গল্পের ম্যাজিক:: সূর্যগ্রহণের গল্প - দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য


সূর্যগ্রহণের গল্প
দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

কা-নাম ভারি দুষ্টু মেয়ে ছিল। মায়ের কথা মোটে শুনত না। মা বলেছিল, “দুপুরবেলা একা একা বনের ভেতর যাস না।”
কিন্তু সে কথা শুনতে দুষ্টু মেয়ের ভারি বয়েই গেছে! দুপুরবেলা মাও কাজ-টাজ সেরে একটু চোখ বুজেছে, আর কা-নামও অমনি ঘর ছেড়ে একদৌড়ে সো—জা জঙ্গলে।
খানিক ভেতরে ঢুকতেই ঠা ঠা দিনের আলো নরম হয়ে এল। ঝোপঝাড়ের আড়াল দিয়ে একটা ছোট্টো নদী বয়ে যাচ্ছে। এই নদীটার খোঁজ সে ছাড়া আর কেউ জানে না। তার জলে পা ডুবিয়ে কা-নাম আরাম করে বসল। মাথার ওপর সবুজ ছাদ। সে ছাদের এখান ওখান দিয়ে ফোকর গলে তিরের ফলার মতন রোদ এসে নদীর জলের সঙ্গে খেলা জুড়েছে। মন দিয়ে তাই দেখছিল কা-নাম।
ঠিক সেই সময় ঝোপের আড়াল থেকে তার দিকে দেখছিল একজোড়া জ্বলজ্বলে চোখ। মানুষের মাংস খেতে ভারি ভালোবাসত বাঘরাজা উ-খ্‌লা। সামনে এমন একটা মানুষকে একা একা বসে থাকতে দেখে তাই তার জিভে জল আসছিল। তবে কিনা মানুষটা একেবারে একরত্তি। তবে তাতে তার আপত্তি নেই। কদ্দিন আটকে রেখে খানিক খাইয়ে-দাইয়ে মোটা করে নিলেই হল।
এই ভেবে, ভয়ানক একটা হাঁকার ছেড়ে হলুদ বিদ্যুতের মতো উ-খ্‌লা এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল কা-নামের ওপর। তারপর তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে একছুটে গভীর জঙ্গলে হারিয়ে গেল।

* * *

চোখ খুলে চারপাশে তাকিয়ে কা-নাম টের পেল, একটা গুহার ভেতর সে বন্দি। বাইরে উঁকি মেরে দেখে, সে এক গহিন জঙ্গল। সে বনের কূলকিনারা নেই। একা একা কোথায় যাবে সে, সেই গভীর অরণ্যে! একটা পাথরের ওপর জড়োসড়ো হয়ে তাই ভাবছে কা-নাম এমন সময় কোত্থেকে একটা বিরাট বাঘ লাফ দিয়ে গুহায় ঢুকে এসে একরাশ ফলমূল আর একটা লাউয়ের খোলায় করে খানিক জল সেখানে নামিয়ে রেখে ফের জঙ্গলে উধাও হয়ে গেল।
এতক্ষণে কা-নামের খেয়াল হল, তাই তো! খুব খিদে পেয়েছে যে তার! সেই কখন সকালবেলা দু’মুঠো ভাত খেয়েছিল; তারপর আর দাঁতে কুটোটি কাটেনি সে। ফলমূল খেয়ে পেট ভরিয়ে খানিক জল খেয়ে সে শুয়ে পড়ল গুহার মেঝেতে। তারপর কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে সে কথা তার নিজেরও খেয়াল নেই।
তারপর থেকে প্রতিদিন সন্ধেবেলা বাঘ এসে কা-নামকে খাবার দিয়ে যায়; মেপেজুপে দেখে যায় কতটা মোটাসোটা হল মেয়েটা। গুহায় বসে কা-নাম সেই ফলমূল খায় আর মায়ের কথা ভেবে হাপুস হয়ে কাঁদে।
গুহায় কিন্তু আরও একজন থাকত। কে বল তো? সে এক ছোট্টো ইঁদুর। অন্ধকার কোণে লুকিয়ে থাকত বলে কা-নাম তাকে কোনওদিন চোখে দেখেনি। সে কিন্তু কা-নামের সব খবর রাখত। একদিন সন্ধেবেলা ইঁদুর গুহার বাইরে ঝোপের ভেতর খাবার খুঁজছে এমন সময় দেখে বাঘ কা-নামকে খাবার দিয়ে গুহা ছেড়ে বের হচ্ছে আর বিড়বিড় করে কী যেন বলতে বলতে যাচ্ছে। অমনি ইঁদুর কান খাড়া করল। শোনে, বাঘ আপনমনেই বলছে, “মেয়েটা বেশ গোলগাল হয়ে উঠেছে। আজ রাত্রে এটাকে খাব। যাই, বন্ধুবান্ধবকে নেমন্তন্ন করে আসি।”
কা-নামের ওপরে ইঁদুরের মায়া পড়ে গিয়েছিল। বাঘের কথা শুনে সে ঠিক করে নিল, যে করেই হোক মেয়েটাকে বাঁচাতেই হবে। তাড়াতাড়ি গুহার ভেতর ফিরে এল সে। এসে দেখে খাওয়াদাওয়া সেরে কা-নাম ঘুমিয়ে কাদা। তার কানের কাছে গিয়ে কিঁচকিঁচ করে ইঁদুর বলল, “ওঠো গো মেয়ে। আজ যে তোমার ভারি বিপদ!”
ঘুম ভেঙে চমকে উঠে কা-নাম দেখল, তার কানের কাছে একটা ছোট্ট ইঁদুর দাঁড়িয়ে তাকে ডাকছে।
“কী বিপদ গো?”
ইঁদুর তখন তাকে সবকথা বলে শেষে বলল, “এবারে তুমি পালাও গো মেয়ে।”
কা-নামের চোখে জল এল। বলল, “এ জঙ্গলের কিচ্ছুটি যে চিনি না আমি! কোথায় যাব একা একা?”
তাই শুনে ইঁদুর খানিক ভেবেচিন্তে নিয়ে বলল, “এস তাহলে আমার সঙ্গে। আমি তোমায় বাঁচাব।”
ইঁদুরকে কাঁধের ওপর বসিয়ে মাঠঘাট, বন, উপবন পেরিয়ে কা-নাম ছোটে—ছোটে—ছোটেরাত পেরিয়ে দিন হল, তারপর দিন পেরিয়ে ফের যখন রাত নামছে তখন সেই বনের ভেতর একটা বিরাট পুকুরের সামনে এসে দাঁড়াল তারা। কা-নামকে চুপটি করে দাঁড়াতে বলে তার কাঁধ থেকে জলের বুকে ঝাঁপ দিল ইঁদুর। তারপর টুপ করে তলিয়ে গেল পুকুরের গহিন জলে।
খানিক বাদে জল তোলপাড় করে ভেসে উঠল পাহাড়ের মতো একটা ব্যাঙতার কাঁধের ওপর ইঁদুর বসে। পুকুরধারে পৌঁছে জলের ভেতর থেকেই সে গোল্লা গোল্লা চোখ মেলে কা-নামকে দেখল অনেকক্ষণ। তারপর বলল, “আমি উ-হিনরো। দুনিয়ার সেরা জাদুকর। বল, তোমার কী বিপদ হয়েছে।”
তারপর কা-নামের সবকথা শুনে উ-হিনরো বলল, “তুমি বরং আমার বাড়িতে এসে থাক। সেখানে থাকলে উ-খ্‌লা তোমার কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। তবে কিনা, আমার বাড়িতে থাকতে হলে তোমাকে ব্যাঙ সেজে থাকতে হবে। অমন বিচ্ছিরি মানুষের চেহারা দেখলে আমার সুন্দর সুন্দর ছেলেমেয়েগুলো ভয় পাবে তো! কী? রাজি?”
কা-নাম মাথা নাড়ল।
তারপর তো কোলাব্যাঙের চামড়া মুড়ি দিয়ে কা-নাম উ-হিনরোর বাড়িতে থাকে। তার বউ-ছেলেমেয়ের ফাইফরমাশ খেটে, চড়চাপড় খেয়ে দিন চলে তার। বাড়ির বাইরে পা দেয়াও মানা।

