Showing posts with label সুচরিতা দত্ত. Show all posts
Showing posts with label সুচরিতা দত্ত. Show all posts

প্রবন্ধ:: দুই প্রোফেসরের কথা - সুচরিতা দত্ত

দুই প্রোফেসরের কথা
সুচরিতা দত্ত

প্রোফেসর হেশোরাম হুঁশিয়ার কিন্তু ভারি রাগ করেছেন। না না, ভয় পেয়ো না, তোমাদের উপর নয়, উনি রাগ করেছেন ‘সন্দেশ’ পত্রিকা আর তার সম্পাদক সুকুমার রায়ের উপর। তা রাগ হবে নাই বা কেন? ‘সন্দেশ’ পত্রিকা সেকাল একালের কত জীবজন্তু, আশ্চর্য ঘটনার কথাই লেখে আর হেশোরাম হুঁশিয়ার যে কত কষ্ট করে তার দলবল নিয়ে কোন সেই কারাকোরামের বন্দাকুশ পাহাড়ে কী ভয়ানক অভিযানটাই না করে এলেন, কত অদ্ভুত জীবজন্তুদের কিম্ভুত কীর্তিকলাপের কথাই না জানলেন, সেই বিষয়ে কারোর কোনও মাথাব্যথাই নেই! রাগ না হয়ে যায়?
ভাবছ তো কেই বা এই হেশোরাম হুঁশিয়ার? তিনি সুকুমার রায়ের উপর রাগ করেছেন কি না জেনে ভারি বয়েই গেল! উঁহু, অমন মুখ ঘুরিয়ে থাকলে প্রোফেসর হুঁশিয়ারের দুর্ধর্ষ রোমহর্ষক অভিযানের কথা তোমরা জানবে কী করে?

প্রোফেসর হেশোরাম হুঁশিয়ার আর তাঁর দলবল
আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে ১৯২২ সালে প্রোফেসর হুঁশিয়ার, তাঁর ভাগনে চন্দ্রখাই, দুই পাঞ্জাবী শিকারি ছক্কড় আর লক্কড় সিং, ছয়জন কুলি ও একটা কুকুরসহ অভিযান করেছিলেন কারাকোরামের বন্দাকুশ পাহাড়ের অজানা জায়গায়। যেসব জায়গায় তারা গিয়েছিলেন তা যেমন অতি অদ্ভুত তেমনি সেখানকার গাছপালা, ফলমূল, জীবজন্তু সবই কেমন যেন অতি কিম্ভূত। সেসব জায়গায় প্রাণীদের যেমন কেউ কখনও দেখেনি, তেমনি তাদের নামও কেউ জানে না। ভাগ্যিস প্রোফেসর ওরকম দুর্গম জায়গায় অভিযান করেছিলেন! তাই তো আমরা সেই বিদঘুটে প্রাণীগুলোর পরিচয় পেলাম। ভাবছ তখন থেকে অদ্ভুত-কিম্ভুত-বিদ্ঘুটে এইসব বিশেষণের বোঝা বাড়িয়েই যাচ্ছি? কী এমন প্রাণী তারা!
তাহলে শোন তাদের বর্ণনা।
হাতির চাইতেও বড়ো প্রকান্ড এক মানুষ (নাকি বাঁদর?) সারাক্ষণ শুধু খেয়েই যায়। প্রোফেসর তার নাম দিয়েছিলেন ‘হ্যাংলাথেরিয়াম’
তারপর? তাপ্পর আরও আছে। উটপাখির মতো বড়ো লম্বা গলার অদ্ভুত পাখি ‘ল্যাগব্যাগর্নিস’সে যে কোনদিকে চলবে, এগোবে না পিছোবে তা নিজেই জানে না! কাঁকড়ামতী নদীর ধারে আছে বিশালাকৃতি জানোয়ার ‘ল্যাংড়াথেরিয়াম’, আছে না সাপ, না মাছ, না কুমীর ‘চিল্লানোসোরাস’, ছোটো নিরীহ গোছের নিতান্তই গোবেচারা ‘বেচারাথেরিয়াম’আছে খিটখিটে, খুঁতখুঁতে গোমড়া মেজাজ আর অনন্ত বিরক্তিকর মুখ করে থাকা বিকট প্রাণী ‘গোমড়াথেরিয়াম’

