গল্পের ম্যাজিক:: রহস্য যখন নদীর বাঁকে - অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

রহস্য যখন নদীর বাঁকে

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী


“স্বামী ভবানন্দজি। অদ্ভুত ক্ষমতা, তাই না!” মিলন বলে উঠল।

“হ্যাঁ, এরকম গ্যারান্টি দিয়ে ঈশ্বরদর্শন করানো! ভাবা যায়?”



“আসলে বলাটাই বড়ো কথা নয়, করেও তো দেখাচ্ছেন! যে-ই যায় ওর কাছে সেই তো পালটে যাচ্ছে। এই তো ম্যাজিশিয়ান মল্লিক অনেক হম্বি তম্বি করে গিয়েছিলেন, বলেছিলেন ভণ্ডামি, অপকীর্তি সব ফাঁস করে দেবেন। তা এক মাস বাদে ফিরে এলেন বাবা- বাবা বলতে বলতে। শুনছি ম্যাজিকও ছেড়ে দিচ্ছেন। বাকি সারা জীবন গুরুর বাণী প্রচার করে আর জনসেবায় দিন কাটাবেন বলছেন


“দেখেছো কাগজে ভবানন্দজির ওপর রোজ একটা লেখা থাকবেই। আমার মনে হয় মিডিয়ার সঙ্গেও ওর দারুণ যোগাযোগ আছে

“তা তো হবেই বড় বড় সব নেতা - আমলারা ওনার শিষ্য। আর ওনার কাছে দীক্ষা নেবার জন্যও বিশাল ওয়েটিং লিস্ট। স্বামীজি নাকি কয়েকশো নামের মধ্যে মাত্র কয়েকজনকে বেছে নেন। তাও আবার বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময় ছাড়া দীক্ষা দেন না

“অদ্ভুত তো! তা লোকটাও খুব ভালো শুনেছি। ওনার কথা শুনে তাই তো মনে হয়

“লোক বলিস না বাবা, ওঁরা হলেন মহাপুরুষ,মাসিমা বলে উঠলেন, “আমরাও এক বছর ধরে অপেক্ষায় আছি। কখন স্বামীজি ডাকেন। ভাগ্যে থাকলে হবে

“আমি গত সপ্তাহে ডাক পেয়েছি মাসিমা। আগামী সপ্তাহে যাচ্ছি

বিশ্বজিৎদা বলে উঠল, “ন’ মাস অপেক্ষা করে” আমরা সবাই চমকে উঠলাম। এত বড়ো খবরটা এতক্ষণ বিশ্বজিৎ দা বলেনি।

“সত্যি ভাগ্য করে এসেছিস বিশ্ব। তা না হলে এরকম স্বামীজির কাছ থেকে ডাক পাস,” মাসিমা বলে উঠলেন। আমরাও সবাই তাতে যোগ দিলাম। এই প্রথম আমাদের চেনা কেউ স্বামীজির দর্শন পেতে চলেছে।

তোমরা যারা আমাদের শনিবারের আসর সম্বন্ধে পরিচিত নও, তাদের জানাই প্রত্যেক শনিবার উত্তর কলকাতার রামতনু বোস লেনের এক বাড়িতে আমরা জনা কুড়ি কিশোর কিশোরী জমায়েত হই। বিজ্ঞান, সাহিত্য, মেলা, সিনেমা কোনও কিছুই আমাদের আলোচনা থেকে বাদ যায় না। তা আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় স্বামী ভবানন্দজি। গত এক বছরে তাঁর নাম সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু ভারতে কেন ভারতের বাইরে থেকেও অনেকে ওনার কাছে দীক্ষা নিতে আসেন। স্বামীজির দীক্ষা দেওয়ার পদ্ধতিটাও ভারি অদ্ভুত। প্রায় একমাস ধরে এই দীক্ষা পর্ব চলেহয় বছরের বিশেষ কিছু সময়ে। বেছে বেছে নেন। লক্ষাধিক ভক্তের মধ্যে সামান্য কিছু জন স্বামীজির কাছে দীক্ষা নেবার সুযোগ পায়। আর যারাই ওঁর সংস্পর্শে আসেন তাদের মধ্যে বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বিখ্যাত অ্যাডভোকেট রামকুমার শেষাদ্রি, ই এন  পি সফটওয়্যার সার্ভিসের প্রধান রবি উনি, ক্রিকেটার ভরত শেঠ, হোম মিনিস্টার রাহুল সরকার - সবার মধ্যেই এক বিশাল মিল। এরা সবাই স্বামীজির শিষ্য। স্বামীজির থেকে দীক্ষা নেবার পর এদের কেউ কেউ পেশার থেকে সরে এসে পুরোপুরি জনসেবার কাজে যুক্ত হয়েছেন, কেউ পুরো সন্ন্যাসী হয়ে গেছেন। স্বামীজির কথায় প্রত্যেকের মধ্যেই ঈশ্বর আছেন, আর উনি সেই ঈশ্বর কে খুঁজে পেতে সাহায্য করেন।

“তা বিশ্বজিৎদা তুমি কবে যাচ্ছ? দারুণ এক্সাইটেড নিশ্চয়ই?” রাতুল বলে ওঠে।

“হ্যাঁ তা তো বটেই। তবে এখনও কুড়ি দিন বাকি আছে

“তা তুমি এত ধার্মিক হলে কবে থেকে?” শিশির বলে ওঠে।

“আরে আমি থোড়াই যাচ্ছি সেরকম ভক্ত হতে! আসলে এরকম পরিবর্তন এ ক'দিনের মধ্যে কীভাবে সম্ভব সেই কৌতূহলটাই আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে

“বিশ্বজিৎদা থেকে স্বামী বিশ্বানন্দজি,” অনিলিখা এতক্ষণ চুপ করে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাচ্ছিলো। হঠাৎ করে খোঁচা মেরে দিল।

কটমট করে অনিলিখার দিকে তাকিয়ে বিশ্বজিৎদা বলে উঠল, “আমার ওপর প্রভাব বিস্তার করাটা অত সহজ হবে না। আমার বিশ্বাস এর পেছনে একটা বড় কোনও চক্র কাজ করছে। এই যে চক্রধরপুর - এর কথা আগে কোনও দিন কেউ জানত? এখন শুধু স্বামীজির জন্যই লক্ষ্ লক্ষ্ লোক ওখানে আসতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ইয়ংগার জেনারেশান - চল্লিশের কমবয়সীদের আকর্ষণ করতে পেরেছেন। স্বামীজির প্রভাবে ওই অঞ্চলে হিংসার ঘটনাও কমে গেছে

“তা এতে অস্বাভাবিক কী আছে?”

“অস্বাভাবিক আছে বৈকি! অন্য কোনও গুরু, মুনি-ঋষি যা পারলেন না, হঠাৎ করে ইনি করছেন কী করে? তা ছাড়া আর কোনও গুরুকে নিয়ে এত লেখালেখি হতে দেখেছিস? কাউকে ঘিরে এত বড় বড় নেতাদের ভিড় দেখেছিস? আমার মনে হয় পুরো ব্যাপারটার পেছনেই সরকার আর প্রচার মাধ্যমের প্রত্যক্ষ মদত আছে। আর তা-ই আমার যাওয়া

“তা ওখানে কতদিন থাকতে হবে?”

“একমাস তো থাকতেই হবে। পুরো দীক্ষার প্রসেসটাই চলবে একমাস ধরে। তারপর আমার আরও দিন চার পাঁচ থাকার ইচ্ছা আছে

“তার মানে বিশ্বজিৎদা তুমি বেশ কয়েক সপ্তাহ আর এখানে আসছ না?”

