Showing posts with label বাবিন. Show all posts
Showing posts with label বাবিন. Show all posts

গল্পের ম্যাজিক:: ক্যানসেলড চেক - বাবিন


ক্যানসেলড চেক
বাবিন

রোজ সকালে উঠে তিয়াষের প্রথম কাজটি হল এক কাপ চা হাতে নিয়ে আনন্দবাজার আর টেলিগ্রাফ কাগজদুটো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়া। এই অভ্যাসটা ও দাদুর কাছ থেকে পেয়েছে। উনিও সকালে উঠে খবরের কাগজটি হাতে নিয়ে বসতেন। সেই সময় কেউ ওঁকে বিরক্ত করত না। তিয়াষেরও একই স্বভাব। এই একঘন্টা সময়টা সম্পূর্ণ নিজের মতো করে কাটায়। আজও তাই করছিল। ঠিক এই সময়ই ওর মোবাইলটা আর্তনাদ করে উঠল। দ্বৈতা। বিরক্ত মুখে কলটা রিসিভ করল তিয়াষ।
হয়ে গেছে!দ্বৈতা হইহই করে উঠল ফোনের ওপার থেকে, “আর কোনও চিন্তা নেই, সব সমস্যার সমাধান!
কী হয়েছে?” তিয়াষ ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।
দ্বৈতার এই এক সমস্যা। পুরো ঘটনা খুলে না বলে দাঁতকপাটি মেলে বসে থাকে।
এতদিন ধরে যার অপেক্ষায় আমরা গালে হাত দিয়ে বসেছিলাম এবার তার দেখা মিলবে। অ্যান্ড উই উইল বি সাকসেসফুল!
এই, আমি ফোন রাখছি!তীব্র বিরক্তি ভরে তিয়াষ বলে ওঠে, “তোর এটা ভয়ানক সমস্যা, আদ্দেক কথা পেটে আদ্দেক মুখে। এইভাবে আমি পারি না। যদি পুরোটা খুলে বলতে পারিস তাহলেই ফোন করিস।
ওহো-হো, সরি রে। আসলে আমি এত্ত খুশি হয়ে গেছি যে আনন্দে পাগল হয়ে যাব!ওদিক থেকে দ্বৈতার যেন দম ফুরিয়ে গেছে। একটু থেমে লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল, “লোন স্যাংকশন হয়ে গেছে! আর শুধু তাই নয়, আমরা পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত লোন পেতে পারি!
ওহ্‌ মাই গড! কী বলছিস রে!তিয়াষ আনন্দে হতবাক হয়ে যায়, “পাঁচ লাখ?”
তবে আর বলছি কী! এবার আমাদের স্বপ্ন সত্যি হয়ে যেতে আর কোনও বাধা নেই। আমাদের দ্বৈতির উদঘাটন এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা।
আনন্দে তিয়াষের চোখে জল চলে আসে। আসারই কথা। দেড় লাখ টাকা লোনের জন্য আজ প্রায় দেড় বছর ধরে ওরা দুজনে এ ব্যাঙ্ক সে ব্যাঙ্ক করে কোথায় না ঘুরেছে। সব জায়গা থেকেই হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে। সবাই চায় গ্যারান্টার কিংবা ফিক্সড ডিপোজিট নয়তো জমি-জমা-ফ্ল্যাট-বাড়ির দলিল বন্ধক হিসেবে। আরে বাবা, সেটাই যদি থাকবে তাহলে আর তোমাদের কাছে যাওয়া কেন? এটাই ব্যাঙ্কওয়ালারা বুঝতে চায় না। দুটো কলেজ পড়ুয়া ছাত্রী একটা বুটিক খুলতে চাইছে, স্বাবলম্বী হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাইছে, কোথায় তোমরা উত্সাহ দেবে, তা নয় একরকম ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দিচ্ছ? পশ্চিমবঙ্গ সরকারেরও কয়েকটি ঋণ প্রকল্প আছে, কিন্তু সেখানেও সবকিছু ঠিকঠাক এগিয়ে যাবার পরও শেষমেশ ব্যাঙ্কে গিয়েই আটকে যাচ্ছে। ব্যাঙ্কের দরজায় ঘুরতে ঘুরতে যখন সব আশা প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে সেই সময় দ্বৈতার এই ফোন খুব সঙ্গত কারণেই তিয়াষের চোখে জল এনে দিল।
খুশি চেপে রেখে তিয়াষ জিজ্ঞেস করে, “কী করে হল রে? কাকু কি গ্যারান্টার হতে রাজি হয়েছেন?”
উঁহু। দশটার সময় তোদের বাড়ি যাচ্ছি, তখন সব খুলে বলব।ফোন রেখে দেয় দ্বৈতা।
দ্বৈতার বাবা সরকারি চাকরি করেন। বেশ উঁচু পদে। উনি যদি একবার রাজি হতেন গ্যারান্টার হতে তাহলে বহু আগেই এই লোনটা ওরা পেয়ে যেত। তিয়াষের বাবা রেলওয়েতে আছেন। দ্বৈতার মা গৃহবধূ, কিন্তু তিয়াষের মা চাকরি করেন পূর্তদপ্তরে। ওঁদের একজনও যদি গ্যারান্টার হিসেবে একটা স্বাক্ষর করে দিতেন তাহলে ওদের এই স্বপ্ন সত্যি হয়ে যেত। কিন্তু তিনজনের কেউই ওদের এই বুটিক খোলার স্বপ্নকে সাকার করতে এগিয়ে আসেননি। এখনও সবাই ওদের বাচ্চা বলেই মনে করে। ধরে নিয়েছেন, লোনের টাকা উড়িয়ে দিতে ওদের সময় লাগবে না। ওঁদের মুখে এক কথা, ‘বুটিক-ফুটিক আবার কী? তার চেয়ে বরং সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নাও গে! রেল, ব্যাঙ্কে মাইনে কত জানিস?’
দ্বৈতা আর তিয়াষ দুজনের কেউই পড়াশোনায় তেমন একটা ভালো ছিল না। মোটামুটিভাবে টুয়েলভ পাশ করে আর্টস নিয়ে পড়াশোনা করছে কলকাতার এক মাঝারি মানের কলেজে। ওরা জানে যে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-সফটওয়্যার প্রফেশনাল ওরা কোনওদিনই হতে পারবে না। কিন্তু আর পাঁচটা সাধারণ মেয়েদের মতো বাঁধাধরা জীবন দুজনের কেউই বেছে নিতে চায় না। স্বপ্ন দেখে বড়ো কিছু করার। তিয়াষের আঁকার হাতটি ভালো, আর দ্বৈতা ভালোবাসে ফটোগ্রাফি। বিভিন্ন পেশাসংক্রান্ত পত্রিকা ঘাঁটাঘাঁটি করে ওদের মনে হয়েছে, বুটিক ব্যাপারটা ওদের জন্য একদম সঠিক ব্যাবসা। সঙ্গে সঙ্গে এই বিষয়ে আরও পড়াশোনা শুরু করল ওরা। তিয়াষ একটা বুটিকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কিছুদিন একটা ক্র্যাশ কোর্সও করে নিল। হিসেব করে দেখল, আপাতত হাতে দুলাখ টাকা এলেই ব্যাবসাটা শুরু করা যেতে পারে। দ্বৈতার নামের প্রথম অক্ষর দ্বৈআর তিয়াষের তিমিলে নাম ঠিক হলো দ্বৈতি। দ্বৈতাদের বাড়ির নিচে দুটো গ্যারেজ আছে। একটায় বাবা গাড়ি রাখেন আর অন্যটা ভাড়া দেওয়া হয়। তবে এই মুহুর্তে দ্বিতীয়টা খালি আছে। বুটিক খোলার জন্য গ্যারেজটা নিলে ওর বাবার খুব একটা আপত্তি নেই, তবে লোনের ব্যাপারে আছে। আর বাকি টাকাটাও কেউ ধার হিসেবে ওদের দেবেন না। চেয়েচিন্তে এদিক ওদিক করে দুজনের জমানো সমস্ত টাকা মিলিয়ে দেখা গেল মোটামুটিভাবে বাহান্ন হাজার হয়েছে। বাকি টাকাটার জন্য মাথা খুঁড়ে মরছে ওরা। কোনওদিকে রাস্তা না পেয়ে আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল, এমনি সময় দ্বৈতার এই কল পেয়ে তিয়াষ অবাক হয়ে গেল।

ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা ব্যাঙ্কের সিঁড়িতে। কাল একবার ব্যাঙ্কে গিয়েছিলাম। কথা বলে দেখছিলাম যদি কোনও একটা রাস্তা বেরোয়। উনি বোধহয় শুনেছেন আমাদের কথাবার্তা। নিজে থেকেই যেচে এসে আলাপ করলেন। উনি একটা প্রাইভেট ব্যাঙ্কে আছেন। কী যেন নাম বললেন ডায়মন্ড ফিনান্স বোধহয়। ওদের সুদের হার সামান্য, মাত্র ওয়ান পার্সেন্ট বেশি। তবে লোনটা হয়ে যাবে।
গ্যারান্টার লাগবে না?” তিয়াষের যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না। কারণ, এতদিন ধরে এত জায়গা থেকে হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে যে লোনের আশা ছেড়েই দিয়েছিল।
না রে, তাহলে আর বলছি কী!দ্বৈতার চোখে খুশির ঝিলিক, “শুধু আমাদের দুজনের মধ্যে যে কোনও একজনের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এক লাখ টাকা থাকলেই হবে। তার নামেই লোনটা অ্যাপ্রুভ করা হবে।
এক লাখ!তিয়াষ আকাশ থেকে পড়ে, “এক লাখ কোত্থেকে আসবে? আমাদের তো রয়েছে মাত্র বাহান্ন...
