প্রবন্ধ:: ছড়া ও কবিতার সীমান্ত সমস্যা - দীপ মুখোপাধ্যায়


ছড়া কবিতার সম্পর্ক এবং সীমান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রথমেই মনে আসে যে এই দুটি মাধ্যমই মানুষের মধ্যে সৌন্দর্যবোধ রুচির উত্তরণ ঘটায় ছন্দ হচ্ছে গতিসৌন্দর্য গতি যদি অনিয়ন্ত্রিত হয় তবে তা কখনোই সুন্দর হয়ে উঠতে পারে না গতিসৌন্দর্য যেমন রূপগত তেমনি ধ্বনিগতও হতে পারে। রূপসৌন্দর্য উপভোগ করা যায় চোখে, আর ধ্বনিসৌন্দর্য কানে। মনে রাখতে হবে সাহিত্যের ছন্দ কিন্তু রূপগত নয়, ভাষাগত ধ্বনি প্রবাহের সৌন্দর্যস্বভাবতই প্রশ্ন জাগে কবিতা ছড়ার গতিসৌন্দর্য কি একই? নাকি ভিন্ন প্রকৃতির? এই দুটি কি স্বতন্ত্র সাহিত্যশাখা? এদের মধ্যবর্তী অবস্থানে আবার রয়েছে পদ্য আমাদের এইরকম কয়েকটি জিজ্ঞাসা চিহ্নের প্রায়ই মুখোমুখি হতে হয়বয়স্কজনপাঠ্য ছন্দোবদ্ধ রচনার ক্ষেত্রে সমস্যা কিছুটা কমসে ক্ষেত্রে পদ্য হলেও আমরা কবিতা বলে অভিহিত করিকিন্তু শিশুতোষ রচনায় বেশ ধাঁধায় পড়তে হয় সুধীসমাজ ছন্দোবন্ধ সব শিশুরচনাকে ছড়া বলে থাকেনকেউ আবার বেশি মর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করে বলেন কবিতা। এ এক বহুল প্রচলিত ব্যাপারআমার বিনীত নিবেদন, এর জন্য শিল্পবোধের অস্বচ্ছতা হয়তো কিছুটা দায়ী
আমার আপত্তির কারণ ছন্দোবদ্ধ ছড়া কবিতার উৎপত্তিগত, গঠনগত এবং কাঠামোগত দিকগুলি লক্ষ্য করেমোটা দাগের এই অভিধায় হয়তো অনেকের আপত্তি নেই, কিন্তু সূক্ষ্ম সচেতনতায় ভিন্ন রূপসৌকর্য ধরা পড়ে ছড়া এবং কবিতার কবিতার কথায় আগে আসি এই নিয়ে বিস্তর আলোচনায় না গিয়ে অতিসরলীকরণ করে বলি, হৃদয়ের শুদ্ধ অনুভূতি এবং আবেগের প্রকাশ হল কবিতা কবির কল্পনা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি বা উপলব্ধি যখন সুনির্বাচিত শব্দ-সম্ভারে ছন্দোবদ্ধ অবস্থায় রসমণ্ডিত রূপ লাভ করে তখনই জন্ম নেয় কবিতা সুতরাং কবিতার প্রধান উপাদান ভাব, ভাষা, ছন্দ রস ভাবের প্রকাশ হয় ভাষার মাধ্যমে। আর এই ভাষাকে শ্রুতিমধুর রসমণ্ডিত করে তোলে ছন্দভাষা ছন্দের সমন্বয়ে কবির কোনও অনুভূতি যখন রসাত্মক বাক্যে রূপ পায় তখনই ভূমিষ্ঠ হয় সার্থক কবিতা কাজেই উৎকৃষ্ট কবিতার রসসৃষ্টির ক্ষেত্রে ছন্দের ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণছন্দ যেমন কবিতার ভাষাকে শ্রুতিমধুর করে তোলে তেমনি কবির ভাবকে করে তোলে হৃদয়গ্রাহী। কবিতার জন্মলগ্ন থেকেই ছন্দ তার পরিস্ফুটনের বাহনকবিতার আদি নিদর্শন চর্যাপদেও এর প্রমাণ আমরা বারে বারে পেয়েছি সুতরাং কবিতার অন্যতম উপাদান যদি ভাব হয় তবে ভাবের আশ্রয় ভাষা আর ভাষা হলো শব্দের সমষ্টি তাই কবিতায় শব্দচয়নের গুরুত্ব অনেকখানি ভাবকে বহন করার জন্য উপযুক্ত শব্দ ছাড়া কবিতা হয় না ধরা যাক কোনও রচনার শব্দগুচ্ছে ছন্দ, অন্ত্যমিল সবই আছে, কিন্তু কাব্যময় অনুভূতির ছোঁয়া নেইশব্দগুলোও আক্ষরিক অর্থের বাইরে বিশেষ কিছু প্রকাশ করে না ফলে সেই সৃষ্টিকে কিছুতেই কবিতা বলা যাবে না কবিতা হয়ে ওঠার জন্য বাক্যের শব্দসমষ্টির একটি বিশেষ গুণ প্রয়োজনতার নাম কাব্যগুণ কাব্যগুণ শব্দের সৌন্দর্য সৃষ্টি করেকবিতার ভাবকে মূর্ত করার জন্য সুষম মাত্রায় শব্দের পর শব্দ গেঁথে উপমা-উৎপ্রেক্ষা-চিত্রকল্প যোজনার মাধ্যমে কবিকে