Showing posts with label তনুশ্রী চক্রবর্তী. Show all posts
Showing posts with label তনুশ্রী চক্রবর্তী. Show all posts

ছড়া-কবিতা:: আশায় ভাসায় ভেলা - তনুশ্রী চক্রবর্তী


আশায় ভাসায় ভেলা
তনুশ্রী চক্রবর্তী

ফুলছাপ খুন্তিটা হারিয়েছে বেলনা,
মামা পাপা কেউ নেই, চাইব যে খেলনা!
ঝুঁটি বেঁধে মামা রোজ টাটা যায় অফিসে,
পাপা বকে ভেঙে গেলে, হাত দিলে শো-পিসে।
স্কুলছুটি হয়ে গেলে দারোয়ানও বকে খুব,
আমি বল কাকে বকি, আয়ামাসি দিলে ডুব?

বার্বিটা হাত ভেঙে পড়ে থাকে বাড়িতে,
সামলাব কত আর? চাল দে না হাঁড়িতে।
টেডিটাকে ঠেলে ঠেলে গেল না গো বাজারে,
কড়াটা যে জ্বলে গেল! হায় এ কী সাজা রে!

‘হ্যালো, হ্যালো মামা আমি গেম খেলি কী-বোর্ডে।’
‘পাপা হ্যালো জু-তে যাবে? চড়ব না ও ফোর্ডে।
প্রজাপতি আমি হব, তুমি হবে ককরোচ –
মামা তা’লে ছুটি নেবে? আমাদেরই হবে কোচ?’
বাড়ি ফিরে রাগী মুখে, মামা বলে ‘বেয়াড়া’
পাপা ফেরে হাসিমুখে নিয়ে ডাঁশা পেয়ারা;
‘এসো এসো সোনামণি, নুন দেব মাখিয়ে,’
চোখে জল মোছে খুকু হাসিমুখে তাকিয়ে।
_____
অলঙ্করণঃ সুতীর্থ দাশ

বিজ্ঞান:: এক্কেবারে ছবির মতো :: পিসীমাকে চিঠি - ২ : তনুশ্রী চক্রবর্তী

বিষয় ফোটোগ্রাফিঃ এক্কেবারে ছবির মতো – দ্বিতীয় পর্ব


পিসীমাকে চিঠি - ২
তনুশ্রী চক্রবর্তী

পিসীমা সরি সরি সরি কান মুলছি, পায়ে পড়ছি! অনেক দেরি হয়ে গেল এই চিঠিটা লিখতে; খারাপ লাগছে নিজেরই। তুমি বেশ কয়েকটা ছবি পাঠিয়েছ আমাকে হোয়াটস অ্যাপে, আর লাস্ট চিঠিতে জানিয়েছিলে ছবি তোলা সংক্রান্ত তোমার মজার মজার অভিজ্ঞতা, লিখেছিলে তোমার অনেক প্রশ্নও আছে আর আশা করেছিলে যে আমি চটপট সেগুলোর উপর তোমাকে ফিডব্যাক দেব। খুব অপরাধবোধ হল যখন লাস্ট মেসেজে বললে যে তোমাকে আমি অপেক্ষায় রেখেছি। সত্যি গো - অজুহাত দিয়ে আরও সময় নষ্ট করব না বরং দেখি দোষখন্ডনের জন্য এ যাত্রা তোমাকে বেশ কয়েকটা হালকা ফুলকা মুচমুচে টিপস দিয়ে পটিয়ে ফেলা যায় কিনা! এই টিপসগুলো তোমার ছবি তোলায় অনেক সাহায্য করবে, তখন কিন্তু আমাকে চটপট মাফ করে দিও।
তোমার তোলা যে ফটোগুলো পাঠিয়েছ বিশ্বাস করো সবকটাই বেশ চমকে দেবার মত। একটুও বাড়িয়ে বলছি না আমি সত্যি এতটা আশা করিনি। আসলে তুমি যে সিরিয়াসলি আমার কথা শুনে ও মেনে মন দিয়ে ছবি তুলছ এতে আমার শেখানোর উৎসাহ সত্যি অনেক বেড়ে গেছে। শুধু যদি সময়টা একটু বেশি পেতাম যাক গে – ওই কথা আর তুলছি না!
তোমার পাঠানো ছবিগুলোর একটা একটা করে ধরে ধরে আলোচনা করব ভাবছিলাম কারণ তুমি লিখেছ “ছবিতে নিশ্চয়ই অনেক খামতি আছে” তারপর ভাবলাম সেটা করার আগে বরং ছবি তোলার কিছু কমন খামতি নিয়ে একটু আলোচনা করে নিইএই খামতি আমাদের সকলেরই হয় যখন আমরা প্রথম প্রথম ছবি তুলি। মজার ব্যাপার হল, অন্যের তোলা ছবি দেখার সময় যদিও এগুলো ত্রুটি হিসেবে খুব সহজেই চোখে পড়ে, নিজে ছবি তোলার সময় কিন্তু সেগুলো অতটা খেয়াল থাকে নাএকটু সতর্ক থাকলেই কিন্তু খুব সহজে কিন্তু এগুলো এড়ানো যেতে পারে।
একটা খুব সাধারণ ছবির উদাহরণ দিয়ে বোঝাই - যেমন ধরো, নিচের ছবিটা (এটা তোমার তোলা নয়, নেট থেকে নেওয়া) সারি দিয়ে দাঁড়ানো গাড়ি আর তার উপরে রেলিংগুলো বেশ একটা সুন্দর প্যাটার্ণের এফেক্ট এনেছিলছবিটা ফ্রেমিং-র সময় কিন্তু ব্যাপারটা ভালই ছিল, কিন্তু শাটার টেপার মুহূর্তে ফ্রেমে ঢুকে পড়েছে ওই স্কুটারের আদ্ধেকটা। আর সেটা ফটোগ্রাফারের খেয়ালে আসেনি – তাই একটা ভাল কম্পোজিশন মার খেয়ে গেছে। মজা কী জানো তো, বেশিরভাগ সময়েই ছবি তোলার সময় আমাদের মনোযোগ থাকে সাবজেক্টের উপরেই, তাই ছবির কিনারা ঘেঁষে যেসব ক্লাটার ঢুকে পড়ে সেদিকে আমরা নজর দিই না তত; অথচ ছবি দেখার সময় কিন্তু ওই ক্লাটারগুলোই আমাদের চোখে পিন ফুটোতে থাকে, আর দাঁতে কাঁকর পড়ার মতো লাগে।


তাই আজকের প্রথম পাঠ হল এইটা – খেয়াল রাখা – সাবজেক্টের সাথে সাথে চোখ রাখতে হবে ছবির কিনারেওকাজটা খুবই সহজ, ছবির সাবজেক্টের উপর ক্যামেরা তাক করে শাটারটা টেপার জাস্ট আগে একবার চোখটা ছবির চার কিনারা বরাবর ঘুরিয়ে নেওয়া – আর তারপর ডিসিশন নেওয়া – শাটার কখন টিপবযেমন, এই ছবিতেই দেখ – স্কুটারটা ওরকম আধখ্যাঁচরা হয়ে আছে বলেই বিপত্তি – শাটার টেপার আগে যদি কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করা যেত তবে পুরো স্কুটারটা ফ্রেমে এসে যেত – তাহলে ব্যাপারটা মন্দ দাঁড়াত না! আর সেটা না পছন্দ হলে, কয়েক সেকেন্ড আরও অপেক্ষা করলেই স্কুটার বেরিয়ে যেত ফ্রেম থেকে – ব্যাস! এটা এড়াবে কীভাবে সেটা বলব খানিক বাদেই –তার আগে দুনম্বরটা বলে নিই – কারণ দুটোর মধ্যে খানিক যোগসাজশ আছে কিনা, তাই!


