Showing posts with label হিমি মিত্র রায়. Show all posts
Showing posts with label হিমি মিত্র রায়. Show all posts

ভ্রমণ:: দলগাঁও ভিউ পয়েন্টে একবেলা - হিমি মিত্র রায়


দলগাঁও ভিউ পয়েন্টে একবেলা
হিমি মিত্র রায়

এই দমবন্ধ পরিস্থিতিতে সুকুমার রায়ের অবাক জলপানের কথা মনে পড়ছিল, ছোটোবেলায় এই নাটকের একটি চরিত্রে আমি অভিনয় করেছিলাম পথিক বারে বারে বিভিন্ন মানুষের দোরে দোরে ঘুরছে আর বলছে,একটু জল পাই কোথায় বলতে পারেন? কিন্তু কেউই জল দিতে পারছিল না আমাদের অবস্থাটা হল অনেকটা সেরকমই বিশুদ্ধ অক্সিজেন কোথায় পাব বল তো এই পরিস্থিতিতে? চারিদিকে শুধু অক্সিজেনের হাহাকার, দমবন্ধ পরিস্থিতি। উত্তরবঙ্গে থাকার অনেকগুলো অসুবিধের মধ্যে একটাই সুবিধে আছে, চাইলেই প্রকৃতিকে জাপটে ধরে মনের কথা বলা যায়, তার কাছে নিজের অভাব অভিযোগ সব খুলে বলা যায় যে গান বাকি সকলের কাছে গাইলে হাসির পাত্র বা পাত্রী হতে হয় সেটা দিগন্তবিস্তৃত সবুজের মাঝে চিৎকার করলেও কেউ বকা দিতে আসে না বা মুখ টিপে হাসে না
টিভির খবরে ভয়, ঠিক করলাম এই ভিড় থেকে দূরে পালিয়ে যাব, উদ্দেশ্য, ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়ানো এদিক-সেদিকনিজেরাই বাড়ি থেকে খাবার প্যাক করে নিলাম, ফ্রাইড রাইস আর ডিম কষা, সঙ্গে এক গ্লাস ভর্তি আদা দেওয়া লিকার চা। আপাতত নিশ্চিন্ত তারপর চললাম এগিয়ে ডুয়ার্সের দিকে যাযাবরের জীবনযাপন হওয়ায় উত্তরবঙ্গে ফিরলাম তিন বছর পর। সেজন্য একটা অন্যরকম ভালোলাগা ভেতরে ছিলই, বাড়িতে ফিরে আসার ভালোবাসা আবার সেই সবুজ প্রকৃতি, খাল-বিল, জঙ্গল পাহাড়, বিভিন্ন পাখিদের নানান ডাক, কোনোটা জানা কোনোটা অজানা!
লাটাগুড়ি ফরেস্ট-এর ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় চিরপরিচিত সেই ঘণ্টা পোকার আওয়াজ যেখানে গাড়ির এসি বন্ধ করে দিতে হয়, তার বদলে খুলে দিতে হয় কাচ সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে ঢুকবে এক ঝাঁক ঠান্ডা সবুজ অক্সিজেন ভরা বাতাস এই ঘণ্টা পোকাকে অনেকেই ঝিঁঝিঁপোকা বলে ভুল করে, তা কিন্তু নয় আসলে ঘণ্টা পোকার নাম হয়েছে কারণ - মন্দিরে যখন একসঙ্গে অনেকগুলো ঘণ্টা বাজে তখন যে আওয়াজটি হয় এর আওয়াজ ঠিক তেমন।
মুখ বাড়িয়ে কিছুক্ষণ প্রাণভরে বাতাস নিলাম, তারপর সোজা চলে গেলাম চাপরামারি ফরেস্ট-এর ভেতর দিয়ে আরও দূরে শিবচু বিএসএফ ক্যাম্প ছাড়িয়ে ঝালং পার করে আরও অনেকটা ওই রাস্তার প্রতিটি বাড়িঘর দেখে মনে হয় ফুলের রাজ্যে এসে পৌঁছেছি ডান দিক দিয়ে বয়ে চলেছে পাথুরে নদী তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আমরা চললাম কুমানির দিকে এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলে রাখা ভালো, কুমারি আর কুমাই কিন্তু আলাদা



অন্ধকার ঝুপ করে নেমে এল, এটা বলাই বাহুল্য এমনিতেই সে দিনের আবহাওয়া মনমুগ্ধকর ছিল, একদম রোদ নেই, আর জঙ্গলে ঢোকামাত্রই আবহাওয়াটা আর বেশি অন্ধকার হয়ে এল আমরা সোজা চলে গেলাম যাচ্ছি তো যাচ্ছি, তবুও মনে হয় এ পথ যেন না শেষ হয় দুপাশে শুধুই মনোরম দৃশ্য তবে এখানে হাতি আসার সম্ভাবনা রয়েছে আমার ছোট্ট কন্যাটিও মায়ের এই উত্তেজিত ভাব দেখে খানিক অবাক
এতদিন পরে সবুজ প্রকৃতি, পাহাড়, নদী সকলকে কাছ থেকে দেখতে পেরে যে উচ্ছ্বাস মনের মধ্যে ছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় নাএক অদ্ভুত আরাম আমাদের সবাইকেই মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল, বলছিল একদিনের জন্য তোদের ছুটি দিলাম এই মুখোশের বৃত্ত থেকে প্রকৃতিতে ঘুরে ভালোয় ভালোয় ফিরে এসো, আবার তো সেই ভয়।
এবার বেশ কিছুটা রাস্তা পাহাড়ে উঠতে হল জিজ্ঞেস করে করে আমরা অবশেষে গিয়ে পৌঁছলাম দলগাঁও ভিউ পয়েন্ট প্রচণ্ড বৃষ্টি তখন পাহাড়ে, আমরা গাড়ি থেকে নামতে পারছি না গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখে গাড়ির মধ্যে বৃষ্টির শব্দ শুনছি আর গরম চায়ে চুমুক দিচ্ছি, সঙ্গে ডাইজেস্টিভ বিস্কুট তারপর বহুক্ষণ আটকে ছিলাম গাড়িতে, আস্তে আস্তে সূর্য উদয় হলেন হঠাৎ দেখি কালো মেঘ সরে গিয়ে তিনি বেরোচ্ছেন হিরের দ্যুতি সঙ্গে নিয়ে! কী অপূর্ব দৃশ্য! জানলার কাচ ভেদ করে সূর্যালোক ভেতরে এসে ঢুকছিল, আমরা জানলার কাচ খুললাম গাড়ি থেকে দেখতে পাচ্ছি ভুটান পাহাড়ে মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে অনেক নিচে বয়ে চলেছে পাথুরে নদী নানান রঙের ফুলের প্রাচীর সর্বত্র অপূর্ব দৃশ্য! কিছুক্ষণ জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইলাম আমরা, প্রত্যেকেই চুপচাপ বসে রইলাম, গাড়ি থেকে নামতে হবে সে কথা ভুলে গেছি।