মুখের কথা কেড়ে নিয়ে দ্বৈতা বলে, “সেসব আমি বলেছি। অনেক রিকোয়েস্ট করে ব্যাপারটা পঞ্চাশে নামিয়েছি। পাঁচ লাখ অবধি আরামসে হয়ে যাবে।
আমি একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না যে আমাদের অ্যাকাউন্টে টাকা থাকার সঙ্গে লোনের কী সম্পর্ক? টাকার দরকার বলেই তো লোন নিচ্ছি আমরা, টাকা যদি থাকত তাহলে কে আর ধারদেনার চক্করে পড়ে?”
ওরে বাবা, কাগজে-কলমে ব্যাঙ্ক দেখতে চায় যে তোর অ্যাকাউন্ট থেকে টাকার লেনদেন হয়। একেবারে ইন-অ্যাকটিভ অ্যাকাউন্ট নয়। তাই এটা দেখাতে হবে। লোন পেয়ে গেলে তুই নিজের টাকায় যা খুশি কর না গে!দ্বৈতা খুশিতে যেন ফুটছে টগবগ করে।
তিয়াষের কপালের ভাঁজটা সোজা হচ্ছে না কিছুতেই। কোথাও যেন একটা খটকা লাগছে। যে লোনের জন্য আজ ছমাস ধরে ওরা জুতোর সুকতলা খইয়ে ফেলল সেটা যে এত সহজে হাতের মুঠোয় এসে যাবে এটাই বিশ্বাস হচ্ছে না।
তাহলে তোর আঠাশ আর আমার চব্বিশ হাজারটা কোনও একটা অ্যাকাউন্টে জমা করতে হবে তো?”
হ্যাঁ, তোর অ্যাকাউন্টেই আমার টাকাটা ট্রান্সফার করে দেব। সামনের এটিএম থেকে কার্ড টু কার্ড ট্রান্সফার করে দিচ্ছি। তারপর তুই অনলাইনে লগ-ইন করে একটা স্টেটমেন্ট বের করে নে।
কী কী ডকুমেন্ট দিতে হবে?”
যা সব ব্যাঙ্ককে দিতে হয় এদেরও তাই দিতে হবে দুজনের ছবি, আইডি প্রুফ, অ্যাড্রেস প্রুফ, ব্যাবসার প্ল্যান ইত্যাদি আর একটা ক্যানসেলড চেক। তোর চেক বই আছে না?”
হ্যাঁ, আছে তো। একটাও ইউজ করিনি কোনওদিন।তিয়াষ জিজ্ঞেস করে, “লোকটার সঙ্গে তোর কবে দেখা হল?”
কালকে ব্যাঙ্ক থেকে বেরোচ্ছি, তখনই দেখা ভদ্রলোকের সঙ্গে। খুবই ভালো মানুষ। অমায়িক ব্যবহার। লোনটা পেয়ে গেলে ওঁকে বাড়িতে ডেকে একটা ট্রিট দিয়ে দেব।দ্বৈতা তৃপ্তির সুরে বলল, “পাঁচ লাখ পেলে আমরা বেশ বড়ো করেই শুরুটা করতে পারব, বল?”
আগে তো হাতে পাই, তারপর দেখা যাবে। না আঁচালে বিশ্বাস নেই!তিয়াষ ছদ্ম অভিমানের সুরে বলে, “কালকেই যদি কথাটা জেনেছিস, আমাকে আজ বললি যে বড়ো?”
ইচ্ছে করেই বলিনি। কারণ, ভদ্রলোক বলছিলেন ব্যাঙ্কে এক লাখ টাকা থাকতে হবে, আর আমাদের দুজনের মিলিয়ে তো বাহান্ন হচ্ছে। উনি বললেন, ওদের ব্যাঙ্কের সঙ্গে কথা বলে কনফার্ম করবেন। আমার মোবাইল নম্বর নিয়েছিলেন। এতবার আমরা আশা করেও শেষমেশ কাজের কাজ কিচ্ছু হচ্ছে না বলে তোকে আমি আর বলতে চাইনি। আজ সকালে উনি জানাতেই তোকে ফোন করলাম। এগারোটার সময় উনি আসবেন এখানে।তিয়াষকে জড়িয়ে ধরে দ্বৈতা উত্ফুল্ল সুরে বলে, “ডিয়ার, এবার আমাদের বুটিক হবেই হবে! আর কোনও টেনশন নেই!
এগারোটার একটু আগে তিয়াষের বাবা-মা দুজনেই অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাবার পরই এলেন ভদ্রলোক। বছর চল্লিশেক বয়স। কাঁচাপাকা চুল। রংটা কালো, কিন্তু বেশ মার্জিত কথাবার্তা। পোশাকেও রুচির ছাপ। হাতে বেশ কয়েকটি সোনার আংটি। তার মধ্যে জ্যোতিষ-পাথরও রয়েছে। পরিষ্কার কামানো গাল। দেখে মনেই হয় না প্রাইভেট ব্যাঙ্কের এজেন্ট। বরং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী হিসেবেই বেশি মানায়। করজোড়ে নমস্কার করে নাম বললেন, “সৈকত বসু।
আপনি কী করে জানলেন যে আমরা লোনের জন্য চেষ্টা করছি?” তিয়াষ জিজ্ঞেস করল।
হেঁ হেঁ, আসলে কী জানেন, আমাদের মানে, বিভিন্ন ব্যাঙ্কের এজেন্টদের নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা হয়। এর থেকেই খবরাখবর পাওয়া যায়। সরকারি বা নামী বেসরকারি ব্যাঙ্ক সাধারণত রিস্ক নিতে চায় না। মজবুত জামিনদার না পেলে কিংবা ভালো রোজগার না থাকলে লোন পাওয়া একটু মুশকিল হয় বৈকি। তখন এইসব কেসগুলো আমাদের কাছে চলে আসে।
তাহলে আপনারা কীসের ভরসায় লোন দেন?”
