বিজ্ঞান:: শেষপাতে দই - অমিতাভ প্রামাণিক


শেষপাতে দই
অমিতাভ প্রামাণিক

শেষপাতে দই বাঙালি বহুকাল ধরে খেয়ে আসছে, তবে নেপোয় মারে দইকথাটা নেপোলিয়নের জন্মের আগে থেকে চালু ছিল কিনা তাতে ঘোর সন্দেহ আছে মিষ্টি দই বাঙালির প্রিয় খাদ্য এবং সারা ভারতে সেটা বেঙ্গলি ডেলিকেসি বলে পরিচিত হলে কী হয়, বাঙালি বা ভারতীয়দের তুলনায় দধিপ্রীতিতে বহু এগিয়ে আছে ইওরোপের একটি দেশ বালগেরিয়া দই ছাড়া সেখানকার লোকেদের কোনো খাদ্যই মুখে রোচে না আমরা যতই দই-ইলিশ, দই-পটল, দই-চিঁড়ে, দধিকর্মা, দইবড়া বা দৈবাৎ দই-ভাত খাই বা দহি-হান্ডি ফাটাই না কেন, তাদের সব কিছুতেই দই চাই তাদের অমল জানালার ধারে বসে থাকলে দইওয়ালা এসে জিজ্ঞেস করবে না দই চাই কিনা এমনিই নামিয়ে দিয়ে যাবে দইয়ের ভাণ্ড বিশ্বকে লস্যিও নাকি দিয়েছে তারাই
কিন্তু দইয়ের মাহাত্ম্য যে কী, তার পেছনেও গল্প আছে
১৯০৫ সালে, যখন দুই বাংলার বদমাশরা নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি আর মারামারি করছিল, সেই সময় স্ট্যামেন গ্রিগোরভ নামে এক বালগেরিয়ান গবেষক সুইজারল্যান্ডের জেনিভায় গবেষণা করছিল প্রোফেসর লিয়ন মাসোল নামে এক বিজ্ঞানীর ল্যাবরেটরিতে তার গবেষণার বিষয় দই দুধ থেকে দই কীভাবে হয়, সেই বিষয় নিয়ে সে ঘাম ঝরাচ্ছিল এতদিন সে বছরই সে বের করে ফেলল যে ব্যাসিলাস গোত্রের এক বিশেষ ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবেই দুধ জমে হয়ে যায় দই তখন তার বয়স সাতাশ বছর
উল্লেখ্য, গ্রিগোরভ জন্মেছিল সাতাশে অক্টোবর, ১৮৭৮ সালে এবং মারাও গিয়েছিল সাতাশে অক্টোবরেই, ১৯৪৫ সালে সাতাশ সংখ্যাটার সঙ্গে তার বেশ ঘনিষ্ঠতা বোঝা যাচ্ছে। জন্ম তার বালগেরিয়ার এক ক্ষুদ্র শহরে ফ্রান্সে ন্যাচারাল সায়েন্সে মাধ্যমিক স্তরের পাঠ শেষ করে সে হাজির হয়েছিল জেনিভায়, সেখানেই এই আবিষ্কার এই আবিষ্কার আধুনিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফার্মেন্টেশন বা গাঁজন প্রক্রিয়ার জন্ম দিল একজন বালগেরিয়ানের কৃতিত্বকে স্মরণে রাখতে সেই ব্যাকটেরিয়ার নামকরণ করা হল ল্যাক্টোব্যাসিলাস বালগেরিকাস এবং তারও পরে অ্যান্টার্কটিকার এক হিমবাহের নামকরণ করা হয় গ্রিগোরভ গ্লেসিয়ার
গ্রিগোরভ দই নিয়ে আরও গবেষণা করেছিলেন এবং প্রমাণ পেয়েছিলেন বিভিন্ন আন্ত্রিক রোগে দই খাওয়ার সুফল তবে দুধ ঘন হয়ে ঠিক কীভাবে দই হয়, তার ঠিকঠাক ব্যাখ্যা এসেছে আরও পরে
তার মানে এই নয় যে ভারতীয়রা দইয়ের ব্যবহার জানত না সেই বৈদিক যুগ থেকে পঞ্চগব্য (দুগ্ধ, দধি, ঘৃত, গোময়, গোমূত্র) পঞ্চামৃতের ব্যবহার জানা
দধি দুগ্ধং ঘৃতঞ্চৈব শর্করাসংযুতং মধু
পঞ্চামৃতমিদং প্রোক্তং বিধেয়ং সর্বকর্মেষু।।
অর্থাৎ সমস্ত কর্মে দধি-দুগ্ধ-ঘৃত-শর্করা এবং মধুএই পঞ্চ অমৃতের ব্যবহার বিধেয়
আয়ুর্বেদে দইয়ের গুণ ফলাও করে বর্ণনা করা আছে অবশ্য আয়ুর্বেদমতে রাতে দই খাওয়া নিষেধ – ন নক্তং দধি ভুঞ্জীত দই থেকে যে তক্র প্রস্তুত হয়, তারও প্রচুর কাহিনি বিদেশিরা যতই দাবি করুক লস্যি তাদের দান, আয়ুর্বেদমতে তক্র পাঁচ প্রকার - ঘোল, মথিত (মাঠা), তক্র, উদশ্বিৎ ছচ্ছিকা সরের সঙ্গে নির্জলা দই মন্থন করলে তাকে বলে ঘোল সরবিহীন নির্জলা দই মেড়ে তৈরি হয় মথিত বা মাঠা এক-চতুর্থাংশ জল দিয়ে দই মন্থন করলে তাকে তক্র আর আদ্ধেক জলের সঙ্গে দই মন্থন করলে তাকে উদশ্বিৎ বলে প্রচুর জল ঢেলে দই মাড়লে যে স্বচ্ছপদার্থ তৈরি হয় তাকে বলে ছচ্ছিকা অর্থাৎ কিনা ছাস
মেসোপটেমিয়ায় ৫০০০ বছর আগে দই ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে রোমের প্লিনি দ্য এল্ডার লিখে গেছেন এক যাযাবর বর্বর জাতির কথা, যারা দুধকে ঘন করে অম্ল এক খাদ্য বানাতে পারে
দই সম্ভবত যাযাবরদেরই আবিষ্কার দুধ তারা বয়ে নিয়ে যেত পশুচর্মের থলিতে সেখান থেকেই ল্যাক্টোব্যাসিলাস ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হয়ে তৈরি হত দই
গ্রিগোরভের গবেষণায় উৎসাহিত হয়ে প্যারিসের পাস্তুর ইন্সটিট্যুটের নোবেলজয়ী রাশিয়ান বিজ্ঞানী এলি মেশনিকফ দইয়ের ওপর পরীক্ষানিরীক্ষা চালান দাবি করেন দই মানুষের আয়ু বর্ধন করে ইনি ফ্যাগোসাইট বা মাইক্রোফাজ আবিষ্কার করেছিলেন যা থেকে মানুষের স্বয়ংক্রিয় রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতার (ইনেট ইমিউনিটি) প্রথম হদিশ মেলে ১৮৮৩ সালে ইনি আবিষ্কার করেছিলেন কিছু শ্বেত রক্তকণিকা শরীরে অনুপ্রবেশকারী ক্ষতিকর পদার্থ যেমন ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হলে তাদেরগিলে খেয়েধ্বংস করে দিতে পারে, যার নাম দেওয়া হল ফ্যাগোসাইটোসিস এর জন্যেই নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন তিনি ১৯০৮ সালে
