Showing posts with label চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়. Show all posts
Showing posts with label চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়. Show all posts

ইতিহাস:: লালদিঘির লালবাজার - চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়

লালদিঘি, ১৮৭৮

লালদিঘির লালবাজার
চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়

গ্রাম কলকাতা তখনও খানা, ডোবা, গভীর বন-এর আড়ালে ডুবে আছে সুন্দরবন বিস্তৃত আজকের ঝাঁ চকচকে ধর্মতলা অবধি এই গ্রামে তখন মৃতদের ভরসা শেয়াল আর শকুন জীবিতদের ভরসা দারিদ্র্য খাদ্যের বিচার নেই, ভালোমন্দের বোধ নেই ধোঁয়া হচ্ছে মশা তাড়ানোর ওষুধ তার ওপর নিত্য চুরি, ডাকাতি ধীরে ধীরে ব্রিটিশদের ছায়া পড়ল গঙ্গার জলেএকটা ছোটোখাটো দুর্গও তৈরি হল। ব্যাবসা বাণিজ্য বাড়তে লাগলকিছু কিছু হোগলা পাতায় ছাওয়া ঘর তৈরি হল। কিছুটা করে বন কেটে মানুষের বসবাস শুরু হল। অবশ্য তখন লালদিঘির পাড়ে শেঠ আর বসাকদের রমরমিয়ে ব্যাবসা চলছে।
১৭৫৬। নবাব সিরাজদৌল্লা এলেন কলকাতা অভিযানে। গুঁড়িয়ে দিলেন ইংরেজদের তৈরি কেল্লা। কলকাতা বিজয় সেরে ফিরে যেতে না যেতেই এক বছরের ভেতর ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেল। পলাশীর প্রান্তরে সিরাজদৌল্লার পরাজয় সূচিত করল বঙ্গে এক নতুন অধ্যায়ের। রবার্ট ক্লাইভ প্রথমেই যে কাজটা করলেন সেটা হল, সিরাজের আক্রমণের ভয়ে যে সমস্ত মানুষজন কলকাতা গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল, তাদের ফেরাতে লাগলেন। কারণ প্রজা না থাকলে রাজ্য শাসন কীভাবে হবে! দ্বিতীয়ত, ক্লাইভ এখানে বসবাসকারী নেটিভদের সঙ্গে একটা যোগসূত্র তৈরি করতে উদ্যোগ নিলেন আর সবচেয়ে দ্রুত যেটা করলেন সেটা হচ্ছে, গ্রাম কলকাতাকে আস্তে আস্তে শহর কলকাতা করে তোলবার প্রয়াস নিলেন। মূলত লালদিঘিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে লাগল নতুন হোয়াইট টাউন।
ওই লালদিঘির পাশে একটা ছোট্ট পুকুর ছিল। তারই পাড়ে ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কালিকোপ্রিন্টারদের কোয়ার্টার। ১৭৭৬ সালে টমাস লানস কেরানিদের থাকার জন্য উনিশটা পৃথক অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করেন রাইটার্স বিল্ডিং নাম দিয়ে। তার পাশেই ছিল পাদরি বেলামি সাহেবের বাড়ি। আরও একটু এগোলে কোম্পানির আস্তাবল। আস্তাবলের গায়েই লাগোয়া হাসপাতাল। আর হাসপাতালের পরই ছিল বারুদঘর। তারপরেই গোরস্থান। এটাই হোয়াইট টাউনের শেষ সীমা। লালদিঘির পশ্চিমে দুটি রাস্তা চলে গেছে, ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিট আর কাউন্সিল হাউস স্ট্রিট। ওখানেই ছিল হলওয়েল সাহেবের বাড়ি। এখন যেখানে সেণ্ট অ্যাণ্ড্রুজ গির্জা, তার সামনের রাস্তাটা তৈরি হয় ১৭৭১ সালে ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিট নাম দিয়ে। আর ১৭৫৮ সাল নাগাদ তারই পাশের রাস্তাটার নাম ছিল কাউন্সিল হাউস স্ট্রিট। সেখানে একটি বিশেষ মন্ত্রণাগ্রহ ছিল যেটা ১৮০০ সালে ভেঙে ফেলা হয়। লালদিঘির একটু উত্তর-পূর্ব কোণ চেপে তৈরি লন্ডনের বিখ্যাত সেন্ট মার্টিন-ইন-দ্য-ফিল্ড চার্চের অনুকরণে সেন্ট জনস চার্চ। এরই পেছনে ছিল পর্তুগিজ আর আর্মেনিয়ান টোলা।
ওদিকে লালদিঘির সামনের থেকে একটা রাস্তা সোজা পূর্বদিকে চলে গেছে। সাহেবদের ভাষায় অ্যাভেনিউ টু ইংলন্ড। রাস্তাটি গিয়ে মিশেছে বউবাজার বা বৈঠকখানা বাজারে। সেকালের নামকরা বেনিয়ান বিশ্বনাথ মতিলাল তাঁর এক ছেলের বউয়ের জন্য কিনে দেন ওই বাজারটি। সেই থেকে নাম বউবাজার। আর এই রাস্তার ওপরেই লালদিঘি থেকে মাত্র কয়েক পা হাঁটলেই বিখ্যাত লালবাজার।
আসলে লালদিঘি আর লালবাজার এই দুটো নাম নিয়েই বিতর্কের শেষ নেই। ইতিহাস যেমন বলে যে অধুনা মেটকাফে হল ছিল শেঠদের বাড়ি, তাদের বাড়ির বউদের দোলের দিনের আবির খেলায় লাল হয়ে যেত দিঘির জল, সেই থেকে নাম লালদিঘি। মতান্তরে কেউ বলেন কলকাতা গ্রামের জমিদার বেহালার সাবর্ণ  চৌধুরীদের কাছারি বাড়ি ছিল ওখানে। তাদের বাড়ির বউরা নাকি দোলের দিন দিঘির জলে স্নান করতেন। কিন্তু সে সময়ে যখন যানবাহনের কোনও সামান্যতম সুবিধে ছিল না, সে সময় বেহালা অঞ্চল থেকে লালদিঘিতে বাড়ির বউরা এসে দোলের দিন আবির খেলে স্নান করতেন এই যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য, ইতিহাস সে বিষয়ে নীরব। এই দোল পূর্ণিমায় সাবর্ণ চৌধুরীদের বিখ্যাত শ্যামরায়ের মন্দিরে দোল উৎসবে ছড়ানো হত আবির আর ফাগ। কাছেই বসত মেলা আর বাজার। তাই থেকে নাম লালবাজার। মতান্তরে অনেকগুলি তথ্য আছে। লালদিঘির কাছে শেঠদের বাড়ির ঠাকুর রাধাকৃষ্ণের নামে দুটো বাজারও আছে। একটু উত্তর দিকে গেলে রাধাবাজার। দোল উৎসবের মাতন সেখানেও ছিল। লালদিঘির উলটোদিকে মিশন রো-তে একটি খুব পুরোনো চার্চ ছিল, ওল্ড মিশন চার্চ (সিরাজের আক্রমণে এটিও গুঁড়িয়ে যায়)। গির্জার টকটকে লাল রংয়ের ছায়া পড়ত দিঘির জলে। সেই থেকে নাকি লালদিঘি ও লালবাজার। এমনও শোনা যায় ইংরেজ কোম্পানির প্রথম কেল্লার রঙও ছিল লাল। সেই লালের ছায়া পড়ত ওই জলে। কলকাতাবিদ শ্রীপান্থ লিখেছেন – ‘ইতিহাসে অনুল্লেখিত তৃতীয় জন যার নাম পালকিওয়ালা। সোয়ারি সাহেবরা ছিলেন ওদের কাছে লাল মানুষ বা রাঙা মানুষ। সুতরাং তারা যখন লাল, তখন তাদের হাট কি কখনও নীলবাজার হয়!’ আবার শেষোক্ত মত জানা যায় যে কলকাতার এক বাসিন্দা লালমোহন বসাক নাকি ওই দিঘি খনন করিয়েছিলেন। তাই তাঁর নামে দিঘি আর বাজার।

