সুপারহিরো:: জয়গড়ের বাহাদুর - রাখী আঢ্য

   

জয়গড়ের বাহাদুর
রাখী আঢ্য

বিশ্বসাহিত্যে কমিকস-এর জন্ম বলতে মোটামুটি ১৯২০-র দশককেই ধরা হয় কমিকসের হাত ধরে সুপারহিরোদের জন্ম তো আরও পরে কিন্তু আজ তোমাদের যে ভদ্রলোকের, থুড়ি সুপারহিরোর গল্প বলতে চলেছি তিনি বাঙালি না হলেও আপামর বাঙালির কাছে একজন আদ্যোপান্ত ঘরের ছেলে, যার নানা কীর্তিকাহিনি মিশে আছে আমাদের প্রায় প্রত্যেকেরই ছোটোবেলার বইয়ের ফাঁকে, একাকী দুপুরে বা রোমাঞ্চকর স্বপ্নে
সময়টা মার্চ ১৯৬৪ বিখ্যাত পাবলিশার্স গ্রুপ ‘দি টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ এবং ‘বেনেট, কোলম্যান এন্ড কোং’ বাজারে নিয়ে এলেন এক নতুন সিরিজ 'ইন্দ্রজাল কমিকস' ঝকঝকে ছাপা, রোমাঞ্চকর গল্প, পরিচ্ছন্ন ড্রয়িং এসবের মেলবন্ধন এক নিমেষে মন কেড়ে নিল আপামর ভারতীয় পাঠককুলের ইন্দ্রজাল কমিকস প্রথম ৩২টি সংখ্যা ছিল শুধুমাত্র ফ্যান্টম বা বেতালের গল্প নিয়ে তারপর আস্তে আস্তে বইয়ের পাতায় উঠে আসতে থাকে জাদুকর ম্যানড্রেক, ফ্ল্যাশ গর্ডন বা বাজ সয়ার-এর মতো কমিক সুপারহিরো চরিত্রগুলি আর বাংলা ভাষায় ইন্দ্রজাল কমিকস-এর প্রথম আগমন জানুয়ারি ১৯৬৬-তে
সবই ঠিক ছিল কিন্তু ধীরে ধীরে কোথায় যেন তাল কাটছিল ফ্যান্টম, ম্যানড্রেক, টারজান এরা সবাই সুপারহিরো, কিন্তু ওই যে ঘরোয়া ঘরোয়া গন্ধ সেটাই যেন পাওয়া যাচ্ছিল না টাইমস গ্রুপ-এর বিখ্যাত কার্টুনিস্ট ও ইন্দ্রজাল কমিকস-এর অন্যতম রূপকার আবিদ সূর্তীর কাছে প্রস্তাব গেল এমন এক সুপারহিরো সৃষ্টির যে কিনা হবে আপাদমস্তক ভারতীয় সময়টা ডিসেম্বর, ১৯৭৬ আমেরিকায় তখন তৈরি হয়েছে বাহাদুর ফ্যান ক্লাব নামে এক প্রবল জনপ্রিয় সুপারহিরো ফ্যান ক্লাব অন্যদিকে কিছুদিন আগেই ভারতে মুক্তি পেয়েছে 'শোলে' সিনেমাটি তাকে নিয়ে উন্মাদনা তখন চরমে অমিতাভ বচ্চনের ৬ ফুটিয়া অ্যাংরি ইয়ং ম্যান ইমেজ তখন সমস্ত ভারতীয় কিশোর তথা যুব সমাজের কাছে একটা আইকনের মতো মধ্যপ্রদেশের চম্বল তথা সেখানকার ডাকাতদের গল্প তখন লোকের মুখে মুখে ফিরছে আর এইসবেরই মেল বন্ধনে আবিদ তথা ইন্দ্রজাল কমিকস বাজারে নিয়ে এলেন গেরুয়া পাঞ্জাবি আর ব্লু জিনস-এ, মার্শাল আর্টে পারদর্শী আর ঘাড় পর্যন্ত লম্বা চুলওয়ালা এক আপাদমস্তক সুঠাম ভারতীয় সুপারহিরোকে - 'বাহাদুর - দ্য ব্রেভ ম্যান' ইন্দ্রজাল কমিকস-এর নতুন সংখ্যা 'লাল ইটের বাড়ি'- (#২৬৭) হাত ধরে ১৯৭৬ থেকে ১৯৯০-এর মধ্যে বাহাদুর-এর মোট ৭৫টি কমিকস প্রকাশিত হয়, তার মধ্যে প্রথম ১২টি মিঃ সূর্তী লিখেছিলেন ও শেষ ৬৩টি মিঃ  জগজিৎ উপল কমিকসগুলি ইলাস্ট্রেট করেন গোবিন্দ ব্রাহ্মণানিয়া ও পরবর্তীকালে তাঁর পুত্র প্রমোদ ব্রাহ্মণানিয়া
'আমি বাহাদুরকে একদম ভারতীয় সুপার হিরো বানাতে চেয়েছিলাম,’ মিঃ সূর্তী পরবর্তীকালে এক ইন্টারভিউতে বাহাদুর ও তার পোশাক সম্পর্কে চর্চা করতে গিয়ে বলেছিলেন, 'তাই বাহাদুরের গেরুয়া পাঞ্জাবি যা ভারতীয়ত্বের প্রতীক নীল জিনস পাশ্চাত্য ঘরানার পোশাক হলেও ভারতীয় সমাজের অগ্রগতির পরিচয় বহন করে'