“আমি না থাকলেই বা কী! অনিলিখা তো আছেই। ওর কাছেই গল্প শুনিস তোরা” অনিলিখাকে বিদ্রুপ করার সুযোগ পেলে বিশ্বজিৎদা ছাড়ে না। আজকের বাকি সময়টাও ভবানন্দজি, আর বিশ্বজিৎদা কী ভাবে যাবে, কী প্রস্ততি নেবে - সেসব নিয়ে আলোচনায় কেটে গেল।

(২)

আমরা আবার তিনমাস বাদে শনিবারের আসরে বিশ্বজিৎদাকে ফিরে পেয়েছি। অনিলিখাও আছে। বিশ্বজিৎদা ছিল না বলে যে আমাদের শনিবারের জমায়েত বন্ধ ছিল তা নয়। তবে অনেকটাই স্বাদ হারিয়েছিল। অনিলিখাও এর মধ্যে একদিন এসেছিল। তাই দুই চন্দ্র –সূর্যের অভাবে আমাদের আসর একদমই টিমটিমে হয়ে পড়েছিল। বিশ্বজিৎদা প্রায় একমাস হল ফিরেছে। কিন্তু ফেরার পর থেকে আমাদের আসরে আর আসেনি। তাছাড়া লোকমুখে খবর পেয়েছি ফেরার পর থেকেই বিশ্বজিৎদা নাকি একেবারেই পালটে গেছে। দিনের অনেকটা সময় গীতা-ভাগবৎ পড়ে সময় কাটায়, হালকা কথা বলে না। তাই আরও উদগ্রীব হয়ে বিশ্বজিৎদার অপেক্ষা করছিলাম, যাতে পরিবর্তনটার চাক্ষুষ পরিচয় পাই। ঢোকামাত্রই সে প্রমাণ পেলাম। অন্যদিনের মতো চটিটা ছুঁড়ে না ফেলে হাতে করে সরিয়ে রাখল। সেরা চেয়ারটায় না বসে, ঘরের এককোণে রাখা টুলটার ওপর কুণ্ঠিত ভাবে বসল। আমাদের সবার উত্তেজিত কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করে একবার উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে বুঝিয়ে দিল যে ও আর আগের মতো নেই। ট্রেতে রাখা গরম সিঙ্গারাগুলোর দিকে শীতল দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে চোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। এ যেন অন্য কেউ।

আমাদের অনেক পীড়াপীড়িতে বিশ্বজিৎদা আস্তে আস্তে বলতে শুরু করল, “স্বামীজির সংস্পর্শে এসে আমি এটাই বুঝলাম যে এতদিন কীভাবে আমি নষ্ট করেছি” হাতটা কপালে ঠুকে, চোখ বন্ধ করে প্রণাম করে ফের বলতে শুরু করল, “জায়গাটা খুব রিমোট। আগে তো বলতে গেলে যাওয়াই অসম্ভব ছিল, এখন তাও স্বামীজির আশ্রমের জন্য প্রচুর বাস যায়। যদিও তা কোনও ভাবেই যথেষ্ট নয়। দেরাদুন থেকে বাসে দেড় ঘণ্টার মতো। সাকরি। তারপর সেখান থেকে আশ্রমের বাসই নিয়ে যায়। অন্য কোনও বাস বা গাড়িতে যাওয়ার উপায় নেই। যেদিন পৌঁছলাম তার দুদিন পরে প্রথম স্বামীজির দর্শন পেলাম। একদম আর পাঁচজনের মতো চেহারা। কিন্তু চোখ মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায় যে ইনি সাধারণ নন। একটা অদ্ভুত দীপ্তি, দৃঢ়তা আর প্রশান্তির ছাপ। মুখে সর্বদা স্মিত হাসি। চারপাশের চাঞ্চল্য থেকে যেন কত দূরে। আমাকে দেখে মৃদু হেসে বলে উঠলেন, “কী আবার আমার পরীক্ষা নিতে এসেছিস? তা ভালো, অন্ধ বিশ্বাস ভালো নয়। যাচাই করে নিতে হয়। তবে মনে রাখিস এ তোর নিজেরই পরীক্ষা” কী করে আমার মনের কথা বুঝলেন জানিনা। প্রথম দর্শনেই শ্রদ্ধায় মনটা ভরে উঠল। স্বামীজিকে প্রণাম করে অন্য একটা ঘরে বসলাম। আমারই মতো আরও যারা দীক্ষা নেবে তারা অপেক্ষা করছে। স্বামীজির এক শিষ্য এসে আমাদের সব বুঝিয়ে দিয়ে গেল। আমাদের প্রত্যেকের জন্য একটা জায়গা নির্দিষ্ট আছে, যেখানে বসে আমাদের আরাধনা করতে হবে। প্রত্যেকে শুধু দুটো করে জামা কাপড় সঙ্গে নিতে পারবে। দিনে মোটে একবার খেতে পারব। তাও যৎসামান্য। জলতেষ্টা পেলে পাশের নদী থেকে খেয়ে আসতে হবে। এভাবে একমাস কাটাতে হবে। তবেই নাকি আত্মশুদ্ধি হবে। তারপরে হবে দীক্ষা। মনে মনে হাসছিলাম কে কাকে দীক্ষা দেয়! এরপর তিনজন শিষ্য আমাদের আরাধনার জায়গা দেখাতে নিয়ে গেল। ভেবেছিলাম বোধ হয় কোনও বাড়ির বড় চাতাল হবে। কোথায় কী! পাশেই তোরাই নদী। পাহাড়ি নদী। বাঁক নিয়ে নেমেছে। তারই ঠিক পাশে। চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা। তারই মাঝে খানিকটা উপত্যকা মতো। পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট গুহা। তারই একটাতে আমাকে বসতে হবে। সেটা বড়জোর পাঁচ বাই সাত ফুটের মতো জায়গা। পাথরের ওপর শুতে হবে। আমাদের আর নদীর মাঝে, নদীর ধার বরাবর শ্মশান ঘাট। তবে অনেক পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন। মড়া পোড়ানো হচ্ছে। জায়গাটা দেখে ভয় পাওয়া খুব স্বাভাবিক। তবু চারদিক এত পরিষ্কার, এত সুন্দর পরিবেশ যে কেন জানিনা ভয় লাগছিল না। চারদিকে তাকালেই মনে হয় এটা দারুণ বেড়ানোর জায়গাও হতে পারত।

(৩)

পরের দিন থেকে আরাধনা শুরু হল। কোনও কথা বলার অনুমতি নেই। যখন তখন ধ্যান ভেঙ্গে ওঠাও যাবে না। তবু প্রথমদিন উঠে মাঝে মাঝেই হেঁটে আসছিলাম। মনঃসংযোগ করতে অসুবিধা হচ্ছিল। দূর থেকে ওঁ ধ্বনি, মন্ত্রোচ্চারণ ভেসে আসছে। আমাদের প্রত্যেকের আরাধনার জায়গার মধ্যে প্রায় একশো ফুটের ব্যবধান। সকাল থেকে কোনও খাওয়া নেই। সন্ধেবেলা একজন একটা বাটিতে করে ডাল রুটি দিয়ে গেল। সারাদিনের খিদে কি আর ওতে মেটে? কিন্তু উপায় নেই। এটাই নিয়ম। রাতের বেলায় শুয়ে শুয়ে মনে হচ্ছিল কেন মরতে এখানে এলাম। চারদিকের অন্ধকারের মধ্যে আগুন দেখা যাচ্ছে, মড়া পোড়ানোর। আর নদীর জলের আওয়াজ। মাঝে মাঝে নদীর ধারের মন মাতাল করা হাওয়া। কিন্তু পেট জ্বলছে। প্রথম রাতে একটা মুখরোচক স্বপ্নও দেখে ফেললাম।

খিদের চোটে ঘুম তাড়াতাড়ি ভেঙ্গে গেল। তখনও সূর্য ওঠেনি। হেঁটে নদীর ধার অবধি ঘুরে এলাম। আমাদের গ্রুপে কয়েকজন বিদেশীও ছিল। তাদের একজনকে পথে দেখলাম। আশপাশে যে কটা গাছ দেখলাম কোনোটাতেই কোনও ফল নেই যে খাবো। রোদ একটু উঠতেই গুহায় ফিরে এলাম। ‘গুরুর বাণী’ বলে যে বইটা আমাদের পড়তে দেওয়া হয়েছে বসে বসে তাই পড়তে লাগলামনদীর ধার থেকে মড়া পোড়ানোর ধোঁয়া ভেসে আসছে। তবে আশ্রমের লোকেরাই পুরো ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণ করে, তাই মাঝে মাঝে কাঠ কাটার আওয়াজ ছাড়া আর কোনও আওয়াজ নেই। দুপুরের দিকে নদীর হাওয়ায় আর ক্লান্তিতে খানিকক্ষন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি থালায় মোটা বাজরার রুটি আর ডাল দিয়ে গেছে। খিদের চোটে তা-ই খুব তৃপ্তি ভরে খেলাম। বিকেলের দিকে এক গুরুভাই জানিয়ে গেল যে সন্ধেবেলা নদীর ধারে একটা জায়গায় গীতা পাঠ হবে - আমি যেন যাই। খানিকবাদে সেখানে পৌঁছে দেখি জনাপাঁচেক ভক্ত আগুনকে ঘিরে গোল হয়ে বসে আছে। চারদিকে নিকষ কালো অন্ধকার। তারাখচিত আকাশের নিচে আগুনের আলোয় গীতাপাঠ হচ্ছে। অনির্বচনীয় পরিবেশ।