লাল গির্জা (ওল্ড মিশন চার্চ), পুরনো ফোর্ট উইলিয়ম কেল্লা, কলকাতা, ১৭৭৪

নামের উৎপত্তি যাই হোক, লালবাজার সে সময়ের সবচেয়ে ব্যস্ত অঞ্চল ছিল। এই লালবাজারেই গড়ে উঠেছিল কলকাতার প্রথম জেলখানা, ‘মেয়র’স কোর্ট’হেড কনস্টেবল মাইকেল গ্রেস-এর লালবাজার। কলকাতার প্রথম লাল পাগড়ি। সাল ১৭৮৫।
এই লালবাজারের পুলিশ হেড কোয়ার্টার গড়ে ওঠার আগে একটু তাকিয়ে দেখা যাক অতীতে৬ই ফেব্রুয়ারি ১৭০৪পুরোনো কেল্লায় ইংরেজদের একটি মিটিং-এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হল যে এই গ্রামটিতে চুরি ডাকাতি বন্ধ করার জন্য একটি দল গঠন করা হবে। এক জন হেড পিওনের অধীনে থাকবে পয়ঁতাল্লিশ জন পিওন, দু’জন সুবেদার ও কুড়ি জন গোয়ালা। এক বছরের ভেতরেই হেড পিওনের পদ বদলে হল কোতোয়াল আর পিওনরা হল পাইক, যারা বল্লম হাতে সশস্ত্র থাকবে। ১৭২০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি র‍্যালফ শেলডনকে কলকাতার প্রথম জমিনদার হিসেবে নিয়োগ করে। এই জমিনদারদের কাজ ছিল নগর ও ফৌজদারী - দুটি বিভাগের দেখভাল করা। পরবর্তীতে স্থানীয় মানুষদের মধ্যে থেকে ডেপুটি জমিনদার নিয়োগ করা হয়। প্রথম ব্ল্যাক জমিনদার হলেন নন্দরাম সেন ও দ্বিতীয় জন গোবিন্দরাম মিত্র। পরবর্তীতে তিন জন দেওয়ান পদের সৃষ্টি করা হয়এক জন রাস্তার ও পুকুরগুলির দেখভাল করবে, অন্য জন খাজনা আদায় করবে, তৃতীয় জন পুলিশের কাজ দেখবে। ১৭২০-তে জমিনদারদের কাছাড়ি, নগর পুলিশি ব্যবস্থা-সহ উঠে এল নর্টন বিল্ডিং-এ। অধুনা টোবাকো হাউস, ২৩নং লালবাজার স্ট্রিটে।
রবার্ট ক্লাইভের অধরা কাজ শেষ করতে উদ্যোগী হলেন পরবর্তী স্যার ওয়ারেন হেস্টিংস। এই ওয়ারেন হেস্টিংসের বিশিষ্ট বন্ধু ছিলেন জন পামার নামের এক বিশিষ্ট ধনী ইংরাজ। কিন্তু অপরিমিত জীবন যাপনে তার আর্থিক সংকটের সময়ে বন্ধু ওয়ারেন হেস্টিংস কিনে নেন তাঁর বাড়িটি এবং স্থায়ীভাবে সেই বাড়িটিতেই গড়ে ওঠে পুলিশের হেড কোয়ার্টার। এই বাড়িটি আদতে ছিল জন প্রিন্সেপ-এর। তিনি চার্লস ক্রোমেলিন নামে এক ব্যবসায়ীকে সেটি বিক্রি করে দেন। ক্রোমেলিনও চার্লস ওয়েসটনকে বাড়িটি বিক্রি করেন। সেখান থেকে বাড়িটির মালিক হন জন পামার। ১৭৮৫ সালে সেই লালবাজারে প্রথম হেড কনস্টেবল হয়ে আসেন মাইকেল গ্রেস। শ্রীপান্থর বিবরণে জানা যায়, গ্রেস সাহেবের লালবাজার যে-কলকাতার পুলিশ হেড কোয়ার্টার্স তার লোকসংখ্যা ছিল চার লক্ষের ওপর। কিন্তু লাল পাগড়ি ছিল মাত্র চারজন। মাইকেল ফ্ল্যাডিন, টমাস সিম্পসন ও জন রূপ। এরা কনস্টেবল। গ্রেগ হেড কনস্টেবল। তাঁদের ওপরওয়ালা হলেন কলকাতার শেরিফ।
পামার-এর বাড়ির উলটো দিকেই ছিল সাবেক কয়েদখানা। লম্বায় একশো ফুট আর চওড়ায় চল্লিশ ফুট একখানা বাড়ি। ভিতরে ছিল পুকুর। কয়েদিরা সেখানেই কাপড় কাচত, স্নান করত। গরমের দিনে পুকুরের ধারে সাহেব কয়েদিরা নিজেদের খরচায় সারি সারি ছাউনি তুলত। লালবাজারের কয়েদখানায় একটা অসুবিধে ছিল, মেয়ে আর পুরুষের জন্য এখানে স্বতন্ত্র কোনও ব্যবস্থা ছিল না। ১৭৮৩ সালে বেঙ্গল গেজেটের বিখ্যাত সম্পাদক জেমস অগাস্টাস হিকিকেও এই কয়েদখানায় বন্দি জীবন যাপন করতে হয়েছে। এছাড়া আরও দুটি কয়েদখানা ছিল তখনকার কলকাতায়। একটি উত্তর কলকাতায়, হরিণবাড়ি আর দ্বিতীয়টি বিরজি কয়েদ, এখন যেখানে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল।
১৮৫৬ সালের ১লা নভেম্বর চিফ ম্যাজিস্ট্রেট এস ওয়াওচোপ হলেন কলকাতার প্রথম পুলিশ কমিশনার। তাঁর আগে যারা ছিলেন তাঁরা সব সুপারিটেন্ডেন্ট। তারও আগে হেড কনস্টেবল। লালবাজারের এই অঞ্চলটি কলকাতার অতীতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসগুলোকে বুকে আঁকড়ে ধরে আছে। ভাবা যায়, এই লালবাজারেই ১৭৮০ সালে গড়ে ওঠে কলকাতার সবচেয়ে সেরা ট্যাভার্ন। লন্ডন ট্যাভার্ন। অনেকে এটাকে হারমনিক ট্যাভার্নও বলত। তৎকালীন কলকাতার সবচেয়ে এলিট মানুষরা এখানে আসতেন। মজলিস হত। এমনকি স্বয়ং মিসেস ওয়ারেন হেস্টিংস সেখানকার একজন পেট্রন ছিলেন। ১৭৮৫ সালের জানুয়ারি মাসে এই লন্ডন ট্যাভার্নেই স্যার ওয়ারেন হেস্টিংসকে তাঁর বিদায়কালীন ‘address of Thanks’ প্রদান করেন সেকালের কলকাতার মহামান্য নাগরিকরা। পরতে পরতে ইতিহাসের সাক্ষী আজও তার স্বমহিমায় দৃপ্ত।

