Showing posts with label পূর্বা মুখোপাধ্যায়. Show all posts
Showing posts with label পূর্বা মুখোপাধ্যায়. Show all posts

গল্প:: হিটলারের হুইস্পার - পূর্বা মুখোপাধ্যায়


হিটলারের হুইস্পার
পূর্বা মুখোপাধ্যায়

(১)

আমার ছেলে হারিয়ে গেছে। কেউ তাকে দেখে থাকলে যোগাযোগ করুন।
নাম - হিটলার
স্বভাব - গম্ভীর
বয়স - ৭ বছর
ধবধবে সাদা
নাকের নীচে স্পষ্ট কালো গোঁফ
দিশি বেড়াল হলেও পার্শিয়ানের মতো লোম ও মোটা ল্যাজ

চোখের জলে ভাসতে ভাসতে রুচিরা মাসি ড্রাফট টাইপ করছিলেন। ছাপা হয়ে কিছু পোস্টার হবে। পাড়ায় পাড়ায় আটকে দেবে পার্টির রন্টু। আর বাকিটা খবরের কাগজের সঙ্গে যাবে, লিফলেটমাখন কাগজওয়ালার দায়িত্ব সেটা।
গত পরশু থেকে হিটলার লিখোঁজ। রুচিরা মাসির আদরের বেড়াল। বাড়িতে শোকের ছায়া। রান্নাবান্না বন্ধ। মেয়ে দীপাবলি কোনো রকমে ভাত আলুসেদ্ধ, ম্যাগি-ট্যাগি দিয়ে চালাচ্ছে। রুচিরা মাসি তো কিছু মুখেই তুলছে না। বাড়ি বাড়ি ফোন আর হোয়াটস্যাপ তুমুল অ্যাকটিভ। হ্যাঁ রে, খোঁজ পাওয়া গেল? কী রে, ফিরল? বেড়াল তো ঠিক চিনে ফিরে আসবে, দেখিসএসব উদ্বিগ্ন জিজ্ঞাসা ছাড়াও আছে আড়ালের বার্তা - বাড়াবাড়ি, ন্যাকামো, ঢং ইত্যাদি বিশেষণ।
মিচকে মহিলা সম্প্রদায়ের প্রেসিডেন্ট মোনালিসা মাইতি সকাল এগারোটায় বাড়ির সক্কলে আপিসে কলেজে রওনা হবার পরে চিকেনের ঝোল আর আলু পোস্ত নামিয়ে শোকপ্রকাশক একটা ম্যাটাম্যাটা কালারের সালোয়ার চাপিয়ে এসে মেসেজগুলো মৌখিক ডেলিভার করে দিল। আগে হলে রুচিরা মাসি তেড়ে গিয়ে কমন হোয়াটস্যাপ গ্রুপে নাম না করে অগ্নিবর্ষী বাক্যবাণে সব ক’টাকে দিতেন এক্কেবারে শেষ করে। কিন্তু মাসি সত্যিই ভেঙে পড়েছেন; দু-কাপ চা (ওই চায়ের ওপরেই বেঁচে আছেন) টেবিলে নামিয়ে সোফায় এলিয়ে পড়লেন। বললেন, “মোনু, এদের তো যায়নি, যার যায় সেই বোঝে। এরা কী বুঝবে রে ভালোবাসার! বিষ্টিতে রাস্তার কুকুর বেড়াল ফ্ল্যাটের সিঁড়িতে এসে শুলে তাড়িয়ে দেয়! এরা মানুষ!”
মাছ পিন্টু খোঁজ নিতে ফোন করে দুপুরবেলা, বাজার শেষে - দিদি, মাছ লাগবে না?” খোঁজ নেয় নিজের স্বার্থেই। বুকটা ফেটে যায় মাসির। অনেক প্যাখনা ছিল ছেলের; হিটলারী। পাঁচ-ছইঞ্চি মাপের পোনা হতে হবে। অন্য কিছুই চলবে না। একবার বাটা দিয়েছিল। এক কেজি মাছ কাজের মেয়ে সুখীকে দিয়ে দিতে হল ধরে। শুঁকেই মুখ ঘুরিয়ে, হাত ঝেড়ে গিয়ে পাঁউরুটি হয়ে বসে রইল পেটে কিল মেরে। একদিন অন্তর অন্তর দু-কেজি মাছ আসত। রাত্তির বেলা ফোন হত – ‘পিন্টু, কাল মাছ দিস।’ পিন্টু বলত, ‘হ্যাঁ দিদি।’ সন্ধেয় পেমেন্ট চলে যেত গুগল পে-তে। ওরও লস বই-কি! ফ্রীজারটা খুলে দেখে রুচিরা মাসি, দিনের হিসেবে মাছ কাটা, কৌটো ভরে রাখা এখনওমাথা, পাখনা, পেটের পটকা সব ফেলে কেটে রাখা নিজের হাতে। নইলে ছেলে মুখেই তুলত না যে।

