Showing posts with label সোমঋতা চ্যাটার্জী. Show all posts
Showing posts with label সোমঋতা চ্যাটার্জী. Show all posts

গল্পের ম্যাজিক:: রাজকন্যে চঞ্চলা আর হাবুলচন্দ্র - সুস্মিতা কুণ্ডু


রাজকন্যে চঞ্চলা আর হাবুলচন্দ্র
সুস্মিতা কুণ্ডু

রাজামশাই শেষমেশ আর কোনও উপায় না পেয়ে, সারা দেশের আনাচে কানাচে লোক পাঠিয়ে, ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে ঘোষণা করলেন, রাজকন্যে চঞ্চলাকে যে উদ্ধার করতে পারবে, তাকে অর্দ্ধেক রাজত্ব দান করা হবেশুধু তাই নয়, ‘সেরার সেরা বীর’ খেতাব দেওয়া হবে তাকে দেশ বিদেশ থেকে রাজপুত্র এল রথ হাঁকিয়ে, মন্ত্রীপুত্র এল হাতিতে চেপে, সেনাপতিপুত্র এল ঘোড়া ছুটিয়ে, আরও না জানি কতশত হোমরাচোমরা নামিদামি লোক এল পায়ে হেঁটে, ছুটে, ঢাল তরোয়াল লাঠি হাতে নিয়ে অচেনা অজানা কত্ত লোক এল কিন্তু কেউ রাজকন্যে চঞ্চলাকে উদ্ধার করে আনতে পারল না পারবে কী করে? রাজকন্যে তো আর উঠোনে খেলে বেড়াচ্ছেন না, যে যাবে আর টপাৎ করে উদ্ধার করে নিয়ে চলে আসবে রাজকন্যে চঞ্চলাকে বন্দি করে রেখেছে এক বিশাআআল বড়ো ড্রাগন সে কেমন ড্রাগন শুনবে?
তার, সবুজ আঁশের বর্ম
তার, লৌহকঠিন চর্ম
তার, কণ্ঠে অগ্নিশর
সে যে ভীষণ ভয়ঙ্কর!
তেরো সমুদ্দুর সপ্তনদীর পারে এক ভয়ানক গভীর জঙ্গলে আকাশছোঁয়া পাথুরে দুর্গে নাকি বন্দি আছেন রাজকন্যে সবাই এর ওর তার মুখে শুনে শুনে সবটা জেনে গেছে কিন্তু সে ড্রাগন আর ড্রাগনের দুর্গের দেখা আর কেউই পায় না কাজেই রাজকন্যেকেও কেউ উদ্ধার করে তার মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে দিতে পারে না সবাই জল্পনা করে, কল্পনা করে, হ্যান করেঙ্গা ত্যান করেঙ্গা মশা মারেঙ্গা ড্রাগন কাটেঙ্গা, কিন্তু কচুটা! কাজের কাজ কিছুই হয় না! আরে বাবা তেরো সমুদ্দুর সপ্তনদী পেরোনো কি ছেলের হাতের মোয়া নাকি?
ওই দ্যাখো ভুল ধরে! হ্যাঁ রে বাবা, ওই সাত সমুদ্দুর তেরো নদীই না হয় হ’ল! এক দু’টো নদী সমুদ্দুর কম বেশি হলেও ফলাফল সেই একই হবে!
অতএব রাজকন্যে চঞ্চলার খোঁজ চলতেই থাকে... চলতেই থাকে