লালদিঘি, ছবিঃ জেমস বেইলি ফ্রেজার, ১৮২৬
_____

আমার ছোটোবেলা:: ছোটোবেলার পুজো - চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়


ছোটোবেলার পুজো
চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়

আমার ছোটোবেলা থেকে প্রৌঢ়বেলা যে বাড়িতে বা যে অঞ্চলে কেটেছে সেখানে কাছাকাছির ভেতর দুর্গাপুজো বলতে কিছু ছিল না। যদি খাস মধ্য-কলকাতার সি আই টি রোড অঞ্চল। আমাদের বাড়ির পাশের গলি দিয়ে বেশ কিছুটা গেলে সেটা একটা টিমটিমে পুজো। প্রায় বাড়ির পুজোর মতোই, নামে সর্বজনীন। বড়ো পুজো হলে যেতে হত আনন্দপালিত অঞ্চলে, একটা বাস-স্টপ পরে। কিন্তু পুজোর আনন্দটা ছিল ভরপুর। শরতের ছেঁড়া মেঘের সারি, শিউলির প্রথম ফোটা গন্ধএগুলো মনের ভেতর পুজোর অনুরণন তৈরি করে দিত। তখন একটা পুজো গেলে গুনতে বসতাম পরের পুজো কবে আসবে। কতদিন দেরি! ওরে বাবা! আর এখন মনে হয়, এই তো সবে পুজো গেল, এর ভেতরেই একবছর পার! আসলে সময় তো বয়সের প্রলেপ পরিয়ে দেয় মনের ওপর।
আমাদের পুজোর আনন্দটার পারদ চড়ত ঠিক মহালয়ার দিন ভোর থেকে। ওইদিন থেকেই মন বাঁধনছাড়া। তখন খুব ছোটোমানে একলা বার হবার অধিকার নেই বাড়ি থেকে। তাই বসে বসে নতুন জামাগুলো গুনতাম। পুজোর স্টাইল বলে কিছু ছিল না আমাদের। মনে আছে, বাবা নিয়ে বার হতেন একদিন আমায়। বিনি কোম্পানির কাপড় কেনা হত জামার জন্য। আর রেডিমেড হাফপ্যান্ট। তারপর সোজা বাবার হাত ধরে বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটে চিনেদের দোকান থেকে জুতো। তবে দিদির সঙ্গে বার হলে নিউ মার্কেটটা একবার ঘুরতে যাওয়া হত। তখন আমাদের ছোটোবেলায় একটা মজার পোশাক পাওয়া যেত। এখনও পাওয়া যায় বোধহয়। বেশ উর্দিধারী সিপাহীদের পোশাক। মাথায় অলিভ কালারের টুপি। ফুল-প্যান্ট, জামা, আবার কোমরে গোঁজা পিস্তল। নিউ মার্কেটে ঢোকার পরেই ডানদিকে মনে আছে জামাকাপড়ের দোকানে ওই পোশাকটা সাজানো থাকত। কী অসম্ভব প্রিয় ছিল আমার এই পোশাকটা বলতে পারব না! কিন্তু মুখ ফুটে বাবাকে কোনদিন কিনে দিতে বলতে পারিনি। যেমন কোনদিন বলতে পারিনি বাবাকে যে বাটার দোকান থেকে জুতো কিনে দাও, নয়তো পরব না। এগুলো বলার ক্ষমতাই ছিল না। এটা নয় যে বাবা প্রচণ্ড রাশভারি মানুষ। আসলে বাবা-মা হাতে করে যেটা দিতেন সেটাই আমার কাছে বড়ো পাওনা ছিল তখন। চাহিদা ব্যাপারটা আসেইনি।
তবে একবার বাবার কাছে আবদার করেছিলাম একটা জুতোর। বাটা কোম্পানি সদ্য তখন সেটা বার করেছে। স্কুলে আমার এত বন্ধুর পায়ে দেখে খুব মনে ধরেছিল। কিছুই না, জুতোর ভেতরের খোলটা তুললে একটা ছোট্ট কম্পাস বসানো ছিল। সেই প্রথম বাবার হাত ধরে ফুটনানি ম্যানসনে, ধর্মতলায় বাটার দোকানে ঢোকা। জুতো কিনলে যে সুন্দর হলুদ রঙের মুখোশ ফ্রি পাওয়া যায় আর সঙ্গে দুটো বেলুন, এ তথ্য জানলাম তখনই আর সেটা কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের থেকে কিছু কম আনন্দের ছিল না।
পুজোর মজা ছিল বাবার সঙ্গে বার হলে ওই একটা দিন পুডিং খাওয়া। বাবা নিয়ে যেতেন কলকাতা কর্পোরেশনের পেছনে রিজেন্ট হোটেলে। সেখানকার পুডিংয়ের স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে। আরেকটা জিনিস সে সময় বাবা আনতেন আমার জন্য। একটা বড়ো পিচবোর্ডের বাক্সে একটা করে খেলনা। দুটোর কথা এখনও মনে আছে। একবার পেয়েছিলাম মেকানো, আরেকবার ট্রেনের রেলগাড়ি; দম দিলে টিনের পাতা গোল ট্রাকের ওপর দৌড়বে। পিচবোর্ডের বাক্সের গায়ে নীল রঙের একটা চাঁদমালার ছবি দেওয়া। অন্যদিকে বড়ো করে লেখা থাকত কমলালয় স্টোর্সবাঙালি জাতির বাবুয়ানার নিজস্ব ট্রেড মার্ক। আজ বুঝি সে খেলনার মাহাত্ম্য কতটা।
