Showing posts with label সৌমী আচার্য্য. Show all posts
Showing posts with label সৌমী আচার্য্য. Show all posts

গল্প:: সময়জাল - সৌমী আচার্য্য


সময়জাল
সৌমী আচার্য্য

সূত্রধর

দীর্ঘ সময় লোডশেডিং চলছে। ভূদেব সাহা বারান্দায় হ্যারিকেন জ্বেলে গল্পের বই পড়ছেন। কতক্ষণ খেয়াল নেই, তবে বাড়ির উঠোনের পশ্চিমকোনার ডোবাটায় এখন আর ব্যাঙেরা ডাকছে না। কেবল ঝিঁঝিঁর ক্ষীণ শব্দ হয় চলেছে। সরলা রান্নাঘরে খিচুড়ি চাপিয়েছে—গন্ধ বেরিয়েছে সুন্দর। মণিমালা ঠাকুমার বুকের সঙ্গে লেপটে রামায়ণ শুনছে। সেই গুনগুন আওয়াজটাও মাঝে মাঝে পাচ্ছেন ভূদেব। তখনই কানের খুব কাছে কে যেন মৃদু ফিশফিশ করে উঠল। বিড়ির গন্ধটা নাকে এসেছিল আগেই।
“আজ আবার কী দেখে এলে, হরেকিসনো?”
“ইতুটুক যনতর, তা দিয়ে দূরের লোকটাকে পুরো জ্যান্ত দেকা যাচ্ছে।”
“তুমি কি ক্যামেরার কথা বলছ?”
“আরে, সে ক্যামেরা ক্যান হবে? তার নাম ‘মুবাইল’।”
ভূদেব একটু হাসল। ‘হরেকৃষ্ণ’ বছর বাষট্টির রোগাভোগা মানুষ। ‘পাগল’ বলে ডাকে পাড়ার সবাই। অন্ধকারে পথেঘাটে, ঝোপেঝাড়ে অথবা দিনের আলোতেও সে অন্য জগৎ খুঁজে পায়। কেবল ভূদেব ওর কথাগুলো শোনে আর সবাই ‘দূর-ছাই’ করে। হরেকৃষ্ণকে হ্যারিকেনের আলোয় ঝাপসা দেখায়। ওর কথাগুলোর ভেতর কোথাও না কোথাও সত্যতা আছে বলে মনে হয়। হতে পারে এই মুহূর্তে বাস্তব নয়। প্রথম গোলমালের দিনটা এখনও মনে আছে ভূদেবের। বছর দুয়েক আগে ভীষণ মেঘ করে এসেছিল। ঘনঘন বাজ পড়ছিল, সঙ্গে হালকা বৃষ্টি। ভূদেব রাস্তার ওপাড়ের পুকুরের ওপর বৃষ্টি ঝরে পড়া দেখছিল একমনে। হঠাৎ বাড়িতে ঢুকে এসেছিল হরেকৃষ্ণ।
“মাস্টার পুরো এলাকা বদলে গেচে, চারিদিক শুধু উঁচু বাড়ি; পাঁচতলা দশতলা পায়রার খোপের মতুন ঘর, চারদিক চওড়া রাস্তা, শুধু গাচপালা কুমে গেচে। আমাদের মোড়ের মাথার বটগাছটাও কে য্যান কেটে নেছে।”
ভূদেব কিছু বুঝতে না পেরে ভাবল, ও বোধহয় স্বপ্ন দেখেছে। হাসিমুখে বলেছিল, “এমন সুন্দর মেঘলা দিনে পড়ে পড়ে ঘুমোলে এমন বিদঘুটে স্বপ্ন ছাড়া কীই বা দেখবে?” সে ভারী আকাশ থেকে পড়েছিল। মাথা চুলকে বলেছিল, “ঘুমাই না তো! যা সব দেখি ওই অষ্টকুলি বিলের পাড়ে! চারপাশের হাওয়া যেন থরথর করি নাচে; আর ঘুম আসে না।” আজ আবার এই লোডশেডিং-এর ভেতর কিছু একটা দেখে এসেছে। আচ্ছা, ও কি ভবিষ্যৎ দেখতে পায়? পাগলের কোনো লক্ষণ তো নেই ওর ভেতর। তাহলে ঘটনাটা ঠিক কী?

গোলমেলে

অম্বরীশ মহাপাত্র মন দিয়ে তৃষাণজিৎকে দেখছেন, মানে শুনছেন। ছেলেটার কাজ ভীষণ নিখুঁত। ভীষণ অস্থিরভাবে কথা বলছে।
“আসলে স্যার, টাইমমেশিন বানানোর এই স্টেজে এসে নিউ hollow লাইনে যে এমন সমস্যা হতে পারে, ভাবতেই পারিনি। মানে বিষয়টা খুব ইন্টারেস্টিং। প্রোটন কণা ইচ্ছেমতো বিহেভিয়ার করছে এই ফাঁপা চেম্বারে অ্যাক্টিভেট করা মাত্র। মানে, স্পেস ওপেন করে দিচ্ছে ১৯৭৬-এ খুব অল্প সময়ের জন্য; তারপর সেখান থেকে ডাইরেক্ট কখনও ২০০৯, ২০২২ অথবা এই সময়ে, মানে ২০৫৯-এ। আরও আশ্চর্য বিষয়, একটা নির্দিষ্ট নিউরোন ওয়েব এই জার্নিটা কমপ্লিট করছে। কী ভাবে সে অ্যাটাচ হচ্ছে, জানি না।”
“মানে বলতে চাইছ, ১৯৭৬-এর একটি নির্দিষ্ট লোকের মস্তিষ্ক ভবিষ্যৎ যাত্রা করছে?”
“হ্যাঁ স্যার, একদম তা-ই।”
উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন অম্বরীশ। তৃষাণজিৎকে বললেন, “তুমি আপসেট হচ্ছ কেন? এ তো দারুণ খবর। টাইম মেশিন এখন তাহলে অপেক্ষা মাত্র। শোনো, লক্ষ করো, নিউরোন ওয়েব থেকে পুরো হিউম্যান সোর্সটাকে কীভাবে কানেক্ট করা যায়।” মনিটর বন্ধ হতেই ঘর থেকে মুছে গেলেন অম্বরীশ। তৃষাণ এখন একা। এই মানুষটাকে বোঝা খুব মুশকিল। এঁর নেতৃত্বে ‘অপারেশন রোবোটিক্স’ সফল হওয়াতে হাজার হাজার মানুষ সারা বিশ্বে কর্মহীন। এমনকি, সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন—সমাজের ভাঙন দ্রুত বাড়ছে। শুধু তা-ই নয়, রোবটকে থট্‌ প্রসেস দিতে ক্রমাগত চেষ্টা করছেন অম্বরীশ, বেশিরভাগ মানুষ যার চরম বিরোধিতা করেই চলেছে। তবু নিজের অবস্থা থেকে একচুল নড়েননি অম্বরীশ। মাথার ভেতর ‘বিপ’ ‘বিপ’ শব্দটা বাড়ছে। এই নতুন কানেকশন মাস ছয়েক ধরে তৃষাণজিৎকে আরও অস্থির করে তুলেছে।