হ্যাংলাথেরিয়াম
কী? এদের নাম শুনেছ কখনও? শোনোনি তো? তাহলেই ভাবো, ভাগ্যিস প্রোফেসর কারাকোরামে ওরকম অদ্ভুত জায়গায় গিয়ে পড়েছিলেন! তাই তো আমরা  জানতে পারলাম সে জায়গার প্রাণীদের কথা। সত্যি মিথ্যে না হয় তোমরাই বিচার করে নিও আমার আর কী!
কিন্তু তারপর কী হল প্রোফেসর হুঁশিয়ারের? তা আর কী বলব দুঃখের কথা! তিমিমাছের মতো কী এক বিশাল নাম না জানা জন্তুর ডানার ঝাপটানিতে প্রোফেসর ও তার দলবল পুরো ছত্রভঙ্গ হয়ে কোনওরকমে নিজেদের প্রাণটা নিয়ে পালিয়ে এসে বেঁচেছেন! তবে সুকুমার রায়ের উপর তাঁদের বোধহয় আর রাগ নেই কারণ, তাদের এই রোমহর্ষক অভিযানের কাহিনি সুকুমার রায় ছিলেন বলেই তো আমরা জানতে পারলাম!
তা প্রোফেসর হেসোরাম হুঁশিয়ার আর কোনও অভিযান করেছিলেন কি না তা বাপু আর জানার জো নেই কারণ, বিখ্যাত এই চরিত্রের স্রষ্টা সুকুমার রায় খুব অল্প বয়সে মারা যান।

ল্যাংড়াথেরিয়াম
প্রোফেসার হেশোরামের অভিযানের প্রায় চল্লিশ বছর পর ১৯৬১ সালে ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় আবার এক অভিযানের কাহিনি প্রকাশিত হয় সুকুমারপুত্র সত্যজিৎ রায়ের কলমে – ‘ব্যোমযাত্রীর ডায়েরি’এই অভিযানের পুরোভাগে ছিলেন ভারত তথা পৃথিবীবিখ্যাত বৈজ্ঞানিক প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু। জানিয়ে রাখি শঙ্কুর চরিত্র নির্মাণের প্রারম্ভে সত্যজিতের অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর বাবার সৃষ্ট বিখ্যাত চরিত্র প্রোফেসর হেশোরাম হুঁশিয়ার ও আর্থার কোন্যান ডয়েলের প্রোফেসর চ্যালেঞ্জার। লক্ষণীয়, প্রোফেসর হেশোরাম হুঁশিয়ারের অভিযান কাহিনি লেখা হয়েছিল ডায়েরির আকারে। কাহিনির নাম ছিল ‘হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি’১৯৬১ সালে শঙ্কুর প্রথম অভিযানের নামও ছিল ‘ব্যোমযাত্রীর ডায়েরি’শঙ্কুর সমস্ত অভিযানগুলিও লেখা ডায়েরির আদলেই। তাছাড়া সুকুমার রায় আর সত্যজিৎ রায়ের অলঙ্করণে নির্মিত হেশোরাম আর শঙ্কুর চেহারা দেখলেই সাদৃশ্যের স্পষ্ট ছাপ কারোরই নজর এড়িয়ে যাবে না।
জানি তোমাদের অনেকের মনেই আবার প্রশ্ন জেগেছে, কে এই শঙ্কু? তোমরা অনেকেই হয়তো এর মধ্যে শঙ্কুর অভিযানের কিছু কাহিনি পড়ে ফেলেছ। তাঁকে সবচেয়ে বেশি চেনেন একমাত্র সত্যজিৎ রায়। সত্যজিৎ-এর কলমে শঙ্কুর যেটুকু পরিচয় পাওয়া যায়, তা হল ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু ওরফে তিলুর বাবা ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু ছিলেন পেশায় পদার্থবিদ। শঙ্কুর অতি বৃদ্ধ প্রপিতামহের নাম বটুকেশ্বর শঙ্কু। ছোটো থেকেই শঙ্কু অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। মাত্র বারো বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এর চার বছর পর অর্থাৎ ষোল বছরে (যেই বয়সে আমরা মাধ্যমিক নিয়ে হিমসিম খাই) তিনি পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন দু-দুটি বিষয়ে অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন! ১৯৯২ সালে আনন্দমেলায় পূজাসংখ্যায় প্রকাশিত শঙ্কুর শেষ সম্পূর্ণ অভিযান ‘স্বর্ণপর্ণী’ থেকে জানা যায় ২০ বছর বয়সে শঙ্কু স্কটিশচার্চ কলেজে অধ্যাপক হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন। তবে ‘ব্যোমযাত্রীর ডায়েরি’ থেকে শুরু করে অন্যান্য অভিযানগুলিতে আমরা শঙ্কুর যে চিত্র পাই তা প্রৌঢ়ত্বের সীমানায় পৌঁছনো এক বিজ্ঞানসাধকের। তাই বলে সারাক্ষণ কি তিনি মুখ গোঁজ করে ল্যাবরেটরিতে কাজ করেন? মোটেই তা নয়। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ। শুনলে অবাক হয়ে যাবে যে তিনি ৬৯টি ভাষায় পারদর্শী। শুধু বিজ্ঞানসাধক বললে তাই তাঁর প্রতিভাকে খাটো করা হয় তিনি আদপেই একজন প্রকৃত জ্ঞানসাধক।


