Showing posts with label সূর্যনাথ ভট্টাচার্য. Show all posts
Showing posts with label সূর্যনাথ ভট্টাচার্য. Show all posts

বিজ্ঞান:: দু’রঙা জ্যামিতি - সূর্যনাথ ভট্টাচার্য

দু’রঙা জ্যামিতি
সূর্যনাথ ভট্টাচার্য

মনে করো কোনও উপায়ে একটা সমতলের সব বিন্দু হয় লাল না হয় নীল রং করে দেওয়া সম্ভব হলসাধারণভাবে কোনোটাই সসীমসংখ্যক নয়। রঙিন বিন্দুগুলোর ঘনত্ব সুষম নাও হতে পারে, দুই রঙের ক্ষেত্রে কোথাও বেশি কোথাও কম। এইরকম এক সমতলে একটা বর্গক্ষেত্র কি আঁকা যাবে যার চারটে কৌণিক বিন্দু একই রঙের?
উঁহু, সেরকম তো বলা যাচ্ছে না। ধর দুটো একই রঙের বিন্দু নেওয়া হল। এটা সবসময়েই করা যেতে পারে। ঐ বিন্দুর সংযোগকারী সরলরেখার ওপর লম্ব তুলে বর্গক্ষেত্রটি সম্পূর্ণ করা যেতে পারে। কিন্তু তার নতুন দুই কৌণিক বিন্দু দুটি একই রঙের হবে কিনা তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। কোনও একটি অথবা দুটিই অন্য রঙের হতে পারে।
একই রঙের কৌণিক বিন্দুবিশিষ্ট জ্যামিতিক আকারগুলোকে ‘একবর্ণ’ আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। তাহলে দেখা যাচ্ছে ঐ দ্বিরঙা সমতলে যে কোনও রকমের একবর্ণ আকার আঁকা সম্ভব নয়। কিন্তু নীচের একবর্ণ আকারগুলো সবসময়ে আঁকা যাবে —
(ক) তিনটে একই রঙের সমরেখ বিন্দু, যার মাঝেরটা অন্যদু'টোর মধ্যবিন্দু
(খ) একটা একবর্ণ সমবাহু ত্রিভুজ।
(গ) একটা একবর্ণ সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ।
(ঘ) একটা একবর্ণ সমদ্বিবাহু সমকোণী ত্রিভুজ।
(ঙ) একটা বৃত্তে অন্তঃস্থ একটা একবর্ণ সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ।
(চ) একটা একবর্ণ আয়তক্ষেত্র।
সমস্যাগুলো একেবারে বুনিয়াদি স্তরের 'কবুতরখানা' নীতির ('Pigeonhole' principle) প্রয়োগবিদগ্ধ গণিতবিদদের কাছে নস্যি। কিন্তু সোজা ভাষায় সাধারণের বোধগম্য করে বলা যায় কি? দেখা যাক।
(ক) দু’টো একই রঙের, ধর লাল, বিন্দু যুক্ত কর। এই দুই বিন্দুর মধ্যবিন্দু যদি লাল হয়, তাহলে তো হয়েই গেল (চিত্র ১-ক)তিনটে একই রঙের (লাল) সমদূরবর্তী বিন্দু পাওয়া গেল। কিন্তু ধর ঐ মধ্যবিন্দুটি লাল নয়, নীলতাহলে?
ঐ লাল বিন্দু দুটোর বাইরে একই সরলরেখায় আরও দুটো বিন্দু, যারা লাল বিন্দুদের থেকে একই দূরত্বে, পর্যবেক্ষণ কর। এদের মধ্যে যে কোনও একটা লাল হলে আমরা তিনটে সমদূরবর্তী একই রঙের (লাল) বিন্দু পেয়ে গেলাম (চিত্র ১-খ,গ)
এবার যদি দুটোই নীল হয়, তাহলেও দেখ এই দুটোর সঙ্গে মধ্যবিন্দুটা নিয়ে আমরা তিনটে একই রঙের (এক্ষেত্রে নীল) সমদূরবর্তী বিন্দু কিন্তু পেয়ে গেছি (চিত্র ১-ঘ)!
অনুসিদ্ধান্তঃ লক্ষ্য করে দেখ, সমরেখ না হয়ে একই বৃত্তচাপের ওপরেও একই যুক্তিতে এইরকম তিনটি সমদূরবর্তী বিন্দু পাওয়া সম্ভব।
(খ) তিনটি একই রঙের (ধর লাল) সমরেখ বিন্দুর (এটা সম্ভব, (ক) দ্রষ্টব্য) প্রান্তীয় দুটো বিন্দুর সংযোজক সরলরেখার ওপর একটা সমবাহু ত্রিভুজ খাড়া কর। এর ত্রিভুজের শীর্ষ যদি লাল হয়, তাহলে তো হয়েই গেল (চিত্র ২-ক)
কিন্তু ধর এই শীর্ষ নীল পাওয়া গেলতাহলে শীর্ষবিন্দুর সংযোজক বাহুদুটোর মধ্যবিন্দুদ্বয় দেখ। তাদের কোনও একটা লাল হলে ভূমির মধ্যবিন্দুর সঙ্গে সেটি একটা সমবাহু ত্রিভুজ গঠন করবে (চিত্র ২-খ,গ)আর দুটোই নীল হলে শীর্ষবিন্দুর সঙ্গে তারা এক সমবাহু ত্রিভুজ গঠন করবে (চিত্র ২-ঘ)
(গ) যে কোনও দুটি একই রঙের, ধর লাল, বিন্দুর ওপর একটা সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ খাড়া কর। এর তৃতীয় শীর্ষটি যদি লাল হয়, তাহলে তো হয়েই গেল (চিত্র ৩-ক)
কিন্তু ধর এই তৃতীয় শীর্ষ নীল। তাহলে শীর্ষবিন্দুর সংযোজক বাহু দুইটিতে ভূমির সমান দূরবর্তী বিন্দুদ্বয় দেখ। শীর্ষকোণ ৬০৹-র কম হলে বিন্দুদুটি বাহুর অন্তর্বর্তী অংশেই পড়বে, আর বেশি হলে বর্ধিত অংশে পড়বে। বিন্দুদ্বয়ের কোনও একটি যদি লাল হয়, তাহলে ভূমির সঙ্গে একটি সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ গঠিত হবে (চিত্র ৩-খ,গ)আর দুটিই নীল হলে শীর্ষের সঙ্গে (চিত্র ৩-ঘ)কেন না, সহজেই বোঝা যাচ্ছে এই বিন্দু দুটি শীর্ষ থেকে সমদূরবর্তী।
(ঘ) দুটি একবর্ণ (ধর লাল) কৌণিক বিন্দুর উপর একটি বর্গক্ষেত্র খাড়া কর। এই বর্গের ওপর দুটি কৌণিক বিন্দুর কোনও একটি লাল হলেই আমরা কিন্তু ঐ সমদ্বিবাহু সমকোণী ত্রিভুজটা পেয়ে যাচ্ছি (চিত্র ৪-ক,খ)
ধর ঐ দুটোই কৌণিক বিন্দু নীল রঙের। তাহলে বর্গের কর্ণদুটির ছেদবিন্দুটি লক্ষ্য করএর রঙ যাই হোক না কেন আমরা একটা ত্রিভুজ পাচ্ছি যা সমকোণী ও সমদ্বিবাহুও বটেযদি কর্ণদ্বয়ের ছেদবিন্দু লাল রঙের হয় তাহলে ভূমির দুই প্রান্তীয় বিন্দুর সঙ্গে (চিত্র ৪-গ), আর নীল হলে শীর্ষের দুই প্রান্তীয় বিন্দুর সঙ্গে (চিত্র ৪-ঘ) একটা সমকোণী সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ গঠিত হবে। কেননা বর্গক্ষেত্রের কর্ণদ্বয় সমকোণে দ্বিখন্ডিত হয়।
(ঙ) ঐ বৃত্তের ওপর দুটি একই রঙের বিন্দু নির্দিষ্ট কর। এটা সর্বদাই সম্ভব, কেননা কোনও একটি রঙ ঐ বৃত্তে অনুপস্থিত হতে পারে অথবা একটি মাত্র থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে অন্য রঙটি পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যাবে
ধর এই দুই বিন্দু লাল রঙের। ভূমিস্থ দুই বিন্দুর লম্ব সমদ্বিখন্ডক ও বৃত্তের ছেদবিন্দুটি দেখ। এটা যদি লাল হয় তাহলে তো হয়েই গেল (চিত্র ৫-ক)।
মনে কর তা নয়, বিন্দুটি নীল রঙের। তাহলে ভূমির বিন্দুদুটি থেকে বৃত্তে আরও দুইটি চাপ নির্দিষ্ট করে নাও যাদের দৈর্ঘ বিন্দুদ্বয়ের মধ্যে চাপের সমান। এই চাপদ্বয়ের অপর প্রান্তবিন্দুর কোনও একটি লাল হলেই আমরা একটি একবর্ণ সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ পেয়ে যাচ্ছি (চিত্র ৫-খ,গ)
কিন্তু ধর দুটিই নীল বিন্দু পাওয়া গেল সেক্ষেত্রে ঐ দুই বিন্দুর সঙ্গে শীর্ষবিন্দুটি একবর্ণ (এক্ষেত্রে নীল রঙের) সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ গঠন করে (চিত্র ৫-হগ)কেননা সহজেই দেখা যায় ঐ চাপ দুটির অন্য প্রান্তদ্বয় শীর্ষ থেকে সমদূরবর্তী।
(চ) একটা সরলরেখায় (চিত্র-৭এ বামদিকের উল্লম্ব রেখাটি) চারটি এক বর্ণের বিন্দু নির্দেশ কর। এটা সবসময়েই করা যাবে। ঐ সরলরেখায় যে কোনও ৭টা বিন্দু নির্বাচিত করলে তার মধ্যে অন্তত চারটে (বেশিও হতে পারে) একই বর্ণের হতেই হবে। কবুতরখানা নীতি! ধর এইগুলির রঙ লাল।
এই চারটি বিন্দু থেকে ঐ সরলরেখার ওপর চারটে লম্ব টান যারা প্রথম সরলরেখার সমান্তরাল (যে কোনও দূরত্বে) আরও দুটি রেখাকে মোট আটটা বিন্দুতে ছেদ করে।
লক্ষ্য কর, কোনও একটি সমান্তরাল রেখাকে দুই বা তার বেশি লাল বিন্দুতে ছেদ করলে অন্তত একটি একবর্ণ (লাল) আয়তক্ষেত্র পেতে কোনও সমস্যা নেই (চিত্র৭-ক)।
আরও লক্ষ্য কর, ঐ আটটি ছেদবিন্দুর একটিও লাল না হলেও একাধিক একবর্ণ (এক্ষেত্রে নীল) আয়তক্ষেত্র পাওয়া যাচ্ছে। মোট ৭টি নীল বিন্দু পেলেও তাই। এমনকি, রেখাদুটিতে যদি একটি করে লাল বিন্দু থাকে এবং তারা সমরেখ হয়, তাহলেও একাধিক আয়তক্ষেত্র পেতে বাধা নেই।
রইল বাকি, যদি সমান্তরাল রেখা দুটিতে একটি করে লাল বিন্দু — পরস্পর অসমরেখ - থাকে, বাকি সব নীল। এটাই সবচেয়ে বিপরীত পরিস্থিতি। এক্ষেত্রেও কিন্তু দেখা যাবে অন্তত একটা একবর্ণ (নীল) আয়তক্ষেত্র নির্মাণ রোধ করা সম্ভব নয় (চিত্র ৬-খ,গ,ঘ)
অতএব দেখা গেল অন্তত একটা একবর্ণ আয়তক্ষেত্র যে কোনও অবস্থাতেই পাওয়া যাবে।
*                          *                           *
খুব কঠিন কিছু নয়, তাই না? মনে রেখ প্রশ্নগুলো কিন্তু আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড স্তরের। অন্তর্নিহিত যুক্তিটা ধরতে পারলে কঠিন অঙ্কও সরল হয়ে যায়।
_____