আর আসত পুজো উপলক্ষে প্রকাশিত শারদসম্ভার। মায়ের জন্য আসত বসুমতী, ঘরোয়া, উল্টোরথ। আর আমাদের জন্য দেব সাহিত্য কুটিরের আনন্দ, নীহারিকা, তপোবন। এই সংকলনগুলো ছিল আমাদের পুজোর স্পেশাল গিফট। সঙ্গে অবশ্যই মৌচাক আর শারদীয়া শিশুসাথী।
আমাদের বাড়ির পুরাতন কাজের মানুষটি ছিলেন সৌরীদা। সৌরীদার কাজ ছিল পুজোর সময় আমার ও আমার দু-তিন বন্ধুকে বগলদাবা করে ওই আনন্দপালিত অবধি নিয়ে যাওয়া। প্যান্ডেলের বাঁশ পড়া থেকে শুরু হত তাঁর এই নিত্য যন্ত্রণা। আমরা বাঁশ গুনতাম। বাঁশ লাগানো হলে সেটা ধরে ঝুলে ঝুলে দোল খেতাম। তখন কোনমতে একটা বাঁশের স্ট্রাকচার খাড়া করে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে সামনে কাপড়ের কুঁচি দিয়ে প্যান্ডেল সাজানো হত। আর পাড়া সাজানো হত ষাট অথবা চল্লিশ পাওয়ারের বাল্বের ঝালর করে। পরে অবশ্য টিউবলাইটের বাহার এল। কিন্তু দেখার মতো জিনি ছিল শুধু পুজোটা। সাবেক মূর্তি অথবা আলাদা আলাদা মূর্তি। কিন্তু পুজোটা করা হত অন্তর থেকে। তখনও মা দুর্গা র‍্যাম্পে দাঁড়ানো সুন্দরীর মতো প্রতিযোগিতায় নাম লেখাননি। থিমের পুজো কোনও ধারণাতেই ছিল না। ছিল শুধু আন্তরিকতার প্রয়াস।
পরে যখন একটু বড়ো হলাম মানে, ক্লাস নাইন-টেনে পড়ি, তখন প্রথম ফুলপ্যান্ট উপহার পেলাম মামার বাড়ি থেকে। আর পেলাম একটা ববি প্রিন্টের শার্ট। তখন বছর দুই-তিন হল ববি সিনেমা দেখানো হয়ে গেছে। অমিতাভ বচ্চনের জমানা এসে গেছে। বেলবটস কাটিং প্যান্ট তখন নতুন ট্রেন্ড। নতুন ফুলপ্যান্ট আর ববি কাটিং শার্ট তখন আমাদের কিশোর মনের নতুন রোমাঞ্চ। বাড়ি থেকে ছাড় পাওয়া গেল দুঘণ্টা ঘুরে আসতে পারি বন্ধুদের সঙ্গে, একা ফিলিপসের মোড় থেকে মাত্র দুটো স্টপ তালতলা অবধি। তাই তখন আমাদের হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো। পকেট খরচ পেলাম পাঁচ টাকা। ওই সময় পাঁচ টাকা এখন প্রায় পাঁচশ টাকার সমান।
কিছুটা স্বাধীনতা পেলেই সেটাকে আরও একটু বেশি করে অধিকারে আনা ওই বয়সের ধর্ম। চারবন্ধু চলে গেলাম নিউ মার্কেট। ওই অবধি চিনি। তারপর নিজামে ঢুকে রোল খেলাম। সেই জীবনে প্রথম রোল খাওয়া। পুজোয় বার হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে নিজামে রোল খেয়েছি, নিজেকে বেশ লায়েক লায়েক মনে হচ্ছিল। তখনও আমাদের মধ্যে একটা খেলার চল ছিল। স্কুল খুললে বন্ধুদের কাছে জানানো কে কটা ঠাকুর দেখেছে। কারোরই একশোর কম হত না। আসলে একই ঠাকুর, যাতায়াতের পথে তিনবার দেখলাম ওটা, মানে তিনটে ঠাকুর দেখা হয়ে গেল। আসলে আমাদের ওই কৈশোরে আনন্দ ছিল আদিগন্ত বিস্তৃত। বৈভবের এত প্রাচুর্য ছিল না এখনকার মতো। ছিল মারফি রেডিও, বীরেন ভদ্রের গলায় মহালয়া, স্বচ্ছ আকাশ। সপ্তমী আর নবমীতে মায়ের হাতের পাঁঠার ঝোল। বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে আলুকাবলি। পুজোর মেলায় বেলুন ফাটানোকাঠের নাগরদোলায় ঘুর-ঘুর-ঘুর। আর যে কোন পুজো প্যান্ডেলে বসে জোরকদমে আড্ডা।
আমার পৈতৃক বাড়ি ভবানীপুর হরিশ মুখার্জি রোডের ওপর। সেইখানে ভবানীপুর সর্বজনীন দুর্গোৎসব আজ প্রায় সাতাশি বছরের। আমাদের জ্যাঠা, বাবার হাতে তৈরি পুজো। উলটোদিকেই সেকালের বিখ্যাত ব্যারিস্টার বি সি ঘোষের বাড়ি। আর পাশেই কুণ্ডুদের বাড়ি। তাঁরাও ছিলেন এই পুজোর প্রধান উদ্যোক্তা। সেই পুজোতেই ছিল আমার নাড়ির টান বাঁধা। ষষ্ঠীর দিন আমাদের এন্টালির বাড়ি থেকে আমার জ্যাঠতুতো ন’দাদার সঙ্গে গাড়ি করে চলে যেতাম ভবানীপুর।
