Showing posts with label মৃত্যুঞ্জয় দেবনাথ. Show all posts
Showing posts with label মৃত্যুঞ্জয় দেবনাথ. Show all posts

ছড়া-কবিতা:: ছড়া তো তাই - মৃত্যুঞ্জয় দেবনাথ


ছড়া তো তাই
মৃত্যুঞ্জয় দেবনাথ

একটা ছড়া লিখব বলে
বসে আছি ধ্যানস্থ,
সকাল-দুপুর-বিকেল কাটে
ওই সূর্য যান অস্ত।

রাত্তিরেও এক অবস্থা
ছড়া থাকেন গরহাজির,
ছড়া কি আর কেবলমাত্র
শব্দমালার কারসাজি?

ছড়ারা নয় কাতুকুতু
নয় রঙ্গ, মশকরা,
অনাদরে যায় না তাকে
করায়ত্ত, বশ করা।

ছড়া তো তাই, যাতে অক্ষর-
শব্দরা আলোক ছড়ায়,
শিশু এবং কিশোর মনে
জীবনবোধের পাঠ পড়ায়।

খেলাচ্ছলে অবহেলায়
ধরতে তাকে চাচ্ছিলাম -
হয়তো তাই, আজও তাকে
তেমন করে পাচ্ছি না!
----------
ছবি - আন্তর্জাল