বিজ্ঞান:: অন্তিম সূত্র - সূর্যনাথ ভট্টাচার্য


অন্তিম সূত্র
সূর্যনাথ ভট্টাচার্য

প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে, সম্ভবত ১৬৬৫ কি ৬৬ সালের বসন্তকাল। চিলেকোঠায় রাখা অনেকগুলো পুরোনো বাক্স সাফ করতে গিয়ে স্যামুয়েল ক্লেমেন্ট দৈবাৎই দেখতে পেলেন তাঁর পিতার ব্যবহৃত একটা বেশ পুরোনো বই। পিতা প্রয়াত হয়েছেন সম্প্রতি, তাঁর ব্যবহার করা বই, লেখা, কাগজপত্র ইত্যাদি সংগ্রহ করে একত্র করছিলেন স্যামুয়েল।
এই বইটা তৃতীয় শতাব্দীর গ্রীক দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ ডায়োফ্যান্টাসের লেখা ‘অ্যারিথমেটিকা’-র ১৬২১ সালের একটি ল্যাটিন সংস্করণ। ডায়োফ্যান্টাস দুটি চলরাশির বিভিন্ন সূচক সংবলিত এক বিশেষ ধরনের সমীকরণের সমাধানের বিষয়ে বহু তথ্যের গবেষণা করেছিলেন। এই সমীকরণগুলি ডায়োফ্যান্টাইন ইকোয়েশন নামে খ্যাত। সেই গবেষণালব্ধ নানান সমস্যা ও তার সমাধানের সংগ্রহ ছিল ঐ অ্যারিথমেটিকা। পাতা ওলটাতে ওলটাতে একটা জায়গায় এসে স্যামুয়েলের চোখ আটকে গেল।
সেখানে একটা অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে কী ভাবে একটা বর্গ সংখ্যাকে দুটো অন্য বর্গের যোগফলরূপে প্রকাশ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ ডায়োফ্যান্টাস দেখিয়েছেন যে, ৪ এর বর্গ, অর্থাৎ ১৬ কে দু’ভাগে ভেঙ্গে কী করে ১৬/৫ ও ১২/৫-এর বর্গের যোগফল হিসেবে দেখানো যায়।
এই অঙ্কটির ঠিক ডানদিকের মার্জিনে পরিষ্কার হাতের লেখায় ল্যাটিন ভাষায় লেখা ছিল – কোনও কিউবকে কিন্তু এইভাবে অন্য দু’টো কিউবের যোগফলরূপে দেখানো যায় না। অথবা কোনও চতুর্ঘাতীয় সংখ্যাকে অন্য দু’টো চতুর্ঘাতীয় সংখ্যার সমষ্টি হিসেবে দেখানো যায় না সাধারণভাবে, দু’য়ের বেশি যে কোনও ঘাতের জন্যই এই নিয়মটি সিদ্ধ। আমি তার একটা চমকপ্রদ প্রমাণ আবিষ্কার করেছি, কিন্তু মার্জিনের এই জায়গাটুকু সেটা ধরাবার পক্ষে যথেষ্ট নয়।
ব্যস, এইটুকুই। লেখাটা বেশ পুরোনো, অন্তত বছর ত্রিশেক আগেকার। লেখার কালি কোথাও কোথাও একটু আবছা হয়ে এলেও পিতার হাতের লেখা পুত্রের পরিচিত। বুঝতে অসুবিধে হয় না কোনও এক আকস্মিক আবিষ্কারের অভাবনীয় আনন্দে স্যামুয়েলের পিতা পিয়ার ডি ফার্মা এই কথা ক’টি লিখে রেখেছেন।