এদিকে রাজা-গজারা সব ততক্ষণ রাজকন্যেকে খুঁজতে থাক, আমরা বরং ওদিকে একটু হাবুলের সঙ্গে আলাপটা সেরে নিই হাবুলের জগৎ সংসারে কেউ নেই রাজ্যের শেষ প্রান্তে একটা কুঁড়েঘরে একা থাকে, একা রাঁধে বাড়ে, একাই খায়দায়, একাই খেলাধুলো করে হাবুলের কুঁড়েটা টপকালেই শুরু হয় গা-ছমছম বন গা-ছমছম বনে সচরাচর কেউ যায় না যাবেই বা কেন? শোনা যায় নাকি ওই বনে নানারকমের সব ভয়াল ভয়ংকর জীবজন্তু থাকে তবে আমাদের হাবুল হল গিয়ে বোকাসোকা ছেলে, আর কে না জানে বোকাসোকা ছেলেদের ভয়ডর কম তাই রান্নার জন্য জ্বালানী কাঠ জোগাড় করতে হাবুল ওই গা-ছমছম বনেই ঢুঁ মারে বেশি গভীরে যায় না, সামনাসামনিই পড়ে থাকা শুকনো ছালবাকল ডালপালা কুড়িয়ে নিয়ে আসে
কিন্তু সেদিন এদিক-সেদিক ঘুরতে ঘুরতে জঙ্গলের একটু ভেতরপানে চলে গেল হাবুল যখন খেয়াল হল তখন দেখল কুঁড়েতে ফেরার চেনা পথটা ঘন জঙ্গল, ঝোপঝাড় আর লম্বা লম্বা গাছের আড়ালে হারিয়ে গেছে হাঁকপাঁক করে পথ খুঁজতে গিয়ে আরও গভীর জঙ্গলের ভেতর দিশেহারা হয়ে গেল হাবুল না জানি কতক্ষণ! ক্ষিধে তেষ্টায় ক্লান্ত হয়ে হঠাৎই এসে পড়ল একটা বেগুনি রঙের প্রাসাদের সামনে প্রাসাদ ঠিক নয় বরং দুর্গ বলাই ভালো খুব উঁচু একটা পাথুরে মিনার চারপাশে পাথরের পাঁচিল সব বেগুনি রঙ করা হাবুল সেই দুর্গে যাবে কি যাবে না চিন্তায় পড়ল দুর্গে যদি কোনও রাক্ষস-খোক্কস থাকে? যদি হাবুলকে গপ করে খেয়ে ফেলে? অবশ্য জঙ্গলে এইভাবে পথ হারিয়ে ঘুরে বেড়ালেও যে হাবুল বিশেষ সুরক্ষিত থাকবে তা নয় তাছাড়া যারা বেগুনি রঙের দুর্গ বানায় তারা কি খুব খারাপ লোক হবে? হলেই বা রাক্ষস!
পাঁচিলের একটা ফোকর দিয়ে গলে ভেতরে ঢুকে পড়ল হাবুল ঢুকেই তো হাবুল থ! কী সুন্দর ভেতরটা কতরকমের ফুলের গাছ, সবুজ ঘাস গাছে গাছে রসালো ফল গাছগুলো লম্বা নয় বেশি, খাটো খাটো সব সেইজন্যই পাঁচিলের ওই পার থেকে দেখতে পাওয়া যায় না হাবুল তো খিদের চোটে অস্থির একটু দূরেই একটা ঝাঁকড়া মতো গাছ তাই থেকে ঝুলছে হলুদ গায়ে সিঁদুরে ছোপওয়ালা টুসটুসে আম গাছটা হাবুলের মাথা ছাড়িয়ে আর বড়ো জোর হাত দুই লম্বা হবে দু’হাতের মুঠোয় দু’খান আম পেড়ে তাইতে সোওওজা দাঁত বসাল হাবুল যেই না সবে মধুর মতো মিষ্টি সোয়াদটা মুখের ভেতর চারিয়ে গেছে, ওমনি একটা খিল খিল হাসির শব্দ কানে বাজল হাবুলের তড়িঘড়ি ওই গাছটার পেছনেই গা-ঢাকা দিল হাসির শব্দটা লক্ষ্য করে চেয়ে দেখে, একটা ছোট্ট মতো মেয়ে, হাবুলের বয়সীই হবে, ছুটে ছুটে খেলছে আর মেয়েটার পায়ে পায়ে ঘুরছে সবুজ রঙের একটা কুকুরছানা, না ছাগলছানা, না না খরগোশছানাই হবে বুঝি হাবুল ঠিক ঠাহর করতে পারে না
হাবুলের কৌতূহল বাড়ে কে এই মেয়েটা? আর সবুজ রঙের এটা আবার কী জন্তু রে বাবা! একটু উঁকিঝুঁকি মেরে নজর করার চেষ্টা করে মেয়েটার গায়েও বেগনে জামা, মাথা ভর্তি কালো কোঁকড়ানো চুল সবুজ ছোট্ট প্রাণীটাকে একটা রঙিন গোল্লা ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে মেয়েটা, ও সেটা কুড়িয়ে কুড়িয়ে আনছে ওমা! সবুজ জন্তুটা আবার ডানা মেলে আকাশে উড়ে গিয়ে গোল্লাটা ধরছে যে কী কাণ্ড! হাঁ করে আকাশের দিকে চেয়ে দেখতে থাকে হাবুল হঠাৎ একটা রিনরিনে গলা ওর কানের কাছে বেজে ওঠে, “এইয়ো! কে বটে তুমি? আমাদের বেগনে পুরীতে কী করে ঢুকলে শুনি? এই ডুগ্গু... ডুগ্গুউউউ! শিগগির এসে এই চোরটাকে ধর তো!”
হাবুল খেয়াল করেনি কখন ওই সবজে উড়ুক্কু জন্তুটাকে দেখতে দেখতে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে বেগনে জামা পরা মেয়েটা ওকে দেখতে পেয়ে সামনে এসে কোমরে হাত দিয়ে আঙুল নেড়ে নেড়ে বকছে সরু গলা হ’লে কী হবে, এমন সানাইয়ের মতো প্যাঁ পোঁ করে বাজছে হাবুলের কানে তালা লাগার জোগাড় তার ওপর আবার সাহস মন্দ নয়, হাবুলকে চোর বলছে! হাবুলের মতো একটা সৎ ছেলে একটা খুঁজে দেখাক তো! হাবুলও রেগেমেগে বলল, “এইয়ো! আমাকে চোর বলবে না বলে দিচ্ছি! আমি হাবুল
মেয়েটা হেসে উঠে বলল, “হাবুল আবার কেমন বিচ্ছিরি নাম!”
“আর তোমার নাম কী শুনি?”
“আমার নাম রাজকুমারী চঞ্চলা! আর ও হ’ল আমার বন্ধু ড্রাগনছানা ডুগ্গু
হাবুল চোখ বড়ো বড়ো করে চেয়ে দেখে, সত্যিই তো! মেয়েটার মাথায় লাল-নীল পাথর বসানো সোনালি রঙের একটা ছোট্ট মুকুট আর ওই উড়ুক্কু জন্তুটারও পিঠে দু’টো ডানা আছে, একটা লম্বা লেজ আছে আর আর... ওই তো! মেয়েটার পেছনে লুকিয়ে হাবুলকে দেখছে আর গর গর করছে, মুখ দিয়ে ধোঁয়া আর অল্প আগুন বেরোচ্ছে তার মানে এটা সত্যি সত্যিই ড্রাগন!
হাবুলের হঠাৎ মনে পড়ে, তাই তো! রাজকন্যে চনচলা না মনচলা কাকে যেন নাকি ভয়ানক ড্রাগন ধরে নিয়ে গেছে! রাজার লোক ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে বলছিল বটে বেশ ক’দিন আগে মা গো মা! এই তবে সেই হারানো রাজকন্যে আর ভয়ানক ড্রাগন! হাবুল হি হি করে হাসতে শুরু করে চঞ্চলা হাবুলের হাসি দেখে আরও রেগে যায় পা ঠুকে বলে, “এইয়ো হাবুলচন্দ্র! খবর্দার হাসবে না বলছি ডুগ্গু তাহলে মজা দেখাবে তোমায়!”
হাবুল হাসি থামিয়ে উত্তর দেয়, “ও রাজকন্যে! তুমি এখানে এই ড্রাগন ছানার সঙ্গে খেলা করছ, আর ওদিকে তোমার বাবা-মা যে তোমায় খুঁজে খুঁজে সারা! কত লোক তোমায় কতশত সমুদ্দুর নদী পাহাড় সব টপকে খুঁজতে গেছে, আর তুমি এই গা-ছমছম বনের বেগনে দুর্গে লুকিয়ে আছ? তুমি বরং বাড়ি ফিরে যাও
চঞ্চলার মুখটা কেমন রাগ আর দুঃখের মিশেলে কাঁদো কাঁদো হয়ে যায়
“আমি কিছুতেই রাজপ্রাসাদে ফিরব না! দিনরাত খালি অঙ্ক কষো, নামতা পড়ো, পদ্য মুখস্থ করো, নাচ শেখো, গান শেখো! ভাল্লাগে না, আমার একদম ভাল্লাগে না! সইদের সঙ্গে খেলব কখন? পঞ্চব্যঞ্জনে সোয়াদ লাগে না কুলের আচার আমের টক খেতে দেয় না কেউ আমায় গলা খারাপ হলে গাইতে পারব না, পেট ব্যথা হলে পাঠশাল যেতে পারব না বলে ওটা রাজপ্রাসাদ না কারাগার! আমি এখানেই ডুগ্গুর সঙ্গে দিব্যি আছি
এই বলে ড্রাগনছানার মাথায় হাত বোলায় চঞ্চলা সেও চঞ্চলার হাতের তালুতে মাথা ঘষে, পোষা বেড়ালছানার মতো কে বলবে এ নাকি ভয়ংকর ড্রাগন!
হাবুল বোকাসোকা হলেও মূর্খ নয় মানুষের মনের কষ্ট সে বোঝে নরম গলায় বলে, “রাজকন্যে আমি তোমার দুঃখটা বুঝেছি গো কিন্তু তুমিও ভেবে দেখ তো, এই যে তুমি বাড়ি ছেড়ে চলে এলে, তোমার মা-বাবা তোমায় কত খুঁজছেন, কত কান্নাকাটি করছেন আমার সাত কূলে কেউ নেই, তাই মা-বাবার ভালোবাসা আমার কপালে জোটেনি কিন্তু তুমি সেই ভালোবাসা হারিয়ে ফেলবে সামান্য কারণে রাজকন্যে?”
চঞ্চলা হাবুলের কথাগুলো শুনতে থাকে হাবুল বলে চলে, “দুনিয়াটা কেমন অদ্ভুত দেখ তোমার পড়াশোনা করতে ইচ্ছে করে না অথচ আমার পড়াশোনা করতে পাঠশালে যেতে ভারি মন চায় কিন্তু আমার কপালেই নেই পড়াশোনা! কে পড়াবে এই অনাথ হাবুলকে? শুধু কি তাই? তোমার পঞ্চব্যঞ্জনে অরুচি অথচ আমার মতো গরীব মানুষরা দু’বেলা একটু ভাত পেলেই হেসে খেলে আনন্দে থাকি তাই বলছিলুম রাজকন্যে এভাবে রাগ করে থেকো না!”
মনটা কেমন কেমন করে চঞ্চলার মায়ের হাতের রান্না, বাবার আদর সব মনে পড়ে হাবুল বুঝতে পারে রাজকন্যের মনটা, “তার ওপর কন্যে ভেবে দেখ! তোমায় খুঁজতে কত লোক কত জায়গায় ছুটছে তাদের যদি কোনও বিপদ হয় অথবা তোমায় এখানে খুঁজে পেয়ে কেউ যদি ভাবে ডুগ্গু তোমার ক্ষতি করেছে আর ডুগ্গুকে ওরা ধরেবেঁধে নিয়ে যায়?”
চঞ্চলার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে সত্যিই তো! এত কিছু তো তলিয়ে ভাবেনি ও পালিয়ে এসে কত লোককে কষ্ট দিচ্ছে, বিপদে ফেলছে নিজের অজান্তেই দু’হাত চোখে চাপা দিয়ে কেঁদে বলে ওঠে চঞ্চলা, “না না, আমি আজই বাড়ি যাব আমি তো বাড়ি থেকে পালিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এই জঙ্গলে এসে পথ হারিয়ে ফেলি তারপর ডুগ্গুর দেখা পাই এই বেগুনি দুর্গে তারপর থেকে আমি এখানেই ছিলাম, মা-বাবার ওপর রাগ করে একদিন ডুগ্গুর পিঠে চেপে বনের বাইরে আকাশে উড়ছিলাম এক কাঠুরে আমাদের দেখে ফেলে সেই থেকেই মনে হয় গুজব ছড়ায় যে আমায় ভয়ংকর ড্রাগন সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পারে বন্দি করে রেখেছে কিন্তু ডুগ্গু তো আসলে ছোট্ট ড্রাগনছানা ও খুব ভালো তোমার কথা শুনে আমি বুঝলাম আমি খুব বড়ো অন্যায় করেছি আমার অনেক কিছু আছে বলে আমি সেগুলোর গুরুত্বই বুঝিনি কিন্তু যাদের নেই তাদের কথা শুনে আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি
হাবুল হেসে বলে, “এই তো রাজকন্যের মতো কথা ফিরে গিয়ে মা-বাবাকে তোমার কষ্ট ইচ্ছে-অনিচ্ছেগুলো বুঝিয়ে বলো, ওঁরা ঠিক শুনবেন