 

বাহাদুরের জন্মের প্রেক্ষাপট রচনা হয়েছিল তৎকালীন কুখ্যাত চম্বল এবং সেখানকার ডাকাত দলকে ঘিরে 'লাল ইটের বাড়ি' থেকে জানা যায় বাহাদুর হল চম্বলের তৎকালীন কুখ্যাত ডাকাত ভৈরব সিং-এর পুত্র বাহাদুর-এর মাতৃ পরিচয় জানা যায় না ডাকাত ভৈরব সিং-কে মারার পর পুলিশ চিফ বিশাল কিশোর এবং অনাথ বাহাদুরকে নিজের কাছে রেখে মানুষ করেন কিশোর বাহাদুর প্রতিজ্ঞা করে যে সে তার বাবার মৃত্যুর বদলা নেবে, কিন্তু পরবর্তীকালে বিশালের পিতৃস্নেহ ও ভরণপোষণ বাহাদুরকে ফিরিয়ে আনে অন্ধকার থেকে আলোর পথে জন্ম হয় ছোট্ট শহর জয়গড়ের রক্ষাকর্তা এক সুপারহিরোর পরবর্তীকালে আমরা দেখি বাহাদুর তার বাবার সঞ্চিত গুপ্তধন তিনটি পর্যায়ে উদ্ধার করে মানুষের কাজে লাগায় এই অভিযানগুলির নাম 'জয় গড়ের গুপ্তধন' (V ২১, #১১), 'বাহাদুর ও অদৃশ্য রক্ষাকারী' এবং 'মরুভূমির বিভীষিকা' (V ২১, #৪১)
বাহাদুর সিরিজের চতুর্থ গল্প 'সাদা ভূতের আড্ডা' (#২৮৪)-তে আমরা প্রথম পাই বাহাদুরের বান্ধবী বেলাকে তন্বী, সুশ্রী, মার্শাল আর্টে পারদর্শী বেলা পিপলীর শেঠ শিবরামের পুত্রী শিবরামকে বাহাদুর ডাকাতের হাত থেকে বাঁচানোর সময় সেই যে বেলার সঙ্গে বাহাদুরের বন্ধুত্ব হয়েছিল, সে বন্ধুত্ব অটুট থাকে বাহাদুর সিরিজের শেষ গল্প 'সাপুড়ের টোপ' (V ২৯, #) (১৯৯০) পর্যন্ত 'সাপুড়ের টোপ' গল্পে শেষ পর্যন্ত বাহাদুর জীবনসঙ্গিনী রূপে বেছে নেয় বেলাকেই



