বিজ্ঞান:: একটা লম্বা সফরের কাহিনি (৪র্থ পর্ব) - দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

আগের পর্বগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করো প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব


একটা লম্বা সফরের কাহিনী
দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

।। পর্ব চার ।। গ্যালাপাগোস ।।

ভালপারাইজোতে থাকবার সময়েই একটা খবর পেয়ে মন ভালো হয়ে গিয়েছিল ডারউইনের। ক্যাপটেন ফিটজরয় প্রোমোশন পেয়ে অ্যাডমিরাল হয়ে গিয়েছেন। তবে বিগ্‌ল্‌ তখনও সমুদ্রে, কাজেই ক্যাপটেন নিজে সে-খবর তখনও পাননি। তিনি তখন মাউলে নদীর উপকূলে কাউলিমো শহরের ধ্বংসাবশেষ ঘুরে দেখছেন। সেখানকার সমীক্ষা শেষ করে বিগল উপকূল অঞ্চলের সমীক্ষা চালাতে চালাতে উত্তরমুখো রওনা হল। তার গন্তব্য ভালপারাইজো।
জাহাজ ভালপারাইজো পৌঁছুতে ডারউইন তাড়াতাড়ি এসে ক্যাপটেনকে তাঁর প্রোমোশনের খবরটা দিতে জাহাজে বেশ একটা আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। প্রায় দিনচারেক বন্দরে থেকে চলল বিশ্রাম আর আনন্দফুর্তির পালা। তারপর, এপ্রিলের চব্বিশ তারিখে ফের জাহাজ ছেড়ে শহরে ফিরলেন ডারউইন। এর পরদিন বিগল হরকন উপসাগর হয়ে পাপুদো-র দিকে রওনা হয়ে গেল। দিন দুই বাদে সাতাশ তারিখে রওনা দিলেন ডারউইনও। ডাঙাপথে উত্তরমুখে চললেন কোকিম্বো শহরের দিকে।
দু’জন চলেছে উত্তরমুখো। তবে দুই পথে। তবে জাহাজকে ছেড়ে আমরা এখন ডাঙাপথে ডারউইনকেই অনুসরণ করব। তিনি তখন চলেছেন তাঁর তৃতীয় (এবং শেষ) আন্দিজ অভিযানে।
ছোট্টো অভিযাত্রী দলটা উঁচুনিচু পথ বেয়ে চলে। ডারউইনের সঙ্গে আছেন পথপ্রদর্শক মারিও গঞ্জালেস, চারটে ঘোড়া আর একটা খচ্চর। একে একে পেরিয়ে গেল অজস্র ছোটো ছোটো খনি-শহর। মাটি খুঁড়ে তামা, সোনা এমন আরও কত কী তুলে আনে সেইসব শহরের মানুষেরা।
এইভাবে চলতে চলতে মে মাসের ১৪ তারিখে ডারউইন এসে পৌঁছোলেন কোকিম্বোর বন্দর শহরে। সেখানে তখন বিগ্‌ল্‌ আগেভাগেই পৌঁছে গেছে। জাহাজ খালি করে দিয়ে তার সারাইয়ের কাজ চলছে সেখানে। ডারউইন পৌঁছে দেখেন সমুদ্রের তীরে তাঁবু খাটিয়ে বেজায় আনন্দে ক্যাম্পিং করছে জাহাজের লোকজন। তাদের সঙ্গে ভারী মজায় একটা রাত কাটানো গেল। এখানে মশামাছির উপদ্রব তুলনায় কম। ফলে ঘুমটা মন্দ হল না।
পরদিন সকালে ফিটজরয়কে নিয়ে শহরটা একচক্কর ঘুরে নেয়া হল। তারপর ফের রওনা আন্দিজের গা ঘেঁষে। ইয়েরবা বুয়েনা থেকে কারিজেল-এর দিকে এগোতে এগোতেই নজরে পড়ছিল, আস্তে আস্তে কেমন মৃতপ্রায় হয়ে উঠছে প্রকৃতি। এই প্রাণহীন চেহারা আরও রুক্ষ হয়ে উঠছিল উত্তরমুখো এগোবার সঙ্গে-সঙ্গে। গোটা এলাকা জুড়ে অসংখ্য বিচিত্রজাতের শামুকের খোলের ফসিলের ছড়াছড়ি।
সুদীর্ঘ এই তৃতীয় আন্দিজ অভিযান খুব নতুন কিছু দেয়নি ডারউইনকে। কাজেই, জুলাইয়ের শুরু নাগাদ যাত্রা শেষ করে বন্দরে ফিরে বিগ্‌ল্‌কে সেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষায় থাকতে দেখে খুশিই হয়েছিলেন তিনি।
তবে ক্যাপটেন ফিটজরয় তখন জাহাজে নেই। জানা গেল আরাউকোতে চ্যালেঞ্জার নামে একটা জাহাজ ডুবেছে। তার মাঝিমাল্লারা আটকে পড়েছে অজানা এলাকায়। তিনি খবর পেয়ে তাদের উদ্ধার করতে গিয়েছেন।


দেশের দিকে রওনা দেয়া ‘কনওয়ে’ নামের একটা যুদ্ধজাহাজে করে তিনি হেন্‌স্‌লোকে তাঁর সংগৃহীত নমুনার রাশি পাঠিয়ে দিয়ে বিগ্‌ল্‌-এর ডেক-এ ফিরে গেলেন। হেন্‌স্‌লোকে পাঠানো এই তাঁর শেষ নমুনা। এরপর বাকি যাত্রায় যা সংগ্রহ করেছেন তিনি তা জমা করে রেখেছেন বিগ্‌ল্‌-এর খোলে।
ওদিকে বিগল-এরও তখন পশ্চিম উপকূলের সময়সীমা প্রায় শেষ। ডারউইনও ফিরে এসেছেন জাহাজে। অপেক্ষা ছিল কেবল ক্যাপটেন ফিটজরয়ের ফেরবার। জুলাইয়ের পাঁচ তারিখ ব্লন্ড নামের একটা জাহাজে করে বিপন্ন নাবিকদের উদ্ধার করে নিয়ে তিনি ফিরে এলেন। নাবিকদের কনস্ট্যান্স শহরে পাঠিয়ে দিয়ে এর দু’দিন পরে নোঙর তুলল বিগ্‌ল্‌। এবার সে নতুন পথে যাবে। গন্তব্য প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ।
জুলাইয়ের আট তারিখে বিগল রওনা হয়ে সেদিনই মকরক্রান্তি রেখা পার হয়ে গেল। ১২ তারিখ ইকিক বন্দর ছুঁয়ে এগিয়ে গিয়ে ১৯ জুলাই জাহাজ এসে লিমার কাছে কালাও উপসাগরে নোঙর ফেলল। সামনে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা। এইখানে লিমা থেকে তার রসদ নেয়ার পালা। ক’দিন বাদে ব্লন্ডও এসে যোগ দিল বিগ্‌ল্‌-এর সঙ্গে।
রওনা দেবার তোড়জোর চলছে, এমন সময় ডারউইনের তিন বোন, ক্যাহরিন, সুজান আর ক্যারোলিনের তিন-তিনখানা পত্রাঘাত একসঙ্গে। শরীর খারাপ বলে খবর দিয়ে সেপ্টেম্বরে চিঠি লিখেছিলেন এক বোনকে ভালপারাইজো থেকে। খবর পেয়ে জানুয়ারি মাসে উত্তর দিয়েছেন তিন বোন। অ্যাদ্দিনে তা এসে পৌঁছেছে তাঁর কাছে। জানা গেল তাঁরা বেজায় উদ্বিগ্ন ভাইয়ের এহেন শরীর খারাপের সংবাদে। নাকি অজানা দেশে এইভাবে দুঃখকষ্ট করে ঘুরে বেড়ালে আদরের ভাইটা আর প্রাণে বাঁচবে না। অতএব তিন বোনের একটাই আবদার, অনেক হয়েছে দুঃসাহসী অভিযান। ঘরের ছেলে এবার ভালোয় ভালোয় ঘরে ফিরে আসুক।
ডারউইনের সংক্ষিপ্ত জবাব গেল এর উত্তরে, “গ্যালাপাগোস দেখবার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছি আমি। প্রাণে বাঁচি আর না-ই বাঁচি, এ-অভিযান শেষ না করে ঘরমুখো হচ্ছি না।”
পশ্চিম উপকূলে বিগ্‌ল্‌-এর সময়সীমা শেষ, কিন্তু সমীক্ষার তখনও খানিক বাকি রয়েছে। ফিটজরয় অতএব চারশো পাউণ্ড খরচ করে কনস্টিটিউশান নামে একটা শক্তপোক্ত নৌকো কিনে তিন অফিসার, আর আটজন নাবিককে তাতে রওয়ানা করিয়ে দিলেন সমীক্ষার বাকি কাজ শেষ করতে। কাজ শেষ হলে তারা টিয়েরা দেল ফুয়েগো হয়ে আটলান্টিক পেরিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে যাবে।