তারপর কী হল?
কী আবার হবে?
হাবুলচন্দ্র রাজকন্যে চঞ্চলাকে পৌঁছে দিয়ে এল রাজপ্রাসাদে রাজামশাই তাকে ‘সেরার সেরা বীর’ খেতাব আর অর্ধেক রাজত্ব পুরস্কার দিতে গেলেন কিন্তু হাবুল বলল, “রাজত্ব নিয়ে আমি কী করব, রাজামশাই? আপনি বরং আমার মতো অনাথ বাচ্চাদের থাকাখাওয়া পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দিন, তাহলেই আমি খুশি
হাবুলের এই কথা শুনে তো সবাই ধন্য ধন্য করল আর গল্প এখানেই ফুরোলো!
ওহো না না... একটুসখানি বাকি আছে ড্রাগনছানা ডুগ্গু এখন রাজকন্যে চঞ্চলার কাছেই থাকে চঞ্চলা রোজ বিকেলে ডুগ্গুর পিঠে চেপে উড়ে যায় জঙ্গলের ভেতরে সেই বেগনে দুর্গে
কেন যায়?
বাহ্ রে! সেখানে যে এখন চঞ্চলার প্রিয় বন্ধু হাবুল থাকে অত সুন্দর সুন্দর মিঠে আমের মায়া কাটিয়ে কি আর হাবুলচন্দ্র অন্য কোথাও থাকতে পারে?
চঞ্চলা আর হাবুলচন্দ্র
হল প্রাণের বন্ধু,
তাই না দেখে বেজায় খুশি
ড্রাগনছানা ডুগ্গু
_____
ছবিঃ সোমঋতা চ্যাটার্জী