১৯০৮ সালেই প্রকাশিত মেশনিকফের সেই ঐতিহাসিকদ্য প্রলঙ্গেশন অভ লাইফঅপ্টিমিস্টিক স্টাডিজপ্রকাশিত হতেই সারা বিশ্বে আলোড়ন পড়ে গেল ইনি বললেন অত্যধিক দধিপ্রীতিই বালগেরিয়ানদের, বস্তুত দক্ষিণ-পূর্ব ইওরোপ রাশিয়ার বিস্তীর্ণ তৃণভূমির অধিবাসীদের বহু বছর সুস্থ অবস্থায় বেঁচে থাকার কারণ তাঁর ধারণা ছিল, বার্ধক্যের কারণ হচ্ছে অন্ত্রে ক্লস্ট্রিডিয়া ধরণের প্রোটিওলাইটিক ব্যাকটেরিয়া, যাদের সংক্রমণে ফেনল, অ্যামোনিয়া, ইন্ডোল ইত্যাদি ক্ষতিকর পদার্থ তৈরি হয় প্রোটিওলাইটিক ব্যাকটেরিয়া প্রোটিন ভেঙে ফেলে তিনি ভাবলেন, ল্যাকটোব্যাসিলাস যেহেতু প্রোটিনসমৃদ্ধ দুধ নষ্ট হতে দেয় না, তার মানে এর মধ্যে এমন কিছু আছে যা প্রোটিওলাইটিক ব্যাকটেরিয়াকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে আরও দেখলেন উপরোক্ত অঞ্চলের অধিবাসীরা নিয়মিত দই খায় আর সাধারণভাবে বেশিদিন বাঁচে দুটোর মধ্যে নিশ্চয় যোগাযোগ আছে, অর্থাৎ দই খাওয়াই তাদের আয়ুবৃদ্ধির কারণ, বলে দিলেন তিনি
ততদিন অবধি আমেরিকানরা দই কী জিনিস জানত না এবার তারা নড়েচড়ে বসল আয়ুবৃদ্ধি করতে অমরত্ব পেতে কে না চায়?
সুযোগ পেয়ে বাণিজ্যিক স্কেলে দই উৎপাদন নিয়ে মাথা ঘামানো শুরু করল খাদ্য প্রস্তুতকারী সংস্থারা প্রাচীন অটোমান, বর্তমানে গ্রিসের সালোনিকা শহরের আইজ্যাক কাসারো নামে এক ব্যবসায়ী স্পেনের বার্সেলোনায় শুরু করেছিল এক ছোটোখাটো দইয়ের ব্যাবসা তার ছেলে ড্যানিয়েলের নাম অনুসারে কোম্পানির নাম দিল সে ড্যানন ইওরোপ থেকে আমেরিকায় পাড়ি দিয়ে ব্যাবসা ফুলে-ফেঁপে উঠতে সময় লাগল না দইয়ের মধ্যে বিভিন্ন ফ্লেভার কাটা ফল বা তাদের জ্যাম মিশিয়ে পেটেন্ট নেওয়া শুরু হয়ে গেল
আমেরিকানরাই বা পিছিয়ে থাকবে কেন? মিশিগানের জন হার্ভে কেলগভবিষ্যৎ দুনিয়া যাকে চিনবে ব্রেকফাস্ট সিরিল কর্নফ্লেক্সের জন্যে, যা তিনি শুরু করেছিলেন ভাই উইলিয়াম কীথ কেলগের সঙ্গে কেলগসব্র্যান্ড দিয়েশুরু করলেন দইয়ের ব্যাবসা সার্কিস আর রোজ কলম্বোসিয়ান নামে দুই আর্মেনিয়ান ইমিগ্রান্ট ম্যাসাচুসেটসে চালু করল কলম্বো অ্যান্ড সন্স ক্রিমারি নামে এক কোম্পানি নিউ ইংল্যান্ডে তারা ঘোড়ায়-টানা ওয়াগনে দই বিক্রি করত মাদজু নাম দিয়ে মাদজু হচ্ছে দইয়ের আর্মেনিয় নাম পরে সেটাই তুর্কি ভাষায় পরিবর্তিত হয়ে নাম নিলইয়োগার্ট দইয়ের বিক্রি বাড়লেও আমেরিকানদের জিভে তা অত্যন্ত টক খাদ্য হিসাবেই বিবেচ্য ছিল পরে এর সঙ্গে চিনি ফল-টল মিশিয়ে কলম্বো ইয়োগার্ট সুষম খাদ্য হিসাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠল
বাঙালিদের মিষ্টি দই ঠিক কবে থেকে চালু হয়েছে, তা অবশ্য আমি জানি না
ল্যাক্টোব্যাসিলাস বালগেরিকাস নিয়ে গবেষণা করে জানা গেছে এরা . থেকে . পি এইচে সবচেয়ে দ্রুত বাড়ে দুধ থেকে দই বানাতে এরা একা রাম নয়, বরঞ্চ এদের সঙ্গে স্ট্রেপ্টোকক্কাস থার্মোফিলাস নামে আর এক সুগ্রীব দোসর থাকলে সুবিধা, এরা একেবারে মাসতুতো ভাই গোত্রের ল্যাক্টোব্যাসিলাস দুধের প্রোটিন, যার নাম কেসিন, তাকে ভেঙে অ্যামাইনো অ্যাসিড তৈরি করে, সেটার ওপর তখন লেগে পড়ে এই স্ট্রেপ্টোকক্কাস, দুজনে মিলে তৈরি করে ল্যাকটিক অ্যাসিড এই ল্যাকটিক অ্যাসিডই দইয়ের অম্লত্বের কারণ অ্যাসিড তৈরি হতেই দুধের কেসিন প্রোটিন ডিনেচার্ড হয়ে তঞ্চিত (কোয়াগুলেটেড) হয়ে যায়, ফলে দুধ ঘন হয়ে যায় এর সঙ্গে খুব অল্প পরিমাণে অ্যাসিট্যালডিহাইডও তৈরি হয়, যা দইয়ের টক টক গন্ধের কারণ
২০১২ সালে ভারতের পরিবেশ, অরণ্য আবহাওয়া পরিবর্তন মন্ত্রক সায়েন্স এক্সপ্রেস বায়োডাইভার্সিটি স্পেশাল নামে এক বিশেষ শিক্ষামূলক ট্রেন চালায় প্রধানত স্কুলের শিক্ষার্থীদের জীবাণু সম্বন্ধে বিশেষভাবে অবহিত করে তোলা ছিল এই ট্রেনের উদ্দেশ্য যে সমস্ত স্টেশনে এই ট্রেন থামে, সেখানকার স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জীবাণু সম্বন্ধে আকৃষ্ট করে তোলা ছাড়াও এক ভোটিং-এর ব্যবস্থা করা হয় কোন জীবাণুকে ভারতের জাতীয় জীবাণুর সম্মান দেওয়া যায়, তার ওপর ছাত্রছাত্রীদের ভোটের বিচারে এই সম্মানের প্রাপক হয় ল্যাক্টোব্যাসিলাস বালগেরিকাস
২০১৪ সাল থেকে একে ল্যাক্টোব্যাসিলাস ডেলব্রুয়েকাই নামেও ডাকা হতে থাকে
দই খাও, দই ভালো জিনিস যাদের মডারেট ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স আছে অর্থাৎ দুধের ল্যাকটোজ সুগার যারা হজম করতে পার না, তারাও দই খেতে পার, কেননা ল্যাক্টোব্যাসিলাস ল্যাকটেজ এনজাইম দিয়ে দুধের ল্যাকটোজ বিভিন্ন মাত্রায় ভেঙে ফেলতে পারে আন্ত্রিক গোলযোগে যারা অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে শরীরের উপকারী ব্যাকটেরিয়াদের মেরে ফেলতে বাধ্য হও, তারা অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স শেষ হলে ডাক্তারের পরামর্শে দই খেতে পার, তাতে অন্ত্রে উপকারী ন্যাচারাল ব্যাকটেরিয়ার কলোনি দ্রুত প্রতিস্থাপিত হয় বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা
তবে আর কী! হয় সহজপাঠের মতন ‘বাটি হাতে এ ঐ / হাঁক দেয় দে দই’ শুরু করো, অথবা চণ্ডালিকার মতো ‘দই চাই গো দই চাই, দই চাই গো!/ শ্যামলী আমার গাই, তুলনা তাহার নাই’ গাইতে লেগে যাও।
_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