জাহাজ চলেছে প্রশান্ত মহাসাগর ধরে। চারদিকে কূলহীন জলরাশি। তারা গন্তব্যে পৌঁছোবার আগে এসো আমরা গ্যালাপাগোস নিয়ে কিছু কথা জেনে নিই।
পশ্চিম গোলার্ধের এক্কেবারে মাঝখানটায় বিষুবরেখার দু’পাশে ছড়িয়ে থাকা খুদে খুদে আগ্নেয় দ্বীপের সমষ্টি এই গ্যালাপাগোস আদতে ইকুয়েডর রাষ্ট্রের একটা প্রদেশ। এখানে, সমুদ্রের নিরাপদ ঘেরাটোপে বিবর্তিত হওয়া বহু উদ্ভিদ ও প্রাণী, পৃথিবীর জীবজগতের উদ্বর্তনের একটা ছোটো মডেলের মতো ছড়িয়ে আছে। ১৫৩৫ সালে পানামার বিশপ সমুদ্র বেয়ে পেরু যাবার সময় প্রথম এদের দেখা পান। ১৬৮৪ সালে অ্যাম্ব্রোজ কাউলে নামের এক ক্যারিবিয় জলদস্যু এর দ্বীপগুলোর নানান নাম রেখেছিলেন সঙ্গী জলদস্যুদের আর কিছু কিছু বৃটিশ হর্তাকর্তার নামে। তবে ১৮৩২ সালে স্প্যানিশরা দ্বীপপুঞ্জের দখল নিয়ে তাদের নতুন নামকরণ করলেও ডারউইন তাঁর বইতে সেই জলদস্যুর দেয়া নামগুলোই ব্যবহার করেছেন। ১৭৯৩ সালে জেমস কলনেট প্রথম এ দ্বীপের জীবজগতের বিবরণ নথিভুক্ত করেন। তৈরি করেন এই এলাকার ন্যাভিগেশন চার্ট। তার ফলভোগ করে এখানকার বিশালদেহী গ্যালাপাগোস কচ্ছপ। চার্টের সহায়তায় তিমিশিকারী জাহাজের আনাগোনা শুরু হতে হাজারে হাজারে মারা পড়ে তারা মানুষের অস্ত্রে। এর ফলে তাদের কয়েকটা প্রজাতি একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়। বাকিদের অস্তিত্বও সঙ্কটাপন্ন হয়ে ওঠে। এর পর আস্তে আস্তে জায়গাটা তিমিশিকারীদের বড়ো আস্তানায় পরিণত হয়।


একসময় প্রায় দু-কোটি বছর ধরে একটানা অগ্ন্যুৎপাত হয়েছে এই অঞ্চলেএখন আর ততটা ভয়ঙ্কর না হলেও মাঝে মাঝে আজও অগ্ন্যুৎপাত ঘটে সেখানে। শেষতম ঘটনাটি ২০০৯ সালের। সে-অগ্ন্যুৎপাতে এখানকার ইসাবেলা দ্বীপটা প্রায় ৯০ সেন্টিমিটার উঁচু হয়ে যায়। ডারউইন তো এ দ্বীপপুঞ্জের নামই দিয়েছিলেন ল্যান্ড অব ক্রেটার্স বা জ্বালামুখের দেশ।
মোট ১৮টা প্রধান দ্বীপ, ৩টে ছোটো দ্বীপ আর ১০৭ খানা পাথুরে স্তূপ রয়েছে গোটা দ্বীপপুঞ্জ জুড়ে সমুদ্রের বুকে। ১৮৩২ সালে ইকুয়েডর এর দখল নিলে এখানে কিছু জনবসতি আর একটা বড়ো প্রিজন কলোনি গড়ে ওঠে।
উপস্থিত দ্বীপপুঞ্জের সামান্য কিছু এলাকা বাদে সবটাই সংরক্ষিত। সংরক্ষিত এর চারপাশের সমুদ্রও। যেটুকু অংশে বসতির অনুমতি আছে সেখানে দ্বীপমালার মোট জনসংখ্যা মাত্রই পঁচিশ হাজার।
বাকি বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ায় স্থল ও জলচারী ইগুয়ানা, অতিকায় কচ্ছপের দল, ঘুরে বেড়ায় সেই আশ্চর্য ফিঞ্চ ও মকিং বার্ডরা যারা ডারউইনকে তাঁর গবেষণার মূল চাবিকাঠি জুগিয়েছিল বিগ্‌ল্‌ এর সমীক্ষার সময়। এছাড়াও আরও অসংখ্য উদ্ভিদ আর প্রাণীর সমারোহ ঘটেছে এখানে যাদের জুড়ি দুনিয়ার আর কোথাও মেলে না।


ফিরে আসা যাক বিগ্‌ল্‌ এর কাছে। ১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৩৫। অকূল সমুদ্রে ভাসতে ভাসতেই হঠাৎ ক্রোজ নেস্ট থেকে ভেসে এল নজরদার নাবিকের হাঁকার, “ল্যান্ড অ্যাহয়।” জাহাজের মানুষজন গলা শুনে সবাই গিয়ে জুটেছে ডেক-এর ওপর। তারপর অনেক উঁচু মাস্তুলের মাথার ক্রোজ নেস্টে বসা নাবিকের হাতের ইশারা অনুসরণ করে তারা দেখল দিগন্তের গায়ে জলরাশির মধ্যে একটা ছোটো কালো ফুটকি দেখা দিয়েছে। দেখা দিয়েছে গ্যালাপাগোস।
ক্যাপ্টেন ফিটজরয়ের রোজনামচা বলছে, “জল দেখে দেখে যখন একটুকরো ডাঙার জন্য অধীর হয়ে উঠেছি ঠিক তখন মাস্তুলের ডগা থেকে খোঁজারু হেঁকে বলল, “দ্বীপ দেখা গেছে। পরে দেখা গেল দ্বীপ নয়, ও হল মাউন্ট পিট, চ্যাথাম দ্বীপের উত্তর-পূর্ব কোণে দাঁড়ানো এক বড়োসড়ো পাহাড়।


পরদিন সকালবেলা জাহাজ এসে পৌঁছুল হুড আইল্যান্ডে। ভোর হতে না হতেই এডওয়ার্ড শ্যাফার্স আর আরথার মেলের্শ নামের দুই অভিযাত্রী নৌকো নিয়ে রওনা হলেন দ্বীপের উপকূলভাগের সমীক্ষা করতে। দুপুর নাগাদ দ্বিতীয় একটা নৌকো নামল দ্বীপমালার কেন্দ্রীয় এলাকার দ্বীপগুলোর সমীক্ষা করবার জন্য। এর পরদিন, সতেরো তারিখে বিগ্‌ল্‌ গিয়ে নোঙর ফেলল চ্যাথাম দ্বীপের কূলে। ডারউইন অবাক বিস্ময়ে চেয়ে চেয়ে দেখছিলেন কালো লাভায় গড়া দ্বীপের পাথুরে বেলাভূমি, তার আদিম, হিংস্র পরিবেশ।
দ্বীপের পশ্চিম উপকূল বেয়ে উত্তরমুখে এগোচ্ছিল বিগ্‌ল্‌। উপকূলের ধারে ধারে ছোটোছোটো লেগুন। খানিক এগোতে স্টিফেন্‌স্‌ হার্বার এলাকায় একটা আমেরিকান তিমিশিকারী জাহাজেরও দেখা মিলল তাঁদের।
পরদিন দ্বীপের জমিতে পা পড়ল অভিযাত্রীদলের। ক্যাপ্টেন ফিটজরয় ছোটো একটা দল নিয়ে চললেন দ্বীপের ভেতরটা ঘুরে দেখতে। ডারউইনকেও নামিয়ে দেয়া হল। তাঁর কাজ আলাদা। তিনি একা একা ঘুরে নিজের কাজ করবেন।
দিনটা ভারী গরম ছিল। জলের ওপরেই তাপমাত্রা সেদিন চড়েছে সত্তর ডিগ্রি ফারেনহাইটে। আর ডাঙার কথা তো কহতব্য নয়। সেখানে জমির আগ্নেয় পাথরে ধাক্কা খেয়ে সূর্যের তাপ ছিটকে এসে চোখমুখ পুড়িয়ে দেয় যেন। তারই মধ্যে ডারউইন দ্বীপের অতিকায় কচ্ছপদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলেন। গোটা দশেক নতুন জাতের ছোটো ছোটো গাছও তুলে নিলেন নিজের সংগ্রহে।


