গল্পের ম্যাজিক:: দানোগুহায় ছোটোমামি - সঙ্গীতা দাশগুপ্ত রায়


দানোগুহায় ছোটোমামি
সঙ্গীতা দাশগুপ্ত রায়

ছোটোমামি যে নেহাত শুধু ছোটোমামি নয় সেটা গেনু, মনু, বিলু, নুটুদের মাথায় প্রথমে মোটেই ঢোকেনিসবে মাসখানেক হল ছোটোমামুর বিয়ে হয়েছে। এদ্দিন বাড়ির বড়োরাই কেবল নতুন বউ নতুন বউদি বলে ছোটোমামিকে ঘিরে রেখেছিল। এখন যা হোক বিয়েবাড়ির মোচ্ছব শেষ আর ওদিকে ইস্কুলেও গরমের ছুটি। সব মিলিয়ে গেনু মনু নুটু বুলি আর ষষ্টির হাতের নাগালে এসেছে ছোট্টখাট্ট ছোটোমামি, কল্যাণী
এখন, বোশেখের বেলা দশটায় বাড়ির সবাই যখন এক থালা ভাত, সুক্তো, আলু পোস্ত, বিউলির ডাল আর মাছের ঝাল খেয়ে অফিস-টফিস যায়, মা দিদিমা বড়োমামি সেজমাসির দল দুপুরে আয়েস করে ওপরের ঘরে গল্পের বইটা কি সেলাইটা হাতে নিয়ে টেলিভিশনের সামনে বসে ঘুমিয়ে নেয় এক ফাঁকে, বড়দি আর রাঙ্গাদি নিজেদের মোবাইল ফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করে, সেই সময় গেনু মনুরা আবিষ্কার করে ওদের নতুন ছোটোমামি নিচের একটেরে ঘরে একগাদা কী সব যন্ত্রপাতি নিয়ে খুটখুট করে, এটা জোড়ে সেটা গাঁথে ওটা সাজায় সেটা বাদ দেয়...
দু-চারদিন ওরা দরজার ফাঁক দিয়ে দেখেছে। তাতে ছোটোমামির মনোযোগে একচুল চিড় ধরেনি। শেষে আর কৌতূহল চাপতে না পেরে একদিন গেনু আচমকা ঘরে ঢুকে চমকে দিয়ে বলে ওঠে, “কী কর তুমি ওই সব জিনিসপত্তর দিয়ে?
ছোটোমামি একটা ছোট্ট আয়না লাগানো গেলাসের মতো জিনিস ডান চোখটায় আটকে একটা চিমটে দিয়ে ছোট্ট একটা চকচকে পাথর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিল। গেনুর কথা শুনে জিনিসটা চোখ থেকে খুলে হাতের পাথরটা নামিয়ে রেখে হেসে বলে, “এই যে, কাজ-টাজ করি
“কী কাজ?” এবার নুটুও এগিয়ে আসে। এমনিতে ছোটোমামি একদম গম্ভীর না। ভয় পাওয়ারও কিছু নেই। তবু কাজের সময় কাউকে ডিস্টার্ব করতে নেই, এ কথা ওকে ক’দিন আগেই বাবা কানে মোচড় দিয়ে ভালো করে শিখিয়েছে। সেই জন্যেই আজ ও গেনুকেই নেতৃত্ব দিতে জমি ছাড়ল।
ছোটোমামি আঁচলটা কোমর থেকে খুলে টেবিলে রাখা পাথরগুলো একটা সরু ভেলভেটের বাক্সে পর পর সাজিয়ে রাখে। তারপর ওই কাচ লাগানো গ্লাস আর চিমটে-টিমটেগুলো আর একটা ভেলভেটের পাউচে ভরে সরিয়ে রেখে বিছানায় গিয়ে বসে। তখনও দরজায় মনু বুলি আর ষষ্টি দাঁড়িয়ে। ছোটোমামি হাত নেড়ে সব্বাইকে ভেতরে ডাকে। তারপর খাটের পিছনের তাক থেকে একটা কাচের বয়াম নামিয়ে এনে সবার হাতে গুলি গুলি ইমলি লজেন্স দিয়ে বসিয়ে দেয়।
“বললে না তো কী কাজ?” নুটু এতক্ষণে বুঝেছে ছোটোমামিকে ওরা ডিস্টার্ব করছে না মোটেই।
“পাথর যাচাইয়ের কাজ,” ছোটোমামি হাসিমুখে বলে।
“পাথর যাচাই? সেটা কেমন কাজ? কী করে করো?” বুলি শুরু থেকেই মামিদের ন্যাওটা। ফ্রকের ঘেরটা তুলে ভালো করে বিছানায় বসে এবার প্রশ্ন ছোড়ে
“এই যে, কোন পাথরটা দামি কোনটা শুধুই চকচকে কিন্তু দামি নয়, এইসব যাচাই করি আর কী।”
ওরা পাঁচজনে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এরকমও কাজ হয় নাকি? আর এসব পাথর তুমি পাও কোথা থেকে?
ছোটোমামি এবার আসনপিঁড়ি হয়ে বসে ষষ্টিকে কোলের কাছে টেনে নেয়। তারপর বলে পাথর তো কত জায়গা থেকেই পাওয়া যায়। সেই যেমন আমি একবার পাহাড়ের চুড়ো থেকে...
এটুকু শুনেই ওরা হই হই করে ওঠে – “তুমি পাহাড়ের চুড়ো দেখেছ? ছবির বইয়ের মতো?
গেনু আর নুটু যখন খুব ছোট্ট তখন মা-বাবার সঙ্গে দার্জিলিং গিয়েছিল। সে সব কিছুই মনে নেই, শুধু ছবিগুলো ওরা দেখে মাঝে মাঝে। নুটু বলল, “পাহাড়ের চুড়ো তো মেঘে ঢাকা ছোটোমামিতুমি সেখানে কী করে যাবে?
ছোটোমামি টিপি টিপি হাসে। তারপর পাঁচ ভাইবোনকে যে গল্প বলে তা তোমরা বাপু তার মুখ থেকেই শোনো -

আমি তখন সবে কলেজ পাস করে শিক্ষানবিশি করছি। আমার সুপারভাইজার ছিলেন ডঃ সিদ্ধান্ত। ভারি কড়া মানুষ। সারাদিন চুরুট খান আর কফির মগ হাতে নিয়ে মাপজোক করেন। শুরুতেই আমাকে বলেছিলেন, ‘দেখ মেয়ে, আমাদের সঙ্গে পাহাড়ে গিয়ে খনিজ সম্পদ খুঁজতে চাও সে ভালো কথা, কিন্তু মেয়ে বলে তোমাকে কম ভারী কাজ দেব তা ভেবো না। দিনের পর দিন মোট বইতে হতে পারে।  টিনের খাবার  আর মাপা জল খেয়ে থাকতে হতে পারে আর বাথরুম-টাথরুম যে পাবেই এমন কোনও কথা নেই। নদীর ধার, ঝরনার আড়াল কি জংলি ঝোপের মধ্যে গিয়ে কাজ সারতে হতে পারে। সে সব যদি পার তো সঙ্গে চল। নয়তো আমার পিছু নিও না মোটে।’
তা আমি ওই বাথরুম-টাথরুম শুনে একটু দমে গেলেও ভাবলাম, দেখাই যাক না। মোট বইতে আপত্তি নেই আর খাবার খাওয়ার বায়নাক্কাও নেই আমার। বাথরুমের ব্যাপারটা খুব অসুবিধার হলে না হয় পাহাড় থেকে নেমে আসতে হবে, এই তো! ক’দিনের মধ্যে রুকস্যাকে স্লিপিং ব্যাগ, ফুঁ দিয়ে ফোলানো বালিশ আর ক’টা মাত্র জামা-প্যান্ট নিয়ে প্রস্তুত হলাম আমি। মা সঙ্গে দিল একটা দু’মুখো ফ্লাস্ক যাতে একদিকে জল আর একদিকে চা কফি নেওয়া যায়, কিছু শুকনো খাবার মায় ক’টা  শুকনো মালপো অবধিঠাকুমা এনে দিল একটা মুশকিল আসান ফকিরের মাদুলি। পথে বিপথে মাদুলিই আমাকে রক্ষা করবে। সব শেষে বাবা দিল একটা ছোট্ট এল-ই-ডি বাল্বের সাদা আলোর টর্চ। রাতে খাটের নিচে সে টর্চ জ্বালতেই গোটা তিন চার সরু মোটা মাকড়শা খচমচ করে নিজের বোনা জাল বেয়ে এদিক থেকে ওদিক হাঁটা দিল। আমার ছোটো ভাই গোপুর একটা রঙিন সুগন্ধী ইরেজার হারিয়েছিল অনেকদিন আগে। টর্চের আলোয় সেটাও দেখতে পাওয়া গেল এক্কেবারে কোনার দিকে। বুঝলাম এক্সপিডিশনের জন্য এক্কেবারে ষোলো আনা প্রস্তুত আমি।

ট্রেনে উঠে ডঃ সিদ্ধান্ত বলে দিয়েছিলেন তাড়াতাড়ি খাবার খেয়ে শুয়ে পড়তে হবে। গন্তব্যে পৌঁছনো অবধিই আমাদের বিশ্রামের সময়। একবার পৌঁছে গেলে আর শুয়ে বসে থাকার সময় নেই।
মোটামুটি ত্রিশ ঘন্টা আমাদের খেয়ে আর ঘুমিয়েই কাটল। দলের মধ্যে একটি ছেলে, শ্যামল, সে আদতে নেপালি কিন্তু কখনও নেপাল যায়নি। আমাদেরই মতো কলকাতায় মানুষ, বাংলায় কথা বলে, ভাত ডাল এঁচোড়ের ডালনা খায়। এমনকি পাহাড়ের অভিজ্ঞতাও তার নেই। পাহাড় চেনার শখও তেমন আছে মনে হয় না। তার সঙ্গে একখানা খাতা। তাতে গুটি গুটি অক্ষরে মজার সব রেসিপি লেখা আছে। পাহাড়ের গাছপালা, ছোটো বুনো খরগোশ পাখি এসব কী করে রান্না করতে হয় তাইই লিখে নিয়ে চলেছে।
দেড়দিন পরে আমরা যখন গিয়ে পৌঁছলাম সেই গ্রামে তখন সন্ধে হয় হয়। ছোট্ট সাজানো গ্রামে সব বাড়িগুলোই উঁচু মাচার ওপর।  বাড়ির গায়ে গায়ে সাদা আলপনা আঁকা। লক্ষ করে দেখলাম প্রায়  প্রত্যেকটা বাড়ির গায়ের ছবি আলাদা আলাদা। অনেকটা ওরলি আর্ট ধরণের। তবে একটু মোটা মোটা আঁকাগুলো। ডঃ সিদ্ধান্ত বললেন, এই যে দেয়ালের আঁকা, এর থেকেই বোঝা যায় একটা বাড়িতে কতজন সদস্য। নতুন শিশু জন্মালে ওরা একটা শিশু এঁকে দেয়, কেউ মারা গেলে একজন মানুষ মুছে ফেলে মাটি লেপে।

