Showing posts with label সুমনা সাহা. Show all posts
Showing posts with label সুমনা সাহা. Show all posts

মহাভারতের গল্প:: মহাভারতের এক তেজস্বিনী মেয়ের কথা (ষষ্ঠ পর্ব) - সুমনা সাহা



মহাভারতের এক তেজস্বিনী মেয়ের কথা
সুমনা সাহা
ষষ্ঠ পর্ব

যুদ্ধের সংবাদ ও পাণ্ডবপক্ষে যোগদানের আহ্বানসহ পত্র মহেন্দ্র পর্বতের কোলে মণিপুর গ্রামেও এসে পৌঁছাল। চিত্রাঙ্গদা তখন আনমনে বনপথে বিচরণরতা, বভ্রুবাহন রাজকার্যের অবকাশে বিশ্রাম কক্ষে সঙ্গীতের আনন্দ উপভোগে মগ্ন। পত্রবাহক পাণ্ডবপক্ষের সেই পত্র তুলে দিল রাজা চিত্রবাহনের হাতে। চিত্রবাহন পত্র খুলে পড়লেন। তারপর ছিঁড়ে ফেললেন। কাউকে কিচ্ছু জানালেন না তিনি। ঐ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রাণাধিক নাতি বভ্রুবাহনকে তিনি কখনও পাঠাবেন না, নাতিকে তিনি অর্জুনের কাছ থেকে আইনসম্মতভাবে পুত্র হিসাবে গ্রহণ করেছেন, এই মণিপুর রাজ্যের ভাবী শাসক সে, তাঁর ও রানির অবর্তমানে কন্যা চিত্রাঙ্গদার জীবনসর্বস্ব। ঐ পুত্রের মুখ চেয়েই চিত্রা আজ বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পেয়েছে। আর বভ্রু এখনও বয়সে কিশোর, জীবনের কত স্বপ্ন পূরণ তার বাকি। সে কেনই বা দূর দেশে যুদ্ধে যাবে? সুতরাং হস্তিনাপুরের যুদ্ধ নিয়ে মণিপুরে আলোচনা প্রায় উঠলই না।
ওদিকে ইরাবান পিতার সঙ্গে হস্তিনাপুরে প্রবেশ করল। এত বৃহৎ প্রাসাদ, এত জাঁকজমক, সাজসজ্জা সে আগে দেখেনি। তার পিতার দুই জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ও দুই কনিষ্ঠ ভ্রাতা তাঁদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের নিয়ে পৃথক পৃথক মহলে থাকেন। এছাড়াও রয়েছে মাতা কুন্তীর মহল। দাসদাসীদের জন্য পৃথক আবাসস্থল। বিরাট আস্তাবলে তেজি ঘোড়া, সুবৃহৎ গোশালা বিশালাকার দুগ্ধবতী গাভীতে পূর্ণ। সুদৃশ্য পুষ্প বাগিচা, অগণিত বিচিত্র স্বাদের ফলের বৃক্ষ, সুরম্য অট্টালিকা, রাজপথ ইত্যাদির শোভা দেখতে দেখতে আশ্চর্য হয়ে চেয়ে থাকে ইরাবান। তাঁদের নাগলোক তো এই ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের সমারোহের কাছে সমুদ্রের সম্মুখে গোষ্পদ তুল্য। পিতা তাঁর জন্য নিযুক্ত করেছেন দুজন বিশ্বস্ত, অনুগত ও আজ্ঞাবাহী সমর্থ দাস। তারা সর্বদাই ইরাবানের সুখসাচ্ছন্দ্য বিধানে অত্যন্ত তৎপর। ইরাবান তো কাউকেই চেনে না। পিতা বললেন, “এখন তোমার কক্ষে গিয়ে বিশ্রাম করো। পথশ্রমে তুমি ক্লান্ত। সন্ধ্যায় প্রাসাদের অভ্যন্তরে পারিবারিক মিলনের সভাস্থলে এরা তোমাকে নিয়ে আসবে, তখন পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে পরিচয় হবে।” পিতার আদেশে ইরাবান দাস দুজনের সঙ্গে তার জন্য নির্দিষ্ট বিশ্রাম কক্ষের উদ্দেশে রওনা হল। যেতে যেতে একের পর এক মহল পার হয়ে চলল আর সঙ্গীরা তাকে চিনিয়ে দিতে দিতে অনুচ্চ স্বরে বলতে থাকল, “এ হল আপনার জ্যেষ্ঠ তাতশ্রীর মহল, আর ওইটি হল কনিষ্ঠ তাতশ্রীর মহল, আর এপাশে আপনার আরও অনুজ ভ্রাতারা থাকেন”তাদের কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে ইরাবান বলে ওঠে, “আর ওইদিকের মহলটিতে কে থাকেন? ওটি সবচেয়ে সুন্দর!” তার অনুচররা ফিসফিস করে বলে, “ওটি তো আমাদের প্রধান মহিষীর মহল, মহারানী দ্রৌপদী থাকেন ওখানে!” ইরাবান দ্রৌপদীর সম্বন্ধে কিছুই জানে না। তবুও কেন যে তাকে সেই মহল টানছে এক দুর্নিবার আকর্ষণে, সে জানে না। কিন্তু বর্তমানে তার প্রধান চিন্তা নিজের বেশভূষা নিয়ে। সেটা যেন এই প্রাসাদে বড়োই বেমানান। কক্ষের প্রবেশ দ্বারে দুই সুন্দরী রমনী দাঁড়িয়েছিল। ইরাবানকে দেখেই তারা আপ্যায়নের হাসি হেসে বলল, “আসুন কুমার! এবার আপনার দাসদের বিদায় দিন আর আমাদের সেবা গ্রহণ করুন!” ইরাবান নাগলোকের যুবরাজ। তার ব্যক্তিগত পরিচর্যার জন্যেও বহাল রয়েছে দাস ও দাসীরা। তবে তারা এখানকার মতো এত সুন্দরী নয়, আর এমন যুবতীও নয়। যুবতী রমনীদ্বয় দু-পাশ থেকে ইরাবানের দুটি হাত ধরে কক্ষে প্রবেশ করল, সেই স্পর্শে ইরাবান শিহরিত হল, তার মধ্যে এক লজ্জামিশ্রিত আবেশ জেগে উঠল, যেটি তার একেবারেই অপরিচিত অনুভূতি। সেই যুবতীরা সহাস্যে বলল, “লজ্জা করবেন না কুমার! আপনি আমাদের হাতে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। আমরা আপনাকে সুগন্ধি জলে স্নান করিয়ে, নববস্ত্রে সুসজ্জিত করে সান্ধ্য মিলনসভার জন্য প্রস্তুত করে দেব, দেখবেন, আপনাকে তখন এই প্রাসাদের কুমারদের একজন বলেই মনে হবে!” ইরাবান বিস্মিত হল, তার মধ্যে একাধারে রাজোচিত বীরত্ব, অন্যদিকে এক বালকতুল্য সারল্য। সে নিজেকে ওই দুই রমনীর পরিচর্যায় সঁপে দিল। স্নানের পর উত্তম আহার পরিবেশিত হল। এত বড়ো মহল তার জন্যই বরাদ্দ হয়েছে ভেবে সে অবাক হয়ে রইল। সেই রমনীরা বলল, “এ আর তেমন কী? পাণ্ডব রাজকুমারদের ইন্দ্রপ্রস্থের রাজপ্রাসাদ তো দেখেননি? সেই প্রাসাদ স্বর্গের দেবরাজ ইন্দ্রের প্রাসাদকেও হার মানায়। কিন্তু এখন মহারাজ দুর্যোধন তার দখল নিয়েছেন। এই মহলগুলি তো দ্বারকার মহারাজ কৃষ্ণের ব্যবস্থাপনায় রাজ্যের সীমান্তে অস্থায়ীভাবে তৈরি করা হয়েছে!” তারপর তারা গলা নামিয়ে বলল, “যুদ্ধ তো এইসবের জন্যই!” আহার্য দ্রব্য সবই ইরাবানের অচেনা, তবে অত্যন্ত সুস্বাদু। তাই অধিক ভোজন করে ফেলেছে সে, উত্তম ভোজনের শেষে তার নিদ্রার আবেশ দেখে সহচরীরা তাকে শয্যায় শয়ন করিয়ে একজন পায়ের কাছে বসে পা টিপে দিতে লাগল, আরেকজন পাখা নিয়ে মাথার কাছে বাতাস করতে লাগল। ইরাবান তার মায়ের কথা, নাগলোকের কথা চিন্তা করতে করতে গভীর নিদ্রায় অভিভূত হয়ে পড়ল। সন্ধ্যার মুখে তার নিদ্রা ভঙ্গ হল। প্রাসাদের বড়ো বড়ো গবাক্ষ পথে উদ্যানের ছায়া অস্তগামী সূর্যের আলোর সঙ্গে মিশে এক অপরূপ মায়া সৃষ্টি করেছে। দূর থেকে ভেসে আসছে নানা দেবালয়ের সন্ধ্যা আরতির ঘণ্টাধ্বনি। সমস্তই একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা। সে যা দেখে, যা শোনে, সবটুকু যেন নিজের অন্তরে শুষে নেয়। তার কৈশোর উত্তীর্ণ দেহ ও মন সম্পূর্ণ নিষ্কলঙ্ক, পবিত্র।
সান্ধ্য মিলনসভায় উপস্থিত হল ইরাবান। অন্দরমহলের বিশাল কক্ষের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত সুসজ্জিত আসন, সবথেকে উঁচু আসনে মধ্যমণি হয়ে বসে আছেন এক অনিন্দ্যকান্তি পুরুষ। কে ইনি? ইরাবান সেই পুরুষের দিক থেকে চোখ সরাতে পারছে না। এমন রূপ জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে কোনো প্রাণীতে থাকা সম্ভব? সুদৃঢ় দেহের অপূর্ব সৌষ্ঠবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসামান্য পেলবতা। বিরাট দুটি নয়ন কী বাঙ্ময়! তিনি হেসে উঠলে গৃহের অভ্যন্তরের সহস্র দীপাধারের বাতি মলিন হয়ে যাচ্ছে। ইনিই কি সেই দেবকীনন্দন কৃষ্ণ? ইরাবানের সমগ্র সত্তা যেন এক তীব্র আকর্ষণে ধাবিত হয়ে চলেছে ঐ অনিন্দ্যকান্তি পুরুষের পানে। বিভিন্ন আসনে উপবিষ্ট আরও রাজা ও রাজকুমারদের সে এতক্ষণ লক্ষ করেনি। অর্জুন ইরাবানের দিকে সস্নেহে তাকিয়ে তাকে কাছে ডাকলেন। মন্ত্রমুগ্ধের মত এগিয়ে গেল সে। আর নিজের অজান্তেই পিতার পাশে উপবিষ্ট সেই মোহন রূপবান পুরুষের চরণপ্রান্ত স্পর্শ করে জানু পেতে ভূমিতে বসে পড়ল। সেই পুরুষ তাকে দু-হাতে ধরে তুললেন, তাকালেন তার চোখের দিকে, যেন পড়ে ফেললেন তার জন্মজন্মান্তরের কথা। তারপর কোমল করস্পর্শে আশীর্বাদ করে বসালেন একেবারে নিজের পাশটিতে। একে একে সভায় উপস্থিত সকলের দিকে তিনি চেয়ে দেখলেন, দীপের কম্পিত আলোকশিখায় মুখগুলি কঠিন ও গম্ভীর। তিনি ধীরে ধীরে সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “তোমরা সকলেই অবগত আছ, আমার সখা, অর্জুনকে যখন দ্রৌপদীর সঙ্গে বৈবাহিক নিয়ম লঙ্ঘনের প্রায়শ্চিত্ত করতে তীর্থযাত্রায় রওনা হতে হয়েছিল, সেসময় তাকে নাগলোকের রাজকন্যা উলুপীর প্রণয় আহ্বান স্বীকার করতে হয়েছিল। এই সুদর্শন কুমার নাগলোকের রাজপুত্র, উলুপী ও অর্জুনের প্রণয়জাত প্রথম সন্তান, ইরাবান। যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী এই তরুণ সুদূর নাগলোক থেকে আমাদের পক্ষে যুদ্ধ করতে এসেছে। এঁকে তোমরা সকলে পরিবারের অন্যতম সদস্যরূপে অভিবাদন করবে, এটাই আমার কাম্য।” সূচীভেদ্য নীরবতা ভঙ্গ করে কথা বললেন এক সৌম্যদর্শন ব্যক্তি, তাঁর প্রতিটি বাক্য শুদ্ধ, ধীর ও মার্জিত। তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, “ইরাবান, আমি তোমার জ্যেষ্ঠ তাত, জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব, যুধিষ্ঠির, তোমাকে আমাদের পরিবারে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাচ্ছি। তুমি যে আমাদের যুদ্ধে সহায়তা করতে সুদূর নাগলোক থেকে এসেছ, তার জন্য আমাদের পরিবারের প্রত্যেকে তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার বিনম্র শ্রদ্ধা তোমার পুণ্যবতী জননী উলুপীর উদ্দেশ্যে” এরপর একে একে উঠে দাঁড়িয়ে পরিচয় দিল আরও অনেকে। ইরাবান চিনল তার জেঠা ও কাকাদের এবং সেইসঙ্গে জানল, তার আরও ভাই-বোনদের কথা। অর্জুন ও দ্রৌপদীর পুত্র শ্রুতকর্মা এবং অর্জুন ও সুভদ্রার পুত্র অভিমন্যুর সঙ্গে পরিচয় হল। তবে সব ভাইবোনদের মধ্যে সবার বড় ভীম-পুত্র ঘটোৎকচ প্রাসাদে থাকেন না। তিনি তার মায়ের সঙ্গে তাদের উপজাতি সম্প্রদায়ের গ্রামেই থাকেন। তবে যুদ্ধের আগে তিনি উপস্থিত হবেন। প্রাসাদে আছেন যুধিষ্ঠির ও দ্রৌপদীর পুত্র প্রতিবিন্ধ্য, নকুল কাকার পুত্র শতানীক, ভীম জেঠার পুত্র সুতসোম, এবং সহদেব কাকার পুত্র শ্রুতসেনা। দ্রৌপদী ছাড়াও, যুধিষ্ঠিরের বিয়ে হয়েছিল শৈব্য সম্প্রদায়ের কন্যা দেবিকার সঙ্গেতাদের একটি ছেলে আছে, নাম যৌধ্যেয়। নকুলের আরেক স্ত্রী হলেন চেদী রাজকন্যা করেনুমতী। এঁদের ছেলে নিরমিত্র। মদ্রদেশের রাজকন্যা বিজয়া সহদেবের অপর স্ত্রী। তাদের ছেলে সুহোত্র। এসব কথাও জানল ইরাবান। তবে এই ভাইরা বভ্রুবাহনের মতোই নিজেদের দেশেই থাকেন, পাণ্ডবদের সঙ্গে থাকেন না। প্রধানা মহিষী দ্রৌপদী ছাড়া আর একজন রানিই মহলে থাকেন, তিনি কৃষ্ণের ভগ্নী, সুভদ্রা। এরা প্রত্যেকেই বিবাহিত। শ্রুতকর্মা ইরাবানের থেকে বয়সে ছোটোকিন্তু সেও বিবাহিত। ইরাবান তার ভাইদের মধ্যে নিজেকে যেন ঠিক মেলাতে পারল না। সকলকেই পানীয় দেওয়া হল। পান করবার পর যে যার মহলে ফিরে গেল। কেবল সেই সুদর্শন পুরুষটি পিতার সঙ্গে বসে অনুচ্চ স্বরে কিছু আলোচনা করছিলেন। দীপের আলো অনুজ্জ্বল হয়ে এসেছে। দাসী এসে আবার দীপাধারে নতুন করে তেল ঢেলে দিয়ে গেল। সবকটা দীপ ঝলমলিয়ে উঠতেই ইরাবান সবিস্ময়ে লক্ষ করল, তার চিত্তচোরা সেই পুরুষের মাথার মুকুটে উজ্জ্বল নীলকান্ত মণির সঙ্গে গোঁজা আছে একটি ময়ূরপুচ্ছ। কৃষ্ণ! ইনিই তবে কৃষ্ণ! সে তার বৃদ্ধ পিতামহ কৌরব্যর মুখে শৈশব থেকে এই কৃষ্ণের কত গাথাই না শুনেছে। তার একপ্রকার ঘোরের মধ্যেই কৃষ্ণ তাকে আরও একবার স্পর্শ করলেন, বললেন, “পুত্র ইরাবান! তোমার শারীরিক লক্ষণ অত্যন্ত শুভ। তুমি এক বিশেষ প্রয়োজন সিদ্ধ করতে বিধাতার নির্দেশেই উপস্থিত হয়েছ। যুদ্ধে দৈহিক ক্ষতি অনিবার্য। বৎস, যুদ্ধে নিজেকে সর্বতোভাবে নিবেদন করতে তোমার মন প্রস্তুত তো?” ইরাবান দৃপ্ত স্বরে উত্তর দিল, “নাগলোকের যোদ্ধারা কখনও সমরে পিছপা হয় না। আমি পিতাকে সাহায্য করতেই এসেছি। যে কোনোভাবে নিজেকে সম্পূর্ণ উৎসর্গ করতে আমার কোনো বাধা নেই!” অর্জুন গর্বিত দৃষ্টিতে দেখছিলেন এই কিশোরকে, তার মনে পড়ে যাচ্ছিল অনেক বছর আগেকার সেই আশ্চর্য কিশোরী মেয়েটির কথা, যে নিঃশর্তে অর্জুনকে ভালোবেসে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিল, নিঃশর্তে বিদায় দিতেও কুণ্ঠিত হয়নি। ইরাবানের দেহে তিনি খুঁজছিলেন সেই সাহসিনী কন্যার স্মৃতি। কৃষ্ণ ইরাবানের সংকল্পের দৃঢ়তায় প্রসন্ন হলেন, বললেন, “বাছা, আজ তুমি আপন কক্ষে গিয়ে বিশ্রাম করো। কাল থেকে যুদ্ধের অনুশীলন আরম্ভ হবে। তোমার অনুচররা তোমাকে অনুশীলন প্রান্তরে নিয়ে আসবে।”
ইরাবান ফিরে গেল নিজের কক্ষে। সে বুঝতে পারল, এই পরিবারে সে কখনও আপন স্থান অধিকার করতে পারবে না। সে বাইরে থেকে আসা এক আগন্তুক মাত্র। পিতার কারণে ও যুদ্ধের খাতিরে তাকে মেনে নেওয়া হল, কিন্তু কুমারদের দেহের ভাষায় তার প্রতি ঔদাসীন্য স্পষ্টই প্রকাশ পেয়েছে। তাতে ইরাবান দুঃখিত হয়নি। কারণ সে কোনো দাবি নিয়ে হস্তিনাপুরে আসেনি। সে চেয়েছিল তার পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে, তাঁকে সাহায্য করতে। পিতা তাকে সাদরে গ্রহণ করেছেন, এতেই সে খুশি। তবে তার অন্তর আজ কানায় কানায় পূর্ণ কৃষ্ণের স্নেহে ও স্পর্শে। পিতামহ বলতেন, কৃষ্ণ এক জাদুকর। সে সম্মোহনী জানে। তাই বুঝি সত্যি হবে। তা না হলে মাত্র একটি সন্ধ্যার পরিচয়ে কেন তার মনে হচ্ছে, এই ব্যক্তির সঙ্গে তার জনমে জনমে অচ্ছেদ্য বন্ধন? রাত্রে শয্যায় শুয়ে ঘুমঘোরে সে শুনতে পেল একটি করুণ বাঁশির সুর। সমস্ত জগতের যত দুঃখ আছে, সব যেন সেই বাঁশির সুরে দুলছে, ভাসছে, আর আকাশ বাতাস প্লাবিত হয়ে যাচ্ছে। নিদ্রিত ইরাবানের সুপ্ত চেতনা বলে, “অপূর্ণ! অপূর্ণ থেকে যাবে সব সাধ! আমাকে পূর্ণ করো নাথ!” তার চোখের প্রান্ত থেকে ঝরে পড়ল অশ্রুর একটি বিন্দু
(ক্রমশ)
----------
ছবি - এআই (নির্মাণ: তাপস মৌলিক)