সন্ধেবেলা জাহাজে ফিরে দেখা গেল আঠারোখানা দানবিক কচ্ছপকে তুলে আনা হয়েছে সেখানে। অনেকদিন বাদে তাজা মাংস খাবার জন্যে। এর পরের কয়েকদিন দ্বীপ ঘিরে সমীক্ষা চালাল বিগ্‌ল্‌। দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায় খুঁজে পাওয়া গেল একটা মিষ্টি জলের উৎস। এখান থেকে জল তুলে নিয়ে জাহাজ এগিয়ে গেল দ্বীপের দক্ষিণ কোণে। সেখানে শ্যাফার্স আর মেলের্শ ফিরে এসে জাহাজে উঠলেন ফের।
ইতিমধ্যে ক্যাপ্টেন ফিটজরয় দ্বীপমালা সমীক্ষার নিখুঁত একটা প্ল্যান বানিয়ে ফেলেছেন। সঙ্গে সে পরিকল্পনার মানচিত্র রইল। ওতে লাল দাগগুলো জাহাজের পথ আর হলদেগুলো নৌকো নিয়ে সমীক্ষার পথ।
(ক্রমশ)

বিজ্ঞান:: নদীর পাড়ের রহস্য - সূর্যনাথ ভট্টাচার্য

নদীর পাড়ের রহস্য
সূর্যনাথ ভট্টাচার্য

   নেদোটা আবার কোনও ফিকির করছে, মাষ্টারমশাই, রুমালে মুখ মুছে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন বিরূপাক্ষ দারোগা। চেয়ারখানা একবার ককিয়ে উঠে চুপ মেরে গেল।
মাষ্টারমশাই উৎসুক মুখে তাকালেন, কিছু বললেন না। আমিই জিজ্ঞেস করলাম, এবার কী করল নন্দ?
  সেইটিই তো জানতে হবে, দারোগাবাবু চোখদুটো কয়েক পাক ঘুরিয়ে বললেন, এখনও ধত্তে পারিনি। কিন্তু জানি ব্যাটা ফের কিছু একটা চালাকি করছে।
ব্যাপার যা জানা গেল, তা এই — নন্দ মল্লিক পৈতৃক ব্যাবসা লাটে তুলে এবার মাছের ব্যাবসা ধরেছে। নীলসায়রের পশ্চিমদিকে খানিকটা জায়গা ইজারা নিয়ে তাতে সে মাছ ধরার কারবার করে। নীলসায়রে মাছের চাষ হয়, সরকারি উদ্যোগ। পুঁজিপতিরা তাতে ব্যক্তিগত পয়সা লাগিয়ে অংশীদার হতে পারে। নন্দ সেইরকমই এক ভাগের মালিকানা ভাড়া নিয়েছে। তার এলাকায় সরোবরের কিনারা থেকে একশো গজ পর্যন্ত তার মাছ ধরবার সীমানা। কিন্তু ফিশারিজ বিভাগ থেকে নালিশ এসেছে, সে নিয়মিত ভাবে ঐ সীমা লঙ্ঘন করে নৌকা নিয়ে যায়।
নন্দ ফন্দি করে ব্যাবসায় দু’নম্বরি করে থাকে। কিন্তু এর মধ্যে আর কী করে ফাঁকি দেবে? নালিশ সত্যি প্রমাণিত হলেই তাকে তা বন্ধ করতে হবে। কিছু গুনাগারও দিতে হবে নিশ্চয়ই। দারোগাবাবুকে বললাম, চুপচাপ গিয়ে হাতে নাতে ধরে ফেলুন একদিন।
   আরে, সে চেষ্টা কি আর করিনি? সে ব্যাটা সটান অস্বীকার করল। আমরা লুকিয়ে সব দেখেছি শুনে আমাকেই উলটে বললে, আবার লুকোছাপা কেন? তার কোনও কসুর নেই, ডিপাটমেন্ট থেকে ভুল মাপ করেছে। আমি নিজে সরেজমিন করে যেন তাকে এই ঝামেলা থেকে উদ্ধার করি।
   তারপর? আপনাকে মাপজোখ সব দেখাল?
  দেখালই তো। আজকেই তো গিয়ে টুঁটি চেপে ধরেছিলাম। তা বললে, আপনি নিজের চোখেই সব দেখে যান হুজুর। বলে তার স্যাঙাৎ ফটকেকে পাঠাল নৌকা নিয়ে। সে নৌকা পাড়ের কাছে শক্ত কাছি দিয়ে বাঁধা। ফটিক যতদূর সম্ভব চলে গেল, দড়িটা টান টান হয়ে আর আগে বাড়তে দিচ্ছে না। পরিষ্কার দেখলাম, সরকারি সীমানা করা খুঁটিগুলো পেরিয়ে আরও বেশ খানিকটা চলে গেছে। নেদো বললে, এইবার দেখুন হুজুর আমি নৌকা পাড়ে লাগাচ্ছি। বলে হিড়হিড় করে দড়ি টেনে নৌকা পাড়ে লাগিয়ে বলল, মাপ করে দেখুন হুজুর কতোটা টেনে আনলাম।
   দেখলেন সেই দড়ির মাপ?
  দেখলাম বৈকি, ছাড়ব নাকি! বললে বিশ্বাস করবেন না মশাই, বিলকুল একশো গজ। একটুও বেশি নয়!
   কী বলছেন দারোগাবাবু? ইলাস্টিকের দড়ি নাকি?
   কী যে বলেন? চার-ফেরতা নাইলনের কাছি, সে একটুও বাড়ে না। তাজ্জব হয়ে ভাবছি, মাপে কোনও কারসাজি করল? আলাদা করে আমাদের ফিতে দিয়ে নিজে মেপে দেখলাম। সেই একশো গজ, কোনও ভুল নেই। তাহলে সত্যিই সরকারি মাপে ভুল আছে নাকি? কিন্তু তাই কি হয়?
আমারও বেশ খটকা লাগছিল। আমার সঙ্গে পল্টুও অবাক হয়ে শুনছিল। বললাম, দড়ি শক্ত করে বাঁধা ছিল তো? আলগা হয়ে স্লিপ করেনি?
বিরূপাক্ষ দারোগার কাজে কটাক্ষ করলে তিনি ভারি অসন্তুষ্ট হন। একটা তাচ্ছিল্যের গলাঝাড়া দিয়ে বললেন, কী যে বলেন মশাই। ওসব কিছুই নয়। একবার নয়, তিন-তিন বার আচ্ছা করে মাপজোখ করেছি। কিছু একটা ধান্দা করেছে বুঝেছি, কিন্তু কী করে যে নৌকা অদ্দূর যাচ্ছে, সেটা কিছুতেই ধরতে পারলাম না। তবু সিবিল বিভাগ থেকে লোহার চেন আনতে পাঠিয়েছি। তাই দিয়ে এবার মেপে দেখব।
   দড়িতে কোনও কায়দা নেই মনে হয়, মাষ্টারমশাই এতক্ষণ চুপ করে শুনছিলেন। এবার মুখ খুললেন, এত কাঁচা কাজ নন্দ করবে না।
   অ্যাঁ, তাহলে?
মাষ্টারমশাই হঠাৎই প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা সরোবরের পাড়টা নিশ্চই খানিকটা উঁচু, তাই না?
   পাড়? হ্যাঁ — তা পাড় থেকে জলের কিনারা খানিকটা নিচে তো বটেই। ফুট বিশেক হবে। সিঁড়ি কাটা আছে কয়েক ধাপ, নেমে যেতে হয়। কিন্তু তাতে কী হল?
   তাতেই তো হলদড়িটা আসলে একশো নয়, একশো গজ আর ঐ বিশ ফুট লম্বা।
   তাতে কী? কিনারা থেকে একশ’ গজ দূরেও তো জল ততটাই নিচে। বিশ ফুট তো কাটাকুটি হয়ে যাচ্ছে?
   হচ্ছে নাআমার আন্দাজ মতো নন্দ একশো গজ পেরিয়ে আরও অন্তত দশ-পনের ফুট এগিয়ে যেতে পারে।
   কী করে জানলেন?
   অঙ্কশাস্ত্রে ট্রিগোনোমেট্রি বলে একটা বিষয় আছে দারোগাবাবু, তা দিয়ে বার করা যায়। পাড়টা যদি খাড়াই কুড়ি ফুট নেমে যেত, তাহলে একশো গজ বিশ ফুট লম্বা দড়ি দিয়ে জলের তলে একশো গজ — অর্থাৎ তিনশো ফুটের পরেও প্রায় উনিশ ফুট আগে চলে যাওয়া যেত। যেহেতু পাড় খাড়াই নামেনি, তাই কিছু কম হবে। পাড়ের স্লোপ জানা থাকলে কষে বার করা যায় ঠিক কতটা আগে যাবে।
খানিকক্ষণ বিরূপাক্ষ দারোগার মুখব্যাদান বন্ধ করতে ভুল হয়ে গেল যেন। তারপর কিঞ্চিৎ সামলে নিয়ে বললেন, দড়ি কি অঙ্ক কষতে পারে নাকি?
   না। কিন্তু ঐ দড়ি দিয়েই আরও আগে চলে যাওয়া যাবে। কিঞ্চিৎ জ্যামিতির ব্যাপার আছে।
ট্রিগোনোমেট্রিই শুধু নয়, আবার জ্যামিতি! দারোগাবাবু আর দেরি করলেন না, ত্বরিতে উঠে পড়লেন। মাষ্টারমশাই যেন কী? সবেতেই অঙ্ক টেনে আনবেন। দারোগাবাবুর যা অতি অপছন্দ। কিন্তু এটুকু জানেন, মাষ্টারমশাই যখন বলছেন, সে কথার ওজন আছে। টুপিটা মাথায় চড়িয়ে তিনি বললেন, এসে আপনার বাকি কথা শুনব, আগে নেদোটাকে থানায় জমা করে আসি।
দারোগা চলে যেতে পল্টু বলে উঠল, কী জ্যামিতি আছে বুঝলাম না তো?
আমিও বললাম, দড়িটা একশো গজের চেয়ে লম্বা ঠিকই। কিন্তু টানা হয়েছে তো একশো গজই। তাতে নৌকাটা তার চেয়ে বেশি এগিয়ে আসবে?
মাষ্টারমশাই চট করে একটা কাগজে কিছু আঁকিবুঁকি কেটে পল্টুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, আসবে। প্রথমটা একটু কাউন্টার-ইন্টুইটিভ লাগে ঠিকই। এইটে দেখলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।
পল্টুর ঘাড়ের ওপর দিয়ে দেখি কাগজটায় লেখা —