গল্প:: পুচাই নিখোঁজ - মৃত্যুঞ্জয় দেবনাথ


পুচাই নিখোঁজ
মৃত্যুঞ্জয় দেবনাথ

পুচাই নিখোঁজ!
শুনেই চমকে উঠলাম সকলে! বসে চা-শিঙাড়া খাচ্ছিলাম আমরা। সঙ্গে গল্পগাছা। প্রথমে আমরা ছেলেরা ক-জন। পরে এসে যোগ দিল মহিলাবাহিনীও। জমে উঠেছিল আসর। হাসিমজার আধিক্য ক্রমে পঁয়ষট্টি ডেসিবেলের মাত্রা ছাড়াচ্ছিল বই-কি। সংবাদটা আছড়ে পড়তে গোটা বাড়ি স্তব্ধ।
ছুটতে-ছুটতে এসে কথাটা বলল বিট্টু।
ওর বড়দা। পুচাই আমার মেজো শ্যালিকা ফুলুরানির কনিষ্ঠপুত্র। সংবাদটা জানিয়েই বিট্টু ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে রয়েছে আমাদের দিকে। আমরা হতভম্ব।
আমি তড়াক করে উঠে দাঁড়ালাম। ভুরু-কপাল কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলাম, “কী বলছিস? কোথায় গেল পুচাই? একসঙ্গেই তো খেলছিলি সবাই!”
“হ্যাঁ তো। এখন খুঁজে পাচ্ছি না,” হাঁপাচ্ছে বিট্টু।
“কী আশ্চর্য! ছুটোছুটি করছিলি যে একটু আগেও!”
“হ্যাঁ, খেলছিলাম তো। লুকোচুরি
“তারপর?
“হঠাৎ দেখি আর নেই
“নেই মানে! এ কেমন কথা? ভোজবাজি! উবে গেল? কর্পূর নাকি!”
বিট্টু বোবা।
“স্ট্রেঞ্জ! কোন্‌ জায়গা থেকে নিখোঁজ হয়েছে ও, তাই বল না রে? আমি অস্থির হয়ে উঠি।
“ওই যে, সামনের গলিটা থেকে,” উত্তর দিকে আঙুল দেখায় বিট্টু, “চলো, দেখবে
আমরা দলবেঁধে ওর সঙ্গ নিলাম।
পুচাই যে-গলিটা থেকে আচমকা নিরুদ্দেশ হয়ে গেল, সেখানে এসে দাঁড়িয়েছি সকলে। আমাদের চোখেমুখে উৎকণ্ঠা। শ্যালিকা ফুলুরানি সানাইয়ের পোঁ-ধরেছে ততক্ষণে।
সত্যিই অবিশ্বাস্য ব্যাপারটা!
কোথায় চলে গেল ছেলেটা! গলি ধরে দূরের বড়ো রাস্তার দিকে নয় তো? কিংবা অন্য কোনো অলিগলির গোলকধাঁধায় পড়ে আর বেরোতে পারছে না। ঘূর্ণির মতো একই আবর্তে পাক খাচ্ছে। স্ট্রেঞ্জ! তেমনটি হলে কী করবে ও? ফিরতে পারবে আর? কেমন করে বা খুঁজে পাব আমরা ওকে?
বয়সে-অবয়বে এইটুকুনি পুচাই। কিন্তু স্বভাবে যারপরনাই চঞ্চল। একমুহূর্ত শান্ত থাকতে জানে না সে। সর্বদা ছটফট, ঘুরঘুর, হইহল্লা আর লম্ফঝম্পে মেতে আছে ও। একবার আমাদের কলকাতার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েও বড়ো বিপদ ঘটিয়েছিল ব্যাটা। মনে পড়লে এখনও গা শিরশিরায় আমার। সেই থেকেই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে, বাপ-মা মিথ্যে বলে না ওর সম্পর্কে। ওটি প্রকৃতই আস্ত হনুমানএকটি।
সেবারেও ছিল লুকোচুরির কেস।
আমাদের পাপাই আর ওরা দু-ভাই মিলে লুকোচুরি খেলছিল অ্যাপার্টমেন্টের নীচের গ্যারেজে। পরে এসে যোগ দিয়েছিল পাশের বাড়ির অনলদার ছেলে ঘন্টু, কচি, লকাইরা। নীচেই ছুটোছুটি, হইচই করছিল চার-পাঁচজনে - উপরে বসেও শুনছিলাম আমরা। হঠাৎই নীচে একটা বাড়তি শোরগোল শোনা গেল। তড়িঘড়ি জানালায় মুখ বাড়াতে জানলাম, পুচাই নিরুদ্দেশ।
উপর থেকে প্রায় লাফিয়ে নামলাম আমরা সবাই।
তারপর চলতে থাকল পুচাই অনুসন্ধানপর্ব। প্রথমে আমাদের বিল্ডিং-এর চতুর্পাশ ঘেঁটে ফেললাম। বাদ রাখলাম না গা-ঘিনঘিন করা সেপটিক ট্যাঙ্কের দিকটাও। অ্যাপার্টমেন্টের পেছনের দিকগুলি নিয়মিত পরিষ্কারের অভাবে আগাছার বাড়বাড়ন্ত হয়েছে খুব। হঠাৎই মনে হল, ওই দিকটাতে লুকিয়ে নেই তো বিচ্ছুটা? বিশ্বাস নেই ওকে, সঙ্গীদের ভয় খাওয়ানোর খেলা খেলছে হয়তো বা।
না, সেখানে কোনো চিহ্ন নেই ওর। একবার নয়, কয়েকবার ঘুরেফিরে দেখছি আমরা সকলে। সত্যিই ম্যাজিকাল ব্যাপারটা। কোথায় উবে গেল ছেলেটা!
“সেপটিক ট্যাঙ্কটা খুলে দেখলে হয় না? আচমকা বলে উঠলেন ভাস্করদা। উদ্বেগ ওঁর চোখেমুখে।
“য়্যাঁ, সেপটিক ট্যাঙ্ক!” শুনে চমকে উঠি আমি, “ওখানে কী হবে? ওখানে ঢুকবে কেমন করে ও? তা ছাড়া সেপটিক ট্যাঙ্ক ঢাকনা দেওয়া। লোহার পিট। ভাঙাচোরাও নয় যে, পা হড়কে গলে যাবে ভেতরে
“তবু?
আমি ভাস্করদার অসহায় মুখটির দিকে তাকিয়ে হার মানলাম। ঘর থেকে ছোটো শাবলটা নিয়ে এসে সেপটিক ট্যাঙ্কের ঢাকনা খুললাম। কিন্তু পুচাই ওখানে থাকবে কেন?
এরপর পাশের পুকুরের দিকে ছুটছিলাম। বিট্টুদের কথায় থামলাম। বিল্ডিং-এর মেইন গেট বন্ধ রয়েছে অনেকক্ষণ। ওরা সবাই ভেতরেই খেলছিলকেউ বাইরে যাওয়ার প্রশ্নই নেই।
তবে পুচাই? রয়েছে এই অ্যাপার্টমেন্ট চত্বরেই? কিন্তু কোথায়?
নীচের গ্যারেজের ধূলিকণাটি পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ শেষ করে, একে-একে গোটা রূপকথা অ্যাপার্টমেন্ট-এর বারোটি ঘর চেক করে; শেষে গিয়ে উঠলাম ছাতে। কিন্তু ছাত অবধি এগোতে পারিনি তখনও। চিলেকোঠা ঘরের দিকে তাকিয়ে চক্ষুস্থির আমার। চিলেকোঠার আবছা অন্ধকারেও স্পষ্ট দৃশ্যমান - দেয়ালের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে পুচাই। মনে হল, ঘেমেনেয়ে একশা ও। ওর ভয়ার্ত চাহনিকিন্তু স্ট্যাচু ও। প্রস্তরবৎ।
“কী রে, পুচাই, তুই এখানে!” প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম আমি।
ও আমার দিকে ভয়ার্ত চাহনি মেলে তাকিয়ে। ও নিরুত্তর। ও আঙুল তুলে কিছু একটা ইঙ্গিত করছে যেন আমায়।
“কী হয়েছে? বেরিয়ে আয়? সবাই খুঁজে-খুঁজে হন্যে তোকে
পুচাই তখনও নিরুত্তর। বোবা। এবারে ও যেন কাঁদছে। অথচ শব্দ বেরুচ্ছে না মুখ থেকে। সামনের দেয়ালের দিকে আঙুল দেখাচ্ছে ও।
ততক্ষণে আমার নজরে এল ভয়ংকর ব্যাপারটা।
চিলেকোঠা ঘরে ঢোকার মুখের দেয়ালটায় একটি সাপ লেপটে আছে। ভাস্করদা আর্তনাদ চেপে ফিসফিসিয়ে উঠলেন, “চন্দ্রবোড়া!”
আমি আঁতকে উঠলাম। বিষধর সাপ যে! হে ভগবান! এখানে এসে বাসা বেঁধেছে?
আর কথা বাড়ালাম না কেউ। আকারে-ইঙ্গিতে তেমনই স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে বললাম পুচাইকে। এর-ওর ঘর থেকে চলে এসেছে ততক্ষণে দু-একটি লাঠিসোটা। কিন্তু অমন দুঃসাহসিক কাজটি করবে কে? আঘাত ফসকালে যে সাপটি পুচাইয়ের দিকেই ছুটবে!
লাঠি হাতে এগোতে থাকলেন ভাস্করদা।
গাঁ-গঞ্জে থাকার সুবাদে এ-কাজে তিনি সিদ্ধহস্ত; অন্তত উপস্থিত আমরা আরও ক-জন গোবেচারা শহুরে ফ্ল্যাটবাসীর তুলনায়। কিন্তু দু-পা সামনে এগোতেই বুঝি টের পেল সাপটি। একটু নড়ে উঠল। মাথাটাও ঘোরাল এদিক-ওদিক। এরপরই হয়তো অন্যদিকে ঘোরার জন্যই প্রস্তুত হচ্ছিল। তার আগেই ভাস্করদার লাঠি পড়ল সটান ওর মাথায়।
মেঝেয় পড়ে ভয়ংকর ছটফটাচ্ছিল সাপটি। কিন্তু আঘাতটা এতই জোরালো ছিল যে, ও চলচ্ছক্তি হারিয়েছে। তার উপর ভাস্করদা আরও ক-টি লাঠির বাড়ি কষালেন। সাপটি নিষ্প্রাণ নিথর হলে আমি হাতে ধরে পুচাইকে ভেতর থেকে বার করে আনলাম।...