বাহাদুরের বহু অভিযানই জয়গড় এবং তার পারিপার্শ্বিক-কে ঘিরে অবশ্য গল্পের প্রয়োজনে বাহাদুর কখনও গিয়েছে জঙ্গল, কখনও পাহাড়, কখনও বা মরুভূমিতে মুম্বাই থেকে শিখে এসেছে কুংফু একদিকে ক্যারাটে, অন্যদিকে কুংফু - এই দুইয়ের মিশেলে একসময় বাহাদুর অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল অবশ্য মাঝে মাঝে ইচ্ছা করেই হার স্বীকার করেছে পরিস্থিতির প্রয়োজনে এবং বৃহত্তর জয়ের খাতিরে, আর এইখানেই বাহাদুরের গল্পের বাস্তবতা 'নিয়তির অভিশাপ' (V ২৪, #১১) অভিযানে বাহাদুর মোকাবিলা করে সত্যি ভূতের
কিশোর জীবন অতিক্রম করার পরে পরেই দুষ্টের দমনের জন্য নিজেকে পূর্ণরূপে নিয়োজিত করে বাহাদুর জয়গড়ে গড়ে তোলে নাগরিক সুরক্ষা দল (Citizen Security Force) শুধু দমনকার্যই নয়, অপরাধীকে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার কাজটাও সমানভাবে করেছে এই সিএসএফ বাহাদুর সিরিজের আর এক বর্ণময় চরিত্র এবং বাহাদুরের বিশ্বস্ত অনুচর লাখান একসময় ডাকাত সর্দার ছিল পরবর্তীকালে সে পুলিশের হাতে আত্মসমর্পণ করে এবং বাহাদুরের সঙ্গে যোগ দেয় এ ছাড়াও বাহাদুরের গল্পে বারে বারে ফিরে এসেছে পুলিশ কমিশনার বিশাল, গ্রাম প্রধান মুখিয়া এবং বৃদ্ধ সুখিয়া, যে নিজে একসময় কুখ্যাত ডাকাত শয়তান সিং-এর অনুচর ছিল ইন্দ্রজাল কমিকসের অমর সৃষ্টি ফ্যান্টমের বিখ্যাত নেকড়ের মতোই আমরা পাই বাহাদুরের বিশ্বস্ত পাহাড়ি নেকড়ে ছমিয়াকে
কিছুটা গল্পের খাতিরে এবং কিছুটা সময়ের সঙ্গে তাল রাখতেই শেষ দিকে দশ-বারোটি অভিযানে বাহাদুরকে আমরা পেয়েছি আরও আধুনিক রূপে লম্বা চুল কেটে ছোটো হয়, পরিধানে গেরুয়া পাঞ্জাবির পরিবর্তে আসে গেরুয়া রঙের ফুল টি শার্ট এবং নীল জিনস ১৯৯০-এ বাহাদুরের শেষ অভিযান পর্যন্ত তার এই পোশাকই বজায় ছিল
এপ্রিল ১৯৯০ কোনও এক অজ্ঞাত কারণে টাইমস অফ ইন্ডিয়া চিরতরে বন্ধ করে দিল ইন্দ্রজাল কমিকস-এর প্রকাশনা শেষ হল ফ্যান্টম, ম্যানড্রেক, বাহাদুরের মতো কমিকসের জগতের বর্ণময় সুপারহিরোদের মনকাড়া অভিযানগুলি আজ আর বাচ্চারা হয়তো ইন্দ্রজাল কমিকস পড়ে না কিন্তু আমরা যারা মধ্যবয়সি, তাদের ছেলেবেলাটা কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই আটকে আছে স্কুলের বইয়ের ফাঁকে লুকানো ইন্দ্রজাল কমিকসে, যেখানে কেউ নিজেকে ভাবতাম ফ্যান্টম, কেউ ম্যানড্রেক, কেউ বা বাহাদুর, অথবা কেউ বা ডায়না অথবা বেলা
বহু পুরোনো এবং দুষ্প্রাপ্য হওয়ার জন্য বাহাদুরের সব ক’টি অভিযানের নাম জোগাড় করা সম্ভব হল না তবু চেষ্টা করেছি প্রকাশকাল নির্বিশেষে একটা তালিকা বানানোর বাহাদুরের বাকি অভিযানগুলির নাম পাঠকরা অবশ্যই যোগ করতে পারেন -
) লাল ইটের বাড়ি
) কালো মেঘের ছায়া
) মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা
) সাদা ভূতের আড্ডা
) অথৈ জলের গুপ্তধন
) নন্দী নদীর সেতু
) রক্ত লোলুপ নেকড়ে
) জয়গড়ের গুপ্তধন
) নীলগিরির আতঙ্ক
১০) কালো ছায়ার রহস্য
১১) শিকারগড়ের নেকড়ে
১২) লাল পাহাড়ের রহস্য
১৩) বাহাদুর ছেলেধরার দল
১৪) রাজধানী এক্সপ্রেস
১৫) মরু শয়তানের পিছনে
১৬) চম্বলের রাজসিং
১৭) মুন্ডুহীন প্রেত
১৮) সোনালী মিশর
১৯) শয়তানের ছোট্ট সাকরেদ
২০) ড্রাগনের নিঃশ্বাস
২১) আঁধারের অভিশাপ
২২) সবুজ বনের দুঃস্বপ্ন
২৩) মাঝসাগরের বিস্ফোরণ
২৪) কেউটের জিভে বিষ
২৫) গোখরোর ফণা
২৬) পান্থশালায় ঝড়
২৭) মরুভূমির বিভীষিকা
২৮) অপরাজেয় বাহাদুর
২৯) আলোর পথের পথিক
৩০) রক্তে রাঙা অর্জনগড়
৩১) সূর্যোদয়ের পরে
৩২) বীরাঙ্গনার অভিমান
৩৩) নরকের হাতছানি
৩৪) রক্তলোলুপ চিতা
৩৫) নিয়তির অভিশাপ
৩৬) রক্তাক্ত প্রতিশোধ
৩৭) প্রতিহিংসার আগুন
৩৮) উপত্যকার আহ্বান
৩৯) অভিশপ্ত নিঃশ্বাস
৪০) শিকারী নেকড়ে
৪১) পাপের বীজ
৪২) বিষের ধোঁয়া
৪৩) মুখোশধারী রাজকুমারী
৪৪) কালো ছায়ায় হাতছানি
৪৫) গুপ্তধনের অভিশাপ
৪৬) মুখোশের মায়া
৪৭) অপরাধের স্রোত
৪৮) প্রেতাত্মার ক্রোধ
৪৯) বজ্রের কবলে
৫০) শান্তির দূত বাহাদুর
৫১) বাহাদুরের অভিযান
৫২) রক্তঝরা রাত
৫৩) শয়তানের ছোট্ট সাগরেদ
৫৪) সোনালি মিনার
৫৫) চম্বলের রাজসিং
৫৬) কলিঙ্গ তটের কাহিনি
৫৭) অর্জনপুরার হত্যাকান্ড
৫৮) বাহাদুর অদৃশ্য রক্ষাকারী
৫৯) নীল সাগরে দুর্বিপাক
৬০) সাপুড়ের টোপ