পিয়ার ডি ফার্মা
ফার্মা ছিলেন ফ্রান্সের বোর্দো শহরের ব্যস্ততম বুদ্ধিজীবীদের একজন। শহরের আইনব্যবস্থার উচ্চতম স্তরে ছিল তাঁর কর্মক্ষেত্র। কিন্তু নেশা ছিল অঙ্ক। সংখ্যাতত্ত্বে ছিল বিশেষ আকর্ষণ। কর্মব্যস্ততার স্বল্প অবসরেই তিনি আবিষ্কার করেছিলেন বহু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। কিন্তু স্বভাব অগোছালো ও অন্তর্মুখী এই গণিতপ্রতিভা তাঁর আবিষ্কারগুলির সুষ্ঠু প্রকাশনায় আদৌ যত্ন নিতেন না।
এই উপপাদ্য আবিষ্কারের আনুমানিক সময়ের আগে ও পরে অনেক সূত্রের প্রমাণই তিনি নিজে লিখে প্রকাশ করেননি, শুধু পত্রে জানিয়েছিলেন তাঁর বন্ধু ও সতীর্থদের। সেগুলো ফার্মার নামে পরে প্রকাশিত হয়েছে সেইসব অন্তরঙ্গ বন্ধুদের সততা ও সৌজন্যে। অনেক সূত্র তিনি বিনা প্রমাণেই উল্লেখ করে গেছেন, বড়োজোর প্রমাণের কিছু ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন মুখে বলে অথবা পত্রে। পরে তা প্রমাণিত হয়েছে তাঁর উত্তরসূরীদের দ্বারা।
স্যামুয়েল ভাবলেন এই সূত্রটিও সেইরকম কোনও এক উপপাদ্য, যা আবিষ্কার করার পরে তাঁর পিতা হেলায় সে কথা ভুলে গিয়েছিলেন। সমস্ত কাগজপত্র তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোথাও পাওয়া যায়নি এই সূত্রের সেই ‘চমকপ্রদ’ প্রমাণ। ফার্মা কোথাও সেটি লিখে রাখেননি, কাউকে পত্রে বা অন্য কোনোভাবে দিয়ে যাননি সমাধানের কোনও ইঙ্গিত। সুতরাং অঙ্কশাস্ত্রের একটি উজ্জ্বল রত্নখন্ড হয়তো হারিয়েই গেল চিরদিনের মতো।

স্যামুয়েল নিজে উদ্যোগী হয়ে ১৬৭০ সালে অ্যারিথমেটিকার একটা নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেন, যাতে ঐ অঙ্কটির নিচে তিনি নিজের পিতার এই আবিষ্কারের কথাটাও নথিবদ্ধ করেন। প্রকাশিত হল ‘ফার্মার অন্তিম সূত্র’ যদিও তা প্রকাশিত হল একটি ‘অনুমান’ হিসেবে, কোনও গাণিতিক প্রমাণ ছাড়াই। তারপরের ঘটনা ইতিহাস!

উপপাদ্যটিকে ফার্মার শেষ সূত্র বলার কারণ আর কিছুই নয়, তাঁর অনুমিত কিন্তু প্রমাণিত নয় এরকম আর সব তত্ত্বই হয় ফার্মার জীবদ্দশাতেই অথবা তার কিছু পরেই প্রমাণিত হয়ে গেছে। একমাত্র এইটি ছাড়া। কেটে গেছে দশকের পর দশক, দশক পেরিয়ে শতক। প্রজন্ম পরম্পরায় গণিতবিদেরা এই সূত্র নিয়ে গবেষণা করে গেছেন। তাদের মধ্যে ছিল অয়লার ও লিজেন্ডারের মতো কিছু নাম, যাঁদের মেধা ও গণিতপ্রতিভা কিংবদন্তী হয়ে আছে। বহু গুণীজন এর প্রমাণে কিছুদূর অগ্রসর হয়েছেন। একে একে ৩, , , ৭... এইভাবে ১৪ সূচক পর্যন্ত এটি প্রমাণিত হয়ে গেল। প্রমাণ করা গেল সব অযুগ্ম মৌলিক সংখ্যার জন্যেও। এই চলার পথে ঘটনাচক্রে আবিষ্কৃত হয়ে গেল অন্য অনেক গভীর ও কূটতত্ত্ব। সাধারণভাবে (সকল পূর্ণসংখ্যার জন্য) ফার্মার শেষ থিওরেম কিন্তু রয়ে গেল অধরা। ফার্মার দেহান্তের পরে দীর্ঘ তিনশ আটান্ন বছর এই উপপাদ্যটি ছিল অপ্রমাণিত!
সবাই জেনে গিয়েছিল, ফার্মার শেষ থিওরেম প্রমাণ করা যায় না। অথচ এর কোনও ব্যতিক্রমও খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই দীর্ঘ সময়ে একে মিথ্যা প্রমাণ করার চেষ্টাও বন্ধ ছিল না। উঁহু, তাও সম্ভব হয়নি। কেউ দুই-এর বেশি এমন কোনও সূচক আবিষ্কার করতে পারেননি, যার জন্য ফার্মার দেওয়া বিবৃতিটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়। অবশেষে বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় ‘বিশ্বের কঠিনতম সমস্যা’ বলে গিনেস বিশ্বরেকর্ড পুস্তিকায় স্থান করে নিয়েছিল ফার্মার শেষ থিওরেম।
অথচ সংখ্যাতত্ত্বের এই আশ্চর্য ধর্মটি অনুমানের পরেও ফার্মা আরও বহু তত্ত্ব নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন। কিন্তু উচ্ছ্বাস দূরে থাক, এই সূত্র নিয়ে তাঁকে আর কোনও উচ্চবাচ্য করতেও দেখা যায়নি। আমরা যদি অ্যারিথমেটিকায় ঐ ছোট্ট নোটের সময়কে এর উৎপত্তি ধরে নিই, তাহলে তার পরেও প্রায় ত্রিশ বছর ফার্মা জীবিত ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কি তাঁর প্রমাণকে প্রকাশ করার অবকাশ পাননি? এমন চমকপ্রদ একটি তথ্য ত্রিশ বছরে তিনি প্রতিষ্ঠিত করতে বিস্মৃত হবেন? একি শুধুই অমনোযোগ, উপেক্ষা, অবহেলা?
মনে হয় না। তাহলে আর একটাই সম্ভাবনা হতে পারে। প্রমাণটি তিনি করতে পারেননি। যদিও আবিষ্কারের উত্তেজনায় তিনি ভেবেছিলেন এটা সিদ্ধ, পরে নিশ্চয়ই সে পদ্ধতিতে কোনও ত্রুটি পেয়েছিলেন। হয়তো সে ত্রুটি দূর করতে তিনি প্রয়াস করে গেছেন, কিন্তু জীবদ্দশায় সফল হননি। তাই বিরক্তি বা হতাশায় আর এ নিয়ে দ্বিরুক্তি করেননি। এ ঘটনা পরে অন্যান্যদের সঙ্গেও কয়েকবার হয়েছে, যখন কেউ ভেবেছেন যে তিনি সূত্রটি প্রমাণ করতে সফল হয়েছেন। অল্প পরেই কিন্তু সমাধানের গলদটি আবিষ্কৃত হয়েছে।
সাড়ে তিন শতক ধরে এক অমীমাংসিত গাণিতিক ধন্দ হয়েই রয়ে গিয়েছিল ফার্মার অন্তিম সূত্র।