মহাভারতের গল্প:: মহাভারতের এক তেজস্বিনী মেয়ের কথা (পঞ্চম পর্ব) - সুমনা সাহা



মহাভারতের এক তেজস্বিনী মেয়ের কথা
সুমনা সাহা

পঞ্চম পর্ব

মণিপুরে চিত্রাঙ্গদা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে নানা কাজে। পিতাকে পূর্ণমাত্রায় সহযোগিতা করে সে। সেইসঙ্গে চলে পুত্রের শিক্ষাদান। কোমরে কটিবন্ধ, মাথায় শিরস্ত্রাণ ও অঙ্গে কঠিন বর্মের আচ্ছাদন ঢেকে রাখে তার নারীদেহ। কিন্তু মনটা ঢাকা পড়ে না কোনো আচ্ছাদনে। গভীর রাতে যখন নিশ্বাসের শব্দও বজ্রের মতো মনে হয়, একাকিনী চিত্রাঙ্গদা শিরস্ত্রাণের বন্ধন থেকে মুক্তি দেয় তার ঘন কুঞ্চিত কেশদাম, অযত্নের রুক্ষ ত্বকে খেলা করে কুসুমগন্ধবাহী বসন্ত-পবন, তার মনে পড়ে দূরবাসিনী সখীর কথা। সে কেমন আছে? এতদিন মনে পড়েনি কেন তাকে?
নাগলোকের প্রাসাদে জলের ছলাৎ-ছল শুনতে শুনতে তন্দ্রাহীন উলুপীর মনে হয় কে যেন ডাকছে, সখী! কেমন আছ ভাই? সে যত্ন করে লেখে একটি চিঠি, “সখী চিত্রা, কতদিন হল তোমার সংবাদ পাইনি। তোমরা কেমন আছ? আমার পিতা বড়োই অসুস্থ, শয্যাশায়ী একপ্রকার। হয়তো তিনি বেশিদিন আমাদের মধ্যে থাকবেন না। আমার ভাইটি অপরিণত-বুদ্ধি, জানোই তো সেকথা। তাই সমস্ত রাজ্যের ভার আমার ওপরে। তা না হলে সেই ছেলেবেলাকার মতো হঠাৎ করে গিয়ে হাজির হতাম তোমার দেশে। মনে পড়ে, কেমন সেবার লুকিয়ে চলে গিয়েছিলাম বাণিজ্যতরিতে? সখী, তোমাকে দেখতে বড়োই ইচ্ছা করে। একবার আসবে? তোমার রাজ্য হয়তো তাদের রাজকন্যার অভাব কিছুদিনের জন্য মেনে নেবে। কিন্তু আমার যে একেবারেই রাজ্য ছেড়ে বের হওয়ার উপায় নেই। এই পত্র পেয়ে চলে এলে খুব খুশি হব। ইতি তোমার নাগলোকবাসিনী সই, উলুপী।”
তরির সঙ্গে ভাসতে ভাসতে সেই পত্র যেদিন এসে পৌঁছোল মণিপুর রাজ্যে, সেদিন চিত্রাঙ্গদাও সখীকে একখানি পত্র লিখেছে, “সই উলুপী, তোমার কথা ক-দিন ধরে মনে পড়ছে। যদি রাগ করো, এতদিন খোঁজ নিইনি কেন ভেবে, তা তুমি করতেই পারো। কিন্তু সই, আমি যে আর তোমার আগের সেই কিশোরী চিত্রা নই! আমার একটি ছেলে হয়েছে। নাম, বভ্রুবাহনএক ভিনদেশের পথিক এসে পড়েছিলেন ঘুরতে ঘুরতে আমার রাজ্যে। তাঁকেই এই পোড়া মন দিয়ে বসলাম। যতই তিরন্দাজি করি না কেন, ভেতরে তো আমি একটি বোকা মেয়ে। তিনি একটি দেশের রাজার ছেলে। তাঁর শর্ত ছিল, আমার সঙ্গে চিরকাল থাকতে পারবেন না। সব জেনেও আমি তাঁকে বিয়ে করেছি। আমাদের সন্তানকে তিনি আমার পিতাকে সমর্পণ করে গেছেন, এ রাজ্যের ভাবী রাজা হিসেবে। এখন বলো, সইয়ের ছেলেকে তুমি কি একটিবার দেখবে না? তোমাকে না দেখালে যে আমার প্রাণে শান্তি নেই! তোমার চিরসখী, চিত্রাঙ্গদা।”
তার স্বামী যে হস্তিনাপুরের রাজপুত্র মধ্যম পাণ্ডব অর্জুন, একথা কেন যে চিত্রাঙ্গদা তার সইকে বলতে পারল না, সে নিজেই জানে না। মানবমন বড়ো বিচিত্র। কিন্তু এ-পত্র পাঠাবার আগেই উলুপীর পত্র পৌঁছোল তার হাতে। সে আর দেরি করল না। বাবার অনুমতি নিয়ে বভ্রুবাহনের হাত ধরে নায়ে চেপে বসল, যাত্রা করল নাগলোকের উদ্দেশেসখীর পিতা শীঘ্রই দেহত্যাগ করবেন। সখী বড়োই একলা হয়ে পড়বে। তার তো ছেলে আছে, ছেলে পিতার অভাব বোধ করার ফুরসত পায় না। কারণ তার মাতা ও পিতা চিত্রবাহন বভ্রুকে আদরে-শাসনে ভরিয়ে রেখেছেন। রাজা কৌরব্যের তুলনায় চিত্রবাহনের বয়স অনেক কম। তিনি এখনও যৌবনের প্রান্তসীমায়। নাতির সঙ্গে তাঁর দারুণ সখ্য। বভ্রু কখনও পিতা সম্পর্কে প্রশ্নও করে না। সে চিত্রবাহনকেই পিতার স্থানে বসিয়েছে। সে হবে মণিপুরের ভবিষ্যৎ রাজা। অতএব অত্যন্ত যত্নে চলছে তার অস্ত্রশিক্ষা ও অন্যান্য বিদ্যাশিক্ষা। কিন্তু তবুও পিতার কাছ থেকে ছেলেকে সে কিছুদিনের জন্য ছিনিয়ে নিল নিজের কাছে, তাকে যেতেই হবে সখীর কাছে। যেকথা সে মাকে বলতে পারে না, পিতাকে তো নয়ই, দাসীদের, সখীদের কাউকেই বলতে পারে না; মনের ভেতরে গুমরানো সেই ব্যথাটুকু তার সখীকে দেখাতেই হবে। তাই সে চলেছে নাগলোকে। দুই সখীর দেখা হওয়া একান্তই প্রয়োজন। সময় জানে তা। তারা কিন্তু জানে না।
সখী আসছে—এ সংবাদ পৌঁছে গেছে দ্রুত উলুপীর কানে নাগলোকের মাঝিমাল্লা, বণিকদের মাধ্যমে। সে রোজ এসে প্রতীক্ষা করে গঙ্গাদ্বারে। অবশেষে সখীর তরি দেখা দিল। দুই সখী পরস্পরকে আলিঙ্গন করে চোখের জলে ভেসে গেল।
চিত্রাঙ্গদাকে তার প্রাসাদে নিয়ে গেল উলুপী। সেখানে একটি চমক তার অপেক্ষায় ছিল। সেটি একটি নিষ্পাপ বালক—ইরাবান। উলুপীর সন্তান। চিত্রাঙ্গদা নির্বাক হয়ে শুনে চলল উলুপীর কথা। সেও তো সখীর কাছে মনের ভার মেলে ধরতেই চেয়েছিল, তাই তো পত্রে এত করে আসতে লেখা। রানি উলুপী মুছে গেল। পড়ে রইল অবিরাম অশ্রুবর্ষণকারিণী এক দুঃখিনি মা, সন্তানকে যে দেখাতে পারেনি তার পিতার মুখ, যার স্বামী চলে গেছে সন্তানসম্ভবা উলুপীকে একলা ফেলে রেখে, কোনোদিন ফিরে আসেনি আর।
উলুপীর বুকের সবটুকু মেঘ কান্না হয়ে ঝরে গেলে চিত্রাঙ্গদা সখীকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে, “তুমি আর আমি একই অশ্রুনদীর দুটি তীর। আমাদের দুজনকেই স্পর্শ করে বয়ে গেছে সেই নদ, যার নাম অর্জুন, কুন্তীপুত্র বীর অর্জুন!” চমকে ওঠে উলুপী। এবার তার শোনার পালা। তারপর সেও বুকে জড়িয়ে ধরে সখীকে, “ঠিক সখী, তুমিও তাঁকে ধরে রাখতে পারোনি, আমিও না। তাঁকে যেতেই হততবুও তোমার এইটুকু সুখ যে, তোমার সন্তান তার পিতার উপস্থিতিতে জন্মেছে, আমি সেই ভাগ্য থেকে বঞ্চিতা।” দুই মা যখন তাদের দুঃখের ভার পরস্পরের কাছে নিঃশেষে ঢেলে দিয়ে শান্ত হয়, তখন আকাশে অস্তরাগের লালিমা। বাগানে তখন দুই ভাই খেলায় মেতে উঠেছে। ওরা জীবনের কটু ফল এখনও চেখে দেখেনি। ওদের চোখে পৃথিবী এখনও পরতে পরতে অপার বিস্ময় মেলে রেখেছে। ওদের এখনও কর্তব্যের বোঝা বইতে বাধ্য হতে হয়নি, ওদের জগতে দৈন্য আসেনি, দুঃখের তীব্র গরল ওদের স্পর্শ করেনি। মাটিতে ঝরে পড়া ফুলের মতো ধুলায় গড়াগড়ি দেওয়া দুটি বালকের অমলিন হাসি সন্ধ্যার বাতাস ভরিয়ে তুলছিল, ওদের মায়েরা সেদিকে চেয়ে চেয়ে দেখছিল।

