Showing posts with label নন্দন ঘর. Show all posts
Showing posts with label নন্দন ঘর. Show all posts

গল্পের ম্যাজিক:: অপেক্ষা - প্রতিম দাস


অপেক্ষা
প্রতিম দাস

বাড়িটা রেলস্টেশন থেকে বেরিয়ে এসে মিনিট খানেকের দূরত্বে। চারকাঠা জমি সস্তায় পেয়ে যখন বাড়িটা করেছিলেন তখন চারপাশটা খা খা করতএখন জমজমাট। নিজেদের বাড়ি ছিল না মিঃ মজুমদারদের। সামান্য মুদির দোকানে কাজ করে বাড়ি বানাতে পারেননি ওঁর বাবা। তবে কষ্ট সহ্য করে ছেলেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার ফল ভোগ করে গেছেন জীবনের শেষ কয়েকটা বছরেছেলের বানানো বাড়িতে থেকে সুখেই দিন কাটিয়েছেন।
এ পৃথিবীতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যায় যার কোনও ব্যাখ্যা মেলে না। সাধারণ মানুষ তাকে অলৌকিক আখ্যা দেয়যে ঘটনার কথা এখানে জানাতে চলেছি সেটা অলৌকিকের তকমা পাবে কি না জানা নেই, তবে অবিশ্বাস্য বটেই। না-মানুষ জীবের ভালোবাসার এক অভূতপূর্ব উদাহরণ এই আখ্যান। মানুষ ভালোবেসে ভুলে যায়; ওরা ভোলে না।

* * *

মিঃ মজুমদারের বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ট টাইম লেকচারার থেকে পাকাপাকি প্রফেসর হতে সময় লেগেছিল বেশ কয়েকটা বছর। কর্মজীবনের শুরুটাও কলেজ জীবনের মতো মেসেই কাটিয়েছিলেন। হাতে একটু অর্থ জমতেই শুরু করেছিলেন খোঁজ যদি কাছেপিঠে কোনও বাড়ি পাওয়া যায়। বাড়ি জোটেনি, বদলে জুটেছিল এই জমিটা। তারই এক ছাত্রের সূত্রেবিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাত্র ছ’টা স্টেশন আগে। সুযোগটা ছাড়েননি সমর
তারপর কেটে গেল অনেকগুলো বছর। চারবছর আর বাকি রিটায়ারমেন্টের। বাবা-মা দু’জনেই বিদায় নিয়েছেন ধরাধাম থেকে। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়েছে পাশের শহরে। ঝাড়া হাত-পা জীবন। কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে বাড়িটাকে। কিছু সত্যিকারের গরিব মেধাবী ছাত্রকে বিনা পয়সায় পড়া দেখিয়ে দেওয়া ছাড়া প্রাইভেট টিউশন করেন না। টিভি দেখে, বই পড়ে সময় কাটতেই চায় না। একটা কিছু পোষার কথা আলোচনা করেন ওরা। অন্তত একটা কুকুর।
“আমি কলেজ চলে গেলে তোমার একটা সঙ্গী তো থাকবে।”
“বাড়ি সামলাতেই সময় যায়, ওর দেখাশোনা করব কখন? না না, ওসব তোমার রিটায়ারমেন্টের পরই ভেবো।”
চারদিকে ফাঁকা জায়গা ছেড়ে দিয়ে জমিটার ঠিক মাঝখানে বাড়িটা বানিয়েছিলেন সমরবাবু। বেশ কিছু গাছগাছালি লাগানো আছে ওই ফাঁকা জায়গায়। এরকমই দুটো গাছের মধ্যে একফালি জায়গায় একটা ছোট্ট ঘর বানালেন মিস্ত্রি ডেকে। বিদেশি সিনেমায় যেমন দেখা যায়, কুকুর থাকে। আর সেটা দেখেই ওর স্ত্রী বললেন, “মনে আছে তো কথাটা? রিটায়ারমেন্টের পর কিন্তু
“ঠিক আছে রে বাবা, ঠিক আছে, তাই হবে। যদি হুট করে কিছু একটা জুটে যায় দরকারে একটা লোক রাখবতোমায় চিন্তা করতে হবে না।”