“ওরলি আর্ট কি ছোটোমামি?” মনু কথার মাঝে ফুট কাটে
“মুম্বাইয়ের আশেপাশে যে আদিবাসীরা থাকে তাঁদের মধ্যে একরকম আঁকার চল আছে, তাকেই বলে ওরলি আর্ট। মানুষ রোজদিন যা করে, রান্না খাওয়া, নাচ গান এসব বিষয় নিয়েই আঁকা, সরু সরু হাত পা, গোল একটা মাথা... ওদের সব ছবিতেই এমন মানুষ থাকে। তবে হিমালয়ের বুকের ওই গ্রামটিতে যে আঁকা দেখেছিলাম তাতে মানুষের শরীর অনেক বেশি ভরভরন্ত
“মোটাসোটা?” বুলি ফিক করে হাসে।
“হ্যাঁ, একদম তোমার মতো,” মামি বুলির গাল টিপে গল্পে ফেরে -

গ্রামের সর্দার যোগিয়া হাঁটু গেড়ে বসে আমাদের পাঁচজনকে আপ্যায়ন করল নতুন ছোটো হাতমোছার গামছা আর ছোটো ছোটো আয়না দিয়ে। ওদের নাকি ওরকম নিয়ম
জঙ্গলে হঠাৎ করে রাত নামে জানিস তো? তো ওই কষকষে জংলি গ্রামে এমনিতেই প্রত্যেকটা বাড়ি ঘিরে বেশ কিছু বড়ো গাছ। সেই গাছ বেয়ে যখন অন্ধকার নামল, যেন এক্কেবারে ঘুটঘুটিয়ে। যোগিয়ার বউ, তাঁকে গাঁয়ের সবাই মা বলে ডাকে, সে আমাদের হাত পা ধোয়ার জল দিল, তারপর আমাকে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘বাথরুম যাবে কি? গেলে এখনই চল। রাত হলে যেতে পারবে না।’ ওর হাতের নির্দেশে দেখলাম দূরে মাচার ওপর বাথরুম করার জন্য একটা ঘেরা জায়গা। এরা খুব পরিষ্কার। কিন্তু বাড়ির মধ্যে বাথরুমের ব্যবস্থা রাখে না। পাশাপাশি চার-পাঁচটা মাচা আছেগোটা গাঁয়ের লোক সেগুলোই ব্যবহার করে
রাতে আমরা খেলাম রুটি আর ভুট্টার সঙ্গে মোটা লঙ্কার সবজি। ভীষণ ঝাল সে সবজি মুখে তুলেই আমি তো লাফিয়ে উঠি প্রায়। শ্যামল বলল, ‘দিদি আমার কাছে গুড় আছে, খাবে?
ডঃ সিদ্ধান্ত বাংলায় বললেন, ‘সেটা করলে এদের অপমান করা হবে না তো?
এদিকে আমার মুখ-চোখ দেখে ‘মা’ মানে সর্দারের বউ বুঝতেই পেরেছে যে ভীষণ ঝাল লাগছে। এক মুখ হেসে সে শিকে থেকে একটা হাঁড়ি নামিয়ে আনল। কালচে আঠা আঠা জমাট মধুতে ভর্তি হাঁড়িটা। আমি আয়েস করে মধু আর রুটি খেয়ে শুতে গেলাম সেদিন।
পরদিন ভোর ছ’টা বাজতেই ডঃ সিদ্ধান্ত তৈরি। অতএব আমরাওআকাশ সেদিন খুব মেঘলা। চারদিক কেমন অন্ধকার আর ঠান্ডা। তার মধ্যেই আমরা গরম চা আর ছাতুর রুটি খেয়ে বেরোলাম। আমাদের গ্রুপে আর একটি ছেলে ছিল, বরুণযেমন তার স্বাস্থ্য তেমনই তার গলার আওয়াজ। দেখলেই মনে হয় একে মিলিটারিতে ভর্তি করিয়ে দেওয়া উচিতকিন্তু কাজের সময় দেখা গেল সে একটি ভিতুর ডিম। কী করে তা বুঝলাম সেটা পরে বলছি।
আমরা তো  জঙ্গলে পাহাড়ে গিয়েছি পাথর থেকে খনিজ খুঁজতে। মাটির বুকের মধ্যে লুকোনো থাকে রঙিন সুন্দর পাথরের স্তর। হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবী ঝড় বৃষ্টি ভূমিকম্প সহ্য করে, সহ্য করে আগ্নেয়গিরির তাপ। কখনও জলের ধাক্কায় পাশ ফেরে মাটি, কখনও ভয়ংকর উত্তাপে নিজেকে পোড়ায়। এভাবেই নিজেকে ভেঙ্গে গড়ে কষ্ট পেয়ে অনেক দুর্যোগ সহ্য করে প্রকৃতি আমাদের চোখ ধাঁধানো রঙিন পাথর উপহার দেয়।

“আচ্ছা, তারপর কী হল বল? বরুণ কীসে ভয় পেল?” নুটু, গেনুদের পাথরের বিবরণে আগ্রহ নেই
ছোটোমামি এক ঢোঁক জল খায়, তারপর আবার গল্প শুরু করে -

পাহাড়ের গায়ে কোথাও ভালো পাথর আছে কিনা দেখতে পাহাড়কে ফাটাতে হয়। এক্সপ্লোসিভ পাহাড়ের গায়ে সেট করে তাতে আগুন লাগিয়ে পাহাড় ফাটিয়ে দেখা যায় অনেক অনেক গভীরে কী আছে। কিন্তু আমরা তো বড়ো মাইনিং করতে যাইনিগিয়েছি কলেজের পড়া সেরে হাতে কলমে সামান্য কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে। তাই অল্প এক্সপ্লোসিভ আর কিছু যন্ত্রপাতি নিয়ে গেছি।
বরুণ যেহেতু সবচেয়ে শক্তপোক্ত তাই বরুণের পিঠে ছিল সেই যন্ত্রপাতির বোঝা। হাঁটতে হাঁটতে আমরা যখন গ্রাম থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি তখন ডঃ সিদ্ধান্ত আমাদের দেখালেন একটা ঘন শালগাছে ঘেরা জায়গা। শ’খানেক শালগাছ ঘিরে রেখেছে শক্ত পাথুরে একটা চাতালকে। কালচে কুমিরের পিঠের মতো রং চাতালটার। রোদ্দুর ঢোকে না ওখানে খুব বেশিদেখে মনে হচ্ছে শালের ছাওয়ায় মসৃণ চাতালটা যেন উপুড় হয়ে ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু আমরা তাকে ঘুমোতে দিলে তো!
বড়ো একটা গজাল চাতালের একদিকে ঠুকতে বসলেন ডঃ সিদ্ধান্ত। হাতুড়ির ঠোকায় পেরেকের চারপাশ ঘিরে বড়ো চিড় ধরতে পারে শক্ত পাথর হলে,  আবার খুব নরম পাথর হলে চারপাশে চিড় না ধরিয়েও গজালের মুখটা সরাসরি ভেতরে অল্প ঢুকে যেতে পারে। যাইই হবে, আমি লিখে নেব ডায়েরিতে। এসবই আমাদের রিপোর্টে যাবে। ডঃ সিদ্ধান্ত সবে হাঁটু গেড়ে বসে গজালটা ঠুকেছেন ঠুক ঠুক আওয়াজে। আমিও খাতা কলম বাগিয়ে তাকিয়ে আছি সেদিকে। শ্যামল বোধহয় ছবি তুলবে বলে ক্যামেরা বার করছে। ডকুমেন্ট হিসেবে ছবি লাগবে তো! হঠাৎ মনে হলে কেউ যেন ঝুমুর পরে ঝুম ঝুম শব্দে এদিকে আসছে। তখনও আমরা ওদিকে সেভাবে মন দিইনি। জঙ্গলে অনেক রকম অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়। তাছাড়া একটু সময়ের মধ্যেই ব্যাপারটা কেমন ছন্দে বাঁধা হয়ে গেল। গজালের ঠুক ঠুক আর সেই ঝুম ঝুম মিলে - ঠুক ঝুম ঝুম, ঠুক ঝুম ঝুম - একটা আওয়াজ শান্ত জঙ্গলের মধ্যে দিব্যি মানিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু  হঠাৎ দেখি বরুণ পিঠে সেই এক্সপ্লোসিভ স্টিকের বোঁচকা নিয়ে বিকট ভারী গলায় ‘ওরে বাবা গো-ও, বাঁচাও বাঁচাও, হেল্প হেল্প’ করে চেঁচাতে চেঁচাতে দৌড়চ্ছে। আমরা যে যার কাজ থামিয়ে অবাক হয়ে দেখছি এদিক ওদিক। কেন হেল্প? কীসের থেকে বাঁচাব? ডঃ সিদ্ধান্তও ঘাবড়ে গিয়ে ‘স্টপ বরুণ, স্টপ রাইট নাও, হোয়াটস্‌ রং বরুণ’ বলে লাফালাফি শুরু করেছেন আর এদিকে আমি আর শ্যামল হেসে কুটিপাটি যাচ্ছি দু’জনকে দেখেহয়েছে কী, একটা বেশ বড়ো চেহারার সজারু, তার পিঠে বোধহয় বড়ো একখানা কাঁচা শালপাতা পড়ে কাঁটায় আটকে গেছে... সেইই ওই আধো অন্ধকারে বেড়াতে বেরিয়ে চাতালে আমাদের দেখে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল। সবুজ পাতা ঢাকা গাবলুগুবলু একটা সজারুকে দেখে এত্ত লম্বাচওড়া একটা মানুষ যে ওরকম ভয় পেতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস হয় না।
যাক, সেদিন আমরা অল্প কিছু পরীক্ষামূলক তথ্য জোগাড় করে সন্ধে নামার আগে গাঁয়ে ফিরলাম। ফিরে কিন্তু মনে হল চারদিক কেমন থমথমে।
পাহাড়ি গ্রামের লোকজন খুব হুল্লোড়ে হয়। ওদের জীবনে আনন্দ বলতে ভালো খাওয়া আর নাচ গান। কখনও কখনও ছোরা ছুরি দিয়ে বুনো জন্তু শিকারের প্রতিযোগিতা। শিকার যা হয় তা ওরা আগুন জ্বালিয়ে সেঁকে পাথুরে নুন, তেল আর লঙ্কা মাখিয়ে খায় আর মদ খেয়ে নাচানাচি করে ঘুমোতে যায়।
যোগিয়া বলেছিল, আমাদের জন্য ওরা রাতে বনভোজন করবে। বড়ো হাঁড়িতে মাংস রান্না হবে সব্বার জন্য। শালপাতায় করে মাংস আর জাউ খাবে সবাই। আমরা জাউ খেতে পারব না, তাই আমাদের জন্য পাহাড়ি চালের ভাত করে দেবে ‘মা’কিন্তু গ্রামে ঢুকে মনে হল তেমন কিছু হচ্ছে না। কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা, কেউ কোথাও নেই। যোগিয়া আর ওর বউ আমাদেরকে দাওয়ায় নিয়ে গিয়ে বসাল। তারপর একটা ছোটো ছেলেকে ডেকে বলল, সব ঘরে ঘরে বলে আসতে সবাই যেন সজাগ থাকে। দরকারে খবর দিতে যেন ভুল না করে
আমাদের কেমন গা ছমছম করছিল। কীসের খবর, কেন কোনও জনমানুষ দেখছি না কোথাও...
যোগিয়া খাটিয়ায় বসে আমাদের বলল, ‘গ্রামের থেকে দশ বারো মাইল দূরে একটা বড়ো গুহা আছে। জংলা বুনো কাঁটা গাছের মাঝে ওই বিরাট গুহাতে কেউ কখনও যায় না। কথিত আছে ওই গুহায় বড়ো দানো থাকে। কারও কোনও ক্ষতি অবশ্য সে কখনও করেনি। বরং কারও ঘরে কোনও বিপদ হলে তারা দানোর কাছে প্রার্থনা করে সে বিপদ গিলে ফেলতে। প্রার্থনার সঙ্গে সঙ্গে দানোর জন্য কাঁচা দুধ, ফল, পিঠে এসব রেখে আসে ওই কাঁটাগাছের সামনে। পিছন ফিরে দেখা মানা আছে। দেখলেই চোখে ওই কাঁটাগাছের কাঁটা এসে বিঁধবে। তবে দু’দিন পরে গিয়ে যদি দেখে খাবার যেমন কে তেমন আছে তো জানবে দানো বিপদে সাহায্য করবে না। যদি দেখ ফেলাছড়া করে খাওয়া তো জানবে দানো চেষ্টা করবে, বিপদ কাটতেও পারে, নাও পারে। আর যদি দেখ খাবারদাবার কিছু নেই তো জানবে বিপদ কাটবেই।’