বিজ্ঞান:: একটা লম্বা সফরের কাহিনি (অষ্টম পর্ব) - দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য


একটি লম্বা সফরের কাহিনি
দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

।।  পর্ব আট ।।

অক্টোবর ২, ১৮৩৫
ক্রেটার জেটি থেকে রওনা হওয়া গেল। তবে দিনের বেশির ভাগ সময়টাই পালে বিলকুল হাওয়া না থাকার ফলে দুই দ্বীপের মাঝখানের খাঁড়িটার মধ্যেই থেকে যেতে হল।

অক্টোবর ৩
আলবের্মাল (আগের এপিসোডে সামান্য ভুল হয়েছিল এই নামটায়। - অনুবাদক) দ্বীপের উত্তর কোণের কাছাকাছি পৌঁছোনো গেল অবশেষে। জায়গাটা একেবারে ন্যাড়া। উঁচু উঁচু আগ্নেয় ঢিবি আর তার গায়ে ছোটো ছোটো মৃত জ্বালামুখ ছড়িয়ে আছে চারপাশে। জ্বালামুখগুলো থেকে পুরোনোকালের লাভাস্রোতের জমাট বাঁধা কালো কালো ধারা বের হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে গেছে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন তাল তাল কাদা জমে রয়েছে। ক্রান্তিয় অঞ্চলে, অর্থাৎ কর্কটক্রান্তি আর মকরক্রান্তির মধ্যেকার এলাকাটায় প্রায় পঁচাত্তর মাইল লম্বা এ-হেন সম্পূর্ণ নিষ্কর্মা জমি বোধ হয় আর দ্বিতীয়টি নেই। এদিকে জাহাজ যেন আর চলতে চাইছে না। একে হাওয়া নেই, তায় উলটোমুখো স্রোত বইছে সমুদ্রে।

অক্টোবর ৮
অবশেষে জেমস দ্বীপে পৌঁছোনো গেল। পাঁচ-পাঁচটা দিন কেটে গেছে এই পঞ্চাশ মাইল পাড়ি দিয়ে আসতে। এইখানে আমি নেমে গেলাম। সঙ্গে মিস্টার বাইনো, আরও তিনজন লোক। আমাদের নামিয়ে জাহাজ চলে গেল চ্যাথাম দ্বীপ থেকে জল তুলে আনতে। নেমে দেখি সেখানে চার্লস দ্বীপ থেকে একটা দল এসেছে। জানা গেল মিস্টার লসন তাদের পাঠিয়েছেন মাছ আর কচ্ছপ ধরে শুঁটকি বানিয়ে নিয়ে যাবার জন্য। ওইসঙ্গে কচ্ছপের মাংস থেকে খানিক তেলও বের করে নিয়ে যাবে তারা। ঠিক হল দ্বীপে যদ্দিন থাকব, এদের থেকেই খাওয়াদাওয়ার রসদ নেওয়া হবে।
উপকূল থেকে অল্প খানিক দূরে একটা ছোটো নাবাল জায়গার ভেতর আমাদের তাঁবু পড়ল। দুটো পুরোনো জ্বালামুখ জুড়ে জায়গাটা তৈরি। ভারী সরু একটা জলের ধারা রয়েছে তার মাঝখানে। এককালে এই জ্বালামুখরাই লাভা উগরে এই দ্বীপগুলোর জন্ম দিয়েছে।

