Showing posts with label চুমকি চট্টোপাধ্যায়. Show all posts
Showing posts with label চুমকি চট্টোপাধ্যায়. Show all posts

গল্প:: ভুলের মজা - চুমকি চট্টোপাধ্যায়


ভুলের মজা
চুমকি চট্টোপাধ্যায়


শুক্রবার এলে ঋকের মনের ভেতর খুশি মাপার যে যন্ত্রটা আছে, সেটার রিডিং একটু একটু করে বাড়তে থাকে। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে যে সে খুশি থাকে না তা নয়, তবে সেসব দিনগুলোতে অনেক ব্যস্ত থাকতে হয় ওকে।
প্রথমেই হচ্ছে স্কুলের কথা। স্কুল মানেই তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠা, চটপট স্নান সেরে গপাগপ খেয়ে নেওয়া, ফটাফট ইউনিফর্ম পরে রেডি হওয়া এবং স্কুলবাসের জন্যে ঝটাঝট বাসস্ট্যান্ডে যাওয়া।
এ তো গেল স্কুল পর্ব। এরপর স্কুল থেকে ফিরে কিছু খেয়েই কোনোদিন ক্রিকেট কোচিং তো কোনোদিন সাঁতার বা কোনোদিন টিউশন স্যারের কাছে পড়া। এসব মিটলে স্কুলের হোমওয়ার্ক করা। দিনটা যেন আলোর গতিবেগে পার হয়ে যায়। ঋক যখন রাত্রে শুতে যায় তখন ওর মনে হয় এবার বড়ো করে শ্বাস নেওয়া যাবে। এতক্ষণ যেন শ্বাস আটকে ছিল।

ঋককে সবাই ভালো ছেলে বলে, কারণ ও বড়োদের কথা শোনে। ঠাম্মা যদি বলে, “ঋকুবাবু, বাইরে থেকে ঘুরে এসে হাত তো ধোবেই, তার সঙ্গে পাও ধোবে, কেমন?” ঋক সেটা শোনে।
বাবা খুব একটা সময় পায় না, তাই ঋকের সঙ্গে যখন দেখা হয় তখন রাত্তির হয়ে যায়। তাই বাবা খুব একটা কিছু বলে না। কেবল পড়ার খবর নেয়। “স্যারের পড়ানো বুঝতে তোর অসুবিধে হয় না তো? কোথাও অসুবিধে হলে বলবি।” কোনোদিন জানতে চায়, “পরীক্ষা কবে থেকে?” একদিন ওর বাবা বলেছিল, “ঋক, সময় পেলে দাবা খেলবি। ব্রেন খোলে এই খেলায়। চিন্তাশক্তি, ধৈর্য সব বাড়ে। আমি তোকে শিখিয়ে দেব।” দাবা খেলা শিখিয়েছে বাবা, কিন্তু কিছু কিছু চাল ঋকের কঠিন লাগে।
ঋকের সব থেকে বেশি কথা হয় মায়ের সঙ্গে। “ঋক উঠে পড়, ঋক স্নানে যা, ঋক খেতে আয়, ঋক স্কুল ব্যাগ গুছিয়ে নে, টিফিন বক্স ঢোকা, ওয়াটার বটল নিয়েছিস? মোজা বারান্দায় মেলা আছে, নিয়ে পরে নে...” সারাদিন চলতেই থাকে মায়ের নির্দেশ। ঋক মায়ের বলা কথাগুলো শোনে। ও দেখেছে, কথা শুনলে বকা খেতে হয় না, কিছু চাইলে পাওয়াও যায়।
ওর বন্ধু সৌমিত বলে, “বাড়িতে সবাই আমাকে বকে। আমার ভাল্লাগে না।”
“কেন বকে?” ঋক জানতে চায়।
“খালি খালি এই কর ওই  কর বলে, সব কি করা যায়? তাই বকে।”
ঋক বলে, “তুই যদি বড়োদের কথা শুনিস, তাহলে আর কেউ বকবে না দেখবি।”

শুক্রবার এলেই যে ঋক খুশি হয় তার কারণ হল, পরের দু-দিন ছুটি। শনিবার আর রবিবার। শনিবারটা খারাপ লাগে না ঠিকই, তবে স্কুল ছাড়া বাকি কাজগুলো থাকে। স্কুল থাকলে যে সময়ে ঘুম থেকে ওঠে, শনিবারও সেই একই সময়ে উঠে পড়ে ঋক। ওর বাবা মর্নিং ওয়াকে যায়, ঋকও যায় সঙ্গে। সেখান থেকে ফেরার পথে ওর বাবা বাজার করে, ঋকও শিখছে কীভাবে সবজি বাছতে হয়, দরদাম করতে হয়। ভালোই লাগে ওর।
বিকেল সাড়ে তিনটেয় সাঁতারে যায় ঋক। এখন আর নভিস নেই ও, বড়ো পুলেই সাঁতার কাটে। সাঁতার কাটতে খুবই ভালো লাগে ঋকের, কিন্তু তার পরে যা খিদে পায়, সেটা সহ্য হয় না ওর। মনে হয় সামনে যা পাবে, তাই খেয়ে নেবে।
এরপর বাড়ি ফিরে অঙ্ক স্যারের কাছে পড়া। স্যার খুব ভালো অঙ্ক করান। কিন্তু ভীষণ রকম ব্যস্ত থাকেন বলে কেবল শনিবার দিনই ঋককে পড়াতে আসেন। টানা দু-আড়াই ঘণ্টা অঙ্ক করান।
অঙ্ক স্যার চলে গেলে মা খেতে দেয়। খাওয়া হয়ে গেলে হোম ওয়ার্ক নিয়ে বসে ঋক। রবিবারের জন্যে কিচ্ছু ফেলে রাখে না ও। রবিবার দিনটা খুব স্পেশাল ওর কাছে। শনিবার তাই ঋকের খুশির রিডিং বেশ উঁচুর দিকেই থাকে।
রবিবার দিনের পুরোটাই ঋকের ইচ্ছেমতো কাটানোর দিন। ওর মা বাবা আগেই বলে রেখেছে, “সোমবার থেকে শনিবার যদি তুই সব কাজকর্ম ঠিকঠাক করিস, তাহলে রবিবারটা নিজের মতো করে কাটাবার পারমিশন দিয়ে রাখলাম। সেই দিন তোর যা ইচ্ছে, যেভাবে ইচ্ছে কাটাস।”
রবিবার তাহলে ঋক কী করে? একটু দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে। বেশি দেরি করে না, তাহলে সুন্দর দিনের অনেকটা চলে যাবে। অন্যদিনের থেকে আধঘণ্টা দেরিতে ওঠে। তারপর ও ছাদে যায়ছাদে অনেক গাছ আছে। ঠাম্মা খুব গাছ ভালোবাসে, নিজে হাতে যত্নও করে। সেই গাছে অনেক রকমের ফুল ফোটে। প্রজাপতি, ফড়িং ঘোরাঘুরি করে। ঋকের ভারি মজা লাগে দেখতে।
রবিবার ঋকের পছন্দমতো খাবার খাওয়ার পারমিশন আছে। তবে দিনে একবারই এবং একই খাবার মাসে একবারের বেশি নয়। ঋক কথা শোনে।  বিরিয়ানি, মিক্সড চাউ, পিৎজা আর ধোসা... এই চারটে পছন্দের খাবার চার রবিবার খায় ঋক। আর যদি কোনো মাসে পাঁচ নম্বর রবিবার পায় তাহলে বোনাস পাওয়া। সেই রবিবার এগ চিকেন রোল খায়।
এ তো গেল খাবারের কথা। রবিবারে আর কী করে ঋক? একটা সিনেমা দেখার পারমিশন থাকে। ওর দেখার উপযুক্ত সিনেমার লিস্ট বাবা করে দিয়েছে। সেগুলোর থেকে একটা করে সিনেমা দেখে ঋক। তাছাড়া, রবিবার যদি ফুটবল বা ক্রিকেটের ইন্টারেস্টিং খেলা কিছু থাকে, বাবার সঙ্গে বসে ঋকও খেলা দেখে। উফ, রবিবারের মজাই আলাদা!