এতদূর বলে মামিমা আবার হাত বাড়ায় জলের বোতলের দিকে। বাইরে একটু সন্ধে হয়ে আসছে।
“ঘরের আলোটা জ্বেলে দিই ছোটোমামি?” ষষ্টি বেচারা ভারী ভিতু। গল্পের মধ্যে দানো ঢুকে থেকে তার গা ছম ছম করছে
ছোটোমামিমা হেসে বলে, “দূর বোকা, ভয় পাচ্ছিস নাকি? আমি আছি না!”
নুটু, গেনু, বুলি আর মনু হাসিমুখে ষষ্টির দিকে তাকায়। বেচারা বড্ড ছোটো কিনা! তারপর নিজেরা আর একটু ঘেঁষে ঘেঁষে বসে তাড়া দেয়... “থামছ কেন? বলো তারপর!”
“এই তো বলছি,” ছোটোমামি গল্পে ফেরে -

যোগিয়া গুমগুমে আওয়াজে নিচু গলায় আমাদের বলতে থাকে... ‘ক’দিন আগে জুনান নামে গাঁয়ের একটি মেয়ে গিয়েছিল দানোর পুজো দিতে। তার দাদা আজ দু’মাসের বেশি ঘর ছাড়া। শিকারে গিয়ে আর ফেরেনি। সেই জন্যেই গিয়েছিল। খাবারটাবার দিয়ে মেয়েটা চলেই এসেছিল। তারপর দু’দিন পরে গিয়ে কি দেখেছে কে জানে। সেদিন থেকেই বাড়ি এসে চুপ করে বসে থাকে। গাঁয়ের বদ্যি তখনই বলেছিল দানো ভর করেছে। ঝাড়ফুঁকের জল দিয়েছিল মাথায় ছিটিয়ে ঘুম পাড়ানোর জন্য। কিন্তু সে জলে কাজ হয়নি। গতকাল কোনও এক সময় মেয়েটা আবার  দানোর গুহায় গিয়েছিল। কেউ টের পায়নি। সকাল থেকে গাঁয়ের আশেপাশের জঙ্গলে খুঁজেছে সবাই। শেষে বিকেলের আগে দেখা গেছে মেয়েটা দানোগুহার দিক থেকে ফিরছে। জঙ্গলের কাঠুরেরা দেখেছে ও কাঁটাঝোপ সরিয়ে গুহা থেকে বেরিয়ে আসছে। মেয়েটার সারা গা চকচক করছিল দূর থেকে। কাছে আসতে দেখা গেছে ওর গায়ের রং নীলচে হয়ে গেছে একদম। সারা শরীর ওর ভিজে। মাথার চুল থেকে জল ঝরছে আর মাথায় যেন চকমকে মুকুট বসিয়ে দিয়েছে কেউ। এসে থেকে একটাও কথা বলেনি। ওদের দাওয়ায় মাথা নিচু করে বসে থেকেছে। সেই সময় জুনানের মা খাওয়াতে গেলেও খাবার ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে দাওয়ায়। বদ্যিকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু বদ্যি বলছে এ জড়িবুটি দাওয়াইয়ের কাজ নয়। দানোর নজর পড়েছে ওর ওপর। হয়তো আজ রাতেও ও আবার গুহায় যাবে। জানি না কী হতে চলেছে।’
ডঃ সিদ্ধান্ত আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘খুবই ইন্টারেস্টিং ব্যাপার মনে হচ্ছে। হয়তো যা খুঁজতে এসেছি তার থেকেও ভালো কিছু পেতে পারি। চল, মেয়েটিকে দেখে আসি।’
বরুণ দেখলাম ব্যাজার মুখে ঘাড় থেকে বোঁচকা নামিয়ে বলল, ‘আমার শরীরটা ঠিক লাগছে না। বাথরুম যেতে হবে। আপনারা যান।’
ডঃ সিদ্ধান্ত জোর করলেন না। আমি, শ্যামল আর ডক্টর মিলে যোগিয়াকে নিয়ে মেয়েটার বাড়ির দিকে হাঁটা দিলাম। যোগিয়ার বউ পিছন থেকে ডেকে বলল, ‘তাড়াতাড়ি ফিরো। আমি ওদের জন্য আটা আর গুড়ের পিঠে বানাচ্ছি।’

গ্রামের মধ্যে সত্যিই যেন কিছু ভর করেছে। বাচ্চাগুলো কাল গাছগুলোকে ঘিরে ঘিরে খেলছিল, আজ কোত্থাও নেই। খালি নজর করলাম সব বাড়ির দরজার পাশে একটা করে ছোট্ট ঢোলকের মতো কিছু রাখা আছে। কাল ছিল কিনা দেখিনি খেয়াল করে
জুনানের বাবা দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে বসেছিল। জুনান বোধহয় ঘরে। ওর মা শুকনো কাঠপাতা গোছা করে উঠোনের উনুনের পেটে ঠেসে ঢোকাচ্ছিল। আমাদের দেখে সব ফেলে এসে দাঁড়াল। যোগিয়ার হাত দুটো ধরে কেঁদে উঠল জুনানের বাবা, ‘ছেলেটা দু’মাস হল হারিয়ে গেছে সর্দার, এবার মেয়েটাকেও দানোয় ডাকছে...’
যোগিয়া অসহায় মুখে সান্ত্বনা দিল, ‘ভেবো না। দানো ভাগাবার চেষ্টা করব। গুণিনকে খবর পাঠিয়েছি। বদ্যি তো আছেই।’
ডঃ সিদ্ধান্ত গলায় একটু কাশির আওয়াজ করলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘জুনানকে একবার দেখতে পারি?
পায়ে পায়ে আমরা ওদের ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম। শিকে থেকে ঝুলছে বিছানা। দোলনার মতো। শিকেটায় গাঁট আছে শেকলের। বোধহয় দরকার মতো খাটের নিচে জিনিস রাখার জন্য খাট উঁচু নিচু করা যায়। জুনান শুয়ে আছে চুপ করে। ঘরে বাতি নেই কোনও। আমি আমার পকেটের সেই টর্চটা বার করে জ্বালালাম। প্রায় ঘুটঘুটে ঘরের মধ্যে ওই দুধ সাদা আলোয় জুনানের গোটা শরীরে কালো কালো কালসিটে। আর হাতের পাতা কেমন নীলচে। আরও একটা জিনিস দেখলাম, জুনানের চুলের মাঝে মাঝে কিছু যেন চিকমিক করছে। ইচ্ছে করছিল ওকে ছুঁয়ে দেখি, কিন্তু সেটা বোধহয় উচিত হবে না। তবে বুঝলাম, শুধু হাতের পাতাই নীল, যা লোকের মুখে মুখে সারা শরীর নীল হয়ে ছড়িয়েছে। চুলের মুকুটের গল্পও তাইই।
ফেরার পথে ডঃ সিদ্ধান্ত একটাও কথা বলেননি। যোগিয়া আমাকে জিজ্ঞেস করছিল আমার আরও ভাই বোন আছে কিনা। শ্যামল ফিসফিস করে বলল, ‘সর্দার বোধহয় ভাবছে তোকে এমন ভয়ঙ্কর পাহাড়ে একা ছেড়ে দিয়েছে মা বাবা, মানে তুই মরে গেলেও ওদের আরও ছেলেমেয়ে থাকবে, কষ্ট হবে না।’