কয়েকমাস পরে একদিন উ-হিনরোর বাড়িতে বেড়াতে এসে কা-নামের দশা দেখে ইঁদুরের চোখে জল এল। অত সুন্দর রাজকন্যার মতো মেয়ে ব্যাঙ সেজে ব্যাঙের বাড়ির চাকরানি হয়ে থাকছে! এ কিছুতেই হতে পারে না।
সুযোগ খুঁজতে লাগল ইঁদুর। তারপর একদিন যখন উ-হিনরো বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে দূরের কোন পুকুরে নেমন্তন্ন খেতে গেছে, সেই ফাঁকে কা-নামকে নিয়ে ফের বের হয়ে পড়ল পথে। পুকুর ছেড়ে অনেক দূরে গিয়ে তারা এসে পৌঁছোল এক জাদুবনের মাঝখানে। সেখানে একটা ছোট্টো গাছ দাঁড়িয়ে আছে। ভারি অদ্ভুত চেহারা তার। দেখে কা-নাম জিজ্ঞাসা করল, “কী গাছ এটা?”
ইঁদুর বলল, “এ হল জাদুগাছ। তোমায় একটা মন্ত্র শিখিয়ে দিচ্ছি। গাছের মাথায় চড়ে বসে মন্ত্রটা বল। তোমার সব দুঃখ দূর হয়ে যাবে।”
খানিক বাদে গাছের মাথায় চেপে বসে ইঁদুরের শেখানো মন্ত্রটা বলল কা-নাম,
গাছদেবতা, গাছদেবতা
শুনছ নাকি ভাই,
তোমায় বলি একটা কথা
উঁচোও তোমার ঝাঁকড়া মাথা
তোমায় চেপে আকাশদেশে যাই—”

অমনি কা-নামকে মাথায় নিয়ে সড়সড় করে মাথা উঁচলো জাদুগাছ। দেখতে দেখতে জঙ্গলের সবুজ চাঁদোয়া ছাড়িয়ে, মেঘেদেরও ছাড়িয়ে গেল সে। পায়ের নিচে পৃথিবীটা ছোটো হতে হতে একসময় মিলিয়ে গেল। কা-নাম এসে পৌঁছোল আকাশের দেশে। সে দেশে কারও কোনও দুঃখকষ্ট নেই।
কিন্তু সেই সুখের দেশে এসেও দুঃখিনী কা-নামের দুঃখ ঘুচল না। এ দেশে সবাই সুন্দর। একটা বিচ্ছিরি দেখতে ব্যাঙকে কে আর ভালোবাসবে এখানে? পথে পথে অনেক ঘুরে শেষমেশ সূর্যদেবী কা স্‌ন্‌গীর বাড়িতে তার ঠাঁই মিলল অনেক কষ্টে।
বিরাট সেই প্রাসাদের এক কোণে দুঃখিনী ব্যাঙের বাসা। কেউ তার দিকে ফিরেও দেখে না। কিন্তু তারপর একদিন রাতে সূর্যদেবীর ছোটোছেলে এসে কী মনে হতে উঁকি মেরেছিল কা-নামের ঘরেদেখে, কোথায় ব্যাঙ! মাটিতে কোলাব্যাঙের চামড়া খুলে রেখে পালঙ্কে শুয়ে একটা ভারি মিষ্টি মেয়ে ঘুমোচ্ছে। ছোটোছেলে তখন চুপিচুপি ঘরে ঢুকে ব্যাঙের চামড়াটা তুলে নিয়ে এসে ছুঁড়ে ফেলে দিল আগুনের ভেতর। তারপর সুন্দরী কা-নামের হাত ধরে নিয়ে চলল সূর্যমায়ের ঘরে।
তারপর পূর্ণিমার রাতে সূর্যমায়ের ছোটোছেলের সঙ্গে বেজায় ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেল কা-নামের। সে বিয়ের দিন দুপুরবেলা আকাশ-মাটি-পাতালের সব্বার নেমন্তন্ন হয়েছিল বিয়ের ভোজে। উ-হিনরোও নেমন্তন্ন পেয়েছিল। দাসী পালিয়ে যাবার পর থেকেই তো সে রেগে দশখানা হয়ে দুনিয়াজোড়া খুঁজে চলেছে তাকে। বিয়ের কনেকে দেখে সূর্যদেবীর ওপর তার রাগ দেখে কে! খাবার ফেলে রেখে আকাশপাতাল হাঁ করে সে ধেয়ে গেল তাঁর দিকে। বেধে গেল তুমুল যুদ্ধ। উ-হিনরোর ছায়ায় ঢাকা পড়ে গেল সূর্যদেবীর আলোর মুখ। পৃথিবীতে ভরদুপুরে অন্ধকার নেমে এল। পৃথিবীর মানুষরা তো সূর্যদেবীর দলে! তারা উ-হিনরোকে ভয় দেখাবার জন্য এমন ঢাক-ঢোল বাজানো শুরু করল যে তাইতে ভয় পেয়ে উ-হিনরো সূর্যকে ছেড়ে একছুটে পালিয়ে গেল তার জাদুপুকুরের মাঝখানে। আকাশ আবার আলোয় ঢেকে গেল।

কত যুগ কেটে গেছে তারপর। উ-হিনরোর কিন্তু সূর্যের ওপর রাগ আজও যায়নি। মাঝেমাঝেই পুরনো কথা মনে পড়লে সে রেগে দশখানা হয়ে সূর্যদেবীকে গিয়ে আক্রমণ করে। তখন ভরদুপুরে পৃথিবীতে ছায়া নেমে আসে। মানুষরা তখন ফের ঢাক-ঢোল বাজাতে শুরু করলে খানিক বাদে ভয় পেয়ে সূর্যদেবীকে ছেড়ে পালিয়ে যায় উ-হিনরো। আর এমনি করেই আকাশের বুকে সূর্যগ্রহণ হয়।
_____
খাসিয়া পাহাড়ের রূপকথা
অলঙ্করণঃ শুভ্রা ভট্টাচার্য