কিন্তু এবার কী হবে? এলাকাটা যে একেবারেই অচেনা-অজানা আমাদের। আমরা এখানে বেড়াতে এসেছি। বড়ো শ্যালক তপনদার সঙ্গেওর শ্বশুরবাড়ি। অনেক দিন থেকেই বলছিলেন গোপাবউদি। আজই সবাই দলবেঁধে চলে এলাম। দুপুরে মস্ত খাওয়াদাওয়া হল। সঙ্গে আনন্দ হইহুল্লোড়। কিন্তু এখন সকলেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। অনেকের চোখেই জল। আহা রে! পুচাই কোথায় হারিয়ে গেল?
এলাকাটার নাম সোমড়া। পাড়া, বীরপুর। একটা ক্রমবর্ধিষ্ণু গ্রাম। অচিরেই শহরতলির তকমা পাবে জায়গাটি। অলিগলির শেষ নেই পাড়াটায়। তেমনি সামান্য এগোলেই বড়ো রাস্তার মোড়। গাড়িঘোড়া, বাজারহাট, স্কুলকলেজ, থানা-পোস্টঅফিস সব নিকটবর্তী। তপনদা নিরাশকণ্ঠে বললেন, “ভয়টা এখানেই। কোন্‌ ভুল গলিতে ঢুকে কোথায় গিয়ে উঠবে, তার ঠিকঠিকানা নেই। কী যে হবে!”
আমরা হনহনিয়ে হাঁটছি পুবে-পশ্চিমে, উত্তরে-দক্ষিণে।
কেউ তপনদাকে অনুসরণ করছি; কেউ গোপাবউদির পেছন-পেছন। আধা ঘণ্টা-পঁয়তাল্লিশ মিনিট চষে বেড়ালাম আমরা বীরপাড়া। অবশেষে অন্য একটি পাড়াতে গিয়েও ঢুঁ মারলাম। তপনদা বললেন, “এটির নাম বিষপাড়া। ক-বছর আগেও বনজঙ্গলে ভরা ছিল জায়গাটা। বিষধর সাপেদের আস্তানা ছিল। দু-এক ঘর সাপুড়ে এসে বাসা বাঁধল এখানে প্রথম। ক্রমে আরও অনেকে। পাড়ার নাম হয়ে গেল বিষপাড়া গলির ভেতরে ঢুকে পুচাইয়ের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করলেন তপনদা। না, হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিতে পারল না কেউই।
অমনি এল একটি ফোন।
আমার মোবাইলে। নম্বরটি আননোন। সবুজ বোতাম টিপে হ্যালোবলতে ফোনের ও প্রান্ত থেকে অবিশ্বাস্য একটি প্রশ্ন করল অচেনা কণ্ঠস্বরটি।
“হ্যালো, আপনি কি বলরামবাবু? পুচাই নামের কেউ আছে আপনাদের? মিন্‌স আত্মীয়?
আমি লাফিয়ে উঠি। বলি, “হ্যাঁ তো, আছে! আপনি কে? কোথায় ও?
এত কথার উত্তর দিলেন না লোকটি। অন্য প্রশ্নে গেলেন। “আপনি ওর কে হন?
“আমি ওর মেসো হই। ও কোথায়, দাদা?
“আমার কাছে
“আপনার কাছে! মানে! আপনি কে? ও কোথায়? বুলেট ট্রেনের গতিতে প্রশ্ন করি আমি।
লোকটি ততটাই স্থির। এহেন চরম মুহূর্তেও মজা করলেন কিঞ্চিৎ। বললেন, “আমি ভগবান। আপনার নিরুদ্দিষ্ট সম্পদ বর্তমানে আমার হেফাজতে। এক্ষুনি দিনহাটার মোড়ে চলে আসুন
ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটলাম দিনহাটার মোড়ের দিকে।
সত্যিই সেখানে ভগবান দাঁড়িয়েছিলেন আমাদের পুচাইকে বগলদাবা করে। প্রকৃতই লোকটির নাম, ভগবান। পুচাইকে কাঁদতে দেখে সস্নেহে আগলেছেন ভদ্রলোক। শেষে একাধিক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা সেরে আমার ফোন নম্বরটি উদ্ধার করেছেন। তারপর –

পুচাইকে চোখের সামনে দেখে অমাবস্যার আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ দেখলাম।
আনন্দে সকলের চোখে জল। কিন্তু ও ব্যাটা কাঁদছে না। ভয়ার্ত চাহনি ছাপিয়ে যুদ্ধজয়ের হাসি ঠিকরে বেরোচ্ছে ওর দু-ঠোঁট থেকে। আমি ওর পাশে দাঁড়িয়ে কৃতার্থ বোধ করছিলাম। মনে-মনে বলছিলাম, জগতে একটি বিরল প্রাণী পাওয়া গেল তবু, যে কিনা নিজের বাপ-মায়ের চাইতেও এই মেসোটিকে বেশি ভালোবাসে। রুমাল দিয়ে ওর কপালের ঘাম মুছে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “কী রে পুচাই, মেসোকে এত্ত ভালোবাসিস? আমার ফোন নম্বরটাই মনে রাখলি শুধু! বাবারটা না! মায়েরটাও না!”
বিচ্ছুরাম আমার দিকে ট্যারাচোখে চেয়ে ফিচেল হেসে বলল, “ধুট্‌! টা কেন? তোমাল নম্বরতা থবতাইতে থোদা কিনা। নাইন জিলো ফাইব ওয়ান টু টু থিলি থিলি ফোল ফোল!”
----------
ছবি – সুকান্ত মণ্ডল

