Showing posts with label অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী. Show all posts
Showing posts with label অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী. Show all posts

গল্প:: সামান্য একটা খেলা - অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী


সামান্য একটা খেলা
অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

ডু ইউ ওয়ান্ট টু প্লে চেস? – ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে একটু গম্ভীর গলায় কে যেন দূর থেকে বলে উঠল।
প্রশ্নটা শুনে চারদিকে তাকালাম। খেয়াল করলাম আমি যে বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, সেই বাড়ির কাচের গার্ডেনরুমে বসা এক বৃদ্ধ আমাকে ডাকছেন গার্ডেনরুমের সামনের দিকের কাচের দরজা খোলা। বৃদ্ধের গায়ে একটা ঢোলা প্যান্ট, ফুলহাতা সাদা শার্ট গলায় স্কার্ফ জড়ানো
ভদ্রলোক যেন এতক্ষণ দাবাখেলার সঙ্গীর জন্যই অপেক্ষা করছিলেন।
আমাকে বলছেন?”
হ্যাঁ, আর কি কেউ আছে এখানে? ডু ইউ ওয়ান্ট টু প্লে চেস?”
বৃদ্ধ ইতিমধ্যে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। আমার দিকে একটু এগিয়ে এলেন। বাড়ির বাগানের লন পেরিয়ে পাথরের নীচু দেয়ালের পাশে এসে ফের বলে উঠলেন – “তুমি কীরকম খেলো? ভালো না হলে আমি আবার খেলি না। মাঝখান থেকে আমারই সময় নষ্ট হবে।
একটু অপমানিত বোধ করলাম। দাবায় বাংলার হয়ে একসময় স্টেট লেভেলে খেলেছি। এখনও নিয়মিত খেলি। সেজন্যে স্বাভাবিকভাবেই এই দাবার বোর্ডের দিকে দৃষ্টি গিয়েছিল।
সাদা-কালো মার্বেল দিয়ে তৈরি আঠেরো বাই আঠেরো ফুটের স্কোয়ার চাতালই হল এখানকার দাবার বোর্ড। পাহাড়, সুইস কটেজ, উপত্যকা - সব কিছুর মধ্যেও একটা চোখে পড়ার মতো বিশাল দাবার বোর্ড।
তবে এই ভদ্রলোক সম্বন্ধে আমি কিছুই জানি না। কীরকম খেলেন তাও জানি না। তবে এত উৎসাহ যখন, তখন অ্যাভারেজ প্লেয়ার হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। খুব ভালোরা এরকম উৎসাহ দেখায় না।
কয়েকদিনের জন্য ইংল্যান্ড থেকে সুইজারল্যান্ডে অফিসের কাজে এসেছি। মাঝে একটু সময় পেয়ে বেড়াতে বেরিয়ে পড়েছি। আজ শনিবারছুটির দিন। সকাল ছ-টায় জুরিখ থেকে বেরিয়ে এসেছি। জুরিখ থেকে ট্রেনে ইন্টারলেকেন। সেখান থেকে ট্রেনে লেটারব্রুনেন হয়ে তারপরে কেবিলকারে আল্পসের উপরে ছোটো পাহাড়ি গ্রাম মুরেন-এপৌঁছোতে পৌঁছোতে দুপুর বারোটা বেজে গেছে। মুরেনে কোনো বাস বা গাড়ি চলে না। সব রকম গাড়ি চলাচল এখানে নিষিদ্ধ।
তবে এখানে পা রাখার পর থেকেই বুঝতে পেরেছি যে এই পরিশ্রম সার্থক। এরকম সুন্দর গ্রাম খুব কমই দেখেছি। আল্পসের কোলে ছবির মতো সুন্দর সুইস ভিলেজ। এসব গ্রামের ছবিই বিশ্ব জুড়ে লাখো পর্যটকের কাছে সুইজারল্যান্ডকে স্বপ্নের দেশ হিসেবে গড়ে তুলেছে।
একই সঙ্গে এই গ্রাম সাধারণ ট্যুরিস্টের পরিচিত ম্যাপের বাইরে। সেজন্য মানুষের ভিড় নেই। সেলফিতে হারিয়ে যাওয়া ট্যুরিস্ট নেই।
দেড়ঘণ্টা ঘোরাঘুরি ও আল্পসকে কাছ থেকে দেখার পরে পাহাড়ের খাদের ধারে একটা রেস্টুরেন্টে ইতালিয়ান পিৎজা দিয়ে বেশ ভালোই লাঞ্চ সারলাম। তারপরে হাঁটতে হাঁটতে সেই গ্রাম পেরিয়ে আরও দূরে কোথাও এসে পড়েছি। এখানে পাহাড়ের কোলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দু–একটা বাড়িমনে হচ্ছে যেন ক্যালেন্ডারের ছবির উপর দিয়ে হেঁটে চলেছি।
সেরকমই একটা বাড়ির পাশে আমি এখন দাঁড়িয়ে। এরকম বিশাল দাবার বোর্ড দেখে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলামপাথরের বোর্ডের দু-দিকে রাখা বড়ো বড়ো কাঠের গুটি সেগুলো টেনে টেনে নিয়ে গিয়ে চাল দিতে হবে। বেশ ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। কিন্তু সেটা দেখার জন্য উঁকিঝুঁকি দিতে গিয়ে বাড়ির ভেতর থেকে যে এরকম খেলার ডাক আসবে, সেটা আগে ভাবিনি।
আমার উত্তর না পেয়ে আবার প্রশ্ন এল, “কী, বললে না যে? কীরকম খেলো? দিস ইজ নট এ গেম ফর ইডিয়টস। মগজ লাগে।
বৃদ্ধ তো বেশ উদ্ধত! নাকি আমি যাতে খেলি সেজন্য উসকানোর চেষ্টা করছেন!
একটু অতিরিক্ত বিনয় দেখিয়ে বললাম, “না, না, আমি কিছুটা জানি। মাঝারি মানের প্লেয়ার বলতে পারেন।
মনে মনে বললাম, “মজা দেখাচ্ছি। কে জেতে দেখাচ্ছিআপনি না আমি!
