Showing posts with label অনুষ্টুপ শেঠ. Show all posts
Showing posts with label অনুষ্টুপ শেঠ. Show all posts

গল্পের ম্যাজিক:: বোঝাপড়া - অনুষ্টুপ শেঠ


বোঝাপড়া
অনুষ্টুপ শেঠ
 
ঘুমটা ভাঙতেই চোখে আলো লাগল রিয়ার। ভ্রূ কুঁচকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, যা ভেবেছে তাই। তার পড়ার টেবিলে কম ওয়াটের ল্যাম্পটা জ্বেলে মিলিপিসি ঘাড় গুঁজে পড়ছে। কত রাত কে জানে, এসির হাওয়ায় ঘর একদম হিম হয়ে আছে। নড়েচড়ে একটা বিরক্তির আওয়াজ করে মুখে। পিসি চমকে উঠে পিছন ফিরে তাকায়, “কী রে মনা? জল খাবি?”
রিয়া শুধু হুঁবলে। পিসি উঠে গিয়ে জলের গ্লাস এনে দেয়।
তেষ্টা পেয়েছিল বটে। আধ-গ্লাস জল খেয়ে বাকিটা ফিরিয়ে দেয় পিসিকে রিয়া। তারপর শুয়ে পড়তে পড়তে বলে, “আলোটা নিভিয়ে দাও না, ঘুমোতে পারছি না!
মিলিপিসি খুব কাঁচুমাচু গলায় বলে, “আর-একটু রে সোনা, এই চ্যাপটারটা শেষ করে নিই প্লিজ। এক্ষুনি নিভিয়ে দেব, তুমি ওপাশ ফিরে শোও একটুক্ষণ।
মাথা ঝাঁকিয়ে উলটোদিক ফিরে শোয় রিয়া। উফ্, এ যে কী জ্বালা হয়েছে না!
দিব্যি ছিল রিয়া, মানে সৌমনা গোস্বামী, ক্লাস সিক্স বি, রোল নাম্বার ইলেভেন, হিরাডেল ডে স্কুল। ওদের অরণ্যবিহার বিল্ডিং থেকে হলুদ বাসে উঠলে পনেরো মিনিটে স্কুল, লাইন করে প্রেয়ার, তারপর সারাদিন ধরে ক্লাস, খেলা, লাইব্রেরি, মিউজিক, কম্পিউটার ক্লাস — আরও কত কী সেরে আবার বাসে ফেরা। তারপর স্নান করে খেয়েদেয়ে নিলেই ছুটি! তখন ও নিজের মনে ছবি আঁকে, পুতুল খেলে কিংবা কাগজ কেটে নকশা করে নিজের ঘরে বসে বসে। ট্যাবে গেমও খেলে প্রচুর, বলা বাহুল্য।
রিয়ার বাবা বা মা কেউই খুব বিরাট চাকরি করেন না। তবুও মুম্বইয়ের এমন প্রাইম জায়গায় ভাড়া নেওয়া ফ্ল্যাটে যে রিয়ার নিজস্ব একটা ঘর আছে, সেটা কি কম কথা? না, সৌরভ বা নয়না কেউই তাঁদের মেয়ের জন্য কিছু করতে কখনও পিছপা হননি। অত ভালো স্কুলটায় পড়ানোও কি সহজ ছিল নাকি!
কিন্তু গত একমাস ধরে রিয়ার সেই সাধের একার রাজত্বে ব্যাগড়া পড়েছে।
মিলিপিসি বাবার কেমন যেন কাজিন হয়। বাবাদের অরিজিনাল যে বাড়ি, বর্ধমানে, সেই বাড়ির পাশের বাড়িতেই থাকে। একটা কী যেন চাকরির পরীক্ষার ফার্স্ট লেভেলে চান্স পেয়েছে, পরের লেভেলের পরীক্ষাটা এখানে, মানে মুম্বইতে। তাই তল্পিতল্পা নিয়ে এসে হাজির হয়েছে, এখানে থেকে, পড়াশুনো করে রেডি হয়ে পরীক্ষাটা দেবে।
রিয়ার বেডটা শুরু থেকেই ডাবল ছিল। আত্মীয়স্বজন এলে গেস্ট রুম হয়েই যেত। তাতে রিয়া অভ্যস্ত। কিন্তু এভাবে পুরো এক মাস ধরে কেউ সে বিছানার, সে ঘরের ভাগীদার হয়ে বসবে, এটা ওর কল্পনাতেও ছিল না।
আর মিলিপিসি এত বোরিং না! ভিতু ভিতু টাইপের। একে তো ওর সঙ্গে কিছু খেলতেই পারে না, কিছু এসব জানেই না তো খেলবে কী করে! রিয়া পোকেমন, ইউনিকর্ন বা পিজে মাস্ক নিয়ে কথা বলতে যায়, আর মিলিপিসি ড্যাবড্যাব করে খালি চেয়েই থাকে। বলে দিলেও মনে রাখতে পারে না কিচ্ছু! রিয়া বলেছিল বিকেলে খেলতে নামার সময়ে কাছের পার্কটায় বেড়িয়ে আসবে। ও বাবা, সেই যে দাদা বারণ করেছে তোমায় নিয়ে বড়ো রাস্তায় যেতে!বলে ঘাড় কাত করল, সে আর কিছুতেই সোজা করতে পারল না রিয়া। দেখতেই নরম-সরম। আসলে হেবি জিদ্দি আছে। তবে ওকে আইসক্রিম কিনে দেয়, চাইলেই। ওটুকুর জন্যই এখনো সহ্য করে যাচ্ছে রিয়া।
কিন্তু এই রাত জেগে পড়া, কী যে জ্বালাতন না এইটে! কত করে বারণ করে রিয়া, এমনকি ওর মাও কতবার বলেন, ‘এত রাত জাগিস কেন মিলি, দিনের বেলায় যতটা পারিস পড়ে নে না!পিসি শুনে খালি হাসে আর গোঁয়ারের মতো মাকে রান্নাঘরে বাসন মেজে দিতেই থাকে পড়তে না গিয়ে।
হুঁ, মাকে সত্যি খুব হেল্প করে পিসি। রান্নাঘরে যতক্ষণ মা থাকে, পিসিও ততক্ষণ। হাতে হাতে যা দরকার সব করে। আবার কনক-আন্টি কাজে না এলে ঘর ঝাড়ু-মোছাও নিজে থেকে করে দেয়। মা শুরুতে আপত্তি করত, ‘দিনের জন্য এসেছে মেয়েটা, এত কাজ করবে কেন?’ বলে। তা বাবা মাকে আড়ালে ডেকে বলেছিল, শুনে ফেলেছে রিয়া, ‘করছে করতে দাও। গাঁয়ের মেয়ে তো, ওদের খাটার অভ্যাস আছে। থাকছে, খাচ্ছে, নিজের মনে করে দুটো ঘরের কাজ না করতে দিলে ওরও প্রেস্টিজে লাগবে না
দূর! শোওয়ার নামই নেই, পিসি আবার ঘাড় ঝুঁকিয়ে বাহ্যজ্ঞানহীনের মতো বইখাতায় ডুবে গেছে দেখা যাচ্ছে।

স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগটা আলমারির পাশে ফেলেই বাইরের ঘরে এসে ধপাস করে বসে পড়ল রিয়া। আজ যা-তা হয়েছে ক্লাসে। কাউকে একটা বলার জন্য তর সইছিল না ওর। কিন্তু মায়ের ফিরতে এখনও আরও দু-ঘণ্টা দেরি।
মিলিপিসি আসার আগে অবধি এই সময়টা পাশের বাড়িতে যুক্তা-আন্টির ডে-কেয়ারে থাকত রিয়া। ভালো লাগত না, সত্যি বলতে কী। ছোটো ছোটো দুটো ঘরে একগাদা বিভিন্ন বয়সের বাচ্চা। ডিসিপ্লিনের এদিক ওদিক হলেই কড়া বকুনি। আর সেই এক হয় ইডলি, নয় উপমা দিয়ে টিফিন। আন্টি মনে হয় আর কিছু রান্না করতেই জানে না!