গল্প:: অবনি স্যারের রোগ - মৃত্যুঞ্জয় দেবনাথ


অবনি স্যারের রোগ
মৃত্যুঞ্জয় দেবনাথ

গ্লোবটি বগলদাবা করে ক্লাস নাইনের ঘরে গিয়ে উঠলেন অবনি স্যার। অতি সতর্কতায় সেটি টেবিলে রেখে বললেন, “গতকাল সন্ধির পার্ট চুকেছে। এসো, আজ আমরা সমাসটা শুরু করি। সন্ধির তুলনায় সমাসটা কিঞ্চিৎ জটিল। তাই প্রবাদ আছে, সমাস শিখতে ছ-মাস। তবু দুশ্চিন্তার কিছু নেই। গোটা ব্যাপারটা জলবৎ তরলং করে বুঝিয়ে দিচ্ছি আজ। তাই এটি সঙ্গে নিয়ে এলাম
গোটা ক্লাস অবনি স্যারের দিকে দুটি চোখ ছানাবড়া করে তাকিয়ে। সকলেই ভাবছে, মাথাটা কি গেছে অবনি স্যারের? পড়াবেন তো বাংলা ব্যাকরণ। গ্লোবটি সঙ্গে আনলেন কেন? ওটি নিয়ে তো ভূগোল আন্টির কারবার। সমাসের সঙ্গে সম্পর্ক?
ব্যাপারটা নিয়ে যখন সকলে যারপরনাই ভাবিত, সেই ব্রাহ্মমুহূর্তে ক্লাসরুমে এসে ঝাঁপালেন ভূগোল আন্টি। চোখ কপালে তুলে উত্তেজিত এবং বিরক্তিমিশ্রিত স্বরে বললেন, “ব্যাপার কী? হঠাৎ আমার গ্লোবটা নিয়ে ছুটলেন? ওদের দেশ-বিদেশের অবস্থান চেনাচ্ছেন নাকি?
গ্লোবটির দিকে স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে অমনি সংবিৎ ফিরল অবনি স্যারের। লজ্জিত হেসে বললেন, “যাঃ! এইটি নিয়ে এলাম কেন সঙ্গে করে? আনব তো বামনদেব চক্রবর্তীর ব্যাকরণ বইটা
টিফিন টাইমে টিচার্স রুমে হাসির রোল পড়ল তাই নিয়ে। ভূগোল আন্টি তারিয়ে-তারিয়ে বলছেন আর সকলে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। এমন সময় টিচার্স রুমের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ালেন স্বয়ং অবনি স্যার। ওঁর বদন ম্রিয়মাণ। লজ্জিত। আন্দাজ করতে পারলেন, তাকে নিয়ে মুখরোচক আলোচনা চলছে। তার দিকে তাকিয়ে সকলে বোবা।
অসম্মানিত বোধ করলেন না তাতে অবনি স্যার। উলটে সকলকে চমকে দিয়ে নিজেই তুললেন কথাটা। একটা রিমেডি চাইলেন। অর্থাৎ ওষুধ। রোগমুক্তির। মিনতির সুরে বললেন, “বলুন না এর ওষুধ কী? আছে কিছু আদৌ? ইচ্ছাকৃত তো করি না। যেমন, আজও ঘটে গেল।”
অবনি স্যারের অসহায় চাহনির দিকে তাকিয়ে মুখ খুললেন অর্ধেন্দু স্যার। বললেন, “এই রোগের কী নাম, জানেন অবনি স্যার? অ্যালঝাইমারস। মিন্‌স, লস অফ মেমরি। স্মৃতিভ্রংশ। জটিল রোগ। সারতে চায় না। তবু ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পারেন।”
“কী ডাক্তার দেখাব? অবনি স্যারের গলায় আকুতি।
“আমি বলব ডাক্তার নয়, ব্রাহ্মীশাক চিবোন,” উত্তর করলেন শ্রীতমা ম্যাডাম, “রোজ সকালে বাটনা বাটুন আর গ্যালন-গ্যালন রস গিলুন। অথবা ঝোল-ভাজা-ভর্তা, যা খুশি। এ-রোগের অব্যর্থ ওষুধ।”
“বলছেন?
শ্রীতমা ম্যাডাম হাসেন “হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা, স্যার। বাবাকে দেখেছি। রাতদিন ওই করেছেন। কখনও শরবত করে গলায় ঢালছেন, কখনও ঝোল-ভাজা-ভর্তা রূপে উদরসাৎ। তারপর...”
“তারপর? অবনি স্যারের আশান্বিত চাহনি।
“বাবার স্মৃতিভ্রংশ রোগ উধাও। মেমরি ক্রমে স্ট্রং। দিব্যি তরুণ বয়সের মতো গড়গড়িয়ে কবিতা আওড়াতে থাকলেন আবারও। রবি ঠাকুরের - সোনার তরী, আফ্রিকা; নজরুলের - বিদ্রোহী; সুনীল গাঙ্গুলীর - কেউ কথা রাখেনি, শঙ্খ ঘোষের - বাবরের প্রার্থনা... সব,” বলে একটু থামলেন শ্রীতমা ম্যাডাম। এরপর কিঞ্চিৎ হেসে বললেন, “এককালে নিয়মিত আবৃত্তিচর্চা করতেন কিনা বাবা।”
“ধুৎ! নিকুচি করেছে আবৃত্তির। ওসব শাক-লতাপাতার গল্প রাখুন। ওতে কিচ্ছু হবে না। আমার বাবারও ছিল অ্যালঝাইমারস। কিচ্ছু মনে রাখতে পারতেন না। এই বলে, এই ভুলতেন। বাড়ি থেকে সোজা বেরিয়ে অন্য রাস্তা ধরে হারিয়ে যেতেন। আমরা গোরুখোঁজা করে আবার ঘরে ফিরিয়ে আনতাম। একবার থানাপুলিশও করতে হয়েছিল। বুঝলেন, ব্রাহ্মীর চাষ করে দেখেছি বাড়িতে। বাট, নো রেজাল্ট। ওসব গোখাদ্য।”
অসহায় তাকান অবনি স্যার। তার চোখে নৈরাশ্য। তবে উপায়?
“একজন ভালো ডাক্তার দেখান। জেনারেল ফিজিসিয়ান, এম ডি।” অর্ধেন্দু স্যারকে সমর্থন করে বললেন দীপঙ্কর স্যার। রোগজর্জর শরীর ওর। দিবারাত্র ডাক্তারকুলের দুয়ারে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকেন। কলকাতার ডাক্তার-হাসপাতাল গুলে খেয়েছেন। সেদিন ঘুরে এলেন সুদূর কোয়েম্বাটুর থেকে। দেবা-দেবী দু’জনেই। ফিরলেন মাসান্তে। তো, এহেন ডাক্তার-বিশারদ মানুষটির উপর তো ভরসা রাখা যেতেই পারে।
অবনি স্যার আরও একটু পাশ ঘেঁষে বসলেন দীপঙ্কর স্যারের। বললেন, “বেশ তো, আপনার অনেক জানাশোনা। অভিজ্ঞতাও। একটু বলুন না, কার কাছে গেলে ভলো হয়? মানে, কোন্‌ ডাক্তার?
“যাবেন? সত্যি?
হতচকিত তাকান অবনি স্যার। “যাব না কেন? বলুনই না?
ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসেন দীপঙ্কর স্যার। “যা কিপটে আপনি। হাত থেকে খসবে অত টাকা? বড়ো ডাক্তার, বড়ো দক্ষিণা। দিতে পারবেন?
‘হ্যাঁবলবেন বলে হাঁ করছিলেন অবনিবাবু। তার আগে পথরোধ করলেন নলিনী সামন্ত। স্কুলের একমাত্র ইতিহাসবিদ। ডাক্তার-কবিরাজে উনিও কম যান না। অনেক অনেক ডাক্তারের নাড়িনক্ষত্র-ইতিহাস মেলে ধরলেন অবনি স্যারের সামনে। শেষে গুরুগম্ভীর স্বরে জানালেন, “ডক্টর সোমনাথ নিয়োগীকে দেখাতে পারেন। বসেন ব্লুপ্রিন্ট’-এ। চৌরাস্তা। সোম-শনি, সপ্তাহে দু-দিন, সন্ধ্যায়। ফিজ সামান্যই। ওনলি ফোর হান্ড্রেড। ফোন নম্বর চাইলে দিতে পারি।”