বাহ, তাহলে একটা ম্যাচ হয়ে যাক। তবে খেলা শেষ না করে কিন্তু যাওয়া যাবে না। এ আমি আগেই বলে রাখলাম।
হাতঘড়ির দিকে তাকালাম। বিকেল তিনটে বাজে। এই বছর সত্তরের বুড়োকে হারাতে মিনিট কুড়ির বেশি লাগবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া এরকম অপূর্ব পরিবেশের মাঝে বসে খেলার লোভ সামলানো যায় না।
কাঠের বিশাল সুইস কটেজের তিনদিক দিয়ে ফুলের বাগান। সে বাগানে যেন রঙের প্লাবন লেগেছে। লাল, হলুদ, কমলা, নীল কত রঙের ফুল। সে বাগান যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানেই শুরু হয়েছে ঘাসে ছাওয়া সবুজ উপত্যকা। সে উপত্যকার ঢাল উপরের দিকে ক্রমশ উঠে পাহাড়ে মিশে গেছে। দূরে পাইনের বন ও তারও উপরে বরফঢাকা পাহাড় দেখা যাচ্ছে
এরকম দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য রোজ হয় না।
দূর থেকে টুং টুং শব্দ ভেসে আসছে গোরুর গলার ঘন্টির থেকে এই আওয়াজ ভারী মিষ্টি সুর। যেন কোনো শিল্পী আপনমনে বাজিয়ে চলেছে। আশেপাশের উপত্যকাতেই কোথাও গোরুগুলো চরছে। মাথার উপরে নির্মেঘ নীল আকাশ। নীল আকাশ, সবুজঘাসে ঢাকা উপত্যকার মাঝে কেউ যেন এই বাড়ির ছবি তুলির রঙে এঁকে রেখেছে
খেলব বলে সম্মতি জানালাম।
বৃদ্ধ সেটা শুনে ভারী খুশি হয়ে উঠলেন। দুটো চেয়ার টেনে বোর্ডের দু-দিকে রাখলেনদূরে একটা টেবিলে কফির সরঞ্জাম রাখা ছিল। ওঁর অনুরোধে এক কাপ ব্ল্যাক কফি খেয়ে খেলা শুরু করলাম।
খেলতে গিয়ে শুরুর কিছু দান দেওয়ার পরপরই বুঝলাম বৃদ্ধকে আন্ডার-এস্টিমেট করে বড়ো ভুল করেছি। বৃদ্ধ মোটেই সাধারণ কোনো প্লেয়ার নন।
আমি সাদা গুটি নিয়ে চাল দিচ্ছিলাম। আমার ফেভারিট ওপেনিং রুই লোপেজ-এর একটা বিশেষ ভ্যারিয়েশন ধরে খেলাটা এগিয়ে চলল। মিডল গেমে যখন পৌঁছোলাম, তখনও বেশ সমান-সমান অবস্থা। বৃদ্ধ বেশ ভালোই লড়াই করছেন।
এর মধ্যে বৃদ্ধ দেখি বিড়বিড় করে বলে উঠলেন, “ঠিক এই খেলাটাই ইমানুয়েল লাস্কার সাদা ও উইলিয়াম স্টাইনিৎজ কালো গুটি নিয়ে খেলেছিল ১৮৯৬ সালে মস্কোতেস্টাইনিৎজ-এর একটা ভুলে লাস্কার জিতেছিল সে ম্যাচটা। কিন্তু এবারে তো আর সেটা হবে না।
বলে নিজের দানের মধ্যে দাবার বোর্ডের চারদিক দিয়ে ঘুরে ঘুরে খানিকক্ষণ হাঁটতে লাগলেন নিজের মনে কীসব যেন বলতে লাগলেনহাঁটতে হাঁটতে বোর্ডের বিভিন্ন দিক থেকে তাকিয়ে নানান লেভেল থেকে দেখতে লাগলেন প্রথমবার প্রশ্ন মনে এল, লোকটা স্বাভাবিক তো?
আমি ফের পাহাড়ের দিকে তাকালাম।
বাগানের পাশে পাহাড়ের ঢাল বরাবর বিস্তৃত ঘাস উপত্যকায় অনেক সাদা ভেড়া চরে বেড়াছে। কিছু ভেড়ার বাচ্চাও আছে।
ইতিমধ্যে দান দিয়ে আমার দৃষ্টি লক্ষ্য করে বৃদ্ধ বলে উঠলেন, “ওগুলো সবই আমার ভেড়া। প্রায় একশোর বেশি আছে। ওদের নিয়ে আমার বেশ সময় কেটে যায়। এ ছাড়া আমার বাড়িতে তিনটে ঘোড়া আছে এখানে গাড়ি নেই বলে ওদের নিয়ে বেরোই মাঝে-মধ্যে। তবে ঘোড়াগুলোর ভালোই বয়স হয়েছে আমার মতোই। তবু এখনও আমার মতোই লড়াকু।
বৃদ্ধকে দেখে মনে হয় বয়স সত্তরের উপরে হবে। তবে বেশ শক্তসমর্থ আছেন এখনও। চোখের চাউনিটা অদ্ভুত। ইস্পাত কঠিন। যেন কোনো অনুভূতির স্পর্শ নেই তাতে।
বলে উঠলেন, “বুঝলে দাবা খেলাটা হল জীবন-মরণের মতো সত্যিকারের যুদ্ধ। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে থামার কোনো জায়গা নেই। এখানকার বোড়ে, গজ, নৌকো, রানি প্রত্যেকে রাজাকে বাঁচানোর জন্য যে-কোনো সময়ে মৃত্যুবরণ করতে প্রস্তুত। দে উইল ফাইট টিল ডেথ।
এই কথার অর্থ বুঝলাম না। অবশ্য এরকম প্রত্যন্ত জায়গায় থাকতে থাকতে মানুষ যে একটু অস্বাভাবিক হয়ে যাবে, একটু উলটোপালটা কথা বলবে, এতে আর আশ্চর্য কী!
আপনি কতদিন আছেন এখানে?” জিজ্ঞেস করে উঠলাম।
এখানেই জন্ম। ছোটো থেকেই আছি
আপনি এখন একা থাকেন?”
হেঁয়ালি করে বলে উঠলেন, “আমার সৈন্যরা আছে, রানি আছে। একা থাকব কেন?”
বলে আরেকটা চাল দিলেন।
কেন জানি না যত খেলা এগোচ্ছে, মনে হচ্ছে এই বৃদ্ধ কোনো সাধারণ দাবাড়ু নয়। কিছু বড়ো টুর্নামেন্ট জিতে থাকলেও অবাক হব না। যেভাবে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিচ্ছেন, পরের দু-তিন চাল ভেবে নিয়ে ফাঁদ পাতছেন, তাতে উনি যে একসময় অসাধারণ দাবাড়ু ছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
আরও কয়েকটা চালের পরে একটা চালে সত্যি বিপদে পড়ে গেলাম। একেবারে আন-এক্সপেক্টেড আমার এক বোড়ে খেয়ে ওনার গজ স্যাক্রিফাইস করলেনতারপরে যেন মুচকি হাসলেন নিজের মনে
গজটা আমি একটা বোড়ে দিয়ে খেয়ে নিতেই পারি, কিন্তু লক্ষ করলাম তার কয়েক চাল পরে আমার নৌকো চলে যাবে বিপদে পড়ে যাবতবে এখনই সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি।
আরও বেশ কিছুক্ষণ খেলা চলল।
খেলা যতই এগোতে লাগল, ততই বুঝতে পারলাম আমার হারা অবশ্যম্ভাবীপজিশন বেশ খারাপ। বৃদ্ধ কোনোরকম ভুল না করলে আমি হারবই। যদিও গেম শেষ হতে এখনও বেশ খানিকক্ষণ লাগবে।
সময় হাতে বেশি নেই। এবারে বেরোতে হবে। খেলতে খেলতে দেড়ঘণ্টা হয়ে গেছে। জুন মাসের দীর্ঘদিন। তাই বাইরের আলো ন-টা অবধি থাকলেও ফেরার কেবিলকার থাকবে না। ছ-টায় এখান থেকে শেষ কেবিলকার সেটা মিস করলে আর ফেরার কোনো উপায় থাকবে না।
বলে উঠলাম, “আমি খুব দুঃখিত। এবারে আমাকে উঠতে হবে।
বৃদ্ধ যেন কথাটা শুনলেনই না।
আবার বলে উঠলাম।
এবারে আমার দিকে তাকালেন। মুখে অবিশ্বাসের চিহ্ন
রেগে বলে উঠলেন, “হোয়াট ডু ইউ মিন? খেলা ছেড়ে মাঝপথে চলে যাবে? এরকম হতেই পারে না।
বলে আবার বোর্ডে মনোনিবেশ করলেন।
ফের বলে উঠলাম, “জুরিখে আছি। কাল ভোরে ইংল্যান্ডে ফেরার ফ্লাইট। এখনই না বেরোলে শুধু কেবিলকার নয়, জুরিখ যাওয়ার ট্রেনও মিস করব। তার পরের ট্রেন তো ভোরবেলা। কাল সকালের ফ্লাইটও মিস করব সেক্ষেত্রেআর বড়োজোর দশ মিনিট। আমাকে দশ মিনিটের মধ্যে বেরোতেই হবে।
উঁহুঁ, সে হচ্ছে না। খেলা শেষ না করে কোনোভাবেই বেরোতে পারবে না। শুরুতেই বলে দিয়েছিলাম। এটা কী শুধু একটা খেলা! তাকিয়ে দেখো বোর্ডের দিকে। তোমার কাজ হল এখানে ডাক্তারের মতোযতই তাড়া থাকুক না কেন, যত দরকারি কাজই থাকুক না কেন, ওদের বাঁচানোর দায়িত্ব তোমার, শুধু তোমারওদের জীবন-মরণ তোমার উপরে নির্ভর করছেকী করে তুমি ওদের এভাবে ফেলে পালিয়ে যাবে! আর ইউ ম্যাড?” চিৎকার করে উঠলেন বৃদ্ধ।
আমি বুঝলাম এ নির্ঘাত কোনো পাগলের পাল্লায় পড়েছি।
আমি তবু মরিয়া হয়ে খেলা ছেড়ে উঠতে গেলামবৃদ্ধ এবারে গম্ভীর গলায় ‘ডেভিড’ বলে কাউকে ডাক দিলেন ভাবলাম কোনো বৃদ্ধ চাকর হবে হয়তোকিন্তু যে ঘর থেকে বেরিয়ে এল, সেই ডেভিডের দেখা পেয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেলএকটা বেশ বড়ো সাইজের কুকুর বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। রট হুইলার। কুকুর আমি ভয় পাই। এ কুকুর আবার হিংস্র বলে পরিচিত।
এ কী বিপদে পড়লাম!
