Showing posts with label পম্পা প্রধান. Show all posts
Showing posts with label পম্পা প্রধান. Show all posts

গল্পের ম্যাজিক:: উলূপী - অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী


উলূপী
অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

“খবরটা দেখেছিস? কী কাণ্ড!” বলে শৈবাল কাগজটা এগিয়ে দিল। একটা জনপ্রিয় দৈনিকের তৃতীয় পাতার নিচের দিকের একটা খবরে দৃষ্টি আকর্ষণ করল।
“কী খবর, দেখি?” দেবসেনাপতি খবরটা একবার ঝুঁকে দেখল। কিন্ত সেরকম কোনও আকর্ষণীয় কিছু দেখতে না পেয়ে ব্যাজার মুখে বলে উঠল, “অত পড়তে পারব না। তুইই বলে দে না!”
বলা বাহুল্য, আজকের দিনটা হল শনিবার। আমরা সবাই শনিবারের বিকেলে আবার প্রতীকদের উত্তর কলকাতার বাড়িতে জড়ো হয়েছি। আজকে অনিলিখাদি ও  বিশ্বজিৎদাও আমাদের সঙ্গে আছে। রীতিমতো অঘটনই বলা চলে। এদের দুজনকে একসঙ্গে শনিবারের আসরে পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার।
সামনেই পুজো। দুপুরের দিকে জোর এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। রাস্তায় কোথাও কোথাও একটু জলও জমেছেএখন গরম তেমন না থাকলেও বাইরে খানিকটা গুমোট হয়ে আছেকার কী পুজোর প্ল্যান, কে কোথায় বেড়াতে যাব - এসব নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল।
এসব কথার মধ্যেই হঠাৎ শৈবাল এ খবরের কথাটা বলে উঠেছিল।
দেবসেনাপতির কথায় উৎসাহ পেয়ে শৈবাল ফের বলতে শুরু করল, “খবরটা হল, সুদানে লাটুকা উপজাতির লোকেরা নাকি বিয়ের সময় পাত্রীকে অপহরণ করে। মানে, বাড়ি থেকে জোর করে তুলে আনে। তারপর ওই ছেলের বাড়ির থেকে কোনও এক গুরুজন মেয়ের বাবার কাছে গিয়ে এর জন্য বিয়ের অনুমতি চায়। মেয়ের বাবা যদি সম্মতি দেয়, তাহলে তার প্রমাণস্বরূপ যাকে পাঠানো হয়েছে, তাকে আচ্ছা করে উত্তমমধ্যম দেওয়া হয়। আর মেয়ের বাবা যদি অসম্মতি জানায়, তাহলে আর সেক্ষেত্রে ছেলের বাড়ির লোককে মারা হয় না। তবে মেয়ের বাবার অসম্মতি থাকা সত্ত্বেও সে ছেলে কিন্তু ইচ্ছে করলে জোর করে ওই মেয়েকে তার পরেও বিয়ে করতে পারে।”

“বাহ, এ তো বেশ ইন্টারেস্টিং ব্যাপার,” একটু নড়েচড়ে বসল বিশ্বজিৎদা, “তা হঠাৎ করে এরকম কথা বললি কেন রে শৈবাল! তুই আবার এরকম কোনও মেয়ে অপহরণজাতীয় কিছু করিসনি তো? সেক্ষেত্রে অনিলিখাকে দূত হিসেবে মেয়ের বাড়ি পাঠাতে আমাদের কোনও আপত্তি নেইকি বল অনিলিখা?”
অনিলিখা আজ বেশ সেজেগুজে এসেছে। পুজোর সময় কলকাতায় থাকবে না। তাই মনে হয় পুজোর পোশাক আগেই পরে ফেলেছে। একটা নীল সালোয়ার কামিজ। চুলে একটা ঝিনুকের ক্লিপ।
অনিলিখাকে মুচকি হাসতে দেখে বিশ্বজিৎদা বলে উঠল, “তা খবরটা জানা ছিল তোমার?”
“না, এ ব্যাপারটা ঠিক জানা ছিল না। তবে এরকম অনেক আজব অভ্যেস অনেক উপজাতির মধ্যেই থাকে। আমাদের ভারতেই এরকম কত উপজাতি আছে। চাকমা, গারো, কুকি, বোরো, চিরু, ভিল কত যে আছে! আমরা তাদেরই খবর রাখি না। আর প্রত্যেকেরই নিজস্ব কিছু রীতিনীতি থাকে। একবার এরকম এক উপজাতিকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল।”
“তার মানে তোমার ঝুলিতে এ ব্যাপারে কোনও গল্প আছে, তাই তো?”
“হ্যাঁ, সেরকম একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল একবার। তবে বহু বছর আগের ঘটনা।”
“সেকি? এতদিন বলনি তো!” আমরা সবাই সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলাম।
অনিলিখা ফের মুচকি হাসল। ব্যাগ থেকে লাল লিপস্টিক বার করে ঠোঁটে একবার বুলিয়ে নিয়ে বলতে শুরু করল, “সবই যদি একদিনে বলে ফেলতাম, তাহলে কি আর আজকে এমন সুন্দর ঘুগনি খেতে পারতাম?”
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, দরজা দিয়ে কাজের মাসি বেশ বড়ো একটা প্লেট নিয়ে ঢুকেছে। তাতে ঘুগনি, ঝুরিভাজা।
অনিলিখা আর বিশ্বজিৎদা এই দুই বিশেষ অতিথির জন্যই যে আজকে এই ঘুগনির বিশেষ আয়োজন তা বলাই বাহুল্য। আমাদেরও সেই সুযোগে বেশ জমাটি সান্ধ্যভোজন হবে।
ঘুগনি অধ্যায় শেষ হতে মিনিট পনেরো লাগল। ইতিমধ্যে মাসিমা মানে প্রতীকের মাও গল্পের গন্ধে গন্ধে চলে এসেছেন।
অনিলিখা এবারে ধীরেসুস্থে বলতে শুরু করল –

