গল্প:: সেদিন যা ঘটেছিল - সহেলী চট্টোপাধ্যায়


সেদিন যা ঘটেছিল
সহেলী চট্টোপাধ্যায়

সেদিন যা ঘটেছিল তার কোনো ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে। আসল গল্পে আসার আগে আমার শহরের কথা একটু বলে নিই। আমাদের শহরের একটা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে। শহরের একটা অংশ কেমন যেন ইংল্যান্ডের মতন। পশ্চিমবঙ্গের এক অখ্যাত শহরের সঙ্গে ইংল্যান্ডের মিল কী করে হবে? শহরের একটা দিক খুব সুন্দর। এক সময় ইংল্যান্ড থেকে আসা কিছু ইংরেজ এখানে বসতি বানিয়েছিল। তাদের বানানো চার্চ, লজ, সিনেমা হল, কোয়ার্টার সব আছে। যেমনভাবে তারা রাস্তাঘাট বানাত, পার্ক বানাত ঠিক তেমনভাবেই সব কিছু সাজিয়েছিল। এদিকে এলেই মনটা ভালো হয়ে যায়। কেমন ফাঁকা ফাঁকা নিঝুম চারিদিক। কত গাছপালা, বন জঙ্গল চারিদিকে। হাতে গোনা কিছু লোক এখানে কোয়ার্টারগুলোয় বসবাস করে। আমার ছেলেবেলায় অনেক লোক বাস করলেও এখন লোকসংখ্যা অনেক কমে গেছে। কোয়ার্টারে কেউ থাকতে চায় না। মাইনে থেকে অনেক টাকা কেটে নেয়, তাই কেউ থাকতে চায় না। এক যারা ভিন রাজ্য থেকে এসেছে তাদের কোয়ার্টার ছাড়া গতি নেই। আমার ছেলেবেলায় এই জায়গাটা খুব সুন্দর ছিল। সরকার থেকে ভালো করে রক্ষণাবেক্ষণ করত। আমি নিজে যেদিকে থাকি সেখানে জনবসতি বেশি। শপিং মল বেশি। আমার মনটা ভালো লাগে না। হাঁটতে বেরিয়ে একটুও ভালো লাগে না। শুধু দোকান আর দোকান। বাড়ি ঘর, বিউটি পার্লার। এই সবের মধ্য দিয়ে হাঁটতে ভালো লাগে না। তাই মাঝে মাঝে আমি রেল কোয়ার্টারের দিকে আসি। রেলের মাঠে একটু পায়চারি করি। বেঞ্চিতে একটু বসি। কতরকম পাখির ডাক শোনা যায় এখানে। চোখ গেল চোখ গেল করে একটা পাখি ক’দিন ধরে খুব ডাকাডাকি করছে। পুরানো বাড়ি বা কোয়ার্টারগুলো দেখতে খুব ভালো লাগে। অনেক বাড়ির আবার পেছন দিয়ে ঘোরানো সিঁড়ি। মনে হয় ভেতরে কত রহস্য লুকিয়ে আছে। যারা বানিয়েছিল তারা কত দূর থেকে এসেছিল। আজ তারা কোথায় গেল! সময় কত শক্তিশালী। তার থেকে শক্তিশালী কেউ নেই। সময়ই হয়তো ঈশ্বর। অনেক বাড়ি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দেখে বুকের মধ্যে একটু কষ্ট হয়। এই দিকে অনেক স্কুল আছে। ওপেন ইউনিভার্সিটিও আছে। পার্কে বেঞ্চিতে বসে বসে ছোটো বাচ্চাদের দৌড়াদৌড়ি দেখছিলাম। কাঁধে একটা হাত এসে পড়ল। দেখি অনিন্দ্য। আমার প্রিয় বন্ধু বা বেস্ট ফ্রেন্ড। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম।
“হ্যাঁ রে। তুই যে এখানে আসবি আমাকে আগে জানাসনি তো।”
“অনিন্দ্য বলল, আরে অত চেঁচাস না। আমি তোকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম। আমি এই শহরে বদলি হয়ে এসেছি।”