(২)

দিন সাতেক হয়ে গেল। সব পোস্টার সাঁটা হয়ে গেছে। লিফলেট বিলিও। তাও খোঁজ নেই। সন্ধেবেলায় বেল।
আন্টি, আমি অরিত্র। হিটলারের জন্য আমি, মানে আমরা সবাই খুব ফিল করি। কিছু কথা ছিল এ ব্যাপারে…”
অরিত্র ঘরে এসে গুছিয়ে বসে জানায়, যে তার এক পরিচিতের একজন পরিচিত অ্যানিমাল হুইস্পারার আছে।
“সেটা আবার কী?
“আন্টি, এরা অবলা পশুদের সঙ্গে কম্যুনিকেট করতে পারে। সাধারণত ওদের শরীর খারাপ-টারাপ হলে অনেক সময় এদের সাহায্য নেওয়া হয়। ওরা তো ঠিক বলতে পারে না কী অসুবিধে হচ্ছে! এরা পশুদের ভাষা বুঝতে পারে, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ইত্যাদি।”
রুচিরা মাসি তো হাঁ। এরকমও হয়?
“হ্যাঁ, হয় আন্টি। তবে বিরল ক্ষমতাসম্পন্ন এই সারিকা মালহোত্রা। দিল্লিতে থাকেন। কিন্তু আপনি যদি হিটলারের ছবি আর ওর সব ডিটেইলস ওকে দেন, ও কানেক্ট করে নেবে, সে হিটলার যেখানেই থাক, যে অবস্থাতেইখারাপ খবর কিছু থাকলেওমানে ইয়ে
রুচিরা মাসির মাথা তখন একেবারে খারাপ। “এও হয়! আমি জানতে পারব? যত খারাপ খবরই হোক, সয়ে নেব, তাও জানব তো! সে আছে। বা নেইতোমার ভালো হোক বাবা অরিত্র, তুমি নম্বরটা দাও, আমি যোগাযোগ করব।”
অরিত্র অবাক হয়ে দেখে আশাবরী ফ্ল্যাটের ফাইভ সি-র রুচিরা সেনরায়কে। ইনিই একবার অরিত্রকে কী বকাটাই না দিয়েছিলেন রাস্তার কুকুরটাকে লাথি মারার জন্য! বলেছিলেন, ‘তুমি তো এইটুকু একটা পুঁচকে ছেলে। আমার চেহারাটা দেখেছ? আমি যদি তোমায় অমন একটা জোরসে লাথি মারি? উনি ভুলে গেছেন। অরিত্র ভোলেনি৷ নম্বর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে আসে৷
নম্বর আসে। রুচিরা মাসি হিটলারের গোটা দশেক ছবি আর পুঙ্খানুপুঙ্খ ডিটেইলস পাঠিয়ে দিয়ে অনেক দিন পর গরম ভাত, মাখন আর আলুসেদ্ধ দিয়ে মেখে দু-গরাস মুখে পুরে শুতে যান। সারিকা মালহোত্রার ফি পাঁচ হাজার টাকা, জি পে।

পাঁচ দিন পর খবর আসে -
হিটলার আছে। ভালোই আছে। জানিয়েছে সেই যে, প্রচুর কাজ আছে তার, তাই সেখানেই থাকবে। বাড়ি ফেরার ইচ্ছে নেই। তবে বাড়ির ওই মধ্যবয়সি মহিলার প্রতি তার একটাই কথা, বড্ড ডমিনেটিং, আর সবার ব্যাপারে নাক গলানো স্বভাব। নিজেকে পালটানো দরকার। সারিকার ইংরেজি মেসেজে - টেল হার টু মাইন্ড হার ওন বিজনেস।

(৩)