গল্পের ম্যাজিক:: পরশুরামের রিক্সা - চুমকি চট্টোপাধ্যায়


পরশুরামের রিক্সা
চুমকি চট্টোপাধ্যায়

চন্দবাড়িতে আজ উৎসবের মেজাজ। বাড়ির কর্তা সক্কাল সক্কাল বাজারে ছুটেছেন যদি এক-আধটা ইলিশ জোটে। ছোটোকর্তা জলখাবারে কচুরি জিলিপি এনেছেন। বড়োকর্তা বলেছেন, রাতে তিনি বিরিয়ানি স্পনসর করবেন। বড়োগিন্নি, ছোটোগিন্নির হাসি আর ধরে না। তানিয়াও বেশ খুশি সে তো হল কিন্তু কারণটা কী?
কারণটা হল, চন্দবাড়িতে নতুন গাড়ি এসেছে। টয়োটা ইনোভা। মুক্তো রঙা গাড়িটা ওদের বাড়ির নিচেই দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও যেতে হলে এতদিন ওরা হয় বাস নয় ট্যাক্সি করে যেত। ছোটোখাটো দূরত্বে রিক্সাই ছিল মূল বাহন। কিন্তু মুশকিল হত ঠাম্মিকে নিয়ে। ওদের অঞ্চলে এখন হাতে টানা রিক্সা চলে। বেশ উঁচু এই রিক্সাগুলোতে ঠাম্মির উঠতে খুব কষ্ট হয়। অনেকদিন ধরেই বিস্তর আলাপ আলোচনা চলত, যে একটা গাড়ি না হলে আর চলছে না।
চন্দবাড়ির ছোটো ছেলে শুভ্র চন্দের মেয়ে তানিয়া। ওর স্কুল বাস আসে কিছুটা দূরে বড়ো রাস্তার মোড়ে। হেঁটে যে যাওয়া যায় না তা নয়। তবে আটটায় স্কুল কিনা, তাই বেশ সকালেই তৈরি হতে হয়। হেঁটে গেলে একটু আগে বেরোতে হবে। তার ওপর আছে পিঠে পাঁচ কিলোর বোঝা। তাই পরশুরামের রিক্সা করেই তানিয়া বাস স্ট্যান্ডে যায়। মাস মাইনের বন্দোবস্ত আছে
তানিয়ার জ্যাঠতুতো বড়োদিদির বিয়ে হয়ে গেছে। জ্যাঠতুতো দাদাও বাইরে চাকরি করে। মাঝে মাঝে আসে। এখন বাড়িতে সাতজন মানুষ থাকে। কোথাও যেতে হলে সবাই যাতে এক সঙ্গে যেতে পারে তাই গাড়ির লোন নিয়ে বড়ো গাড়িই কেনা হয়েছে। সাতজন ধরে যায় এই গাড়িতে।
শুধু রিক্সা করে বাস স্ট্যান্ডে গেলেই তো হল না! বাস যে রোজ ঘড়ি ধরে আসে তা তো নয়। কোনদিন যেতে না যেতেই এসে যায়, কোনদিন আবার তীর্থের কাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকআগে শীতলামাসি যেত তানিয়ার সঙ্গে। শীতলামাসির শরীর খারাপ হওয়াতে কাজ ছেড়ে দিয়েছে। এখন তানিয়া একাই যায়। তানিয়ার বাবা একটু একটু ভয় পান কিন্তু মা বলেন,ছোটো থেকে একটু ছেড়ে দিলে ভয় কেটে যায়, আত্মবিশ্বাস বাড়ে। এই তো সামান্য রাস্তা কিচ্ছু অসুবিধে নেই। একাই যাক।
পরশুরাম কিন্তু মোটেই তানিয়াকে একা ছেড়ে দিয়ে চলে আসে না। যতক্ষণ না স্কুল বাস আসে, ও দাঁড়িয়ে থাকে। তানিয়া তো কত বলেছে, তুমি চলে যাও, পরশুরামকাকা। তোমার লস হয়ে যাবে। আমি ওয়েট করছি। কোন প্রবলেম হবে না।
কিন্তু পরশুরামের এক কথা,না খুকুমণি, তুমাকে বাসে তুলে আমি চলিয়ে যাব। ফাঁকা ইস্ট্যান্ডে তুমাকে একা ছেড়ে যাব না।
তানিয়ার স্কুল ছুটি হয় দুটোর সময়। বাস যখন নামায় তখন তিনটে বেজে যায়। জ্যাম থাকলে আরও দেরি হয়। সেই সময় বাস স্ট্যান্ডে অনেক লোকজন থাকে। অন্য রিক্সাও থাকে। তানিয়া কিন্তু জানে বাস থেকে নেমেই পরশুকাকাকে ও দেখতে পাবে। এই সময়ের কাছাকাছি কোন সওয়ারিই ও নেয় না খুকুমণিকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে তবেই ওর স্বস্তি।
তানিয়াকে বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছনো ছাড়াও যখনি তানিয়ার মা, জেম্মা কাছাকাছি দোকান বাজার গেছে, পরশুরামকে আগে থেকে বলে রাখলেই ব্যস, নো চিন্তা! ঠিক সময়মতো এসে ঘণ্টা নাড়বে টুং টুং টুং...অন্য কেউ পাঁচগুণ ভাড়া দিতে চাইলেও যাবে না ও
বর্ষার সময় দু-একবার যা কাণ্ড হয়েছে! তানিয়া স্কুলে গেছে ভালোভাবেই। ও মা, বেলা সাড়ে বারোটা থেকে সেই যে বৃষ্টি নামল, একঘণ্টা পর থামল রাস্তাগুলোকে নদী বানিয়ে। তানিয়ার কিন্তু চিন্তা নেই। ও জানে পৃথিবী ডুবে গেলেও পরশুকাকা আসবে ওকে নিতে।
তানিয়া রিক্সায় যেতে যেতে কত কথাই না বলে পরশুরামের সঙ্গে। দাদুর কাছে শোনা পরশুরামের কুঠারের গল্পও বলেছে ওকে
জানো পরশুকাকা, এটা তো কলিযুগ। এর আগের আগের যুগের নাম ছিল ত্রেতাযুগ। সেই যুগে ঋষি জমদগ্নি আর রেণুকার ছেলের নাম ছিল পরশুরাম। বিষ্ণুর অবতার ছিল এই পরশুরাম। সে সময় ক্ষত্রিয়রা ব্রাহ্মণদের খুব বিরক্ত করত বলে পরশুরাম হাতের কুঠার দিয়ে একুশবার ক্ষত্রিয়দের মেরে শেষ করেছিল। কুঠার বোঝ তো? অ্যাক্স যাকে বলে। বুঝেছ তো? আরে, গাছ কাটে গো! এই গল্প আমার দাদু বলেছে।
হাঁ হাঁবুঝিয়েছি খুকুমণি।
খুশি হয়ে বলতে থাকে তানিয়া, সেই পরশুরাম তার মাকে কুঠার দিয়ে আঘাত করে মেরে ফেলেছিল। তাই ওর বাবার অভিশাপে সেই কুঠার ওর হাতে আটকে গেছিল। কিছুতেই খুলত না। এই তোমার হাতে যেমন রিক্সার ডান্ডি আটকে থাকে সারাদিন, তেমনি।
রাম রাম, খুকুমণি। হামি কিন্তু এত্ত পাপ কাজ করি নাই। ছেলে মাকে মারিয়ে ফেলল, সে কেমন ছেলে? জাহান্নুমে গরম তেলে ওকে ভাজবে গো, খুকুমণি।
হাসিতে ফেটে পড়ে তানিয়া। ওর পরশুকাকার সারল্য আনন্দ দেয় ওকে।

* * *

একজন ড্রাইভারের ব্যবস্থাও করা হল। বাড়ির লোকেরা, বিশেষ করে ঠাম্মি, ম্মা, মা - এদের বেরনো মুশকিল হচ্ছিল কে নিয়ে যাবে? এক রবিবার আর ছুটির দিন ছাড়া তো সবাই অফিসে। বাপ্পা পাশের পাড়াতেই থাকে। বাড়ির বড়োরা আলোচনা করে ঠিক করল, সকালবেলা বাপ্পা এসে তানিয়াকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসবে। আবার বিকেলে স্কুল থেকে নিয়ে আসবে। মধ্যের সময়টুকুতে যার যার দরকার, তারা বেরোবে।
তানি, তোর টেনশন কমে গেল। পরীক্ষার সময় বাস ঠিক সময় আসবে কি না ভেবে পাগল হতিস। এখন থেকে আর চিন্তা রইল না। আমিও নিশ্চিন্ত হলাম তানিয়ার মা বললেন।
তানিয়ারও এই কথাটা মনে হয়েছে। তাছাড়া রোজ একটু সময়ও বাঁচবে। আর, একটু দেরি করে বেরনো যাবে। কিন্তু মনের ভেতর কোথায় একটা যেন কাঁটা বিঁধছে অস্বস্তি হচ্ছে। পরশুরামকাকার জন্যে কি? বাবা তো বলল, ওর জন্যে কোন চিন্তা নেই। ওর বরং রোজগার বাড়বে। কত সওয়ারিকেই তো নিতে পারত না তানিকে সময়মতো দেওয়া-নেওয়া করতে গিয়ে।