নাগলোকে কয়েকটি দিন চোখের পলকে অতিবাহিত হল। চিত্রাঙ্গদার কাছে যেটা সবচেয়ে আনন্দের, তা হল, ছেলে বভ্রু উলুপীর বড়োই ন্যাওটা হয়ে পড়েছে। আর উলুপীও যেন তাকে পেয়ে নিজের দ্বিতীয় পুত্রের মতো স্নেহে-যত্নে কতই না গোপন বিদ্যা অনুশীলন করাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সত্যি বলতে কী, সখী বলে, “ভাই, আমার নিজের ছেলেকে আমি এমন করে কাছে টানতে পারিনি, ও যেন কেমনধারা, একটু অন্যরকম। ঠিক বুঝতে পারি না আমি ওকে। হয়তো বাবার টানে একদিন না একদিন ও নাগলোক ছেড়ে হস্তিনাপুরে চলে যাবে, আমি আটকাতে পারব না। কিন্তু ভাই, তোর ছেলেটি যুদ্ধবিদ্যা শিখতে বেশ আগ্রহী। ওকে মাঝেমধ্যে পাঠিয়ে দিস আমার কাছে।” চিত্রাঙ্গদা হাসে, বলে, “পাঠাব ভাই। তুমি যে কত গুণী, সে কি আর আমি জানি না? তোমার কাছে এলে বভ্রু অনেক কিছু শিখতে পারবে।”
খেলার মাঝে ইরাবান বলে, “ভাই, তুই বাবাকে দেখেছিস?”
বভ্রুবাহন আনমনে চেয়ে থাকে, “কী জানি, আমার মনে পড়ে না।”
ইরাবানের চোখে স্বপ্নের মেদুরতা, সে জলের স্রোত দেখতে দেখতে উদাস দৃষ্টি মেলে বলে, “যেতে চাস না বাবার রাজ্যে?”
বভ্রুবাহন দ্রুত মাথা নেড়ে বলে, “না, আমি মণিপুর ছেড়ে কোত্থাও যেতে চাই না। তুমিও সেখানে চলো না, দাদা? দেখবে আমাদের রাজ্য কত সুন্দর!”
ইরাবান বলে, “আমি অর্জুনের পুত্র ইরাবান। আমাকে তাঁর কাছে যেতেই হবে।”
“তাহলে তোমার মায়ের যে মনখারাপ হবে?”
“না, তিনি তো রাজকাজে ব্যস্ত থাকেন, এখন আরও ব্যস্ত থাকবেন। আমি হস্তিনাপুরে যাব, বাবার সঙ্গে, আমার আরও ভাইদের সঙ্গে দেখা করব বাবাকে দেখাব আমার তিরন্দাজিআর আমি দ্বারকার মহারাজ কৃষ্ণের সঙ্গেও দেখা করব। শুনেছি তিনি খুব বীর। আর তেমনই সুন্দর। তাঁর রাজ্যও খুব সুন্দর। আমি সে সমস্ত দেখতে চাই। এখানে এই নাগলোকে পড়ে থাকলে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে কোনো সংযোগই থাকে না।”
বভ্রুবাহন তার এই দাদাকে বুঝতে পারে না। অর্জুনের দুই পুত্র তাঁর দুই সত্তা পেয়েছে। যুদ্ধ দুজনেরই প্রিয়। কারণ তাদের পিতার মতো মায়েরাও যোদ্ধৃ স্বভাবের। কিন্তু বভ্রু পেয়েছে ঘরের টান, আর ইরাবানের প্রাণে বেজেছে সুদূরের বাঁশি।

ওদিকে চিত্রবাহন অস্থির হয়ে উঠেছেন তাঁর নাতির অপেক্ষায়। মণিপুর রাজ্য যেন শূন্য বোধ হয় রাজা-রানি উভয়েরই, ওই তেজি কুমারের অভাবে। তাই ঘনঘন সংবাদ পাঠান তরি ভরে নানা সামগ্রীর সঙ্গে, “অনেকদিন তো দুই সখীতে কাটালে একসঙ্গে, এবার ফিরে এসো!” ইতোমধ্যে রাজা কৌরব্যের দেহান্ত হয়ে গেল। তাঁকে শেষ প্রণাম জানিয়ে চিত্রাঙ্গদা ছেলেকে নিয়ে ফিরে এল মণিপুরে।

কেটে গেল অনেক দিন। নাকি অল্পদিন? কে জানে? নাগলোকে ও মণিপুরে দুই অর্জুনপুত্র এখন দৃপ্ত যুবক। তেজে, শৌর্যে, বীর্যে, পরাক্রমে তারা হস্তিনাপুরের যুবরাজ বলার যোগ্য। আর তাদের বড়ো করে তোলার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব তাদের মায়েদেরই। দুজনেই তেজস্বিনী, দুজনেই নানা অস্ত্রচালনায় পারদর্শিনী। তারা কেউ ভীরু, দুর্বল নয়; তারা শক্ত হাতে দুটি রাজ্যের শাসনভার দক্ষভাবে সামলায়। ওদিকে হস্তিনাপুরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চলেছে বিচিত্র পরিবর্তনের স্রোত। অর্জুন ফিরে যাওয়ার কিছুদিন পরেই প্রতিশ্রুতিমতো রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই যজ্ঞে দেশের সব রাজ্যের রাজারাই আমন্ত্রিত হয়েছিলেন, উলুপীদের রাজ্যে এবং মণিপুরেও পৌঁছেছিল আমন্ত্রণপত্র। কিন্তু তারা কেউ যেতে পারেনি। ইন্দ্রপ্রস্থে পাণ্ডবদের ঠাঁটবাট, সম্পদ ও সাফল্যে তাঁদের কুরুভাইরা হিংসায় জ্বলতে লাগলতারা শকুনিমামার সঙ্গে পরামর্শ করে পাণ্ডবদের আবার পাশা খেলার নিমন্ত্রণ জানালখেলায় হেরে গিয়ে পঞ্চপাণ্ডব দ্রৌপদীসহ আবার বনগমন করলেন। এবার বারো বছর বনে বনে কাটিয়ে তেরোতম বছরটি অজ্ঞাত পরিচয়ে কাটাতে হবে, এমনই ছিল খেলার শর্ত। অনেক দুঃখের রাত্রি পেরিয়ে অবশেষে তেরো বছর পূর্ণ করে যখন তাঁরা হস্তিনাপুরে ফিরে এলেন, তখন তাঁদের ইন্দ্রপুরীর চেয়েও সুন্দর ইন্দ্রপ্রস্থের রাজপ্রাসাদে দুর্যোধন জাঁকিয়ে বসেছেন। তিনি পাণ্ডবভাইদের আর এককণাও বাসভূমি দিতে চান না। গুরুজনেদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হল। যুদ্ধ ঘোষিত হল। এই যুদ্ধ ইতিহাসে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করতে চলেছে—যুযুধান দুই পক্ষ সম্পর্কে ভাই। অধর্মের বিরুদ্ধে ধর্মের যুদ্ধ। দুই পক্ষই যুদ্ধের প্রস্তুতিতে লেগে পড়ল। নানা রাজ্যের রাজাদের কাছে সাহায্যের আবেদন চেয়ে সংবাদ গেল। এই সংবাদ নাগলোকেও এসে পৌঁছোল। এতদিনে ইরাবানের অভীষ্ট পূর্ণ হওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হল। মন তার নেচে উঠল, সে বলল, “মা, আমি এই যুদ্ধে পিতার পক্ষে যোগ দিতে চাই। তুমি কি আমাকে যাওয়ার অনুমতি দেবে না?” সুযোগ্য পুত্র পিতাকে সাহায্য করতে চায়—উলুপী তাতে বাধা দেওয়ার মতো অধর্ম করতে পারে না। শুধু সে তার বিচক্ষণতা দিয়ে মনে করল, একেবারে সরাসরি অর্জুনের কাছে উপস্থিত না হয়ে পুত্র আগে তার পিতামহ ইন্দ্রদেবের কাছে বরং যাক। ইন্দ্রদেবের সঙ্গে নাগলোকের রাজা কৌরব্যের বন্ধুতা ছিল। তাই সেই সুবাদে ইন্দ্রদেব ইরাবানকে অবশ্যই আতিথেয়তা প্রদর্শন করবেন। মাতার পরামর্শে ইরাবান ইন্দ্রলোকে যাওয়া মনস্থ করল। শুভদিনে সে নাগলোক ত্যাগ করে ইন্দ্রলোকের উদ্দেশে রওনা হল। পুত্রের মাথায় আশিসচুম্বন দিয়ে উলুপী তার যাত্রা নির্বিঘ্ন হওয়ার প্রার্থনা জানাল, আর চেয়ে রইল যতদূর চোখ যায় ছেলের যাত্রাপথের দিকে। ইরাবান নির্ভয়ে রওনা হল, ভবিতব্য তাকে দুর্বার বেগে টানছে। পিতার সঙ্গে মিলনের আনন্দে পথের কষ্ট ও অজানা ভবিষ্যতের চিন্তা তার মনে ছায়া ফেলেনি। ইন্দ্রলোকে পৌঁছে সে জানতে পারল, তার পিতা সেই সময়ে সেখানেই অবস্থান করছেন। ইন্দ্রদেব ইরাবানকে খুবই আদর-যত্ন করলেন। তারপর তাকে হাজির করালেন অর্জুনের সামনে। পিতা-পুত্রের সাক্ষাৎকারের কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটি উপস্থিত হল। পরম কান্তিময় সুপুরুষ তরুণ ইরাবানকে দেখে অর্জুন প্রসন্নচিত্তে তাকে আলিঙ্গন করলেন। বললেন, “তুমি অতি শুভ সময়ে এসে পড়েছ! এই বিপদের সময়ে তোমার সাহায্য আমার একান্ত প্রয়োজন। তুমি আমার পক্ষে যুদ্ধে যোগদান করো।” ইরাবানের মনপ্রাণ আনন্দে ভরে গেল। তার মনে এতদিন পিতার প্রতি যে অভিমানের মেঘ জমেছিল, এক লহমায় তা কোথায় উধাও হল। শয়নে-স্বপনে যে-বীরপুরুষের কল্পনায় তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে, চাক্ষুষ তাঁকে দেখে সে যেন ধন্য হয়ে গেল। পিতার মুখে দুশ্চিন্তার ছায়া যেন সে নিজের জীবন দিয়েও মুছিয়ে দিতে চায়, তাঁকে প্রাণ দিয়ে সর্বপ্রকারে সাহায্য করার জন্য যেন সে অন্তর থেকে তাগিদ অনুভব করছে। পিতা কোমল স্বরে তাকে মাতা উলুপীর কথা জিজ্ঞাসা করলেন। তারপর ইন্দ্রদেবের সামনেই তার মাতার বীরত্ব, সাহসিকতা, বুদ্ধিমত্তা ও দয়ালু স্বভাবের অকুণ্ঠ প্রশংসা করতে লাগলেন। ইরাবানের সমস্ত মন যেন পিতার প্রতি আনুগত্যে পূর্ণ হয়ে গেল। সে তখনই পিতার সঙ্গে হস্তিনাপুর রওনা হতে প্রস্তুত হয়ে গেল।
(ক্রমশ)
----------
ছবি - আন্তর্জাল

মহাভারতের গল্প:: মহাভারতের এক তেজস্বিনী মেয়ের কথা (চতুর্থ পর্ব) - সুমনা সাহা



মহাভারতের এক তেজস্বিনী মেয়ের কথা
সুমনা সাহা
(চতুর্থ পর্ব)

উলুপীর ছেলে ইরাবান বড়ো হচ্ছে। দেখতে সে যেমন সুন্দর, তেমনই বীর। সুগঠিত দেহসৌষ্ঠবে অপূর্ব এক লাবণ্য। একই অঙ্গে কঠোর পৌরুষের সঙ্গে নারীসুলভ এক স্নিগ্ধ কোমলতার মিশেল। নাগলোকের নয়নের মণি সে। বাবাকে সে দেখেনি, মায়ের মুখে শুনেছে তার নানা গৌরবগাথা, আর তাতেই আজন্ম পিতৃদর্শনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা তার। উলুপী এখন নাগলোকের রক্ষাকর্ত্রী, রানি। ছেলের সঙ্গে খুব বেশি সময় কাটানোর সুযোগ হয় না তার। পিতা বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়েছেন, খুব বেশিদিন হয়তো আর নাগলোক তাকে ধরে রাখতে পারবে না। তবুও তাদের জাতের মধ্যে নানা জড়িবুটির বিদ্যা-বিশারদ প্রাচীন বৈদ্য আছেন, তারা রাজার আয়ু দীর্ঘতর করার জন্য সদাই নানা লতাপাতার রস প্রত্যহ তাকে সেবন করান। রাজার পুত্র, অর্থাৎ উলুপীর ভাইটি বয়সে অনেকটাই ছোটো, স্বভাবেও চপল, দিদির মতো স্থিতধী নয় সে, বরং কিছুটা রগচটা। আর ইরাবানকে সে মোটেই সহ্য করতে পারে না। কারণ সে অর্জুনের সন্তান ওই দুরাচারি দুষ্ট ব্যক্তিটি কীভাবে তার পরমা সুন্দরী গুণবতী দিদির মন ভোলালো আর তার গর্ভে সন্তান রেখে দিব্যি অন্তর্ধান করল, এমনকি সন্তানের মুখ দর্শন করতেও কখনও ফিরে আসবার কথা তার মনেও এল না—এসমস্ত কথা চিন্তা করলেই তার মাথায় আগুন জ্বলতে থাকে। তাই ইরাবানকে দূর থেকে দেখলেই সে অন্য পথ ধরে।
ইরাবান কিন্তু ভারি অদ্ভুত ছেলে। তার মনে ঈর্ষার লেশমাত্র নেই। সে আপন মনে ঘুরে বেড়ায় অরণ্যের স্তব্ধতায়, কথা বলে গাছ, ফুল, পাখি, জলের মাছ সবার সঙ্গে। আর যখন আকাশে কাজল কালো মেঘ ঘনায়, জলে আর মেঘে মাখামাখি হয়ে কী এক অপূর্ব শোভা ধরে, তার মনের ভিতরটা যেন কেমন করে ওঠে—সকলের অলক্ষ্যে সে বিভোর হয়ে নাচে। সে যে এত সুন্দর নৃত্য জানে, সেকথা জানে কেবল বনের গাছ, পাখি আর নদী। রাজকাজের অবসরে শ্রান্ত দেহে একদিন উলুপী আপন কক্ষে বিশ্রাম করছিল। দূরে গাছগাছালির ফাঁক গলে একটা ঠিন ঠিন আওয়াজ শুনে সে বাতায়নে গিয়ে দাঁড়াল। বনের ভিতরে তখন সন্ধ্যা নামছে। পাখির কাকলিতে মুখর হয়ে উঠেছে চারদিক। বনের মাঝে একটা পরিষ্কার জায়গায় ঘুরে ঘুরে তার তরোয়ালটি নৃত্যের ভঙ্গিতে ঘুরিয়ে নেচে চলেছে ইরাবান। তার এই রূপ উলুপী আগে দেখেনি। নিজের ছেলেকে যেন তার অচেনা লাগে। তাদের নাগলোকে এমন করে কোনো পুরুষকে নৃত্য করতে তো সে আগে দেখেনি। উলুপীর হঠাৎ মনে হল, ‘এ আমার কাছে থাকবে না। অনেক দূরে চলে যাবে।’ উলুপী আর পাঁচজন ছিঁচকাঁদুনি মেয়ের মতো না, সে ছেলেকে ‘আমার বাছা’ বলে আগলে আঁচলে বেঁধে রাখারও পক্ষপাতী নয় মোটেই। তবে নাগলোকের পুরুষরা সাধারণত বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া অন্য লোকে যায় না। যুদ্ধে মিত্রপক্ষ ডাক পাঠালে তাদের জাতের যুদ্ধবাজ লোকেরা যায় অন্য দেশে যুদ্ধ করতে। যুদ্ধের নানা কৌশলে তারা অতি পটু। ইরাবানকেও সেসব শেখানো হচ্ছে। যুদ্ধ তো কেবল দৈহিক শক্তিতে জেতা যায় না। তার জন্য যোগশিক্ষা করতে হয়। শত্রুপক্ষের মতিগতি আঁচ করবার জন্য মানসিক একাগ্রতা বৃদ্ধির অনুশীলন করানো হয়। যোগবলে দেহের আকার বাড়িয়ে কমিয়ে নেওয়া, দেহকে হালকা করে জলে কিংবা স্থলে হাওয়ার মতো ভাসিয়ে দিতে পারা—এইসমস্ত অত্যন্ত গোপনীয় প্রশিক্ষণ তাদের নাগলোকের ছেলেদের দেওয়া হয়। আর ইরাবানকে তো বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। জলে দীর্ঘক্ষণ ডুব দিয়ে শ্বাসরোধ করে থাকতে পারা তাদের কাছে কোনো বড়ো ব্যাপার নয়। এইসব কারণে দেশের যুদ্ধবিগ্রহে নাগলোকের সাহায্যপ্রার্থীর সংখ্যা কম নয়। সেরকম ইরাবানও কোনোদিন যুদ্ধে যেতে পারে ভিন দেশে। কিন্তু উলুপীর আজকের এই ভাবনা সেরকম নয়। এ একেবারে অন্যরকম একটা ভাবনা, যার উৎস তার মনের গহীনে ঘুমিয়ে আছে, বা সে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে স্বেচ্ছায়। তাই ছোটো থেকেই যতবার ইরাবান প্রশ্ন করেছে, “মা, আমরা বাবার কাছে যেতে পারি না?” ততবার উলুপী তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে তার কপালে চুমু খেয়ে বলেছে, “কেন, এখানে তোর ভালো লাগে না? মায়ের কাছে থাকতে ইচ্ছে করে না বুঝি? বাবার কাছে গেলে কি তুই এত আদর পাবি? এখানে তুই রাজপুত্র। সকলে কত্ত ভালোবাসে তোকে। সেখানে বাবার আরও কত আদরের জন আছে, তোকে কি আমার মতো ভালোবাসবে কেউ সেখানে?” তবুও ইরাবানের বন্ধ ঠোঁটের আড়ালে বুকের ভিতর থেকে ইচ্ছের কুঁড়ি একটার পর একটা ফুটতেই থাকে, “বাবাকে কেমন দেখতে? আমি কি বাবার মতো দেখতে? আমাকে দেখলে বাবা কি বুকে টেনে নেবেন না? তিনি কেন আর একবারও এলেন না? আমাকে দেখতে তার কি একটুও ইচ্ছে করে না? নাকি তিনি জানেনই না, আমি তার একটি ছেলে, তার কাছ থেকে অনেক দূরে বড় হচ্ছি। আমিও তির ছুঁড়তে শিখেছি!” কিন্তু এসব কিছু সে মুখ ফুটে বলে না। নারী-পুরুষের সম্পর্ক সম্বন্ধে সে এখনও অনভিজ্ঞ। তবুও তার এই বোঝা না বোঝার আলো আঁধারিতেও মায়ের মনে চাপা দেওয়া একটি অভিমানী মেঘ সে অনুভব করতে পারে। তার মনে হয়, একবার সে ছুটে গিয়ে বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, “বাবা, আমি তোমার সেই ছেলে ইরাবান! আমার মা নাগলোকের রানি, উলুপী, যাকে ফেলে তুমি চলে গিয়েছিলে, মনে পড়ে? আমার সঙ্গে একটিবার সেখানে ফিরে চলো, আমার মা যে রানি, তাই তো তাকে চোখের জল লুকিয়ে রাখতে হয়। তুমি চলো, তার বুকের মেঘকে বৃষ্টি করে মুক্তি দিতে একবার চলো!”

