Showing posts with label সৌগত সেনগুপ্ত. Show all posts
Showing posts with label সৌগত সেনগুপ্ত. Show all posts

প্রবন্ধ:: ক্যাপ্টেনকে লেখা চিঠি - সৌগত সেনগুপ্ত


ক্যাপ্টেনকে লেখা চিঠি
সৌগত সেনগুপ্ত

প্রিয় ক্যাপ্টেন,

তোমাকে এই চিঠিটা অনেকদিন ধরে অনেকবার লেখার কথা ভেবেছি, কিন্তু কোনও কারণে লিখে উঠতে পারিনি
কখনও রেগে গিয়ে লিখব ভেবেছি, কখনও খুশি হয়ে, কখনও আবার দুঃখ পেয়ে একবার ঈর্ষায় সবুজ হয়ে লিখব ভেবেছিলাম, পরক্ষণেই লজ্জায় লাল হয়ে লেখা মুছে ফেলেছি আজ যখন তুমি অনেক দূরে তখন সাহস করে চিঠিটা লিখেই ফেললাম
খুব ছোটোবেলায় যখন আমি নিজে নিজে পড়তেও শিখিনি, তখন বাবা একটা বই কিনে দিয়েছিলআনন্দমেলা উপরে নাম লেখা ছিল, দুঃসাহসিক অভিযাত্রীরা সেই প্রথম তোমার সঙ্গে পরিচয় তারপর একের পর এক সংখ্যা ডুবোজাহাজ, উড়োজাহাজ, বনসাই, রোবট, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল সঅঅঅব ক্যাপ্টেন, তখন তুমি ছিলে সম্পাদক
আনন্দমেলার শুরু থেকে প্রায় পনের বছর তুমি ছিলে সম্পাদক আমাদের মনের মতন রঙিন একটা করে সংখ্যা প্রতি পক্ষে পৌঁছে যেত আমার মতো আরও অনেক ছোটো ছোটো বন্ধুর বাড়িতে শুনেছি সমসাময়িক সব লেখক লেখিকাকে তুমি ধরে এনেছিলে আমাদের আনন্দ দেওয়ার জন্য কাউকে আদর আপ্যায়ন করে, আবার কাউকে ধরে বেঁধে বন্দি করে লেখা আদায় করেছ

  

আচ্ছা, সত্যজিৎ রায় আমাদের প্রথম টিনটিনের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিলেন কৈলাসে কেলেঙ্কারি উপন্যাসে সেই টিনটিনকে তুমি বাংলায় অনুবাদ করে দু’পাতা দু’পাতা করে আমাদের পড়ালে ফরাসি ত্যাঁ ত্যাঁ কে টিনটিন আর স্নোয়ি কুকুরকে কুট্টুস বানিয়ে দিলে! ক্যাপ্টেন, এ শুধু তোমার পক্ষেই সম্ভব আর তাই তো আমরা পেলাম আর এক ক্যাপ্টেনকে, যিনি কথায় কথায় গালি দেন, গেঁড়িগুগলির দল কিংবা লক্ষ কোটি পোড়া ফোসকা সত্যি বড়ো হয়ে যাওয়ার পরও রেগে গেলে কাউকে গালি দিতে হলে সেই ক্যাপ্টেনের গালিই মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে
তুমি বলেছিলে, অনুবাদ করার সময় আক্ষরিক নয়, ভাবানুবাদ করা দরকার। তাই তো প্রয়োজন মতো লেখা, এমনকি ছবিও বদলে দিয়েছ ভারতীয় সংস্কৃতি আর মূল্যবোধ তোমার থেকে ভালো কে জানবে? সম্পাদক হিসেবে তুমি কেমন কড়া ছিলে শুনেছিলাম রতনকাকুর কাছে রতনকাকু হলেন রতনতনু ঘাটী, তখন আনন্দমেলার সম্পাদকীয় বিভাগে ছিলেন রতনকাকু প্রেমেন্দ্র মিত্র-র থেকে ঘনাদার লেখা নিয়ে এসেছিলেন সেই সময় বয়সজনিত কারণে ঘনাদার স্রষ্টার দৃষ্টিশক্তি খুব ক্ষীণ হয়ে পড়েছিল কিছু লেখা কাগজের বাইরে লেখা হয়ে গিয়েছিল তুমি নাকি রতনকাকুকে দিয়ে সেই লেখা ঠিক করিয়েছিলে

ক্যাপ্টেনের সঙ্গে আমি
স্কুলের উঁচু ক্লাসে তোমাকে অন্যরকম ভাবে চিনলাম কোথায় রঙিন দুনিয়া! সাদা-কালো পিঁপড়ের মতো সারি সারি লেখা হলুদ মলাটের পাঠ সংকলন আর সহায়ক পাঠ কার লেখা নেই সেখানে? ভারতচন্দ্র থেকে জীবনানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র থেকে তারাশঙ্কর, নজরুল ইসলাম থেকে শামসুর রাহমান তার মধ্যে তোমারও একটা কবিতা ছিল, ‘সবাই দেখছে রাজা উলঙ্গ...
খুব রাগ হত, জানো! কবি কী লিখেছেন, কেন লিখেছেন এসব কঠিন কঠিন সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হত দু’বছর ধরে সে সব নিঙড়ানি সহ্য করে দাঁতে পেন চিপে লিখে যেতে হত ছয়, নয় কিংবা বারো নম্বরের প্রশ্ন নম্বর বড়ো বালাই তবে কী জানো, আমাদের সময়ে তো বিখ্যাত প্রকাশনার সহায়িকা ছিল না, তাই নামকরণের সার্থকতা নিজেদের বানিয়ে বানিয়ে লিখতে হত
মিথ্যে বলব না, এই যে চিঠি লেখা, এটাও কিন্তু ওই সময়ই শেখা তারপরে পড়ার বাইরে কবিতা বেশি হত না যখন একটু বড়ো হলাম, তখন মন টানত রহস্য রোমাঞ্চ এক পুজোসংখ্যায় পরিচয় হল ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে কী নির্বিকার ভাবে জটিল রহস্য সমাধান করতেন সত্যি ক্যাপ্টেন, ভাদুড়িমশাই তোমারই এক অল্টার ইগো
জানো ক্যাপ্টেন, আমি জানতাম না, তুমি আমার বাড়ির কাছেই থাকো কতবার তোমার বাড়ির রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করেছি, কিন্তু কখনও জানতেই পারিনি চার দিকে উঁচু ফ্ল্যাট দিয়ে ঢাকা একটা দোতলা বাড়িতে তুমি থাকো আমার বন্ধু সমুদ্র তোমার ইন্টারভিউ নিতে না গেলে আমার যাওয়াও হত না তোমার ছবি তোলার জন্য
সেদিন তোমার জ্বর, তাও আমাদের সঙ্গে কত গল্প করলে কত পুরোনো দিনের কথা, গল্প, অভিজ্ঞতা আমাদের শোনালে সত্যি আমরা কত কম জানতাম! তারপর পড়লাম নীরবিন্দু - তোমার আত্মজীবনী জানলাম চান্দ্রা গ্রাম থেকে কলকাতা আসার গল্প পড়াশোনা আর খবরের কাগজে যোগ দেওয়ার ঘটনা
এই তো সেদিন তোমার লেখায় পড়ছিলাম তুমি সিঁথির মোড়ে বাস থেকে নেমে বাড়ি ফিরতে আমার বাবা, দাদু, এমনকি শ্বশুরমশাইও সিঁথির মোড় হয়ে বাড়ি ফিরতেন আর একটা মজার ঘটনা জানো, তুমিও যে আমার বাবার মতো ছেলের স্কুলভীতি কাটাতে স্কুলের সামনে বসে থাকতে এটা সদ্য জানলাম ওঁর স্মৃতিচারণ থেকে

    

এতক্ষণ ধরে ক্যাপ্টেন ক্যাপ্টেন বলে তোমাকে ডাকছি, তোমার মনে প্রশ্ন জাগছে কি? আসলে কী জানো, তোমার প্রথম যে লেখা আমি পড়েছিলাম তার নাম ছিল ক্যাপ্টেন ক্যাপ্টেন মিলিন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়, অ্যাস্ট্রোনট সেই যে পরাশর নক্ষত্রের বার্বেরিস গ্রহের এক উপগ্রহে অভিযান চালাতে গিয়ে সাংঘাতিক বিপদের সম্মুখীন হয়েছিলেন কীভাবে দলকে ক্যাপ্টেনের মতো নেতৃত্ব দিয়ে সবাইকে প্রাণে বাঁচিয়েছিলেন যতই লেখা থাক বিদেশী গল্পের ছায়া অবলম্বনে, আমি জানি ক্যাপ্টেন তুমি ছাড়া আর কেউ নয়
গত পঁচিশে ডিসেম্বর যখন সবাই আনন্দ করতে ব্যস্ত, তখনই খবর পেলাম তুমি আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেলে ক্যাপ্টেনের মহাকাশযান যত দূরে যেতে পারে তার থেকেও অনেক দূরে, এক না ফেরার দেশে সেই দূর দেশ থেকে তুমি এই চিঠিটা পেলে পড়ে দেখো জানি, তোমার বন্ধু অমলকান্তির সঙ্গে অনেকক্ষণ সময় কাটাচ্ছ আর আমি নিশ্চিত সেই দুনিয়াতেও এক নতুন আনন্দমেলা সাজিয়ে নিয়েছ
ভালো থেকো ক্যাপ্টেন!
ইতি
তোমার এক কখনও বড়ো না হতে চাওয়া বন্ধু
_____