প্রায় ঘন্টাচারেক গীতা পাঠ হল। তারপর আমরা যে যার মতো গুহায় ফিরে গেলাম। সে রাতে খুব বৃষ্টি হল। সঙ্গে বজ্রপাত। এমন বজ্রপাত আগে দেখিনি। চারদিকের পাহাড় ও গাছগুলো চমকে চমকে উঠছিল বিদ্যু চমকে। ভোরবেলা উঠে দেখি ঠিক সামনেই একটা গাছে বজ্রপাত হয়েছে। গাছের কঙ্কাল বেরিয়ে পড়েছে। চারদিকের বাতাস অনেক হাল্কা লাগছে।

এরকম ভাবে দিনের পর দিন কাটতে লাগল। কোনও বৈচিত্র্য নেই।  কিন্তু অদ্ভুত একটা আনন্দ আছে, একটা নেশা আছে। সারাদিন ধরে গুহায় বসে ধর্মগ্রন্থ পাঠ, দুপুরের দিকে সামান্য আহার। সন্ধেতে বেশির ভাগ দিন সমবেত ভাবে আগুনের ধারে বসে গীতাপাঠ। রাতের অন্ধকারে তারাভরা আকাশ দেখা। নদীর ধারে শ্মশান ঘাটে আগুনজ্বলা দেখা। পাহাড়ে ধাক্কা খাওয়া বাতাসের কানাকানি, নদীর স্রোত আর ঝিঁঝিঁর ডাকের সিম্ফনি শোনা। মাঝে মাঝে ঝড় বৃষ্টির রাতে গুহার কোণে কোনও রকমে পড়ে থেকে বৃষ্টির ছাঁট এড়ানোর চেষ্টা। শরীর অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ল। মনে হয় সবসময় শুয়ে থাকি। মাঝে কয়েকদিন জ্বরও এল নদীর ঠাণ্ডা জলে স্নান করে। ডাক্তার দেখে কিছু কবিরাজী ওষুধ দিয়ে গেল। শুধু আমারই যে এরকম তা নয়, প্রত্যেকের এক অবস্থা। এত কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা খুব কম জনেরই থাকে। তবে আশ্রমের গুরুভাইরা এমনিতে খুব যত্ন নেয়। কারো শরীর খারাপ হলে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসে। বয়স্কদের উপর বিশেষ ভাবে খেয়াল রাখে।

ওখানে একটা জিনিস খুব অদ্ভুত লাগত। এত সুন্দর একটা জায়গায় শ্মশান রেখেছে কেন? ওটাকে আলাদা করে দিতে পারত, অবশ্য এটা ঠিক শ্মশানের এই আগুন দূর থেকে দেখে মন যেন কেমন উদাস হয়ে ওঠে। মনে হয় একদিন তো আমারও ওই দশা হতে চলেছে। এসব কষ্ট তখন অনেক কম লাগে। প্রায় প্রতি রাতেই বৃষ্টি আর সঙ্গে বজ্রপাত। আর সেই বজ্রপাত এত অবিরাম হয় যে সকালে উঠলে অবাক লাগে এই ভেবে যে এত গুলো গাছ রক্ষা পেল কী ভাবে? দিন কুড়ির পর থেকে রোজ ডাক্তার এসে দেখত। ওষুধের সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জেকশানও দিত। ছাব্বিশ দিনের মাথায় শরীর এতটাই ভেঙ্গে পড়ল যে ডাক্তার দুধ খেতে বলল। পরের দিন দুধ খাবার পরই অদ্ভুত ব্যাপারটা হল।

দুধ খাবার পরই মাথাটা কী রকম ঝিমঝিম করে উঠল। হঠা করে মনে হল কেউ যেন আমাকে অন্ধকার পথ দিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে দুরন্ত গতিতে। আর সেই অন্ধকার চিরে হঠা দেখতে পেলাম তীব্র আলো। বাবা মারা গেছেন দশ বছর হল। তাঁকে দেখতে পেলাম। দেখতে পেলাম আমার ছোটমাসিকে যে আমাকে ছোটবেলায় মানুষ করেছে। ছোটমাসিও বছর পাঁচেক হল মারা গেছে। স্কুল থেকে বেরুলেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকত এক অন্ধ ভিখারি, যাকে রোজ আমি টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে পাঁচ পয়সা দিতাম। তাকেও দেখতে পেলাম। দেখতে পেলাম প্রথম স্কুলে যাবার দিন। স্পষ্ট। বাবার হাত ধরে স্কুলের চাতালে দাঁড়িয়ে আছি। মনে হল আমি যেন আমার শরীর থেকে বেরিয়ে এসেছি। ওপর থেকে আমার শরীরটা দেখতে পেলাম। দেখতে পেলাম দূরে নদীর জল। চারদিকে পাহাড়। মনে হল আমার আর কোনও বন্ধন নেই। যেখানে চাই যেতে পারছি। সে এক অদ্ভুত স্বর্গীয় অভিজ্ঞতা। মনে দুঃখের কোনও লেশ নেই, শুধুই স্বার্থহীন আনন্দ। কতক্ষণ এরকম ছিলাম জানিনা। যখন জ্ঞান ফিরল দেখি আমাকে ঘিরে কয়েকজন গুরুভাই দাঁড়িয়ে আছে। নিজেকে সম্পূর্ণ অন্যরকম লাগছিল। মনের মধ্যে কোনও পাপবোধ নেই, নিজেকে নিয়ে চিন্তা নেই, ভাবনা নেই। বুঝলাম যে জন্য এখানে এসেছি, সে উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ হয়েছে। পরের দিন ভবানন্দজি আমাকে দীক্ষা দিলেন। আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, “আর কোনও প্রশ্ন নেই নিশ্চয়! এতদিনে নিজেকে ফিরে পেয়েছিস, যা এবার তা কাজে লাগা। এ সংসার শুধু মিথ্যেয় ভরা। কালকে যা অনুভব করেছিস তাই ঈশ্বর। ঈশ্বর তোর মধ্যেই আছেন,” বলে আমার বুকে হাত ছুঁইয়ে বললেন, “এই এইখানে। এবার অন্যের কাজে নিজেকে লাগা। অন্যের কষ্ট দূর করার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা

একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বিশ্বজিদা বলে উঠল, “আমি এখন বুঝতে পারি কীভাবে আমি জীবনের এতগুলো বছর নষ্ট করেছি। যাই হোক গুরুর কৃপায় এখন আমার উপলব্ধি হয়েছে


“তা তুমি যে জায়গায় গিয়েছিলে সেটা কি শুধুই পাহাড় দিয়ে ঘেরা ছিল? না আলাদা পাঁচিলও ছিল?” এতক্ষণের নীরবতা ভেঙ্গে অনিলিখা হঠা একটা বেখাপ্পা প্রশ্ন করে বসল। জানিনা পাঁচিলের ব্যাপারটা এত দরকারী মনে হল কেন?

বিশ্বজিদা খানিকটা অবাক হয়ে বলল, “হ্যাঁ ঠিক বলেছ। পুরো জায়গাটা প্রায় তিরিশ ফুট উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। তা তুমি আন্দাজ করলে কী করে? আমারও একটু অবাক লেগেছিল। এমনিতেই অত বিচ্ছিন্ন জায়গায় অত উঁচু পাঁচিল কেন! তেমন দামী কিছুও তো নেই

“তোমাদের কি মারা হত?” আবার অনিলিখা প্রশ্ন করল।

বিশ্বজিদা এবার সত্যিই অবাক, “হ্যাঁ অনুমতি নিয়েই পিঠে দশবার করে রোজ বেত মারা হত। স্বামীজির মতে এটা আত্মশুদ্ধি, পুরোনো গ্লানি থেকে মুক্তির জন্য। যাতে মনে অতীতের কোনও অপরাধ বোধ না থাকে

“আচ্ছা, যে দিন সকালে তোমার এই দর্শন হল, তার আগের রাতেও কি বৃষ্টি বজ্রপাত হয়েছিল?”

বিশ্বজিদা খানিক চিন্তা করে বলে উঠল, “হ্যাঁ, তার আগের দিন থেকে দুপুর থেকে প্রবল বৃষ্টি–বজ্রপাত হচ্ছিল। সেদিন সকাল অবধি চলেছিল। আচ্ছা তুমি এসব প্রশ্ন কেন করছ বলতো অনিলিখা?”