সামনে দেখা যাচ্ছে ভুটান পাহাড় পুরো এলাকাটাকে ঘিরে রেখেছে, মেঘগুলো আমাদের দিকে হাত বাড়াচ্ছে অপূর্ব!! স্বপ্নপুরী যেন! ফুলে ফুলে ছেয়ে রয়েছে দলগাঁও ভিউ পয়েন্ট রয়েছে ওয়াচ টাওয়ার, সেখানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকা যায় অপরূপ প্রকৃতির দিকে, চুপচাপ শান্ত নিঝুম রয়েছে কতগুলি কটেজ এখানে থাকা যায়শহরের ভিড়ভাট্টা পলিউশন থেকে দূরে রঙ্গো ফরেস্ট এলাকার এই দলগাঁও পয়েন্ট যেন এক রূপকথার রাজ্য, যেখানে থাকলে মন ও শরীর দুয়েরই আরাম হবে
সাধারণত জলপাইগুড়ি বা শিলিগুড়ি থেকে একদিন ডে আউটিংয়ের জন্য ঘুরে আসা যায় দলগাঁও ভিউ পয়েন্ট যারা থাকতে চাও তাদের জন্য রয়েছে কটেজ বা নানান ধরনের হোম স্টে করোনাকালে এখন রাত্রিবাস বন্ধ রয়েছে।



কীভাবে যাবে - শিলিগুড়ি বা জলপাইগুড়ি থেকে মোটামুটি এক দূরত্বযেতে দু-আড়াই ঘণ্টা মতো লাগে
কোথায় থাকবে - হোম স্টে, রিসর্ট সবই রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, সুবিধেমতো খুঁজে নিতে হবে


----------
ফোটো - লেখক

গল্পের ম্যাজিক:: আংটি রহস্য - হিমি মিত্র রায়


আংটি রহস্য
হিমি মিত্র রায়

পরিবারের সকলে মিলে হঠাৎ ছুটি পেয়ে পুরী যাওয়া ঠিক হল। প্রস্তাবটা রেখেছিল ছোটো কাকাই।
কী বলিস রেয়া এ্যান্ড টিম?
রেয়া এ্যান্ড টিম অর্থাৎ রেয়া নিজে, ওর ভালো নাম লহমা বসু, আর ওর দুই কাকাতো বোন চেরি, মিষ্টি আর সবচেয়ে ছোটো ভাই রিকি। ওটা একটা পুচকে যদিও, কিন্তু খুব পাকা। রেয়াদের শাসন করে এখনই। বয়সে ছোটো হলেও রেয়াও যথেষ্ট বুদ্ধিমতী এবং প্র্যাকটিক্যাল। ক্লাস এইটে পড়ে। কিন্তু ইতিমধ্যে গোপালপুরে গিয়ে একটা দারুণ রহস্যের সমাধান করেছে। ছোটো কাকাই ওই জন্য রেয়ার কাছে জানতে চাইল যে ও কী চায়।
ছোটো কাকাই, আমরা প্রত্যেকেই সমুদ্র দেখতে চাই কারণ আমরা পাহাড়ের কাছেই থাকি। চাইলেই পাহাড়ে চলে যেতে পারি। কিন্তু সমুদ্রে তো আর সব সময় যেতে পারি না। তাই না? তাই একবার যখন ভেবে ফেলেছি তখন যাই না সবাই মিলে, দারু সময়ও কাটাব!
মিষ্টিরাও হাত তুলল যে ওরাও পুরীতে যেতে চায়। ছোটো মা, মা বাপি প্রত্যেকে রাজি হল এই প্রস্তাবে। ঠাকুমাকেও রেয়ারা একটু আদর করে নিজেদের টিমে নিয়ে নিল, ব্যস!
হোটেলের ওয়েবসাইট থেকে সমস্ত বুকিং করে ফেলেছিল ছোটো কাকাই। তাই জন্য সবকিছু খুব তাড়াতাড়ি হয়ে গেল। খুব বেশি ঝামেলা পোহাতে হয়নি। আর পুরীতে পৌঁছে প্রথম যখন সমুদ্র দেখল ওরা, ড্রাইভার আঙ্কেল চমকে গিয়েছিল ওদের চিৎকারে, এমন লাফিয়ে উঠেছিল সবাই মিলে! ঢেউয়ের শব্দ কানে এসে লাগল। কী যে আনন্দ হল বলে বোঝান যাবে না। বেশি টুরিস্ট এখন হবে না তার কারণ অল্প অল্প গরম পড়েছে। ওরা ঠিক করে এসেছে যে অন্য কোথাও ঘুরতে যাবে না। শুধুমাত্র সমুদ্রেই স্নান করবে।
হোটেলে পৌঁছে ওরা ফ্রেশ হয়ে নিল প্রত্যেকে। কতক্ষণে সমুদ্রে যাবে এখন! রেয়ার মা'তো বকাঝকা শুরু করে দিল।
বেশি দূরে কোথাও যাবি না কিন্তু, সামনাসামনি থাকবি
কোন চিন্তা কোরো না মা, ছোটো কাকাই আমাদের সঙ্গে সঙ্গে আছে
যাও, কিন্তু কাকাই-এর সঙ্গে সঙ্গেই থাকবে। সমুদ্রের ভেতরে কিন্তু বেশি দূর যাবে না আমরা না যাওয়া পর্যন্ত
এই যে শুরু হয়ে গেল। তোমার মনে নেই মা, আমরা একা একা গোপালপুর এসেছিলাম তিন বন্ধু মিলে! আমরা কি খারাপ কিছু করেছি?
জানি রে, তবুও মা হয়েছি এটুকু তো বলবই। সাবধানে সব কিছু, বেশি সাহস দেখাতে যেও না যেন
 