কুকুরটা কাছে এসে আমার গন্ধ শুঁকে পাশেই একহাত দূরে বসে পড়ল। ওর হিংস্র চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হল বৃদ্ধের অর্ডার পেলেই আমার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমি বেরোতে গেলে এরকম পাগল বৃদ্ধ যে সেরকম করতে দ্বিধা করবেন না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত।
বৃদ্ধ আমার দিকে তাকিয়ে ফের বলে উঠলেন, “আমার সঙ্গে ম্যাচ অসমাপ্ত রেখে কেউ কোনোদিন এখান থেকে বেরোতে পারেনি।
বৃদ্ধের চোখ যেন জ্বলে উঠল। সে চোখ ওই কুকুরের থেকেও বেশি হিংস্র।
আরও পাঁচটা দানের পরে আমি বলে উঠলাম, “আমি সারেন্ডার করছি। হেরে গেছি।
বৃদ্ধ ফের মাথা নাড়িয়ে বলে উঠলেন, “উঁহুঁএখনও অনেক খেলা বাকি আছে। এখনও আমি ভুল করলে হেরে যেতেও পারি। সহজ জয় আমি চাই না। একেবারে শেষ অবধি খেলতেই হবে। একেবারে রাজার মৃত্যু অবধি
বুঝলাম এঁকে অন্য কোনোভাবে বোঝানো যাবে না। খেলতেই হবে।
মাথা কাজ করছিল না। এই বিদেশ-বিঁভুই-তে এসে কী বিপদে পড়া গেল! এ কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম।
বাইরে আলো কমে এসেছে। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে বৃদ্ধ বলে উঠলেন, “দেখো হারা-জেতা হতেই পারে। জীবনটাই তো হারা-জেতার। কিন্তু শেষ অবধি লড়তে হবে। এই যে এক-একটা গুটি পড়ে যাচ্ছে, তার সঙ্গে সঙ্গে তোমার-আমার সৈন্যরাও বিদায় যাচ্ছে। এটা শুধু খেলা নয়। আসলে জীবন-মৃত্যু।
আমাকে এবারে প্লিজ যেতে দিন,” কাঁদোকাঁদো হয়ে ফের বলে উঠলাম, “প্লেন মিস হয়ে যাবে।
এ আবার বড়ো কথা কী? অন্য প্লেনে যাবে। ফোকাস অন ইয়োর গেম। এত হালকাভাবে নিয়ো না। অনেকের জীবন-মৃত্যু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে
বৃদ্ধ যে পুরোপুরি অস্বাভাবিক, এরকম কিছু কথা শুনলেই বোঝা যাচ্ছে
উনি ফের বলে উঠলেন, “ওই যে দূরে ভেড়াগুলো দেখছিলে, ওদের মধ্যে আমার বোড়েরাও আছেদেখো ক’টা বোড়ে গেছে আমার। তিনটে, তাই না?”
হ্যাঁ,” অবাক হয়ে ফের বলে উঠলাম, “হ্যাঁ, তিনটে কালো বোড়ে গেছে।
বৃদ্ধ হঠাৎ উপত্যকার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, “ভালো করে দেখো। দেখতে পাচ্ছ? আমার তিনটে ভেড়া মারা গেছে।
কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলাম। গলা কেঁপে উঠল, “কী হচ্ছে ওখানে?”
তিনটে বড়ো সাদা ভেড়া যেন মাঠের মধ্যে মরে পড়ে আছে।
আমি উত্তেজিত হয়ে ওদিকে এগিয়ে গিয়ে বলে উঠলাম, “আচ্ছা, ওই ভেড়াগুলো আগে তো চলছিল-ফিরছিল। এখন? সত্যি মারা গেছে?”
সে কী? তুমিই তো মারলে! এর মধ্যে ভুলে গেলে। একটা একটা করে গুটি বাইরে যাবে আর ওরা মারা যাবে। সেজন্যই তো এত সাবধানে খেলতে হয়।
হঠাৎ মনে হল বৃদ্ধ শুধু পাগল নয়। যেন তার থেকেও অনেক বেশি কিছু। এ কী বলছেন! কিছুক্ষণ বাদে আমি একটা সাদা বোড়ে দিয়ে ওনার একটা কালো বোড়ে খেলামঅবাক হয়ে উপত্যকার দিকে তাকিয়ে দেখলাম আরেকটা ভেড়া, হ্যাঁ, ঠিক তাই, আরেকটা ভেড়া মাঠের মধ্যে যেন বসে পড়ল। তারপরে আর নড়ল না।
মারা গেল? এ কী আমি স্বপ্ন দেখছি? হাত-পা সব যেন ঠান্ডা হয়ে গেল
এরপরে কোনো কথা আর বলিনি। খেলা আরও বেশ খানিকক্ষণ হল। শেষে হারলাম। আমার রাজা চেকমেট হতেই বৃদ্ধ উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, “মারিয়া, মারিয়া। বেরিয়ে এসো।
তারপরে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে করমর্দন করলেন। বললেন, “মন খারাপ কোরো না। ইউ রিয়ালি প্লেড ওয়েলতুমি যে এতটা ভালো খেলবে, সেটা আমি আশা করিনি। আমি খুব নিশ্চিন্ত হলাম। আমার স্ত্রী মারিয়া এখন তাহলে সুস্থ হয়ে উঠবে। খুব অসুস্থ ছিল। আমার কুইন। তুমি জিতলে বা আমি মন্ত্রী হারালে আজই মারা যেত। মারিয়া!
বলে জোরে চেঁচিয়ে উঠলেন।
দেখি এক বৃদ্ধা ইতিমধ্যে দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছেনদেখেই মনে হল খুব অসুস্থ। বৃদ্ধ বলে উঠলেন, “আর ইউ ফিলিং বেটার?”