গত শতাব্দীর ষাটের দশকে সবাই যখন ধরেই নিয়েছে এ সমস্যার কোনও সমাধান নেই, ব্রিটেনে অ্যান্ড্রু ওয়াইলস নামে এক দশম বর্ষীয় বালকের নজর পড়ে এই সূত্রটির প্রতি। দশ বছরেই অঙ্কের ধাঁধাঁ-হেঁয়ালি সমাধান করতে অ্যান্ড্রু দারুণ আনন্দ পায়। একদিন মিল্টন রোডের স্থানীয় লাইব্রেরিতে সে ই. টি. বেল রচিত ‘দ্য লাস্ট প্রবলেম’ বইটা হাতে পায়, যার মধ্যে ফার্মার সূত্রটা ছিল। স্বভাবতই তা ছিল সমাধানরহিত। অ্যান্ড্রু পিথাগোরাসের সূত্র পড়েছে, যা কিনা ফার্মার সূত্রের দ্বিঘাতীয় রূপ। পিথাগোরাসের সূত্রে ভুল নেই। কিন্তু ঘাত দু’এর বেশি হলে আর সমীকরণটা সিদ্ধ নয়, এটাই ফার্মার ‘অনুমান’ তার মাথায় সমস্যাটা বসে গেল।
পরে যখন কেমব্রিজে গবেষণা করতে ঢুকেছেন অ্যান্ড্রু, ততদিনে তিনি জেনে গেছেন ফার্মার অন্তিম তত্ত্বের ইতিহাস। এক অজানা রোমান্টিসিজম তাঁকে পেয়ে বসল। তিনি মনস্থ করে নিলেন, এর সমাধান করতে হবে। ঘটনাচক্রে তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ইলিপ্টিক কার্ভ সম্বন্ধীয়, যা কাকতালীয়বৎ তাঁকে দেখিয়ে দেয় ফার্মার সূত্র সমাধানের এ যাবৎ অনাবিষ্কৃত একটা পথ।

পি-এইচ-ডি সম্পূর্ণ করে ডক্টর অ্যান্ড্রু ওয়াইলস অধ্যাপকরূপে যুক্ত হলেন নিউ জার্সির প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর সমস্ত মস্তিস্ক জুড়ে তখন বিরাজ করছেন ফার্মা। প্রোফেসর ওয়াইলস স্বভাবত স্বল্পবাক, অমিশুক। আশির দশকের শেষভাগে এসে নিজেকে যেন আরও গুটিয়ে নিলেন। আরও অন্তর্মুখী, নিজের চিন্তায় মগ্ন, বিশেষ বাইরেও বেরোন না। কয়েকটা বিচ্ছিন্ন তত্ত্বের মডিউল তাঁর অবচেতনায় অহরহ বলছে, এইগুলোতেই আছে রহস্যের চাবিকাঠি। কিন্তু সেই টুকরোগুলোকে কিছুতেই জোড়া লাগানো যাচ্ছে না। চলতে থাকে তীব্র মনন, অনিঃশেষ গণনা। হাজারো গণিততত্ত্বের উষর মরুপথে তাঁর এককযাত্রা। সে যাত্রা কোনও পরিষ্কার করে বিছানো সুঠাম রাজপথে নয়, জটিল তত্ত্বরাজির ধূসর কুয়াশাঢাকা এক অজানার উজানে।
কখনো একা বেরিয়ে পড়েন হাঁটতে। শান্ত বহিরাকৃতিতে বোঝার উপায় নেই অন্তরে তাঁর কী উথালপাথাল চলছে। ক্যাম নদীর ধারে পায়চারি করতে করতে হঠাৎ মাথায় এল একটা নতুন চিন্তার মোড়। আবার ফিরে গেলেন নিজের স্টাডির ছোট্ট চৌহদ্দির মধ্যে। এইভাবে চলতে চলতে অবশেষে এল সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। উনিশশো তিরানব্বই সালের তেইশে জুন!
সে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। কেমব্রিজের নিউটন ইনস্টিট্যুটের হলে সেদিন দু’শো লোকে ঠাসাঠাসি। সবাই অঙ্কের মস্ত লোক সব। অ্যান্ড্রু ওয়াইলস এসে ঘোষণা করলেন, ইয়েস আই’ভ ডান ইট!
পরবর্তী দু’ঘন্টায় প্রোফেসর ওয়াইল্‌স ব্যক্ত করলেন গণিতশাস্ত্রের সেই অজানা রহস্য — শতাব্দী প্রাচীন ফার্মার অন্তিম সূত্রের একটি আশ্চর্য সমাধান! পিনপতন নিস্তব্ধতার মাঝে বিদগ্ধ গণিতমণ্ডলী প্রত্যক্ষ করলেন এক দুরূহ গণিততত্ত্বের সেই অভিরূপ উন্মোচন। বক্তৃতার শেষে অকৃত্রিম বিস্ময়ের করতালিতে গুঞ্জরিত হল ঐতিহাসিক সভাকক্ষ।