সৌন্দর্য নির্মাণ করতে হয় শব্দগুলো আক্ষরিক অর্থের খোলস ভেদ করে আমাদের সামনে এমন ছবি হাজির করে যা আমরা চোখ বন্ধ করলেও দেখতে পাই এবং সেই ছবির ঔজ্জ্বল্য বিশালতা আমাদের কল্পনাকেও হার মানায়। শব্দের শৈল্পিক সহযোগ অর্থের নবতর রূপান্তর ঘটায় কথার পিঠে অর্থের দোলা লেগে প্রকাশ পায় একটি পরিপূর্ণ ভাব বা বিষয় ছবি অর্থের ব্যঞ্জনা ছড়িয়ে দেয় এক অপূর্ব মুগ্ধতা। তখন কবিতাটি আমাদের কাছে গভীর আবেদনময় হয়ে ওঠে। আমার কাছে এটাই কবিতা কবিতার চারিত্রবৈশিষ্ট্য যদি এমন হয় তবে পদ্য কী বস্তু? সাধারণ কথায় ছন্দোবদ্ধ পদ সমূহের নাম পদ্য কিন্তু পদ্যের আকারে রচনা মানেই কবিতা নয় পদ্যের ছন্দোবদ্ধ বাক্যে যখন ভাবানুভূতির গভীরতা প্রকাশ পায় তখনই সৃষ্টি হয় কবিতার। কবিতা হয়ে ওঠে আলংকারিক এবং পদ্য চাকচিক্যহীন সাদামাটা। অর্থাৎ, ছন্দকৌশল যতই নিখুঁত হোক না কেন কাব্য-অলঙ্কার এবং রসের অভাবে সেই রচনা পদ্য নামেই চিহ্নিত হবে। কবিতার বিষয়বস্তুতে যদি কোনও ভাবানুভূতি না থাকে, শুধুমাত্র তথ্য বা তত্ত্ব প্রচারিত হয় সেটা তখন পদ্য পদবাচ্যমিলের কারিকুরি থাকতে পারে, উচ্চারণে ছন্দিত শ্রুতিসুখও পাওয়া যায়, বক্তব্যের বেণিও সরাসরি খুলে যায়, কিন্তু শব্দগুচ্ছের কোনও অনির্বচনীয় আনন্দ দেবার ক্ষমতা থাকে না। এগুলি পদ্যই, কবিতার আওতায় কিছুতেই আনা যায় না ছড়ার গঠন-কৌশল আরও ভিন্ন, ছন্দ-মিল ছাড়া কবিতা এবং পদ্যের সঙ্গে রূপগত তেমন সাদৃশ্য নেই ছড়ার প্রচলন চর্যাপদেরও আগে, মানুষের মুখে মুখে কাল থেকে কালান্তরে
সাহিত্যের এই প্রাচীনতম ধারার এক একটি পঙক্তিতে ঝিলিক দিয়ে যায় এক একটি ছবি, টুকরো টুকরো ছড়ানো এই ছড়ানো ছবির ছন্দিত কাঠামোই ছড়া সুরময় ধ্বনিই ছড়ার প্রাণ রবীন্দ্রনাথ যাকে মেঘের সঙ্গে তুলনা দিয়েছেন বলেছেন, গাম্ভীর্য নয়, অর্থের মারপ্যাঁচ নয়, সহজ কথায় লেখা পদ্য বা কবিতার সঙ্গে প্রধান বৈসাদৃশ্য হল ছড়া সবসময় দৃঢ়বদ্ধ এবং সংক্ষিপ্ত সেই তুলনায় পদ্যের বাঁধুনি অনেকটা আলগা ছড়া কিন্তু কবিতার মতো অনুভূতিঘন নয়। কবিতা যেখানে রহস্যময়, ছড়া বেশ অগভীর হালকা অনেক কথা বলার পরও যেন কবিতা কিছু কথা বলে না, উহ্য রেখে দেয় শেষ পর্যন্ত সেই না বলা কথাটিই কবিতা হয়ে ওঠে কবিতার মূলভিত্তি কল্পনা বা আবেগ হলেও তা সত্য কিংবা যুক্তিকে অস্বীকার করে না। যেমন কবিতা বিজ্ঞানের তথ্যপ্রবাহের উপর পা ফেলে আনন্দ, সৌন্দর্য জীবনের সুগভীর তাৎপর্যকে ব্যক্ত করে, ছড়ার ক্ষেত্রে এটা খাটে না যেমন দেখতে পাই সুকুমার রায়ের উদ্ভট কল্পরাজ্যে বিজ্ঞানের বাস্তব যুক্তি-বুদ্ধি সম্পূর্ণ অচলঅবাস্তব খেয়ালরসই সেখানে মুখ্য। কবিতা জীবনপ্রকৃতি এবং সমাজ বাস্তবতার সবকিছুকে ধারণ করে অবলীলায় প্রকাশ করতে ব্যাকুল। কবিতার আছে সর্বগ্রাসী অন্বেষা। ছড়াও কিন্তু পিছিয়ে থাকে না মানুষের দৈনন্দিনতায় ছড়াও একাত্ম। ছড়া নিয়মিত সমাজ-বাস্তবতাকে প্রকাশ করে। আনন্দ-দুঃখ, শোক-দ্রোহ প্রকাশে ছড়া এক অনিবার্য মুখর মাধ্যম। নেরুদার কথা প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে। তিনি বলেছেন, যে কৰি বাস্তববাদী নন, তিনি মৃত। আর যে কবি শুধুই বাস্তববাদী, তিনি ততোধিক মৃত। সুতরাং প্রকৃত ছড়া বা কবিতা হল কল্পনা আর বাস্তবের শৈল্পিক মিশ্রণ যা সুনির্বাচিত