গোলটেবিল:: অলৌকিক সৈকত - সৈকত মুখোপাধ্যায় :: আলোচনাঃ সৌগত সেনগুপ্ত


অলৌকিক সৈকত - সৈকত মুখোপাধ্যায়
আলোচনাঃ সৌগত সেনগুপ্ত

অলৌকিক রহস্য রোমাঞ্চ সংখ্যার জন্য ছোটো সম্পাদিকা যখন আমাকে লিখতে বললেন তখন ফোন রেখে বইয়ের তাকের দিকে তাকাতেই প্রথম যে বইটার দিকে চোখ গেল সেটা হল এইটা। অলৌকিক সৈকত। লেখকের নামও বইয়ের মলাটে জ্বলজ্বল করছে। তিনি হলেন এমন একজন লেখক যার লেখা সূচিপত্রে থাকলেই সবারই, বিশেষ করে ছোটোদের চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে।
লেখকের নাম এতক্ষণে সবাই বুঝে গেছ, তাই তাঁর প্রসঙ্গ ছেড়ে এবারে অন্য প্রসঙ্গে আসি। বইয়ের তাকে এত বই থাকতে এই বইটাই চোখে কেন পড়ল? তার কারণ হল বইটার আকার। তাকের বাকি বইগুলোর থেকে অনেকটাই বড়ো। ছোটোবেলায় ঠিক যেমন বই হাতে নিয়ে উপুড় বা চিৎ হয়ে শুয়ে, টেবিল চেয়ারে বসে অঙ্কের খাতার কিংবা ডেস্কের আড়ালে রেখে পড়তে ভালোবাসতাম ঠিক সেইরকম। শক্ত মলাটের আড়ালে পাতলা ক্ষীণকায় শখানেক পাতা। পাতার হরফগুলো বড়ো বড়ো, আর সঙ্গে অনেক ছবি। চাই কি একটু বুক ক্রিকেটও খেলে নেওয়া যায়। একেবারে ৩৬০° বিনোদন।
ছোটোবেলায় পড়া সেই সব সিনদোবাদ, আলাদিন, বহুরূপী কিংবা টুনটুনির গল্পের বইয়ের মতো এই বইয়েরও প্রকাশক নির্মল বুক এজেন্সি। প্রকাশককে প্রথমেই ধন্যবাদ দিতে চাই বইটাকে ছোটোদের মনের মতো করে প্রকাশ করার জন্য। যে বই হাতে নিলেই পড়তে ইচ্ছে করবে। ডিসেম্বর ২০১৭ অর্থাৎ গত বইমেলার ঠিক আগে প্রকাশিত এই বইটার দাম ১০০ টাকা।
ছোট্ট একটা ভূমিকার পরে ১০৪ পাতার এই বইটায় আছে বারোটা অলৌকিক গল্প। লেখক সৈকত মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা ধার করে বলি,
“...এই ভয়ের বারোটা গল্প এমনই অলৌকিক। চেনা জীবনের মধ্যে হেঁটে যেতে যেতে এই বইয়ের চরিত্রেরা হঠাৎই মৃত্যুর পরের জগতের একঝলক দেখতে পেয়ে অবশ হয়ে যায়...
সেই হিমশীতল মৃত্যুপরবর্তী দুনিয়ার ঝলক পেতে গেলে কী কী লেখা পড়তে হবে এসো দেখে নিই।
·        বিরামগড়ের বন্দী
·        চলে গেছি তবু আছি
·        খেলাঘর
·        কুয়াশার আড়ালে ওরা আসে
·        নীল চিতার হিম আগুন
·        প্রেত উলকি
·        রাতের নৌকা
·        সেই নদীটার নাম
·        বোষ্টমবুড়ির বাগান
·        নরকের চলচ্চিত্র
·        উইলিয়াম ব্রিজের প্রহরীরা
·        লাল বল
এই গল্পগুলোর পটভূমি বিভিন্ন জায়গায়। কখনও কলকাতা শহরে, কখনও বাংলার গ্রামে, পুরুলিয়া কিংবা উত্তরবঙ্গের চা বাগানে, ওড়িশা দিল্লি বা মহারাষ্ট্রের কোনও জায়গাতে। একাধিক ভূতুড়ে বাড়ি, দুর্গ, মন্দির, জলাভূমি, নদী আর অলৌকিক ঘটনার ডিপো যে জায়গা অর্থাৎ শ্মশানও উঠে এসেছে গল্পের পাতায় পাতায়।
প্রথম গল্প বিরামগড়ের বন্দী-তে ফেরারি গ্রুপ অফ হোটেলস-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর পি কে ঘোষাল বিরামগড়ের দুর্গ কিনে নিয়ে একটা হেরিটেজ হোটেল বানাতে চান। হতে চাওয়া হোটেল সেই দুর্গে রাত্রিবাস করে ঘোষালবাবুর কী অলৌকিক অভিজ্ঞতা হল?
দ্বিতীয় গল্প চলে গেছি তবু আছি গল্পের পটভূমি পুরুলিয়া। নিশিডাক নামের ভৌতিক অলৌকিক পত্রিকার নিয়মিত লেখক শিবুদা এক ভূতুড়ে বাড়িতে রাত কাটাতে গিয়ে অপঘাতে মারা যান। তার মৃত্যুর পরে পত্রিকার সম্পাদক অনীকের সেই বাড়িতে রাত কাটাতে গিয়ে কী অভিজ্ঞতা হয়?
তৃতীয় গল্প খেলাঘরের মূল চরিত্র নির্মাল্য বসু। নামজাদা ইন্টিরিয়র ডেকরেটর। ওড়িশার এক রাজপরিবারের বাড়ির ইন্টিরিয়রের কাজ করতে গিয়ে একটা কাঠ খোদাই করা মঞ্চ নিয়ে এসেছিলেন কলকাতার বাড়ির ছাদে একটা চামেলি কুঞ্জ তৈরি করার জন্য। ছাদের ওপর সেই গাছঘরের নিচেই হল নির্মাল্যবাবুর মেয়ে রুম্পার খেলাঘর। কিন্তু সেখানে খেলতে খেলতে কী ঘটল রুম্পার সঙ্গে?
এর পরের গল্প কুয়াশার আড়ালে ওরা আসে সুমন্ত দুবে নামের একজন পাকা ক্রিমিনালের। নয়ডার মথুরানাথ শর্মার কুকুরটাকে খুন করে মথুরানাথের বাড়ি ডাকাতি করতে বেশি বেগ পেতে হয়নি সুমন্তকে। মথুরানাথ শর্মা ছিলেন দৃষ্টিহীন। পুরো অপারেশন শেষ করে নিসান্ত রিসর্টে লুকিয়ে থাকার সময় কিসের আওয়াজ শুনল সুমন্ত?
নীল চিতার হিম আগুন গল্পটা পড়লে বোঝা যায় কেন সৈকত মুখোপাধ্যায়কে শ্মশান স্পেশালিষ্ট বলা যায়। এই বইতেও শ্মশানকেন্দ্রিক একাধিক গল্প আছে। শিবাইকালী শ্মশানের ঘাটবাবু নিতাই নস্কর। শ্মশানের চুল্লি খারাপ হয়ে যাওয়ায় সারাতে আসেন ডুসেলডর্ফের ডঃ সিদ্ধকাম মিত্র। চুল্লি সারানোর পরে কী দেখতে পায় নিতাই?
প্রেত উল্কি গল্পের পটভূমি বাংলা ঝাড়খণ্ড সীমানার বিধনিতে। পার্থ তার বন্ধু সাগ্নিকের আমন্ত্রণে গিয়ে জড়িয়ে পরে এক আজব ঘটনায়। থানার ওসি সাগ্নিক টেররিস্টদের সন্ধানে গিয়ে খবর পায় শিবসাধু নামের এক সাধুর খুন হয়ে যাওয়ার। যিনি আবার খুব ভালো উল্কি আঁকতে পারেন। সেই উল্কি থেকেই কোন রহস্যের সমাধান হল?
আহিরনের বিলের ধারে তান্ত্রিক দুর্লভ চক্রবর্তীর মন্দিরের গয়না চুরি করতে ঢুকেছিল ভজন। তান্ত্রিকের সম্মোহন শক্তির হাত থেকে বাঁচতে চোখ বেঁধে দেয় ভজন। নৌকা করে গয়না নিয়ে পালাতে যায় সে। শেষরক্ষা হয় কি? পড়তে হবে গল্প রাতের নৌকা
আই টি সেক্টরের সৌগত কুসুমপুরের ফরেস্ট বাংলোয় ছুটি কাটাতে এসে জঙ্গলের মধ্যে একটা নদী আবিষ্কার করে। সেই নদীর ধারে একটা ছেলের দেখা পায় সে। কিন্তু তাকে জিজ্ঞেস করেও নদীটার নাম জানতে পারে না। কিছুদূর হেঁটে একটা শ্মশানের কাছে পৌঁছায়। সেখানে গ্রামের কিছু মানুষ শবদাহ করতে এসেছেন। সৌগত কি জানতে পারে সেই নদীটার নাম?
শিল্পপতি শঙ্কর মণ্ডল প্রতিদিন রাত বারোটায় তাঁর নতুন ডিপার্টমেন্টাল স্টোর সম্ভারে ঘুরে যান। যে জমির উপরে সেই সম্ভার তা আগে ছিল এক বুড়ির জমি, সবাই জানত বোষ্টমবুড়ির বাগান বলে। বুড়ি মারা যাওয়ার পরে ছেলের থেকে জমিটা কিনে নিয়ে শঙ্কর মণ্ডল গড়ে তুলেছেন এই দোকান। গতবছর এই দিনেই বুড়ি মরেছিল। ডিজিটাল ডিসপ্লেতে তারিখটা দেখে চমকে উঠলেন শঙ্করবাবু। কী হল তারপর?
হরর ফিল্মের ডিরেক্টর রাজশেখর সেন তাঁর নতুন ছবি নরকের চলচ্চিত্র-র কিছু অংশ কম্পিউটার গ্রাফিক্স করার জন্য দায়িত্ব দিয়েছিলেন অ্যাডভান্সড অ্যানিমেটরসকে। তার কর্ণধার সুধাময় প্রধান একটা অ্যানিমেশন ফাইল পাঠানোর সঙ্গে একটা চিঠিও দিয়েছিলেন রাজশেখরবাবুকে। সেই ফাইলটার নাম নরকের চলচ্চিত্র। কম্পিউটারে সেই ফাইলটা ওপেন করলে কী হল রাজশেখরবাবুর?
এই বইয়ের একাদশ গল্প উইলিয়াম ব্রিজের প্রহরীরা। উনিশশো তিরানব্বইয়ের বন্যায় উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সে হড়কা বানে প্রচণ্ড ক্ষতি হয়। রুদ্রদেব তখন মধুঝোরা চা বাগানের জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার। এমনই বর্ষার রাতে জলস্রোতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিলিগুড়ি থেকে ফেরার সময় মধুঝোরার মুখে জুনালি নদীর উপর উইলিয়াম ব্রিজের রাস্তায় কাদের দেখল রুদ্র? কিভাবে সে বানভাসি ব্রিজ পার করল?
বইয়ের শেষ গল্প লাল বল আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় এক গায়ে কাঁটা দেওয়া ঘটনার মুখোমুখি। কুড়ি বছর আগে নবমীর দুপুরে পল্লবের মাসতুতো ভাই বিলাস মনিপুকুরের জলে ডুবে মারা যায়। একটা লাল বল জলে পড়ে গেলে সেটা তুলতে গিয়েই দুর্ঘটনা ঘটে। কুড়ি বছর পরে সেই নবমীর দুপুরে সেই মনিপুকুরেই একটা লাল বল ভাসতে দেখে পল্লব। তারপর কী হয়?
এই বারোটা গল্পের বারোটা প্রশ্নের উত্তর পেতে পড়তেই হবে অলৌকিক সৈকত। উৎসর্গ করা হয়েছে এই সময়ের অন্যতম সেরা কথাশিল্পী হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্তকে। বইয়ের প্রচ্ছদ আর অলঙ্করণ করেছেন অনিকেত রায়। রাতের নৌকা গল্পের তান্ত্রিক দুর্লভ চক্রবর্তীর সম্মোহনী দৃষ্টিকে শিল্পী প্রচ্ছদে এমন ভাবে সাজিয়েছেন যে সেই সম্মোহনে বইটা তাড়াতাড়ি পড়ে না ফেলা পর্যন্ত স্বস্তি নেই।
অলৌকিক সৈকতে পদচারনা করে তোমাদের কেমন লাগল আমাদের জানাতে ভুলো না। আমাদের ইমেল ঠিকানা হল - editor.desks@gmail.com
_____