"এটা বেশ কয়েক বছর আগের কথা। তখন ইউনিভার্সিটিতে ছুটি পেলে আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে প্রতিবারই কোনও না কোনও পাহাড়ে ট্রেকিং করতে বেরিয়ে পড়তাম।
"তা সেবারে গিয়েছিলাম হর কি দুন। তোদের মনে আছে কি না জানি না, মহাভারত অনুযায়ী এই পথেই পাণ্ডবরা স্বর্গে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। এখান থেকে বেশ কয়েকটা পাহাড়ের চূড়া দেখা যায়, যার মধ্যে ওই স্বর্গারোহিণী ১.২.৩ নামের তিনটে পাহাড়চূড়াও পড়ে।
"পুজোর ঠিক আগে গিয়েছিলামট্রেনে দিল্লী। সেখান থেকে বাসে দেরাদুন। দেরাদুনে পৌঁছে রীতিমতো বিপদে পড়ে গেলাম। কয়েকদিন ধরে ওখানে ভারী অকালবর্ষণ শুরু হয়েছেশুনলাম, পাহাড়ে নানান জায়গায় ধস নেমেছে। প্রাইভেট গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। একমাত্র ভরসা বাস।
"আমাদের দেরাদুন থেকে সাকরি যেতে হত। সেখানে দিনে দুটো বাস যায়। শুনলাম, এখন শুধু একটাই বাস যাচ্ছে।
"যাই হোক, অতদূর গিয়ে তো আর ফিরে আসা যায় না। আমার সঙ্গে আমার কলেজের আরও দুজন বন্ধু ছিল। মিলন আর ধৃতিমান। আমরা ঠিক করলাম একটু অসুবিধে হলেও যে করেই হোক যাব। একদিন অপেক্ষা করে পরেরদিন সকালে দেরাদুন থেকে সাকরির বাস ধরলাম। অনেকটা পথ। প্রায় দশঘণ্টারযে সময়ের কথা বলছি, তখন এ পথে প্রায়ই দুর্ঘটনা হত। এখন জানি না কী অবস্থা। বাসে উঠে খেয়াল করলাম, আমাদের সঙ্গে যারা যাচ্ছে, তারা সবই স্থানীয় বাসিন্দা। আমরা ছাড়া ট্রেকিং-এর উদ্দেশ্যে যাচ্ছে, এরকম অন্য কাউকে চোখে পড়ল না। বুঝলাম, ট্রেকিং করতে যারা এসেছিল, তাদের একটা বড়ো অংশ আশা ছেড়ে বাড়ি ফিরে গেছে।
"ভেবেছিলাম সন্ধে আটটার মধ্যে সাকরি পৌঁছে যাবকিন্তু বিধি বাম। ছ'টা নাগাদ মাঝপথে হঠাৎ বাস দাঁড়িয়ে গেল। নো নড়নচড়ন। কয়েকজন বাস থেকে নেমে এগিয়ে দেখতে গেল। আমরা বাসে বসেই অপেক্ষা করতে থাকলাম। এভাবে প্রায় আধঘণ্টা কেটে গেল। খানিকক্ষণ বাদে বাসের ড্রাইভার এসে জানাল, বাস আর যেতে পারবে না। সামনের রাস্তা ধসে বন্ধ হয়ে গেছে
"বাস থেকে নেমে পড়লামসরু রাস্তা। দুশো মিটার-মতো দূরত্বে একটা বড়ো ধস নেমেছে। রাস্তা বলে আর কিছু নেই। হয় বাসেই সারারাত অপেক্ষা করতে হবে, না হলে আশেপাশে কোনও গ্রাম আছে কি না খোঁজ নিতে হবে। এমনিতেও বাসে বেশি প্যাসেঞ্জার ছিল না। বেশিরভাগ আগেই নেমে গেছে। এখনও সাকরি প্রায় কুড়ি কিলোমিটারের রাস্তা। সারারাত তো এখানে এরকমভাবে বাসে বসে থাকা যাবে না। কী করব তা ভাবছি। এর মধ্যে একজন স্থানীয় বৃদ্ধ লোক জানাল যে কাছেই চার কিলোমিটার দূরে একটু অন্যদিকে একটা খুব ছোট গ্রাম আছে। সে সেখানেই থাকে। আমরা যদি চাই ওর সঙ্গে যেতে পারি। রাতে একটা মাথা গোঁজার মতো জায়গা পেয়ে যাব।
"উপায় ছিল না। ওই অচেনা লোকটার সঙ্গে এগোলাম। একটু অন্যদিকে। আরও প্রত্যন্ত গ্রাম। গ্রাম বলাটাও ঠিক কি না জানি না। সামান্য কয়েক ঘর লোকের বাস। নাম জিজ্ঞেস করলাম। লোকটা প্রশ্নটা শুনে অবাক হয়ে বলে উঠল, 'না, এ গ্রামের কোনও নাম নেই। অনেকে জানেই না যে এখানে কিছু লোক বাস করে।'
"আমাদের ওই লোকটা গ্রামের মোড়লের বাড়ি নিয়ে গেল। তখন সন্ধে হয়ে এসেছিল। আমাদের সঙ্গে তাঁবু, রুকস্যাক আছে। কোনও বাড়িতে থাকার জায়গা না পাওয়া গেলে সেরকম কিছুই ব্যবস্থা করতে হবে।
     "কিন্তু না! রাতের থাকার জায়গার কোনও অভাব হল না। তবে একসঙ্গে জায়গা পাওয়া গেল নাআমার থাকার ব্যবস্থা হল এক গরিব চাষির বাড়িতে। আমাকে ওরা সে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেল।
"অদ্ভুত সে বাড়ি। নিচুমাটি থেকে ছয় ফুট উঁচুতে টিনের চালচাষির নাম মনোজ সিং। ছোটখাটো চেহারা। পঞ্চাশের মতো বয়স হয়েছে। ওর সঙ্গে ওর মেয়ে থাকে। অবশ্য আশেপাশে সে মেয়েকে দেখতে পেলাম না।
"যেটা আমাকে অবাক করল, তা হল ওই লোকটার কথা বলার ধরন। একেবারেই চাষিসুলভ কথাবার্তা নয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাই মনোজজী বলে কথা বলতে শুরু করলাম।
"এরকম বাড়িতে থাকার অভিজ্ঞতা আগে আমার হয়নি। দুটো ছোট ছোট ঘরতার একটাতে আমার থাকার ব্যবস্থা হল। দুটো ঘরেই আসবাব বলে কিছু নেই। চাষি যে ঘরে থাকে, সেখানে একদিকে স্টোভ আর সামান্য কিছু বাসনকোসন রাখা আছে। একটা বাটিতে দুধ রাখা আছে। কোনও বাথরুম নেই। সেটা অবশ্য এই গ্রামেই কারুর বাড়িতে নেই বলে মনে হল।
"মনোজজীর ঘরে এসে বসলাম। সন্ধে সাতটা। আকাশ তারার ভিড়ে ঢাকা পড়েছে। কলকাতায় আকাশে কখনও এতো সুন্দরভাবে তারামণ্ডলী ধরা দেয় না। দূরে এককোণে কিছু কালো মেঘ জড়ো হয়েছে। পরে বৃষ্টি আসতে পারে।
     "আমাকে দেখার জন্য গ্রামের লোকেদের মধ্যে খুব আগ্রহ। ওই চাষি ছাড়াও ঘরের মধ্যে তিনজন এসে বসল।  বুঝলাম, খুব কম বাইরের লোকই এখানে আসে। এদের সবার রং বেশ ফরসা। ছোটখাটো চেহারা।
"একটু কথা বলতেই বুঝলাম, এরা বাইরের পৃথিবীর কোনও খবরই প্রায় রাখে না। এমনকি শরীর খারাপ হলেও এখানে ভালো ডাক্তার পাওয়া যায় না। কিন্তু প্রত্যেকেই খুব সহজসরল।
"যার বাড়িতে উঠেছি, তাকে সবাই বেশ শ্রদ্ধার চোখে দেখে। মনে হল তার কথা সব মেনে চলে। কারণটা ঠিক বুঝলাম না।
"একটা জিনিস হঠাৎ চোখে পড়ল। খেয়াল করে বেশ অবাক হলাম। ঘরের দেওয়ালে কী সব সংখ্যা লেখা। দেখতে কাছে এগিয়ে গেলাম। চমকে উঠলাম, এ তো বিখ্যাত সেই ফিবোন্যাচি নাম্বার সিকোয়েন্স! এখানে লেখা কেন? কে লিখেছে?"