* * *

সময়টা শীতকাল। কলেজের বিশেষ মিটিং সেরে ফিরতে ফিরতে ঘড়ির কাঁটা পৌঁছেছে রাত ন’টার ঘরে। কোটের পকেটে হাতটা ঢুকিয়ে ট্রেন থেকে নামলেন সমরবাবু। ছোট্ট স্টেশন, ফলে বেশি লোক নামে না। চায়ের দোকান থেকে পিকলু বলল, “স্যার, আজ অনেক দেরি হল?”
“হ্যাঁ রে, আজ বেশ দেরিই হয়ে গেল।”
ছোটো স্টেশনের ছোটো অফিসঘর থেকে বেরিয়ে এলেন স্টেশন মাস্টার সঞ্জীব বসাক।
“চলুন প্রফেসর, আজ একসঙ্গেই যাওয়া যাক।”
“কাজ কমপ্লিট?”
“হ্যাঁ, মোটামুটি। বিজন থাকল দরকার হলে ফোন তো আছেই।”
কুঁই কুঁই ধরনের একটা শব্দ কানে এল সমরবাবুর। এদিক ওদিক তাকালেন। সেটা লক্ষ করে সঞ্জীববাবু বললেন, “কী হল, প্রফেসর? কাকে খুঁজছেন?”
“নাহ্‌, মানে একটা কুঁই কুঁই শব্দ পেলাম যেন...”
আঙুল তুলে সঞ্জীববাবু বললেন, “ওই বেঞ্চির তলা থেকে আসছে। কারা ফেলে দিয়ে গেছে। ভাগ্য ভালো যে এদিকে কুকুরটুকুর বিশেষ আসে না। না হলে এতক্ষণ...”
একটু এগিয়ে গিয়ে পকেট থেকে টর্চটা বার করে বেঞ্চির তলায় আলো ফেললেন সমরবাবুদুটো টিপ্পির মতো গোল বস্তু চকচক করে উঠলকাছে গিয়ে নিচু হয়ে হাত বাড়াতেই গরগর আওয়াজ করে উঠল বাচ্চাটা। ঠক ঠক করে কাঁপছে।
“ওরে বাবা, তেজ আছে দেখছি! দেখি কত জোর তোর দাঁতে
হাতটা আরও একটু বাড়িয়ে দিতেই গরগরানি থামিয়ে নাকটা এগিয়ে দিল বাচ্চাটা। আলতো করে আঙুল ছোঁয়ালেন সমরবাবুএকটু শুঁকে আঙুলটা চেটে দিল বাচ্চাটা। দিন ছয়েকের হবে আন্দাজে মনে হল।
“একটু দাঁড়ান সঞ্জীববাবু, প্লিজ!” বলে এগিয়ে গেলেন চায়ের দোকানটার দিকে। “পিকলু, দুধ আছে? থাকলে এক কাপ দে তো।”
মানিব্যাগ বার করতে দেখেই পিকলু বলল, “স্যার, এর জন্য আবার... এই নিন
প্লাস্টিকের কাপটা সামনে রাখতেই দুধের গন্ধ নাকে টেনে এগিয়ে এল বাচ্চাটা এবং শুরু করল খেতে। শোনা গেল চক চক শব্দ। বাচ্চাটাকে ভাল করে দেখলেন সমরবাবু একেবারে নেড়ি নয়, দো-আশঁলা মনে হচ্ছে কালো-খয়েরি মাটি, হলুদ মেশানো লোম থাবাগুলো বেশ প্রশস্ত
“চলুন সঞ্জীববাবু, এবার যাওয়া যাক।”
গেট পার হতেই কানে এল ছোট্ট আধো ‘ভুক’ শব্দ। পেছন ফিরে সমরবাবু দেখলেন, বাচ্চাটা পেছন পেছন চলে এসেছে। একরত্তি লোমে ভরা লেজটা নাড়াচ্ছে টুকটুক করে।
“প্রফেসর ও ঠিক মানুষটাকে চিনে নিয়েছে। অ্যাই, যাহ্‌, যাহ্‌,” জুতোটা মাটিতে ঠুকে ভয় দেখালেন সঞ্জীববাবু।
বাচ্চাটি একটু পিছিয়ে থপ করে বসে পড়ল মাটিতে। ওরা আবার হাঁটা শুরু করলেন। কয়েক পা হেঁটে পেছনে তাকালেন সমরবাবুনা, আর আসছে না।
ওই যে শুরুতেই বলে ছিলাম না, অনেক ঘটনা ঘটে যায় যার ব্যাখ্যা মেলে না। ঠিক সেভাবেই সমরবাবুর জীবনপথে আগমন হল জিমির।
বাড়ির চারপাশের সীমানা প্রাচীরের সঙ্গে যুক্ত প্রবেশদ্বারটি খুলে ভেতরে ঢুকতে যেতেই আবার কুঁই কুঁই শব্দটা কানে এলফিরে তাকিয়ে থমকে গেলেন। বাচ্চাটা! লেজ নাড়ছে।
“একি রে, তুই চলে এসেছিস এতদূর! মরেছে, কী করি তোকে নিয়ে এখন? যাহ্‌, পালা
‘ভউ... উ... ভুক ভুক’ ডাক ছেড়ে লেজ নাড়ানোর মাত্রাটা আরও বাড়িয়ে দিল বাচ্চাটা। একটু ভাবলেন সমরবাবু তারপর হাত বাড়িয়ে তুলে নিলেন বাচ্চাটাকে দরজা লাগিয়ে এগিয়ে গেলেন ছোট্ট ঘরটার দিকে
ঘরটা ফাঁকাই যদিও ধুলো জমেছে তাছাড়া শীতের দিন মেঝে ঠাণ্ডা
“তোর তো খুব কষ্ট হবে রে এই ঠান্ডায় থাকতে না, এখানে তোকে রাখা যাবে না
কথাগুলো শুনে কী বুঝল কে জানে, বাচ্চাটা ছোট্ট তুলতুলে জিভটা দিয়ে একবার চেটে দিল সমরবাবুর হাতটা
“নাহ্‌, যা হবার হবে, চল তোকে ভেতরেই নিয়ে যাই।”
কথাগুলো বলা শেষ হতে না হতেই ভেসে এল ওঁর স্ত্রীর আওয়াজ, “এত রাতে ওখানে আবার কী করছ ঠান্ডার মধ্যে?”
“না মানে... অ্যাই শোন, একেবারে চুপ করে থাকবি, বুঝলি? কিছু না সুরমা, এই...”
“কী না, হ্যাঁ করছ! বয়স হয়েছে, ঠাণ্ডা লাগানোর শখ জেগেছে নাকি?”
“আরে, না না বলছিলাম কী সুরমা...”
পেছন ঘুরতেই সুরমার চোখ গেল বাচ্চাটার দিকে। “ও, এই ব্যাপার! তাই তো বলি... যোগাড় হয়ে গেল তাহলে? বলেছিলাম না? আমার কোন কথাই শোনো?”
“সুরমা, একটা রাতের ব্যাপার। কালকেই কোথাও ছেড়ে দিয়ে আসার ব্যবস্থা করবস্টেশনে ঠাণ্ডায়...”
“বুঝলাম। তা ওটাকে কি ঘরে ঢোকানোর কথা ভাবছ?”
“এই ঘরটার মেঝে খুব ঠাণ্ডা। কিছু একটা পেলে এখানেই... একটা ছেঁড়া কাপড়-টাপড় পেলে...”
কিছুক্ষণ বাদে একটা পিচবোর্ডের বাক্সে পুরনো কাপড় দিয়ে বানানো গদির ওপর থাকার ব্যবস্থা হ বাচ্চাটার। ওই ঘরেই। প্লাস্টিকের বাটিতে কিছুটা দুধ আর পাউরুটির কুচি ভিজিয়ে খাইয়ে দরজাটা লাগিয়ে ফিরে এলেন সমরবাবু।
মাঝরাতে ঘুম ভাঙল সুরমার খুটখাট শব্দে। হাত বাড়িয়ে বেড স্যুইচ অন করে দেখলেন, সমরবাবু বিছানায় নেই।
“বাথরুমে গেলে নাকি?”
কোনও সাড়া না পেয়ে যতটা সম্ভব নিঃশব্দে গেলেন জানালার কাছে। আস্তে করে খুলতেই অনুমান সত্যি হল। ছোটো ঘরটার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সমরবাবু। আবারও নিঃশব্দেই সুরমা ফিরে এলেন বিছানায়।