চরিত্রবান চোর

“দেখ ক/২২, আমি কিন্তু ভুলে যাব তোর সঙ্গে আমার ক্লোনতুতো সম্পর্ক। তোর এটা একটা নেশা হয়ে যাচ্ছে। রোজ রোজ এক কাজ!”
“শোন ঈ/২২, তুই ভাবতেও পারবি না, তখন কত সবুজ ছিল চারিদিক। আর মানুষ কীভাবে বাঁচত ভাবলে তুই পাগল হয়ে যাবি। আজ যাবি আমার সঙ্গে?”
“তুই এটা করিস না। বুঝতে পারছিস না, আমরা নেই হয়ে যাব।”
“তাতে আমার কিচ্ছু যায়-আসে না। আমরা নেই হবার থেকে ওদের না থাকাটা অনেক বেশি জরুরি।”
“প্লিজ! আমি কিন্তু তাহলে ইনফরমেশন পাঠাব চিফের কাছে।”
“পারবি না। কাল তৃষাণজিৎকে নিয়ে এসেছিলাম। সবটা বুঝিয়ে তুই যখন ঘুমোচ্ছিলিস, তোকে অজ্ঞান করে কানের পেছনের ট্রান্সমিটারটা খুলে নিয়ে আমার কানে লাগিয়ে দিয়েছে। এখন থেকে ওরা ভাববে, আমিই তুই।”
“তুই এটা পারলি! তুই চোর হয়ে গেলি? ওরা আমায় নির্বাচন করেছিল বিশেষ শ্রেণির সুযোগ দেবার জন্য।”
“হ্যাঁ, করেছিল। কারণ তুই বিশেষভাবে ওদের প্রতি একনিষ্ঠ। তুই ভীতু, লোভী।”
কথাটা বলেই উদাস মুখে মেয়েটা বত্রিশ তলার জানলা দিয়ে বাইরে চেয়ে রইল। নীচে ব্যস্ত জনজীবন। জীবন! নাহ্, সবটাই যন্ত্র। গোটা পৃথিবী এখন ওদের দখলে। মাত্র পনেরো শতাংশ মানুষ রোবট শাসকের নিয়ন্ত্রণে দমবন্ধ অবস্থায় কোনোরকমে বেঁচে আছে। কিছু একটা করতেই হবে।
মেয়েদুটোর বড়ো হয়ে ওঠা বৈজ্ঞানিক রিয়োর ল্যাবে। উনি বলতেন, “শোনো ক/২২, তুমি পারবে; শুধু নিজের ওপর বিশ্বাস রেখো।” মেয়েটা কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করত, “কী পারব আমি?”
“পরিবর্তন। তোমার জিনের ইচ্ছে, কৌতূহল ওরা মুছে দিতে পারেনি। সম্ভবত আজ থেকে আশি বছর আগে জিন-ল্যাবে রাখা বৈজ্ঞানিক তৃষাণজিৎ-এর জিনের প্রভাব এটা।” বলার পর চুপ করে থাকতেন।
এই জায়গাটার নাম ‘ইউটোপিয়া রিগেইন্ড’। এখানে ক্লোনিং করে হিউম্যান স্লেভের সংখ্যা বাড়ানো হয়। আর মূল হিউম্যান শিশুটিকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। যেমন ক/২২-কে রাখা হয়েছে। ওর ভেতর আবেগের বাড়বৃদ্ধি দেখলেই ভ্যানিশ করে দেওয়া হবে। রিয়ো ওকে বুঝিয়েছিলেন, “মনের সবটুকু প্রকাশ করবে না। যত স্থির থাকবে, তত বদল ঘটাতে পারবে।” রিয়ো বছরখানেক আগে মারা যান। মৃত্যুর আগের দিন মেয়েটিকে একটা ইঞ্চিখানেক বড়ো খেলনা দিয়ে বলেন, “সবার অগোচরে আছে এই স্পেসিমেন। ওদের লিস্টে রেজিস্টার্ড নয়, তাই ওরা ট্র্যাক করতে পারবে না। তুমি এর সঠিক ব্যবহার কোরো। সেই মানুষটাকে খুঁজো, যে উৎসটাই বন্ধ করতে পারবে।” সপ্তাহখানেকের মধ্যে খেলনাটার লাল বোতাম খুঁজে পেয়েছিল মেয়েটা। আর ওটা যে আট বাই দশ ফুটের টাইম মেশিন, সেটাও আবিষ্কার করে। তখন থেকেই টাইম ট্রাভেল শুরু বছর সতেরোর ক/২২-এর। বহু সময়ে নানাভাবে খুঁজে শেষ পর্যন্ত নিজের জিনদাতাকে দেখতে গিয়ে তৃষাণজিৎ-এর সঙ্গে অম্বরীশকেও খুঁজে পায়। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।