ব্যাপারটা এবার বোঝা গেল, কী করে একশো গজ দড়ি টেনে নন্দ একশো গজের বেশি দূর থেকে নৌকাকে নিয়ে আসছিল। কেননা সে কুড়ি ফুট উঁচু থেকে দড়ি টানছিল। দেখি পল্টুও বুঝেছে কিন্তু যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।
পল্টুর বিস্ফারিত দৃষ্টি দেখে মাষ্টারমশাই বললেন, ক প্লাস খ ইজ গ্রেটার দ্যান গ। কেন বল তো পল্টুবাবু?
পল্টু চেঁচিয়ে বলল, বুঝে গেছি। ক, খ আর গ তো ত্রিভুজের তিনটে বাহু!
   কারেক্ট। আর স্কুলের জ্যামিতিতেই পড়েছ কিনা, সাম অফ এনি টু সাইডস অফ আ ট্র্যাঙ্গল ইজ —
   গ্রেটার দ্যান দ্য থার্ড!
_____
ছবি - আন্তর্জাল

বিজ্ঞান:: নোংরা বরফের বিস্ময়কর দুনিয়া - পল্লব কুমার চট্টোপাধ্যায়

নোংরা বরফের বিস্ময়কর দুনিয়া
পল্লব কুমার চট্টোপাধ্যায়

“There is more energy in methane hydrates than in all the world's oil, coal and gas put together.”

বিশ্বে দ্রুত ফুরিয়ে আসছে খনিজ তেলের ভাণ্ডার, এর উপর আর বেশিদিন নির্ভর করা চলে না। যে পরিমাণ তেল প্রতিদিন ব্যবহার হচ্ছে, আর যে পরিমাণ উত্তোলিত হচ্ছে তাতে বিকল্প জ্বালানির চিন্তা এখনই না করলেই নয়। বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে ঠিকই, তবে তা ১০০% পরিবেশ-বান্ধব হলেও এখনও পর্যন্ত বেশ ব্যয়বহুল। পারমাণবিক জ্বালানি এতটাই ব্যয়বহুল আর ঝুঁকিপূর্ণ যে বিশ্বের সব দেশের ক্ষমতা নেই তা ব্যবহার করার। প্রাকৃতিক গ্যাস অপ্রতুলতবে ভবিষ্যতের বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বিজ্ঞানীদের হাতে এসেছে প্রাকৃতিক গ্যাসের কঠিন সংস্করণ, যার নাম মিথেন হাইড্রেট বা নোংরা বরফ যদিও এর ব্যবহার এখনও পরীক্ষামূলক স্তরেই আছে, তা হলেও এর আবিষ্কার আর বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এর ভাবনাচিন্তার প্রগতির ইতিহাস বেশ চাঞ্চল্যপূর্ণ।