“ফিবোন্যাচি নাম্বার সিকোয়েন্স কী অনিলিখাদি?"
অনিলিখার কথার মধ্যে বাধা এল। সহেলী প্রশ্ন করেছে।
অনিলিখা একটু জল খেয়ে বলে উঠল, ", , , , , , ১৩, ২১, ৩৪, ৫৫, ৮৯ - এটা হল ফিবোন্যাচি নাম্বার সিকোয়েন্স। এখানে খেয়াল কর, পরপর দুটো সংখ্যা যোগ করলে পরের সংখ্যাটা পাওয়া যায়। যেমন ১+১ হল ২, ১+২ হল ৩, ২+৩ হল ৫, ৩+৫ হল ৮। এরকম চলতেই থাকবে। ১২০২ সালে ইতালির এক গণিতজ্ঞ লিওনার্দো অফ পিসা এর উপরে একটা বই লেখেন। উনি পরে ফিবোন্যাচি ছদ্মনাম নেন। আর সেই নামেই এই সিকোয়েন্স। উনি খরগোশের একটা পরিবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে বাড়বে তা বোঝানোর জন্য এই সিকোয়েন্স ব্যবহার করেছিলেন।"

একটু থেমে অনিলিখা ফের বলে উঠল, “কী, মাথায় ঢুকল? এবার আসল গল্পে ফেরা যাক। যা বলছিলাম।
   "আমাকে অবাক হয়ে দেওয়ালে লেখা ওই সংখ্যাগুলো দেখতে দেখে বলে উঠল, 'কী ভাবছ? এই সংখ্যাগুলো কোথা থেকে এল, তাই তো? আমার সব সংখ্যাতেই খুব আগ্রহ।'
'হ্যাঁ, ঠিক তাই। এই সংখ্যাগুলো তো ফিবোন্যাচি সিকোয়েন্সের মধ্যে পড়ে?'
"মনোজজী হেসে উঠল, 'না। না। আমি অতো শক্ত কিছু বুঝি নাএটা হল ফুলের পাপড়ির সংখ্যা।'
     "লোকটার পাশে বসা টাকমাথা মাঝবয়সি লোকটা বলে উঠল, 'আমাদের মনোজভাই খুব পণ্ডিত লোক। ওর সঙ্গে কথা বললেই অনেক কিছু জানা যায়।'
"মনোজজী একথা শুনে একটু হেসে ফের বলে উঠল, 'আমার একটা অভ্যেস হল, যখনই কোনও ফুল দেখি, তার পাপড়ির সংখ্যা গুনি। এখানে তো নানান ধরনের অজানা ফুল পাওয়া যায়। জঙ্গল থেকে খুঁজে নিয়ে আসিঅবাক হয়ে দেখি তাদের সবার পাপড়ির সংখ্যা এই সংখ্যাগুলোর মধ্যেই কোনও একটা। এর বাইরে অন্য কোনও সংখ্যার পাপড়ি প্রায় হয়ই না।'
"৩, ৫, ৮, ১৩, ২১, ৩৪, ৫৫, ৮৯, ১৪৪, মনোজজী পরপর বলে গেল।
'১৪৪ এতো পাপড়ি আবার কার হয়?'
'কেন সূর্যমুখী ফুলের পাপড়ির সংখ্যা ৫৫, ৮৯ বা ১৪৪ হয়।'
'কিন্তু বাকি ফুলেরও কি পাপড়ির সংখ্যা এরকমই হয়?'