পরেরদিন সকালে সুরমার যখন ঘুম ভাঙল সমর তখন অঘোরে ঘুমাচ্ছেন। ডাকলেন না সুরমা। কারণ, উনি জানেন, আরও দু’বার রাতে উঠেছিলেন সমর। কারণ একই।
প্রাতঃকর্মাদি সম্পন্ন করে রান্না ঘরে গিয়ে আগে খানিকটা দুধ গরম করে কালকের বাটিটায় ঢেলে নিয়ে এবার নিজেই গেলেন ছোটো ঘরটার কাছেফিরে এসে চায়ের জল চাপিয়ে ডাক দিলেন, “কী গো, আজ কলেজ যাবে না, নাকি? আটটা তো বাজল!”
উঠেই আগে সমর তাকালেন ছোটো ঘরটার দিকে।
“ওকে দুধ খাওয়ানো হয়ে গেছে।”
কৃতজ্ঞতা মাখানো একটা হাসিতে ভরে উঠল সমরের মুখটা। “থ্যাঙ্ক ইউ, সুরো!”
“থ্যাঙ্ক ইউ-টিউ পরে হবে চা খেয়ে আগে ওর কাপড়টা বদলে দাও। আর ঝন্টুকে একটা ফোন করে আসতে বলোঘরটায় একটা আলো লাগাতে হবে তো।”
এবার বিস্ময় সমরবাবুর চোখে
“ওরকম হাঁ করে তাকিয়ে আছ কেন? রাতে তো ভালো করে ঘুমাতে পারছিলে না। তাও তো বাড়িতেই আছে। ছেড়ে এসে থাকতে পারবে?”
আসলে সমর যা জানতেন না তা হল সুরমাও কুকুর ভালোবাসেন। ছোটোবেলায় ওদের বাড়িতে একটা কুকুর ছিল। হনুমানকে তাড়াতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে মারা গিয়েছিল। ছোটোবেলার সেই কষ্টের স্মৃতির রোমন্থন চান না বলে নিজে রাজি না হওয়ার অভিনয় করে এসেছেন এতদিন। কিন্তু ওই যে, যেটা হওয়ার সেটা কে আটকাবে।
অতএব পাকাপাকি জায়গা হয়ে গেল জিমির। নামটা সুরমাই রাখলেনদুই নিঃসঙ্গ মানুষের জীবনের সিংহভাগ ভরাট হয়ে গেল জিমির সাহচর্যে। রাতের বেলাটা ছাড়া সারাদিন মূল বাড়িতেই থাকে জিমি। ইতিমধ্যে মেয়ে-জামাই এসেছিল একদিন। মেয়ে সাগরিকা তো রীতিমতো রাগ দেখাল মাকে, “সেই পুষলে! অথচ আমি কত্তবার চেয়েছি...”

জিমির মজাদার বিভিন্ন আচরণের স্মৃতি মনের খাতায় জমতে জমতে কেটে গেল একটা বছর। সমরবাবু যখন কলেজে যান, জিমি ওঁর সঙ্গে স্টেশন পর্যন্ত যায়। দু-একটা কুকুর দূর থেকে ডাক ছাড়লেও কাছে ঘেঁষে না আদরযত্নে তৈরি হওয়া তাগড়াই শরীরটা দেখে। তার সঙ্গেই আছে গুরুগম্ভীর আওয়াজ। ট্রেন আসা ও সমরবাবুর চাপা পর্যন্ত অপেক্ষা করে, তারপর একাই ফিরে যায়। স্টেশনের লোকেরা এই ব্যাপারটা ভালোই বুঝে গেছে। জিমি আজ অবধি কাউকে কিছু বলেনি।
মাসখানেক বাদের একটা দিন। বিকেলবেলায় সুরমা মগ্ন মাসিক ম্যাগাজিনের গল্পের পাতায়কানে এল গেট ঝাঁকানোর শব্দ। তাকিয়ে দেখলেন জিমি গেটটা খোলার চেষ্টা করছে। কে ডাকছে নাকি? বাইরে বেরিয়ে এলেন। ওকে দেখেই জিমি ছুটে এলনা, গেটের ওপারে তো কে নেই। জিমি আবার ছুটে গেল গেটের কাছে। ব্যাপারটা দেখার জন্য সুরমা গিয়ে দরজাটা খুলতেই জিমি সটান ছুট দিল স্টেশনের দিকে।
“জিমি! জিমি, অ্যাই জিমি!”
ও ফিরেও তাকাল না।
ওদিকে স্টেশনে পিকলুও অবাক হল জিমিকে অসময়ে দেখে।
“কী রে জিমি, তুই এখন?”
জিমি একবার পিকলুকে দেখে নিয়ে আস্তে-সুস্থে গিয়ে উঠে বসল সিমেন্টের বেঞ্চিটায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে গেল ট্রেন। যা থেকে নামলেন সমরদেখতে পেয়েই ‘ভো-ও-উ’ ডাক ছেড়ে জানান দিল নিজের উপস্থিতির। সমর চেনা শব্দে অবাক হয়ে তাকালেন। জিমি! এক-পা এগোতেই ছুটে এসে দু’পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল সমরের গায়ে। ইতিমধ্যে সুরমাও এসে গেছেন স্টেশনেদেখতে পেলেন এক অভূতপূর্ব মিলনদৃশ্য।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে সব বললেন সুরমা। খুব একটা অবাক হলেন না সমর। কারণ, জীবজন্তুদের এই বিশেষ অনুভূতির কথা উনি বইয়েতে পড়েছেন। সেটা স্ত্রীকে বলেন
এরপর থেকে স্টেশনে অপেক্ষা করাটা রুটিন হয়ে গেল জিমির। সমরবাবু কলেজ থেকে যখনই ফিরে আসেন ও কী করে যেন বুঝতে পারে। মিনিটখানেক আগেই স্টেশনে পৌঁছে যায়। কিছুদিন ওর গেট নাড়ানো দেখে সুরমা গেট খুলে দিতেন। পরে মিস্ত্রি ডেকে জিমির বেরোনোর মতো একটা ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। যেটা বুঝে নিতে জিমির মিনিট দশেক লেগেছিল মাত্র।
কিছু মানুষ আপত্তি তুলেছিলেন জিমির স্টেশনে আসার ব্যাপারে। সঞ্জীববাবুর হস্তক্ষেপে জল বেশিদূর গড়ায়নি। বরং ইদানীং জিমিকে না দেখলেই কে কে প্রশ্ন করেন পিকলুকে, “কী ব্যাপার, আজ প্রফেসর কলেজে যাননি নাকি?”