তো এহেন প্রফেসর শঙ্কুর নিবাস উশ্রী নদীর তীরে গিরিডিতে। সাথে থাকে চাকর প্রহ্লাদ ও ২৪ বছর ধরে তাঁর একান্ত অনুগত বিড়াল নিউটন। তাঁর বাড়ির কাছেই থাকেন প্রতিবেশী অবিনাশ মজুমদার। শঙ্কু শুধু ভারতেই না, পৃথিবীর বিজ্ঞানীমহলেও এক অতি পরিচিত নাম। তাই পৃথিবীব্যাপী তার জ্ঞানীগুণী বন্ধুবান্ধবের সংখ্যাও নেহাৎ কম না। ব্রিটিশ বৈজ্ঞানিক জন সামারভিল, জার্মান নৃতত্ত্ববিদ উইলহেলম ক্রল, ব্রিটিশ ভূ-তত্ত্ববিদ জেরেমি সন্ডার্স যেমন তাঁর বন্ধুতালিকায় ঝকমক করেন তেমনি এঁরা শঙ্কুর কোনও কোনও অভিযানের সহযাত্রীও বটে।
শঙ্কুর আবিষ্কারের কথা যদি শোনো তো চোখ কপালে উঠবেই। কী নেই সেই তালিকায়! টেলিস্কোপ, মাইক্রোস্কোপ, এক্স-রেস্কোপের সমন্বয়ে তৈরি অমনিস্কোপ, ধন্বন্তরি ওষুধ মিরাকিউল, লিঙ্গুয়াগ্রাফ, মহাকাশযাত্রার জন্য শাঁকোপ্লেন, নিশ্চিহ্ন করার অস্ত্র অ্যানাইহিলিন গান বা নিশ্চিহ্নাস্ত্র, রোবট রোবু, হাঁচির জন্য স্নাফগান, আরও কত কী! সব বলতে গেলে এ লেখা আর শেষ হবে না।
প্রোফেসর শঙ্কু মাঝে মধ্যেই বিভিন্ন দেশ থেকে বা বিভিন্ন ব্যক্তির আমন্ত্রণ পান এবং তারপরই শুরু হয় একের পর এক দুর্ধর্ষ অভিযানের পটভূমি। মাঝে সাঝে বাড়িতে বসে অথবা বাইরে বেড়াতে গিয়েও জড়িয়ে পড়েন একাধিক সমস্যায়, রহস্যের জালে। তাঁর গিরিডির বাড়ি থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, ইউরোপের একাধিক দেশ, সাহারা, বলিভিয়া মায় সৌরজগৎ (ব্যোমযাত্রীর ডায়েরি) থেকে জলের অতল (প্রোফেসর শঙ্কু ও রক্তমৎস্য রহস্য) পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে টান টান রহস্যের জাল ও অ্যাডভেঞ্চারের