পুরোটা শান্তি নয়, তবে এইটুকু যে সে ভালো আছে, এটাই অনেক। অনেকদিন পরে শান্তিতে চোখ বুজেছিলেন রুচিরা মাসিউঠতে দেরিই হয়ে গিয়েছিল। এমনিতে তো এই গত সাত বছর ঠিক পাঁচটায় ম্যাঁও অ্যালার্মে উঠতে হত। তাকে খেতে দেওয়া। তারপর বারান্দার দরজা খুলে দেওয়া। ক্যাট প্রুফের জাল ঘেরা বারান্দায় বসে সে রাস্তা দেখত আর কাক চড়াইদের সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি। এ ক’দিন সব বন্ধ। তাও সেই পাঁচটাতেই ঘুম ভেঙেছে। হিটলারের খাবার পাত্রটা ফাঁকাই পড়ে। বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন রুচিরা মাসি। ক্ষণে ক্ষণে নিচে তাকিয়েছেন, পায়ের কাছে কেউ কি বসে! বন্ধু কাক চড়াইগুলোও এসে গোল বাধায় - ওদের নিত্য ঝগড়া মিস করে বোধহয়। পাখিদের দানা দিয়ে ঘরে চলে আসেন রুচিরা সেনরায়। ফাঁকা ঘরে - কেউ আর মাছ চায় না।
আজ ঘুম ভাঙল কন্যে দীপাবলির আর্ত কণ্ঠেহুড়মুড় করে উঠে এসে দেখেন বাইরের ঘরের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে দীপু বারবার ডেকে যাচ্ছে – “মা, ও মা দেখবে এসো, দেখবে এসো।”
দেখে দরজার বাইরে বসে হিটলার। বিধ্বস্ত। রোগা হাড় হয়ে গেছে। ধবধবে গায়ে কালো ছোপ। জিভ বের করা - হাঁপাচ্ছে। দরজা থেকে ঘরে ঢোকার শক্তিটুকুও নেই যেন। দৌড়ে গিয়ে কোলে তুলে নেন রুচিরা মাসি। হিটলারের মাম্মাম। যদিও হিটলার এ নামে ডাকেনি কখনও৷ কিন্তু সবাই জানে।
এরপর প্রথমে জল, তারপর মাছ সেদ্ধ। ভাগ্যিস মাছগুলো ফেলে দেননি। এরপর প্যারাভেট নির্মলকে ডেকে স্পট অন। কত পোকা গায়ে নিয়ে এসেছে কে জানে! সন্ধেবেলা ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট। ফুল চেক আপ। আশাবরীর ফাইভ সি ফ্ল্যাট আবার সুরে বাজে। ডিনারের জন্য বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়ে ঢোকেন সেনবাবু, আর রসমালাই।

(৪)

খাওয়াদাওয়া সেরে সব যে যার ঘরে। বসার ঘরের সোফায় এসে বসেন রুচিরা মাসি। হিটলার বক্স জানলায় ওর প্রিয় আসনে। একটা বিছানা কিনে ওর জন্য ওখানে পেতে দেওয়া হয়েছিল। বড়ো রাস্তাটা দেখা যায়। হিটলার দেখে। রাত্তিরের অন্ধকারেও বাইরে চেয়ে থাকে। শীতের রোদে ওখানেই ঘুমোয়। দক্ষিণের বাতাসে গা জুড়োয়।
তখন ঝিমোচ্ছে। দুর্বল। কী রোগা হয়ে গেছে!
ঠিক আছে, ঘরের ছেলে ঘরে তো ফিরেছে। দু-দিন ভালো করে পেট ভরে খেলেই আবার আগের মতন হয়ে যাবে। এক সপ্তাহ পর আবার ডাক্তারের কাছে চেক আপ।
কী মনে হতে অরিত্রর নম্বরটা ডায়াল করেন রুচিরা মাসিসারিকা মালহোত্রা যাই বলুক, ছেলেটা উপকার করতে তো এগিয়ে এসেছিল।
বেশ কিছুক্ষণ বাজার পর ধরল অরিত্র। হ্যাঁ বলুন, রুচিরা আন্টি, সারিকা তো বলেছে ভালো আছে হিটলার। আবার মন কেমন করলে কন্ট্যাক্ট করবেন ফিজ-টা একটু বেশি। আপনার কাছে কী আর এমন! আদরের হিটলারের জন্য।পেছনে খুব হইহল্লা।
তুমি কি বাইরে?”
“হ্যাঁ আন্টি, একটা পেমেন্ট পেয়েছি, তাই বন্ধুদের ট্রিট দিতে
“আচ্ছা, পরে কথা হবে।
কেমন যেন অস্বস্তি হয় রুচিরা মাসির। মেসেজ করেন সারিকা মালহোত্রাকে। স্ক্রিনে ফুটে ওঠে - এই নম্বরটি এখন উপলব্ধ নয়। পরে চেষ্টা করুন। অর্থাৎ সাময়িকভাবে বন্ধ।
হিটলারের দিকে তাকান রুচিরা। ডাকেন - বাবাইটা, আর একটু খাবি? আমার কাছে শুবি আজ? কষ্ট হচ্ছে তোর? সারিকা মালহোত্রা যে বলল তুই ভালো আছিস? এই তার নমুনা?
হিটলার তাকায় - ভালো ছিলাম? দেখে তাই মনে হচ্ছে তোমার?
স্পষ্ট শুনলেন রুচিরা মাসি। হিটলার কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আস্তে আস্তে চোখ বুজল। ফ্যাসফ্যাসে গলায় অস্ফুটে ম্যাঁও বলল একবার।
রুচিরামাসি আবার শুনলেন - যে যা বলে বিশ্বাস কর কেন তুমি?
হিটলার সামনের পায়ের ওপর মুখ রেখে শুল। তাহলে কি আমি হিটলারের হুইস্পার শুনতে পাচ্ছি? - রুচিরা মাসি ভাবেন
----------
ছবি - মেটা এআই