এই ছবিটা বেছে নিয়েছি পরবর্তী পাঠ হিসেবে – টপিকের নামটাও বলে দিইঃ “স্নিপিং”! খুব গুরুতর কিছু না বটে – কিন্তু জরুরি তো বটেই! তোমার বেশ কয়েকটা ভালো ছবিতে দেখলাম এই সমস্যাটা হচ্ছে। ছবিটা চিনতে পারছ তো? তোমারই তোলা । তুমি লিখেছিলে যে তোমার মন ভরেনি ছবিটা দেখে  – অথচ কেন যে ছবিটা ভালো হয়নি সেটা ধরতে পারছ না। তোমার মনে হয়েছে এটা আলোর সমস্যা!
আমি চেষ্টা করছি তোমাকে ধরিয়ে দিতে – কেন এই ছবিটা একটা দারুণ ছবি হতে গিয়েও হল নাস্নিপিং নিয়ে তো বলবই কিন্তু অন্য খামতিগুলোও বলি। প্রথম ত্রুটি – হ্যাঁ, তুমি ঠিকই আন্দাজ করেছ! আলোই হল প্রধান কালপ্রিট, কিন্তু সে একা নয়! এছাড়াও আছে কালপ্রিটের অন্য বদমাইশ সহযোগীরা! প্রধান সহযোগী হল ক্লাটার - ওই যে দেখ ডানদিকের কোণে কালো একটা বাক্স-মতো, আর বাঁদিকে খুরপি... ! ক্লাটার বাদেও আছে স্নিপিং, আছে ফোকাসিং সমস্যা আর “ক্যামেরা শেক” (এ হল আমাদের আজকের শেষ পাঠ) এছাড়াও ছবির অ্যাঙ্গেল আর পারসপেকটিভও খুব গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে একটা ছবিকে সুন্দর করার জন্যহয়তো দেখবে এই ক্লাটারকে এড়াতে গিয়ে তুমি এমন একটা অ্যাঙ্গেলে ছবিটা তুলতে বাধ্য হবে যে সেটা হয়তো ছবিটাকে একদম একটা অন্য লেভেলে নিয়ে যাবে।

আর আলো তো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেটা আগেও লিখেছি। এমন নয় যে মেঘলা দিনে সুন্দর ছবি ওঠে না, অবশ্যই ওঠে। কিন্তু আলো থাকা না থাকার প্রত্যক্ষ প্রভাব ছাড়াও পরোক্ষ প্রভাবটাও কিছু কম নয়! আলো কম থাকলে ছবি কেঁপে যাওয়ার সম্ভাবনাটা অনেক বেড়ে যায় আর তাই ছবি একটু ঝাপসাটে আসেএর পিছনে যে বৈজ্ঞানিক কারণ আছে ছোট্ট করে সেটা বলি। আলো কম থাকলে সেটার ক্ষতি পূরণ করার জন্য ক্যামেরাই বল বা মোবাইল, অটোমেটিক সেটিং-এ শাটার স্পিডটা কমিয়ে দেয়, যাতে আলো বেশি ঢোকে আর ছবিটা অন্ধকার না হয়ে যায়। কিন্তু শাটার বেশিক্ষণ খোলা থাকার জন্য এক সেকেন্ডের ওই অনেক ভাগের একভাগ সময়ের মধ্যেও ফটোগ্রাফারের হাত (বা সাবজেক্টেরও) কেঁপে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তখন ছবিটা ঝাপসা হয়ে যায়এটা খুব কমন ব্যাপারতোমার এই ছবিতে ফোকাসিং সমস্যা ছাড়াও কিছু শেক লক্ষ্য করেছি। কিন্তু ক্যামেরা শেক হল পাঠ নাম্বার তিন! তার আগে পাঠ নাম্বার দুই-য়ের পালা খতম করি।


এবার বলি স্নিপিং কারে কয়! ইনি হলেন ‘এক ধরনের ক্রপিং’ সেটা শতকরা ৯০ ভাগ সময়েই হয় অনিচ্ছাকৃত ভাবে! বাংলায় যাকে আমরা বলি “কেটে গেছে” স্নিপিং হল সেই আদি ও অকৃত্রিম “দুধ ও চোনা”-র গল্প! ক্রপিং আর স্নিপিং-এ তফাত আছে কিন্তু! দেখাচ্ছি বুঝিয়ে!
তোমারই তোলা এই ছবিটায় দেখ – লাল বৃত্তটা দিয়ে মার্ক করেছি যেখানে পাপড়িটা সেখানে কেটে গেছে  সামান্যনইলে ছবিটা বে-শ ভাল তুলেছিলে! স্নিপিং কেন মন্দ? কারণ স্নিপিং বোঝায় অমনোযোগী কম্পোজিশন! ক্রপিং হল ইচ্ছাকৃত কাটা! সেটা কক্ষনও ওইটুকু পাপড়ি কুচ করে কেটে নেবে না! বেশ খানিকটা কাটবে – ঘ্যাঁচ করে! সেটা দেখো পরের ছবিতে! অথচ যদি একচুল জায়গা থাকত পাপড়ির আশেপাশে তাহলে ছবিটা খুব সুন্দর হত  - “ফুল এবং মৌমাছি” এই সাবজেক্টের ছবি হত। স্নিপিং সম্বন্ধে একবার সচেতন হয়ে গেলে তারপর স্নিপিং দেখলে খুব অস্বস্তি হয় – যেমন আমার হচ্ছে এই ছবিটা দেখে – (আমার বুঝি শুচিবায়ু থাকতে নেই? হিহিহি), অথচ এটা এড়ানো খুবই সহজ, জাস্ট একটু খেয়াল রাখা, ব্যস।


তোমার এই ছবিটাকেই এবার ক্রপিং করে দেখানোর চেষ্টা করলাম – কম রেজোলিউশন বলে একটু ঝাপসা হল – সে যাক গে!

এ হোলো ক্রপ! নির্মমভাবে কাটা – বোঝাই যাচ্ছে ইচ্ছাকৃত –আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে বলছে – উঁহু, ফুলটা নয়, আমার সাবজেক্ট হল মৌমাছি!

উপরের ছবিতে নীল বৃত্তগুলো কেন দাগিয়েছি জিজ্ঞেস করবে নিশ্চয়ই! ওগুলো হল আরও কিছু ক্লাটার, যেটা মনে হয় তুমি অ্যাভয়েড করতেই পারতে যদি ক্যামেরাটা সামান্য ডানদিকে ঘোরাতে ছবি তোলার সময়


এবার ফিরে আসি আগের ছবিটায় – ওটাকেও গোল পাকিয়েছি স্নিপিং যেখানে যেখানে হয়েছে সেখানে! দেখ।

এবার তোমাকে একটা কাজ দিই – হোমওয়ার্ক - তুমি নিজে খুঁজে বের কর তো, কোথায় কোথায় ক্লাটার আছে এটাতে? আমি কিন্তু ইচ্ছে করেই দু-দুটো ক্লাটারের উল্লেখ করিনি আগের লিস্টে। দেখ তো আরও কিছু বের করতে পারো কিনা। ক্লাটার স্পট করতে পারাটা একটা বিশাল পদক্ষেপ ফটোগ্রাফির ব্যাপারে। ছবি তোলার সময় এই চোখটা কাজে লাগবে। তোমার ঘরবাড়ি যেমন তকতকে সুন্দর সাজানো থাকে, ছবিকেও তেমনি করে ক্লাটার-ফ্রি বানাও দেখি।