মণিপুরে অর্জুন এক বছরের বেশি বাস করছেন। চিত্রাঙ্গদা নতুন মা হয়েছে। ফুটফুটে ছেলেটি মায়ের কোল থেকে পিটপিট করে চেয়ে দেখে অর্জুনের দিকে, তার চুল ধরে টানে, পিঠের উপর চড়ে নানা যুদ্ধের আঘাতের দাগগুলোর উপর দিয়ে যখন হামাগুড়ি দেয়, অর্জুন ভাবে, পৃথিবীতে যুদ্ধের কী প্রয়োজন? চিরকাল যদি এই শান্তির দিনগুলো ধরে রাখা যেত! অদ্ভুত এক বিষণ্ণতায় সম্পৃক্ত হয়ে যান তিনি। কিন্তু তিনি কুন্তীপুত্র অর্জুন, এই বিষণ্ণতা তাঁকে ছাড়বে না। কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে আবার ঘিরে ধরবে তাঁকে স্বজনহানির মানসিক গ্লানির ভার। কৃষ্ণের প্রেরণায় উজ্জীবিত হবেন তিনি, রক্তাক্ত হবে যুদ্ধভূমি সব্যসাচীর অযুত তীরে। হস্তীনাপুরের ভবিষ্যৎ ইতিহাস তাঁর ফেরার প্রতীক্ষায় অপেক্ষমাণ। অশ্রুভারে বিস্রস্তা প্রেয়সী চিত্রাঙ্গদা, অর্জুনের বোধে তাঁর প্রথম সন্তান, আপন ঔরসজাত বভ্রুবাহন, আর তন্বী মণিপুর নদীটিকে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে চলেন অর্জুন, চিত্রবাহনকে প্রতিশ্রুতি দিতেই হল, শীঘ্রই ফিরে আসবার। কারণ অর্জুনের পুত্রকে রাজা দত্তক নেবেন প্রথা-মাফিক আপন রাজ্যের উত্তরাধিকারী রূপে। মন চায় গৃহসুখের আবেষ্টনীতে ফিরে যেতে, চরণদ্বয় কর্তব্যে স্থির। মহেন্দ্র পর্বতের কাছে মনে মনে প্রার্থনা করেন বীর পার্থ, “হৃদয় আমার তোমার মতো পাষাণ করো হে গিরিবর!”

সমুদ্রতীর ধরে চলতে চলতে ক্রমে অর্জুন পেরিয়ে গেলেন অগস্ত্য তীর্থ, সৌভদ্র তীর্থ, পৌলম তীর্থ, কারন্ধ তীর্থ ও ভারদ্বাজ তীর্থ। সেইসমস্ত তীর্থের জলভাগে ছিল নানা বিষাক্ত প্রাণী ও কুমীরের বাস। ঋষিরা ভয়ে স্নান করতে নামতেন না, অর্জুনকেও তাঁরা নিষেধ করলেন। কিন্তু অর্জুনের মনে পড়ে গেল উলুপীর শিখিয়ে দেওয়া বিশেষ বিদ্যার কথা, যার দ্বারা জলের প্রাণীরা জব্দ হয়। সব তীর্থের জলাশয়গুলো থেকে কুমীর ও অন্যান্য মাংসখেকো জানোয়ারদের উদ্ধার করে তাদের অন্য জলাশয়ে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে তপস্বীদের ভয়মুক্ত করলেন অর্জুন। কিন্তু মণিপুর তাঁকে কেবলই টানছে। এ-সংসারে স্নেহ বড়ো বিষম বস্তু, জ্ঞানীরাও এর হাত থেকে নিস্তার পান না। পিতৃস্নেহ অর্জুনকে আরও একবার টেনে আনল মণিপুরে।

সেদিন সকাল থেকেই চিত্রাঙ্গদার মন বলছিল, আজকের দিনটা অন্যরকম। বাতাস যেন আরও উতলা। রৌদ্রের রঙে যেন কেউ সোনা ঢেলে দিয়েছে। মুগ্ধ পিক কুহু ডেকে ডেকে শ্রবণযন্ত্র বিকল করতে বসেছে। শিশুর হাতে খেলনা তুলে দিতে গিয়ে কেবলই হাত থেকে পড়ে যাচ্ছে। শিশুও আনমনা হয়ে যেন কার পদশব্দে চকিত চাহনিতে ইতিউতি খুঁজছে। এমন সময়ে দাসী সংবাদ দিল, সেই শালপ্রাংশু মহাভূজ, চিত্রাঙ্গদার চিত্তচোর অর্জুনকে নগরীর সীমান্তে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। নিমেষেই সাজো সাজো রব পড়ে গেল। চিত্রবাহন আনন্দে অধীর হলেন তাঁর জামাতাকে ফিরে আসতে দেখে। ধীর পদে অর্জুন এসে দাঁড়ালেন মণিপুর রাজের সামনে, “কথা দিয়েছিলাম, আরেকবার আসব। আপনার হাতে আপন পুত্র ও তার মাতার ভার সঁপে দিয়ে যাব আনুষ্ঠানিকভাবে, তার আয়োজন করুন। হাতে আমার সময় কম।”
দেখতে দেখতে কয়েকটা দিন আনন্দানুষ্ঠানে অতিবাহিত হয়ে গেল। পুত্রের নামকরণ আগেই হয়ে গিয়েছিল। এবার সম্পূর্ণ হল নিঃশর্তে তাকে দান করার পালা। অর্জুন রাজা চিত্রবাহনকে বললেন, “আমার আর স্বীকার করতে বাধা নেই, আমি হস্তিনাপুরের রাজপুত্র, মধ্যম পাণ্ডব অর্জুন।” সভা শুদ্ধ লোক বিস্ময়ে অবাক হয়ে চেয়ে থাকল বহু কীর্তির নায়ক কুন্তীপুত্র অর্জুনের দিকে। কেবল চিত্রাঙ্গদার মুখখানি মলিন হয়ে রইল। অবগুণ্ঠনের আড়ালে কেউ তা দেখতে পেল না। তার মনে পড়ছিল প্রথম দেখা হওয়ার সেই দিনগুলো, যখন নিতান্ত অসহায় পথিকের মতো মানুষটি তার হাত ধরে প্রবেশ করেছিল এই রাজসভায়। তার সব সময়ই মনে হত, ইনি সাধারণ কেউ নন। তাঁর কথায়, প্রতিটি আচরণে যেন কী এক অপূর্ব অসাধারণত্ব ফুটে উঠত, তবুও তিনি যদি আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের একজন হতেন, চিত্রাঙ্গদা বুঝি আজ বেশি খুশি হত। অর্জুন করজোরে রাজাকে বললেন, “শীঘ্রই আমরা এক রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করব। আপনাদের নিমন্ত্রণ রইল। কন্যাকে নিয়ে, বভ্রুকে নিয়ে আপনি অবশ্যই আসবেন। আনুষ্ঠানিক নিমন্ত্রণপত্র পাঠাব। তবে এবার বিদায় দিন, আসি” চিত্রাঙ্গদার কাছে গিয়ে একান্তে তাকে বললেন, “আমার বিপদের দিনে শুশ্রূষা করে আমার জীবন রক্ষা করেছ, তোমার এ ঋণ জীবন থাকতে ভুলব না চিত্রা! কিন্তু তুমি বীর যোদ্ধা। ওই রূপেই প্রথম তোমাকে দেখেছি। আবার সেই রূপে সাজো, পিতাকে সাহায্য করো রাজ্যের সুরক্ষায়, বীর অর্জুনের পত্নী বীরাঙ্গনা তুমি, তোমার চোখে জল মানায় না। চোখ মোছ। আমার বভ্রুকে সাহসী যোদ্ধা হয়ে ওঠায় তালিম দিও। হস্তিনাপুর আমার অপেক্ষায়। আমার মা, ভাইয়েরা আমার ফেরার দিন গুছেন। আমাকে তো যেতেই হবে চিত্রা। বিদায় দাও প্রসন্ন মনে। আবার আমাদের দেখা হবে।”

অর্জুন আবার রওনা হলেন। তাঁর পিছনে পড়ে রইল কলিঙ্গ। সামনে তাঁর গন্তব্য গোকর্ণ তীর্থ। দক্ষিণ সমুদ্রের উত্তর তীরবর্তী তীর্থগুলি দর্শন সম্পূর্ণ করে এবার তিনি যাত্রা করেছেন পশ্চিম সমুদ্র তীরবর্তী তীর্থভূমির উদ্দেশে। লক্ষ্য প্রভাস তীর্থ দর্শন করে মাতুলালয় দ্বারকা গমন ও সেখান থেকে হস্তিনাপুর প্রত্যাবর্তন। এদিকে কৃষ্ণ পেয়ে গেছেন অর্জুনের আগমন সংবাদ। আনন্দে অধীর হয়ে সখাকে আগেভাগে আপ্যায়ন করতে কৃষ্ণ ছুটে এলেন প্রভাসে। বহুদিন পরে দুই প্রাণের সখা পরস্পরকে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হলেন। কৃষ্ণ জানতেন, এতদিনের ভ্রমণে অর্জুন খুবই ক্লান্ত। তাই দ্বারকা পৌঁছানোর আগে রৈবতক পাহাড়ের উপর সুন্দর একটি প্রাসাদে কিছুদিন বিশ্রামের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। তাঁর নির্দেশ মতো সেখানে সব রকমের বিলাস ব্যসনের আয়োজন করে রাখা হয়েছিল। কৃষ্ণ অর্জুনকে নিয়ে প্রভাস থেকে সোজা পৌঁছে গেলেন রৈবতক পাহাড়ের শৈল আবাসে। মনের ইচ্ছে, বন্ধুর কাছ থেকে এতদিনের তীর্থভ্রমণের নানা রোমাঞ্চকর গল্প শুনবেনকৃষ্ণের অনুচরেরা সেখানে থাকা-খাওয়া ও নানা মনোরঞ্জনের আয়োজন করেছেন। দুই বন্ধুতে খুব আনন্দে কাটালেন ক’দিন। রাত্রে শোবার আগে অর্জুন নানা তীর্থের কথা শোনাতেন কৃষ্ণকে। ওদিকে অর্জুনের অভ্যর্থনায় দ্বারকা নগরীও সুন্দর করে সাজানোর নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন কৃষ্ণ। নির্দিষ্ট দিনে তাঁদের দ্বারকায় নিয়ে যেতে এল সুসজ্জিত রথ। রথে করে তাঁরা চললেন দ্বারকায়। কৃষ্ণ সেখানে রাজা। কিন্তু তারও আগে তিনি অর্জুনের সখা, ভাই। তাই বললেন, “অতিথিভবনে নয়, তুমি থাকবে আমারই সঙ্গে, খোদ রাজভবনে।”
(ক্রমশ)
ছবি - আন্তর্জাল

মহাভারতের গল্প:: মহাভারতের এক তেজস্বিনী মেয়ের কথা (তৃতীয় পর্ব) - সুমনা সাহা

মহাভারতের এক তেজস্বিনী মেয়ের কথা
সুমনা সাহা
(তৃতীয় পর্ব)