গল্প:: ড্যানি’স @ কার্সিয়াং - পূর্বা মুখোপাধ্যায়


ড্যানি @ কার্সিয়াং
পূর্বা মুখোপাধ্যায়

তিন্নিরা জয়েন্ট ফ্যামিলি। আর তিন্নিদের বেড়াতে যাওয়া মানেই দশ-বারো জনের টিম। বাবা, মা, দাদুভাই। মাম্মাম, মানে তিন্নির ঠাকুমা, কাকাই, ছোক্কাকি, রাতুল, রিমিল, পিকলু , মুন্নিদিদি, পুতুলপিসি আর তাদের ‘পুরাতন ভৃত্য’ সনাতন দাদা। পুরাতন ভৃত্য কথাটা বাবা বলে, কবিতাটাও। আসলে তিন্নিদের বাগবাজারের বাড়িতে এত লোক, এত কাকা, দাদা, ভাই-বোন যে তিন্নিরা একা একা, কেবল বাবা-মায়ের সঙ্গে কোথাও যায়নি কখনওসে নিয়ে ওদের কোনো দুঃখও নেই অবশ্য বরং একজনও যদি কোনো কারণে যেতে না পারে, পুরো দলেরই সাঙ্ঘাতিক মন খারাপ হয়
তিন্নি, রিমিল খুব মজায় থাকে। ওদের কক্ষনো একা লাগে না। আর ওদের সবচেয়ে প্রিয় পুতুলপিসি আছে না! পুতুলপিসি তিনতলার ছোটো বারান্দাটার লাগোয়া ঘরটায় থাকে। এ বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর ঘর সেটা। সুন্দর পর্দা, জানলায় গ্রিলে আটকানো রঙিন টবে নাইন ও ক্লক, আর মানিপ্ল্যান্ট। একটা এরিকা পাম। দেয়াল জোড়া বইয়ের তাক। মেঝেতে মোটা গদি পাতা, তাতে খাদির চাদর। পর্দাও খাদির। খুব রঙিন। উজ্জ্বল। ঘর থেকে বেরোলেই গাড়িবারান্দার ছাদ। সেখানে বেতের মোড়া, আর ঘাছগাছালির সংসার। বড়ো পাথরের গামলায় পদ্মও ফোটে। যদি এই জয়েন্ট ফ্যামিলি না হত পুতুলপিসিকে তারা পেত কোথায়। তার ওপর পুতুলপিসি কলেজে পড়ায় আর খুব বই পড়ে বলে অনেক কিছু জানে। ল্যাপটপেও ইন্টারনেট ঘেঁটে ঘেঁটে প্রচুর জিকে সংগ্রহ করে। রিমিল তো পুতুলপিসির জন্যেই ইস্কুলের কুইজ টিমে ফার্স্ট। বাবা বলেন, পুতুল আছে, ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে চিন্তা নেই।
পুতুলপিসি যেবার ওদের সঙ্গে কাশ্মীর যেতে পারল না, তিন্নিদের একদমই ভালো লাগেনি। পরে পুতুলপিসি অবশ্য কাশ্মীরের অনেক ইতিহাস বলেছিল আর এও বলেছিল যে তারা আর একবার যাবে ‘খন। এত মহিমামণ্ডিত জায়গা একবার দেখে হয়?
এবার তারা চলেছে কার্সিয়াং। সেখানে একটা পুরোনো বাংলো আছে, ব্রিটিশ আমলের সেটাই এখন হোম-স্টে এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান প্রৌঢ়ার মাত্র তিনটে ঘর বিশেষ ভিড় হয় না তিন্নিদেরও এবার দলে লোকজন কম। লকডাউনের পর আস্তে আস্তে সব স্বাভাবিক হচ্ছে, কিন্তু নিয়মকানুন সব গোলমাল হয়ে গেছে। পরীক্ষার ডেট, আপিসের ছুটি সব। তা তিনটে ঘরে ওদের সাতজনের ভালোই চলে যাবেবাবা-মা, দাদুভাই-মাম্মাম, তিন্নি-রিমিল আর পুতুলপিসি, এই সাতজন। পুতুলপিসি যাচ্ছে এতেই রিমিল আর তিন্নি খুশ। আসলে তারা বেশি ঘোরাঘুরি করে না একগাদা জায়গাতেও যায় না। একটা জায়গাতেই থাকে আশেপাশে পায়ে হেঁটে ঘোরা, স্থানীয় লোকেদের সঙ্গে গল্পগাছা করা আর বাকি সময়টা বারান্দায় বসে প্রকৃতি দেখা, খাওয়া-দাওয়া নির্ভেজাল বিশ্রাম। পুতুলপিসি অবশ্য গিয়েই ঘরের টেবিলে ল্যাপটপটা রাখে। টেবিলটা জানলার ধারে হওয়া চাই বিকেলবেলা আর ভোরবেলা নিয়ম করে এক ঘন্টা হাঁটতে বেরোয় বাকি সময় লেখেগল্প