অনিন্দ্য সেন আমার অনেক দিনের বন্ধু। সেই ওয়ান থেকে আমরা বন্ধু। মাঝে কিছুদিন পড়াশোনার জন্য অনিন্দ্য অনেক দূরে চলে গেছিল। তাও ফোনে বা হোয়াটস-অ্যাপে আমাদের যোগাযোগ ছিল। বছরে একবার আসত দেখা করতে। কলকাতায় অনিন্দ্যর বাবা বাড়ি করেছেন বহুদিন। আসাযাওয়া অনেক কমে গেছিল। অনিন্দ্য বলল, “আমার এই জায়গাটা খুব প্রিয়। তাই এখানেই কোয়ার্টারে থাকব। বাবা যে কোয়ার্টারে ছিল আমিও সেটাতেই থাকব।”
মনে মনে ভাবলাম এখানে যে একবার থেকেছে তার আর কোনো জায়গা ভালো লাগবে না। কিছু একটা ব্যাপার তো আছেই। আমিও ছোটোবেলায় কোয়ার্টারেই থেকেছি, তাই মায়া কাটাতে পারিনি। পরে বাবা অন্য দিকে বাড়ি করেন। আমি একটা সাইবার ক্যাফে চালাই। প্রায় তিরিশ ছুঁই ছুঁই আমি। জীবনে বেশি কিছু করে উঠতে পারিনি। ছোটো ছেলেমেয়েদের ফর্ম-টর্ম ফিল আপ করে দিই। অনিন্দ্য আমাকে হাত ধরে টানতে টানতে কোয়ার্টারে নিয়ে এল। বাংলো টাইপের কোয়ার্টার। সামনে শাল শিরীষ অর্জুন জারুল আরও অনেক রকম গাছ। ছোটোবেলায় এই বাংলোয় অনেকবার এসেছি। অনিন্দ্য বলল, “দেখ অজয়, আজ তুই রাতে এখানেই থাকবি। আমি জানি কাকু কাকিমা বেনারস গেছেন। এখন সহজে ফিরবেন না।”
“এই তুই কী করে জানলি রে!” আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করি।
“তুই খুব বোকা অজয়। কাকু কাকিমার সাথে আমি ফেসবুকে আছি। ওঁরা ছবি পোস্ট করছেন। আমি দেখি। লাইক কমেন্ট করি।”
অনিন্দ্যর সঙ্গে অনেক গল্প করলাম। মুড়ি চানাচুর, চা দিয়ে বন্ধু প্রথমে অভ্যর্থনা করল, তারপর ডিনারের জন্য মাংস রান্না করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমি অনেক বারণ করলাম, কিন্তু ও শুনল না। রান্না করা তার অনেকদিনের শখ। একজন কাজের লোক ছিল। সে রুটি কিনে আনল। তারপর অনিন্দ্য তাকে ছুটি দিয়ে দিল। আমরা অনেকক্ষণ গল্প করলাম। দিন পনেরো হল অনিন্দ্য এখানে জয়েন করেছে। এর আগে কেরালায় ছিল। সেই সব গল্প হচ্ছিল। রাত বাড়তেই ঝিঁঝিঁর শব্দ ছড়িয়ে পড়ল। বাতাবি লেবু ফুলের মিষ্টি গন্ধ আসছে। আমরা বারান্দায় বসে ছিলাম। চারদিকে বেশ অন্ধকার। শুধু ল্যাম্প পোস্টের আলো জ্বলছে। এদিকে আর বেশি কোয়ার্টার নেই। একটু দূরে আছে। তবু ভালো যে অনিন্দ্যর কোয়ার্টারে সিকিউরিটির ব্যবস্থা আছে। সেই ভদ্রলোক গেটের পাশে টুলে বসে বসে মোবাইলে রামায়ণ গান শুনছে। এখান থেকে শোনা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে বেশ ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। ঝিরিঝিরি শব্দ উঠছে। কোথাও থেকে কিশোর কুমারের একটা ডিস্কো গান ভেসে আসছে। মার্চ মাস বড়ো মনোরম। রাত দশটা পর্যন্ত গল্প করে আমরা রাতের খাওয়া সেরে নিয়ে বিছানায় গেলাম। আমরা পাশাপাশি দুটো ঘরে শুয়েছিলাম। শোয়ামাত্র ঘুম। মাঝে একবার ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলাম কারা যেন উঁচু গলায় খুব কথা বলছে। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে ডেকে তুলল অনিন্দ্যই। আজ সোমবার। ওর অফিস আছে। আমাকে অনিন্দ্য বলল, “তুই আমার সঙ্গে থাকতে পারিস যতদিন কাকু কাকিমা না ফিরছেন।” আমি বললাম, “আমি তোর সাথে রাতে থাকব, কিন্তু এখন বাড়ি যাব। কিছু কাজ সেরে আসছি।” চা আর ডিম টোস্ট খেয়ে বাড়ি ফিরলাম। ঘরগুলো ঝাঁট দিলাম, মুছলাম। জামা কাপড় ধুলাম। স্নান সেরে ঠাকুরের পুজো দিলাম। আমাদের বাড়িতে যিনি কাজ করেন সেই মাসিকে ক’দিন ছুটি দিয়েছি। একা মানুষ এখন। কাজের লোকের দরকার নেই। আমি সব কাজই করতে পারি। দুপুরে মাছের ঝোল ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। বিকেলে মনে হল দু-দিন ধরে আমার ক্যাফে বন্ধ। কাল থেকে আবার খুলতে হবে। টোটো করে আবার আমি অনিন্দ্যর বাড়ি এলাম। টোটো চালক লোকটা বড়ো অদ্ভুত কথা বলল। বলল আমার নাকি বিপদ আছে সামনে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “দাদা কি জ্যোতিষচর্চা করেন নাকি?”
“তা একটু করে থাকি,” বলে আমাকে তার ফোন নম্বর লেখা একটা কার্ড দিল।
আমি কার্ডটা রেখে দিলাম। আজ বোধ হয় অমাবস্যা। জায়গায় জায়গায় কালী পুজোর প্রস্তুতি চলছে।
অনিন্দ্যর কোয়ার্টারে এসে দেখি সে অফিস থেকে ফিরেছে। গা-টা ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে বসেছে। আমরা ছাদে গিয়ে দেখলাম কিছুদূরে একটা বাড়িতে ছাদে প্যান্ডেল খাটিয়েছে। আমি অবাক হয়ে বললাম, “কালকেও তো এই বাড়িটা ছিল না! আজ কোথা থেকে এল!”
অনিন্দ্য বলল, “নিশ্চয় ছিল। আমাদের নজর এড়িয়ে গেছিল। রাতারাতি তো আর বাড়ি গজাতে পারে না।” আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু বলতে পারলাম না। কর্ম সহায়ক চা আর চপ মুড়ি নিয়ে এসেছে। সামনের ওই কোয়ার্টার বাড়ির ছাদে প্যান্ডেল খাটানো। ছাদে টেবিল চেয়ার রেখে বসার ব্যবস্থা হয়েছে। কিছু লোক টেবিল চেয়ার পাতছে। কেউ কেউ তদারকি করছে। কী যেন একটা গান চলছে। চপ মুড়ি খেতে খেতে এই সব দেখছি। “মনে হচ্ছে বিয়ে বা রিসেপশন,” অনিন্দ্য ফিসফিস করে বলল। বাতাবি লেবু ফুলের গন্ধে মনটা ভরে যাচ্ছে।
আমি বললাম, “জন্মদিন বা অন্য কিছুও হতে পারে। বাতাসে ফিশ ফ্রাই-এর গন্ধ ভেসে আসছে।”
বলতে বলতে আমাদের চোখ কেমন জড়িয়ে এল ঘুমে। আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম।
তারপর যা দেখেছিলাম, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলাম না সত্যি দেখেছিলাম এখনও বুঝে উঠতে পারি না। বিয়ে বাড়ির (বিয়ে বাড়িই বলছি) ছাদে সুন্দর পোশাক পরা লোকজনেরা উঠে আসছে। সানাই-এর সুর বাজছে। টেবিল চেয়ারে কিছু লোক বসে গল্প করছে। সব দূর থেকে দেখছি। কিন্তু স্পষ্ট। কেউ মোবাইল ব্যবহার করছে না। নারী পুরুষদের পোশাক-আশাক আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগের লোকেদের মতন। সব যেন স্পষ্ট দেখতে পারছি। হই হই করে একটা কোলাহল আসছে। কিছু লোক কাঁধে গামছা ফেলে পরিবেশন করছে। অনিন্দ্য ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে বলল, “চল এবার ঘরে যাই।”