সেইদিক দিয়ে পিসি এসে বেশ মজা হয়েছে। এই যে ও জামা-টামা না ছেড়েই আয়েশ করে বসেছে, এখন প্রথমে এক গ্লাস লেবু-চিনির জল আসবে। তারপর জামা ছেড়ে স্নান করে ফ্রেশ হয়ে আসার পর ওর বাহারি স্টিলের প্লেটটা করে কিছু খাবার রোজ আলাদা আলাদা, ফুলকো লুচি-বেগুনভাজা, চিঁড়ের পোলাও, ডিমের পোচ, আম-কলা দিয়ে কর্নফ্লেক্সআরে, মিলিপিসি আসার আগে, টাটকা গরম রুটি আর আলু-পেঁয়াজ ভাজার মতো পাতি জিনিসও যে এত টেস্টি হয় খেতে, ও জানতই না।
নাহ্‌, ভেবে দেখল, মাকে ঘটনাটা না বলাই ভালো। রাগ করবে মনে হয় শুনলে। কিন্তু পিসিকে বলা যেতে পারে, পিসি অত খ্যাঁচম্যাচ করে না। তাই মিলিপিসি থালাটা নিয়ে আসতেই বড়ো এক চামচ চাউমিন মুখে পাঠিয়ে, এটা অবশ্য পিসি জুত করতে পারে না, কেমন যেন লেটকে যায় সব — বলতে শুরু করে দিল রিয়া।
আজ যা কান্ড হয়েছে না ক্লাসে! অঙ্কন একটা গেম নিয়ে এসেছিল বুঝলে, ব্যাগের মধ্যে। রিসেসে আমাদের বার করে দেখাচ্ছেরিসেসে ম্যামরা চলে যায় জানো তো। আমরা নিজেদের টিফিন খাই আর খেলা করি।
কীসের গেম রে? লুডোর মতো?”
উফ্‌, পিসিটা না! রিয়া একটু ঝাঁঝিয়েই ওঠে, “আরে ধ্যাত! লুডোকে আবার গেম বলে নাকি! ভিডিও গেম। ওই আমি যেমন ট্যাবে খেলি না, সেরকম। আলাদা ডিভাইস হয়, আনা যায়।
আচ্ছা আচ্ছা! এই! চাদরে খাবার ফেলিস না, এই নে কাগজটা তলায় রেখে খা।
সে সবে পাত্তা না দিয়ে রিয়া উৎসাহের সঙ্গে বলে চলে, “তো দেখছি সবাই হাতে নিয়ে নিয়ে, দিশা কী একটা বাটন টিপে ফেলেছে আর সাইলেন্ট মোড অফ হয়ে গিয়ে মিউজিক বাজতে শুরু হয়ে গেছে! অঙ্কন তক্ষুনি কেড়ে নিয়ে সেটা আবার অফ করেছিল, কিন্তু…”
খারাপ হয়ে গেল না তো?” পিসির চোখ গোল হয়ে গেছে। এত বুদ্ধু না!
না না। কিন্তু সরিতা-ম্যাম ঠিক তখন বাইরের করিডরে ছিল সে তো আমরা জানি না! শুনে ফেলেছে, আর সোজা ক্লাসে এসে চার্জ — কে কী নিয়ে এসেছ বার করো, কীসের মিউজিক শুনলাম!
পিসি ভেবুল হয়ে চেয়ে আছে দেখে দয়াপরবশ হয়ে রিয়া বুঝিয়ে দেয়, “স্কুলে আমাদের ইলেকট্রনিক ডিভাইস কিছু আনা বারণ তো! ধরা পড়লে নিয়ে নেয়, গার্জেন কল হয়।
এ বাবা! তাহলে ওই অঙ্কন না কে বললি, এনেছিল কেন? অন্যায় করেছে তো! ওর গার্জেন কল হল তাহলে?”
রিয়া হই হই করে হেসে ওঠে।
তাহলে আর বলছি কী? ধরতে পারলে তো গার্জেন কল হবে! আমরা কী অত বোকা! কেউ কিছু বলল না দেখে ম্যাম এক এক করে সবার হাত আর ব্যাগ চেক করতে লাগল। আর অঙ্কন করল কী, টুক করে ওটা রাবিন্দরের ব্যাগে ফেলে দিয়ে নিজের ব্যাগ দেখাল, তারপর ম্যাম যখন কীর্তির ব্যাগ চেক করছেন তখন রাবিন্দর ওটা উমার ব্যাগে দিয়ে দিল, উমা আমার, আমি আবার অঙ্কনের ব্যাগে হাত পিছন করে লুকিয়ে লুকিয়ে। ব্যস! ম্যাম কিছুই পেল না, চলে গেল!
সে কী!বলে পিসি একদম চুপ হয়ে গেল কেমন যেন।
সাধে কী বলে, পিসিটা হেব্বি বোরিং!
কিন্তু তাই বলে রিয়া এটাও ভাবতে পারেনি যে পিসি ব্যাপারটা বাবা-মাকে বলে দেবে এমন করে।
দাদা, আমার তো খুব খারাপ লাগল শুনে, এইটুকু-টুকু বাচ্চারা টিচারকে বোকা বানানো নিয়ে গর্ব করছে, এ তো ঠিক হচ্ছে না গো! তোমরা একটু ভাবো স্কুলটা নিয়ে।
বেশ, কাজটা হয়তো ঠিক হয়নি ওদের, বাবা-মার রাগ করার মতোই হয়েছিল। কিন্তু পিসির মুখ থেকে শুনল বলেই হয়তো বাবা আর মা দুজনেই এত বেশি রেগে গেল। বাবা ওর ট্যাবটা নিয়ে নিজের আলমারিতে বন্ধ করে দিল, নেক্সট সাত দিনের জন্য বন্ধ। তার চেয়েও খারাপ, মা স্কুলে ফোন করে ঘটনাটা জানিয়ে দিল। শুধুই অঙ্কন নয়, ওদের সবারই গার্জেন কল হয়ে গেল তার ফলে।
রিয়াও বুঝে নিল, ভালোমানুষ মুখ করে থাকা, বোকা বোকা কথা বলা পিসিটা আসলে ওর শত্রু। নির্ঘাত ওকে হিংসে করে, তাই ওর নামে লাগিয়ে বাবা-মার কাছে প্রিয় হচ্ছে।
এই যে একবার বুঝে গেল, তারপর থেকে আর কিছুই মুখে রুচতে চায় না ওর। বিকেলের মুচমুচে চিঁড়ে ভাজা না, নরম ফ্রেঞ্চ টোস্ট না, এমনকি পাশের সর্দারজির দোকান থেকে এনে দেওয়া ক্যাডবেরিও না। হাজার চেষ্টা করেও মিলিপিসি ওর সঙ্গে আর কথা বলার মতো জায়গায় আসতে পারল না, কোনোরকমে হুঁ-হাঁ করে কাটিয়ে দেয় রিয়া আজকাল। আর দিন গোনে, কতদিন বাদে এ যাবে, ফাইনালি।
অবশেষে পিসির পরীক্ষার সময়ও এসে গেল।
রাগে গা জ্বলে যেতে লাগল রিয়ার দেখে দেখে, বাবা অরেঞ্জ আর হরলিক্স নিয়ে আসছে আলাদা করে পিসির জন্য। মা রান্নাঘরের কাজ করতে দিচ্ছে না। যেন আর কেউ পরীক্ষা দেয় না!
ওর জন্যও মা-বাবা এমন করে? সেটা তো করবেই। ও ওদের মেয়ে, তাও ছোটো বাচ্চা। একজন বুড়ো ধাড়ির জন্য এত আদিখ্যেতা কীসের বাপু! কিন্তু একটা বোঝাপড়া করে নেওয়ার ইচ্ছে হলেও ও আর কী করবে!