দুমাস পর
আজ সমরবাবুকে কলেজ যেতে বারণ করছিলেন সুরমা। গত চারদিন অসুস্থ ছিলেন।
“আর একটা দিন বিশ্রাম নিয়ে গেলে কী এমন ক্ষতি হত?”
“ক্ষতি কিছুই হ না। সামনেই পরীক্ষা, এটা ভুলে গেলে তো চলবে না জরুরি কিছু কাজ আছে, ওটা সেরেই তাড়াতাড়ি ফিরে আসব
কথাটা শুনেই কানটা খাড়া হয়ে গেল জিমির। এই চারদিন সমানে সমরের বিছানার পাশে শুয়ে থেকেছে। এমনকি রাতেও। সুরমাও কিছু বলেননি।
যথারীতি সমরবাবুকে ট্রেনে চাপতে দেখে বাড়ি ফিরে এল জিমি। বেলা গড়িয়ে দুপুর হল। জিমি চলে গেল স্টেশনে। বসে থাকল ট্রেনের অপেক্ষায়।
ট্রেন এল বেশ কয়েকটা কিন্তু সমর এলেন না কোনওটাতেই। জিমি নড় না। বসে থাকল একঠায়। রাতের খাবার খাওয়ার জন্য অফিস থেকে বেরিয়ে জিমিকে দেখে অবাক হলেন সঞ্জীববাবু।
“কী ব্যাপার রে, জিমি! প্রফেসর ফেরেননি এখনও?”
প্রশ্নটা শুনে বোবা করুণ চোখে তাকিয়ে থাকল জিমি। রাত পেরিয়ে সকাল হল জিমি বসেই থাকল
কেন ফিরলেন না সমরবাবু? এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো অনুমান করে নিয়েছেন অনেক পাঠক-পাঠিকাই। এ পৃথিবীর কোনও স্টেশনের কোনও ট্রেন থেকেই আর নামবেন না সমর মজুমদার। কলেজেই ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়। ওখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতায়। কিছুই করা যায়নি। সহকর্মীরা খবরটা পাঠান মেয়ে-জামাইকেখবর পৌঁছায় সুরমার কাছেও। আকস্মিক এই দুঃসংবাদে বাহ্যিক জগতের জ্ঞান লুপ্ত হয় ওঁরএকটু ধাতস্থ হতেই চেনা একজনের মারুতি গাড়িতে রওনা দেন কলকাতা অভিমুখে। মনেও থাকে না জিমির কথা।
দেহ আর ফিরিয়ে আনেননি। ক্যাওড়াতলা মহাশ্মশানে শেষকৃত্য সেরে ফিরে আসেন। গাড়িতে গেলেও ফিরে আসেন ট্রেনে। প্রায় চল্লিশ-বিয়াল্লিশ ঘন্টা পর। নেমেই দেখতে পান অপেক্ষমান জিমিকে। না, ওদের দেখে ও ছুটে আসে না। শুধু সেই বোবা দৃষ্টি দিয়ে খুঁজতে থাকে একটি বিশেষ মানুষকে।
পায়ে পায়ে এগিয়ে যান সুরমা। জিমির সামনে একটা পাউরুটি, এক ভাঁড় দুধ রাখা। ছুঁয়েও দেখেনি ও। সুরমাকে দেখে একটা মৃদু কুঁই কুঁই আওয়াজ করে। হাল্কা গরগরে একটা শব্দ করে অনুযোগ জানায়।
“বাড়ি চল জিমি, ও আর ফিরবে না।” জিমির মাথায় হাত রেখে কান্না জড়ানো গলায় কোনওমতে বলেন সুরমা।
এই প্রথম কথার অবাধ্য হয় ও। মুখ তুলে তাকায় পেছনে চলতে শুরু করা ট্রেনটার দিকে। সাগরিকা টান দেয় বেল্টটা ধরে। নাহ্‌, বৃথা চেষ্টা। নড়ানো যায় না জিমিকে ওর জায়গা থেকে।
সুরমা বলেন, “থাক রে গুড্ডি, ও থাক। ওর যখন ইচ্ছে হবে ও ঠিক ফিরে আসবে।”

* * *

না, এ কাহিনির আর বিস্তারের জায়গা নেই। জিমি বাড়িতে আর ফেরেনি। আরও দশবছর অপেক্ষা করেছিল। সুরমা প্রত্যেকদিন দু’বেলাই ওকে খাইয়ে দিয়ে আসতেন নিজের হাতে। তারপর একদিন জিমিও চলে যায় সেখানে যেখানে ওর অপেক্ষায় বসে আছেন ওর পালক-পিতা।
( এটি একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা। সেই প্রভুভক্ত কুকুরটার নাম ছিল হাচিকো। ১৯২৩ সালের শিবুয়া রেইড রোড স্টেশনে ওকে পেয়েছিলেন প্রফেসর ইসাবুরই। এর একবছর পর ইসাবুরইর দেহাবসান হয়। ১৯২৪ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত হাচিকো ওই স্টেশনে প্রফেসরের জন্য অপেক্ষা করেছিল। ওই স্টেশনের ভেন্ডাররা ওর দেখাশোনা করতসংবাদপত্রে এই খবর প্রকাশিত হয়েছিল। দেশবিদেশ থেকে এসেছিল অনেক অর্থ সাহায্য। পরে সেই অর্থে ওই স্টেশনে হাচিকোর মূর্তি বসানো হয়। আজও ওটা এক দ্রষ্টব্য বস্তু জাপানের। এক মানবেতর প্রাণী অপেক্ষা করে আছে তার প্রিয় মানুষটার জন্য। )
_____
অলঙ্করণঃ নন্দন ঘর

