Showing posts with label সোহিনী দেবরায়. Show all posts
Showing posts with label সোহিনী দেবরায়. Show all posts

ভ্রমণ:: চন্দ্র-বংশী - সোহিনী দেবরায়


চন্দ্র-বংশী
সোহিনী দেবরায়

২০১১-এর ডিসেম্বরে মা আর আমার বান্ধবী সোনালি বাস্কের সঙ্গে গিয়েছিলাম সোনালির গ্রামের বাড়ি বাঁকুড়ার গেঁড়েদহ গ্রামে। সোনালির মায়ের ছোটোবেলা আমাদের শহর ব্যারাকপুরে কাটলেও তিনি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন সাঁওতাল সম্প্রদায়ের এক পুরুষকে। তারপর থেকে তাঁরা বাঁকুড়ার গেঁড়েদহ গ্রামেই থাকেন। বিয়ের বছরখানেকের মধ্যেই সোনালির জন্ম। ছোটোবেলায় বেশ কয়েকবার মারাত্মকভাবে অসুস্থ হওয়ায় গ্রামে সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে সোনালিকে ব্যারাকপুরে ওর মামারবাড়িতে চলে আসতে হয়েছিল। সেই থেকেই ও এখানেই আছে। দিদাকে ছেড়ে যেতে ওর আর ইচ্ছে হয়নি। দিদার কাছেই মানুষ হয়েছে ও। ওর সঙ্গে আমার আলাপ স্কুলে। ব্যারাকপুর মিশন থেকে এসে ব্যারাকপুর গার্লস স্কুলে আমি যখন পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হলাম তখন থেকেই বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলাম সোনালিকে। কয়েকবছরে বন্ধুত্ব এতটাই বেড়েছিল যে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে আমরা দু’জন একে অপরের বাড়িতে যখন খুশি যাই, আসি, থাকি, খাই। সোনালির মুখে ওর গ্রামের বাড়ির গল্প শুনে আর না গিয়ে পারিনি। যাওয়ার কথা ছিল আমাদের দু’জনের। কিন্তু আমাদের বাড়ির লোক এভাবে আমাদের একা ছাড়তে রাজি না হওয়ায় সঙ্গে গেলেন আমার মা-ও। তবে মা যাওয়ায় মজা মোটেই কম হয়নি।
ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই আমরা গিয়েছিলাম। যাওয়ার সপ্তাহদুয়েক আগে থেকেই আমাদের দু’জনের মধ্যে ছিল এক প্রবল উত্তেজনা। আমি যেহেতু আগে কখনও গ্রামে যাইনি, গ্রামের ব্যাপারে যেহেতু আমার অভিজ্ঞতা একেবারেই নেই এবং এই ব্যাপারে সোনালি বেশ ভালোরকম অভিজ্ঞ, তাই ওদের গ্রামটা পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রের ঠিক কোন জেলার কোন জায়গায় অবস্থিত, সেখানে আমরা কীভাবে যাব, যেতে কতক্ষণ লাগবে, যাওয়ার পথে কোন কোন যানবাহনের সাহায্য নিতে হবে, গ্রামে ওদের মাটির বাড়ি কেমন দেখতে, ওদের বাড়ির ঠিক কোথায় থাকব, গ্রামে গিয়ে কী কী করব তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ সারাদিন ধরে সোনালি আমাকে দিতেই থাকত। আমিও অবাক হয়ে শুনতাম। তখন তো আর গুগল ম্যাপের যুগ ছিল না (বা থাকলেও তা আমাদের হাতের নাগালের মধ্যে ছিল না), ফোন হাতে নিয়ে খুব সহজে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সবটুকু দেখে নেওয়ার উপায় ছিল না। ওর