Showing posts with label সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়. Show all posts
Showing posts with label সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়. Show all posts

অনুবাদ গল্প:: বিশেষজ্ঞ - হেনরি স্লেশার :: অনুবাদঃ সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়


বিশেষজ্ঞ
(হেনরি স্লেশারের ‘ডক্টর’ অবলম্বনে)
অনুবাদঃ সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়

ভদ্রলোক এতক্ষণ বাদে একটু যেন রেগে উঠলেন চাকরির পরামর্শদাতা হিসেবে ওর মাথা এমনিতে যথেষ্ট ঠান্ডা
“আপনি অবশ্যই কোনও একটা উপায় বার করতে পারবেন ডাক্তারবাবু, তিনি জোর গলায় বললেন, “আপনার মতো শিক্ষিত একজন মানুষ... দেখুন, এই যুদ্ধ আমাদের সবাইকে এখনও অমানুষ বানিয়ে দেয়নি যাই হোক না কেন, দেশে এখন বিশেষজ্ঞদের চাহিদাও হাজারগুণ বেড়ে গেছে
ডাক্তার মেইঘাম নিজের চেয়ারে পেছনে হেলে বসে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন
“আপনারা বুঝতে পারছেন না ব্যাপারটা আমি যে বিষয়টা ভালো জানি সেটা নিয়ে আজ আর কারও কোনও কৌতূহল নেই হ্যাঁ, আমি জানি যে মানুষ জানতে চায় কীভাবে এই ছত্রভঙ্গ দুনিয়ায় বিপদের মোকাবিলা করবে তারা জানতে চায় কীভাবে ভালো কারিগর হয়ে ওঠা যায়, কী করে নতুন নির্মাণের জন্য বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠা যায় তারা আগ্রহী প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহরগুলোকে নতুনভাবে গড়ে তোলার জন্য আর ভাঙাচোরা পুরনো মেশিনগুলোকে আবার কাজের উপযোগী করে তোলার জন্য আর এই ভয়ংকর যুদ্ধে যত বিষাক্ত তেজস্ক্রিয়তা ঢুকেছে আমাদের শরীরে সেগুলো যাতে বের করে দেয়া যায় সেটা নিয়েও তাদের চিন্তা, এমনকি যদি ভাঙা হাড়গোড়গুলোও মেরামতি করে দেয়া যায় অবশিষ্ট আহত মানুষজনদের আর বোমার ঘায়ে যাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নষ্ট হয়েছে তাদের জন্য কৃত্রিম অঙ্গ বানানো নিয়েও অনেক চিন্তা আছে ওদের কী করে আবার অন্ধ মানুষকে স্বাবলম্বী, পাগলকে অন্তত কিছুটা শান্ত করা বা যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত মুখগুলো কিছুটা সারিয়ে তোলা যায় এসব দিকেই মানুষের অগ্রাধিকার এখন এইসব বিষয়ই তারা এখন জানতে চায় আর সেটা আপনি আশা করি আমার থেকেও ভালো করে জানেন
“আর আপনার বিশেষত্ব, যেটার আজ আর কোনও দরকার নেই বলে আপনি মনে করেন?
ডঃ মেইঘামের মুখে একটু শুকনো হাসি দেখা দিল এই প্রশ্নে
“আমার মনে হয় না আদৌ আর কিছু জানি বলে একসময় এই নিয়ে মানুষের আগ্রহ তৈরি করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলাম প্রায় পঁচিশ বছর ধরে খেটেছি আমার ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে যাতে ওরা আদর্শ স্মৃতিশক্তির অধিকারী হতে পারে এই নিয়ে আমার লেখা ছ’টা বই বেরিয়েছিল যার মধ্যে অন্তত দুটো বই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক ছিল যুদ্ধবিরতির প্রথম বছরে আমি আট সপ্তাহের একটা কোর্সের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিলাম আর তার জন্য যোগাযোগ করেছিল মোটে একজন তবে এটাই আমার জীবিকা, চিরকাল আমি এই কাজটাই করে এসেছি এই নতুন ভয়ংকর মৃত্যুর পৃথিবীতে আমি আমার কাজের ধারা কী করে বদলাব তা আপনারাই বলুন না!”
চাকরির পরামর্শদাতা ভদ্রলোক তার ঠোঁট কামড়ালেন এই ব্যাপারটা সত্যি একটা চ্যালেঞ্জ ডাক্তার মেইঘাম চলে যাওয়ার সময়েও ওর কাছে কোনও উত্তর ছিল না এই প্রশ্নের তিনি অসহায়ভাবে সেই কুঁজো হয়ে সামনে ঝুঁকে পড়া ক্লান্ত মানুষটাকে বিদায় নিতে দেখলেন নিজের এই ব্যর্থতার জন্য চরম হতাশ লাগছিল তখন নিজেকে কিন্তু সেইদিন রাত্রিবেলা যখন একটা চেনা দুঃস্বপ্নের ফলে ঘুম ভেঙে গিয়ে আর ঘুম এল না ওর তখন তিনি সারাক্ষণ ধরে ডাক্তার মেইঘামের কথাই ভাবছিলেন সকাল হবার সময় তার কাছে উত্তরটা ছিল
একমাস বাদে একটা সরকারি বিজ্ঞাপন বেরলো আর যার জন্য অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে গেল সঙ্গে সঙ্গেই।