আমরা উঠতে গিয়েও পারলাম না। কী এক অদৃশ্য শক্তি আমাদের যেন চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে ফেলেছে। বিয়ে বাড়িতে এবার বাজি পোড়ানো শুরু হল। সঙ্গে ব্যান্ডপার্টির বাজনা। নানা রং-এর বাজি আকাশে গিয়ে তারা হয়ে ফাটছে। নানান রকম রং সৃষ্টি করছে। আবার আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে। কিছু লোক খুব চিৎকার করছে আনন্দে। কিন্তু এই আনন্দের চিৎকারটা হঠাৎ বদলে গেল বিষাদের চিৎকারে। কানফাটা সেই চিৎকার আজও মনে পড়লে লোম খাড়া হয়ে যায়। দেখলাম বিয়েবাড়িতে আগুন লেগে গেছে। পোড়া একটা গন্ধ বাতাসে ভাসছে। সেই গন্ধে মনে হচ্ছে আমাদের প্রাণ বেরিয়ে যাবে। কিছু লোক প্রাণ বাঁচাতে মরিয়া হয়ে লাফ দিচ্ছে ছাদ থেকে। ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই সাজগোজ করা নারী পুরুষদের দেখে আমরা চমকে উঠি। কিছু কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে। উচ্চস্বরে তারা কাঁদছে। আমরা উঠে পালাতে গেলাম, কিন্তু পারলাম না। ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলাম। দেখলাম সামনের বাড়ি অন্ধকারে পড়ে আছে। নিকষ কালো আঁধার চারিদিকে। কোথাও কিছু নেই। এমন সময় কেউ আমাদের কাঁধ ধরে খুব জোর ঝাঁকুনি দেয়। চোখ মেলে দেখলাম, অনিন্দ্যর সেই লোকটি। লোকটা বলল, “আপনারা ছাদে এসে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। আমি আপনাদের অনেকক্ষণ ধরে ডাকছি। শেষে কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিলাম বলে কিছু মনে করবেন না। আপনাদের রুটি তরকারি করে রেখেছি। আমার এবার যাওয়ার সময় হয়েছে।”
অনিন্দ্য বলল, “তুমি খুব ভালো কাজ করেছ। আমরা কীভাবে যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সামনের ওই বাড়িটার ব্যাপারে কিছু জান গো?” অনিন্দ্য নিজের তর্জনী দিয়ে সেই জরাজীর্ণ বাড়িটা দেখাল।
“আমি কিছু জানি না বাবু। শুনেছি এক সময় এই বাড়িতে আগুন লেগে অনেক লোক মারা গেছিল। মাঝে মাঝে বাড়িটা সেই ঘটে যাওয়া ঘটনাটা দেখায়। সে আমার দাদুর আমলের কথা।”
“কিন্তু আগেও তো এখানে ছিলাম। কখনও এমন ঘটনা দেখিনি।” অনিন্দ্য দম বন্ধ করে বলল।
“বাড়িটা আজ হয়তো দেখাতে চাইছিল নিজের অতীতের কথা; বা আমাদের মধ্যে হয়তো কোনো শক্তি জেগে উঠেছে যার জন্য আমরা দেখতে পেলাম; বা কাকু কাকিমা খুব পুজো-আচ্চা করতেন, তাই কখনও কিছু ফিল করিসনি। কোনো অলৌকিক ঘটনার কার্যকারণ ব্যাখ্যা করা খুব শক্ত রে।” কোনোমতে আমি কথাগুলো বললাম। কাজের লোকটি রাম রাম বলতে বলতে বাড়ি গেল। সেই রাতটা খুব ভয়ে ভয়ে কাটল। সারা রাত ঘরে আলো জ্বেলে অনিন্দ্য আর আমি বসেছিলাম। সিকিউরিটির লোকটি কিছু বুঝতে পারেনি। সে দিব্যি ফোন দেখছিল। আমরা ওকে আর কিছু জানাইনি।
এরপরের ঘটনা খুব সংক্ষিপ্ত।
আমরা দুজনেই প্রায় এক মাস জ্বরে ভুগেছিলাম। অনিন্দ্য বদলি নিয়ে অন্য শহরে চলে যায়। নির্জন জায়গা আমাদের আর ভালো লাগে না।
----------
ছবি - সুজাতা চ্যাটার্জী

No comments:

Post a Comment