'হ্যাঁ, জবার পাপড়ি ৫, ঝুমকোলতায় ৫, নয়নতারায় ৫, তারাফুলে ২১ - প্রায় সব ক্ষেত্রেই পাপড়ির সংখ্যা ওই সংখ্যাগুলোর মধ্যে।'
'বাহ্‌, দারুণ ব্যাপার তো!'
  "মনোজজী একটু থেমে ফের হেসে বলে উঠল, 'আমি কি আর অত অঙ্ক বুঝি? সবথেকে বড়ো অঙ্কের জাদুকর তো আমাদের সামনেই বসে আছে আর তা হল আমাদের প্রকৃতি। লক্ষ করেছ কীভাবে গাছের পাতাগুলো একটা শাখার চারদিকে ছড়িয়ে থাকে! একটা নির্দিষ্ট কোণ থাকে পরপর দুটো পাতার মধ্যে অঙ্কের সব সূত্র যেন ওদের জানা। আর এটা কী কারণে হয় জান?'
           'যাতে ওরা সবাই একইরকমভাবে আলো পায়, তাই তো?'
           'হ্যাঁ ঠিক তাই। আমরাও তাই নিয়ম ভাঙতে পারি না।'
  "বলতে বলতে মনোজজী আবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়লএকটু থেমে ফের বলে উঠল, 'আমরা চাইলেও প্রকৃতির নিয়ম ভাঙতে পারব না। আমাদের মেনে চলতেই হবেনা হলেই অনর্থ।'
  "পাশে বসে থাকা তিনজন লোকও দেখলাম সায় জানিয়ে ঘাড় নাড়ল। একজন বলে উঠল, 'আমরা নিয়ম ভাঙব না।'
  "খানিকবাদে আমরা সবাই মিলে বাজরার রুটি আর একটা ডাল খেলাম। বলতে নেই, এরকম অখাদ্য ডাল আমি খুব কমই খেয়েছি। তাতে ডাল কম, জলই বেশি তা আবার আধসেদ্ধ। এরা এতই গরিব যে কোনওরকমে এ ধরনের খাবার খেয়ে চালায়তাতেই এরা খুশি। শুনলাম, এরা হিড়িম্বার পুজো করে। এদের কাছে হিড়িম্বাই হল মূল দেবতা।
"যে তিনজন ঘরে বসেছিল, তাদের মধ্যে একজনের নাম লখন। সে দেখি গাড়োয়ালি ভাষায় মনোজজীকে বলে উঠল, 'আচ্ছা, উলূপীর শরীর কেমন আছে?'
           'ভালোই আছে। তবে আমার মেয়ের যা বদমেজাজ, পাঁচজনের সামনে তো আর তাকে বার করা যায় না।'
"ওর মেয়েকে নিয়ে কথোপকথন পুরোটা না বুঝলেও বুঝলাম, ওর মেয়েকে সবাই ভালোবাসে, আবার বদমেজাজের জন্য খানিকটা এড়িয়েও চলে। একটু মাথা খারাপ আছে বোঝা গেল। ওদের কথাবার্তা থেকে বুঝলাম, ওর মেয়ে উলূপী এখানেই থাকে। পাশের অন্য একটা ঘরে।