রাতে আমরা দালিয়ার খিচুড়ি খেলাম, সঙ্গে আচার দিয়ে মাখা মিষ্টি আলু পোড়া। আর ছিল গুড় দিয়ে আটা মেখে বানানো পিঠে। দিব্যি খেতে। দেখলাম ওরা রান্নাতেও খনিজ নুন ব্যবহার করে, গোলাপি রঙের। আমাদের মতো সাদা আয়োডাইজড নুন না।
খেয়েদেয়ে আমি শুয়েছি খাটিয়ায়। সবাই একটা ঘরে তিন চারটে খাটিয়ায় ভাগাভাগি করে শুই আমরা। আর যোগিয়া শোয় ঘরের বাইরে মাটি দিয়ে বানানো ডিভানের মতো বড়ো রোয়াকে।
আমার সঙ্গে স্লিপিং ব্যাগ ছিল। ঠান্ডায় স্লিপিং ব্যাগে শুয়ে ভীষণ আরাম। আমিও কখন যে ঘুমিয়ে গেছি জানি না। ঘুম ভাঙল  যখন, তখন বোধহয় ভোর রাত। দ্রিমি দ্রিমি গুমগুম একটা আওয়াজ হচ্ছে একটানা। তবে সে আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গেনি আমার। ঘুম ভেঙ্গেছে কারণ ডঃ সিদ্ধান্ত আমার মুখে ঠান্ডা জলের ছিটে দিয়ে ডাকছে, ‘কল্যাণী! কল্যাণী! ওঠো শিগগির।’
আমি ভাবলাম, এ কী! আমি কি অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম? জলের ছিটে দিচ্ছে কেন? তাড়াতাড়ি উঠে চোখ কচলে বুঝলাম ডক্টর শ্যামলকেও ওভাবেই জলের ছিটে দিচ্ছেন। ঘুম ভাঙ্গাতে ঠান্ডায় এর চেয়ে ভালো দাওয়াই আর হয় না। ঘোর কাটতে শুনলাম ডক্টর বলছেন শিগগির চলো। জুনান আবার বেরিয়ে পড়েছে বাড়ি থেকে। শুনছ না গ্রামের লোকেরা ঢাকের আওয়াজে খবর দিচ্ছে?
এক লাফে খাটিয়া থেকে নেমে জ্যাকেট চড়িয়ে বেরিয়ে এলাম। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। আর তার থেকে বেশি অদ্ভুত ঘোর লাগানো আওয়াজ। একভাবে এক তালে দ্রিমিদাম দ্রিমিদাম করে ঢাক বাজছে, কিন্তু যেন খুব নিচু স্কেলে। গাছপালার ঘেরে এক অদ্ভুত ইকো তৈরি করেছে আওয়াজটা। আশেপাশের বাড়িগুলোর লোকজন দাওয়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। শুধু একটা মশালের আলো এগিয়ে যাচ্ছে বোধহয় দানো গুহার দিকেই। দরজার ধার থেকে একটা জন্তু গাঁথার বল্লম টেনে নিল যোগিয়া। ডঃ সিদ্ধান্ত আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘চলো, কুইক।’
শুকনো পাতা মাড়িয়ে কিছুটা দৌড়ে কিছুটা হেঁটে আমরা এগোচ্ছিলাম। দু’পাশে শাল আর সেগুনের জঙ্গল। অন্ধকারে বড়ো গাছের ফুলে ওঠা শিকড় বাঁচিয়ে এগোতে গিয়ে বার বার হোঁচট খাচ্ছি। যোগিয়া বরং অনেক দ্রুত এগোচ্ছে। এসব রাস্তায় ও অভ্যস্ত।
জানি না কতক্ষণ ওভাবেই হেঁটেছি আমরা। হঠাৎই দেখি সকালের সেই চাতালের মতোই আর একটা চাতাল। কিন্তু আকারে সেটার প্রায় তিনগুণ। চাতালের ওপাশ দিয়ে একটা ছোটো ঝোরা তিরতির করে বইছে। আর তার কুড়ি পঁচিশ ফিটের ওপারে অনেক উঁচু পাথরের একটা গুহা, যেন বিশাল এক দৈত্য মাথায় কম্বল মুড়ি দিয়ে একটু সামনে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে।
ঝোরাটা অগভীর। পা দিলে প্রায় হাঁটু জল হবে। টর্চের আলো এখানে ম্যাড়ম্যাড়ে আর বড্ড বেমানান। বরং হালকা চাঁদের আলোয় হাঁটুজলের ওই ঝোরার নিচে বড়ো বড়ো সাদা আর তামাটে পাথর স্পষ্ট দেখা যায়। জলের সামনে দাঁড়িয়ে যোগিয়া নিচু হয়ে জল হাতে তুলে মাথায় ছিটায়। দেখাদেখি আমরাও জলে হাত দিই। পাহাড়ি ঝোরার জল সাধারণতঃ বেশ ঠান্ডা হয়। বিশেষ করে রাতের দিকে। এই জল কিন্তু তা নয়। বরং ঠান্ডার দিনে যে উষ্ণ গরম জলে চান করি আমরা, প্রায় সেরকম।
ডক্টর আস্তে করে জিজ্ঞেস করেন এতক্ষণে, ‘মশাল হাতে লোকটা কে ছিল যোগিয়া?
যোগিয়া এদিক ওদিক তাকিয়ে উত্তর দেয়, ‘জুনানের বাপ। কিন্তু সে গেল কোথায়?
যা শুনলাম, জুনান এমনিতেই ভোর রাতে ঘুম থেকে ওঠে। কিন্তু আজ মাঝরাতেই উঠে পড়েছে। তারপর কোনোদিকে না তাকিয়ে চুপচাপ বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটছিল গ্রামের পথে। ওর মা বাবার ডাকে সাড়াও দেয়নি। হয়তো দানোগুহাতেই যাচ্ছে, দানোর ডাক শুনতে পাচ্ছে হয়তো ও, এই ভেবে ওর বাপ মশাল জ্বালিয়ে মেয়ের পিছু নেয় আর মা ঢাক বাজিয়ে গাঁয়ের লোককে ডেকে তোলে
নিচু গলায় কথা বলতে বলতে আমাদের চোখ সয়ে আসে আধো অন্ধকারে। দেখি মশালটা নেভা। একটু দূরে গুহার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কোলকুঁজো একটা লোক, জুনানের বাপ। যোগিয়া তার কাছে যেতেই হু হু করে কেঁদে উঠে সে বলল, ‘জুনানকে দানো ডেকেছে আবার। জুনান চলে গেছে গুহার মধ্যে।’

ডঃ সিদ্ধান্ত যেন মুহূর্তের মধ্যে ঠিক করে নেন কী করতে হবে। আমাকে বলেন, ‘কল্যাণী, তোমার টর্চটা দাও। আর তোমরা কেউ না চাইলে এসো না আমার সঙ্গে। জানি না কতটা রিস্ক আছে ভেতরে, তবে আমার মন বলছে ভেতরে ভয়ের কিছু নেই। থাকলে জুনান সেখান থেকে ফিরে এসে আবার যেত না।’
আমি আর শ্যামল কোনও কথা না বলে ঝোরার জলে পা ডুবিয়ে পার হলাম। যোগিয়াও। জুনানের বাবাও আমাদের পিছু পিছু আসবে ভাবছিল বোধহয়। কিন্তু দু’পা এগিয়েই দাঁড়িয়ে গেল। আর দাঁড়িয়ে রইল বরুণ অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা গুহামুখে পৌঁছলাম। ভীষণ কাঁটাঝোপে ভর্তি বেশিটাই, কিন্তু একটা ফাঁক আছে যেখান দিয়ে অনায়াসে ভেতরে যাওয়া যায়। আর কী অদ্ভুত, সেই ফাঁক দিয়ে ভিতর থেকে একটা নীলচে আলোর আভা যেন বয়ে আনছে হাজার ধূলিকণা।
যোগিয়া কখন মশালটা তুলে নিয়েছিল দেখিনি। এখন দেখলাম সে কোমর থেকে দেশলাই বার করে মশালটা জ্বালিয়ে নিল, তারপর এক হাতে বল্লম আর এক হাতে মশাল নিয়ে সে আর ডক্টর সিদ্ধান্ত আমার আর শ্যামলের আগে ঢুকল গুহায়।
ভেতরে ঢুকেই আমি আর শ্যামল চিৎকার করে উঠলাম। ভয়ে নয়, বিস্ময়ে। গুহাটা বাইরে থেকে যত বিশাল মনে হয় ভেতরে তেমন নয়। বরং ছাদ অনেক নিচু, আকারেও বিরাট নয়। এরই মধ্যে উঁচু করে রাখা মশালের আলোয় আমরা দেখলাম, জুনান দাঁড়িয়ে আছে কিছুটা ভিতরে সরু তিরতিরে একটা ঝরনার সামনেঝরনার জল বোধহয় ফুটন্ত গরম, যাকে লোকে উষ্ণ প্রস্রবন বলে, সেই রকম। জল থেকে উঠে আসছে ধোঁয়া আর সেই ধোঁয়ার ওপাশে বিরাট এক নীলচে দেয়াল। এবড়োখেবড়ো দেয়ালটা ঝরনার থেকে অনেকই চওড়া। ফলে যেখান দিয়ে জল যাচ্ছে সেখানের রংটা যত স্পষ্ট, তার দু’পাশের শুকনো দেয়ালে অত স্পষ্ট নয়। চারদিকে ভালো করে আলো ফেলে দেখা গেল নীলের বিভিন্ন শেডের পাথরে ভর্তি দেয়ালটা। আলো না ফেললে নীল রং তেমন বোঝাই যেত না। শুধু যেখান দিয়ে জল নামছে সে জায়গাটায় তাকালে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। 
কতক্ষণ যে অবাক হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম আমরা জানি না। ঘোর কাটতে দেয়ালে হাত রেখে রেখে তুলে নিচ্ছিলাম, সাদা আলোয় দেখছিলাম আমাদের হাতে নীলচে ধুলো।
ভোরের আলো ফুটতে বাইরে পাখির ডাক শুনে বেরিয়ে এলাম আমরা। জুনানের হাত ধরে বার করে আনলাম আমি।
ডক্টর সিদ্ধান্ত বললেন, জুনান সম্ভবতঃ বিস্ময়ের ধাক্কা সহ্য করতে পারেনি। বলতেও পারেনি কাউকে বুঝিয়ে। এত বছরের দানোর বিশ্বাস ভেঙ্গে ও ভেতরে কেন গিয়েছিল, কোন সাহসে গিয়েছিল - সে প্রশ্নের উত্তর কীই বা দিত? তবে হয়তো দানোর কাছে প্রার্থনা জানাতে বেশি এগিয়ে গিয়ে ও ওই আলো দেখে। তারপর আলোর টানেই ভেতরে ঢুকে এসব দেখে। দেয়াল ধরে ধরে ঘুরেছিল হয়তো বা ভিতরে ওই ঝরনায় পড়ে গিয়ে থাকতে পারে। বাইরের আলোতে দেখ, ওই ঝরনার জলে অভ্র মেশানো আছে। সেই অভ্র শরীরে আটকে যায়।

“আমরা সেবার ওখান থেকে প্রচুর স্যাম্পেল কালেক্ট করেছিলাম, জানিস? বহুবছর ধরে গুহার বাইরের পাথরের চাপ আর ভেতরের হাওয়ার প্রতিরোধ, তার সঙ্গে প্রাকৃতিক উষ্ণ ঝরনার জল মিলেমিশে গুহার দেয়ালে নীল কোয়ার্টজের একটা আস্তরণ তৈরি করেছিল। ডাক্তার সিদ্ধান্ত পরে আরও অনেকবার ওখানে গিয়ে আরও অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছিলেন জানি। সে সব গবেষণার নথিপত্র এখন কোনও লাইব্রেরিতে আছে নিশ্চয়ই।”
“তুমি আর যাওনি ছোটোমামি?” বুলি ঘোর ভেঙ্গে জিজ্ঞেস করে।
“না রে। তারপর আমার আর যাওয়া হয়নি। আমি অন্য জিনিস নিয়ে পড়াশুনো করতে লাগলাম যে!”
ওপরের ঘর থেকে কেউ একজন হাঁক দিল, “কল্যাণী, ওপরে আয়, চা খাবি তো!”
ছোটোমামি সদ্যপ্রাপ্ত ফ্যানেদের মিছিল নিয়ে ওপরতলায় উঠে যায় চা খেতে

সেবার গরমের ছুটিতেই ওরা পাঁচ ভাইবোনে ঠিক করে নিয়েছে সামনের বছর ওরা একসঙ্গে যোগিয়াদের গাঁয়ে যাবে, ওই দানোগুহার নীল দেয়াল দেখতে। সঙ্গে অবশ্যই নেবে ছোটোমামিকে। ছোটোমামিই কিনা ওদের লিডার!
_____
ছবিঃ সুমিত রায়