জল-জঙ্গল অতিক্রম করে বহু কষ্টে অর্জুন তাঁর দুজন বিশ্বস্ত অনুচরকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের যে অংশে প্রবেশ করতে পারলেন, সেদিকে জনবসতি নেই। নির্জন নদীতীরে কেবল লাল কাঁকড়ার ছুটোছুটি আর শনশন হাওয়া। অর্জুন বনের পথ ধরে এগোনোর কথা ভাবলেন। কিন্তু ক্ষুধায় তাঁরা এতদূর কাতর হয়ে পড়েছেন যে আর পথ চলা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। দূরে কলাগাছের ঝোপ দেখতে পেয়ে তাঁরা সেদিকেই এগোলেন, আপাতত কলা খেয়েই পেট ভরানো যাক। অর্জুন পিঠের তিরের বোঝা নামিয়ে রাখলেন। জলরোধক চামড়ার খাপে তিরগুলো সুরক্ষিত। একজন সঙ্গীর সঙ্গে রয়েছে ছোটো একখানা কাটারি গোছের অস্ত্র। সেটাই কলার কাঁদি কেটে নামাতে কাজে লাগবে। প্রচুর পাকা কলা খেয়ে গ্রামের দিকে যাত্রা করার আগে তাঁরা নিজেদের মধ্যে পরিকল্পনা ছকে নিচ্ছিলেন, এমন সময় দূর থেকে সৈনিকের বেশধারী কয়েকজনকে ছুটে আসতে দেখেই তিনজন যে যেদিকে পারলেন ছুট দিলেন, কারণ উলটোদিক থেকে অনর্গল তির ধেয়ে আসছে। অর্জুন দেখলেন সৈনিকরা প্রত্যেকেই বর্ম আচ্ছাদিত, আর তাঁদের তিনজনের খালি গা। সুতরাং এদের সঙ্গে লড়তে যাওয়া বোকামি। তাই তিনি পলায়নই শ্রেয় মনে করে বনের দিকে দৌড়াতে আরম্ভ করলেন। কিন্তু কিছুদূর যেতে না যেতেই তাঁর বাম কাঁধের পিছনে বিঁধল তীক্ষ্ণ তিরের ফলা। যন্ত্রণায় মাটিতে পড়ে গিয়ে তিনি অনুভব করলেন তাঁর চেতনা দ্রুত অসাড় হয়ে আসছে। তিরন্দাজীতে তাঁর সমকক্ষ ভূভারতে কমই আছে। কিন্তু এক নতুন স্থানে, অজানা প্রতিপক্ষকে বুঝে ওঠার সুযোগ তিনি পাননি। তবে বেশ বুঝতে পারছেন, তিরের ফলায় চেতনানাশক ঔষধির প্রলেপ রয়েছে। সম্পূর্ণ জ্ঞান হারানোর আগে তিনি দেহটাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেলেন ঝোপ-জঙ্গলের একেবারে ভিতরে। তারপর গাঢ় নিদ্রায় বেহুঁশ হয়ে পড়ে রইলেন।
যখন চেতনা ফিরে এল, অর্জুন উঠে বসলেন। দেখলেন তাঁর সমস্ত শরীরের দখল নিয়েছে লাল কাঁকড়ার দল। নিম্নাঙ্গের বসন জলে কাদায় মাখামাখি। অবসন্ন বোধ করলেন পার্থ, কিন্তু মনের জোর তাঁর বজায় আছে পূর্ণ মাত্রায়। ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করলেন তিনি। বেশ কিছুক্ষণ চলার পর দেখতে পেলেন জঙ্গল ক্রমে হালকা হয়ে এসেছে। বনের প্রান্তে দেখা যাচ্ছে একটি প্রাচীন মন্দিরের আদল। অর্জুন সেই মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেলেন সাহসে ভর করে। মন্দির যখন রয়েছে, হয়তো মানুষের গমনাগমন থাকবে। তিরের বোঝাটিও আর সঙ্গে নেই, তিনি নিরস্ত্র, সঙ্গীহীন, প্রয়োজনে দুটি হাত ঊর্ধ্বে তুলে জানু পেতে বসে পড়বেন, অসহায়ভাবে সাহায্য চাইবেন, তারপর যা হবার তা দেখা যাবে। মন্দিরটি একেবারে সাধারণ ও ক্ষুদ্র। চারদিকে আগাছার লতাপাতায় ছাওয়া। ভিতরে একটি কালো পাথরের শিবলিঙ্গ। মন্দিরের ভেতরে ঠান্ডা পাথরের চাতালে ক্লান্ত দেহ এলিয়ে দিলেন অর্জুন, নিদ্রার ভাবে আবার আচ্ছন্ন হলেন। হঠাৎ একটি মৃদু সুগন্ধে তাঁর তন্দ্রা ছিন্ন হল। এক সশস্ত্র কিশোর তাঁর মুখের উপর ঝুঁকে আছে কৌতূহলে, সুগন্ধটি সেই কিশোরের দেহ থেকেই উঠে আসছে। অর্জুন ওঠার চেষ্টা করতেই সে তলোয়ারের বাঁট তাঁর বুকে ঠেকিয়ে একটি তীক্ষ্ণ শিস দিল। সঙ্গে সঙ্গে বনের শুকনো পাতা মাড়িয়ে ছুটে এল তারই মতন সশস্ত্র কয়েকজন কিশোর। তারা তাঁকে ঘিরে ধরে দুর্বোধ্য ভাষায় কিছু বলছে। শুয়ে শুয়ে কী করে জবাব দেবেন অর্জুন? তবে তিনি মনে মনে তারিফ করলেন এই গ্রামের শাসনব্যবস্থার, অল্পবয়সি ছেলেদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিয়ে কেমন অঞ্চল রক্ষায় নিযুক্ত করেছে! অর্জুন দুর্বল শরীরেও একশো যোদ্ধাকে হারিয়ে দিতে পারেন। এক ঝটকায় তিনি বুকের উপর ঠেকিয়ে রাখা তরোয়ালের বাঁট সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন আর এক হাতে সজোরে পেঁচিয়ে ধরলেন আক্রমণকারীর গলা। তার সঙ্গীরা খানিকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। কিন্তু অর্জুনের বাহুবন্ধনে বন্দি কিশোর প্রবলভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালাতে লাগল। এক সময় খসে পড়ল তার শিরস্ত্রাণ আর লুটিয়ে পড়ল ঘন কুঞ্চিত একঢাল কেশরাশি। নিমেষেই হতচকিত অর্জুনের ভুজবন্ধন শিথিল হয়ে গেল আর ত্রস্তা হরিণীর মতো ক্ষিপ্র গতিতে পালিয়ে গেল সৈনিকের দল। যেতে যেতে একবার পিছু ফিরে চাইল সেই পুরুষ বেশী কিশোরী কন্যা, তার টানা টানা কালো চোখের চাউনি অর্জুনের একেবারে বুকের মাঝে গিয়ে বিঁধল। যাওয়ার আগে সেই মেয়ে শিবের উদ্দেশে ছুঁড়ে দিয়ে গেছে অঞ্জলিতে রাখা এক গুচ্ছ শুভ্র গুঞ্জা ফুল। ঐ ফুলেরই ঘ্রাণ পেয়েছিলেন অর্জুন তন্দ্রা ঘোরে। তিনি ভাবলেন, এই মেয়েটি বুঝি শিবপুজো করতেই এই মন্দিরে প্রতিদিন সকালে আসে। মেয়েটির একাধারে বীরভাব ও পূজারিণী ভাবের অনিন্দ্য সৌন্দর্যের যুগলবন্দি বীর সেনাপতি অর্জুনের মন কেড়ে নিল। মন্দিরের পাশেই জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে তিনি প্রতীক্ষা করতে লাগলেন, কখন আবার সেই মেয়ে আসে শিবপুজো করতে।
ওদিকে রাজকুমারী চিত্রাঙ্গদাও সেদিন থেকে ঐ বীরপুরুষের ধ্যান করে চলেছেন। কে তিনি? এখানে কেমন করে এলেন? দেখে তো মনে হল ভিনদেশিতবে এমন একাকী নিরস্ত্র অবস্থায় মন্দিরে কেন শুয়েছিলেন? অনেক প্রশ্ন তার মনে। খুব ইচ্ছে করছে, আবার ঐ মন্দিরে গিয়ে দেখতে, তিনি এখনও সেখানে আছেন কি না! পিতাকে এখনই কিছু জানাতে সে সখীদের নিষেধ করেছেপরদিন তারা লুকিয়ে থেকে দেখতে গেল, কিন্তু না, তিনি নেই। চিত্রাঙ্গদা মনে মনে অধীর হয়ে উঠল। হায়, মন্দিরে যাকে দেবতার প্রসাদের মতন হাতের উপরে পেলাম, তাঁকে কী হারিয়ে ফেললাম? এরপর সে গোপনে একাই গেল মন্দিরে, শিবপুজোর থেকেও এখন সেই ভিনদেশির দেখা পাওয়ার আগ্রহ বেশিবাঞ্ছিত ফলও পাওয়া গেললোকটি ঘুমিয়ে আছে মন্দিরের ভিতরে। চিত্রাঙ্গদা পা টিপে টিপে নিঃশব্দে কাছে গেল। গাঢ় ঘুমে অচৈতন্য অর্জুন, তাঁর দেহে যেন জীবিতের কোনো লক্ষণই নেই। চিত্রাঙ্গদা অতি সন্তর্পণে স্পর্শ করল তাঁকে, চমকে উঠল, জ্বরে যে গা পুড়ে যাচ্ছে। প্রাথমিক চিকিৎসার সব রকম ব্যবস্থাসহ দ্রুত সখীদের নিয়ে ফের হাজির হল সেতার আগে লতাপাতা দিয়ে শক্ত করে তারা বেঁধে দিল ভিনদেশীর হাত-পা, বলা তো যায় না, চোখ মেলেই তিনি আবার রাজকুমারীকে আক্রমণ না করে বসেন! অর্জুনের কাঁধে লাগা তিরের জখম থেকেই সংক্রমণ ও জ্বর হয়েছে বলে তারা বুঝতে পারল। ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে জড়িবুটি লেপে তার উপর সযত্নে তারা পটি বেঁধে দিল। উষ্ণ জলে তাঁর শরীর সেঁকতে লাগল। ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে এল মধ্যম পাণ্ডবের। তিনি ওঠার চেষ্টা করতেই চিত্রাঙ্গদা কোমল হাতে তাঁকে শুইয়ে দিয়ে ঠোঁটে আঙুল রেখে ইশারায় কথা বলতে বারণ করল। অর্জুন বুঝলেন, তিনি বন্দি, দেহে তো বটেই, এই মৃগনয়নী সুন্দরী তাঁর মনটিকেও বন্দি করে ফেলেছে। একান্ত নিশ্চেষ্ট হয়ে কুন্তীপুত্র তাঁর দেহমনের শুশ্রূষার ভার সঁপে দিলেন মণিপুরের এই যোদ্ধা রাজকুমারীর হাতে।
খানিকটা সুস্থ হওয়ার পর, রাজকুমারীর কাঁধে ভর রেখে অতি ধীরে অর্জুন রওনা হলেন রাজ-সাক্ষাতে। মণিপুরের রাজা চিত্রবাহন ভারি ভালোমানুষ। অর্জুনের সুন্দর চেহারা, তাঁর নম্র বিনয়ী আচরণ তাঁর ভালো লেগেছে। চিত্রাঙ্গদার হাবভাব দেখে রাজা-রানি কারোই বুঝতে বাকি নেই যে, তাঁদের কন্যা ঐ ভিনদেশি যুবককে মনপ্রাণ সমর্পণ করেছে। অর্জুনেরও মনের অবস্থা তথৈবচ। চিত্রাঙ্গদার স্বভাবের কঠোর-কোমলের অপূর্ব সমাহার তাঁকে এক অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী করে তুলেছে। আশৈশব রাজা তাঁকে নিজের পুত্রসন্তান তুল্য যুদ্ধবিগ্রহে তালিম দিয়ে বড়ো করে তুলেছেন। ফলে সে যেমন সাহসী, তেমনই সকল সংস্কার মুক্ত। কিন্তু দেবদ্বিজে ভক্তি, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের প্রতি করুণা প্রভৃতি মহৎ গুণ তাঁর ব্যক্তিত্বকে পূর্ণতা দিয়েছে। ভাগ্যচক্রে দ্রৌপদীর সঙ্গে অর্জুনের বন্ধুত্ব জমে ওঠার সুযোগ পায়নি। উলুপী অর্জুনের রূপে মুগ্ধ হয়ে স্বয়ং তাঁর প্রেম আকাঙ্ক্ষা করেছে, কিন্তু চিত্রাঙ্গদার ও অর্জুনের বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা উভয় দিক থেকেই সমান ভাবে এগিয়েছে। অর্জুন ভাবেন, এখন যদি রাজা চিত্রবাহনকে নিজের সম্পূর্ণ বংশপরিচয় ও যে কর্তব্য পালনে তাঁর এই মণিপুরে এসে পড়া—সে সমস্ত কথা জানিয়ে দেন, তাহলে রাজা হয়তো রাজকুমারীর সঙ্গে অর্জুনের বিবাহে মত নাও দিতে পারেন। তাই অর্জুন নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় গোপন করে রাখলেন। কেবল বললেন, “আমি ক্ষত্রিয় বংশ জাত। দেশভ্রমণে বের হয়ে আমার তরি ডুবেছে, সঙ্গীসাথিদের হারিয়ে ফেলেছি।” রাজা অর্জুনের হাত দুটি ধরে বললেন, “আমার মেয়ের সঙ্গে বিবাহ দিয়ে তোমাকে আমার কাছে রেখে দিতে চাই, তোমাদের যে সন্তান হবে, তার উপর তোমার বংশের নয়, আমার বংশের দাবি থাকবে। ভগবান আমাকে পুত্রসন্তানের ভাগ্য থেকে বঞ্চিত রেখেছেন। তাতে আমার ক্ষোভ নেই। চিত্রাকে আমি পুত্রের মতোই লালন করেছি। কিন্তু ওকে কাছছাড়া করলে আমি বাঁচব না। বলো, এতে তোমার কোনো আপত্তি আছে?” রাজার চোখে জল চিক চিক করে উঠল। অর্জুনের মন রাজার প্রতি মমতায় পূর্ণ হয়ে উঠল। নতুন রাজ্যের ভাষা তাঁর খুব বেশি রপ্ত হয়নি, রাজকুমারী চিত্রাঙ্গদাই বর্তমানে তাঁর ভাষা-শিক্ষয়িত্রী। কিন্তু রাজার হৃদয়ের আকুল আর্তির ভাষা বুঝে নিতে তাঁর অসুবিধা হল না। খুব ছেলেবেলার কথা আবছা মনে পড়ল অর্জুনের, বাবা তাঁকে পরম স্নেহে কোলে বসিয়ে মুখচুম্বন করতেন। খুব অল্প বয়সেই পিতৃহারা হয়েছেন অর্জুন। আজ তাঁর হাত দুটি জড়িয়ে ধরে তাঁর মুখের দিকে গভীর আশা নিয়ে চেয়ে থাকা এক পিতার ইচ্ছার অমর্যাদা তিনি কীভাবে করবেন? বললেন, “রাজা! চিত্রাঙ্গদাকে আমিও মনেপ্রাণে স্ত্রীরূপে পেতে ইচ্ছা করি। সে আপনার কাছেই থাকবে, কথা দিলাম। আমাদের সন্তানের উপরেও আপনার অধিকার থাকবে। সে মণিপুর রাজ্যের উত্তরাধিকারী হোক, তা আমার কাছে গৌরবের। কিন্তু সন্তান হওয়ার পর আমাকে আমার নিজের পরিজনদের কাছে ফিরে যেতেই হবে। আমি স্ত্রী ও সন্তানের কাছে আবার ফিরে আসব। কিন্তু আমার বিদায়কালে বাধা সৃষ্টি করবেন না, কেবল এই শর্তেই আমি রাজি

অর্জুন আর চিত্রাঙ্গদার বিবাহ হয়ে গেল। এক বছর সুখে অতিক্রান্ত হয়ে গেছে যেন চোখের পলকেহস্তিনাপুরে অর্জুনের কোনো সংবাদ পৌঁছায়নি। যে ব্রাহ্মণরা বৈতরণী নদীর তীর থেকে অর্জুনের সঙ্গবিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন, তাঁরাও ফিরে গিয়ে তিরস্কারের ভয়ে যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। মাতা কুন্তী প্রতীক্ষা করে থাকেন, কবে তাঁর মধ্যম পুত্র, বীর অর্জুন, ফিরে আসবে। তিনি জানেন, ফিরে সে আসবেই। মণিপুর রাজ্য পেয়েছে তাদের ভাবী রাজাকে। চিত্রাঙ্গদা এক শিশুপুত্রের জন্ম দিয়েছে। সর্বসুলক্ষণ সেই পুত্রের মুখ দর্শন করে অর্জুন অনাস্বাদিত এক অনুভূতিতে প্লাবিত হয়েছেন, প্রথম পিতা হওয়ার গর্বিত আনন্দ চিত্রবাহনের মাধ্যমে রাজ্যবাসীকে ধনরত্ন দান করলেন, মন্দিরে পুজো পাঠালেন, নিজের ভাগ্যকে বারংবার ধন্যবাদ দিলেন আর চিত্রাঙ্গদার প্রতি তাঁর মন আগের চেয়ে আরও বহুগুণ প্রেমে পূর্ণ হয়ে উঠল। অর্জুন জানেন, তাঁকে তীর্থ পরিক্রমা সম্পূর্ণ করে ফিরতে হবে। কিন্তু শিশুকণ্ঠের আধো আধো বুলি, চিত্রাঙ্গদার অশ্রুসজল চোখ দুটি তাঁর ফেরার দিন ক্রমেই পিছিয়ে দেয়। সন্তান স্নেহ যে এত মধুর, তা যেমন অর্জুন আগে বোঝেননি, তেমনই তিনি জানতে পারেননি, তিনি এর আগেই পিতা হয়েছেন, পৃথিবীর বুকে তাঁর আরেক সন্তান জন্ম নিয়েছে, গঙ্গাদ্বারের নিকটে, নাগলোকে উলুপী জন্ম দিয়েছে ৩৩টি সুলক্ষণ যুক্ত এক সুদর্শন পুত্রসন্তান, রাজা কৌরব্য লাভ করেছেন তাঁর রাজ্যের ভাবী উত্তরাধিকারী, তার নাম রাখা হয়েছে ইরাবান। পিতার স্নেহ সে পায়নি। উলুপী তাকে একলাই বড়ো করে তুলছেন। চিত্রাঙ্গদার চেয়ে কোনো অংশেই তিনি কম সাহসী নন!
(ক্রমশ)
ছবি - আন্তর্জাল