হাতছানি। ১৯৬১ সালে ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় ‘ব্যোমযাত্রীর ডায়েরি’ থেকে শুরু করে ১৯৯২ সালে ‘আনন্দমেলা’ পুজোসংখ্যায় ‘স্বর্ণপর্ণী’ একত্রিশ বছর ধরে সত্যজিৎ রায় শঙ্কুর আটত্রিশটি অভিযানের কাহিনি রচনা করেছেন। সত্যজিতের মৃত্যুর পর দুটি কাহিনি অসমাপ্ত থেকে যায় – ‘ইনট্রেলেক্টন’ ও ‘ড্রেক্সেল আইল্যান্ডের ঘটনা’সমাপ্ত ও অসমাপ্ত মোট চল্লিশটি কাহিনি একসাথে দুই মলাটের মধ্যে এনে ২০০২ সালে আনন্দ পাবলিশার্স ‘শঙ্কু সমগ্র’ প্রকাশ করে। এছাড়া শঙ্কুর একাধিক কীর্তিকলাপ একত্র করে প্রকাশিত অন্যান্য বইগুলি হলঃ
প্রোফেসর শঙ্কু, নিউ স্ক্রিপ্ট, কলকাতা, ১৯৬৫
প্রোফেসর শঙ্কুর কান্ডকারখানা, আনন্দ, ১৯৭০
সাবাশ প্রোফেসর শঙ্কু, আনন্দ, ১৯৭৪
মহাসংকটে শঙ্কু, আনন্দ, ১৯৭৭
স্বয়ং প্রোফেসর শঙ্কু, আনন্দ, ১৯৮০
শঙ্কু একাই ১০০, আনন্দ, ১৯৮৩
পুনশ্চ প্রোফেসর শঙ্কু, আনন্দ, ১৯৯৩
সেলাম প্রোফেসর শঙ্কু, আনন্দ, ১৯৯৫
এছাড়াও ‘শঙ্কুর কঙ্গো অভিযান’, ‘প্রোফেসর শঙ্কু ও ইউ.এফ.ও’, ‘মরুরহস্য’ ইত্যাদি বেশ কিছু অভিযান পৃথক বই আকারেও আনন্দ থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
বেশ কিছু কাহিনি প্রকাশিত হয়েছে কমিকস আকারেও।
এরপর? এরপর আর কী? প্রোফেসর শঙ্কু নিয়ে অনেক কথাই তো জানলে। এরপর চটপট পড়ে নাও শঙ্কুর অভিযানগুলি। আর হ্যাঁ, তার আগে কিন্তু প্রোফেসর হুঁশিয়ারের কথা পড়তে ভুলো না। একটা সুখবর দিয়ে লেখাটা শেষ করি।
সত্যজিৎপুত্র সন্দীপ রায় খুব তাড়াতাড়িই সিনেমার পর্দায় আনতে চলেছেন প্রোফেসর শঙ্কুকে। আমরা মানে যারা শঙ্কুর ভক্ত, তারা এখন সেই প্রতীক্ষায় দিন গুনছি।