অনিলিখা মৃদু হেসে খানিক্ষন চুপ করে রইল, “তোমার যেদিন ওই অনুভূতি হয়েছিল তা খুব একটা সাধারণ দিন নয়। ওই দিনের একটা বিশেষত্ব ছিল — কী জানো?”

“আরে ওই দিনেই তো আমেরিকার ভার্জিনিয়ায় ইউনিভার্সিটিতে পাগল একটা ছাত্র এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে অনেক ছাত্রছাত্রী মেরেছিলো, তাই নয়?” মিলন বলে ওঠে।

শিশির ধমক দিয়ে বলে ওঠে, “থাম তো, তার জন্য কি আর ওই দিন কে বিশেষ বলা যায়?”

অনিলিখার ঠোঁটের কোণে একটু হাসি, “ওটা ওই দিনের বিশেষত্বের একটা প্রকাশমাত্র। মহাকাশবিদ ছাড়া খুব কম লোকেই জানে যে ওই দিনটাতে চাঁদ গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে পৃথিবীর সব থেকে কাছে এসেছিল। অর্থা কী বলতে পারিস?”

“ম্যাগনেটিক ফিল্ডের কিছু ব্যাপার?” রাতুল আমতা আমতা করে বলে ওঠে।

“ঠিক তাই। চাঁদের কাছে আসাটা পৃথিবীর তড়ি চৌম্বক ক্ষেত্রের উপর বিশাল প্রভাব ফেলে। আর তার প্রভাব পড়ে আমাদের মস্তিস্কে

অনিলিখা খানিক থেমে বলে ওঠে, “আমি যা বলতে যাচ্ছি তা বলার সাহস খুব কম লোকেরই আছে। সারা বিশ্বে গুটি কয়েকজন বিজ্ঞানী আছেন যারা এটি জানেন। তারাও এব্যাপারে প্রকাশ্যে কিছু বলবেন না, আর এ তথ্যকে গ্রহণ করতে হলে মনটাকে খোলা রাখতে হবে

মাসিমা অধৈর্য হয়ে বলে ওঠেন, “বলে ফেলো না অনিলিখা। এমন আর কী বলতে চলেছো? বিশ্বজি তো আমাদেরই ঘরের ছেলে

“আমাদের মস্তিস্কের সব থেকে বড় রহস্য হল টেম্পোরাল লোব। এটা মস্তিস্কের দুই ধারে কানের পাশাপাশি থাকে। টেম্পোরাল লোব সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন আছে। তবে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন এই টেম্পোরাল লোবকে উদ্দীপ্ত করলে বিশ্বজিদার যে অনুভূতি হয় ঠিক একই রকমের অনুভূতি হয়। লোকেরা হারিয়ে যাওয়া ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের দেখে, মনে হয় অনুভূতি শরীরের বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে। শরীর কে ওপর থেকে দেখা যায় অনুভব করা যায় একটা বৃহ শক্তিকে, এককথায় আমাদের চেতনাবোধ শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। অ্যালডাক্স হাক্সলে একেই বলেছিলেন মানুষ আর মহাবিশ্বের অচেনা এক বৃহ শক্তির মধ্যে সংযোগকারী মাধ্যম। তা কী করে এই টেম্পোরাল লোব উদ্দীপ্ত হয়? নাইট্রিক অক্সাইডের সাহায্যে। এই নাইট্রিক অক্সাইড তৈরী হয় অক্সিজেন আর নাইট্রোজেনের মিশ্রণে বিদ্যুসংযোগে। অর্থা নাইট্রিক অক্সাইড বাতাসে বেড়ে যায় বজ্র-বিদ্যুপাত হলে। আর তাছাড়া উঁচু জায়গাতে এমনিতেই নাইট্রিক অক্সাইড বেশী থাকে

জয়দীপ বলে ওঠে, “তুমি বলতে চাও বিদ্যুপাত হলে পরেই এই ধরণের অনুভূতি হয়তা হলে তো লোকে আকছার এরকম দেখত।

“না, শুধু নাইট্রিক অক্সাইড তৈরী হলেই যথেষ্ট নয়। নাইট্রিক অক্সাইড বাতাসের থেকে ভারী। দেখতে হবে এই নাইট্রিক অক্সাইড চারদিকে ছড়িয়ে না পড়ে। তাই চারধারে এই পাঁচিল। আর গুহার ভেতরে আরাধনা যাতে নাইট্রিক অ্যাসিডের ঘনত্ব আরও বেশী হয় । এবার আসি শ্মশান প্রসঙ্গে। মৃতদেহ পোড়ালে বা পচলে তা থেকে মিথেন বলে একটা গ্যাস উপন্ন হয় যা মস্তিস্কে প্রভাব ফেলে। বিজ্ঞান আজকে এ কথা বলছে, কিন্তু মুনি-ঋষিরা আগে থেকেই এ কথা জানতেন। তাই তাঁরা গুহায় বসে শ্মশানের কাছে। আর শুধু যে আমাদের দেশেই এই অভ্যাস ছিল তাই নয়। পিরামিড। পিরামিড তো মিশরীয়দের কাছে ছিল একধরনের উপাসনাস্থল। তাই পিরামিডের চার ধারেও অতীতে ছিল উঁচু পাঁচিল যাতে নাইট্রিক অক্সাইড না বেরুতে পারে। কবরখানাও থাকত সব পিরামিডের খুব কাছে

খানিক থেমে অনিলিখা আবার বলে ওঠে, “আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করবি, পৃথিবীর সব ধর্মস্থানই হয় নদীর ধারে যেখানে নদী হঠা করে বাঁক নিয়েছে বা কোনও ঝর্ণার কাছে। কারণ ফ্রি ইলেকট্রন। টেম্পোরাল লোব কে উদ্দীপ্ত করতে আরেকটা অনুঘটক। বুদ্ধের বোধি লাভ করার কথাই ভাবো। বুদ্ধগয়া নৈরঞ্জনা নদীর ধারে। বুদ্ধ এরপর প্রথম ভক্তদের উপদেশ দেন সারনাথে। সারনাথেও যে জায়গা বেছে নিয়েছিলেন তা ছিল নদীর ধারে। এবার, দ্বিতীয় প্রসঙ্গে আসি। উপবাস, নাম মাত্র খাওয়া দাওয়া আমরা অনেক পুজোর দিনেই করি। হয়ত একদিন, আধদিন। এই অভ্যাসটা এসেছে কোথা থেকে? আগের মুনি ঋষিরা দিনের পর দিন না খেয়ে সাধনা করতেন। বিশ্বজি তো তাও কিছু একটা খেত। শরীরের ওপর অত্যাচার, টেনশন, কষ্ট এও তেমন অবস্থার সৃষ্টি করে যাতে টেম্পোরাল লোব সহজে উদ্দীপ্ত হয়। কিছু ধর্মে তো বেত বা ছড়ি দিয়েও মারা হয়। এ সবই প্রস্তুতি। খুব সুস্থ শরীরে টেম্পোরাল লোব উদ্দীপ্ত হয় না

“তুমি এবার বলবে বিশ্বজিদা কে দুধ খাওয়ানো হয়েছিল - তাও বিশেষ উদ্দেশ্যে,” মিলন উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল।

“দুধ তো অবশ্যই ইচ্ছে করে খাওয়ানো হয়েছিল। দুধে থাকে ট্রিপটোফ্যান। ট্রিপটোফ্যান অবসন্ন শরীরের ক্ষেত্রে মস্তিস্কে খুব তাড়াতাড়ি প্রভাব বিস্তার করে। সেরোটনিন নামক এক রাসায়নিক যৌগ তৈরী করে। ঠিক যেমন বুদ্ধকে করেছিল। ঊনপঞ্চাশ দিন উপবাসের পর বুদ্ধ যখন প্রায় মৃত তখন সুজাতা নামক এক বালিকা বুদ্ধকে পায়েস দিয়েছিল, মনে পড়ে সে কথা? পায়েস মানেই দুধ। ট্রিপটোফ্যান যে ভাবে বুদ্ধের ওপর প্রভাব ফেলেছিল, ঠিক তেমনই ফেলেছে বিশ্বজি এর ওপরে। আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। অশোকের পরিবর্তনের কথাই ভাবো। চণ্ডাশোক থেকে ধর্মাশোক। কোথায় হয়েছিল কলিঙ্গ যুদ্ধ? দয়া নদীর ধারে, যেখানে নদী বাঁক নিয়েছে, ধৌলিগিরি পাহাড়ের উপত্যকায়। নাইট্রিক অক্সাইডের মতো ভারী গ্যাসের পছন্দের জায়গা। যুদ্ধে এক লক্ষের মতো সেনা মারা গিয়েছিল। সেদিনও হাজার হাজার চিতা জ্বলেছিলো, তারপরে নেমেছিলো বজ্রবিদ্যুসহ প্রবল বৃষ্টি। সবে মিলে আমরা পেলাম সর্বকালের সেরা সম্রাটকে

“তাহলে তুমি বলতে চাও বিশ্বজিদাও এখন বুদ্ধের মতো হয়ে গেছে?”