সঙ্গে গল্প করে বাড়ি ফেরার পরেই বুক-শেলফের এক কোণে থাকা মানচিত্রের বইটা নিয়ে বসতাম। পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্র থেকে খুঁজে নিতাম বাঁকুড়ানামের জেলাটাকে। মানচিত্রর মধ্যে দিয়েই দেখতে চাইতাম ওদের গেড়েদহনামের গ্রামটাকে। কিন্তু কিছুতেই সেই নামটুকু দেখতে পেতাম না। কেন যে গ্রামের নামগুলো মানচিত্রে থাকে না কে জানে! না দেখতে পেলেও প্রতিদিন ওর বর্ণনা শুনেই সে না-দেখা সাঁওতালি গ্রামের রূপ আমার ড্রয়িং খাতার পাতায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করতাম।
ডিসেম্বরের এক কুয়াশা-মাখা ভোরে ব্যারাকপুর স্টেশন থেকে অটো ধরে প্রথমে পৌঁছেছিলাম দু-পয়সার ঘাট, দু-পয়সার ঘাট থেকে ফেরি করে গঙ্গা পেরিয়ে শ্যাওড়াফুলি ঘাট, শ্যাওড়াফুলি ঘাট থেকে ট্রেন ধরে তারকেশ্বর স্টেশন, তারকেশ্বর স্টেশন থেকে বাস ধরে আরামবাগ, আরামবাগ থেকে বাস পালটে বিষ্ণুপুর, বিষ্ণুপুর থেকে আবার বাস পালটে বাঁকুড়ার তালডাংরা বাজার। তালডাংরার বাজারে সোনালির বাবা তাঁর নিজের ট্রেকার গাড়িটি নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। কাকুর ট্রেকারে করেই আমরা চললাম গেড়েদহ গ্রামের দিকে। সামান্য উঁচুনিচু রাস্তা দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছালাম গেড়েদহ গ্রামে।
সেই আমার প্রথম গ্রাম দেখা। মাটির বাড়ি, সরষের খেত, ধানের খেত, ধানের গোলা, মাছভর্তি পুকুর, গোয়ালঘর, উঠোনে অবাধে ঘুরে বেড়ানো হাঁস-মুরগি-খরগোশ-ছাগলছানা সবটাই আমি প্রথম দেখেছিলাম। প্রথমবার শ্যালোর জলে স্নান করেছিলাম। বাঁধের জলে হাত-পা ছুড়ে সাঁতারের নিষ্ফল চেষ্টাতেও ত্রুটি ছিল না। মাটির ঘরের দালানে বসে থালার মতো বড়ো চাঁদ আর তারা ভরা আকাশ দেখেছিলাম। গ্রামের পথে পথে সোনালিকে পেছনে বসিয়ে সাইকেল চালিয়েছিলাম। আলাপ হয়েছিল ওদের পোষা দুই মোরগ চন্দ্র ও বংশীর সঙ্গে। চন্দ্র ও বংশী দু’জনেই খুব শক্তিশালী, সাধারণ মোরগদের থেকে অনেকটাই লম্বা, বড়োওরা মোরগ লড়াইয়ে নামে। মোরগ লড়াই যে গ্রামদেশের মস্ত বড়ো খেলা তা সেবারেই জানতে পেরেছিলাম। চাক্ষুষ করার সুযোগ হয়েছিল আরও পরে। চন্দ্র ও বংশী প্রতি ভোরে 'কুকুরকুক্কুকু' ডাকে আমাদের ঘুম ভাঙাত।
এক সকালে চন্দ্রকে পেলেও বংশীকে আর খুঁজে পাইনি। পরে খোঁজ করে জেনেছিলাম বংশী আগের রাতেই আমাদের পেটে চলে গিয়েছে। ভাবতেও পারিনি ধোঁয়া ওঠা ভাতের সঙ্গে মহাতৃপ্তিতে খালপোষ করা দেশি মোরগের ঝোল খেতে খেতে বংশীকেই খেয়ে ফেলেছি! বিষয়টা কিশোরী মনে এক মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। বেশ কিছুদিন অদ্ভুত একটা মনঃকষ্টেও ভুগেছিলাম। পরবর্তীতে আবার মাংস খাওয়া ধরতে অনেকটাই সময় লেগেছিল।
----------
ছবি - আন্তর্জাল