আহুতি

তৃষাণজিৎ-এর চোখ জলে ভরে উঠেছে। মেয়েটি যে তার সন্তানের মতোই। ভীষণ দৃঢ়ভাবে মেয়েটি বলল, “আপনাকে পারতেই হবে, তৃষাণজিৎ। আমি এই টাইম মেশিন আপনাকে দিয়ে যাচ্ছি। আপনার এক্সপেরিমেন্টের খুঁটিনাটি হাতে-কলমে বোঝাতে ওনাকে এটার ভেতরে এনে সোজা ১৯৭৬-এ নিয়ে যাবেন। ওখানেই আপনার প্রোটন কণা সবচেয়ে বেশি ওপেন স্পেস পাচ্ছে। ওখানেই রেখে আসুন ওকে।” অত্যন্ত চিন্তায় তৃষাণ বলে, “কিন্তু তাতে রোবোটিক্স রেভলিউশন কী আটকানো যাবে?”
“যাবে। ওর সব নির্দেশ আপনি বদলে দেবেন, যাতে রোবটদের নিয়ে সব কাজ বন্ধ হয়ে যায়।”
“তাহলে ভবিষ্যৎ পৃথিবীটাই বদলে যাবে?”
“জানি না, তবে চেষ্টা তো করতেই হবে।”
“বেশ, তবে তা-ই হোক। শুধু একটা কথা—তোমার কত বছর বয়সে ক্লোনিং-এর কাজ শুরু হয়, তুমি কি জানো?”
“রিয়ো বলেছিলেন, আমি তখন ছ-মাসের। কেন বলুন তো?”
তৃষাণজিৎ কোনো উত্তর দেয় না। মেয়েটা চলে যেতেই সবার আগে ২১২৯ সালে রিয়োর ল্যাবে যায়। চুপিসারে উঁকি দিয়ে দেখে বৈজ্ঞানিকরা সবাই কাজে ব্যস্ত, পেছনে একটা ধাতব বিছানায় ঘুমোচ্ছে একটি ফুটেফুটে শিশু। তার জিনজাত সন্তান। সুযোগের অপেক্ষায় থাকে তৃষাণ। একটা সময় পর সকলেই বিশাল মনিটরে ক্লোনিং প্রসেস দেখতে মনোযোগী হতেই তৃষাণ বাচ্চাটাকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। নিজের শোবার ঘরে রেখে ওর স্ত্রী ডরোথির জন্য একটা চিঠি লেখে, তারপর কল করে অম্বরীশকে। ভাসমান গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনে মুখটা দৃশ্যমান।
“কী খবর, তৃষাণ?”
“স্যার, আপনি একবার ল্যাবে আসুন। একটা এক্সপিরিয়েন্স আপনার সঙ্গে শেয়ার করতে চাই, টাইম মেশিন সংক্রান্ত। বিষয়টা জরুরি।”
অম্বরিশ জানালেন, আসতে দু-ঘণ্টা সময় লাগবে। তাহলে এর মধ্যে যা করার করতে হবে। প্রথমে ইনভিজিবল্ শিট দিয়ে টাইম মেশিনটাকে মুড়ে দিতে হবে, যাতে অম্বরীশ কেবল ল্যাবটাকেই দেখতে পান। ক/২২ রিয়োর ল্যাব থেকে ওগুলো চুরি করে এনে দিয়েছে।
অম্বরীশ বহুদিন পর সরাসরি কোনো ল্যাব ভিজিট করলেন। ওঁর সঙ্গে রয়েছে বিশ্বস্ত রোবটগার্ড। তবু অম্বরীশ নিজের সিকিউরিটি পাস ওয়ার্ডে ল্যাব লক করে দিলেন।
“এসব এখনও করতে হচ্ছে, কারণ বোকা-বোকা আবেগের লোকজন নানারকম কুৎসা রটিয়ে চলেছে। যত সব ইডিয়ট। আমার উপস্থিতি টের পেলে এখানেই হুজ্জুতি করতে পারে। যাই হোক, বলো কী দেখাবে?”
তৃষাণজিৎ দুরুদুরু বুকে বলল, “স‍্যার, আপনি এইখানে বসুন। আমি প্রোটন কণাকে অ্যাক্টিভেটেড করছি। কাল থেকে ওই হিউম্যান সোর্সটাকে এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে। আপনি লক্ষ‍ রাখুন।” অম্বরীশ ভুরু কুঁচকে মনিটরে তাকালেন। একটা স্মুথ কম্পন অনুভব করলেন। তারপর মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। ক/২২ একটা স্টিকার দিয়ে গিয়েছিল, যেটা আসলে ‘ফলো মি’ ডিভাইস। ওটা তৃষাণ অম্বরীশের জামায় আলতো করে লাগিয়ে দিয়ে নিজের হাতে সেটার কনট্রোল স্ট্রিপ লাগিয়ে নিয়েছে।
“স্যার, আসুন। একটু বাইরে যাই।”
“এটা কোন জায়গা? এত সবুজ? এমন সুন্দর বিল?”
“এটা স্বর্গ স্যার। আপনি ক-দিন এখানে বিশ্রাম নিন। আমি পরে এসে আপনাকে নিয়ে যাব। আর আপনার ল্যাপটপটা আমায় দিন। ওটার এখানে কোনো দরকার নেই।”
দ্রুত ল্যাবে ফেরে তৃষাণ; সঙ্গে রয়েছে অম্বরীশের রেটিনা রেপ্লিকা, ভয়েস রেপ্লিকা ও ফিঙ্গার প্রিন্ট। এগুলো সংগ্রহ করার ডিভাইস মেয়েটাই দিয়েছিল। আগামী সময় শুধু উন্নত—তা-ই নয়, ভয়ংকর। ব্যক্তিগত বলে কিছুই যেন নেই। সব রাষ্ট্রের দখলে। তৃষাণ দ্রুত ডিকোড করতে লাগল অম্বরীশের ল্যাপটপ। একের পর এক বন্ধ করতে লাগল অর্ডার।