হুগো মেইঘাম, পি.এইচ.ডি.
একটা আট সপ্তাহের ক্র্যাশ কোর্সের ঘোষণা করছেনঃ ‘কী করে ভুলতে পারা যায়’
আবেদনপত্র নেওয়া শুরু হবে আগামী ৯ই সেপ্টেম্বর থেকে
_____

অনুবাদকের বক্তব্যঃ আগামীর ছোটো ছোটো কিশলয়দের জন্য যে পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি আমরা তার ঠিক উল্টো একটা দুনিয়ার ছবি আছে এই গল্পে সেই রূপকের মধ্যে দিয়েই লেখক তার যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য রেখেছেন এই অণু-কল্পবিজ্ঞানের গল্পে আইজ্যাক আসিমভ, মার্টিন হ্যারি গ্রিনবার্গ আর জোসেফ ডি. ওল্যান্ডারের সম্পাদনায় একশো অণু-কল্পবিজ্ঞানের যে বিখ্যাত সংকলন বেরোয় গত শতাব্দীর সাতের দশকে, তাতে স্থান পেয়েছিল এই লেখাটা
_____
অলঙ্করণঃ শ্রীময় দাশ

বায়োস্কোপ:: রাজকুমারী মনোনোকের কাহিনি - সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়

সিনেমা সমালোচনা - রাজকুমারী মনোনোকের কাহিনি
সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়