“নাম বলুন?
“অবনীন্দ্র বটব্যাল।”
“বয়স?
“একান্ন প্লাস।”
“প্রবলেম? প্রশ্ন করে অবনিবাবুর দিকে জোড়াভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন ডক্টর কালীকিঙ্কর।
অবনি স্যার বলতে থাকলেন। বললেন, বাসে চেপে টিকিট কাটার বিড়ম্বনার কথা। কতদিন দিব্যি দু’বার টিকিট কেটে বাসযাত্রা সেরেছেন। বাড়ি ফিরে আবিষ্কার করেন, একই বাসের দুটি টিকিট পকেটে তার। একটি কেটেছেন বাসে উঠেই; অপরটি নামার সময়। টিকিট কাটেন না কতদিন আবারগন্তব্যস্থলে নামতে গিয়ে কন্ডাকটরের দাঁতখিঁচুনি খেয়ে পকেট থেকে পয়সা বার করেন। বললেন, বাজারে গিয়ে আলুর জায়গায় শাঁকালু, ময়দার জায়গায় আদা নিয়ে ঘরে ফেরা এবং গৃহিণীর সঙ্গে যুদ্ধে মাতার বৃত্তান্তসকল। বললেন গত সপ্তাহে ঘটে যাওয়া স্কুলের অভাবনীয় ঘটনাটিও।
ডাক্তারবাবু অবনি স্যারের দিকে ট্যারা চোখে চেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কোনো নেশা?
এদিক-ওদিক মাথা নাড়েন অবনি স্যার। বলেন, “না। সেই কোন্‌ তরুণবেলায় দু-এক পিস বিড়ি-সিগারেট ফুঁকেছি বটে। সে অতীতের স্মৃতিমাত্র। এখন নৈব নৈব চ।”
“অন্য কোনো নেশা?
আহ্লাদিত তাকান অবনি স্যার। “তা একটি আছে বইকি। সাহিত্যচর্চা। ছড়া-কবিতা লিখি।”
চোখ দ্বিগুণ ট্যারা করে তাকালেন ডক্টর কালীকিঙ্কর। তারপর প্রেসক্রিপশন লিখলেন।
সেটি হাতে নিয়ে অবনি স্যারের চক্ষুস্থির। ডাক্তারবাবু লিখলেন, ‘অদ্য হইতে ছড়া লেখা বন্ধ।’
অবনি স্যারের শুষ্ক বদনের দিকে চেয়ে মৃদু হাসলেন ডক্টর কালীকিঙ্কর। বললেন, “ইয়েস। সাহিত্যচর্চা আর নয়। ওসব ছাড়তে হবে। তবেই এ রোগের সমূলে বিনাশ। ওষুধ উপলক্ষ্য মাত্র।”
তারপর মাসাধিককাল ওষুধটি নিয়মিত খেলেন অবনি স্যার। সঙ্গে ডাক্তারবাবুর নিদারুণ ফরমান মেনে সাধের ছড়াচর্চায় তালা। যদিও গাছের গুঁড়ি যথাস্থানে। রোগটির নট নড়ন-চড়ন। উলটে অন্য এক মারণব্যাধি জড়িয়ে ধরল তাকে। হররোজ পেটটি ফুলে আস্ত ঢাক হয়ে উঠছে তার। খাবারদাবার হজম হচ্ছে না কিছুই। সঙ্গে দুর্গন্ধময় বিচ্ছিরি চোঁয়াঢেকুর। কখনও গা গুলিয়ে বমি পায়। সঙ্গে আর একটি উপসর্গ। রোজই রাত্তিরে সময়মতো বালিশে মাথা রাখেন অবনি স্যার। অথচ ঘুমের নামগন্ধ নেই দু-চোখে। সক্কালবেলা বিছানা ছেড়ে আয়নাটির সামনে দাঁড়িয়ে আঁতকে ওঠেন। চোখের নিচে কে যেন সুলেখা কালি ঢেলে রেখেছে।