গল্পের ম্যাজিক:: বিউটি পার্লার - সহেলী চট্টোপাধ্যায়


বিউটি পার্লার
সহেলী চট্টোপাধ্যায়

তখন আমার বয়স কুড়ি বাইশ হবে। এখনকার মতো মোটা চশমা পরা ভারিক্কি গোছের দিদিমণি মোটেও ছিলাম না। গ্রাজুয়েশনের ফাইনাল ইয়ার। এখনও মনে হয় এই তো কদিন আগের ঘটনা। ঘটনা বলা যাবে কিনা জানি না, কিন্তু কিছু একটা তো ঘটেছিল। আমার মর্নিং কলেজ ছিল। রোজ সকাল সকাল বেরিয়ে যেতাম। একদিন কলেজে তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেল। কোন একজন স্টাফ মারা গেছিল। আমি ফিরছিলাম। আমার একটা বন্ধু ছিল ইতি। একসঙ্গে যাতায়াত করতাম। কিন্তু ইতি সেদিন আসেনি। আমি একা টুকটুক করে হাঁটছি। বাস ধরব বলে। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল হঠাৎ। ছাতা খুলতে খুলতে বেশ খানিকটা ভিজে গেলাম। এদিক ওদিক তাকাচ্ছি যদি একটা মাথা গোঁজার আস্তানা পাওয়া যায়। সামনে একটা বিউটি পার্লার দেখে ঢুকে পড়লাম।
পার্লারটা একদম নতুন হয়েছে। ঢুকতেই মনটা অদ্ভুত একটা ভালোলাগায় ভরে উঠল। জানি না কেন এরকম লাগছিল! মনে হচ্ছিল যেন কোথাও বেড়াতে এসেছি। বেশ সুন্দর ঝাঁ চকচকে পার্লার। ভেতরে ঝকঝক করছে। ঝকঝকে আয়নায় নিজেকে কত সুন্দর লাগছে। কয়েকটা মিষ্টি মেয়ে বসেছিল। আমাকে দেখে একজন হেসে বলল, কী করবে?
আমি বললাম, বাইরে বৃষ্টি দেখে ঢুকে পড়লাম। আমি তো কিছু করাই না।
-      তাহলে একটা ম্যাসাজ হয়ে যাক।
-      কিন্তু আমি কখনও এসব করাই না। তাছাড়া আমার কাছে তেমন টাকাও নেই।
-      আমরা টাকা নেব না।
-      না না, তা কী করে হয়!
-      তুমি লাকি ফিফথ কাস্টমার। তাই তুমি ফ্রিতে পাবে সব সার্ভিস।
আস্তে আস্তে আমি যেন কেমন হয়ে যাচ্ছিলাম। ভেতরে একটা সুন্দর গন্ধ ভেসে আসছিল। মনে হয় কোন এসেন্স দিয়েছে বা নতুন ধরনের কোন রুম ফ্রেসনারস। আর একটা মিউজিকের টিউন ভেসে আসছে। সত্যি মনে হচ্ছে আমি কোথাও বেড়াতে এসেছি। মনটা খুব হালকা লাগছে। খুব আনন্দ হচ্ছে, মনে হচ্ছে আমি চিরশান্তির রাজ্যে চলে গেছি। আমি আমার কথা বলতে লাগলাম। আমাকে যে ম্যাসেজ করছিল ওর নাম ইউনিস। এরকম অদ্ভুত নাম কেন আমি আর জিজ্ঞাসা করিনি। তার হাতের ম্যাজিক ম্যাসাজ আমি আজও ভুলিনি। পার্লারের ভেতরটা খুব আরামদায়ক। দেয়ালে একটা পাহাড়ি ঝরনার ছবি। ঝরনার জলধারা গড়িয়ে পড়ছে। জলটা যে গড়িয়ে পড়ছে বোঝা যাচ্ছে। ছবির ঝরনাও কথা বলছে। নিশ্চয় এই ছবির পেছনে বিজ্ঞান আছে। আর দেখা যাচ্ছে একটা ছোটো ঘর। পাহাড়ি জায়গায় যেমন বাংলো টাইপের বাড়ি হয় ঠিক সেই রকম। মনে হল এই পার্লারে থেকে যাই। এত শান্তি এখানে। বাড়িতে সারাক্ষণ মায়ের খিট্‌মিট্‌ সহ্য করতে হয়। মা প্রচন্ড বাস্তববাদী, তাই আমার সঙ্গে বনে না। তার চেয়ে এখানেই থেকে যাই। কিন্তু পার্লারে আমাকে রাখবেই বা কেন! ইউনিস বলছিল, তারা অন্য জায়গা থেকে এসে এই পার্লার খুলেছে। তারপর আর কিছু মনে নেই। জানি না কেন।
পার্লার থেকে বেরুলাম যখন তখন আর বৃষ্টি হচ্ছিল না। বেগুনি রঙের আকাশ। পাখির শিস শুনতে শুনতে মনটা ভালোলাগায় ভরে যাচ্ছিল। হাঁটতে হাঁটতে একটা রেস্টুরেন্ট চোখে পড়ল। আবার ঢুকে পড়লাম। রুমালি রুটি আর চিকেন তন্দুরি দিয়ে লাঞ্চ করলাম। একা একা বেশ ভালো লাগছিল।
বাস ধরে বাড়ি এলাম। মা অফিস, বাবা অফিস। তারপর কলেজের আবার ছুটি পড়ল। একমাস পর আবার গেলাম। পার্লারের জায়গায় দেখলাম সেই পুরানো ভাঙাচোরা বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। মনে পড়ে গেল, এখানে বরাবর এই ভাঙা বাড়িটাই দেখে আসছি। এখানে কখনও কোন ঝাঁ চকচকে পার্লার কোনোদিনই ছিল না। পার্লার কোথা থেকে আসবে? সেদিন কি দিনের বেলা আমি জেগে জেগে স্বপ্ন দেখেছিলাম! কাছেপিঠে রেস্টুরেন্টও নেই।
এই ছিল আমার গল্প। তারপর কুড়িটা বছর কেটে গেছে। আমার চোখে চশমা উঠেছে। এখন পড়াই কোচিং সেন্টার করে। মা আরও খিট্‌খিটে হয়েছে। প্রতিদিন বকা খাওয়াটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। একদিন কলেজের ওদিকেই গেছি। সেই রাস্তা ধরেই হাঁটছি। অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আবার বৃষ্টি নামল। হঠাৎ সেই ভাঙাচোরা বাড়িটার কাছে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। বাড়ির জায়গায় শোভা পাচ্ছে ঝাঁ চকচকে একটা পার্লার। ভেতরে ঢুকেই মনটা ভালো হয়ে গেল। দেখলাম দেয়ালে সেই ঝরনার ছবি। জল গড়িয়ে পড়ছে। দু-তিনটে মেয়ে বসে গল্প করছিল। তাদের মধ্যে একজন বলল, কী করাবেন?
ইউনিস এখনও একইরকম আছে। বয়স শুধু আমারই বেড়েছে।
বললাম, আমি আসলে বৃষ্টি দেখে ভেতরে ঢুকে পড়েছি। কখনও কিছু করাই না।
-      তাহলে একটা ম্যাসাজ হয়ে যাক। আপনার শরীর মন তরতাজা হয়ে উঠবে। সব স্ট্রেস কেটে যাবে।
-      কিন্তু আমার হাতে তো তেমন টাকা নেই।
-      আপনি আমাদের লাকি ফিফথ কাস্টমার। আপনি ফ্রিতে করাবেন।
ইউনিসের হাতের ম্যাসাজে পর আবার রেস্টুরেন্টে গেলাম। সেই রুমালি রুটি আর চিকেন তন্দুরি। আজ একটা আইসক্রিম নিলাম। অবিকল কুড়ি বছর আগের একটা দিনের মতোই সব হচ্ছে।
রাতে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখলাম ইউনিসের পার্লারের। ইউনিস হেসে বলল, আমরা আসলে পরিকেউ কেউ আমাদের দেখা পায়। আমরা মানুষের মন ভালো করার চেষ্টা করি, না হলে এই নিষ্ঠুর বাস্তব দুনিয়ায় তারা থাকবে কী করে? আর কী করেই বা গল্প কবিতা লিখবে! তুমি খুব লাকি, তাই আমাদের দেখা পেলে। ভালো থেকো। আরও ভালো ভালো লেখার চেষ্টা করো। আবার দেখা হবে আমাদের।
পরের দিন সকালে আবার ছুটলাম পার্লারের উদ্দেশে। কুড়ি বছর কেটে গেছে, সেই ভাঙাচোরা বাড়িটা একইরকম আছে। শরিকি বিবাদের কারণে বাড়িটা বিক্রি হচ্ছে না।
_____
ছবিঃ সোমঋতা চ্যাটার্জী