শনিবার রাত থেকেই আনন্দের গুড়গুড়ানি শুরু হয় ঋকের মনে। রবিবার রাতে শুতে যাবার সময় দিনটাকে থ্যাঙ্ক ইউ জানিয়ে পরের রবিবারের অপেক্ষায় থাকে সে।

এর মধ্যে ঋকের পিসি পিসা আর রাকাদিদি এল ওদের বাড়িতে। ওরা লক্ষ্ণৌতে থাকে। ঋকের জন্যে জামা নিয়ে এসেছে। বাবা আর মায়ের জন্যেও গিফট এনেছে। বাড়িতে হই হই। বাবা অনেক রকম মাছ আনছে বাজার থেকে। পিসি যা যা খেতে ভালোবাসে, মা সেসব রান্না করছে। খাওয়াদাওয়া ভালোই হচ্ছে। তবে ঋকের ডেইলি রুটিনে একটু গড়বড় হয়ে যাচ্ছে।
কাল অনেক রাত অবধি গল্প হয়েছে। রাকাদিদির সঙ্গে দাবা খেলতে খেলতে ঋকেরও ঘুমোতে দেরি হয়ে গেছে। নানা রকম আবোল তাবোল স্বপ্ন দেখে যখন ঋকের ঘুম ভাঙল, মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল ওর। ইস, আজ রবিবার!
অন্য সময়ে শনিবার দিনই ও সোমবারের জন্য ব্যাগ গুছিয়ে, ইউনিফর্ম বের করে, জুতো পালিশ করে গুছিয়ে রেখে দেয় যাতে রবিবার ওকে এসব নিয়ে ভাবতেই না হয়। কাল হই হই-এর চক্করে কিছুই করা হয়নি। তাছাড়া কী খাবে না খাবে, কোন মুভি দেখবে, সেও ঠিক করে রাখা হয়নি। আজকের দিনের অনেকটা নষ্ট হবে। মন খারাপ হয়ে যায় ঋকের।
মুখ ধুয়ে ডাইনিং রুমে এসে ঋক দেখল বাবা আর পিসা বসে গল্প করছে। পিসি আর রাকাদিদিকে দেখতে পেল না ও। মনে হয় ঘুমোচ্ছে। ঋক ঠিক করল, আজ ধোসা খাবে। রাকাদিদি যদি খায় তাহলে দুটো আনাবে। এখন খাবার আনানো খুব সহজ। কত অ্যাপ আছে। বাবার মোবাইলে খাবারের দুটো অ্যাপ ইনস্টল করা আছে। তার একটা থেকেই খাবার আনায় ঋক। আজ সকালে ছাদেও যাওয়া হল না ওর। ধুস...।
রান্নাঘরের দিকে গেল ঋক। মাকে জিজ্ঞেস করতে হবে রাকাদিদির জন্যে ধোসা আনবে কিনা। সেখানে গিয়ে দেখল মা আর পিসি গল্প করতে করতে কাজ করছে। মা চিঁড়ের পোলাও করছে। এ বাবা, রবিবার তো লুচি হবার কথা!
“আরে ঋকবাবু যে, গুড মর্নিং!”
“রাকাদিদি কি ধোসা খাবে পিসিমণি?
“একদম খাবে, খুব খুশি হয়ে খাবে। আবার চিঁড়ের পোলাও খেতেও ভালোবাসে রাকা। বৌদি চিঁড়ের পোলাও করছে, তুই খাবি না?
“মা, আজ লুচি করছ না কেন? আজ তো রবিবার।”
“আজ কেন রবিবার হবে, আজ তো শনিবার। কাল লুচি হবে। তোর দিন গুলিয়ে গেছে ঋকুসোনা” মা হেসে উঠল।
আজ শনিবার? মনের মধ্যে কোথাও যেন খুশি-ময়ূরটা পেখম মেলার তোড়জোর শুরু করল। আরেব্বাস! তাহলে তো আজ চিঁড়ের পোলাও খাবে, কাল বিরিয়ানি অর্ডার দেবে। ওহ, কী মজা লাগছে যে বলার না। কিন্তু আজ বাবার সঙ্গে মর্নিং ওয়াকে যাওয়া হয়নি। বাবা কি একাই ঘুরে এসেছে? ওকে ডাকেনি?
“বাবা, তুমি মর্নিং ওয়াকে গেছিলে আজ?