দ্বৈতা এবার খুব সাবধানে সৈকতবাবুর নজর এড়িয়ে তিয়াষকে একটা চিমটি কাটে। এসব কী ফালতু কথাবার্তা জিজ্ঞেস করছে তিয়াষ? লোন পাচ্ছিস, চুপচাপ নিয়ে নে না বাবা! এত ভিতরের খবরে কী দরকার তোর? বাই চান্স যদি ভদ্রলোকের মাথা ঘুরে যায় তো হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা হয়ে যাবে না?
তিয়াষ দ্বৈতার হাতটাকে সরিয়ে দিয়ে উত্তরের অপেক্ষায় সৈকতবাবুর দিকে তাকিয়ে থাকে। উনি হেসে বলেন, “সঙ্গত প্রশ্ন। প্রথম কথা, আমরা দেখি যে বাড়িটায় আপনারা রয়েছেন সেখানে কতদিন ধরে আছেন। এলাকায় আপনার সুনাম কতটা। আর তাছাড়া দুজন অ্যাপ্লিক্যান্ট হলে সমস্যাটা কমই হয়। আমাদের লাভ তো ওই এক্সট্রা ওয়ান পার্সেন্ট!
তার মানে কি আপনারা এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে আমাদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেবেন?”
না না, ব্যাপারটা তেমন কিছু নয়, ম্যাডাম।সৈকতবাবু হাত তুলে আশ্বস্ত করে বলেন, “প্রতি এলাকাতেই আমাদের কিছু এজেন্ট থাকে, তারাই মোটামুটি সব খবরাখবর রাখে। আপনার বাবা রেলওয়েতে চাকরি করেন, ওঁর বাবাও সরকারি চাকরি করেন, নিজের বাড়ি ব্যস, আর কী চাই?”
সৈকতবাবুর ম্যাডামসম্বোধনে তিয়াষ খুশি হয়। এখনও ম্যাডাম সম্বোধনের মতো বড়ো হয়ে উঠতে পারেনি বলেই জানত এতদিন। আজ জীবনে প্রথমবার এই ডাকটা শুনে ভালো লাগে। মনের খটকাটাও ধীরে ধীরে উবে যায়। দ্বৈতাও বুঝতে পারে, তিয়াষ সন্তুষ্ট হয়েছে। তিয়াষের উদ্দেশে সে বলে, “ডকুমেন্টগুলো কাকুকে দিয়ে দে, তিয়াষ।
তিয়াষ সমস্ত দরকারি কাগজপত্র একটা প্লাস্টিক ফোল্ডারে গুছিয়ে রেখেছিল। সৈকতবাবুর দিকে এগিয়ে দেয়। দেখে নিন সব ঠিক আছে কি না।
ভদ্রলোক ফোল্ডার থেকে সমস্ত ডকুমেন্ট বের করে নেড়েচেড়ে দেখতে থাকেন। তারপর দ্বৈতার দিয়ে চেয়ে বললেন, “ক্যানসেলড চেকটা?”
তিয়াষ পাশে রাখা চেক বইটা বার করে। এই প্রথমবার ও চেক ব্যবহার করছে। এতদিন এটিএম কার্ডই ব্যবহার করে এসেছে। কোনওদিন চেক ব্যবহার করার দরকার পড়েনি।
চেক কীভাবে ক্যানসেল করতে হয় জানেন তো?” ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করেন।
লোনের জন্য বারবার ব্যাঙ্কে যাবার সূত্রে তিয়াষ জেনে ফেলেছে যে চেকের ওপর কোনাকুনিভাবে ক্যানসেলডকথাটা লিখে তার ওপর নিচে দুটো লাইন টেনে দিলেই চেক ক্যানসেল হয়ে যায়। পাশে রাখা পেনটা তুলে টেবিলে রাখা চেক বইটার প্রথম চেকটায় ও সেটাই করতে গেল। কিন্তু ভদ্রলোক হাঁ হাঁ করে উঠলেন।
আরে না না, ওইভাবে নয়,” সৈকতবাবু চেক বইটা নিজের দিকে টেনে নিলেন। ওঁর নিজের হাতের পেনটা দিয়ে চেকটার মাঝ বরাবর কোনাকুনিভাবে দুটো লাইন টেনে তার মধ্যিখানে ক্যানসেলড কথাটা লিখে দিলেন। তারপর খানিক আত্মপ্রসাদের সুরে বললেন, “এইভাবে করতে হয়। আপনি হয়তো প্রথম করছেন তাই নিয়মটা ঠিক জানেন না। এবার সিগনেচারের জায়গায় ব্যাঙ্কে যেভাবে করেন ঠিক সেরকমভাবে একটা সই করে দিন।
তিয়াষ জুলজুল চোখে ভদ্রলোকের পেনটার দিকে চেয়েছিল। ভারি সুন্দর দেখতে। কালোর ওপর সাদা স্ট্রাইপ। নীল রঙের কালিতে উজ্জ্বল হয়ে লেখাটা পড়েছে। উফ্‌, ফের কোথাও একটা খটকা লাগছে! এইরকম পেন ও কোথাও দেখেছে।
একটা কথা ভদ্রলোক ঠিকই বলেছেন। এই প্রথম তিয়াষ কোনও চেকে স্বাক্ষর করল, আর ক্যানসেলড চেক তো একেবারেই প্রথম।
আচ্ছা,” তিয়াষ ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “ক্যানসেলড চেকে কি সই করতে হয়?”
স্মিত মুখে সৈকতবাবু বললেন, “অবশ্যই! করতে হয় বৈকি? আপনি চিন্তা করবেন না, এই যে কোনাকুনি ক্রসড করে দিলেন এটা আর কেউ ব্যবহার করে টাকা তুলতে পারবে না। এটা জাস্ট একটা নিয়মরক্ষা, ফরমালিটি বলতে পারেন।
ব্যস, খটকাটা পরিষ্কার হয়ে গেল তিয়াষের। মনে পড়ে গেছে। ও তড়াক করে উঠে পড়ে বলে, “আরে, আমি ভুলেই গেছিলাম যে গ্যাসে চায়ের জল চড়িয়ে দিয়ে এসেছি! আপনি বসুন, আমি আপনার জন্য চা নিয়ে আসছি। দ্বৈতা তুই খাবি?”
দ্বৈতা ঘাড় নেড়ে সায় দেয়। ভদ্রলোক মৃদু আপত্তি করেন, “এসবের আর কী দরকার? আমার কাজ শেষ, আমি বরং উঠে পড়ি, আপনাদের আর বিরক্ত করব না।
তিয়াষ হাসি মুখে বলে, “আপনি আমাদের জন্য এত করছেন আর আমরা আপনার জন্য এটুকু করব না? বসুন বসুন।

এর পরেরটুকু সবাই খবরের কাগজেই পড়েছেন।
বেশ কয়েকবার ভ্যানিশিং ইঙ্ক ব্যবহার করে ক্যানসেলড কথাটা লিখিয়ে নিয়ে, পরে সেই চেক ব্যবহার করে ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে নেবার অপরাধে পলাতক অপরাধী ধরা পড়ল এক তরুণীর বুদ্ধিমত্তায়।

সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে লোকাল থানার ওসি সুবীর দত্ত তিয়াষদের বাড়িতে ঘরভর্তি লোকের সামনে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কী করে আন্দাজ করলে যে ব্যাপারটায় একটা গোলমাল আছে?”
তিয়াষ হাসিমুখে বলে, “ভদ্রলোকের দুটি কাজ আমার আশ্চর্য লাগে। প্রথমত, ক্যানসেলড চেকে সই করতে হয় না, আর দ্বিতীয়ত উনি আমার থেকে চেক বইটা একরকম কেড়ে নিয়ে নিজেই নিজের পেন দিয়ে ক্যানসেলড কথাটা লিখে দেন। অথচ আমিও ঠিক ওইভাবেই ক্যানসেলড লিখতে যাচ্ছিলাম। উনি বললেন, আমার পদ্ধতিটা নাকি ঠিক নয়।
দ্বৈতা গোলগোল চোখ করে বলে উঠল, “বাপরে, তোর কী বুদ্ধি রে! আমি তো কিছুই আঁচ করিনি!