শব্দবিন্যাসে হদরগ্রাহী হয়ে ওঠে। আমাদের দেশের কয়েকজন তথাকথিত পণ্ডিত আবার ছড়াকে সাহিত্য বলে মানতে নারাজ। অথচ ১৩০৬ বঙ্গাব্দে যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ‘খুকুমণির ছড়া’-র ভূমিকা লিখতে গিয়ে লিখিত ভাষ্যে ছড়াকে সাহিত্যের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছিলেন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী। তবুও কবিতার দাপটে ছড়ার জন্য নির্ধারিত আসন ছিল শিশুতোষণের জন্যই সীমাবদ্ধ। অন্নদাশংকর লিখছেন, ছড়া দিয়ে মিটবে না কবিতার স্বাদ/ তবু তো যায় না ভোলা বচন প্রবাদ/ খোকা ঘুমাবে না যদি না পায় এর স্বাদ/ পাড়া ঘুমাবে না যদি এটা পড়ে বাদ। সুতরাং বোঝাই যায় ছড়ার প্রভাব কত গভীরে, একেবারে শিকড়ে। ছড়া মানে কিছু মিলের কারসাজি নয়। আল মাহমুদ লিখছেন, ছড়া সেও কাব্যকথা হৃদয়ভাঙা মিল/ ঠিক দুপুরে উড়তে থাকা পাখ ছড়ানো চিল/ নেইকো ছড়ার মালমশলা নেইকো কথা মিল/ এই শহরে কোথায় পাব নীলপরীদের ঝিল? সাহিত্যের এই আদি মাধ্যমটির সাময়িকতার দিকে উন্মুখতা দুর্নিবার। কৌতুকের বক্রতায় এবং ছন্দমিলের বিন্যাসে আমাদের কৌতূহলকে উদ্দীপিত করে। ছড়া যেন ঝলসে ওঠে আগুনের ফুলকির মতো। এই ছড়াগুলির স্থায়িত্ব এবং শিল্পগুণ সম্পর্কে সংশয় থাকতে পারে। সাময়িকতার সংকীর্ণতা মেনে নিলেও মনে হয় সাম্প্রতিকতার আমেজ কেটে গেলে তরতাজা ঘটনার এই চিত্রায়ণ কালের ইতিহাস হিসেবে নির্ণিত হবে। কবিতার ক্ষেত্রেও এর দৃষ্টান্ত রয়েছে। তাৎক্ষনিকতাকে প্রশ্রয় দিয়ে অচিরতার আশঙ্কায় ভুগতে হয়েছে অজস্র কবিতাকেও। আবার কালের চাকার আড়াল থেকে প্রকাশ্যে এসেছে নতুন উপস্থাপনায় সময়ের গতিময়তা তোয়াক্কা না করে। এ যেন সময়ের সঙ্গে ঐতিহ্যের নবায়ন।
ইদানীং কাব্যসাহিত্যে বিরাজ করছে একধরণের স্থবিরতা। কবিতার মতো ছড়াও সময়ের চাকায় পিষ্ট। কবিতা না হয় নতুনভাবে বাঁক নিতে পারে, কিন্তু ছড়া একই আঙ্গিকে ক্রমান্বয়ে নির্মিত হতে থাকবে। কবিতার যেমন প্রাচীন যুগ, মধ্য যুগ, আধুনিক, উত্তর আধুনিক যুগ আছে, ছড়ার এই বিভাজন নেই কেন? তবে কী ছড়া এখনও আধুনিক হয়ে ওঠেনি? আমার ধারণা ছড়া সূচনাপর্ব থেকে আজ অবধি আদ্যন্ত আধুনিক। সাম্প্রতিক ছড়ার চেহারায় সময়ের সৌন্দর্য লেগেছে, শুধুমাত্র শিশুতোষ ভাবার দৃষ্টিভঙ্গি বদল হয়েছে. বক্তব্যের বলিষ্ঠতা এসেছে, তাও আদি-অকৃত্রিম উদ্দেশ্য ও ইঙ্গিত কিন্তু একই থেকে গেছে। আমরা যারা এখন ধরাকে ছড়া জ্ঞান করি, সেই পরিশীলিত নির্মাতারা কি অতিক্রম করতে পেরেছি ছেলেভোলানো ঘুমপাড়ানি ছড়াগুলি? বাংলা সাহিত্যের এই সম্পদগুলি কার রচনা তাও জানি না, কিন্তু হদয়-সঞ্জাত ছড়াগুলি স্থান কালের সীমাহীন রাজ্যে চিরস্থায়ী বসতি গেড়েছে কাব্যকলার নন্দনতাত্ত্বিকতায়। কখনও বা হয়ে উঠেছে শাশ্বত প্রতিবাদের শব্দচিত্র। স্বতঃস্ফূর্ত সৃষ্টিকুশলতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেগবান করেছে ছড়াকে, যেখানে কৃত্রিমতা বা চাতুরির কোনও স্থান নেই। নতুন সহস্রাব্দে আমরা যতই এগোই না কেন, ছন্দের বন্ধনে সমষ্টিগত লোকমনের সৃষ্টি সেই ছড়া চিরনতুন এবং সর্বজনীন। দম নিতে জানে, বাঁক নিতে জানে না! আর যদি বাঁক নিতেই থাকে তখন সেটি আর ছড়া থাকে না! অন্য রূপ ধারণ করে।
_____