গল্পের ম্যাজিক:: আমার দিদি হওয়া - সোহিনী দেবরায়


আমার দিদি হওয়া
সোহিনী দেবরায়

তখন আমার তিন বছর বয়স। গোলু মোলু ফুলো পেটটা দেখিয়ে মা বলত বটে, “এখানে তোর পুঁচকে ভাই আছে... কিন্তু বছর তিনেকের আমি মোটেই তা বিশ্বাস করিনি। এ কীরকম বোকা বোকা কথা...!! আমাকে তো ভগবান এসে দিয়ে গেছিল মায়ের কোলে। তাহলে ‘পুঁচকে ভাই’ মায়ের পেটে কেন থাকবে...? তাছাড়া পেটটা ‘পুঁচকি ভাই’ থাকার জায়গা নাকি!! এসব জিনিস তো দোকানে কিনতে পাওয়া যায়। ওই যে গো ওই দোকানটা আছে না!! যেখানে সব মানুষের বাচ্চা কিনতে পাওয়া যায়...! রঙবেরঙের প্যাকেটে ভরে গোলুমোলুফুলো বাচ্চা বিক্রি হয়!
এসবই জানতাম আমি। হঠাৎ করে গভীর সমস্যায় পড়ে গেলাম। এটা তো ঠিক না। মা আমাকে কেন এভাবে মিথ্যা কথা বলছে!
কিন্তু কয়েকদিন বাদেই বুঝলাম, মা মোটেই মিথ্যা বলেনি। সত্যি সত্যি মায়ের পেট থেকেই পুঁচকি ভাইটা বেরিয়েছে। প্রমাণ আছে। মায়ের পেটে অপারেশনের দাগও দেখতে পাচ্ছি। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। আমিও তো মায়েরই মেয়ে। তাহলে আমি মায়ের পেট থেকে হইনি কেন...? চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছিল। ঝাপসা চোখেই দেখলাম রড দেওয়া একটা চাকা লাগানো কেমন অদ্ভুত ধরনের গাড়িতে কাপড়ে জড়ানো একটা ছোট্ট পুঁচকু ঘুমাচ্ছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। দেখতেই পাচ্ছিলাম না বাচ্চাটাকে।
পাপ্পা (মানে আমার বাবা) তখন আমাকে কোলে তুলে ভালো করে দেখালেন পুঁচকেটাকে। দেখেই মনটা ভালো হয়ে গেল। মায়ের পেট থেকে ও এসেছে... এই ব্যাপারটা যেন ভুলেই গেলাম। সেই আমাদের প্রথম দেখা।

কয়েকদিন বাদেই ও আর মা বাড়ি চলে এল। অত ছোটো একটা বাচ্চা আমাদের বাড়িতে থাকবে কীভাবে সেটা ভেবেই ভয় ভয় লাগছিল। ও খাবে কী? আমাকে তো ঠাম্মি কাঁটা বেছে মাছ আর ভাত খাইয়ে দেয়। আমি দাঁত দিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে খাই। মুখের মধ্যে ভাত টোবলা করেও রাখি না। মুখের মধ্যে ভাত রেখে দিলে কেউ ‘ভালো মেয়ে’ বলে নাকিন্তু পুঁচকেটা কি এসব পারবে...? ওর তো দাঁতও নেই। এসব ভেবে ভেবে পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু বাড়ির কেউ এটা বুঝতেই চাইছিল না। সবাই শুধু হাসছিল। যত্তসব বাজে পচা লোকজন।
সেদিনই বিকেলে মা আমাকে ডেকে বিছানার মাঝখানে বসিয়ে পুঁচকুটাকে আমার কোলে দিলেন। হালকা নরম ছোট্ট একটা ঘুমন্ত বাচ্চা। ভয় ভয় লাগছিল। কোলে নিতেই ঠোঁটটা অল্প কাঁপিয়ে ছোট্ট করে একটা হাই তুলল। যেন কিছু বলতে চাইল। ‘দিদি’ বলল কি?
কিছুদিন পর ওর নাম রাখা হল। ভালো নাম স্বর্ণাভ, আর ডাকনাম রোহন। আমি দুটোর একটাও ঠিক করে বলতে পারতাম না। আমি বলতাম, ‘মুনু’মুনু তখন ড্যাবড্যাব করে তাকাতে শিখে গেছে। আমিও ওকে কোলে নিতে শিখে গেছি। আর মুনুর সবথেকে ভালো ব্যাপার হল ও আমার কোলে উঠলে অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, একটুও কাঁদে না।
আমি যখন বছর চারেকের হলাম, ওকে ভালো মতো কোলে নিতে শিখে গেলাম। এমনকি ওকে কোলে নিয়ে চলাফেরা করতেও খুব অসুবিধা হয় না। কিন্তু একদিন কীভাবে যেন ও আমার হাত থেকে পড়ে গেল! অত জোরে কান্না দেখে আমি ভয়ে সিঁটকে গেছিলাম, বেশ কিছুদিন কোলে নিইনি।
ও একটু বড়ো হওয়ার পর টের পেলাম, ও আমাকে একবেলা না দেখলে কান্নাকাটি করে। আমি একা মামার বাড়ি থেকে যাওয়ার কথা বললে দৌড়ে এসে ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে গলা জড়িয়ে এক সুরে বলে যেত, ‘দিদিভাইয়া চল। আমি তোকে ছাড়া থাকতে পারব না আমি পড়তে বসলে ও পাশে এসে পড়তে বসে যেত। আমি পড়তে গেলে ও মায়ের সঙ্গে আমাকে আনতে যেত। ম্যাম দেরিতে ছাড়লে ও ‘দিদিভাইয়া আয় আয়’ করে কান্না শুরু করে দিত।
ততদিনে ও স্কুলে ভরতি হয়ে গেছে। স্কুল থেকে ফিরেই ওর কাজ ছিল আমি স্কুল থেকে ফিরেছি কিনা সে খোঁজ নেওয়া। তারপর আমাকে খুঁজে পেয়ে গেলে ওর খেলনা সাইকেলে আমাকে বসিয়ে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়ানো। আমিও কীভাবে যেন সেই ছোট্ট সাইকেলটায় ঠিক বসে যেতাম!
আর একটু বড়ো হওয়ার পর সাইকেলটা অকেজো হয়ে গেল। তখন শুরু হল দুপুরে পাঁচিল বেয়ে বাড়ির আমগাছে উঠে আম পাড়া। সেই আম কেটে নুন লঙ্কা চিনি মাখিয়ে দু’জনে মিলে খাওয়া। অদ্ভুত সুন্দর ছিল সেসব দিন।
পড়াশোনার চাপে, দুপুরে স্কুলে থেকে ক্লাস করার চাপে, বিকেলে স্কুল শেষে পড়তে যাওয়ার চাপে সেসব মায়াবী রূপকথার দিনগুলো চিরতরে হারিয়েই গেল।