গল্পের ম্যাজিক:: অণুগল্প:: দিগন্তের রেলগাড়ি - অরুণাচল দত্ত চৌধুরী


দিগন্তের রেলগাড়ি
অরুণাচল দত্ত চৌধুরী

মালগাড়িটা স্টেশন পেরিয়ে যাচ্ছে। একত্রিশ... বত্রিশ... যাহ্‌, শেষ হয়ে গেল। ছোটোবেলা থেকে বিজনের এই এক মজার খেলা। মালগাড়ির কামরা গোনা। এমনি ট্রেনের কামরাও গোনা যায়। কিন্তু সেগুলো ছোটোসবই আট নইলে বারো বগির। গোনার কোনও মজা নেই।  মালগাড়িতে অনেক কামরা। আবার তার রকমফেরও অনেক। কতকগুলো চার চাকার। ছোটোআবার কতকগুলো কামরার আটটা করে চাকা। সেগুলোকে দুটো কামরা ধরলে হয়। বিজন কিন্তু তা ধরে না। যে মালগাড়ির কপালে যেমন জুটেছে। এ অবধি সবচেয়ে বেশি যা পেয়েছে, বাষট্টি কামরার মালগাড়ি। বাষট্টি না তেষট্টি? বাষট্টিই হবে। ইঞ্জিন আর গার্ডের কেবিন ধরে। ওই বাষট্টিটা পেরোনো যাচ্ছে না। তাই বিজন আজও গোনে। গুনলও।
মালগাড়ি নাকি আরও অনেক অনেক কামরারও হতে পারে, একশো, দেড়শো, দুশোগণপতিকাকু বলেছিল। গণপতি বাস্কে। বাবা-মা কিন্তু গণপতিকাকুকে চিনত না। লেভেল ক্রসিংয়ে দাঁড়িয়ে, হেঁটে স্কুলে যাবার পথে মালগাড়ির কামরা গোনা প্রথম যখন শুরু করে, গণপতিকাকু ছিল রেলের গেটম্যান।
মা শিখিয়েছিল, বড়োদের কাকু বলে ডাকতে। কী করে গণপতিকাকুর ভাব হয়েছিল ছোট্ট বিজনের সঙ্গে আজ আর মনে পড়ে না। শুধু মনে আছে, বিজনের রেলগাড়ি নিয়ে যে কোনও প্রশ্নেরই এনসাইক্লোপিডিয়া ছিল গণপতিকাকু।
এখন বোঝে বিজন, অনেক প্রশ্নেরই কোনও মানে ছিল না। অনেক উত্তরও তাই হত লাগামছাড়া। বেশি লেখাপড়া ছিল না কাকুর। যা ছিল, বুকভরা অনন্ত সাহস। ইয়া ইয়া চেহারার বাস-ট্রাক ড্রাইভার, কেউ কেউ মাতালও বোধহয়, গেট বন্ধ থাকলে নেমে এসে ঝামেলা করত। গেট খুলে দেবার জন্য টাকা দেবার লোভ দেখাত। চেঁচামেচি করে গালাগালি দিত। মারবে বলে ভয় দেখাত। সেই নির্জন বন্ধ রেলগেটে গণপতি অটল হয়ে বসে থাকত শুধু।
কোনও কোনও দিন বিজন অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করত, “ও কাকু, তুমি কেন ইঞ্জিন চালাতে পার না? তুমি কবে মালগাড়ি চালাবে গো?
“চালাব, চালাব। দাঁড়া, আগে ড্রাইভার হবার পরীক্ষাটা দিই, তবে না!”
“আমকে নিতে হবে কিন্তু। তোমার সঙ্গে দেশ দেখব অনেক। চলন্ত ইঞ্জিনে বসে আমি লাইন দেখে তোমাকে বেছে দেব, কোন লাইনে যেতে হবে।”
হা হা করে হেসে উঠত কাকু, “আরে বোকা, কোন লাইনে গাড়ি যাবে সেটা ড্রাইভার ঠিক করে নাকি? সেটা ঠিক করে স্টেশনে থাকা মাস্টারবাবু আর কেবিনম্যান।”
“তবে তুমি মাস্টারবাবুই হও, নইলে কেবিনম্যান।”
“দ্যুৎ! আমি ড্রাইভার না হলে তুই ইঞ্জিনে বসে দেশ দেখবি কেমন করে?
স্রেফ তাকে নানান দেশ দেখাবার জন্য গণপতির এই আত্মত্যাগ বিজনকে মুগ্ধ করে দিত।
“ক’টা বগি থাকবে তোমার মালগাড়িতে, কাকু?
“দেড়শো-দুশো, তোর যেদিন যেমন ইচ্ছে হবে। চার-পাঁচটা আলগা ইঞ্জিন লাগিয়ে নেব না হয়, খুব লম্বা হয়ে যাবে যেদিন।”
কাকুকে কোনওদিন বলেইনি, তার নিজেরও সারাজীবনের স্বপ্ন ওই ড্রাইভার হওয়া। হায়ার সেকেন্ডারির পর গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় পড়তে চলে এল বিজন। কাকু তার আগেই রেলগেট ছেড়েছে। ডিপার্টমেন্টের পরীক্ষা দিয়ে, তদ্বির করে সে নাকি গাড়ি চালাবার অনুমতি পেয়েছে। গেটম্যান থেকে ড্রাইভার হওয়া, রেলের চাকরিতে এ এক অসাধ্যসাধন। বলেছিলেন রঞ্জনবাবু ক্লাস ইলেভেনে ভর্তি হওয়া বন্ধু সলিলের বাবা, নতুন স্টেশনমাস্টার।