আজকের এক নম্বর পাঠ ঝালিয়ে নিই একবার - আমি জানি পরেরবার যখন তুমি ছবি তুলবে তখন এই যে সব হিজিবিজি যা যা আমি বকছি সব তোমার মাথায় ভেসে উঠবেই - যদি তুমি মনে রাখো নিচের এই ছবিটা (এটা যে কোন ছবির ব্যাপারেই প্রযোজ্য!) প্রথম প্রথম ছবি তোলার সময় ভিউফাইন্ডার দিয়ে যখন দেখা হয় (বা ডিসপ্লে-তে), সব ফটোগ্রাফাররা কেবল এক (১) লেখা অংশটার দিকেই নজর রাখে প্রধানত। কিন্তু নজর রাখতে হবে পুরো ছবিতেই শাটার টেপার আগে এক লেখা লাল গোল্লার বাইরেও চোখ তো বোলাতে হবেই, কিন্তু খেয়াল রেখো সবচেয়ে ডেঞ্জারাস হল ওই দুই নম্বর লেখা অংশটা! ওখানেই যত গড়বড় চুপিচুপি এসে ভীড় করে! ক্লাটার এসে যায়, স্নিপ হয়ে যায় (এই ছবিতেও স্নিপ আছে বইকি) ইত্যাদি... । তাই একবার আলতো করে ছবির কিনারা বরাবর দেখে নিতে ভুলো না – আর দেখো তোমার পরের লটের ছবিগুলো কত ভালো ওঠে! নিজেই তখন বুঝতে পারবে খামতিটা কোথায় হচ্ছিল, ও কেন।

আজকের মত শেষ গপ্প, বা পাঠ, বলার আগে একটু ভাল কথা বলে নিই – অনেক দোষ ধরছি অনেকক্ষণ ধরে কিনা, তাই একটু অন্য দিকটাও বলি! তোমার মধ্যে একটা দারুণ ভালো গুণ লক্ষ করলাম কিন্তু দেখলাম তুমি নিজের তোলা ছবি নিয়ে একদম সন্তুষ্ট নও এটা খুব ভালো লক্ষণ, এর মানে হল যে তুমি ভালোমন্দের তফাত বোঝ, আর তোমার মধ্যে দেখার চোখ আছে। আত্মসন্তুষ্টি কিন্তু এ ব্যাপারে বেশ বাজে জিনিস – তা হলে এগোনোর পথ বন্ধ হয়ে যায়, দেখার চোখটা মরে যায়!
আগেরবারই বলেছিলাম তোমাকে, ছবি তোলা হল সায়েন্স আর আর্ট – এই দুয়ের মিশ্রণ দেখার চোখ থাকা মানে আর্টিস্টিক অ্যাপটিটিউড আছে তার প্রমাণ! সায়েন্স শেখানো যায় অপেক্ষাকৃত সহজে –কিন্তু এই শিল্পীসুলভ চোখ থাকাটা হল ঈশ্বরের আশীর্বাদ!
যার এই চোখ নেই তাকে দেখতে শেখানো হয়তো যায়, কিছুটা, (“ডেভেলপিং দ আই” বলে একটা পেপার ছিল আমাদের কারিকুলামে), কিন্তু যে নিজে থেকেই দেখতে পায় তার এগিয়ে যাওয়া রুখবে কে?

এবার আজকের শেষ পাঠ – ক্যামেরা শেক সংক্রান্ত!
তোমার পাঠানো যে ক’টা ছবি দেখলাম তার মধ্যে একটা কমন সমস্যা লক্ষ্য করেছি আমি। দুয়েকটা বাদে বাকি ছবিগুলো দেখলাম ঠিক ঝকঝকে/শার্প নয় মানছি তুমি মোবাইলে ছবি তুলছ তাই ডিএসএলআরের শার্পনেস আশা করা যায় না, কিন্তু মোবাইলেও আজকাল মোটামুটি শার্প ছবি তোলা সম্ভব যদি তার জন্য কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চল! সেগুলো মাথায় রাখলেই দেখবে তোমার তোলা ছবি কোন লেভেল থেকে কোন লেভেলে চলে যাচ্ছে ঝাপসা ছবি ছাড়াও আরেকটা কমন সমস্যা হল ক্যামেরার অ্যাঙ্গেলে গড়বড় ফুলটুলের ব্যাপারে সেটা নিয়ে অতটা মাথা না ঘামালেও চলে কিন্তু মানুষের তো বটেই, এমনকি জন্তুজানোয়ারের ছবি তোলার সময়েও এই অ্যাঙ্গেলটা ঠিক রাখতে না পারলে কিন্তু মুশকিল! ওইরকম ছবি দেখতে কেমন যেন বিটকেল লাগে যাকে টেকনিক্যাল ভাষায় বলে পার্স্পেক্টিভ ডিসটরশন
তবে ডিসটরশন কি আর সবসময় খারাপ? যারা সেলফি ভালো তোলে তারা কিন্তু এটাকে খুব ভালো কাজে লাগাতে পারে যাতে গোলগাল মুখও পানপাতার মতো দেখায়! সেটাও তোমাকে শেখাব না হয়! অক্সফোর্ড ডিক্সনারিও যখন সেলফিকে সম্মানের সাথে ঠাঁই দিয়েছে তাদের পাতায় তুমি “ম্যা-গো” করলে হবে? আচ্ছা আচ্ছা এক্ষুনি এটা নিয়ে ঘাবড়িও না সেলফি টপিক না হয় পরের বারের জন্য তোলা রইল –এ সবের চেয়ে আগে চলো বরং একটু ঝাপসা ছবির চিকিৎসা করা যাক আজকাল সব ক্যামেরাই, মায় মোবাইলেও হাত কাঁপার থেকে রক্ষা পাবার ইন বিল্ট অ্যান্টি-শেক মেকানিজম থাকে কিন্তু তারও তো একটা সীমা আছে কিছু সাবধানতা নিজেকেও নিতে হবেই তোমায় সেটাই শেখবার
জানোই নিশ্চয়ই ছবি ঝাপসা হবার প্রধান কারণ হল ছবি তোলার সময় ক্যামেরা বা সাবজেক্ট নড়ে যাওয়া আগে যেমন ফোটোগ্রাফাররা ছবি তোলার সময় নড়বেন না, নড়বেন না বলে সবাইকে একটা স্টিফ মূর্তির মতো দাঁড় করিয়ে রাখত অতটা কড়া না হলেও চলে আজকাল... তবে হ্যাঁ সাবজেক্টের নড়াচড়া না করাই ভালো, বিশেষত আলোর হাল সুবিধের না হলে কিন্তু আসলে যার নড়াচড়া করা প্রায় বারণ সে হোল ফটোগ্রাফার নিজে এবার বলি ছবি তোলার সময় নিজের নড়াচড়া কমাবে কী করে তুমি হয়তো বলবে নড়ি না তো”! কিন্তু সামান্য নড়লেও অনেকটা এফেক্ট হয় সেটা এড়াতে প্রথমেই যেটা করতে হবে সেটা হল কনসেন্ট্রেট”! – এবং শাটার টেপার সময়টুকু একেবারে স্ট্যাচু! নিঃশ্বাসটা ধরে রাখতে হবে দম বন্ধ করে আজ্ঞে হ্যাঁ ! যতটা ভয়ঙ্কর ভাবছ ব্যাপারটা এটা ততটা নয় ঠিক দিনের আলোয় ছবি তুলতে মোটামুটি ১/২৫০ সেকেন্ড সময় লাগে রাত্রিবেলা ১/৩০শে দিব্যি আলো আলো ছবি হয়! তাহলে বুঝতেই পারছ এক সেকেন্ডের চেয়েও কত কম সময়ে ছবি ওঠে তাই ওইটুকু সময় নিঃশ্বাস ধরে রাখলে আর মন দিয়ে ছবিটা নিলে কষ্ট হবার কথা নয় মোটেই নিঃশ্বাস কীভাবে ধরে রাখবে সেটা তোমার ব্যাপার মানে, ব্রিদ আউট করে তারপর, না ব্রিদ ইন করে
দ্বিতীয় স্টেপ – (এই পড়লাম মুশকিলে সঠিক বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজে পাচ্ছি না তা যা হোক, ইংরাজীই ভরসা) – শাটার টেপার সময় মনে রাখবে স্কুইজ, নট প্রেস তফাতটা বুঝতে পারলে তো? মানে ক্যামেরার বোতামে আঙুল রেখে আস্তে করে বোতামের উপর চাপ বাড়িয়ে ছবি তুলবে শাটার প্রেস করলে একটা হালকা ঝাঁকুনি লাগে ক্যামেরায় যেটা আমরা টেরও পাই না, কিন্তু ক্যামেরা পায় মোবাইলের ক্ষেত্রে তো টাচই ভরোসা – তা চেষ্টা করবে যতটা সম্ভব হালকা হাতে সেটা করা যায়।
তৃতীয় নিয়ম মোবাইল বা ডিজিটাল ক্যামেরা সবেতেই আজকাল একটা প্রিভিউ স্ক্রিন থাকে ছবিটা তোলার সময় শাটার স্কুইজ করে ছবিটা যতক্ষণ না সেই স্ক্রীনে ভেসে উঠছে ততক্ষণ নিজের দম ছাড়বে না স্ট্যাচু ভাঙবে না! আবার বলি ভয় পেয়ো না এইসব ব্যাপারই মিটে যাবে জ্যাদা সে জ্যাদা এক সেকেন্ডের মধ্যে! ওটুকুও যদি দম রাখতে না পারো তো এক্ষুনি প্রাণায়াম শুরু করো শীগগির হি হি হি!
চতুর্থ চালাকি সব সময় ক্যামেরা বা মোবাইল যাতেই ছবি তোলা হোক সেটা দু’হাতে ধরবে একদম একহাতে ধরার চেষ্টাই করবে না আর সেই হাতগুলো যতটা সম্ভব শরীরের কাছাকাছি শরীরের সাথে ঠেসে রাখবে পারলে কনুইদুটো শরীরের দু’পাশে চেপে দেখবে কতটা এক্সট্রা সাপোর্ট পাওয়া যায় ক্যামেরা যত ভারী হবে তত এর কার্যকারিতাটা টের পাবে কিন্তু কার্যকারিতা সব ক্যামেরার জন্যই সত্যি এই এক্সট্রা সাপোর্টের আরও অনেক উপায় আছে বলছি যেমন যেমন দরকার প্রয়োগ কোরো
একঃ আশেপাশে কোনও দেয়াল বা শক্ত সাপোর্ট থাকলে তাতে হেলান দিয়ে দাঁড়ালে সুবিধে! এছাড়াও সবসময় সাপোর্ট খুঁজবে চারদিকে বেঁটে পাঁচিল, খাবার টেবিল, সিঁড়ির হাতল মানে যা পাবে তার উপর ক্যামেরা বা মোবাইলকে বসিয়ে নেবে এভাবে ছবি তুললে ক্যামেরা শেক সংক্রান্ত ঝামেলা অনেকটা কমে ওজনটা সাপোর্টের উপর চলে যায় ক্যামেরার ডিগ্রি অফ ফ্রিডমের বেশ কয়েকটার ভুষ্টিনাশ করা যায় আর কি! এছাড়া ট্রাইপড মোনোপড, গোরিলাপড, বিনব্যাগ ইত্যাদি নানান ব্যবস্থা আছে সেটা আমি তোমাকে বড়ো ক্যামেরা নিয়ে যখন ছবি তুলবে তখন বলব!