“নাহ, আজ যাইনি। কতদিন পর সায়ন্তনদারা এসেছে, গল্প করছি। আজ তোকেও আর সাঁতারে যেতে হবে না। রাকা বোর হবে।”
“কী মজা, কী মজা... আজ হোমওয়ার্ক শেষ করে, সব গুছিয়ে রেখে রাকাদিদির সঙ্গে দাবা খেলবে। ওহ, আজ বড্ড ভুল হয়ে গেছিল। শনিবারকে ভাবছি রবিবার! ওহ, যেন ডবল মাটন বিরিয়ানি খাচ্ছি মনে হচ্ছে। ভুলেরও মজা আছে।”
“ঋক, রাকাদিদিকে ডেকে নিয়ে খেতে আয়।” মা ডাকছে। লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে রাকাকে ডাকতে গেল ঋক। ভীষণ আনন্দ হচ্ছে ওর আজ।
----------
ছবি - নচিকেতা মাহাত

গল্প:: টাকার গাছ - চুমকি চট্টোপাধ্যায়


টাকার গাছ
চুমকি চট্টোপাধ্যায়

শানদিঘিয়া গ্রামে ঢোকার মুখে যেখানে পাকা রাস্তা শেষ হয়ে যাচ্ছে, সেখানে কে কবে যে একটা নীচু বেদির ওপর গান্ধিজির মূর্তি বসিয়ে রেখেছে, কেউ তা জানে না। মূর্তিটা আদৌ মহাত্মা গান্ধির কিনা তাতেও ঘোরতর সন্দেহ আছে। তবে ন্যাড়া মাথা আর চোখে গোল চশমার কারণে দেখতে অনেকটা সেরকমই লাগে। জায়গাটার নামই হয়ে গেছে গান্ধি মোড়।
ছায়ারানি খুব গান্ধিভক্ত। ছোটোবেলায় বাবার কাছে গান্ধিজির নুন, যাকে ওরা লবণ বলে, তৈরির গল্প শুনে ওর খুব ভালো লাগত। ওর বাবা যা বলত তার সবটা ঠিক না হলেও, খানিক খানিক ঠিকই বলত। ছায়ারানি তাই ছেলের নাম রেখেছিল গান্ধি
গ্রামদেশে কি আর এসব নাম চলে? ওখানে বাচ্চা-কাচ্চাদের খোকা খুকু পুঁটি টেঁপি - এইসব নামে ডাকে। গান্ধি নামটা গ্রামের লোকেদের মুখে মুখে হয়ে গেল গন্ধি, তার থেকে গন্ধ। কোনো মানে হয়, তোমরা বলো!
যাই হোক, কিছু তো করার নেই। ছায়ারানিই কেবল ছেলেকে গান্ধি বলে ডাকত। নামের তো কিছু মাহাত্ম্য থাকে! গান্ধিরও যে বুদ্ধিশুদ্ধি বেশ, তা ওর মা বুঝেছিল। ছায়ারানির দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, গান্ধি বড়ো হয়ে কিছু না কিছু খেল ঠিক দেখাবে। দেশবরেণ্য নেতার নাম কখনও ফেলনা যাবে না।
শানদিঘিয়া গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই হয় বাগানি নয় জেলে। জেলে তো তোমরা জানো, মাছ ধরে যারা। নৌকা নিয়ে জলধর নদে মাছ ধরতে বেরিয়ে পড়ত গ্রামের জেলে যারা। জলধর নদ বয়ে গেছে গ্রামের পশ্চিম ধার ঘেঁষে। এই নদ গ্রামের প্রাণ। অতিবৃষ্টিতে বন্যা না হলে জলধর সব সময়ে গ্রামবাসীর পাশে থাকে। ভারী লক্ষ্মী নদ।
তোমরা ভাবছ, জলধরকে নদ কেন বলছি, নদী কেন বলছি না। জলধর তো ছেলের নাম, তাই নদ। বুঝলে তো। আচ্ছা, এবার বলি বাগানি কাদের বলে। বাগান করে যারা, তারাই হল বাগানি। শানদিঘিয়া গ্রামের অনেক মানুষ বড়ো বড়ো বাগানে গাছ বসায়। ফলের গাছ, ফুলের গাছ, সবজির গাছ।
কারোর কারোর নিজের অনেক জমি আছে, তাতেই বাগান করে। যেমন হারুন আলি। তার অনেক বড়ো জমিতে সে দেদার আমগাছ লাগিয়েছে। কত রকমের আম হয় -- ল্যাংড়া, হিমসাগর, অরুণা, আম্রপালি, মল্লিকা, ফজলি -- বাব্বা, বলতে বলতে হাঁপিয়ে গেলাম! নাম দিয়ে কাম নেই।
এদিকে আবার বসুগোপালের সবজি বাগান। কাঁচালংকা থেকে শুরু করে বেগুন, টমেটো, ঢ্যাঁড়শ, কলমি, পালং, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, চালকুমড়ো... আরও অনেক অনেক সবজি। তেমনি আবার সীমাদিদির ফুলের বাগান। ফুলের রকম আর বলছি না, তোমরা শুনে শুনে হেদিয়ে যাবে।
গ্রামে দুটো পাঠশালা আছে। একটা ব্রজেশ্বর মাস্টারের। আর একটা নারাণ পণ্ডিতের। ব্রজেশ্বর মাস্টারের পাঠশালাটা বড়ো, তাতে অনেক ছাত্রছাত্রী। গান্ধি পড়ে নারাণ পণ্ডিতের পাঠশালায়। এইটা ছোটো, ছাত্র কম। কম ছাত্র বলে নারাণ পণ্ডিত যত্ন করে পড়া
পড়াতে পড়াতে নারাণ পণ্ডিত গল্প বলেন। গল্প শুনতে কে না ভালোবাসে। খুব মন দিয়ে গল্প শুনছিল গান্ধিগল্পের মধ্যে টাকার গাছকথাটা এলকেউ একটা বলছে, আরে আমার কি টাকার গাছ আছে নাকি? এইখানেই একদম থমকে গেল গান্ধিবিষয়টা মাথার মধ্যে গেঁথে গেল ওর।
পাঠশালা ছুটি হয়ে গেল। এখনই বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে না গান্ধির। কোনো একটা বাগানের পাশ দিয়ে বেশ কয়েক পাক চক্কর মেরে তবে ঘরে ফেরে ও। হারুনচাচা থাকলে ওকে ভেতরে ঢুকিয়ে নেয়। দু-একটা আমও দেয় হাতে। লুকিয়ে নিয়ে যেতে বলে। নাহলে অন্যদেরও দিতে হবে।
আজও একবার হারুনচাচার বাগানের দিকে গেল গান্ধিচাচা থাকলে টাকার গাছের ব্যাপারটা একবার জিজ্ঞেস করবে। ওখানে যেতে গিয়ে দেখা হয়ে গেল ওদেরই পাঠশালার এক ক্লাস উঁচুতে পড়া লোকমানের সঙ্গে। সঙ্গে আরও দুটো ছেলে ছিল যাদের গান্ধি চেনে না।
লোকমান জিজ্ঞেস করল, “কী রে গন্ধ, এদিক কোথায় যাচ্ছিস? তোর বাড়ি তো এদিকে নয়?”
হারুনচাচার বাগানে যাচ্ছি।”
বাগানে ঢুকতে দেয় তোকে?”