প্রবন্ধ:: ছড়ার ছন্দ আর ছন্দের ছড়া - মৌ দাশগুপ্ত


ছড়া পড়ে আনন্দ পায় না কে! কিন্তু কেন এই ছড়া আমাদের মনকে মাতিয়ে তোলে, অবোধ শিশু অবধি ছড়ার তালে তালে হাততালি দিয়ে দুলতে থাকে, তা নিয়ে আমরা পারতপক্ষে ভেবে দেখি কি? এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় ‘আম খাচ্ছ খাও, কষ্ট করে আঁটি গোনার কী দরকার?’ কিন্তু এটা নিয়ে একটু ভেবে দেখলে ক্ষতি কী আর যদি তাতে আনন্দও পাওয়া যায়, সঙ্গে সঙ্গে নতুন কিছু শেখাও যায়!
পণ্ডিতেরা এই ছড়ার ছন্দ নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন, সে-সব বলে আমি তোমাদের মোটেই এখানে ঘাবড়ে দিতে চাই না। শুধু সহজ করে বলি, এই ছন্দ আমাদের বাংলাভাষার সঙ্গী সেই আদ্যিকাল থেকে – সে-ই সাধারণ দিশি মানুষেরা এই ছন্দে গান গাইত, তাল দিত, এই ছন্দেই মিশে আছে লোকসংগীতের বাদ্যি আর নাচের বোল। তাই তখনকার পড়াশুনো করা মানুষেরা এই ছন্দকে অত সমীহের চোখে দেখতেন না, তাঁরা পদ্য লিখতেন প্রধানত পয়ার ছন্দে, যে ছন্দ তোমরা আজও শোন লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়া-তে। ছড়ার ছন্দকে সবার প্রথমে সম্মানের আসনে তুলে আনলেন রবীন্দ্রনাথ, তিনি দেখালেন শুধু হালকা চালের ছেলেভোলানো কবিতা বা লোকসংগীতই নয়, এ-ছন্দে লেখা যায় চমৎকার উঁচুদরের কবিতা। তাঁর ‘পলাতকা’ নামের কবিতার বইতে এই ছন্দে অপূর্ব ভাবের কবিতা লিখে তখনকার পাঠকদের অবাক করে দিলেন তিনি।
এই ছড়ার ছন্দ নিয়ে খুব তলিয়ে আলোচনা করেছেন কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, যাঁকে বলা হত ছন্দের জাদুকর। তাঁর ‘ছন্দ সরস্বতী’ নামে বইতে এই ছন্দ সম্বন্ধে ভারি চমৎকারভাবে তিনি বলেছেন, “ওকে অত সহজে আয়ত্ত করতে পারবে না, ও হল বাংলা ভাষার প্রাণপাখি। ওকে যে বশ করতে পারবে বঙ্গবাণীর স্বরূপ মূর্তি সে প্রত্যক্ষ করবে, ...দেখতে ছোটো বটে, কিন্তু সহজে ওকে হাত করতে পারবে না।” এই ছন্দের আরেকটি গালভরা নাম আছে, সেটি হল ‘স্বরবৃত্ত’। বাংলা পদ্য কবিতায় সাধারণভাবে তিন রকমের ছন্দের দেখা পাওয়া যায়, তার মধ্যে একটি হল ছড়ার ছন্দ। পণ্ডিতেরা বলেছেন এই ছন্দে মুক্ত বা স্বরবর্ণান্ত অক্ষর (সিলেব্‌ল) সবসময়েই একমাত্রা আর রুদ্ধ বা ব্যঞ্জনান্ত অক্ষরও সাধারণত একমাত্রার মূল্য পায় এবং প্রতি পর্বে মাত্রার সংখ্যা থাকে চার। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বলেন, “এটা তিন মাত্রার ছন্দ... এর প্রত্যেক পা-ফেলার লয় হচ্ছে তিনের।” রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যের উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে এই চিরচেনা ছড়াটিকে –
বৃষ্‌ টি / পড়ে- / টাপুর / টুপুর / নদেয় / এল- / বা-ন।
শিবঠা / কুরের / বিয়ে- / হবে- / তিন্‌ ক / ন্‌নে- / দা-ন।
আসল কথা হল, ছড়ার ছন্দের একটা বিশেষ সুবিধে এই যে, এখানে ইচ্ছেমতো স্বরকে টেনে লম্বা করা যায়, ছোটোও করা যায়, ফলে এর একটা ফ্লেক্সিবিলিটি বা নমনীয়তা আছে, কবিতার বিষয় ও ভাব অনুসারে একে চমৎকারভাবে ব্যবহার করা যায়, এবং রবিঠাকুর আর তাঁর পরবর্তী কবিরা তা করেওছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সেকালের বিখ্যাত কবি ও লেখকেরা
[বসে ডানদিক থেকেঃ সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, যতীন্দ্রমোহন বাগচি, করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়;
দাঁড়িয়ে ডানদিক থেকেঃ প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়,
দ্বিজেন্দ্র নারায়ণ বাগচি এবং চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়]