এই জন্যই বলি খবরের কাগজ পড়, নইলে পিছিয়ে পড়বি যে!তিয়াষ একটু গর্বের ভঙ্গিতে বলে, “কিছুদিন আগেই এইধরনের একটা ঘটনার কথা পড়েছিলাম, তাই খটকাটা লাগল। ওরা নিজের ভ্যানিশিং ইঙ্ক ভরা পেন দিয়ে ক্যানসেলড কথাটা লিখে দেয় আর আবেদনকারীর সাধারণ পেন দিয়ে সইটা করিয়ে নেয়। ঘন্টাখানেক পর ক্যানসেলড লেখাটা মুছে গেলে নিজের ইচ্ছেমতো টাকার অঙ্ক ভরে ব্যাঙ্ক থেকে চেকটা ক্যাশ করে নিতে কোনও অসুবিধা হয় না। অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের নামের চেক আর সই থাকার জন্য ব্যাঙ্কও কোনও সন্দেহ করে না। এইভাবে মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা করার দারুণ একটা ফাঁদ এরা পেতে বসেছে।
দ্বৈতার মা একটু বিভ্রান্তভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “এই যে ভ্যানিশিং ইঙ্ক বলছিস, আদতে জিনিসটা কী?”
তিয়াষ স্মিত মুখে বলল, “এটা আমাদের ছোটোবেলায় কেমিস্ট্রিতে পড়ানো হয়েছিল বলে জানি, একরকম রাসায়নিক তরল আছে যেটার নিজস্ব একটা রং থাকে। কিন্তু বাতাসের সংস্পর্শে আসার পর একটা বিক্রিয়া হয়ে এর রং পাল্টে গিয়ে বর্ণহীন হয়ে যায়। এইধরনের দুটি রাসায়নিক পদার্থ হল, ফেনলফথ্যালিন যার রং লাল বা গোলাপি আর নীল রঙের থাইমলফথ্যালিন। এদেরকেই ভ্যানিশিং ইঙ্ক বলা যেতে পারে। এইধরনের রাসায়নিক কলমের মধ্যে কালির বদলে ব্যবহার করে লিখলে লাল বা নীল রঙে চমত্কার লেখা যায়, কিন্তু একঘন্টার মধ্যেই সমস্ত রং গায়েব হয়ে যাবে আর রঙের সাথে সাথে ব্যাঙ্কের টাকাও হবে লোপাট!
দ্বৈতা অবাক হয়ে বলে, “কিন্তু উনি তো দেখলাম একটা জেল পেন দিয়ে লিখছিলেন। এর মধ্যে ভ্যানিশিং ইঙ্ক ভরলেন কী করে?”
তিয়াষ দ্বৈতার অজ্ঞানতায় যেন ভারি হতাশ হয়। করুণার সুরে বলল, “অনলাইন শপিং সাইটে গিয়ে ভ্যানিশিং ইঙ্ক বা ইনভিজিবল ইঙ্ক পেন লিখে সার্চ করে দ্যাখ, এক সে এক রেডি পেন পাওয়া যাবে। আমি ঠিক ঐরকম পেন দেখেছিলাম ওয়েবসাইটে, তাই খটকাটা লাগল। কোত্থাও যাবার দরকার নেই, ঘরে বসে অনলাইন অর্ডার কর, তিন-চারদিনের মধ্যেই ডেলিভারি। দেখতে এক্কেবারে বল পয়েন্ট পেনের মতো। কারও কোনও সন্দেহ করার অবকাশই নেই।
ওসি তিয়াষের কথায় ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে বললেন, “এইধরনের প্রতারকদের উত্পাত আজকাল ভীষণ বেড়ে গেছে। মানুষ নিজে যদি সচেতন না হন, তাহলে আমরা নাচার। আপনাদের মেয়েরা দারুণ বুদ্ধির কাজ করেছে। লোকটিকে বসিয়ে রেখে চুপিচুপি লোকাল থানায় ফোন করেছিল। শুধুমাত্র ওদের বুদ্ধির জোরেই একটা গ্যাং ধরা পড়ল। ওদের দলে এরকম বেশ কয়েকটি ঝানু পাজি আছে। মানুষকে চটপট লোন পাইয়ে দেবার লোভ দেখিয়ে ব্যাঙ্কের জমা টাকা নিয়ে চম্পট দেয়।
দ্বৈতা এবার একটু বিষণ্ণভাবে বলল, “কিন্তু আমাদের বুটিকটার কী হবে তাহলে?”
তিয়াষের বাবা এতক্ষণ হাঁ করে মেয়ের কান্ডকারখানার কথা শুনছিলেন। উনি তড়াক করে বলে উঠলেন, “কী আর হবে, আমাদেরই কিছু করতে হবে।দ্বৈতার বাবার দিকে চেয়ে বললেন, “কী মশাই, আপনি এক ছাড়ুন আমিও এক ছাড়ছি। কী রে, আপাতত দুলাখ পেলে তোদের বুটিক খুলতে পারবি তো? ফালতু এইসব লোনের চক্করে কোথায় ফেঁসে যাবি!
দ্বৈতার বাবা নাচার ভঙ্গিতে বললেন, “অগত্যা।
_____
অলঙ্করণঃ সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী

গল্পের ম্যাজিক:: নিউমেরোলজি - বাবিন


নিউমেরোলজি
বাবিন

কই হে? সব এখনও ঘুমুচ্ছ নাকি?
রবিবারের সক্কাল সক্কাল অমরবাবু হই হই করে হাজির বিশাল বড়ো এক চাঙারি গরম গরম ধোঁয়া ওঠা ডালপুরি আর একটা মস্ত মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে আমি আর বুল্টি বৈঠকখানা ঘরে সবে টোটোদার কাছে অঙ্কের খাতাটা খুলে বসেছিলাম ডালপুরির সুবাসে পড়া মাথায় উঠল জুল জুল করে সেদিকে চেয়ে জুতসই কিছু একটা বলার কথা ভাবছিলাম টোটোদা আলতো করে আমার জুলপিটা ধরে টান মেরে অমরবাবুকে জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার? আজ হঠাৎ সাতসকালে?
ততক্ষণে টোটোদার মা, আমাদের জেঠিমাও বেরিয়ে এসেছেন হাসিমুখে, “কী ব্যাপার দাদা, খুশির খবরটা কী?