না, বাইরে থেকে দেখি,” বুদ্ধি করে বলল গান্ধি
বাগান দেখে কী করিস?”
গাছ দেখতে ভালো লাগে আমার।”
যাস না, তোর গন্ধে গাছ পালাবে।” বলেই হ্যা হ্যা হাসিতে ফেটে পড়ে লোকমান। সঙ্গের ছেলে দুটোও হাসতে শুরু করে। মন খারাপ হয়ে যায় গান্ধির। সোজা না গিয়ে জলধর নদের দিকে হাঁটা দেয় সে। নদের পাড় থেকে ভাঙা টালির টুকরো কুড়িয়ে নিয়ে জলের সমান্তরালে ছুঁড়ে দিতেই ব্যাঙের মতো লাফাতে লাফাতে চলল সেগুলো। এটা খুব পছন্দের খেলা গান্ধির। তারপর বাড়ির পথ ধরল।
ওদের কুঁড়ের সামনে অল্প একটু ফাঁকা জমি আছে। সেটা কাদের জমি তা জানে না ওর বাবা মা। তাই একটা ঘরে খুব কষ্ট করে থাকতে হলেও ঘরটা বড়ো করার চেষ্টা করে না গান্ধির বাবা। তাছাড়া বাবা তো কাজের জন্য বছরের দশমাসই বাইরে থাকে। মা-ছেলের চলে যায় কোনোরকমে।
গান্ধি ঠিক করল, ওই ফাঁকা জায়গাটায় টাকার গাছ পুঁতবে। গাছ লাগালে নিশ্চয়ই কেউ বকাঝকা করবে না। আর যদি তাতে টাকা ফলে, তাহলে তো কথাই নেই। ওদের নিজেদের কষ্ট শুধু নয়, আশপাশের যত্ত মানুষ কষ্টে আছে, সবাই ভালো থাকতে পারবে। এখন কথা হচ্ছে, টাকার গাছ পুঁততে হলে তো টাকা দরকার। সে কোথায় পাবে গান্ধি?
মাকে যদি ওর ভাবনার কথা বলে, মা ঠাস করে একটা চড় লাগিয়ে দিয়ে বলবে, “মশকরা হচ্ছে! বেরো এখান থেকে।” মা বেশ রাগিতাহলে? কেউ যদি একটাকার কয়েন দিত তাহলেই কাজটা শুরু করতে পারত গান্ধিমনটা খারাপ হয়ে গেল ওর।
বাবা কবে আসবে চিন্তা করতে লাগল গান্ধিমাকে জিজ্ঞেস করতে হবে। এতে নিশ্চয়ই মা রেগে যাবে না। জিজ্ঞেস করতে ওর মা বলল, আর দিন পনেরো বাদেই তো আসার কথা। স্বস্তি পেল গান্ধি
পনেরো দিনের একদিন আগেই এসে গেল গান্ধির বাবা। আসার সময় প্রতিবারই হাতে করে ছোটোখাটো জিনিসপত্র নিয়ে আসে। গান্ধির জন্য এবারে একটা বাঁদর টুপি আর একটা কাবলি জুতো এনেছে। শীতে মাথা কান ঢাকা থাকলে ঠান্ডা কম লাগে। জুতোটাও অনেক পুরোনো হয়ে গেছে। বাবা ঠিক বুঝতে পারে গান্ধির কোনটা দরকার।
গান্ধি খুশি হল কিন্তু তক্কে তক্কে থাকল বাবার মেজাজ বুঝে একটা কয়েন বাগাবার। সন্ধেবেলা বাবা যখন মুড়ি-আলুর চপ খাচ্ছে, তখন গুটিগুটি বাবার পাশে গিয়ে বসে গান্ধিও জানে, বাবার সব থেকে প্রিয় খাবার এটা। এখন বাবার মেজাজ ভালোই থাকবে।
বাবা, আমাকে একটা জিনিস দেবে,” প্রায় ফিশফিশ করে বলে গান্ধি যাতে মায়ের কানে না যায়।
ছেলে কোনোদিন কিচ্ছু চায় না। আজ এই আবদার শুনে একটু থমকে গেল ওর বাবা। তারপর বলল, “কী চাই বল। সাধ্যে কুলোলে নিশ্চয়ই দেব।”
আমাকে এক টাকার একটা কয়েন দেবে?” অবাক হয়ে যায় গান্ধির বাবা। এক টাকার কয়েন দিয়ে কী করবি রে?” ছেলে চুপ করে আছে দেখে আর কিছু জিজ্ঞেস না করে উঠে গিয়ে শার্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে এক টাকার একটা কয়েন বের করে এনে গান্ধির হাতে দেয়। আনন্দে চকচক করে ওঠে গান্ধির চোখ। ওর বাবা ছেলের আনন্দ দেখে হেসে ফেলে।
আজ গান্ধির ফুর্তিই আলাদা। পাঠশালা থেকে ফিরে পান্তা খেয়ে হাতমুখ ধুয়ে উঁকি দিয়ে দেখে, মা পাশ ফিরে ঘুমোচ্ছে। বাবা মন্ডল জ্যাঠামশাইয়ের কাছে গেছে। ওর বাবা রঙের মিস্ত্রিমন্ডল জ্যাঠামশাই প্রথম কাজ দিয়ে পাঠিয়েছিল ভিনরাজ্যে। এখনও বিভিন্ন রাজ্যে ঘুরে ঘুরে সেই কাজই করে। গ্রামে এলে মন্ডল জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে অবশ্যই দেখা করতে যায় ওর বাবা।
গান্ধি কয়েনটা আর একটা কঞ্চি নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল বাইরে। ফাঁকা জমিটায় একটা বড়ো বাবলা গাছ আছে। তারই নীচে উবু হয়ে বসে কঞ্চি দিয়ে মাটিতে একটা গর্ত করল। কয়েনটা তার ভেতর যত্ন করে বসিয়ে ওর মনে হল, একটু জল দেওয়া দরকার। উঠে দৌড়ে ঘরে গেল জলের বোতল আনতে। ফিরে এসে গর্তে মাটি চাপা দিয়ে খানিকটা জল ছিটিয়ে দিল। মনে মনে বলল, “গাছ হ, গাছ হ।” তারপর বাকি জল দিয়ে হাত ধুয়ে ঘরে ঢুকে গেল। মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছে আজ। বাবলা গাছের নীচু ডালে বসে থাকা কাকটা যে হাসল সেটা আর বুঝতে পারল না গান্ধি
রোজই দু-তিন বার করে জায়গাটা দেখে যায় গান্ধিজলও দেয় মাকে লুকিয়ে। চার-পাঁচ দিন কেটে গেছে। গাছ বেরোবার কোনো চিহ্ন নেই। মনটা খারাপ খারাপ লাগছে একটু। তাহলে কি গাছ হবে না?