এবার বলি একজন প্রায় বিস্মৃত ছোটোদের ছড়াকারের কথা। যে-সময়ে বাংলাতেও ছোটোদের জন্যে পয়ার বা অক্ষরবৃত্তে (প্রতি চরণে ১৪টি করে অক্ষর) কবিতা লেখা হত, যেমন –
“পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল
কাননে কুসুমকলি সকলই ফুটিল”
সে-সময় পূর্ববঙ্গের ঢাকা জেলার সোনারং গ্রামে হরিপ্রসন্ন দাশগুপ্ত বিদ্যাবিনোদ নামে এক কবি ছিলেন, দরিদ্র কিন্তু পড়াশুনো-অনুরাগী। বিদ্যালয়ের উঁচু ডিগ্রি তাঁর ছিল না কিন্তু মানুষটি ছিলেন স্বশিক্ষিত। নানা বিষয়ে ছিল তাঁর আগ্রহ, উদ্ভিদবিদ্যা, সাহিত্য, সর্বোপরি ছন্দশাস্ত্র। তিনি প্রবাসী, ভারতী প্রভৃতি তৎকালীন বিখ্যাত পত্র-পত্রিকায় প্রায় নিয়মিতই কবিতা লিখতেন। পঞ্চস্বরের মিল দিয়ে কবিতা লিখে এক প্রতিযোগিতায় হরিপ্রসন্ন রবীন্দ্রনাথের প্রশংসাপত্র পেয়েছিলেন।
অক্ষরবৃত্ত অর্থাৎ পয়ার ছন্দে কবিতা পাঠে অভ্যস্ত গ্রামের শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা রবীন্দ্রনাথের মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা কবিতা অক্ষরবৃত্তের চালে পড়তে পারছেন না, অপেক্ষা হরিপ্রসন্নের জন্য, এবার সে জব্দ হবে, এই কবিকে সে এত বড়ো বলে, অথচ দেখ ছন্দেই ভুল! হরিপ্রসন্ন এলেন এবং নির্ভুলভাবে পড়ে শোনালেন সাত মাত্রার ছন্দে লেখা কবিতাটি। গ্রামের লোকেরা জানলেন ছন্দ এরকমও হতে পারে।
হরিপ্রসন্ন আদতে ছিলেন কবি, প্রধানত লিখতেন ছোটোদের জন্য কবিতা। তাঁর এরকম কতগুলি কবিতার বইও বেরিয়েছিল – ‘রঙ্গিলা’, ‘বেদানা’, ঈশপের গল্পের চমৎকার কাব্যরূপ ‘আঙুর’। এখন বইগুলি আর পাওয়া যায় না, কিন্তু বেশ কয়েক বছর আগেও তাঁর নাতি দেখতে পান কোনও এক পত্রিকায় ‘কবি অজ্ঞাত’ পরিচয় দিয়ে তাঁর দাদুর একটি কবিতা কেউ উদ্ধৃত করেছেন। এভাবেই অপরিচয়ে হারিয়ে যান দরিদ্র হরিপ্রসন্নরা, কিন্তু তবু টিঁকে থাকেন। এখানে দিলাম সেই ‘অজ্ঞাত-পরিচয়’ কবির সেই উদ্ধৃত কবিতাটি, যেটি ঈশপের গল্পের কাব্যরূপ, নীতিবাক্য সমেত, প্রায় একশো বছর আগে লেখা হরিপ্রসন্ন দাশগুপ্তর এই কবিতাটিতে ধরা আছে ছোটোদের শিক্ষার জন্যে ছড়ার ছন্দ ব্যবহারের এক চমৎকার নমুনা -

ব্যাং ও ষাঁড়
কেউটেকুড়ির বিল,
তাতে ছুড়লে পরে ঢিল;
দেখ্‌তে পারো ব্যাং এর নাচন্‌ -
কিল্‌ বিল্‌ কিল্‌ বিল্‌!

তাতে একটা ছিল ব্যাং,
তার লম্বা সরু ঠ্যাং,
বাদ্‌লা দিনে গাল ফুলিয়ে
ডাক্‌ত ঘ্যাঙর ঘ্যাং!

তার বড্ড ছিল জাঁক,
কথায় লাগিয়ে দিত তাক্‌,
বল্‌ত সদা – ‘এক্‌লা আমি
মার্‌তে পারি লাখ্‌ !’

সেদিন নান্নু মিঞার ষাঁড়
এলো চর্‌তে বিলের ধার;
ব্যাংটা বলে – ‘তফাত রহো
ছোট্ট জানোয়ার’!

রাগে ফুলিয়ে দেহ খান্‌,
তিনি ষাঁড়টি হ’তে চান্‌;
শেষ কালেতে পেটটি ফেটে
হ’লেন লবেজান।

নীতি – ছোটো যদি আপনারে বড়ো ব’লে ভাবে।
     একদিন তার ফল হাতে হাতে পাবে।।
_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

প্রবন্ধ:: কবির একুশ বসন্ত - সুদীপ ঘোষাল


কবির একুশ বসন্ত
সুদীপ ঘোষাল

কলকাতার কালীঘাট অঞ্চলের ৪৩নং মহিম হালদার স্ট্রিট। জনবহুল এলাকা। সবাই ব্যস্ত। সুনীতি দেবী এসেছেন বাপের বাড়ি। তিনি সন্তানসম্ভবা। দ্বিতীয় সন্তান হবে। তখনকার দিনে ধাত্রীমাতা আসতেন বাড়িতে। তিনি এসে বললেন, আর দেরি নেই, রাতের মধ্যেই বাচ্চা প্রসব হবে। তখন ফোন এত ছিল না। অফিসে আদালতে ফোন থাকত।
এদিকে সুনীতির স্বামী চিন্তায় মগ্ন। ফরিদপুরে উনশিয়া গ্রামে থাকেন। কলকাতা থেকে অনেক দূর। বড়ো ছেলেকে নিয়ে খুব চিন্তায় আছেন। তারপর মাসখানেক পরে খবর পেলেন আবার পুত্রসন্তান প্রসব করেছেন তার স্ত্রী। নিবারণ ভট্টাচার্য গ্রামের সকলকে মিষ্টিমুখ করালেন।
তার রানিদি ভাইয়ের নাম দিলেন সুকান্ত।