"কোথায় সে ঘর জিজ্ঞেস করতে, মনোজজী ওর ঘরের অন্যদিকের একটা নিচু দরজার দিকে দেখাল। দেখলাম, যেখানে রান্না করা হয় তার পাশে একটা নিচু দরজা আছে। আগে ভেবেছিলাম ওটা বোধহয় বাড়ি থেকে বেরোনোর আরেকটা রাস্তা। ওদিকে যে আরেকটা ঘর আছে তা খেয়াল করিনি।
"আমরা কথা বলছি। এর মধ্যে হঠাৎ দেখি আরও দুজন লোক বাইরের দরজার কাছে উঁকি মারছে। মনোজজী ওদের দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। খানিক বাদে আবার ফিরে এল। এসে একটা খুব আনন্দের খবর জানালগ্রামে একজনের নাকি বাচ্চা হয়েছে। এমনিতে বেশ কয়েকদিন বাদে হওয়ার কথা ছিল। হঠাৎ কয়েক ঘণ্টা আগে প্রসববেদনা ওঠে। যাই হোক, এখন সব নির্বিঘ্নে হয়ে গেছে। মা ও মেয়ে দুজনেই ভালো আছে।
"ঘরের সবার মধ্যেও আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল। ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ওরা বেশ কিছু কাঠ জড়ো করে আগুন জ্বালালশুনলাম, এটাই নাকি এখানকার রীতি। নতুন কাউকে এভাবে স্বাগত জানান হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্রামের প্রায় সবাই এসে হাজির। এ আনন্দে শরিক হতে।
"লক্ষ করলাম, মনোজজী এর মধ্যেই একজন বৃদ্ধের সঙ্গে কথা বলছে। ওদের কথার মাঝে অনেকেই সে লোকটাকে এসে প্রণাম করে যাচ্ছে।
"খানিকবাদে মনোজজীকে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'লোকটা কে হয়?'
"মনোজজী বলে উঠল, 'বুধুয়া। এই গ্রামের সবথেকে বয়স্ক লোক। সবাই ওনাকে খুব ভালোবাসে আর শ্রদ্ধা করে যখনই কেউ বিপদে পড়ে, উনিই সবার আগে এগিয়ে আসেন।'
"খুব ভালো লাগল শুনে। এরা তাহলে গুরুজনদের এরকমভাবে সম্মান করে।
"রাত ন'টা নাগাদ সবাই যে যার ঘরে ফিরে গেল। পূর্ণিমা আর কয়েকদিনের মধ্যে। কিন্তু চারদিক থেকে কালো মেঘটা যেভাবে চাঁদটাকে ঘিরে ধরেছে, মনে হচ্ছে কেউ যেন একটা সোনার থালায় কালির দোয়াত উল্টে ফেলেছে। আমিও মনোজজীর বাড়িতে ফিরে এসে ওর সঙ্গে খানিকক্ষণ কথার পরে রাত দশটার সময় শুয়ে পড়লাম।
"একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। একা শোবো। তাও পাশের ঘরে এমন একজন যাকে প্রায় চিনি না।
"তখনকার দিনে তো আর আমাদের কাছে মোবাইল ফোনও থাকত না। তাই মিলন বা ধৃতিমানকে রাতে দরকার হলে জানানোরও কোনও উপায় ছিল না।
"ঘুম আসছিল না। রাত বারোটা নাগাদ মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল। টিনের চালের উপরে পড়া বৃষ্টি আর হাওয়ার কনসার্ট শুনতে শুনতে কখন জানি ঘুমিয়ে পড়লাম।
"খানিক বাদে কীসের শব্দে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। মনে হল, পাশের ঘরে কীসের যেন আওয়াজ পাচ্ছি। একটা খসখস আওয়াজ। মাটিতে চাদর পেতে শুয়েছিলাম, মনে হল পাশের ঘরে যেন কিছু একটা চলে বেড়াচ্ছে। ঘরে ঠিক যেন কোনও হাঁপানি-রুগী আছে। আর সে মাঝে মধ্যে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে। দরজা খোলার সুযোগ নিয়ে কেউ ভেতরে চলে আসেনি তো! পাশে ব্যাগের মধ্যে টর্চ ছিল। টর্চ নিয়ে চাদরের মধ্যে থেকে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে এলাম। কিন্তু টর্চ জ্বাললাম না। যদি মনোজজীর ঘুম ভেঙ্গে যায়!
"কান খাড়া করে আবার শুনলাম। একটা আওয়াজ আসছে। কেউ যেন জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। একটু থেমে আবার বড়ো করে নিঃশ্বাস। অনেকটা খানিকক্ষণ দম বন্ধ করে যেভাবে কেউ তারপরে নিঃশ্বাস নেয়।
"চোখ একটু অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়ে গেলে পাশের ঘরে গেলাম। আওয়াজটা যেন হঠাৎ করে থেমে গেলমনোজজী ঘরের একধারে চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। মনে হল, পাশের ঘরের দরজাটা যেন সামান্য খোলা। কোনও কিছু কি তাহলে ওর মেয়ের ঘরে ঢুকেছে? ঢুকে দেখব?
"শুনেছিলাম মেয়ে স্বাভাবিক নয়। এত রাতে কোনওরকম পরিচয় ছাড়া তার ঘরে ঢোকা কি ঠিক হবে? একটু দ্বিধা নিয়ে আবার আমার ঘরে ফিরে এলাম।
"ভোরের দিকে আবার ঘুম ভেঙে গেল। আবার সেই একই শব্দ শুরু হয়েছে। কিছু একটা যেন পাশের ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এবারে তাড়াতাড়ি করে উঠে পাশের ঘরে চলে এলাম। বাইরে এখন সামান্য আলো হয়েছে। মনোজজীর ঘরের ছোট জানলা দিয়ে প্রথম সূর্যের ঘুমভাঙা আলো এসে মাটিতে পড়েছে। কিন্তু ঘরে কিছু নেই। কোনও কিছুই দেখতে পেলাম নামনোজজী এখনও নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেবাইরের দরজা বন্ধ নয়। ভেজানো। হঠাৎ চোখ পড়ল দুধের বাটিতে। বাটি থেকে দুধ খানিকটা বাইরে মাটিতে এসে পড়েছে। পাশে মেয়ের ঘরের দরজা সামান্য খোলা। তাহলে কি সেই এসেছিল এখন?
"সাহস করে পাশের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম। মাঝের দরজা খুলে অন্য ঘরে ঢুকলাম
"ছোট ঘর। এখানে কোনও জানালা নেই। ঘরের মধ্যে অন্ধকারে ভালো করে কিছু দেখা যাচ্ছে না। টর্চটা এবার জ্বাললাম। এখানে কী করে কেউ থাকে, ভেবে অবাক হলাম। ঘরের এককোণে একটা কাঠের বাক্স। কিছু মাটির কলসি রাখাএকটা ছোট টেবিলতার উপর কিছু জামাকাপড় রাখা। একটা মেয়ের ঘরে মেয়েদের কোনও পোশাক চোখে পড়ল না। তাহলে কে থাকে এই ঘরে? আর শব্দই বা কীসের?
"তাহলে হয়ত আমারই মনের ভুল।
"এর মধ্যে আবার খুব কাছ থেকে আওয়াজটা শুনতে পেলাম। সেই জোরে জোরে নিঃশ্বাস।
"সেই শব্দের উৎসটাকে এবার খুঁজে বার করতে অসুবিধে হল না। আসছে আমার সামনে রাখা মাটির কলসিটা থেকে। আর ওই কলসি থেকে আস্তে আস্তে উঠে আসছে একটা লাঠির মতো জিনিস। হঠাৎ ভয়ে চমকে উঠলাম। ওটা লাঠি নয়, একটা বিশাল কিং কোবরার ফণা! আমার থেকে ঠিক দেড় ফুট দূরে মাটি থেকে পাঁচ ফুট উপরে উঠে এসেছে ফণাটা। আর স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। খানিকক্ষণের জন্য ঘাড় অব্দি উঠে আসা ওই রাগী দৃষ্টির সামনে সম্মোহিতের মতো দাঁড়িয়েছিলাম।
"এক মুহূর্তের জন্য ভয়ে বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলাম। তারপরে একটু পিছিয়ে আসার চেষ্টা করতেই পেছনে হঠাৎ মনোজজীর গলা শুনলাম।
            'কোনও ভয় নেই, আমি এসে গেছি। উলূপী কিছু করবে না।' একটু থেমে, 'উলূপী, উলূপী, শান্ত হো যা', বলে দেওয়ালে টোকা মারল মনোজজী।
"সাপটা দেখি একটা বড়ো শ্বাস ফেলে ফের কলসীর মধ্যে মাথা নিচু করে নিল।
"মনোজজী ফের আমাকে বলে উঠল, 'এখানে না এলেই পারতে, আমি নেহাত টের পেয়েছিলাম। নাহলে একটা ছোবলেই সব শেষ।'
            'আসলে একটা শব্দ পাচ্ছিলাম, তাই ভাবলাম কিছু একটা ঢুকেছে ঘরে। তা এটা কি আপনার পোষা সাপ?'
"প্রশ্নটা শুনে মনোজজীর গলা হঠাৎ অন্যরকম হয়ে গেলখসখসে গলায় বলে উঠল, 'কী নামে ডাকলাম শোননি? ও সাপ নাআমার মেয়ে। উলূপী।' বলে আমার দিকে আগুনের দৃষ্টিতে তাকাল। আর তখনই লক্ষ করলাম ওর চোখের সঙ্গে কিং কোবরার চোখের অসম্ভব মিল। একটা প্রায় গোল চোখের মধ্যে কালো গোল মণি। চোখের ধার দিয়ে সেরকমই চামড়ায় ভাঁজ।
"আমি কী বলব বুঝে উঠতে পারলাম না। ওই ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম
"ভোর হয়ে এসেছিল। শিক দেওয়া জানলা দিয়ে ঢুকেছিল ঠাণ্ডায় কাঁপতে থাকা ভোরের রোদ্দুরের আলোছায়া
"বাড়ির বাইরে গিয়ে বসলাম। কেন জানি না, ওই ঘরে থাকতে ভরসা পাচ্ছিলাম না। খানিকবাদে মিলন ও ধৃতিমান চলে এলো। ম্যাগি দিয়ে আমরা সকালের ব্রেকফাস্ট সারলাম। মনোজজীকেও খাওয়ালাম। ও ওরকম জিনিস আগে কোনওদিন খায়নি।
"আমাকে উলূপীর সম্বন্ধে কোনও কথা বলতে বারণ করেছিল। খানিকবাদে সকাল আটটা নাগাদ আমরা সাকরির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। প্রায় পনেরো কিমি পথ হাঁটতে হবে। গ্রাম থেকে বেরোনোর সময় একটা জায়গায় দেখি বেশ কিছু লোকের ভিড়। এগিয়ে গিয়ে শুনলাম কালকের সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক, বুধুয়া মারা গেছেন। মৃত্যুর কারণ কী জিজ্ঞেস করতে একজন বলে উঠল, সাপের কামড়। এ ব্যাপারে প্রশ্ন করতে আর কোনও উত্তর দিল না।
"তাহলে কি উলূপী এখানেই এসেছিল মাঝরাতে? আর তাই আমি ওই আওয়াজ শুনেছিলাম
"ঘাড় ঘুরিয়ে চারদিক দেখতে গিয়ে দেখলাম আমাদের পাশে কিছু দূরে মনোজজী দাঁড়িয়ে আছে। এগিয়ে গেলাম।
"মনের মধ্যে একটা সন্দেহ হচ্ছিল। তাই জিজ্ঞেস করে উঠলাম, 'আচ্ছা, এ গ্রামে কতজন থাকে?'
"মনোজজী নির্বিকারভাবে বলে উঠল, '৮৯।'
          'আর তাই নতুন কেউ এলে, কাউকে তার জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে হয়, যাতে গ্রামের জনসংখ্যা একই থাকে কোনওভাবেই ফিবোন্যাচি সিকোয়েন্সের বাইরে এ সংখ্যা হতে পারে না। আর সে কাজটা সারে আপনার মেয়ে উলূপী তাই তো?'
"মনোজজী আরেকবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠল, 'বুধুয়াকাকুর হাতে আমি মানুষ। খুব ভালো লোক ছিল। কিন্তু আমরা তো আর প্রকৃতির নিয়মের বাইরে যেতে পারি না। তাই ওই সংখ্যাগুলোর বাইরে অন্য কোনও সংখ্যা হয় এরকম আমরা হতে দিতে পারি নাতাই কেউ এলে, কাউকে জায়গা ছেড়ে দিতে হয়। এটাই এখানকার নিয়ম। চলে আসছে গত কয়েকশো বছর ধরে।'
"মনোজজীর চোখ ছলছল করে উঠল। ফের বলে উঠল, 'আমার বাবা খুব কম বয়সে মারা যান। আমি মানুষ ওই বুধুয়ারই হাতে।'
"বলে আমার দিকে ফের স্থিরদৃষ্টিতে তাকাল। ফের মনে করিয়ে দিল আজকে ভোররাতে দেখা সেই দৃষ্টিকে উলূপীকে।
_____
ছবিঃ পম্পা প্রধান