এবারও কেবল কার্সিয়াং। এমন কি দু’পা দূরে দার্জিলিং-এও যাবে না। রিমিল অবশ্য তাল তুলেছিল। পুতুলপিসি বলল, তোর ইচ্ছে হলে দাদা-বৌদির সঙ্গে দার্জিলিং নামক রথের মেলায় ঘুরে আসিস। পাড়ার অনেকের সঙ্গেই দেখা হয়ে যাবে, ইস্কুলের বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গেও। তোর মনেও হবে না যে কলকাতা ছেড়ে এসেছিস, পুরো ফিল অ্যাট হোম। লাইন দিয়ে কেভেন্টার্সে সসেজ খাবি আর সেলফি তুলবি।
রিমিল আর কিছু বলার আগেই মা ঘরে ঢুকল বেশ কয়েকটা সোয়েটার আর জ্যাকেট নিয়ে। পুতুলপিসি বলল, অত গরম জামা নিয়ে কী করবে বৌদি? পাহাড়ে এখন আর তেমন ঠান্ডা পড়ে না গো। আমরা মূর্খের দল প্রকৃতির দফারফা করে দিয়েছি। পাহাড় আর কুয়াশাটাই টিঁকে আছে কেবল, এই রক্ষে। তবে ছাতা নিও, আর পারলে রেনকোট, বাচ্চাগুলোর জন্যে।
এন জে পিতে বেশ গরম। রাস্তায় বৃষ্টিও ছিল না। তবে শহর ছাড়িয়ে ফাঁকা পাকদণ্ডিতে পড়তে ঠান্ডা থার্মোমিটারে মালুম না হলেও, মন আর চোখ দুইই শীতল হল। মাঝে থামা মার্গারেটস ডেক-এ। অর্ডার করা হল কন্টিনেন্টাল ব্রেকফাস্ট আর মাসকাটেল চা। রিমিল অবশ্য একবার তাল তুলেছিল মোমো খাওয়ার। পুতুলপিসি বলল, “মোমো তো কলকাতায় বসে ওয়াও মোমোতেও খেতে পারিস। এই যে মার্গারেটস ডেক, এর ইতিহাস কিন্তু পড়ে আছে আঠেরোশ’ বাষট্টি সালে। মার্গারেটস হোপ টি গার্ডেন। এখন যে জাহাজের মতো শেপের টি লাউঞ্জে আমরা বসে আছি, এটা গুডরিক কম্পানির” সবাই গল্পের গন্ধ পায়। পুতুলপিসি নিরাশ করে না। “ছোটা রিংটং। আবার কেউ বলে বড়া রিংটং। চা বাগানটা চালাতেন মিস্টার ক্রুইকশ্যাংক। তখন বেশির ভাগ চা বাগানই সাহেবদের ছিল। সেই সাহেবের মেয়ে ছিল মার্গারেট। এই পাহাড়, সবুজ চা বাগান, মাঝে সরু পায়ে হাঁটা পথ, মার্গারেট খুব ভালোবেসে ফেলে এই জায়গাটাকে। কিছুদিন পরে অবশ্য তাকে ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে হয়। যাবার আগে এই পাহাড়, সবুজ চা বাগানকে সে মনে মনে বলে যায়, আমি শিগগিরই ফিরব, আবার। কিন্তু তার আর ফেরা হয়নি। দেশে যাওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়, জাহাজেই। শোকাতুর বাবা, তার প্রিয় কন্যার নামে চা বাগানের নামকরণ করেন – মার্গারেটস হোপ। গুডরিক কম্পানি এই ইতিহাসকে একটা ছোট্টো ট্রিবিউট দিয়ে রেখেছে, টি লাউঞ্জের নামটিতে
খেয়েদেয়ে মার্গারেটের কথা ভাবতে ভাবতে গাড়িতে চেপে সিধে মিসেস ও’নীলের হোম-স্টে – ড্যানি’স
পরের দিন বেশ বৃষ্টি শুরু হল। সারাদিন সবাই বাড়িতে। মালকিন মিসেস ও’নীলের সঙ্গে বেশ আলাপ হল তিন্নিদের। আর আছে রিঞ্চেন আর তার বউ মিসেস ও’নীলের সহায়ক। রিমিলকেই কেবল ঘরে রাখা যাচ্ছে না। বৃষ্টি থামলেই সে পেছনের বাগানে খেলতে চলে যাচ্ছে। মা-বাবা চিন্তা করেন। দাদুভাই আর মাম্মামও। পুতুলপিসিই উদ্ধার করে – আহ, ওকে ওর মতো উপভোগ করতে দাও। সব সময় আতুপুতু কোরো না। পেছনেই তো রিঞ্চেনরা থাকে, ভয় কী?
ঘরে জমে ওঠে পুতুলপিসির গল্পের সেশন।
কার্সিয়াং নাম কেন জানিস? তিন্নি জানে না। গুগল ঘাঁটলেই জানা যেত অবশ্য। কিন্তু ও সে সব করে না। পুতুলপিসির মতো করে বলতে পারবে, গুগল? বাবা বললেন, “হিমালয়ের সাদা অর্কিড, লেপচাদের ভাষায় সেটাই কার্সিয়াং বোধহয়, এরকমই পড়েছিলাম
“হ্যাঁ, লেপচারাই এখানের অধিবাসী। আসল নামটা হল, কার্সেন রিপ অর্কিড। কেউ কেউ আবার বলে এক সাহেব ইঞ্জিনিয়ার এই নাম দেয়, যেহেতু এই সাদা অর্কিড বসন্তকালে গোটা কার্সিয়াং ছেয়ে ফেলে