তখন ১৯২৬ সাল। পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ রাজ চলছে। অত্যাচার আর অবিচারে বিপ্লবীদের ফাঁসি দিচ্ছে সরকার একের পর এক।
সুনীতি দেবীর মোট সন্তান ছিল ছয় জন। তিনি স্বামীকে বললেন, আর নয়। এবার ছেলেদের মানুষের মতো মানুষ করতে হবে।
তারপর ফরিদপুরে স্কুলে ভরতি হলেন সুকান্ত। তাঁর ছয় ভাইয়ের মধ্যে ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর ভাইদের নাম যথাক্রমে - মনমোহন, সুশীল, প্রশান্ত, বিভাষ, অশোক এবং অমিয় ছিল। তিনি তাঁর বড়ো দাদা মনমোহন এবং বৌদি সরজু দেবীর বড়ো আদরের ছিলেন।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ ছিলেন রানিদি। সেই সময়ের বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক মণীন্দ্রলাল বসুর ‘সুকান্ত’ গল্পটি পড়ে, তিনি তাঁর নাম রেখেছিলেন সুকান্ত।
জানা যায়, তাঁর প্রিয় রানিদির জন্যই নাকি তিনি সাহিত্যকর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। রানিদি বললেন, “তোর খাতায় লেখা কবিতা আমি দেখেছি। তুই কবিতা লেখ। একদিন তুই অনেক বড়ো হবি। তোর নাম ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়বে।”
সুকান্ত বললেন, “তুমি কী করে জানলে আমি বড়ো কবি হব? ও কথা বোলো না। আমার লজ্জা লাগে দিদি।”
রানিদি বললেন, “আমার কথা ফেলিস না ভাই।”
সুকান্ত বলেছিল, “চেষ্টা করব তোমার কথা মেনে চলার।”
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাঁর রানিদি তাঁর কোনো সাহিত্যকর্মই দেখে যেতে পারেননি, কারণ তিনি খুব তাড়াতাড়ি মারা যান। দিদি মারা যাওয়ার কিছুদিন পরেই তাঁর মা সুনীতি দেবীও পরলোক গমন করেন।
পর পর চোখের সামনে দুটো মৃত্যু, সুকান্তকে ভীষণ শোকাহত এবং মর্মাহত করে তোলে, যার ফলে তাঁর মানসিক অবস্থা পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে যায় বেশ কিছুদিন। এই চরম শোকের মুহূর্তেই তিনি রচনা করেন অনেক কবিতা। নিঃসঙ্গতার সময় সেই সব কবিতাই ছিল তাঁর একমাত্র সঙ্গী।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের বাল্যশিক্ষা শুরু হয় কলকাতার কমলা বিদ্যামন্দির থেকে। এখানেই তাঁর লেখা প্রথম ছোটোগল্প প্রকাশিত হয় স্কুলেরই নিজস্ব পত্রিকা ‘সঞ্চয়’-এ। সেই স্কুলে তিনি বেশ কিছু বছর পড়াশোনা করেন এবং তারপর ভর্তি হন বেলেঘাটা দেশবন্ধু হাইস্কুলে। এরপর ১৯৪৫ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষা দেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই পরীক্ষায় ফেল করেন।
বাড়িতে তার বাবা বললেন, “ফেল করেছিস তো কী হয়েছে? মনে রাখবি এটা সাফল্যের এক একটা স্তম্ভ।”
সুকান্ত বললেন, “আমার স্কুলে যেতে লজ্জা করছে।”
তাঁর বাবা বললেন, “স্কুলে তুমি যাও। এবার দেখ তুমি পাশ করবে।”

স্কুলে পড়ার সময় থেকেই কবি সুকান্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই সময় ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য তাঁর পড়াশোনার পরিসমাপ্তি ঘটে।
ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও অনৈতিক ব্রিটিশ শাসন প্রভৃতির বিরুদ্ধে তিনি ও তাঁর দল ভীষণভাবে সোচ্চার হন। তিনি তাঁর সীমিত জীবনকালে যা কিছু সাহিত্যসৃষ্টি করে গেছেন তা সত্যিই এক কথায় অনবদ্য। তিনি মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতির বিরুদ্ধে সেইসময় কলম ধরেছিলেন। তাঁর সমস্ত সাহিত্যকর্ম আজও প্রত্যেক বাঙালী পাঠকদের সমানভাবে মাতিয়ে রাখে।
১৯৪৪ সালে তিনি এরপর ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। সেই বছরই ‘আকাল’ নামক একটি সংকলনগ্রন্থ তিনি সম্পাদনাও করেন এবং সেখানেই শোষিত মানুষের কর্ম, জীবন, ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য সংগ্রাম, সমাজের দুর্দশাজনিত বেদনা এবং শোষণমুক্ত স্বাধীন সমাজের স্বপ্ন প্রভৃতি বিষয় নিয়ে কবিতা লিখতে থাকেন। তাঁর সেই কবিতা সংকলন মানুষকে ভীষণভাবে সাহস ও অনুপ্রেরণা যোগায় রাজনৈতিক কর্মকান্ডে লিপ্ত হওয়ার জন্য।
১৯৪১ সালে সুকান্ত ভট্টাচার্য কলকাতা রেডিও আয়োজিত ‘গল্পদাদুর আসর’ নামক এক অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। সেখানে তিনি প্রথমে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করতেন। যখন রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়, তখন সেই আসরেই তিনি নিজের লেখা কবিতা পাঠ করে তাঁকে শ্রদ্ধাও জানান।