মহাভারতের গল্প:: মহাভারতের এক তেজস্বিনী মেয়ের কথা (দ্বিতীয় পর্ব) - সুমনা সাহা


মহাভারতের এক তেজস্বিনী মেয়ের কথা
সুমনা সাহা
(দ্বিতীয় পর্ব)

ছবির মতন গ্রামখানি। নাম মণিপুর। মণি মানে বহুমূল্য রত্ন পাথর। গ্রামের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মহেন্দ্র পর্বত, এখন যাকে আমরা পূর্বঘাট পর্বতমালা বলি। আর দক্ষিণে তির তির করে বয়ে চলেছে মণিপুর নদীশঙ্খ আর কোয়েল নদীর মিলনে ঝাড়খণ্ডে যে ব্রাহ্মণী নদীর জন্ম, সেই নদীই উড়িষ্যার এই উপকূল প্রান্তে পৌঁছে দুই ভাগে ভাগ হয়ে বইছে, একটি শাখা তার বৈতরণি নদী, আরেকটি এই মণিপুর নদী। মাঝে সবুজ বনে ঘেরা এক উজ্জ্বল পান্নার মতোই মণিপুর গ্রামটি পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে নদীর দিকে পা ছড়িয়ে বসে আছে। চিত্রাঙ্গদাও আজ ঘুরতে ঘুরতে চলে এসেছে গ্রামের একেবারে প্রান্তে। গ্রামের নদীটি যেখানে সাহস করে সাগরের সঙ্গে দেখা করতে যায়, তার অনতিদূরেই মণিকাপুরম বন্দর। বাবার বাণিজ্য তরী সেখান থেকে রওনা হয় নানা পণ্য নিয়ে, আবার ফেরতও আসে বিদেশী পণ্য বোঝাই করে। তার বাবা এ গ্রামের রাজা। নাম চিত্রবাহন। গ্রামের মধ্যে রাজগড়ে তাদের বিশাল বড়ো প্রাসাদ। তবে বাবার নামের সঙ্গে নাম মিলিয়ে যে তার নাম চিত্রাঙ্গদা, তা কিন্তু নয়। আসলে চিত্রবাহনের সন্তান ছিল না। তাদের বংশে আগেও এমন সমস্যা দেখা দিয়েছিল। পূর্বপুরুষরা তখন থেকেই স্কন্দদেবের পুজো করতেন। কার্তিকের মতো বীর ও সুদর্শন পুত্রলাভের বাসনা কোন রাজার না থাকে? ছেলে হলে তবেই তো বংশরক্ষা হবে! না হলে রাজা মরে গেলে রাজত্ব সামলাবে কে? প্রজাদের আপদে বিপদে যুদ্ধ করে রক্ষাই বা করবে কে? তাই রাজা চিত্রবাহনও পারিবারিক প্রথা মেনেই কার্তিকের পুজো করছিলেন। কিন্তু রানি এক অতি সুদর্শনা কন্যার জন্ম দিলেন। রাজা দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি ঠিক করলেন, ছেলে হয়নি তো ‘কুছ পরোয়া নেহি’, আমার মেয়েই হবে একশো ছেলের সমান। স্কন্দপুরাণ ঘেঁটে মেয়ের নাম রাখলেন চিত্রাঙ্গদা, যার আরেক কথ্য নাম মধুলিকা। মধুলিকা বা মধুকুম্ভ কার্তিক ঠাকুরের প্রিয় ফুল। ফুলটি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমন তার উজ্জ্বল মণির মতো রং আর অন্তর মিষ্টি মধুতে পূর্ণ। মনে মনে এই পুষ্পসম কন্যাকে স্কন্দদেবের চরণে নিবেদন করে রাজা প্রার্থনা জানালেন, “হে যোদ্ধা দেবতা! মেয়েকে যেন যুদ্ধবিদ্যা শিখিয়ে পুরুষের সমকক্ষ তৈরি করতে পারি। তবে তার অন্তরের নারীসুলভ কোমলতার মাধুর্যও যেন কখনও নষ্ট না হয়!” কার্তিক ঠাকুর চিত্রবাহনের মনের কথা শুনেছেন। চিত্রাঙ্গদা তীরন্দাজীতে যেমন দক্ষ, তেমনই তার মন দীন-দুঃখী মানুষের জন্য করুণায় পূর্ণ।
গ্রামের একেবারে প্রান্তে নদীর কিনারায় এসে পিঠের তূণীর ভার নামিয়ে রেখে একটা ঝাঁকড়া গাছের ছায়ায় ঠেস দিয়ে বসে চিত্রাঙ্গদা। তার সঙ্গে সর্বদাই থাকে দু-চারজন সশস্ত্র সঙ্গিনী। নির্ভয়ে সে তীর-ধনুক নিয়ে গ্রামের সর্বত্র ঘুরে বেড়ায়, কোথাও কাউকে বিপদে পড়তে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে সাহায্যের জন্য হাজির হয়ে যায়। আজ এই শান্ত নদীতীরে বসে তার ছোটোবেলার সইয়ের কথা মনে পড়ছিল। ডানপিটে রাজকন্যা উলুপী তাদের বাণিজ্য তরীর সঙ্গে লুকিয়ে চলে এসেছিল কলিঙ্গের এই মণিকাপুরম বন্দরে, আর সেদিন বায়না করে বাবার সঙ্গে তাদের বাণিজ্য তরী রওনা হওয়া দেখতে চিত্রাঙ্গদাও এসে পড়েছিল ভাগ্যক্রমে এইখানে এই নদী মোহনায়। তারা দু’জন সেদিন সই পাতিয়েছিল। এখনও মাঝেমধ্যে সে এইভাবে লোক মারফত সংবাদ পাঠায় সখীকে। কিছুদিন আগেই খবর এসেছিল, তার দুঃসাহসী ডানপিটে সই নাকি এক ভিনদেশি রাজপুত্রকে বড্ড ভালোবেসে ফেলেছে। গঙ্গাদ্বারে সে খুঁজে পেয়েছে তার মনের মতো বীরপুরুষকে। বেশি কিছু সে জানায়নি। এসব সংবাদই সাঙ্কেতিক লিপিতে পাঠায় সে, পাছে লোকজন জানতে পারে! নদীর মোহনা কি এমনি করেই মিলিয়ে দেয়? যেমন নদী নিজে দেশ-দেশান্তর ভ্রমণ করে এসে মেশে সাগরের বুকে, তেমন করেই দূরদূরান্তের ভালোবাসার মানুষদেরও কি সে মিলিয়ে দেয় এক অবর্ণনীয় উপায়ে? বড়োদের মুখে চিত্রাঙ্গদা শুনেছে যে, যেখানে শঙ্খ আর কোয়েল নদীর মিলনে ব্রাহ্মণী নদীর জন্ম, সেইখানে নাকি অনেক বছর আগে জেলেপাড়ার মেয়ে সত্যবতীর নৌকায় নদী পার হতে এসেছিলেন এক বিরাট পণ্ডিত ঋষি, নাম তাঁর পরাশরনদীর এমনই মায়া যে অমন গম্ভীর জ্ঞানী মানুষটিও নাকি সত্যবতীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন, তাঁদের ভালোবাসার বিয়ের ফলেই মহর্ষি বেদব্যাসের জন্ম, যিনি নাকি এক বিশাল মোটা বই লিখছেন, যাতে ধরা থাকবে তাঁর নিজের বংশের আর সারা ভারতের ইতিহাস। যদিও সারা ভারত দেশটা যে কত বড়ো, সে সম্পর্কে রাজকুমারী চিত্রাঙ্গদার কোনো ধারণাই নেই। এসবই সে শুনেছে বাবার সঙ্গে অন্যান্য জ্ঞানী মানুষদের আলোচনা থেকে অল্পবিস্তর। নদীর স্নিগ্ধ হাওয়া, জলের কলকল শব্দ, পাখির কাকলি—সব মিলিয়ে পরিবেশ আজ বড়োই মধুময়। এমন সময় দূর থেকে তার অনুচরীরা হই হই করতে করতে হাজির হয়। চিত্রাঙ্গদা অলস আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসে, “কী হয়েছে? তোরা এত চেঁচামেচি করছিস কেন?”
ভানুলেখা বলে, “বনের মধ্যে আমরা একজন পুরুষকে দেখেছি। প্রথমে ঝোপঝাড়ের নড়াচড়া ভেবে হরিণ মনে করে তাড়া করেছিলাম, তারপর দেখতে পাই তিনি একজন বলিষ্ঠ পুরুষ এবং কোনোমতেই আমাদের গ্রামের নন। বাইরের শত্রু মনে করে তীর ছুঁড়েছি, সে তীর তাঁর গায়ে লেগেছে বটে, কিন্তু তাঁকে ধরতে পারিনি, তীরবিদ্ধ অবস্থায় তিনি বনের মধ্যে অদৃশ্য হয়েছেন। এখন কী করবে বল?”
চিত্রাঙ্গদা সোজা হয়ে বসে। তার নাকের পাটা ফুলে ওঠে, গভীর চিন্তায় কুঞ্চিত হয় সুন্দর ভ্রু-যুগল। খানিকক্ষণ ভেবে সে বলে, “তীর যখন বিঁধেছে, বাছাধন বেশিক্ষণ ঘোরাঘুরি করতে পারবে না। নিশ্চয় যন্ত্রণায় কাতরাবে কোথাও পড়ে। তোমরা নজর রেখ, যেন কোনোমতে গ্রামের ভিতরে প্রবেশ করতে না পারে। কোথাও তাকে দেখলেই আমাকে জানাবে। ধরতে পারলে আমরা তাকে ধরে নিয়ে যাব পিতার কাছে। বিদেশি শত্রু হলে পিতাই স্থির করবেন, কী করণীয়। হয়তো তিনি মন্দ উদ্দেশ্যে এই গ্রামে আসেননি, হয়তো তার তরী ডুবেছে। সাহায্য দরকার। খুব সাবধান, দূর থেকে লক্ষ রেখ

এদিকে উলুপীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অর্জুন এগিয়ে চললেন। হস্তিনাপুরের অনতিদূরে ইন্দ্রপ্রস্থে তাঁদের নতুন রাজধানী থেকে রওনা হয়ে তিনি সমস্ত পবিত্র তীর্থের পথ ধরে চলেছেন। তাঁর এই তীর্থভ্রমণ শখে নয়, এক শর্ত পালনের। আগের বছর, যখন তাঁরা বারণাবতে বেড়াতে গিয়েছিলেন, দুর্যোধন তাদের পুড়িয়ে মেরে ফেলার জন্য লাক্ষার তৈরি ঘরে থাকার ব্যবস্থা করেন। কাকা বিদুরের পরামর্শে পাঁচ ভাই তখন মাতা কুন্তীকে নিয়ে গোপন সুড়ঙ্গ পথে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেই থেকে তারা বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। যে জায়গাটি আজকের পাঞ্জাব, তখন সেটি ছিল পাঞ্চাল রাজ্যএই সময় পাঞ্চাল রাজ্যে দ্রুপদ রাজার আয়োজিত স্বয়ম্বর সভার কথা তাদের কানে আসে। অর্জুন তো আগেই দ্রুপদকে যুদ্ধে হারিয়ে গুরু দ্রোণাচার্যের প্রার্থিত গুরুদক্ষিণা দিয়েছিলেন। তাই সেই রাজ্যের স্বয়ম্বরের সংবাদ শুনে তাঁর কৌতূহল হল। ভাবলেন, ব্যাপারটা কী, দেখেই আসা যাক। সেখানে গিয়ে দেখলেন রাজা দ্রুপদ রাজকুমারী দ্রৌপদীকে বিয়ে করবার জন্য এক কঠিন ‘লক্ষ্যভেদ’ পরীক্ষার আয়োজন করেছেন। বহু দেশের রাজা ও ক্ষত্রিয় শূরবীরদের হারিয়ে সেই কঠিন ও সূক্ষ্ম লক্ষ্যভেদ পরীক্ষায় মাছের চোখে লক্ষ্যভেদ করে রাজকন্যা দ্রৌপদীর কাছ থেকে বিজয়মালা পেয়েও গেলেন অর্জুন। কিন্তু ঘটনাচক্রে মাতা কুন্তীর অজান্তে বলে ফেলা একটি কথার সত্যতা রক্ষা করতে গিয়ে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হল, দ্রৌপদীকে তাঁদের পাঁচ ভাইয়ের স্ত্রী হতে হলঅবশেষে কুন্তীর অস্বস্তি, দ্রৌপদীর মানসিক টানাপোড়েন ও পঞ্চপাণ্ডবের কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা সামাল দিতে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ মধ্যস্থতা করেন এবং স্থির হয়, এক এক ভাই এক বছর করে দ্রৌপদীর সঙ্গে থাকবেন। তবে দ্রৌপদী যাতে কোনোভাবে অসম্মানিত না হন এবং ভাইদের মধ্যেও অসদ্ভাব না আসে, সেজন্য এক ভাইয়ের সঙ্গে দ্রৌপদীর অবস্থান কালে, অন্য কোনো ভাই সেখানে প্রবেশ করতে পারবেন না। এই শর্ত লঙ্ঘন করলে শাস্তিস্বরূপ নিজের দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বারো বছর তীর্থভ্রমণ করে কাটাতে হবে—এমনই নিয়ম স্থির করা হয়েছিল। ক্ষত্রিয় ধর্ম অনুসারে একজন ব্রাহ্মণকে বিপদ থেকে রক্ষা করবার জন্য অস্ত্র নিতে শর্ত লঙ্ঘন করে অর্জুন ঢুকে পড়েছিলেন সেই ঘরে, যেখানে তখন দ্রৌপদী যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে একান্তে বিশ্রাম করছিলেন।