গল্পের ম্যাজিক:: মুকুলবাবুর মার্স অভিযান - অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়


মুকুলবাবুর মার্স অভিযান
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

মুকুল বৈরাগী বেজায় ভুলো মনের মানুষ। পেশার মধ্যে লেখা আর নেশার মধ্যে ইস্কুলে পড়ানোউলটোটা হলেই ভালো হত - কিন্তু হয়েছে কী, একুশ বছর ধরে ইস্কুলে ইতিহাস পড়াতে পড়াতে, পড়ানো তার নেশা হয়ে গিয়েছিল। আর লেখা? সেটাকে তিনি মনে করেন পেশা। মুশকিল হচ্ছে পেশা হলে তাতে কিছু রোজগারপাতি হতে হয়তা তিনি রোজগারের চেষ্টায় কিছু লেখালেখি করে, রোজগারের দেখা না পেয়ে, এখন বলেন, “রোজগার কী আর টাকা পয়সার মাপেই হয়? এই যে আমার লেখা পড়ে এত মানুষ আনন্দ পায়, তা রোজগারের চাইতে কম কীসের? মানুষের ভালোবাসাই আমার পরম প্রাপ্য।”
মুকুলবাবু ছোটোবেলায় জটায়ুর উপন্যাস পড়ে বড়ো হয়েছেন। কোন জটায়ু? আরে, লালমোহনবাবু, যিনি ফেলুদার সঙ্গে জটিল সব রহস্য অনুসন্ধানের সঙ্গী হয়ে জটায়ু ছদ্মনামে দিস্তা দিস্তা রোমহর্ষক কাহিনি লিখে গিয়েছেন। মুকুলবাবু ছোটোবেলা থেকে জটায়ুর ফ্যান। ইস্কুলের ছেলেরা পাছে জেনে যায় তাদের মাস্টারমশাই এক রহস্য রোমাঞ্চ গল্প লিখিয়ে, তাই মুকুলবাবু ছদ্মনামে লেখেন। ‘গরুড়’ নামে লেখকের লেখা বই দেখলে জানবে ওটা মুকুলবাবুর লেখা। জটায়ুপ্রেমী মুকুলবাবু তার ছদ্মনাম ‘গরুড়’ রেখেছেন কেন, তা আমাকে জিজ্ঞেস কোরো না, একমাত্র তিনিই এর হদিস দিতে পারবেন।
বিজ্ঞানীরা ভুলো মনের হয়ে থাকেন, সেটা বহুজনশ্রুত। ইতিহাসের মাস্টার কেন ভুলো হতে যাবে - এই যদি কেউ ভেবে বসে, তাহলে হয়ে যাবে মস্ত বড়ো ভুল। কেন সেটা বলি।
মুকুলবাবুর আম্রপল্লির বাসাটা ছিল ভাড়ার। সেই বাসা ছোটো মনে হওয়ায় মুকুলবাবু তখন সবেমাত্র তাম্রপল্লিতে ঘর ভাড়া করেছেন। বাড়ি থেকে আধ কিলোমিটার দূরে ছিল দুধের ডিপো। রোজ তিনি ঘড়ির কাঁটা ধরে সকাল সাড়ে সাতটায় ডিপোতে যেতেন দুধ আনতে। বাড়ি থেকে দুধের ডিপো পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া আর ফেরা, এই সময়টা ছিল গল্পের প্লট ভাঁজার উপযুক্ত সময়। সেদিন অল্প অল্প বৃষ্টি পড়ছিল। বাদলা দিনে তিনি বেশ বুঝতে পারলেন, মাথায় একটা গল্পের প্লট দানা বেঁধে উঠছে। তার গল্পের নায়ক মিলনকুমার মার্স আর জুপিটারের মধ্যে দুর্দান্ত রকেট চালিয়ে ছুটে চলেছে। এস্টার‍য়েডস্‌ এড়িয়ে সেই ভীষণ পথে চলা বেজায় কঠিন। রকেটের স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে, ফুটবল মাঠের দক্ষ খেলোয়াড়ের মতো মিলনকুমার মহাবেগে ধেয়ে আসা বিশাল বিশাল পাথর এড়িয়ে এগিয়ে চলেছে মার্সের দিকে।
কমলালেবুর রঙের মার্সের জমি ছুঁতে আর বেশি বাকি নেই, তখনি মুকুলবাবু চমক ভেঙে দেখলেন, তিনি দুধের ডিপোর সামনে দাঁড়িয়েদোকানদার একরাশ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে। চমক ভেঙে রোজকার মতো দুই লিটার দুধের প্লাস্টিকের থলে কাঁধের ঝোলা ব্যাগে ভরে ফেলে আবার বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। পিছন থেকে দোকানদার ছেলেটা চেঁচিয়ে উঠল, “কাকু, দামটা দিয়ে গেলেন না?”
মুকুলবাবু বেজায় লজ্জিত। ছি ছি ছি, কী ভাবল ছেলেটা – মুকুলবাবুর মতো ভদ্র শিক্ষিত লোক দুধের দাম না দিয়ে পালচ্ছেন? দাম মিটিয়ে আবার বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন। মিলনকুমারের রকেট আবার চলতে শুরু করল মার্সের দিকে। যে করেই হোক মার্সের দানব থিটাকে হারিয়ে তাকে ফিরতে হবে পৃথিবীতে। থিটার হাতে পরাজিত হয়ে মার্সের রাজা ওমেগা গ্রহাণু সেরেসে আশ্রয় নিয়েছে। সেরেস হচ্ছে দুই গ্রহ মার্স আর জুপিটারের মধ্যের এ্যাস্টার‍য়েড বেল্টের সবচাইতে বড়ো গ্রহাণু।
হেরো রাজা ওমেগার পাঠানো সংকেত পৃথিবীতে চলে আসে ভারতের প্রেসিডেন্টের কাছে। তিনি আবার ভারতীয় সৈন্য বাহিনীর অধ্যক্ষ কিনা!  তাই তিনি অন্য তিন সেনাপ্রধানের সঙ্গে শলাপরামর্শ করে, ইন্টেলিজেন্স বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে মিলনকুমারের হাতে মার্সের দুরাত্মা থিটাকে হারানোর গুরুদায়িত্ব তুলে দিলেন। রাজা ওমেগার আদেশে থিটাকে হারিয়ে ওমেগার হাতে রাজ্যপাট ফিরিয়ে দিয়ে মিলনকুমার ফিরে যাবে পৃথিবীতে
গল্পের প্লট যখন ক্লাইম্যাক্সে, তখনই বাড়ির রাস্তা হারালেন মুকুলবাবু। অপরিচিত পাড়ায় বিচিত্র বাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে মুকুলবাবু নিজেকে জিজ্ঞেস করলেন, “পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ?” দুর্ভাগ্যের কথা, কোনও উত্তর এলো না।
এই পাড়াটা বেশ অভিজাত। এটাকে ঠিক তাম্রপল্লি বলে মনে হচ্ছে না। তাম্রপল্লিতে রাস্তা শুনশান থাকে, হয় ইতিউতি দু-চারজন লাফিয়ে লাফিয়ে দৌড়োয় - মানে জগিং করে, আর না হয় বাড়ির পোষা কুকুরের পিছনে দৌড়োয়। মুকুলবাবুর পুরোনো পাড়া আম্রপল্লিতে থাকে সাধারণ মানুষ। আশ্চর্য ব্যাপার এখানে চারিদিকে লম্বা লম্বা মাথায় উঁচু বাড়ি। বাড়ির পোর্টিকোতে ঢাউস ঢাউস গাড়ি নিঃশব্দে ঘুমোচ্ছে। কোনও লোকজনের দেখা নেই। কাউকে যে জিজ্ঞেস করে নিজের বাড়ির হদিস জানবেন তার উপায় নেই।
সামনে একটা টি পয়েন্ট দেখে মুকুলবাবু থমকে গেলেন। কিছুক্ষণ আগে মিলনকুমারকে কি অনায়াসেই না পাথরের চাঁই এড়িয়ে, উড়িয়ে নিয়ে চলেছিলেন মার্সে। আর এখন টি পয়েন্ট থেকে ডান দিক যাবেন, না বাম দিক, সে নিয়ে সংশয়ে পড়ে গেলেন।
এমন সময় একটা লোক, উসকো খুসকো চুল, গালের দাড়ি হাওয়ায় উড়িয়ে টি পয়েন্ট থেকে মুকুলবাবুর দিকে হেঁটে এল। কাছে আসতে শোনা গেলো, লোকটা গান গাইছে, “ডান দিকে রই না আমি বাম দিকে রই না......
মুকুলবাবুর মনে হল লোকটা অন্তর্যামী, ঠিক ধরে ফেলেছে উনি পথ হারিয়েছেন। সরু চোখে মুকুলবাবুর দিকে তাকিয়ে লোকটা বলে উঠল, “পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ?”
“তাম্রপল্লি-টা কোনদিকে বলতে পারেন?”
লোকটা আবার গান ধরল, “এ ভাই জারা দেখকে চলো, আগে ভি নেহি পিছে ভি......”
এ তো আচ্ছা মুশকিলে পড়া গেল, রাস্তা না বাতলে লোকটা শুধু গানই গেয়ে চলেছে। মুকুলবাবু টি পয়েন্টের দিকে হাঁটা দিতে পিছন থেকে লোকটা খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠলে মুকুলবাবুর নিজেকে বেশ অপমানিত বলে মনে হতে লাগল। যা থাকে কপালে – এই ভেবে, ডান দিকেই হাঁটা দিলেন মুকুলবাবু। রাস্তার পাশে পাম গাছের নিচে একটা বাদামি রঙের কুকুর শুয়েছিল। সেটা দিব্যি ঘুমোচ্ছিল, কিন্তু মুকুলবাবু কাছে আসতেই প্রথমে এক চোখ খুলে তাকাল, তারপর হঠাৎ ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে এলমুকুলবাবু এক ছুটে উলটো দিকে দৌড় লাগালেন।
কিন্তু এ কী! শহরের পাকা রাস্তা তো নয় এখানে! এতো এবড়ো খেবড়ো ধু ধু প্রান্তর। চারিদিকে কোনও গাছপালা নেই। লাল রুক্ষ মাটি। মিলনকুমারের রকেট যান এসে মুকুলবাবুর পাশে ক্র্যাঁচ শব্দ করে থামল। রকেটের দরজা আপনা থেকেই খুলে গেলভিতরে নীল মায়াবী আলো। মুকুলবাবু রকেটে উঠে বসলেন। রকেট শূন্যে উঠে গেলমিলনকুমার শক্ত চোয়াল নিয়ে ককপিটে বসে আছে। গোল জানলার কাচ দিয়ে দেখা গেল আরেকটা লাল রঙের রকেট ধেয়ে আসছে মিলনকুমারের রকেটের দিকে। লেজার গানের আলো ঝলসে উঠল। মিলনকুমার সেই আলো এড়িয়ে গেল নিপুণ হাতে রকেটের স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দিয়ে। শোঁ শোঁ শব্দে রকেট কখনও ডান দিকে, কখনও বাম দিকে পাক খেয়ে তেড়ে গেল লাল রকেটের দিকে। রকেটের দোলায় ছিটকে পড়লেন মুকুলবাবু।
“আরে ও মশাই, বলি কেমন বোধ করছেন এখন?” লোকটা মুখের কাছে ঝুঁকে এললোকটার নিশ্বাসের দুর্গন্ধে গা গুলিয়ে উঠল মুকুলবাবুর। নিশ্চয়ই ব্যাটা দাঁত মাজেনি। গা ঝেড়ে উঠে বসে মুকুলবাবু দেখেন তিনি রাস্তার পাশে ড্রেনের ধারে পড়ে আছেন। বোঝা গেল এতক্ষণ অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। আসলে কুকুরের তাড়া খেয়ে কতদূর দৌড়েছিলেন মনে নেই। হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিলেন সেটা জানান দিল পায়ের পাতা। ব্যথায় টনটন করছে। দুধের থলে কোথায় পড়ে গেছে কে জানে। ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়লেন মুকুলবাবু। ঝুঁকে এসেছিল যে লোকটা তাঁকে এখন ভালো করে দেখলেন মুকুলবাবু। সাদা হাফ প্যান্ট আর কলার ছাড়া ক্রিম কালারের টি শার্ট, হাতে একটা ওয়াকিং স্টিক। দেখে বেশ সম্ভ্রান্ত ঘরের মনে হচ্ছে।
“যাচ্ছিলেন কোথায়? আর এখানে পড়ে জ্ঞান হারালেন কীভাবে? বাড়ি কোথায় আপনার?” সব ক’টা প্রশ্ন টর্পেডোর মতো ধেয়ে এল মুকুলবাবুর দিকে। তিনি অসহায়ের মতো চারিদিকে চোখ ঘুরিয়ে দুধের প্যাকেট খুঁজতে খুঁজতে শুধু বললেন, “তাম্রপল্লি।”
“আরে তাম্রপল্লি তো এখান থেকে বেশ দূর! বরং চলুন, আমার বাড়িতে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে যাবেন ‘খন। একটু চা-ও খাওয়া যেতে পারে। আমিই না হয় গাড়িতে আপনাকে ছেড়ে আসব।