অক্টোবর ৯
সঙ্গে একজন গাইড জুটিয়ে নিয়ে আমরা চললাম দ্বীপের ভেতরের উঁচু এলাকার দিকে। এখানে চার্লস দ্বীপ থেকে আসা দলটার কয়েকজন মিলে তখন কচ্ছপ শিকারে ব্যস্ত। প্রায় মাইল ছয়েক খাড়াই জমি পেরোবার পর হাজার দুয়েক ফিট উচ্চতায় পৌঁছে প্রথম সবুজের আভাস চোখে পড়ল। এইখানটায় দুটো কুঁড়ে বানিয়ে লোকগুলো ঘাঁটি গেড়েছে। এর নিচের এলাকাটা একেবারেই চ্যাথাম দ্বীপের মতো। বিলকুল শুকনো। গাছগুলোর গায়ে কোনো পাতা নেই। লক্ষ করে দেখলাম একই জাতের গাছ হলেও এই দ্বীপে সেগুলো বেশ বড়ো আকৃতি নিয়েছে, প্রায় বৃক্ষ পর্যায়ে ফেলা যায় তাদের। তবে হ্যাঁ, খুব বেশি উঁচু নয়। ডালগুলো নিচু, কুঁকড়ে যাওয়া চেহারা তাদের। এখান থেকে আরও দু’মাইল এগোলে হাজার তিনেক ফিট উচ্চতায় কয়েকটা ছোটো ছোটো কুণ্ডি আছে। জল তাদের সামান্য, কিন্তু ভারি ঠাণ্ডা আর মিষ্টি। দ্বীপের ভেতরের এলাকায় এগুলো ছাড়া জলের আর কোনো উৎস নেই। দিনের বেশির ভাগ সময় ধরে দ্বীপের উঁচু এলাকাটার মাথায় মেঘ জমে থাকে। তার বাষ্প জমে জমে গাছপালার ডাল বেয়ে বৃষ্টির মতো ফোঁটা ফোঁটা জল নামে। ফলে এই এলাকাটায় কাদাটে মাটি আর ভেজা উজ্জ্বল সবুজ অরণ্যের রাজত্ব। খানিক নিচের চোখে জ্বালা ধরানো শুকনো এলাকা ছাড়িয়ে উঠে আসতেই এই ভেজা, সবুজ প্রকৃতি খানিক অবিশ্বাস্য ঠেকে। চার্লস দ্বীপেও সেই একই ব্যাপার দেখেছি। উচ্চতার সামান্য হেরফেরে একই দ্বীপের প্রকৃতিতে এত বিশাল বদল বেশ চমকদার।

অক্টোবর ১১
কচ্ছপ মারতে আসা দলটার একজন নৌকো করে আমাদের উপকূল ধরে ধরে মাইল ছয়েক দক্ষিণে একটা নোনতা জলের ঝিলে নিয়ে গিয়েছিল। পথে একটা জমাট লাভাস্রোত পড়ল। স্রোতটার বয়েস তুলনায় কম। এখনও একেবারে ন্যাড়া। একটা প্রাচীন জ্বালামুখকে ঘিরে বয়ে গিয়েছে। আমাদের ঝিলটা ছিল এই জ্বালামুখটার ভেতরে। তিন থেকে চার ইঞ্চি জল তাতে। আকারে গোল। জলের নিচে জমাট নুনের স্ফটিকের অসামান্য সব প্রাকৃতিক ভাস্কর্য। ঝিলের চারপাশে উজ্জ্বল সবুজ রঙের রসালো গাছগাছড়ার ভিড়। জ্বালামুখটার ধারগুলো খাড়াই। তাতে ঘন জঙ্গল।
সব মিলিয়ে ভারী সুন্দর একটা শান্ত পরিবেশ। তবে ঝোপের ভেতর পড়ে থাকা একটা মানুষের খুলি খানিক অন্য খবরও দিচ্ছিল। জানা গেল বছর কয়েক আগে এক জাহাজের মাল্লারা তাদের ক্যাপ্টেনকে এইখানে এনে খুন করে। খুলিটা সেই হতভাগ্য ক্যাপ্টেনের।
এইখানটায় অনেক অদ্ভুত দর্শন ক্যাকটাসের ভিড়। তাদের গোল গোল রসালো পাতা বড়ো বড়ো ডান্ডার মতো ডাল দিয়ে চোঙ আকৃতির মূল কাণ্ডের সঙ্গে জোড়া। (সঙ্গে ডারউইনের নোটবইয়ের মার্জিনে তাঁর নিজের আঁকা সেই ক্যাকটাসের ছবি রইল - অনুবাদক।)


এছাড়া রয়েছে লজ্জাবতীর গাছ। (মাইমোসা পুদিকা। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা। বেশ খানিক উঁচু গাছ হয়। - অনুবাদক) খাড়া রোদের ভেতর সে গাছের ছায়ায় বসে ভারী আরাম পাচ্ছিলাম আমরা।


অক্টোবর ১২ থেকে অক্টোবর ১৬
বারো তারিখে ফের একবার আমাদের ক্যাম্প ছেড়ে কুঁড়েগুলোয় ফিরে এলাম। এ যাত্রা সঙ্গে একটা কম্বলের স্লিপিং ব্যাগ নিয়ে এসেছি। দিন দুয়েক সেখানে ঘাঁটি গেড়ে বেশ কিছু নমুনা জোগাড় করা গেল। অনেক গাছগাছড়া আছে এখানে। বিশেষ করে নানাজাতের ফার্ন। তবে গাছের গায়ে গজানো ফার্ন এখানে নেই। গাছপালাগুলোর গায়ে ছেয়ে থাকা যৌগিক ফুলের বাহার তাদের ক্রান্তীয় চরিত্রের প্রমাণ দিচ্ছিল। ফুলগুলো হল ল্যাটিন ভাষায় যাকে বলে সিনগাইনেশিয়াস, মানে একটাই গর্ভকোষের মাথায় অনেকগুলো করে পুংকেশর জুড়ে থাকে (উদাহরণঃ সূর্যমুখী ফুল- অনুবাদক। সঙ্গে একটা ছবি দেওয়া হল তার)