“এটাই তো মুস্কিল। মহাপুরুষদের মধ্যে বাড়তি আরও কিছু থাকে এত কিছু সত্ত্বেও যার নাগাল বিজ্ঞান এখনও অবধি পায়নি। আর যাই হোক বিজ্ঞান কোনও দিন ল্যাবরেটরিতে মহাপুরুষ তৈরী করতে পারবে না। তবে এটাও ঠিক সেই সব মহাপুরুষের জীবনেই বড় পরিবর্তন এনেছিল কোনও একটা বিশেষ দিন। সেই দিন, সেই সময়, সেই পরিবেশ, সেই জায়গা ছিল একই রকম যার কথা তোমরাও এখন জেনে গেলে। তবে দেখো এসব কথা অপাত্রে বোলো না। মারধোর খেয়ে যেতে পারো

_________

ছবি দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী

গল্পের ম্যাজিক:: রবিন জেঠুর ক্যামেরা - পুষ্পেন মণ্ডল

রবিন জেঠুর ক্যামেরা

পুষ্পেন মণ্ডল

রবিন জেঠুর ক্যামেরাটা আমার হাতে এসেছিল অনেক গুলি হাত ঘুরে। ইনি বাবার ছোট বেলার বন্ধু ছিলেন মাঝে দীর্ঘ দিন আমাদের সাথে কোন যোগাযোগ ছিল না। তিনি মারা যাবার পর বাবা খবর  পেয়ে এক বন্ধকি দোকান থেকে ক্যামেরাটা উদ্ধার করেছিলেনআসলে তিনি ছিলেন এক ভবঘুরে প্রকৃতির মানুষ। বাবা বললেন,“শুনেছিলাম এই নিকোম্যাটের জুম লাগান ক্যামেরাটি নেপালে এক সাহেবের কাছ থেকে কিনেছিলেন রবিন দা, বছর তিরিশেক আগে। শেষ জীবনে টাকার প্রয়োজনে হয়ত বন্ধক দিতে হয়েছিল

প্রায় দু থেকে আড়াই কেজি ভারিপুরানো আমলের রিল লাগানো সিস্টেম। এখন ডিজিট্যাল যুগে এই ধরনের ক্যামেরা একেবারেই অচল। ম্যানুয়াল সেটিং জুম। ক্যাপ খুলে আইহোলে চোখ রাখতে ভেতরটা ঘোলাটে মনে হল। লেন্সের গায়ে ফাঙ্গাস পড়েছে বোধ হয় কালো কালো ছোপ। বাবা এই পুরানো জিনিসটা কেন বন্ধকি দোকান থেকে ছাড়াতে গেলেন কে জানে? যাই হোক সেটা আসার পর থেকে বুক সেলফের এক কোণে পড়ে রইল অনেক দিন। এবং ক্রমশ স্মৃতির পলিতে চাপা পড়ে গেল।

ঘটনাটা ঘটল আমি স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে ভর্তি হবার পর। বোটানির এক্সকারসানে চার পাঁচদিনের জন্য গ্যাংটক যাব। যাবার দিন ট্রেন ছাড়ার দু ঘণ্টা আগে মৃণাল ফোন করে জানাল যে তার ডি.এস.এল.আর. ক্যামেরাটা গণ্ডগোল করছে। ছবি তোলার পর সেভ হচ্ছেনা। মনে হয় সার্কিটের কোনসমস্যা। দোকানে না দিলে সারানো যাবে না।

আমি আকাশ থেকে পড়লাম, “এখন কী হবে? আমাদের গ্রুপে তো ঐ একটা ভালো ক্যামেরা। কী ছবি নিয়ে প্রোজেক্ট জমা দেব!”

এক্সকারসানের জন্য স্যার পাঁচজন করে এক একটা গ্রুপ করে দিয়েছেন। আমার সাথে আছে মৃণাল, সাহেব, অরিজি আর তন্ময়। সে বলল, “আমিও তো চিন্তায় মরছি। অন্য সবাইকে ফোন করেছিলাম। ওরা বলল অর্ডিনারি ডিজিট্যাল ক্যামেরা ছাড়া কিছুই যোগাড় করা যাবে না। কিন্তু তাতে আর কত ভালো ছবি হবে? দূরের ছবি তো কিছুই আসবে না। তোর কোন চেনা লোকের কাছে ভালো ক্যামেরা পাওয়া যাবে?”
আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “ট্রেন ছাড়তে আর কত বাকি ভাই? এখন কাকে বলব? ব্যাগ গুছানো রেডি। আর কিছু হবে না। ফোন রাখ

বাবা শুনে বললেন, “তুই এক কাজ কর, রবিনদার ঐ পুরানো নিকোম্যাট ক্যামেরাটাই নিয়ে যা। এক সময়ে ঐ ক্যামেরাতেই দারুণ ছবি হয়েছে। আমি দেখেছি। টেকনিক্যালি পুরানো হলেও জাপানী জিনিস তো!”
তা শেষমেশ ঐ ক্যামেরার জন্য আমার লাগেজ আরও আড়াই কেজি ভারি হয়ে গেল। আর মনের মধ্যে থেকে গেল অস্বস্তিক্যামেরাটা তো নিলাম কিন্তু এর ঝামেলা অনেক। এর রিল এখন পাই কোথায়? আর রিল পেলেই হবে না সেটাকে ঠিকঠাক সেট করতে হবে। ফ্ল্যাশ গানের জন্য লাগবে চারটে পেনসিল ব্যাটারি।
রাত্রের ট্রেনে স্লিপার কোচে কলেজের ছেলেমেয়েদের হৈচৈ আর হুল্লোড়ে সে কথা ভুলে গেলাম। পরের দিন সকালে নিউজলপাইগুড়িতে নেমে ব্রেকফাস্ট সেরে বাসে করে সোজা গ্যাংটক। পাহাড়ের রাস্তায় গাড়ি উঠতেই মনটা ডানা মেলে উড়ে গেল দূরে ঝাউগাছ আর শাল, সেগুন, রডোডেনড্রনের জঙ্গলে। তারপর এলো চা বাগানের সারি। সবার হাতে ক্যামেরাপটাপট ছবি তুলছেআমার সম্বল এনড্রয়েড ফোন। জবর জং ক্যামেরাটা পড়ে রয়েছে লাগেজের সাথে বাসের পেটের মধ্যে। কাছে থাকলেও তাতে ছবি তোলা যেত না। রিল নেই। আর বন্ধুরা দেখলে নিশ্চয় টিটকিরি করত

গ্যাংটকে যখন পৌঁছলাম দুপুর গড়িয়ে বিকেল। সন্ধ্যাবেলা লাগেজ থেকে ক্যামেরাটা বের করে কাঁধে ঝুলিয়ে বের হলাম হাঁটতে অনেক গুলি দোকানে খুঁজে শেষে এম.জি.মার্গের এক প্রান্তে এক নেপালি ভদ্র লোকের কাছে পেলাম ফুজি কোম্পানির একটা রিল। বত্রিশটা ছবি উঠবে এতেতিনি নিজেই ক্যামেরাটা খুলে রিল ভরে দিলেন। আর বললেন, এই ধরনের ক্যামেরার ব্যবহার এখন অনেক কমে গেছে। খদ্দের পাওয়া যায় না। তবে জিনিসটা নাকি অ্যান্টিক এখন এর সেকেন্ড হ্যান্ড দামও অনেক। তারপর ব্যাটারি ভরে ফিরলাম হোটেলে। দেখা যাক কাজ কতটা হয়। বন্ধুদের সাথে ফ্ল্যাশ গানে বেশ কয়েকটা ছবি তোলা হল। ডিজিট্যাল ক্যামেরায় যেমন রিওয়াইন্ড করে আগের তোলা ছবি দেখে নেওয়া যায়, এতে সে সুযোগ নেই। রিল পুরো শেষ করে ল্যাবে দিয়ে ওয়াশ করতে হবে। তবে ছবি দেখা যাবে।