আজ প্রথম গাড়িতে চড়ে স্কুলে যাচ্ছে তানিয়া। ওর বাবাও যাচ্ছেন সঙ্গে। বাস স্ট্যান্ড পেরনোর সময় তানিয়া দেখতে পেল পরশুকাকা রিক্সা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা যেন করুণ। বুকটা মুচড়ে উঠল তানিয়ার। চোখ ভরে এল জলে। একটুও ভালো লাগছে না গাড়ি করে স্কুলে যেতে। ভাড়া নয় পরশুকাকা পেয়ে যাবে, কিন্তু কী সুন্দর গল্প করতে করতে যেত যে ওরা, তার কী হবে?
স্কুল থেকে গাড়িতে করেই ফিরল তানিয়া। আসার সময় পরশুকাকাকে দেখতে পায়নি ও। মুখটা ভার হয়ে আছে
কী তানি-মা, মুখ ভার কেন? কাল রেজাল্ট বেরোবে তো? জেম্মা জিগ্যেস করেন, “আজ কেমন লাগল গাড়িতে যাতায়াত করে?
ভালো না,” বলেই ঘরে চলে আসে তানিয়া।

আজ রেজাল্ট বেরিয়েছে। সেকেন্ড হয়েছে তানিয়া। মাত্র দুনম্বরের জন্যে। বাড়ি ফিরছে গাড়িতে। রিক্সা স্ট্যান্ডে দেখতে পায় দাঁড় করানো রিক্সার পাদানিতে উদাসভাবে বসে আছে পরশুকাকা। কাকা কি তানিয়ার কথা ভাবছে? পরশুকাকার দেশের গল্প, ধর্মের গল্প, কিছুই তো আর শোনা হচ্ছে না
বাড়িতে সবাই খুব খুশি। দাদু বললেন,ভালো করে লেখাপড়া শিখলে কী হয় জানো, দিদিসোনা? যেখানেই যাও না কেন, সম্মান পাবে। শাস্ত্রে আছে, স্বদেশে পূজ্যতে রাজা, বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে। মানে হল, তুমি যদি ধনবান রাজা হও তাহলে যে রাজ্যের রাজা, সে রাজ্যের লোক তোমাকে মানবে, পুজো করবে। কিন্তু তুমি যদি বিদ্বান হও তাহলে গোটা বিশ্ব তোমাকে পুজো করবে।
বাবা, মা, জেঠু, জেম্মা সব্বাই অনেক আদর করল তানিয়াকে। রাত্রের মেনু ঠিক হয়ে গেল, টুং ফাং-এর মিক্সড চা আর গারলিক চিকেন। তানিয়ার পছন্দের খাবার
বল, কী নিবি,” মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বাবার প্রশ্ন।
আমি গাড়ি করে স্কুলে যাব না। পরশুকাকার রিক্সা করেই যাব, আগের মতো।
সবাই থমকে যায় মেয়ের কথা শুনে। বলে কী? ওর মা বলেন, কেন রে? গাড়িতে তো তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাচ্ছিস স্কুলে, আরামেও যাচ্ছিস। তাহলে?
বাবা জিগ্যেস করেছে, আমি কী নেব। আমি এটাই চাই। এটাই আমার প্রাইজ। না দিলে দিও না। আমার আর কিচ্ছু চাই না।
দৌড়ে সেখান থেকে চলে যায় তানিয়া।

* * *

টুং টুং করে বাজছে আঙুলে জড়ানো ঘণ্টা। পরশুরামের রিক্সায় খিল খিল করে হাসছে তানিয়া
পরশুকাকা, তুমি শিগগির শিগগির গাড়ি চালানো শিখে নাও। তাহলে আমাদের গাড়িটা তুমিই চালাবে। তোমারও আর কষ্ট করে হাতে রিক্সা টানতে হবে না আর, অনেক বেশি টাকা পাবে। আমিও তোমার সঙ্গে গল্প করতে করতে স্কুলে যেতে পারব।
ঠিক হি তো বলিয়েসো, খুকুমণি। হামার ভি ভালো লাগছিল না। খুকুমণি আসিয়ে গেছে, হামি ভি খুশ। ইকটা কথা হোলো, হামি যদি ডেরাইভিং শিখে লি, তাহলে হামা এ রিস্কাটার কী হবে খুকুমণি! যোবে থেকে হামি কাম করছি, ই রিস্কাই তো হামাকে খাবিয়েছে। ইকে তো ছাড়তে পারব না গো।
ঠিকই তো! পরশুকাকার প্রাণ তো রিক্সাটাই। একে ছেড়ে তো থাকতে পারবে না কাকা। ভেবেচিন্তে বলে তানিয়া,তাহলে তোমার রিক্সায় চড়েই আমি আসব, যাব। তোমাকে আর ড্রাইভিং শিখতে হবে না। ওই তো বাস আসছে।
পরশুকাকাকে টা টা করতে গিয়ে দেখে কাকা একটা কাগজের ঠোঙা হাতে নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে
এটা তুমার জন্যে আনিয়েছি, খুকুমণি। লিট্টি। লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলে পরশুরাম।
হেসে কাকার হাত থেকে ঠোঙা নিয়ে বাসে উঠে যায় তানিয়া। টিফিন ব্রেকে ঠোঙা খুলে একটা বের করে কামড়ে মন্দ লাগে না। লিট্টি আগে কখন খায়নি। বন্ধুদের ভাগ করে দিয়ে পরশুকাকার গল্প বলে তানিয়া। আজ খুব খুশি ও।
পরশুকাকার রিক্সায় চেপে বাড়ি ফিরছে তানিয়া
তোমার লিট্টিগুলো খুব ভালো খেতে, পরশুকাকা। থ্যাঙ্ক ইউ! জানো, আমি ক্লাসে সেকেন্ড হয়েছি। আর তুমি আমাকে সব থেকে ভালো প্রাইজ, ওই, মানে পুরস্কার দিয়েছ। আমি বন্ধুদেরও দিয়েছি।
পেরাইজ হামি দিলাম কই, খুকুমণি! হামার খেমতা কী আসে তুমাকে দেব যে? সে হামার দেশে একঠো গরিব আদমি ছিল। তার ছেলে ভালো লিখাপড়া করল...
টুং টুং ঘণ্টি আর দিলখোলা গল্পের মধ্যে দিয়ে পেরিয়ে যায় পথ। ওদের খুশিতে রামধনু ওঠে আকাশে, অকারণেই। ভাঙাচোরা রাস্তা হয়ে যায় মখমলের। যেন পক্ষীরাজে চেপে চলেছে রাজকুমারী, সারথি কলিযুগের পরশুরাম
_____
অলঙ্করণঃ স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