এক প্রাবন্ধিক তাঁর বক্তব্যে  বলেছিলেন, তুমি যদি এটা ভেবে থাকো যে সুকান্ত ভট্টাচার্য শুধু একজন কবি ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না, তাহলে তোমার সেই ভাবনা একেবারে ভুল। কারণ তিনি কবিতা লেখার সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন গান, গল্প, নাটক এবং প্রবন্ধও রচনা করেছিলেন। মাত্র এগারো বছর বয়সে তিনি ‘রাখাল ছেলে’ নামে একটি গীতিনাট্য রচনা করেছিলেন, যেটি পরে ‘হরতাল’ নামক বইতে সংকলিত হয়েছিল। তাঁর সমস্ত রচনাবলীর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল - ছাড়পত্র (১৯৪৭), গীতিগুচ্ছ (১৯৬৫), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠেকড়া (১৯৫১), অভিযান (১৯৫৩), ঘুম নেই (১৯৫৪), হরতাল (১৯৬২) প্রভৃতি। পরবর্তীকালে উভয় বাংলা থেকেই ‘সুকান্ত সমগ্র’ নামে তাঁর রচনাবলি প্রকাশিত হয়।

জীবনের প্রতিটি অংশেই সুকান্ত যেন অনিয়মকেই তাঁর জীবনের অঙ্গ করে তুলেছিলেন। কবি সুকান্ত তাঁর বন্ধুদের বলতেন, আমার যেমন পার্টির কাজ, তেমনই অন্যদিকে সাহিত্যকর্ম, অভাব ও অনটন। এই সব কিছুর ধকল আমার শীর্ণ শরীর আর মানতে পারছে না।
বন্ধুরা তাঁকে সাহায্য করতেন অর্থ দিয়ে। তারা বলতেন, ‘শরীরের যত্ন নে। তা নাহলে তোর বিপদ হবে।’
তবুও কবি লিখে যেতেন কষ্ট করে। অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে নিজের শরীরের উপর যে অত্যাচারটুকু তিনি করেন তাতে তাঁর শরীরে প্রথমে ম্যালেরিয়া ও পরে দুরারোগ্য যক্ষ্মারোগ হানা দেয়।
বন্ধুরা তাঁকে দেখতে আসতেন আর সাবধানবাণী শোনাতেন। কবি মুচকি হেসে বলতেন, ‘দেখবি একদিন পালিয়ে যাব ফাঁকি দিয়ে। এই ম্যালেরিয়া আর যক্ষ্মার আদরে আমি জর্জরিত।