প্রোফেসর অ্যান্ড্রু ওয়াইলস
কিন্তু আবিষ্কারের আনন্দে ওয়াইলসও বোধহয় একটু তাড়াহুড়ো করে ফেলেছিলেন। তাঁর গবেষণাপত্রেও রয়ে গিয়েছিল একটা ত্রুটি, যা তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞের স্ক্রুটিনিতে তা ধরা পড়ে। ত্রুটি খুব বড়ো নয়, কিন্তু সে অল্প প্রমাদ যুক্তির একেবারে মূলে আঘাত করেছে। তাই অন্তিম সিদ্ধান্তটি আর গ্রহণযোগ্য নয়। সাফল্যের ইমারতের চূড়া থেকে প্রোফেসর ওয়াইলস সজোরে এসে পড়লেন কঠিন বাস্তবের ধরাতলে।
কিন্তু তীরে এসে কি তরী ডুবতে দেওয়া যায়? তাই আবার সেই স্বেচ্ছানির্বাসন, আবার সেই অনুধ্যান। হ্যাঁ, যুক্তিজালে রয়ে গিয়েছিল একটা ক্ষুদ্র ছিদ্র! সেটা হয়তো সংশোধনের অতীত নয়। কিন্তু সেই সামান্য মেরামতি করতে লেগে গেল আরও পনেরোটি মাস। সব হয়ে গিয়ে একসময়ে শুধু দুটি পদ্ধতির প্রান্তিক সূত্রদুটো কিছুতেই এক আর করা যাচ্ছিল না। উনিশশো চুরানব্বই সালের উনিশে সেপ্টেম্বর অকস্মাৎই মাঝের সেই সামান্য অন্তরালটি বিস্ময়করভাবে জোড়া লেগে গেল। ফার্মার সূত্র প্রমাণের পূর্ণাঙ্গ রূপটা এবার প্রকট হল। আর একবার চমৎকৃত হলেন অ্যান্ড্রু ওয়াইলস। অভাবনীয়ভাবে ছিন্ন যুক্তিজাল জোড়া লাগার সেই মুহূর্তটির অনুভূতি ব্যক্ত করে ওয়াইলস পরে বলেছেন, ইট ওয়াজ সো ইন্ডেস্ক্রাইবেবলি বিউটিফুল, সো সিম্পল অ্যান্ড সো এলিগ্যান্ট!
কিন্তু এবার সাবধান হলেন তিনি। আর তাড়াহুড়ো নয়। শুরু থেকে আবার যাচাই করে দেখতে বসলেন, কোথাও আর কোনও ছিদ্র থেকে গেল না তো? কোথাও রয়ে যায়নি তো কোনও ভ্রান্ত অনুমান, কোনও সমীকরণের ত্রুটি, কোনও অনভিপ্রেত বিক্ষেপ? বার বার পরীক্ষা করেও দেখা গেল, না — যুক্তিপরম্পরায় আর কোনও ভুল নেই। হ্যাঁ, বিশেষজ্ঞরাও পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করে এবার সবিস্ময়ে সম্মতি দিলেন — অসম্ভব অবশেষে সম্ভব হয়েছে!

সেই অক্টোবর মাসে নিজের জন্মদিনে শ্রীমতী ওয়াইলস পেয়েছিলেন তাঁর জীবনের সেরা উপহারটি — তাঁর স্বামীর আজীবনের সাধনালব্ধ সম্পূর্ণ পান্ডুলিপিখানা, যাতে আছে বিশ্বের কঠিনতম সমস্যার এক অভাবনীয় সমাধান!
_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