একসময় ইংরেজদের ফেভারিট জায়গা ছিল এই কার্সিয়াং। তবে যাতায়াতের অসুবিধে ছিল। রাস্তা বলতে এক মিলিটারি রোড ছিল, তার পরে তৈরি হল হিল কার্ট রোড। বেশ কিছু ইংরেজ কার্সিয়াংকে ভালোবেসে এখানে সামার হোম করেন। কেউ কেউ পাকাপাকি থাকতেও শুরু করেন। তারপরে দার্জিলিং তাদের অনেক বেশি মনোমতো হয়ে ওঠে। কাজেই কার্সিয়াং তার সৌন্দর্য নিয়ে একান্তে নিরালায় থেকে যায়। এখনও অনেকেই বড়ো জোর এক বেলা এখানে থেকে দার্জিলিং চলে যায়। এভাবেই পুতুলপিসির গল্পে গল্পে রিমিলের হুটহাট একা একা বাইরে খেলতে যাওয়ার প্রসঙ্গটা আপাতত চাপা পড়ে যায়
দুপুরবেলা স্টিমড রাইস আর চাইনিজ চিকেন স্ট্যু খেয়ে দিব্যি লম্বা একটা ঘুম দিয়ে যখন উঠল সকলে, তখনও মেঘলা আশেপাশেই একটু হেঁটে এল সবাই রিমিলই কেবল পেছনের বাগানে খেলবে বলে রয়ে গেল।
পড়ন্ত বিকেল তখন পুতুলপিসির গল্পের অপেক্ষায়। পুতুলপিসি বলছিল, কাল ডাউহিলটা দেখতে যাবমিসেস ও’নীল চা আর কুকিজ সার্ভ করছিলেন, বললেন, “ডাউহিল হল সবচেয়ে ভূতুড়ে জায়গা। গেলেই বুঝবে এক গা ছমছমে ভাব রয়েছে জায়গাটায়। একটা জায়গা আছে যার নাম ডেথ রোড। লোকাল কাঠুরেরা ওখানে নাকি একটা মুণ্ডুকাটা বাচ্চা ছেলেকে দেখেছে অনেকেই। ভীতু গঙ্গারামেরা তাই এড়িয়েই চলে ওই পথআরও গল্প রয়েছে, যেমন একজন গ্রে গাউন পরা ব্রিটিশ মেয়ে ভূতের। অনেকেই নাকি নানারকম ভূতুড়ে আওয়াজ, এবং অশরীরি ছায়া ইত্যাদি দেখেছে একশ’ বছরের পুরোনো ভিক্টোরিয়া বয়েজ স্কুলেআর আশ্চর্যের ব্যাপার হল, যত ভূতুড়ে কাণ্ড সব ঐ স্কুল যখন ডিসেম্বর থেকে মার্চ অবধি বন্ধ থাকে তখন
মিসেস ও’নীল ওই স্কুলেই শিক্ষকতা করেছেন। তারপর রিটায়ার করে এই হোম-স্টে। ছেলে অস্ট্রেলিয়ায়। মা’কে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু তিনি পৈত্রিক ভিটে ছেড়ে যাবেন না। ওর বাবা-মায়ের সমাধি আছে এখানেই। স্বামী অ্যালেনেরও।
আর এক রাউন্ড চা আর ড্যানিশ কুকিজ নিয়ে ঘরে ঢোকে রিঞ্চেন। “ওয়ান্ডারফুল কুকিজ মিসেস ও’নীল, ইউ মেড দেম?” পুতুলপিসি বলে। মিষ্টি হাসেন প্রৌঢ়া। - “ড্যানিজ কুকিজ, ইউ নো! দে ওয়ার মাই ব্রাদারস ফেভারিট! আমার ভাই ড্যানি ওর নামেই এই হোম-স্টে
“ছিল? এখন?”
লিভিং রুমের জানলার কাছে গিয়ে পর্দা সরিয়ে বৃষ্টি ধোয়া কার্সিয়াং পাহাড়ের আবছা সবুজের দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ গলায় বলেন – “ছিল। আমাদের সব্বার চোখের মণিখেলতে খেলতে খাদের ধারে চলে যায়। এরকমই বৃষ্টি আর পা পিছলে... এখানে সেও শুয়ে আছে মা আর পাপার মাঝখানটিতে, যেমন ছোট্টোবেলায় নিজের ঘর ছেড়ে ‘ভয় করছে’ বলে বাবা-মায়ের মাঝে গিয়ে শুত
ঠিক তখনই ঘরের নীরবতা ভেঙে ঘরে ঢোকে রিমিল, “মা, দেখো, আমার ফ্রেন্ড, ওর সঙ্গেই খেলি রোজ...” বলেই পেছন ফিরে দেখে কেউ নেই। অবাক রিমিল “ড্যানি, ড্যানিইইই” বলে ডাকতে ডাকতে আবার বেরিয়ে যাবার উপক্রম করে।
ড্যানি!” আঁতকে উঠে মা দৌড়ে গিয়ে ধরে ওকে - “না, বাইরে যাবে না তুমি, ঘরেই থাকবে” তারপরেই আবার ধপ করে একটা সোফায় বসে পড়ে। মিসেস ও’নীল যেন পাথরের মূর্তি। রিঞ্চেনও বাইরে ঠিক তখনই ঝুপ করে সন্ধে নেমে এল আর আবার বৃষ্টি শুরু হল
----------
ছবি - আন্তর্জাল