গোলটেবিল::জীবরামের গল্প – হিমানীশ গোস্বামী :: আলোচনাঃ সৌগত সেনগুপ্ত


জীবরামের গল্প – হিমানীশ গোস্বামী
আলোচনাঃ সৌগত সেনগুপ্ত

পান্ (Pun) বা শব্দ নিয়ে কথার খেলায় অদ্বিতীয় ছিলেন শিবরাম চক্রবর্তী। যিনি নিজেকে শিব্রাম চকরবরতি বলতে বা লিখতে পছন্দ করতেন। তাঁর লেখা হর্ষবর্ধনের হাসির গল্প তোমরা সবাই পড়েছ। তরুণ হিমানীশ গোস্বামী একবার সেই শিবরামের হর্ষবর্ধন চরিত্রটিকে নিয়ে একটা গল্প লেখেন যার নাম ছিল চেঞ্জে গেলেন হর্ষবর্ধন। শিবরাম সেই লেখাটি পড়ে এতটাই খুশি হন যে তাঁর পরবর্তী গল্পসঙ্কলনে হিমানীশের গল্পটিকে স্থান দেন।
ম্যাজিক ল্যাম্পের এই হাসি স্পেশাল সংখ্যায় আজ সেই হিমানীশ গোস্বামীর একটা বই নিয়ে তোমাদের বলব। ১৯২৬ সালে অবিভক্ত ভারতের ফরিদপুরে তাঁর জন্ম। বাবা পরিমল গোস্বামী ছিলেন সে যুগের বিখ্যাত লেখক। শিবরাম চক্রবর্তীর সান্নিধ্যে এসে তিনি অনুপ্রাণিত হন হাস্যরসাত্মক লেখায়। এছাড়া রহস্য ও রম্যরচনা ছাড়াও ভ্রমণকাহিনি ও কার্টুনও এঁকেছেন তিনি। বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও প্রধানত আনন্দবাজার সংস্থার সঙ্গেই তিনি দীর্ঘ কর্মজীবন কাটিয়েছেন।
২০১২ সালের ১৪ই মার্চ তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। বিভিন্ন সংস্থা থেকে তাঁর একাধিক বই থাকলেও পূর্ণাঙ্গ রচনাসমগ্র প্রকাশ করার প্রয়াসে এগিয়ে আসেননি কোনও প্রকাশকই। অনেক বই এখন দুষ্প্রাপ্য।  সূর্য পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত জীবরামের গল্প বইটার কথা আজকে বলব। বইমেলা ১৪১২ বা ২০০৬-র শুরুর দিকে বইটি প্রকাশিত হয়। প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণে ছিলেন প্রণবেশ মাইতি। এই বইতে সঙ্কলিত হয়েছে জীবরামকে নিয়ে লেখা ১৭টি গল্প। যথাক্রমে,
·        জীবরাম কি বোকা ছিল?
·        চি চি চি চি চি
·        চোর চারু চরে জীবরাম
·        আত্মারাম খাঁচা ছাড়া
·        জীবরামের শেষ যাত্রা
·        ফৌজদাড়ি মামলায় জীবরাম
·        জীবরামের ম্যালেরিয়া মাসি
·        তাল-বেতালের গল্প
·        আগে মেসোর সঙ্গে মেশো
·        বনসাগর স্কুলের বনভোজন
·        কথা নিয়ে ঝামেলা
·        জীবরামের বিপদ
·        মামাদের মামাবাড়িতে জীবরাম
·        নরনারায়ণের খিদে নেই
·        পঞ্চবঁটি
·        কচুর মোরব্বা
·        জীবরামের ঘোড়াই ভ্রমণ
এই গল্পগুলো মূলত আনন্দমেলা ও কিশোর ভারতী পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৫ - ২০০৩ সালের মধ্যে। শুকতারা, টগবগ এবং নবকল্লোল পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয় একটা করে গল্প। কয়েকটি গল্পের প্রকাশকাল দেওয়া নেই।
এবার দেখা যাক জীবরাম আসলে কে? লেখকের কথায় শিবরাম চক্রবর্তী আবার ফিরে এসেছেন জীবরাম চকরবরতি নামে। মাঝে মাঝে শিব্রামের অনুকরণে তার নাম ডাকা হয়েছে জীব্রাম বলে। কিছু গল্পে লেখক নিজেও একটা চরিত্র। জীবরামকে লেখক ডাকে হিম্বাবু বলে, আর তাঁর স্ত্রীকে হিম্বিবি! জীবরাম প্রথমে পড়ত বনসাগর স্কুলে। সেটা গ্রাম বা মফস্বলের দিকে। পরের দিকে তাকে কলেজে পড়তে ও কলকাতা শহরে থাকতে দেখা গেছে। স্কুল থেকে কলেজে এসেও তার কথা নিয়ে খেলা বন্ধ হয়নি।
বিভিন্ন গল্পে জীবরামের বিভিন্ন বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় হয়, তাদের নামগুলোও দারুণ মজাদার। চর্যাপদ ধর, নরনারায়ণ, হরিনারায়ণ, চিরঞ্জীব, মনিটর পাঁচু। বনসাগর হাই স্কুলের সুপারিন্টেন্ডেন্ট ছিলেন দুর্গতিহরণ বাবু। দারোয়ান ছিল দুখিরাম। এদেরকেও কথার প্যাঁচে নাজেহাল করে তুলত জীবরাম। সেসব লেখা পড়লেই বুঝতে পারবে প্রায় সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ নিয়ে কী দারুণ খেলাই না দেখিয়েছেন হিমানীশ বাবু।
বিভিন্ন গল্পে জীবরামের বেশ কিছু মামা, মামী, পিসি-পিসেমশায় এমনকি মাসি-মেসোর উল্লেখ আছে। অনেক বন্ধুবান্ধবদেরও কাকা মামা মেসোমশায়রাও জীবরামকে চেনে। এই বইয়ের শেষ গল্পে জীবরামের মায়ের উল্লেখ আছে। সেখানে কথার খেলায় জীবরাম তার মাকেও নাস্তানাবুদ করেছে।
সূর্য পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত জীবরামের গল্প বইটার প্রথম সংস্করণের মূল্য ছিল ৫০ টাকা। মূল্য পরিবর্তন সাপেক্ষ। বইটির ISBN No. 81-89710-03-6.
উৎসর্গ পত্রেও লেখক তাঁর স্বভাবসিদ্ধ কথার খেলা থেকে বেরোতে পারেননি। সেটা তোমাদের জন্য এখানে তুলে দিচ্ছি।
....“এই বইটি যাদের হাতে দিচ্ছি তাঁরা সকলেই আমার সমসাময়িক, তাঁরা প্রত্যেকেই আমারই মতো গত শতাব্দীর লোক, যদিও এঁদের বয়স আমি ছাড়া কারোরই এগারো বছরের বেশি নয়।
এঁদের ডাক নামঃ ঋততোষ, গোডো, জোজো, বিষ্টু এবং বুনি।
এঁদের তোলা নামঃ ঈশাদৃতা, ঋষি, শ্রীজন, অর্ণব এবং তাতার।
এঁদের পদবিঃ গুহ, লাহিড়ি, বন্দ্যোপাধ্যায়, চক্রবর্তী এবং মুখোপাধ্যায়।
এঁদের বাসস্থানঃ সিঁথি, বসুপুকুর, বিধাননগর, পণ্ডিতিয়া (বালিগঞ্জ) এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রোড।
একটা কথা বলার আছে – কোন ডাক নাম, তোলা নাম এবং বাসস্থান কার কার সেটা ঠিক মনে পড়ছে না। এইটে একটা ধাঁধা – আমার কাছে এবং যাঁদের নাম ওপরে দেওয়া হল, তাঁদের কাছেও। এই ধাঁধাটির সঠিক উত্তর পরবর্তী সংস্করণে দেওয়া হবে (যদি সেটি প্রকাশিত হয়)।....”
এবারে তোমাদের কাজ হল বইটা খুঁজে জোগাড় করে পড়ে ফেলা আর ম্যাজিক ল্যাম্পকে জানানো কেমন লাগল আর যদি উপরের ধাঁধার সমাধান খুঁজে পাও তাহলে সেটাও আমাদের জানাতে ভুলো না, কেমন?

প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট পি. কে. এস. কুট্টি-র তুলিতে হিমানীশ গোস্বামী
_____

গোলটেবিল::অ্যাডভেঞ্চার ও রহস্য সমগ্র - অজেয় রায় :: আলোচনাঃ সৌগত সেনগুপ্ত


অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র - অজেয় রায়
রহস্য সমগ্র - অজেয় রায়
আলোচনাঃ সৌগত সেনগুপ্ত