এই শব্দগুলোও ও পিসির কথা শুনে শুনে শিখেছে। গাঁইয়াতো, এভাবেই কথা বলে।
রিয়া এক-একবার ভাবে, পিসির বইখাতা বা অ্যাডমিট কার্ডটা হাপিশ করে দেয়। বেশ হবে, পরদিন যখন যেতে গিয়ে খুঁজে না পাবে, কেমন জব্দ! কিন্তু তারপরেই মনে হয়, তাহলে তো পরীক্ষা শেষ হবে না, কে জানে ভাই, তাহলে হয়তো আরও এক মাস এখানে ঠাঁই গেড়ে বসে থাকবে!
দূর দূর! না, তার চেয়ে যা হোক করে আর কটা দিন কেটে গেলেই শান্তি!
কিন্তু শেষরক্ষা করতে পারল না রিয়া।
পরদিন কীসের পরীক্ষা ছিল মনে নেই ওর, তবে পিসি যে সাবজেক্টটা খুব ভয় পায় সেটা বোঝা যাচ্ছিল। সন্ধেবেলা বাবা ওর সঙ্গে রোজের মতো না খেলে পিসিকে কী সব বোঝাতে বসল।
একা একা ট্যাবে বাবল শুট করতে করতে আড়চোখে রিয়া দেখল, মা শাড়ি ইস্ত্রি করে হ্যাঙারে ঝুলিয়ে রাখল। হ্যাঁ, পিসিটা হেব্বি ব্যাকডেটেড, কিছুতেই শাড়ি ছাড়া আর কিছু পরতে চায় না। লোকাল ট্রেনে ওই নিয়ে যেতে হলে টের পেত নেহাত মা অফিস যাবার পথে নামিয়ে দিয়ে যায়, আর একা অটোয় চাপতে ভয় পায় বলে ফেরাটা নাকি হেঁটেই চলে আসে। পঁচিশ মিনিট হাঁটে, বাপ রে বাপ!
কিন্তু এসব মা-বাবার আদিখ্যেতা ছাড়া কিছুই নয়।
এই জমা রাগটা একদম আচমকা ফেটে বেরোল সেদিন রাত্রে। যথারীতি রিয়া খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। মাঝরাতে ঘুমটা ভেঙে গেল। পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়লেই ল্যাটা চুকে যেত। কিন্তু কী যেন একটা ওকে জাগিয়ে রাখল।
ওর ঘরের দরজা ঠেলে খুব নিঃসাড়ে মা ঢুকল, হাতে একটা বড়ো বাহারি কাপ। কাপটায় প্রচুর লাভ সাইনের মধ্যে একটা টুইটি আঁকা। ও নিজে পছন্দ করে, বায়না করে কিনেছিল নিজের জন্য যে বার শ্রেয়ার বার্থডে গিফট কিনতে ওই ম্যলটায় যাওয়া হয়েছিল। মা পিসির জন্য হরলিক্স বানিয়ে নিয়ে এসেছে, ওই কাপে করে!
গা কিষকিষ করছিল রিয়ার। ও যে চেয়ে আছে সেটা ওরা টের পায়নি।
কাপ টেবিলে রাখল মা। ধোঁয়া উঠছে।
তোমরা এত করছ আমার জন্য বৌদি...
পিসি চোখের জল মুছছে। কী যেন বলে উমা? বাহানা! আচ্ছে বননা!
মা পিসির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নিচু গলায় কী যেন বলল। ওর নিজের একজামের সময় মা ওকে হরলিক্স করে দিয়েছে এমন রাত্রে?
রিয়া ভুলে গেল, ও রাত জেগে পড়েওনি তো কখনও! তেমন বয়স হয়েছে নাকি ওদের! ভুলে গেল, মা একজামের দিন ওকে নিজে পৌঁছে দিয়ে তবে অফিস যায়, লেট মার্ক হবে জেনেও। ভুলে গেল, পিসি আসার আগে মা ঠিক এইভাবেই ওর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বুঝিয়েছিল, ‘গরিব মানুষ, বাবা অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে, আর কেউ নেই ওদের, চাকরিটা ওর খুব দরকার বাবু। পেয়ে গেলে বেঁচে যাবে পরিবারটা। কটা দিন তুই একটু অ্যাডজাস্ট করে নিস মা, মানুষের বিপদে-আপদে পাশে থাকতে হয়।
সব ভুলে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল রিয়া, “আমার কাপ কেন দিয়েছ মা? ওটা আমার কাপ! কেন দিয়েছ?”
দুজনেই আঁতকে উঠে ঘুরে তাকাল। পিসি একটা চুমুক দিয়েছিল কাপে, তড়িঘড়ি হাত থেকে নামিয়ে রাখল সেটা।
মা হতভম্ব হয়ে গেছে, “কী হল রিয়া? এমন করছ কেন? পিসি একটু খাচ্ছে, নিয়ে নিচ্ছে না তো! খেলই-বা?”
না, খাবে না। আমার কাপে খাবে, আমার ঘরে জিনিস নিয়ে থাকবে, রাত অবধি আমার ঘুম নষ্ট করে আলো জ্বেলে জ্বেলে পড়বে! কী, ভেবেছ কী তোমরা? এবার আমায় তাড়িয়ে দিয়ে পিসিকেই নিয়ে থাকো তাহলে!
নিজের গলাটা নিজেও চিনতে পারছিল না রিয়া। এত রাগ!
মায়ের মুখ পুরো ফ্যাকাশে হয়ে গেছিল। পিসি ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল, “তুমি রাগ কোরো না রিয়া, আমি তোমার কাপে খাব না আর একদম, বড্ড ভুল হয়ে গেছে।
কাপটা নিয়ে পিসি ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, মা কেমন কাতর গলায় ডাকল, “মিলি!
পিসি ঘুরে তাকাল, ফ্যাকাশে হাসল একটু, “ফেলে দেব না বৌদি। তোমাদের কষ্টে আনা, তুমি নিজে হাতে বানিয়ে দিলে, তায় খাবার জিনিস! আমি গ্লাসে ঢেলে নিয়ে ওর কাপ ধুয়ে রাখছি। তুমি যাও, শুয়ে পড়ো।একটু থেমে আবার বলল, “রিয়াকে বোকো না গো। সত্যিই তো, ছোটো বাচ্চা, ওর বড্ড কষ্ট হচ্ছে
পিসির চোখ ছলছল করছে।
মা চোখ মুছে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রিয়ার দিকে আর তাকালও না। কী ভীষণ তেতো মুখে ঘুমিয়ে পড়ল রিয়া।
পরদিনের একজাম পিসির মনে হয় ভালো হয়নি বাবাকে বলছিল, বেশ কিছু ভুল হয়ে গেছে। বাবা শুনে বেশ চিন্তায় পড়ল বার বার করে বলল পরদিন যে লাস্ট পেপারটা আছে সেটা যেন খুব মন দিয়ে দেয়। পিসি শাড়ির আঁচল হাতে জড়াতে জড়াতে আস্তে করে বলল, “দাদা, বলছি কী, রাত্রে পুরোটা রিভাইজ দেব একবার ভাবছি। আজ বাইরের ঘরে বইখাতা নিয়ে বসি, জানো। এমনিও ঘুম হবে না, নেহাত পেলে ওই মাদুরটা বিছিয়ে শুয়ে নেব একটু।
বাবা কালকের ঘটনা সবটাই শুনেছিল মায়ের কাছে। খুব ঠান্ডা গলায়, “সেটার কোনো দরকার নেই, যেমন রিয়ার ঘরে টেবিলে বসে পড়িস তাই পড়বিবলে এক ধমক দিয়ে উঠে গেল।
মা-বাবা-পিসি কেউই সে ভাবে আর কথা বলল না সারা সন্ধ্যা। কোথায় যেন একটা পাঁচিল উঠে গেছে ওদের সবার মধ্যে।
সে রাত্রেও রিয়ার ঘুম ভাঙল মোটামুটি ওই সময়েই। একটুক্ষণ চুপ করে দেখল। তারপর নিঃশব্দে, কাউকে কিছু টের পেতে না দিয়ে উঠে গেল ঘরের বাইরে।
পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে মিলি মাথাটা নামিয়ে ছিল বইয়ের উপর। গাল বেয়ে গরম জলের ছোঁয়া লাগছিল ওর হাতে। মনটা এত বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে, কালকের পরীক্ষাটাও খারাপ হবে ও এখন থেকেই বুঝতে পারছিল। চেষ্টা করেও রিয়ার কালকের কথাগুলো মন থেকে যাচ্ছিল না ওর। উপায় থাকলে কি আর এভাবে অন্যের বাড়িতে, অন্যের উপর এত অসুবিধা করত ও!