বন্ধুদের সাথে হৈহৈ করে কাটল কটা দিন। প্রজেক্টের কাজে প্রতিদিন সকালে গ্যাংটক শহরের পাশে একটা গ্রামে যেতে হচ্ছে। অনেক নীচে দিয়ে বয়ে চলেছে খরস্রোতা ‘রোরোচু’। সেপ্টেম্বরের ঠাণ্ডাটা এখানে বেশ কড়া। আর মাঝে মাঝেই হঠা হঠা বৃষ্টি। শেষ দিনে সেখানে নিরিবিলি জঙ্গলের মধ্যে পাহাড়ের গায়ে একটা ছোট্ট বুদ্ধিস্ট গুম্ফা আবিষ্কার করলাম আমরা। অসম্ভব সুন্দর নৈসর্গিক সেই পরিবেশ। পাথরের গায়ে খোদাই করা তিব্বতি ভাষায় ‘ওম্‌ মণিপদ্মে হুম্‌!’শুধু পাথর নয় গুম্ফার গায়ে, গোল ঘণ্টার উপর, সব জায়গায় লেখা ঐ একই মন্ত্র। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে জুতো খুলে আমরা প্রবেশ করলাম গুম্ফার ভেতরে। চন্দন ধূপের গন্ধে মম করছে। সোনালী রঙের বুদ্ধ মূর্তির সামনে একজন বয়স্ক মোটাসোটা লামা হলুদ রঙের ফতুয়ার উপর লাল কাপড় জড়িয়ে ধ্যান করছেন। চোখ বন্ধ। প্রদীপ আর মোমবাতির আলোয় একটা ভৌতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠা সাহেব “খ্যাঁক খ্যাঁক” করে হেসে উঠল। কী ব্যাপার? ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি সে আঙুল তুলে কিছু একটা দেখার জন্য বলছে। চোখ পড়ল লামার চকচকে ন্যাড়া মাথায় ঠিক ব্রহ্মতালুর উপরে একটা সাদা টিকটিকি চুপ করে বসে আছে। আশ্চর্য!!

“ওটা কি ওনার পোষা টিকটিকি? হিহি.. হিহি..” সাহেব বরাবরই এরকম ফাজিলআমরা সবাই ইশারায় তাকে চুপ করতে বললাম। কিন্তু সে সমানে হেসেই যাচ্ছে।

আমি এর মধ্যে ক্যামেরা বের করে ফ্ল্যাশগানে একটা ছবি তুলে নিয়েছি। চকা করে আলো লাগতে লামা চোখ খুলে তাকালেন সাংঘাতিক সে চাউনি। চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। আমরা তাড়াহুড়ো করে ওকে টেনে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। তাতেও সাহেবের হাসি আর থামছে না। গুম্ফা থেকে বেরিয়ে সরু পাথরের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে দেখলাম লামা বারান্দায় বেরিয়ে আমাদের দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেন ভস্ম করে ফেলবে

গুম্ফাটা পেরিয়ে উত্তর পশ্চিম দিকে পাহাড়ের ঢালে ট্রপিকাল জঙ্গল থেকে আমরা কিছু নমুনা সংগ্রহ করতে গেলামপ্রায় পাঁচ হাজার প্রজাতির গুল্ম পাহাড়ি ফুলের গাছ দেখা যায় এই অঞ্চলেতার মধ্যে অর্কিড, প্রিমুলা, রডোডেনড্রন, বাঁশ, ওক, কনিফার, ফার্ন আর বহু করমের ঔষধি গাছ, সবই আছে। বড় গাছেদের মধ্যে আছে পাইন, ওক, শাল, সেগুন, চেস্টনাট, ম্যাপল প্রভৃতি। নমুনা সংগ্রহের পাশাপাশি আমার ক্যামেরা দিয়ে যথারীতি দরকার মত ছবি তুলে যাচ্ছি। জানিনা আদৌ ছবি গুলি কতটা ভালো উঠছে!

একটা ম্যাকাও প্রজাতির রংবাহারি পাখি চোখে পড়ল। তার ঘন নীল, রক্তিম লাল, গাড় হলুদ রঙে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। যত বার তাকে জুম করে ফোকাস করার চেষ্টা করছি, ততবার সে উড়ে এক গাছের ডাল থেকে অন্য গাছে চলে যাচ্ছে। আমরাও নাছোড়বান্দা হয়ে তার পিছু ধাওয়া করলাম। জঙ্গলের ঢালে এগোতে এগোতে বেশ গভীরে চলে গেলামপ্রফেসার আর বাকি সবাই পিছনে পড়ে রইল।

এদিকের জঙ্গলটা আরও ঘন। নিস্তব্ধ বনে মাঝে মাঝে কাঠঠোকরার ঠকঠক ...ঠকঠক আওয়াজ, কিম্বা “চিহু.. চিহু.. চিহু..” করে অচেনা কোন পাখীর ডাক। পায়ের নীচে বড় বড় ফার্ন আর ঝরা পাতাদের উপর জমা হওয়া শেওলার একটা বিশুদ্ধ বুনো গন্ধ। লম্বা লম্বা গাছেদের মাথা গুলি কুয়াশায় ঢাকাহাঁটতে হাঁটতে অরণ্যের মুগ্ধতা অদ্ভুত নেশার মত গ্রাস করছে আমাদের। পাখীটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। হঠা নামল ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। বড় বড় ফোঁটা বাড়তে লাগল ক্রমশ। এই কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যে বৃষ্টির ফোঁটা গুলি হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছে একেবারেআমাদের কাছে না আছে রেনকোট আর না কোন ছাতা। দিশেহারা অবস্থায় চোখে পড়ল জঙ্গলের মধ্যে একটা কাঠের বাড়ি। সবাই মিলে দৌড়লাম সেই দিকে। মাথাটা তো আগে বাঁচাতে হবে।

ভাঙাচোরা সিঁড়ি দিয়ে দুড়দাড় করে উঠে বারান্দায় দাঁড়ালাম। সবুজ শ্যাওলায় মোড়া কাঠের বাড়িটা বহু আগাছা শিকড় চালিয়ে আরও জরাজীর্ণ করে ফেলেছে। অরিজি ভালো করে নিরীক্ষণ করে বলল, “এটা মনে হয় কোনইংরেজ আমলের তৈরি পরিত্যক্ত বাড়ি” মৃণাল আরও উসাহ দেখিয়ে কাঠের শ্যাওলা ধরা দরজায় জোরসে একটা ধাক্কাদিয়ে গটগট করে ভেতরে ঢুকে গেলবলল, “দেখি কোনসাহেব ভূতকে খুঁজে পাওয়া যায় কিনা!” শব্দ শুনে দুটো বড় বুনো বাদামী রঙের বেড়াল পালালো জানালা দিয়ে লাফ মেরে। “আমি তো এখানে, আমাকে আবার কোথায় খুঁজতে যাচ্ছিস?” সাহেব চেঁচিয়ে জানান দিল। “আরে তোর মত সাহেব নয়, আমি খুঁজছি ইংরেজ সাহেবের ভূত। এই সব পড়ে থাকা পুরানো বাড়িতে মাঝে মধ্যে তাঁদের দেখা পাওয়া যায়।”