আজকে তোমাদের একটা নয়, একসঙ্গে দু-দুটো বইয়ের সন্ধান দেব। দুটো বইই অ্যাডভেঞ্চার আর রহস্য-রোমাঞ্চে ঠাসা। বইদুটোর সম্পর্কে বিশদে বলার আগে চলো একটু জেনে নিই বইদুটোর লেখকের সম্পর্কে।
অজেয় রায়ের জন্ম ১৯৩৫ সালে শান্তিনিকেতনে। তাঁর নাম রেখেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিশ্বভারতীতে পড়াশোনা শেষ করার পরে তিনি কিছুদিন শিক্ষকতা করেছিলেন। সেখানকার ছাত্রছাত্রীদের মুখে মুখে বানিয়ে বলতে বলতে তাঁর গল্প বানানোর শুরু। পরবর্তীকালে সত্যজিৎ রায় ও লীলা মজুমদারের সান্নিধ্যে এসে লেখা শুরু আর শুরু থেকেই তা যাকে বলে সুপারহিট! লেখকের বিজ্ঞানভিত্তিক লেখা পড়ে মুগ্ধ হয়ে স্বয়ং সত্যজিৎ রায় তাঁর থেকে লেখা চেয়ে পাঠান সন্দেশে প্রকাশ করার জন্য। সারাজীবন শুধুমাত্র ছোটোদের জন্য লেখালিখি করে যাওয়া এই মানুষটি ২০০৮ সালে আমাদের ছেড়ে চলে যান। তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে সন্দেশ, শুকতারা, কিশোর ভারতী, আনন্দমেলা সহ সেই সময়ের সমস্ত শিশুকিশোর পত্রিকায়।
অজেয় রায়ের প্রথম যে বইটার কথা আজকে বলব সেটার নাম অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র। এতে আছে আটটা অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি। সেগুলো হল – মুঙ্গু, আমাজনের গহনে, ফেরোমন, মিস্টার বাসুর ফর্মুলা, মানুক দেওতার রহস্য সন্ধানে, রক্তচোষা, বাস্তেন দ্বীপে অভিযান এবং কেল্লা পাহাড়ের গুপ্তধন।
মুঙ্গু এই বইয়ের প্রথম উপন্যাস যা সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। প্রাণীবিজ্ঞানী প্রফেসর নবগোপাল ঘোষ, তাঁর ভাগনে সুনন্দ আর সুনন্দর বন্ধু অসিতের কলমে অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি লিখেছেন লেখক। আফ্রিকার টাঙ্গানিকার জঙ্গলে আর এক রহস্যময় দ্বীপে গায়ে কাঁটা দেওয়া অ্যাডভেঞ্চার। মুঙ্গু আসলে কী আর কীভাবে সেই রহস্য উদ্ধার হল তা জানতে হলে পড়তেই হবে।
আমাজনের গহনেও সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এখানেও মামাবাবু অর্থাৎ প্রাণীবিজ্ঞানী প্রফেসর নবগোপাল ঘোষ, তাঁর ভাগনে সুনন্দ আর সুনন্দর বন্ধু অসিতের কলমে অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি। পটভূমি এবারে আমাজনের অরণ্যনিখোঁজ বৈজ্ঞানিক সত্যনাথ সর্বজ্ঞর সন্ধানে আমাজন অভিযান।
বড়োগল্প ফেরোমন-এ আবার এই ত্রয়ী অর্থাৎ মামাবাবু, সুনন্দ আর অসিত। এবার আবার পটভূমি আফ্রিকা আর বিষাক্ত পিঁপড়ের কামড়ের হাত থেকে কীভাবে রক্ষা পেল তাই নিয়েই এই লেখা। এটাও প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল সন্দেশ পত্রিকায়।
এই বইয়ের চতুর্থ কাহিনি ডঃ বাসুর ফর্মুলা উপন্যাস যখন বই হিসাবে প্রকাশিত হয়, মুখবন্ধ হিসেবে লীলা মজুমদার লিখেছিলেন –
‘অজেয় রায় হলেন প্রকৃত বিজ্ঞানভিত্তিক কিশোর উপন্যাসের জগতে একজন বিশিষ্ট লেখক। এঁর গল্পে সরস ভাষায় প্রকৃত বৈজ্ঞানিক তথ্য পরিবেশন করা হয়এগুলি পাঠ্যপুস্তকের চাইতে বেশি মূল্যবান, কারণ ছেলেমানুষরা আনন্দ এবং আগ্রহের সঙ্গে পড়ে। এঁর প্রচ্ছন্ন রসিকতাগুলিও পরম উপভোগ্য। আজগুবি গল্প লেখা বরং সহজ, কিন্তু তথ্যসমৃদ্ধ আনন্দের উপাদানের অনেক বেশি দাম।’
সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত এই কাহিনিতে মামাবাবু আর তাঁর দুই ভাগনে কলকাতার আশেপাশেই ঘোরাঘুরি করেছেন রহস্য উদ্ধারে। ডঃ বাসুর ফর্মুলা কীভাবে চুরি গেল আর তা খুঁজতে গিয়ে সুনন্দ তাঁর বন্ধু তপনকে কীভাবে খুঁজে পেল তাই নিয়েই এই রুদ্ধশ্বাস উপন্যাস।
বেকার যুবক তপন কাজের সূত্রে ব্যাংককে পাড়ি দেয়। সেখানে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় ডঃ ইন্দ্র দত্তর। ব্যাংককের এক কিউরিও শপে তপন হদিশ পায় এক অসাধারণ দেখতে স্টাফড পাখির যার নাম বার্ড অফ প্যারাডাইস। সেই সূত্র ধরে ডঃ দত্তর সঙ্গে এক রোমাঞ্চকর অভিযানে শামিল হয় তপন। তারা প্যারাডাইস বার্ডের সন্ধানে ইন্দোনেশিয়া পাড়ি দেয়। সেই পাখির সন্ধান কি পাবে তারা? এই নিয়েই উপন্যাস মানুক দেওতার রহস্য সন্ধানে। প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল সন্দেশ পত্রিকায়।
পরবর্তী কাহিনি রক্তচোষা, শারদীয়া কিশোর ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এই গল্পে আবার সুনন্দ আর অসিতের দেখা পাওয়া যায়, যদিও মামাবাবুর উল্লেখ নেইঘাটশিলায় বেড়াতে যাওয়ার পর সেখানে এক রহস্যময় রক্তচোষা প্রাণীর আবির্ভাব হয়। কে সে?
বাস্তেন দ্বীপে অভিযান কাহিনিটি এই সংকলনে থাকা কাহিনিগুলোর মধ্যে সবথেকে শেষে প্রকাশিত। এটি ২০০৪ সালে ঝালাপালা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এটাও মামাবাবু আর অসিত-সুনন্দের অভিযান। কলকাতা বন্দরে আসা নাবিক মিকির থেকে এক শিলালিপির সন্ধানে তিনমূর্তি পাড়ি দেয় ইন্দোনেশিয়ার বাস্তেন দ্বীপে। তারপরে ঘটে যায় একের পর এক রহস্যময় ঘটনা।
এই বইয়ের শেষ কাহিনি কেল্লা পাহাড়ের গুপ্তধন সরাসরি বই হিসাবে প্রকাশিত হয় এশিয়া পাবলিশিং থেকে। অলঙ্করণ করেন সত্যজিৎ রায়। লেখক এবং তাঁর বন্ধু রতন ওড়িশার কেওনঝাড়ে কাকার বাড়ি বেড়াতে আসেন। সেখানে তাদের পুরনো বন্ধু ডাকুকে খুঁজে পায় তারা। তারপর তারা জড়িয়ে পড়ে কেল্লাপাহাড়ে একটা রোমহর্ষক অ্যাডভেঞ্চারে।
বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন রঞ্জন দত্ত। যদিও প্রচ্ছদের জিনস-শার্ট-চশমা পরিহিত দাড়িওয়ালা রিভলভার হাতে মানুষটি ঠিক কোন চরিত্রকে তুলে ধরেছেন বোঝা গেল না। অন্যদিকে রক্তচোষা ও বাস্তেন দ্বীপে অভিযান ছাড়া বাকি ছ’টি কাহিনিতে সত্যজিৎ রায়ের আঁকা আসল অলঙ্করণগুলো বইটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। ছবিগুলো দেখলে বোঝা যায়, শুধু নিজের কাহিনি নয়, অন্য লেখকদের কাহিনির সঙ্গেও কত মণিমুক্তো সাজিয়ে গেছেন তিনি
বইটির ভূমিকা লিখেছেন বিশ্বভারতীর বাংলা বিভাগের শ্রী অমল পাল। দে’জ পাবলিশিং থেকে ২০০৯–এর এপ্রিলে প্রকাশিত হয়। ৩৬৭ পাতার হার্ডবাউন্ড বইটির শেষে প্রতিটি লেখা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া আছে। দাম ৩০০টাকা (মূল্য পরিবর্তন সাপেক্ষ)ISBN নম্বরঃ 978-81-295-0929-1


এরপর যে বইটার কথা বলব সেটাও অজেয় রায়ের, রহস্য সমগ্র। খণ্ডে খণ্ডে অজেয় রায়ের সমস্ত লেখা প্রকাশ করার যে প্রচেষ্টা নিয়েছেন প্রকাশক এটা তাঁর দ্বিতীয় প্রয়াস। এই বইতে আছে উপন্যাস, বড়োগল্প ও ছোটোগল্প মিলিয়ে উনিশটা  কাহিনি। সেগুলো হল – অপারেশন ব্ল্যাক স্কোয়াড, মঙের চুনি, বাতিঘরের বিভীষিকা, চৌধুরীবাড়ির গুপ্তধন, রুদ্ধ-প্রাণ, ডাক্তার কুঠি, হাঙর উপদ্রব রহস্য, খুনে বৈজ্ঞানিক অন্তর্ধান রহস্য, অনুসন্ধানীর রহস্যভেদ, প্রতিশোধ, মন কথা কয় না, খাতা চুরি রহস্য, নন্দপুরে অঘটন, টিয়া রহস্য, মূর্তি চুরি, মরণের মুখে, ঘোষ বাগানের দানো, মেলায় ঝামেলা, কেদার বাবার রহস্য সন্ধান
এই কাহিনিগুলো মূলত কিশোর ভারতী, শুকতারা এবং সন্দেশ পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়। ঝালাপালা পত্রিকাতেও একটা কাহিনি প্রকাশিত হয়েছিল। যদিও বইটার নাম রহস্য সমগ্র, তা সত্ত্বেও কিছু বিজ্ঞানভিত্তিক, সামাজিক এবং হাসির গল্পও এর মধ্যে ঢুকে আছে। গল্পগুলো আছেও খুব ছড়িয়ে ছিটিয়ে।
প্রথমে বিজ্ঞানভিত্তিক লেখাগুলো নিয়ে বলে নিই। অপারেশন ব্ল্যাক স্কোয়াড পুরোপুরি একটা বিজ্ঞানভিত্তিক উপন্যাসএখানে ব্ল্যাক স্কোয়াড নামে এক সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের হুমকি থেকে এক শহরের প্রধানকে বিপন্মুক্ত করার কাহিনি। প্রকাশিত হয়েছিল কিশোর ভারতী পত্রিকায়।
বাতিঘরের বিভীষিকা-ও বিজ্ঞানভিত্তিক কাহিনি। বিশাখাপত্তনমের কাছে এক সমুদ্র-তীরবর্তী এলাকায় এই কাহিনি জাল বুনেছে। এক প্রাগৈতিহাসিক জীবের আক্রমণ কীভাবে বিভীষিকায় পরিণত হয়েছে তাই নিয়ে এই গল্প। সন্দেশ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়
রুদ্ধ-প্রাণ আবার আরেকটা বিজ্ঞানভিত্তিক উপন্যাসমানুষকে জরার হাত থেকে বাঁচাতে নিয়ন্ত্রিত শীতঘুমের ব্যবহার এই কাহিনির মূল ভাবনা। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পাশাপাশি চলে তার অপব্যবহার। সত্যি কি কাজে আসে সেই যুগান্তকারী প্রক্রিয়া? প্রকাশিত হয়েছিল কিশোর ভারতী পত্রিকায়।
পরের কাহিনি ডাক্তার কুঠিও বিজ্ঞানভিত্তিক লেখাএটাও কিশোর ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। মন নিয়ে যত গোলমাল সব সারানোর ডাক্তারের যে শত্রু হবে সে তো তোমরাও জানো বাকিটা পড়ে দেখো।
এই বইয়ের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানভিত্তিক লেখা হল মন কথা কয় না। বিজ্ঞানী প্রিয়রঞ্জন আবিষ্কার করেছেন এমন যন্ত্র যার সাহায্যে মনের ভাব গোপন রাখা যাবে না। জানাজানি হয়ে যাবার পর সেই ফর্মুলা নিয়ে শুরু হয় কাড়াকাড়ি। কীভাবে রক্ষা পেলেন প্রিয়রঞ্জন? এটা প্রকাশিত হয়েছিল কিশোর ভারতী পত্রিকায়।
হাঙর উপদ্রব রহস্যে আমরা আবার দেখা পাই বিজ্ঞানী মামাবাবু আর তাঁর ভাগনেদের। সিঙ্গাপুরের কাছে এক দ্বীপের সৈকতে কেউ স্নান করতে নামলেই কেন হাঙর তাড়া করে আসত তারই রহস্যভেদ হয়েছে এই বিজ্ঞানভিত্তিক কাহিনিতে। প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল শারদীয়া কিশোর ভারতী পত্রিকায়।
মঙের চুনি পড়ে মুগ্ধ হয়ে সত্যজিৎ রায় অজেয় রায়কে চিঠি লিখেছিলেন। স্বর্ণগর্ভা বার্মার পটভূমিকায় এই কাহিনি এক বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনেসন্দেশ পত্রিকায় এই কাহিনি প্রকাশিত হয়। দুঃখের বিষয়, অ্যাডভেঞ্চার সমগ্রের মতো এই বইতে সত্যজিৎ রায়ের আঁকা সেই অলঙ্করণ স্থান পায়নি।
অজেয় রায়ের এক অন্যতম সৃষ্টি শিব আর দেবুর চরিত্র দুটি। বীরভূমের এক গ্রামের স্কুল ছাত্র দুই বন্ধু প্রায়ই বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চারে মেতে ওঠে। কখনও তা রহস্য সমাধানের জন্য, আবার কখনও বা উপকারের লোভে। এই সিরিজের একাধিক রহস্য-কাহিনি থাকলেও এই বইতে জায়গা পেয়েছে এই একটা উপন্যাসই, যা কিশোর ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আশা করা যায়, পরবর্তী খণ্ডে গোয়েন্দা মানিকজোড়ের আরও লেখা তোমরা পড়তে পাবে।
এর পরে যে দুটো গল্পের কথা বলব সে দুটো হল খুনে বৈজ্ঞানিক অন্তর্ধান রহস্য আর খাতা চুরি রহস্য। প্রথমটা সন্দেশ আর পরেরটা ঝালাপালা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রথমটায় পারুলডাঙা গ্রামের স্কুলপড়ুয়া বাবলু আর সিরাজ উদ্ধার করে খুনে বৈজ্ঞানিককে। যতটা রহস্য, তার থেকে বেশি হাসি ও মজার কাহিনি এটা। খাতা চুরি রহস্যে কলকাতা শহরে এক শেফের রন্ধনপ্রণালী লেখা খাতা খুঁজে দেয় দুই যুবক গোয়েন্দা পুলক আর জয়।
পুলক আর জয়কে আমরা আবার পাই অনুসন্ধানীর রহস্যভেদ লেখায়বিশ্বনাথ মজুমদারের হারানো আংটির রহস্য উদ্ঘাটন করে তারা। পটভূমি কলকাতা, প্রথম প্রকাশকাল অজ্ঞাত।
অজেয় রায়ের এক অন্যতম সেরা সৃষ্টি রিপোর্টার দীপক রায়। বোলপুরের বঙ্গবার্তা পত্রিকার রিপোর্টার সে। বয়স বছর পঁচিশ। অবিবাহিত যুবকটি খবরের খোঁজে বিভিন্ন রহস্যের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। কখনও তাঁর সহযোগী হয় ভাইপো ছোটন আর ভাইঝি ঝুমা। শুকতারা পত্রিকায় গত শতকের আট ও নয়ের দশকে প্রায় প্রতিটি পূজাসংখ্যায় থাকত বীরভূমের পটভূমিকায় অজেয় রায়ের লেখা দীপকের অ্যাডভেঞ্চার। কখনও গুপ্তধনের সন্ধানে, কখনও ডাকাত দলের খোঁজে, কখনও বা ভণ্ড সাধুর জারিজুরি ফাঁস করতে। এইরকম সাতটা গল্প জায়গা পেয়েছে এই সংকলনে।
এই সংকলনের একমাত্র বেমানান গল্প হল প্রতিশোধ। এটা পুরোপুরি সামাজিক গল্প। সিউড়ি শহরের কিশোর মন্টু ঘরছাড়া হয়েছিল বিশে গুণ্ডার অত্যাচারে। মাকে নিয়ে মামাবাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়। সেই কিশোর সেই অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে সিউড়িতে ফিরে আসে। সে কি প্রতিশোধ নিতে পারে? এই নিয়ে একটা দারুণ সামাজিক ও শিক্ষণীয় গল্প। কিন্তু এই সংকলনের সঙ্গে একেবারেই মানানসই নয়
বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ রঞ্জন দত্তর। অ্যাবস্ট্রাক্ট প্রচ্ছদ, বেশ ভালোছোটোদের জন্য আকর্ষণীয় অলঙ্করণও খারাপ নয়, তবে অ্যাডভেঞ্চার সমগ্রর মতো সত্যজিৎ রায়ের আঁকাগুলো মিস করতেই হয়
এই বইটি সম্পাদনা করেছেন অরিন্দম দীঘাল ও সমুদ্র বসু। বইয়ের শুরুতে ছ’পাতা জুড়ে ভূমিকা লিখেছেন দু’জনে। বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেল ভূমিকা থেকে। যদিও তার অধিকাংশ তথ্য অজেয় রায়ের নিজের লেখা ‘গল্প লেখার গল্প’ থেকে সংগৃহীত। সম্পাদকের বয়ানের বদলে অজেয় রায়ের নিজের লেখাটি ছাপা হলে বইটি আরও আকর্ষণ বাড়াত। আশা রাখি পরবর্তী কোনও সংস্করণে সেটা আমরা পেয়ে যাব।
সবথেকে আশ্চর্যজনক হল এই বইয়ের শুরুতে ভূমিকারও আগে একটা ভুলে ভরা গ্রন্থপঞ্জী ছাপা আছে। যেখানে বানান ভুল তো আছেই, উপরন্তু নীলকুঠির জঙ্গলে নামে একটা কাহিনির উল্লেখ আছে যেটা আদপে বইটায় ছাপাই হয়নি। অন্যদিকে অনুসন্ধানীর রহস্যভেদ কাহিনির কোনও পরিচয় নেই। শুধু তাই নয়, প্রথম প্রকাশকালে কে কে সেই সেই কাহিনির অলঙ্করণ করেছেন তাঁদের পরিচয়ও নেই। সম্পাদকদ্বয় পরবর্তী সংস্করণে এইদিকে নজর দিলে এই বইটা একটা সর্বাঙ্গসুন্দর সংকলনে পরিণত হবে বলে আমার বিশ্বাস।
অজেয় রায়ের রহস্য সমগ্র দে’জ পাবলিশিং থেকে ২০১৭–এর জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয়। ৩৬০ পাতার হার্ডবাউন্ড বইটির দাম ৩৫০টাকা (মূল্য পরিবর্তন সাপেক্ষ)ISBN নম্বরঃ 978-81-295-2938-1
_____