এসো আমরা বরং দু’শো বছর পিছিয়েই যাই আপাতত

ঘটনাপ্রবাহ ।। ১৮১০ ১৮২৩

স্যার হামফ্রে ডেভি-র (Humphrey Davy) নাম শোনেনি এরকম বিজ্ঞানের ছাত্র বোধহয় কমই আছে দুনিয়ায়। ইনি বিখ্যাত হয়ে আছেন তাঁর আবিষ্কৃত সুরক্ষিত দীপ (safety lamp)-এর জন্যে, যে আলোক-বর্তিকা কয়লাখনির শ্রমিকদের বিনা গ্যাস-বিস্ফোরণেই খনির নিচে কাজ করাতে সক্ষম হয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রাক্কালে, কাচের গোলকের মধ্যে বন্দি ফিলামেন্টকে বিদ্যুৎশক্তিতে জ্বালানো টর্চলাইটের উৎপত্তি হয়নি তখনও। আরেক বিশ্ববন্দিত বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডের (Michael Faraday) সঙ্গে তাঁর যুগলবন্দী ঘটে ১৮১২ সালে, ফ্যারাডে তখন সদ্য একুশ। ইনি বৈদ্যুৎ-চুম্বকীয় ক্ষেত্র, বিদ্যুৎ-বিশ্লেষণ ইত্যাদি গবেষণায় বিশ্বখ্যাত হয়েছেন পরে, কিন্তু ১৮১৫-র সেফটি ল্যাম্প আবিষ্কারের সময় ইনি ডেভির সহায়ক ছিলেন।
এই দুই বিজ্ঞানী সে সময় কাজ করছেন ক্লোরিন গ্যাসের উপর। সবুজাভ এই গ্যাস ১৭৭৪ সালে সুইডেনের বিজ্ঞানী কার্ল উইলহেম স্কিলি (Carl Wilhelm Scheele) আবিষ্কার করলেও তিনি একে একটি অম্ল ভেবে ভুল করেন। ডেভিই প্রথম এই গ্যাসের মৌলিকত্ব প্রমাণ করেন ১৮১০-এ ডেভি আকস্মিকভাবে ক্লোরিনের হাইড্রেট তৈরি করে ফেললেও, তাকে তিনি তরল ক্লোরিন ভেবে ভুল করেছিলেন ১৮২১-২২ নাগাদ ডেভি ও ফ্যারাডে যুগ্মভাবে ক্লোরিনকে ঠাণ্ডা করে তরল করার পরীক্ষা করছিলেন। কী ভেবে ফ্যারাডে জলে কিছুটা ক্লোরিন মিশিয়ে ঠাণ্ডা হতে দেন। কিছুক্ষণ পরে তিনি লক্ষ করেন হিমবিন্দুতে নামার আগেই জলে কিছু বরফের স্ফটিক ভাসছে যার ভেতরে কিছু পরিমাণ সবুজ গ্যাস বন্দি হয়ে আছে। ফ্যারাডে এই ঘটনার বিবরণ লেখেন ১৮২৩ সালে, আর এই বরফের নাম দেন ক্লোরিন ক্ল্যাথ্রেট হাইড্রেট (Chlorine Clathrate Hydrate)ক্লোরিনের বন্দি অণুকে বলা হল অতিথি (guest) আর চারপাশ থেকে ঘিরে ধরা জলের অণুরা হলেন গৃহস্বামী (host)তারপরও বিজ্ঞানীরা অতিথি-অণু রূপে ক্লোরিনের জায়গায় অন্য গ্যাস, যেমন মিথেন, ইথেন, হাইড্রোজেন সালফাইড, নাইট্রোজেন, অ্যামোনিয়া ইত্যাদি ব্যবহার করে নানাধরণের ক্ল্যাথ্রেট বানাতে সক্ষম হলেও তাদের ব্যবহার সীমিত ছিল কেবলমাত্র গবেষণার খাতিরে। তখনও এঁরা জানতেন না এ জিনিস প্রাকৃতিকভাবেও পাওয়া সম্ভব বা এগুলোর ব্যবহারিক জীবনে কোনও ভূমিকা আছে।

চিত্র ১ - একটি ক্ল্যাথ্রেটের সাঙ্কেতিক প্রতিস্থাপনমাঝের নীল গোলকটি guest অণু অর্থাৎ মিথেন বা ক্লোরিন, বাইরের লাল গোলকগুলি host অর্থাৎ জল বা অন্য কোন তরল পদার্থ, এই দুইয়ের সংযোগে বরফসদৃশ স্থায়ী বস্তুটি তৈরি হয় যার চলতি নাম ক্লাথ্রেট বা গ্যাস হাইড্রেট। একে নোংরা বরফও (dirty ice) বলা হয়ে থাকে।

ঘটনাপ্রবাহ ।। ১৯৩০

হাইড্রেট আবিষ্কারের পর ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রায় গোটা সময়টা বিভিন্ন ধরণের ক্ল্যাথ্রেট আর হাইড্রেট নিয়ে গবেষণা করে কাটান বিজ্ঞানীরা। তখনও কেউ প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন গ্যাস হাইড্রেট বা এদেরকে নিয়ে কোনও সমস্যায় ভোগেননি। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে উচ্চচাপের প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইনে পাঠানো হত না বললেই চলে। তবে ১৯০০-র পর থেকে, বিশেষতঃ ১৯৩০ সাল নাগাদ দেখা গেল যে পেট্রোলিয়াম কূপ থেকে C1-C2-C3-C4 (মিথেন-ইথেন-প্রপেন-ব্যুটেন) ইত্যাদি গ্যাসের মিশ্রণ উচ্চচাপে পাইপের মধ্য দিয়ে পাঠানোর সময়ে তা মাঝে মাঝে অল্পবিস্তর বরফের মতো জমে যাচ্ছে। অথচ তাপক্রম সেখানে কম হলেও হিমাঙ্কের কিছুটা উপরে আর চাপও তুলনামূলকভাবে কম। মেক্সিকো, আমেরিকা আর কানাডার কিছু ঘটনা জার্মান বিজ্ঞানী হ্যামারশ্মিটের (Hammerschmidt) নজরে পড়ে। তিনি এগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পান –
১) এগুলো বরফ নয়, বরং জলের অণু দিয়ে ঘেরা মিথেন বা ইথেন গ্যাসের অণুর সমন্বয়, যাকে উনি নাম দিলেন মিথেন বা ইথেন হাইড্রেট।
২) শুষ্ক গ্যাস প্রবাহিত হলে এ ধরণের বরফ তৈরি হয় না, কিন্তু সম্পূর্ণ শুকনো গ্যাস খুব কমই থাকে প্রাথমিক স্তরে।
৩) এগুলো তৈরি হবার জন্যে কিছুটা কম তাপমান, উচ্চ চাপ আর উচ্চ গতির গ্যাসপ্রবাহ চাই। তবে পাইপের যেখানে বিকৃতি আছে যেমন বাঁক, ব্যাসের কম-বেশি হওয়া বা ওয়েল্ডিং দিয়ে জোড়া হয়েছে তেমন জায়গাগুলোতেই বেশি করে জমে এই হাইড্রেট।
৪) পাইপের ভেতরের দেয়াল ঘেঁষে এর জমা শুরু হয় ও কিছুক্ষণের মধ্যেই বরফের শক্ত টুকরোর মতো জমে পাইপ দিয়ে সব প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়।
সত্যি সত্যিই হাইড্রেট জমার ফলে গ্যাস-পাইপলাইনে প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া, চাপ বেড়ে পাইপ ফেটে দুর্ঘটনা - এসব লেগেই থাকত। শেষে ১৯৩৪ সালে হ্যামারশ্মিট উদ্ভাবন করেন তাঁর বিখ্যাত ও প্রথম সমীকরণ যা দিয়ে গ্যাস হাইড্রেট তৈরি হবার সম্ভাব্য পরিস্থিতি অঙ্ক কষে বার করা যায়। এছাড়া উনি দেখালেন যে উপযুক্ত পরিমাণে ইথিলিন গ্লাইকল বা মিথানল পাইপলাইনে ঠিক সময়ে ইন্‌জেক্ট করতে পারলে হাইড্রেট তৈরির সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। এর পর ২০০২ সাল পর্যন্ত কাট্‌জ, উইলকক্স ইত্যাদি বহু পেট্রো-রসায়ন বিজ্ঞানীরা নানাধরণের গবেষণা চালিয়ে গেছেন গ্যাস পাইপে এই অবাঞ্ছিত উৎপাত রোধ করার সবচেয়ে কম খরচায় অথচ সব চেয়ে প্রভাবশালী উপায় উদ্ভাবন করার কাজে।