গল্পের ম্যাজিক::অন্যরকম রূপকথা - ঈশানী রায়চৌধুরী


অন্যরকম রূপকথা
ঈশানী রায়চৌধুরী

দুটো শোবার ঘর, মাঝে একটা চৌকো মতো দালান, একপাশে রান্নাঘর, একটা খাবার ঘর, আর রাস্তার দিকে কালো রেলিং ঘেরা একটা মস্ত বারান্দা। ব্যস, এটুকু নিয়েই ঝিনিদের ভাড়ার আস্তানা। দোতলায়। কলঘরে আবার মাঝে মাঝে জল আসে না। তখন বাড়িওয়ালার সঙ্গে গলা তুলে ঝগড়া করতে হয়। এ বাড়িতে কোনও বৈঠকখানাও নেই। কেউ এলে ওই দুটো শোবার ঘরের যে কোনো একটাতে খাটের ওপরেই জাঁকিয়ে বসে। ঝিনির ঠাম্মা-দাদুর আপনার জন হলে ওদের ঘরে যায়, আর মা-বাবার চেনা হলে তাদের ঘরে। তবে হ্যাঁ, একটা অলিখিত নিয়ম আছে। ঝিনির মা-বাবার কাছে কেউ এলে তাকে অন্য ঘরেও হাজিরা দিতে হয়, কিন্তু উলটোটা কক্ষনো হয় না। ঝিনির মা-বাবাকেই তখন এ ঘরে এসে বসতে হয়। ঝিনি তখন কী করে? সে দাঁত দিয়ে গভীর মনোযোগে নখ কাটতে কাটতে তার খরগোসের কানজোড়া পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে সব কথা গোগ্রাসে গেলে।
আসলে ঝিনির খুব তাড়াতাড়ি টুক করে বড়ো হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। বড়ো হলে তবেই বন্ধুবান্ধব হয়, ঝিনি জানে। এখানে তো তার কোনও বন্ধুই নেই! শুধু রেলিংগুলো আছে। ঝিনির বয়স চার। সে দুষ্টু নয়, তবে সেয়ানা খুব। সে পাড়ার একটা নার্সারি ইস্কুলে ভর্তি হয়েছে এবং চট করে শিখে নিয়েছে কী করে ক্লাসে দিদিমণির মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেও মনে মনে সাত পাঁচ চিন্তা করা যায়। অবিশ্যি দিদিমণির মুখের দিকে তাকালে চিন্তার চেয়ে ভয় দানা বাঁধে বেশি! তিনি যেমনি কালো, তেমনি দশাসই। মাথায় চুড়ো করে চুল বাঁধা। খোঁপা নয়, বিচ্ছিরি গুটলিমতো। চোখ দুটো একটু লাল লাল, হাতে খটখটে কাঠের স্কেল। ঝিনি একদিন কপালে বাড়ি খেয়েছে, টিফিনে অসভ্যের মতো জ্যাম বিস্কুট খুলে ভেতরের জ্যাম চেটে চেটে খাচ্ছিল বলে।
ঝিনি যখন ইস্কুল থেকে ফিরে ধাঁই ধপ করতে করতে সিমেন্টের চলটা ওঠা সিঁড়ি টপকাতে টপকাতে ওপরে ওঠে, তার মা তখন বাড়িতে থাকে না। মা পড়তে যায় বড়ো কলেজে। দাদু বলে, ‘ইউনিভার্সিটি।’ ঝিনি ঠাম্মার কাছে চান করে, ভাত খায়, তারপরে ঠাম্মা যখন দুপুরে নাকে চশমা এঁটে বড়ো পালঙ্কটাতে গা এলিয়ে দেয় খবরের কাগজ হাতে নিয়ে, সে গুট গুট করে ঢুকে যায় পালঙ্কের নিচে। ওখানে তার একঘর ছেলেপুলে নিয়ে সংসার। ঝিনির বাবা আছে, ঝিনির বাবার আর মায়েরও বাবা আছে, কিন্তু কোনও অজানা কারণে ঝিনির ছেলেপুলেদের তো বাবা নেই! তাই সব কিছু ঝিনিকেই দেখতে হয়। ঘরের কাজ, বাইরের কাজ। বাইরের কাজ বলতে ঝিনিও ‘আপিস’ যায়। সে ইস্কুলে পড়ায়। বারান্দার কালো রেলিংগুলো সব তার ছাত্রছাত্রী। তবে সে ইস্কুল বসে বিকেলে, যখন ঝিনির মুখে সাদা দুধের গোঁফ গজায়। ঝিনি তখন কাচ্চাবাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে একটা স্কেল বগলদাবা করে ক্লাস নিতে আসে। কতক্ষণ? যতক্ষণ না তার মায়ের চেনা শাড়ির আঁচল দেখা যায় রেলিঙের ফাঁক দিয়ে।
আসল কথাটা হল, ঝিনি তার মাকে যমের মতো ভয় পায়। বাড়ির তিনজন তাকে নির্বিকার আহ্লাদ দিলেও তার মা জননীটি বড়ো কঠিন ঠাঁই। ঝিনির এই যে ইস্কুলের পড়া করতে যাচ্ছেতাই লাগে, মানে ইস্কুলেই যেতে ভালো লাগে না, রোজ টিফিনে সিঙ্গাপুরি কলা আর জ্যাম-বিস্কুট খেতে বমি পায়, সে কথা মায়ের কানে গেলে রক্ষে নেই আর! মা ঝিনিকে বুঝিয়েছে, কত গরিব লোক পেট ভরে খেতে পায় না, কত বাচ্চা ইস্কুলে যেতে পারে না! ঝিনির খুব ইচ্ছে করে ওই কলা আর বিস্কুট সামনের বস্তির বাচ্চাদের দিয়ে দেয়। ঝিনির বদলে ওরা ইস্কুলে গেলেও ঝিনির কোনও আপত্তি নেই। যোগ বিয়োগ, হাতের লেখা, বাংলা রিডিং, ইংরিজি রাইমস... সবই অপছন্দ তার। খাতায় ভুলভাল লিখলে মা গালে ঠোনা মারে, বকে খুব। ঝিনি কাঁদে না। সে চুপিচুপি শিখে নেয় এই সব শাসন। তার জের টানে বোবা রেলিংগুলো।

এইভাবে এক রুটিনে চলতে চলতে ঝিনির একা থাকা অভ্যেস হয়ে গেছে। সত্যি বলতে কী, একা থাকতেই তার যেন বেশি বেশি করে ভালো লাগে। সে বই ভালোবাসে খুব, তবে শুধুই গল্পের বই আর ছড়ার বই; পড়ার বই একেবারেই নয়। মানে নিজের পড়ার বই এড়িয়ে চলে যথাসম্ভব। ঝোঁক তার মোটাসোটা ইংরিজিতে লেখা বাবার বইগুলোর ওপরে। বাবাও তো মাস্টারমশাই। কলেজের ছেলেপুলেদের পড়ায়। হয়তো এইজন্যই তারও সুযোগ পেলেই ভরদুপুরে রেলিং পেটানোর ঝোঁক! সে সব বইয়ের মাথামুণ্ডু ভারী তো বোঝে ঝিনি! শুধু পেটের ওপরে চেপে ধরে হাঁচোড়পাঁচোড় করতে করতে বিরাট বিজ্ঞের ভান করে উঠে বসে বাবা-মায়ের শোবার ঘরের জানলার ধাপির ওপরে। এই জানলাটা খোলে পাশের সরু গলিটার গায়ে। সেখানে টাইমের কলে জল নিতে ভিড় জমায় উলটোদিকের বস্তির মেয়ে-বউ। তারা লাইনে দাঁড়িয়ে ওপরপানে তাকিয়ে হেসে বলে, ‘কী করছ গো ঝিনি?’
ঝিনি উঁচু করে তুলে ধরে মোটা ইংরিজি বই। গম্ভীর গলায় বলে, ‘পড়ার খুব চাপ বেড়েছে আজকাল। পড়ছি।’
বই তো খোলা, কিন্তু ঝিনির কান থাকে ওই কলতলায়। প্রচুর নতুন শব্দ শেখা যায়, যদিও তার বেশিরভাগই ‘মন্দ’ কথা। এই যে এগুলো সব মন্দ কথা, ঝিনি সেটা বুঝল কী করে? একদিন ভুল করে বলে ফেলেছিল সে, মায়ের সামনে। মা ধুপধুপিয়ে রান্নাঘর থেকে আঁশবঁটি বাগিয়ে তেড়ে এল। ঝিনির জিভ কেটে নেবে কুচুত করে। শেষ পর্যন্ত জিভটা ঠাম্মার দয়ায় বেঁচে গেলেও পিঠ আর কান বাঁচেনি। সেই থেকে ঝিনি শোনে সব, মনেও রাখে কিছু কিছু, কিন্তু মুখে উচ্চারণ করে না।