অত্যন্ত রুগ্ন চেহারার সেই বৃদ্ধা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালেন।
আমি কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এ কোন পাগলের পাল্লায় পড়েছি! আমি এবারে উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ালাম। কেবিলকার পাই বা না পাই, এখানে আর একমুহূর্ত থাকা উচিত নয়
আমি ছুটে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলাম। কিছুদূর গিয়ে আমার মাথায় এক অদ্ভুত প্রশ্ন এলকেন এরকম অস্বাভাবিক প্রশ্ন এল, সেটা জানি না।
ফিরে এলাম। সেই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এখন দুজনে পাশাপাশি বসে আছেন।
আমি জোরে চেঁচিয়ে বলে উঠলাম, “আচ্ছা, আমার সৈন্য তাহলে কারা? আমারও কী ওরকম সৈন্য আছে!
অবশ্যই। আশ্চর্য, তুমি সেটা না জেনেই আমার সঙ্গে খেলতে বসে গেলে। আমি তোমাদের এপিক মহাভারত পড়েছি। সেখানে যেমন যুধিষ্ঠির না বুঝে-শুনে পাশাতে চাল দিচ্ছিল, সেরকম দেখছি তুমিও না বুঝে একের পর এক চাল দিয়ে দিয়েছ?”
আমি কোনোরকমে বলে উঠলাম, “আমার বোড়ে কারা? ওখানে ওই ভেড়াদের মধ্যে আছে?”
নো, নো, দে আর অল মাইন। আমার। তোমার ভেড়া, তোমার রানি, তোমার নৌকো কোথায় - তা আমি কী করে জানব? তোমার সেটা জানা উচিত
আমার মনে হল ছুটে গিয়ে বৃদ্ধের টুটি চিপে ধরি।
কিন্তু বৃদ্ধ দেখি ফের বলে উঠলেন, “ওই যে আমার দুটো ঘোড়া মারা গেল আজ খেলতে খেলতে, তা নিয়ে আমি কিছু বলেছি? ইটস অল পার্ট অফ আ গেম। তুমি দেখে আসো আমার তিনটে ঘোড়ার মধ্যে দুটো ঘোড়া, দুটো এতদিনের প্রিয় ঘোড়া - সুগার ও ডাস্টি - দুটোই এখন মৃত। আমি কী কেঁদেছি সেজন্যে? কে বলতে পারে তোমার জন্য আজ কে কে প্রাণ দিল?”
আমি আর একমুহূর্ত দাঁড়ালাম না। থাকলে বৃদ্ধকে খুন করে ফেলব। এসব আমি কী ভাবছি!
অবসন্ন হাতে আমার ফোনের দিকে তাকালামফোনে চার্জ নেই। কখন যে সুইচড অফ হয়ে গেছে, খেয়াল করিনি।
রাস্তা দিয়ে ছুটতে শুরু করলাম। যদি এখান থেকে এখনও ফেরার কেবিলকার পাওয়া যায়। বাড়ির সবাই, সবকিছু ঠিক আছে তো?
টের পেলাম বুকের মধ্যে যন্ত্রণা হচ্ছে। দৃষ্টি যেন অস্পষ্ট হয়ে আসছে। তবু কোনোরকমে কেবিলকারের দিকে ছুটতে শুরু করলাম। আমি কী বৃদ্ধের কথা বিশ্বাস করতে শুরু করেছি? এরকম একটা অবিশ্বাস্য কথা!
মুরেনের সরু রাস্তা দিয়ে ছুটতে লাগলাম। খানিক বাদে একটা ছোটো স্টেশনারি দোকান পড়লতার মধ্যে টিভি চলছে। কী জানি ভেবে দোকানে ঢুকে টিভির দিকে তাকাতেই খবরটা চোখে পড়ল
ব্রেকিং নিউজ – মেজর বম্ব ব্লাস্ট ইন অক্সফোর্ড সার্কাস এরিয়া অফ লন্ডন
২১ জন মৃত, অজস্র আহত
আচ্ছা, আমার স্ত্রী, দুই পুত্র - ওদের আজ ওখানেই যাওয়ার কথা ছিল না?
বসে পড়লাম দোকানের মেঝের উপরে। মনে হল চোখের সামনে হঠাৎ যেন ঘন অন্ধকার নেমে এল এক চেকমেট হওয়া রাজার মতো।
বোর্ডে আমার রানি আর দুটো নৌকো হারানোর সঙ্গে সঙ্গে কী ওরা আর নেই? সত্যি নেই?

আস্তে আস্তে চোখের সামনে আবার সব স্পষ্ট হয়ে আসছিল
খেয়াল করলাম আমাকে ঘিরে এখন অনেকজনের ভিড়
জার্মান ভাষায় কথা হচ্ছে
কে যেন বলে উঠল, “লোকটার জ্ঞান ফিরেছে
পাশ থেকে আরেকজন বলল, এবারে আমাকে লক্ষ করে, “কেমন মনে হচ্ছে?”
আমি আস্তে আস্তে উঠে বসলাম
বলে উঠলাম, “ভালো, বেটার মনে হচ্ছেহঠাৎ শরীরটা কেন জানি...”
সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল হল আবার, খানিক আগেই খেলায় হেরে কী হারিয়েছি আমিকান্নায় গলা অবরুদ্ধ হয়ে এলকেউ নেই আর! ফ্যামিলি বলে আর কিছু নেইএবারে একজন আমার কাঁধে হাত দিয়ে বলে উঠল, “কী হয়েছে?”
কোনোরকমে বলে উঠলাম গত দেড়ঘণ্টার ঘটনা, কীভাবে আমি আমার স্ত্রী-পুত্রদের হারিয়েছিলোকটা শোনার পরে হেসে উঠল, সঙ্গে অন্যরাও
আবার বলে উঠল লোকটা, “মিলার পারেও বটে, গল্প বানাতেশোনো, আমি নিশ্চিত তোমার কিছুই হয়নিতোমার ফোন তো সুইচড অফ, আমার ফোন থেকে বাড়িতে ফোন করোদেখবে সব ঠিক আছে, কারও কিছু হয়নি, সব বানানো গল্প
“কিন্তু ওই ভেড়াগুলো? একটা একটা করে যারা মারা যাচ্ছিল?”
“কিছু হয়নি, বললাম তোমিলার শুধু ভালো দাবাড়ু নয়, দারুণ ম্যাজিশিয়ান, ইলিউশনিস্টযা চাইবে তাই দেখিয়ে দেবেনাও বাড়িতে ফোন করোও এভাবে মজা করে সবার সঙ্গে,” বলে আমার হাতে ফোনটা দিল
কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পরেই ফোনের উলটোদিকে চেনা গলা শুনলাম, “হ্যালো, কে বলছেন?” – আমার স্ত্রী মীনার গলা
আমি শুধু বলে উঠলাম, “তোমরা সবাই ঠিক আছ তো?”