ঠক করে একটা আওয়াজ হল। মাথায় একটা হাত এসে পড়ল তারপর।
বৌদি? আবার?
না, রিয়া।
খেয়ে নাও পিসি। অ-নে-ক মিষ্টি দিয়েছি।
সামনে, টেবিলে সেই টুইটি কাপে এক কাপ হরলিক্স রাখা।
রিয়ার দিকে বেকুব হয়ে চেয়ে থাকে মিলি। রিয়া কুঁকড়ে যায় একটু।
আমি যেমন পারি বানিয়েছি, ওক্কে? মাইক্রোওয়েভ চালাতে জানি তো এখন! কতটা দেয় জানি না তাই আন্দাজে... খাবে তো?”
দু-হাত বাড়িয়ে রিয়াকে বুকে আঁকড়ে নেয় মিলি। এখানে আসার পর এই প্রথম, নিঃসঙ্কোচে। জাপটে ধরে রিয়ার গায়ের পুতুল পুতুল গন্ধটা বুক ভরে টেনে নিতে নিতে বলে, “তুই বানিয়ে দিয়েছিস, আমি খাব না? কী যে বলিস! ও তো পৃথিবীর সেরা হরলিক্স হয়েছে রে!
আরও খানিকটা আদর খেয়ে, পিসিকে কালকের একজামের জন্য বেস্ট অফ লাক বলে ঘুমিয়ে পড়ে রিয়া।
ঠান্ডা হয়ে আসা, কিটকিটে মিষ্টি, নিচে পুরোটা না গোলা হরলিক্সের ডেলা লেগে থাকা কাপটা দু-হাতে পরম মমতায় আঁকড়ে ধরে আয়েশের একটা চুমুক দেয় মিলি। ও নিশ্চিত, কালকের পরীক্ষাটা ওর ফাটাফাটি হবে। হবেই!
_____
ছবিঃ সুকান্ত মণ্ডল

গল্পের ম্যাজিক:: হরেনবাবু - অনুষ্টুপ শেঠ


হরেনবাবু
অনুষ্টুপ শেঠ

বুইয়া খুব ভালো করে জানে ওদের নতুন বন্ধুটা এখানকার কেউ নয় এখানের কোনও মানুষ অমন সুভদ্র, সুশীল, কথায় কথায় প্লিজ আর থ্যাংকু বলা, খালি দোকানে খোলা বয়াম পেলেও লজেন তুলে না নিয়ে চলে আসা, কুকুরকে বিস্কুট দিতে হলে পিঠের ব্যাগ থেকে কাগজের প্লেট বার করে তাতে দেওয়া স্বভাবের নয় এসব অদ্ভুত অভ্যাস দেখলে ওরা হাসে - ও, বুলি, টুলি, ঝনু, মিন্টু, টুনটুনিদি, বলাইদারা সবাই বন্ধুটাও হাসে, রাগ করে না কে জানে কোন সাহেবদের দেশ থেকে এসেছে, দেখতে যদিও একদম পাতি বাঙালির মতো
ঝনুর বাবা কাগজ-টাগজ পড়তে পারেন কোথায় যেন মাল বইবার কাজ করেন তিনি, কিন্তু সেটা যেহেতু বইপত্রেরই দোকান তাই বই নাড়াচাড়া করার অভ্যাস হয়ে গেছে ঝনুর কাছে নতুন বন্ধুর কথা শুনে তিনি বলেছেন এ নিশ্চয় জাপানে বড়ো হয়েছে সেই বা কোথায় কে জানে, অনেক দূরে অক্টোপাস-টাস খায় নাকি তারা, ইশ!
নতুন বন্ধু, লোকটা নাম বলে না এ এক জ্বালা, কাঁহাতক আর বন্ধু বন্ধু বলা যায়! অতএব টুনটুনিদি ওর নাম রেখেছেহরেনবাবু নামটা মানানসই হয়েছে, কারণ প্রতিদিন সন্ধেবেলা বাইক নিয়ে নিঃশব্দে পাড়ায় ঢুকে, বটগাছের ছায়াটায় বাইকটা পার্ক করে লোকটাহরেন’ বাজায় একটা ভারি সুন্দর সুরেলা হর্ন একটা, যেন মিষ্টি একটা পাখি ডেকে উঠল ওরা সবাই সময়মতো পরিষ্কার হয়ে জামা-টামা পরে চুল আঁচড়ে ওই ডাকটার অপেক্ষায় থাকে, আর শুনতে পেলেই যে যার বই খাতা পেন্সিল সব নিয়ে পিলপিল করে বটগাছের পাশের সেনবাড়ির মাঠে এসে জড়ো হয় অমনি নেমে এসে নিচের একটেরে ঘরটা খুলে দেন সেনদের মেজোবাবু অবস্থা ভালো ছিল যখন তখন এটা দারোয়ানের ঘর ছিল একটা জোরালো আলো আছে মেজোবাবুর মনটা ভালো, এককথায় বস্তির বাচ্চাগুলোকে বাড়ির জায়গায় পড়তে দিয়েছেন, কম কথা! যদিও দুষ্টু লোকে আড়ালে বলে, ব্যবস্থাটা মিনিমাগনায় নয়
হরেনবাবুকে জিজ্ঞাসা করলে অবশ্য সে কথার জবাব পাওয়া যায় না বেশি উত্যক্ত করলে মিঠে ধমক আসে, “তোদের অত কথায় দরকার কী? পড়তে পাচ্ছিস, যথেষ্ট নয়? একটা অঙ্কের টেস্ট নিই আজ, কী বল?”
অমনি না নাকরে ওরা মুখ নামিয়ে যে যার খাতায় আঁকড়ি বুঁকড়ি করে নামতা কি চিঠি কি রচনা লিখতে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ে
পড়া শেষ হবার পর, ওরা গান গায়। রবি ঠাকুরের গান। কী যে সুন্দর, কী যে সুন্দর কথাগুলো। হরেনবাবুই শিখিয়েছে, নইলে আর শিখবে কোথা থেকে!