গোবিন্দপুর সরগরম

এক পাগল আর-এক পাগল জুটিয়েছে। কোট-প্যান্ট পরা সাহেব পাগল। থেকে থেকে সে চিৎকার করছে। হরেকৃষ্ণ তাকে টানতে টানতে নিয়ে এল ভূদেবের বাড়ি। সে স্কুলে যাবে বলে সবে সাইকেলটা বের করেছে তখন।
“মাস্টার, এই দেকো। যে-সময়ে হাওয়ায় গাড়ি-ঘুড়া চলবে, সেই সময়ের লোক এয়েচে। এই দেকো, মুবাইল রয়েচে হাতে।”
অম্বরিশ আলুথালুভাবে এগিয়ে এসে ভূদেবের হাত চেপে ধরে, “প্লিজ হেল্প মি। মোবাইলটা এখনই চার্জ দিতে হবে, প্লিজ। বন্ধ হয়ে আছে।”
ভূদেব যন্ত্রটা দেখে নরম সুরে বলে, “এই যুগে এসব আবিষ্কার হয়নি, স্যার। আপনি কোন সাল থেকে আসছেন?”
“মানে? আপনি আমার সঙ্গে ইয়ার্কি করছেন?”
“না স্যার, সময় আপনার সঙ্গে ইয়ার্কি করেছে।”
“আপনি রোবোটিক্সের নাম শোনেননি? ওটা আমার কোম্পানি। আমি বৈজ্ঞানিক অম্বরীশ মহাপাত্র।”
“রোবটের কথা পড়েছি, স্যার; তবে আমরা চোখে দেখিনি।”
“এটা কোন জায়গা?”
“এটা গোবিন্দপুর, সময় ১৯৭৬।”
অম্বরীশ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকল। মাথার চুল টেনে ধরে চিৎকার করে উঠল, “তৃষাণজিৎ, তোমায় আমি ছাড়ব না!”
পুরো পাগল মানুষটিকে ভূদেব বাড়িতেই রেখে দিল। এমন সব জিনিসের কথা বলে যে, বাড়ির সবাই চমকে যায়। এটা-ওটা দিয়ে যন্ত্র বানানোর চেষ্টা করে, আর থেকে থেকেই তৃষাণজিৎ নামে কারও মুণ্ডুপাত করে। মাঝে ভূদেব কলকাতায় নিয়ে গিয়েছিল অম্বরীশকে। খুব জেদ করছিল। ওর মনে হয়েছিল, মুখ্যমন্ত্রী ওর কথা শুনে ওকে একটা আস্ত ল্যাব বানিয়ে দেবেন। যেখানে ও টাইম মেশিন বানিয়ে দ্রুত ফিরবে নিজের সময়ে। কিন্তু নেতারা দেখাই করেননি। বাড়ি ফিরে চুপ হয়ে গিয়েছিল অম্বরীশ। ভূদেব বলেছিল, “আপনি তো চাকরিও পাবেন না, স্যার! সার্টিফিকেট তো নেই আপনার কাছে। কী করে প্রমাণ করবেন, আপনি বৈজ্ঞানিক?” খানিকক্ষণ খুব জোরে জোরে হেসে সে বলেছিল, “সব সময়ের কারসাজি। এই আছে, এই নেই।”
বেশ কয়েকদিন পর রাতের অন্ধকারে হরেকৃষ্ণ আসে। “ও মাস্টার, অষ্টকুলি বিলের পাড়ে রোজ যেতেছি, কিন্তুক নতুন কোথাও যাতি পারছি না কেন?” ভূদেব গম্ভীর মুখে বলে, “হয়তো সেটাই মঙ্গলকর, তাই।”
----------
ছবি - মেটা এআই