ঝিনির খুব এটা সেটা কিছু একটা পুষতে ইচ্ছে করে। কুকুরছানা, বিড়ালছানা, এমনকী কেলেকুষ্টি কাকের ছানাও তার বেশ লাগে! সে দেখেছে কাকের ছানার হাঁ-মুখটা কী সুন্দর লাল!
তার চিরকালই মানুষের থেকে জন্তুজানোয়ার পাখি প্রজাপতি ঢের বেশি পছন্দ। কিন্তু ছোটো মেয়ের পছন্দ-অপছন্দের দাম আজ পর্যন্ত কোনো বাড়ির বড়োরা দিয়েছে বলে তো শোনা যায় না! এই যেমন সে চেয়েছিল মুরগির ছানা পুষতে। ছোট্ট ছোট্ট গুল্লি গুল্লি সাদা-হলুদ কদমফুলের মতো। কিন্তু কেউই গা করে না দেখে মাথায় একটা সহজ বুদ্ধি খেলেছিল তার। চুপি চুপি সেটা সরলা দিদিকে বলল। সরলা দিদি ঝিনিদের বাড়িতে কাজ করত আর তার বহু বায়নাবাটি মেটাত বটে, এই প্রস্তাব শুনে চোখ কপালে তুলে দৌড়ে গিয়ে অমনি ঝিনির মায়ের কাছে চুকলি কেটে এলঅথচ প্রস্তাবটা এত হইচই করার মতো ছিলই না! শুধু বাজার থেকে ডিম আনা হয়েছে দেখে দুটো ডিম লুকিয়ে নিয়ে গিয়ে সরলাদিদিকে সে বলেছিল তা দিতে। ছানা ফুটলে ঝিনিই না হয় পালত তাদের! সে যাত্রা সরলাদিদির বিশ্বাসঘাতকতায় ডিমগুলো বেঁচে গেল বটে, কিন্তু ভবি ভোলার নয়। কিছুদিন পরে বাড়ির লোকজন বুঝলও সে কথা। ঝিনির মাথার পোকা নড়েছে যখন একবার, ডিমে তা দিতেই হবে। চুপিচুপি বাজার থেকে কিনে আনা মুরগির ডিমের ওপরে এবার নিজেই বসার চেষ্টা করল সে। ছানা-টানা কিচ্ছুই হল না, মাঝখান থেকে ভ্যাচ করে ডিমটা ভেঙে গিয়ে তার সাদা টেপ জামা আর জাঙিয়াটা নষ্ট হয়ে গেল। মা অমনি দু-ঘা কষিয়ে দিল পিঠে।

ঝিনির ঘ্যানঘ্যানানিতে অতিষ্ঠ হয়ে ঝিনির মামা একদিন জলভরা প্লাস্টিকের থলি করে চারটে মাছ নিয়ে এল। লাল মলি আর কালো মলি। কী কিপটে রে বাবা! এইটুকু-টুকু মাছ, তাও মোটে চারটে ! হরলিক্সের খালি শিশিতে জল দিয়ে রাখা হল তাদের। আর তারপর ঝিনির ঘুম, খাওয়া, লেখাপড়া মাথায় উঠল। এই যে মাছগুলো একটানা সাঁতার কাটছে, ওদের গায়ে ব্যথা হবে, এতক্ষণ জলে থেকে সর্দিও হবে নির্ঘাত! এমনি  জামা না পড়ুক, অন্তত সাঁতারের জামা তো পরতেই পারে! যতক্ষণ বাড়িতে থাকে ঝিনি, তার অখণ্ড মনোযোগ ওই গেঁড়ি গেঁড়ি মাছের ওপরে। ঘরে কেউ না থাকলে বিড়বিড় করে ওদের সঙ্গে গল্পও করে সে। নাম দিয়েছে লালি ১, লালি ২ আর কালি ১, কালি ২। একবার ‘ঝিনি’ হয়ে কথা বলে ওদের সঙ্গে আর একবার কোনও না কোনও ‘লালি’ বা ‘কালি’ হয়ে। কী করে যে ১ আর ২ নম্বরদের আলাদা করে কে জানে, কিন্তু ও নাকি ঠিক চিনতে পারে! তারপর একদিন ঝিনি অবাক হয়ে দেখল জলের মধ্যে সরষের দানার মতো গুঁড়ো গুঁড়ো কী যেন! মা বলল, লালি-কালি মাছের ছানা বেরিয়েছে ডিম ফুটে। এক্ষুনি আলাদা করে দিতে হবে। না হলে মা ছানাগুলোকে কপকপিয়ে খেয়ে ফেলবে। ছোটো শিশি, চানের মগ নিয়ে আসা হল। দূর, ও সব কি সোজা কথা! গেঁড়িগুলো অক্কা পেল প্রথমে, কারণ তাদের বাপ মা তাদের খেয়ে সটান হজম করে ফেলল। ধাড়ি চারটেও যে এক এক করে কখন পটল তুলল কে জানে!

এরপর ঝিনির বছর সাড়ে পাঁচ বয়স যখন, তারা বাড়ি বদলাল। নতুন বাড়িতে মালপত্তর পৌঁছনোর পরে ঝিনি একদিন উল্লসিত হয়ে আবিষ্কার করল, তার ঠাম্মার বিয়ের সময়কার ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে নেংটি ইঁদুর বাচ্চা দিয়েছে। কী যে মিষ্টি হালকা গোলাপি কুট্টি কুট্টি দেখতে! তিনটে মিষ্টি আর কুট্টি ইঁদুরছানা। ফুটফুটে কচি সাহেব বাচ্চাদের মতো ফরসা আর গোলাপি। ন্যাজগুলো এত খুদে যে ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে দেখতে হয়। কালো জিরের মতো চোখ। ওদের মা-বাবা খুব বজ্জাত। ‘জন্মেছিস, খুঁটে খে গে যা,’ নির্ঘাত এই বলেই ওদের ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর মা ওদের ড্রয়ারের মধ্যে ফেলে রেখে চম্পট দিয়েছে। ঝিনি সেই কী একটা সিনেমায় দেখেছিল যেমন... বাচ্চা ফেলে রেখে মা চলে গেছে ওই বৃষ্টি মাথায় করে। কোন চার্চের সিঁড়িতে নাকি মন্দিরের চাতালে... ওইরকম। শুধু ইঁদুরদের বেলায় জায়গাটা আলাদা। ঠাম্মার বার্মা টিকের ড্রেসিং টেবিলের আয়নার নিচে দুটো খুদে ড্রয়ার ছিল, তার একটার মধ্যে। দাদুর সেই আদ্যিকালে বন্ধ হয়ে যাওয়া ফাটা কাচের ধ্যাবড়াপানা ট্যাঁকঘড়িটার পাশে।
ঝিনি স্রেফ চেপে গেল ইঁদুরছানাদের কথা। সে সুযোগ পেলেই ওই ড্রয়ার খুলে ডিঙি মেরে উঠে হাঁপাতে হাঁপাতে সাত জন্মের অচল ট্যাঁকঘড়িতে দম দেয় বাঁই বাঁই করে, ঘেঁটেঘুঁটে দেখে কী মণিমুক্তো মেলে আর চুপি চুপি ইঁদুরদের দেখাশুনো করে।
উফ, কী তুলতুলে আর নরম নরম। কী সুন্দর মুখের ছিরি, এক পছন্দে বিয়ে হয়ে যাবার মতো। নিয়মিত বিস্কুটের গুঁড়ো, চালের খুদ এইসব রান্নাঘর থেকে লুকিয়ে এনে খাওয়াতে খাওয়াতে এক সময়ে তার সঙ্গে ছানাগুলোর যথারীতি কথোপকথনও শুরু হয়ে যায়। কয়েকদিন বাদে এক চিলতে খবরের কাগজে ওদের তুলে পুতুলের বাক্সের ডালা খুলে লুকিয়ে রাখল ঝিনি। একটু ফাঁক করে। খাটের তলায়।
আহা রে, সবে আধো আধো বুলি ফুটেছে। ফিসফিস করে জানতে চাইল, কী খাবি?
তিনটে খুদে ফোকলা মাড়ি বের করে ফিক করে হেসে বলল, ছন্দেছ। ওপলে কিচমিচ দেওয়া।
ঠাম্মার পুজোর থালায় ছিল। এদিক ওদিক তাকিয়ে একটু ভেঙে দিল ঝিনি। আহা, খাক ওরা। ঠাম্মা চেঁচামেচি করলে টপ করে বলে দেওয়া যাবে, ঠাকুর খেয়েছে। এবার জল খাবে তো ওরা! কিন্তু কী করে? মায়ের নাক বন্ধ হলে নাকে ওষুধ দেয়; ড্রপার দিয়ে। ওইটে ঝেঁপে দিল ঝিনি। তবে বেশ করে জলে ধুয়ে। ওষুধ থাকলে জলের টেস্ট লাগবে না।
এরপর থেকে এই এক কাজ হল তার। বিস্কুটের টুকরো, আলুসেদ্ধ, সন্দেশ, চটকানো ভাত। একদিন রসগোল্লা দিয়েছে... হামলে পড়ে খেতে গিয়ে ব্যাটাদের বিষম খেয়ে দম আটকে মরার দাখিল। একদিন ঝোলমাখা ভাত দিয়েছে, বলে কিনা, খাব না। , কেমন নোংরা মতো। ফরসা ভাত দাও
বোঝেও না যে ঝিনিকে কত কষ্ট করে আর লুকিয়ে এ সব জোগাড় করতে হয়! হাড়জ্বালানে পরভালানে ছানাপোনা যত!
বিকেলে রুমালে মুড়ে বা কোট ফ্রকের পকেটে লুকিয়ে তেনাদের হাওয়া খাওয়াতে নিয়ে যেতে হয়। ওদের নাম দিয়েছে চ্যাঁ, ভ্যাঁ, ট্যাঁ। ডাকনাম। এখনও ভালো নাম দেয়নি। ইস্কুলে ভর্তির সময় তো দিতেই হবে!