নাকি এখনই একটু বলে রাখি? তাহলে পরে খুঁজে পেতে সুবিধা হবে কিছুটা হয়তো ধোঁয়াটে ঠেকবে তোমার তাও শুনে রাখো
আজকাল প্রায় সব ভালো ক্যামেরাতেই অ্যান্টিশেক ফিচার আছে! ছবি তোলার সময় সেটা অন রাখতে হয় কিন্তু যখন ট্রাইপড ব্যবহার করা হয় তখন কিন্তু সেটা অফ করে দিতে হয়, নইলে ক্যামেরা যখন ট্রাইপডের উপর বসে থাকে তখন ওই অ্যান্টিশেক ফিচারটা একটা ভাইব্রেশন তৈরি করেএটা খুব জরুরি ব্যাপার কিন্তু।
তবে শুধু অ্যান্টিশেক ফিচারের উপর ভরসা করলে কি চলবে? না! শেক কমানোর জন্য ছবি তোলার সময় শাটার স্পিডটা বাড়িয়ে রাখতে হয় আর সেটা কম্পেনসেট করার জন্য আইএসও এবং অ্যাপারচার বাড়িয়ে এক্সপোজার অ্যাডজাস্ট করা হয়! আর ডিএসেলয়ার ছাড়াও আজকাল অটো ক্যামেরাতেও দেখবে নানা রকম চিহ্ন থাকে, দৌড়বাজ, ফুল ইত্যাদি এদের মধ্যে দৌড়বাজ আইকনটিকে বলে স্পোর্টস মোড এতে রেখে ছবি তুললে ছবি কাঁপার সম্ভাবনা কম! যদিও স্ট্যাচু হওয়া প্র্যাকটিশ করো, দেখবে আর কিছুরই কোনও দরকার পড়বে না অতটা!
এইসব সামান্য কিছু ব্যাপার একটু মেনে চলো, দেখবে একটু সামান্য খেয়াল রাখলেই তোমার ছবির মান একলাফে পৌঁছে যাবে অনেকখানি উপরে আমি বসে রইলাম সেইসব ছবির জন্য!
_____

বিজ্ঞান:: এক্কেবারে ছবির মতো - তনুশ্রী চক্রবর্তী

বিষয় - ফটোগ্রাফি

এক্কেবারে ছবির মতো
তনুশ্রী চক্রবর্তী

এক
পিসীমার মন ভাল নেই! থুড়ি, শরীর ভালো নেই! ছেলে বৌমা নাতিনাতনিরা অস্থির হয়ে যাচ্ছে চিন্তায়।

পিসীমার খানিক বয়স হয়েছে বটে - যদিও ভজনপূজন-সর্বস্ব জীবন কাটানোর অবস্থা আসেনি এখন, এদিকে নাতি নাতনিরাও বড় হয়ে গেছে – তারাও আর সবসময় কাছাকাছি ঘুরঘুর করার বয়সে নেই আর ঠিক! হঠাৎ করেই এহেন কর্মহীন, অনায়াস-হয়ে-পড়া জীবনটা চির-চটপটে, পড়ুয়া, কেজো পিসিমার পক্ষে ঠিক পোষাচ্ছে না। জানা গেছে সবচেয়ে ছোট নাতিটিও ক্লাস নাইনে উঠে প্রাইভেট টিউশন যেতে শুরু করার পরই শুরু হয়েছে এই অসুস্থতা’। কেউ এ ব্যাপারে কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না কারণ পিসিমার মতে তিনি ঘোর অসুস্থ। তাঁর সবসময়ই জ্বরজ্বর ভাব, পেটে ব্যথাব্যথা করে, শীতশীত লাগে ডাক্তাররা নাকি কোন অসুখই ধরতেই পারছে না!
কলকাতা এসে শুনলাম এই সব গল্প। পিসিমাকে আমি বড়ই ভালোবাসি উনি অসাধারণ মানুষ, খুব ভালো লাগে সময় কাটাতে ওনার সাথে। আমার প্রবাসী জীবনে দেশে আসা ছুটির দিনগুলো খুব টিপে টিপে খরচ করতে হয় - সময় সামান্য আর মানসিক তাগিদা একরাশ তাই কোন একটা জায়গায় খুব বেশি সময় কাটানোর জো নেই। তাও স্থির থাকতে পারলাম না!
এক দুপুরে উপস্থিত হলাম পিসিমা-সকাশে!