----------
ছবি - অতনু দেব

গল্প:: মিস্টার পাই ও শিক্ষামন্ত্রী ঘনশ্যামবাবু - অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী


মিস্টার পাই ও শিক্ষামন্ত্রী ঘনশ্যামবাবু
অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
 
১৫ সেপ্টেম্বর
কিছুদিন আগে থেকে ঠিক করেছি নিয়মিত ডায়েরি লিখব। বিশেষ করে দরকারি কথাগুলো লিখে রাখব। গত তিরিশ বছর ধরে যে অজস্র আবিষ্কার করে চলেছি, তা লিখে না রাখলে আমি নিজেই ভুলে যাব। একই সঙ্গে আমার ফাউন্টেন পেনগুলোরও সামান্য সদব্যবহার হবে।
কিছুদিন আগে অনিলিখাই আমার ফাউন্টেন পেনের সংগ্রহ দেখে প্রথম আমাকে এ আইডিয়াটা দিল। আমি তো আর সাহিত্যিক নই, যে ইচ্ছেমতো সাদা কাগজে একটা গল্প বা উপন্যাস লিখে ফেলব। মাঝে মধ্যে অবশ্য বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখি, কখনও বাংলা কিশোর সাহিত্য নিয়ে, কখনও বা বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি নিয়েসারা ভারত ঘুরে দেখা দেবদেবীর মূর্তি নিয়ে এখন লিখছি। একই সঙ্গে গত কিছুদিন ধরে ডায়েরি লিখে দেখেছি, বেশ ভালো লাগছে। কালি, কলমের সঙ্গে মনের যোগাযোগ হয়তো অনেক গভীরে। লেখা অনেক বেশি অকপট হয়, নিজেকেও ভাবায়
এ ছাড়া অবশ্য আরেকটা কারণও আছে। তা হল লিও। লিও হল আমার তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিসম্পন্ন রোবট। ও যে রোবট তা দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই। এমন কী ওর গায়ে হাত দিলেও বোঝা যাবে না যে ও মানুষ নয়তোমরা নিশ্চয়ই ‘লিও-এর অদ্ভুত জগতে’ লিওর কথা আগেই শুনেছ। তা লিওকে আমি অনেক কিছু শেখালেও শুধু আমার হাতে লেখা বাংলা নোটস পড়তে শেখাইনি। এর পিছনে আমার হাতের লেখার মাহাত্ম্য অবশ্যই আছে। সেটা আমি ছাড়া কেউ পড়তে পারে না। আমার প্রতিবেশী অবিনাশবাবু তো ক্লাস সিক্স ফেল ছাত্রের হাতের লেখা বলে মন্তব্য করতেও ছাড়েননি।
যতই হোক, দিনের শেষে লিও একটা রোবটই। কিছু জিনিস থাকা ভালো যা রোবটের আয়ত্তের বাইরে চিরকাল থাকবে, যেমন আমার বিদঘুটে অপাঠ্য হাতের লেখাআমি অবশ্য ওকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি। তবুও
তবে এই ডায়েরি লেখার ব্যাপারে আমাকে আরও নিয়মিত হতে হবে। এখনও সে অভ্যেসটা গড়ে ওঠেনি।
পাঁচ সপ্তাহ আগে আমার বন্ধু প্রফেসার ফিলিপো পাচিনি একটা গুরুতর সমস্যার ব্যাপারে আমাকে ফ্রান্স থেকে ফোন করেছিল।
গ্লোবাল ওয়ারমিং-এর জন্য জলের উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় সমুদ্রে কোরাল রীফ বা প্রবাল প্রাচীর সাঙ্ঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রবাল প্রাচীর সমুদ্রের জলের তলায় কখনও অগভীর জলে, কখনও বা গভীর জলে গড়ে ওঠে। খুব বড়ো ঢেউ, বন্যা বা বড়ো ঝড়ের হাত থেকে উপকূলকে রক্ষা করতে ঢালের মতো কাজ করে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরণের সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য এই প্রবাল প্রাচীর শুধু খাদ্যের সন্ধানই নয়, বাসস্থানও।
এখন সামুদ্রিক ঝড়, প্লাবনের সম্ভাবনা যেমন একদিকে বাড়ছে আর অন্যদিকে কোরাল রীফ উধাও হয়ে যাচ্ছে। এর জন্য আগামী দিনে উপকূলবর্তী এলাকায় মানুষের পক্ষে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। সমস্যাটা বিশ্বজুড়েই সাঙ্ঘাতিক আকার ধারণ করছে। এই ব্যাপারে আমার কাছে পরামর্শ চেয়েছিল প্রফেসার ফিলিপো পাচিনি আমি একটু সময় চেয়ে নিয়েছিলাম, তবে এ ব্যাপারে অবশ্যই সাহায্য করব এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম।
আমি এ ধরনের সমস্যা এলে ‘Gedankenexperimente,’ বা ‘থট এক্সপেরিমেন্ট’-এ বিশ্বাস করি। ঠিক যেমন আইনস্টাইনও করতেন। বেশিরভাগ বড়ো আবিষ্কারের পিছনে থাকে গভীর পরীক্ষামূলক চিন্তাভাবনা বা থট এক্সপেরিমেন্ট’আমার ক্ষেত্রেও বেশিরভাগ আবিষ্কারে সেটাই সাহায্য করেএর দুটো উদাহরণ দিই
কী হবে যদি পৃথিবীর আকাশে একটার জায়গায় তিনটে চাঁদ থাকে বা যদি একটা সাইকেলের বেগ আলোর বেগের থেকেও বেশি হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে আমরা সেই সাইকেলকে কীভাবে দেখব।
এটা তো আর ল্যাবে বসে এক্সপেরিমেন্ট করে দেখা যায় না। কিন্তু কল্পনার সাহায্যে সেই বিষয়ের অনেক গভীরে গেলে একটা ধারণা করা যায়। সেটাই হলো ‘থট এক্সপেরিমেন্ট’।
এসব ক্ষেত্রে আগে ভাবতে হয়। ল্যাবের কাজ অনেক পরে। সেভাবেই এই আইডিয়াটা প্রথমে মাথায় এলযদি এরকম কিছু করতে হয়, তাহলে সেটা যেন সহজে তৈরি করা যায়, সেটা ভাবতে হবে। সমুদ্রের জলের নিচে তো আর কংক্রিটের প্রাচীর গড়া সম্ভব নয়। কিন্তু সমুদ্রের জলে যদি দুটো ইলেকট্রোডের মধ্যে বিদ্যুৎ পাঠানো হয়, সেক্ষেত্রে সমুদ্রের জল থেকে ক্যালসিয়াম কারবোনেট এবং ম্যাগনেশিয়াম হাইড্রক্সাইড আলাদা হয়ে চুনাপাথর তৈরি করবে, যা অনেকটাই সাধারণ কোরাল রীফের মতো হবে। এভাবে আমরা নিজেরাই কৃত্রিম প্রবাল প্রাচীর তৈরি করে নিতে পারব যা আমাদের ঝড়-জল, বন্যা - এসব থেকে রক্ষা করবে।
কথাটা মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গে এ ব্যাপারে ল্যাবের অ্যাকোয়ারিয়ামে সমুদ্রের জল এনে তার মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎপ্রবাহ চালিয়ে পরীক্ষা করে দেখলাম। আমার ধারণা একদম ঠিক। দু’দিন বাদে সামান্য চুনাপাথর-এর কণা পেলাম। কিন্তু এত আস্তে হলে চলবে না। এ ভাবে প্রবাল প্রাচীর তৈরি করতে হলে কয়েকশো বছর লেগে যাবে। অনেক তাড়াতাড়ি করতে হবে।