যেহেতু ভাইবোনেদের মধ্যে আমি সবচেয়ে ছোটো, মানে আমি নিজের দিদির ও দাদার থেকে যথাক্রমে কুড়ি ও আঠারো বছরের ছোটো, আমার সমস্ত ভাইপো, ভাইঝি, ভাগ্নে ছিল প্রায় আমার সমবয়সী, এমনকি বয়সেও অনেকে বড়ো ছিল। তাই আড্ডা জমত নিচের ঘরে। এই ঘরটা পুজোর কদিন আমাদের দখলে। কখন খাচ্ছি, কখন ঘুমোচ্ছি কোনও কিছুরই ঠিক নেই। আমার প্রিয় ভাগ্নে ভাস্কর আমার থেকে ঠিক ছমাসের বড়োআর প্রিয় ভাইঝি সুকন্যা আমার থেকে এক বছরের ছোটোএদের সঙ্গে ঝগড়া, মারামারি হবেই আবার মিটে যেত ঠিক সন্ধ্যারতির সময়ভাস্করের হাতের ঢাক বাজানো পথচলতি মানুষ দাঁড়িয়ে শুনতপরবর্তী সময়ে ভাস্কর গান শেখে দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে। অসাধারণ বহুমুখী গুণের আধার ছিল। আর সুকন্যার সঙ্গেই আমার যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় কিঞ্জল পত্রিকা। আজ আমার এই খুব প্রিয় দুই মানুষের দুইজনেই নেই। শুধু তাদের স্মৃতিটুকু ঘুরে বেড়ায় এখনও, ভবানীপুরের বাড়ির চাতালে দাঁড়ালে। মাঝরাতে বসে ভাস্কর ঢোল নিয়ে বসে গান ধরত, কাঠের চৌকির ওপর। অক্লান্তভাবে গেয়ে চলত একের পর এক গান। প্রসঙ্গত আমার বিয়ের বাসরেও ভাস্কর সারারাত গান গেয়ে আর লোক হাসিয়ে সবাইকে জাগিয়ে রেখেছিল। এ ধরনের ছেলেদের আমাদের সময়ে বলা হত বাসর জাগানিয়া। এখন তো আর বিয়ের বাসর সেভাবে হয় না।
ফিরে আসি পুজোর কথায়। তখন ভবানীপুরের পুজো মানেই লোকের ঢল। সঙ্ঘশ্রী, সঙ্ঘমিত্রা, মুক্তদল, বকুলবাগান। এরই মধ্যে প্রথম সঙ্ঘশ্রী। সাতের দশকের শেষে প্রথম থিমের ঠাকুর তৈরি করল শোলা দিয়ে। ব্যস, ভবানীপুরের সব প্যান্ডেলে উপচে পড়া ভিড়অষ্টমীর অঞ্জলির সময়টা আমাদের ব্যস্ততা বেড়ে যেত। মানে আমরা ওই যাদের না হলে পুজো হয় না, তাদের দলে। একটু দুষ্টুমিও থাকতসদ্য শাড়ি পরে আসা ষোড়শীটির হাতে অঞ্জলির ফুল তুলে দেওয়া। বা তারই পাশে অথবা পেছনে দাঁড়িয়ে অঞ্জলি দেওয়া। শ্যাম্পু করা চুল উড়ে এসে লাগছে নাকে। মনের মধ্যে হাজারো কাঠির ঝনৎকার। হয়তো আবার দেখা হবে পরের বছর অষ্টমীতে। কতক চোখ খুঁজবে তাকে প্যান্ডেলের আঙিনায়। এসবই তো তখন আমাদের বিনোদন।
আর ছিল অবশ্যই দুপুরবেলা গান শোনা রেকর্ডে। আমার জ্যাঠতুতো বউদি বন্দনা সিংহ, তাছাড়া আমার জ্যাঠতুতো দুই দিদিও অসাধারণ গান গাইত। ওদের বসত গানের আসর সন্ধ্যায়। আমরা দুপুরে রেকর্ডে গান শুনতাম। পুজোয় বা হওয়া নতুন রেকর্ডের গান। একটা হিজ মাস্টার’স ভয়েস বা এইচ এম ভির শারদ-অর্ঘ্য বই আসত বাড়িতে। সেই বই থেকে দেখে নতুন রেকর্ড কেনা হত। ই পি অথবা লং প্লেয়িং। সুরের মায়াজালে ভাসতাম আমরা। মান্না দে, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে থেকে শুরু করে সতীনাথ-উৎপলা পর্যন্ত গানের সবার নতুন রেকর্ড বার হত। আর বার হত ভানু বন্দোপাধ্যায়ের কমিক রেকর্ড।
দশমীর দিন সকাল থেকে মন-বিষাদের পালা। তবে নিয়ম ছিল সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে ভাসানে যেতে হবে। আগেকার দিনে বাবারা নাকি কাঁধে করে নিয়ে যেতেন প্রতিমা। এখন আর কাঁধে নয়, লরিতে যাওয়া হয়। দশমীর দিন সিঁদুর খেলার পর আমাদের চাটুজ্যে বাড়ি থেকে মেজজেঠিমা সবাইকে খাওয়াতেন ঘুগনি। আর কুণ্ডুবাড়ি থেকে আসত বোঁদে। সিদ্ধি খাওয়ারও প্রথা ছিল। এরপর পাড়ায় একচক্কর দিয়ে ভবানীপুরের আদি গঙ্গায় মায়ের বিসর্জন হত। ফিরে এলে ঘটে গঙ্গার জল নিয়ে, তারপর বড়োদের প্রণাম আর বিজয়ার কোলাকুলি। শূন্য প্যান্ডেলের মধ্যে জ্বলত একটা মাটির প্রদীপ। বিষণ্ণতার ভেতরেও এই যে প্রাণের কোলাকুলি, বুকের ভেতর উষ্ণভাবে জড়িয়ে ধরা, এটাই ছিল পরম প্রাপ্তি। 