স্থলবাসী কচ্ছপদের একটা বৈশিষ্ট্য হল, সুযোগ পেলে এরা একসঙ্গে অনেকটা করে জল খেয়ে নেয় পেট পুরে। ফলে উঁচু এলাকার এই ঝরনাগুলোর চারপাশে তাদের ভিড় জমে। গড়ে প্রায় গজখানেক করে লম্বা এখানকার কচ্ছপরা। কয়েকটার খোলার পরিধি তো ছয় থেকে আট ফিট করে দেখা গেল। গায়ে এত জোর যে পিঠে বসলে দিব্যি বয়ে নিয়ে হেঁটে চলে যায়। একজনের পক্ষে তাদের মাটি থেকে টেনে তোলা অসম্ভব। চলার পথে তাদের অনেকেরই দর্শন মেলে সবসময়। একদল জল খেতে চলেছে তো অন্যদল পেট পুরে জল-টল খেয়ে ফেরার পথ ধরেছে। দৃশ্যটা খুব মজার হয়। ছোটোখাটো পাহাড়ের মতো কতগুলো প্রাণী, গম্ভীরবদনে লম্বা গলা বের করে অতি সাবধানে পা ফেলে ফেলে চলেছে। গতি ঘন্টায় ৩৬০ গজ মতো হবে। অর্থাৎ দিনে চার মাইল। জলের ধারে এসে একবার পৌঁছোলেই অবশ্য আর তাদের কোনো সাবধানতা থাকে না। বেহুঁশ হয়ে চোখ অবধি মুণ্ডু কাদাজলের ভেতর গুঁজে দিয়ে চলে জল খাবার পালা। আশপাশে তখন কে এল কে গেল সেদিকে তাদের আর কোনো হুঁশ নেই।
যেখানেই জলের কুণ্ডি তার চারপাশ দিয়ে বেশ চওড়া রাস্তা চলে গেছে মাইলের পর মাইল। সব এই কচ্ছপদের যাওয়া আসার ফল। ওই রাস্তার নিশানা দেখেই মেছুড়েরা এ দ্বীপের জলের কুণ্ডিগুলোর খোঁজ বের করেছে।
জল থাকবার দরুন দ্বীপের উঁচু এলাকাটা হল কচ্ছপদের রাজত্ব। দ্বীপের শুকনো নিচু এলাকাটায় ক্বচিৎ তাদের দেখা মিলবে। ও এলাকাটা হল গিয়ে হলদে রঙের বড়ো বড়ো নিরামিশাষী গিরগিটিদের রাজত্ব (ইউরোম্যাসটিকস অনুবাদক)গোটা জমি জুড়ে তাদের গর্তের এত প্রাদুর্ভাব যে তাঁবু ফেলবার জায়গা ঠিক করা নিয়ে আমাদের বেশ সমস্যাই হয়েছিল। গাছের পাতা এদের প্রিয় খাবার। বিশেষ করে লজ্জাবতীর পাতা। সে জিনিস খাবার জন্য এরা দিব্যি গাছ বেয়ে তার টঙ-এ চড়ে বসে। এছাড়া, কখনও জল খায় না বলে ক্যাকটাসের রসালো ডাল খেতেও এরা ভালোবাসে খুব। একজন যদি বেশ পুরুষ্টু একটুকরো ক্যাকটাসের টুকরো নিয়ে খেতে বসে তো আর দশটা এসে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কুকুরের মতো মারপিট জুড়ে দেবে সেই খাবারের ভাগ নিয়ে।


এদেরই জাতভাই যে ইম্‌প্‌স অব ডার্কনেস নামের গিরগিটি তারাও একইভাবে সমুদ্রের আগাছা খেয়ে জীবন কাটায়। (মেরিন ইগুয়ানা। সঙ্গে তাদের সমুদ্রের নিচে ঘাস খেয়ে বেড়াবার ছবি রইল - অনুবাদক)


এখানকার দ্বীপগুলো দেখে আমার কেবল ফার্নান্দো নোরোন্‌হা দ্বীপমালার কথা মনে হচ্ছিল। (আটলান্টিকের বুকে একুশ দ্বীপের সমষ্টি। ব্রাজিল উপকূল থেকে সাড়ে তিনশো কিলোমিটার দূরে - অনুবাদক) জমির চরিত্র, গাছপালা, সবই একরকম দু’জায়গাতে, শুধু এখানে যেটা নেই সেটা হল নোরোনহার সৌন্দর্য। বড়ো রুক্ষ এই দ্বীপগুলো।
যে দু’দিন কুঁড়েগুলোতে ছিলাম সে সময়টা কচ্ছপের তেল দিয়ে ভাজা কচ্ছপের মাংস খেয়েই কাটানো গেল। এছাড়া, কাছিমের বুকের দিকের শক্ত চাকতিটাকে মাংস শুদ্ধ রোস্ট করা হত গচোদের কার্নে কন কুয়েরোস্টাইলে। আর রান্না হত কচি কচ্ছপের স্যুপ। এই স্যুপ অতি উপাদেয় খাবার। বাকিগুলো মোটামুটি চলনসই।
এই পাঁচ দিন ধরে আমাদের ব্যস্ততার শেষ ছিল না। সারা দিন নানান নমুনা খুঁজে বেড়ানোয় ব্যস্ত থাকতে হত। ইতিমধ্যে আবার আর এক উৎপাত এসে জুটেছিল। আগেই বলেছি, আমাদের ক্যাম্প ছিল সমুদ্রের কাছাকাছি। একদিন একটা উত্তুরে ঝড় আসতে সমুদ্র উঠে এসে ক্যাম্পটাকে ভাসিয়ে দিয়ে গেল একেবারে। ফলে সেখানে যে মিষ্টি জলের খুদে উৎসটা ছিল সেটা গেল নষ্ট হয়ে। খুবই অসুবিধেয় পড়তাম হয়তো আমরা, কিন্তু ঠিক তখন, দেবদূতের মতো একটা আমেরিকান তিমি-শিকারি জাহাজ এসে উপস্থিত। আমাদের দশা দেখে তারা দয়াপরবশ হয়ে তিন পিপে মিষ্টি জল দিয়ে গেল (সঙ্গে এক ঝুড়ি পেঁয়াজ)গোটা যাত্রাটাতেই দেখেছি, যখনই দেখা হয়েছে আমেরিকানরা কিন্তু বেশ ভালো ব্যবহার করেছে আমাদের সঙ্গে। অন্তত আমাদের দেশোয়ালি ভাইরা দেখাসাক্ষাত হলে যা ব্যবহার দেখিয়েছে একাধিকবার, তার চাইতে অনেক ভালো। ইংরেজদের আমেরিকান সম্বন্ধে যা মনোভাব, তাদেরও যদি ইংরেজদের ব্যাপারে তেমনটা হয়েও থাকে, তবু, অন্তত মুখোমুখি হলে তারা সেটা কখনোই আমাদের দেখায়নি।

অক্টোবর ১৬
বেজায় গরম পড়েছে। আকাশে মেঘের ছিটেফোঁটা অবধি নেই। রোদের তেজ গায়ে জ্বালা ধরায়। মাঝেমধ্যে বাণিজ্যবায়ুর স্রোত ঘন্টাখানেকের জন্যে বন্ধ হলেও তেতেপুড়ে একশা হতে হচ্ছে। গত দু’দিন ধরে তাঁবুর ভেতর থার্মোমিটার ঘন্টার পর ঘন্টা তিরানব্বই ডিগ্রি ফারেনহাইটে দাঁড়িয়ে। বাইরে খোলা আকাশের নিচে সেটা দাঁড়াচ্ছে ৮৫ ডিগ্রিতে। বালি একেবারে আগুনের মতো গরম। হলদে বালিতে থার্মোমিটার গুঁজে দিতে সঙ্গে সঙ্গে পারা চড়ে বসল ১৩৭ ডিগ্রিতে। ওর ওপরে আর দাগ নেই, নইলে আরও কতদূর উঠত কে জানে। আর কালো বালিগুলো তো ওর চাইতেও বেশি গরম। এমনকি পুরু বুট পরেও ওর ওপর পা দিলে পুড়ে যাবার দাখিল।