এখানেই আমার আসল পরীক্ষা শুরু হল। আমি সব সময় মনে করি একটা সফল ইকোসিস্টেমে যারা থাকে, তারা প্রত্যেকেই সে ইকোসিস্টেম তৈরি করতে সাহায্য করেযদিও বিজ্ঞান এখনও জানে না যে এই কোরাল রীফের পিছনে বিভিন্ন প্রাণীজগৎ বা মাইক্রোব–এর অবদান কী, কিন্তু আমার ধারণা নিশ্চয়ই কিছু আছে বিশেষ কিছু মাইক্রোব-এর সাহায্য নিয়ে যদি এই প্রসেসটাকে ত্বরান্বিত করা যায়, সেক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে প্রবাল প্রাচীর তৈরি করা যাবে।
সেটা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট শুরু করলাম। আজ সকালে সে পরীক্ষায় প্রথম বিশেষ সাফল্য পেলাম সেই বিশেষ মাইক্রোবসগুলোর মধ্যে কিছু অজানা মাইক্রোব আছে সেগুলোর সহজ নাম দিলাম রাম, শ্যাম, যদু, মধু - এরকম জটিল বৈজ্ঞানিক নাম দিয়ে ওদের দুর্বোধ্য করে রাখার কোনো মানে নেই। আমার আবিষ্কার করা সব কিছুরই আমি তাই সহজ নাম দিই।
গণেশ আর লিও দু’জনে এসব এক্সপেরিমেন্টের সময় আমার সঙ্গেই থাকে। আজও ছিল। তবে কিছু সময় ইচ্ছে করে লিওকে সঙ্গে রাখিনি।
এখন একটা ফোন করব ফিলিপো পাচিনি–কে। ওকে জানাতে হবে এই পদ্ধতির ব্যাপারে। আমার ধারণা এটা নিয়ে বড়োভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার। সেক্ষেত্রে খুব সহজেই আমরা হাইব্রিড প্রবাল প্রাচীর তৈরি করতে পারব। এভাবে লক্ষ লক্ষ লোকের জীবন ও জীবিকা রক্ষা করা সম্ভব হবে। আমি মনে করি আমরা এখন এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি যে গ্লোবাল ওয়ারমিং এড়াতে গেলে আমাদের সবার একজন আরেকজনকে সাহায্য করতে হবে। নিজের স্বার্থের কথা শুধু ভাবলে চলবে না।
এমনিতেও আমার নোবেল পুরস্কারের মতো পুরস্কারে কোনো লোভ নেই। প্রত্যেকটা আবিষ্কার করার পরে যে আনন্দ পাই, সেটাই সেরা পুরস্কার। লক্ষ লক্ষ লোকের প্রাণের থেকে বড়ো পুরস্কার কীই বা আছে!
 
১৭ সেপ্টেম্বর
ইতিমধ্যে আমার পরীক্ষা আরও সাফল্য পেয়েছে। অবাক হয়েছি দেখে যে আমার আবিষ্কৃত দুই মাইক্রোব ‘যদু’ আর ‘মধু’-কে জলে তড়িৎপ্রবাহের সাহায্যে আমার তৈরি ওই প্রবাল প্রাচীরে নিয়ে আসতে পারলে কী তাড়াতাড়ি সেই কৃত্রিম প্রবাল প্রাচীর তৈরি হয়ে যাচ্ছেযে জিনিস এমনিতে করতে এক বছর লাগত, সেটাই ওরা করে ফেলছে চুনাপাথরের উপরে কয়েক মিনিটের মধ্যে। আর সেই হাইব্রিড প্রবাল প্রাচীর বেশ শক্ত পোক্ত। ঢেউতে তেমন ক্ষতি করতে পারবে না।
তবে সেটা কতটা শক্ত ঠিকভাবে বোঝার জন্য আমার আরও অনেক বড়ো জায়গা লাগবে, যেখানে সমুদ্রের মতো কৃত্রিম ঢেউ তৈরি করা সম্ভব।
ফিলিপো পাচিনি কতটা খুশি হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। আমি বার বার বারণ করা সত্ত্বেও বিজ্ঞানী মহলে এই আবিষ্কারের পিছনে আমার অবদানের কথা জানিয়েছে। আমাকে ফ্রান্সে যেতে অনুরোধ করেছে। যাতায়াত, থাকা-খাওয়ার সব খরচ ওই দেবে। ও চায় এই আবিষ্কারের সঙ্গে আমার নামটাও যেন জুড়ে থাকেপাচিনি লোকটা ভালো। সবাই এরকম চায় না। এমন নাছোড়বান্দা যে শেষে আমি আমার নাম রাখার প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয়েছি।
ওর কাজ অবশ্য এখনও অনেক বাকিবড়ো স্কেলে এই পরীক্ষা করা দরকারতার জন্য বেশ কিছু জায়গা জুড়ে সমুদ্রে এই এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে। দেখতে হবে এর অন্য কোনো সাইড এফেক্ট হচ্ছে কিনা। হয়তো দেখা গেল যে কোনো ধরনের মাছ এ জন্য উপকূলবর্তী এলাকা থেকে উধাও হয়ে গেলএরকম আরও অনেক কিছুই হতে পারে।
এ ব্যাপারে আরেকটা কথা মনে পড়ে গেল।
 
আগামীকাল আমাকে এখানে কল্যাণগড়ে কী একটা সরকারি পুরস্কার দেওয়া হবেশিক্ষামন্ত্রী আসবেন এখানে। তিনি নাকি নিজের হাতে আমাকে এই পুরস্কার তুলে দেবেন। কিছুদিন আগে আমার প্রতিবেশী অবিনাশবাবু এ ব্যাপারে বলতে এসেছিলেন। ওর আজকাল পার্টির লোকজনদের সঙ্গে ওঠাবসা। এতে নাকি ওর আজকাল কাজের ব্যাপারে অনেক সুবিধে হয়। এখানকার পার্টির লোককে সুপারিশ করেছেন আমার পুরস্কারের ব্যাপারে। আমার দেওয়া পাকা চুল তোলার মেশিনটা ওর খুব নাকি পছন্দ হয়েছে। সে সুপারিশ কাজ করেছে। আমি নাকি সে পুরস্কার পেতে চলেছি। বেশ দর্পের সঙ্গেই এসে বললেন কথাটা।
“বুঝলেন পাই, এসব আবোলতাবোল ছেলেভোলানো আবিষ্কারের মধ্যে একটাই কাজের কাজ করেছেন। আমার পাকা চুল তোলার মেশিনটা। কী দারুণ। মাথায় বসালে টুকটুক করে ঘুরে বেড়ায়, আর ঠিক দেখে শুনে আমার পাকা চুল তুলে দেয়। ভারী আরাম। এই একটা আবিষ্কার আপনার ভাগ্য বদলে দিতে চলেছে। শিক্ষামন্ত্রী ঘনশ্যাম বাবুর নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন। উনি নিজে হাতে আপনাকে এ পুরস্কার দেবেনপুরোটাই আমার সুপারিশে।”
আমি শুনে বেজায় খেপে গিয়েছিলাম। এসব মন্ত্রী, দলীয় নেতাদের হাত থেকে এভাবে পুরস্কার নিতে আমার একদমই ভালো লাগে নাতার উপরে সুপারিশ! এসব শুনলে মনে হয় বিজ্ঞানকে যেন অপমান করছি। সরাসরি ‘না’ বলে দিলাম। আমি কোনোভাবে এ পুরস্কার নেব না।