গল্পের ম্যাজিক:: বোর্ডিং স্কুলের বিপদ - অনন্যা দাশ


বোর্ডিং স্কুলের বিপদ
অনন্যা দাশ

।। এক।।

বাবা অফিস থেকে ফিরেই মাকে বললেন, “সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে ফর্ম ইত্যাদি যা ভরার ছিল আমি ভরে দিয়েছি, আর শংকর গিয়ে জমা দিয়ে এসেছে কথাও হয়ে গেছে, সামনের বুধবার সোহমকে নিয়ে যেতে হবে ভর্তি হওয়ার জন্যে
মা একটু ভয়ে ভয়ে বললেন, “সত্যিই কী তাহলে ওকে বোর্ডিং স্কুলে দিয়ে দেবে?”
বাবাকে টলানো কঠিন বললেন, “হ্যাঁ, থাকুক কয়েকটা বছর আর নিউ হরাইজেন স্কুল তো আর যে সে বোর্ডিং স্কুল নয় সোহমদের মতন অনেক দুষ্টু আর বেয়াড়া ছেলেকে ওরা ঠিক করে তুলেছে ওইরকম ছেলেদের মানুষ করার জন্যেই ওই স্কুলটা খোলা হয়েছে পরিমলের ছেলেটা কী বদমাশই না ছিল পরিমলের বসের বাড়িতে গিয়ে সোফার ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে সেটাকে ভেঙেই ফেলল! পরিমলের তো লজ্জার একশেষ সেদিন আর এখন তাকে দেখো, নিউ হরাইজেনে গিয়ে একেবারে শান্ত-বাধ্য ছেলে হয়ে গেছে! ব্যবহার দেখে বুঝতেই পারবে না যে একই ছেলে!”
মা তাও একবার বলতে চেষ্টা করলেন, “বাচ্চা ছেলে একটু চঞ্চল তো হবেই আমি না হয় বুঝিয়ে বলব আর করবে না দুষ্টুমি
কিন্তু বাবা আর একটাও কথা শুনতে রাজি হলেন না বললেন, “ওকে অনেক সুযোগ দেওয়া হয়েছে আর কিছু শুনতে চাই না আমি!”
পর্দার আড়াল থেকে সব শুনছিল সোহম ওর মনটা দুঃখে ভরে গেল তার মানে পরের সপ্তাহ থেকেই ওকে বোর্ডিং স্কুলে যেতে হবে সোহম অনেকদিন ধরেই এটা সেটা দুষ্টুমি করে এসেছে বকুনি খেয়েছে, মার খেয়েছে বেশিরভাগ সময় মার কাছেই বাবা মাঝে মাঝে বকেন, কিন্তু মারেন না এবারেও হয়তো সোহম দুষ্টুমিটা করে পার পেয়ে যেত, কিন্তু কেলেঙ্কারিটাতে বাবার বস জড়িয়ে পড়লেন বলে মুশকিলটা হয়ে গেল

গত রবিবার দুপুরবেলা মা-বাবা সোহমকে তারামাসির জিম্মায় বাড়িতে রেখে তাপসকাকুর বাড়িতে গিয়েছিলেন সোহমের বোন জিয়া খুব ছোটো। তাই ওকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন তারামাসি টিভি সিরিয়াল দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ল আর তখন সোহমকে পায় কে! মনের সুখে টেলিফোনটা নিয়ে উলটোপালটা নম্বর ডায়াল করে লোককে বিরক্ত করতে লাগল একটা সিনেমাতে দেখেছিল রিসিভারটাতে রুমাল চাপা দিয়ে কথা বললে গলার আসল স্বর বুঝতে পারা যায় না তাই সেই পদ্ধতি ব্যবহার করল তারপর মনের মতন নম্বর ডায়াল করে লোককে ভয় দেখাতে লাগল কিন্তু কপালে দুর্ভোগ থাকলে যা হয় কাকতালীয়ভাবে একটা নম্বর বাবার বসের বাড়ির হয়ে গেল! বাবার বস আর ওঁর স্ত্রী তখন বাড়িতে ছিলেন না শুধু বসের বৃদ্ধা মা বাড়িতে ছিলেন তাই তিনিই ফোনটা ধরলেন সোহম তো আর জানত না উনি বাবার বসের মা ওপাশ থেকে মহিলার গলার আওয়াজ শুনে সে গলাটাকে যতটা সম্ভব গম্ভীর করে বলেছিল, “হ্যালো, আমি লালবাজার থানা থেকে বলছি আমরা খবর পেয়েছি যে আপনাদের বাড়িতে কোটি কোটি টাকার চোরাইমাল লুকোনো আছে তাই আমরা এখুনি ওখানে আসছি
এখন সোহম সবাইকেই ফোন করে করে ওই কথাগুলোই বলছিল কিন্তু বেশিরভাগ লোকই ওটা কারও শয়তানি বুঝতে পেরে ফোন রেখে দিচ্ছিল বাবার বসের মা বয়স্ক মানুষ উনি ওর দুষ্টুমি ধরতে না পেরে ভয়ানক ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, “ওমা! সে কী গো! কী হবে গো!”
সোহম মনে মনে হাসল পুলিশ বলে কয়ে আসছে, সেটা আবার কেউ বিশ্বাস করেছে! সে এবার বলল, “কী আবার হবে? আপনাদের সবাইকে চোরাইমাল লুকিয়ে রাখার জন্যে জেলে পুরে দেওয়া হবে
ও রে বাবু রে! পুলিশ কী বলছে রে!” বলে মহিলা এবার কেঁদে ফেললেন
এমন কপাল, বাবু মানে বাবার বস ঠিক তখনই বাড়িতে এসে ঢুকেছেন তিনি নিজের মার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে, ‘হ্যালো! হ্যালো! কে বলছেন?’ বলতেই সোহম ফোনটা রেখে দিয়েছিল কিন্তু উনি টেলিফোন এক্সচেঞ্জে চেনা একজনকে ফোন করে ফোনটা কোথা থেকে এসেছে জেনে ফেললেন ব্যস, তারপর আর যায় কোথায়! উনি বাবাকে বললেন সবকিছু, আর সোহমের বোর্ডিং স্কুলে যাওয়ার ব্যবস্থা পাকা হয়ে গেল