বেশ আছে ওরা। ওরা চার জন। ঝিনির আরবন্ধু চাই-এর বায়না নেই। একা থাকার কষ্ট নেই। তিনটেই গোকুলে বাড়ছে। কেউ জানেই না। ওদের গায়ে রেশমি রোঁয়া, মোটকু-সোটকু চেহারা, গুটগুট করে হাঁটে, তুরতুর করে ছোটে, কিচকিচ করে কথা বলে, কুপকুপ করে খায়। ঝিনিকে নাকি ‘দিদিভাইবলে!
ঝিনি যখন মনে মনে এঁচে রেখেছে এবারে ওদের ভাইফোঁটা আর বোনফোঁটা দেবে, ঠিক তখনই এক কেলোর কীর্তি হল।
পুতুলের বাক্সের ডালাটা বুঝি একটু বেশি খোলা ছিল। তিনটেতে ওস্তাদি করে বাইরে এসে পায়চারি করছে গম্ভীর হয়ে। ব্যস! এ বাড়িতে ঠিক জুটেছে একজন, সরলা মাসির জায়গায় রাধা মাসি, তার আবার সবেতেই উত্তেজনা আর চিলচিৎকার!
‘তিনটে ধেড়ে নেংটি ইঁদুর ভুষ্টিনাশ কল্লো।’
ঝিনি বলে, নেংটি কখনও ধেড়ে হয় না, আর এগুলো একে পোষা তায় ছেলেমানুষ।’
কিন্তু ততক্ষণে সারাবাড়িতে তাণ্ডব! যত সে বোঝাতে চায় ওরা খুব বাধ্য ততই সব্বাই মিলে তার খোয়ার করে! মুড়ো ঝাঁটা নিয়ে রাধামাসি, কোমরে আঁচল জড়িয়ে রণরঙ্গিনী ঝিনির মা জননী, তিড়িং বিড়িং তুড়ি লাফে তার ঠাম্মা... উফ, সারা বাড়ি হুলুস্থুলু! তিন মক্কেল বেগতিক দেখে খোলা দরজা দিয়ে সোজা ধাঁ।
মা চিল্লিয়ে বাড়ি মাথায় তুলে ঝিনির বেআক্কেলে বুদ্ধির জন্য বকাবকি করতে করতে কান পেঁচিয়ে দিল জোরসে। আর বাবা কোনো কালেই জন্তুজানোয়ার সইতে পারে না। তাই কড়া হুকুম হল, বাড়ির মধ্যে কোনদিনই কোনো চারপেয়ে আটপেয়ে চলবে না।

বাড়ির মধ্যে চলবে না। বাইরে তো চলতে পারে! তখন ঝিনি দাদুর হাত ধরে ঝুলে পড়লচিরকালই সে ঘ্যানঘ্যান করতে এক্সপার্ট। অতিষ্ঠ হয়ে শেষে জগুবাবুর বাজার থেকে একটা স্টেগোসরাসের ছানা নিয়ে এল দাদু। দেশলাইয়ের বাক্স করে। ছোট্ট মাথা, শরীরটা তুলনায় বড়ো, লেজটা চিমড়েপানা। কিন্তু পিঠে ছোট্ট ছোট্ট কাঁটা আর পাত কই? দাদু বলল, বড়ো হলে হবে। একটু ঘিয়ে আর বাদামি চেহারা। ঝিনি একটু খুঁতখুঁত করেছিল বটে মাথাটা কেমন ছোটো বলে, দাদু বলল,ছোটো মাথাই ভালো। বুদ্ধি কম হলে তাড়াতাড়ি পোষ মানবে, কারণ ছোটোদের তো এমনিতে কেউ ধর্তব্যের মধ্যেই আনে না।’
পেছনের বারান্দায় রাখা হবে ওকে। ওদিকে দু-ধাপ সিঁড়ি পেরোলেই তাদের এই ভাড়াবাড়িটার সঙ্গে মুফতে পাওয়া একটা আধা-বাগান টাইপ জায়গা। আর স্টেগোৱা তো ঘাসপাতা ফলফুলুরি খায়... ঠাম্মা আর মা ওই গুচ্ছের ষষ্ঠী আর ব্রত করে, প্রতি সোম আর বেস্পতিতে শিবঠাকুরের মাথায় জল ঢালে আর লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়ে... সপ্তাহভর যা ফলমূল আসে, ওই টুকরো-টাকরাতেই চলে যাবে। শুধু দাদু জানল আর ঝিনি জানল, যে স্টেগো এল বাড়িতে। আর কেউ ওকে দেখতেও পেত না। কারও সাড়াশব্দ পেলেই ওকে লুকিয়ে রাখা হত। ওর নাম দেওয়া হল রামদীন পালোয়ান।