এদিন বউ আর সবেধন নীলমণিটিকে নিয়ে নেমন্তন্ন খেতে বেরিয়ে যারপরনাই গোল বাঁধালেন অবনিবাবু। যাচ্ছিলেন মেট্রোয় চেপে। আগেভাগেই বলে নিয়েছিলেন ভিড়ের চোটে এদিক-ওদিক হয়ে গেলেও নামবেন শেষ স্টেশন, নোয়াপাড়ায়। প্ল্যাটফর্মে নেমে নড়বে-চড়বে না কেউ। ভিড় হালকা হলে মুলাকাত। তারপর একসঙ্গে মালতীদিদির বাড়ি।
বাধ্য ছাত্রীর মতো অবনি স্যারের কথা অক্ষরে-অক্ষরে পালন করলেন আলপনাদেবী। ভিড়ঠাসা ট্রেন নোয়াপাড়া স্টেশনে এসে ব্রেক কষতে টুপ করে নামলেন। কিন্তু প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা হতে বুঝলেন, অবনিবাবু নেই। নামেননি তিনি এই স্টেশনে। নির্ঘাত আগের কোনো স্টেশনে নেমে পড়েছেন। অথবা এখানে নেমে ছেলে-বউয়ের কথা বেবাক ভুলে একাই রওনা দিয়েছেন বিয়েবাড়ি। ভাবতে গিয়ে বিষম খেলেন আলপনা। কী ভয়ানক কাণ্ড! এমনও ঘটে কখনও? সপরিবার নেমন্তন্ন খেতে বেরিয়েছেন - ভুললেন তা? তবে উপায়? মালতীদির বাড়ির ঠিকানা যে তার জানা নেই। ব্যাগ খুলে মোবাইলটি হাতে নিলেন তারপরই।
টুংটাং বেজে ওঠা মোবাইলের দিকে তাকিয়ে একহাত জিভ বার করলেন অবনি স্যার। বুঝলেন, কেলোর কীর্তি বাঁধিয়ে বসে আছেন। ঝড়ের মতো মনে এল, ঠিক কোথায় কী জন্য সপরিবার ঘর ছেড়ে বেরিয়েছিলেন আজ। আশ্চর্য হয়ে গেলেন নিজেই। সব ভুলে দিব্যি কলেজস্ট্রিট পাড়ায় এসে উঠেছেন! ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পুরোনো বই ঘাঁটছেন! হে ভগবান! তবে কী সত্যি মাথাটি খারাপ হয়ে গেছে তার? হাতের বইটি ছুড়ে ফেলে অমনি মেট্রোয় লাফ। কিন্তু প্ল্যাটফর্মে নেমে বউটিকে চিনতে পারলেন না। অচেনা এক মানুষ তখন আলপনাদেবী। তার দুই চক্ষু রক্তবর্ণ। নাসিকারন্ধ্রে বিষধর সর্পিনীর ফোঁস-ফোঁস। মুখে ফুটন্ত খই।
স্বামীটিকে উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়ার কথাই ভাবলেন এরপর আলপনাদেবী। বুদ্ধিও খেলে গেল মাথায়।
এদিন বাজার করতে বেরিয়েছিলেন অবনিবাবু। কথা ছিল, ব্ল্যাকে দু-লিটার কেরোসিন তেল নিয়ে আসবেন। বেমালুম ভুললেন তা অবনিবাবু। ঘরে ফিরলেন শূন্য হাতে। উপরি নুনের বদলে নিয়ে ফিরলেন চিনি। আটার বদলে কাটোয়ার ডাঁটা ইত্যাদি। কাণ্ড দেখে রেগে কাঁই হলেন আলপনা। রাগ প্রকাশ করলেন না যদিও। ঠান্ডা মাথার খুনিদের মতো আসল কাজটি সারলেন এরপরই
“কেমন হয়েছে তরকারি? জিজ্ঞাসা করে তাকান আলপনা।
“আহা, খাসা হয়েছে,” আঙুল চেটে, ঢেকুর তুলে উত্তর করেন অবনিবাবু।
“আর বড়াটি?
“সেটিও চমৎকার।”
“ওইটি কীসের বড়া, জানো? আলপনাদেবীর সহাস্য বদন।
“ডালের বোধ করি,” ভুরু কুঁচকে বলেন অবনি।
উত্তরে-দক্ষিণে মাথা দোলান আলপনা। “উঁহু, বলতে পারলে না।”
“তবে?
“ছড়ার,” আলপনাদেবীর ঠোঁটে উপচে পড়া হাসি।
“মানে!” অবনিবাবুর বিস্মিত চাহনি।
বুঝিয়ে বলতে থাকলেন আলপনা। “শোনো, গ্যাস ফুরোতে বুক করতে বললাম। করেছিলে?
“না।”
“আজ বাজার বেরোতে বললাম, কেরোসিন তেল আনতে। এনেছ?
“না। তাও আনলাম না।”
“তবে কীসে রান্না করি? পরনের শাড়িকাপড় জ্বালিয়ে, নাকি মাথার চুল ছিঁড়ে?
“আহা, তা কেন!”
“অগত্যা তোমার লেখার টেবিলে গিয়ে উঠলাম। তাক থেকে একটি-একটি করে নামালাম তোমার ছড়াভরতি ডায়ারিগুলি। তারপর সঁপে দিলাম স্বয়ং অগ্নিদেবের মুখগহ্বরে। আমার নিবেদন তৎক্ষণাৎ গ্রহণ করলেন তিনি। রান্নাও হয়ে গেল গড়গড়িয়ে।”
বিষম খেলেন অবনিবাবু। হাতে ধরা বড়ার টুকরোটি মেঝেতে টুপুস।

রাত্তিরের আহারপর্ব সেরে বালিশে মাথা রেখেছেন আলপনা। অমনি শ্রীমান পাপাইচন্দ্রের প্রশ্ন। “মা, দুপুরে ওটা কীসের বড়া খেয়েছিলাম?
“কেন? ডালবড়া।”
“আরে না। বাবাকে যে বলছিলে?
হেসে উঠলেন আলপনা। “ছড়ার বড়া?
“ইয়েস, ছড়ার বড়া। তাই বলি মা, এত্ত ছড়া আসছে কোথা থেকে।”
“কীসের ছড়া? কোথায় আসছে? বালিশ থেকে মাথা তুলে তাকান আলপনা।
“সত্যি মা। লিখেও ফেলেছি কতগুলো। শুনবে?
“কী বলছিস হাবিজাবি!” ককিয়ে উঠে বলেন আলপনা।
“সত্যি বলছি মা। ছড়া। স্রেফ বাবার মতো। সন্ধ্যায় বসে লিখলামও ক-টি,” বলেই মস্ত এক ঢেকুর তুলল পাপাইচন্দ্র। সঙ্গে জলজ্যান্ত ছড়া –
‘উদোমগড়ের রাজা
প্রত্যহ খান খাজা,
খাজা হলে বাসি
শূল, নয়তো ফাঁসি।’
ধড়মড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে বসলেন আলপনা। ছেলের কীর্তি দেখে কাঁদবেন না দেয়ালে মাথা ঠুকবেন, ভেবে পেলেন না। করুণ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর আতঙ্কে শরীর হিম হয়ে এল তার - দুপুরবেলা বড়াটা যে উনিও খেয়েছিলেন!
----------
ছবি - নচিকেতা মাহাত