বিজ্ঞান:: নদীর পাড়ের রহস্য - সূর্যনাথ ভট্টাচার্য

নদীর পাড়ের রহস্য
সূর্যনাথ ভট্টাচার্য

   নেদোটা আবার কোনও ফিকির করছে, মাষ্টারমশাই, রুমালে মুখ মুছে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন বিরূপাক্ষ দারোগা। চেয়ারখানা একবার ককিয়ে উঠে চুপ মেরে গেল।
মাষ্টারমশাই উৎসুক মুখে তাকালেন, কিছু বললেন না। আমিই জিজ্ঞেস করলাম, এবার কী করল নন্দ?
  সেইটিই তো জানতে হবে, দারোগাবাবু চোখদুটো কয়েক পাক ঘুরিয়ে বললেন, এখনও ধত্তে পারিনি। কিন্তু জানি ব্যাটা ফের কিছু একটা চালাকি করছে।
ব্যাপার যা জানা গেল, তা এই — নন্দ মল্লিক পৈতৃক ব্যাবসা লাটে তুলে এবার মাছের ব্যাবসা ধরেছে। নীলসায়রের পশ্চিমদিকে খানিকটা জায়গা ইজারা নিয়ে তাতে সে মাছ ধরার কারবার করে। নীলসায়রে মাছের চাষ হয়, সরকারি উদ্যোগ। পুঁজিপতিরা তাতে ব্যক্তিগত পয়সা লাগিয়ে অংশীদার হতে পারে। নন্দ সেইরকমই এক ভাগের মালিকানা ভাড়া নিয়েছে। তার এলাকায় সরোবরের কিনারা থেকে একশো গজ পর্যন্ত তার মাছ ধরবার সীমানা। কিন্তু ফিশারিজ বিভাগ থেকে নালিশ এসেছে, সে নিয়মিত ভাবে ঐ সীমা লঙ্ঘন করে নৌকা নিয়ে যায়।
নন্দ ফন্দি করে ব্যাবসায় দু’নম্বরি করে থাকে। কিন্তু এর মধ্যে আর কী করে ফাঁকি দেবে? নালিশ সত্যি প্রমাণিত হলেই তাকে তা বন্ধ করতে হবে। কিছু গুনাগারও দিতে হবে নিশ্চয়ই। দারোগাবাবুকে বললাম, চুপচাপ গিয়ে হাতে নাতে ধরে ফেলুন একদিন।
   আরে, সে চেষ্টা কি আর করিনি? সে ব্যাটা সটান অস্বীকার করল। আমরা লুকিয়ে সব দেখেছি শুনে আমাকেই উলটে বললে, আবার লুকোছাপা কেন? তার কোনও কসুর নেই, ডিপাটমেন্ট থেকে ভুল মাপ করেছে। আমি নিজে সরেজমিন করে যেন তাকে এই ঝামেলা থেকে উদ্ধার করি।
   তারপর? আপনাকে মাপজোখ সব দেখাল?
  দেখালই তো। আজকেই তো গিয়ে টুঁটি চেপে ধরেছিলাম। তা বললে, আপনি নিজের চোখেই সব দেখে যান হুজুর। বলে তার স্যাঙাৎ ফটকেকে পাঠাল নৌকা নিয়ে। সে নৌকা পাড়ের কাছে শক্ত কাছি দিয়ে বাঁধা। ফটিক যতদূর সম্ভব চলে গেল, দড়িটা টান টান হয়ে আর আগে বাড়তে দিচ্ছে না। পরিষ্কার দেখলাম, সরকারি সীমানা করা খুঁটিগুলো পেরিয়ে আরও বেশ খানিকটা চলে গেছে। নেদো বললে, এইবার দেখুন হুজুর আমি নৌকা পাড়ে লাগাচ্ছি। বলে হিড়হিড় করে দড়ি টেনে নৌকা পাড়ে লাগিয়ে বলল, মাপ করে দেখুন হুজুর কতোটা টেনে আনলাম।
   দেখলেন সেই দড়ির মাপ?
  দেখলাম বৈকি, ছাড়ব নাকি! বললে বিশ্বাস করবেন না মশাই, বিলকুল একশো গজ। একটুও বেশি নয়!
   কী বলছেন দারোগাবাবু? ইলাস্টিকের দড়ি নাকি?
   কী যে বলেন? চার-ফেরতা নাইলনের কাছি, সে একটুও বাড়ে না। তাজ্জব হয়ে ভাবছি, মাপে কোনও কারসাজি করল? আলাদা করে আমাদের ফিতে দিয়ে নিজে মেপে দেখলাম। সেই একশো গজ, কোনও ভুল নেই। তাহলে সত্যিই সরকারি মাপে ভুল আছে নাকি? কিন্তু তাই কি হয়?
আমারও বেশ খটকা লাগছিল। আমার সঙ্গে পল্টুও অবাক হয়ে শুনছিল। বললাম, দড়ি শক্ত করে বাঁধা ছিল তো? আলগা হয়ে স্লিপ করেনি?
বিরূপাক্ষ দারোগার কাজে কটাক্ষ করলে তিনি ভারি অসন্তুষ্ট হন। একটা তাচ্ছিল্যের গলাঝাড়া দিয়ে বললেন, কী যে বলেন মশাই। ওসব কিছুই নয়। একবার নয়, তিন-তিন বার আচ্ছা করে মাপজোখ করেছি। কিছু একটা ধান্দা করেছে বুঝেছি, কিন্তু কী করে যে নৌকা অদ্দূর যাচ্ছে, সেটা কিছুতেই ধরতে পারলাম না। তবু সিবিল বিভাগ থেকে লোহার চেন আনতে পাঠিয়েছি। তাই দিয়ে এবার মেপে দেখব।
   দড়িতে কোনও কায়দা নেই মনে হয়, মাষ্টারমশাই এতক্ষণ চুপ করে শুনছিলেন। এবার মুখ খুললেন, এত কাঁচা কাজ নন্দ করবে না।
   অ্যাঁ, তাহলে?
মাষ্টারমশাই হঠাৎই প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা সরোবরের পাড়টা নিশ্চই খানিকটা উঁচু, তাই না?
   পাড়? হ্যাঁ — তা পাড় থেকে জলের কিনারা খানিকটা নিচে তো বটেই। ফুট বিশেক হবে। সিঁড়ি কাটা আছে কয়েক ধাপ, নেমে যেতে হয়। কিন্তু তাতে কী হল?
   তাতেই তো হলদড়িটা আসলে একশো নয়, একশো গজ আর ঐ বিশ ফুট লম্বা।
   তাতে কী? কিনারা থেকে একশ’ গজ দূরেও তো জল ততটাই নিচে। বিশ ফুট তো কাটাকুটি হয়ে যাচ্ছে?
   হচ্ছে নাআমার আন্দাজ মতো নন্দ একশো গজ পেরিয়ে আরও অন্তত দশ-পনের ফুট এগিয়ে যেতে পারে।
   কী করে জানলেন?
   অঙ্কশাস্ত্রে ট্রিগোনোমেট্রি বলে একটা বিষয় আছে দারোগাবাবু, তা দিয়ে বার করা যায়। পাড়টা যদি খাড়াই কুড়ি ফুট নেমে যেত, তাহলে একশো গজ বিশ ফুট লম্বা দড়ি দিয়ে জলের তলে একশো গজ — অর্থাৎ তিনশো ফুটের পরেও প্রায় উনিশ ফুট আগে চলে যাওয়া যেত। যেহেতু পাড় খাড়াই নামেনি, তাই কিছু কম হবে। পাড়ের স্লোপ জানা থাকলে কষে বার করা যায় ঠিক কতটা আগে যাবে।
খানিকক্ষণ বিরূপাক্ষ দারোগার মুখব্যাদান বন্ধ করতে ভুল হয়ে গেল যেন। তারপর কিঞ্চিৎ সামলে নিয়ে বললেন, দড়ি কি অঙ্ক কষতে পারে নাকি?
   না। কিন্তু ঐ দড়ি দিয়েই আরও আগে চলে যাওয়া যাবে। কিঞ্চিৎ জ্যামিতির ব্যাপার আছে।
ট্রিগোনোমেট্রিই শুধু নয়, আবার জ্যামিতি! দারোগাবাবু আর দেরি করলেন না, ত্বরিতে উঠে পড়লেন। মাষ্টারমশাই যেন কী? সবেতেই অঙ্ক টেনে আনবেন। দারোগাবাবুর যা অতি অপছন্দ। কিন্তু এটুকু জানেন, মাষ্টারমশাই যখন বলছেন, সে কথার ওজন আছে। টুপিটা মাথায় চড়িয়ে তিনি বললেন, এসে আপনার বাকি কথা শুনব, আগে নেদোটাকে থানায় জমা করে আসি।
দারোগা চলে যেতে পল্টু বলে উঠল, কী জ্যামিতি আছে বুঝলাম না তো?
আমিও বললাম, দড়িটা একশো গজের চেয়ে লম্বা ঠিকই। কিন্তু টানা হয়েছে তো একশো গজই। তাতে নৌকাটা তার চেয়ে বেশি এগিয়ে আসবে?
মাষ্টারমশাই চট করে একটা কাগজে কিছু আঁকিবুঁকি কেটে পল্টুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, আসবে। প্রথমটা একটু কাউন্টার-ইন্টুইটিভ লাগে ঠিকই। এইটে দেখলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।
পল্টুর ঘাড়ের ওপর দিয়ে দেখি কাগজটায় লেখা —


ব্যাপারটা এবার বোঝা গেল, কী করে একশো গজ দড়ি টেনে নন্দ একশো গজের বেশি দূর থেকে নৌকাকে নিয়ে আসছিল। কেননা সে কুড়ি ফুট উঁচু থেকে দড়ি টানছিল। দেখি পল্টুও বুঝেছে কিন্তু যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।
পল্টুর বিস্ফারিত দৃষ্টি দেখে মাষ্টারমশাই বললেন, ক প্লাস খ ইজ গ্রেটার দ্যান গ। কেন বল তো পল্টুবাবু?
পল্টু চেঁচিয়ে বলল, বুঝে গেছি। ক, খ আর গ তো ত্রিভুজের তিনটে বাহু!
   কারেক্ট। আর স্কুলের জ্যামিতিতেই পড়েছ কিনা, সাম অফ এনি টু সাইডস অফ আ ট্র্যাঙ্গল ইজ —
   গ্রেটার দ্যান দ্য থার্ড!
_____
ছবি - আন্তর্জাল