 
 
_____
(ছবি সূত্রঃ কিছু ইন্টারনেট, কিছু নিজস্ব সংগ্রহ থেকে)

সুপারহিরো:: আমার পছন্দের সুপারহিরো - শায্যাম - পার্থ মুখার্জি

আমার পছন্দের সুপারহিরো - শায্যাম
পার্থ মুখার্জি

১৯৩৯ সাল। সারা দুনিয়া জুড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে ঊঠেছে পুরো দমে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো, আমেরিকার নারী পুরুষ, বিশেষ করে ছোটো শিশুদের চোখে ঘুম নেই। তাদের সবার চোখে ভয়, যুদ্ধের ভয়! ঠিক এই সময়ে, শিশুদের মন থেকে ভয়কে তাড়ানোর জন্য এগিয়ে এলেন কিছু শিল্পী আর লেখকগণ তাঁরা এই অশান্ত পরিবেশে ছোটোদের কল্পনার জগতকে দিতে চাইলেন অন্য রং। তাই তাঁদের হাত ধরে একে একে পৃথিবীর আলো দেখল একের পর এক অতিমানবেরা। সুপারহিরোরা। আর ছোটোরা দেখল, তাদের হিরোরা কীভাবে ভারী ট্যাঙ্ক কাগজের মতো মুচড়িয়ে ছিঁড়ে ফেলছে। শত্রুদের লাথি ঘুষিতে করছে কুপোকাত! মহাকাশে উড়ে যাচ্ছে। নতুন নতুন ভিলেনদের মেরে ঠান্ডা করে দিচ্ছে। রকেট মিসাইল অনায়াসেই ধরে ছুঁড়ে দিচ্ছে শত্রুদের দিকে। এই সব দেখে ছোটোরা বেশ মজা পেয়ে গেল। তারা ভয় পাওয়া ছেড়ে দিল, করতে চাইল সেই অতিমাবদের অনুকরণ। স্বপ্নে বিভোর হয়ে ভুলে গেল যুদ্ধের বীভৎসতাকে।