গল্প:: ফাঁড়া কাটল নন্দ পাটারির - মৃত্যুঞ্জয় দেবনাথ


ফাঁড়া কাটল নন্দ পাটারির
মৃত্যুঞ্জয় দেবনাথ

অবশেষে বদলির অর্ডার এল ভয়ংকর দারোগার
খবরটি ভুয়ো যদিও কিন্তু চাউর হল নিমেষে আসলে বদলি হচ্ছেন মেজোদারোগাবাবু পরশকান্তি বটব্যাল ওরফে ঢ্যাঁড়শকান্তি পাকা বেল ওটা আশপাশ অঞ্চলের ডেঁপো লোকেদের দেওয়া নাম টকটকে পাকা বেলটির মতোই গায়ের রং-টি কিনা তার অথচ একেবারেই কাজের নয় মানুষটি সাড়ে তিনমন ভুঁড়িটি নিয়ে ঝিমোতে-ঘুমোতেই ব্যস্ত থাকতেন সর্বদা তাই ওই নাম
ওদিকে ভুয়ো খবর শুনে অল্পজলের চিংড়ির মতো লাফাল নন্দ চোখ বুজে মা বিপত্তারিনীর নাম করে কপালে আঙুল ঠুকল এগারোবার মনে-মনে বলল, যাক, বিদায় অইল তবে আপদকান খুপ জ্বালাইল -দিন দয়ামায়ার চিহ্ন বলতি নাই শরীলে দৈত্যটির তাই একদিন রাগে ক্ষোভে আসল নামটি উপড়েভয়ংকর দারকানাম দিনু!
এলাকাবাসী যদিও তাকে ভালো নামেই চেনে শুভংকর দারোগা ন্যায় বিচার পায় কিনা কিন্তু বাদ সাধল নন্দর সাধের ব্যাবসাপত্তরের থানায় অমন ধর্মপুত্তুর যুধিষ্ঠিরের আবির্ভাব ঘটে যদি তবে ওর কারবারটি টিকিয়ে রাখে কেমন করে? বেজায় ঠোক্কর খেল তাই ভয়ংকর দারোগা পূর্বস্থলী থানায় এসে উঠতে প্রথম সাক্ষাতেই যমরাজটি খপাৎ করে ধরে শূন্যে আছাড় মারছিল ওকে তাতেই হাড়ে-হাড়ে বুঝেছিল নন্দ, -বস্তু ককনও শুবংকর হতি পারেনে, যে আগাপাশতলা ভয়ংকর!
অথচ দোষের মধ্যে, নন্দ সেদিন কমলাবতীর হাতে গড়া সুস্বাদু নারকোল-নাড়ুর লোভ দেখিয়েছিল মানুষটিকে মা! অমনি কিনা -
সে যাক গে শেষমেশ নন্দর সঙ্গে বড়োবাবুর সম্পর্কটা দাঁড়াল গিয়ে যাকে বলে, আদায় কাঁচকলায় অথবা সাপে নেউলে হলই বা নন্দ ছোটোখাটো চোর, তবু মানসম্মান বলেও কথা আছে একটি অথচ তার ধারকাছ দিয়েই গেলেন না সেদিন ভয়ংকর দারোগা নন্দরও তাই রাগ হল খুব মনে অথবা অভিমান, ক্রোধ একদিন ভয়ংকর দারোগাকে দেখে নেবে - এই পণ করে বসল
শুনে যদিও ফিক করে হাসে বউ কমলাবতী ফোড়ন কেটে বলে, হুঁহ! বামুনের আবার চাঁদের উপর আক্কোশ! পিতিশোদ! বুদ্দিসুদ্দি আর হবেনি দেকচি কনদিনও তমার
কেনে? বলে ঘাড় কাত করে তাকায় নন্দ এতে বুদ্দি-অবুদ্দির কী অইল শুনি? হলুম বা বামুন, ভয়ংকর দারকার চাইতে ছোটো ? ছোটো বলি রাগ-অবিমান থাকতি নাই বুজি?
তা বলে থানার দারকার উপর রাগ? পিতিজ্ঞে? নোকে শুনলি হাসপেনি? আমারও হাসি পেল তাই এক ডান্ডার বাড়ি খেলি -
চোখ বড়ো-বড়ো করে গোখরোর মতো ফুঁসল নন্দ তেড়েফুড়ে বলল, চুপ! একদম চুপ! ঘরের শত্তুর বিবিষন! মুকে খালি অলুক্কুনে কতা অমন ডান্ডার বাড়ি ঢের খেইচি জেবনে রে পোড়ারমুকি অত ভয় করিনে ওসপে ভয় করিনে কাউরে ভয়ংকর দারকারেও না আমিও নন্দ পাটারি তেনার ভয়ে গর্তে নুকিয়ে থাকপনে - কয়ে রাকলাম

সেদিন প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছিলেন শুভংকর দারোগা অমনি নন্দর সঙ্গে মাঝরাস্তায় মুখোমুখি সামনে পড়তে বড়োবাবুর থেকে নন্দর দৃষ্টি আর সরে না কেবলই কাঁচুমাচু করে তাকায় তাই দেখে দারোগাবাবুর সন্দেহ দানা বাঁধল ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় যেন দেখেছি হে?
অমনি সরু গোঁফের ফাঁক গলে এককণা হাসি ঝরল নন্দর বলল, যাচ্চলে! এরই মদ্যি ভুলি গেলেন? আমি নন্দ সেই যে, নারকেল-নাড়ু - তাপ্পর আমারে ধরি শূন্যে তুলি - অরে বাবা রে!
শুনে গুরুগম্ভীর চাহনি মেলে তাকালেন ভয়ংকর দারোগা ঘাড় নেড়ে বললেন, হ্যাঁ-হ্যাঁ, বেশ মনে পড়েছে কিন্তু খবরদার বাপ, চুরি-চামারির নামটি কোরো না যেন আর অন্তত এই তল্লাটে যদ্দিন আছি আর তোমার ওই সনাতন দারোগার কথা ভুলে যাও
অভিমান হল নন্দর অমনি বিড়বিড় করল, ধুৎ! আপনে বড়ো নেষ্টুর
কী বললে?
না, কিচু না নন্দ মা কালীর মতো জিভ কাটে
গাম্ভীর্য ত্যাগ করে এবারে পরিষ্কার করে হাসলেন দারোগাবাবু বত্রিশপাটি বার করে বললেন, শোনো বাছা, ওইসব থাকলে আমাদের চলবে কেন? তবে যে দেশের বদনাম পুলিসজাতির বদনাম অত মায়াদয়া শরীরে নিয়ে ঘুরলে, তোমাদের মতো চোরছ্যাঁচ্চড়দের শায়েস্তা করব কেমন করে?
কথা ক'টি শেলের মতো বিঁধল নন্দর তবু উচ্চবাচ্য করার নাম করল না উলটে হাত কচলাতে-কচলাতে বড়োবাবুকে উদ্দেশ্য করে বলল, একটা কতা ছেল ছার, যতি অভয় দেন
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন ভয়ংকর দারোগা কী কথা?
এঁজ্ঞে, আপনের ভয়ে সপ ব্যাবসাপত্তর লাটে মানে অইল, বাপঠাকুদ্দার কাচ থিকে জম্মসূত্তে যা পেয়েচিনু কিনা একটি সিঁদকাটি আর অন্যের ঘর সাফ করার চালাকি বুদ্দি এদ্দিন ঘরে বসি দু-পায় খিল ধইরল সাধের সিঁদকাটিতেও জং তবে কী হাওয়া খাই বাঁচি? রোজগারপাতি বলতি নাই উপোস করি বা কদ্দিন চলে? মন চায় করবির দানা খাই অক্কা যাই
নন্দর দিকে তাকিয়ে থমকালেন বড়োদারোগাবাবু আহা, মরবে কেন?
তবে এককান কামের ব্যবস্তা যে আপনেরেই করি দিতি অয় আপনের লাগি এদ্দিনকার বাপঠাকুদ্দার ব্যাবসায় তালা যতি বলে কাঁচুমাচু মুখ করে তাকায় নন্দ
শুনে মন কেমন করে ওঠে বড়োবাবুর বলেন, যা কাজ দেব, পারবে?
নন্দ মুচকি হাসে বড়ো করে মাথা নাড়ে পারব বই-কি
বেশ, কাল একবার দেখা করো
ধড়ে প্রাণ এল নন্দর আপনমনে কইমাছের মতো লাফাল -বার কপালে আঙুল ঠুকে ঈশ্বরের উদ্দেশে বলল, পোভু, সপ তমার নীলা