অক্টোবর ১৭
বিকেলে বিগ্‌ল্‌ থেকে নৌকা এল আমাদের নিয়ে যাবার জন্য।

অক্টোবর ১৮
আলবের্মাল-এর জরিপের কাজ শেষ হল অবশেষে। এর পুবের দিকটা নতুন বেরিয়ে আসা লাভার দরুণ একেবারে ঘোর কালো। দ্বীপের প্রধান পাহাড়গুলোর ওপরে নিঃসন্দেহে বড়ো বড়ো কড়াইয়ের মতো জ্বালামুখ থাকবে। পাহাড়গুলো একেকটা চার হাজার ফিটের চাইতেও বেশি উঁচু। কিন্তু চেহারায় বেশ মোটাসোটা গোলগাল হবার ফলে উচ্চতাটা ঠিক বোঝা যায় না।

অক্টোবর ১৯
রাতে জাহাজ চালিয়ে অ্যাবিংডন দ্বীপে (বর্তমান নাম আইলা পিন্টা) গিয়ে সকাল সকাল মিস্টার শ্যাফার্সকে তুলে নেয়া হল সেখান থেকে। তারপর রওনা হলাম উত্তরমুখো প্রায় শ’খানেক মাইল দূরে দাঁড়ানো দুটো ছোটো ছোটো দ্বীপের উদ্দেশে (কালপেপার আর ওয়েইনম্যান দ্বীপ)

অক্টোবর ২০
খুদে দ্বীপদুটোর সমীক্ষা শেষ করে এখানকার কাজ মোটামুটি শেষ হল। জাহাজের মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া হল ওটেহাইট-এর দিকে (তাহিতি দ্বীপের পুরোনো নাম)শুরু হল ৩২০০ মাইলের আরেকটা দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা।
এবার লক্ষ্য তাহিতি।
(এরপর আগামী সংখ্যায়)
_____

ভ্রমণ:: আচানকমারে আচমকা - অরিন্দম দেবনাথ

আচানকমারের প্রবেশ দ্বার
আচানকমারে আচমকা
অরিন্দম দেবনাথ

ছত্তিশগড়ের আচনকমার টাইগার রিসার্ভ পর্যটকদের কাছে খুব একটা পরিচিত নয়। কিন্তু এখানে বাঘের সংখ্যা ৪২। এই জঙ্গলের গল্প শুনিয়েছেন অরিন্দম দেবনাথ।

রাসেল ভাইপার...।”
কোথায় কোথায়...।
আচানকমার টাইগার রিসার্ভ-এর শাল, মহুয়া আর বাঁশ গাছের ঝরা পাতায় ঢাকা পাহাড়ি মেঠো রাস্তায় আচমকা হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল গাড়িটা। ড্রাইভ করতে থাকা ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার বিলাসপুরের রিশলু লাহিড়ী সামনে রাস্তার দিকে আঙ্গুল দেখাল
গাড়ির পেছনের আসনে বসে ভালো করে কিছু বোঝার আগেই হলুদের ওপর কালো চাকা চাকা দাগওয়ালা সাপটার অর্ধেক শরীর রাস্তা পার হয়ে পাতার স্তুপের আড়ালে চলে গেছে। শুধু ডাইনে বাঁয়ে নড়তে থাকা ছিপছিপে লেজের খানিকটা অংশ নজরে এল। মাটিতে পড়ে থাকা শাল আর বাঁশ পাতার নাড়াচাড়া দেখে সাপটার বাঁশ ঝাড়ে ঢুকে যাওয়াটা আন্দাজ করতে পারলাম।
রিশলু বলল, ফুট চারেক লম্বা হবে ভাইপারটা, ইশশশশ ছবিটা...।
সাপটা এত দ্রুত রাস্তা পার করল যে ক্যামেরা তোলার সময় পাইনি কেউ। খানিক আগে এক বাঁশের ঝোপে কয়েকটা শাল গাছের ফাঁকে এক মস্ত বাইসন দেখেছি। ক্ষণিক দেখা দিয়েই গাছের আড়ালে চলে গেছিল বাইসনটা। গাড়ি চালাতে চালাতে বাইসনদের নিয়ে বেশ কয়েক বছর আগে এই জঙ্গলে ওঁর অভিজ্ঞতার কথা শোনাচ্ছিল রিশলু।