ওদের বাড়ি পাঠিয়ে, ব্যাগ পিঠে ফেলে হরেনবাবু কিন্তু ফিরে যায় না। ওদিকের গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যায়। কোথায় যায় ওরা কেউ জানে না, ওদের তখন ঘরে ফেরার তাড়া থাকে, বাড়ি গিয়ে খাতা বই নামিয়েই ছুটে তারককাকার বাড়ি টিভি দেখতে যাওয়ার, কিংবা মায়ের হাতে হাতে ঘরের কাজ সারার তাড়া থাকে এটুকুই তো সারাদিনে নিজেদের সময়, নইলে সারাদিন কারও চায়ের দোকানে কাজ, কারও মায়ের সঙ্গে ঠিকেবাড়িতে, টুনটুনি দিদি তো নিজেই ফ্ল্যাটবাড়ির একটা বাচ্চাকে দেখে।
খালি বুইয়া জানে, হরেনবাবু কোথায় যায়।
সে ভারি অদ্ভুতভাবে জেনেছিল। সেই বুধবার বুইয়ার মা কাজে যায়নি, তাই ঘরের কাজের তাড়া ছিল না। পড়া শেষ হতে, ও বেরিয়ে বটগাছের নিচের ধাপিটায় বসে বসে পা দোলাচ্ছিল, আর ভাবছিল পঞ্চার মতো বাজে দুষ্টূ ছেলেটাকে অবধি হরেনবাবু কথায় বশ করে ক্লাসে নিয়ে এল, দিব্যি নামতা-টামতা বলতে পারছে আজকাল, আর বুইয়া এত চেষ্টা করেও কিছুতেই মূর্ধন্য ষ টা ঠিক মতো লিখতে পারছে না কেন! এমন সময়ে হরেনবাবু জিনিসপত্র তুলে গেট বন্ধ করে বেরোল।
অমনি বুইয়ার মনে হল, দেখি তো কই যায়!
যেমন ভাবা, তুরতুর করে হরেনবাবুর পিছু পিছু গলিতে ঢুকে পড়ল সে।
গলিটা কোথায় যায় সবাই জানে। এদিক দিয়ে এসে বাজারের সামনে বেরিয়েছে, বাজার যাওয়ার শর্টকাট এটা। কিন্তু বাজারে গিয়েই বা হরেনবাবু প্রতিদিন কী করে, এটা জানার ইচ্ছে হচ্ছিল ওর। তবে বেশিক্ষণ পিছু পিছু যাওয়া গেল না।
“এই, বাড়িতে বলে এসেছিস? জানিস তো আমার মাথার পিছনেও চোখ আছে?”
ধরা পড়ে গেলে গুটি গুটি পাশেই চলে আসতে হয়। লাজুক হেসে জিজ্ঞাসাও করতে হয়, “কোথায় যাও গো তুমি?”
“চল, যাচ্ছিস তো! নিজেই দেখবি
গলিটা যেখানে পড়েছে তার ফুট দশেক দূরে বাজারের গলি শুরু। এখানটা ভরে থাকে ঝাঁকায় মিষ্টি পেয়ারা, চুপড়িতে শাক নিয়ে বসা গরিব লোকেতে। তার পিছনে হেলে পড়া, মলিন, শ্রীহীন চায়ের দোকান চালায় এক থুড়থুড়ি বুড়ি। সবাই তাকে বুড়িমাসি বলেই ডাকে। কত বয়স কে জানে! বুইয়ার বাবা বলেন তাদের ছোটোবেলাতেও নাকি ছিল বুড়িমাসির দোকান বুড়িমাসি তখনও বুড়িই ছিল, তবে এতটা নয় হেলাফেলার মনিষ্যি নয়, রীতিমতো লেখাপড়া জানা বাড়ির মেয়ে ছিল সে। কিসে কী হয়েছিল কে জানে, এখন তিন কুলে আর কেউ নেই বুড়ির, ঐ দোকানেই বাস, ঐ দোকান থেকেই যা আয়।
হরেনবাবু দিব্যি সেই ঝুপসি দোকানে ঢুকে গেল। পিছু পিছু বুইয়াও।
“অ মনা, এয়েচ? চা খাবে? এটি কে গো?”
বুড়িমাসি একগাল হেসে বলে।
ব্যাগটা বুড়িমাসির পাশের কোনাটায় নামিয়ে দিয়ে হরেনবাবু বলে, “দাঁড়াও মাসি, আগে কাজ সেরে নিই! এ বুইয়া, আমার কাছে পড়ে। ওকে চা বিস্কুট দাও একটু
তারপর - “তুই বোস, খা। আমি আসছি” - বলে পট করে পিছনের দরজা দিয়ে কোথায় জানি চলে যায়।
বুইয়া বসে বসে মশা তাড়ায় বুড়িমাসি একটা স্টিলের ছোটো গ্লাসে ওকে খুব গরম, ধোঁয়া ওঠা চা আর একটা প্লেটে দুটো লেড়ো বিস্কুট দেয় মাথায় হাতও বুলিয়ে দেয় একবার, কী শিরা বেরোনো হাতগুলো!
আস্তে আস্তে তারিয়ে তারিয়ে পুরোটা খায় বুইয়া। হরেনবাবু গেছে তো গেছেই।
“একটু ভিতরে নামিয়ে আয় না মা!”
অন্য খদ্দের এসে গেছে। বুড়িমাসি ব্যস্ত। বুইয়া প্লেট গ্লাস তুলে নিয়ে যেতে গিয়ে দেখে আরও খালি কাপ প্লেট পড়ে আছে পাশের টেবিলে। সেগুলোও নিয়ে নেয়। বুড়িমাসি ফোকলা দাঁতে হাসে দেখে।
দরজা পেরিয়ে একটা বাজেমতো খালি জায়গা। তার পাশে একটা কলতলা। কল দিয়ে জল পড়ছে, আর সেখানে উবু হয়ে বসে হেব্বি স্পীডে বাসন মাজছে একটা লোক। তার একপাশে এক ডাঁই গ্লাস কাপ প্লেট পরিষ্কার ধোয়ামাজা, অন্য পাশে এখনও ধুতে বাকি ঘুগনি মাখা থালা, পোড়া চাটু, সসপ্যান।
হরেনবাবু।
বুইয়া আস্তে করে হাতেরগুলো নামিয়ে রাখে। মুখে কথা সরছিল না তার। তাদের পড়ায় সে অবধি না হয় ঠিক ছিল, তাই বলে এমন একটা ঝকঝকে জামাকাপড় পরা লোক এরকম এঁদো জায়গায় বসে বাসন মাজবে!
হরেনবাবু মুখ তুলে হাসে, “খেয়েছিস? হয়ে গেছে দাঁড়া, বুড়ো মানুষ তো বুঝলি, পারে না আর। তাই সব জমিয়ে রাখতে বলি রোজের, আমার তো একটুখানি ব্যাপার এটা!”
বুইয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেই ফেলে, “তোমার ভালো লাগে?”
হরেনবাবু কাজ থামিয়ে হাঁ করে তাকায়, “কী বলিস? তোদের এখানকার এটাই তো সেরা কাজ, যা দেখলাম!”
বুইয়ার মুখে কথা সরে না। বাসন মাজা তো ওর সবচেয়ে অপছন্দের কাজ গো!
“কী মজার না? দ্যাখ, এই ঘষলাম, এই...এই...দেখলি? কেমন সমান ভাবে চকচক করে উঠছে?”
ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাটিটা দেখায় হরেনবাবু।
ছিট আছে মাথায় নির্ঘাৎ!
দ্যাখ না দ্যাখ বাকিগুলোও মেজে ফেলে, হাত ধুয়ে উঠে দাঁড়ায় হরেনবাবু, বুড়িমাসির কাছে বসে চা খায়, হাসিমুখে অনেক গল্প করে। তারপর ফেরার পথ ধরে। বুইয়া ভারি আশ্চর্য হয়ে বাড়ি ফেরে।
“তুমি টাকা পাও? বাসন মেজে?”