শিল্পী অ্যালেক্স রস-এর আঁকা SHAZAM (ক্যাপ্টেন মার্ভেল)-এর ছবি

নেপথ্যের কাহিনি
ঐ বছরের নভেম্বর মাসের এক বিকেল আমেরিকার এক সরাইখানায় দুই কমিকসপ্রেমী বন্ধু অর্থাৎ চিত্রশিল্পী চার্লস ক্লেরেন্স বেক এবং কমিকস লেখক বিল পার্কার ঠিক করলেন কমিকসের দুনিয়ায় অতিমানবদের ভিড়ে তারা নতুন কোনও চরিত্রকে সামিল করবেন ওঁরা দুজনেই কাজ করতেন ‘ফসেট কমিকস’ দপ্তরের ‘হুইজ কমিকস’ বিভাগে দু’জনেই চাইছিলেন, কমিকসের পাতায় এমন একজন অতিমানব আসুক, যে হবে অন্য সবার থেকে কিছুটা আলাদা। কিন্তু সেই ‘আলাদা’ ব্যাপারটা ছোটোরা নেবে তো? তারা তাদের নতুন হিরোকে হাসিমুখে গ্রহণ করবে তো? এই সব নানা প্রশ্ন ছিল ওঁদের মাথায়। বিল পার্কারের বাড়িতে রোজ সকালে একটা বাচ্ছা ছেলে কাগজ দিতে আসত। বেশ চনমনে ছেলেটি। তাকে দেখেই বিল ভেবে ফেললেন তাঁকে কী করতে হবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ তিনি লেখা শুরু করলেন নতুন সুপারহিরোকে নিয়ে। চিত্রশিল্পী চার্লস প্রথমে কিছু বুঝতে পারেননি। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি সবটাই বুঝলেন। দু’জনের মুখেই হাসি ফুটল। কারণ তাঁরা জানতেন, আমেরিকার শিশুদের তাঁরা কী উপহার দিতে চলেছেন।

ক্যাপ্টেন মার্ভেল বা SHAZAM-এর সর্বপ্রথম কমিকসটির প্রচ্ছদ

আগমন
সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে এক বছর পরে ‘হুইজ কমিকস’-এর দ্বিতীয় ইস্যুতে (ফেব্রুয়ারী ১৯৪০) আবির্ভুত হল কমিকস দুনিয়ার নতুন নায়ক “SHAZAM”! প্রথম প্রকাশের তিন বছর (১৯৩৯ - ১৯৪১ সাল) পর্যন্ত এই নায়কের নাম ছিল “ক্যাপ্টেন মার্ভেল”। কিন্তু স্ট্যান লি’র মারভেল কমিকস-এর একই নামধারী সুপার হিরোইনের সঙ্গে নাম নিয়ে দ্বন্দ্বের ফলে, ‘হুইজ কমিকস’ তাদের নব সন্তানের নাম রাখলেন ‘SHAZAM’! বর্তমানে চরিত্রটির স্বত্ব কিনে নিয়েছেন বিখ্যাত ডি. সি কমিকস সংস্থা। তারা প্রতিমাসে প্রকাশ করছেন ক্যাপ্টেন মার্ভেলের আশ্চর্য কান্ডকারখানা।
সর্বপ্রথম প্রকাশিত কমিকসটির প্রচ্ছদে দেখা গেল, ক্যাপ্টেন মার্ভেল একটা গাড়িকে ধরে সামনের দেওয়ালে ছুঁড়ে মারছে এবং তার ভেতর থেকে দুটি লোক বাইরে ছিটকে পড়ছে। এই প্রচ্ছদটির সঙ্গে সুপার ম্যানের সর্বপ্রথম কমিকসটির (Action Comics #1) প্রচ্ছদের অনেক মিল পাওয়া গেল, যেখানে সুপারম্যান একটা গাড়িকে দুই হাতে তুলে নিয়ে সামনের দিকে ছুঁড়ে দেওয়ার ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে। প্রচ্ছদের ছবি থেকে শুরু করে সমগ্র কমিক বইটি বিল পার্কারের ইচ্ছে অনুযায়ী সাজানো হয়েছিল।