।। দুই।।

নতুন স্কুলে গিয়ে প্রথম কয়েকদিন সোহম খুবই মনমরা হয়ে রইল বাবা, মা, জিয়া, বন্ধুবান্ধব সবাইকে ছেড়ে একা একা থাকতে কার আর ভালো লাগে? তারপর এই স্কুলের নিয়ম খুব কড়া ভোর ছ’টায় উঠে স্কুলের জন্যে তৈরি হয়ে খাবারঘরে যেতে হয় জলখাবারের পর স্কুল দুপুরবেলা খাবার পর আবার স্কুল ছুটির পর বাগানে কাজ করা, খেলার মাঠ পরিষ্কার করা ইত্যাদি বিকেলে একটু কিছুক্ষণ খেলা তারপর আবার পড়াশোনা রাতের খাবার আর ঘুম আবার সকালে উঠে সেই একরকম ছুটির দিনে কারও মা বা বাবা এসে তাদের বাড়ি নিয়ে যায়
প্রথম সপ্তাহতে সোহমের মা-বাবা কেউ এলেন না, ও সবে ঢুকেছে বলে এমনিতে স্কুলটা বেশ বড়োসড়ো স্কুলবাড়ি আলাদা আর ছাত্রদের থাকার জন্যে একটা আলাদা বাড়ি সেই বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া বড়ো রান্নাঘর আর ডাইনিং হল যেখানে ছাত্রদের রান্না আর খাওয়াদাওয়া এছাড়া খেলার মাঠ, বাগান ইত্যাদি তো আছেই
দিন দুয়েক পর থেকেই ক্লাসে ওর পাশে যে ছেলেটা বসেছিল সেই সৌরদীপের সঙ্গে সোহমের বেশ ভাব হয়ে গেল দীপও ওর মতন দুষ্টুমি করার জন্যে নিউ হরাইজেন স্কুলে এসেছে বেশ চটপটে চালাকচতুর ছেলে সে ক্লাসের অন্য ছেলেগুলোর মতন গম্ভীর চুপচাপ নয় ওর সঙ্গে ভাব হওয়ার পর সোহমের বন্ধু না থাকার দুঃখটা কিছু কমল দীপের আরেক বন্ধু আকাশের সঙ্গেও ওর বন্ধুত্ব হল দীপ মাংস খেতে খুব ভালোবাসে বুধবার আর রবিবার রাতের খাবারে মাংস হয় সেই দিনগুলোর জন্যে হাঁ করে বসে থাকে সে
দুসপ্তাহ বাদে এক শনিবার মা-বাবার সঙ্গে বাড়ি গেল সোহম ভালোমন্দ খেয়ে জিয়ার সঙ্গে খেলা করে আবার সোমবার সকালে ওকে স্কুলে ছেড়ে দিয়ে এলেন বাবা
বাড়ি থেকেই জলখাবার খেয়ে এসেছে বলে সোজা ক্লাসে গেল সোহম দীপের জন্যে চকোলেট এনেছে সে কিন্তু দীপ ক্লাসেই এল না সেদিন একে ওকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল যে দীপের নাকি শরীরটা খারাপ হয়েছে ছাত্রাবাস থেকে কিছুটা দূরে একটা হলুদ রঙের বাড়ি আছে। সেটাই নাকি হাসপাতাল কারও অসুখ করলে যাতে অন্যদের না ধরে যায় তাই তাদের আলাদা করে ওই বাড়িটায় রাখা হয় ওই হাসপাতালেই নাকি আছে দীপ মনটা খারাপ হয়ে গেল সোহমের বেচারা দীপ
কয়েকদিন পর অবশ্য দীপ ফিরে এল ওকে চকোলেট দিতে ও নিল বটে, কিন্তু খুব একটা উৎসাহিত দেখাল না ওকে সেটা দেখে সোহমের কেমন যেন লাগল দীপ তো এই চকোলেট খেতে খুব ভালোবাসে কিন্তু দীপ যেন বদলে গেছে যত দিন যাচ্ছে সোহমের মনে সেই ধারণাই যেন বদ্ধমূল হতে লাগল ওই শরীর খারাপটার পর থেকেই দীপ যেন কেমন একটা হয়ে গেছে ওর ওই প্রাণোচ্ছল দুষ্টু দুষ্টু ভাবটা আর নেই কেমন যেন একটা অন্যরকম চটপটে ভাব তবে সবচেয়ে বেশি বদল হয়েছে ওর খাবারে যে দীপ মাংস খাওয়ার জন্যে হা পিত্যেশ করে বসে থাকত, সে এখন আর মাংস তেমন খেতেই চায় না! কোনওরকমে শুধু ভাত-ডাল খায়, স্যালাডটা খায়, আর মাছ-মাংস দেখলেই ওয়াক তোলে
ওর কী হয়েছে বল তো?” একদিন আকাশকে জিজ্ঞেস করল সোহম
আকাশও দীপের ভালো বন্ধু সেও বেশ চিন্তিত বলল, “কী জানি ওর ওই শরীর খারাপটা হওয়ার পর থেকেই এইরকমটা হয়েছে লক্ষ করছি এর আগেও তো অনেকের শরীর খারাপ হয়েছিল, আর হলুদ বাড়িতে গিয়ে থেকেছে কিন্তু কারও তো এইরকমটা হয়নি সবাই তো দিব্যি মাংস খায়!”
তারপর সেদিন রাতে একটা অভাবনীয় ঘটনা ঘটল প্রতিটা ঘরে চারজন করে শোওয়ার ব্যবস্থা সোহম, দীপ, আকাশ আর রত্নাভ বলে একটা ছেলে এই চারজন একটা ঘরে শোয় সেদিন রাতে কীসের একটা শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল সোহমের চোখ খুলে সে দেখল, দীপ তার খাট থেকে নেমে দরজার দিকে হেঁটে যাচ্ছে ঘরের দরজাটা খুলে দীপ বাইরে চলে গেল কোনও এক অজানা আশঙ্কায় সোহমের বুক কেঁপে উঠল উঠে পড়ল সে আকাশকে ঝাঁকিয়ে ঘুম থেকে তুলল আকাশ চোখ খুলে ‘আঁ আঁ’ করতে যাচ্ছিল, কিন্তু সোহম তার মুখে আঙুল চাপা দিয়ে ওকে থামাল রত্নাভ ঘুমোচ্ছে ওকে জাগিয়ে লাভ নেই সে ফিসফিস করে বলল, “উঠে পড়! দীপ কোথায় একটা গেল আমরা ওর পিছু নেব
এবার আকাশ উঠে পড়ল ওরা দু’জনে পা টিপে টিপে বাইরে গিয়ে যে দৃশ্যটা দেখল তাতে ওদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল দীপ বাগানে বসে পড়ে মুখ নিচু করে মাটিতে গজানো ঘাস তুলে খাচ্ছে! সেই দিনটা ছিল বুধবার রাতে খাবারে মাংস হয়েছিল দীপ তাই কিছুই খায়নি এখন সে বাগানে বসে ঘাস খাচ্ছে! সোহম আর আকাশ ঘরে ফিরে এসে ঘুমের ভান করে পড়ে রইল একটু পরেই দীপ ফিরে এল এসে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল এদিকে সোহম আর আকাশের চোখে তো ঘুম নেই কী যে হচ্ছে! তবে সেইসব ভাবতে ভাবতেই কোনও এক সময় ওরা দু’জনেও ঘুমিয়ে পড়ল
পরদিন ক্লাসে সোহম আকাশকে বলল, “আমার স্থির বিশ্বাস ওই হাসপাতালেই দীপের মাংস না খাওয়ার রহস্যের চাবিকাঠি আছে তুই কখনও গেছিস ওই হাসপাতালে?”
না, আমার তো কখনও তেমন শরীর খারাপ করেনি আর এমনিতেও আমার বেশিদিন হয়নি এখানে তুই আসার কয়েক সপ্তাহ আগেই আমি এসেছি এখানে, আর আমরা আসার কয়েক মাস আগে দীপ
ঠিক আছে, আজকে স্কুলের পর বাগানের আগাছা পরিষ্কার করার কথা আছে আমরা দু’জনে আগাছা সাফ করতে করতে হলুদ বাড়িটার কাছে চলে যাব, আর সুযোগ বুঝে টুক করে ভিতরে ঢুকে দেখব কেমন?”
পারবি না! হাসপাতালের ওই হলুদ বাড়িটার দরজায় সবসময় তালা দেওয়া থাকে প্রিন্সিপাল স্যার বা ডাক্তার আর নার্সরা তালা খুলে ঢোকেন
ও, তাহলে তো মুশকিল! তাও চেষ্টা করতে তো দোষ নেই!”