ঘূর্ণিঝড় ফনির প্রভাব এখনও খুব ভালোভাবে রয়ে গেছে পুরীতে। ওদের হোটেলের আশেপাশে কাজু বাদামের গাছের জঙ্গল। একজন লোকাল লোকের সঙ্গে কথা বলছিল কাকাই। সে বলল কয়েক হাজার কুইন্টাল কাজু নষ্ট হয়ে গিয়েছে। নতুন করে হতে বহুদিন লাগবে।
রেয়ার মনটা খারাপ হয়ে গেল এইসব দেখে আর শুনে। কত গরিব মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা বলার নয়। মানুষ যদি প্রকৃতিকে ধ্বংস না করে একে ভালোবাসত তবে প্রকৃতিও মানুষে কম ক্ষতি করত। এসব ভাবতে ভাবতেই মিষ্টুদের চিৎকার শুনতে পায় ও।
কী রে দিদিভাই!! পাড়ে দাঁড়িয়েই থাকবি? ভয় পাচ্ছিস নাকি??
সবাই ওকে দেখে হাসছে আর স্নান করছে। রিকি বালির ক্যাসল বানাচ্ছে মন দিয়ে, আর ঢেউ এসে ভেঙে দিয়ে যাচ্ছে। আশেপাশে ওদেরই হোটেল বা অন্য হোটেলের অনেক মহিলা বাচ্চা পুরুষ মহা আনন্দে লাফালাফি ঝাপাঝাপি করছে। আর ছবিও উঠছে নানান রকম পোজে।
কী রে!! নামছিস না যে! আয় এদিকে!
ছোটকা, দিদিভাই ভেবেছে এখানে কোন রহস্য সমাধান করবে!
চেরি ঢেউয়ের ওপর একটা লাফ দিতে দিতে কথাগুলো বলে খুব আনন্দ পেল।
রেয়া অবশ্য স্নান করতেই এসেছে। কী জানি কেন হঠাৎ মনে হল একটু পাড়ে হাঁটাহাঁটি করতে ভালো লাগছে। আসলে পরিবেশটা অন্যরকম তো, ভিড়ভাট্টা নেই, অল্প লোক। কিছুটা হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছে রেয়া। ছোটো কাকাই দূর থেকে হাত নাড়িয়ে বলছে যে ওদিকে আর যেতে না, ওখানে থেকে ফিরে আসতে।
ঢেউয়ের চলে আসা ফিরে যাওয়া দেখতে দেখতে পা ভিজে যাচ্ছিল। কিন্তু ওটা কী!! ছোট্ট একটা জিনিস চকচক করছে আবার জলে ঢুকে যাচ্ছে! যতবার দেখতে যায় ততবার ওটা ডুবে যাচ্ছে। হাতে নিয়ে দেখতে গিয়ে আবার ঢেউ টেনে নিয়ে চলে গেল জলে। কিন্তু সমুদ্র তো, একবার যা নেয় সেটা অবশ্যই ফিরিয়ে দেয়। ও দাঁড়িয়ে থাকল ওটা কী দেখার জন্য।
একটু নিচু হতেই আবার ঢেউ এসে ওর হাতের কাছে এনে দিল ওটা। হাতে তুলে নিয়ে সামনে থেকে দেখে একটা আংটি, তার মধ্যে এস. কে মিনে করা। বিয়ের আংটি যেমন হয় বরের, তেমনি সোনার আংটি। ইমিটেশনের হতে পারত, কিন্তু ইমিটেশনের আংটিতে এরকম মিনে করা নামের অক্ষর খোদাই করা কী থাকবে? ইমিটেশন হলে তো জলে থাকতে থাকতে রং পালটে যেত। এটা তো তা হয়নি, চকচক করছে এখন
আংটিটা ওর প্যান্টের পকেটে যত্ন করে রেখে দিল রেয়া।
 
হোটেলে ফিরে এসে চান করার সময় পকেটে হাত দিয়ে দেখল, হ্যাঁ আংটিটা আছে। এবার এর ব্যবস্থা করতে হবে। থানায় গিয়ে জমা দিয়ে আসতে হবে এই মূল্যবান আংটি। দুপুরবেলায় ডাইনিং রুমে খেতে এল ওরা সবাই। পেটপুরে খেল ওরা। রান্নাগুলো অপূর্ব হয়েছিল। খাবার পর প্রত্যেকে একটা করে আইসক্রিম নিল।
অন্যান্য যারা আছেন তারা এসময় খেতে এসেছেন। বেশ ভালোই ভিড়। এদেরই অনেক জনকে আজকে সমুদ্রের ধারে দেখেছে ও। ওই  মেরুন রঙের হাফপ্যান্ট পরা লোকটা, সঙ্গে স্কার্ট আর পিঙ্ক হ্যাট পড়া ভদ্রমহিলা আর তাদের একটা ছোট্ট বাচ্চা। আর একটা বড়ো ফ্যামিলি যাতে একটাও বাচ্চা নেই।
হঠাৎ কিছু একটা দেখে আইসক্রিম খাওয়া ফেলে চেয়ার থেকে উঠে অন্যদিকে এগিয়ে গেল রেয়া। সবাই তো চেঁচিয়ে উঠল!
দাঁড়াও আসছি,” বলে এগিয়ে গেল ও। গিয়ে দাঁড়াল ওদের টেবিলের পাশের টেবিলেই বসা একটা ফ্যামিলির সামনে। একজন পুরুষ একজন মহিলা বসে রয়েছেন। অল্প বয়সি, নতুন বিয়ে হয়েছে বোঝা যাচ্ছে।
ছোটো কাকাই রেয়ার পেছনে দাঁড়িয়ে রইল। ওদের কথোপকথন শুনতে পাচ্ছেন তিনি।
রেয়া বলছে, আপনি কি আজ দুপুরে সমুদ্রে গিয়েছিলেন?
লোকটি বলল,হ্যাঁ, আমি তো এখানে তিন দিন ধরে রয়েছি। আজও গিয়েছি। কেন?
আপনার নামটা কি জানতে পারি?
নাম? কারণটা কী বলবে? তুমি অনেক ছোটো, তাই তোমাকে তুমি বললাম
আপনার নাম জানাটা ভীষণ দরকার। আচ্ছা আপনার কি কোন জিনিস হারিয়েছে?
ভদ্রলোকের চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। উঠে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত হয়ে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, আমার তো একটা আংটি হারিয়েছে! বিয়ের আংটি! তুমি কী করে জানলে?
ছোটো কাকাই কিছুই বুঝতে পারছে না।
আপনার নামটা একবার শুনলে আংটিটা আপনাকে দিয়ে দেব
সুমন কল্যাণ রায়। আমার আংটির উপরে এস. কে লেখা রয়েছে
পকেট থেকে আংটিটা বার করে ভদ্রলোকের হাতে তুলে দিয়ে একগাল হাসল রেয়া ভদ্রলোকের স্ত্রীর মুখেও আনন্দ। বলেই ফেললেন, এতটুকু মেয়ে তুমি, কী করে বুঝলে যে ওই আংটি হারিয়েছে?
রেয়া একটু হেসে বলল, আমাদের হোটেলের যারা আছেন তারাই ওই সমুদ্রে স্নান করতে গিয়েছিলেন। কারণ এটা হোটেলের নিজস্ব বিচ। ফলে এখানকারই কার আংটি হারিয়েছে সেটা হওয়ার চান্স ছিল। আরও বুঝলাম, কারণ লক্ষ করলাম সুমনবাবুর হাতের আঙ্গুলের একটা জায়গায় সাদা হয়ে দাগ হয়ে রয়েছে। সমুদ্রে দু-একদিন চান করলে আমাদের স্কিন-টোন পুড়ে যায়। শুধু আংটির জায়গাটুকু দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে ওখানে আংটি পরেছিলেন। আর নামের আদ্যক্ষর জেনে জিজ্ঞেস করে নিলাম কী নাম! ব্যস! হয়ে গেল, প্রমাণ পেয়ে গেলাম
সবাই প্রচন্ড অবাক। সুমনবাবু বললেন, অসংখ্য ধন্যবাদ তোমাকে। তোমার বুদ্ধির তারিফ না করে পারছি না। এইটুকু মেয়ে হয়ে কীভাবে বুঝে গেলে এত কিছু? কী নাম তোমার?
লহমা বসু
পেছন থেকে ছোটো কাকাই এসে রেয়াকে জড়িয়ে ধরল।
একবারও বললি না আংটি পেয়েছিস! চুপ করে পকেটে ঢুকিয়ে রেখে দিয়েছিস!
তোমাদের বলতাম, তার আগেই এই ঘটনা ঘটে গেল। উনিও আংটি পেয়ে গেলেন!
টেবিলে এসে দেখে রেয়ার আইসক্রিম গলে ঝোল হয়ে গেছে। ছোটো কাকাই বড়ো মুখ করে বলল, রেয়া এখন আর একটা আইসক্রিম খাবে। ওর যেটা ইচ্ছে সেটা! প্রাউড অফ ইউ! তুই এভাবেই এগিয়ে চল, একদিন তুই অনেক বড়ো জায়গায় যাবি
দাঁত টিপে একটু হাসল রেয়া। আর বাকিরা দর্শক হয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল ওদের দিকে।
_____
ছবিঃ রাজা আক্তার