ক্যাপ্টেন মার্ভেলের সঙ্গে বিলি ব্যাটসন, দুই সত্ত্বা একসঙ্গে

পরিচয়
আগেই বলেছি, বিল পার্কার সেই ছেলেটিকে দেখে একটা আইডিয়া পেয়েছিলেন সেই আইডিয়া মতোই তিনি রচনা করেন ১২/১৩ বছরের একটা বাচ্চা ছেলেকে,যার নাম ছিল উইলিয়ম জোশেফ ব্যাটসন (এই নামটা বিল নিয়েছিলেন বিখ্যাত ক্রিকেটার উইলিয়ম ব্যাটসন-এর নামানুসারে) বাচ্চা ছেলেটির ডাকনাম ছিল 'বিলি' কিন্তু বাচ্চা হলেও ওর কাছে ছিল একটা মায়াবী শব্দ, ‘SHAZAM’, যেটা জোরে উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই ও রূপান্তরিত হয়ে যেত শক্তিশালী পূর্ণবয়স্ক এক অতিমানবে, যার নাম ক্যাপ্টেন মার্ভেল (সর্বপ্রথম নাম ক্যাপ্টেন থান্ডার), যে ছিল বিলির ‘অল্টার ইগো’ বিশেষ। ‘SHAZAM’ এই ইংরাজি শব্দটার প্রতিটা আদ্যাক্ষর ছয় জন মহান দৈবশক্তিধারী ব্যক্তিকে মাথায় রেখেই বিল ভেবেছিলেন তাঁরা হলেন - S = Solomon, H = Hercules, A = Atlas, Z = Zius, A = Acilis আর M = Mercury বিলির বন্ধুরা হল মেরী মার্ভেল, ক্যাপ্টেন মার্ভেল জুনিয়ার, আংকেল মার্ভেল, সুপারম্যান আর সাইবোর্গ আর শত্রুরা হল উন্মাদ বৈজ্ঞানিক শিভানা, ব্ল্যাক আডাম, ক্যাপ্টেন নাযি, মিস্টার অ্যাটম, সাব্বাক, মাইন্ড মাস্টার, কিং বুল প্রমুখরা