গল্প:: বাবুনি - পূর্বা মুখোপাধ্যায়


বাবুনি
পূর্বা মুখোপাধ্যায়

বাবুনি ছিল দাদুভাইয়ের বেড়াল আমার দাদুভাই শ্রীযুক্ত মহীতোষ মিত্র একসময়ের ডাকসাইটে উকিল তালডুবি গ্রামে থাকেন তালডুবি গ্রামে আমাদের পূর্বপুরুষদের বিশাল বাড়ি বাংলা সিনেমায় জমিদারবাড়ি যেমন পূর্বপুরুষদের কেউ একজন ছিল ওখানের জমিদারের নায়েব প্রচুর পয়সা-টয়সা করেন তার পরে যা হয়, জমিদারি উঠে যাওয়ার পরে সব ব্যাবসা চাকরি-বাকরি করতে শুরু করেন দাদুভাই গ্রামের বাড়িতে থেকে গ্রামের স্কুলেই পড়াশোনা করেন, তারপরে পাস-টাস করে কাছেই শহরের কোর্টে প্র্যাকটিস করেন প্রচুর টাকাপয়সাও করেন কিন্তু গ্রাম আর গ্রামের বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাননি।
বাবা চাকরি করে কলকাতায়, সেখানেই ফ্ল্যাট পিসি দিল্লিতে, বিয়ের পর দু’জনেই ঠাম্মা মারা যাওয়ার পরে এবং আগেও দাদুভাইকে অনেকবার বলেছে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে তাদের কাছে এসে থাকতে কিন্তু দাদুভাই ‘আমি না থাকলে এই এত বড়ো বাড়ি, জমিজমা, বাগান, পুকুর সব পাঁচ ভূতে লুটে খাবে’ বলে কখনোই আসেননি তারপর তো ঠাম্মা মারা গেলেন দাদুভাই একেবারে একা যদিও পুতুলপিসি আর নারানদা, অনেক পুরোনো লোক ওরা, রাতদিন থাকে, বাড়িরই নিচের তলায়, ওদের পরিবার নিয়ে তাও দাদুভাই তালডুবির বাড়ি ছেড়ে আসেন না, বলেন‘এই বাবুনিটাকে ছেড়ে যাই কী করে?
বাবুনি ভারী অদ্ভুত বেড়াল অনেক বেড়ালই ন্যাওটা হয়, আবার বেড়ালদের মধ্যে এক স্বাভাবিক স্বাধীনচিত্ত থাকে আবার বেড়ালকে ঘরে আটকে রাখা যে কী কঠিন তা সবাই জানেন তা, বাবুনিও স্বাধীনচেতা তবে চারিদিক খোলা থাকা সত্ত্বেও বাবুনি কখনও বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ায়নি সে যেন এই বড়ো বাড়ির রাজকন্যে বাইরের বেড়ালদের সঙ্গে তার সর্বদা দূরত্ব বাবুনি বাইরে বেরোত কেবল দাদুভাইয়ের সঙ্গেই বিশেষ করে বিকেলে দাদুভাই যখন হাঁটতে যেতেন, বাবুনি তাঁর পাশে পাশে যেত দাদুভাই যেখানে যেখানে থামতেন, সে একটু দূরে বসে থাবা চাটত, নয় লেজ আছড়াত মৃদু মৃদু; আবার দাদুভাই সেখান থেকে চলতে শুরু করলেই সেও চলত
তালডুবির বাড়ির একটা বিশাল দক্ষিণের বারান্দা ছিল দাদুভাই সকালে আর সন্ধের পর সেখানে একটা ইজিচেয়ারে বসে অনেকটা সময় কাটাতেন কয়েকটা চেয়ারও ছিল পাতা, আর একটা শ্বেতপাথরের টেবিল সন্ধেবেলা কেউ এলে সেখানেই বসত ইজিচেয়ারের ঠিক পাশেই একটা চেয়ারে বসে থাকত বাবুনি ওই চেয়ারটাতে দাদুভাইয়ের একটা কাচা ধুতি ভাঁজ করে পেতে রাখতে হত বেশ কয়েকদিন একই ধুতি থাকলে বাবুনি ম্যাঁও ম্যাঁও করে জীবন অতিষ্ঠ করে দিত যতক্ষণ না কাচা ধুতি পাতা হচ্ছে দাদুভাই প্রশ্রয়ের হাসি হেসে পুতুলমাসিকে বলতেন‘ওরা খুব পরিচ্ছন্ন প্রাণী, বুঝলে?
আর একটা ব্যাপার ছিল এই যে দাদুভাই, এত বড়ো উকিল, কত পড়াশোনা, কিন্তু তার একটাই বদ অভ্যাস ছিলবিড়ি খাওয়া বলে বলেও ছাড়ানো যায়নি লোকসমাজে খেতেন না কিন্তু বারান্দায় বসে খেতেন আর বাবুনি কীরকম যে চোখ ছোটো করে, মুখ তুলে পরম মৌতাতে বিড়ির গন্ধ নিত! সকালেও দাদুভাই বাথরুমে যাবার আগে বারান্দায় বসে এক কাপ চা শেষ করে বিড়িটা ধরাতেন বাবুনি আবার ঐ মুখ উঁচু আর চোখ বন্ধ করে বিড়ির প্যাসিভ স্মোকার দাদু বিড়ি নিয়ে বাথরুমে চলে যেতেন, আর বাবুনি ছাদে বা বাগানে সবাই অবাক হত, আর হাসাহাসিও চলত
দাদুভাইকে কোথাও কাজে বেরোতে হলে, যদিও তা কালেভদ্রে, বাবুনি ছাদের পাঁচিলের ওপর বসে থাকত রাস্তার দিকে চেয়ে, যতক্ষণ না দাদুভাই আসেন কাজেই খুব দরকার ছাড়া দাদুভাই বাবুনিকে ছেড়ে কোথাও যেতেন না আমরা ছুটিছাটাতে যেতাম বাবুনি আমাকে ভালোবাসত আর মাকে বাবার বেজায় বেড়াল অ্যালার্জি বাবুনি বাবার ধারেকাছেও ঘেঁষত না মায়ের পায়ে পায়ে ঘুরত