শর্ত অনুযায়ী অর্জুনকে ইন্দ্রপ্রস্থ ছেড়ে চলে যেতে হল। তখন বেশ কয়েকজন ব্রাহ্মণও তীর্থদর্শনে তাঁর সঙ্গী হলেন। সে তো অনেক কাল আগের কথা। সে সময় তো আর পথে বেরিয়ে গুগল ম্যাপ দেখে পথের হদিশ জেনে নেওয়ার উপায় ছিল না! তবে মানুষ তীর্থে যাওয়া আসা করত আর একজনের কাছ থেকে আরেকজন মুখে মুখে পথের সমস্ত সুলুকসন্ধান জেনে নিত। কোন পথে গেলে সময় কম লাগবে, কোন পথে গেলে বেশি ঘুরতে হবে, কোথায় বা ভালো পানীয় জল ও রাতের বিশ্রামের ব্যবস্থা আছে, কোন পথে আবার দস্যু বা লুটেরার ভয় আছে, এ সমস্ত জেনে নিয়ে এবং সঙ্গে অভিজ্ঞ লোক নিয়েই লোকে তীর্থে বের হত। তা অর্জুনের সঙ্গেও সেরকম লোকজন ছিল, যারা নানা তীর্থে ভ্রমণ করেছে। ব্যাসদেবের মহাভারতে যে সমস্ত শ্লোক আছে, সে সব থেকে ধারণা নিয়ে মানুষের পায়ে হাঁটার গড় গতিবেগ, এক তীর্থ থেকে আরেক তীর্থের দূরত্ব, বিশ্রামের সময় ইত্যাদি তথ্যের ভিত্তিতে পণ্ডিতরা গবেষণা করেছেন, গণনা করে তাঁরা সিদ্ধান্ত করেছেন যে, ইন্দ্রপ্রস্থ থেকে রওনা হয়ে ফের ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে আসতে অর্জুনের বারো বছর নয়, দু’বছর সময় লেগেছিল।
ইন্দ্রপ্রস্থ নগর এখনকার দিল্লী ও লাহোরের মাঝমাঝি স্থানে ছিল। সেখান থেকে রওনা হয়ে অর্জুন সোজা চলে আসেন গঙ্গার উৎসের কাছাকাছি, গঙ্গাদ্বার তীর্থে, খুব সম্ভবত এটাই আজকের হরিদ্বার। তাঁর সঙ্গে যে ব্রাহ্মণরা এসেছিলেন, তাঁরা বেদজ্ঞ পণ্ডিত, কেউ কেউ সুগায়ক, সুন্দর সুললিত সুরে তাঁরা প্রতিদিন স্তোত্রপাঠ করেন, পুজো করেন, হোম করেন, কেউ অর্জুনকে বেদ ও পুরাণ থেকে পাঠ করে শোনান। দূরে নীল পাহাড়ের ঢেউ খেলানো সারি, কাছেই কলকল করে বয়ে চলেছে পুণ্যতোয়া গঙ্গা, মনোরম শান্ত পরিবেশ। এখানে পৌঁছে অর্জুন কিছুদিন থাকবেন ভেবে গঙ্গাতীরে অস্থায়ী শিবির তৈরি করার আদেশ দিলেন। এখানেই একদিন উলুপীর সঙ্গে অর্জুনের দেখা হয়ে গিয়েছিল। উলুপী অর্জুনকে নিয়ে গিয়েছিলেন তাদের নাগলোকে। আজ থেকে বহুকাল আগে ‘নাগলোক’ নামে যার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, হয়তো সেই স্থানটি আজকের নাঙ্গাল বা নাগাল, যেটি হৃষীকেশের খুব কাছেই। একে একে হিমালয়ের তীর্থগুলো দর্শন করতে করতে তাঁরা পথ চলেছিলেন। তাঁদের কাছে অবশ্যই ইন্দ্রপ্রস্থ থেকে উত্তরের তীর্থ দর্শন করে ক্রমে পূব দিক বরাবর ভ্রমণ করে পশ্চিমে মামাবাড়ির রাজত্ব, শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা নগরী ও প্রভাস তীর্থ হয়ে ফের ইন্দ্রপ্রস্থে ফেরার মতন ভ্রমণ সূচি ছিল। সেই মতো মহাভারতের বর্ণনা থেকে জানতে পারা যায় যে, অর্জুন গঙ্গাদ্বার থেকে উত্তরে অগস্ত্যমুনি শিখর, বশিষ্ঠ শৃঙ্গ ইত্যাদি উঁচু পাহাড়চূড়ায় আরোহণ করেছিলেন। ভৃগু পর্বতের পূর্বে, শিবলিঙ্গ শিখরের কাছেই রয়েছে তপোবন পাহাড়। এর চূড়ায় আছে সোনার আভাযুক্ত হিরণ্যবিন্দু সরোবর। লোকের বিশ্বাস, সেখানে স্নান করলে সর্বপাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। সেখানেও স্নান করলেন তিনি। তারপর গোমতী নদীর গতিপথ অনুসরণ করে আরও পূর্বে বা উত্তর-পূর্বে যাত্রা করলেন। উপকূল রেখা বরাবর চলতে চলতে এসে পৌঁছালেন কলিঙ্গ রাজ্যের সীমানায়। এখানে পুরীর দক্ষিণ সীমান্তে পাঁচটি পবিত্র নদী এসে মিলেছে মহাসাগরে। এটি হিন্দুর পবিত্র তীর্থ গোকর্ণ। উড়িষ্যার উপকূলভাগে, কলিঙ্গ সাম্রাজ্যের দক্ষিণ প্রান্তে মৌনমহান পূর্বঘাট পর্বতমালা, প্রাচীন গ্রন্থে যার নাম মহেন্দ্রগিরি। যুগ যুগ ধরে বহু মুনি ঋষি তপস্যা করেছেন এই মহেন্দ্র পর্বতে। অর্জুনের ইচ্ছা হল ঐ পাহাড়ে যাওয়ার। কিন্তু তাহলে পেরোতে হবে বৈতরণি নদী। নদীর ওপারে দেখা যাচ্ছে শ্যামল গ্রামের আভাস, পাহাড়ের পায়ের কাছেই গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে শান্ত ছবির মতো একটি গ্রাম। অর্জুনের সাহসী চিত্ত নেচে ওঠে দূর দেশের অজানা নগর দেখতে। কিন্তু বেঁকে বসলেন সঙ্গী ব্রাহ্মণরা। বৈতরণি নদী যে যমালয়ের প্রবেশ দ্বার, নদী পার হলেই যমলোক। তাই তাঁরা আর এক পা-ও নড়তে চান না। অর্জুন তাকালেন সঙ্গীদের মুখের দিকে, তারপর ধীর স্বরে বললেন, “আমরা যদি বৈতরণি পেরিয়ে দেশের মধ্যে দিয়ে বরাবর না যাই, তাহলে চলে যেতে হবে আরও দক্ষিণে। গোদাবরী তট অতিক্রম করে চলে যেতে হবে আরও দক্ষিণে কৃষ্ণা নদীর অববাহিকা বরাবর, সেখান থেকে দক্ষিণভাগে বাঁক নিয়ে তুঙ্গভদ্রার তটভূমি ধরে চললে প্রভাসে পৌঁছাতে আমাদের অনেক বিলম্ব হবে। আমি এই পথেই বৈতরণি পার হয়ে সোজাসুজি চলতে চাই। আপনারা কে কে আমার সঙ্গে আসবেন, বলুন?”
অর্জুনের কণ্ঠে অনুরোধের মিনতি নয়, সিদ্ধান্ত ঘোষণার প্রত্যয়কয়েকজন অপেক্ষাকৃত তরুণ ব্রাহ্মণ এগিয়ে এলেন মহাবাহু অর্জুনের দিকে, “আমরা আপনার সঙ্গ ছাড়ছি না!”
প্রাচীন ব্রাহ্মণরা এ ওর মুখ চাওয়া চাউয়ি করছিলেন, একজন আমতা আমতা করে বললেন, “আমরা উত্তরের লোক। দক্ষিণের এলাকা সম্বন্ধে কিছুই জানি না। সেখানে ম্লেচ্ছ থাকার সম্ভাবনা। শুনেছি সেখানকার মানুষ বেদ পড়েনি, মানেও না। এদের খাওয়াদাওয়া, আচার-ব্যবহার, ভাষা সবই অন্যরকম। ভিন দেশে নিরস্ত্র অবস্থায় ভ্রমণে বিপদের সম্ভাবনা। আরেকবার ভেবে দেখবেন কি কুন্তীপুত্র?”
মহেন্দ্রগিরি অর্জুনকে ভিতর থেকে টানছে। এ ডাক অমোঘ। হয়তো বৈদিক ও অবৈদিক সংস্কৃতি মিলনের ক্ষণে বৈতরণির তীরে দাঁড়িয়ে অর্জুন সাক্ষাৎ যমের দুয়ারে যেতেও প্রস্তুত। সভ্যতার ইতিহাস রচনা করেন গুটিকয় সাহসী মানুষ, যাদের প্রাণের ভয় নেই, অজানাকে জানবার দুর্দম নেশা যাদের রক্তে, যারা যে কোনো নতুন ভাবধারাকে উদার মনে আলিঙ্গন করে নিতে পারেন, ইতিহাসে তাঁরাই অমর হয়ে থাকেন। আর অর্জুন যে সেই দলেই পড়েন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
(ক্রমশ)
ছবি - আন্তর্জাল