একটা গল্প বলি শোনো!
প্রত্যেক সুপারহিরো, হিরো হওয়ার আগে কিন্তু সাধারণ মানুষ থাকে। বিলিও তেমনই একটা বাচ্চা ছেলে ছিল। বিলি ছিল অনাথ। ছোটোবেলায় ওর দুর্বলতার সুযোগে ওকে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছিল, যেমন হয়ে থাকে। সবলেরা দুর্বলদের ওপরে ছড়ি ঘোরায়। বিলি তাই মনে মনে চাইত, কমিকসের ওই অতিমানবদের মতো হতে। আর যারা ওকে কষ্ট দেয়, কাঁদায়, সেই বাজে লোকগুলোকে আচ্ছা করে সায়েস্তা করতে! একদিন স্কুল থেকে ফিরতে বিলির খুব দেরি হয়ে গেছিল। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ও বাড়ির দিকে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় পাড়ার কিছু দুষ্টু ছেলে ওকে ঘিরে ধরে আর ওকে মারতে থাকে। কোনোরকমে সেখান থেকে পালিয়ে ও একটা জায়গায় লুকিয়ে পড়ে। এদিকে ওই দুষ্টু ছেলেগুলো তো বিলিকে খুঁজছে, ওকে দেখলেই খপ করে ধরে ফেলবে বিলি তাই ভেবে ভয়ের চোটে চোখ বন্ধ করে ঈশ্বরের নাম জপতে লাগল। হঠাৎ ওর কানে কানে ফিসফিসিয়ে কেউ যেন বলল, “বিলি, ভয় পেও না, আমার কাছে এসো।” বিলি অবাক হয়ে গেল। আবার সেই কন্ঠস্বর ওকে ডাকল। বেশ কয়েকবার সেই ডাক শোনার পরে বিলি সেই আওয়াজটা অনুসরণ করতে লাগল। এই ভাবেই সে পৌঁছে গেল মেট্রো স্টেশনের সুড়ঙ্গে সেখানকার একটা মিষ্টি সুগন্ধে বিভোর হয়ে অচৈতন্য হয়ে গেল বিলি। যখন ওর জ্ঞান ফিরল, তখন ও নিজেকে আবিষ্কার করল, এক রহস্যময় গুহার ভেতরে! সেখানে এক রহস্যময় ব্যক্তি ওকে স্বাগত জানালেন। সেই রহস্যময় ব্যক্তি বিলিকে বলেছিলেন যে তিনি একজন মিশরীয় জাদুকর। ওঁর নাম ছিল সাযামো। তিনি নিজের অতিদৈবিক শক্তির সাহায্যে পাপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে চলেছেন কয়েক’শ শতাব্দী ধরে। কিন্তু তিনি এখন খুবই ক্লান্ত। তাই নিজের এই শক্তি তিনি এমন কাউকে দিয়ে যেতে চান যে হবে তাঁর প্রকৃত ধারক ও বাহক। তাকে হতে হবে মনের দিক দিয়ে পবিত্র আর মানবতাবাদে বিশ্বাসী। তাই তিনি বিলিকে বেছে নিয়েছিলেন তাঁর সেই যোদ্ধা হিসেবে। তিনি বিলিকে দান করেছিলেন অসীম শক্তির ভান্ডার। বিলি সেই শক্তি পেয়ে চিৎকার করে বলে উঠেছিল “SHAZAM!!!” আর পরিবর্তিত হয়ে গেছিল, ক্যাপ্টেন মার্ভেল-এ। এদিকে শক্তিহীন হয়ে সাযামো সেই গুহায় (যার নাম ছিল ‘দ্য রক অব ইটারনিটি’) মারা গেলেন। কিন্তু তাঁর আত্মাকে বিলি আহ্বান করল পথপ্রদর্শক হিসেবে, কারণ বিলি জানত না, কীভাবে এই অফুরন্ত শক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। সেই থেকে সেই জাদুকর বিলিকে নাম দিলেন SHAZAM! আর কথা দিলেন সর্বদা তিনি বিলির ভেতরেই বাস করবেন!

জাদুকর সাযামো
শক্তিমান নায়ক
আমাদের ছোট্ট বন্ধু বিলি, ‘SHAZAM’ শব্দটা জোরে চিৎকার করে উচ্চারণ করলে ওর মধ্যে চলে আসে অফুরন্ত শক্তি - এটা আগেই বলেছি। কিন্তু যেটা বলিনি সেটা হল, প্রতিবার এই শব্দটা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে এক শক্তিশালী বজ্র ওর শরীরে দারুণভাবে আঘাত করে, আর এর ফলেই ও পরিবর্তিত হতে পারে ক্যাপ্টেন মার্ভেল–এ, আর বিলির মধ্যে চলে আসে ছয়জন দেবতার শক্তি। সলোমনের বুদ্ধিমত্তা, হারকিউলিসের অমিত বল, অ্যাটলাসের সামর্থ্য, যিউসের বজ্রশক্তি, অ্যাকিলিসের বীরত্ব, মারকারির গতি। এই সকল শক্তির ফলে ক্যাপ্টেন মার্ভেল তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী। সে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম শব্দ শুনতে পায়। এ ছাড়া অপরাধীদের সম্মোহনও করতে পারে। বলতে পারে পার্থিব ও অপার্থিব সব ধরনের ভাষা। না খেয়ে, না ঘুমিয়ে, এমন কী নিঃশ্বাস না নিয়েও কাটিয়ে দিতে পারে মাসের পর মাস! যাওয়া আসা করতে পারে যে কোনও ডাইমেনশনে। ক্যাপ্টেন মার্ভেলের মধ্যে আছে ক্ষতস্থান সারানোর ও দ্রুত আরোগ্য দানের শক্তিও এ ছাড়া ওর মধ্যে আছে সুপারম্যানের মতো আকাশে ওড়ার ক্ষমতা।