ভাবলাম উনি সেটা মেনে নিয়েছেন। তখনকার মতো চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু দু’দিন বাদে আবার কানা রনেনকে নিয়ে এলেন। বোমা তৈরির সময় ফেটে রনেন–এর এক চোখ কানা হয়ে গিয়েছিল।
সে লোকটাকে দেখে আমার এমন গা রিরি করছিল যে কী আর বলবলোকটার নানান ধরনের কুখ্যাতি আছে। আবার ‘না’ বলে দিলাম। কিন্তু তারপরে লোকটা আবার আরেকদিন এলবেশ বুঝতে পারছিলাম আমার নাম ওরা উপরমহলে বলে দিয়েছে ও পুরস্কার সেজন্য মঞ্জুর হয়ে গেছেএখন না গেলে মন্ত্রীর অপমান হবে ওরা বেশ অসুবিধেতে পড়বে
শেষে গণেশই আমাকে বোঝালগণেশ মানে আমার সহকারী গণেশ। বাড়ির বাইরের সব কাজ ওই দেখে। ওকে নাকি মাছওয়ালাও এ ব্যাপারে ভয় দেখিয়েছে। ভালো পারশে, চিংড়ি আর ইলিশ এলে, কোনোটাই আর দেবে না বলেছে। যাই হোক, ওর আর চিংড়ির কথা ভেবেই রাজি হয়ে গেলাম এ পুরস্কার নেওয়ায় ধরেই নিয়েছি এর জন্য কয়েক ঘণ্টা নষ্ট হবে।
আগামীকাল সে পুরস্কার নিতে যেতে হবে খানিকক্ষণ। ভেবেছি লিও-কে সঙ্গে নিয়ে যাব। আমার একবার দেখার ইচ্ছে ছিল লিও সবার সঙ্গে কীভাবে মেশে। কয়েকমাস হল ওকে তৈরি করেছি। কৃত্রিম বুদ্ধিসম্পন্ন লিওকে দেখে কেউ বলবে না যে ও রোবট।
তবে দেখার ব্যাপারটা ওর একমাত্র বৈশিষ্ট্য নয়। ও বুদ্ধিমত্তায় অনেক মানুষের থেকে অনেক এগিয়ে আছে। এখন ওর উপরে আমি নতুন কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছি। সেটা হল একবার দেখে, সামান্য কথা বলে মানুষকে চেনার ক্ষমতা। এটা শুনতে খুব সহজ মনে হলেও একজন কৃত্রিম বুদ্ধিসম্পন্ন রোবট-এর পক্ষে এটা সহজ কাজ নয়।
হাবেভাবে, চলাফেরায়, চেহারায়, কথাবার্তার মাধ্যমে একজন মানুষ কেমন, তা সহজে বোঝা যায়। সেই জাজমেন্ট বা বিচারবোধ একটা রোবটকে দেওয়া যায় কিনা সেটাই দেখছিলাম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। এর জন্য ওকে অবশ্য অনেক দাগী অপরাধী থেকে শিক্ষিত মানুষ - তাদের সবার ছবি, তাদের সম্পর্কে নানান তথ্য, নানান সিনেমা, ভিডিও ইত্যাদি দেখিয়েছি। বাকিটা অবশ্যই ওর মেশিন লার্নিং, অর্থাৎ সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে ক্রমাগত শেখার ক্ষমতাতবে এর জন্য আরও বেশি করে ওর বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে মেশা দরকার। সে সুযোগ পাইনি। ঠিক করেছি ওকেও তাই নিয়ে যাব কালকের অনুষ্ঠানে। একটা প্র্যাক্টিকাল টেস্ট হবে।
 
১৯ সেপ্টেম্বর
গতকাল নানান কাণ্ড যা হল, তারপর রাতে আর লেখার ইচ্ছে হয়নি।
গতকাল সেই মন্ত্রীর সভায় আমি ঠিক সময়মতোই গিয়েছিলাম। সঙ্গে লিও ছিল। যথারীতি ওকে কেউ রোবট বলে বুঝতে পারেনি। আমার আপ্তসহায়ক বলার পরে কোনো প্রশ্নের মুখেও পড়তে হয়নি।
আমি এসব মন্ত্রী–টন্ত্রীর খবর বিশেষ রাখি না। তার মানে এই নয় যে রাজনীতি বুঝি না। কিন্তু এদের মধ্যে সুযোগ সন্ধানী, অপরাধীদের সংখ্যা ইদানিং এত বেড়ে গেছে যে এদের সঙ্গে কথা বললেও নিজের অপরাধবোধ বেড়ে যায়। তাই বক্তৃতার সময় প্রথম সারিতে বসে একটা বাংলা গল্পের বই পড়ছিলাম।
যাই হোক, এই মন্ত্রী যে বেশ জাঁদরেল ও জনপ্রিয় সেটা মাঝে মধ্যে দীর্ঘ হাততালির বহর দেখে বেশ বুঝতে পারছিলাম। এখানে আগে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় যুদ্ধ বিমান-এর জন্য একটা হ্যাঙ্গার ছিল। সেই জায়গায় আর পাশের বুনো আমতলার পুরো মাঠ ভরে গিয়েছিল। বক্তৃতার শেষে আমার ডাক পড়ল পুরস্কার নেওয়ার জন্য।
আমার কী কী আবিষ্কার, সে সব ওরা আগেই জানতে চেয়েছিল। গণেশ আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের লিস্ট একটা কাগজে লিখে দিয়েছিল। মন্ত্রী মশাই দেখি সেই লিস্টটা একবার দেখে, ছিঁড়ে পকেটে ফেলে দিয়ে বলে উঠলেন, “ধুর, ওসব আমার লাগে না। আমি সব জানি।”
বলে দৃপ্ত ভঙ্গিতে মাইকের সামনে গিয়ে বলতে শুরু করলেন, “কল্যানগড়ের গর্ব, আমাদের বাংলার গর্ব, কল্যানগড়ের সুসন্তান প্রখ্যাত বিজ্ঞানী মিস্টার পাই, আজ এখানে আছেন। ওঁর অজস্র আবিষ্কারের কথা তো আপনারা জানেনইএসব আবিষ্কার কোনোটাই আমাদের সরকারের সাহায্য ছাড়া হত না। আমাদের কাছ থেকে আবিষ্কারের জন্য অনুপ্রেরণা না পেলে উনি রাস্তায় রাস্তায় ভিখারির মতো ঘুরে বেড়াতেন। আজ সে সব আবিষ্কার ভারত পেরিয়ে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ বদলে দিতে চলেছে। পেনিসিলিন, মাইক্রোস্কোপ, স্টেথোস্কোপ, আয়নোস্কোপ...”
বলে মন্ত্রীমশাই যে কী কী বলতে শুরু করলেন - আমি এক পাশে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিলাম। বুঝতে পারছিলাম এই সমাজে শিক্ষাটাই অপরাধযাদের শিক্ষা থাকে না, তাদের লজ্জাই থাকে না।
কিন্তু অবাক হচ্ছিলাম ওঁর উচ্চারিত প্রত্যেকটা শব্দের সঙ্গে সঙ্গে সমবেত জনতা হাততালি দিয়ে উঠছিল। উনি উৎসাহিত হয়ে আরেকটা জিনিস-এর নাম বলে উঠছিলেন। শেষে টর্চ, ব্যাটারি হয়ে উনি ম্যালেরিয়া, পোলিও – এসবের আবিষ্কারকর্তা হিসেবে আমার নাম উল্লেখ করতে শুরু করলেন। তাতেও দেখি হাততালি আর থামে না।
যাই হোক, সে কথার ঝড় এক সময় থামল। উনি আমাকে পুরস্কৃত করার পরে ফিসফিস করে আমাকে বলে উঠলেন, “দেখলেন, কীরকম আপনাকে আমি ফেমাস করে দিলাম। আজ থেকে আপনি হলেন একজন হিরো।”
স্টেজের থেকে নেমে আমার পাশে ‘লিও’-কে দেখে ওঁর কী মনে হল কে জানে! বলে উঠলেন, “বাহ, এর তো বেশ ভালো পেটানো চেহারা। আমার দলে যোগ দিতে বলুন। কী নাম তোমার!”