_____

গোলটেবিল:: হীরা মানিক জ্বলে : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় :: আলোচনাঃ সুচরিতা দত্ত



লেখকঃ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
আলোচনাঃ সুচরিতা দত্ত

ছোট্ট বন্ধুরা কেমন আছ? নতুন বছরে নতুন ক্লাসে উঠে পড়াশুনার গাড়ি-ঘোড়ায় জিন লাগিয়ে টগবগিয়ে ছুটে চলছ, তাই না? আচ্ছা, কেমন পড়ছ একটা পরীক্ষা হয়ে যাক। অ্যানাকোন্ডা সাপ কোথায় দেখা যায় বল তো? অথবা মাংসাশী পিঁপড়ে? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছ। বৃষ্টিবনে। আর সেই বৃষ্টিবন কোথায় দেখা যায়? বাহ্‌, এটাও ঠিক। আমাদের নীলগ্রহ পৃথিবীর মাঝখান দিয়ে গেছে ‘Great Circle’ অর্থাৎ, নিরক্ষরেখাআর তার আশেপাশেই দেখা মেলে সেই সুগভীর বৃষ্টিবনের সেই বৃষ্টিবন এতটাই ভয়ানক যে দিনের বেলাতেই সূয্যিমামার দেখা পাওয়া ভার! দুনিয়ার বিষাক্ত, খতরনাক সব জন্তু-জানোয়ার, সরীসৃপরা ওখানেই জমিয়ে তুলেছে ওদের আড্ডা
এই রে! ভাবছ তো, ভূগোলের দিদিমণি আবার জ্ঞানের ঝাঁপি উপুড় করে দিচ্ছে! না না, ব্যাপারটা মোটেই তা নয়।
ঢাক গুড়গুড় ছেড়ে এবার আসল কথায় আসি। আজ তোমাদের দারুণ একটা অ্যাডভেঞ্চারের গল্প শোনাই। তারপরই বুঝতে পারবে কেন বৃষ্টিবনের কথা বলছিলাম। ‘চাঁদের পাহাড়’-এর শঙ্করের কথা নিশ্চয়ই জান? কার লেখা বল তো? একদম ঠিক। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ওনারই লেখা আরেকটি অ্যাডভেঞ্চারের গল্প শোনাই আজ। এবারের অ্যাডভেঞ্চার মালয়, সুমাত্রা, বোর্নিওর নিরক্ষীয় বৃষ্টিবনে। না, এবার আর শঙ্কর না। এ কাহিনির নায়ক সুশীল। ম্যাট্রিক পাশ দিয়ে দিব্যি পায়ের উপর পা তুলে তার চলছিল। কিন্তু ঐ যে! যার রক্তে অ্যাডভেঞ্চারের নেশা তাকে পায় কে! পরিচয় হল জামাতুল্লার সাথে। সুশীল আর তার খুড়তুতো ভাই সনৎ বেরিয়ে পড়ল গভীর বনে লুকিয়ে থাকা পুরনো এক সভ্যতার ধনসম্পদের খোঁজেধনসম্পদের চেয়েও সুপ্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার ধ্বংসস্তূপ খুঁজে বার করে অজানাকে জানার আগ্রহই তাদের প্রবল। আর তারপর? তারপর প্রতি পদে পদে মৃত্যুফাঁদ পেরিয়ে তারা কীভাবে সেখানে পৌঁছোয়, শত শত বছরের লুকানো ধনসম্পত্তি খুঁজে পায় কি না তা আর বলব না। জানতে হলে পড়ে ফেল ‘হীরা মানিক জ্বলে’। টান টান এ উপন্যাস পড়তে পড়তে গায়ের লোমকূপ যে খাড়া হয়ে যাবেই তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর? আর সাথে ভাল করে চিনবে ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ নিরক্ষীয় বৃষ্টিবনকেজানবে ভয়ানক এই অরণ্যের অলিগলিতে লুকিয়ে থাকা অজস্র রহস্যকে। জানবে ভারতীয় হিন্দু রাজাদের বিস্মৃতপ্রায় এক অতীতকে, বিস্মৃতির আড়ালে চাপা পড়ে যাওয়া এক ভারতীয় ঐতিহ্যকে। তাহলে আর দেরি কীসের? এক নিঃশ্বাসে চটপট পড়ে ফেল শ্বাস রুদ্ধ করা অসাধারণ এই অ্যাডভেঞ্চারটি। মিত্র ও ঘোষ থেকে প্রকাশিত বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিশোর-সাহিত্য সমগ্র, বিভূতিভূষণ রচনাবলিতে পাবে এই উপন্যাসটি। এছাড়াও আলাদাভাবে বই আকারেও প্রকাশিত হয়েছে অ্যাডভেঞ্চারটি।


_____

গোলটেবিল:: জম্ভলা দেবতার পুরোহিতঃ হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত :: আলোচনাঃ সুচরিতা দত্ত

বইঃ জম্ভলা দেবতার পুরোহিত
লেখকঃ হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
প্রকাশকঃ পশ্চিমবঙ্গ শিশু কিশোর একাডেমি
আলোচনাঃ সুচরিতা দত্ত