খাওয়া দাওয়া পর সেই পুরনো দিনের উঁচু সিলিং লাল মেঝে ঠান্ডা ঠান্ডা ফুলবাতাসা মার্কা গন্ধওয়ালা ঘরে উঁচু খাটে বালিশ মাথায় বেশ ঘুমঘুম আসছিলপিসিমা পাশে বসে সকালের আনন্দবাজারটা তন্নতন্ন করে পড়ার ফাঁকে ফাঁকেই তখন দুঃখ প্রকাশ করে চলেছেন যে তার ভঙ্গুর অসুস্থ শরীরের জন্য কিভাবে তিনি আমার যথেষ্ট যত্ন নিতে পারছেন না।
এই সব সেন্সিটিভ সময়ে ঘুমিয়ে পড়াটা খুব পাশবিক ঠেকবে তাই আধো ঘুমের মধ্যেই বললাম, পিসীমা, আমি কিন্তু ধরতে পেরেছি তোমার অসুখ!
পিসিমা তখন খবর শেষ করে তান্ত্রিক’ ‘বশীকরণ সম্রাট’, ‘বন্ধু চাই এইসব পাতায় চোখ বুলিয়ে মাগোমা করে শিউরে উঠতে শুরু করেছেন কি করেননি – আমার কথা শুনে একটু চমকালেন!
- কি অসুখ রে?’
বললাম - রাজার অসুখ

পিসিমার মুখের যা হাল হল দেখে বুঝলাম কিছু একটা কেলো করেছি বোধহয় একটু খুলে বলা দরকার! কিন্তু বিশদে বলতে শুরু করার আগেই পিসীমা আঁতকে উঠে বললেন, রাজার অসুখ? রাজরোগ? সে কি রে? সে তো ভয়ঙ্কর ব্যাপার!
এবার উঠে বসতেই হ’ল, উফ পিসীমা! আরে, রাজরোগ নয়, কী মুশকিল! তুমি তো এত্ত বই পড় রাতদিন...” (…“কই আর পড়ি, কিছুই আর আজকাল ভালো লাগে না…” থামিয়ে দিয়ে কন্টিনিউ করলাম) রাজার অসুখ গল্পটা পড়োনি? সেই যে সুকুমার রায়ের লেখা সেই যে এক রাজার ভারি অসুখ। ডাক্তার ফাক্তার আসে আর যায় কিন্তু অসুখটা সারাতে পারে না। সারাবে কী করে? অসুখ তো আর সত্যিকারের নয়। রাজামশাই কেবলই বলেন, 'ভারি অসুখ', কিন্তু কোথায় যে অসুখ তা আর কেউ খুঁজে পায় না
পিসিমার মুখটা একটু অভিমানী দেখাল হ্যাঁ পড়েছি!” তারপর একটু থেমে বললেন, “তুইও এরকম বলছিস?”
আমি বললাম, “শোনো পিসীমা, একটা কমন থিওরী আছে, জানো তো? জোড়া-জোড়া অসুস্থতা, যেমন গা হাত পা ব্যথাব্যথা, জ্বরজ্বর, শীতশীত... ইত্যাদির মানে হল তোমার শরীর একদম পারফেক্ট আছে, কিন্তু তোমার মনটা ঠিক ভাল নেই! বুঝলে? আর মন ভালো করার সবচেয়ে বড় ওষুধ কী বল তো? একটা জম্পেশ হবি! নতুন কিছু একটা শুরু কর করতে, বুঝলে?
কী করব বল যা ছিল সবই তো গেছে, আগুনের কাছে যাই না আর রান্নাবান্না বন্ধক্রস ওয়ার্ড করতে পারি না আর, কিছুই মনে থাকে না ছাই, পড়তেও যেন আর ভাল লাগে না নতুন বই যোগাড় করাও ঝামেলা... ওই স্মার্টফোন একটা ধরালি লাস্টবার এসে, সেও তো টাইপ করতেই দিন কাবার...”
আমিও বেশ দমেই যাচ্ছিলাম, হঠাৎ স্মার্টফোন শুনেই আমার মাথার টঙে একটা লাইট বাল্ব জ্বলে উঠল “ইউরেকা!!! তুমি ফোটোগ্রাফি শুরু কর না পিসিমা আমি শেখাবো তোমাকে!
ওরে বাবা! সে তো ভয়ানক ব্যাপার! ও সব আমি পারব না। তোর পিসেমশাইয়ের ওই গাব্দা ক্যামেরা তো আলমারিতেই তোলা থাকে! আমাকে দিত এক দুবার তুলতে, তারপর সেই ছবি দেখে চটে যেত – খালি নাকি আকাশ আসতো আর একটুখানি মুন্ডু – কী রাগ অনেক শিখিয়েও আমি পারিনি!  ...... ও আমি পারব না!!!”
“ও সব ক্যামেরা লাগবে না! ও ছাড়াই হবে। তুমি তো স্মার্টফোনেই ফটো তুলতে পারো তাতেই হবে!
স্মার্টফোনে, য্যাঃ ওসব তো হাবিজাবি!
শোনো পিসিমা হাবিজাবি করে তুললেই হাবিজাবি সুন্দর করে তুললেই সুন্দর! আর, সুন্দর ছবি তোলার জন্য একটা দারুণ ক্যামেরা চাই কে বলেছে? তোমার হাতে যা আছে তাতেই তুমি অনেক ভালো ছবি তুলতে পারবে! জানো এক বিখ্যাত ফটোগ্রাফার চেজ জার্ভিস একটা আস্ত বইই লিখে গেছেন এর উপরে, the best camera is the one that's with you.”
পিসীমা একটু একটু সোজা হয়ে বসছে দেখে খুশী হলাম!
“শোন পিসীমা, আমি খুব কম জানি আর কম জানি বলেই তোমাকে শেখাতে আমার সুবিধা। খানিক পড়াশোনা করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার কোনকালে... তাই এ বি সি ডি যা শিখেছি তাই তোমাকে শেখাবোতুমি কিন্তু আমার তুলনায় অনেক বড় বড় এক্সপার্ট অনেক পাবে আশেপাশেই কিন্তু তারা তোমাকে সহজ করে মোটেই শেখাবে না (তাহলে তারা যে এক্সপার্ট সেটা সবাই বুঝবে কী করে শুনি?J)! আর আমি যেমনি করে শিখেছি তোমাকেও তেমনি করেই শেখাবো - অনলাইন ডিসট্যান্ট লার্নিং, কেমন? একবার চেষ্টা করে দেখই না পারো কি না! কে জানে হয়ত তোমার পড়াশোনার ইচ্ছাটাও খানিক বাড়বে! আর তারপর তুমি নিজে নিজে শিখে নিয়ে নীলকেও শেখাবে এবার, ওর সামারের ছুটিতে ওরও তো স্মার্টফোন আছে! নীল হয়ত তখন কম্প্যুটার গেমস আর খেলবে না দুপুরগুলোয় তোমার সাথে বাড়ির মধ্যেই ফটোগ্রাফির টপিক খুঁজে বেড়াবে!
পিসিমার মুখে আলো দেখলাম – স্পষ্ট আমি আবার বালিশে মাথা দিয়ে চোখ বন্ধ করলাম!
“বাকীটা চিঠিতে, কেমন?