_____
ছবিঃ আন্তর্জাল এবং লেখক

আমার ছেলেবেলা - চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়


আমার ছেলেবেলা
চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়

আমার জন্ম-সময়টা এমন একটা বছরে যখন একদিকে যৌথ পরিবারগুলো শেষ পুরুষের কলকাকলিতে একই ছাদের তলায় অবস্থান করছে। ঘরের মধ্যে দেওয়াল। বাড়ির নাটমন্দির ভাগ করে রান্নার জায়গা। তবুও বাড়ির মেজবউ লাউ-চিংড়ি রান্না করে একবাটি বড়ো ভাসুরের জন্য পাঠিয়ে দেয়। বড়োজন লাউ-চিংড়ি খেতে খুবই ভালোবাসে যে! তেমনি ছোটোকর্তার মেয়ে অনায়াসে মেজজ্যাঠার সঙ্গে শীতের বালাপোশ ভাগ করে শুয়ে পড়ে। তখনও কলকাতার সূর্যাস্তে ছড়ানো রয়েছে বাবু কালচারের ফিকে হয়ে যাওয়া স্বর্ণালী আভার শেষ পরতটুকু। তখনও কলকাতার গৃহস্থ-বাড়িতে ছিল কয়লা জ্বালানো উনুনে রান্না। সেটা ১৯৬০ সাল। বাড়িতে বাড়িতে ছিল সাদা নব দেওয়া রেডিও, গ্রামোফোন, ৭৮ স্পীডের রেকর্ড, ইকমিক কুকার, হ্যাজাকের আলো, হোল্ড-অল, আচার শুকানো কাঁচের বয়াম, দোয়াত কলম। তখন কলকাতায় ছিল ভিস্তিওয়ালা, ডবল ডেকার বাস, সিনেমার হাফ টাইমের বই। ছিল বেতার জগত, এইচ এম ভি-র শারদ অর্ঘ্য, পুজোর গান, থিয়েটার পাড়া, কমলালয় স্টোরস, উত্তর পূরবী-উজ্জ্বলা আর ছিল সকাল ন’টার ভোঁ।
আমাদের বাড়ির সামনে একজন চিনাম্যান জাগলিংয়ের খেলা দেখাতেন। আমার জ্ঞান হওয়া থেকে যৌবন পর্যন্ত তাকে ওই একই খেলা দেখাতে দেখেছি। কাঁধে একটা বড়ো কাঠের বাক্স স্ট্র্যাপ দিয়ে আটকানো। হাতে একটা গোলাকৃতি ছোট্ট টুল। তখন আমাদের ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ দান হিসেবে মনে হত সেই লোকটিকে যে হাতে মোটা বাঁশের লাঠি নিয়ে এসে দাঁড়াত আর লাঠিতে জড়ানো থাকত চ্যাপটানো লজেন্স। সে সেখান থেকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে বানিয়ে দিত হাতে ঘড়ি, গড়গড়া, পদ্মফুল। তখন এক পয়সা, দু’পয়সা, তিন পয়সা মাপের পেপারমেন্ট লজেন্সের বিক্রি ছিল এখনকার ক্যাডবেরি স্লিকের থেকে বেশি। দোলযাত্রায় মুড়কি, ফুটকড়াই আর চিনির তৈরি মঠ ছিল অবশ্য আহার্য। তিলের কাঠি, কদমা, পাঁচ পয়সার ‘বরফ আইসক্রিম’ (ফিরিওয়ালারা ওই নামেই ডাকত)। তখনও কলকাতায় ছিল আড্ডা দেওয়ার রক। বিয়েবাড়িতে হত কলাপাতায় খাওয়া, মাটির খুরিতে কেওড়া জল। ছিল আন্তরিকতার মোড়কে কলকাতা।