গল্পের ম্যাজিক:: রক্ত-রহস্য - হিমি মিত্র রায়


রক্ত-রহস্য
হিমি মিত্র রায়

বহুদিন হয়ে গেল কোথাও বের হওয়াই হয়নি কাজের চাপে এবার পুরো দশদিনের আগে স্কুল জয়েন করছি না, দেখে নিস ঋতমের অকপট স্বীকারোক্তি
“একদম ঠিক ডিসিশন সান্তালিখোলা থেকে ফিরে এসেও চুপচাপ ঘরে শুয়ে থাকব। দেদার সে কমিকস, অর্জুন আর কফি ওফ্‌, ভাবলেই আরামে চোখ বন্ধ হয়ে আসে! সুতীর্থ দুটো হাত মাথার পেছনে দিয়ে একটা আরামসূচক আওয়াজ বের করল মুখ দিয়ে।
“ওদিকে এনজেপি থেকে বাইক ভাড়া নিয়ে যাচ্ছি বলে মা রাগ করে বসে রয়েছেকিছুতেই বোঝানো যাচ্ছে না যে শিলিগুড়ি থেকে বেশি দূর নয় সান্তালিখোলা! লাটাগুড়ির রাস্তাটাতে বাইক চালানোর জন্য কবে থেকে ওয়েট করছি! বের হওয়ার সময় প্লিজ একটু ম্যানেজ করিস মা কে
“চিন্তা করিস না, আমি কাকিমাকে বুঝিয়ে দেব।”