অগুনতি মারপিট ঝগড়াঝাঁটি রক্তারক্তি কাণ্ডের মধ্যে দিয়েই আবিষ্কার করলাম আমরা কবে যেন বড়ো হয়ে গেছি। চোখের সামনে দিয়ে পুঁচকুটা কবে যেন বড়ো হয়ে এখন আমার থেকেও লম্বা হয়ে গেছে...!! পুঁচকে ভাইটারও বাইশ বছর বয়স হয়ে গেল...!!
এর মধ্যে অনেক কিছু পালটেছে। আমি ওকে আর মুনু বলে ডাকি না। রোহন বলে ডাকি। কলেজপড়ুয়া ছেলেকে মুনু বলে ডাকা যায় নাকি...! না বললে হয়তো ওর বা কারোর আপত্তিই থাকত না, কিন্তু সেসব মায়াবী দিনগুলো যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘মুনু’ ‘দিদিভাইয়া’... মায়াবী ডাকগুলোও হারিয়ে গেছে। ব্যস্ততা তার জালে সব জড়াতে জড়াতে সব কিছু কেড়ে নিচ্ছে যে...!
তবু ওর কথা মনে পড়লে চোখ বুজলেই যেন দেখতে পাই বেবিকটে শোয়ানো সেই কাপড় জড়ানো পুঁচকুটাকে।
----------
ছবি - সুকান্ত মণ্ডল