বাইসন
তখনও আচানকমার টাইগার রিসার্ভ বলে ঘোষিত হয়নি। জঙ্গলে ঘোরাফেরায় খুব একটা বাধানিষেধ ছিল না। গাছপালা আর জন্তু জানোয়ারের টানে আমি জঙ্গলে বন দফতরের একটা ছোটো ট্যুরিস্ট রিসর্ট ইজারা নিয়ে চালাই। পরিচিতির অভাবে খুব বেশি ট্যুরিস্ট এই জঙ্গলে আসত না। সামান্য যে কয়েকজন আসত তাদেরকে কখনও সখনও আমিও জঙ্গলে গাড়ি চালিয়ে ঘুরতে নিয়ে যেতাম। একবার এক ফটোগ্রাফার বন্ধুর সঙ্গে জঙ্গলের এক ওয়াচ টাওয়ারের কাছে শেষ বিকেলে হরিণের পালের ছবি তোলার আশায় গাড়িতে বসে জমিয়ে আড্ডা দিতে দিতে প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। যখন ঘুম ভাঙল তখন মাঝ রাত্তির। অন্ধকারে চোখটা খানিক ধাতস্ত হতে দেখি গাড়িটাকে ইংরেজি সি অক্ষরের মতো ঘিরে অসংখ্য কাচের চকচকে গুলি নড়ে বেড়াচ্ছে। ভাবলাম হরিণের দল আমাদের গাড়ি ঘিরে আছে। আমার গাড়িতে একটা  খুব শক্তিশালী সার্চলাইট রাখা থাকে সবসময়। আমার ফটোগ্রাফার বন্ধুটা জানালার বাইরে হাত বাড়িয়ে যেই না সার্চলাইটটা জ্বালিয়েছে, দেখি হরিণ কোথায়! আমাদের গাড়ি ঘিরে অগণিত সাদা পায়ের বাইসন। অধিকাংশ বাইসন মাটিতে বসে থাকলেও কয়েকটা দাঁড়িয়ে। সার্চ লাইটের আলোই বিপদ ডেকে আনল। আলোটা জ্বলতেই বসে থাকা শান্ত বাইসনের দল ভয় পেয়ে আস্তে আস্তে একটা দুটো করে উঠে দাঁড়াতে শুরু করল। অজস্র বাইসনের মধ্যে একটা ভয়ঙ্কর দর্শন বিশাল আয়তনের বাইসন আচমকা মাটিতে পা ঠুকে ধুলো ওড়াতে শুরু করল। দেখাদেখি আরও কয়েকটা। বুঝলাম বিপদ আসতে আর বেশি দেরি নেই। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি গাড়ির পেছনটা খালি। চাবি ঘুরিয়ে গাড়ি স্টার্ট করে এক্সিলারেটর দাবিয়ে ব্যাক গিয়ারে গাড়িটাকে চালিয়ে দিলাম। গাড়িটা দ্রুত পেছনে এগোতে লাগল। গাড়ির আওয়াজে বাইসনের দল একসঙ্গে পা ঠুকে ঠুকে ধুলো ওড়াতে শুরু করেছে। কোনোরকমে গাড়ি ঘুরিয়ে জঙ্গলের মাটির এবড়োখেবড়ো রাস্তায় যত জোরে সম্ভব চালিয়ে দিলাম ফোর হুইল ড্রাইভ গাড়ি। মাটি কাঁপিয়ে আমাদের তাড়া করে আসছে বাইসনের দল। প্রায় চার কিলোমিটার রাস্তা পার হয়ে এসে যখন থামলাম তখন গাড়ি ও আমাদের ঘামে ভেজা শরীরে লাল ধুলোর পুরু আস্তরণ জমে গেছে। বাইসনের দল আর একটু হলেই আমাদের গাড়িসুদ্ধু উলটে খুর আর শিঙের খোঁচায় কিমা বানিয়ে দিত!
এখন এই জঙ্গলে গাড়ি থেকে নামা নিষিদ্ধ। গাড়িতে বসে থাকা ফরেস্ট গাইড কোনো ভাবেই গাড়ি থেকে নামতে অনুমতি দিল না। তাই গাড়ি থেকে নেমে বাঁশের ঝোপে ঢুকে ভাইপারের ছবি তোলার স্বপ্ন মন থেকে মুছে দিতে হল। রাসেল ভাইপার, যাকে বাংলায় চন্দ্রবোড়া বলে, তার একটা ছোবল মানে সাক্ষাৎ মৃত্যু।
ভোর সাড়ে চারটের সময় ছত্তিশগড়ের বিলাসপুর শহর থেকে রওয়ানা দিয়ে ষাট কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আচানকমার টাইগার রিসার্ভের গেটে সকাল ছ’টায় পৌঁছে দেখি, জঙ্গলে ঘোরার জন্য নির্দিষ্ট একটিও জিপসি গাড়ি পাওয়া যাবে না। অগত্যা রিশলু লাহিড়ীর সুজুকি বেলিনো গাড়িই ভরসা। যদিও এই জঙ্গলে ঘোরার উপযুক্ত গাড়ি এটা নয়।

আচানকমারের জঙ্গল পথ
মে মাস। সকালেই প্রচণ্ড গরম। বৃষ্টির দেখা নেই এখনও পর্যন্ত। ৯১৪ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের জঙ্গলের গেটে টাকা জমা দিয়ে জঙ্গলে ঢোকার অনুমতি নেবার পর আমাদের আরও দুই সঙ্গী দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য ও শান্তনু বন্দোপাধ্যায়কে নিয়ে এক ফরেস্ট গাইড সহ জঙ্গলে ঢুকল রিশলু। নিয়ম অনুযায়ী বন দফতরের কোনো ফরেস্ট গাইড ছাড়া জঙ্গলে প্রবেশ করা যাবে না। নভেম্বর থেকে জুন মাস পর্যন্ত পর্যটকদের জন্যে খোলা থাকে এই জঙ্গল। বাঘ, লেপার্ড, ভাল্লুক, বুনো কুকুর, বাইসন, হাইনা, কয়েক প্রজাতির হরিণ, ফ্ল্যাইং স্কুইরেল এসব ছাড়াও আছে ১৫০টিরও বেশি প্রজাতির পাখি। আছে অনেক জাতের সাপ। নেই খালি হাতি। মানিয়ারি নদী বয়ে গেছে সাতপুরা পর্বতমালায় অবস্থিত এই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। এই নদীই এই জঙ্গলের জীবনস্রোত। ছত্তিশগড়ের সুন্দাবেদা মালভূমির একটি লেক থেকে উৎপন্ন এই নদীতে সারা বছরই খানিক জল থাকে। গিরধাস নালা নামে আর একটি উপনদী এসে মিশেছে এই মানিয়ারি নদীতে। বর্ষাকালে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে এই নদী। মানিয়ারি নদী জঙ্ক নামেও পরিচিত। এছাড়া এই জঙ্গলে বেশ কিছু পুকুর আছে জন্তু জানোয়ারদের জল খাবার জন্য।

ইন্ডিয়ান রোলের
ইন্ডিয়ান পিটটা
জঙ্গলে ঢোকার খানিক পরেই হরিণের পাল এসে এক ঝলক দেখা দিয়ে মিলিয়ে গেল গাছপাতার ঝোপে। একটা কালো লম্বা চেরা লেজওয়ালা ফরক টেইল্ডপাখি ক্যামেরা ফোকাস করার কোনো সুযোগ না দিয়ে, গাছের এক ডাল থেকে আর এক ডালে পিরিং পিরিং করে উড়ে বেড়াচ্ছে। ছোট্ট নীল রঙের ইন্ডিয়ান পিটটা পাখি তীরের মতো উড়ে এসে আমাদের গাড়ির সামনের রাস্তা থেকে একটা কিছু ঠোঁটে কামড়ে নিয়ে উড়ে গিয়ে বসল একটা গাছের ডালে। খানিক দূর দিয়ে তিনটে ময়ূর লাইন দিয়ে কেকা কেকা করে ডাকতে ডাকতে হেলে দুলে রাস্তা পার হয়ে গেল।