সন্ধেবেলা বাবার কাছে বসে গান্ধি জিজ্ঞেস করল, “বাবা, বীজ থেকে গাছ বেরোতে কতদিন লাগে।”
সেটা বীজের ওপর নির্ভর করেকম করে সাত-দশ দিন তো লাগেই। কেন রে?” ওর বাবা বলে।
না, এমনি জিজ্ঞেস করলাম।” স্বস্তি পায় গান্ধিএখনও সময় আছে তার মানে। দেখা যাক।
একটা ভালো কাজের খবর পেয়ে সময়ের আগেই চলে গেল গান্ধির বাবা। বাবা চলে গেলে ওর একটু মনখারাপ হয় তবে এবার মনোযোগ গাছের দিকে হওয়াতে অতটা মনখারাপ হয়নি।
দশ দিন পেরিয়ে গেল। গান্ধি এবার হতাশ হতে শুরু করেছে। ধুর, টাকার গাছ আর হবে না। এই গাছ হলে তো সবাই লাগাত, কেউ কি ছাড়ত? নিজের বোকামিতে নিজের ওপরেই রাগ হল ওর।
পরদিন পাঠশালা থেকে ফিরে জায়গাটার দিকে তাকাতেই গান্ধি দেখল ছোট্ট সবুজ কী যেন দেখা যাচ্ছে। হৃৎপিণ্ডটা টগবগিয়ে উঠল ওর। তিন লাফে সেখানে পৌঁছে উবু হয়ে বসে দেখল, ছোট্ট চারা মাথা তুলেছে কয়েন পোঁতা জায়গাটায়। আনন্দে চোখে জল এসে গেল ওর। এই তো টাকার গাছ বেরোচ্ছে!
চারা একটু একটু করে বড়ো হচ্ছে। তার যত্নের কোনো শেষ নেই। জল তো দেয়ই গান্ধিএখন একহাত মতো বড়ো হওয়াতে কঞ্চি জোগাড় করে চারপাশ ঘিরে দিয়েছে সে যাতে গোরু-ছাগলে না খায়।
চারা যখন প্রায় গান্ধির সমান, ঝিরিঝিরি চিকন পাতায় ভরতি, গান্ধির মা একদিন বলল, “ওটা তো তেঁতুলগাছ। বিচি ফেলেছিলি নাকি?”
চুপ করে থাকে গান্ধিমা তো বুঝতে পারছে না যে ওটা টাকার গাছ। পাতাগুলো তেঁতুলগাছের মতো গজিয়েছে বটে, হয়তো বা তেঁতুল যেমন ঝোলে তেমনি টাকা ঝুলবে।
সেদিন রাতে শুয়ে এক আজব চিন্তা ঘিরে ধরল গান্ধিকে। এক টাকা পুঁতেছে বলে সবই এক টাকা ফলবে না তো! তাহলে তো মুশকিল! এই যাহ্‌! ভুল হয়ে গেছে। পাঁচ টাকা বা দশ টাকার কয়েন পোঁতা উচিত ছিল। কিন্তু অত টাকার কয়েন কে দিত ওকে? এক টাকা চেয়েছে বলে বাবা দিয়েছে। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে গান্ধি
দিন পার হয়, বাড়তে থাকে টাকার গাছ। বেশ বড়ো হয়ে উঠেছে এখন সে। বাবলাগাছের ডাল ঠেলে উঠছে। ডালপালা এদিক ওদিক ছড়িয়েছে। রোজই গান্ধি হাঁ করে তাকিয়ে খোঁজে টাকার ফল ধরল কি না। ওর মা নিশ্চিত যে এটা তেঁতুল গাছ।
এরপর এক সকালে গান্ধি অবাক হয়ে দেখল গাছটাতে অনেক ছোটো ছোটো ফল ধরেছে। লাফিয়ে উঠল সে। কিন্তু ফলগুলো লম্বাটে। কত টাকা ওগুলো? টাকা তো এরকম দেখতে হয় না! মাকে জিজ্ঞেস করতে ভরসা পাচ্ছে না।
আর কদিন যেতে না যেতেই ফলগুলো কোনোটা সোজা লম্বা আবার কোনো কোনোটা বেঁকে আধখানা চাঁদের মতো হল। একদম তেঁতুলের মতো দেখতে। ছায়ারানি বলল, “বাবা, অনেক তেঁতুল ফলেছে তো রে গাছটাতে। পেকে গেলে ঘরে কিছু রেখে বাকিটা বাজারে বিক্রি করে দেব।”
গান্ধির খুব খুব মনখারাপ। পুঁতল টাকা আর হল কিনা তেঁতুলগাছ! বিছানায় পাশ ফিরে শুয়ে খানিক কাঁদল গান্ধিপরের দিন ঘুম থেকে উঠতেই সে দেখল মা খুব উত্তেজিত হয়ে বলছে, “ও গান্ধি, কোন জাতের তেঁতুলের বীজ পুঁতেছিলি রে, এত মিষ্টি খেতে! এক দানা নুন-চিনি লাগছে না। খেয়ে দেখ।”
খেল গান্ধিএকেবারে গুড়ের মতো মিষ্টি স্বাদ তেঁতুলের। দারুণ খেতে। সবই তো ভালো কিন্তু টাকা তো আর হল না!
দু-দিন ধরে মা-ছেলেতে মিলে লম্বা কঞ্চি দিয়ে বাড়ি মেরে মেরে প্রচুর তেঁতুল পেড়েছে। কিছুটা বাড়িতে রেখে পরের দিন বাজারে বাকিটা নিয়ে বিক্রি করে এসেছে ছায়ারানিসে নাকি হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে তেঁতুল কিনতে। এক দোকানদার সব তেঁতুল অন্যদের থেকে বেশি দাম দিয়ে কিনে নিয়েছে। কিছু টাকা আরও দিয়ে বায়না করে রেখেছে পরের লটের তেঁতুল নেবে বলে।
কড়কড়ে আটশো টাকা ব্যাগ থেকে বের করতে করতে গান্ধির মা বলে, “কী লাগিয়েছিস বেটা, এ তো টাকার গাছ রে! তুই খাসির মাংস খেতে চেয়েছিলি তো, এই রবিবার নিয়ে আসব।”
গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল গান্ধির। তাই তো, টাকা তো পাওয়া যাচ্ছে তেঁতুল বেচে, তাহলে এভাবেই মনে হয় ভগবান টাকার গাছ দেয়। কিন্তু এই মিষ্টি তেঁতুলের বীজটা এল কোত্থেকে? তখনই তেঁতুল গাছের ডালে বসে থাকা কাকটা বলে ডেকে উঠল।
----------
ছবি - শ্রীময়ী

গল্প:: তুতাইয়ের কপ্পামাসি - চুমকি চট্টোপাধ্যায়


তুতাইয়ের কপ্পামাসি
চুমকি চট্টোপাধ্যায়

এতা খাব না... অ্যাঁ অ্যাঁ... এতা পচা খেতে...