ছোট্ট বন্ধুরা, ধরো কোথাও ঘুরতে গেছ। আর ঘুরতে গিয়ে হঠাৎ করে যদি জড়িয়ে যাও কোনও অভিযানে, যার মধ্যে আবার দিব্যি মিশে আছে রহস্যের ঝাঁঝ , কেমন হবে? রাহুলের অভিজ্ঞতা কিছুটা তেমনই। বেচারা অফিসের কাজে এসেছিল কালিম্পং-এ। ওর শখ বুদ্ধমূর্তি সংগ্রহের। আর সেজন্যই 'মলমল এন্ড কোং'-এ আলাপ হল পদ্ম শ্রীবাস্তবের সাথে। অদ্ভুত লোক এই পদ্ম শ্রীবাস্তব। সরকারী গবেষণাগারের জন্য সাপ ধরা তার পেশা। এই ভদ্রলোকের টানেই রাহুলের এডভেঞ্চারপ্রিয় মন শেষ পর্যন্ত সঙ্গী হয় পদ্ম শ্রীবাস্তবের। দুজনে যাত্রা করে জম্ভলা দেবতার গ্রামে। পথে তাদের সাথে আলাপ হয় ডং-পো নামে ওই গ্রামেরই বাসিন্দা এক বাচ্চা ছেলের সাথে।
তিব্বতী অর্থসম্পদের দেবতা হলেন জম্ভলা, যিনি একই সাথে ধনসম্পদেরও দেবতা আবার অপদেবতাদেরও দেবতা। পাহাড়ের কোলে অদ্ভুত এই গ্রামের কথা ট্যুরিস্টরা সাধারণত জানে না, তাই বহির্জগতের থেকে এই গ্রাম অনেকাংশে বিছিন্ন। জম্ভলা দেবতাকে কেন্দ্র করে এই গ্রামের জনজীবন চালিত হয়। গ্রামের প্রধান হলেন জম্ভলা দেবতার প্রধান পুরোহিত। প্রতি বছর এই গ্রামে একদিন জম্ভলা দেবতা দর্শন দেন। ঘটনাচক্রে রাহুলরা যেদিন গ্রামে পৌঁছয় সেদিনই ছিল দেবতার দর্শন দেওয়ার দিন।
এরপর?
এরপর কী হয় রাহুল আর পদ্ম শ্রীবাস্তবের সাথে তা জানতে হলে পড়তে হবে দুর্ধর্ষ এই উপন্যাসটি। রহস্যে মোড়া টান টান এই উপন্যাসটি শুধুই যে জমাট এডভেঞ্চার তাই নয়, বরং হিমাদ্রিকিশোরের অন্যান্য লেখার মতই অনেক তথ্যে ভরপুর। তিব্বতীয় দেবদেবী, পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের অদ্ভুত জীবনযাত্রা, সর্বোপরি বর্ষায় পাহাড়ের অসাধারণ নৈসর্গিক রূপ অনেক কিছুরই ধারণা পাবে এই উপন্যাসে। তাহলে আর দেরি কিসের? থ্রিলার পাঠের ভক্ত যারা তারা পড়ে ফেল এই উপন্যাস। না পড়লে কিন্তু মিস করবে অনেককিছু। শুধু থ্রিলার প্রেমীরাই বা কেন, ছোট বড় সবাই যে এ উপন্যাস চোখের নিমেষে পড়ে শেষ করবেন তার গ্যারান্টি দিতে পারি।
______

গোলটেবিল:: দুই বাংলার একশো ভূতের গল্প:: আলোচনাঃ সুচরিতা দত্ত


বইঃ দুই বাংলার একশো ভূতের গল্প
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও উজ্জ্বল কুমার দাস সম্পাদিত
প্রথম প্রকাশ: ১৯৯৪ এর বইমেলা
আলোচনাঃ সুচরিতা দত্ত