এক নম্বর চিঠি – লেসন নাম্বার ওয়ান

পিসীমা,

প্রথমেই বলি, ফটোগ্রাফি হল সায়েন্স আর আর্ট একসাথে মিলেমিশে তৈরি এক সমসত্ত্ব মিশ্রণ। কোনটাকে ছাড়া কোনটার চলে না! তবে সুবিধা কী জানো তো, আজকাল অটোমেটেড টেকনোলজির দৌলতে ফটোগ্রাফির সায়েন্স পার্টটা এতই সহজ হয়ে গিয়েছে যে অটো-মোডে ছবিও বেশ যথেষ্টই ভালো ওঠে। সেটা অনেককে সুযোগ করে দিয়েছে, ফটো তোলার শখটা সহজে মেটানোর ব্যবস্থা করে! আমার পরিচিত অনেকেও দেখেছি ডিএসএলআর (ওই যেটাকে তুমি গাব্দা ক্যামেরা বল) ক্যামেরায় ছবি তোলেন, অথচ কোন টেকনিক্যাল ব্যাপারে যানই না; স্রেফ অটো বা প্রোগ্রাম মোড (ওই অটোরই নামান্তর)-এই থাকেন, এবং বিশ্বাস কর, খুবই ভালো ছবিও তোলেন! তার কারণটা কী বল তো? ওনারা আর্টের দিকটা বোঝেন ভালো, আর ফটোগ্রাফি তো শেষ অবধি একটা আর্টই। তুমি সাহিত্যের মানুষ। তোমাকে তাই টেকনিক্যাল কচকচি শেখাব না একদম –অন্তত শুরুতে। আমার এই লেসন নাম্বার ওয়ান হবে একদম যাকে বলে প্রাইভেট বাসের রিজার্ভড সিট শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য শুধু! এফ-স্টপ, শাটার স্পিড, আই এস ও এসবের নামই নেব না। এক্সপোজার ট্র্যাঙ্গেল রাম রাম - খায় না মাথায় দেয়! ওদিকে যাবই না। শুধু আর্ট ব্যাপারটা নিয়েই বলব আর খুব সামান্য কিছু বেসিক কথা না জানালে পাপ হবে, সেগুলো তো বলতেই হবে! ব্যাস! হয়ে গেল! তারপর কিন্তু তোমাকে জানাতে হবে তুমি কী চাও, মনে যা যা প্রশ্ন আসে সে সব – তার উপর ভিত্তি করে পরের লেসনগুলো পাঠাব।

শুরুতে জানাই - ফোটোগ্রাফী মানে হল ‘আলো দিয়ে ছবি আঁকা’; গ্রীক শব্দ photos মানে আলো আর graphé মানে "representation by means of lines" যার সোজা অর্থ ড্রয়িং! “আলো” আর “ছবি আঁকা” কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ফোটোগ্রাফির নির্যাস - তাই আলো ব্যাপারটার মাহাত্ম্যটা তোমাকে মাথায় রাখতেই হবে; আর ছবি আঁকা কথাটারও, তাহলেই তুমি সিঁড়ির প্রথম ধাপটা উঠে পড়বে চট করে!

ফটোগ্রাফিতে আলোর গুরুত্ব অসীম। ভেবে দেখো, দিনের আলোয় ছবি তুললে সে ছবি যত স্পষ্ট হয়, মেঘলা হলে বা সন্ধ্যেবেলা তেমন হয় না, তাই না? গ্রেন চলে আসে... বালি বালি একটা ভাব (গ্রেইনস)। আবার কিছু কিছু ছবি যেন কম আলো ছাড়া মানায়ই না...  যেমন ধরো মোমের আলোয় ছবি, অন্ধকার ঘরের ভিতরের ছবি, কুয়াশার ছবি, অথবা ছায়ায় ছবি! কারণ আলো তো শুধু স্পষ্ট ছবি তোলার জন্যই জরুরী তা নয়, আলো নির্ধারণ করে দেয় একটা ছবির মুড, তার টোন, পরিবেশ, সৌন্দর্যও শুধু তাই নয় - আলো কোন দিক থেকে আসছে তার উপরেও অনেক কিছু নির্ভর করে। এককথায় শুধু আলো নিয়েই একটা আলাদা পর্ব লিখব তোমার জন্য, আপাতত খালি কিছু ছবি দেখাই আর কিছু শব্দগুচ্ছ জানিয়ে রাখি! পরে কাজে দেবে–
এই যে – এই একজোড়া ছবি দেখো কি বলতে চাইছি আলো নিয়ে সেটা একদম স্পষ্ট, তাই না? কিছুই বলে দিতে হবে না।



আলো কোনদিক দিয়ে সাবজেক্টের উপর পড়ছে তার উপর ভিত্তি করে কিছু শব্দবন্ধ জেনে নাও – যেমন সাইড-লাইট, ব্যাকলাইট আর ফ্রন্টলাইট এই সামান্য তফাতটাই ছবিকে অনেক অসামান্য করে তোলে –তোমার “হাবিজাবি” ছবিও হয়ে ওঠে দেখবার মতোই। একটা হাবিজাবি ছবি (যাকে টেকনিকালি বলে স্ন্যাপশট) আর ভালো ছবি (ফটোগ্রাফ)-এর মধ্যে যে জিনিষগুলো মূলতঃ তফাত এনে দেয় তা হল আলোর ব্যবহার, কম্পোজিশন/ ফ্রেমিং, একটা পরিষ্কার সাবজেক্ট বা গল্প, আর ঠিকঠাক ফোকাস। এ হল প্রথম ধাপের গল্প – এরপরে আরঅনেক এলিমেন্টস আছে সেটা পরে জানাচ্ছি। আগে কিছু ছবি দেখাই! আমার তোলা নয় কিন্তু – সুবিধার জন্য নেট থেকে নিয়েছি



প্রথমেই দেখাই কুয়াশায় তোলা ছবি, আলো সেভাবে নেই - এটাকে বলে ওভারকাস্ট কন্ডিশন, এখানে কিন্তু আলোর অভাবটাই ছবিটায় একটা প্রাণ এনে দিয়েছে – কারণ এই ছবির সাবজেক্ট যদিও একটা ফুল, কিন্তু গল্পটা আরেকটু বেশি – এক কুয়াশাময় ভোরে শিশির/ বৃষ্টিস্নাত ফুল... এবার তুমি এই ছবিটার সাথে তুলনা করলে বুঝবে কেন প্রথমটা হল ফটোগ্রাফ আর পাশের হলুদ ফুলের ছবিটা হল স্ন্যাপশট।
এই দুনম্বর ছবিটা মনে রেখো – বারবার ফিরে আসব এটার কথা বলতে!


ইবার দেখ অন্য ছবি! উপরে বাঁ দিকের ছবিটাকে বলে ‘শিল্যুয়েট’ আর দ্বিতীয়টা ‘ব্যাকলাইটেড’ ছবিদুক্ষেত্রেই আলো আসছে সাবজেক্টের পিছন থেকে, কিন্তু শিল্যুয়েট আর ব্যাকলাইটেড ছবির মধ্যে যে তফাত আছে সেটা বলার আগেই বুঝতে পারছো নিশ্চয়ই? শিল্যুয়েটে ছবির সাবজেক্টটা একদম ঘোর কালো থাকে, যাকে বলে ওপেক (Opaque) – আদতে দুটোই ব্যাকলাইটেড।


ব্যাকলাইটেড ছবিতে কিন্তু সাবজেক্টের ট্র্যানস্প্যারেন্সিটা খুব সুন্দর ব্যবহার করা যায় – অস্বচ্ছ আর অর্ধস্বচ্ছ এই দুই সাবজেক্ট মিলিয়ে বেশ কিছু মোহময় ছবিও তোলা যায়... যেমন এই ছবিটা দেখো – বেলুনের স্বচ্ছতা আর মানুষের ওপেসিটি মিলিয়ে কী দারু একটা ছবি! এই সব ছবি দেখাচ্ছি তোমাকে আইডিয়া পাবে বলে ভাবো একবার, এগুলো কি কোন বিরাট জটিল কোন ব্যাপার? তা তো নয় – কিন্তু তোমার মনের মাধুরী মিশিয়ে তুমি শিল্পসৃষ্টি করতে পারো এভাবেই! ভালো ছবি তোলার আইডিয়ার জন্য ভালো ভালো ছবি দেখাটা খুব জরুরি জানি জানি, কোথায় পাবে জিজ্ঞেস করছ তো? সব বলে দেব, চিন্তা করো না! আর, আজ্ঞে হ্যাঁ, মনে রেখো, এই যে সব ছবি দেখাচ্ছি এগুলো কিন্তু স-ব তোমার এই স্মার্টফোনেই তোলা যাবে!
একই ভাবে, আলোর উৎসের সাথে ছবির সাবজেক্টের অবস্থানের রকমফেরের উপর নির্ভর করে ফ্রন্টলাইট, সাইডলাইট (৪৫ডিগ্রী, ৬০ডিগ্রী, ৯০ ডিগ্রী ইত্যাদি, বা যে কোন ডিগ্রী) ইত্যাদি ধরনের ছবি তোলা হয় – দেখে নাও নীচে!