ঋতম আর সুতীর্থর আগের দুটো ঘুরতে যাওয়া আর সঙ্গে রহস্য উদঘাটনের ঘটনা ‘চিলাপাতার জঙ্গলে’ এবং ‘তাজপুরের তাজ’-এর গল্প অ্যাদ্দিনে অনেকেরই জানা। লোকমুখে তাদের সাহসিকতার কথা রটে গেছে চারদিকে। এবার উত্তরবঙ্গেরই পাথুরে নদী-জঙ্গলে পরিবেষ্টিত মনোরম সান্তালিখোলাতে তিনদিন আরামে কাটাতে পরদিন সক্কাল সক্কাল এনজেপি পৌঁছে বাইক ভাড়া করে বেরিয়ে পড়ল দু’জন। সান্তালিখোলা শব্দটি এসেছে ‘সান্তরা’ অর্থাৎ কমলালেবু থেকে। ওখানে ছোটো ছোটো কটেজে তিনরাত্তি থাকবে সেই সঙ্গে আশেপাশের রকি আইল্যান্ড, সামসিং চা বাগান এসব ঘুরে নেবে এই ক’দিনে এমনটাই প্ল্যান ওদের।
আকাশ মোটামুটি পরিষ্কারই আছেযদিও এখন ঝড়বৃষ্টির খুব একটা সম্ভাবনা নেই, তবুও আজকাল আবহাওয়ার ক্রমাগত পরিবর্তনের জন্য কখন কী হয় বোঝা মুশকিলফেব্রুয়ারি মাস, না ঠান্ডা না গরম, বেশ ভালো সময়। তবুও পাহাড়ঘেরা অঞ্চল বলে একটা করে চাদর আর জ্যাকেট নিয়েছে দু’জনেই। গুগল ম্যাপ দেখে দেখে রাস্তা চিনতে কোনও অসুবিধেই হচ্ছে না ওদের। মাঝে দু’বার চা খাওয়ার জন্য দাঁড়াল ওরাব্রেকফাস্টও সেরে নিল লাটাগুড়ির বিখ্যাত বৌদির দোকানে। গরম গরম পুরি-তরকারি আর মাটির ভাঁড়ে রাবড়ি উফ্‌, অমৃত!
পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় সাড়ে এগারোটা বেজে গেলবেশ চড়াই-উতরাই আছে, সন্তর্পণে চলাফেরা করতে হয়পাহাড়ি রাস্তা, নদী সব মিলিয়ে অপরূপ প্রাকৃতিক নিসর্গ দেখে মন ভালো হয়ে গেল ওদের। এতটা রাস্তা বাইক নিয়ে আসার পরিশ্রম মনে হল না কোনও ব্রিজে দাঁড়িয়ে নিচের পাথুরে নদীর বয়ে চলা দেখছিল কিছুক্ষণ মোবাইলে রিং হতেই ঘোর কাটল, সোনাম ভুটিয়া কলিং!
“হ্যালো, সোনাম ভুটিয়া বোল রহা হ্যায় সান্তালিখোলা সেআপ লোগ কব রহে হো, সার? বারাহ্‌ বজে কে বাদ লাঞ্চ কা অর্ডার বন্ধ হো যায়ে গা!
“হা হা, হম পহচ হি গয়ে, উইদিন টেন মিনিটস ঢুকে যাচ্ছি।”
“আচ্ছা ঠিক হ্যায়, আইয়ে।”
একটা উপত্যকামতো, ওই নদীটিকে ঘিরেই ছোটো ছোটো কতগুলো রঙিন ঘর বানানো হয়েছে, ফুলের গাছে ঘেরা। সবুজে মোড়া চতুর্দিক পাশেই লাগোয়া ঝুলন্ত ব্রিজ এপার ওপার করবার জন্য। খরস্রোতা নদী এখানে একটু শান্ত, কিন্তু বড়ো সুন্দর কুলু কুলু করে বয়ে চলেছে। ট্যুরিস্টদের ফটো তোলার ধুম দেখা গেল বেশ কিছু। বাইকের আওয়াজ শুনেই মোটা মতন একজন লোক এগিয়ে এসে হেসে হাত বাড়িয়ে দিল।
“মাইসেলফ সোনাম ভুটিয়া। আপ লোগো সে অভি বাত হুই মেরা বাইক লেকে জ্যায়দা লোগ নহি আতে ইয়াহা, ইস লিয়ে পহচান লিয়া
হাত বাড়িয়ে দিল ওরাও।
“এ রাজু, সাব লোগকো রুম মে লে যাও, লাগেজ নিকালো কাকে একটা হাঁক দিয়ে ডাকল সে।
“চলিয়ে সাব, বাইক ইয়াহা রখ দিজিয়ে, অউর চাবি ছোড় দিজিয়ে রাজু বাইক কো উধর শেড মে রখ দেগা
সোনামজী বাইরেই লনের মধ্যে টেবিল পেতে লাঞ্চের ব্যবস্থা করে দিলেন ওদের কথামতো ভাত, ডাল, পাঁপরভাজা, একটা পাঁচমেশালি সবজি আর চিকেন। সঙ্গে ঝাল আচারনেপালিদের খুব পছন্দের জিনিস ওটা। একটু মুখে দিতেই গলা জ্বলে গেল। জল খেয়ে রক্ষে।
দুপুরবেলা একটু জিরিয়ে নিল ওরাএতটা বাইকের ধকল রয়েছে, তবে ঘুমোল না। একটু পরই চারপাশটা ঘুরে দেখতে যাবেসন্ধে হয়ে যায় এসব জায়গায় খুব তাড়াতাড়ি, তাই অন্ধকার হওয়ার আগেই যেতে হবে।
“জ্যায়দা দূর পয়দল চলকে মত যানা, লওট আনা জলদি
“কেন? কী হবে?
“অ্যায়সা কুছ নহি, পর..
“পর ক্যায়া?
“উওহ্‌ হাথি-ওয়াথি নিকল সকতা হ্যায়, ইস লিয়ে।”
“হাতি? এখানে? কী বলে রে? কোনওদিন তো শুনিনি! সুতীর্থ বলল
“আচ্ছা ঠিক আছে, আমরা তাড়াতাড়ি চলে আসব, চল।” বলে ঋতম ইশারা করে সুতীর্থকে আসতে বললআর কথা বাড়াল না।
দোলনা ব্রিজ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলছে ওরা দু’জনকী সুন্দর প্রকৃতি তার ডালি সাজিয়েছে এখানে! সবুজের ছড়াছড়ি। পাশে গা বেয়ে রাস্তা উঠে গেছে ওপরে। সামান্য পাকদন্ডি রয়েছে, কিন্তু খুব বেশি নয়। বসার বেঞ্চ আছে, কিন্তু সবগুলোই শ্যাওলা ধরা। এখানে বেশিরভাগ সময়ই বৃষ্টি হয়, আর জোঁকের অত্যাচার মারাত্মক বেড়ে যায়। জংলি ফুল আর নানানরকম অর্কিড হয়ে আছে, কী সুন্দর তাদের রঙ!
ওপরে ওঠার রাস্তা দিয়ে উঠতে থাকে ওরাশান্ত পরিবেশটা বড্ড ভালো লেগে যায় পাখিগুলোও যেন বড়ো শান্ত এখানেচুপ করে আছে, আওয়াজ করে না। একটু দূরে একটা ছোটো ঝুপড়িমতো দেখা যাচ্ছে এগিয়ে যায় ওরা।