গল্পের ম্যাজিক:: সোনালি কলম - কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়


সোনালি কলম

কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়


সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা। সন্ধেবেলায় যখন জাস্টিস ইন্দ্রনীল গুপ্ত বাড়ির সামনে গাড়ি থেকে নামলেন তখন টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। গাড়ির সামনের সিটে বসেছিল আর্দালি। তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে ছাতাটা খুলে পেছনের দরজার দিকে হাত বাড়াতে যেতেই দরজাটা নিজে খুলে নেমে এলেন জাষ্টিস গুপ্ত। অন্যদিন এরকম সময় হলে জাস্টিস গুপ্ত অপেক্ষা করেন। গাড়ির দরজাটা আর্দালি নিজের হাতে খুলে দিয়ে ছাতাটা মেলে ধরলে তারপর গাড়ি থেকে নামেন। আজ আর্দালি অবাক হল। গাড়িটা থামা মাত্রই জাস্টিস গুপ্ত নিজেই দরজাটা খুলে নেমে টিপটিপে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাড়ির সদর দরজার দিকে পা বাড়ালেন। কেমন যেন অন্যমনস্ক আজ উনি। পেছন থেকে ছাতাটা মাথায় ধরে জাস্টিস গুপ্তর পেছন পেছন আর্দালিও এগোতে থাকল। অল্প মোরাম বিছানো পথ। পথটার দুদিকে কেয়ারি করা বাগান। জাস্টিস গুপ্তর বাগান করার খুব শখ। নিজের হাতে বাগান করেন। প্রত্যেকদিন সকালবেলায় নিজের হাতে বাগানের পরিচর্যা করেন। কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। একটা গোলাপ গাছ। দিনকয়েক আগে একটা কুঁড়ি এসেছিল। প্রকৃতির হিসেবমতো আজকালের মধ্যেই কুঁড়িটা ফুটে যাওয়ার কথা। কিন্তু কুঁড়িটা মাথা ঝুঁকিয়ে পড়ে আছে। ডালটা কেউ যেন মটকে দিয়েছেজাস্টিস গুপ্ত নিচু হয়ে কুঁড়িটাকে ধরলেন। নাঃ! এটাকে বাঁচানোর আর কোনও উপায়ই নেই। একটা ব্যথাতুর শূন্যদৃষ্টি নিয়ে আর্দালির দিকে ফিরে তাকালেন। ঠিক তক্ষুনি আকাশ চিড়ে খেলে গেল একটা বিদ্যুতের শিখা। তারপরেই একটা কান ফাটানো আওয়াজ আর বৃষ্টিটা নামতে থাকল ঝমঝম করে।

শ্রীমতী গুপ্ত গাড়ির হর্নের আওয়াজ পেয়েছিলেন। দরজা খুলে দেখলেন জাস্টিস গুপ্ত খুব শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “শরীর খারাপ নাকি?