আমাদের এন্টালির বাড়িতে সত্যজিৎবাবু, আমি হাফপ্যান্ট পরে

বাঙালি জীবন দ্বিতীয় রেনেসাঁয় ভেসে যাচ্ছে। কি সঙ্গীত, কি সাহিত্য, কি শিল্প, কি চলচ্চিত্রে, কি বাণিজ্য-রাজনীতিতে বাঙালি তখন স্বর্ণালী নস্টালজিয়ায় সওয়ার। আর আমার জ্ঞান হওয়া থেকে বাল্য-কৈশোরে বেড়ে ওঠাও এই পরিবেশে। ছোটোবেলা থেকেই একটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে শ্বাস নিতে নিতে বড়ো হয়ে গেছি কখন।
আমার বাবা বিমলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ, আড্ডাবাজ, গ্রন্থপ্রেমী এক মানুষ। যিনি পরবর্তী জীবনে অভিনেতা হয়ে উঠেছিলেন সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেনের বিভিন্ন চলচ্চিত্রে। আমাদের ছোটোবেলায়, কিশোরবেলায় একটা পাড়া-সংস্কৃতির ছাপ ছিল সর্বত্র। পান পরাগ কালচার তখন ব্রাত্য। তখন ছোটোদের জন্য মণিমেলা, ব্রতচারী সংঘ ছিল। ছিল শহরের মধ্যেই বড়ো বড়ো পুকুর। খেলবার মাঠ। ছিল পাড়ায় পাড়ায় বিশেষ বিশেষ দিনে প্রভাতফেরী। বিচিত্রানুষ্ঠান। আমি ছোটোবেলা থেকেই মণিমেলার সদস্য। এছাড়া বিশেষ বিশেষ পাড়ায় অনুষ্ঠিত হত সারারাতব্যাপী বাংলা গানের জলসা। সাধারণ চৌকি পেতে, ত্রিপল বিছিয়ে স্টেজ করা হত। মাথার ওপর সাধারণ কাপড়ের ঢাকা। অবশ্য একটা গ্রিনরুম হত বড়ো সাইজের। শিল্পীরা সেখানে বসে আড্ডা দিতেন। বাংলার প্রায় সমস্ত নামী গাইয়েরা উপস্থিত থাকতেন। এইরকম একটা কলকাতায় আমার বড়ো হয়ে ওঠা। যখন গাছে চড়া, পিট্টু খেলা, ডাংগুলি এগুলো না খেললে দমবন্ধ হয়ে যেত। বাবা ব্যস্ত থাকতেন তাঁর সাংস্কৃতিক আঙিনায়। বাড়ির নিয়ম ছিল বড়োরা গল্প করলে, কথা বললে সে ঘরে প্রবেশ নিষেধ। যতক্ষণ না তাঁরা ডাকছেন। রবিবার মানেই সকাল থেকেই বাবার কাছে লোকের আনাগোনা। তার ভেতর এক রবিবার বাবা নিয়ে গেলেন আমায় আমাদেরই পড়শি কাজী নজরুল ইসলামের বাড়িতে। আমার বয়স তখন আট কি নয়। একজন দাদু কবিতা লেখে এটাই ছিল আমার কাছে তাঁর পরিচয়। সেই আমার দেখা প্রথম মহাপুরুষ। যেতাম কাজী সব্যসাচীর কাছে কবিতা শিখতে। কোনও কোনওদিন হয়তো তিনি ব্যস্ত, আমায় বলতেন, ‘যা, বাবার ঘরে গিয়ে বস। এই কবিতাটা মুখস্থ কর। আমি দেখে দিচ্ছি।’ গিয়ে বসতাম কাজী নজরুলের ঘরে। আমার হাতে কবিতার বই ‘সঞ্চিতা’কবিতা ‘ঝিঙেফুল’। উনি হয়তো একটা তক্তপোষে বসে নিবিষ্ট মনে কাগজ ছিঁড়ে চলেছেন। আর আমি বসে থাকতাম একটা গোল করে পাকানো শতরঞ্চির ওপর। অদ্ভুতভাবে উনি মাঝে মাঝে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতেন আমার দিকে চেয়ে। তখন জানতাম না কোন মনীষীর সামনে বসে আছি। খুব খারাপ লাগত যখন দেখতাম কাজের লোকেরা ওনাকে চান করানোর জন্য নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু হয়তো ওনার লুঙ্গি খুলে গেল। আর অমনি কাজের লোকটি দু’চার ঘা বসিয়ে দিল কাজী নজরুলের গায়ে। বড়ো হয়ে মা’র কাছে শুনেছি এই কারণেই নাকি মাস কয়েক পর আর আমি ওখানে যাইনি। মাকে নাকি বলতাম, ‘ওরা দাদুকে মারে। আমি যাব না।’ যাই হোক, তাঁর কৃপাদৃষ্টি তো আমি পেয়েছি। আজ বুঝি সে আমার জীবনের কত বড়ো সম্পদ।