প্রথমটা ফ্রন্টলাইট দ্বিতীয়টা হল সাইডলাইট... ফুলের ছায়া আর আলোকিত অংশটা দেখলেই বুঝবে আলো কোথা দিয়ে আসছে, এক্ষেত্রে যেমন ফটোর ডানদিকে উপর থেকে ওয়ান-থার্ডে মোটামুটি। কোন আলো কখন কী জন্য ব্যবহার করা হয় সে নিয়ে পরে জানাব।
আচ্ছা, তুমি নিশ্চয়ই ভাবছ, তোমাকে কেবলই ফুলের ছবির উদাহরণ দিচ্ছি কেন? কারণ, তোমার বাগানে অজস্র ফুল, আর এই এই ছবিগুলো যাতে তুমি এক্ষুনি এক্ষুনি তোলবার চেষ্টা করতে পারো, সেইজন্য কিন্তু এই শেখার সিঁড়ির দ্বিতীয় ধাপে উঠে গেলে তখন কিন্তু আর ফুলের ছবি বা সূর্যাস্ত বা সূর্যোদয়ের ছবি ভাল লাগবে না তোমার (ভাল কথা মনে পড়েছে, সূর্যাস্ত বা সূর্যোদয়ের ছবিও তোলার চেষ্টা কোরো তো কয়েকটা, আমাকে পাঠিও হোয়াটস অ্যাপে – তারপর আমি সেই প্রসঙ্গে আলোচনায় যাব) তবে দ্বিতীয় ধাপে ওঠার অন্যতম প্রধান অংশই তো এখন বলা হলনা, ফটোগ্রাফির আর্ট বলতে যা বোঝায়,তার নাম হ’ল কম্পোজিশন আর ফ্রেমিং
এটাই হল ফটোগ্রাফির আর্ট পার্টের প্রথম ও প্রধান অধ্যায়। মানেটা বুঝতে পারছ নিশ্চয়ই – কম্পোজিশন মানে ছবির সাবজেক্টকে সাজিয়ে নেওয়া, ছবি তোলার আগে, মনে মনেকম্পোজ করা মানে সাজানো, ফ্রেমিং মানে কীভাবে সেটা করছ, কোথায় কী রাখছ। তুমি খেয়াল করেছ নিশ্চয়ই আগে ফিল্ম-ডিরেক্টরেরা কেমন দুহাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর সাহায্যে একটা চৌকো মিছিমিছি ফ্রেম বানিয়ে তার মধ্যে দিয়ে দেখতেন চারপাশ – এটাকে বলে শট কম্পোজ করা, মানে ছবির ফ্রেমের মধ্যে কী কী থাকবে আর কী কী থাকবে না – পরিচালক সেটা ক্যামেরাম্যানকে বোঝালে ক্যামেরাম্যান সেইভাবে ছবিটা নিতেন এখন টেকনোলজির কল্যাণে সেই বোঝানোর ব্যাপারটা সহজ হয়ে গেছে, কিন্তু কম্পোজিশনের মূল্য ও গুরুত্ব এতটুকু কমেনি – কারণ তার উপর নির্ভর করেই তো ছবি ভালো বা খারাপ সেটা স্থির হয়! স্টিল ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে ক্যামেরার ভিউ-ফাইন্ডারের মধ্যে দিয়েই (বা, মোবাইলে তুললে তার স্ক্রীনে) কী ছবি তুলতে চলেছি তা দেখা যায় – তাই তুমি ছবির একটা প্রিভিউ সেখানেই পেয়ে যাবে।
কিন্তু নিশ্চয়ই ভাবছো তখন থেকে কম্পোজিশন কম্পোজিশন করছি কেন তবে শোনো! এই কম্পোজিশনের কিছু নিয়ম আছে – কিন্তু ‘নিয়ম’ শব্দটা শুনেই ঘাবড়ে যেও না, নিয়ম ভাঙা যাবে না কেউ বলেনি! নিয়ম মানা হয় একটাই কারণে যাতে তাকে আবার ভাঙাও চলে, কিন্তু সুন্দর করে – তোমার প্রিয় কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কথায় বলতে হয় ভাঙারও নিজস্ব এক ছন্দ আছে, রীতি প্রথা আছেআরবলেছেন... অপরূপ ভাবে ভাঙা, গড়ার চেয়েও মূল্যবান/ কখনোসখনোতাই নিয়মগুলো জেনে তারপর ভাঙাই ভালো, তাই না? হিজিবিজি ভাঙলেই সেটা হয়ে যাবে স্ন্যাপশট!
রুলস বলার আগে – দুটো ছবি দেখাই, একই ধরণের ছবি – কিন্তু একটু অন্যরকমদেখ তো কোন ছবিটা বেশী ভাল লাগছে? একই ছবি প্রায় – কিন্তু দ্বিতীয়টা একটু যেন দু-সেকেন্ড বেশী আটকে রাখে চোখকে, তাই না! একই সাবজেক্ট শুধু সাজানোর বা সাবজেক্ট প্লেসমেন্টের উপর নির্ভর করে কতটা বেশী নয়নমনোহর হয়ে উঠতে পারে সেটাই জানায় এই প্রথম রুল, যেটা আবার কী করে ভাঙাও যায় সেটাও পরে বলব আবার – বেশ মজা লাগতে শুরু করেছে আমার অলরেডি।



কম্পোজিশনের অন্যতম প্রধান নিয়ম – রুল অফ থার্ড! ধরে নাও মোবাইলের স্ক্রীনে, বা ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে যেখানে ছবিটা ফুটে উঠেছে সেটাকে তুমি এই নীচের ছবির মতো দুটো সোজা আর দুটো আড়াআড়ি লাইন টেনে ভেঙে ফেললে (মনে মনে)! এবার এই লাইনগুলো যেখানে একে অপরকে কাটাকাটি করেছে তেমন চারটে বিন্দু তুমি পাবে! এবার করবে কী তোমার ছবির যা সাবজেক্ট তাকে এই চারটে বিন্দুর যে কোনএকটা বিন্দুতে রাখবে, বা সামান্য আশেপাশে! তারপর ক্লিক করবে। ব্যাস –




এই রুলটি একদম ইউনিভার্সাল – কিছু ছবি দেখাই কী ভাবে এর প্রয়োগ হয়!


এই রুলটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য দিগন্তরেখা বা হরাইজনের ছবি তোলার সময়। একটু ডিটেলে বলি!
নতুন যারা ছবি তোলে তাদের মধ্যে একটা খুব সাধারণ ভুল হয়ে যায় - প্রায়ই তারা হরাইজনকে ছবির একদম মাঝামাঝি রাখে, অথবা বেশ অনেক সময়েই সেটা হয়ে যায় বাঁকা! অথচ হরাইজনকে কোথায় রাখবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া কষ্টকর নয় মোটেই আকাশ আর ডাঙা/ জলের মধ্যে যেটা বেশী জমকালো, সে প্রাধান্য পাবে! মানে ছবির ২/৩ ভাগ জুড়ে সে থাকবে! আর যদি দুটোই দুর্দান্ত হয় – তখন আসবে রুল ভাঙার পালা – কিন্তু তার আগে মোটেই নয় –
পরের ছবিটা দেখো – এখানে যদিও আকাশ আর সমুদ্র দুটোই বেশ বোরিং, এবং আলোর হালও বেশ খারাপ, হরাইজনটাও বাঁকা, তাও, যদি এসব না-ও হত, আকাশকে ১/৩ আর সমুদ্রকে ২/৩ দেখানো উচিত ছিল – অর্থাৎ হরাইজনকে লাইন নাম্বার ১ -তে রাখা উচিত ছিল! মানে কিছুটা এইরকম...  (আসল ছবিটা কেটেকুটে বানালাম ফটোর মালিক এসে আমাকে না ধরে এবারJ!)