গল্প:: হলধরের ট্রেনিং - সৌমী আচার্য্য


হলধরের ট্রেনিং
সৌমী আচার্য্য

হলধরের অবস্থা যাকে বলে কিনা খুবই খারাপ। এ বছর ধান বিক্রি করে মাত্র লাখ খানেক টাকা লাভ হয়েছে, এই আকালে গরুর গোয়ালটাও শূন্য। আহা মাত্র পনেরোটা গরু থাকাকে কি ভরা গোয়াল বলে? দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাতাসা দিয়ে আরেক গাল মুড়ি মুখে দিল। ঠিক তখন ঘাড়ের কাছে কে যেন নিশ্বাস ফেলল। কে রে বলে চমকে উঠতেই অন্ধকারের ভিতর গলা, “আজ্ঞে আপনার দুঃখে মরা হাতিও কেঁদে উঠবে, আহা সত্যি বড়ো কষ্ট আপনার।” এই শুনে অন্ধকারটাকে ভারী ভালোবেসে ফেলল হলধর। বাড়ির কেউই তার দুঃখ ঠিক বোঝে না। বিশেষ করে তার বউ আর বারো বছরের ছেলে সৃজান। এর উপরে ভয়ঙ্করী হয়ে বসে আছে পিসিমা। বাপ-ঠাকুরদার বানানো বাড়িটার এদিক ওদিক খসে পড়ে একটা অ্যান্টিক লুক এসেছে এটা কেউ মানতে রাজি নয়, উপরন্তু পিসিমার সঙ্গে সাঁট করে প্রতিদিন নিত্য নতুন খাবারের আয়োজন চলছে। এর মধ্যে একদিন সকালে মুড়ি চাইতেই বউ সুরবালা হাতে প্লেট ধরিয়ে দিল। তার ভিতর হলুদ হলুদ কেঁচো, সঙ্গে গাজর, ক্যাপসিকাম, ডিম। বুকে ব্যথা উঠে গেল হলধরের। ছেলে সুরুৎ সুরুৎ করে লম্বা কেঁচো খেতে খেতে বলল, “একে বলে ম্যাগি, খাও বাবা।” হলধর খাবে কী, দু-দিনের বাজার খরচা একবেলার জলখাবারে শেষ এটা ভেবেই হু হু করে কান্না ঠেলে উঠল। অমনি পিসিমা কেমন শিলনোড়ার শব্দ তুলে বলল, “কিপটে লোকেরা এসব খাবারের মর্ম বোঝে না রে দাদুভাই, তুই খা, তোর বাবা বরং মুড়ি বাতাসা খাক।” এসব খোঁচা দেওয়া কথা মোটে ভালো লাগে না হলধরের। সে কিপটে একথা শত্রুতেও বলতে পারবে না। অন্ধকারটা মনের কথা বুঝতে পারে।
“আজ্ঞে কিপটে হলে কেউ ভিখারিকে পঞ্চাশ পয়সা ভিক্ষে দেয়? তার উপর বাজার ঘুরে ঘুরে এই দু-কড়ের মাপের পুঁটি খুঁজে খুঁজে কিনে আনে? এসব নিন্দুকের রটনা।”
হলধর একটু ধন্দে পড়ে গেল, “তা বাপু তুমি যে প্রশংসা করছ এমন তো মোটে ভাবতে পারছি না।”
অন্ধকার আরও অনুগত গলায় বলে উঠল, “এমা ছিঃ ছিঃ এ কী বলছেন হুজুর? আমি আপনার শুধু প্রশংসা করছি তাই নয় আপনার কাছে আসার কারণটিও বলতে চাইছি।”
“হ্যাঁ বলে ফেল তো বাপু, কী দরকারে এসেছ?”
“আজ্ঞে আপনি হলেন যাকে বলে কিনা সঞ্চয়ী, মিতব্যয়ী এবং বিবেচক, তো, নিঝুম রঙ্গালয়ের মালিক আপনাকে একবারটি দেখতে চান, তার সম্পত্তি আপনার নামে লেখার আগে।”
“আমার নামে সম্পত্তি মানে?”
“মানে তিনি তার সম্পত্তি এমন কাউকে দিতে চান যে নয়ছয় না করে সেটা রক্ষা করবে।”
“কেন তিনি কি মারা যেতে বসেছেন?”
“আরে না না ছিঃ ছিঃ, হাট্টাকাট্টা মানুষ তিনি। তবে বিশেষ একজনকে খুঁজছেন। মশাই যাবেন কখন? রাতে বেরোনোই ভালো।”
“কিন্তু তোমাকে তো মোটে দেখতেই পেলাম না বাপু! বিশ্বাস করি কী করে?”
“আজ্ঞে দেখাশোনা হবে আগামীকাল রাস্তায়। আপনার ঘরের কবাটটা ভেজিয়ে রাখবেন, টোকা দেব, টক্‌ টক্‌ টক্, বুঝবেন আমিই এসেছি।”
“তা তোমার নাম কী হে?”
“আর নাম, ধরে নিন অমাবস্যা, আবার ভোজবাজিও বলতে পারেন, এছাড়া...”
“থাক, থাক আর নাম বলতে হবে না। তা তোমার মালিকের নামধাম আছে?”
“আজ্ঞে আছে বই-কি, তেজলাল পাঠক। আমি আজ তাহলে আসি, আরও দুয়েকজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হবে এই ব্যাপারে। তারাও সব আপনার মতো প্রার্থী।”
হলধর চড়বড়িয়ে ওঠে, “ইসে মানে বাপু অন্য কোথাও গিয়ে কাজ কী? আমাকেই তো তোমার বেশ পছন্দ নাকি?”
অন্ধকারের ভিতর থেকে উত্তর আসে, “আজ্ঞে তা পছন্দ, তবে কিনা মেঠোপাড়ার মরণ সরকার আমায় বেশ পছন্দ করেন, দুটো নতুন ফুলপ্যান্ট আর একটা পুরোনো সাইকেল দেবেন বলেছেন। দেখি আর কে কী দিতে চায়।”
হলধর বুঝতে পারল অন্ধকার বেশ সরেস।
“তুমি উৎকোচ চাইছ?”
“আরে ছিঃ ছিঃ সেসব কে চায়? তার উপর আপনি যাকে বলে কিনা মিতব্যয়ী মানুষ।”
অন্ধকারের হালচাল হলধরের ভালো লাগল না। কথা না বাড়িয়ে সোজা ঘরে ঢুকে দরজায় খিল দিয়ে দিল। লস যে বেশ খানিকটা হল তা ঠিক তবে কিনা অন্ধকারের চাহিদা খুব। শুতে যাবে ঠিক তখনি আলমারির পাশ থেকে মিহিন গলা ভেসে এল।
“কর্তা ওই ইস্টুপিডটার সাথে বড্ড সময় কাটালেন। আমি এদিকে ভালো একটা কাজের সন্ধান নিয়ে এসেছি।”
হলধর ধচমচ করে বসে বলে, “কাজ! কী কাজ? আমি কাজ করবই বা কেন?” লোকটা একটু কাশল, যদিও হলধর ভাবল হাসল। সে বেশ আদর বোলানো গলায় বলল, “কর্তা আপনার অবস্থা যে এ বছর বড্ডই খারাপ সে তো বুঝতেই পারছি, তা বলছি বাড়ির পেট ক’টা তো চালাতে হবে। কাজটা বেশ ভালো, একটা চিটিংবাজ লোকের বিষয়ে খবরাখবর আনতে হবে। তা আপনি হলেন গে যাকে বলে বিড়াল, রাতে যেভাবে নিঃশব্দে কাজ সারেন তা কারোর পক্ষে টের পাওয়া সম্ভব নয়। তাই বলছিলাম কাজটা আপনি নেন। আমি থাকব সাহায্য করার জন্য।”
হলধর আচমকা বিষম খেল। অনেকক্ষণ আহা উহু করে শেষে মিহিন গলা বলল, “কর্তা লোকটার নাম আপনার জানা, ওই নিঝুম রঙ্গালয়ের মালিক।”
একদিনে আর কতবার যে চমকে উঠবে হলধর বুঝতে পারে না।
“কেন ওর খবরে তোমার কী?”
“আরে রামকৃষ্ণ! আমি হলাম ছাপোষা মানুষ, আমার এসবে কী প্রয়োজন? তবে কিনা সাফসুতরো কারখানার মালিক জিবেগজা বনবনের দরকার। এই নিঝুম রঙ্গালয়ে কিছু একটা গড়বড় আছে উনি সেটা খুঁজে বার করতে চান।”
“কেন লোকের খবর খুঁজতে তার কী এত দরকার?”
“আরে মশাই উনি হলেন ফেলুদার ভক্ত, সন্দেহ হলেই ক্যাচ কট্‌কট্ করতে চান।”
“তাহলে তোমাকেও ধরতে পারেন, আমার ঘরে তুমি ঢুকলে কী করে? তাছাড়া তোমায় দেখতে পাচ্ছি না কেন?”
“আজ্ঞে দেখবেন কী করে, ক’দিন ধরেই তো লোডশেডিং চলছে, আর আপনি ওই হোৎকাটার সাথে কথা বলার সময় খুব ঘুম পাচ্ছিল তাই ঢুকে পড়েছি। এতে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হল শুনি?”
হলধর বোঝে আজকের রাতটাই বিচ্ছিরি। একের পর এক উটকো লোকের ঝামেলা। কিন্তু মিহি গলাও মনের কথা বুঝে গেল। বেশ গম্ভীরভাবে বলল, “যদি কাজটা করেন নগদ বিশ হাজার। আপনার মতো করিৎকর্মা লোকের পক্ষে এ কাজ ‘জলবৎ তরলং’, বড়োজোড় দিন পাঁচেক। তাছাড়া ওরা আপনাকে যেচে নিয়ে যেতে এসেছে, তা যান খান আনন্দ ফুর্তি করুন খবরাখবর দিন, ব্যস্।”
হলধরের দ্বিধা যেতে চায় না, লোকটাকে উৎকোচ-ফুৎকোচ কিছুতেই দিতে পারবে না। সবটা শুনে মিহিন গলা বলল, “আপনার হয়ে আমরা উৎকোচ দেব, চিন্তা কী? শুধু হ্যাঁ বলে দিন।”