জাপানের ইতিহাসে ১৩৩৬ থেকে ১৫৭৩ খ্রীষ্টাব্দ মুরোমাচি সোগুনের রাজত্বকাল হিসেবে ধরা হয়। মধ্যযুগের এই অধ্যায়টা জাপানের প্রাচীন সাহিত্য আর শিল্পকলায় এক অনন্য স্থান নিয়ে আছে। নানা অদ্ভুত লৌকিক-অলৌকিক বিশ্বাস আর দেশীয় আচারের পরিচয় পাওয়া যায় এই সময়কার কৃষ্টিতে। এই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে একটা অসামান্য অ্যানিমে (অ্যানিমেশন) ছায়াছবিপ্রিন্সেস মনোনোকে [জাপানী ভাষায় ‘মনোনোকে হিমে’] যার পরিচালক অ্যানিমের জাদুকর হায়াও মিয়াজাকি আর নির্মাতা ঘিবলি (জাপানী ভাষাতে ঝিবড়ি) স্টুডিও
গল্পের শুরুতে বিরাট এক বন্য শুকরের বেশে একটা দৈত্য আক্রমণ করে এক এমিসি গ্রামে। এই এমিসিরা ছিল একরকম আদিম জনগোষ্ঠী যারা হোনসু দ্বীপের উত্তর পূর্বে তোহোকু অঞ্চলে বাস করতএরা ছিল মূলতঃ অরণ্যের অধিবাসী, স্বাধীন। বহুবার জাপানের মূল সাম্রাজ্যের বিরাট সৈন্যবাহিনী এদের সঙ্গে যুদ্ধ করেও পেরে ওঠেনি। প্রায় গেরিলা পদ্ধতিতে ছোট ছোট দলে ভেঙে অতর্কিতে আক্রমণ করত এমিসিরা। যাই হোক, গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়ার আগেই এমিসিদের শেষ রাজপুত্র আসিতাকা ওই দৈত্যকে মেরে ফেলেন। কিন্তু পরে জানা যায় যে ওই দৈত্য আসলে ছিল শুকরদের এক দেবতা যার নাম নাগো। জাপানের প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী সমস্ত বন্যপ্রাণীদেরই একজন করে দেবতা ছিলেন। গ্রামের থেকে এই গুজব শোনা যায় যে এই দেবতা তার শরীরে একটা লোহার বল ধারণ করে অভিশপ্ত দানবে পরিণত হয়েছিলেন। ওই দানবকে যে হাত দিয়ে হত্যা করেছিলেন রাজপুত্র আসিতাকা তার সেই ডানহাত শাপভ্রষ্ট হয়ে যায়। এই অভিশাপের ফলে অদ্ভুৎভাবে তার ওই হাতে কিছুদিনের জন্য এক অতিমানবিক শক্তি এসে যায় কিন্তু ধীরে ধীরে অনিবার্য মৃত্যুর দিকে তিনি এগোতে থাকেন। তখন গ্রামের এক বয়স্কা জ্ঞানী মহিলা রাজকুমারকে পরামর্শ দেন পশ্চিমদিক বরাবর এগিয়ে যেতে যে অঞ্চল থেকে নাগো দৈত্য এসেছিল। হয়তো এই অভিশাপের প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে সেখান থেকে।


রাজকুমার আসিতাকা

ওই পথেই আসিতাকার দেখা হয়ে যায় সন্ন্যাসী জিকো-বো’র সাথে যিনি তখন সারা জাপান পরিভ্রমণ করছিলেন। এই অত্যন্ত ক্ষমতাশালী সন্ন্যাসী কুমার আসিতাকাকে পরামর্শ দেন কাছের জঙ্গলেই ঘুরে বেড়ানো বনের প্রাচীন আত্মার সাথে দেখা করার জন্য যিনি দিনেরবেলা ‘কিরিন’ (চীন ও জাপানের প্রাচীন পুরান আর উপকথায় বর্ণিত জীব) আর রাতের বেলা এক ভয়ংকর দানবের রূপে থাকেন। একমাত্র এই প্রানীই পারে এই অভিশাপকে ঠেকাতে। রূপকথার ওই প্রানীর সন্ধান করতে গিয়ে কুমার আসিতাকা পৌঁছে যান এক লোহার তৈরি শহরের মধ্যেএই শহর নাকি তৈরি করার জন্য এক প্রাচীন অরণ্যের অনেকটা অংশ কেটে ফেলা হয়েছিল এর ফলে ওই অরণ্যের দেবতাদের সাথে ভয়ংকর সংঘাতে জড়িয়ে পরে এই শহরের মানুষ বিশেষ করে তাদের রাণী এবোসি। তার পর থেকেই এই শহরে অনেকে এসে জোটে এমনকী তাদের মধ্যে রয়েছে সমাজ পরিত্যক্ত গুন্ডা বদমাইশের দল। এদের দিয়েই রাণী এবোসি নানা রকম আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি করাতে থাকেন যেগুলো ওই দেবতাদের সঙ্গে যুদ্ধে কাজে লাগে ভীষণভাবে। এরকম এক যুদ্ধেই নাগোর দেহে একটা লোহার গোলা ঢুকে গিয়ে সে অভিশপ্ত দানবে পরিণত হয়ে গেছিল।