ভদ্রলোকের একতলা বাড়ির সামনেটা গোলাকৃতি। সেখানে একটা ছোট্ট গাড়ি বারান্দা। ছোটো বাগানে অনেক রকম গাছ লাগিয়েছেন – পাম, সুপুরি, নারকেল। কিছুটা জায়গা কেটে সেখানে ফুলের কেয়ারি। ছায়া ছায়া শীতল বাড়িটা যেন ঝুম মেরে দাঁড়িয়ে। বাইরের বারান্দায় দু-তিনটি চেয়ার পাতা, একটা বেতের টেবিলমুকুলবাবুকে চেয়ারে বসিয়ে ভদ্রলোক ভিতরে গেলেন। কিছুক্ষণ পর একটা সাদা তোয়ালে দিয়ে শরীরের ঘাম মুছতে মুছতে বেরিয়ে এসে বললেন, “কেমন লাগছে আমার বাড়ি?”
মুকুলবাবু ঘাড় নেড়ে জানালেন, তার ভালো লাগছে। পায়ের ব্যথাটা এখনও চিনচিন করে বেশ কষ্ট দিচ্ছে। দুধের প্যাকেট দুটো মহাকাশ যাত্রার পথে হারিয়ে ফেলে এখন আফসোস হচ্ছে। বাড়ি গেলে আজ কপালে কী আছে কে জানে। গিন্নীর কাছে মুখ দেখানোর উপায় থাকবে না।
চাকরের হাতে বিরাট ট্রেতে চেপে চায়ের সরঞ্জাম আসা দেখে বোঝা গেল, লোকটা বেশ বড়োলোক। চায়ের ট্রে সামনের ছোট্ট বেতের টেবিলে রেখে চাকর দু’হাত জড়ো করে নমস্কার করল। মুকুলবাবু পায়ের ব্যথায় এমনিই কাতর, তাই ঠোঁট ফাঁক করে একটু হাসবার চেষ্টা করলেন। সুদৃশ্য ট্রেতে সাদা রঙের টি পট, দুধের ছোট্ট পট আর একটা বোন চায়নার প্লেটে সুগার কিউব রাখা। ঢেউ খেলানো কারুকার্য করা প্লেটে কয়েকটা ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কুট, কিছু ভাজা সল্টেড কাজু। মুকুলবাবুর নিজেকে এর কাছে বেশ দীনহীন বলে মনে হল। আজ সকালে নিজের হাতে চা করে যে কাপটায় প্রাতঃকালীন প্রথম চুমুক দিয়েছিলেন, সেটার চিড় খাওয়া হ্যান্ডেলের কথা মনে পড়ে গেল।
“নিন, চা খান। আপনার ক’টা কিউব লাগে?” ভদ্রলোক সামনের বেতের গোল চেয়ারে বসতে বসতে মুকুলবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন।
“আমি, ওই... না, মানে একটা... না না... সুগার আছে কিনা...”
“আরে মশাই সকালে উঠে দৌড়োন। কত আর বয়েস হবে আপনার! আমি এই আটষট্টিতেও সুগার-টুগার কিচ্ছু ঢুকতে দিইনি শরীরে, বুঝলেন কিনা। আপনি আমার থেকে ছোটোই হবেন। নিন নিন শুরু করুন
মুকুলবাবু কাজুর কয়েকটা টুকরো মুখে ফেলে চোখ বুজলেন। আঃ, কতদিন কাজু খাওয়া হয়নি। এমন একটা জীবন যদি পাওয়া যেত! কী করে মানুষ বড়োলোক হয়ে যায় কে জানে! আর ঠিক সেই সময়, যেই না চায়ের কাপটা হাত বাড়িয়ে নিয়েছেন, অমনি সামনের লোকটা দেখতে দেখতে একটা দানব হয়ে উঠল। ভীষণ লম্বা কান, ঠিকরে পড়া চোখ, নির্লোম মাথা দেখে মুকুলবাবু বুঝতে পারলেন, এই-ই হচ্ছে মার্সের দস্যু, থিটা। ভয় পেয়ে মুকুলবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, “মিলনকুমার! কোথায় তোমার লেজার গান? দানবটাকে বধ করো, এক্ষুনি
মুকুলবাবুর চিৎকারে বড়োলোক বাড়ির চাকর সেগুন কাঠের ভারী দরজা ঠেলে বারান্দায় এসে অবাক হয়ে মুকুলবাবুর দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর তার শরীরে স্টিল রঙের স্পেস স্যুট, মাথায় হেলমেট, কোমরে লেজার গান দেখতে পেলেন মুকুলবাবু। দানব থিটা মুকুলবাবুর দিকে ঝুঁকে এলমুকুলবাবু চিৎকার করে উঠলেন। বারন্দার চালে বসা কাকেরা কা কা শব্দে উড়ে গিয়ে বাগানের পাম গাছের মাথায় বসে চেঁচামেচি করতে লাগল। আশ্চর্যের ব্যাপার, মিলনকুমার কিন্তু থিটার উপর আঘাত হানল না। বরং থিটার কানের কাছে কী যেন বলে উঠল। মুকুলবাবু জ্ঞান হারালেন, চোখে নেমে এল গাঢ় অন্ধকার। তিনি যেন অন্ধ কুয়োর মধ্যে সাঁ সাঁ করে নিচে নেমে যেতে লাগলেন। হাতের চায়ের কাপটা ফসকে গিয়ে অন্ধকারে কোথায় আছড়ে পড়ল শব্দ করে।

চোখ খুলতেই মুকুলবাবু দেখলেন বিছানার পাশে তার স্ত্রী দাঁড়িয়ে আছেন। এইমাত্র ঘুম ভাঙল। কতক্ষণ ঘুমিয়ে আছেন কে জানে? মাথাটা একটু ভারী মনে হচ্ছে। শুধু মাথা ছাড়া শরীরের বাকি অংশরা বোধহয় ধর্মঘট করেছে। হাত পা কিছুই নাড়ানো যাচ্ছে না। চারিপাশের শব্দগুলো একটু একটু করে বাড়ছে। মুকুলবাবুর স্ত্রী কীসব বলে যাচ্ছেন, কিচ্ছু শোনা যাচ্ছে না। ঠোঁট নড়া দেখে বোঝা যাচ্ছে, তিনি কিছু একটা বলে চলেছেন মুকুলবাবুর পিছনে দাঁড়ানো কারও দিকে। একটু একটু করে স্ত্রীর কণ্ঠস্বর পরিষ্কার হল। শুনতে পেলেন, “যে দিন থেকে ওই ইস্কুলের চাকরিটা নেই, সেদিন থেকেই দেখছি কেমন যেন অন্যরকম। মাঝে মধ্যে বিড়বিড় করে কীসব বকে যায়। রাত জেগে লেখালেখি করে, সারা রাত ঘরের মধ্যে পায়চারি করে আমার ঘুমের দফারফা করে... কী আর বলি আপনাকে। জানতাম একদিন একটা কাণ্ড বাধাবে। ভাগ্যিস আজ আপনি ছিলেন। আদাড়ে বাদাড়ে পড়ে থাকলে তো জানতেই পারতাম না। আপনাকে কী বলে যে ধন্যবাদ...”
“আরে এসব আর বলবেন না ম্যাডাম। যে কোনও মানুষ হলে যা করত, আমিও তাই করেছি। ভাবলাম হার্টের গোলমাল আছে। চায়ের কাপ হাতে নিতে না নিতেই উনি যেই চোখ উলটে ফেললেন, আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো, মিলনকুমার কে? নাম ধরে ডাকতে ডাকতে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। আমার চাকরটা যদি ঝট করে ওঁকে ধরে না ফেলত, উনি চেয়ার থেকে পড়েই যেতেন। ভাগ্যিস সে সব কিছু...”
“যা ভেবেছি তাই। আসলে ওর গল্পের নায়কের নাম মিলনকুমার। ওই সব ছাইপাঁশ গল্প লিখে লিখে মাথাটা একেবারে গেছে। কতবার বলেছি, বড়োদের জন্য গল্প লিখতে পার, ছোটোদের গল্প লিখে কী হবে, এক পয়সা রোজগার হবে না...”
“দাঁড়ান দাঁড়ান, কী বললেন? গল্প লেখেন, মানে ছোটোদের গল্পকার? বাঃ, এ তো খুব ভালো কথা! কী মুকুলবাবু, কী বই লিখেছেন এ যাবৎ? আমার তো পাবলিকেশন হাউস আছে। একবার উঠে পড়ুন দেখি, আপনার গল্প না হয় আমি ছেপে দেব। এবার থেকে না হয় ছোটোদের গল্পের বই ছাপব
মুকুলবাবু উঠে বসতে যেতে তার স্ত্রী হাঁ হাঁ করে চেঁচিয়ে উঠলেন, “এখন উঠছ যে! শরীর ভালো নেই তোমার... ডাক্তার বলেছে একদম রেস্ট, মাথারও...”
মুকুলবাবু বলেন, “ধুত্তেরি, নিকুচি করেছে শরীরের... সাক্ষাৎ ভগবান দর্শন হল আজ... কী বলে যে ধন্যবাদ দেব আপনাকে...”
প্রকাশক ভদ্রলোক বলেন, “আগে সুস্থ হয়ে নিন। তারপর না হয় আপনার মিলনকুমারের গল্প শুনব জমিয়ে।”
_____