আমার ম্যাজিক অভিযান:: ছোটা আম্বানার সিগন্যাল ঘর - সৌগত সেনগুপ্ত


ছোটা আম্বানার সিগন্যাল ঘর
সৌগত সেনগুপ্ত

       ছোটা আম্বানা জায়গাটা বাংলা ঝাড়খন্ড সীমান্তে, ধানবাদ থেকে পনেরো কিমি আগে আর আসানসোল থেকে জায়গাটার দূরত্ব তেতাল্লিশ কিমি খুব ছোটো একটা জায়গা তার থেকেও ছোটো একটা রেলস্টেশন সারাদিনে আট-দশ জোড়া ট্রেন থামে ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চল বলে উঁচুনিচু পাহাড়ি এলাকা দু’একটা টিলা ট্রেন থেকেই দেখা যায়
       আমার বন্ধু প্রসূন তখন ধানবাদের মাইনিং স্কুলে এম.টেক করছে সপ্তাহে সপ্তাহে কলকাতা-ধানবাদ যাওয়া আসা করে আমি তখনও এখনকার মতোই কলকাতায় চাকরি করি আমাদের মাঝেমধ্যে দেখা হয় প্রসূনের ফটোগ্রাফির শখ, ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়ায় অবসর সময়ে একদিন প্রসূন আমাকে বলল, “সৌগতদা, ছোটা আম্বানা যাবে?”
       আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম জায়গাটা কোথায় রে বাবা! ওর থেকেই শুনলাম ছোটা আম্বানা খুঁজে পাওয়ার গল্প ওখানে ট্রেন লাইনের ধারে স্টেশন থেকে কিছুটা আগে একটা টিলা আছে বললাম, “সে আর নতুন কী? ওরকম টিলা তো আরও অনেক জায়গায় আছে!”
       আরো জানলাম, শুধু টিলা নয়, টিলার উপরে একটা সিগন্যাল ঘর আর একটা সেমাফোর সিগন্যালও আছে যদিও সেটা এখন এই অটোমেটিক সিগন্যালের যুগে অকেজো শুধু তাই নয়, ওখানে রেল লাইনটা ইংরেজি ‘এস’ অক্ষরের মতো বেঁকে গেছেপ্রথমে ট্রেন থেকে দেখে আর পরে গুগল স্যাটেলাইট ইমেজ দেখে প্রসূনের মনে হয়েছে জায়গাটা এক্সপ্লোর করে দেখা দরকার ওখান থেকে ট্রেনের দারুণ ভিউ পাওয়া যাবে আর আশেপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশও খুব সুন্দর কাজেই একদিন ছোটা আম্বানা অভিযানে যেতেই হবে
       আমি তো এককথায় রাজি হয়ে গেলাম তখন কি জানতাম, সেই বেড়ানো সত্যি সত্যি অভিযানে পরিণত হবে!

       শুরুয়াত
       যদিও প্রসূনের মার্চ মাসে যাওয়া ইচ্ছে ছিল, কিন্তু সবদিক সামাল দিয়ে আমাদের যেতে যেতে সেপ্টেম্বর মাস হয়ে গেল অবশেষে সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি প্রসূন আমাকে জানাল ছোটা আম্বানা যাবার প্ল্যান ফাইনাল হচ্ছে আমাদের আর একজন সঙ্গী হল সিদ্ধার্থ আমরা ঠিক করলাম, ২০-২১শে সেপ্টেম্বর যাচ্ছি ২০ তারিখে রাত্রে আসানসোল, ওখানেই রাত্রিবাস পরেরদিন সকালে লোকাল ট্রেন ধরে ছোটা আম্বানা টিলা বিজয় এবং বেলাবেলি আসানসোলে ফিরে এসে ট্রেন পাল্টিয়ে কলকাতা ফেরা
       টিউশন ক্লাসকে অফিস ট্যুরের গল্প শুনিয়ে, আর অফিসে অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে যাবার জোগাড় করা হল। নিয়ে যাবার জন্যে প্রয়োজনীয় ব্যাগ না থাকায় আগেরদিন সেটা কিনতে হল। ২০ তারিখ সকালে একপ্রস্থ টিউশন সেরে প্রায় ছুটে ছুটে অফিস, পরেরদিন না আসার অজুহাত শুনিয়ে শেষমেশ প্রসূন সাড়ে পাঁচটা নাগাদ জানাল ও বাড়ি থেকে বেরিয়েছে আমার অফিস থেকে হাওড়া স্টেশন খুব কাছে হলেও রাস্তায় জ্যামের কথা সবাই জান
       প্রথমে ঠিক ছিল আমরা অগ্নিবীণা এক্সপ্রেসে যাব আর সাড়ে ন’টা পৌনে দশটার মধ্যে আসানসোল পৌছে যাব, আসানসোলের রিটায়ারিং রুম খুব ভালো ইত্যাদি কিন্তু সিদ্ধার্থ আসবে শিবপুর থেকে ওখানে পি.এইচ.ডি. করছে শিবপুর থেকে হাওড়া আসা খুব সহজ, কিন্তু সিদ্ধার্থ প্রথমে শিবপুর থেকে গড়িয়াতে ওর বাড়ি গিয়ে হাওড়া আসবে যাই হোক, আমারও সুবিধা হল বিভূতি এক্সপ্রেসে টিকিট কাটার জন্য ট্রেন যখন রাত আটটায় তখন তাড়াহুড়ো করারও কিছু নেই। পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে দেখতে লঞ্চে করে নদী পার হয়ে পৌনে সাতটাতেই পৌঁছে গেলাম।