পুরোনতুন গল্প:: পিতার মস্তক থেকেই কি গ্রীকদেবী আথেনার জন্ম? - সোহিনী দেবরায়


পিতার মস্তক থেকেই কি গ্রীকদেবী আথেনার জন্ম?
সোহিনী দেবরায়

বৃষ্টিটা আরও জোরে শুরু হল। আকাশ বাতাস সমগ্র অলিম্পাস পর্বত কেঁপে আরও একটা বাজ পড়ল। তখনই শোনা গেল এক শিশুর কান্না। হ্যাঁ, একটু মন দিয়ে শুনলেই বোঝা যাবে এ এক নবজাত শিশুর কান্না। শিশুর পিতা দু’চোখ ভরে শিশুটিকে দেখলেন। কী অপরূপ দীপ্তি শিশুটির চোখে মুখে! সূর্যের মতো গায়ের রঙ, সোনালি চুল। পৃথিবীর সমস্ত রূপ নিয়ে জন্মেছে এই কন্যা। কী নাম রাখা যায় এই দেবকন্যার! না না, এখন অত সময় নেই নাম ভাবার। সে পরে হবে’খনআপাতত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই শিশুকে তার মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে অন্যত্র চলে যেতে হবে। যদিও সে ছোট্ট একটি লোহার বর্ম দিয়ে শিশুটিকে ঢেকে নিয়েছে তবুও একবার মনে হল বটে যে এই সদ্যোজাত শিশু মাকে ছাড়া বাঁচবে তো! কিন্তু তা ভাবার সময় এখন নয়। এই ঝড়জলের রাতেই তাকে অন্য কোথাও চলে যেতে হবে। কেউ যেন জানতে না পারে এই শিশুর মা কে কেউ জানবে না। কেউ না। কেউ যাতে না জানে তাই জন্যই তো তিনি এই ঝড়জলের রাতে একা এতটা এসে নিজে সন্তান প্রসব করিয়েছেন। না না না। মেটিস-এর গর্ভে এই সন্তান জন্মেছে তা কিছুতেই জানতে দেওয়া যাবে না। তিনি দেবরাজ জিউস। আর তার মেয়ের মা হবে কিনা জ্ঞান ও হস্তশিল্পের দেবী মেটিস! না, তা কিছুতেই হতে পারে না। মেটিস এখনও অজ্ঞান অবস্থায় আছে। এই সময়েই তাকে নিয়ে অন্যত্র চলে যেতে হবে।
দেবরাজ জিউস শিশুটিকে বুকে আগলে দ্রুত পায়ে এগোতে লাগলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি তার রাজপ্রাসাদে পৌঁছে গেলেন। সারারাত বৃষ্টির পর সূর্যের প্রথম আলোতে সোনার রাজপ্রাসাদ অনেক দূর থেকেই জ্বলজ্বল করছে। মুখটা আরও ভালো করে ঢেকে নিলেন। যদিও প্রয়োজন ছিল না। সৈন্যরা কেউই পাহারায় নেই। অন্যসময় হলে তিনি হুঙ্কার দিতেন। কিন্তু না, আজ সৈন্যরা পাহারায় না থাকায় তিনি বেশ খুশিই হলেন। রাজপথ পেরিয়ে তিনি দ্রুত তাঁর কক্ষে প্রবেশ করলেন। শিশুটিকে সোনার পালঙ্কে শুইয়ে দিলেন। নিজেও পাশে শুয়ে পড়লেন। সারারাত তিনি বৃষ্টিতে ভিজেছিলেন। তাঁর জ্বর এল এবং প্রচণ্ড মাথাব্যথায় তিনি কাতরাতে লাগলেন। ঘরের বাইরে থেকে তাঁর বিশাল শরীরের পাশে ছোট্ট শিশুটিকে দেখা গেল না। দেবরাজকে অনেকক্ষণ ওভাবে শুয়ে থাকতে দেখে ছোট্ট অ্যাপোলো এবং রাজপ্রাসাদের দাসদাসীরা ছুটে এলেন। রাজা তখন অসহ্য মাথাব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছেনসবাই রাজার কক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। রাজার অনুমতি ছাড়া তো আর কক্ষে প্রবেশ করা যায় না! কেউই বাইরে থেকে শিশুকে দেখতে পেল নাহঠাৎ এক শিশুর কান্না শোনা গেলরাজা পাশ ফিরলেন। বাইরে দাঁড়ানো সবাই দেখতে পেল এক নবজাত শিশু তার ছোট্ট একখানি হাত রাজার মুখে কপালে দিচ্ছেন। শিশুটির গায়ে লোহার বর্ম। রাজার মাথাব্যথাও কমে গেলতিনি অবাক নয়নে শিশুটিকে দেখতে লাগলেন। তিনি বুঝে ওঠার চেষ্টা করতে লাগলেন সবাই কি সবকিছু বুঝে গেল! এই চিন্তার কাছে তার মাথাব্যথা কিছুই নয়। কিন্তু তাঁর কানে অন্য কথা এল
‘আচ্ছা, দেবরাজ কি কিছু ভাবছেন!’
‘কিন্তু শিশু এখানে এল কীভাবে!’
বাইরে দাঁড়ানো সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলকেউ কেউ বলল, ‘হয়তো দেবরাজ জিউসের মস্তক থেকে এই দেবশিশুর জন্ম
‘হয়তো এই শিশু জন্মাবে বলেই মহারাজের মাথায় এত ব্যথা হচ্ছিল
দেবরাজ নিশ্চিন্ত হলেন। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। মুহূর্তের মধ্যে এই খবর সমস্ত অলিম্পাস পর্বতে ছড়িয়ে পড়ল। রাগী দেবতা জিউসকে কেউ নিজের মুখে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না আর দেবরাজ নিজে মুখেও কাউকে কিছু বললেন না।