ওদের পিছন পিছন ভেতরে ঢুকলাম। ছাদ থেকে ঝুলছে বেশ কটা বাদুড়। স্যাঁতস্যাঁতে কাঠ পচা গন্ধ। মাকড়শার জাল দেয়ালের কো গুলি ছেয়ে ফেলেছে।
তন্ময় বলল, “এটা নিশ্চয়ই শিকারের জন্য কেউ তৈরি করেছিল।”
“হ্যাঁ, হতে পারে। এই অঞ্চলে হিমালয়ান লেপার্ড আগে অনেক ছিল।” সাহেব বিজ্ঞের মত মাথা নেড়ে বলল।
“আরে, তুই তো আগের জন্মে শিকারে আসতিস মনে নেই?” মৃণাল টিটকিরি মারল তাকে।
“বাজে কথা বলবি না।”
অরিজি বলল, “সেই টিকটিকি লামাকে দেখে ওরকম হাসছিলি কেন? টেনে না নিয়ে আসলে সে তোকে ভস্মই করে দিত।”
“অতোই সোজা? আমাকে কি ও পাহাড়ি বোকা হাঁদা ছেলে মনে করেছে, যে কটকট করে তাকালেই ভয় পেয়ে যাব? এই সব ভন্ড সাধুদের আমি খুব চিনি। আমার তো মনে হয় ঐ টিকটিকিটা নকল।”
মৃণাল সাহেবকে সমর্থন করে বলল, “হ্যাঁ হতেই পারে। অসম্ভব কিছু নয়। এই সব অশিক্ষিত লোকেদের বোকা বানানোর কত রকম উপায় যে এরা বার করে।”
আমি বললাম, “ভূতের দেখা পাওয়া যাবে কিনা জানি না। তবে সাপের দেখা পাওয়া যেতে পারে।”
“পাহাড়ি সাপ প্রচণ্ড ক্ষিপ্র আর বিষাক্ত হয় শুনেছি” তন্ময় বলল “এ জায়গা থেকে যত তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাওয়া যায় তত ভালো।”
অরি বলল, “কিন্তু বাইরে তো ঝমঝমে বৃষ্টি। এখুনি তো থামবে না।”
“সাপ শীতল রক্তের প্রাণীএত ঠাণ্ডার জায়গায় থাকবে বলে মনে হয় না। তবে পাইথন জাতীয় সাপ থাকলেও থাকতে পারে।” সাহেব জানাল।
মৃণাল বলল, “সাপেরা পায়ের আওয়াজ বুঝতে পারেআমরা যদি লাফালাফি করি তাহলে তার ভাইব্রেশানে যদি কাছাকাছি কোন সাপ থাকে তাহলে সরে যাবে।” বলেই সে লাফাতে শুরু করল। আর তার দেখাদেখি বাকি তিনজনও লাফাতে লাগল।

কিন্তু ঘটনাটা ঘটল সাংঘাতিক। মেঝেটা পুরো কাঠের পাটা জুড়ে জুড়ে তৈরি। আর পুরানো কাঠে ঘুণ ধরেছিল নিশ্চয়ই। মচা করে একটা পাটা মাঝখান থেকে ভেঙে চোখের পলকে একটা আর্ত চিকার করে সাহেব ঢুকে গেল ভেতরে। আমরাও পরিত্রাহি স্বরে চেঁচিয়ে উঠলাম। নীচেটা অন্ধকার। এমনিতেই মেঘলা দিনে আলো কমআমাদের কাছে টর্চও নেই।
“আ.. আ..” করে ভয়ার্ত চিকার আসছে সাহেবর গলা থেকে।
কাঠের ভাঙা পাটাটা সরিয়ে মৃণাল গলা ফাটিয়ে বলল, “সাহেব, ঠিক আছিস তুই? আমি নীচে নামছি।”
সে যেন কিছুই শুনতে পেল না। চিকার করেই যাচ্ছে। মনে হয় ভয় পেয়েছে খুব। আওয়াজটা আসছে অনেক নীচে থেকে। কাউকে যে ফোন করে সাহায্য চাইব তারও উপায় নেই। দেখলাম আমাদের কারোর ফোনেই কোন টাওয়ার পাওয়া যাচ্ছে না
প্রথমে মৃণাল নামল। তারপর আমি। বাকিদের উপরেই থাকতে বললাম। কাঠের পাটার মধ্যে দিয়ে শরীরটা কোন রকমে গলিয়ে সাবধানে নেমে দেখলাম, বাড়িটার ঠিক নীচে পাহাড়ের গায়ে একটা গুহার মুখশ্যাওলায় এতোই পিচ্ছিল যে মৃণাল পা রাখার সাথে সাথেই শরীরের ব্যালেন্স হারিয়ে সড়া করে ঢুকে গেল ভেতরে। আর আমার জ্যাকেট আঁকড়ে ধরার জন্য আমিও টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেলাম গর্তের মধ্যে। উপর থেকে পড়ার সময়ে মাথাটা গিয়ে লাগল একটা পাথরে। ঝিমঝিম করে উঠল। তারপর ব্ল্যাক আউট।
..... যখন জ্ঞান ফিরল দেখি জল কাদার মধ্যে চি হয়ে শুয়ে আছি। চারিদিকে অন্ধকার। মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা। হাত দিয়ে দেখলাম কানের পাশে রক্ত চিটচিট করছে। সামান্য আলো আসছে উপর থেকে। গুহার মুখটা আনুমানিক তিরিশ ফুটের মত উপরেনীচে থেকে ওঠার কোন উপায় নেই। গা জলকাদা আর শ্যাওলায় মোড়া। অন্ধকারে চোখটা সয়ে যেতে দেখলাম ভেতরের দিকে গুহার একটা পথ ঢুকে গেছে। বাকি দুজন গেল কোথায়? “সাহেব.... মৃণাল...” চিকার করে ডাকলাম। কোন প্রত্যুত্তর নেই। আবার গুহার উপরের দিকে মুখ করে চেঁচালাম, “অরি.... তন্ময়...।” উপর থেকেও কোন সাড়া পাওয়া গেল না। ভয় পেয়ে গেলাম খুব।
ভাবলাম সাহেব আর মৃণালও তো নীচে পড়ে গিয়েছিল। ভেতর দিয়ে কি তাহলে কোন রাস্তা আছে? কিন্তু ওদিকটা খুবই অন্ধকার। পকেট হাতড়ে এ্যনড্রয়েড ফোনটা বের করলাম। দেখলাম এটা কাজ করছে। টর্চ মোডে দিতেই অনেকটা আলো ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। ক্যামেরার ব্যাগটা আমার কাঁধেই ঝোলানো ছিল। সেটা নিশ্চয়ই পাথরের গায়ে ধাক্কা লেগে ভেঙে চুরে গেছে।

ধীরে ধীরে ভেতর দিকে এগোলাম। গুহার হাইটটা কম। মাথা নীচু করে হাঁটতে হচ্ছে। নরম মাটিতে দু জোড়া জুতোর ছাপ স্পষ্ট। তার মানে ওরা এদিকেই গেছে। এ পাহাড় পাললিক শিলায় তৈরি। কাদা মাটি বেশি। কত লক্ষ বছর আগে এই হিমালয় পর্বতমালার জায়গায় টেথিস সাগর ছিল। ইউরেশিয়ান প্লেট আর ভারতীয় প্লেটের সংঘর্ষের ফলে এই চেহারা নিয়েছে। জল পড়ে এই পাললিক শিলাগুলি নরম হয়ে আছেগুহার ভেতরের দিকে যত ঢুকছি, মনে হচ্ছে যেন এটা প্রকৃাতিক গুহা নয়। এই রাস্তা কেউ বানিয়েছে। গুহার উপর নীচে, চারিদিকে মাটি আঁচড়ানোর দাগ। ভালো করে দেখলাম চারটে নখের আঁচড়। এবং সে গুলি বেশ মোটা আর তীক্ষ্ণ সাম্প্রতিক তৈরি হয়েছে এই রাস্তা। যে বা যারা এটা খুঁড়েছে তারা মানুষ বলে মনে হয় নানীচে লক্ষ করলাম চার আঙুল ওলা বড় বড় পায়ের ছাপ। ভয়ে হাত-পা কাঁপছে। একি কোন প্রাগৈতিহাসিক জন্তুর আস্তানা? হিংস্র বা মাংসাশী প্রাণী হলে মৃত্যু অনিবার্য। বেরুনোর  পথ তো একটাই, পিছনে ফেলে এসেছিসেখান থেকে বাইরের সাহায্য ছাড়া উপরে ঠা আমার সাধ্য নয়। অতএব এদিকেই এগোতে হবে। যদি অন্য কোনরাস্তা পাওয়া যায়। ভয়ে ভয়ে এগোলা
বেশ কিছুদূর গিয়ে রাস্তাটা দুভাগে ভাগ হয়ে গেল। চিন্তায় পড়ে গেলাম। কোন রাস্তা ধরব? ডানদিকেরটা দেখলাম সামান্য উপর দিকে উঠেছে। হয়ত এটাই পাহাড়ের গা দিয়ে বের হবার রাস্তা। সবে ভাবছি সেদিকেই যাব এমন সময়ে একটা চিকার! মৃণাল আর সাহেবের গলা। আওয়াজটা ডানদিকের গুহা থেকেই আসছে। পরিত্রাহি স্বরে চেঁচাতে চেঁচাতে হুড়মুড় করে এসে পড়ল ওরা। আমাকে দেখে বলল, “পালা.. পালা..এই দিকে” দৌড়াতে শুরু করলাম তাদের সাথে। দ্বিতীয় গুহায় ঢুকে প্রাণ ভয়ে দৌড়চ্ছি। কী তাড়া করছে পিছনে? সেটা আর জিজ্ঞাসা করা হল নাপিছন দিক থেকে একটা বিদঘুটে কান ফাটানো শব্দে সারা শরীর শিরশির করে উঠল। এরকম ডাক কোন পার্থিব জন্তুর হতে পারে বলে আমার ধারণা নেই। একটা গরম হাওয়া পিছন থেকে এসে ধাক্কা মারছে। অন্ধকারের মধ্যে মাঝে মাঝে মুখ ঘুরিয়ে দেখছি এক জোড়া জ্বলজ্বলে ভয়ঙ্কর লাল চোখহঠা কী মাথায় এলো, হাতের কাছে অন্য কিছু না পেয়ে কাঁধ থেকে ঐ ভারি ক্যামেরাটা খুলে ছুড়ে মারলাম ঐ জ্বলন্ত চোখ লক্ষ করে। 