হো হো করে হেসেছিল হরেনবাবু।
“দূর পাগলি! অত গরিব মানুষ, ও টাকা দিলেও আমি নিতাম নাকি! আমি তো মজা পাই, তাই করি
এ কক্ষনো এখানকার লোক নয়। ঐ জাপান-টাপানই হবে।
মুশকিলটা হল তার পরের মাসেই। পড়ানো সবে শুরু করেছে হরেনবাবু, মেজোবাবু এসে দাঁড়ালেন।
“ইয়ে, শোনো না, কথা আছে একটু
কী কথা হল ওরা জানে না। কিন্তু হরেনবাবু ফিরে এল ভুরুতে বিশাল ভাঁজ নিয়ে। অন্যমনস্কও হল বার বার পড়াতে গিয়ে। ওদের প্রশ্নের জবাবে খালি “কিছু না” বলে গেল।
যদিও, ওদের জানতে বাকি রইল না পরদিনই।
প্রোমোটরের নজর পড়েছে ঐ বাড়িতে। মেজোবাবু না করে দিয়েছেন নাকি, নাকি বলেছেন বাচ্চাগুলো শিখছে পড়ছে, ও জায়গা কেড়ে নেওয়া যাবে না, তাই তার পোষা মাস্তানরা হুমকি দিয়ে গেছে এসে।
বস্তির বাচ্চা ওরা। এসব মাস্তান-টাস্তান শুনে ঘাবড়ায় না। তবে সতর্ক হওয়া দরকার, এটা বুঝে ফেলে। অনেকে আসা বন্ধও করে, তাদের বাবা বা মা প্রোমোটরের বিষ নজরে পড়তে চায় না বলে।
তার তিনদিন পরে লোকগুলো এল। ক্লাস শেষের মুখে।
কমজনই ছিল ওরা। চার-চারটে হুমদো লোকের সামনে কিছুই করতে পারবে না বুঝেই কেউ টুঁ শব্দও করেনি। লোকগুলো ধমক-চমক করে যাচ্ছিল হরেনবাবুকে, বাজে বাজে গালিগালাজ করছিল, তখনও ওরা সিঁটিয়ে এক ধারে বসে ছিল চুপ করে। কিন্তু একটা লোক দুম করে হরেনবাবুকে জোরসে থাপ্পড় মেরে বসল একটা।
অত জোরে মার খেয়েও মুখ দিয়ে আওয়াজ বার করেনি হরেনবাবু। হাত দিয়ে জায়গাটা চেপে ধরেছিল খালি। ওরা দেখতে পাচ্ছিল আঙুলের ফাঁক দিয়ে লাল রক্ত দেখা যাচ্ছে।
বুইয়ার ছোট্ট মাথায় কেমন ভয়ংকর রাগ হয়ে গেল ঐ দেখে। কেন? কেন এই বাজে লোকগুলো ওদের স্কুল কেড়ে নেবে, এমন বাজে কথা বলবে, হরেনবাবুকে মারবে, কেন এমন করে মারবে, কেন!
একটা খ্যাপা কুকুরের মতোই ও আগুপিছু না ভেবে চেঁচিয়ে উঠে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সামনের লোকটার গায়ে, প্রাণপণে আঁচড়ে দিচ্ছিল তার হাতে, তাকে ধরতে আসা আরেকজনের হাতেও দাঁত বসানোর মতো জোরে কামড়ে দিয়েছিল। ওর দেখাদেখি, টুনু বুলি জগারাও লাফিয়ে পড়েছিল, হাত পা চালাচ্ছিল যে যেমন পারে।
কিন্তু ছোটো ছোটো ক’টা বাচ্চা কি আর গুণ্ডাদের সঙ্গে পারে! কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওদের হাত পিছমোড়া করে ফেলল লোকগুলো।
“এটা শুরু করেছিল। বেশি সাহস। একে আগে দেখে নিই, বাকিগুলোর তারপর ব্যবস্থা হচ্ছে
যে লোকটা হরেনবাবুকে চড় মেরেছিল, সে নিজের কোমরের বেল্ট খুলে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। ভয়ে চোখ বুঁজে ফেলেছিল বুইয়া।
অমনি কেমন যেন বাজ পড়ার মতো একটা আওয়াজ হল ঘরের মধ্যে। বাল্বের আলোটা কেঁপে উঠল। বেল্টটা ওর গায়ে আছড়ে পড়ার আগেই একটা হাত সেটা খপ করে ধরে এক টানে সরিয়ে নিল।
চোখ খুলেই আঁতকে উঠে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার দশা হল বুইয়ার। হরেনবাবুর জায়গায় এটা কে দাঁড়িয়ে? এটা কী?
সবুজ রঙের বিশাল প্রাণীটার চারটে হাত, হাতগুলো শুঁড়ের মতো লম্বা আর কিলবিল করছে। ইয়া বড়ো গোল গোল দুটো চোখ... না... দুটো চোখ সামনে আর দুটো পিছনে।
ঐ মাস্তান লোকটা অসহায় পুতুলের মতো প্রাণীটার হাতে ঝুলছে। খোলা দরজা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল তাকে প্রাণীটা। তারপর শুঁড়, নাকি হাত নাড়াতে নাড়াতে অন্যদের দিকে ধেয়ে যেতেই সবাই পড়ি কি মরি ছুটে পালাল ঘর থেকে। এমনকি টুনু বুলি জগারাও।
শুধু বুইয়া দাঁড়িয়ে রইল। ওর ভয় করছিল না, কারণ ও খেয়াল করেছে, হরেনবাবু গলায় যে কার মতো জিনিস দিয়ে আঁটা একটা নীল পাথর পরত, সেটা এর গলাতেও আছে।
আলোটা ঢিমে হয়ে এসেছিল কেন কে জানে। বুইয়া দেখল, সবুজ রং আস্তে আস্তে মুছে গিয়ে, হাতগুলো চলে গিয়ে, চোখ ছোটো হয়ে হরেনবাবু আবার ওদের চেনা হরেনবাবু হয়ে গেল।
পায়ে পায়ে কাছে গিয়ে দাঁড়াল সে।
হরেনবাবু ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। মুখের হাসিটা ভারি ম্লান।
“আমি আর আসব না রে। চলে যেতে হবে আমায়। তবে তোদের স্কুলটা থাকবে মনে হয়, ওরা আর আসার সাহস পাবে না হয়তো। মেজোবাবুকে বলিস পড়া দেখে দিতে, দেবেন উনি
বুইয়ার গলায় শক্ত ডেলা পাকাচ্ছিল।
“চলে যাবে কেন? ওদের ভয়ে?”
“না রে। আমি... তোদের এখানকার নই তো! এখানে এসেছিলাম আমরা, ভালো লেগে গেছিল তাই থেকে গেছিলাম। ছুটি নিয়ে। শর্ত ছিল যে এখানের কেউ যেন আমার আসল পরিচয় জানতে না পারে। আমার ফিরে যাওয়ার সিগনালও ঐ, নিজের চেহারা ধরলেই, এই ট্রান্সমিটার খবর পাঠাবে, আর আমায় নিতে আমাদের শিপ এসে যাবে
“তুমি...কোথায় ফিরে যাবে?”
হরেনবাবু হাসল, “নামটা তোরা উচ্চারণ করতে পারবি না, তাই শুনে লাভ নেই। অনেকদূরের একটা অন্য সূর্যের গ্রহের লোক আমি। সেখানেই ফিরে যাব
এই সময়ে ওর বুকের পাথরটায় দপ করে আলো জ্বলে ওঠে আর বিপ বিপ করে আওয়াজ হতে শুরু করে।
“ঐ এসে গেছে ওরা। আমি যাই। তোকে একটু এগিয়ে দিচ্ছি, বাড়ি চলে যা। আসিস না কিন্তু ওদিকে, তোদের জন্য ওটা সেফ নয়
বটগাছ অবধি একসঙ্গে আসে ওরা
বুইয়ার খুব কান্না পাচ্ছিল। হরেনবাবু ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
“পড়বি কিন্তু! ছেড়ে দিবি না। নিজে নিজেই পড়বি তেমন হলে
বুইয়া মাথা হেলায়। কথা বলার অবস্থা ছিল না ওর।
“বুড়িমাসিটারই কষ্ট হবে খুব। অভ্যাস হয়ে গেছিল তো! কী আর করার!”