“খুশি হব না! অমরবাবু চাঙারি আর প্যাকেটটা জেঠিমার হাতে চালান করে দিয়ে হাঁ হাঁ করে উঠলেন, “বাবলু এবার ইস্কুলে স্ট্যান্ড করেছে, বুঝলেন এক থেকে দশের মধ্যে নাম রয়েচে! নিন, ধরুন ধরুন এগুলো, সবাইকে ভাগ করে দিন
তারপর টোটোদার দিকে ঘুরে বললেন, “ধন্যি তুমি। সত্যিই গাধা পিটিয়ে ঘোড়া বানাতে পার দেখছি অমন বিচ্ছু ছেলে যে এত ভালো রেজাল্ট করবে সেটা স্বপ্নেও ভাবিনি
টোটোদা মুচকি মুচকি হাসতে লাগল
টোটোদা হল সুবোধজেঠুর ছেলে ভালো নাম, সুবাস চট্টোপাধ্যায় যাদবপুরে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়ছে দারুণ বুদ্ধি গোটাকতক টিউশনি করে নিজের হাতখরচ নিজেই চালায় আমাকে আর বুল্টিকে অঙ্ক-বিজ্ঞান পড়ায় হপ্তায় তিনদিন বুল্টি হল তিনুকাকুর মেয়ে আমাদের বাড়ির ঠিক উলটোদিকে ওদের বাড়ি আমার সঙ্গে একই ক্লাসে পড়ে আর আমি হলাম বাঘু ভালো নাম, অর্চিস্মান রায়
টোটোদাদের বাড়িটা আমাদের দুটো বাড়ি পরেই কোন্নগরে এই বিশ্বম্ভর ব্যানার্জী লেনের প্রতিটি বাড়িই প্রত্যেকের আত্মীয়ের মতো সবাই সবাইকার খুব আপন টোটোদাকেও কোনওদিন আমার নিজের দাদা ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি অমরবাবুও এই পাড়াতেই থাকেন বেশ ভালো মানুষ সদা হাস্যময় মাঝারি উচ্চতার গোলগাল ফর্সা একমাথা টাক মানুষটিকে দেখলেই আমার কেন জানি টেডি বিয়ারের কথা মনে পড়ে যায়ওঁর একটিমাত্র সন্তান, বাবলু ভীষণ বিচ্ছু ছেলে বরাবর মোটামুটি গোছের রেজাল্ট করে এসেছে তাই টোটোদা পড়াবার পর এই বছর ওর যে উন্নতি হয়েছে সেটার পুরো ক্রেডিট আর কাউকে দেওয়া যাবে না টোটোদার এই সাফল্যে আমারও খুব আনন্দ হল
ডালপুরি মুখে পুরে অমরবাবু বললেন, “এমনি সব ঠিকই আছে, তবে ওর রোল নম্বরটা নিয়ে একটু চিন্তায় আছি ভাবছি কাল একবার ইস্কুলে যাব
টোটোদা একটা জলভরা তালশাঁস সন্দেশ খুব সাবধানে কাত করে, যাতে রসটা না গড়িয়ে পড়ে এমনিভাবে, কামড় বসিয়ে বলল, “রোল নম্বর নিয়ে চিন্তা? এটা তো ঠিক বুঝলাম না
“আর বোলো না। ওর ডেস্টিনি নম্বর হল সাত, আর ওদের ইস্কুলে রোল নম্বর দেয় আগের ফাইন্যাল পরীক্ষার র‍্যাঙ্ক অনুযায়ী” অমরবাবু চোখ গোল গোল করে বললেন, “এ বছর ওর রোল নম্বর ছিল পঁচিশ দুই প্লাস পাঁচ ইজ ইকুয়াল্টু সাত, মানে ওর লাকি নম্বর কিন্তু র‍্যাঙ্ক অনুযায়ী ক্লাস সিক্সে ওর রোল নম্বর হবে এইট এটাই আমার চিন্তার কারণ যে কোনওভাবে ওটা হয় সাত, নয়তো ষোল করতেই হবে
দেখলাম টোটোদাও আমার মতো কথাটা শুনে অবাক হয়ে ভ্রূ কুঁচকে ফেলল, “কী বলছেন মশাই, ঠিক বুঝতে পারলাম না একটু বুঝিয়ে বলুন তো
অমরবাবুর ডালপুরি ফুরিয়ে গিয়েছিল উনি মিষ্টি খান না তাই প্লেটটা নামিয়ে রেখে গ্লাস থেকে একটু জল খেয়ে বললেন, “হ্যাঁ, এই ব্যাপারটা সকলে জানে না আমিও আগে জানতুম না অবনী চৌধুরীর সঙ্গে দেখা না হলে হয়তো কোনওদিন জানতেও পারতুম না জিনিসটা আশ্চর্যজনক বললেও কম বলা হবে প্রত্যেক মানুষের একটা ডেস্টিনি নম্বর থাকে
“ডেস্টিনি নম্বর!” টোটোদা ভারি অবাক হয়ে বলল
“হ্যাঁ গো, ডেস্টিনি নম্বর” অমরবাবু বললেন, “তোমার জন্ম-তারিখটা বল দিকি
“টেন ডিসেম্বর, নাইনটি সিক্স
“ইসস,” অমরবাবু চুকচুক করে উঠলেন, “একটুর জন্য হল না
“কী হল না?” আমি থাকতে না পেরে বলে উঠি বুল্টি আমাকে আলতো করে একটা চিমটি কাটল আমি ভুলে গেছিলাম বড়োদের কথার মাঝখানে কথা বলাটা টোটোদা আবার পছন্দ করে না তবে টোটোদা দেখলাম ব্যাপারটা নিয়ে এতই উত্তেজিত যে আমার কথাটা গ্রাহ্য করল না
অমরবাবু আমাদের বোঝাতে লাগলেন, “জন্ম-তারিখের মোট যোগফল যদি কারও এক হয় তো সে হল গিয়ে যাকে বলে রাজা
“কীরকম?” টোটোদা ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া স্বরে বলে, “একটু খুলে বলুন তো
“তোমার জন্ম-তারিখ দশ দশের এক আর শূন্য যোগ করলে হয় এক ডিসেম্বর মানে হলে বারো এক আর দুই যোগ করলে হয় তিন উনিশশো ছিয়ানব্বইয়ের এক, নয়, নয় আর ছয় যোগ করলে হয় পঁচিশ আবার পঁচিশের দুই আর পাঁচ যোগ করলে হয় সাত এবার সব যদি যোগ কর, মানে তারিখের এক, মাসের তিন আর বছরের সাত যোগ করলে কী হবে? এগারো আর এগারোর এক আর এক যোগ করলে হয় দুই! অর্থাৎ, তোমার ডেস্টিনি নম্বর হল দুই
আমার মাথা ঘুরতে লাগল কিস্যু মাথায় ঢুকল না বুল্টির দিকে চেয়ে দেখলাম, ওর অবস্থাও তথৈবচ
“কিন্তু তাতে কী হল?” টোটোদা যেন আমার প্রশ্নটাই করল, “আপনি কি জানেন, সত্যজিৎ রায়ের জন্ম-তারিখ দোসরা মে উনিশশো একুশ?
“দেখ বাপু, যাদের ডেস্টিনি নম্বর এক তারা হল লগন চাঁদা। তোমার দুই খুব একটা মন্দ নয় অবিশ্যি, তবে এক হলে জীবনে বহুদূর যেতে সত্যজিৎ রায়ের ডেস্টিনি নম্বর যদি দুই না হয়ে এক হত তাহলে যে আরও অনেক বেশি নাম করতে পারতেন না, সেটাই বা কে বলতে পারে?
“তাহলে যাদের ডেস্টিনি নম্বর এক নয় তারা কি জীবনে উন্নতি করবেন না?” টোটোদা ভাবলেশহীন মুখ করে জিজ্ঞেস করল আমি হাসি লুকোবার চেষ্টা করলাম অমরবাবু যে এতটা কুসংস্কারগ্রস্ত, এটা জানতাম না তবে ভদ্রলোক বেশ ভালো একটা চাকরি করেন বলে শুনেছি
“উঁহু, তা কেন হবে তবে ডেস্টিনি নম্বরকে ব্যবহার করতে পারলে জীবনে বেশি উন্নতি করা যায়
“আর একটু বুঝিয়ে বলুন” টোটোদা বলল
“যেমন তোমার ডেস্টিনি নম্বর দুই তাই যদি তোমার নামটির সাংখ্যমান দুই করা যায় তবে উন্নতি পায়ের তলায় লুটোপুটি খাবে জীবনে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ যদি দুই, এগারো বা কুড়ি তারিখে করতে পার, তোমার সাফল্য ঠেকায় কে! আমার ছেলের ডেস্টিনি নম্বর সাত তাই ওর জীবনে সাত নম্বরটি গুরুত্বপূর্ণ যদি ওর ইস্কুলের রোল নম্বর সাত করা যায় তাহলে দেখে নিও পরের বারও ভালো ফল হতে বাধ্য
আমি ভাবছি, তাহলে কি উনি বলতে চাইছেন টোটোদার পড়ানোর কোনও দামই নেই? শুধু কি নম্বরের জন্যই এত সাফল্য? ভয় হল টোটোদা রেগে না যায় কিন্তু ও দেখলাম বেশ ভালোমানুষের মতো মুখ করে জিজ্ঞেস করল, “এই বিদ্যেটি আপনাকে দিল কে? মানে কোনও বই-টই পড়ে...”