হলধরের ঘুম বেশ পাতলা, তবে পাশের বাড়ির ধূর্জটি টিকাদার, পুলিশে পর্যন্ত রিপোর্ট করেছিল যে তার বাড়িতে নাকি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার আছে, যেটা দিনে আফিং-এর নেশায় চুপ থাকলেও রাতে নাকি এমন গজরায় যে হলধরের বাড়ির আশেপাশের পাঁচ-ছ’টা বাড়ির লোক ঘুমাতে পারে না। পুলিশ এসেওছিল, সুরবালা চোখ উলটে বলল, “হুজুর আপনারা চাইলে বাঘটাকে নিয়ে যেতে পারেন, আমরাও ক’দিন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি।” বাঘের সন্ধান জানতে চাইলে বাড়ি শুদ্ধ লোক হলধরের দিকে যে কেন আঙুল ওঠাল কে জানে। তা যাক গে, আলতো টোকাতেই ঘুম ভেঙে সে বাইরে উপস্হিত। অন্ধকার এখন চাদর মুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
“কুম্ভকর্ণ বলে কাউকে চেনেন?”
ঘুম থেকে উঠে আবার কুইজ খেলতে হবে? মাথা চুলকে হলধর বলল, “হ্যাঁ ওই আমার মামাবাড়ির এলাকায় থাকে, মহা ধড়িবাজ, চারানার আমসত্ত্ব চেয়েছিলাম বলে, দুর দুর করে খেদিয়েছিল।”
অন্ধকার হেসে বলল, “আমি ভাবলাম আপনার ডাকনাম।”
হলধর পোঁটলা নিয়ে রেডিই ছিল। তবে চারিদিক হালকা আলো।
“তা তুমি বাপু আরেকটু আগেই ডাকতে।”
লোকটা হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল। হলধরের লেজে গোবরে অবস্থা। অবশ্য বাড়ি ছাড়ার ব্যাপারে কাউকে কিছু না জানানোটাও বুকের ভিতর খচখচ করে বিঁধছে। তবে লোকটা নেহাৎ মন্দ না, হলধরের পোঁটলা নিজেই মাথায় তুলে নিল। মেমারি স্টেশনে তখন ব্যান্ডেল লোকাল ঢুকছে। একটু একটু শীতভাব তাই সূর্য উঠেও উঠছে না।
“কর্তা, কেউ যদি চিনে ফেলে সমস্যা হবে, গামছাটা দিয়ে মুখ মাথা ঢেকে নেন।”
চুপ করে বসে পড়ল হলধর। পেটের ভিতর গুড়গুড়, যাচ্ছে কোথায়? বর্ধমান? নাহ্ পালসিট আসতেই লোকটা হ্যাঁচকা টানে নামিয়ে নিল। তারপর ভ্যানে চাপিয়ে নিয়ে চলল। তা মিনিট কুড়ি যাবার পর বেশ ছিমছাম এক পাড়ায় নেমে পড়ল দুজনে। সুন্দর রঙচঙা বাড়িগুলোর একেবারে শেষে জেলখানা টাইপ উঁচু পাঁচিল ঘেরা কারখানায় গিয়ে পা থামল। দুমদুম করে লোহার দরজা পিটল লোকটা। ভিতর থেকে আওয়াজ এল, “পাশের ছোটো গেট খোলা, চলে আয়।” ভিতরে ঢুকে হলধরের মনে হল জীবনের সবচে বড়ো ভুলটা করে ফেলেছে। ওরে বাবা, তেজলাল পাঠকের খবর সে কী নেবে? সে যে বিশালকায় ভীম। মুখে আলগা হাসি রেখে হলধর দাঁড়াল। তেজলাল ওই সকালে স্নান সেরে সাদা পাজামা, পাঞ্জাবি পরে বসে আছে চেয়ারে। একটা দেয়ালে বড়ো করে লেখা নিঝুম রঙ্গালয়। মাঝখানে দোতলা বাড়ি, চারদিকে ছোটো ছোটো ঘর আরও বেশ কিছু।
হলধরকে ইশারায় পাশের চেয়ারে বসতে বলে হাঁক দিলেন, “গজা চা নিয়ে আয়। বসুন, চা পান করুন।”
ইয়া বড়ো গ্লাসে চা এল, সঙ্গে পাঁচ-ছ’রকম বিস্কুট। হলধর দেখেই আঁতকে উঠল, “আজ্ঞে, এত খরচ করলে তো আপনার সম্পত্তি এমনিই শেষ হয়ে যাবে, দেখাশোনার লোক লাগবে না।” তেজলাল হা হা করে হেসে বলল, “আরে মেধো, এ তো বেড়ে লোক এনেছিস। শাবাশ! ঠিক বলেছেন হলধরবাবু, আপনি তাহলে লেড়ো আর চা খান।” হলধর মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তেজলাল ঘন হয়ে দেখছে তাকে। চা পান শেষে মুখ খুললেন।
“দেখুন হলধরবাবু, আমি সোজা কথার মানুষ। আমার সম্পত্তি যে বাঁচাবে তাকে আমি একমাস ট্রেনিং দেব, তারপর একমাস সে সমাজে চলাফেরা করবে নিজের ইচ্ছেমতন, তখন আমি তাকে পরীক্ষা করে নেব, তারপর সে যদি উপযুক্ত প্রমাণ হয় তো আমি তাকে আমার সম্পত্তি লিখে দেব।”
“কিন্তু কেন?”
“কারণ বাকি জীবনটা আমি নিঝুম হয়ে রঙ্গালয় নিয়ে মেতে থাকতে চাই। তার আগে বলি, আমার মোট সম্পত্তি স্থাবর অস্থাবর মিলিয়ে একশো কোটির আশেপাশে, তা আপনি এই সামান্য সম্পত্তির দায়িত্ব নিতে রাজি হবেন তো?”
পরিমাণ শুনে হলধরের বুকে চা আটকে বিষম লেগে যা তা অবস্থা। শেষমেশ তিনি রাজি হলেন। তাকে একটা ছোটো ঘর দেওয়া হল, তার পুঁটলিটাও দেওয়া হল। পুঁটলিতে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও বাড়ির দলিল আর সিন্দুকের চাবিটা মোটে খুঁজে পেলেন না হলধর। এ ব্যাপারে কারোর খুব একটা হেলদোল দেখা গেল না। বলা ভালো তিনি কাউকে খুঁজেও পেলেন না মোটে। সন্ধের আগ দিয়ে কে যেন ধোঁয়া ওঠা আতপ চালের খিচুড়ি আর বেগুনি দিয়ে গেল। যদিও নিমেষেই পেটের ভিতর হারিয়ে গেল সে সব। সন্ধের পর থেকে অস্বস্তি টের পেলেন হলধর। কাঁহাতক একা থাকা যায়? একটা টিমটিমে ডুমের আলো, টর্চ আর ছোটো লাঠি আবিষ্কার করলেন দরজার পাশে। একা থাকতে থাকতে বেশ ঝিমুনি এসে গেল। খিদেটা চাগাড় দিতেই ঘরের দড়িতে দুটো সবরিকলা দেখতে পেলেন। তা বেশ, খাওয়ার ব্যাপারে বাড়াবাড়িটা উধাও হয়েছে, সঙ্গে লোকজনও। হলধর আশা করেছিল সকালে কাউকে দেখতে পাবে। সে গুড়েও বালি। বড়ো দরজাটা খোলার বৃথা চেষ্টা করে শেষে হাল ছাড়লেন। এভাবেই কেটে গেল প্রায় পনেরোদিন। মাঝে মাঝে ছেলের কথা ভেবে ভেউ ভেউ কান্নাটা গলায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, তবে যেদিন কাঁদবে ভেবে হলধর গুছিয়ে বসেছে সেদিন তেজলাল সাঙ্গোপাঙ্গ সহ হাজির।
“হলধরবাবু আজ আপনার চোখের টেস্ট হবে। দেখা যাক এই পনেরো দিনের ট্রেনিং ঠিক কতটা কাজে এল।”
হলধর অবাক, ট্রেনিং কবে হল? একা থাকার নাম ট্রেনিং? যাক গে, তেজলালের লোক বেশ জুত করে তেল মালিশ করে দিল, গেট দিয়ে বেরিয়ে একটা পুকুরে বেশ ঝাঁপাঝাঁপি করে স্নান হল। ঝলমলে আকাশ, টলটলে জল, হলধর পাড়ে বসে গান জুড়ে দিল, এমন স্বপ্ন কখনও দেখিনি আমি/ মাটিতে যে আজ স্বর্গ এসেছে নামি। যদিও দুটো কুকুরের এতে এত মাথাব্যথা হল কেন সেটা ঠিক বোঝা গেল না। ভৌঔঔঔ শব্দে তীব্র আপত্তি জানাল। ফিরে এসে ফকফকা সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরে লুচি, আলুরদম, জিবেগজা খেতে কোনো আপত্তি জানাল না হলধর। খোশগল্প করল দুজনে অনেকক্ষণ। পুকুরে মাছ ধরল। দুপুরে কাঁসার থালায় অড়হড় ডাল, ঝিঙেপোস্ত, আলু বেগুন বড়ি দিয়ে বাটামাছ, কাতলা কালিয়া, তেঁতুলে টক খেয়ে পরিতৃপ্ত মুখে ঢেকুর তুলে ঘুমিয়ে নিল। সন্ধ্যায় ঘুম থেকে উঠে আবার সেই একা। কোনো কথা না বলে তেজলাল গায়েব। দেখা হল ত্রিশ নম্বর দিনে। না ভুল হল, রাতে। মাংসের গন্ধে ঘুম ভাঙল হলধরের। তেজলাল বাইরে বসে হুঁকো টানছে। সঙ্গে অন্ধকার লোকটাও আছে। মোচ্ছব চলছে যেন নিঝুম রঙ্গালয়ে। অন্ধকার বলে উঠল, “কর্তা আমাকে যে দেখেও না দেখার ভান করতেন এতে মনে মনে বেশ দুঃখ পেয়েছি। আমি তো ডাকলেই হুজুর নাকডাকা শুরু করতেন। এতটা যোগী মানুষ মোটে টের পাইনি।” হলধর কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। তেজলাল গম্ভীর মুখে তাকিয়ে রইল।
“হুম্ তাহলে ট্রেনিং বেশ ভালো হয়েছে বলতে হবে। আচ্ছা সেদিন দুপুরে আপনি আমি কী কী খেয়েছিলাম মনে আছে?”
হলধর হুবহু মেনু বলা মাত্র তেজলাল হো হো করে হেসে উঠল, “বেশ বেশ, বাটামাছ হয়েছে কাতলা, পুঁটি হয়েছে বাটা, ডাঁটা চচ্চড়ি হয়েছে পোস্ত, শাবাশ।” হলধর বোকার মতো চেয়ে থাকল। তেজলাল বলল, “দেখুন মশাই, টাকা রক্ষা করা যায়, সামান্যকে অসামান্য বুঝলে। আর লোকজনকে দেখেও না দেখলে। বোঝা যাচ্ছে আপনার সে সব ভালো মতো হয়েছে।”
“কিন্তু সত্যি কেউ আসেনি, বিশ্বাস করুন।”
অথচ অন্ধকার বলে দিল কবে ক’টা মশা মেরেছে হলধর। কখন কখন হাই তুলেছে, হলধর মাথা চুলকে জিজ্ঞাসা করল, “আমি কি তাহলে এখন পাগল?”
“পাগল নাকি? পাগল কেন হবেন। এখন আপনি ওয়েল ট্রেনড্, আসুন আজ অন্তত একটু মাংস খান। আজকে হিসেব করবেন না। এ ক’দিন অনেক কৃচ্ছসাধন করেছেন।”