ছবিঃ অতনু দেব

গল্পের ম্যাজিক:: হরেনবাবু - অনুষ্টুপ শেঠ


হরেনবাবু
অনুষ্টুপ শেঠ

বুইয়া খুব ভালো করে জানে ওদের নতুন বন্ধুটা এখানকার কেউ নয় এখানের কোনও মানুষ অমন সুভদ্র, সুশীল, কথায় কথায় প্লিজ আর থ্যাংকু বলা, খালি দোকানে খোলা বয়াম পেলেও লজেন তুলে না নিয়ে চলে আসা, কুকুরকে বিস্কুট দিতে হলে পিঠের ব্যাগ থেকে কাগজের প্লেট বার করে তাতে দেওয়া স্বভাবের নয় এসব অদ্ভুত অভ্যাস দেখলে ওরা হাসে - ও, বুলি, টুলি, ঝনু, মিন্টু, টুনটুনিদি, বলাইদারা সবাই বন্ধুটাও হাসে, রাগ করে না কে জানে কোন সাহেবদের দেশ থেকে এসেছে, দেখতে যদিও একদম পাতি বাঙালির মতো
ঝনুর বাবা কাগজ-টাগজ পড়তে পারেন কোথায় যেন মাল বইবার কাজ করেন তিনি, কিন্তু সেটা যেহেতু বইপত্রেরই দোকান তাই বই নাড়াচাড়া করার অভ্যাস হয়ে গেছে ঝনুর কাছে নতুন বন্ধুর কথা শুনে তিনি বলেছেন এ নিশ্চয় জাপানে বড়ো হয়েছে সেই বা কোথায় কে জানে, অনেক দূরে অক্টোপাস-টাস খায় নাকি তারা, ইশ!
নতুন বন্ধু, লোকটা নাম বলে না এ এক জ্বালা, কাঁহাতক আর বন্ধু বন্ধু বলা যায়! অতএব টুনটুনিদি ওর নাম রেখেছেহরেনবাবু নামটা মানানসই হয়েছে, কারণ প্রতিদিন সন্ধেবেলা বাইক নিয়ে নিঃশব্দে পাড়ায় ঢুকে, বটগাছের ছায়াটায় বাইকটা পার্ক করে লোকটাহরেন’ বাজায় একটা ভারি সুন্দর সুরেলা হর্ন একটা, যেন মিষ্টি একটা পাখি ডেকে উঠল ওরা সবাই সময়মতো পরিষ্কার হয়ে জামা-টামা পরে চুল আঁচড়ে ওই ডাকটার অপেক্ষায় থাকে, আর শুনতে পেলেই যে যার বই খাতা পেন্সিল সব নিয়ে পিলপিল করে বটগাছের পাশের সেনবাড়ির মাঠে এসে জড়ো হয় অমনি নেমে এসে নিচের একটেরে ঘরটা খুলে দেন সেনদের মেজোবাবু অবস্থা ভালো ছিল যখন তখন এটা দারোয়ানের ঘর ছিল একটা জোরালো আলো আছে মেজোবাবুর মনটা ভালো, এককথায় বস্তির বাচ্চাগুলোকে বাড়ির জায়গায় পড়তে দিয়েছেন, কম কথা! যদিও দুষ্টু লোকে আড়ালে বলে, ব্যবস্থাটা মিনিমাগনায় নয়
হরেনবাবুকে জিজ্ঞাসা করলে অবশ্য সে কথার জবাব পাওয়া যায় না বেশি উত্যক্ত করলে মিঠে ধমক আসে, “তোদের অত কথায় দরকার কী? পড়তে পাচ্ছিস, যথেষ্ট নয়? একটা অঙ্কের টেস্ট নিই আজ, কী বল?”
অমনি না নাকরে ওরা মুখ নামিয়ে যে যার খাতায় আঁকড়ি বুঁকড়ি করে নামতা কি চিঠি কি রচনা লিখতে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ে
পড়া শেষ হবার পর, ওরা গান গায়। রবি ঠাকুরের গান। কী যে সুন্দর, কী যে সুন্দর কথাগুলো। হরেনবাবুই শিখিয়েছে, নইলে আর শিখবে কোথা থেকে!
ওদের বাড়ি পাঠিয়ে, ব্যাগ পিঠে ফেলে হরেনবাবু কিন্তু ফিরে যায় না। ওদিকের গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যায়। কোথায় যায় ওরা কেউ জানে না, ওদের তখন ঘরে ফেরার তাড়া থাকে, বাড়ি গিয়ে খাতা বই নামিয়েই ছুটে তারককাকার বাড়ি টিভি দেখতে যাওয়ার, কিংবা মায়ের হাতে হাতে ঘরের কাজ সারার তাড়া থাকে এটুকুই তো সারাদিনে নিজেদের সময়, নইলে সারাদিন কারও চায়ের দোকানে কাজ, কারও মায়ের সঙ্গে ঠিকেবাড়িতে, টুনটুনি দিদি তো নিজেই ফ্ল্যাটবাড়ির একটা বাচ্চাকে দেখে।
খালি বুইয়া জানে, হরেনবাবু কোথায় যায়।
সে ভারি অদ্ভুতভাবে জেনেছিল। সেই বুধবার বুইয়ার মা কাজে যায়নি, তাই ঘরের কাজের তাড়া ছিল না। পড়া শেষ হতে, ও বেরিয়ে বটগাছের নিচের ধাপিটায় বসে বসে পা দোলাচ্ছিল, আর ভাবছিল পঞ্চার মতো বাজে দুষ্টূ ছেলেটাকে অবধি হরেনবাবু কথায় বশ করে ক্লাসে নিয়ে এল, দিব্যি নামতা-টামতা বলতে পারছে আজকাল, আর বুইয়া এত চেষ্টা করেও কিছুতেই মূর্ধন্য ষ টা ঠিক মতো লিখতে পারছে না কেন! এমন সময়ে হরেনবাবু জিনিসপত্র তুলে গেট বন্ধ করে বেরোল।
অমনি বুইয়ার মনে হল, দেখি তো কই যায়!
যেমন ভাবা, তুরতুর করে হরেনবাবুর পিছু পিছু গলিতে ঢুকে পড়ল সে।
গলিটা কোথায় যায় সবাই জানে। এদিক দিয়ে এসে বাজারের সামনে বেরিয়েছে, বাজার যাওয়ার শর্টকাট এটা। কিন্তু বাজারে গিয়েই বা হরেনবাবু প্রতিদিন কী করে, এটা জানার ইচ্ছে হচ্ছিল ওর। তবে বেশিক্ষণ পিছু পিছু যাওয়া গেল না।
“এই, বাড়িতে বলে এসেছিস? জানিস তো আমার মাথার পিছনেও চোখ আছে?”
ধরা পড়ে গেলে গুটি গুটি পাশেই চলে আসতে হয়। লাজুক হেসে জিজ্ঞাসাও করতে হয়, “কোথায় যাও গো তুমি?”
“চল, যাচ্ছিস তো! নিজেই দেখবি
গলিটা যেখানে পড়েছে তার ফুট দশেক দূরে বাজারের গলি শুরু। এখানটা ভরে থাকে ঝাঁকায় মিষ্টি পেয়ারা, চুপড়িতে শাক নিয়ে বসা গরিব লোকেতে। তার পিছনে হেলে পড়া, মলিন, শ্রীহীন চায়ের দোকান চালায় এক থুড়থুড়ি বুড়ি। সবাই তাকে বুড়িমাসি বলেই ডাকে। কত বয়স কে জানে! বুইয়ার বাবা বলেন তাদের ছোটোবেলাতেও নাকি ছিল বুড়িমাসির দোকান বুড়িমাসি তখনও বুড়িই ছিল, তবে এতটা নয় হেলাফেলার মনিষ্যি নয়, রীতিমতো লেখাপড়া জানা বাড়ির মেয়ে ছিল সে। কিসে কী হয়েছিল কে জানে, এখন তিন কুলে আর কেউ নেই বুড়ির, ঐ দোকানেই বাস, ঐ দোকান থেকেই যা আয়।
হরেনবাবু দিব্যি সেই ঝুপসি দোকানে ঢুকে গেল। পিছু পিছু বুইয়াও।
“অ মনা, এয়েচ? চা খাবে? এটি কে গো?”
বুড়িমাসি একগাল হেসে বলে।
ব্যাগটা বুড়িমাসির পাশের কোনাটায় নামিয়ে দিয়ে হরেনবাবু বলে, “দাঁড়াও মাসি, আগে কাজ সেরে নিই! এ বুইয়া, আমার কাছে পড়ে। ওকে চা বিস্কুট দাও একটু
তারপর - “তুই বোস, খা। আমি আসছি” - বলে পট করে পিছনের দরজা দিয়ে কোথায় জানি চলে যায়।
বুইয়া বসে বসে মশা তাড়ায় বুড়িমাসি একটা স্টিলের ছোটো গ্লাসে ওকে খুব গরম, ধোঁয়া ওঠা চা আর একটা প্লেটে দুটো লেড়ো বিস্কুট দেয় মাথায় হাতও বুলিয়ে দেয় একবার, কী শিরা বেরোনো হাতগুলো!
আস্তে আস্তে তারিয়ে তারিয়ে পুরোটা খায় বুইয়া। হরেনবাবু গেছে তো গেছেই।
“একটু ভিতরে নামিয়ে আয় না মা!”
অন্য খদ্দের এসে গেছে। বুড়িমাসি ব্যস্ত। বুইয়া প্লেট গ্লাস তুলে নিয়ে যেতে গিয়ে দেখে আরও খালি কাপ প্লেট পড়ে আছে পাশের টেবিলে। সেগুলোও নিয়ে নেয়। বুড়িমাসি ফোকলা দাঁতে হাসে দেখে।
দরজা পেরিয়ে একটা বাজেমতো খালি জায়গা। তার পাশে একটা কলতলা। কল দিয়ে জল পড়ছে, আর সেখানে উবু হয়ে বসে হেব্বি স্পীডে বাসন মাজছে একটা লোক। তার একপাশে এক ডাঁই গ্লাস কাপ প্লেট পরিষ্কার ধোয়ামাজা, অন্য পাশে এখনও ধুতে বাকি ঘুগনি মাখা থালা, পোড়া চাটু, সসপ্যান।
হরেনবাবু।
বুইয়া আস্তে করে হাতেরগুলো নামিয়ে রাখে। মুখে কথা সরছিল না তার। তাদের পড়ায় সে অবধি না হয় ঠিক ছিল, তাই বলে এমন একটা ঝকঝকে জামাকাপড় পরা লোক এরকম এঁদো জায়গায় বসে বাসন মাজবে!
হরেনবাবু মুখ তুলে হাসে, “খেয়েছিস? হয়ে গেছে দাঁড়া, বুড়ো মানুষ তো বুঝলি, পারে না আর। তাই সব জমিয়ে রাখতে বলি রোজের, আমার তো একটুখানি ব্যাপার এটা!”
বুইয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেই ফেলে, “তোমার ভালো লাগে?”