“সে অনেক বড়ো ঘটনা” অনেক পুরনো ঘটনা মনে করার ভঙ্গিতে অমরবাবু ধীরে ধীরে ভেবেচিন্তে বলতে শুরু করলেন, “আমি আগে তোমার মতোই এই নিউমেরোলজি সম্পর্কে বিলকুল ওয়াকিবহাল ছিলুম না কিন্তু একটা ঘটনার পর থেকে সমস্ত ধারণাটাই পালটে গেল খুলে বলি, রোসো
আমরা বেশ উত্সুক হয়ে তাকিয়ে রইলাম অমরবাবুর দিকে বুঝলাম, একটা জমাটি গল্প শুরু হতে চলেছে
“গেল বোশেখ মাসের কথা শনিবার সকাল নটা নাগাদ ঢাকুরিয়ায় ডাক্তার স্বরূপ ঘোষের চেম্বারে বসেছিলুম ডাক্তারবাবু রুগী দেখছিলেন কম্পাউন্ডারকে দিয়ে খবর পাঠিয়ে ডাক পড়ার অপেক্ষা করছি মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ বন্ধু রাজার কাছে শুনেছিলুম ডাক্তারবাবু নাকি একটা গাড়ি জলের দরে বেচে দিচ্ছেন বেশ ভালো কন্ডিশন আমারও একটা গাড়ি কেনার শখ ছিল সস্তায় পাওয়া যাবে শুনে রাজার মারফত ডাক্তারবাবুর কাছে আর্জি জানিয়ে পাঠাতেই মঞ্জুর হয়ে গেল তার পরদিনই পঞ্চাশ হাজার টাকা অ্যাডভান্স দিয়ে গাড়িটা বুক করে নিই সেদিন গিয়েছিলুম ডাক্তারবাবুর কাছে আমার পরিচিতি সংক্রান্ত কাগজপত্র দেবার জন্য সোমবার কোর্টে গিয়ে হস্তান্তরপর্ব পুরোপুরি চুকে যাবে তখনই উনি বাকি টাকাটা নেবেন
আমার পাশে বসে এক রোগাসোগা মোটা গোঁফওলা সুবেশ ভদ্রলোক নিউজ পেপারে অনেকক্ষণ ধরে কীসব আঁকিবুঁকি কাটছিলেনরুগী হতে পারেন আচমকা উনি অনেকটা স্বগতোক্তির ঢঙে বলে উঠলেন, ‘ইয়ে, জন্ম-তারিখটা ঠিক আছে তো?
বিষম খেয়ে বলি, ‘আপনি কী করে...’
‘চিন্তার কিছু নেই, লক্ষ করলুম, কথা বলতে বলতে ভদ্রলোক ঘন ঘন নিজের মাথাজোড়া টাকে হাত বোলাচ্ছেনবোঝা গেল এটা ওঁর মুদ্রাদোষউনি চাপা সুরে বললেন, ‘বয়স নিয়ে সমস্যা অনেকেরই থাকে একটা এফিডেবিট করে দিলেই হয়ে যাবে
“বুঝলুম, ভদ্রলোক আমার হাতে থাকা প্যান কার্ডের ফটোকপিটা লক্ষ করেছেন উনি ঠিকই বলছেনআসলে ইস্কুলে আমার জন্ম-তারিখটা ভুল ছিলবার্থ সার্টিফিকেটে সঠিক তারিখটা আছেআমার প্যান-রেশন-আধার কার্ড সমস্ত জায়গায় ভুলটাই রয়ে গেছেকিন্তু ইনি সেটা বুঝলেন কীভাবে?
“ভদ্রলোক আমার প্রশ্নটা আঁচ করলেন বোধহয়, ‘আপনার হাতের ফটোকপিতে দেখছি জন্ম-তারিখ পয়লা জানুয়ারি, ১৯৭০অর্থাৎ জন্ম-তারিখ ১, জন্ম-মাস জানুয়ারি মানে ১ আর সবসুদ্ধ যোগফলও ১ এ তো রাজযোগ! এইধরনের মানুষরা প্রচন্ড ড্যাশিং-পুশিং হয়, যেটা আপনাকে দেখে মোটেও লাগছে না
“এটাও উনি ঠিকই বললেন আমি একদমই বলিয়ে-কইয়ে নইবেশি মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারি নানিজের জগতেই ডুবে থাকিঅফিসে বাড়িতে একইরকমনিজের কমফর্ট জোন থেকে বেরোতে ভীষণ ভয় পাইতবে ভদ্রলোকের কথার পুরোটা আমার কাছে পরিষ্কার হল নাতাই জিজ্ঞেস করলুম, ‘মোট যোগফল ১ কীভাবে হয়? ঠিক বুঝতে পারলুম না
উনি বোঝালেন, ‘পুরো জন্ম-তারিখটা যোগ করলে হয় উনিশ, ১+১+১+৯+৭+০ = ১৯ আবার উনিশের ১ ও ৯ যোগ করলে হয় ১০ আর দশের ১ আর ০ যোগ করলে তো ১ হয়!’
কিন্তু এর সঙ্গে ড্যাশিং-পুশিংয়ের কী সম্পর্ক আছে?
“উনি বললেন, ‘পুরোটাই! এই দুনিয়ায় ঘটা সব ঘটনার সঙ্গেই নম্বরের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে
“বিশ্বাস করো, আমার হাসি পেল হাসি চেপে ভালোমানুষের মতো মুখ করে জিজ্ঞেস করি, ‘কীভাবে?
আপনার আসল জন্মতিথিটি বলুন দেখি অমরবাবু।’ উনি আমার নামটাও দেখে ফেলেছেন বুঝলুম
৬ আগস্ট, ১৯৭২
তার মানে ৬+৮+১+৯+৭+২ = ৩৩ = ৩+৩ = ৬ হল? ভদ্রলোক ভারি খুশি হয়ে হাতে হাত ঘষতে ঘষতে বললেন, ‘এবার আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ গোটা কয়েক তারিখ বলুন দিকি
“ভেবে দেখলুম, আমার বিয়ের তারিখ ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০০৫তার মানে ৬ তো রয়েইছে, আবার ৬+২+২+০+০+৫ = ১৫ = ১+৫ = ৬
দেখলেন?
আমিও তলিয়ে দেখি, যেখানে আজ প্রায় বছর চোদ্দ ধরে চাকরি করছি সেই কোম্পানির অফার লেটার পেয়েছিলুম ২৪ এপ্রিল, ২০০৩ তারিখেতার মানে ২৪ হল ২+৪ = ৬ আর ২+৪+৪+২+০+০+৩ = ১৫ = ৬!
“জীবনে কিছু কিছু দিন থাকে যেগুলোকে কখনও ভোলা যায় না যেমন এই চাকরি পাবার দিনটা এটাই আমার প্রথম চাকরি নয় যদিও কিন্তু আগের কোম্পানি থেকে চাকরি যাবার পর বেশ হতাশায় ভুগছিলুম এই চাকরিটা আমাকে যেন খাদের ধার থেকে টেনে আনে তাই তারিখটা কক্ষনও ভুলতে পারব না
এবার এটা দেখুন,’ ভদ্রলোক চটপট একটা ছক এঁকে দেখালেন


“আশ্চর্য! আমার নামের সাংখ্যমান ৬, আবার পদবিতেও রয়েছে ৬! ব্যাপারটার মধ্যে একটা চমত্কারিত্ব আছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই কিন্তু ধন্দ কাটে না আমার জিজ্ঞেস করলুম,আমার নাম তো বাবা-মা এই সাংখ্যমান মিলিয়ে রাখেননি, এটা তো কাকতালীয়ই বলা যেতে পারে, তাই না?