তাহলে আমি খেয়ে নিই, আমার গায়ে জোর হবে, দুষ্টু লোক আমাকে কিচ্ছু করতে পারবে না, তাদের আমি এক ঘুসি মেরে মাটিতে ফেলে দেব। কিন্তু তুতাই পারবে না, ও তো খায় না, গায়ে জোর হবে না। দুষ্টু লোক এলে তুতাই কী করবে তাহলে?”
কপ্পামাসিকে ডাকবে
তুতাইয়ের কথা শুনে হেসে ফেলে কল্পনা। সাড়ে চার বছরের তুতাইকে দেখাশোনা করার জন্য সকাল আটটা থেকে রাত আটটা অবধি কল্পনা থাকে ওদের বাড়িতে।
তুতাইয়ের বাবা অধীপ চাকরিসূত্রে দুবাইতে থাকে। মা নীলাঞ্জনা স্কুলে পড়ায়। তুতাই ছোটো, একা থাকবে কী করে? তাই কল্পনা আসে।
এর আগে অঞ্জু আসত। সে একটু রাগী রাগী ছিল। তুতাই তখন আর একটু ছোটোছোটো বাচ্চারা দুষ্টুমি তো করবেই। তুতাইও করত। খেতে চাইত না, জিনিসপত্র ছুড়ত, বাথরুমে গিয়ে কল খুলে দিত, জল ঘাঁটত। অঞ্জুমাসি রেগে গিয়ে তুতাইকে বকত।
নীলাঞ্জনা স্কুল থেকে ফিরলে তুতাই রোজই বলত, “অন্নুমাসি বকেছে তুতাই একটু আদো আদো কথা বলে, অঞ্জুকে বলত অন্নু। নীলাঞ্জনা অঞ্জুকে জিজ্ঞেস করলে সে বলত, “বকিনি দিদি, একটু চোখ বড়ো করেছি মাত্র। এত ছোটো ছেলেকে কেউ বকে!
প্রতি রাতেই অধীপের সঙ্গে কথা হয় নীলাঞ্জনা আর তুতাইয়ের। তুতাইয়ের একটাই কথা, “বাবি, তুমি কবে আথবে?” এটুকু বলেই দৌড়ে চলে যেত অন্য ঘরে।
নীলাঞ্জনা তুতাইয়ের নালিশের কথা অধীপকে জানালঅধীপ বলল, “রোজই যখন এক কথা বলছে তুতাই, তখন কিছু তো সত্যি বটে। এক কাজ করো, বাড়িতে সিসি টিভি লাগাও। তোমার ফোনের সঙ্গে কানেক্ট করা থাকবে। তুমি অফিসে বসেই বাড়িতে কী হচ্ছে, সব দেখতে পাবে
গুড আইডিয়া! কিন্তু কাকে বলব এ ব্যাপারে সেটা তো ঠিক জানি না,” নীলাঞ্জনা বলল।
সে নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। আমার বন্ধু অর্ক সিকিয়োরিটি অ্যাপলায়েন্সের ব্যাবসা করে। আমি কালকেই ওকে বলে দিচ্ছি। ও গিয়ে লাগিয়ে দেবে
তুতাইদের বাড়িতে বসে গেল ক্যামেরা। নীলাঞ্জনার ফোনের সঙ্গে কানেক্ট করে দিল। অফিসে বসেই নীলাঞ্জনা বাড়িতে কী হচ্ছে, সবটাই নজর রাখতে পারে।
তুতাই যে মিথ্যে মিথ্যে বলেনি, সেটা কদিনেই বুঝে গেল ওর মা। এমনকি, একদিন তো গালে চড় মারতেও দেখল নীলাঞ্জনা।
সেদিন রাত্রে অধীপ যখন ফোন করল, নীলাঞ্জনা বলল, “অঞ্জু তুতাইকে মারে। আমি তো সারাক্ষণ নজর রাখতে পারি না, কাজ থাকে। অফিসে গিয়েই একবার দেখি, টিফিন আওয়ারে একবার দেখি আর মাঝে কখনও সময় পেলে একটু দেখি। এটুকুতেই যা বোঝার বুঝেছি। একে রাখা যাবে না
ইমিডিয়েটলি ছাড়াও। সেন্টারে কথা বলো। দরকারে তুমি তিন-চার দিন ছুটি নিয়ে নাও। তার মধ্যে নিশ্চয়ই একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে
সে তো হবে, কিন্তু সে-ই বা কেমন হবে কে জানে
সেন্টার থেকে পাঠাল কল্পনা সাহাকে। কল্পনা উচ্চারণ করতে পারে না তুতাই, বলে কপ্পামাসি। স্কুলে যাবার জন্য তুতাইকে রেডি করে দেয় ওর মা, কল্পনা গিয়ে ওকে স্কুলবাসে তুলে দেয়। তার পরেই অফিস বেরিয়ে যায় নীলাঞ্জনা।
সাড়ে বারোটায় স্কুল থেকে ফেরে তুতাই। কল্পনা গিয়ে নিয়ে আসে। তারপর চান করিয়ে দেয়, খাইয়ে দেয় আর ঘুম পাড়িয়ে দেয়। ব্যাপারগুলো শুনতে যত সহজ, আদতে কিন্তু তত সহজ নয়। কারণ, তুতাই খেতেও চায় না, ঘুমোতেও চায় না কেবল চান করতে গেলে বেরোতে চায় না। জল ঘাঁটতে খুব ভালোবাসে তুতাই।
নীলাঞ্জনা তো কল্পনাকে নিয়েও চিন্তায় ছিল। অফিসে গিয়ে কাজে মন দিতে পারত না। মাঝে মাঝেই মোবাইল খুলে বাড়ির হালচাল দেখত। দশ দিন পেরিয়ে গেছে, তেমন কোনো খারাপ জিনিস চোখে পড়েনি। বরং তুতাই কল্পনার কথা শুনছে বলেই মনে হয়েছে।
স্কুল থেকে ফিরে জামাকাপড় ছেড়েই চান করতে দৌড়োয় তুতাই। কল্পনা আগেই বাথরুমে জামা প্যান্ট রেখে আসে। চান হয়ে গেলেও তুতাই বলে, “আর একতু চান করি না কপ্পামাসি কল্পনা বলে, “শিগগির খেয়ে নেবে চলো তুতাইবাবা, নাহলে একানড়ে এসে তোমার খাবার খেয়ে যাবে
একনলে কে?”