বলে পাশে দাঁড়ানো স্থানীয় নেতা হাতকাটা বাবলুকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন, “কী ব্যাপার বাবলু, এসব ভালো ভালো ছেলেদের খবর রাখছ না।”
ইতিমধ্যে লিও নিজের নাম বলেছে। কিন্তু মন্ত্রীর বাড়িয়ে দেওয়া হাত করমর্দন না করে, তারপরে যা বলে উঠল তার জন্য আমি একেবারে প্রস্তুত ছিলাম না। সেটা অবশ্য ও আমাকেই জানাতে চেয়েছিলকিন্তু সে কথা মন্ত্রীমশাই-এর কান এড়ায়নি।
“লোকটা নির্লজ্জ, মিথ্যুক, চরিত্রহীন, অপদার্থ, কিছুই জানে না, কিন্তু সবজান্তা ভাব অতীতে অনেক অপরাধ করেছে। খুন করে থাকলেও অবাক হব না। একানব্বই শতাংশ সম্ভাবনা।”
মন্ত্রী ঘনশ্যামবাবুর চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেলমুহূর্তে দেখলাম ওঁর চোখ রাগে লাল হয়ে উঠেছে। লিও-র দিকে এক পা এগিয়ে বলে উঠলেন, “কী, কী বললে!”
বলেই লিওর গালে সপাটে চড়। শুধু একটা নয়, একের পর একদেখলাম লিও বেশ হাসিমুখে মন্ত্রীর চড় থাপ্পড় সহ্য করল। কিন্তু কোনো রকম ক্ষমা চাইল না। মন্ত্রীর সঙ্গে দুটো গুন্ডা মতো লোক ছিল, তারাও লিওকে চড়–থাপ্পড়-লাথি মারতে মারতে মাটিতে ফেলে দিল। আমি কোনোরকমে লিওকে আগলাতে গিয়ে নিজেও একটু মার খেলাম। ভাগ্য ভালো লিও উলটে ওদের মারেনি। সেক্ষেত্রে যে কী হত!
ফেরার পথে অবিনাশবাবু বললেন, “আপনার জন্য আজ আমার মান সম্মান সব জলাঞ্জলি দিতে হল। এখন সামনের জলা জায়গা পুকুর বুজিয়ে বাড়ির যে এক্সটেনশন করব ভাবছিলাম, তা আর হল না।” দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ভদ্রলোক। ফের বলে উঠলেন, “বলেছি না, এসব রোবট চাকর রাখবেন না। তাকে আবার আদিখ্যেতা করে এখানে নিয়ে এসেছেন। এখন বুঝুন। আর ক’দিন এখানে থাকতে পারবেন দেখুন।”
আমি আর উত্তর দিইনি। একটাই সান্ত্বনা, লিও তাহলে মানুষ চিনতে শিখেছে। আমার পরীক্ষা ঠিক দিকেই এগোচ্ছে। একই সঙ্গে যে সংযম লিও দেখিয়েছে, তা অসাধারণ।
এটা হল প্রথম খারাপ খবর। দ্বিতীয় খারাপ খবরটা পেলাম বাড়ি ফিরে গণেশের কাছ থেকে। ল্যাবে তৈরি হওয়া কৃত্রিম প্রবাল প্রাচীর কৃত্রিমভাবে তৈরি করা জলস্রোতে ভেঙে গেছে। যতটা শক্ত ভেবেছিলাম, ততটা নয় তাহলে? দেখতে হবে কীভাবে এই প্রাচীর আরও মজবুত করা যায়।
গণেশের সঙ্গে এই ব্যাপারে যখন আলোচনা করছিলাম, দেখলাম লিও আমাদের পাশ দিয়ে চলে গেল আজকের এই ঘটনা ও কীভাবে নিয়েছে কে জানে!
 
২৬ সেপ্টেম্বর
এ ক’দিনে যা হল, তা কীভাবে লিখব জানি না। কতটা লেখা ঠিক, তাও জানি না। তবে একটাই ভরসা, একজন ছাড়া অন্য কেউ আমার হাতের লেখা পড়তে পারে না।
একটু গুছিয়ে লেখার চেষ্টা করি।
আমার পুরস্কার পাওয়ার ঘটনার তিন দিন পরে মন্ত্রীর বারাসাতের বাড়িতে ডাকাত পড়ে। সে ডাকাত সিকিউরিটি গার্ডদের মারধর করে অজ্ঞান করে ফেলে রেখে মন্ত্রীকে কিডন্যাপ করে। তার পর থেকে মন্ত্রী ঘনশ্যামবাবু উধাও। কোথাও কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। রাজ্য পুলিশ সব রকম চেষ্টা চালাচ্ছে ইতিমধ্যে সি আই ডি-ও কোমর বেঁধে তদন্তে নেমে পড়েছে। তবে কোনো কিছুর কূল কিনারা করতে পারেনি। কেউ বলছে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, কেউ বলছে বিরোধী দল এর জন্য দায়ী।
ডাকাতির ঘটনার দু’দিন পরে মন্ত্রী ঘনশ্যামবাবুর জিম থেকে একটা পাথরের মূর্তি পাওয়া যায়, যে মূর্তি বাড়ির লোক আগে কখনও দেখেনি। ঠিক মাদাম তুসোর মোমের মূর্তির মতোই ‘মন্ত্রী’-র অবিকল পাথরের মূর্তি। এত ভালো পাথরের মূর্তি কে কবে তৈরি করল তা বাড়ির লোকেরা বলতে পারছে না। কাগজে খবরটা ছোটো করে বেরিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে ওই মূর্তির শিল্পী ঘনশ্যামবাবুর হদিস জানে কিনাকিন্তু সেরকম কোনো তথ্য এখনও সামনে আসেনি।
খবরটা শুনে আমি বুঝেছি কী হয়েছে। একটু খোঁজ করলে দেখা যাবে ওই পাথর খুব সাধারণ পাথর নয়। ওই পাথর ঠিক দেখা যায় কোরাল রীফে। বা আমার তৈরি করা নকল কোরাল রীফে।
আমার ডায়েরির পাতায় যেখানে ওই কৃত্রিম প্রবাল প্রাচীর সম্বন্ধে সব ডিটেলস লিখে রেখেছিলাম, সেখানে দেখেছি ঠিক আমার হাতের লেখায় আরও দু’লাইন কে যেন লিখে রেখেছে। আমার প্রসেস ও উল্লেখিত মাইক্রোবদের সঙ্গে আরেক পরিচিত মাইক্রোবের নাম, যা কিনা ওই প্রবাল প্রাচীরকে মজবুত করে।
লিও তার মানে শুধু আমার হাতে লেখা পড়তে নয়, নকল করতেও শিখে গেছে। বাকিটা আর ডায়েরিতে লেখা ঠিক হবে না।
আমার কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার। মন্ত্রী ঘনশ্যামবাবুকে আর কোনো দিনই খুঁজে পাওয়া যাবে না।
তবে এর বাইরেও একটা ঘটনা ঘটেছে। লিও দেখেছি আমার পাওয়া ‘বাংলার আইনস্টাইন’ নামক পুরস্কারটা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে। সেটা অবশ্য ও না করলে আমিই করতাম।
----------
ছবি - অতনু দেব