“অবনীবাবু বললেন,অবশ্যই এটা কাকতালীয় আপনার বাবা-মা নিশ্চয়ই নিউমেরোলজি মেনে নাম রাখেননি কিন্তু এই মিলটুকুর জন্যই আপনি আজ উন্নতির শিখরে আমার ধারণা, কর্মক্ষেত্রেও আপনি যথেষ্ট উন্নতি করেছেন এবং তার জন্য আপনার নামটাই দায়ী আপনার নামের সাংখ্যমান আপনাকে অনেক দূর নিয়ে যাবে
“হয়তো ব্যাপারটা কাকতালীয়, তবুও ভেবে দেখলুম, আমার জীবনের অনেক ঘটনাই জড়িয়ে আছে ৬ সংখ্যাটির সঙ্গেআর আমি জীবনে অনেকটাই উন্নতি করেছি, অথচ বলার মতো তেমন কোনও গালভরা ডিগ্রি আমার নেই সত্যিই কি নম্বরের জাদু আছে?
আলাপ করলুমভদ্রলোকের নাম অবনী চৌধুরীপেশায় বেসরকারি চাকুরে অবনীবাবু নিউমেরোলজি নিয়ে শখের চর্চা করেনএই নিয়ে নাকি অনেক বইপত্রও পাওয়া যায়ব্যাপারটা আমার বেশ আকর্ষণীয় লাগলআগে এসব নিয়ে শুনিনি বা জানিনি কখনওওর সঙ্গে আমার বিজনেস কার্ড বিনিময় করলুম
“ডাক্তারবাবুর চেম্বার থেকে আমার ডাক পড়েছিল উঠে যাচ্ছিলুম, ভদ্রলোক আমার দিকে একটু এগিয়ে এসে বিদঘুটে চোখে চেয়ে প্রায় ফিসফিস করে বললেন, মশাই, ৩ নম্বরটা থেকে সাবধান ৬ যেমন আপনার জন্য ভালো, তেমনি থ্রি আপনার জন্য ভয়ংকর রকমের বিপজ্জনক পারলে এই সংখ্যাটা এড়িয়ে চলবেন
“ডাক্তারবাবুর হাতে ডকুমেন্টগুলো জমা দিয়ে আপিসে ফিরলুমআমাদের একটা নতুন আপিস তৈরি হচ্ছে নিউটাউনের দিকে ইলেকট্রিকের কাজ কতটা এগিয়েছে সেটা দেখার জন্য যেতে হবে সচরাচর আপিসের কাজে বাইরে যেতে হলে আপিসের গাড়িই পাওয়া যায় কিন্তু সেদিন গাড়িগুলো নানান দিকে বেরিয়ে গেছিল একটাও গাড়ি বা ড্রাইভার ফাঁকা ছিল না তাই ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে পড়লুম বেলা বারোটা নাগাদলম্বা রাস্তা প্রায় ঘন্টা খানেকের জার্নিআসনে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে একটু ঘুমাবার চেষ্টা করছিলুম কিন্তু মাথার মধ্যে সেই অদ্ভুতুড়ে সংখ্যাগুলো আবার ঘুরতে লাগলঅবনী চৌধুরী বলছিলেন, আমার জন্য ৩ নাকি খুব খারাপ সংখ্যাভেবে দেখলুম, ৩ এপ্রিল ২০০৩ অ্যালকাসফট থেকে চাকরি চলে যায় কোম্পানি লোকসানে চলছিল বলে যেসব কর্মীদের ছাঁটাই করে আমিও তাদের মধ্যে ছিলুম ৩ বছর কাজ করেছিলুম ওই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে১২ মে ২০১২ মরতে মরতে বেঁচে গেছিলুম একটা বাইক দুর্ঘটনায়পা ভেঙে ৩ মাস বিছানায় শয্যাশায়ী থাকতে হয়েছিল


এই সময় জেঠিমা আমাদের জন্য চা নিয়ে এলেন বলে অমরবাবুকে থামতে হল চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে উনি বলতে থাকলেন, “এইসব ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে গেল ডাক্তার স্বরূপ ঘোষের গাড়ির নম্বরটা WB02AH3333! চমত্কার নম্বর মনে রাখার জন্য ভীষণ সোজা এই বিশেষ নম্বরটা পাবার জন্য ডাক্তারবাবু প্রায় দশ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ করেছেন একে বলে প্রাইম নম্বর মনে মনে যোগ করে চমকে উঠলুম! আরে এটাও তো তিন নম্বর! তার মানে নিউমেরোলজির হিসেব মতো এটা আমার জন্য খুব একটা ভালো হবে না! কিন্তু সত্যিই কি তাই হয়? এত সস্তায় গাড়িটা পেলুম, সেটা ছেড়ে দেব?
“আমাদের ঠিক পিছন পিছন অনেকক্ষণ ধরে একটা ট্রাক আসছিল মাঝে মাঝেই সেটা ওভারটেক করার চেষ্টা করছিল কিন্তু পাশাপাশি আরও অনেক গাড়ি থাকায় সেটা পারছিল না বারবার হর্নের আওয়াজে বিরক্ত হয়ে চোখ মেলতেই সামনের আসনের পেছনে লেখা ট্যাক্সির নম্বরটায় চোখ পড়ল WBJ011533! মনে মনে হিসেব করে চমকে উঠলুম! সাংখ্যমান ৫+২+১+০+১+১+৫+৩+৩ = ২+১ = ৩! একের পর এক চমক! মানে আমার জন্য আবারও একটা বিপজ্জনক সংখ্যা! বিস্ময়, হতবুদ্ধিতা আর আতঙ্ক মিলিয়ে মিশিয়ে আমি ভয়ে প্রায় আর্তনাদ করে উঠলুম কিন্তু বললে বিশ্বাস হবে না তোমাদের, ঠিক সেই মুহূর্তেই ট্যাক্সি ড্রাইভার কেন জানি আচমকা গাড়িতে ব্রেক কষে দিলতীব্র একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ট্যাক্সির বাঁদিকের দরজাটা খুলে গেল আর আমি ছিটকে পড়লুম রাস্তায় কিন্তু ট্যাক্সিটার ঠিক পেছনে ফুল স্পীডে আসা ট্রাকটা ব্রেক কষতে পারল নাপ্রচন্ড বেগে ট্রাকটা চোখের পলকে আমাদের ট্যাক্সিটার ওপর উঠে গেল বীভত্স একটা শব্দ করে ট্যাক্সিটাকে তালগোল পাকিয়ে দিয়ে খানিকটা ঘষটে ঘষটে এগিয়ে ট্রাকটা থেমে গেল দুর্ঘটনার পর কিছুক্ষণের জন্য কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলুম তবে সামান্য ছড়ে যাওয়া ছাড়া আর তেমন কিছু ক্ষতি হয়নি আমার আশেপাশে দ্রুত একটা ভিড় জমে গেল ট্রাক ড্রাইভার ততক্ষণে ট্রাক ফেলেই চম্পট দিয়েছে হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে ওঠার পর নজরে এল, ট্রাকটার নম্বর GJ03ER0011 - গুজরাটের ট্রাক এই নম্বরগুলো সারাজীবনেও ভুলতে পারব না! গুণে দেখেছি সাংখ্যমান ৬যা কিনা আমার জন্য লাকি! সেইজন্যই কি দুর্ঘটনার মুহুর্তে দরজা খুলে আমি ছিটকে পড়ি? ওই নম্বরই কি আমাকে বাঁচিয়ে দিল? জানি না, কোনও উত্তর নেই আমার কাছে
খুব স্বাভাবিকভাবেই ট্যাক্সি ড্রাইভার প্রাণে বাঁচেনিপুলিশ এসে যখন ওর পকেটে থাকা ড্রাইভিং লাইসেন্সটা চেক করছিল, দেখলুম ওর জন্ম-তারিখ ১২ ডিসেম্বর, ১৯৭৫১২ মানে ৩, ডিসেম্বর মানেও ১২ অর্থাৎ ৩, আবার সমস্ত সংখ্যাগুলো যোগ করলেও ৩ হচ্ছেঅবনী চৌধুরীর কথামতো নিউমেরোলজির হিসেবে ৩-এর জন্য ৬ হল অশুভ সংখ্যা
“এই ঘটনাটার পর আমি প্রচন্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলুম অনেকদিন বাড়ি থেকে বাইরে বেরুতেই পারিনি ওই ট্যাক্সি আর ট্রাকটার নম্বর দুটো কোনদিনও ভুলতে পারব না বাস-ট্যাক্সি চাপলেও আমি নম্বরটা মিলিয়ে দেখে তারপরই চড়ি জীবন তো একটাই, ভাই!