লোকটা, নাকি প্রাণীটা চলে গেল তারপর। তারও খানিক পর গুরগুর আওয়াজটা পেল কান খাড়া করে থাকা বুইয়া, ঝট করে আকাশে দাগ টেনে যাওয়া তারাটাকেও দেখতে পেল ও একাই।
চোখ মুছে বাড়ির দিকে পা বাড়াল ও।
স্কুল চলে যদি তো ভালো, না হলেও ও ভেবে নিয়েছে কী করবে।
বুড়িমাসির ওই ক’টা বাসন ও ঠিক রোজ মেজে দিতে পারবে। অমন চকচকে করেই।
না, মোটেই মিনিমাগনায় করবে না। বুড়িমাসি তো লেখাপড়া শিখেছিল, এখনও খবরের কাগজ চেয়ে নিয়ে পড়ে ও দেখেছে, আর অঙ্কই বা সব ভুলে গেছে নাকি? টাকা পয়সার হিসেব করছে না! ও বাসন মেজে দেবে, বুড়িমাসি ওকে পড়াবে, ওর লেখা দেখে দেবে তার বদলে।

মূর্ধন্য ষ-টা নিখুঁত লিখেই ছাড়বে ও এবার
_____

গল্পের ম্যাজিক:: আম্বাপুরের গল্প - অনুষ্টুপ শেঠ


আম্বাপুরের গল্প
অনুষ্টুপ শেঠ

আম্বাপুরের মাঠে জব্বর খেলা চলছিল সেদিন মুহুর্মুহু গোল হচ্ছিল আর মাঠশুদ্ধু কালোকোলো ডিগডিগে খেলোয়াড়রা অমনি সবাই মিলেগোওওওওওওলবলে ডিগবাজি খাচ্ছিল শূন্যে
টিম-ফিমের বালাই নেই, যে পারে যেদিকে ইচ্ছে বলে লাথি মারে ওই করতে করতে বল দু’দিকের তেকাঠিতে কখনও গলে গেলেই গোল যেই করুক, সবার গোল যার গোলেই হোক, সবাই-ই জেতে ভারি ভালো ব্যবস্থা, কেউ রাগ-মাগ করার সুযোগ পায় না মাঠের তিন দিক ঘিরে ঝুপসি গাছের সারি - নিম, তেঁতুল, শ্যাওড়া, বট তার ছায়ায় ছায়ায় কত দর্শক বসে বসে দেখছে, হাততালি দিচ্ছে, খুব আনন্দ হলে ঘোঁতনের পিসির মতো উঠে দাঁড়িয়ে দু’পাক নেচেও নিচ্ছে কেউ কিছু মনে করে না এখানে
মনে আর করবেই বা কে! জনমনিষ্যি নেই তো এ দিগরে!
কী বলছ? জনমনিষ্যি নেই তো খেলছেই বা কারা, আর সে খেলা দেখছেই বা কারা?
আহা, আমি কি একবারও বলেছি তারা মনিষ্যি, মানে মানুষ?
আরে শোনো শোনো পালিও না! ভূত হলেও, ওরা সবাই-ই খুব সজ্জন ওদের কথা শুনে অমন করে পালালে খুবই অপমানিত বোধ করবে তো হে! শুনে যাও, এসব গপ্পো আর কারও কাছে পাবে না!
আম্বাপুর গ্রামের নামই শোনোনি তোমরা তো? শোনার কথাও নয় মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, মাত্রই কয়েক ঘর চাষি-গোয়ালা-বামুন ছিল সে তারা তো কবেই কলেরা, ডেঙ্গি আর নিউমোনিয়ায় ভুগে হেজেমজে গেছে যে ক’জন যায়নি, তারা চম্পট দিয়েছে ফলে অমন লকলকে চাষজমি সব আগাছার জঙ্গল, পুকুর পানাসর্বস্ব, গেরস্তর পুঁইমাচা বেগুনক্ষেত সব শুকিয়ে নারকেলদড়ি
জনমনিষ্যি তো গেল, কিন্তু ছেড়ে যেতে পারল না সদ্য পালে পালে মারা যাওয়া ভূতের দল সাধের গাঁয়ের এমন হাল দেখে তাদের ভূতোকান্না দেখলে স্বয়ং শিবঠাকুরেরও চোখে জল আসত গো! শেষে একদিন চোখের জল-টল মুছে, গলা খাঁকরে বড়ো বেম্মদত্যি, মানে ভবনাথ চক্কত্তির ভূত, বেঁচে থাকতে যিনি গাঁয়ের মুখের ছোট্ট মন্দিরের মিষ্টি দেখতে অন্নপূর্ণা মায়ের পুজো করতেন, উঠে দাঁড়ালেন
শোনো হে সব ওরা যায় যাক, আমরা তো আছি! আমরা থাকতে কি আমাদের গাঁয়ের এমন হাল হতে দেব?”
চাদ্দিকের হেটো ভূত মেঠো ভূত পেতনি শাকচুন্নি মামদো বেম্মদত্যি মেছো ভূত সব্বাই একবাক্যে বলে উঠল, “কক্ষনো না!”
ব্যস সেই থেকে ভূতেরা এসে আবার যে যার বাড়ির ভার নিল ঘরদোর পরিষ্কার করল, বাগানে আগাছা সাফ করল, কুয়ো ধুয়ে মুছে চকাচক করে রাখল, যদি কোনো অতিথ আসে কখনও জল দিতে হবে তো! পুকুরের পানা সাফ করল, আর যদিও চাষ করল না, কিন্তু চাষের জমি জুড়ে হরেক রঙের ফুল ফুটিয়ে ফেলল সাজুর ক্ষেত জুড়ে দোপাটি, তো মনুয়ার ক্ষেত জুড়ে চন্দ্রমল্লিকা
ওদের তো রান্না খাওয়ার বালাই নেই, সারাদিন তাই এসব কাজকম্মো করে আর বিকেল হলে এই বড়ো মাঠটায় এসে খেলাধুলো করে, কখনও বা সবাই মিলে নাচগান করে
আজও তেমন ফুটবল খেলা চলছিল পটকে সতেরো নম্বর গোলটা করার পর রেফারি পুকুরপাড়ের বেম্মদত্যি খেলা শেষ বোঝাতে ফটাস ফটাস করে হাততালি দিয়ে দিলেন সে হাততালির শব্দ হুইইইই দূরে টাউন মার্কেটেও শোনা যায় তা জানো? লোকে ভাবে পুলিশে গুলি ছোঁড়া প্র্যাকটিস করছে
তারপর সব গুছিয়ে-টুছিয়ে নিয়ে, ঘোঁতনের পিসিকে ইস্তক ধরে-বেঁধে গাছের মগডাল থেকে নামিয়ে সবাই মিলে বাড়ি রওনা দিয়েছিল রোজকার মতোই এমন সময়েই, সেই কাণ্ডটা হল
বলব?
নাকি থাক?
ওরে বাবা, অমন করে জামা টানলে ছিঁড়ে যাবে যে! বলছি, বলছি, রোসো!
হয়েছে কী, গ্রামের কাছাকাছি এসে শোনে কারা যেন কথা বলছে!
অ্যাঁ! এখানে আবার কে কথা বলবে এই ভর সন্ধ্যাবেলায়? ওরা তো সব্বাই মাঠে গেছিল
মেজ বেম্মদত্যি আবার সবাইকে দাঁড় করিয়ে মাথা গোনে হ্যাঁ, তেতাল্লিশটাই হচ্ছে তো! তাহলে?
আশপাশের গাঁ থেকে ভূতেরা এসে ওদের বাড়ি দখল করছে না তো?
হাঁই হাঁই করে বাকি পথটুকু পেরিয়ে এসে যা দেখল, তাতে তো ওদের চক্ষু চড়কগাছ!
মানুষ!