নায়কের কি কোনও দুর্বলতা আছে?
উত্তরটা হল, হ্যাঁ! আছে। প্রত্যেক সুপারহিরোর কিছু না কিছু দুর্বলতা থাকে যেমন তোমরা জানো, সুপার ম্যানের দুর্বলতা হল ওর নিজের গ্রহ ক্রিপ্টনের রেডিও অ্যাকটিভ খন্ড ক্রিপটোনাইট! ঠিক তেমনি আমাদের ক্যাপ্টেন মার্ভেলেরও কিছু দুর্বলতা আছে –
অসীম শক্তিশালী জাদু মহাজাগতিক যে কোনও অসীম শক্তিধর জাদুশক্তি আমাদের নায়ককে পর্যুদস্ত করতে সক্ষম।
বাকশক্তি - ক্যাপ্টেন মার্ভেলের অসীম শক্তির আধার ওর গলা দিয়ে বেরোনো চিৎকার। কিন্তু যদি কোনও সময়ে বিলি সঠিক ভাবে ম্যাজিক স্পেলটা উচ্চারণ করতে না পারে, তাহলে ওর মৃত্যু ঘনিয়ে আসবে!
বিদ্যুৎশক্তি - যে বিদ্যুৎশক্তি বিলিকে ক্যাপ্টেন মার্ভেল বা আবার বিলিতে ফিরিয়ে আনে, সেটাই ওর সমস্যার কারণ হতে পারে যদি বিলি সঠিক সময়ে বিদ্যুৎশক্তিকে নিজের শরীরে ধারণ করতে অক্ষম হয়!

জাদুকর সাযামোর সঙ্গে ক্যাপ্টেন মার্ভেল

কমিকসের পাতা থেকে জীবন্ত হয়ে ওঠা
কমিকসের দুনিয়ায় ক্যাপ্টেন মার্ভেলের প্রভূত সাফল্যের পর, কলম্বিয়ার ‘রিপাবলিক পিকচার্স’ ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম এই চরিত্রকে দূরদর্শনের পর্দায় নিয়ে আসেন। বারো পর্বে বিভক্ত এই টেলিভিশন সিরিজের নাম ছিল ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অব ক্যাপ্টেন মার্ভেল’, যেখানে ক্যাপ্টেন মার্ভেলের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা টম টাইলার, আর বিলি ব্যাটসনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ফ্রাঙ্ক কুঘান জুনিয়ার। সেই সময়ের নিরিখে ক্যাপ্টেন মার্ভেল-ই ছিল এমন একটি কমিকস চরিত্র যাকে নিয়ে ফিল্ম তৈরি হয়েছিল। অনুষ্ঠানটি সর্বজনসমাদৃত হয়েছিল। এরপরে ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে কলম্বিয়া নিজ খরচায় একটি সুপারম্যান অ্যানিমেটেড সিরিজ নির্মাণ করেন। সেখানেও ক্যাপ্টেন মার্ভেলকে দেখা যায়।

বন্ধুরা, এবার তোমরা অনেকটাই জেনে গেছ আমার এই পছন্দের সুপারহিরো সম্পর্কে। আশা করি, তোমাদের নতুন এই হিরোকে ভালোই লেগেছে। তবে চুপি চুপি একটা কথা জানিয়ে রাখি। এই মাসেই তোমাদের কাছের পেক্ষাগৃহে ক্যাপ্টেন মার্ভেল আসছে। তোমরা দেরি কোরো না কিন্তু। বিলির সঙ্গে দেখা করার জন্য মা, বাবা, দাদা, দিদির সঙ্গে চলে যেও সেখানে। আরও কিছু চমকপ্রদ তথ্য সেখানে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে!
ভালো থাকো সবাই... SHAZAM!!!!!
_____