সুতরাং শিশুটি দেবরাজ জিউসের মানসকন্যা রূপেই বড়ো হতে লাগলেনরূপে গুণে এই কন্যা অতুলনীয়। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই এই মেয়ে সবরকম অস্ত্রচালনায় পারদর্শী। শুধু কি তাই! বছর বারো হতে না হতেই এই কন্যা ন্যায়-নীতি, আইন, হস্তশিল্প, সাহিত্যকলা ইত্যাদি নানান বিষয়ে পারদর্শী হয়ে উঠলেনসমগ্র দেবলোকে এই কন্যা বিশেষ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠলেনজিউস জানতেন এই কন্যা অনেক গুণের অধিকারী হবে। কারণ, চিন্তাশক্তি, হস্তশিল্প ও জ্ঞানের দেবী মেটিস এবং সর্বশক্তিমান দেবরাজ জিউসের মিলনে যে তাদের চেয়েও শক্তিশালী কেউ জন্ম নেবে এটাই স্বাভাবিক। দেবরাজ তার কন্যার নাম দিলেন ‘অ্যাথেনা’। অ্যাথেনা হলেন জিউসের প্রিয় সন্তান, চোখের মণি।
সমগ্র গ্রীসদেশের মধ্যে দেবী অ্যাথেনার নাম ছড়িয়ে পড়ল। অ্যাথেনা জ্ঞানের দেবী, যুদ্ধের দেবী। গ্রীসদেশের মানুষ মনে করতেন দেবীর দয়াতেই তারা তাদের দেশকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারছেন। তার নামানুসারেই গ্রীসের রাজধানীর নাম হল এথেন্স। অ্যাথেনাকে এথেন্সের রক্ষাকর্ত্রী বলা হত। গ্রীসে তার মন্দির স্থাপন করাও হয়। তার স্মরণে ‘প্যানাথেনিয়া’ নামে এক বিরাট উৎসব গ্রীকরা পালন করেন। গ্রীক কবি হোমারের ইলিয়াড এবং ওডিসিতে এই দেবীর নাম পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন এক কুমারী দেবী। ভয়-শঙ্কাহীন এক বিরাট যোদ্ধা জিউসের মতোই খুব রাগী ছিলেন এবং অন্যায় ক্ষমা করতেন না।
অ্যাথেনাকে নিয়ে অলিম্পাস পর্বতের সব দেবতারা গর্ব করতেন। শুধু একজন নিজের মেয়ে জেনেও সর্বক্ষণ মেয়ের থেকে দূরে দূরে থাকতেন। হাজার কষ্টে বুক ফেটে গেলেও নিজের মেয়েকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে আদর করতে পারতেন না। আর এভাবেই আথেনার জন্মবৃত্তান্ত সমগ্র অলিম্পাস পর্বতের দেবতা ও গ্রীকবাসীর কাছে অধরাই রয়ে গেলএক ক্ষমতাশালী রাগী রাজার প্রভাব প্রতিপত্তির জোরে এক দুঃখিনী মায়ের কান্না ইতিহাস থেকে চিরতরে মুছে গেল।
_____
ছবিঃ আন্তর্জাল


লেখক পরিচিতিঃ জন্ম ৩রা মার্চ ১৯৯৫, ব্যারাকপুর। বর্তমানে এম.এস.সি. পাঠরতা। লেখালিখির শুরু খুব ছোটবেলায়, ২০০০ সালে স্কুলের দেওয়াল পত্রিকার শিশু-বিভাগে লেখার মাধ্যমে। লেখার বিষয় প্রধানত রূপকথা। তবে বিজ্ঞানবিষয়ক ও সামাজিক গল্প বেশ কিছু লেখা হয়েছে। লেখালিখি আর বিজ্ঞানচর্চা ছাড়াও আরেক নেশা ফুটবল। গান শুনতেও খুব ভালো লাগে।