রাণী এবোসি

রাণী এবোসির এই গুন্ডাবাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে জড়িত ছিল সান নামে এক কিশোরী মেয়ে। এই সান মানুষ হয়েছিল নেকড়েদের মধ্যে তাই জঙ্গলের প্রাচীন আত্মার সঙ্গে সে ছিল একাত্ম হয়ে। অরণ্যের বিরুদ্ধে মানুষের এই সংগ্রামে সে তীব্রভাবে ছিল মানুষের বিপক্ষে। নিজেই সে মনোনোকে উপাধি নিয়েছিল। জাপানী ভাষায় এই শব্দের মানে আত্মা। এই কথাবার্তার মধ্যে সান আক্রমণ করে বসে রাণী এবোসির শহরে। এই যুদ্ধে রাজকুমার আসিতাকাও জড়িয়ে পড়ে বাঁচাতে চান রাণী এবোসিকে। কিন্তু মারাত্মক আঘাত পেয়ে সানের মতোই অজ্ঞান হয়ে যান তিনিওজ্ঞান ফিরে পাবার পর রাজকুমার আসিতাকা, সান বা মনোনোকের সাথেই তার জঙ্গলে গিয়ে সেখানকার অধিবাসীদের জীবনশৈলী জানতে পারেন। এই সুপ্রাচীন অরণ্যের আত্মার সাথে তারা যে কতটা একাত্ম হয়ে আছেন সেটা জানতে পেরে আসিতাকার ভুল ভাঙে। এই সব বিরাট পুরোন গাছেরা মৌন থেকেও যে অশ্রুত সুরে গান গেয়ে যায় সেই গানের সুর আস্তে আস্তে ধরতে পারেন তিনি। বুঝতে পারেন যে যন্ত্র সভ্যতার দম্ভে আসলে মানুষই এই মহান ঐতিহ্যকে ধ্বংস করতে যাচ্ছে। মনোনোকের জন্যই তার শাপ মুক্তি ঘটে বনের এক আত্মার  সাহায্যে।


সান ওরফে রাজকুমারী মনোনোকি

এরপর কি হবে? যন্ত্রের গরবে মত্ত মানুষ না প্রকৃতির ছায়ায় বেড়ে ওঠা অরণ্যবাসীরা কে জিতবে এই যুদ্ধে। নাকি দুজনেই এক সহজ সরল সহাবস্থানে আসতে পারবে? জানতে হলে অবশ্যই দেখতে হবে এই অনবদ্য ছবিটা। এখন এ দেশেও যথেষ্ঠ সুলভ এর ডিভিডি।


সিরাতানি উনুসি’র ঘন জঙ্গল; যা এই ছবির অনেক গ্রাফিক ডিজাইনের প্রেরণা

এই ছবির গল্পে পৌরাণিক এবং লৌকিক নানা প্রাণীর ছায়া আছে। লোক আঙ্গিকে গল্পের বয়ানের মধ্যে দিয়ে আসলে পরিবেশ হত্যাকারী আধুনিক মানুষের সভ্যতার উদ্দ্যেশেই তীব্র শ্লেষ ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি গল্পের আখ্যানের এই বিষয়বস্তুটা রজার এবার্টের মতো বিখ্যাত সমালোচকেরও খুব পছন্দ হয়েছিল। ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন তিনি এই ছবির। মিয়াজাকির নিজের কথায় এই অ্যানিমে ছায়াছবি ঠিক ভালো – খারাপের মোটা দাগের দ্বন্দ্ব নিয়ে নয়। এটা আসলে একটা অন্বেষণ যে শিল্প বা যন্ত্র সভ্যতার উন্নতি আর অদিম অরণ্যের কোলে মানুষের আধ্যাত্মিক চেতনার মুক্তি এই দুইয়ের মধ্যে হয়তো খুব বিরোধ নেই। মানুষই পারে এদের মধ্যে একটা সমন্বয় এনে আগামী পৃথিবীটা শিশুদের সত্যিই বাসযোগ্য করে যেতে। আর ঠিক এই কারণেই এক মহান পরিচালক মিয়াজাকির এক অমর সৃষ্টি হয়ে রয়ে গেছে এই বিখ্যাত চলচ্চিত্র।


জাপানী উপকথা অনুসারে প্রাচীন অরণ্যের এক আত্মা – এই ছবিতে দেখানো
_____