       হাওড়া স্টেশন
       রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখেছ কখনও? রাতের আকাশের তারা যেমন গোনা যায় না তেমনি হাওড়া স্টেশনের মানুষের সংখ্যাও। পরিসংখ্যানবিদেরা টিকিট বিক্রি দিয়ে একটা পরিমাপ করেন ঠিকই, কিন্তু একটা সংখ্যা দিয়ে বর্ণময় হাওড়ার যাত্রীদেরকে মাপা যায় কি? দুটো টিকিট পকেটে নিয়ে স্টেশন চত্বরে ঢুকে প্রথম কাজ ছিল ট্রেন সংখ্যা ১২৩৩৩ আপ হাওড়া এলাহাবাদ সিটি বিভূতি এক্সপ্রেস কোন প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে খোঁজ করা। তা সে ছাড়বে ১০ নম্বর থেকে। এরপর আমার দুই নম্বর কাজ আসানসোল স্টেশনের রিটায়ারিং রুম বুকিং করা কিন্তু কাউন্টারের লোক বলল সেটা নাকি আসানসোল গিয়েই করতে হবে। প্রসূন জানিয়েছে মেট্রোতে এসপ্ল্যানেড আসবে, তারপর বাস, ও তখন কালিঘাটে সিদ্ধার্থ তখন বাড়ি থেকেই বেরোয়নি। ছেলেটা মনে হয় ঝোলাবে!
       আমার তিন নম্বর ও শেষ দায়িত্ব রাতের খাবার কেনা, ফুড প্লাজা থেকে। আমি খুব ফুডি নই তাই খাবার বাছতে গিয়ে হিমশিম হিমশীতল খাবার নাকি উষ্ণ, তার জন্য প্রসূন আসা অবধি অপেক্ষা করতেই হল। শেষে তিন প্যাকেট বিরিয়ানি প্যাক করে নেওয়া হল রাতের জন্যে। আমি নিজে ভেবেছিলাম রাতের খাবার বোধহয় আসানসোল স্টেশনে করতে হবে এই প্যাকিংয়ের বিষয়টা মাথায় আসেনি। এই লিডারশিপ কোয়ালিটির জন্যে না প্রসূন নতুন জায়গা আবিষ্কার করেছে!
       প্রসূন আর সিদ্ধার্থর বার্থ ছিল ২০ আর ২৩, আর আমার ৪ সবগুলোই এস ৯এ। ট্রেন দিয়ে দিয়েছে প্ল্যাটফর্মে, এদিকে সিদ্ধার্থর দেখা নেই। প্রসূন বলল, সিদ্ধার্থ নাকি এরকম দেরি হামেশাই করে যাই হোক,  ফোন করাতে এক চান্সে উত্তর, স্টেশনে ঢুকছিআমরা ২৩, ২৪ বার্থে গুছিয়ে বসলাম সিদ্ধার্থও এল, আর এসেই ইঞ্জিন দেখতে গেল। আমরা ২৩ নম্বরের লোকটাকে ৪ নম্বরে পাঠিয়ে দিলাম আমার ধারণা ছিল না, এত লোক এত রাত্রে আসানসোল যাচ্ছে তাও আবার রিজার্ভেশন করে! দু’একজন আবার রাজারহাটের প্রতিবেশী গলায় ট্যাগ ঝুলিয়ে ফ্রাইডে ইভনিং উইক-এন্ড কাটাতে বাড়ি ফিরছে ই-টিকিটের প্রিন্ট আউট নিয়ে সোজা আপার বাঙ্কে
       ট্রেন ছাড়ার ঝাঁকুনি পেলাম, ওদিকে সিদ্ধার্থ ইঞ্জিন দেখতে গিয়ে ভ্যানিশ হয়ে গেছে এদিকে প্রসূন নির্বিকার সিদ্ধার্থ নাকি এরকমই, ওর সঙ্গে স্কুল থেকে পড়েছে ট্রেন প্লাটফর্ম ছাড়ার আগেই সিদ্ধার্থ এল সে নাকি ট্রেন ছাড়ছে দেখে এস ১-এ উঠে ভেতর দিয়ে আসছে

       রাতের ট্রেনের সঙ্গী
       সন্ধের ট্রেনে যাত্রা মানেই মনে হয় সারারাতের পাড়ি কিন্তু এবারে সেটা নয় গভীর রাতে নেমে যেতে হবে। ঢিমেতালে হেলেদুলে হাওড়া থেকে ছেড়ে যথারীতি কর্ড লাইনে ঢুকল। প্রসূনের ট্রেনের গতি মাপার যন্ত্র রেডি, কিন্তু মোবাইলে সিগন্যালই নেই। আমি বসেছি ট্রেনের অভিমুখের বিপরীত দিকে আমার উল্টোদিকে প্রসূনসিদ্ধার্থ বসেছে কিউবের একেবারে বাইরের দিকে। ডানকুনির আগে পর্যন্ত কিছু হকার দেখা গেলেও তারপরে সব হাওয়া হয়ে গেল পুলিশের উর্দি পরা কে বা কারা এসে ব্যাগ সাবধানে রাখার উপদেশও দিয়ে গেল তবে ভিডিও রেকর্ডিং করতে দেখলাম না। যথাসময়ে ট্রেনে টিকিট পরীক্ষককে দেখা গেল তবে মুখে উপস্থিত বলাতেই কাজ হল, কাগজ, এস.এম.এস. কিছুই লাগল না এরপর ট্রেন বারুইপাড়ায় থামল কামারকুন্ডু, জৌগ্রাম আর একটা কোন স্টেশনে থামতে থামতে বর্ধমানে পৌঁছতে দেরি করিয়ে দিল বেশ কিছুক্ষণ। সেই দেরি আর ফিরে পাওয়া গেল না, অন্তত আসানসোল পর্যন্ত।
       বর্ধমানে ডাউন তুফান এক্সপ্রেসের সঙ্গে মোলাকাত হল যেটা এত লেট যে নাম-মাহাত্ম্য ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে কখন হাওড়া পৌঁছাবে কে জানে! বর্ধমানের পরে বিরিয়ানি খেয়ে নেওয়া হল সিদ্ধার্থ খুব স্বাস্থ্য সচেতন তাই ডিম খেতে কিন্তু কিন্তু করছিল কারণ, সেদিন সকালে একটা ডিম অলরেডি খাওয়া হয়ে গেছে আমি আর প্রসূন জোর করে খাওয়ালাম। দুর্গাপুর আসতে প্রসূনের পুরনো স্মৃতি ফিরে এল তা বলে প্রসূন স্কিৎজোফ্রেনিয়াক নয় কিন্তু! ও আগে দুর্গাপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ত কালিপাহাড়িতে অনেকক্ষণ দাঁড়াল আমার ঘোড়া সাহেবের কুঠির (কার লেখা বল তো? মনে পড়লে কমেন্ট করে দিও) কথা মনে হল আর ট্রেনটা আরও লেট করে আসানসোল পোঁছাতে রাত প্রায় ১১টা হয়ে গেল

রাতের আসানসোল স্টেশন

       রাতের অতিথি
       ঠিক ১১টার সময় ২নং প্ল্যাটফর্ম থেকে ধানবাদ যাবার শেষ মেমু লোকাল ছেড়ে গেলকাল সকালে আমরা ওইখান থেকে ওইরকম একটা ট্রেনে ছোটা আম্বানা যাব কিন্তু সে তো অনেক দেরি আগে রাতের জন্য মাথা গোঁজবার একটা আস্তানা পাওয়া যাবে কি? আমরা র‍্যাম্প দিয়ে ৪নং থেকে ২নং প্ল্যাটফর্মে এসে এনকোয়ারিতে খোঁজ নিলাম থাকার জায়গা পাওয়া যাবে কি না? প্রশ্নের উত্তরে জানা গেল, রুম নেই তবে ডরমিটরি খালি আছে। সেটার জন্যে আবার ভেতরে আসতে হল লেখালেখির ফাঁকে এনকোয়ারির টারমিনালে ট্রেন আসা যাওয়ার সফটওয়্যারটা দেখলাম। তখন দু’দিকেই ঘন ঘন ট্রেন আসার সংকেত। টাকা আর টিকিটের সঙ্গে আই.ডি. কার্ড দেখাতে হল প্রসূনের আই.এস.এম-এর আই.ডি (যেটা ডেট এক্সপায়ার করে গেছে), আমার পুরনো ঠিকানার ভোটের আই.ডি (যেখানে আমার রবীন্দ্র জাদেজার মতো গোঁফ)।
       তারপর সেই এনকোয়ারির লোকের পিছু পিছু ডরমিটরিতে উঠলাম। বাঁদিকে দুটো এসি রুম আর ডানদিকে এসি ডরমিটরি। মাঝে একটা করিডোর যার একদম শেষে একটা ছাদ থেকে স্টেশন চত্বরটা দেখা যাচ্ছে আকাশে বেশ মেঘ, চাঁদ তারা সব উধাওডরমিটরিতে ঢুকে আমরা একদম শেষের তিনটে কিউব দখল করলাম ডবল রুমের থেকে আরও ভালো। স্প্লিট এসিটাকে চিলড করে চালিয়ে ফ্রেশ হতে গেলাম ছাদের পাশে কমন টয়লেটে। হঠাৎ ঘরের আর বারান্দার আলো নিভে গেল আর ছাদের উপর একটা মুখ! কে উঁকি মারছে ওখানে? ছাদের পাঁচিলের পাশে ওখানে কে দাঁড়িয়ে? প্রসূন বা সিদ্ধার্থকে ডাকার মতো আওয়াজ বেরোচ্ছে না গলা থেকে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আলো এসে গেল।

আসানসোল স্টেশনের ডরমিটরি

       তারপর যা দেখলাম তাতে গলা দিয়ে আওয়াজ সত্যি বন্ধ হয়ে গেল! ছাদের ওপাশে একটা বিশাল বড়ো হোর্ডিং যেখান থেকে মুখ দেখাচ্ছেন তৎকালীন ক্রিকেট অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি। অন্ধকারের মধ্যে দৃষ্টিবিভ্রম আর নিজের বোকামি বুঝতে পেরে ঘটনাটা পুরো চেপে গেলাম বাকিদের কাছেহালকা ঠাণ্ডায় রাত্রে ঘুমটা ভালোই হল

       সকাল, ২১শে সেপ্টেম্বর
       আসানসোল থেকে ছোটা আম্বানা যাওয়ার মেমু ট্রেন সকাল ৫.১০-এ, তাই সাড়ে চারটের মধ্যে উঠে তৈরি হয়ে নিতে হল। সকালবেলার কাজগুলো সেরে, মহিলার কাছে কম্বল ফেরত দিয়ে টিকিট কাউন্টারে লাইন দিলাম। আসানসোল থেকে ছোটা আম্বানার রিটার্ন টিকিট নিল ২০ টাকা করে একেকজনেরএর মধ্যে অগ্নিবীণা আর হলদিয়া যাবার ট্রেনের ঘোষণাও করেছে। সিদ্ধার্থ আর প্রসূন কিছু খাবার কিনতে গেল। দু’নম্বর প্ল্যাটফর্মে যেতেই ট্রেন ঢুকে গেল১ নম্বর থেকে হলদিয়া এক্সপ্রেস, ৫ নম্বর থেকে অগ্নিবীণা আর ৬ নম্বর থেকে বর্ধমান যাবার মেমু ছাড়ার জন্যে রেডিশনিবার হলেও অত ভোরে আসানসোল স্টেশনে অনেক লোক কেউ কলকাতা যাবে, কেউ আবার যাবে আদরা।

অন্ধকারে আসানসোল স্টেশনের বোর্ড জ্বলজ্বল করছে

অন্ধকারে ট্রেন চলেছে বাঁদিকে আদ্রা যাওয়ার লাইন বেঁকে গেছে

       আকাশে মেঘ ভরা, রাত্রে বৃষ্টিও হয়েছে। বারো বগির মেমু ঠিক সময়েই ছাড়ল। বাঁদিকে লোকো শেড পার করে আদরা যাবার সিঙ্গল লাইন বেঁকে গেলবরাচক, সীতারামপুর, কুলটি পার করার পর বাইরে একটু একটু আলো দেখা গেল। আমরা ততক্ষণে তিনটে জানালার ধার বেছে ক্যামেরা নিয়ে বসে পড়েছি। বৃষ্টি নেই, তাই রক্ষে। যদিও সকাল থেকেই কুয়াশা ভরা মেঘলা আবহাওয়া, যেটা ছবি তোলার একেবারে বিপরীত। বরাকর নদী পার করে বাংলা থেকে ঝাড়খণ্ডে ঢুকলাম মোবাইলে এসএমএস এল, বিহারের নেটওয়ার্ক আপনাকে স্বাগত জানায়। কুমারডুবিও পেরোনোর পরে খেয়াল করলাম ট্রেনে লোক উঠতে শুরু করেছে ধানবাদে সকালে অনেকেই কাজে যাচ্ছে স্কুলপড়ুয়া মেয়েদেরও দেখলাম। বলতে ভুলে গেছি, মুগমার পরে গ্রেডিয়েন্ট শুরু হল কুমারডুবি (MSL ১৩৮) থাপরনগর (MSL ১৪৪), কালুবাথান (MSL ২৩৬) পার হয়ে গেলাম। মাঝে মাঝে পাশের লাইনটা দূরে সরে যাচ্ছে, জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে, আবার পাশে এসে যাচ্ছে কিছুদুর গিয়ে। ট্রেন থেকে প্রসূন টিলাটা দেখাল আর একটু পরেই ট্রেন এসে থামল ছোটা আম্বানাতে (MSL ১৯৪)।