মোমোর দোকান। বয়স্ক স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই বসে আছে একটা ছোটো চায়ের কেটলি আর মোমো করার বাসন নিয়ে। ওদের দেখে মহিলাটি মোমোর বাসন দেখিয়ে বলল, “মোমো?
সুতীর্থ হাতের ইশারা এবং মুখে বলল, “দো প্লেট মগর ওয়হ্‌ তিখা চাটনি মত দেনা!
হেসে সম্মতি জানাল নেপালি মহিলা। ইশারায় বসতে বলে মোমো রেডি করতে লাগল। দোকানটার একপাশে কাঠের একটা বেঞ্চমতো রাখাবয়স্ক লোকটি এতক্ষণ ওখানেই বসে ছিলএখন উঠে গিয়ে ওদের জায়গা করে দিল আর স্ত্রীকে সাহায্য করতে শুরু করল। ঋতমরা বসে বসে ওদেরকে দেখছে। পরিবেশটা ভারি সুন্দর। সামনেই কতগুলো পাহাড়ি কুকুরের বাচ্চা খুনসুটি করে চলছেরাস্তার দু’ধারে অজস্র পাহাড়ি ফুলে ঠাসা, কী রঙ নেই বলা যাবে না। একটা হালকা ঠান্ডা হাওয়া বইছে। এসবের জন্যেই তো ছুটে ছুটে আসা এদিকেশহরে শুধু কংক্রিটের ঠোকাঠুকি, আর কিছুই নেই।
মোমোর স্বাদ অতুলনীয় ভেজ মোমো, কিন্তু অনবদ্য। খেতে খেতে সুতীর্থ বলল, “ফিরে যাবি, না আর একটু উঠবি?
“ধুর, এত তাড়াতাড়ি ফিরব কেন, আর একটু ঘুরে আসি ওপরে তারপর ফিরবতুই কি ভয় পেয়ে গেলি নাকি সোনামের কথায়?
“ভয়? পাগল হলি নাকি? আমারও তাইই ইচ্ছে, চল উঠি।”
“ওই ওপরে ওটা কী দেখা যাচ্ছে না একটা, ভাঙাবাড়িমতো? দেখতেই কী মায়াবী লাগছে, দেখ! কুয়াশাঘেরা, যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে! ওই অবধি গিয়ে নেমে আসব সন্ধের আগে হাত দিয়ে দেখাল ঋতম।
দেখানোমাত্র ওই বয়স্ক দোকানদার ক্রমাগত হাত আর মাথা নাড়াতে শুরু করলভাঙা ভাঙা হিন্দি থেকে বাংলা করলে দাঁড়ায়, ওখানে কেউ যায় নাকিছু মাস আগে তিনজন খুন হয়েছিল
এরই মধ্যে আর একজন লোক এসে হাজির হলচেনাশোনা কেউ হবে, এদেরই কেউ। সেও কথাগুলো শুনে ফেলে বলল, “না না, যানা নহি, যানা নহি সাব! লাস মিলতা হ্যায় উস ঘর সে, খুন পিয়া হুয়া লাস!
বলল, চারদিকে নাকি আতঙ্ক ছড়িয়ে রয়েছেওদের ফিরে যেতে বলল সে।
“হোয়াট?
ঋতম প্রায় ধমকের সুরে বলল, “ইতনা পিসফুল জগাহ্‌ পর অ্যায়সা গন্দি বাত মত ফ্যায়লাও, ট্যুরিস্ট লোগ আনা বন্দ কর দেঙ্গে নহি তো!
ঋতম, সুতীর্থ দু’জনেই বেশ রেগে গেল। সত্যি কথা বলতে কোনও পাপ নেইওর কী লাভ মিথ্যে বলে? পরে আসা লোকটা কাঁচুমাচু মুখ করে বলল। কী বলবে ভেবে পায় না ওরাএত জোর দিয়ে কথাগুলো বলছে এরা তার মানে সত্যিই কি কিছু ব্যাপার আছে! সেদিনের মতো ঘরে ফিরে এল ওরা, আর কথা বাড়াল না। তবে মনের মধ্যে খচ খচ করতে থাকল। রাতে ডাইনিং টেবিলে বসে রুটি-মাংস আর স্যালাড খেয়ে নিয়ে পাশে রাখা কাঠের সোফায় বসল ওরাকিছুই না, সোনাম ভুটিয়ার কাছ থেকে যদি কিছু শোনা যায় এত সাংঘাতিক একটা ব্যাপার যদি সত্যি হয়ে থাকে তবে তো সত্যি ভয়ের ব্যাপার!
“স্যার, রুম মে নহি যানা? ঠন্ড জ্যায়দা হ্যায় আজ, ঘর পে যাকে সো যাইয়ে” সোনাম ভুটিয়া খাতায় হিসেব লিখতে লিখতে বলল।
“এক বাত বতাইয়ে, সোনামজী...”
মুখ তুলে তাকাল সে।
“ওই পাহাড়ের ওপরে জঙ্গলে ঘেরা বাড়িটায় কি কিছু হয়েছে? সত্যি করে বলুন তো
হঠাৎ এমন একটা প্রশ্ন আশা করেনি সেহিসেব ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পেনটা রেখে বলল, এই জন্যেই নাকি সে ওদের কোথাও যেতে বারণ করছিল।
“কিন্তু আপনি তো বলছিলেন হাতির কথা!
ঋতমের এই প্রশ্নে থতোমতো খেয়ে কথা ঘোরানোর চেষ্টা করল সোনাম ভুটিয়া। “ছোড়িয়ে ওয়হ্‌ সব, কল ব্রেকফাস্ট পে ক্যায়া লেঙ্গে, ব্রেড-ওমলেট ইয়া পুরি-ভাজি?
“লাশ কা ক্যায়া মামলা হ্যায় ইয়ে বাতাইয়ে আপ, ব্রেকফাস্ট পে ব্রেড-ওমলেট হি দেনা।”
যা বলল তা হল দু-তিনবছর আগে ওখানে এক বিদেশি এসে থাকতে শুরু করে, একাই। হঠাৎ একদিন ওর দেহ মেলেশরীরে এক ফোঁটাও রক্ত ছিল না। তারপর আবার তিন-চারজন মারা যায় একইভাবেমনে হয় কেউ যেন নিপুণভাবে শরীরের সব রক্ত বের করে নিয়েছে।
“আচ্ছা! এত্ত বড়ো খবর কেউ জানি না কেন বল তো? সত্যি যদি হয়ে থাকে তবে তো মারাত্মক ব্যাপার! ভয়ানক কান্ড! এর কোনও ইনভেস্টিগেশন হয়নি?
ইনভেস্টিগেশন চলছে এখন একটু ঢিলে পড়েছে নাকি, সে বলল।
“প্লিজ, ইয়ে বাত কিসিকো মত বতাইয়ে, নহি তো ইয়হা পর ট্যুরিস্ট আনা বন্ধ হো যায়েগা, হমারা রোটি-রোজি সাব!
“আরে আরে, ঠিক আছে, কেউ জানবে না
“প্লিজ অউর কুছ মত পুছিয়ে, মুঝে কুছ মালুম নহি