এক কবিসভায় কোনো এক কবিবন্ধু তাঁকে পালকি করে নিয়ে গেছিলেন। সেই সভায় বন্ধুটি কবির সম্বন্ধে দু-চার কথা লিখেছিলেন। তিনি কবির সামনেই সেই লেখা পাঠ করেছিলেন। তিনি সভায় সকলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আট-নয় বছর বয়স থেকেই সুকান্ত লিখতে শুরু করেন। তিনি আমার বন্ধুসম। তাঁর কাছেই শোনা কথাগুলি আমি বর্ণনা করছি।’
কবি তো প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি বললেন, ‘আমাকে আগে এই কথা বললে না! আমার সামনে আমারই স্তুতি নিবেদন করবে তুমি? এ যে ভীষণ লজ্জার!’
বন্ধু বলেছিলেন, ‘আগে বললে উনি তো অনুমতি দিতেন না ভাই। তাই বলছি। আমাকে ক্ষমা কোরো।’
সমবেত সকলে হাততালি দিয়ে জয়ধ্বনি করলেন।
তারপর তাঁর বন্ধু বলতে শুরু করলেন, ‘আমি আমার বন্ধুর সাহিত্যকর্ম বিষয়ে কয়েকটি সংবাদ পরিবেশন করব। স্কুলের হাতে লেখা পত্রিকা সঞ্চয়-এ একটি ছোট্ট হাসির গল্প লিখে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন। তার দিনকতক পরে বিজন গঙ্গোপাধ্যায়ের শিখাকাগজে প্রথম ছাপার মুখ দেখে তাঁর লেখা বিবেকান্দের জীবনী। মাত্র এগারো বছর বয়সে রাখাল ছেলেনামে একটি গীতিনাট্য রচনা করেন তিনি। এটি পরে তাঁর হরতালবইতে সংকলিত হয়। বলে রাখা ভালো, পাঠশালাতে পড়বার কালেই ধ্রুবনাটিকার নামভূমিকাতে অভিনয় করেছিলেন সুকান্ত। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাল্যবন্ধু লেখক অরুণাচল বসুর সঙ্গে মিলে আরেকটি হাতে লেখা কাগজ সপ্তমিকাসম্পাদনা করেন। অরুণাচল তার আমৃত্যু বন্ধু ছিলেন। মার্কসবাদী চেতনায় আস্থাশীল কবি হিসেবে সুকান্ত কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থান করে নিয়েছেন। সুকান্তকে বলা হয় গণমানুষের কবি। অসহায়-নিপীড়িত সর্বহারা মানুষের সুখ, দুঃখ তার কবিতার প্রধান বিষয়। অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের স্বার্থে ধনী মহাজন অত্যাচারী প্রভুদের বিরুদ্ধে নজরুলের মতো সুকান্তও ছিলেন সক্রিয়। যাবতীয় শোষণ-বঞ্চনার বিপক্ষে সুকান্তের ছিল দৃঢ় অবস্থান। তিনি তাঁর কবিতার নিপুণ কর্মে দূর করতে চেয়েছেন শ্রেণী বৈষম্য। মানবতার জয়ের জন্য তিনি লড়াকু ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। অসুস্থতা, অর্থাভাব তাঁকে কখনও দমিয়ে দেয়নি। মানুষের কল্যাণের জন্য সুকান্ত নিরন্তর নিবেদিত থেকেছেন। তিনি মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বিদ্রোহের ডাক দিয়েছেন। তার অগ্নিদীপ্ত সৃষ্টি-প্রণোদনা দিয়ে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে প্রয়াসী হয়েছেন। মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কাব্যধারার প্রচলিত প্রেক্ষাপটকে আমূল বদলে দিতে পেরেছিলেন। সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা দৈনিক স্বাধীনতার (১৯৪৫) কিশোর সভাবিভাগ সম্পাদনা করতেন। তাঁর কবিতায় অনাচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ পাঠকদের উদ্বুদ্ধ করে তোলে। গণমানুষের প্রতি গভীর মমতার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর কবিতায়। তাঁর রচনাবলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল: পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠেকড়া (১৯৫১), অভিযান (১৯৫৩), ঘুম নেই (১৯৫৪), হরতাল (১৯৬২), গীতিগুচ্ছ (১৯৬৫) প্রভৃতি। পরবর্তীকালে উভয় বাংলা থেকে ‘সুকান্ত সমগ্র’ নামে তার রচনাবলি প্রকাশিত হয়। সুকান্ত ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পীসঙ্ঘের পক্ষে ‘আকাল’ (১৯৪৪) নামে একটি কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনা করেন। সুকান্তের কবিতা বিষয়বৈচিত্র্যে ও লেখার দক্ষতায় অনন্য। সাধারণ বস্তুকেও সুকান্ত কবিতার বিষয় করেছেন। বাড়ির রেলিং ভাঙা সিঁড়ি উঠে এসেছে তাঁর কবিতায়। সুকান্তের কবিতা সব ধরনের বাধা-বিপত্তিকে জয় করতে শেখায়। যাপিত জীবনের দুঃখ-যন্ত্রণাকে মোকাবিলা করার সাহস তাঁর কবিতা থেকে পাওয়া যায়। তারুণ্যের শক্তি দিয়ে উন্নত শিরে মানুষের মর্যাদার জন্য মানুষকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান সুকান্তের কবিতায় লক্ষণীয়। তাঁর কবিতা সাহসী করে, উদ্দীপ্ত করে। তাঁর বক্তব্যপ্রধান সাম্যবাদী রচনা মানুষকে জীবনের সন্ধান বলে দেয়। স্বল্প সময়ের জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্যকে অনেক কিছু দিয়ে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, জীবনানন্দ দাশ-সহ সে সময়ের বড়ো বড়ো কবির ভিড়ে তিনি হারিয়ে যাননি। নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন নিজ প্রতিভা, মেধা ও মনন দিয়ে। সুকান্ত তাঁর কম বয়সের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেছেন তাঁর পরিণত ভাবনায়। ভাবনাগত দিকে সুকান্ত তাঁর বয়স থেকে অনেক বেশি এগিয়ে ছিলেন। এখন তিনি ম্যালেরিয়া ও যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত। আপনাদের সাহায্য চাই।’
সকলের সমবেত প্রচেষ্টায় প্রিয় কবিকে রেড এড কিওর হোমে ভরতি করা হয়। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। যার ফলে ১৯৪৭ সালের ১৩ই মে তারিখে কলকাতার ১১৯ নম্বর লাউডন স্ট্রিটের ‘রেড এড কিওর হোমে’ তিনি অবশেষে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র একুশ।
স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেও তিনি স্বাধীন দেশের আনন্দ আস্বাদন করার সুযোগ পাননি।
_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

কমিকস:: কুট্টু দ্য বীরপুরুষঃ ভাগ্যান্বেষণে কুট্টু - ফ্র্যাঙ্ক কিং, অনুবাদঃ তাপস মৌলিক

_____

হাওয়াকল:: পুতুলের ঘর - সুজাতা চ্যাটার্জী

হাওয়াকল ।। পুতুলের ঘর
সুজাতা চ্যাটার্জী

এবারের হাওয়াকল বিভাগে দেখ কত সহজে কী সুন্দর পুতুলের ঘর তৈরি করা যায়। বসার ঘর, শোওয়ার ঘর, খাবার ঘর, কিচেন, বাথরুম - সমস্ত। কী করে তৈরি করবে? দেখে নাও নিচের ভিডিওতে।



_____

ম্যাজিক পেনসিলঃ ছোটোদের নিজস্ব বিভাগঃ জুলাই ২০২০

ম্যাজিক পেনসিল
ছোটোদের নিজস্ব বিভাগ

(১)

ছোট্ট শুভ্রজা তার জীবনের প্রথম লেখা ছড়াটি পাঠিয়েছে ম্যাজিক ল্যাম্পের জন্য, সঙ্গে আবার দারুণ একটা ছবিও এঁকে দিয়েছে দেখছি!

ব্যাঙ
শুভ্রজা চ্যাটার্জী

এক যে আছে ব্যাঙ,
তার যে আছে ঠ্যাঙ।
সে ডাকল, মা
মা বলল, না
সে তখন কাঁদে
মা তখন ছাদে।


পরিচিতি
শুভ্রজা চ্যাটার্জী
বয়স ৬ বছর, প্রথম শ্রেণি, সেন্ট জেনেভিভ, ব্রাসেল্‌স, বেলজিয়াম

(২)

নিচের সুন্দর ছবিটি এঁকে পাঠিয়েছে ক্লাস সিক্সের প্রবাহনীল দাস।


পরিচিতি
প্রবাহনীল দাস
ষষ্ঠ শ্রেণি, একমি একাডেমি, কালনা, পূর্ব বর্ধমান, ৭১৩৪০৯
_____