ঘুম থেকে উঠে উঠোনের বাগান পরিদর্শনে বেরোন ভয়ংকর দারোগা আর দু’ঠোঁটে জ্যোৎস্নার হাসি ঝুলিয়ে বলেন, আহা, চমৎকার করেছিস বাগানখানা নন্দ ভাবিনি, এমন পরিপাটি কাজ তোর দ্বারা সম্ভব
নন্দ মুচকি হাসে বলে, সে আপনের কিপা
ভাবছি রজনীগন্ধার পৃথক বাগান করব একটি কেমন হয় রে নন্দ?
বেশ হয় ছার -টি চারা যে চাই তবে?
সব ব্যবস্থা করছি বলে পিঠ চাপড়ে দেন নন্দর
নন্দর কান্না পেয়ে যাচ্ছিল অমনি পাওয়ারই কথা ডান্ডার বাড়ির বদলে জীবনে এই প্রথম পুলিসের আদর খেল কিনা সে যাক গে সেইদিনই প্রথম নন্দর দেওয়া নারকোল-নাড়ু খেলেন ভয়ংকর দারোগা কথাটা দারোগাবাবু নিজেই তুললেন নন্দর ফুলগাছে জল দেওয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, কী রে নন্দ, গাঁ-ঘরে এত্ত লক্ষ্মীপুজো গেল তোর ঘরেও হল কই, সেই নারকোল-নাড়ু খাওয়ালি না তো?
শুনে আহ্লাদে আটখানা হয়ে তাকাল নন্দ সত্যি ছার? খেতি চান আমার কমলাবতীর আতের নাড়ু? তবে যে কালই আনতি অয়
এনেওছিল নন্দ এক থলে নারকোল-নাড়ু আয়েশ করে খেতেও দিল দারোগাবাবুকে একটি-দুটি-তিনটি-চারটি - আটটিতে গিয়ে থামলেন বড়োবাবু তারপরই ঘটল বিপত্তি নাড়ু চিবিয়ে উদরস্ত করতে-না-করতে অদ্ভুত ঝিমুনি এল প্রথমে তারপর দু’চোখ বুজে বিছানায় কেতরে পড়লেন
ঘণ্টাখানেক বাদে চোখ মেলে অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন ভয়ংকর দারোগা
বেচারা নন্দর তথৈবচ অবস্থা ততক্ষণে যাকে বলে, চোখের জলে-নাকের জলে দশা দুই হাঁটুতে কম্পন বড়োবাবুর চরণতলে নিজেকে সঁপে দিয়ে বলল, খেমা করি দেন ছার আর হবেনি জেবনে মা-কালীর দিব্যি
বড়োবাবু গম্ভীর হয়ে তাকালেন নাড়ুতে কী মেশানো ছিল? সত্যি করে বল? ঘুমের বড়ি?
এঁজ্ঞে মুখচুন করে ছেঁড়া কলাপাতার মতো মাথা দোলায় নন্দ
কেন?
ভুল করি, ছার অনেকদিনের অব্যেস কিনা
এর কী শাস্তি, জানিস?
নন্দ আরও কম্পমান এঁজ্ঞে না
ভয়ংকর দারোগা ঝিমোতে-ঝিমোতে বিড়বিড় করলেন, কান ধরে উঠবোস মাঝ উঠোনে ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমার ঘুমের ঘোর কাটছে!
শাস্তির বয়ান শুনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল নন্দ
ফাঁসি হতে-হতে রক্ষা পেল যেন মা-বিপত্তারিনির নাম স্মরণ করে তিনবার কপাল ঠুকে বড়োবাবুর দিকে তাকাল নন্দ ভয়ংকর দারোগা তখনও ঝিমোচ্ছেন ঢুলুঢুলু নয়নে তাকাচ্ছেন তারই মধ্যে জড়ানো স্বরে বললেন, ইয়েস স্টার্ট -
প্যাঁচামুখ করে উঠবোস করায় মনোযোগী হল নন্দ এক, দুই, চার, আট, বারো -
মনে-মনে যদিও প্রবল অট্টহাসে বলে, হুঁ! কেমন নাগতিচে তবে ভয়ংকর দারকা! আমি অইল গিয়া নন্দ পাটারি পিতিজ্ঞে করিচিনু তমারে ঘোল খাওয়াম; ঠিক খাওয়ানু কিনা!
----------
ছবি – নচিকেতা মাহাত
ম্যাজিক ল্যাম্প