সে দিন খুব বৃষ্টি সন্ধেবেলাতেই পাড়া নিঃঝুম জলে ডুবে গেছে কলকাতা হঠাৎই আমাদের ফ্ল্যাটের বাইরে বেড়ালের ম্যাঁও ম্যাঁও ডাক মা শুনেছেন প্রথমে ভেবেছেন বাইরের কোনো বেড়াল হয়তো জলে ভিজে আশ্রয় খুঁজছে কিন্তু তারপরেই ঠক্ঠক্ বাবুনি ঠিক এরকম করে কেউ যদি ঘরের দরজা বন্ধ করে বাবুনির খুব আপত্তি কীভাবে যেন ছিটকিনিতে হাত দিয়ে ঠিক মানুষের মতোনককরেঠক্ঠক্ঠক্‌! ঠিক তিনবার মা দরজা খোলেন, দেখেন বাবুনি বসে আছে মা ভেবেছেন দাদুভাই এসেছেন বুঝি মা আদর করে বাবুনিকে ডাকছেন বাবুনি কিন্তু ভেতরে ঢুকছে না মায়ের কথা শুনে বাবা বেরিয়ে এসেছেন মা বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন“এই দেখো বাবুনি বসে আছে, বাবা এসেছেন বোধহয়, দেখো তো!” বলেই তাকিয়ে দেখেন বাবুনি কই? একটা পাড়ার বেড়াল সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে গেল
দরজা বন্ধ করতে না করতেই ফোন নারানদা দাদু অসুস্থ, অবস্থা ভালো ঠেকছে না তখনই রওনা হলাম আমরা পৌঁছোলাম ঠিকই, কিন্তু দাদু ততক্ষণে তালডুবির বাড়ি আর আমাদের ছেড়ে অনেক দূরে যাত্রা করেছেন আর বাবুনিকে ছেড়েও
মাই প্রথম বলল, “পুতুলদি, বাবুনি?” পুতুলদি কাঁদছিল হাউ হাউ করে বলল -বেড়ালকে কেউ মরতে দেখে না বউমা কিন্তু দেখি বাবার পাশে বাবুনিওপেছনে বাগানে নিয়ে গিয়ে রেখেছে নারানদা ওখানেই…”
বাবুনিকে ছেড়ে থাকতে পারতেন না দাদুভাই, বাবুনিও তাঁকে ছাড়া আমি কেবল ভাবছিলাম, মা যে বেড়ালটাকে দরজা খুলে দেখেছিল, সে কি
----------
ছবি - সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী
ম্যাজিক ল্যাম্প