“সে রাতেই অবনী চৌধুরীকে ফোন করে সমস্ত ঘটনা জানিয়ে বলেছিলুম যে ডাক্তার স্বরূপ ঘোষের গাড়িটা আমি মোটেও কিনছি না সে উনি অ্যাডভান্সের টাকাটা ফেরত দেন, চাই না দেন সমস্ত ঘটনাটা মন দিয়ে শুনে ভদ্রলোক দুঃখ প্রকাশ করে সহানুভূতি জানালেন তারপর ব্যাপারটা নিয়ে আরও বইপত্র কিনে পড়াশোনা করে দেখেছি
“তা অ্যাডভান্সের টাকাটা ফেরত পেয়েছিলেন কি?” টোটোদা জিজ্ঞেস করল
“হ্যাঁ, দিন কতক পর ডাক্তারবাবু ওঁর ড্রাইভারকে দিয়ে আমার আপিসে টাকাটা ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন উনি ভারি ভদ্রলোক
“হুম” টোটোদা কী যেন ভাবতে ভাবতে বলল, “গাড়ির নম্বরটা কী যেন বললেন? ডব্লিউ বি জিরো টু...” বলতে বলতে টোটোদা নিজের মোবাইল খুলে মেসেজ বক্সে কী যেন খুটখাট করতে লাগল
“এ এইচ থ্রি থ্রি থ্রি থ্রি ভীষণ ক্যাচি নম্বর” অমরবাবু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, “কী করবে?
টোটোদা ওঁর দিকে চেয়ে বলল, “আর.টি.ও.-র একটা এসএমএস ব্যবস্থা আছে বাহন ভি এ এইচ এ এন, তারপর একটা স্পেস দিয়ে গাড়ির নম্বর লিখে ৭৭৩৮২৯৯৮৯৯ নম্বরে এসএমএস করলেই গাড়ির মালিকানাসংক্রান্ত সমস্ত বিবরণ ফিরতি এসএমএসে আপনার কাছে এসে পৌঁছবে
“তার মানে?” অমরবাবু কিছু বলার আগে বুল্টিই সবার হয়ে জিজ্ঞেস করে ওঠে
টোটোদা বাঁ কানের ওপরের চুলে আঙুল ঘষতে ঘষতে মুখে রহস্যময় একটা হাসি নিয়ে বলল, “ডাক্তারবাবুর গাড়িটা এখন কার কাছে আছে সেটা জানতে হবে না?
টুং করে আওয়াজ করে একটা এসএমএস ঢুকল টোটোদার নম্বরে আমি আর বুল্টি হুমড়ি খেয়ে পড়লাম মোবাইলটার ওপর টোটোদা এক ঝলক দেখেই মুচকি হেসে উঠল অমরবাবু আশ্চর্য ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হল?
“যেটা আন্দাজ করেছিলাম সেটাই হয়েছে” টোটোদা ভ্রূদুটো তুলে ঠোঁটের ডগায় হাসিটা ঝুলিয়ে রেখে বলল, “গাড়িটা এখন অবনী চৌধুরীর নামেই রেজিস্টার্ড আপনাকে নিউমেরোলজির গপ্পো শুনিয়ে ভয় পাইয়ে দিয়ে গাড়িটা কেনা থেকে পিছু হটিয়ে দেয় এলেম আছে বলতে হবে ভদ্রলোকের
“তার মানে!” অমরবাবু যেন আকাশ থেকে পড়েন
“আপনার সঙ্গে যেটা হয়েছে সেটা কাকতালীয় বলেই আমার ধারণা” টোটোদা বলল, “আর গাড়ি দুর্ঘটনাটার জন্য আপনি নিজেই দায়ী ছিলেন সেদিন যদি আপনি ভয় পেয়ে চিত্কার না করে উঠতেন, ট্যাক্সি ড্রাইভারও অন্যমনস্ক হয়ে ব্রেক কষত না, আর দুর্ঘটনাটাও আদৌ ঘটত না এর জন্য নম্বরকে মোটেই দায়ী করা যায় না সবচেয়ে ভালো হয় যদি আপনি একবার আপনার বন্ধু রাজার মাধ্যমে খবর নেন আমার বিশ্বাস অবনীবাবুও গাড়িটা কেনার জন্য ঘুরঘুর করছিলেন খবরটা পেতে ওঁর একটু দেরি হয়ে যায় ততদিনে আপনি গাড়িটা কেনার জন্য অ্যাডভান্স করে বসে আছেন তাই আপনাকে রাস্তা থেকে সরাতেই উনি এই চালাকিটা করেনউনি জানতেন, একবার যদি এই নম্বরের ভূত আপনার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া যায় তাহলে ওই গাড়ি আর আপনি কিনবেন না তাই কায়দা করে আপনাকে বুঝিয়ে দেন যে তিন নম্বর আপনার জন্য ভীষণ ক্ষতিকর
“বলছ কী!”
“হুম এটাই হল সত্যি
অমরবাবু খানিকটা অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে বললেন, “তার মানে তুমি বলতে চাও, সমস্ত ব্যাপারটাই অবনী চৌধুরীর কারসাজি ছিল!”
“অবশ্যই! দুর্ঘটনাটুকু বাদ দিয়ে একটু তলিয়ে দেখলে এমন অনেক ভালো ঘটনাই পাবেন যেগুলো আপনার লাকি নম্বরওয়ালা দিনে হয়নি” টোটোদা অমরবাবুর দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলতে থাকল, “আবার এমন অনেক দুঃখজনক ঘটনাও খুঁজে পাবেন যেগুলো আপনার শুভদিনগুলোতে ঘটেছে
“হুম,” অমরবাবু মুষড়ে পড়া গলায় বললেন, “তাহলে দেখা যাচ্ছে এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে নম্বরের কোনও ভূমিকাই নেই
“মানুষের এসব অতিপ্রাকৃত ব্যাপারের প্রতি আগ্রহটাকে কাজে লাগিয়ে কত লোক যে করে খাচ্ছে, তার ইয়ত্তা নেই! এজন্যই তো জ্যোতিষী, বাবাজীরা এই একবিংশ শতাব্দীতেও রমরমিয়ে ব্যাবসা চালিয়ে যাচ্ছে” টোটোদা আমার অঙ্কের খাতাটা টেনে নিয়ে উদাস সুরে বলল, “যাক তাহলে বাবলুর রোল নম্বর পাল্টাবার জন্য আর আপনাকে স্কুলে যেতে হচ্ছে না তো?
একটু লজ্জা লজ্জা গলায় মাথা চুলকে অমরবাবু বললেন, “সে আর বলতে!”

(গল্পে ব্যবহৃত সমস্ত সংখ্যাই কাল্পনিক এর সঙ্গে বাস্তব কোনও ঘটনার বিন্দুমাত্র মিল নেই)
_____
অলঙ্করণঃ পুষ্পেন মণ্ডল