সারারাত দু’জনের মধ্যে আলোচনা হল এই নিয়েএভাবে একটা রহস্য রহস্যই থেকে যাবে এটা কেমন কথা! যেখানে ক’জন লোক মারা গেছে! পুলিশই বা হাত-পা গুটিয়ে কেন বসে রয়েছে কে জানে অবশ্য হয়তো এমনও হতে পারে ইনভেস্টিগেশন চলছে, সবাই জানে না তা। তবে রহস্যের এত কাছে এসে একবার স্পটে না গেলে কেমন একটা লাগছে ওদেরএকটু দেখতে তো যাওয়া যেতেই পারে। একমত দু’জনেই। ঠিক হল, কাল ভোরের আলো ফুটতে ফুটতেই ওরা দেখতে যাবে জায়গাটানা গেলে শান্তি পাবে না।
ভাগ্যিস একটা জ্যাকেট আর চাদর নিয়ে এসেছিল দু’জনেইকারণ, সকালটা বেশ ঠান্ডা, রীতিমতো শিরশির করছে। ভালো করে চাদরমুড়ি দিয়ে পা টিপে টিপে বের হল ওরা কটেজ থেকে। দোলনা ব্রিজ পেরিয়ে আর একটু এগিয়ে সরু রাস্তাটা দিয়ে ওপরে উঠে গেল মোমোর দোকান পেরিয়ে চলল আরও ওপরেদূর থেকে আজ আর বাড়িটাকে ভালো করে দেখা যাচ্ছে না, কুয়াশার চাদরে ঢেকে রয়েছে। আরও দুটো বাঁক ওঠার পর দেখা গেল। বড্ড গা ছমছমে পরিবেশ, দেখেই মনে হচ্ছে কত রহস্যে ঘেরা যেন।
ধীরে ধীরে বাড়িটির প্রায় কাছে চলে এল ওরা। সাদা রঙের কাঠের একতলা বাড়ি, বাগানবাড়ি বলা চলে। রঙচটা দেওয়াল, জানালার পাল্লা নেই হয়তো চুরি হয়ে গেছে। পুরো জায়গাটা পাইনগাছের জঙ্গলে অন্ধকার হয়ে আছে। কালো অন্ধকার কেটে মেঘের খেলা দেখা যাচ্ছে ভোর হতে বেশি দেরি নেই। দেখে বোঝা যাচ্ছে এখানে মানুষের আনাগোনা নেই প্রায়, বিচ্ছিন্ন একটা জায়গা।
“ভেতরে যাবি তো? ঋতমের দিকে তাকাল সুতীর্থ।
“আলবাত যাব চল, যা হবে দেখা যাবে এত কাছে এসে ফিরে যাব না। চল, ঢুকি।”
দরজা পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ওরাছিটকিনি লাগানো, তাতে মস্ত তালা ঝুলছে।
“এ বাবা! এ তো দেখছি তালা! তীরে এসে তরী ডুবল নাকি রে?
“দাঁড়া
দৌঁড়ে ওদিকে গিয়ে একটা বড়ো সাইজের ইট নিয়ে এল সুতীর্থ। এক মারে ধাম করে আলগা হয়ে গেল তালা। ক’টা পাখি ডেকে উঠল এদিকে ভোরও হয়ে গেছে। দরজাটা একটু ঠেলতেই খুলে গেল। ভেতর থেকে একটা বড়ো সাইজের পাখি খুব দ্রুত উড়ে বেরিয়ে গেল। মুখ সরিয়ে নিল ওরা তাড়াতাড়ি। তারপর ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।
খুব একটা বাজে অবস্থায় নেই ঘরটাশুধু এদিক ওদিক একটু মাকড়সার জাল রয়েছে। জানালার কাচ দিয়ে আলো আসছে, ফলে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে ভেতরে। মাঝখানে একটা সিঁড়ি গোল করে ওপরে উঠেছেঠিক দোতলা নয়, ওপরে দেখা যাচ্ছে পুরোটাই। নিচে একটাই টেবিলতার মধ্যে কাচ পাতা, আর কাচের নিচে কিছু হলুদ হয়ে যাওয়া খবরের কাগজ। কাচটায় ধুলো পড়ে বিশেষ বোঝাও যাচ্ছে না। ওপাশে অসংখ্য ভাঙা কাচের টুকরো ছাড়া আর বিশেষ কিছু নেই। আর একটা বোঁটকা গন্ধগন্ধটাতে গা গুলোয়।
“চল, ওপরে উঠে দেখি
গোল হয়ে ওঠা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দেখল, এখানেও একটা ছোটো টেবিল। আর দেওয়াল আলমারিতে কিছু ভাঙা কাচের টুকরো পড়ে রয়েছে।
“বিশেষ কিছু অবশিষ্ট নেই দেখার মতো। চ’, বেরোই
যেতে গিয়ে কী মনে করে নিচের টেবিলটার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ল ঋতম
“কী রে, কী হল?
কিছু না বলে ধুলো পড়া টেবিলের ওপরের কাচটা ঠেলে তুলল , আর ভেতরে ছড়িয়ে থাকা খবরের কাগজগুলো নিয়ে নিল।
“চল, আর থেকে লাভ নেই। ফিরে গিয়ে ভাবব’খন।”
“ওটা কী?
ফায়ার প্লেসের দিকে এগিয়ে গেল সুতীর্থ। পোড়া, আধপোড়া কাঠ সরিয়ে টেনে বের করল একটা শ্যাওলা রঙের ডায়েরি।
দরজাতে আর তালা লাগানো গেল নাওভাবেই রেখে ওখান থেকে ফিরে এল ওরা। ফেরার সময় দেখল, সবে বৃদ্ধা মহিলা দোকানের ঝাঁপ খুলছেওদের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল শুধুচোখের মধ্যে অনেক জিজ্ঞাসা মনে হল।
ঘরে ফিরে তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে বসল বিছানায়। সঙ্গে খবরের কাগজের টুকরোগুলো। শক্ত এবং হলদে হয়ে যাওয়া হলেও লেখাগুলো পড়াই যাচ্ছে। সঙ্গে ডায়েরিটা। প্রতিটি কাগজই বিদেশিসেরকম কিছু নেই পড়ার মতো বা হয়তো ওরা বুঝতে পারছে না।
ডায়েরি খুলে আশ্চর্য হয়ে গেল ওরাদু’জন মুখ চাওয়াচাওয়ি করল প্রথম পাতায় একটি লেখা দেখে। সেখানে লাল কালিতে লেখা, ‘ব্যাটস্ আর দা ওনলি ম্যামালস্ দ্যাট ক্যান ফ্লাই, বাট ভ্যাম্পায়ার ব্যাটস্ হ্যাভ এন ইভেন মোর ইন্টেরেস্টিং ডিস্টিংশন, দে আর দা ওনলি ম্যামালস্ দ্যাট ফিড এন্টায়ারলি অন ব্লাড!
হাঁ হয়ে গেল দু’জনেই মাথায় আসতে থাকল অনেক কিছু। আবার পরের পাতাগুলোয় বলা আছে যে ভ্যাম্পায়ার ব্যাটরা নাকি শুধুমাত্র রক্ত খেয়েই পেট ভরায়
“দাঁড়া, এক সেকেন্ড চটপট নেট সার্চ করতে গেল ঋতমকিন্তু এই পাহাড়ি এলাকায় কিছুতেই খুলল না নেটহঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল আটটা কুড়ি। ফোন লাগাল বাবাকে।
প্রান্ত থেকে ভারিক্কী আওয়াজে ‘হ্যালো’ ভেসে এল। “হুম বল, সব ঠিকঠাক আছে তো?
“হ্যাঁ বাবা, ঠিকই আছেকিছু জিনিস জানার ছিলখুব দরকারি।”
ঋতমের বাবা জুওলজির মেধাবী ছাত্র ছিলেনবহু তথ্য ওঁর ঝুলিতে। হেডমাস্টার ছিলেন স্কুলের। রিটায়ার করেছেন। তবে এখনও বইয়ে ডুবে থাকেন। কোনও জিনিস জানার হলে বাবার ওপরে কাউকেই ভাবতে পারে না ঋতম। ও সমস্ত ঘটনা বাবাকে না বলে শুধু জিজ্ঞেস করল, ভ্যাম্পায়ার ব্যাটসরা ঠিক কী
উত্তরে উনি যা বললেন তা হল এই যে কুখ্যাত বাদুড়কুল বিভিন্ন অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গায় দিনের বেলা ঘুমোয় বিশেষ করে গুহার ছাদে ঝুলে থেকে। রাতের বেলা এরা শিকার করতে বের হয়মূলত হাজার বা তার বেশি দলে থেকে। একশোজনের একটা দল পঁচিশটি গরুর সম্পূর্ণ রক্ত খেয়ে ফেলার ক্ষমতা রাখে
স্পিকারে মোবাইল বিছানার মাঝে রেখে দু’জন মন দিয়ে শুনছে। বাবা আরও বললেন, “রাতের গভীর অন্ধকারে এই রক্তখেকো বাদুড়েরা ঘুমন্ত প্রাণীদের টার্গেট করে যেমন, গরু-মোষ অথবা ঘোড়াদের। কিন্তু বিপজ্জনক এমন বাদুড়ও রয়েছে যারা মানুষকেও ছাড়ে নাতিরিশ মিনিট ধরে রক্ত খেতে থাকে ভিকটিমের, কিন্তু ভিকটিম টের পায় না বা অবশ হয়ে যায়।”
এবার মনে পড়ল ওদের দু’জনেরই, ডিসকভারি আর অ্যানিম্যাল প্ল্যানেটে ওরা দেখেছে সেটা।
বাবা আরও বললেন, “এই বাদুড়দের অল্প ক’টা দাঁত থাকে কারণ, ওরা লিকুইড খাদ্য খায়আসলে রক্তখেকো যে! তবে তা প্রচণ্ডই তীক্ষ্ণ, রেজরের মতো এই দাঁত। প্রতিটি বাদুড়ের নাকে এমন একেকটা করে স্ট্রং সেন্সর থাকে যাতে মানুষের শরীরের মধ্যে বয়ে চলা উষ্ণ সুস্বাদু রক্তের গন্ধ সহজেই বুঝতে পেরে আক্রমণ করে সুযোগ বুঝে। এদের দেখা মেলে মূলত মেক্সিকো, সেন্ট্রাল আমেরিকা আর দক্ষিণ আমেরিকায়।”
“বাবা, কোনওভাবে এরা কি আমাদের দেশে আসতে পারে?
“এমনি আসার চান্স কম, তবে কেউ যদি কোনও এক্সপেরিমেন্ট করার জন্য নিয়ে আসে তখন হতে পারেতবে সেক্ষেত্রে আয়ু বেশিদিন নয়এখানকার জলবায়ু তাদের বংশবৃদ্ধির পক্ষে সহায়ক নয়।”
“ডেঞ্জারাস ব্যাটস! সুতীর্থ তাকাল ঋতমের দিকে।
“ঠিক আছে বাবা, তোমায় পরে ফোন করছি।”
“চল থানায় যাই, সব জলের মতো সহজ হয়ে যাচ্ছে।”
“তাই তো দেখছিদেখ, সব জায়গার নামগুলো মেক্সিকান, আমেরিকান এর বাইরে একটাও নেই।”
ডায়েরির মাঝে পেজ মার্ক খুলে অবাক হয়ে গেল ওরাপ্রাণীবিজ্ঞানী রিচার্ড ক্রুকের ছবি দেওয়া পেপার কাটিং, যিনি এই ভ্যাম্পায়ার ব্যাটদের নিয়ে রিসার্চ করতে করতে খারাপ নেশায় পড়েছেন গরু-মোষের রক্ত খাওয়া দু-তিনটে বাদুড়কে শুধুমাত্র মানুষের রক্ত খাওয়ার মতো তৈরি করছেন। তিনি প্রকৃতি-বিরুদ্ধ কাজের দায়ে অভিযুক্ত আমেরিকান গভর্নমেন্ট তার ওপর প্রাইজ ডিক্লেয়ার করেছে
“তবে কি সেই বিদেশি ব্যক্তি যে এই বাড়িতে থাকত, আর ক’দিন পর একইভাবে মারা যায় সে তো সেম লোক রে! বোঝাই যাচ্ছে ব্যাটা এখানে ওই রক্তখেকো বাদুড়দের নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে নিজেই তাদের শিকার হয়েছে। বেশ হয়েছে, প্রকৃতি প্রতিশোধ নিয়েছে। তবে এত বড়ো ঘটনা পুলিশের চোখে পড়ল না?
“অন্যায়ভাবে এই জঘন্য কাজ করেছে ক্রুক বাদুড়গুলোকে এমনভাবে তৈরি করেছিল যাতে চারজনের একটা দল একজন মানুষকে অ্যাটাক করে মেরে ফেলতে পারেছিঃ! ঘৃণারও অযোগ্য সে। উচিত শাস্তিও পেয়েছেনিজের পোষ মানা ভ্যাম্পায়ার ব্যাটরাই শুষে খেয়েছে ব্যাটম্যানকে