রামদীন একটু বড়ো হল যখন, ওর গলায় একটা লাল সিল্কের ফিতে চেষ্টা করেছিল ঝিনি। ফিতেটা অবিশ্যি সত্যি বলতে কী পুরো বাঁধতে পারেনি। বাঁধার আগেই রামদীন তুরতুর করে পালিয়ে গেল। আহা, কী যে রূপ খুলত তাহলে! মনে হত, ওকেও একটা কাজলের টিপ পরাতে হবে। দুষ্টু লোকের নজর লাগে যদি! রামদীন বারান্দার কোণে ঘাপটি মেরে থাকত। শুধু ঝিনি ডাকলে বেরোত। কাঁটা বেরোচ্ছে না কিন্তু! অথচ দিব্যি টুকটুক করে বড়ো হচ্ছে। দাদুকে বলতে দাদু বলল, না বেরোনোই ভালো, বুঝলে দিদিমণি। পিঠে অমন হুদো হুদো খরখরে কাঁটা থাকলে ওতে চেপে তুমি বড়ো হয়ে বেড়াতে যাবে কী করে বল? গায়ে ফুটে যাবে তো!’
ঝিনি মেনেও নিয়েছিল সে কথা। ওঃ, আর হেঁটে হেঁটে স্কুলে যেতে হবে না, ভুতো সুযোগ পেলেই চিমটি কাটে আর জমানো ট্রামের টিকিটগুলোর দিকে ভারী লোভ দেয়... রামদীনকে দেখলে সব ওস্তাদি বেরিয়ে যাবে! তারপর ঠাম্মার দেওয়া টিফিনের ওই অখাদ্য কলা আর বাড়িতে তৈরি সন্দেশ না ছাই... ওই ছানার পিন্ডি ঝিনিকে আর গিলতে হবে না... রামদীন সোনা মুখ করে খেয়ে নেবে... উফ, ভাবতেই মনটা চনমন করে ওঠে।
রামদীন যখন বেশ ইঞ্চি ছয়েক লম্বা আর মোটাসোটা, কালো পুঁতির মতো চোখ... দেখা গেল একটা উচ্চিংড়েকে খপ করে ধরেছে। ঝিনি কোমরে হাত দিয়ে দেখছে। ওমা, গপ করে খেয়ে নিল! দাদুকে গিয়ে বলতে দাদু বলল, তুমি সেদিন ওর সামনেই তো পেছনের বারান্দায় গিয়ে প্লেটে করে মাংস খাচ্ছিলে। ঠাম্মার কাছে বায়না করে কড়াই থেকে একটা মেটে আর এক টুকরো মাংস কষানোর সময় চেয়ে নিলে যে! ও দেখেছে! ওর বুঝি ইচ্ছে করে না ভালো-মন্দ খেতে! আর রোজ যা ফলের কুচি দাও... ওর অরুচি ধরেছে নির্ঘাত! কালকেই তো দেখলাম পিঁপড়েদের নেমন্তন্ন খেতে ডেকেছে। শোনো, আপ রুচি খানা। অত টিকটিক করলে কিন্তু ও চলে যাবে।
তারপর রামদীনের সাহস বাড়ল একটু একটু। মাঝে মাঝেই মুখ বের করে। দেওয়াল ঘেঁষে হাঁটে। দাদু বলে, সকালটা মর্নিং ওয়াক আর রাতেরটা হল আফটার ডিনার ওয়াক আ মাইল। ঝিনি ছটফটিয়ে মরে। কবে পিঠে চড়ে ইস্কুল যাবে?
একদিন তার চোখে পড়ল দেওয়ালের ঘুপচি কোণে তিনটে গুলি গুলি সাদা সাদা ডিম। আরিব্বাস! একটা রামদীন থেকে চারটে রামদীন হবে! গ্রামার বইতে লেখে... ফ্লিট অফ কারস! ঝিনিরও তাই হবে। লাফাতে লাফাতে সব প্রতিজ্ঞা ভুলে ঠাম্মা আর মাকে যেই না ডেকে এনে দেখিয়ে সে কথা বলেছে... অমনি...
‘ম্যা গো ম্যা... কী বদখত টিকটিকি একটা! আবার ডিমও পেড়েছে! এই মিনতি, শিগগির ঝুলঝাড়ু আনো। কখন আবার টপ করে ঘরে ঢুকে যাবে আর বাড়ি ভর্তি কুচো কুচো টিকটিকির বাচ্চা! ছি ছি... ঝেঁটিয়ে ফেলে দে তো ডিমগুলো! যাঃ যাঃ... আ মোলো যা, হতচ্ছাড়া টিকটিকিটা! আরে, বাগানের দিকটায় তাড়িয়ে নিয়ে যা না!’
টিকটিকি! রামদীন পালোয়ানকে বলা হল টিকটিকি! রামদীন বাগানে চলে গেল সকলের চোখের সামনে দিয়ে। যাবার আগে কালো পুঁতির মতো চোখদুটো ঝিনির দিকে তাকিয়েছিল একটুক্ষণ। ওর ঠোঁটের কোণে একটু মিচকি হাসিও ছিল। দাদু আর ঝিনি ছাড়া ওকে আর কেউ চিনতেই পারেনি বলে।

বাড়ির পেছনদিকের বাগানে ঝাঁকড়া কলকে ফুলের গাছের নিচে বসেছিল ঝিনি। তার বয়স আট, মাথায় সারাক্ষণ নানা দুর্বুদ্ধি কিলবিল করছে। এই যেমন এখন। একটু আগে একটা সবজেটে শুঁয়োপোকা শিউলিগাছের নিরাপদ আশ্রয় থেকে কাঠি দিয়ে টেনে বার করেছে ঝিনি। ঘরে ঢুকে একটা পরিষ্কার করে ধুয়ে রাখা পেটমোটা শিশি হাতিয়ে আবার বাগানে এল সে। শিশির বড়োসড়ো মুখে একটা কর্কের ছিপি। ক’দিন আগে সারা দুপুর ধরে দাদুর পাকাচুল তোলার সন্না দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ছিপিতে একটা এবড়োখেবড়ো ছোট্ট ফুটো করেছে সে। কায়দা করে শুঁয়োপোকাটাকে কাঠিতে তুলে শিশিতে ভরল ঝিনি। কাঠির গায়ে গুল্লি পাকিয়ে ছিল পোকাটা। কিছুতেই ছাড়বে না কাঠিটা! ‘বাবা, বাছা’ করে ভুলিয়ে ভালিয়ে শিশির ভেতরে ওটাকে চালান করল ঝিনি। তারপর দু-চারটে সবুজ পাতা ঠুসে দিল ভেতরে। সে ছবির বইতে দেখেছে শুঁয়োপোকা থেকেই প্রজাপতি হয়। তার একটা পোষা প্রজাপতি চাই-ই চাই!
ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখছিল ঝিনি। তার শুঁয়োপোকা গুটি বেঁধেছে কাচ ঘরে। একরাশ সবুজ পাতার বিছানায়। এক দিন, দু-দিন, পাঁচ দিন... কে জানে ক’দিন! তারপর একদিন গুটি কেটে একটা মস্ত বড়ো ঝলমলে প্রজাপতি বেরিয়ে এল। দরজা খুলে দিল ঝিনি। প্রজাপতিটা উড়ে যাওয়ার আগে একবার আলতো করে ছুঁল ঝিনির কচি হাতের আঙুল ক’টা। তারপর আর ওকে দেখাই গেল না। তবে ঝিনি জানে, কখনও না কখনও ও ঠিক খেলা করতে আসবে ঝিনির কাছে।
ঝিনির চোখের পাতায় স্বপ্ন লেগে ছিল। আর আঙুলে রেণু রেণু অদৃশ্য রং। প্রজাপতির ডানার।
_____
ছবিঃ সোমঋতা চ্যাটার্জী