একাকি হরিণ
সরকারি হিসাব অনুযায়ী ৪২টা বাঘ আছে এই টাইগার রিসার্ভে। একটা সময় চোরাশিকারিদের দৌরাত্ম ছিল এই জঙ্গলে। বিভিন্ন ভাবে চোরাশিকার হয়েছে। কখনও অস্ত্র দিয়ে, কখনও বা বিষ প্রয়োগ করে। ২০০৯ সালে বিলাসপুর নেচার ক্লাবের কিছু সদস্যের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে আচানকমারে বাঘ গণনা অভিযানে যোগদান করেছিল রিশলু। সেবার জঙ্গলে ঢুকে স্বেচ্ছাসেবীরা কয়েকটি পুকুরের ধারে বেশ কিছু মৃত জীবজন্তু দেখতে পায়। বিশেষ করে চাপারওয়া রেঞ্জে, কুম্ভিপানি নামক ওয়াটার হোলেরধারে মরা লেপার্ড, খরগোশ, হরিণ পরে থাকতে দেখেন স্বেচ্ছাসেবীরা। পুকুরের জলে অসংখ্য মরা ব্যাঙ ভেসে ছিল। কিন্তু দুর্বোধ্য কারণে জলে বিষক্রিয়া পরীক্ষা করার জন্য নমুনা সংগ্রহ করতে দেননি বনকর্মীরা।

অ্যান্টি পোচিং পেট্রোলিং ক্যাম্প
যেহেতু আমাদের গাড়িটা ফোর হুইল ড্রাইভ গাড়ি নয়, তাই রিশলুকে খুব সাবধানে পাথরের বড়ো আলগা টুকরো এড়িয়ে ধীরে ধীরে চালাতে হচ্ছিল। ঘণ্টা তিনেক জঙ্গলে ঘোরার অনুমতি আছে আমাদের। এই জঙ্গলের মাত্র এক চতুর্থাংশ খোলা পর্যটকদের জন্যে। গাড়িতে চলতে চলতে কথা হচ্ছিল জঙ্গলের সব অংশে পর্যটক ঢুকতে দেওয়া উচিত কি উচিত না এই বিষয়ে। জঙ্গলে এক দিকে গাড়ি ও পর্যটকের দল ঢুকলে যেমন বন্য প্রাণীদের শান্তি নষ্ট হতে পারে, আবার ঠিক উলটোটাও হতে পারে। জঙ্গলে পর্যটক ঢুকলে চোরাশিকারিদের গতিবিধি থাকলে নজরে এসে যেতে পারে। বেআইনি গাছ কাটা হলে জানাজানি হতে পারে। জঙ্গল বাঁচাতে পর্যটকদের ভূমিকা একদম উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ঢালু মাটি পাথরের রাস্তা বেয়ে মাটি কামড়ে আস্তে আস্তে গাড়ি পৌঁছল জলদা নামে এক উপত্যকায়। পাহাড়ে ঘেরা বিশাল সমতল ঘাস জমি একটা। গাইড ছেলেটি আকাশের দিকে আঙ্গুল তুলে বলল, দেখিয়ে সাব।দেখি আমাদের থেকে প্রায় একশো মিটার দূরে একটা ধূসর রঙের বাজ পাখি মাথা নিচু করে ঘাস জমি থেকে ফুট দশেক ওপরে আকাশে এক জায়গায় স্থির হয়ে ডানা ঝাপটাচ্ছে। কয়েক মুহূর্ত পরে দু’পাশে ডানা ছড়িয়ে মাটিতে ঝাঁপ দিয়ে পায়ের নখে একটা শিকার আঁকড়ে শাঁ শাঁ করে উড়ে গিয়ে বসল বহু দূরের এক গাছের মাথায়।

শিকার ধরতে ঝাঁপ দিয়েছে বাজ
শিকারের প্রতীক্ষায় ঈগল
একটা ছোটো নালা চলে গেছে ঘাস জমিটার মাঝ বরাবর। আরও বেশ কয়েকটা ঈগল দেখতে পেলাম গাছের ডালে। আমাদের গাড়ি থেকে ফুট পঞ্চাশ দূরত্বে একটি ঈগল গাছ থেকে উড়ে এসে ঘাস জমি থেকে একটা সাপ ধরে ঠোঁটের এক আঘাতে ছিঁড়ে নখ দিয়ে ফালাফালা করে একটু একটু করে খেল। গাইড ছেলেটি বলল বিকেল বেলা প্রায় দিনই দলে দলে বাইসন আর হরিণ আসে এখানে ঘাস আর জল খেতে। আসে জঙ্গলের আরও অনেক জন্তু। চোরাশিকারিদের জন্য লোভনীয় চারণভূমি। ঘাস জমির শেষ প্রান্তে  জঙ্গলের কিনারায় মেঠো রাস্তার ধারে বন দফতরের কতগুলো ঘরবাড়ি আছে। তার গায়ে বড়ো বড়ো করে হিন্দিতে লেখা অ্যান্টি পোচিং পেট্রোলিং ক্যাম্প।

পর্যটকদের অপেক্ষায় গাইডের দল
এই জঙ্গলে বাঘ থাকলেও সহজে দেখা মেলে না। তবে প্রায়শই লেপার্ডের দেখা পাওয়া যায়। অনেক জঙ্গলের মতো এই জঙ্গলেরও অনেক নরখাদক বাঘের গল্প আছে। মূল জঙ্গলের বাইরে রাস্তার ধারে একটা পাথরের ফলকের কাছে এনে গাড়ি থামিয়ে দিল রিশলু। ফলকে লেখা আছে এরকমই একটি নরখাদক বাঘের গল্প।
জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে কোথাও ঝরা পাতা বা শুকনো গাছে আগুন লাগল কিনা দেখার জন্য একদল বনকর্মী থাকে। এদের বলে ফায়ার ওয়াচার। শুকনো পাতা জড়ো করে এরা মাঝে মাঝে আগুন লাগিয়ে দেয় জঙ্গলকে বড়ো দাবানলের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। এরকমই একজন ছিল মাইকু গোন্ড। ১৯৪৯ সালের ১০ এপ্রিল জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত গ্রাম বিন্দাওআলএর ফায়ার ওয়াচার মাইকু গোন্ড জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর সময় এক বাঘিনীর খাদ্য হয়। তার তিনদিন পর ১৩ এপ্রিল, কোটা রেঞ্জের রেঞ্জ অফিসার এম.ডবলু.কে.খক্কার সেই নরখাদক বাঘিনীকে মাইকু গোন্ড-এর আধ খাওয়া শরীরের ওপর বসে থাকা অবস্থায় গুলি করে মারে।
জঙ্গলে তিন ঘণ্টা থাকার মেয়াদ শেষ। জঙ্গল ছেড়ে এ’যাত্রার মতো বেরিয়ে আসতে হল।

মাইকু গোন্ডকে এখানে বাঘে খেয়েছিল
_____
ফোটোঃ অরিন্দম দেবনাথ