হরেনবাবু কাজ থামিয়ে হাঁ করে তাকায়, “কী বলিস? তোদের এখানকার এটাই তো সেরা কাজ, যা দেখলাম!”
বুইয়ার মুখে কথা সরে না। বাসন মাজা তো ওর সবচেয়ে অপছন্দের কাজ গো!
“কী মজার না? দ্যাখ, এই ঘষলাম, এই...এই...দেখলি? কেমন সমান ভাবে চকচক করে উঠছে?”
ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাটিটা দেখায় হরেনবাবু।
ছিট আছে মাথায় নির্ঘাৎ!
দ্যাখ না দ্যাখ বাকিগুলোও মেজে ফেলে, হাত ধুয়ে উঠে দাঁড়ায় হরেনবাবু, বুড়িমাসির কাছে বসে চা খায়, হাসিমুখে অনেক গল্প করে। তারপর ফেরার পথ ধরে। বুইয়া ভারি আশ্চর্য হয়ে বাড়ি ফেরে।
“তুমি টাকা পাও? বাসন মেজে?”
হো হো করে হেসেছিল হরেনবাবু।
“দূর পাগলি! অত গরিব মানুষ, ও টাকা দিলেও আমি নিতাম নাকি! আমি তো মজা পাই, তাই করি
এ কক্ষনো এখানকার লোক নয়। ঐ জাপান-টাপানই হবে।
মুশকিলটা হল তার পরের মাসেই। পড়ানো সবে শুরু করেছে হরেনবাবু, মেজোবাবু এসে দাঁড়ালেন।
“ইয়ে, শোনো না, কথা আছে একটু
কী কথা হল ওরা জানে না। কিন্তু হরেনবাবু ফিরে এল ভুরুতে বিশাল ভাঁজ নিয়ে। অন্যমনস্কও হল বার বার পড়াতে গিয়ে। ওদের প্রশ্নের জবাবে খালি “কিছু না” বলে গেল।
যদিও, ওদের জানতে বাকি রইল না পরদিনই।
প্রোমোটরের নজর পড়েছে ঐ বাড়িতে। মেজোবাবু না করে দিয়েছেন নাকি, নাকি বলেছেন বাচ্চাগুলো শিখছে পড়ছে, ও জায়গা কেড়ে নেওয়া যাবে না, তাই তার পোষা মাস্তানরা হুমকি দিয়ে গেছে এসে।
বস্তির বাচ্চা ওরা। এসব মাস্তান-টাস্তান শুনে ঘাবড়ায় না। তবে সতর্ক হওয়া দরকার, এটা বুঝে ফেলে। অনেকে আসা বন্ধও করে, তাদের বাবা বা মা প্রোমোটরের বিষ নজরে পড়তে চায় না বলে।
তার তিনদিন পরে লোকগুলো এল। ক্লাস শেষের মুখে।
কমজনই ছিল ওরা। চার-চারটে হুমদো লোকের সামনে কিছুই করতে পারবে না বুঝেই কেউ টুঁ শব্দও করেনি। লোকগুলো ধমক-চমক করে যাচ্ছিল হরেনবাবুকে, বাজে বাজে গালিগালাজ করছিল, তখনও ওরা সিঁটিয়ে এক ধারে বসে ছিল চুপ করে। কিন্তু একটা লোক দুম করে হরেনবাবুকে জোরসে থাপ্পড় মেরে বসল একটা।
অত জোরে মার খেয়েও মুখ দিয়ে আওয়াজ বার করেনি হরেনবাবু। হাত দিয়ে জায়গাটা চেপে ধরেছিল খালি। ওরা দেখতে পাচ্ছিল আঙুলের ফাঁক দিয়ে লাল রক্ত দেখা যাচ্ছে।
বুইয়ার ছোট্ট মাথায় কেমন ভয়ংকর রাগ হয়ে গেল ঐ দেখে। কেন? কেন এই বাজে লোকগুলো ওদের স্কুল কেড়ে নেবে, এমন বাজে কথা বলবে, হরেনবাবুকে মারবে, কেন এমন করে মারবে, কেন!
একটা খ্যাপা কুকুরের মতোই ও আগুপিছু না ভেবে চেঁচিয়ে উঠে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সামনের লোকটার গায়ে, প্রাণপণে আঁচড়ে দিচ্ছিল তার হাতে, তাকে ধরতে আসা আরেকজনের হাতেও দাঁত বসানোর মতো জোরে কামড়ে দিয়েছিল। ওর দেখাদেখি, টুনু বুলি জগারাও লাফিয়ে পড়েছিল, হাত পা চালাচ্ছিল যে যেমন পারে।
কিন্তু ছোটো ছোটো ক’টা বাচ্চা কি আর গুণ্ডাদের সঙ্গে পারে! কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওদের হাত পিছমোড়া করে ফেলল লোকগুলো।
“এটা শুরু করেছিল। বেশি সাহস। একে আগে দেখে নিই, বাকিগুলোর তারপর ব্যবস্থা হচ্ছে
যে লোকটা হরেনবাবুকে চড় মেরেছিল, সে নিজের কোমরের বেল্ট খুলে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। ভয়ে চোখ বুঁজে ফেলেছিল বুইয়া।
অমনি কেমন যেন বাজ পড়ার মতো একটা আওয়াজ হল ঘরের মধ্যে। বাল্বের আলোটা কেঁপে উঠল। বেল্টটা ওর গায়ে আছড়ে পড়ার আগেই একটা হাত সেটা খপ করে ধরে এক টানে সরিয়ে নিল।
চোখ খুলেই আঁতকে উঠে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার দশা হল বুইয়ার। হরেনবাবুর জায়গায় এটা কে দাঁড়িয়ে? এটা কী?
সবুজ রঙের বিশাল প্রাণীটার চারটে হাত, হাতগুলো শুঁড়ের মতো লম্বা আর কিলবিল করছে। ইয়া বড়ো গোল গোল দুটো চোখ... না... দুটো চোখ সামনে আর দুটো পিছনে।
ঐ মাস্তান লোকটা অসহায় পুতুলের মতো প্রাণীটার হাতে ঝুলছে। খোলা দরজা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল তাকে প্রাণীটা। তারপর শুঁড়, নাকি হাত নাড়াতে নাড়াতে অন্যদের দিকে ধেয়ে যেতেই সবাই পড়ি কি মরি ছুটে পালাল ঘর থেকে। এমনকি টুনু বুলি জগারাও।
শুধু বুইয়া দাঁড়িয়ে রইল। ওর ভয় করছিল না, কারণ ও খেয়াল করেছে, হরেনবাবু গলায় যে কার মতো জিনিস দিয়ে আঁটা একটা নীল পাথর পরত, সেটা এর গলাতেও আছে।
আলোটা ঢিমে হয়ে এসেছিল কেন কে জানে। বুইয়া দেখল, সবুজ রং আস্তে আস্তে মুছে গিয়ে, হাতগুলো চলে গিয়ে, চোখ ছোটো হয়ে হরেনবাবু আবার ওদের চেনা হরেনবাবু হয়ে গেল।
পায়ে পায়ে কাছে গিয়ে দাঁড়াল সে।
হরেনবাবু ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। মুখের হাসিটা ভারি ম্লান।
“আমি আর আসব না রে। চলে যেতে হবে আমায়। তবে তোদের স্কুলটা থাকবে মনে হয়, ওরা আর আসার সাহস পাবে না হয়তো। মেজোবাবুকে বলিস পড়া দেখে দিতে, দেবেন উনি
বুইয়ার গলায় শক্ত ডেলা পাকাচ্ছিল।
“চলে যাবে কেন? ওদের ভয়ে?”
“না রে। আমি... তোদের এখানকার নই তো! এখানে এসেছিলাম আমরা, ভালো লেগে গেছিল তাই থেকে গেছিলাম। ছুটি নিয়ে। শর্ত ছিল যে এখানের কেউ যেন আমার আসল পরিচয় জানতে না পারে। আমার ফিরে যাওয়ার সিগনালও ঐ, নিজের চেহারা ধরলেই, এই ট্রান্সমিটার খবর পাঠাবে, আর আমায় নিতে আমাদের শিপ এসে যাবে
“তুমি...কোথায় ফিরে যাবে?”
হরেনবাবু হাসল, “নামটা তোরা উচ্চারণ করতে পারবি না, তাই শুনে লাভ নেই। অনেকদূরের একটা অন্য সূর্যের গ্রহের লোক আমি। সেখানেই ফিরে যাব
এই সময়ে ওর বুকের পাথরটায় দপ করে আলো জ্বলে ওঠে আর বিপ বিপ করে আওয়াজ হতে শুরু করে।
“ঐ এসে গেছে ওরা। আমি যাই। তোকে একটু এগিয়ে দিচ্ছি, বাড়ি চলে যা। আসিস না কিন্তু ওদিকে, তোদের জন্য ওটা সেফ নয়
বটগাছ অবধি একসঙ্গে আসে ওরা
বুইয়ার খুব কান্না পাচ্ছিল। হরেনবাবু ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
“পড়বি কিন্তু! ছেড়ে দিবি না। নিজে নিজেই পড়বি তেমন হলে
বুইয়া মাথা হেলায়। কথা বলার অবস্থা ছিল না ওর।
“বুড়িমাসিটারই কষ্ট হবে খুব। অভ্যাস হয়ে গেছিল তো! কী আর করার!”
লোকটা, নাকি প্রাণীটা চলে গেল তারপর। তারও খানিক পর গুরগুর আওয়াজটা পেল কান খাড়া করে থাকা বুইয়া, ঝট করে আকাশে দাগ টেনে যাওয়া তারাটাকেও দেখতে পেল ও একাই।
চোখ মুছে বাড়ির দিকে পা বাড়াল ও।
স্কুল চলে যদি তো ভালো, না হলেও ও ভেবে নিয়েছে কী করবে।
বুড়িমাসির ওই ক’টা বাসন ও ঠিক রোজ মেজে দিতে পারবে। অমন চকচকে করেই।
না, মোটেই মিনিমাগনায় করবে না। বুড়িমাসি তো লেখাপড়া শিখেছিল, এখনও খবরের কাগজ চেয়ে নিয়ে পড়ে ও দেখেছে, আর অঙ্কই বা সব ভুলে গেছে নাকি? টাকা পয়সার হিসেব করছে না! ও বাসন মেজে দেবে, বুড়িমাসি ওকে পড়াবে, ওর লেখা দেখে দেবে তার বদলে।

মূর্ধন্য ষ-টা নিখুঁত লিখেই ছাড়বে ও এবার
_____