।। তিন।।

সেদিন বিকেলে আগাছা সাফ করতে করতে দুই বন্ধু হাসপাতালের চারপাশে পাক মেরে দেখল হঠাৎ আকাশ বলল, “ওই যে, ওই যে!”
কী?”
একতলার একটা জানালা খোলা রয়েছে! আমি তোকে কাঁধে করে ওই পর্যন্ত তুলছি তুই যদি ঢুকতে পারিস তাহলে ঢুকে দেখে আয় হয়ে গেলে আবার লাফ মেরে ওই জানালা দিয়েই বেরিয়ে আসবি আমি বাইরে পাহারায় থাকছি দু’জনে ঢোকা যাবে না তাহলে বিপদ হতে পারে
ঠিক আছেবলে সোহম রাজি হয়ে গেল
আকাশের পালোয়ান চেহারা সে অনায়াসেই প্যাংলা সোহমকে ঘাড়ে তুলে জানালা পর্যন্ত পৌঁছে দিল টুক করে জানালা দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল সোহম
ওমা, ওটা একটা রান্নাঘর মতন! মনে হয় যাদের অসুখ তাদের জন্যে রান্না হয় এখানে ভাগ্য ভালো কেউ কোথাও নেই সোহম এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল অস্বাভাবিক কিছুই চোখে পড়ল না সারি সারি ছোটো ছোটো ঘর তাতে প্রতিটাতে একটা করে বিছানা রাখা কয়েকটাতে ছেলেরা শুয়ে রয়েছে কিন্তু কেউ জেগে নেই, সবাই ঘুমোচ্ছে তা ঘুমোতেই পারে শরীর খারাপ হলে তো ঘুম পায় হঠাৎ কাদের কথা শুনতে পেয়ে ভীষণ ভয় পেয়ে সোহম একটা আলমারির পিছনে লুকোল
প্রিন্সিপাল স্যার একজন সাদা লম্বা ডাক্তারদের কোট পরা ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আসছেন
সব অপারেশান সাকসেসফুল এরা শীঘ্রই ক্লাসে ফিরে যেতে পারবে
ঠিক আছে তবে শোনো ডাক্তার, যে পদ্ধতি প্রমাণ হয়ে গেছে সেটাকে বদলাবার চেষ্টা করতে যেও না
কিন্তু স্যার, আপনি বুঝতে পারছেন না! নতুন পদ্ধতিতে বাধ্যতা অনেক বেশি আসবে!”
সেটা তুমি বলছ প্রমাণ তো নেই! উলটে খাওয়াদাওয়া নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে শুনছি ওসব বন্ধ কর!”
সোহম শুনে ভাবল, কী বলছে এরা? দীপের কি কোনওরকম অপারেশান হয়েছে নাকি? সেজন্যেই কি ও বেচারা আর মাংস খেতে পারছে না?
হঠাৎ ডাক্তার আর প্রিন্সিপাল স্যার ভোজবাজির মতন মিলিয়ে গেলেন! মানে এই ছিলেন, এই নেই! কথাও আর শোনা গেল না সোহম আস্তে আস্তে আলমারির পিছন থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক দেখল না, কেউ কোথাও নেই তাহলে ওরা দু’জন গেল কোথায়? হঠাৎ ওর খেয়াল হল মাটিতে একটা চৌকো টাইল একটু আলগা মতন তার মানে ওনারা মনে হয় মাটির নিচের কোনও একটা ঘরে গেছেন আবার লুকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল সোহম একটু পরেই চৌকো টাইলটা সরে গেল, আর ডাক্তার ও স্যার ওপরে উঠে এলেন
ওরা চলে যেতে সোহম ধীরে ধীরে নিচে যাওয়ার দরজাটা খুলল সামনেই নিচে নেমে যাওয়ার সিঁড়ি তলা থেকে একটা আবছা আলো আসছে বেশ ভয় ভয় লাগছিল ওর কিন্তু কৌতূহলের জয় হল সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গিয়ে সোহম একটা ঘরে এসে পড়ল ঘরটাতে কেমন একটা যেন গন্ধ মানে, ভালো গন্ধ নয় নানারকম শব্দও হচ্ছে আবছা আলো চোখ সওয়া হয়ে যেতে আলোর সুইচটা দেখতে পেল সোহম ফট করে আলোটা জ্বালতেই যা দেখল তাতে ওর পিলে চমকে গেল ঘরটায় সারি সারি খাঁচা রাখা! কোনও খাঁচায় ইঁদুর, কোনও খাঁচায় খরগোশ, কোনওটায় গিনিপিগ ইত্যাদি সেজন্যেই ঘরটাতে গন্ধ
সোহম ভাবল, ‘ও, তাহলে এখানে গবেষণা হয়!’ কিন্তু কীসের গবেষণা বা কে করে কিছুই তার মাথায় ঢুকছিল না হঠাৎ পায়ের শব্দ শুনতে পেয়ে চমকে উঠল কেউ সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে! তাড়াতাড়ি আবার লুকিয়ে পড়ল সে আবার কে এল রে বাবা? তারা যতক্ষণ না যাবে সে তো আটকে গেল
এই দেখো, কে আবার আলো জ্বালিয়ে দিয়ে চলে গেছে! ইলেকট্রিসিটির কত বিল দিতে হয় জানো আমাদের? এখানে তো একটা লো পাওয়ারের আলো জ্বলার কথা!”
সোহম লুকোনো জায়গা থেকে শুনে ভাবল, আরে, এটা তো ভাইস প্রিন্সিপালের গলা! আলোটা তো সোহম জ্বালিয়েছিল কিন্তু উনি ভেবেছেন অন্য কেউ জ্বালিয়ে রেখে গেছে! যাক, ভালো
কী আর করা যাবে, স্যার কেউ হয়তো ভুল করে জ্বালিয়ে রেখে গেছে আমি সবাইকে সাবধান করে দেব, এই ভুল যেন আর না হয়
হ্যাঁ, মনে থাকে যেন প্রিন্সিপাল শুনলে সবাইকে ওয়ার্নিং দেবেন!”
না না, স্যার ওই যে বললাম না, আর ভুল হবে না তবে কী, উনিই তো এখুনি বেরিয়ে গেলেন না?”
ঠিক আছে, ঠিক আছে তোমাকে আর স্যারের ভুল ধরতে হবে না নিজের চরকায় তেল দাও নাও, এবার নামগুলো লিখে নাও আর শোনো, আগের মতন ইঁদুরের ব্রেন সেল হলেই ভালো তোমাদের ওসব খরগোশ নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে সমস্যা হচ্ছে ছেলেটা আর আমিষ খেতে পারছে না! সেরকমটা হলে কিন্তু চলবে না সবার মনে সন্দেহের সৃষ্টি হবে প্রিন্সিপাল স্যার ডক্টর সাহার সঙ্গে কথা বলেছেন এই নিয়ে তুমি ওনার কাছে বিস্তারিত জেনে নিও
কিন্তু খরগোশ আপনাদের পছন্দ হচ্ছে না কেন, স্যার? ওরা তো আরও শান্ত প্রাণী বলেই আমরা চেষ্টা করেছিলাম, স্যার ইঁদুরের মধ্যে কিছু হিংস্র ভাব থাকলেও থাকতে পারে কিন্তু খরগোশ তো একেবারেই নিরীহ, স্যার তবে ওই খাবারের ব্যাপারটা আমাদেরই ভুল তবে নিরামিষাশী হলে মন্দ নয় কিন্তু আর চাইলে আমরা কোষিকাগুলোকে...”
থাক, আর পাকামো করতে হবে না অনেক হয়েছে
লুকিয়ে থাকা জায়গা থেকে সব শুনে সোহমের তো রক্ত হিম হয়ে গেল এরা বলে কী? ছেলেদের শান্ত করার জন্যে ব্রেনে ইঁদুর, খরগোশের ব্রেন সেল ঢোকাচ্ছে! ইতিমধ্যে ভাইস প্রিন্সিপাল কয়েকটা নাম বলে চলেছেন আর সামনের জন মনে হয় লিখে নিচ্ছিল, “সৌরভ বসু, রুদ্রশক্তি রায়, আকাশনীল ঘোষ, অর্চিত দে আর সোহম মজুমদার
নামগুলো শুনে সোহম চমকে উঠল সোহম মজুমদার তো ওর ভালো নাম, আর আকাশনীল মানে তো আকাশ! এবার কী হবে? কী ভয়ংকর জায়গা রে বাপু! ওদের এখান থেকে পালাতেই হবে কোনওভাবে!
একটু বাদে ওরা আলো নিভিয়ে দিয়ে চলে গেলেন সোহম তার লুকোনো জায়গা থেকে আস্তে আস্তে বেরিয়ে এল আবছা আলোতে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল সে তারপর যেই না জানালাটা দিয়ে উঠতে যাবে অমনি পিছন থেকে কে একজন বলে উঠল, “এই তুমি ওখানে কী করছ? যাও, গিয়ে বেডে শুয়ে পড়!”
আর কিছু বলার আগেই সোহম এক লাফে জানালা দিয়ে বাইরে আকাশ তখনও নিচেই ছিল ওকে দেখে বলল, “কী হল রে তোর? এত দেরি?”
ও আর কিছু বলার আগেই সোহম চিৎকার করে বলল, “আমাকে দেখে ফেলেছে পালা আকাশ, পালা আমাদের ভয়ংকর বিপদ!”
দুই বন্ধুতে প্রাণপণে ছুটতে শুরু করল কিন্তু কোথায় যাবে? বাইরে যাওয়ার বিশাল গেট তো বন্ধ ওই গেট তো প্রিন্সিপালের অনুমতি ছাড়া খোলে না তাই ওদের বাইরে যাওয়ার কোনও উপায় নেই এদিকে নিজেদের ঘরেও যেতে পারবে না