ভোরের বর্ষাভেজা কুলটি স্টেশন

জঙ্গলের মধ্যে মেমু লোকাল

       শিখর অভিযান
       স্টেশনে নেমে দেখি, ঘাস তখনও ভিজে। স্লীপার ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চললাম শিখরের দিকে। এর মধ্যে আবার হু হু করে হাওড়ামুখী ডাউন কোলফিল্ড এক্সপ্রেস এসে আমাদের পাশ দিয়ে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল। ক্যামেরার EXIF বলছে সময়টা ৬.২৭। লাইন থেকে নেমে দাঁড়ালাম। প্রথমে স্লীপার, তারপরে লাইনের পাশে পায়ে চলা রাস্তা দিয়ে এগোতে হল। এরপরে আর রাস্তা নেই আগাছা আর চোরকাঁটা ভরা অসমতল ঢালু জমি। সেসব ভেদ করে ধীরে ধীরে উঠতে লাগলাম।

হাওড়াগামী ডাউন কোলফিল্ড এক্সপ্রেস

       হিলটপে পৌঁছে প্রাথমিক কাজের মধ্যে ছিল ইনসেক্টিসাইড স্প্রে করা পোকার উপদ্রবের থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রসূন ওটা কলকাতা থেকেই নিয়ে গিয়েছিলএকদিকে দূরে ছোটা আম্বানা স্টেশন দেখা যাচ্ছে অন্যদিকে লাইনজোড়া বাঁক নিয়ে দিগন্তে মিলিয়ে গেছে আগের স্টেশন কালুবাথানের দিকে। আশেপাশে ছোটো বড়ো টিলা, দূরে দূরে দু’একটা গ্রামও দেখা যাচ্ছে। আশেপাশে মানুষজনের কোনও চিহ্ন নেই একটা লম্বা সিগন্যাল পোস্ট আর পাশে একটা ছোটো ইটের তৈরি ঘর আছে। ঘরের ভেতরে ধুলো ভর্তি, বহুদিনের অব্যবহারের প্রমাণ

সিগন্যাল পোস্ট আর পাশে একটা ছোটো ইটের তৈরি ঘর (ছবি – প্রমিত মিত্র)

       ঘরের ভেতরটা পরিষ্কার করে প্রসূনেরই আনা শতরঞ্জি পেতে ব্যাগগুলো রাখা হল। তখনও আকাশে মেঘ যে কোনও সময় বৃষ্টি আসবে। নিচের রেললাইন দিয়ে দু’দিকেই ঘন ঘন মালগাড়ি যাচ্ছে। কয়লাখনি এলাকা বলে তার বেশিরভাগ কয়লার ওয়াগন। সঙ্গে শিয়ালদা রাজধানী, আসানসোল বারাণসী প্যাসেঞ্জার, হাওড়াগামী মুম্বাই কলকাতা মেলের মতো যাত্রীবাহী ট্রেনও যাচ্ছে একের পর এক
       আকাশে অল্প আলো ফুটেছে একটা নীল রঙের পাখিকে দেখে সিদ্ধার্থ আর প্রসূন ডি এসেলারের লেনসবন্দী করতে শুরু করল আমি আমার পয়েন্ট অ্যান্ড শুট কোডাক ক্যামেরাতে চোখ লাগিয়ে দেখলাম, ও মা, গাছপালা সবই দেখা যাচ্ছে, পাখির চোখ ছাড়া! ওটা আমার ক্যামেরার নাগালের বাইরে। সিদ্ধার্থ বেশ কয়েকটা ছবি তুলে এলসিডিতে দেখাল, নীলকণ্ঠ পাখি। ততক্ষণে রোদটা ভালোই উঠেছে প্রায় ৯টা বাজতে চলল এই সময় কলকাতায় সকালবেলাতে অফিস যাবার জন্যে ট্রেন আর মেট্রোতে ঠেলাঠেলি করি এখানে নিজেরা ছাড়া একটা লোকও নেই বিষয়টা অবাক লাগাতে প্রসূনকে বললাম প্রসূন পাত্তাই দিল না লোকজন আসলে নাকি, কে, কী, কেন, কোথা থেকে এসেছি, হাজারটা প্রশ্ন করবে আর আমাদের ছবি তোলা পণ্ড হবে।

শিয়ালদাগামী ডাউন রাজধানী এক্সপ্রেস কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে

নীলকন্ঠ পাখি (ছবি – সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়)

       এরপর আপে ডাউনে পরপর অনেকগুলো ট্রেন গেল এল যাদের মধ্যে বৈদ্যনাথধাম-রাঁচি এক্সপ্রেস, ধানবাদপাটনা এক্সপ্রেস এই দুটো ট্রেনের বোর্ড দেখে বুঝলাম। এদের পরে আসানসোলগামী মেমু এল এটাও কামরার রঙ দেখে চিনলামআর দুটো ট্রেন দেখার পরিকল্পনা ছিল, শতাব্দী এক্সপ্রেস আর দুরন্ত এক্সপ্রেস। এগুলো চলে যাবার পরে আমরা নিচে নামতে থাকব, আর ছোটা আম্বানা স্টেশনে গিয়ে আসানসোলগামী ট্রেন ধরব। সওয়া ন’টা নাগাদ আপ লাইনে শতাব্দী আসবে। প্রসূন একটা কাশফুলের ঝোপের পাশে ক্যামেরা বসিয়েছে। সিদ্ধার্থ অবশ্য পাহাড়ের উপর থেকেই রেডি। শতাব্দী এল ঠিক ৯.১৮-তেছবি তোলা শেষ হলে সেগুলো একপ্রস্থ ফিরে দেখছি, আর মাঝে মাঝে কুট কুট চপর চপর করে ট্রেল মিক্স খাচ্ছি

মেঘলা আকাশের নিচে ধানবাদ আসানসোল মেমু লোকাল

রাঁচিগামী আপ শতাব্দী এক্সপ্রেস (এখন আর ট্রেনটাকে এরকম দেখতে নেই)

       এবার শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আসবেন দুরন্ত এক্সপ্রেসআর মিনিট কয়েকের অপেক্ষা, ব্যস, আমাদের ছোটা আম্বানা অভিযান শেষ। আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম সিদ্ধার্থ বা প্রসূন কেউ আমাকে থামতে বলল। চারদিকে একটাও শব্দ নেই সারা পৃথিবী যেন এখানে এসে বোবা হয়ে গেছে। এই নিস্তব্ধতার মধ্যে স্পষ্ট শুনতে পেলাম একটা ক্ষীণ আওয়াজ, গোঁ গোঁ গোঁ গোঁ... জেনারেটর কারের আওয়াজ আর ইলেকট্রিক ইঞ্জিনের হর্ন ট্রেন আসছে, দুরন্ত আসছে কিন্তু কোথায়? ছোটা আম্বানা স্টেশন পার করে প্রথম এস কার্ভ পার করে সে তখন আমাদের ক্যামেরার নাগালে সামনে সাদা ইঞ্জিন, পেছনে সবুজ গাড়ি। পরে ক্যামেরার EXIF এ দেখছি ৬টা ছবি সবক’টা ৯.৩৩-এ। হু হু করতে করতে আমাদের দশ মিটার সামনে দিয়ে বাঁক নিয়ে সে গাড়ি আসানসোল-দুর্গাপুর-বর্ধমান হয়ে সোজা শিয়ালদার দিকে এগিয়ে গেল। প্রসূন আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “মিশন সাকসেসফুল
       এবার শিখর থেকে নেমে আসার পালা।

শিয়ালদাগামী ডাউন দুরন্ত এক্সপ্রেস

       অভিশপ্ত টিলার ভূতুড়ে কিসসা
       ফেরার পথে সাইকেল নিয়ে চলা দুটো ছেলের সঙ্গে দেখা হল তার মধ্যে একজন আবার ধানবাদের একটা পলিটেকনিকের জ্যাকেট গায়ে সেখানে আবার প্রসূনের বন্ধু ফ্যাকাল্টি। আমাদের বাংলাতে কথা বলা শুনে ছেলেগুলো বাংলাতেই জিগ্যেস করল, আমরা কোথা থেকে এসেছি আর কোথায় গেছিলাম কলকাতা থেকে ওই টিলা দেখতে এসেছিলাম শুনে এমনভাবে তাকাল যেন এলিয়েন দেখছে! তারপর ঠেঠ দেহাতি ভাষায় কীসব বিড়বিড় করতে করতে সাইকেল নিয়ে এমনভাবে গ্রামের দিকে দৌড় দিল যেন বাঘে তাড়া করেছে পায়ে পায়ে প্ল্যাটফর্মে এলাম।
       আমাদের রিটার্ন টিকিট কাটাই ছিলস্টেশনে এসে চায়ের দোকানে বাংলা হিন্দি মিশিয়ে চা পাওয়া যাবে কি না জিগ্যেস করতে প্রৌঢ় চা-দোকানি সেই এক কথা রিপিট করল, আমরা কারা, কোথা থেকে কেন এসেছি ওই টিলার কথা শুনে তিনি এক আশ্চর্য কাহিনি শোনালেন সে এক ঐতিহাসিক ঘটনা ইলেক্ট্রনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করার আগে গ্র্যান্ড কর্ড সেকশনে ওই সেমাফোর সিগন্যাল চালু ছিল ভারতীয় রেলের বিভিন্ন জায়গায় আজও চালু আছে খুব রহস্যজনকভাবে অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে দু-দু’জন সিগন্যালম্যান রাতের অন্ধকারে উধাও হয়ে গেছে ওই ঘর থেকে তাদের আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি তারপর ওই সিগন্যাল পোস্ট তুলে দিয়ে ছোটা আম্বানা আর কালুবাথান স্টেশনের মধ্যে অন্যত্র একাধিক সিগন্যাল পোস্ট বসিয়ে ট্রেন চলাচল চালু রাখা হয় এখন তো ইলেক্ট্রনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা এসে গেছে কিন্তু সেই যুগের সাক্ষী হয়ে সেই সিগন্যাল পোস্ট আর সঙ্গে ঘরটা এখনও টিঁকে আছে
       দোকানিবুড়ো আরও জানালেন, ওই জায়গাটা নিয়ে ওদের এতই ভয় যে ওখানে চাষ-আবাদ, এমনকি গরু ছাগল চরাতেও কেউ যায় না কেউ ভুল করে চলে গেলে তাদের নাকি কিছু না কিছু ক্ষতি হয়! বুঝলাম সেই ছেলেদুটোর চমকানোর কারণ বার কয়েক রাম নাম উচ্চারণ করে আমাদের সাবধানে থাকতে বললেন আমরা আশ্বাস দিয়ে বললাম, আমরা যখন টিলায় উঠে আবার নেমেও আসতে পেরেছি তখন আর কিছু হবে না উল্টে ওদের সাহস দিয়ে বললাম এই যে চোরকাঁটা আমরা জিনসে বেঁধে নিয়ে এসেছি এতে সব অপদেবতা-টেবতা পালিয়ে গেছে
       আসানসোল যাবার মেমু লোকাল আসার কথা ১০.১৩-এ আর সেটা আসানসোল পৌঁছানোর কথা ১১.৩০–এ সেইমতো আমরা প্ল্যান করে রেখেছি আসানসোলে অনেক সময় থাকবে, ঝাড়া হাত পায়ে চিন্তা করব কী কী করব দোকানদার বলেছিল মেমু লোকাল লেট করে কারণ, সেটা নাকি গয়া থেকে আসে সেটা যে এত লেট করবে কী করেই বা বুঝব! সিদ্ধার্থের আনা বারবন বিস্কুট খেতে খেতে কিছু ছবি তোলা হল। কিছু না কিছু দেখলেই দু’জনেই ছবি তুলতে থাকছে আর আমি চুপচাপ একটা বেঞ্চে বসে বসে ওদের লক্ষ করছি
       একটা মালগাড়ি এসে ঠিক আমাদের সামনেই দাঁড়িয়ে গেল ছবি তোলার সুবিধার জন্য সিদ্ধার্থ সেটার ওপাশে চলে গেছিল এদিকে ডাউনে জম্মু-তাওয়াই-কলকাতা-শিয়ালদা এক্সপ্রেস ঢুকে গেল আর সেটা আবার মাঝের লাইনেট্রেনটা দাঁড়াল ঠিকই, কিন্তু সিদ্ধার্থকে ডেকে আনতে আনতে ট্রেনটা আবার ছেড়ে দিল এদিকে মেমুরও কোনও হদিস নেই। সামনে দিয়ে ট্রেন চলে যাওয়াতে আমাদের তো মাথার চুল ছেঁড়ার অবস্থা সিদ্ধার্থ দিব্যি অম্লানবদনে বলল, “আমাদের তো লোকাল ট্রেনের টিকিট ওটা এক্সপ্রেস ছিল, চেকার ধরত
       এর পরে আর কথা হয় না অগত্যা মনোযোগ দিয়ে জিনস থেকে চোরকাঁটা ছাড়াতে শুরু করলাম।
       মেমু এল ১১.৩০ নাগাদ তখনও জল্পনা করছি, আসানসোলে নেমে রিটায়ারিং রুমে গিয়ে ভালো করে স্নান করতে হবে আমাদের তো ২৪ ঘন্টার জন্য ৩টে বেড নেওয়া আছে! জন আহারে লাঞ্চ করে ট্রেন ধরব তখন কি জানতাম উপরওয়ালা আমাদের চিন্তাভাবনা দেখে মুচকি হেসেছিলেন! মেমু বরাকর পর্যন্ত ভালো এলেও ওখানে দাঁড়িয়ে রইল আমরা প্লাটফর্মে বসে গল্পগুজব করতে শুরু করলাম বরাকর ছেড়ে কুলটিতে এসে আরও অনেকক্ষণ এবারে সত্যিই মনে হচ্ছিল টিলার অভিশাপ আমাদের উপরে পড়েছে শেষে সীতারামপুরে আসতে ঘোষণা হল, আপ শিয়ালদা মুজফফরপুর ফাস্ট প্যাসেঞ্জার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে। ট্রানজিট যাত্রীরা দৌড়ালেন ওটা ধরতে। আমরা তখন বসার জায়গা পেলাম যদিও সেই ট্রেন চলে যাওয়ার পরেও আমাদের ট্রেন দাঁড়িয়ে রইল সেই সময় মনে হচ্ছিল ট্রেনটা আদৌ কি চলবে কখনও? আশেপাশের নির্বিকার যাত্রীদের দেখে একসঙ্গে রাগ আর করুণা দুইই হচ্ছিল কথা বলে জানলাম, এটাই এ তল্লাটের রেওয়াজ আসানসোলে প্লাটফর্ম খালি না থাকার জন্য ট্রেনটা যতটা সম্ভব দেরি করে যাতে যতটা কম সময় প্লাটফর্ম দখলে থাকে
       শেষমেশ ট্রেন আসানসোলে ঢুকল। ঘড়ি দেখার ইচ্ছে হয়নি এখন EXIF দেখে লিখছি কুমারডুবি থেকে ট্রেন বরাকরে ঢুকেছে ১২.১০-এ, আর আসানসোলে এ ঢুকলাম ১.৪০-এ।