বিজ্ঞান:: আর্বেলসম্যান - সূর্যনাথ ভট্টাচার্য


আর্বেলসম্যান
সূর্যনাথ ভট্টাচার্য

উনিশশো বাহান্ন সালের সতেরোই মে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া শহরের লস এঞ্জেলেস মিরর দৈনিকে একটা চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, নোবেল বিজয়ী আইনস্টাইন অঙ্কে ফেলকরেছেন!
খবরে প্রকাশ, এক পঞ্চদশী স্কুলছাত্রী জ্যামিতির একটা প্রশ্ন সমাধান করতে না পেরে প্রিন্সটনে স্বয়ং আইনস্টাইনকে তা পত্রযোগে জানিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করে। আইনস্টাইন সে পত্রের উত্তর দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যে সমাধান করে পাঠিয়েছিলেন সেটি বুঝতে না পেরে মেয়েটি স্থানীয় এক দন্তচিকিৎসককে তা দেখায়। এই ডাক্তারবাবুর আবার অঙ্কে বেশ মাথা খেলত। তিনিই বলেছেন যে বিশ্ববিশ্রুত বৈজ্ঞানিকের সমাধানটিতে একটু গলদ আছে। শুধু তাই নয়, নিজস্ব পন্থায় তিনি প্রশ্নটির সঠিক সমাধানও করে দেখিয়ে দেন।
প্রশ্নটা ছিল হাইস্কুল জ্যামিতির, দুটো পরস্পর স্পর্শকারী বৃত্তের সাধারণ স্পর্শকের দৈর্ঘ্য বার করতে দেওয়া ছিল। তেমন শক্ত কিছু নয়। কিন্তু স্বনামধন্য আইনস্টাইনের অন্যমনস্কতার কথা তো সুবিদিত। তিনি দুই বৃত্তের সাধারণ স্পর্শক আঁকবার পদ্ধতি লিখে পাঠিয়েছিলেন। খবরের কাগজে এই ছোট্ট ঘটনাটা পড়ে ডাক্তারবাবু লঘুভাবেই সম্পাদকের কাছে মন্তব্য করেছিলেন, নোবেলজয়ী এখানে একটু ভুলকরে ফেলেছেন। অনন্য বিজ্ঞানপ্রতিভাকে হেয় প্রতিপন্ন করার কোনও উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না। ঘটনাটাও অকিঞ্চিৎকর। কিন্তু খবরের কাগজওয়ালারা সুযোগ ছাড়বে কেন, ফলাও করে তা ছাপিয়ে দেয়। লস এঞ্জেলেসে ডাক্তারবাবুর নাম ছড়িয়ে পড়ে, তিনি আইনস্টাইনের ভুল ধরেছেন!
কে এই রহস্যময় ডাক্তার? চিকিৎসাবিজ্ঞান যাঁর পেশা তিনি অঙ্কে পাল্লা দিতে যান আইনস্টাইনের সঙ্গে?
বিশিষ্ট এই ব্যক্তিটির নাম ডঃ লিঅন ব্যাঙ্কফ। পেশায় দন্তচিকিৎসক, নেশা কিন্তু তাঁর গণিত! পেশাবহির্ভূত এই বিষয়টিকে তিনি আয়ত্ত করেছিলেন সম্পূর্ণ নিজের আগ্রহ ও খেয়ালে। আর করেছিলেন এতোটাই যে প্রথাগত গণিতশিক্ষা তাঁর না থাকলেও অনেক অভিজাত গণিতসভায় বক্তৃতা করার ডাক পেতেন তিনি। বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ মন্ডলীতে তাঁর পরিচিতি ছিল আর্বেলসম্যান’ — আর্বেলস বিশেষজ্ঞ রূপে।
আর্বেলস! সেটা আবার কী বস্তু? খায় না মাথায় দেয়? জানতে চাইলে আমাদের পেছিয়ে যেতে হবে অনেকটা সময়। আর্বেলস গবেষণার সূত্রপাত হয় বাইশ শতাব্দীরও আগে।