ঘটনাপ্রবাহ ।। ১৯৬০


চিত্র ২ - পাইপে জমে যাওয়া মিথেন হাইড্রেট বা নোংরা বরফ, পাইপ পরিষ্কার করা হচ্ছে।

এতদিন ধরে গ্যাস হাইড্রেটকে পেট্রোলিয়াম ড্রিলিং, উৎপাদন বা সংবাহন (transportation) উদ্যোগে একটি অবাঞ্ছিত উপদ্রব হিসেবেই গণ্য করা হত, অবশ্য তা সত্যিও বটে। তবে ১৯৬০-এর পর থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠের গভীর অঞ্চলে কূপখননের উদ্যম বেড়ে ওঠার ফলে গভীর সমুদ্রতলের সম্বন্ধে মানুষের জ্ঞান বাড়তে লাগল। ততদিনে এটা বিজ্ঞানীদের জানা এবং জানানো হয়ে গেছে যে সামান্য পরিমাণ মিথেন হাইড্রেটে কী প্রচুর পরিমাণে দাহ্য-শক্তি সঞ্চিত থাকে, আর এটা প্রায় স্বচ্ছ জ্বালানি (Near-green fuel), অর্থাৎ দহনের ফলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ছাড়া আর কোনও Green-house gas উৎপন্ন হয় না। এই Green-house effect আর Green-house গ্যাস সম্বন্ধে তোমরা আলাদা করে জেনে নিতে পার যে কোনও পরিবেশবিদ্যার বই থেকে বা সেই সংক্রান্ত ওয়েবসাইট থেকে, তাই আর এ নিয়ে আলাদা করে আলোচনা করলাম না। তবে জেনে রাখো যে জৈব ও জীবাশ্ম জ্বালানি (কাঠ, কয়লা, পেট্রোলিয়াম) আর পারমাণবিক জ্বালানি, দুইয়েরই পরিবেশ দূষণ করার ক্ষমতা আছে। সে তুলনায় মিথেন বা ইথেনের হাইড্রেট জ্বালানি হিসেবে অনেক বেশি স্বচ্ছ ও পরিবেশ-বান্ধব। তাহলে এসো দেখি ১৯৬০ সালে আমাদের জন্যে কী নতুন খবর অপেক্ষা করছে।
১৯৬০ সালে পশ্চিম সাইবেরিয়ার মেসায়াখা (Messoyakha) গ্যাস ক্ষেত্রে কূপ খননের সময় পাওয়া কোর (Core) থেকে উদ্ধার হয় সেই একই বরফ যার জলীয় আবরণের মধ্যে বন্দি দাহ্য গ্যাস মিথেন প্রথম সঞ্চিত জ্বালানিরূপে প্রাকৃতিকভাবে দেখতে পাওয়া যায় এই ঘটনা বিশ্বের জ্বালানির দুনিয়ায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এক উন্নতমানের জ্বালানির সন্ধান পায় শক্তি-পিপাসু বিশ্বের মানুষ আর উদ্যোগ-সংস্থাগুলি।

চিত্র ৩ - মাটির ভিতর শিলা যেভাবে স্তরীভূত থাকে সেভাবেই কেটে উদ্ধার করা অংশকে কোর (Core) বলা হয়। ভারতে খনন করা একটি কোর থেকে পাওয়া মিথেন হাইড্রেট বা ‘নোংরা বরফ’ নীচে স্কেল - এক ইঞ্চি প্রতি ভাগ। (উৎস - কানাডা-জাপান মল্লিক প্রজেক্টের রিপোর্ট)

ঘটনাপ্রবাহ
।। ১৯৯২

১৯৬০-এর পরবর্তী সময় থেকেই প্রকৃতিতে পাওয়া মিথেন হাইড্রেটের সন্ধান আর আবিষ্কৃত সম্ভার দুইই বেড়ে চলেরাশিয়া-কানাডা অঞ্চলের চিরতুষারক্ষেত্রের শিলাস্তরে (permafrost sediments) তৈলকূপ খননের সময় মাঝে-মাঝেই পাওয়া যেতে থাকল এই হাইড্রেট বা নোংরা বরফ। তার কিছুদিনের মধ্যেই এক গবেষকদল আলাস্কার উত্তরাঞ্চলের মেরুসাগরের ঢালুক্ষেত্রের (continental slope) মাটির নিচে খুঁজে পেল প্রচুর মিথেন হাইড্রেটের সম্ভার। খুলে গেল সম্ভাবনার এক নতুন দরজা।

চিত্র ৪ - সাইবেরিয়া অঞ্চলের একটি পার্মাফ্রস্ট। লক্ষণীয় যে বরফের উপরের স্তরে পাললিক মাটির স্তর জমা হলেও নীচের বরফ অবিকৃত আছে।

এই গবেষণার ফলের ভিত্তিতে আমেরিকার ভূবিদ্যা জরিপ সংস্থা (U.S. Geological Survey বা USGS) National Energy Technology Laboratory (NETL) মিলে আরও অনুসন্ধান চালিয়ে ঘোষণা করে যে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের গভীরের ভূতলে প্রচুর মিথেন হাইড্রেট সঞ্চিত হয়ে থাকার কথা। একসময় যা ছিল নিছক কৌতূহলের বস্তু বা তৈলখনি কর্মীদের জন্য এক উটকো সমস্যা তাই বুঝি হতে চলল সারা পৃথিবীর শক্তির ক্রমবর্ধমান চাহিদার সমাধান। এরপরে বহু জায়গাতেই সমুদ্রপৃষ্ঠে গ্যাস হাইড্রেটের সম্ভার পাওয়া গেল যাদের অন্যতম হল কানাডার ম্যাকেঞ্জি নদীর মোহানা আর জাপানের নানকাইয়ের তীরবর্তী সমুদ্রতল। ইতিমধ্যে পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখা গেছে যে মিথেন হাইড্রেটের সামান্য মাত্রার বরফের মধ্যে সঞ্চিত জ্বালানির পরিমাণ আমাদের অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি (এক লিটার বরফ থেকে মিথেন পাওয়া যায় প্রায় ১৬০ লিটার), তারা সহজদাহ্য আর জ্বলে শুধু কার্বন-ডাই-অক্সাইডই উৎপন্ন হয়, যা গ্রিনহাউস গ্যাস হলেও ওজোনস্তরের তেমন ক্ষতিকারক নয়, আর ঠিকভাবে দহন করতে পারলে জলে দ্রবীভূত করেও ফেলা যায়।
এইবার বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান শুরু করতেই ফল পাওয়া যেতে লাগল। উত্তর মেরুর পার্মাফ্রস্টে, গভীর সমুদ্রের তলদেশে (Deep Sea-bed), বিশেষত যেখানে কিছুটা ভূতাত্ত্বিক ক্রিয়া বা tectonic plate sliding দেখা গেছে, যেমন ওয়াশিংটন ও ওরেগন। এছাড়াও যেখানে দুই বা ততোধিক সাগরের ধারা মেশে সেই অঞ্চলে (যেমন দক্ষিণ ক্যারোলিনার ব্লেক রিজ) জলের দুই থেকে সাড়ে চার হাজার মিটার গভীরতায় পাওয়া গেল প্রচুর পরিমাণে হাইড্রেট।


চিত্র ৫ – কীভাবে প্রকৃতিতে তৈরি হয় মিথেন হাইড্রেটঃ ভূস্তরে সঞ্চিত জৈব (Biogenic) বা তাপ-সংশ্লিষ্ট (Thermogenic) মিথেন ফল্ট (Fault) বা ফাটল (Fracture) দিয়ে বাহিত হয়ে পার্মাফ্রস্টের নিচে ভূগর্ভে বা সমুদ্রের তলদেশে জমা হয়।

কী পরিমাণ মিথেন হাইড্রেট সঞ্চিত আছে মাটির আর সমুদ্রের নিচে? কোলেট-এর (Collett) অনুমান অনুযায়ী তিন হাজার থেকে আশি লক্ষ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার। পেট্রোলিয়াম আর অন্যরূপে পাওয়া প্রাকৃতিক গ্যাসের মাত্রা পৃথিবীতে এই মুহূর্তে আছে মাত্র চারশো ট্রিলিয়ন ঘনমিটার (কোল বেড মিথেন মিলে)।
অবশ্য এই সঞ্চয়ের আবিষ্কার এক জিনিস আর তাকে কাজের উপযোগী করে পৃথিবীর বুক থেকে বের করে নিয়ে আসা সম্পূর্ণ আলাদা কাজ।