ফুলে ঘেরা ছোট্ট থানা। ইনস্পেক্টর বাঙালি অল্পবয়সী একজন। নাম বললেন বিবেক মজুমদার, সবে সবে এসেছেন। সব ঘটনা বুঝিয়ে বলার পর চোখ কপালে উঠে গেল প্রায়। দাঁড়িয়ে পড়ল চেয়ার ছেড়ে। ডায়েরিতে চোখ বুলিয়ে বলল, “আপনারা তো ডিটেকটিভ মশাই! দারুণ কাজ করেছেন! হ্যাটস অফ টু ইউ, গাইজ! আপনারা নিজেও জানেন না কী করে ফেলেছেন। এখন তো খবরে খবরে শোরগোল পড়ে যাবে! কী নাম বলুন তো, ভাই
নাম শোনার পর কী যেন ভাবল সে। “শোনা শোনা লাগছে কেন বলুন তো! কোথায় যেন শুনেছি মনে হয়
ঋতমরা বলার পর খাতির যেন আরও বেড়ে গেল। অফিসিয়াল সইসাবুদ করে বের হওয়ার সময় একটা জিনিস খটকা লাগল সুতীর্থর দাঁড়িয়ে পড়ল মাঝরাস্তায়। “তোর মনে আছে ঋতম, আমরা ওই বাড়ির তালা ভাঙার পর দরজা খুলতেই একটা পাখি উড়ে বেরিয়ে গেল?”
“হুম, মনে আছে তো
এক ঝটকায় ঘুরে তাকাল দু’জনেই চুপ, শুধু চোখ চাওয়াচাওয়ি
অন্ধকার হতে বেশিক্ষণ নেই আরদূরে পাহাড়ের পাইনগাছগুলো বোধহয় কিছু বলতে চায় ওদের। নিস্তব্ধতা ভেঙে পাহাড়ি কুকুর ডেকে ওঠে অন্য সুরে
_____
অলঙ্করণঃ দীপিকা মজুমদার