ছবিতে যেমন দেখানো হয়েছে, সেইরকম তিনটি পরস্পর স্পর্শকারী অর্ধবৃত্তে গঠিত জ্যামিতিক আকারটিকে আর্বেলস নামে অভিহিত করা হয়। এদের ব্যাস তিনটি একই সরলরেখায় অবস্থিত। গ্রীক ভাষায় আর্বেলস শব্দের অর্থ শ্যু’মেকার্স নাইফ’—অর্থাৎ জুতো তৈরি করতে ব্যবহৃত গোল ফলাবিশিষ্ট ছুরি। যার ছবিও দেখানো হল। চর্মশিল্পীদের ব্যবহৃত এই যন্ত্রটির ফলার সাদৃশ্য থেকেই আর্বেলসের নামকরণ। অবশ্য শ্যুমেকার্স নাইফ’-এর ফলা দুদিকে সুসমঞ্জস, আর্বেলসের ক্ষেত্রে তেমন বিধিনিষেধ নেই। এটা যেন একটা বক্ররৈখিক ত্রিভুজ, বক্ররেখা দিয়ে ঘেরা ধূমিল স্থানটিকেই আর্বেলসের ক্ষেত্রফল বলা হয়।
আর্বেলসের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় গ্রীক দার্শনিক আর্কিমিডিসের গবেষণায়। তিনি তাঁর রচিত গণিত প্রস্তাবের সংকলনে চার, পাঁচ ও ছয় সংখ্যক উপপাদ্যের বিবৃতিতে প্রথম আর্বেলসের কয়েকটি বিশেষ ধর্ম প্রমাণিত করেন।
বৈশিষ্ট্যযুক্ত জ্যামিতিক আকার আরও অনেকই আছে, কিন্তু আর্বেলসের মতো এতো অফুরন্ত ও আশ্চর্যজনক ধর্মের সমন্বয় খুব কম দেখা যায়এদের অনেকগুলোই বেশ অবাক করা, হঠাৎ শুনলে মনে হয় এও কী হয় নাকি? কিন্তু গাণিতিক উপায়ে তার সবই প্রমাণ করা যায়। বোধের বাইরে যুক্তির এই বিজয়ই বোধহয় এই অতি সাধারণ কিন্তু রহস্যময় আকারটিকে এতটা আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
বিনোদন গণিতের বাইরে আর্বেলস কিন্তু অনেক তন্নিষ্ঠ গবেষণারও উৎস। বৃত্ত বা আরও সাধারণ বিচারে বক্ররেখার স্পর্শসংক্রান্ত তত্ত্ব জড়িত থাকায় ইনভারশন, র‍্যাডিক্যাল অ্যাক্সিস, সিমিলিটিউড ও স্বর্ণানুপাতের মতো গুরুগম্ভীর বিষয়ের প্রভূত চর্চা করার সুযোগ আছে এই আর্বেলসের মাধ্যমে। যুগে যুগে আর্বেলস খ্যাতনামা গণিত বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়েছে। প্যাপাস, ভীটা, ডিকার্টেস, ফার্মা, নিউটন, স্টেইনার থেকে নিয়ে বিংশ শতাব্দীর ভিক্টর থীবো — বহু গণিতজ্ঞের কাছেই আর্বেলস তত্ত্বের নান্দনিক আবেদন ছিল উদ্দীপনা ও চর্চার বিষয়।
দুই সহস্রাব্দীরও বেশী আগে আর্কিমিডিস দেখিয়েছিলেন আর্বেলসের মাঝ দিয়ে একটা লাইন টেনে কাস্তের মতো দুটো ফলাকে আলাদা করে দিলে, ঐ লাইনের দুপাশের জায়গাদুটোতে আঁটসাঁট করে যদি দুটো বৃত্ত ধরানো হয় তাহলে বৃত্তদুটো মাপে একদম সমান হবে! হ্যাঁ, ভেতরের অর্ধবৃত্তদুটোর ব্যাসের অনুপাত যাই হোক না কেন। আশ্চর্য সিদ্ধান্ত! কিন্তু সত্যি। এই বৃত্তদুটোকে সেই থেকে আর্বেলসে আর্কিমিডিসের জোড়া বৃত্ত বলা হয়।
এরপর প্রায় পাঁচশো বছর আর্বেলস নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য নেই, অন্তত লিখিত বা প্রামাণ্য নথিপত্রে। তারপর প্যাপাস এক চমকপ্রদ সূত্র আবিষ্কার করেন, যার দ্বারা আর্বেলসের মধ্যে পরস্পর স্পর্শকারী বৃত্তের সারি বসিয়ে যে বৃত্তের মালা পাওয়া যায়, তার মধ্যে যেকোনওটার মাপ নির্ণয় করবার পদ্ধতি পাওয়া যায়বর্তমান কালে জ্যামিতিক ইনভার্শন ব্যবহার করে খুব সহজেই সূত্রটা প্রমাণ করা যায়। কিন্তু সেই যুগে প্যাপাস কিভাবে এই সত্যটা আন্দাজ করেছিলেন ভাবলে অবাক হতে হয়।
প্যাপাসের পর আরও অনেকেই আর্বেলসের নানান আঙ্গিকের প্রতি আলোকপাত করেছেন। কিন্তু সেরকম উল্লেখযোগ্য পরিণাম তেমন কিছু আসেনি। আমাদের ডঃ ব্যাঙ্কফের হাতে যেন তার আবার করে পুনরুত্থান হল।
গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে ফরাসী অধ্যাপক থীবো আর্বেলস নিয়ে এক আকর গ্রন্থের পাঁচটি পরিচ্ছেদ রচনা করেন। তা পড়ে ব্যাঙ্কফ আর্বেলসের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং সাগর পেরিয়ে ফ্রান্সের প্রত্যন্ত গ্রাম টেনি-তে গিয়ে থীবোর সঙ্গে দেখা করেন। দুজনের জাতীয়তা, ভাষা ও পেশায় কোনও মিল না থাকলেও আর্বেলসের সূত্রে মনের কম্পাঙ্কে অনুরণন উঠতে দেরি হয়নি। মনোজগতে ভাবের আদানপ্রদানে কোনও বাধাও হয়নি। বয়োবৃদ্ধ থীবো আর্বেলস নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি নবীনতর ব্যাঙ্কফকে দান করেন। এই সূত্রে ব্যাঙ্কফের অবশ্য আর একটা লাভও হয়। অধ্যাপক থীবোর সঙ্গে আলাপচারিতায় যিনি দোভাষীর কাজ করেছিলেন, পরে সেই ম্যাডাম ফ্রান্সিনকে তিনি পেয়েছিলেন নিজের জীবনসঙ্গিনী রূপে।
আর্বেলস ব্যাঙ্কফের নেশা হয়ে দাঁড়ায়। উদ্ভাবন করেন আরও অত্যাশ্চর্য সব পরিণাম। ক্রমে তার পরিমাণ এতো বেশী হয়ে যায়, ব্যাঙ্কফ থীবোর গ্রন্থে আরও পাঁচটি পরিচ্ছেদ যোগ করার পরিকল্পনা করেন।
সে পরিকল্পনা তিনি অবশ্য কার্যকরী করে যেতে পারেননি। কিন্তু তরুণ গণিতমানসে তিনি আর্বেলস গবেষণার বীজটা বুনে দিতে পেরেছিলেন তাঁর সর্বাপেক্ষা চমকপ্রদ অনুসন্ধানের ফলে। আর্কিমিডিসের বাইশ শতাব্দীরও বেশী পরে তিনি আবিষ্কার করেন, আর্বেলসের মধ্যে লুকিয়ে থাকা আরও দুটি আর্কিমিডিস বৃত্ত’, যাদের উৎপত্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে, কিন্তু মাপে অবিকল আর্কিমিডিস বৃত্তদ্বয়ের সমান! এগুলি আজ আর্বেলসের ব্যাঙ্কফ বৃত্ত বলে খ্যাত।
এরপর যেন আর্বেলসের মধ্যে আর্কিমিডিস বৃত্ত খুঁজে পাবার মিছিল লেগে গেল। দেখা গেল, আর্কিমিডিস ও ব্যাঙ্কফের দ্বারা আবিষ্কৃত মোট ঐ চারটি মাত্র নয়, আর্বেলসের বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে আছে আরও অনেক আর্কিমিডিস বৃত্তগবেষণায় পাওয়া গেছে প্রায় একশর বেশি এই একই মাপের বৃত্ত, যারা কোনও না কোনও ভাবে যুক্ত হয়ে আছে আর্বেলসের সঙ্গে। এখনও আবিষ্কৃত হয়ে চলেছে। একটা ওয়েবসাইট করা হয়েছে, এই সব আর্কিমিডিস বৃত্ত’-এর বিবরণ সেখানে আর্কাইভ করা হচ্ছে আর্কিমিডিস সার্কল’-এর আর্কাইভ সাইটের লিঙ্ক — http://home.wxs.nl/~lamoen/wiskunde/Arbelos/Catalogue.htm
আর্বেলসম্যান ডঃ ব্যাঙ্কফ আর আজ নেই। ১৯৯৭ সালে অষ্টাশি বছর বয়েসে এই অঙ্কপাগল ডাক্তারবাবু আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর জীবদ্দশার শেষ ত্রিশ বছরেও তিনি তাঁর সমস্ত আবিষ্কারের গ্রন্থীকরণ করে যেতে পারেননি। আজকের তরুণ গাণিতিকেরা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তাঁর অসমাপ্ত আরব্ধ কর্ম।
এই আশ্চর্য ডাক্তারবাবুটি জীবনে কিন্তু শুধু অঙ্কই করেননি। যে কোনও শিল্পকর্মে ছিল তাঁর সহজাত আকর্ষণ। তিনি গান শুনতেও ভালবাসতেন। সিদ্ধহস্ত ছিলেন গীটার ও বেহালাবাদনে। আবার তিনি ছিলেন ভালো স্থপতি। অবসর সময়ে মূর্তি তৈরি করতেন। তাঁর আর এক নেশা ছিল ক্যালিগ্রাফি বা হরফবিদ্যা। তিনি এক জায়গায় বলেছিলেন, বিভিন্ন পেশার মধ্যে তিনি দাঁতের ডাক্তারিকে বেছে নিয়েছিলেন তাঁর এই শিল্পের প্রতি ঔৎসুক্যের কারণেই। মানুষের দাঁতের গঠনের মধ্যে তিনি পেতেন অনেক শৈল্পিক নকশার প্রেরণা!
এতরকম শখের মাঝে তিনি ডাক্তারিটা তাহলে করতেন কখন? চিকিৎসকের দায়িত্বে কি ফাঁকি দিতেন? উঁহু, তাও নয়। ডঃ ব্যাঙ্কফ তাঁর সময়ের প্রথিতযশা দন্তবিশেষজ্ঞ ছিলেন। ভাবলে বিস্ময় জাগে, অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ব্যাপী চিকিৎসক পেশায় অগণিত ছিল তাঁর রোগীর সংখ্যা। তার মধ্যে ছিল বেশ কিছু হলিঊডের তারকা, রাজনীতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। আর শুধু মানুষই নয়, বেশ কয়েকটি চতুষ্পদের— পূর্ণবয়স্ক বাঘ ও সিংহ সমেত — দন্তোপচারও তিনি করেছিলেন!
অদ্ভুত এই মানুষটির জন্মদিন ১৩ই ডিসেম্বর, গত ২০০৮ সালে ছিল তাঁর জন্মশতবার্ষিকী।
এরপর কখনও যদি ডেন্টিস্ট আপনার দাঁত পরীক্ষা করতে গিয়ে আচমকা প্রশ্ন করে বসেন, আর্বেলসে আরও একটা আর্কিমিডিস সার্কল বেরিয়েছে মশাই, তাহলে চমকে যাবেন না। আমি অন্তত যাব না। বরং নিশ্চিন্ত হব এই ভেবে যে, ডঃ ব্যাঙ্কফের উত্তরাধিকার তাহলে শেষ হয়ে যায়নি।