ঘটনাপ্রবাহ ।। ২০১২

চিত্র ৬ - বিশ্বে সঞ্চিত এ যাবৎ আবিষ্কৃত গ্যাস হাইড্রেটের সম্ভার।


আমেরিকার ভূবিদ্যা জরিপ সংস্থা (USGS) কানাডা আর জাপানের সঙ্গে মিলে ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১২ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আলাস্কার পার্মাফ্রস্ট থেকে আর জাপানের নানকাইতে প্রথম সমুদ্রস্তরের থেকে এই গ্যাস বরফ উৎপাদনে সক্ষম হয়। মিথেন হাইড্রেটের সুবিধা এই যে তাপ বেড়ে গেলে বা চাপ কমে গেলে নিজে থেকেই মিথেন জল থেকে আলাদা হয়ে যায়। ফলে কূপের মুখে বা ভূপৃষ্ঠে শুদ্ধ মিথেন থাকে। আর আগেই বলেছি যে এক লিটার আয়তনের বরফ থেকে সাধারণ বায়ুচাপে প্রায় ১৬০ লিটার মিথেন পাওয়া যায় - অঢেল শক্তিরাশি। সমস্যা একটাই, জ্বালাবার পর মিথেন পরিণত হয় কার্বন-ডাই-অক্সাইডে যা গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর জন্যে দায়ী একটি গ্রিনহাউস গ্যাসআর মিথেন যদি না পুড়ে সরাসরি হাওয়ায় মিশে যায়? তা হবে আরও ক্ষতিকর, কার্বন-ডাই-অক্সাইড থেকেও ৩০ গুণ বেশিতাহলে কী করা যায়?
নাঃ, আপাততঃ কিছু করার নেই। গবেষণা চলছে, মিথেন হাইড্রেটকে এক আদর্শ সবুজ বা পরিবেশ-বান্ধব জ্বালানি হিসেবে প্রতিপন্ন করার। আশা করা যাচ্ছে ২০৩০ নাগাদ এর ফল পাওয়া যাবেই।
_____