কী ছোট্ট বন্ধুরা, কেমন আছ? আমাদের নববর্ষ সংখ্যা নিশ্চয়ই তোমাদের ভাল লেগেছে। প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবার ম্যাজিক ল্যাম্পের জিনি হাজির তোমাদের কাছে। এবার অবশ্য জিনি একা নয়। জিনির সঙ্গী তেনারা। তেনারা?
বুঝতে পারলে না? সেই অন্ধকারে যাদের ভয়ে তোমরা মা বাবার হাত ছাড়তেই চাও না। অমাবস্যার রাতে শ্যাওড়া গাছের ডাল ধরে নাকি যাদের ঝুলতে দেখা যায়। সেই তারা, যাদের সব কথাতেই চন্দ্রবিন্দু থাকে।
এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ। আরে ভূত গো ভূত। এতক্ষণে অবশ্যই অন্যান্যদের লেখা বেশ কিছু ভূতের গল্প, ছড়া পড়ে ফেলেছ?
তাহলে এবার ভূতের গল্পের বই নিয়ে আলোচনা করা যাক। তোমাদের মত বয়সে আমারও ভূত সম্পর্কে যেমন ভয়ও ছিল তেমনি ছিল অপার কৌতূহল। ভূতের গল্প পড়তে খুব  ভালবাসতাম। অবশ্য ভালবাসতাম বলছি কেন, এখনও ভালবাসি। বাড়ির লোকেদের বলতে গেলে জ্বালিয়ে মারতাম ভূতের গল্পের বই কিনে দাও বলে। সেই শুনে আমার মেজকাকু কথা দিলেন ভূতের গল্পের বই দেবেন, যাতে একটা দুটো নয় একেবারে একশোটা গল্প থাকবে! কিন্তু তার আগে আমায় পরীক্ষায় ভালো ফল করতে হবে। আমিও একদম এইসা জোর পড়াশোনা শুরু করলাম যে থ্রি থেকে ফোরে উঠতে ক্লাসে সেকেন্ড হলাম। রেজাল্ট আগের ক্লাসের তুলনায় অনেক ভাল হল আর সাথে সাথে মেজকাকুর দেওয়া কথা মত আমার হাতে চলে এল "দুই বাংলার একশো ভূতের গল্প"। ভূত যে এত ধরণের হয় তা কি আর আগে জানতাম! কোন ভূত বেদম ভয় দেখায় তো কারোর কীর্তিকলাপে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যায়। কেউ মানুষের উপকার করে তো, কেউ কেউ আবার মানুষের কাছে শিখে নিজেরাই চাউমিন বানাতে ওস্তাদ হয়ে ওঠে। কখনও মানুষ গাছের ছায়াকে ভূত ভেবে আঁতকে ওঠে তো কখনও কখনও সত্যি সত্যি তেনারা এসে দেখা দেন। আর লেখক তালিকাও রীতিমতো আকর্ষণীয়। কে নেই সেখানে? সেই বিদ্যাসাগর বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে সুকুমার রায়, পরিমল গোস্বামী, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, লীলা মজুমদার হয়ে শেখর বসু, মঞ্জিল সেন, প্রলয় সেন, সুকুমার ভট্টাচার্য, অজেয় রায়, হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায় কে নেই! আর শুধু কি এপার বাংলা? আছেন ওপার বাংলার মহম্মদ হাপিজুল হক, ফাতেমা আখতার, মহম্মদ ইলিয়াস ও আর অনেকে। বইটার প্রচ্ছদটা খেয়াল করেছ? দেখলেই কেমন একটা ঠান্ডা স্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে নামতে থাকে। সেরকমই বইয়ের ভেতরের বেশ কিছু সাদা কালো ইলাস্ট্রেশন হাড় হিম করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।
তা এই একশো ভূতের গল্পের বই পেয়ে আমি তো খুশ। সারা বছর জুড়ে পড়ে শেষ হয় না আর সাথে বাড়ির লোকেরাও ভূতের গল্পের বই কিনে দেওয়ার বায়না হাত থেকে মুক্তি পেয়ে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিল বেশ কিছুদিন। তোমরাও পড়ে জানিও কেমন লাগল। এখন আসি তাহলে? পরের সংখ্যায় আবার হাজির হব কোনও বইয়ের সন্ধান নিয়ে। ভাল থেকো বন্ধুরা।
________