নাঃ! শান্ত গলায় উত্তর দিলেন জাস্টিস গুপ্ত। জুতো ছেড়ে পোশাক বদলাতে বাথরুমে ঢুকলেন। বাথরুমের আয়নায় নিজেকে দেখতে গিয়ে বুকের কাছটা অল্প একটু চিনচিন করে উঠল। সাদা জামার বুক পকেটে মাথা উঁচিয়ে আছে ওনার অত্যন্ত প্রিয় শেফার্স সোনালি কলমের ক্যাপটা। মুখেচোখে জলের ঝাপটা দিয়ে পোশাক বদলে পেনটা হাতে নিয়ে বাড়িতে নিজের চেম্বারে এসে চুপ করে বসলেন। এটাও আজকে ব্যতিক্রম। জাস্টিস গুপ্ত আদালতে রাশভারী হলেও বাড়িতে স্ফূর্তিবাজ মানুষ। আদালত থেকে বাড়িতে ফিরে এসে কোনদিন এই চেম্বারে ঢোকেন না। স্ত্রী কন্যার সঙ্গে গল্পগুজব করে সময় কাটান।

চেম্বারের তিনদিকের দেওয়ালে মোটা মোটা আইনের বইয়ে ঠাসা আলমারি। সামনের দেওয়ালে শুধু বড়ো একটা কাচের জানালা। জাস্টিস গুপ্ত চেম্বারে একটা আলো জ্বালালেন না। বাইরে দূরে একটা ল্যাম্পপোস্টে আলো জ্বলছে। বৃষ্টির মধ্যেই সেই হলদেটে মিয়ানো আলোতে সোনালি পেনটা হাতে নিয়ে নিজের সাধের বাগানের দিকে আনমনা হয়ে তাকিয়ে থাকলেন। দুর্যোগের হাওয়াতে ফুলের গাছগুলো প্রবলভাবে দুলছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের আলোর দ্যুতিতে আইনের বইগুলোর ওপর নীল আলো ঝিলিক খেলে যাচ্ছে। বন্ধ জানালার চেরা ফাঁক দিকে শিসের মতো একটা আওয়াজ হচ্ছে। জাস্টিস গুপ্তর মনে হচ্ছে এসবের মধ্যে প্রকৃতি যেন কিছু বলতে চাইছে। তিনি সেটা কিছুতেই বুঝতে পারছেন না।

       শ্রীমতী গুপ্ত চা জলখাবারের ট্রে নিয়ে চেম্বারে ঢুকে জাস্টিস গুপ্তকে কলম হাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই বুঝতে পারলেন কিছু একটা হয়েছে। জাস্টিস গুপ্ত একজন সেশন জজ। হয়তো সাংঘাতিক কোনও জটিল মামলা নিয়ে বিচলিত উনি। ঘরের আলোটা জ্বালিয়ে শ্রীমতী গুপ্ত টেবিলের ওপর চায়ের ট্রেটা নামিয়ে বললেন, “নাও। চা-টা খেয়ে নাও। এই স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায় গরম চা-টা ভালো লাগবে।

জাস্টিস গুপ্ত সোনালি কলমটা পেনস্ট্যান্ডে রেখে চুপ করে নিজের চেয়ারে বসে চায়ের কাপটা টেনে নিয়ে একটা চুমুক দিয়ে চেয়ারের পেছনে মাথাটা হেলিয়ে দিলেন। শ্রীমতী গুপ্ত কী হয়েছে জানার সুযোগ খুঁজছিলেন। নরম গলায় বললেন, “জানি, আমি আইনের অত কিছু বুঝি না। কিন্তু কী হয়েছে যদি আমাকে বলতে পার, তোমার মনটা হয়তো হালকা হবে।

খুব ধীর গলায় জাস্টিস গুপ্ত বললেন, “একটা হয়তো অন্যায় করে ফেললাম।

কী অন্যায়? কোনও রায় দিয়ে মনে হচ্ছে যে তুমি কিছু ভুল করে ফেলেছ?

না, রায়টা আমার নয়রায়টা সর্বোচ্চ আদালতের। আমি শুধু আমার কর্তব্যটা করেছি। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে একটা প্রথা মানিনি। অন্যায় করেছি।”

কী রায়? কীসের প্রথার কথা বলছ?

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জাস্টিস গুপ্ত বললেন, “এক্সিকিউন অর্ডার...মৃত্যু পরোয়ানায় সই।

শ্রীমতী গুপ্তর গলাটাও একটু কেঁপে গেল, “ফাঁসির আদেশ?

জাস্টিস গুপ্ত শুধু মাথাটা অল্প নড়িয়ে হ্যাঁ বললেন। তারপর নিজের মনেই কেসটা বলতে থাকলেন, “কুড়ি বছরের পুরনো কেস। লোকটা জমিজমা নিয়ে বিবাদের হিংসায় নিজের এক বোবা ভাইপোকে কুপিয়ে খুন করেছিল। রেয়ারেস্ট অফ দ্য রেয়ার কেস। নিম্ন আদালতেই ফাঁসির আদেশটা হয়েছিল। তারপর লোকটা হাইকোর্ট হয়ে সুপ্রীমকোর্টে গিয়েছিল। কোথাও আদেশটা বদলায়নি। এমনকি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষাও করেছিল। ক্ষমা হয়নি। কাল ভোরবেলায় লোকটার ফাঁসি হবে।

শ্রীমতী গুপ্ত বোঝানোর চেষ্টা করলেন, “যে লোকটা জঘন্য অপরাধটা করেছিল, সে তার উপযুক্ত শাস্তি পাচ্ছে। কিন্তু তুমি তার জন্য এরকম মনমরা হয়ে অন্ধকারে বসে আছ কেন? তুমি তো আর ফাঁসির আদেশটা দাওনি।