তিন তিনটে মানুষ ওদের ডেরায়! একটা আখাম্বা লম্বা, ঝুলো গোঁফওলা লোক, সবুজ পেন্টুল আর লাল জামা পরেছে একটা ছোটোখাটো, গোল মুখের চুলে বিনুনি করা মিষ্টি মেয়ে আর একটা ভারিক্কি মোটাসোটা বুড়ো লোক
ঘুরঘুর করছে খালি না, কী সব মাপছেও আবার!
তবে রে! মজা দেখাচ্ছি দাঁড়াও আমাদের জায়গা দখল করা!!!
তেড়ে যাচ্ছিল ভূতের দল বড়ো বেম্মদত্যি ইশারায় থামালেন সবাইকে যেতে হবে না, আমি যাচ্ছি দাঁড়া
ভূত তো, ইচ্ছেমতো চেহারা ধারণ করতে পারে ওরা কিন্তু তার জন্য খানিকটা সময় লাগে
নিজের সবচেয়ে ভয়াল চেহারাটা তৈরি করতে করতে লোকগুলোর কথাবার্তা শুনছিলেন বড়ো বেম্মদত্যি এদের এখানে একটা হোটেল গোছের কিছু খোলার ইচ্ছে, যা বুঝলেন
দত্তদা বুঝলেন, রিসেপশনটা এইখানে বসাতে হবে লোকে গাড়ি নিয়ে পুরো চলে আসতে পারে যাতে।”
পুকুরটা এদ্দিন পড়ে থেকেও কী সুন্দর সাফ দ্যাখো রবিন, একটু পদ্মের চাষ করে নিলে কী সুন্দর যে হবে!”
রবিনদা, ঘরগুলো যেমন যেমন আছে, মোটামুটি সেই বরাবরই আমরা কটেজ করব, তাই তো? এরকম বাগান কী করে রয়ে গেছে বলো তো? এইগুলো রেখে দেব বুঝলে, একটু কিচেন গার্ডেনও করে নিতে পারলে আমাদের রান্না একদম ফ্রেশ সবজি দিয়ে হবে, খুব পছন্দ করবে লোকে।”
সবই তো ভালো রে বিদিশা, কিন্তু এত কিছু করতে কত লোক লাগবে ভেবে দেখেছিস? খরচাটাও তো ভাবতে হবে!”
বড়ো বেম্মদত্যি একটু দ্বিধায় পড়ছিলেন জায়গাটা যদি মানুষের কাজে লাগে, তবে কি বাধা দেওয়া উচিত? ওদের বাস করার জন্য তো মাঠের ধারের গাছ বা এদের এই কটেজের ছাত রইলই
কিন্তু একগাদা লোক এসে যদি ওদের এতদিনের যত্নে তৈরি করা বাগান তছনছ করে দেয়? ফুল পাতা ছেঁড়ে, পুকুরে নোংরা ফেলে, সব খারাপ করে রাখে? এদ্দিনের ভূতজীবন যাপন করে এইটে বুঝে গেছেন তিনি, মানুষ বড়ো খারাপ জীব নিজেরটুকু ছাড়া কারও কথা ভাবে না শীতকালে এক আধবার ঐ মাঠে পিকনিক পার্টি এসেছে, দেখেছেন তো! চলে যাবার পর মাঠ জুড়ে এঁটো কাঁটা কাগজ খোসা প্লাস্টিকের প্যাকেট বোতলকী না ছড়িয়ে থাকে! ছিঃ!
না, না, এদের এমন ভয় দেখাবেন যে আর কখনও এমুখো হবেই না!
ভয়াল চেহারাটা প্রায় হয়ে এসেছে হাতের পাকানো লাঠিটা তুলে দেখা দিতে যাবেন, শুনলেন মেয়েটা বলছে, দত্তদা দেখুন, এইখানটায় বাচ্চাদের প্লেগ্রাউন্ড করলে খুব ভালো হবে না? দুটো স্লিপ, দুটো দোলনা বেঁধে দেবে ঐ গাছের ডালে…”
বড়ো বেম্মদত্যির হাতটা আপনি নেমে আসে ঐ গাছটায় টুকটুকির দোলনা বাঁধা হত খিলখিল করে হাসত মেয়েটা দুলতে দুলতে
টুকটুকি তাঁর একমাত্র নাতনি তিনি মারা যাবার পর টুকটুকির বাবা মা তাকে নিয়ে টাউনে চলে গেছিল সেই কবে, আর দেখেননি মেয়েটাকে
ঐ গাছে দোলনা করলে আবার বাচ্চারা আসবে কত বয়েসের, কত রকম
কদ্দিন এ গ্রামে কোনও নতুন শিশু আসেনি!
মত পালটে ফেলতে বেশিক্ষণ লাগল না বাকি ভূতেদের কথা বলে রাজি করাতেও বেশিক্ষণ লাগল না
ভয়াল ভয়ংকর রাগী ব্রহ্মদত্যির বদলে, গাছের আড়াল থেকে যে লোকটা বেরিয়ে এল ওদের সামনে, তার সৌম্য হাসি হাসি মুখ, চোখে চশমা, পরনে সাদা ধুতি পাঞ্জাবি
আপনারা লোক রাখা নিয়ে কথা বলছিলেন যেন শুনলুম? সে ভার আমার উপর ছেড়ে দিন, আশপাশের গরীব গুর্বো লোক আছে অনেক, আমি ব্যবস্থা করে দেব সব, কিচ্ছু দেখতে হবে না আপনাদের সব কাজ পারবে, একটু দেখিয়ে দেবেন ব্যস আর খুব সৎ, খুব পরিশ্রমী, চব্বিশ ঘন্টা ডিউটি করবে, মাইনে আপনারা যা দেবেন তাই মুখ বুজে নেবে চলবে?”
চলবে মানে! দত্তদা হাতে চাঁদ পেয়েছিলেন তো! তক্ষুণি সব কথাবার্তা পাকা করে, সামনের মাস থেকেই কটেজ বানানো শুরু করবেন, তিন মাসে বুকিং চালু হয়ে যাবে সব ঠিক হয়ে গেল
তবে, একটা শর্ত আছে কিন্তু আমাদের যতই হোক আমাদের গাঁ, ইয়ে মানে, আমাদের অঞ্চল তো! বুকিং করার সময়েও বলে দেবেন এখানে কোনোরকম গাছপালা ছেঁড়া, নোংরা করা চলবে না সেরকম দেখলে কিন্তু আমার লোকেরা খেপে গিয়ে মারধর করে দিতে পারে!”
হাত তুলে অভয় দেন দত্তদা
নোট করো বিদিশা, আমাদের পেজে বড়ো বড়ো করে লেখা থাকবে ইকো ফ্রেন্ডলি না হলে ফাইন দিতে হবে কোনোরকম পরিবেশ দূষণ বরদাস্ত করা হবে না।”
ওরা চলে যেতে ভূতেরা হইহই করে বেম্মদত্যিকে ঘিরে ধরল সব্বার মনে খুব আনন্দ, ওদের জায়গাও সুন্দর থাকবে, আবার ওরাও থাকবে!
কী হল? গপ্পো তো শেষ বাপু, এবার একটু খেলতে যাও দিকি বল-টল নিয়ে! রোজ দৌড়ঝাঁপ করলে শরীর মন দুই ভালো থাকে জানো না?
আরেকটা কথা, এর পর থেকে মা-বাবার সঙ্গে রিসর্টে বেড়াতে গেলে খুব সাবধান কিন্তু মানে আম্বাপুরটা কোথায় আমি ঠিক জানি না তো, কোন রিসর্টে যে তেনারা মালি ওয়েটার ঘরসাফাই মাসি হয়ে কাজ করছেন তাও জানি না তাই! ভুল করে গাছের পাতা ফুল ছিঁড়ে ফেললে, পুকুরে জঞ্জাল ফেললে, এখান ওখানে খালি বোতল ফেললে যদি তারা দেখে ফেলে? শুনেছি, ভূতের গাঁট্টা খেলে খুব ব্যথা লাগে কিন্তু!
_____
ছবিঃ লেখক