আসল ছবি
সোজা করার পরে – হরাইজন লাইন তে
কেটেকুটে হরাইজনকে লাইন ১-এ এনে ফেলেছি

এই ছবিটায় পাথরটাকে সাবজেক্ট ভেবে নিলে সেটা ভার্টিকালি ১/৩ আশেপাশে রয়েছে। কিন্তু এটা ভালো ছবি মোটেই না, ছিঃ – বোরিং! ভাল ছবি দেখো এবার। প্রথম ছবিতে আকাশ সাদামাটা তাই হরাইজন লাইন ১এ, দ্বিতীয়তে আকাশ জমজমাট, তাই লাইন ২ – বোঝা গেল?


প্লিজ এক্ষুনি আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবতে বোসো না যে তোমাকে বেড়াতে যেতেই হবে ভালো ছবি তোলার জন্য!!! কে বলেছে! দেখো তো এই পরের ছবিগুলো চেনা চেনা লাগে নাকি!
আসল কথা কী বলো তো – সবকিছুর মধ্যেই সৌন্দর্য আছে আর ফোটোগ্রাফি আমাদের সাহায্য করে সেই সুন্দরটা খুঁজে বার করার চেষ্টা করতে –কী ভীষন পজিটিভ ব্যাপারটা, না? আমরা যদি সবকিছুর মধ্যেই এভাবে সুন্দর খুঁজে বেড়াতে পারতাম, খুঁত না খুঁজে!


আর এই হল কিছু রুলভাঙা ছবি শক্তি কি আর সাধে বলেছেন সুন্দরভাবে ভাঙা গড়ার চেয়েও মূল্যবান!


এর বাইরেও, কম্পোজিশনের কিছু পরীক্ষিত এবং সহজ টেকনিক আছে, যেটা ছবির দর্শকের মনোযোগ আটকে রাখে ছবির উপরে। এদের বলে কম্পোজিশনের এম্‌ফ্যাসিস টেকনিক আগে সহজ এবিসিডি-গুলো একটু সড়গড় করে নাও তারপর বলব এর উপরে!
কম্পোজিশনের পরের রুলে যাবার আগে একটু বলে নিই – স্ন্যাপশট হইতে ফটোগ্রাফে উত্তরণ – এই হচ্ছে আমাদের (তোমার আমার আর নীলের) চলার পথ! কাজেই এই দুই ধরনের ছবির মধ্যে তফাত কী, সেটা একটু জেনে নিলে সুবিধা হবে!
ফটোগ্রাফে থাকতেই হবে একটা সুস্পষ্ট সাবজেক্ট অফ ইন্টারেস্ট, যদি সেটা অ্যাবস্ট্র্যাক্ট হয়, তাও! ঠিকঠাক আলো থাকতে হবে, জঞ্জালহীন (ক্লাটার-ফ্রি) ফ্রেম চাই, আর চাই খালি স্পেস-এর ঠিকঠাক উপযোগ (এই রে –এই ‘নেগেটিভ স্পেস’ আরেক বড় টপিক – অবশ্যই জানাব বিশদে, কিন্তু পরে) ইত্যাদি তাই দ্বিতীয় রুল (আবার বলি) “ছবির সাবজেক্ট হতে হবে পরিষ্কার, বোধগম্য, ওয়েল-ডিফাইন্ড” আমরা শিখেছিলাম – “আ পিকচার সেইজ আ থাউজ্যান্ড ওয়ার্ডস” এবং, লেজুড় হিসেবে মাস্টারমশাই বলেছিলেন “অ্যান্ড ইওর ক্যাপশন শুড সে নাথিং, ইফ পসিবল” অর্থাৎ ছবিই কথা বলবে, তুমি নয়, বা তোমার ক্যাপশন নয়! তোমার ছবি দেখে যেন কারো মনে প্রশ্ন না আসে, এটা কীসের ছবি! অবাক হয়ো না, এরকম ছবি প্রায়ই দেখি আমরা! একটা উদাহরণ দিই! একটু বড় করে দেখাচ্ছি ছবিটা।


অথচ এই ছবিটার মধ্যে অশেষ সম্ভাবনা ছিল। লক্ষ্য করে দেখ – একটা সুন্দর লালমাটির রাস্তা, পাশে নীল জলের ভেড়ি, একজন গেরুয়াধারী এবং তার পিছনে ইলেক্ট্রিকের পোলের নবীন-প্রবীণ বৈপরীত্য, একটা গ্রামীণ চায়ের দোকানের মানুষের আড্ডা! প্রতিটিই সুন্দর মুহূর্ত, ছবি তোলার মতই - কিন্তু আবেগে ভেসে গেলে চলবে না! এ তো ফটোগ্রাফারের পরম সৌভাগ্য, একই জায়গায় দাঁড়িয়ে খানিক এদিক ওদিক হাঁটলেই এই প্রতিটি সাবজেক্টকে আলাদা করে ধরতে পারতেন তিনি – কিন্তু এখন এই মুহূর্তে এই ছবিটি একটি ফোটোগ্রাফ হয়নি, এটাকে বলা হবে স্ন্যাপশট! ঠিক তেমনি – হলুদ ফুলের দু-নম্বর ছবিটা মনে করো। ওখানে তো এত কিছু ছিলনা – কিন্তু তাও কেন ছবিটা পচা? কারণ ওটা ক্লাটারড! ওই ছবিটাকে মানুষ করতে গেলে কী করতে হত – সেটা তোমাকে জানাবো কিন্তু এই চিঠিতে না।

কম্পোজিশনের তৃতীয় আর এই চিঠির শেষ টপিক – (বিশ্বাস করো এই তো সবে শুরু)... ফ্রেমিং! নাহ ... এটুকুতেই ক্ষান্ত দিই এই বারের মত ......আবার পরের চিঠিতে...
একটু প্রোমো দিয়ে দিই – তলার ছবিগুলো দেখ! মাঝখানের ছবিটা আমার মাস্টামশাইয়ের আঁকা – হাহাহা – শেয়ার না করে পারলাম না! ছবিটা দেখে নাও – পরের চিঠিতে এর উপর আলোচনা করব! প্রথম ছবিটা ভীষণ চেনা চেনা নয়? দুটোই কিন্তু একই ছেলের ছবি – প্রথমটাতে ক্যামেরার চোখ একটু উর্দ্ধমুখী তাই বেচারী ছেলেটির পায়ের পাতাগুলো বাদ পড়েছে! পরের ছবিটা হল শুধরে নেওয়ার পরে! আমি তোমার সঙ্গে বাজি ধরছি তুমি এই ধরনের ভুল প্রচুর পাবে আমাদের তোলা ছবিতে।
এটা শুধু একটু ছুঁয়ে গেলাম – পিকচার আভি বহো বাকি হ্যায় মেরে পিসিমা!!! J


আরেকটা জরুরি কথা বলে নিই। ছবি তোলার ব্যাপারে খুব কাজে দেয় ছবি দেখা। ভালো ভালো অনেক অনেক ছবি দেখো, ভাল ফোটোগ্রাফারের কাজ দেখ, আর পারলে টুকটাক পড়াশোনা কোরো, কিন্তু এক্ষুনি নয় আমার চিঠির বহর শেষ হোক, তারপর। এই স্মার্টফোনই সব জোগান দেবে তোমাকে। এন্তার গুগল করবে আর ছবি দেখবে বা পড়বে তখন! আর হ্যাঁ, তোমার জন্য হোমওয়ার্ক তো অবশ্যই থাকবে পরের চিঠি পাবার আগে। চটপট কিছু ফুলের ছবি (আর সূর্যাস্ত সূর্যোদয়ের ছবিও) তুলে আমাকে পাঠাও দিকি!! মনে রেখো কী কী শিখলে এইবার - ওয়ান-থার্ড রুল, পরিষ্কার সাবজেক্ট আর ব্যাক/ সাইড লাইটিং! নাও এবার লেগে পড়ো কাজে!
প্রণাম নিও।
ইতি, তনুশ্রী
(চলবে)

________