তা দেশ দেখেছে বৈকি বিজন। অনেক দেশ দেখা হল। প্রথমে মাস্টার্স আর পিএইচডি করতে আমেরিকা। তারপর চাকরি করতে করতে এখন এই ইউরোপ। মা-বাবা গত হয়েছেন দুজনেই। দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বলতে কিছু আত্মীয়বন্ধুর সঙ্গে ই-মেইল চালাচালি। সেই বন্ধু সলিলের ছেলে আবীর ওর সেইরকম অসমবয়সী এক ই-মেইল বন্ধু।
রেলগাড়ি, বিশেষ করে মালগাড়ি এখনও ওকে টানে খুব। গণপতিকাকুর সঙ্গে ঘুরে দেশ আর দেখা হয়নি। শুধু মালগাড়ি দেখলেই আজও বিজন বগি গোনে। হোক না বিদেশ, পুরনো অভ্যাসে তবুও ও খেয়াল করতে চেষ্টা করে ড্রাইভারের মুখটা। যদি চেনা চেনা লাগে
ওর এই শহরের বাসাটা রেললাইনের খুব কাছে। এখানে বরফ পড়ে খুব। দিগন্তে বরফঢাকা পাহাড়ের দিকে ছুটে গেছে অসীমে মিলিত হওয়া সমান্তরাল রেখা। পৃথিবীর এই উত্তর-বারান্দায় শীতের ঋতুতে সন্ধে নামে খুব তাড়াতাড়ি। আগের মালগাড়িটার পর আবার একটা মালগাড়ি যাবে। স্টেশন থেকে বাসায় ফিরতে গিয়ে ফেরা গেল না। এটাও দেখে তবে যাওয়া যাক।
এই মালগাড়িটাকে দেখে বিজনের অবাক হবার পালা। একমনে কামরা গুনতে গুনতে, একি রে! দুশোও পেরিয়ে গেল যে! ঠিক যেরকম বলেছিল গণপতিকাকু, অবিকল সেরকম অনেকগুলো ইঞ্জিন ট্রেনটার মাঝে মাঝেই গুঁজে দেওয়া। আর সেই প্রত্যেকটা ইঞ্জিনে বসে গণপতিকাকু। এমনকি শেষের গার্ডের কামরাতেও রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে। বিজনকে হাত নাড়তে নাড়তে সবক’টা গণপতিকাকু বরফ ঢাকা দিগন্তের দিকে চলে গেল।
বিজন জানে, অসম্ভব। এই দূর বিদেশের মনখারাপের আবছা আলোয় এই দেখা চোখের ভুল ছাড়া আর কিচ্ছু নাবিজন যেটা জানে না, আজই বাড়ি ফিরে ই-মেইল বক্সে রাখা আবীরের চিঠিতে খবর পাবে, রিটায়ার করার তিনমাস আগে মাত্র গতকাল জঙ্গলের মধ্যে ওই মালগাড়ি নিয়েই গণপতিকাকু যাচ্ছিল নাশকতার মাইনপাতা রেলরাস্তা দিয়ে। আজ দেশের সবক’টা কাগজে বিস্তারিত বেরিয়েছে ইঞ্জিনটার দিগন্তে মিশে যাবার খবর।
____
অলঙ্করণঃ নন্দন ঘর