মহাভারতের গল্প:: মহাভারতের এক তেজস্বিনী মেয়ের কথা - সুমনা সাহা


মহাভারতের এক তেজস্বিনী মেয়ের কথা
সুমনা সাহা

প্রথম পর্ব

দূরে, যত দূরে চোখ যায় অথৈ জল সুনীল জলরাশির উপর নাচছে ছোটো ছোটো তরঙ্গ উজ্জ্বল রৌদ্রকিরণে ঢেউয়ের মাথায় রূপোর মুকুটগুলো ঝিকমিক ঝিকমিক করে উঠছে পন্নগী দু’চোখ ভরে দেখছে সকলের অলক্ষে আবার সে নিঃশব্দে উঠে এসেছে জলের উপরিভাগে, বসেছে একটি আধোডোবা চ্যাপটা পাথরের উপর বাবা জানতে পারলে ভীষণ রাগ করবেন জলের উপর আসার বিপদ আছে পন্নগীও যে সেটা জানে না, তা নয় কিন্তু তবুও না এসে পারে না জলের উপরের জগৎটা তাকে ভীষণ টানে এই জলকল্লোলের শব্দ, এই মৃদুমন্দ পবন, দূরে সবুজ বনের আভাসএসবই তার বড়ো ভালো লাগে আনমনে দূর বনের দিকে চেয়ে থাকে পন্নগী বাতাসে ওড়ে তার ঘন কৃষ্ণ কুঞ্চিত কেশদাম, হলদে সবুজ জলপাই রঙের ত্বকে খেলা করে কমনীয় রোদ্দুর, কোমরের নিচের দুর্বল পা-দুটিকে ঢেকে রাখা শ্যাওলা সবুজ মেখলা ঢেউয়ের হিল্লোলে ভিজে উঠছে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই পন্নগীর অপূর্ব এক ভালোলাগার আবেশে সকালের সোনালি আলো আর গঙ্গা-তীরের মিঠে বাতাস গায়ে মাথায় মেখে সে চুপ করে বসে থাকে মন যেন কীসের এক প্রতীক্ষায় অধীর কী যেন এক অজানা আজ ঘটবে তার জীবনে যেন এক অস্ফুট স্বপ্নের মতো সেই অধরা মাধুরী তাকে আনমনা করে রেখেছে
অবাক হচ্ছ বুঝি? হ্যাঁ, পন্নগী সত্যিই জলের নিচে থাকে অনেক অনেক কাল আগে, মানব সভ্যতা উন্নতির শিখর স্পর্শ করেছিল তাদের ছিল দ্রুত গতিসম্পন্ন বিমান, জানা ছিল নীরোগ শরীরে দীর্ঘায়ু হয়ে বেঁচে থাকবার বিদ্যা, অধিগত হয়েছিল গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধির জ্ঞান, আরও কত কী! একবিংশ শতাব্দীর জনসংখ্যা বিস্ফোরণের যুগে মানুষ এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে সমুদ্রের নিচে বসতি স্থাপন করবার পরিকল্পনা করছে, অথচ বহুযুগ আগে নদীর তলদেশে সমুদ্রের নিচে উন্নত জাতি বাস করত তাদের পাতালবাসী কিম্বা নাগলোকের বাসিন্দা বলা হত, আর অনেক অনেক কাল পরে সে সমস্ত লোকের মুখে মুখে গল্পকথায় পরিণত হল জলের নিচে স্থলভাগের তুলনায় চলাফেরায় প্রতিবন্ধকতা কম ডাঙায় হাঁটতে গেলে মাটির সঙ্গে পায়ের ঘর্ষণের ফলে যে বাধার সৃষ্টি হয়, সেই বাধা কাটিয়ে দেহের ওজন অনুপাতে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করে চলাফেরা করতে হয় জলে সে সব অসুবিধা নেই বললেই চলে তাই অনেক প্রজন্ম জলে বাস করার পর পাতালের বাসিন্দাদের কোমরের নিচের দিক থেকে পায়ের অংশ খানিকটা দুর্বল হয়ে গিয়েছিল তবে তারা সাঁতারে অত্যন্ত পটু ডাঙার মানুষ জলে তাদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারবে না কিন্তু জলের উপরে গেলে কেউ যদি আক্রমণ করে, তখন বিপদ তাই তো জলের উপরে একলা এলে বাবা রাগ করেন ওহো, ওর পরিচয় তো তোমাদের বলা হয়নি গঙ্গানদীর নিচে সেকালে ছিল এক বিরাট সাম্রাজ্য সেখানকার রাজা কৌরব্য- মেয়ে সে, আমাদের পন্নগী তবে তার কী কেবল একটা নাম? কেউ বলে কৌরবী, কেউ বলে ভূজগাত্মজা, পন্নগদুহিতা, ভূজগেন্দ্রকন্নকা এমনিই কত নাম তার, আরও একটি নাম আছে তার, উলূপী এই নামেই আমাদের প্রাচীন মহাকাব্য মহাভারতে, বিষ্ণুপুরাণে ভাগবত পুরাণেও তার উল্লেখ আছে তাকে কখনও-সখনও কেউ দেখে ফেলেছে পাথরের উপর বসে থাকতে মানুষ কাছেপিঠে দেখলেই সে চোখের পলকে জলের তলায় অদৃশ্য হয় তখন অবাক হয়ে লোকে বলাবলি করে, “অদ্ভুত একটা প্রাণী দেখেছি, দেহের উপরের ভাগ তার মানুষের মতো, কিন্তু নিচের অংশ সাপের মতো, নাকি মাছের মতো, জলের ভিতর তিরবেগে সাঁতরে সে নিমেষেই চোখের আড়াল হয়ে গেল!”
উলূপী সুন্দরী, যুদ্ধবিদ্যা জানে, আরও অনেক বিদ্যা শেখা হয়েছে তার, কিন্তু সবচেয়ে বড়ো কথা হল, সে ভীষণ তেজি মেয়ে তেমনই সাহসী আর স্বাধীনচেতা কারও কথা বিনা প্রতিবাদে মেনে নেওয়া তার ধাতে নেই সহসা জলের ঢেউয়ে ঝলসে ওঠে একটি শাণিত ফলার মতো পদার্থ সেদিকে দৃষ্টি পড়তে উলূপী লক্ষ করে একজন স্থলের মানুষ উপুড় হয়ে পড়ে আছে, হয়তো বা অচেতন, তার কাঁধে রাখা তূণীর মধ্যস্থ তিরের ফলা সূর্যের আলোয় ঝকমকিয়ে উঠে উলূপীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তিরের ফলা, রোদের প্রতিফলন এসবই তো বাহ্য, এরা সকলে মিলে কেবল ঘনিয়ে তুলেছে সেই যোগ, যে যোগ পরিচয় করাবে দুটি মানুষের, স্থলের মানুষের সঙ্গে জলের মানুষের, রচনা করবে অন্য এক ইতিহাস, উলূপীর আজকের এই অজানা অধীর অপেক্ষা এই পরিচয়ের ক্ষণটির জন্যেই হয়তো বা তৈরি হয়েছিল! এক সর্পিণীর মতোই তড়িৎ গতিতে উলূপী সাঁতরে পৌঁছে যায় আধোডোবা অচেতন মানুষটার কাছে, তারপর এক হাতে ওর হাত ধরে মারে এক হ্যাঁচকা টান আর যাত্রা করে নিজের রাজত্বের দিকে, জলের এক্কেবারে গভীরে
হ্যাঁচকা টানে চেতনা ফিরে আসে স্থলের মানুষটার কিন্তু সেও চট করে প্রতিক্রিয়া দেখানোর লোক নয় ধীর-স্থির-বুদ্ধিমান পুরুষ সে তাই কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাকে, তা দেখবার জন্য শান্তভাবে সে ভেসে চলে শান্ত ছায়াময় এক মনোরম লতাপাতায় ঘেরা স্থানে পৌঁছে থামে সেই মেয়ে পুরুষের হাত ছেড়ে দিয়ে সামনে দাঁড়ায় দু’চোখে ওর একরাশ মুগ্ধতা জিজ্ঞেস করে, “কে তুমি?” পুরুষ দৃপ্ত স্বরে বলে, “আমি কুন্তীপুত্র অর্জুন! তুমি কে গো সাহসিনী কন্যা?”
অর্জুন? কী সুন্দর এই নাম! সাহস তো তোমারও কম কিছু নয়? এই যে অপরিচিত এক মেয়ে তোমাকে টেনে নিয়ে এল এক অজানা স্থানে, বিন্দুমাত্র ভয় নেই তোমার?”
অর্জুন হাসল ভুবনমোহন হাসিতে জয় করেছে সে কত নারী-পুরুষ-রাজা-ঋষি আচার্য হৃদয় নিতান্ত কিশোরী কন্যার আর কথা কী? হাসি মনের মুকুর সৎ, পবিত্র, সরল, অকপট নির্ভীক পুরুষেরই হাসি সাজে
স্নেহপূর্ণ স্বরে অর্জুন বলল, “ভয় কীসের কন্যা? এমন তো প্রথম নয় আগেও কতবার জীবন বিপন্ন হয়েছে আমার দৈব সর্বদাই আমার সহায় হয়েছে তুমি তো নেহাৎই বালিকা কে তুমি? পরিচয় দাও নিজের, আমাকে কোথায় এনেছ তাও বল
“আমি নাগলোকের অধিপতি কৌরব্য রাজার কন্যা পন্নগী তুমি আমাকে উলূপী নামেও ডাকতে পার এটি গঙ্গাগর্ভের নাগলোক এখানে আমি সম্পূর্ণ স্বাধীন আর তুমি আমাকে বালিকা বলছ কেন? আমি মোটেই বালিকা নই তোমাকে আমার ভালো লেগেছে আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই
অর্জুন এবার আগের থেকে আরও জোরে হেসে উঠল হাসি আর থামতেই চায় না তারপর ধীরে ধীরে বলে, “আচ্ছা বেশ, তোমাকে আর বালিকা বলব না তোমার নির্ভীক অকপট স্বীকারোক্তি আমাকে মুগ্ধ করেছে কিন্তু উলূপী, আমি যে তোমার প্রস্তাবে সাড়া দিতে অক্ষম! আমি ইতিপূর্বেই বিবাহ করেছি এবং আমাদের স্থলের রাজাদের নিয়ম অনুসারে এক স্ত্রী জীবিত থাকতে তার অনুমতি না নিয়ে আমি দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারি না
উলূপী অর্জুনের কথায় একটুও দমে না গিয়ে বলে, “বেশ, তুমি বিবাহিত, তা না হয় মেনে নিলাম কিন্তু তুমি তো রাজা! একলা এই নদীতীরে এমন ভ্রাম্যমান পথিকের মতো কীভাবে এসে পড়েছ? তোমার অনুচর-সহচর কোথায়? যদি নদীতীরে কোনো যজ্ঞ করতে এসে থাকো, তোমার ধর্মপত্নী সঙ্গে নেই কেন?”
অর্জুন শান্তস্বরে বলে, “তুমি ঠিকই বলেছ, আমি নদীতীরে একটি যজ্ঞের প্রয়োজনেই এসেছি হঠাৎ স্রোতের টানে আমি ভেসে গিয়েছিলাম তারপর কখন জ্ঞান হারিয়েছি, মনে নেই আমার সঙ্গে কয়েকজন ব্রাহ্মণ ছিলেন তোমার সব প্রশ্নের উত্তর আমি দেব তার আগে আমি আমার অসম্পূর্ণ যজ্ঞ সম্পূর্ণ করতে চাই এই নাগলোকে কি যজ্ঞাহুতির জন্য অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করা যেতে পারে?”
উলূপী কোনো কথা না বলে আবার এসে নিঃসঙ্কোচে অর্জুনের হাত ধরে তারপর তাকে টেনে নিয়ে চলে আরেক দিকে
কিছুক্ষণ পরে যেখানে পৌঁছায়, সেখানে অর্জুন দেখে এক বিরাট প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ড সামনে প্রশস্ত যজ্ঞবেদি এখানে যে নিয়মিত যজ্ঞাদি কর্ম হয়ে থাকে, বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না অর্জুনের দৃষ্টিতে প্রসন্নতা দেখে খুশি হয় উলূপী, বলে, “নাও, এবার তোমার কাজ সম্পূর্ণ কর
হৃষ্ট চিত্তে অগ্নিতে আহুতি দিয়ে যজ্ঞ সম্পূর্ণ করে অর্জুন অগ্নিদেবও যেন অর্জুনের প্রাত্যহিক ব্রত-অনুষ্ঠানের নিষ্ঠা দেখে তুষ্ট হয়ে পূর্ণ তেজে জ্বলে উঠলেন তারপর দু’জনে কথা বলবার জন্য বসে অর্জুন বলে, “আমার স্ত্রী দ্রুপদ রাজার মেয়ে দ্রৌপদী যাজ্ঞসেনী সে, যজ্ঞের অগ্নি থেকে উদ্ভূতা পরমা সুন্দরী তাকে লাভ করবার জন্য দেশবিদেশের রাজকুমারদের মধ্যে লড়াই বেঁধে গিয়েছিল অবশেষে স্বয়ম্বর সভায় এক কঠিন প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করে তার কাছ থেকে আমিই বরমাল্য লাভ করেছি
, তুমি পাঞ্চাল দেশের রাজকন্যা পাঞ্চালীর কথা বলছ! কিন্তু তিনি তো শুনেছি পঞ্চপতি গ্রহণ করেছেন
তিনি পঞ্চপতি গ্রহণ করেননি পরিস্থিতি তাকে দিয়ে তেমন করিয়েছে যাই হোক, তুমি এসব জানলে কোথা থেকে?”
আমার পিতার কাছে সব খবরই আসে আমি সেখান থেকেই জানতে পেরেছি তবে কি তুমিই সেই অর্জুন? সেই অসম্ভব শর্ত মেনে মাছের চোখে লক্ষ্যভেদ করে তুমিই জয় করেছ পাঞ্চালীকে? তবে তোমার রাজবেশ কোথায়? কেন তুমি এমন দরিদ্র ব্রাহ্মণের বেশে? তোমার তূণীরে তির দেখে আমার সংশয় হয়েছিল আমাকে বলো বীর অর্জুন, যাজ্ঞসেনী কি এখন তোমার সঙ্গে বাস করছেন না?”
অর্জুন, বীর অর্জুন, ক্ষত্রিয় যোদ্ধা অর্জুন, এই মুহূর্তে এক বিস্মিত কিশোরীর সরল প্রশ্নবাণে নতমস্তকে নীরব থাকে, বলতে পারে না, ‘ওহে বালিকা, ভাগ্য কতরকমে পরিহাস করে, তার তুমি কতটুকুই বা জানো?
অবশেষে ধীরে ধীরে আরক্ত নয়ন তুলে অর্জুন তাকায় উলূপীর দিকে তার প্রেমপ্রার্থী এই সুন্দরী কিশোরী ব্যাকুল আগ্রহে চেয়ে আছে তারই মুখের পানে, নিষ্পাপ সরল দুটি চোখে ভালোবাসা আর নিঃশর্ত সমর্পণ অর্জুন মৃদুস্বরে বলে চলে মাতা কুন্তীর অসতর্ক উক্তির কথা, তাদের পঞ্চভ্রাতার মধ্যে দ্রৌপদীর ভাগ হয়ে যাওয়ার কথা এবং এক ভ্রাতার স্ত্রী থাকাকালীন অন্য কোনো ভ্রাতা তাদের ব্যক্তিগত মুহূর্তে উপস্থিত হলে শাস্তিস্বরূপ এক বছরের জন্য অরণ্যে ব্রহ্মচারী হয়ে থেকে প্রায়শ্চিত্ত করার প্রতিজ্ঞার কথা, এবং বর্তমানে শর্তভঙ্গকারী অর্জুনের অরণ্যচারী হওয়ার কথা
নীরবে সব শোনে উলূপী তার দু’চোখ ছলছলিয়ে ওঠে অর্জুনের দুঃখে স্থলের মানুষদের জটিল নিয়মকানুন সে বুঝতে পারে না
উলূপী অর্জুনের হাতের উপর নিজের হাত রাখে তারপর দৃঢ় স্বরে বলে, “শোন বীর অর্জুন, সমস্ত ঘটনা শুনে আমি যা বুঝেছি, তাতে কোনোখানে তোমার কোনো অপরাধ হয়নি দ্রৌপদী ধর্মমতে তোমার স্ত্রী হলেও এখন তিনি যুধিষ্ঠিরের গৃহিণী তাই এখন তোমার অন্য স্ত্রী গ্রহণে বাধা থাকতে পারে না
তুমি বোঝনি কন্যা আমি তোমাকে আঘাত দিতে চাই না কেন বার বার অসম্ভব কথা বলছ? আমি ভ্রাতাদের অনুমতি না নিয়ে অন্য স্ত্রী নিয়ে গৃহে প্রবেশ করতে পারব না আমাকে দয়া করে নাগলোক থেকে বেরোবার পথ বলে দাও
এবার উলূপী খিলখিল করে হেসে ওঠেএই তোমার ভয় বীরপুরুষ? আমাকে তোমার স্ত্রী হিসেবে সঙ্গে নিতে হলে পরিবারের সমর্থন দরকার? কে তোমার পরিবারে যেতে চায়? আমি? আমি এখানে মহানন্দে থাকি, আমার স্বাধীনতায় কেউ হস্তক্ষেপ করেন না, এমনকি আমার পিতাও নন আমি নাগলোকের রাজনন্দিনী আমি তোমাদের স্থলের জগতে বাস করতে পারবও না তোমাকে আমার ভালো লেগেছে তোমাকে ভালোবেসে আমি তোমার ভালোবাসা পেতে চাই এই নাগলোকে এমন কোনো নিয়ম নেই যে বিয়ে করবার পর নারী-পুরুষকে পরস্পরের স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে হবে এবং তাদেরকে একত্রে থাকতেই হবে তোমার যতদিন ইচ্ছা এই নাগলোকে থাকতে পার তারপর কর্তব্য পালনের জন্য প্রয়োজনে যেতে পার যেখানে ইচ্ছা, আমাদের এখানে কেউ তোমাকে বাধা দেবে না আমিও না কেবল আমার ভালোবাসাকে প্রত্যাখ্যান কোরো না বীর অর্জুন! কথা দিচ্ছি, কোনোদিন, কোনো দাবি নিয়ে তোমাকে বিব্রত করতে উপস্থিত হব না বরং কোনোদিন তোমার কোনো দরকারে যদি কাজে লাগতে পারি, নিজেকে ধন্য মনে করব
দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিন্নভিন্ন হতে থাকে অর্জুনের মন বারংবার মনে পড়ছে সেদিনের সেই লক্ষ্যভেদ অনুষ্ঠান শেষে বিজিতা যাজ্ঞসেনীর লাজনম্র মুখের ছবিখানি! যাজ্ঞসেনীর আগে স্থান দিতে হবে অন্য কোনো নারীকে! নিয়তির এ কী অদ্ভুত পরিহাস! চিন্তাজাল ছিন্ন হয় কোমল দুটি করস্পর্শে দু’হাতে অর্জুনকে বেষ্টন করে দু’চোখের নীরব ভাষায় উলূপী যেন বলতে চায়, ‘যাজ্ঞসেনীর চেয়ে আমিও রূপে-গুণে কোনো অংশে কম নই! উলূপীর সহজ সরল স্পষ্ট বাক্যে অর্জুন মুগ্ধ হয়, মন থেকে সব দ্বিধা মুছে ফেলে জলজ শৈবালের মতো নরম অথচ দৃঢ় মনের সেই নাগলোকবাসিনী কন্যা উলূপীর বিয়ের প্রস্তাবে সম্মতি জানায় বহু রাজকন্যা যে বীর অর্জুনের স্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই মধ্যমপাণ্ডব কৃষ্ণসখা অর্জুনের প্রথমা স্ত্রী হওয়ার গৌরব লাভ করেছিল সাহসিনী মেয়ে উলূপী
কোনো শর্ত নেই, নেই কোনো বন্ধন, কোনো মন্ত্র উচ্চারিত হয় না এই প্রেমের বিবাহে, কেবল দুটি পবিত্র হৃদয় হল যজ্ঞের অগ্নি, আর দু’জনের পবিত্র ভালোবাসা -বিয়ের মন্ত্র বেশ কিছুদিন সুখে অতিবাহিত হয় ভালোবেসে অর্জুনকে উপহারস্বরূপ এক বর দান করে উলূপী, বলে, “জলের নিচের সমস্ত প্রাণীর সঙ্গে যুদ্ধে তুমি হবে অপরাজেয়!” একসময় অর্জুন উলূপীকে স্মরণ করিয়ে দেয় নিজের অসমাপ্ত কর্তব্যের কথা নির্দ্বিধায় উলূপী বিদায় দেয় প্রিয়তম অর্জুনকে সঙ্গে করে দিয়ে আসে পাতাললোকের ঊর্ধ্বে, স্থলভাগে বিদায়কালে মনে করিয়ে দেয়, “আমার অনেক বিদ্যা জানা আছে, কোনোদিন বিপদে পড়লে স্মরণ কোরো, পাশে পাবে যে-ক’দিন একসঙ্গে কাটল, তার স্মৃতি আমার হৃদয়ে থাকবে চির-অমলিন!”
চলে গেলেন অর্জুন মহাভারত মহাকাব্যে তাঁর বিরাট ভূমিকা, অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে তিনি সে সমস্ত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন উলূপীর কথা আর তাঁর মনে এল না নাকি মাঝেসাঝে মনে পড়ত, কে জানে?
কিছুদিন পরে নাগলোকে এল এক নতুন অতিথি উলূপীর গর্ভে জন্ম নিল অর্জুনের প্রথম সন্তান ইরাবান
রাজার ছেলের মতোই নাগলোকে ইরাবানকে বড়ো করে তুলছেন উলূপী ক্ষত্রিয় বীর অর্জুনের সন্তানকে যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী করে তুলতে কোনো ত্রুটি রাখছেন না উলূপী ইতিমধ্যে গঙ্গায় বয়ে গেছে অনেক জল পিতা কৌরব্যের অবর্তমানে পাতাললোকের রাজ্য শাসন করছেন বীর নারী উলূপী হঠাৎই একদিন তাঁর কানে এল অর্জুনের সংবাদ তাঁর প্রিয় সখী, মণিপুর রাজকুমারী চিত্রাঙ্গদা খবর পাঠিয়েছেন, “অর্জুনের আর বাঁচার আশা নেই তুমি শিগগির এসো ভাই, কিছু একটা করউলূপীর যে অনেক বিদ্যা জানা আছে, সে কথাও জানে কেউ কেউ চিত্রাঙ্গদাও জানে কিন্তু অর্জুনের কী হল? যুদ্ধে হারিয়ে তাঁকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে নাকি নেহাৎই এক বালক! বভ্রুবাহন নাম তার কী সর্বনাশ! সে- যে অর্জুনেরই ছেলে!
(ক্রমশ)
----------
[মহাভারত - আদিপর্ব, অধ্যায় - অর্জুন-বনবাস পর্ব, ২১৬ নং পরিচ্ছেদ]
ছবি - উইকিপিডিয়া
ম্যাজিক ল্যাম্প