তখন অন্ধকার হয়ে গেছে আকাশ বলল, “রান্নাঘরের পিছনে একটা আনাজ রাখার ঘর আছে না? চল, সেখানে গিয়ে বসে থাকি
চল, তাই চল!” বলে ওরা দু’জনে রান্নাঘরের পিছনের আনাজ রাখার ঘরটায় গিয়ে লুকিয়ে বসে রইল
আকাশকে সব বলল সোহম আকাশ বলল, “এবার কী হবে? আজ রাত হয়ে গেছে বলে কোনওরকমে বেঁচে গেছি কাল তো নির্ঘাত ধরা পড়ে যাব!”
ভাব দেখ যদি কিছু উপায় থাকে
আকাশ একটু ভেবে বলল, “একটা উপায় পেয়েছি মনে হয় কাল বাজারের দিন দেবুদা খুব ভোরে গাড়ি নিয়ে বাজারে যায় আমরা যদি সকাল হবার আগেই ওই গাড়িতে গিয়ে বসে থাকতে পারি তাহলে ওই গাড়ি করে বেরিয়ে যেতে পারব কিন্তু গাড়ির যদি তল্লাশি হয় তাহলে কিছু করার নেই ওই ঝুঁকিটা নিতেই হবে
সারারাত ওরা দুই বন্ধু আনাজঘরে আলু-চাল ইত্যাদির সঙ্গে লুকিয়ে বসে রইল বাইরে যে এদিক ওদিক খোঁজাখুঁজি চলছে সেটা ওরা ভালোই বুঝতে পারছিল কিন্তু আশ্চর্য! কেউ আনাজঘরে ওদের খুঁজতে এল না

।। চার।।

সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারল না দুই বন্ধু ভোরের আলো ফোটার আগেই ওরা বেরিয়ে দেবুদার ট্রাকে ঊঠে ত্রিপল গায়ে ঢাকা দিয়ে গুঁড়িসুঁড়ি মেরে বসে রইল
একটু পরেই আবছা সূর্যের আলো ফুটতেই দেবুদা হিন্দি গানের কলি ভাঁজতে ভাঁজতে গাড়িতে এসে উঠল গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেটের কাছে এসে দাঁড়িয়ে হাঁক দিল, “আরে শ্যামসুন্দর, গেটটা খোল বাবা! আমি আজ হাটে না গেলে ছেলেপিলেগুলো যে না খেতে পেয়ে মরে যাবে!”
দারোয়ান শ্যামসুন্দর মনে হয় ঘুমোচ্ছিলএকটু পরেই গেটের কাছের ঘরটা থেকে বেরিয়ে এল
এ কী, চোখ লাল কেন? ঘুমোচ্ছিলে নাকি, শ্যামসুন্দর?”
হ্যাঁ, দাদা আর বলবেন না কাল রাতে ওই দুটো ছেলেকে নিয়ে খুব হাঙ্গামা হল অনেক রাত অবধি খোঁজাখুঁজি চলছিল তাই ঘুমোতে পারিনি ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে, তোমার গাড়িটাও পুরো খুঁজে দেখতে বলেছে নাহলে ছাড়তে পারব না বড়োকর্তার হুকুম
আরে বাবা, সেটা কি আমি জানি না নাকি! ভালো করে খুঁজে তবে তো গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছি সেজন্যেই তো আমারও একটু দেরি হয়ে গেল তোমাকে আর কিছুটি করতে হবে না
ঠিক বলছ তো? নাহলে আমার নোকরি যাবে!”
আরে বাবা, ঠিক নয়তো কি ভুল?”
সোহম আর আকাশ বিশ্বাস করতে পারছিল না ওরা ঠিক শুনছে কি না! দেবুদা মিথ্যে কথাটা বলল কেন?
গেট খোলা হতেই গাড়ি সাঁ সাঁ করে ছুটে একেবারে বাজারের কাছে গিয়ে থামল ওরা দু’জন ভাবল, একটু পরে দেবুদা বাজার করতে চলে গেলে তখন ত্রিপলের তলা থেকে বেরিয়ে আসবে কিন্তু তা আর হল না কারণ, উনি নিজেই সোজা এসে ত্রিপলটা তুলে দিয়ে বললেন, “আরে বাবা, আমি সাতবছর ধরে রোজ এই গাড়ি নিয়ে হাটে আসছি গাড়ির প্রতিটা আনাচকানাচ আমার চেনা আমি খুব ভালোরকম জানতাম তোরা ওই ত্রিপলের তলায় লুকিয়ে আছিস যেমন জানতাম কাল রাতে তোরা ওই আনাজঘরে ঘাপটি মেরে পড়েছিলি তবে কী জানিস, আমি পেটের দায়ে এই কাজটা করি বাড়িতে অনেক লোক, মা-বাবা অসুস্থ যাক, সে কথা থাক যা বলছিলাম আমার চোখ কান সবসময় খোলা ছেলেগুলো কীভাবে ম্যাদা মেরে যাচ্ছিল সেটা কি আমি দেখিনি ভাবছিস! তরতাজা ছেলেগুলো স্কুলে এসে কেমন যেন মিইয়ে পড়ত কী করছিল ওরা আমি জানি না, কিন্তু গন্ডগোলের ব্যাপার কিছু চলছিল ওখানে সেটা ভালোই বুঝতে পারছিলাম তোরা পালাতে পেরেছিস যখন পালা আর কখনও ফিরে যাস না বাপু ওখানে
তোমাকে কী বলে ধন্যবাদ দেব জানি না, দেবুদা! কিন্তু আমরা যা দেখেছি তা পুলিশকে বললে স্কুলে পুলিশ যাবে স্কুল হয়তো বন্ধ হয়ে যেতে পারে তাহলে তো তোমার চাকরি চলে যাবে!”
আরে দেবুকে অত কাঁচা পেয়েছিস তোরা? আমি গন্ডগোল আন্দাজ করেই তো অন্য চাকরি খুঁজছিলাম একটা পেয়েও গেছি পরশু থেকে শুরু করববলে দেবুদা ইয়াবড়ো একটা দেঁতো হাসি হাসল, “একটু পরেই এই গাড়ি স্কুলের গেটে নামিয়ে দিয়ে আমিও তো পগারপার হয়ে যাব!”

।। পাঁচ।।

নিউ হরাইজেন স্কুলটা বন্ধ হয়ে গেছে প্রিন্সিপাল, ভাইস প্রিন্সিপাল, ডাক্তার আর অন্য যারা সব ওই চক্রে জড়িত ছিল তারা সবাই জেলে সেসব জেনেও কিন্তু সোহম এখন আর দুষ্টুমি করে না বলা তো যায় না, বাবা আবার কখন রাগ করে ওকে বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দেন আর সেই স্কুলেও যদি নিউ হরাইজেনের মতন ব্যাপার-স্যাপার চলে? না বাবা, ওসব ঝুঁকি নিয়ে লাভ নেই তার চেয়ে লক্ষ্মীছেলে হয়ে থাকা ঢের ভালো।
_____
অলঙ্করণঃ সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী