Showing posts with label শিশির বিশ্বাস. Show all posts
Showing posts with label শিশির বিশ্বাস. Show all posts

গল্প:: ভয় - শিশির বিশ্বাস


ভয়
শিশির বিশ্বাস

গাঢ় নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। সেই অতল অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছি ক্রমশ। আতঙ্কে হাতপা ছুঁড়ে বৃথাই চিৎকারগলা দিয়ে বিন্দুমাত্র আওয়াজ বের হচ্ছে না। তারই মধ্যে হঠাৎ খটখট শব্দ। খুব ধীর গতিতে হেঁটে আসছে কেউ। আওয়াজটা বাড়ছে ক্রমশ। তারপরেই দেখতে পেলাম নিকষ অন্ধকার ফুঁড়ে ভয়ানক চেহারার এক দানব এগিয়ে আসছে এরপরেই তীক্ষ্ণ একরাশ নখ অন্ধকারে ঝলসে উঠল। যন্ত্রণায় চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম। ভয়ানক স্বপ্নটা ভেঙে গেল ওই সময়। চোখ মেলে যা দেখলাম তা আরও ভয়ানক! পাশে বসে বিশাল চেহারার মানুষ হাকিমসাহেব। হাতের ডানায় সুচ ফুঁড়ে ইনজেকশন দিচ্ছেন। যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে শরীর। পাশেই উদ্বিগ্ন মুখে দাদু আর ঠাকুরমা।
ভয়ানক স্বপ্নটা ছেলেবেলায় প্রায় তাড়া করে বেড়াতঘুম ভেঙে চমকে উঠে বসতাম। ব্যাপারটা যে নিছক স্বপ্ন সত্যি নয় বুঝতেও সময় লাগত। কিন্তু তারপরেও আতঙ্ক কিছুমাত্র কমত না। হিম হয়ে আসত শরীর। ভয়ে বলতেও পারতাম না কাউকে। এমনকি কাছের মানুষ ঠাকুরমাকেও নয়। এরপর সেই প্রথম স্বপ্নের ঘোর কাটতেই সামনে দেখলাম হাকিমসাহেবকে। স্বপ্নে দেখা সেই ভয়ানক দৈত্য আর হাকিমসাহেব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। আতঙ্ক বাড়ল আরও। শুধু রাতে নয় এরপর দিনের বেলাতেও স্বপ্নটা কখনও ভেসে উঠত চোখের সামনে। তাড়া করে আসত সেই দৈত্যটা। দিনের অনেকটা সময় দাদু নানা কাজে বাইরে থাকতেন। তাই লেগে থাকতাম ঠাকুরমার সঙ্গে। আর যমের মতো ভয় পেতাম হাকিমসাহেবকে।
মানুষটির পুরো নাম ছিল আবদুল হাকিম। সবাই হাকিমসাহেব বলেই ডাকত। কাছাকাছি সবচেয়ে পসারওয়ালা ডাক্তার ছিলেন উনি। কালো বিশাল শরীর। দেখতে মোটেই সুশ্রী ছিলেন না। মুখ ভরতি বসন্তের দাগের জন্য আরও ভয়ানক দেখাত। ঘোড়ায় চেপে রোগী দেখতে বেরোতেন। বাড়ির বাইরের উঠোনে খটখট শব্দ হলেই বুঝতাম উনি এসেছেন। লাফিয়ে ঘোড়া থেকে নেমেই হাঁক পাড়তেনকই গো মাতুব্বরদা। নাতি কেমন?’
আমার মুখে ততক্ষণে ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে। ঠাকুরমা আমার সেই মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা আঁচ করতেন হয়তো। বাড়িতে দাদু না থাকলে মাথায় কাপড় টেনে দরজার আড়াল থেকে বলতেনদাদুভাই আজ ভালোই আছে হাকিমসাহেব। একবার দেখে যাবেন নাকি?’
তাহলে থাক,ভারী গলায় উত্তর আসতএকটা কথা কই দিদিজান। মণিরে এবার কলিকাতা পাঠায়ে দেন। ছোটো মানুষ তো।
ভিতরে কাঠ হয়ে বসে আমি এরপর হাকিমসাহেবের লাফিয়ে ঘোড়ায় ওঠার শব্দ পেতাম। খটখট আওয়াজ মিলিয়ে যেত ক্রমশ। হাঁপ ছাড়তাম আমিও
ছেলেবেলায় বাবা চাকরি নিয়ে কলকাতায় চলে এলেও দাদু আর ঠাকুরমার ইচ্ছেয় কিছুদিন দেশের বাড়িতেই থেকে গিয়েছিলাম। ম্যালেরিয়া রোগটা শরীরে জাঁকিয়ে বসেছিল ওই সময়। যখন তখন কাঁপিয়ে জ্বর আসত। তারপর বেহুঁশ। চিন্তিত দাদু আর ঠাকুরমা চিকিৎসার কোনো ত্রুটি রাখেননি। জ্বর উঠলেই তল্লাটের সেরা ডাক্তার হাকিমসাহেবকে খবর দেওয়া হত। দাদুর বন্ধু মানুষ ছিলেন উনি। জ্বর থাক বা না থাক কাছে কোনো কলে এলে খোঁজ নিয়ে যেতেন। দশাসই চেহারা ছিল মানুষটার। তেমনই বুকের পাটা। নানা গল্প চালু ছিল ওনাকে নিয়ে। একবার ভাটির দিকে এক গ্রামে নাকি বাঘ এসেছিল। খবর পেয়ে নিজের দো-নলা বন্দুক নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। দিন চারেক বাদে মেরেও এনেছিলেন সেই বাঘ। আশপাশের গোটা কয়েক গ্রামের মানুষ ভেঙে পড়েছিল দেখতে। একবার কী এক ব্যাপার নিয়ে হঠাৎ দুই দলে দাঙ্গা বাধার উপক্রম। ভয়ে কাঁপছে সবাই। হাকিম সাহেব ভিন গাঁয়ে গিয়েছিলেন রোগী দেখতে। খবর পেয়ে ছুটে এসেছিলেন। একা হাতে ঠেকিয়েছিলেন সেই দাঙ্গা। এসব কারণে তাঁর শত্রু ছিল অনেক। কিন্তু পরোয়া করতেন না। ডাক পেলে রাতবিরেতে ছুটে যেতেন ভিন গাঁয়ে। কারোর পরামর্শে কর্ণপাত করেননি।
এসব শুনেছি অনেক পরে। কিন্তু সেইদিনের সেই ব্যাপারের পর হাকিমসাহেব আমার কাছে হয়ে উঠেছিলেন মূর্তিমান আতঙ্ক। দেখলেই স্বপ্নের সেই ভয়ানক দৈত্যটার কথা মনে পড়ে যেত। নিকষ অন্ধকারের ভিতর তলিয়ে যাচ্ছি ক্রমশ। সামান্য প্রাণের স্পন্দন নেই। তারই মধ্যে তীক্ষ্ণ বর্শা হাতে খটখট শব্দে এগিয়ে আসছে বিকট চেহারার সেই দৈত্যটা। কালো হাঁড়ির মতো বিশাল মাথা। ছড়ানো মোটা নাক। পুরু ঠোঁট। মুখ ভরতি বসন্তের দাগ। ঠিক হাকিমসাহেব। তবে এরপর বেশিদিন আর গ্রামে দাদুঠাকুরমার কাছে থাকা হয়নি। খবর পেয়ে বাবা এসে কলকাতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
কলকাতায় আসার পর ম্যালেরিয়া ছাড়ল অল্প দিনের মধ্যেই। তবে ভয়ানক সেই স্বপ্নটা সহজে ছাড়েনি আমাকে। যদিও বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছু কমে এসেছিল এই মাত্র। বলা যায় সেই কারণেই দেশের বাড়িতে এরপর আর যাইনি। দাদু আর ঠাকুরমা অবশ্য মাঝে-মধ্যে আসতেন। সেই স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত যে একদিন সত্যি হয়ে দেখা দেবে ভাবতেও পারিনি। সেটাই ঘটে গেল এক রাতে।
স্কুল ছেড়ে সবে কলেজে ভরতি হয়েছি। হঠাৎ দেশ থেকে দাদুর আর্জেন্ট টেলিগ্রাম। ঠাকুরমা ভীষণ অসুস্থ। কয়েকটা জরুরি ওষুধ দরকার। তার মধ্যে কোরামিনও রয়েছে। বাবা অফিসে। উৎকণ্ঠিত মা অফিসে ফোন করতে বললেন। বাবার অফিসে অডিট চলছে জানতাম। তাই বললামদরকার নেই মা। আমি ওষুধগুলো নিয়ে এখুনি বেরিয়ে পড়ছি। দেরি করা ঠিক হবে না।
মা চিন্তিত গলায় বললেনকিন্তু তুই কি পারবি? কতদিন যাসনি!
মার চিন্তার কারণ ছিল। একে তো সেই যে দেশের বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় এসেছি আর যাইনি। তারপর স্টেশন থেকে বাড়ি মাইল পাঁচেক পথএখুনি বেরিয়ে পড়লেও মাঝে ট্রেন পালটে গ্রামের স্টেশনে পৌঁছোতে সন্ধে হয়ে যাবে। অন্ধকার গ্রামের পথে অতটা পথ চিনে যাওয়া সহজ নয়। কিন্তু মায়ের আশঙ্কা উড়িয়ে দিলাম আমি। পরিস্থিতি বুঝে মাও আর আপত্তি করলেন না। বলা যায় সেই দণ্ডেই ব্যাগ গুছিয়ে বের হয়ে পড়লাম।
ওষুধগুলো কিনতে সময় লাগল। বিশেষ করে কোরামিন। প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি হয় না। টেলিগ্রাম দেখিয়ে গোটা কয়েক দোকান ঘুরে ওষুধটা যখন হাতে পেলাম অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে। তারপর পথে ট্রেন পালটাতে হল। গ্রামের স্টেশনে যখন নামলাম রাত প্রায় দশটা
পৌঁছোতে রাত হয়ে যাবে ভেবেছিলাম। কিন্তু এতটা ভাবিনি। ছোটো হল্ট গোছের স্টেশন। নীচু প্ল্যাটফর্মের মাঝে টিমটিম করে এক কেরোসিন ল্যাম্প জ্বলছে। শুক্লপক্ষের চাঁদ ইতিমধ্যে পশ্চিম দিগন্তে ঢলে পড়েছে। অস্ত যাবে অল্প সময়ের মধ্যে। স্টেশনে জনাকয়েক মানুষ নামলেও অন্ধকারে কে কোথায় ছিটকে গেছে! কিন্তু আমার সে উপায় নেই। অগত্যা স্টেশনমাস্টারকে ধরলাম। সব শুনে তিনি পথের হদিস বুঝিয়ে দিলেও সাফ জানালেন এই অন্ধকার রাতে অচেনা পথে না যাওয়াই ভালোপরের ট্রেন ভোর পাঁচটায়। ওই ট্রেনে ওদিকের মানুষ পাওয়া যেতেও পারে। তাদের সঙ্গ ধরলে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যাবে। না হলেও ততক্ষণে আলো ফুটে যাবে। সমস্যা হবে না।
কিন্তু আমার উপায় ছিল না। তাড়াতাড়িতে সঙ্গে টর্চ আনতে ভুলে গেছি। তবু অসুস্থ ঠাকুরমার কথা ভেবে নেমেই পড়লাম পথে।
দু-দিকে বিস্তীর্ণ মাঠের মাঝে উঁচু কাঁচা রাস্তা। পথের দু-দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দু-চারটে বাবলা আর খেজুর গাছ। ডালের ফাঁকে থোকা থোকা জোনাকি। দূরে দু-একটা শেয়ালের কোরাস। সেই সঙ্গে দূরের কোনো গ্রাম থেকে ভেসে আসা কুকুরের চিৎকার। নির্জন পথে এছাড়া কোথাও প্রাণের স্পন্দন নেই। আকাশে চাঁদ তখনও রয়েছে। সেই আলোয় পথ চিনতে অসুবিধা হচ্ছিল না। বড়ো বড়ো পায়ে দ্রুত এগিয়ে চলেছি। বড়ো এক কবরস্থান চোখে পড়ল। পথের ধারেই নতুন এক কবর। পাশেই ডাঁই করা ইটবালি। দু-এক দিনের মধ্যেই বাঁধানো হবে। পয়সাওয়ালা কোনো ব্যক্তির কবর। মনে পড়ল এ পথে মধুখালির কাছে পথের ধারে এক কবরখানা আছে। সন্দেহ নেই সেটাই। মনটা খুশি হয়ে উঠল। অল্প সময়ের মধ্যে অনেকটাই চলে এসেছি তাহলে! জামতলা হাট আর মাইল খানেক পথ মাত্র। ছোটোবেলায় দাদুর হাত ধরে কতবার ওই হাটে এসেছি। চেনা পথ। তারপর গ্রাম মাত্রই মাইল দেড়েক।
কিন্তু ভাবনার সঙ্গে বাস্তবের মিল সবসময় হয় কোথায়? মধুখালি পেরিয়ে আসার কিছুক্ষণের মধ্যে পশ্চিম আকাশে চাঁদ অস্ত যেতেই টের পেলাম সেটা। দেখতে দেখতে অন্ধকার আরও ঘন হয়ে উঠল। সেই সঙ্গে হঠাৎই মেঘ করে এল আকাশে। অন্ধকার আরও বাড়ল। কলকাতার মানুষ। অনেক রাতেও পথ চলা অভ্যাস। কিন্তু অন্ধকার এমন ভয়ানক হতে পারে ধারণাই ছিল না। ভাবতে গিয়ে হঠাৎ সারা শরীর প্রায় কাঁটা দিয়ে উঠল! মনে হল ছেলেবেলার সেই ভয়ানক স্বপ্নটা হঠাৎ যেন সত্যি হয়ে উঠেছে! চারপাশে সেই গাঢ় নিশ্ছিদ্র অন্ধকার! সামান্য দূরেও কিছু নজরে পড়ছে না। সেই অন্ধকারের ভিতর ক্রমশ অতলের দিকে এগিয়ে চলেছি। তলিয়ে যাচ্ছি ক্রমশ! পার্থক্য দু-পাশে থোকা থোকা জোনাকির ঝাঁক। অন্ধকারের ভিতর একদল দানব যেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। প্রায় ভুলে যাওয়া ছেলেবেলার সেই আতঙ্ক দেখতে দেখতে প্রায় গিলে ফেলল আমাকে। একবার তো মনে হল নিছক সেই স্বপ্নটাই দেখছি আবার। ঘরে শুয়ে আছি বিছানায়। এখুনি ভেঙে যাবে ঘুমটা। সেই ছোটোবেলায় যেমন হত। কিন্তু তা যে সম্ভব নয় এই মুহূর্তে ঘুমিয়ে নয় জেগেই আছি একই সঙ্গে বুঝতে পারলাম সেটাও।
শুধু তাই নয় হঠাৎ আবিষ্কার করলাম দশ বছর আগের সেই স্বপ্নের মতোই চারপাশ হঠাৎ কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। খানিক আগে দূর থেকে ভেসে আসা শেয়ালের কোরাস কুকুরের ডাক আর শোনা যাচ্ছে না। সামান্য প্রাণের স্পন্দন নেই কোথাও। বোধহয় বৃষ্টিও নামবে। একবার ভাবলাম স্টেশনে ফিরে যাই বরং। কিন্তু অনেকটাই চলে এসেছি। ফেরার পথ ধরলেও এই ঘন অন্ধকারে শেষ পর্যন্ত যে সেখানে পৌঁছোতে পারব এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই বাতিল করতে হল সেই মতলব।
অনুমানে পা ফেলে প্রায় হাতড়ে হাতড়েই চলতে লাগলাম এরপর। প্রতি মুহূর্তে ভয় হচ্ছিল এখুনি হয়তো পথের ধারের খাদে হুমড়ি খেয়ে গড়িয়ে পড়ব। এভাবে কতক্ষণ চলেছি মনে নেই। হঠাৎ খেয়াল হল আমি একা নই পিছনে কেউ আসছে। চারপাশের নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে খুব হালকা ধুপধুপ আওয়াজ। কারও পায়ের শব্দ। এই ঘন অন্ধকারে কিছুই দেখা সম্ভব নয় জেনেও পিছনে তাকালাম। যথারীতি নজরে পড়ল না কিছু। তারপর কান পেতে বোঝার চেষ্টা করতেই মাথার ভিতর টনক নড়ল। পায়ের শব্দ ঠিকই। কিন্তু এ শব্দ কোনো মানুষের পায়ের নয়বিলম্বিত লয়ে খটখট আওয়াজ। যেন পেরেকের উপর হাতুড়ি পড়ছে। আওয়াজটা ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। কাছে এগিয়ে আসছে। স্বপ্নে দেখা সেই দৈত্যটা নয়তো! আতঙ্কে শরীর হিম হয়ে গিয়েছিল আগেই। কোনোমতে চেঁচিয়ে বলতে গেলামকে? কে ওখানে?”
সামান্য ফ্যাসফ্যাস আওয়াজ ছাড়া গলা দিয়ে কোনো স্বরই বের হল না। শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। শব্দটা ইতিমধ্যে আরও কাছে এগিয়ে এসেছে। অন্ধকারে দেখা না গেলেও উৎস কয়েক হাত মাত্র। হঠাৎ মনে হল বাঁচতে হলে পালানো ছাড়া অন্য উপায় নেই। মুহূর্তে দিগ্‌বিদিক হারিয়ে ছুটতে শুরু করলাম। আর তখনই হুঁশ হল অদূরে আমার সামনে সর্বাঙ্গ সাদা কাপড় গায়ে একটা মানুষ। বলিষ্ঠ চেহারা হলেও মাথা অদ্ভুতভাবে ঝুঁকে পড়েছে বুকের উপর। দেখে কিছুটা হলেও সাহস ফিরে এল। গলা ঝেড়ে নিয়ে চিৎকার করে বললামশুনছেন।
কিন্তু ওদিক থেকে কোনো সাড়া এল না। সেই একই ভাবে মাথা ঝুঁকিয়ে চলতে লাগল। অগত্যা গতি বাড়ালাম আমিও। পিছনে সেই আওয়াজ তখনও সমানে তাড়া করে আসছে।
এভাবে কতক্ষণ সেই মানুষটির পিছনে ছুটেছি হুঁশ নেই। কিন্তু আশ্চর্য দূরত্ব সামান্য কমাতে পারলেও ধরতে পারিনি তাকে। তারপর একসময় হঠাৎই দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। ছুটে সামনে গিয়ে হাত বাড়িয়েছিলাম। ভয়ানক চমকে উঠে মুহূর্তে টেনে নিলাম। মানুষটির মাথা সেই একইভাবে ঝুঁকে রয়েছে বুকের উপর। তবু অন্ধকারেও যেন চিনতে পারলাম তাঁকে। মুহূর্তে দারুণ আতঙ্কে হিম হয়ে গেল শরীর। হাকিমসাহেব! কেমন মরা মাছের মতো চোখে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। গলায় গভীর এক ক্ষতচিহ্ন। মাথাটা কোনোরকমে ঝুলে রয়েছে।
আতঙ্কে আমার সারা শরীর তখন প্রায় পাথর হয়ে গেছে। বুকের উপর ঝুলে থাকা মাথাটা নড়ে উঠল সামান্য, “মণি আর ভয় নাই। সামনেই বাড়ি। একাই যাতি পারবা
আতঙ্কে হিম হয়ে যাওয়া শরীরে সেই কথায় হঠাৎ যেন প্রাণ সঞ্চার হল। ততক্ষণে সামনে সেই মানুষটা কথা শেষ করে এগিয়ে গেছে। অন্ধকারে আর দেখতে পেলাম না। পিছনে তাড়া করে আসা সেই আওয়াজটাও আর শোনা যাচ্ছে না। তারপরেই খেয়াল হল দাঁড়িয়ে আছি কোনো এক লোকালয়ের ভিতর। অদূরে ঘরবাড়ির আভাসপথের পাশেই এক বাড়ির ভিতর আলো জ্বলছে। জানলা দিয়ে সেই আলোর রেখা। আরে, ঘরের পিছনে ওই তো আমাদের সেই উঁচু জোড়া খেজুর গাছ! পাশেই পথের উপর দাঁড়িয়ে আছি! চিৎকার করে ডাকলাম, “দাদু আমি শিবু শিবনাথ। দরজা খোলো
মুহূর্তে সশব্দে গোটাকয়েক দরজা খুলে গেল। ওদিকে কাছারি ঘরের দিক থেকে কাজের মানুষ হারানের গলার আওয়াজ, “কে? মণিভাই! এত রাতে!
ততক্ষণে ওদিকের বড়ো ঘর থেকে দাদু হাতে আলো নিয়ে বের হয়ে এসেছেন। কাছে এসে অবাক হয়ে বললেন, “দাদুভাই!
হ্যাঁ দাদু। দুপুরে টেলিগ্রাম পেয়েই বেরিয়ে পড়েছি। তবু ওষুধ কিনতে দেরি হয়ে গেল। কেমন আছে ঠাকুরমা? কোরামিন এনেছি
আমার ওই কথায় দাদুর চোখ দিয়ে হঠাৎ জল গড়িয়ে পড়ল। উত্তর না দিয়ে ঘরে নিয়ে এলেন। আমার সাড়া পেয়ে আশপাশের আরও কয়েকজন হাজির হয়েছেন। ঘরে এসে দেখি অসুস্থ ঠাকুরমাও জেগে উঠেছেন। বুক থেকে একটা স্বস্তির নিশ্বাস পড়ল। তাড়াতাড়ি বললাম, “কোরামিন আর লাগেনি?”
লেগেছিল দাদুভাই,” ধরা গলায় দাদু বললেন।
কোথায় পেলে?”
উত্তর দিতে গিয়েও দাদু থেমে গেলেন হঠাৎ। একজন ঠাকুরমার কাছ থেকে আমাকে পাশের ঘরে টেনে এনে বললেন, “ওসব এখন থাক মণিভাইসে অনেক কথা
কিন্তু থাক বললে আমার যে চলবে না। তাড়াতাড়ি বললাম, “কী? হাকিম সাহেব?”
হ্যাঁ হাকিম সাহেব। কোরামিন পাওয়া যায়নি শুনে উনি নিজেই দূরের এক রোগীর বাড়ি থেকে খুঁজে এনেছিলেন ওষুধটা। গতকাল অনেক রাতে।
কেমন আছেন উনি?” উৎকণ্ঠিত গলায় কোনোমতে বলতে পারলাম।
উনি খুন হয়েছেন গত রাতে। এখান থেকে ফেরার পথে। শত্রু তো কম ছিল না। এই রাতে একা ফিরতে তাই মানা করেছিল সবাই। লেঠেলের জন্য সর্দারপাড়ায় লোকও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু কানে তোলেননি। জানিয়েছিলেন ঘোড়া যখন রয়েছে চিন্তার কিছু নেই। বরং একা গেলে অনেক তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছোতে পারবেন।
----------
ছবি - স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

গল্প:: কানাই পালের পোষ্য - শিশির বিশ্বাস


কানাই পালের পোষ্য
শিশির বিশ্বাস

সন্ধেয় রাসবিহারী মোড়ে রাস্তা পার হবার জন্য দাঁড়িয়ে ছিল মোহিত হঠাৎ কাছে বিড়বিড় করে অস্ফুট গলায় কাউকে কথা বলতে শুনে কৌতূহলে ঘাড় ফেরাল এত নিচু গলায় কেউ সাধারণত কথা বলে না তারপরেই ভিতরের তাগিদটা নাড়া দিয়ে উঠল মানুষটা অন্ধ! রাস্তা পার হবার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন চোখে গাঢ় চশমা হাতে ব্লাইন্ড ওয়াকিং স্টিক
আজকাল অনেক উন্নত মানের ব্লাইন্ড স্টিক বের হয়েছে সঙ্গে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি লাগানো থাকে তা দিয়ে শহরের ভিড় পথেও দিব্যি চলা যায় সামনে চলার পথে কোনো বাধা আছে কিনা যন্ত্র শব্দের হেরফেরে জানিয়ে দেয় কিন্তু এই মানুষটির ব্লাইন্ড স্টিক একেবারেই সেকালের শুধু সাদা রং ছাড়া বোঝার উপায় নেই যে, এটা ব্লাইন্ড স্টিক
কলকাতার পথে এই অবস্থায় অন্ধ কাউকে দেখলে সাহায্যের জন্য এগিয়ে যাওয়া মোহিতের অভ্যাস আজও ব্যতিক্রম হল না যদি দরকার হয়, মানুষটিকে রাস্তা পার করে দেবে কিন্তু বলতে গিয়েও হঠাৎ কেমন থতোমতো খেয়ে গেল বিড়বিড় করে ভদ্রলোক সেই থেকে কারও সঙ্গে একইভাবে কথা বলে চলেছেন এত অস্ফুট যে, বোঝা মুশকিল তবে কথা যে বলছেন, তাতে সন্দেহ নেই ঠোঁট নড়ছে হঠাৎ দেখলে মনে হয়, বুঝি মোবাইলে কথা বলছেন কিন্তু তেমন কিছু নেই এমনকি কানে ইয়ার-ফোনও নয় সামান্য ইতস্তত করে সাহায্য লাগবে কিনা জিজ্ঞাসা করতে যাবে, ভদ্রলোক হঠাৎ ঘাড় ফিরিয়ে তাকালেন
কিছু বলবে ভাই?”
অন্ধ মানুষ এভাবে কারও দিকে তাকিয়ে বড়ো একটা কথা বলে না থতোমতো খেয়ে মোহিত বলল, “না, মানে আপনার হাতে ব্লাইন্ড স্টিক
কথা শেষ না করে মোহিত থেমে গেলেও উনি বললেন, “আরে আমি তো অন্ধই রাস্তা পার হবার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি যা গাড়ির ভিড়!”
যদি দরকার হয়, সাহায্য করতে পারি
সে তো খুবই ভালো কথা ভাই,খুশি হয়ে ভদ্রলোক তৎক্ষণাৎ হাত বাড়িয়ে দিলেন
ভদ্রলোককে নিয়ে রাস্তা পার হবার সময় সামান্য ইতস্তত করে মোহিত বলেই ফেলল, “স্যার একটা কথা বলব? তখন কি মোবাইলে কথা বলছিলেন আপনি?”
মোবাইল! মোবাইল কোথায়? আমি তো মোবাইল ব্যবহার করি না,মাথা ঝাঁকিয়ে উনি বললেন
তাহলে স্যার, বিড়বিড় করে কার সঙ্গে কথা বলছিলেন?”
তাই বুঝি?” কিছুটা যেন অপ্রস্তুত হলেন উনি আরে সে তো আমার ভুতোর সঙ্গে কথা বলছিলাম
ভুতো! বেজায় অবাক হল মোহিত কে?”
আরে ঘাবড়ে যেও না ভাই,অল্প হাসলেন উনি,ভুতো আমার পোষ্য লক্ষ্মীপ্যাঁচা
পোষ্য লক্ষ্মীপ্যাঁচা! কোথায়?” যতটা অবাক হবার ততটাই অবাক হল মোহিত
ছিল তো,” তড়িৎ উত্তর ভদ্রলোকের,তোমাকে দেখে কিছু ঘাবড়ে গিয়ে উড়ে গেছে চলে আসবে আবার আসলে ব্যাপার কী জানো? ওই ভুতোকে নিয়েই আমি পথ চলি কিনা সামনে কোথায় কী আছে, কোনদিকে যেতে হবে, কাঁধে বসে ভুতোই আমাকে গাইড করেকী, অবাক হয়ে গেলে নাকি?”
অবাক হবার মতোই ব্যাপার, কিন্তু চট করে মোহিতের মুখে কথা জোগাল না ভদ্রলোক অবশ্য থামলেন না আসলে কী জানো, ভুতো প্যাঁচা হলেও ওর কথা আমি বুঝতে পারি অবশ্য সে কথা মানুষের মতো নয় যদিও রকমারি কিছু আওয়াজ ভুতোও বুঝতে পারে আমার কথা কি বিশ্বাস হল?”
খানিক চুপ হয়ে থেকে মোহিত আনমনেই অল্প মাথা নেড়েছে কী নাড়েনি ভদ্রলোক বললেন, “বাহ্, তাহলে বুঝেছ দেখছি আসলে সব পশুপাখিরই নিজস্ব ভাষা, মানে কিছু শব্দ রয়েছে বুঝে নেওয়া চাই
আপনি, আপনি কী করে বুঝলেন যে আমি বুঝতে পেরেছি?” একটু অবাক হল মোহিত
ওই যে মাথা নাড়লে?”
আমি মাথা নেড়েছি, কী করে বুঝলেন?” মোহিত আরও অবাক
কেন ভুতো বলল তো
ভুতো!” অবাক হয়ে মোহিত ঘাড় ফিরিয়ে পাশে ভদ্রলোকের দিকে তাকাল সত্যিই ভদ্রলোকের বাঁ দিকের কাঁধে বসে রয়েছে ছোটো এক লক্ষ্মীপ্যাঁচা একটু আগেও ছিল না এর মধ্যে ফের যে উড়ে এসেছে, একেবারেই বুঝতে পারেনি কিন্তু পাখিটার দিকে তাকিয়ে প্রায় আঁতকে উঠল মোহিত সাধারণ পাখি হলেও প্যাঁচা খুব একটা দেখা যায় না মোহিতও দেখেনি শুধু ছবিতেই কিন্তু লক্ষ্মীপ্যাঁচা কি এমন কালো কুচকুচে হয়? তারপর পাখিটার ওই ভয়ংকর মুখ! হঠাৎ তাকিয়ে অজান্তেই এক পা পিছিয়ে গিয়েছিল প্যাঁচার মুখ কিছু বিদঘুটে হয় ঠিকই বাবার কাছেই শুনেছে, ছেলেবেলায় একবার গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন নির্জন পুকুরের চারদিকে ঘন গাছপালার বাগান বড়ো এক কদম গাছের তলায় বসে ছিপ ফেলেছেন হঠাৎ পিছনে সেই কদমগাছের ঝাঁকড়া এক ডালের দিকে চোখ পড়তেই আক্কেল গুড়ুম! পাতার ফাঁকে বড়ো বড়ো চোখ পাকিয়ে কেউ ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে তার দিকে আঁতকে উঠে মুহূর্তে ছিপ ফেলে বাড়ির দিকে দৌড় দিয়েছিলেন তারপর
সব শুনে ঠাকুরমা হেসে বলেছিলেন, “আরে ওটা তো হুতুম প্যাঁচা ওরা দিনের বেলা চুপচাপ গাছে বসে কাটিয়ে দেয় রাতে শিকার খুঁজে বেড়ায় দিন কয়েক হল প্যাঁচাটা ওই কদমগাছেই আস্তানা নিয়েছে
নাতির হাত ধরে পুকুরঘাটে নিয়ে ফের দেখিয়েও এনেছিলেন সত্যি, বড়ো এক হুতুম প্যাঁচাই বটে প্রায় পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে আছে বাবা অবশ্য এরপর একা আর কখনও পুকুরঘাটে মাছ ধরতে যাননি
সেই তুলনায় লক্ষ্মীপ্যাঁচা আকারে অনেক ছোটো কিন্তু এমন কালো আর কদাকার মুখ হয় জানা ছিল না ছোটো পাখিটা গম্ভীর মুখে দুই চোখ মেলে বাবার দেখা সেই হুতুম প্যাঁচার মতোই ড্যাবড্যাবে চোখে তাকিয়ে রয়েছে লাল চোখ দুটো যেভাবে জ্বলজ্বল করছে, মতলব তেমন ভালো বলে মনে হল না রাসবিহারী মোড়ের এই মানুষের ভিড়েও হঠাৎ ঘামতে লাগল মোহিত
ক্রসিং পার হয়ে ইতিমধ্যে ফুটপাতে উঠে এসেছে ওরা চট করে ভদ্রলোকের হাত ছেড়ে দিয়ে বলল, “ক্রসিং পার হয়ে এসেছি এবার তাহলে আসি স্যার
হ্যাঁ ভাই নিশ্চয়,” ভদ্রলোক হেসে উত্তর দিলেন, “তোমার সঙ্গে কথা বলে বেশ ভালো লাগল কী নাম তোমার?”
মোহিত মোহিত বৈদ্য
বাহ্! বেশ নাম যদিও জিজ্ঞেস করোনি, তবু আমার নামটাও বলে রাখি, ছেলেবেলা থেকে অন্ধ তো, সবাই তাই কানাই বলে ডাকত সেই নামটাই বহাল হয়ে গেছে কানাই পাল বাস কলকাতার পুতুলকুঠি
পুতুলকুঠি!” অবাক হয়ে মোহিত বলে ফেলল
হ্যাঁ, পুতুলকুঠি নাম শোনোনি?” কিছু যেন অবাক হলেন উনি
কলকাতায় অনেক বাড়িরই কিছু একটা নাম আছে কিন্তু সেই নামে কে আর চেনে? সঙ্গের ঠিকানাটাই আসল নীরবে মাথা নাড়ল নেতিবাচক
ভদ্রলোক তৎক্ষণাৎ বললেন, “তাহলে শোনোনি দেখছি পুতুলকুঠি নর্থ কলকাতায় গঙ্গার ধারে কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই দেখিয়ে দেবে এই সন্ধের পর বাড়িতেই থাকি ওদিকে গেলে চলে এস একদিন দুতলার ঘর থেকে চমৎকার গঙ্গা দেখা যায় খানিক গল্প করতে ভালোই লাগবে
আরও কিছুক্ষণ ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা চালানোই যেত উনি খুশিই হতেন হয়তো কিন্তু মানুষটির কাঁধে ড্যাবডেবে চোখে তাকিয়ে থাকা লক্ষ্মীপ্যাঁচাটাকে কিছুতেই যেন সহ্য করতে পারছিল না মোহিত, যদিও তারপর একবারও তাকায়নি ভদ্রলোকের কাঁধের দিকে প্যাঁচাটা সেখানে একইরকম বসে আছে কিনা দেখেওনি আর তবে নিশ্চয় রয়েছে নইলে অল্প আগে ভদ্রলোকের কথার উত্তরে ওর নীরবে মাথা নাড়া বুঝলেন কী করে! মোহিত তাই আর কথা বাড়ায়নি বিদায় নিয়ে চলে এসেছিল
ঘটনাটা মাস কয়েক আগের মোহিত এর মধ্যে নর্থ কলকাতায় গেলেও পুতুলকুঠি যাওয়ার কথা মনে হয়নি পথে এমন কত মানুষের সঙ্গেই তো পরিচয় হয় সেই সূত্র আর টিকিয়ে রাখে জন? মোহিতও রাখেনি প্রায় ভুলেই গিয়েছিল কিন্তু হঠাৎ মানুষটির সঙ্গে ফের এভাবে দেখা হয়ে যাবে ভাবেনি সেদিন শিবপুরে এক বন্ধুর বাড়ি যাবে গোড়ায় বাসে যাবে বলেই বের হয়েছিল কিন্তু পথেই হঠাৎ খবর পেল কী এক গোলমালে দ্বিতীয় সেতুর একটা লেন বন্ধ রয়েছে আজ অনেক বাসই তাই হাওড়া ব্রিজ হয়ে যাচ্ছে খবরটা শুনেই মত বদলে ফেলেছে চাঁদপাল ঘাটে ফেরি ধরলে অনেক আগে শিবপুর পৌঁছে যেতে পারবে
বাস পার্ক স্ট্রিট ছাড়াতে সিট ছেড়ে উঠবে কিনা ভাবছে, হঠাৎ পিছনে কেউ অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে উঠল বাসেট্রেনে এভাবেই অনেকে মোবাইলে কথা বলেন পাশের ব্যক্তিও বুঝতে পারেন না কিন্তু গলার স্বর শুনে বেজায় চমকে উঠল সেদিনের সেই ভদ্রলোক! সেই আগের দিনের মতো বিড়বিড় করে কথা বলছেন মুহূর্তে ঘাড় ফেরাল
হ্যাঁ, সেই ভদ্রলোকই পিছনের সিটে ঘাড় গুঁজে সমানে বিড়বিড় করে বকে যাচ্ছেন কাঁধে ভুতো নেই অবশ্য হয়তো কোলের উপর রয়েছে দেখতে পাচ্ছে না কিছু অবাক হয়েই বলল, “স্যার, আপনি!”
আরে!” কিছুটা যেন সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলেন উনি তুমি সেই মোহিত না?”
একদম স্যার
গরিবের আস্তানায় আর তো গেলে না তা ফের যখন দেখাই হল, আজ আর ছাড়ছি না
সামনেই এসপ্ল্যানেড নামার জন্য এগোতে হবে মোহিত তাড়াতাড়ি বলল, “আমি স্যার চাঁদপাল ঘাটে যাব সামনেই নামতে হবে
চাঁদপাল ঘাট!” হঠাৎ যেন কিছু সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলেন উনিকোথায় যাবে?”
ওপারে শিবপুর বিশেষ দরকার
তাই?” সামান্য থামলেন উনি তারপর বললেন, “তাহলে চলো, আমারও ওদিকে ফোরশোর রোডে একটু কাজ আছে খানিক গল্প ছাড়া কিছু কাজও হবে কথা শেষ করেই উনি হাতটা বাড়িয়ে দিলেন
এরপর আর কথা চলে না খুবই তাড়া ছিল এক বন্ধুর বাড়িতে যাবে দরকারি একটা বই আনতে টাইম দেওয়া আছে ইতিমধ্যেই দেরি হয়ে গেছে তবু বলল, “আজ, আজ ভুতো নেই?”
ছিল তো তুমি তাকাতেই উড়ে গেল আমার পোষ্যরা বেজায় খেয়ালি আবার শুধু চলেই গেল না, আজ যে আর ফিরবে না, জানিয়ে গেল সেটাও তুমি থাকলে কিছু সুবিধেও হয় তাই
শুনে কিছু অবাকই হল মোহিত যত ছোটোই হোক, জলজ্যান্ত একটা প্যাঁচা ওর সামনে উড়ে গেল, অথচ সে দেখতেই পেল না! কিন্তু সে কথা আর জিজ্ঞাসা করা গেল না শোভনও নয় এদিকে স্টপেজ এগিয়ে আসছে, ভদ্রলোকের বাড়িয়ে দেওয়া হাত ধরে উঠে পড়ল
এসপ্ল্যানেড থেকে চাঁদপাল ঘাট দূরত্ব একেবারে কম নয় তায় গোটা কয়েক ক্রসিং মানুষের ভিড় দ্রুত পা চালাবার দরকার ছিল কিন্তু ভদ্রলোকের গল্প থামতেই চায় না এদিকে হাতে সময় নেই এই দুপুরের দিকে ঘাটে ফেরি লঞ্চের সংখ্যাও তেমন বেশি নয় হুঁহাঁ করে তাল দিয়ে মোহিত যখন জেটিঘাটে পৌঁছোল, ভোঁ দিয়ে একটা ফেরি লঞ্চ ছাড়ার মুখে অনেকেই জেটি দিয়ে ছুটতে শুরু করেছে লঞ্চের দড়ি খুলে দিলেও ছুটে গিয়ে অনেকেই লাফিয়ে উঠছে তখনও এমন দৃশ্য নতুন নয় মোহিত নিজেও অনেকদিন উঠেছে কিন্তু আজ উপায় নেই অন্ধ মানুষটিকে নিয়ে এভাবে ওঠা সম্ভব নয় তবু হাতের ঘড়ির দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, “খুব তাড়া ছিল আমার কিন্তু এই অবস্থায় আপনাকে নিয়ে লঞ্চে ওঠা যাবে না
মোহিত ভেবেছিল, কথার অন্তর্নিহিত অর্থ হয়তো বুঝবেন উনি কিন্তু কোনো উত্তরই এল না চোখের সামনেই ফেরি লঞ্চ জেটি ছেড়ে চলে গেল শেষ মুহূর্তেও দুজন যাত্রী বেশ ঝুঁকি নিয়েই মস্ত লাফে দিব্যি লঞ্চের ডেকে লাফিয়ে পড়ল মোহিত দাঁতে দাঁত চেপে তাকিয়ে দেখছিল উনি বললেন, “এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে আর লাভ কী? চলো উপরে বসি কোথাও
অগত্যা ঘাটের উপর ফাঁকা এক বেঞ্চে বসল দুজন ফেরি লঞ্চ ফেল করে মোহিতের মেজাজ একেবারেই ভালো ছিল না উনি অবশ্য বিপুল উৎসাহে নানা কথা বলে যাচ্ছিলেন গোড়ায় হুঁহাঁ করলেও মোহিত পরের দিকে তেমন সাড়া দিচ্ছিল না বন্ধুকে সময় দেওয়া আছে দেরি হবার কারণে যদি সে বের হয়ে পড়ে, কোনো কাজই হবে না মোবাইলে ধরার চেষ্টা করেও হল না টাওয়ার বেজায় কম বিড়ম্বনা আর কাকে বলে!
ভদ্রলোক অবশ্য বকে চলেছেন তখনও মোহিত বন্ধুকে ধরার জন্য সমানে চেষ্টা করে যাচ্ছে অন্য দিকে নজর দেবার সময় নেই হঠাৎ চারপাশে হইহই চিৎকারে চমকে উঠল তাকিয়ে দেখে কী এক কারণে সবাই জেটির দিকে দৌড়তে শুরু করেছে কী ব্যাপার? কয়েক পা এগোতেই সারা শরীর প্রায় হিম হয়ে গেল ওর
একটু আগে যে লঞ্চটা ঘাট থেকে ছেড়েছিল, মাঝগঙ্গায় উলটে গেছে কাছেই একটা বড়ো বামবোট পাশে একজন জানাল, বামবোটটা দক্ষিণ দিক থেকে আসছিল জোরালো বানের তোড়ে দুটোর কোনোটাই দিক ঠিক রাখতে পারেনি মুখোমুখি ধাক্কায় উলটে গেছে
ভয়ানক জোরালো বান তারপর প্রায় মাঝনদী ফুলে ওঠা গঙ্গার জলে হাবুডুবু খাচ্ছে অনেকগুলো মানুষ কেউ দুই হাত তুলে আর্ত চিৎকার করছে আশপাশ থেকে কিছু জেলে নৌকো ছুটে এসে দু-একজনকে জল থেকে তোলার চেষ্টা শুরু করেছে বটে, কিন্তু সে আর কয়জন জলের তীব্র টানে ততক্ষণে অনেকেই ভেসে গেছে যারা সাঁতার জানে তারাও যে বেশিক্ষণ ভেসে থাকতে পারবে, সেই সম্ভাবনা কম ভাবতে গিয়ে বুকের ভিতরটা হঠাৎ হিম হয়ে এল মোহিতের অন্ধ কানাই পালের সঙ্গে ওইভাবে দেখা না হলে, প্রায় জোর করে সঙ্গে না থাকলে তারও ওই দশা হতে পারত! সাঁতারটাও জানা নেই
এক মুহূর্ত দেরি না করে মোহিত এরপর ছুটল ঘাটের অদূরে সেই বেঞ্চের দিকে নাহ্, ভদ্রলোক নেই সেখানে চলে গেছেন
ভিড়, মানুষের ছুটোছুটির মধ্যে ভদ্রলোকের সন্ধান আর পায়নি মোহিত শিবপুর যাওয়া বাতিল করে বাড়ি ফিরে এসেছিল তারপর রাতে টিভির খবরেই বিস্তারিত জানা গেল চাঁদপাল ঘাটের কাছে গঙ্গায় ফেরি লঞ্চ উলটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা বাড়িতে তাই নিয়ে আলোচনা সেই আলোচনায় যোগ দিলেও মোহিত ঘুণাক্ষরেও আসল ব্যাপার ভাঙেনি বরং প্রসঙ্গ পালটে পাশে ছোটোকাকুর কাছে হঠাৎই পুতুলকুঠির কথা পেড়েছিল
ছোটোকাকু অনেক খোঁজখবর রাখে বইপত্রও পড়ে প্রচুর অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, “সে কী রে, পুতুলকুঠির নাম শুনিসনি! কলকাতায় পয়লা নম্বর ভূতের বাড়ি ওটা
পুতুলকুঠির বিস্তারিত বিবরণ তারপর ছোটোকাকুর কাছেই জানতে পেরেছিল মোহিত অন্য সময় হলে সে সব ভয়ানক কথার পর ভিতরের ইচ্ছেটা হয়তো নামিয়ে ফেলত মাথা থেকে, কিন্তু দুপুরে যে ঘটনা ঘটে গেল, ভদ্রলোকের সঙ্গে একবার দেখা না করলেই নয় অগত্যা পরের দিনই বাস ধরে হাজির হল শোভাবাজারে বাড়িটা এদিকেই
ঠিকানা জানা নেই ভেবেছিল, খুঁজে পেতে সমস্যা হবে হয়তো কিন্তু তেমন কিছু হল না বাস থেকে নেমে প্রথম যাকে জিজ্ঞাসা করল, বাতলে দিলেন তৎক্ষণাৎ সরু এক গলি দুপাশে প্রায় গায়ে গায়ে পুরোনো দিনের একের পর এক জরাজীর্ণ বাড়ি সেদিকে তাকিয়ে ভিতরে কিছু অস্বস্তি হওয়াই স্বাভাবিক তার উপর জায়গাটা ঘিঞ্জি নর্থ কলকাতা হলেও গলির ভিতর জনমানুষ খুবই কম কাউকে জিজ্ঞাসা করবে কিনা ভাবছে হঠাৎই নজরে পড়ল বাড়িটা কিছুটা থতোমতোও খেয়ে গেল ছোটোকাকুর কথার সঙ্গে কিছুমাত্রও মেলাতে পারল না পথের উপর পুরোনো দিনের জীর্ণ দুতলা বাড়ি জীর্ণ দরজা পাশে বড়ো এক বোর্ডে লেখা:
প্রবেশ নিষেধ প্রবেশ নিষেধ
এটা ভূতের বাড়ি নয় গুজবে একেবারেই কান দেবেন না বাড়ির কাউকে অযথা বিরক্তও করবেন না
বাসিন্দাবৃন্দ
আধভাঙা দরজা দিয়ে ভিতরের অনেকটাই দেখা যাচ্ছে মাঝখানে মস্ত খোলা চাতাল, হরেক মালপত্র ডাঁই করা, কিন্তু দুতলাটা একেবারেই ফাঁকা কেউ বাস করে বলে মনে হল না পরপর অনেকগুলো দরজা বন্ধ ঘর সামনে বারান্দায় রাজ্যের ঝুলকালি তবে নিচের তলায় লোকজন রয়েছে কয়েকজনকে দেখতেও পেল আধভাঙা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভিতরে ঢুকবে কিনা ভাবছে কোত্থেকে কুচকুচে একটা কালো রঙের বিড়াল ছুটে এসে ওর পায়ের কাছে ঘুরঘুর করতে লাগল বার দুই শুঁকেও গেল পায়ের পাতা ভরসন্ধেয় ওই ব্যাপার দেখলে অনেকেই হয়তো ঘাবড়ে যেত, কিন্তু কালো বিড়াল নিয়ে মোহিতের একেবারেই দুর্বলতা নেই দুর্গাপুরে ওর এক মামা থাকেন বছরভর তিনি বাড়িতে কালো বিড়াল পোষেন কিন্তু এই বিড়ালটা যেভাবে পায়ের উপর ঝুঁকে গন্ধ শুঁকছে, কামড়ে দিতেও পারে সেই আশঙ্কায় পা ছুঁড়ে তাড়াবার চেষ্টা করল কিন্তু বিড়ালটা গ্রাহ্যই করল না আরও কাছে ঘেঁষে এল
আর দেরি করা যায় না কাউকে ডাকবে কিনা ভাবছে তার আগেই ময়লা ধুতি পরা খালি গায়ে একটা রোগা চিমড়ে মাঝবয়সি মানুষ তড়িৎ গতিতে ছুটে এলেন প্রায় নিঃশব্দে মোহিত কিছু বলবার আগেই তিনি খনখনে গলায় বললেন, কীঁ কাঁণ্ড! ভুঁতো আঁপনাকে চেনে নাকি?”
ভুতো, ভুতো কে?” ফের থতোমতো খেল মোহিত
ওঁই বেঁড়ালটা,” বলতে বলতে জোরে একবার নাক টানলেন উনি সামান্য গলা ঝেড়ে নিয়ে বললেন, “কানাইদা, মানে আমাদের কানাই পালের
আমি, আমি তো ওনার সঙ্গেই দেখা করতে এসেছি পথে একদিন আলাপ হতে আসতে বলেছিলেন আছেন উনি?”
না, নেই এখন দুপুরে বেরিয়েছেন তবে চলে আসবেন কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনি দুতলায় ওনার ঘরে গিয়ে বসুন বরং তবে সিঁড়িটা একটু নড়বড়ে সাবধানে উঠবেন ওরে ভুতো, স্যারকে ঘরে নিয়ে যা
লোকটার মুখের কথা শেষ হতে পেল না কালো বিড়ালটা মোহিতের প্যান্ট কামড়ে প্রায় টানতে শুরু করল
সভয়ে পিছিয়ে গিয়ে মোহিত বলল, “ওনার, ওনার ভুতো নামে একটা কালো প্যাঁচাও তো আছে!”
কালো প্যাঁচা!” লোকটা কিছু থতোমতো খেলেন যেন তারপর সামলে নিয়ে বললেন, “থাকতেও পারে ব্যাপার হল, ভুতো তো আর একটা নয় ওনার ওদের সঙ্গে নিয়েই তো থাকেন দিনভর কলকাতার পথে ঘোরাঘুরি করেন এদিকে জন্মান্ধ মানুষ সে যাক, আপনি ভুতোর সঙ্গে উপরে ওনার ঘরে চলে যান বরং পাশেই গঙ্গা জানলা দিয়ে তাকিয়েও দিব্যি সময় কেটে যাবে
লোকটার কথা শেষ হতেই কালো বিড়ালটা ফের মোহিতের প্যান্ট কামড়ে ধরে টানতে শুরু করেছিল, কিন্তু কোনোক্রমে ছাড়িয়ে নিয়ে সে ততক্ষণে মুখ ঘুরিয়ে ফেরার পথ ধরেছে চলতে চলতেই বলল, “উনি নেই যখন, আজ থাক বরং পরে অন্য একদিন আসব
----------
ছবি - অতনু দেব