তারপর অনেকক্ষন ধরে হ্যাঁচোর পাঁচর করে জল কাদা মেখে এঁকেবেঁকে সেই গুহা পথটা ধরে দৌড়ানোর পর সামনে একটা ক্ষীণ আলো চোখে পড়ল। পিছনের আওয়াজটা তখন কমে এসেছে। শেষে একটা ঝোপের মধ্যে দিয়ে বাইরে বের হলাম আমরা। দেখলাম দিনের আলো কমে গেছে আর বৃষ্টিও বন্ধ হয়েছেকিন্তু এ কোন জায়গা? জঙ্গল এখানে অনেকটা ফাঁকা ফাঁকা। পাহাড়ের একদম নীচে। কিছুটা দূরে ছোট বড় পাথরের পাশ দিয়ে কলকল করে বয়ে চলেছে একটা জলস্রোত। চোখে মুখে জল দিয়ে আর অনেকটা জল খেয়ে পাশেই নুড়ি বিছানো তীরে হাঁপিয়ে শুয়ে পড়েছি আমরা। আশা করি এখানে খোলা জায়গায় আর সেই জন্তুটা তাড়া করবে না। আর যদি তাড়া করেও তাহলে আমাদের পালাবার ক্ষমতা আর নেই।
আমি উকণ্ঠার সাথে জিজ্ঞাসা করলাম, “কী জিনিস ছিল ওটা?”
সাহেব ঢোক গিলে বলল, “জানিনা... আমরাও দেখিনি। শুধু ভয়ঙ্কর আওয়াজে আমাদের পিলে চমকে গেছে।”
মোবাইলে দেখলাম সাড়ে ছটা বাজে। এবং ভাগ্য ভালো এখানে টাওয়ার আছে। ফোন করলাম প্রফেসারকে।
“কোথায় তোমরা?” তিনি উকণ্ঠার সাথে জানতে চাইলেন।
বললাম, “পাহাড়ের নীচে নদীর ধারে শুয়ে আছি। অন্ধকার হয়ে আসছে। রাস্তা চিনে ফিরতে পারব না।”
তিনি বললেন, “ওখানেই থাকো। আমি গ্রামের লোকেদের নিয়ে নামছি।”
আস্তে আস্তে সূর্যের আলো চলে গেল। অদ্ভুত নিস্তব্ধতা চারিদিকে। তখন ঠাণ্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছি আমরা। জানিনা কী আছে কপালে। ভয়ে বার বার ফোন করছি শুধু। শেষে অনেক প্রতীক্ষার পর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চার পাঁচটা টর্চের আলো দেখে ধড়ে প্রাণ এলোঅন্ধকারের মধ্যে স্যারের সাথে এগিয়ে এলো অরি আর তন্ময়। পিছনে বেশ কিছু লোকের সাথে পুলিশও আছে।

হোটেলে পৌঁছাতে রাত দশটা হয়ে গেল। মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছে হসপিটাল থেকে। গরম জলে গা হাত ধুয়ে খাওয়া সেরে বিছানায় গিয়ে উঠলাম। বাকি ঘটনা অরি আর তন্ময় ভাগাভাগি করে বলল। যা শুনলাম তাতে চুল আরও খাড়া হয়ে গেল।
আমরা গর্তে পড়ে যাবার পর ওরা বৃষ্টির মধ্যেই প্রাণপণে দৌড়েছে উপরে খবর দিতে। আবার জঙ্গলের মধ্যে রাস্তা হারিয়ে অনেক দেরিও হয়েছে পৌঁছাতে। গ্রামের লোকেদের ডেকে নিয়ে এসে যখন আবার সেই কাঠের বাড়িটায় পৌঁছেছিল ওরা, তখন অবাক হয়ে দেখে মেঝেতে কোন কাঠ ভাঙেনি।  আর বাড়িটার নীচেও কোন গুহা বা গর্ত নেই। হাজার বোঝানোর চেষ্টা করেও লাভ হয়নি। সবাই ভেবেছে কোনকারণে এরাই মিথ্যা কথা বলছে। শেষে খোঁজার জন্য পুলিশেও খবর দেওয়া হল কিন্তু গোটা জঙ্গলে সারাদিন চিরুণী তল্লাশি করেও কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশ ওদেরকে জেরা করার জন্য থানায় নিয়ে যাচ্ছিল তখনই ফোন আসে আমাদের। শুনে আমরা গুম খেয়ে গেলামএটা কি কোন অলৌকিক ফাঁদ? না স্বপ্ন? তাই বা হয় কী করে? আমার মাথা তো সত্যি সত্যি ফেটেছে। তবে কি সেই লামার প্রতিশোধ?  মায়াজাল?


“আমার ক্যামেরাটা গেল!” আমি অনেকক্ষন চুপ করে থাকার পর আক্ষেপের সুরে বললাম
অরি জিজ্ঞাসা করল, “সেটা কখন হারালি?”
“হারায়নি। আমরা যখন প্রাণ ভয়ে দৌড়চ্ছি, আর ঐ জন্তুটা ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে, তখন ক্যামেরাটা ছুঁড়ে মেরেছিলাম।”
“তার মানে ক্যামেরাটার জন্যই তোরা বেঁচে গেছিস।” তন্ময় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল। 
ঘুমের মধ্যে আবার সেই গুহার ছবি দেখলাম। লামা আমাদের দিকে তাকিয়ে শরীর দুলিয়ে হাসছে। সেকি অট্টহাসি! আর তার পিছনে বিশালকায় পোষা টিকটিকি। তার লাল জবা ফুলের মত চোখ, থেকে থেকে শুধু ল্যাজ নাড়ছে। শীতের রাতে আমরা সবাই ঘেমে অস্থির। কিন্তু সবাই একই স্বপ্ন কী করে দেখলাম?  
পরের দিন সকালেই ফেরা। হোটেলের নীচে বাস দাঁড়িয়ে হর্ন দিচ্ছে। লাগেজ গুছিয়ে চেক আউট করার সময়ে ম্যানেজার ডেকে বলল, “একটা ক্যামেরা কেউ ফেলে যাচ্ছে। রুমের মধ্যেই পড়েছিল।”
আমি দেখে অবাক। এটা তো আমার ক্যামেরা। রুমে এলো কখন? বাসে বসে লক্ষ করলাম, সবই ঠিক আছে শুধু চামড়ার কভারে চার আঙুলের তীক্ষ্ণ নখের আঁচড়।
মাথাটা ভোম হয়ে কলকাতায় ফিরলাম। সেই ঘোর কাটতে আরও মাসখানেক সময় লাগল। এর মধ্যে কবে না জানি বাবা ক্যামেরা থেকে রিলটা বের করে ওয়াশ করতে দিয়ে এসেছিলেনকদিন পরে ছবি গুলি যখন নিয়ে এলেন অবাক হয়ে দেখলাম, এত সুন্দর ছবি অনেক দামী ডিজিট্যাল  ক্যামেরাতেও হয় না। প্রতিটা ছবি যেন বাঁধিয়ে রাখার মত। ভারী জিনিসটা ঘাড়ে করে নিয়ে যাওয়া সার্থক হল।

শুধু একটা ছবিতে চোখটা আটকে গেল। গুম্ফার মধ্যে তোলা ছবিটাতে সোনালী বুদ্ধের নীচে শুধু একটা মোটাসোটা টিকটিকি। লামা কোথায়?
____________

অলঙ্করন – লেখক