গল্পের ম্যাজিক:: সেরা পরি - অনন্যা দাশ


সেরা পরি
অনন্যা দাশ

বসন্ত উৎসবের আগে ফুল্লরা খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আর হবে নাই বা কেন? পরির দেশের সেরা দর্জি সে। ওর মতন জামা তো আর কেউ বানাতে পারে না। এবারে ওদের রাজা ঘোষণা করেছেন যে বসন্ত উৎসব এবার অন্যবারের চেয়েও ঘটা করে হবে। আর প্রতিবারের থেকে আলাদা যেটা হবে সেটা হল সেরা পরি নির্বাচন। রাজা, রানি আর রাজসভার লোকজন মিলে সেরা পরির উপাধির যোগ্য একজন কাউকে পুরস্কার দেবেন। সেই ঘোষণার পর থেকেই পরিদের মধ্যে ভয়ংকর রেষারেষি শুরু হয়ে গেছে। সবাই নতুন জামাকাপড় পরে সেজেগুজে উৎসবে যেতে চায়।
হলুদপরি স্বর্ণিমার জন্যে হলুদ জামা, লালপরি রক্তিমার জন্যে লাল জামা, নীলপরি নীলিমার জন্যে নীল জামা। এমনি করে কত অজস্র রঙের জামা যে ওকে বানাতে হচ্ছে তার ঠিক নেই। তবে ফুল্লরাই যে পরিলোকের একমাত্র দর্জি, তা কিন্তু নয়। সরলা পরিও আছেন, কিন্তু ওনার বয়স হয়েছে। এখন আর চোখে তেমন ভালো করে দেখতে পান না তিনি। তাই ভালো করে একটা জামা বানাতে অনেক সময় লেগে যায় ওনার। তাছাড়া নতুন ডিজাইনও নেই তেমন তাঁর কাছে তাই ওনার কাছে আজকাল আর কেউ যায় না। সবাই ফুল্লরার কাছেই আসে। অথচ ফুল্লরাকে কাজ শিখিয়েছেন ওই সরলা পরিই। সরলাদি বলে ডাকে ওনাকে ফুল্লরা।
তা যে বসন্ত উৎসবের জন্যে সবার মধ্যে এত উত্তেজনা, সেই উৎসবের আর দু’দিন বাকি। ফুল্লরার সব জামা সেলাই প্রায় শেষ। একটু আগেই নীলিমা তার নীল রঙের জলের কণা দিয়ে তৈরি পোশাকটা নিয়ে গেছে। স্বর্ণিমা তার সোনালি রোদের সুতো দিয়ে সেলাই করা জামা আর রক্তিমা তার কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি দিয়ে বানানো জামাগুলোও নিয়ে গেছে। এছাড়াও বেগুনি, সাদা, গোলাপি, কমলা জামাগুলো আগেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। যদিও সেসব পরিরা রূপে গুণে নীলিমা, স্বর্ণা, রক্তিমা বা পত্রালির ধারে কাছে নেই। সেই জন্যেই ওদের সেরা পরি খেতাব পাওয়ার সম্ভাবনাও প্রায় নেই। এখন শুধু পত্রালির কচি সবুজপাতা দেওয়া ঝলমলে জামাটা নিয়ে যাওয়া বাকি। সেটা সে এসে নিয়ে গেলেই ফুল্লরার কাজ শেষ। সে তাহলে তারপর নিজের জন্যে একটা জামা বানাতে পারবে। গতবার ওর কাজ শেষ করতে এত সময় লেগে গিয়েছিল যে নিজের জন্যে নতুন জামা বানাবার সময়ই হয়নিপুরনো জামা পরেই উৎসবে যেতে হয়েছিল তাকে। সেটা আর কেই বা চায়? ফুল্লরার কি ইচ্ছে করে না অন্য পরিদের মতন নতুন জামা পরে উৎসবে যেতে? সবুজপরি পত্রালির জামাটাতে শেষ সেলাই দিয়ে সুন্দর করে ভাঁজ করে রাখল ফুল্লরা। একটু পরেই পত্রালি এসে পড়বে। ওর চর সবুজ গিরগিটি একটু আগেই খবর নিয়ে গেছে জামাটা তৈরি হয়েছে কি না। পত্রালি আবার খুব মেজাজি। রানিমার কেমন জানি আত্মীয়া হয় সে। প্রতিবারই সে বলে যায় যে তার জামাটাই যেন সবচেয়ে ভালো হয়। কিন্তু ফুল্লরা তা পারে না। সে সব পরিদের জামাগুলোকেই ভালো করে বানাবার চেষ্টা করে।
একটু পরেই পত্রালি এসে হাজির হল। জামাটা ওকে ভাঁজ খুলে দেখাতে হল। তবে ওর পছন্দ হল কি হল না ঠিক বোঝা গেল না। সে শুধু রাগি রাগি মুখে ফুল্লরাকে জিজ্ঞেস করল, “আর কার কার জন্যে জামা বানিয়েছ তুমি?”
ফুল্লরা ভয় পেয়ে ঢোঁক গিলে বলল, “লালপরি, নীলপরি, হলুদপরি... মানে সব পরিরাই তো প্রায় আমার কাছেই এসেছিল। সবার জন্যেই তো বানিয়েছি।”
“হুঁ, আমি চললাম। তোমার পারিশ্রমিক বসন্ত উৎসবের পরে পাবে,” বলে সে চলে গেল।
চোখ ফেটে জল এসে গেল ফুল্লরার। এত খেটেখুটে জামাটা বানাল সে আর তার পারিশ্রমিক কিনা পাবে বসন্ত উৎসবের পর! কিন্তু কিছু বলা চলবে না। রানিমার আত্মীয়া হয় যে।
পরদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ফুল্লরা আলমারি থেকে নিজের জন্যে কেনা পছন্দের ফুরফুরে রামধনু রঙের কাপড়টা বার করেছে এমন সময় গন্ডগোল শুরু হয়ে গেল। কাপড়ে দাগ কেটে কাঁচিটা দিয়ে সবে কাটতে যাবে এমন সময় রক্তিমা কাঁদতে কাঁদতে এসে হাজির।
“কী হয়েছে? কাঁদছ কেন?” ফুল্লরা জিজ্ঞেস করল।
“এই দ্যাখ, তোমার বানানো সুন্দর জামাটার কী দশা হয়েছে!”
ফুল্লরা তাকিয়ে দেখল। সত্যিই তো! কে যেন তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে ফালা ফালা করে ছিঁড়ে দিয়েছে জামাটাকে! রক্তিমা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “ফুল্লরা, তুমি দয়া করে আমার জন্যে আরেকটা জামা সেলাই করে দাও। তোমার যত পারিশ্রমিক লাগে আমি দেব!”
রক্তিমাকে অঝোরে কাঁদতে দেখে ফুল্লরার মন ভিজে গেল সে বলল, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমি এখুনি বাজারে গিয়ে নতুন কৃষ্ণচূড়া কাপড় নিয়ে আসছি। বসন্ত উৎসবের আগেই তুমি তোমার জামা পেয়ে যাবে। কিন্তু জামাটার ওই দশা কী করে হল সেটা জান?”
“নাহ, কাল নিয়ে গিয়ে আলমারিতে যখন ঝুলিয়ে রেখেছিলাম তখন ঠিক ছিল আজ সকালে মাকে দেখাবার জন্যে যখন বার করেছি তখন দেখি এই দশা!” বলতে বলতে আবার কাঁদতে শুরু করল রক্তিমা।
ফুল্লরা ওকে শান্ত করে ভরসা দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিল। একটু পরেই কিন্তু স্বর্ণিমা আর নীলিমাও এসে হাজির। ওদের দুজনের জামারও ওই একই অবস্থা! ওরা দুজনেই পীড়াপীড়ি করতে লাগল নতুন জামা বানানোর জন্যে। ফুল্লরা কী আর করবে! ওকে রাজি হতে হল। দুজনে কেঁদে কেঁদে শরীর খারাপ করে ফেলছে যে! তাছাড়া ওরা শুনেছে যে সে রক্তিমার জামা আবার বানিয়ে দেবে, তাই ওরা না শুনতে রাজি নয়।
নতুন কাপড় কিনে ভীষণভাবে কাজে লেগে গেল ফুল্লরা।
“কী ব্যাপার ফুল্লরা? কালকে শুনলাম তোমার সব জামা বানানোর কাজ হয়ে গেছে তাহলে আজকে এত কাপড় নিয়ে কী সেলাই করতে বসেছ আবার?”
ফুল্লরা চমকে তাকিয়ে দেখল সরলাদি!
“কী বলব সরলাদি, কে যেন স্বর্ণিমা, রক্তিমা আর নীলিমার জামাগুলো ছিঁড়ে ফালাফালা করে দিয়েছে। ওদের জন্যে আবার নতুন জামা বানাতে হচ্ছে।”
“সে কী! এ তো ভয়ানক ব্যাপার! পরিলোকে এরকম তো কখনও হয়নি কে করেছে জান?”
“না, আমি তো কিছুই জানি না। ওরাও কিছু জানে না।”
“হুঁ, আমার মনে একটা সন্দেহ আছে। তা সরে যাও তুমি একা কী করে একদিনে এতগুলো জামা বানাবে? এস, আমি সাহায্য করি আমি তাড়াতাড়ি করতে পারি না এখন, কিন্তু কিছু তো করতে পারব!”
আনন্দে প্রায় কেঁদে ফেলল ফুল্লরা। সত্যি সে কী করে একদিনে তিনটে জামা বানাবে সেই ভেবে ভেবেই হয়রান হচ্ছিল। সরলার কথা শুনে সে সরলার পা জড়িয়ে ধরল, “আমাকে ক্ষমা করে দাও সরলাদি! আমিই সবাইকে তোমার নামে এটা সেটা বলে তোমার ব্যবসা নষ্ট করছি। পৃথিবী থেকে বই চুরি করে এনে সেসব ডিজাইনের জামা বানিয়ে নতুন ডিজাইন বলে চালিয়েছি। পরিদের জামা নষ্ট হয়ে যেতে আমি ভেবেছিলাম তুমি বুঝি আমার প্রতি হিংসাতে এই কাজ করেছ। কিন্তু এখন তুমিই আমাকে সাহায্য করতে এসেছ আমি তো তোমার শত্রু!”
সরলা পরি হাসলেন, “এই যে তুমি ক্ষমা চেয়ে নিলে তাতেই তোমার সব অপরাধ ধুয়ে গেল। আমি সবই জানি। আর জ্ঞানী লোকেরা বলে গেছেন যে শত্রুতা নষ্ট করার সবচেয়ে ভালো উপায় হল শত্রুকে বন্ধু করে নেওয়া তাই আজ থেকে তুমি আমার বন্ধু। তবে কী, আমার তো সত্যি বয়স হয়েছে। এখন আর চোখে ভালো দেখি না, আঙুলে তেমন শক্তি নেই। বসন্ত উৎসবের আগে ওই হাড়ভাঙা খাটুনি খাটার আর ক্ষমতাও নেই। কাজ কম হয়ে আমার ভালোই হয়েছে। তবে জেনে রেখ, ক্ষতি করে নিজের লাভ করলে কখনও ভালো হয় না। আর কেউ জানুক না জানুক, তুমি নিজে তো জানবে। সেটাতেই তোমার দুঃখের শেষ থাকবে না। যাক ওসব থাক, এস, কাজগুলো শেষ করি।”
ফুল্লরা আর সরলা মিলে একদিনেই তিনখানা জামা তৈরি করে ফেলল। হলুদপরি, লালপরি আর নীলপরিকে বলা হল যেন বসন্ত উৎসবের দিন সকালবেলা এসে জামাগুলো নিয়ে যায়।
সরলা পরি বললেন, “শোনো ফুল্লরা, আজকের রাতটা আমি এখানেই থাকি। আমার মনে হয় কেউ হয়তো আবার জামাগুলো নষ্ট করার চেষ্টা করতে আসতে পারে
ফুল্লরা একটু পরেই ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল কিন্তু সরলা পরি জেগে বসে রইলেন। গভীর রাতে খুসখুস খসখস শব্দ ভেসে এল কেউ একটা আসছে ফস করে আগুন জ্বেলে মোমবাতির আলোয় সরলা দেখলেন একটা সরু সবুজ ল্যাজ দরজার তলা দিয়ে মিলিয়ে গেল!