গোলটেবিল:: বাংলার ডাকাতঃ পাঁচুগোপাল ভট্টাচার্য:: আলোচনাঃ সুচরিতা দত্ত


বইঃ বাংলার ডাকাত
লেখকঃ পাঁচুগোপাল ভট্টাচার্য
আলোচনাঃ সুচরিতা দত্ত

হা রে রে রে রে রে... কী বন্ধুরা? কী ভাবছ? ভাবছ তো যে ভাবাভাবির আছেটা কি? এরপর তো "আমায় ছেড়ে দে রে দে রে" উঁহু হল না আমি এই বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীতের কথা বলছি না যে সময়ের কথা বলছি সে সময় এই গান লেখাই হয় নি বলছি আজ থেকে আড়াই তিনশো বছর আগেকার কথা যখন বেশিরভাগ জায়গাই ছিল বনবাদাড়ে পরিপূর্ণ সেই সুযোগ নিত তাগড়াই চেহারার কিছু মানুষ হাতে থাকত লাঠি মধ্যরাতে তারা জঙ্গলে কালী পূজা করত আর তারপর 'হা রে রে রে রে রে' করে গৃহস্থদের ধনসম্পদ লুঠ করত এরা বাংলার বিখ্যাত ডাকাত, যাদের ভয়ে জমিদার থেকে সাধারণ মানুষ থরহরি কম্পমান ছিল এরকমই দুর্ধর্ষ কিছু ডাকাতির বিবরণ নিয়ে পাঁচুগোপাল ভট্টাচার্যের বই 'বাংলার ডাকাত' এই বইতে তিনটি গল্প আর দুটি উপন্যাস আছে
গল্পগুলি হল - মানিক ঘোষের আত্মকথা বিষ্টু ঘোষের আত্মকথা ঠাকুর ডাকাত
দুটি উপন্যাস হল - সনাতন সর্দার এবং রাণা সর্দার
মানিক ঘোষের আত্মকথা বিষ্টু সর্দারের আত্মকথা এই দুটি গল্পই হল ধরা পড়ার পর সাহেবের কাছে (তখন ব্রিটিশ রাজত্ব) দুই দুর্ধর্ষ ডাকাতের দোষ স্বীকার, ইংরাজীতে যাকে আমরা confession বলি ঠাকুর ডাকাত গল্পে কিভাবে এক বুদ্ধিমতি বধূর প্রচেষ্টায় তাদের বাড়িতে ঘটে যাওয়া ভয়ঙ্কর ডাকাতির কিনারা হয় তারই মনোজ্ঞ বিবরণ আছে
রাণা সর্দার সনাতন সর্দার দুই দুর্দান্ত ডাকাত সর্দারের ডাকাতির ঘটনা নিয়ে রচিত উপন্যাস এগুলি লেখার সময় লেখক কখনও সরকারী নথি ঘেঁটেছেন, কখনও বা লোকমুখে শুনে আসা ঘটনার সঙ্গে আপন মনের মাধুরী মিশিয়েছেন তাই গল্পগুলি নিছক কাল্পনিক নয় বানানবিধি বা ভাষাবিন্যাসে একটু সেকেলে ছাপ থাকলেও বাংলার ডাকাতদের কাহিনী পড়তে তোমাদের একটুও অসুবিধা যে হবে না তা হলফ করে বলতে পারি; বরং সেকালের ভাষা সম্বন্ধে একটু আধটু ধারণা জন্মাবে
কিন্তু ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা ডাকাতের গল্পের কথা শুনে মনে মনে ভয় পাচ্ছ না তো? না না ভয় পাওয়ার কিছু নেই আসলে সেকালের ডাকাতরা নামেই দুর্ধর্ষ, মানুষ হিসাবে কিন্তু তারা খারাপ নয় অবস্থার পাকে চক্রে কেউ কেউ ডাকাতি করতে বাধ্য হয়েছে কারোর ডাকাতির উদ্দেশ্য কেবল পরোপকার রবিনহুডের মত তারা ধনী জমিদার বা সম্ভ্রান্ত মানুষদের বাড়িতে ডাকাতি করেছে আবার সেই ডাকাতির সমস্ত টাকা পয়সা নিজের জন্য না রেখে খরা কবলিত কোন অঞ্চলের মানুষদের সাহায্য করতে বিলিয়ে দিয়েছে অথবা কোন গরীব মানুষকে কন্যাদায় থেকে উদ্ধার করেছে বাংলার ডাকাতরা যেন ডাকাত নয়, বাংলার রবিনহুড তাই ডাকাতি করার সময় তারা অপ্রয়োজনে কাউকে মারধর করার কথা মনেই আনে না, আর বাড়ির মেয়েদের তো তারা দেবী জ্ঞানে পূজা করে তাই বন্ধুরা নির্ভয়ে বাংলার ডাকাতদের কথা পড়ে ফেল বই পড়লে শুধু ডাকাতির কথাই না, জানতে পারবে সে সময়কার সমাজের চিত্র সেদিক থেকে দেখলে বই পড়া একদম মাস্ট তাই না? তাহলে? তাহলে বই ইচ্ছে তালিকায় ঢুকে গেল তো? ডাকাতির গল্প পড়ে কেমন লাগল তা জানিও কিন্তু আমাদের মেল ঠিকানায়

বইঃ বাংলার ডাকাত
লেখকঃ পাঁচুগোপাল ভট্টাচার্য
দামঃ ১৫০ টাকা
প্রকাশকঃ সুবর্ণরেখা
প্রথম প্রকাশঃ জানুয়ারী, ২০১৬
_________