আমাদের দেশের আইন অনুসারে ফাঁসির অপরাধের কথাটা লিখে, ফাঁসির দিনক্ষণ লিখে আদেশনামাটা অর্থাৎ ফাইনাল এক্সিকিউন অর্ডারটা একজন সেশন জজকে সই করে আসামী যে জেলে রয়েছে সেই জেলের সুপারের কাছে পাঠাতে হয়। আজ সেই কাজটাই আমি করেছি।

অপরাধীর অপরাধ যাই হোক না কেন, আদপে একজন মানুষ তো আরেকজন মানুষের মৃত্যু পরোয়নায় সই করছেন! তাই এই মানসিক অস্থিরতাটা স্বাভাবিক। শ্রীমতী গুপ্ত স্বামীর মনের চাপটা বুঝতে পারলেন। সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললেন, “তুমি তো শুধু তোমার কর্তব্যটা করেছ। যেমন কাল ভোরবেলায় ফাঁসুড়ে তার কর্তব্যটা করবে। অন্যায় করলে তার শাস্তি তো পেতেই হবে। প্রথা না মেনে অন্যায়ের কথা বলছ কেন?

ফাঁসির আদেশনামার কাগজটা কেমন হয় জান? একটু বিশেষ রকমের। চারধারে কালো বর্ডার দেওয়া থাকে। প্রথা হচ্ছে, আদেশনামাটায় সই করে কলমের নিবটা ভেঙে ফেলা। কিন্তু সেই কাজটাই আমি করতে পারিনি। আদালত থেকে সই করার জন্য আমাকে একটা কলম দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সই করার আগে আদেশনামাটা পড়তে পড়তে আমি এত আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম যে বুক পকেট থেকে আমার প্রিয় সোনালি কলমটা বার করে সেটা দিয়েই সই করে ফেলেছি। সইটা করার পরই হুঁশ ফিরল। আমার সবচেয়ে প্রিয় কলমের নিবটা আমি নিজের হাতে ভেঙে দিই কী করে! ষোল বছর ধরে সোনালি কলমটা আমার বিশ্বস্ত সঙ্গী। কত মনের কথা লিখেছি কলমটা দিয়ে। প্রথা না মায়া? শেষপর্যন্ত মায়াই জিতে গেল। আমার প্রিয় শেফার্স কলমের নিবটা আর ভাঙতে না পেরে ক্যাপ লাগিয়ে কলমটা পকেটে রেখে দিলামকিন্তু সেই থেকে প্রথাটা না মেনে মনের মধ্যে প্রচণ্ড অস্বস্তি হচ্ছে।”

শ্রীমতী গুপ্ত জাস্টিস গুপ্তকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন কিন্তু স্বামীর মনের দোলাচলটা কিছুতেই দূর করতে পারলেন না। রাত্রে জাস্টিস গুপ্ত কিছুই খেলেন নাঅন্যদিনের চেয়ে একটু তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়লেন।

পরেরদিন সকালে যখন জাস্টিস গুপ্ত ঘুম থেকে উঠলেন তখন ছটা বেজে গিয়েছে। সময়টা দেখেই বুঝতে পারলেন ফাঁসিটা হয়ে গিয়েছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। লোকটার আত্মার শান্তি কামনা করলেন। গতরাতের মনের ভারাক্রান্ত ভাবটা অনেকটাই কমে এসেছে। বিছানা থেকে উঠে জানালার কাছে এলেন। গতকালের মেঘলা আকাশটা আজ ঝকঝকে পরিষ্কার। বৃষ্টিতে ভিজে সকালের নরম আলোয় উজ্জ্বল হয়ে আছে বাগানটা। আর পাঁচটা দিনের মতোই দিনটা শুরু করলেন। চা খেয়ে বাগানের পরিচর্যা করলেনস্নান করলেন। প্রাতঃরাশ করলেন স্ত্রী মেয়ের সঙ্গে। তারপর আদালতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন।

আর্দালি এসে ওনার ব্যাগটা গাড়িতে নিয়ে গেল। জাস্টিস গুপ্ত স্ত্রী মেয়ের কাছে বিদায় চাইতে মেয়ে বলল, “বাবা, তুমি একটা জিনিস নিতে ভুলে যাচ্ছ।

কী?

মেয়ে বুক পকেটটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “তোমার সোনালি শেফার্স পেনটা!

জাস্টিস গুপ্ত একটু আশ্চর্য হলেন। এমন ভুল তো কোনদিন হয় না। আসলে কলমটা থাকে মানিব্যাগ আর চশমার সঙ্গে বেডসাইড টেবিলে। মনে পড়ে গেল গতকাল রাত্রে কলমটা হাতে নিয়ে চেম্বারে বসেছিলেন। ওখানেই পেনস্ট্যান্ডে রেখে এসেছেন কলমটা।

চেম্বারে গিয়ে পেনস্ট্যান্ড থেকে কলমটা নিয়ে বুক পকেটে রেখে বেরিয়ে এসে মেয়েকে বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ।

মেয়ে জাস্টিস গুপ্তর দিকে তাকিয়ে অস্ফু গলায় বলে উঠল, “বাবা!

জাস্টিস গুপ্ত দেখলেন মা মেয়ে দুজনই ওনার জামার পকেটের দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে। মাথা ঝুঁকিয়ে নিজের পকেটটা দেখে খুব আশ্চর্য হয়ে গেলেন। সাদা জামার বুক পকেটটায় নীল একটা কালির ছোপ ক্রমশ বড়ো হচ্ছে। তাড়াতাড়ি পকেট থেকে কলমটা বার করলেন জাস্টিস গুপ্ত। তারপর একেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। সোনালি খাপটার তলা দিয়ে চুঁইয়ে পড়ছে কালি। ধীরে কলমের খাপটা খুললেনদেখলেন, ওনার অত্যন্ত প্রিয় সোনালি কলমটার নিবটা ভাঙা। ফাটল ধরেছে গোড়াটাতেও। সেখান থেকেই চুঁইয়ে সাদা জামার পকেটে ছড়িয়ে পড়ছে কালি।

(সব চরিত্র কাল্পনিক)

_____
ছবিঃ পম্পা প্রধান