সে আছে এক লুভো রাক্ষস। বাচ্চাদের ভালো খাবারের খোঁজ পেলেই টুক করে এসে খেয়ে নেয়। আজ আবার মাগুর মাছ আছে তো! এক্ষুনি এসে পড়বে। চলো চলো
তুতাই খেতে বসে। কল্পনা একটু ভাত সবজি দিয়ে মেখে দেয়, একটু ভাত ডাল দিয়ে আর একটু ভাত মাছের ঝোল দিয়ে মেখে মাছ বেছে পাশে রেখে দেয়। তুতাই এক গ্রাস ভাত মুখে নিয়ে টোপলা বানিয়ে বসে থাকে। কল্পনা বলে, “এই রে, ওই শব্দ পাচ্ছি একানড়ের। তুতাইবাবার খাবার খেতে আসছে
ভাতের দলা গিলে তুতাই জিজ্ঞেস করে, “কই?”
ওই যে ভোঁ ভোঁ আওয়াজ হচ্ছে, তুমি শুনতে পাচ্ছ না? একবার কী হয়েছিল জানো? তোমার মতো একটা বাচ্চা খেতে চাইত না। খাবার পড়ে থাকত। একদিন ওর মা দেখে থালায় খাবার নেই। ছেলে খেয়ে নিয়েছে ভেবে খুব খুশি হয়েছে মা। কিন্তু বাচ্চাটা দিন দিন রোগা হয়ে যাচ্ছে, গায়ের জোর কমে যাচ্ছে। আসলে ও তো খাচ্ছে না, সবই তো একানড়ে খেয়ে নিচ্ছে
আমার গায়ে জোল আছে,” বাইসেপে হাত দিয়ে দেখায় তুতাই। কল্পনা বলে, “আরে তুতাই তো ভালো ছেলে, ও তো নিজের খাবার সব খেয়ে নেয়। একানড়ে পারবেই না ওর সঙ্গে
এক ঘুসি মালব একানলেকে,” শেষ গরাসটা মুখে ঢুকিয়ে তুতাই বলে। এক মিনিটের জন্য মোবাইল খুলে দেখে নেয় নীলাঞ্জনা, তুতাইকে নিয়ে বিছানায় যাচ্ছে কল্পনা। তার মানে খাওয়া হয়ে গেছে।

এক একদিন তুতাই খুব বায়না করে। আজ স্কুল থেকে ফেরার পর ক্রমাগত ঘ্যানঘ্যান করেই যাচ্ছে, “ঘোলা নেব, ঘোলা দাও
কল্পনা বুঝতেই পারছে না তুতাই কী চাইছে। নীলাঞ্জনা এর মধ্যে একবার ফোন করেছিল। তুতাই কাঁদছে কেন জানতে চাইছিল। কল্পনা বলে, “কিছু একটা চাইছে যেটা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আপনি কথা বলবেন দিদি? এই নিন
তুতাই, তুমি কাঁদছ কেন?”
ঘোলা নেব। ঘোলা দাও,” কাঁদো কাঁদো গলায় বলে তুতাই।
আচ্ছা। তুমি কপ্পামাসিকে ফোনটা দাও
কল্পনা ফোন ধরে
কল্পনা, ও ঘোড়া চাইছে। নিশ্চয়ই ফেরার সময়ে রাস্তায় দেখেছে। একটু ম্যানেজ করে নাও, কেমন?”
আপনি চিন্তা করবেন না দিদি ফোন রেখেই কল্পনা তুতাইকে বলে, “চান করে নিয়ে চলো আমরা একটা মজার জিনিস দেখব। তাড়াতাড়ি চলো, বাথরুমে যাই মজার জিনিস দেখার কৌতূহলে চুপ করে যায় তুতাই।
চান করিয়েই তুতাইকে কোলে নিয়ে ছাদে চলে যায় কল্পনা। যাবার আগে হাতে করে অল্প খানিক মুড়ি নিয়ে নেয়। ছাদে উঠে পুব দিকের পাঁচিল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নিচে কার্নিশের দিকে তাকাতেই কাঠবেড়ালিটাকে দেখতে পায় কল্পনা। রোজই এখানে ঘোরাফেরা করে দুটো তিনটে কাঠবেড়ালি। কাপড় মেলতে গিয়ে দেখেছে কল্পনা।
এই দেখ তুতাইবাবা, কাঠবেড়ালি। দেখেছ কী সুন্দর ল্যাজ! কাঠবেড়ালিটা ওদের দেখেই সরে গেছিল। কল্পনা কার্নিশে মুড়ি ছড়িয়ে ডাকল, আয় আয়, খাবি আয় কল্পনার কথা শুনে তুতাইও বলল, “আয়, আয়
কাঠবেড়ালিটা মুড়ি দেখে একটু একটু করে এগিয়ে এসে খেতে শুরু করে। আরও একটা কাঠবেড়ালি এসে যায়। সেও খেতে শুরু করে। তুতাইয়ের খুশি আর ধরে নাহাততালি দিয়ে ওঠে। ভুলে যায় ঘোড়ার বায়না।
নীলাঞ্জনা অফিস থেকে ফিরতেই তুতাই হই হই করে বলে ওঠে, “মাম, কাতবেলালি দেখেছি! মোতকা ল্যাজ ছেলের কথা শুনে হেসে ফেলে নীলাঞ্জনা। কোলে তুলে আদর করে। সানডে আমাকে দেখাবে তো?” বড়ো করে ঘাড় নাড়ে তুতাই।
এভাবেই ফুল চিনিয়ে, প্রজাপতি দেখিয়ে, মেঘের মধ্যে নানা ছবি দেখিয়ে, পাতার ওপর বৃষ্টির ফোঁটা দেখিয়ে, পাখি চিনিয়ে তুতাইয়ের অনেক বায়না সামলে দেয় কল্পনা।
রবিবার নীলাঞ্জনা বাড়ি থাকে বলে কল্পনা ছুটি পায়। ইদানীং নীলাঞ্জনা খেয়াল করেছে, কল্পনা না এলে একটু ছটফট করে তুতাই। ভাত খাবার সময় গল্প শুনতে চায়। সারা সপ্তাহ অফিস করে ক্লান্ত থাকে নীলাঞ্জনা। তাও চেষ্টা করে গল্প বলার। তুতাই সন্তুষ্ট হয় না বিশেষ।
এই গল্প না, একানলের গল্প। কপ্পামাসি জানে। কপ্পামাসিকে দাকো না
নীলাঞ্জনা বুঝে পায় না সেটা কী গল্প!