বসন্ত উৎসবের দিন সকালবেলা পরিরা সব এসে তাদের জামা নিয়ে গেল। লোহার সিন্দুকে নিরাপদেই ছিল সেগুলো। ফুল্লরা তার পুরনো জামাগুলোর মধ্যে থেকে কোনটা পরবে তাই ভাবছিল এমন সময় সরলা পরি এসে বললেন, “এই নাও ফুল্লরা, এটা পরলে তোমাকে খুব সুন্দর দেখাবে
ফুল্লরা আশচর্য হয়ে দেখল ওর নিজের কেনা রামধনু রঙের কাপড় দিয়ে কখন জানি সরলা পরি ওর জন্যে সুন্দর একটা জামা বানিয়ে ফেলেছেন। আনন্দে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল ফুল্লরা।
“আরে, কাঁদছ কেন? তোমাদের বয়স কম, বসন্ত উৎসবে তোমরা আনন্দ করবে না তো কারা করবে?”
বসন্ত উৎসব দারুণ হল। সবার শেষে সেরা পরি পুরস্কার ঘোষণায় রাজা বললেন, “এবারের সেরা পরি পুরস্কার পাচ্ছে ফুল্লরা পরি! ওর মতন সুন্দর জামা আর কেউ বানাতে পারে না আমাদের এখানে
ফুল্লরা তো এত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল যে কী করবে কিছুই বুঝতে পারছিল না। শেষে সবাই ওকে ঠেলে মঞ্চে রাজা-রানির কাছে পাঠাল। রানি ওর মাথায় মুকুট পরাতে গেলেন আর রাজা ওর হাতে পুষ্পস্তবক দিতে লাগলেন। ফুল্লরা কিন্তু কিছুই নিল না হাত তুলে বাধা দিল। সবাই দেখল মঞ্চে দাঁড়িয়ে ফুল্লরা ফিসফিস করে রাজা-রানিকে কীসব বলছে। ওর কথা শেষ হতে রাজা-রানি নিজেদের মধ্যে কীসব পরামর্শ করতে লাগলেন। অবশেষে রাজা ঘোষণা করলেন, “ফুল্লরা আমাদের সবকিছু বলেছে এবং সেই ভিত্তিতে আমাদের মনে হচ্ছে যে সেরা পরি পুরস্কার সরলা পরির পাওয়া উচিত কারণ, সে নিঃস্বার্থভাবে ফুল্লরাকে সাহায্য করেছে ফুল্লরা ওর ব্যবসা ভেঙে দিয়েছিল, তাও! তবে এটাও ঠিক যে ফুল্লরা যদি সাহস আর ভালো মনের পরিচয় দিয়ে আমাদের সত্যি কথাটা না বলত তাহলে আমরা তো কিছুই জানতে পারতাম না! সেই জন্যে এবারের সেরা পরি পুরস্কার যুগ্মভাবে ফুল্লরা আর সরলাকে দেওয়া হচ্ছে! সেই সঙ্গে পত্রালি আর তার পোষা গিরগিটিকে পরির দেশ থেকে নির্বাসিত করা হচ্ছে চিরকালের মতোআমরা জানতে পেরেছি যে সেরা পরি হওয়ার লোভে তারা অন্যদের ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে। যাও, বেরিয়ে যাও তোমরা। আর কোনোদিন যেন তোমাদের এখানে না দেখি!”
সবুজপরি আর গিরগিটি চলে যেতে রানি বললেন, “পরিলোকে সবুজপরি থাকবে না তা তো হয় না, তাই তোমাদের মধ্যে থেকে যারা যারা সবুজপরি হতে চাও তারা আমাদের দরখাস্ত পাঠিও, আমরা বিবেচনা করে দেখে নির্বাচন করব

ফুল্লরা আর সরলা পরি দুজনে এখন একসঙ্গে পরির দেশের পোশাক তৈরির দোকানটা চালায়। ওদের দোকানের নাম ‘সেরা পরিদের সেরা পোশাক’।

_____
অলঙ্করণঃ নন্দন ঘর ও ঋতম মুখার্জি