প্রবন্ধ:: গাঙ্গুলিবাবু - প্রতীক কুমার মুখার্জী


গাঙ্গুলিবাবু
প্রতীক কুমার মুখার্জী

নেপালের ক্যাসিনোর সিঁড়িতে হ্যাট-টাই-কোটে সজ্জিত গাঙ্গুলিবাবু যখন এক বিদেশিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ এড়িয়েই মুখে লাখ টাকার হাসি এনে 'হে-হে-এক্সকিউজ মিইইইই!!!' বলে সামাল দেন, তখন প্রতিটি বাঙালীর মুখে হাসির সঙ্গে সঙ্গেই মনে উঠে আসে গভীর প্রশান্তিকী ব্যাপার - না স্বল্প পরিসরে থাকা আটপৌরে লেখক, যার বিদ্যাবুদ্ধি একেবারেই হিংসা করার মতো নয়, বিশ্বদরবারে বাংলার মুখ রাখতে সমর্থ এ যাত্রায় সেই লোকই যখন ছোট্ট বাক্সে করে আমসত্ত্ব নিয়ে গিয়ে কাস্টমস-এর হাতে ধরা পড়ার ভয়ে তোপসের শরণাপন্ন হন, তখন কী মজাই না লাগে! আরে এই লোকটা তো একেবারে আমাদেরই মতো! প্রতিটি পাঠক যেন এই অবস্থার সঙ্গে নিজের জীবনের বা পরিচিত কার, কোন না কোন অবস্থার মিল পানআর সেটাই পাঠকের মনের ভিতর থেকে বার করে আনে হাসি আর আনন্দ
আবার যখন নকল জপযন্ত্র দিয়ে 'ঠকাস' করে মোক্ষম আঘাতে শূকর গলি অভিযান সফল করেন তিনি, বা ব্যুমেরাং-এর 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক'-এ ধরাশায়ী করেন শত্রুকে, অজান্তে নিজের মনেই একটা সন্তুষ্টি জেগে ওঠে - যাক বাবা, জটায়ু একাধারে ফেলুদা, তোপসে থেকে শুরু করে আপামর বাঙালী জাতির 'ভেতো' বা 'ভীতু' দুর্নাম ঘোচালেন হাসির উদ্রেককারী ঘটনা সবই, কিন্তু সেগুলির মধ্যে কোথা দিয়ে যেন জিতে যাই আমরাপ্রবল বিক্রমে ওই ক্ষুদ্রদেহে কোট আর ধুতি পরে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালিয়ে যাওয়ার ছবি পাঠকের চোখের সামনে ভেসে উঠতেই আরেক দফা হাস্যরোল - চোরাগোপ্তা আক্রমণ সেরে দুবলা বাঙালীর পিঠটান! প্রমাণ হয় বারবার বাঙালী আর যাই হোক, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে ঘুরিয়ে দিতে জানে দুঘা
ঠিক এভাবেই আমাদের নানান সিরিও কমিকাল ঘটনা ও উপঘটনার ভিতর দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছেন সত্যজিৎ বাবুনামটাই ধরা যাক - লালমোহন গাঙ্গুলিকী মনে হয় শুনে? বাংলার বিখ্যাত লালচে, গোলগাল রসে টইটম্বুর মিষ্টি লালমোহন বা পান্তুয়ার কথা, যা আদ্যোপান্তভাবে জড়িয়ে বাঙালীর চিরসবুজ রসনার সঙ্গেনাম শুনেই লোকে ধারণা করে নেন মানুষটার নরমসরম ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে, আর তাই মগনলালের মতো পোড় খাওয়া দুষ্টুলোকও কখন তাঁকে বানায় বুড়ো থুরথুরে অর্জুনের ড্যাগারের নিশানা, কখন চিনিতে ড্রাগ মিশিয়ে অপদস্থ করেবেচারি স্বতন্ত্র ভদ্রলোককে দিয়ে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়াতেও ছাড়েনি বদমায়েশ ডাকু গন্ডারিয়াফেলুদাও ভাবতে বসেন, মগনলাল কী ভাবে মানুষের দুর্বলতা ধরে ফেলে? পাঠক এসব দেখে হাসেন ঠিকই, কিন্তু পুরোটা সময় লালমোহনবাবুর জায়গায় নিজেকে বসিয়ে রিলেট করেন, আর তাই জটায়ু হয়ে ওঠেন নিশ্ছিদ্র হাসির এলিমেন্ট - নিছক ভাঁড় হয়ে থেকে যান না
তাঁর 'জটায়ু' নামটিও যেন ব্যক্তিত্বের একদম পরস্পরবিরোধী - তাঁর কাজকর্ম একেবারেই জটায়ুর সাহসিকতার সঙ্গে যায় নানিরীহ, ভীতু ভদ্রলোকটির যত মস্তানি তাঁর লেখনীতেসেখানে নিজের মনের অবদমিত উচ্চাশাগুলি পূরণ করে তাঁর 'নেমসেক' প্রখর রুদ্র, এবং মাঝে মাঝে তাঁর কাণ্ডকারখানা এতটাই অতিরঞ্জিত, যে ফেলুদার গাম্ভীর্যও 'খান খান' হয়ে খসে পড়েঅদ্ভুত সমস্ত তথ্য দিয়ে তিনি 'উটের পাকস্থলী' মার্কা মশলা মাখিয়ে তৈরি করেন 'হট কচাউরিস', পরে যা ফেলুদার হাতে পড়ে সংশোধিত হয় পরের সংস্করণেসেখানে যথাক্রমে পাঠক অবাক হন, ভাবেন আর শেষে গালে হাত দিয়ে হতবাক হয়ে বোঝার চেষ্টা করেন - শেষে জয় হয় আবার সেই হাসির, আর ভদ্রলোককে ভালো না বেসে থাকা যায় না
সিনেমার পরদায় ট্রেন কানপুরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা প্রতিটা মানুষ নড়ে বসি কোট, সবজে মাফলার,  ধুতি, আর জাপানী সুটকেসের মালিককে দেখার উদগ্র বাসনায়'শর্ট, বল্ড এন্ড মুস্টাচ' সম্বলিত ছোটোখাটো মানুষটা কামরায় ঢোকা মাত্র 'ইম্পোরটেড' জিনিসের প্রতি অপত্যস্নেহ থেকে কুলিবিদায়ের স্টাইলে, নিজের 'পটভূমিকা' জানাবার অননুকরণীয় স্টাইলের ভিতর দিয়ে সকল লাইমলাইট সটান নিজের উপর টেনে নিলেনমেড ইজি পুষ্ট হিন্দিতে গড়পারের ঠিকানা দিয়ে বাঙালীদের দল ভারী করে ফেললেন অচিরেই, কোথায় যেন ম্লান করে দিলেন ফেলুদার রেজর শার্প ব্যক্তিত্ব! লটোদিকের মাড়োয়ারি ভদ্রলোক তো মাথা নেড়ে সবটা ম্যানেজ করলেননিজের গল্পের নায়কের ডাইমেনশন জানিয়ে ফেলুদার অপরিসীম 'সেন্স অফ হিউমার'-কে কাউন্টার করেন যে সপ্রতিভতার সঙ্গে, তার ভিতর পরতে পরতে হাসি থাকলেও সেটার ভিতরে 'মস্তিষ্কের পুষ্টির' জোগান প্রচুর
এ ছাড়াও অনেক ছোটো ছোটো ঘটনা, যেমন এথিনিয়াম ইন্সটিটিউশনের শিক্ষাপুষ্ট লালমোহনবাবুর কাছে কবিত্বের শিখরে বসা বৈকুন্ঠ মল্লিকের অপরিণত কবিতার শ্রেষ্ঠত্ব, নিজের নতুন বই-এর অনুপ্রাসের ঝংকার সম্বলিত নাম ঠিক করার চমক, হাসির ফোয়ারা ছোটায়প্রচণ্ড বিপদের সময়ে গাঙ্গুলিবাবুর অদ্ভূতুড়ে আচার আচরণ আমাদের হাসতে বাধ্য করায়, যেমন জং বাহাদুর রানার ভোজালি চুরি হয়ে যাওয়ার পরও উনি নিশ্চিন্তভাবে জানান যে শুধুমাত্র খাপটি অবশিষ্ট! 'রয়াল বেঙ্গল রহস্যে' কালান্তক বাঘের সামনে গাছে উঠে তিনি এমনভাবে সংজ্ঞা হারান, যে গল্পের ওই ভয়ানক ক্লাইম্যাক্সে এসেও পাঠকের মন পড়ে থাকে তাঁর দিকে - ওনার যেন কোন ক্ষতি না হয়আগাগোড়া টানটান, সিরিয়াস অপরাধ ও অপরাধতত্ত্বের ঘোরপ্যাঁচের ভিতরও সবার প্রিয় 'লালুদা' সযত্নে লালিত হতে থাকেন
চূড়ান্ত কনফিউজড সিচুয়েশনে তাঁর মুখ থেকে যখন বেরিয়ে আসে অদ্ভুত কিছু শব্দ - 'বেংগুর', 'হাঁয়েস'  'ইনপ্রমপচু' তখন হাততালি দিয়ে, পায়ে তাল ঠুকে হাসতে দেখেছি পাঠককে, আর এখানেই সত্যজিৎ সাহেবের মাস্টারস্ট্রোক'নিজেদের মধ্যেই একজন' হয়েই আদর ও ভালোবাসা কুড়িয়েছেন গাঙ্গুলিবাবু,  কখনোই তিনি 'লারজার দ্যান লাইফ' হয়ে ওঠেননিসাধারণ বাঙালীর মতোই তাজমহল, কাশ্মীর, পুরী দেখে তাঁর অভিব্যক্তি, আর হংকং-এ গিয়ে স্নেক স্যুপের কথা শুনে, বা লন্ডনে হ্যারডস-এ গিয়ে পেন কিনে, বা নেপালে জ্যাকপট জিতে তাঁর মধ্যে দিয়ে জয়ী হয়েছে কে? প্রতিটি বাঙালী - স্বপ্নের ও তথ্যের ভরপেট ভুরিভোজের পর তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে তুলতে পাঠক ফেলুদার ক্যারিশমা তো বটেই, তার সঙ্গে জটায়ুর দীর্ঘজীবন কামনায় দিন কাটিয়েছেবিটকেল জাপানি হর্ণ, গাঢ় সবুজ গাড়ি, মশলাদুরস্ত বেস্টসেলারের মালিক অবশ্য দিনের পর দিন ফেলুদার সঙ্গে থেকে কিছুটা পরিশীলিত হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর স্বভাব রয়ে গেছিল একইভাবে 'অনাম্বর', তা কোনোদিন বিন্দুমাত্র পাল্টায়নি
শুধু 'দেখতেন' তিনি, 'লক্ষ' করতেন না – এই দোষে ফেলুদার কাছে অনেকবার বকুনি খেয়েছেন তিনি, কিন্তু দমে যাননিমনখারাপ করতেন না তিনি, বরং দুগুণ আগ্রহে লাফিয়ে পড়তেন নতুন কিছু শিখতেআসলে সত্যজিৎবাবু ওনার চোখ দিয়ে পাঠককে অনেক কিছু শিখিয়ে দিতেন, বুঝিয়ে দিতেন, আর গাঙ্গুলিবাবুর অদ্ভুত অভিব্যক্তি বা অবস্থাগুলি যেন আমাদের না হয়, তারও পুরোপুরি ব্যবস্থা করে দিতেন তাঁর অত্যাশ্চর্য লেখনীর ভিতর দিয়েমগনলালের বাড়িতে পেস্তার সরবত বিষের ভয়ে মুখে তোলেননি লালমোহনবাবুকিন্তু 'তেরা নম্বর বক্সা' আর কিম্ভূতকিমাকার 'তখত'-এর সামনে দাঁড়িয়ে একটা গোটা মিনিট চেয়েছিলেন তিনিঘড়ি, মানিব্যাগ, এমনকি মগনলালের আস্ত ফুলদানিটাও সরিয়ে দিয়েছিলেনপরক্ষণেই ঢকঢক করে শেষ করেছিলেন সেই সরবতের গ্লাসএটা দেখে কার মুখে হাসি সরেনি ঠিকই, সবাই দাঁত কিড়মিড় করেছিল ফেলুদার অপারগতায়, কিন্তু চাট্টি অভিশাপ কুড়িয়েছিল মগনলালকেন? কারণ গাঙ্গুলিবাবু জোকার নন, কারণ উনি সামান্য এক বিদূষক নন, তিনি আমাদের চোখের মণি, তিনি আমাদের রুক্ষ জীবনে এক সবুজ, রসালো ওয়েসিস
কিন্তু চলচ্চিত্রের গাঙ্গুলীবাবু (সন্তোষ দত্ত) সবশেষে এসে এতটাই বেরসিকের মতো কাজ করলেন যেটা ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিতএতদিনের ভালোবাসা, এতদিনের সম্পর্ক, আদর করে তুলোয় মুড়ে তুলে রাখার পরেও, বলা নেই কওয়া নেই, সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন মার্চ, ১৯৮৮ সালেআরে বাবা, ফেলুদা বকাবকি করত ঠিক কথা, কিন্তু সব জায়গায় তো যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গে আপনাকে পরিচয় করাত, ম্মান করত - তবে কেন চলে গেলেন আপনি? আপনার সঙ্গে সঙ্গে অভিমানে ফেলুদাও আর কোনদিন কোন তদন্তে নামলই নাআপনিও মশাই আর কোনোদিন এসে গুণময় বাগচীর সতেরো ইঞ্চি বাইসেপ ধরে 'আরিব্বাস' বলবেন না, অসহায়ভাবে ঝুলে থাকবেন না গাওয়াংগীর কাছে বগলদাবা অবস্থায়কখনই আর চূড়ান্ত কনফিডেন্সে 'ফ্লোয়িং' অটোগ্রাফ দেবেন না গুণমুগ্ধদের.... সঙ্গে দুটো সিগনেচার ডট
কখনই আর সারা দুনিয়ার দিকে তাকিয়ে, আমরা আপনাকে দেখিয়ে বলতে পারব না, 'উনি আমাদের!!ঠিক যেমন আসল ডঃ হাজরার হাতে আপনার হারানো ভোজালি দেখে একগাল হেসে একলাফে এগিয়ে এসে ওটি হস্তগত করেছিলেন ‘ওটা আমার’ বলে!
তবুও এখন বুকে অনেক আশা নিয়ে ফেলুদা সমগ্রের পাতায় পাতায় আপনাকে খুঁজে চলেছি - আশা রাখি দশাশ্বমেধ ঘাটের উপর সবুট পদচারণ করতে করতে বলে উঠবেন আপনি ‘আহা, হতাশ হচ্ছেন কেন? আরে আমি তো বেঁচে আছি! অক্ষত!

_____
সন্তোষ দত্তর ছবি – আন্তর্জাল
জটায়ুর ছবি – সত্যজিৎ রায়