আর দুসপ্তাহ বাদেই খ্রিস্টমাসের ছুটি। অধীপ আসছে। খ্রিস্টান মিশনারি স্কুল বলে তুতাইয়েরও টানা ছুটি থাকে। বছরের এই সময়টাতেই ওরা বেড়াতে যায়। এবার ওরা যাচ্ছে ঈশ্বরের নিজের দেশে মানে, কেরালায়।

বাবাকে দেখে মহা খুশি তুতাই। অধীপ ওর জন্য নানারকম আধুনিক খেলনা এনেছে। কথা নকল করা টিয়াপাখি, হামাগুড়ি দিতে দিতে পড়ে গিয়ে কাঁদতে থাকা বাচ্চা, আইসক্রিম বিক্রি করা গাড়ি যাকে গিভ মি অ্যান আইসক্রিম বললেই ভেতর থেকে একটা আইসক্রিম কোন ধরা হাত বেরিয়ে আসে এবং আরও অনেক খেলনা। সে সব পেয়েই তুতাই কপ্পামাসিকে দেখাতে বসল।
আইস্কিম চাও, চাও না
আইসক্রিম দাও কল্পনা বলল বটে কিন্তু হাত বেরোল না। খেলনা কেবল ইংরেজি বোঝে। খুব রেগে গেল তুতাই। বাবাকে গিয়ে নালিশ করল, “এতা পচা গাড়ি, কপ্পামাসিকে আইস্কিম দেয়নি। নেব না এতাবাবার দিকে ঠেলে দিয়ে চলে এল তুতাই।
অধীপ নীলাঞ্জনাকে বলল, “কল্পনার সঙ্গে তুতাইয়ের ভালোই র‍্যাপো হয়েছে দেখছি। মহিলা বেশ ভালো
হ্যাঁ, তুতাইকে খুব যত্ন করে। সব থেকে বড়ো কথা, অসম্ভব ধৈর্য আর বুদ্ধি। তুতাইয়ের বায়নাগুলো এমন সুন্দর করে সামলায় যে আমিও তেমন পারি না। বড়ো বড়ো ডিগ্রি থাকলেই হয় না জানো, বোধ থাকাটা খুব জরুরি। আমিও এমন অনেক কাজ করেছি তুতাইকে শাসন করতে গিয়ে, এখন মনে হচ্ছে সেগুলো করা ঠিক হয়নি
অধীপের পাশে বসে রুবিক কিউব নিয়ে খেলছিল তুতাই। অধীপ বলল, “বেটা, তুমি জানো আমরা বেড়াতে যাব? তোমার যা যা হোমওয়ার্ক আছে সব কমপ্লিট করে নিও কেমন। তুতাই ইস আ গুড বয়
কপ্পামাসি যাবে তো?” তুতাইয়ের কথা শুনে অবাক হয় অধীপ। তারপর বলে, “কপ্পামাসির তখন ছুটি থাকবে। কপ্পামাসির তো বিশ্রাম দরকার, তাই না। আমরা ফিরে এলেই আবার কপ্পামাসি চলে আসবে
আমি যাব না, কপ্পামাসির কাছে থাকব আশ্চর্য হয়ে যায় অধীপ। বাবাই মা-কে ছেড়ে কল্পনার কাছে থাকতে চাইছে তুতাই! কথা আর না বাড়িয়ে নীলাঞ্জনার অফিস থেকে ফেরার অপেক্ষায় থাকে।
নীলাঞ্জনা কথা বলে তুতাইয়ের সঙ্গে। সেই এক গোঁ ধরে আছে ছেলে, কপ্পামাসির কাছে থাকব। কল্পনাকে ব্যাপারটা বলাতে সেও খুব সুন্দর করে বোঝায় তুতাইকে। কিন্তু তুতাই নাছোড়বান্দা।
অধীপ নীলাঞ্জনা ঠিক করে, কল্পনাকেও নিয়ে যাবে। তৎকালে টিকিট কাটা হয় কল্পনার। অসম্ভব খুশি হয় তুতাই।
কেরালায় গ্রিন রিসর্টে ওঠে ওরা। গাছপালা, ফুলে ফুলে ভরা চারিদিক। মাঝে মাঝে কটেজ। যেন স্বর্গের বাগান! এসেই তুতাই তার কপ্পামাসির হাত ধরে বেরিয়ে পড়েছে ঘুরতে।
এক ঝাঁক ফড়িং উড়তে দেখে কল্পনা বলে উঠল, “দেখো দেখো তুতাইবাবা, ওগুলো হল ফড়িং। আর ওই দেখো গাছে দুটো বুলবুলি পাখি বসে আছে। আরও অনেক পাখি দেখাব তোমাকে
একটা বিশাল উঁচু সুপুরি গাছকে বেড় দিয়ে উঠেছে বড়ো বড়ো পাতার মানি প্ল্যান্ট। কল্পনা তুতাইকে আঙুল তুলে ওপরে দেখিয়ে বলে, “তুতাইবাবা, ওগুলো কী জানো? ওগুলো হল সুপুরি। পানের মধ্যে দিয়ে খায়। জীবনদাদু পান খায় দেখেছ না?”
তুতাই মাথা উঁচু করে দেখে। তারপর মানি প্ল্যান্ট দেখিয়ে বলে, “এতা?”
এটা হল টাকার গাছ, মানি প্লান্ট। এরা নিজে নিজে বড়ো হতে পারে না, কোনো গাছ বা লাঠিকে জড়িয়ে ধরে বেড়ে ওঠে। বুঝেছ সোনা?”
কল্পনার পা জাপটে ধরে তুতাই, “আমি মানি প্লান্ত, তুমি সুপুলি গাছ শুনেই তুতাইকে কোলে তুলে নেয় কল্পনা। এ কী বলছ তুমি সোনাবাবা! তুমি সুপুরি গাছ, আমি মানি প্লান্ট তো! কল্পনার গলা জড়িয়ে ধরে আছে তুতাই।
আত্মীয়-স্বজনহীন কল্পনা তখন সুপুরি গাছ হয়ে এক শিশুর নিষ্পাপ ঘেরাটোপে বন্দিকটেজের জানলা দিয়ে নীলাঞ্জনা সেই দৃশ্য দেখে ইশারায় অধীপকে ডাকে। নীলাঞ্জনার চোখে জল, অধীপের মুখে অসীম তৃপ্তি।
----------
ছবি - নচিকেতা মাহাত