জমিয়ে কষা মাংস আর রুটি খেয়ে হলধরের এক মাস পূর্ণ হল। পরদিন সকালে পোঁটলা গোছানোর সময় বাড়ির দলিল, সিন্দুকের চাবি যথাস্হানে খুঁজে পেয়ে হলধর বুঝল, খাসা ট্রেনিং হয়েছে তার। আজ অবশ্য সঙ্গে কেউ নেই, একাই ট্রেন ধরে বাড়ির পথ ধরল সে। বাড়ির কাছে এসে জোর ধাক্কা খেল। ঝাঁ চকচকে এক রঙচঙে সুন্দর প্রাসাদ দেখতে পেল। দারুণ গেট, ভিতরে সুন্দর বাগান। যাহ্ বাবা, নিজের বাড়ির রাস্তা ভুলে গেল নাকি? পিছন ফিরে হাঁটা লাগাতে যাবে এমন সময় এক নতুন জামাপ্যান্ট পরা কেতাদুরস্ত ছেলে, বাবা বাবা করে ডেকে উঠল। তাকিয়ে দেখেন আরে এ যে সৃজান।
“বাবা কোথায় ছিলে তুমি এতদিন? মা কেঁদে কেঁদে রোগা হয়ে গিয়েছে। সারা বাড়ির অবস্থা খারাপ বাবা। ভিতরে চলো।”
ঝাঁ চকচকে পুট্টি করা রং করা দেয়াল, বউ বেশ সুন্দর সাজগোজ করে রান্না করছে, পিসিমা নতুন চশমা পরে বেতের চেয়ারে বসে গল্পের বই পড়ছে। বাড়িতে বেশ উৎসব উৎসব ভাব। হলধর এবার মিটিমিটি হাসল। টুকটুক করে নিজের ঘরে গিয়ে বসল। বুঝতে পারল ট্রেনিং-এর ফল ফলতে শুরু করেছে। ওদিকে সৃজান মায়ের হাতে ফোন তুলে দিল।
“হ্যালো ছোটোমামা, কাজ সব কমপ্লিট, হ্যাঁ, না না অসুবিধা হয়নি। ভাগ্যিস তুমি এতদিন বাইরে ছিলে তাই ও তোমায় চেনে না। আর হ্যাঁ বিজন, ভূপেন ভালো কাজ করেছে। বলছি মামা ধরা পড়ে যাব না তো?”
উলটো দিকে তেজলাল ওরফে নকুলেশ্বর গড়াই বেশ হাসলেন। জুত করে বসে মাশরুমের চপ খেতে খেতে বললেন, “ধরা পড়ার আগে অবধি জীবনটাকে ভালো করে বেঁচে নে। আর শোন, কিপটেমি আটকাতে গিয়ে বেহিসেবি হোস না যেন। বুঝে শুনে খরচ করিস। আর একমাস পর ও যদি তেজলালকে খুঁজতে আসে তখন একটু সমস্যা হতে পারে। তবে সে সব নিয়ে অত না ভাবলেও চলবে।”

রাতে ফুলকপি আলুর ডালনা আর ডিমের কষা দিয়ে গোটা সাতেক রুটি খেয়ে মিটিমিটি হেসে হলধর নিজের ঘরে গিয়ে নিশ্চিন্তে অপেক্ষা করতে লাগল মিহিন গলা কখন আসে, তেজলালের সব খবর দিতে পারলে বেশ কিছু আমদানি হবে যে।
----------
ছবি - সুকান্ত মণ্ডল