বাবা আর মা বাবা আলাউদ্দিনের সঙ্গে ভবানীপুরের বাড়িতে

আমাদের বাড়িতে তখন পুরোদমে চলছে নবীন বাউলের জন্মদিবস পালনের কর্মসূচি। পূর্ণদাস বাউল তখন রোজই আসতেন আমাদের বাড়ি। হঠাৎ অনেকের ভিড়ে একদিন লম্বা এক ফর্সা ভদ্রলোককে আসতে দেখলাম। একটা অদ্ভুত জ্যোতি বার হচ্ছে মনে হল ভদ্রলোকের চতুর্দিক থেকে। বাবা প্রণাম করতে বললেন। ভদ্রলোক আমার গাল টিপে আদর করে দিলেন। পাশে বসিয়ে কোন স্কুলে পড়ি, কী পড়ি সব জিজ্ঞাসা করলেন। বাবার কাছে শুনলাম উনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বংশধর, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ঠাকুরবংশের আরেক বোহেমিয়ান মানুষকে অনেকবার দেখেছি আমাদের বাড়িতে বা ওনার বাড়ি ধর্মতলায়। সুভো ঠাকুর। আড্ডা জমে উঠলে কারুরই সময়ের খেয়াল থাকত না। তখন বাবা সন্ধেবেলা বাড়ি থাকা মানেই আড্ডা। তবুও পড়াশুনোর ফাঁকে ফাঁকে উঁকি মেরে দেখতাম কে আসছে বাবার কাছে। যাঁরা আসছেন তাঁদের নাম জানতাম শুধু। তাঁরা কে বোঝবার মতো বয়স হয়নি তখনও। পরে অনুভব করেছি, বিস্মিত হয়েছি। হাতে একটা কালো ছোট্ট সুটকেস টাইপের বাক্স ঝুলিয়ে, সাদা ফতুয়া-পাঞ্জাবি আর ঢোলা পায়জামা পরে এক বেঁটেখাটো ভদ্রলোক মাঝে মাঝে আসতেন আমাদের বাড়ি। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময়ে হাঁক পাড়তেন, ‘কী রে বিমল, আছিস? বৌমা, তাড়াতাড়ি চায়ের জল বসাও।’ উনি এলেই দেখতাম মা ওনাকে প্রণাম করতেন। চা খাওয়া হল। আড্ডার ফাঁকেই দরাজ গলায় গান ধরতেন। কী অসাধারণ কণ্ঠস্বর! তখন কি জানতাম, পাহাড়ি সান্যালের গলায় গান শুনছি? নিধুবাবুর টপ্পা অথবা অতুলপ্রসাদের গান।
তখন ক্লাস এইট-নাইনে পড়ি। আমাদের পাড়ার কনভেন্ট পার্কে ক্রিকেট খেলতে যেতাম বন্ধুদের সঙ্গে। ওখানে আলাপ হল একদিন বয়সে বেশ কিছুটা বড়ো রাজাদার সঙ্গে। রাজাদা পাশেই কনভেন্ট ম্যানসনে থাকতেন। সাবেকি ভাড়াবাড়ির চারতলায়। রাজাদার বাড়ি প্রায়ই যেতাম। একদিন দেখি একজন মানুষ আপনমনে চোখ বুজে এসরাজ বাজাচ্ছেন। বেশ কিছুক্ষণ শুনলাম। রাজাদা এসে আলাপ করিয়ে দিলেন ওঁর জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে, বাবার নাম বলে। এসরাজ নামিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘তুমি বিমলের ছেলে! বিমল কেমন আছে? বোলো, একদিন আমি ডেকেছি।’ পরে বাবাকে গিয়ে ওনার কথা বললাম। ওমা, দেখি বিকেলবেলায় রাজাদাকে সঙ্গে নিয়ে উনি নিজেই হাজির আমাদের বাড়ি। রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রবাদপ্রতিম মানুষ, শৈলজারঞ্জন মজুমদার। কী অমায়িক মানুষ!

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে বাবা, জয় বাবা ফেলুনাথের সেটে

জগন্ময় মিত্র ছিলেন ঘরের লোক। অসাধারণ কুঁচোনো ধুতি পরে জগন্ময়কাকা এসে বসতেন খাটে। আড্ডা চলত, গান চলত। আমার যুবকবেলা অবধি জগন্ময়কাকার সান্নিধ্য পেয়েছি। প্রেমেন্দ্র মিত্র মানুষটি খুবই শান্তশিষ্ট স্বভাবের। তখন ঘনাদা পড়া হয়ে গেছে আমার। উনি আসতেন, বাবার লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে যেতেন। আমার দাদা-দিদির প্রতি খুব রাগ হত। তারা আমার থেকে আঠারো এবং কুড়ি বছরের বড়ো। তারা বাবার খ্যাতির তুঙ্গটা দেখেছেন। আমি বাবা-মা’র বেশি বয়সের সন্তান। তাই সবার আদরটাই পেয়েছি বেশি করে। আমার মা উত্তরপাড়ার বিখ্যাত জমিদার পেয়ারীমোহন মুখোপাধ্যায়ের জ্যেষ্ঠা প্রপৌত্রী। পথ চলতে গিয়ে বাবা থেমে থাকেননি কোনও নির্দিষ্টতায়। দিগন্তরেখার হাতছানিতে বারবার ছুটে গিয়েছেন আকাশ ছুঁতে বিভিন্ন মাধ্যমে। হয়তো এটাই তাঁর ব্যর্থতা। অথবা এটাই এনে দিয়েছিল তাঁর জীবনকে বহুমুখীতার জনপ্রিয়তার স্বাদ। প্রথম জীবনে ঘুরে বেড়িয়েছেন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বীর সাভারকার, অগ্রজ নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ( যিনি এন. সি. চ্যাটার্জী নামেই খ্যাত এবং লোকসভার প্রাক্তন স্পীকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের পিতা)। সেখানে মন টেঁকেনি। সরিয়ে নিয়ে নিজেকে বেঁধেছিলেন সুরের জালে। আমাদের এন্টালির বাড়িতে বসত মাসিক জলসার আসর। কে আসেননি সেই জলসায়। দিলীপকুমার রায়, ডাঃ কালিদাস নাগ, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, ধীরাজ ভট্টাচার্য, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ধীরেন বসু, সুচিত্রা সেন, সুনন্দা পট্টনায়েক, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, অখিলবন্ধু ঘোষ, ঋত্বিক ঘটক প্রমুখেরা। এভাবেই একদিন কৈশোরের সঙ্গমে এসে দাঁড়ালাম।
বাবা তখন অভিনেতা। সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লা, জয় বাবা ফেলুনাথ, জন অরণ্য, হীরক রাজার দেশে, ঘরে বাইরে আর ঋত্বিক ঘটকের খারিজ-এর জনপ্রিয় অভিনেতা। আমার জীবনেও তখন কিঞ্জল পত্রিকার হাতছানি। মাধ্যমিক পাশ করবার পরই বার করেছিলাম কিঞ্জল পত্রিকা। আজ চল্লিশ বছর ধরে যা প্রকাশ করে চলেছি। আমার জীবনে দেখা শেষ মনীষী সত্যজিৎ রায়। আর কিঞ্জল পত্রিকা আমাকে দিয়েছে আরও আরও প্রচুর মানুষের স্নেহ, মমতা। তাঁদের স্নেহবর্ষণে সিক্ত আমি – রাধারানী দেবী, অন্নদাশঙ্কর রায়, চিত্রিতা দেবী, রথীন মৈত্র, পরিতোষ সেন, রাধাপ্রসাদ গুপ্ত, আরও আরও অনেকে। সে অন্য পর্ব। অন্য মনন।

আমাদের ১১৬ নং এন্টালির বাড়ি
_____