আকাশ ভরা মেঘের মাঝে বরাকর নদীর ব্রিজ পেরোচ্ছে মেমু লোকাল

       ফেরার কথা
       ভাগ্য ভালো ট্রেনটা দু’নম্বর প্লাটফর্মে দিয়েছিল আর ওভারব্রিজ পার হতে হল না। ধানবাদ আর গয়া যাওয়ার জন্য একঝাঁক যাত্রী দাঁড়িয়ে ছিলেন ট্রেনে ওঠার জন্য কোনওরকমে ব্যাগ সামলে নেমে এনকোয়ারিতে গিয়ে খোঁজ নিলাম হাওড়া যাওয়ার কী ট্রেন আছে লাক খারাপ থাকার তখনও বাকি ছিল! জম্মু-তাওয়াই-কলকাতা এক্সপ্রেস আমাদের সামনে দিয়ে চলে গেছে এরপরে তুফান এক্সপ্রেসের আগে কোনও ট্রেন নেই সেই ট্রেনেরও আশু কোনও সম্ভাবনা নেই হয়তো পাঁচটা নাগাদ ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেস আগে আসবে পূর্বা এক্সপ্রেস ঠিক সময়ে আসছে, কিন্তু সেই ট্রেনের আসানসোল থেকে হাওড়া টিকিট দেওয়া হয় না! ওঁরাই বুদ্ধি দিলেন বর্ধমান যাওয়ার মেমু লোকাল ধরে নিতে তাহলে বর্ধমান থেকে কানেক্টিং হাওড়া লোকাল পাওয়া যাবে। কিন্তু সেই ট্রেনটা দুপুর ২.০৫-এ ছেড়ে যাবে আর এতক্ষণে প্লাটফর্মে ঢুকেও গেছে। পরের ট্রেন কখন? ভয়লা! সেই ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেস! কিন্তু কেন? ৪.১০ আর ৪.৪৫-এ দুটো লোকাল থাকলেও সেদিন ডাউন লাইনে কালিপাহাড়ি আর রানিগঞ্জের মধ্যে ট্রাফিক আর পাওয়ার ব্লকের জন্য বাতিল থাকবেযদি তুফান আগে এসে যায়, দাঁড়িয়ে থাকবে
       আমরা খুব তাড়াতাড়ি শিয়ালদা যাবার ৩টে লোকাল ট্রেনের টিকিট কেটে নিলাম। স্নান তো ডকে উঠল, এখন কিছু খেতে হবে। জন আহারে বোর্ড দেখলাম আহ! চিকেন থালি মাত্র ৬৫ টাকা। আগে কুপন নিয়ে তারপর খাবার পাওয়া যাবে, সেলফ সার্ভিস। কাউন্টারে আমাদের ঠিক আগে যারা ছিলেন তারাও চিকেন থালি নিলেন, আমাদের টার্ন যখন এল মুরগি শেষ! সিদ্ধার্থ বলেই ফেলল, “এটাও টিলার অভিশাপ!”
       শেষে ভেজ থালির ট্যালট্যালে ডাল আর লাউয়ের সবজি খেয়ে মুরগি হয়ে ৫ নম্বর প্ল্যাটফর্মে নামলাম। ততক্ষণে মেমুর সব সিট ভর্তি হয়ে গেছে। এদিক ওদিক করে একটা ভেস্টিবিউল আর দরজার মাঝে (মেল এক্সপ্রেস ট্রেনে ওই জায়গায় টয়লেট থাকে) শতরঞ্জি পেতে বসলাম। আবার একচোট আলোচনা শুরু হল। আমরা অন্ডালে নেমে হুল এক্সপ্রেস ধরব কি না? শেষে ওই প্ল্যানটাও কাজে লাগল না কারণ, আমাদের মনে টিলার অভিশাপ নিয়ে প্রচ্ছন্নভাবে একটা ভয় কাজ করছে যদি হুল এক্সপ্রেসে ভিড় থাকে? অথবা লেট থাকে? অথবা বাতিল থাকে? তখন মাথায় আসেনি মোবাইলে একবার ট্রেনের রানিং স্ট্যাটাসটা দেখে নিই! কিছু সমাপতন আর অন্ধবিশ্বাস মনের মধ্যে কেমন প্রভাব ফেলে এটা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
       প্রচুর লোক অন্ডালে নেমে গেল কিন্তু আমরা সিট পেলাম না কারণ, যত লোক নামল আবার তত লোকই প্রায় উঠল আমাদের দেখাদেখি কি না জানি না, নাকি তারা ওইভাবেই যাতায়াত করেন, কাগজ বা প্লাস্টিক পেতে অনেকেই মেঝেতে বসে যাচ্ছেন। মাথার কাছে জানলা দিয়ে হালকা হাওয়া আসছেসিদ্ধার্থ আর প্রসূন পুরো সময়টা ঘুমিয়ে কাটাল আমি তিনটে ব্যাগ কোলের কাছে চেপে ধরে ঠায় জেগে রইলাম। খানার কাছে ডাউন হুল এক্সপ্রস ওভারটেক করল যেটায় ঠাসাঠাসি ভিড়। ভাগ্য ভালো যে অন্ডালে নেমে যাইনি বর্ধমানে ঢোকার আগে আমাদের লোকাল ট্রেনটা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল যে আমিও একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম। ততক্ষণে ওরা দু’জন উঠে পড়েছে। ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ট্রেন দাঁড়াবার পর ওরা আমাকে ডেকে ওঠালপাশেই মেন লাইন হাওড়া লোকাল ছিল কিন্তু তাতে মেমুর মতো সিঁড়ি নেই। ফলে মেমু থেকে নেমে পাশের ট্রেনে উঠতে বেশ কষ্ট করতে হল  আমার হাতে চোট লাগল, সিদ্ধার্থর চশমা খুলে গেল। কর্ড লাইনের লোকালের খোঁজ করতে জানা গেল সেটা একটু আগে ছেড়ে গেছে, কারণ আমাদের ট্রেন লেট করেছে। তখনও মেন লাইনের লোকাল ছাড়েনি, উঠে বসার জায়গা পেয়ে গেলাম।
       এরপর বাকি ট্রেন-জার্নিতে আর কিছু বলার মতো ঘটনা ঘটেনি শুধু দুটো ঘটনা না বললে এই ভ্রমণ অভিযান শেষ হয় না সে দুটোও কাকতালীয় কি না কী বলব! আমি আর প্রসূন বালি স্টেশনে নেমে এয়ারপোর্ট যাবার জন্য বাস ধরেছিলাম অন্যদিকে সিদ্ধার্থ হাওড়া হয়ে গড়িয়া যাওয়ার বাস ধরবে। আমরা বালি থেকে বেলঘরিয়া এক্সপ্রেস হয়ে সোজা এয়ারপোর্ট যাওয়ার একাধিক বাস থাকতেও যে বাসে উঠেছিলাম সেটা ডানলপ-চিড়িয়া মোড়-নাগেরবাজার হয়ে অনেক ঘুরে ঘুরে যায়। অন্যদিকে সিদ্ধার্থও হাওড়া থেকে গড়িয়া যাওয়ার এসি ৫-এর বদলে ভুল করে এসি ৫২-তে উঠে পড়েছিল যেটা নাকি সম্পূর্ণ অন্যদিকে যায়! মাঝপথে বাস থেকে নেমে অনেক ঝক্কি সামলিয়ে বাড়ি পৌঁছেছিল ও। প্রায় কাছাকাছি সময়ে তিনজনের কেন একইরকমের ভুল হবে অনেক ভেবেও মাথায় আসেনি সারাদিনের ক্লান্তি নাকি ভূতুড়ে টিলার অভিশাপ কে জানে!
       ওই টিলাটা সত্যিই ভূতুড়ে আর অভিশপ্ত কি না সেটা যাচাই করতে আর একবার ছোটা আম্বানা যেতেই হবে। তোমরা কেউ সঙ্গে যেতে চাও নাকি?
_____