Showing posts with label পিয়ালী বন্দ্যোপাধ্যায়. Show all posts
Showing posts with label পিয়ালী বন্দ্যোপাধ্যায়. Show all posts

গল্পের ম্যাজিক:: তিতলি - রাজীব কুমার সাহা


তিতলি
রাজীব কুমার সাহা

“অর্ক, ইস! এই ছেলেকে নিয়ে আর পারছি না, উফ! এই এলি স্কুল থেকে। দু’সেকেন্ডের মধ্যেই টিভি খুলে বসে গেলি? ইউনিফর্মটা পর্যন্ত গায়ে রয়ে গেছে, মা গো! এই দস্যি ছেলে, গেলি?”
ভুরু কুঁচকে ঘাড় বাঁকিয়ে একবার তাকাল অর্ক মা’র দিকে। তারপর গাল ফুলিয়ে ধীর পায়ে ও ঘরে চলে গেলমা আবার গলা চড়িয়েছে, “হাত মুখ ধুয়ে আয় তাড়াতাড়ি। টেবিলে খাবার রাখছি। চুপচাপ খেয়ে নেবে, বুঝলে? আমি বাথরুমে গেলাম।”
অর্ক খেয়ে এসে এবার ড্রয়িং নিয়ে মেঝেতে নামলএতক্ষণ ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে প্রজাপতিদের জীবনচক্র দেখছিল হাঁ করে ও। একটা ডিম থেকে প্রথমে লার্ভা, তারপর পিউপার একটা পাতলা খোলস থেকে দারুণ রঙিন একটা প্রজাপতি কীভাবে জন্ম নেয় দেখে অবাক লাগছিল ওর। ওটাই এখন আঁকবে ড্রয়িং খাতায়। কাল স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের দেখাবে। সায়েন্স টিচার সুস্মিতা ম্যাডাম দেখলেও খুশি হবে।
আঁকতে আঁকতে একটা হাই তুলে খাতার ওপর উপুড় হয়ে পড়ল অর্ক। হাতের আসল কাজ করতে হবে এখন। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর একটা প্রজাপতি আঁকতে হবে। চার পাঁচটা রং দেবে ডানাগুলোতে কমপক্ষে। খুব যত্ন করে শেষ রঙটা ভরে চোখদুটো ফুটিয়ে দিতেই একেবারে অবাক কাণ্ড! নিজের চোখদুটোকেই বিশ্বাস হচ্ছে না ওর। প্রজাপতিটা ফরফর করে পাতলা পাতলা ডানা দুলিয়ে অর্কর ড্রয়িং খাতাটাকে চক্কর কেটে উড়ে বেড়াচ্ছে। গোল গোল চোখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ও।
পাশে গড়াগড়ি খাওয়া রং পেনসিলটার গায়ে এসে বসে দুটো ডানা এক করে ওপরের দিকে তুলে রাখল প্রজাপতিটা। অর্কর দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসল যেন। বলল, “আমরা আজ থেকে বন্ধু হলাম অর্ক। চলো কোথাও বেড়িয়ে আসি, যাবে?”
অর্ক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে একদম। ওরই আঁকা একটা প্রজাপতি জ্যান্ত হয়ে গিয়ে ওর সাথেই কথা বলছে! এমনও হয়! অনেক কষ্টে স্বর বেরোল গলা দিয়ে, “আ-আমরা বন্ধু? কিন্তু... আগে তো কখনও...”
“দেখবে কী করে, তুমি তো আগে আর আঁকোনি কখনও আমাকে। চলো ঘুরে আসি। আমি আবার এক জায়গায় বেশিক্ষণ থাকতে পারি না,” প্রজাপতিটা তাড়া দিল।
অর্ক আমতা আমতা করে বলল, “কিন্তু মা, মা বাথরুমে। বেরিয়ে এলে বলে যাব।”
“ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যাবে যে! তাছাড়া মাকে বললে মা যেতে দেবে?”
“তুমি তো আমার নাম জান দেখছি। তোমার নাম কী?” অর্ক এতক্ষণে অনেকটা সহজ হয়ে গেছে।
“আমার নাম? সে তুমি যা ইচ্ছে ডাকো। তবে জীববিজ্ঞানীরা একটা গালভরা নাম উপহার দিয়েছেন বটে, রোপ্যালোসেরা। তার সাথে আমাদের শ্রেণী বা পরিবার অনুযায়ী কিছু শব্দ যুক্ত হয়ে আসল নাম হয়। তুমি আমায় নয় তিতলি বলেই ডাকো, কেমন?”
“বাহ, দারুণ নাম তো!” হাততালি দিয়ে ওঠে অর্ক। হিন্দিতে প্রজাপতিকে তিতলি বলতে অনেক শুনেছে ও।
“নাও, তাড়াতাড়ি আমার পিঠে চড়ে বসো। মা বেরিয়ে আসার আগেই আবার রেখে যেতে হবে তো তোমায়!”
তিতলি দরজার বাইরে এসেই সাঁই সাঁই করে এই এত্ত বড় হয়ে গেল। অর্কও অবাক চোখে পিঠে চড়ে বসল তিতলির। উড়ে চলল মেঘের দেশেতুলোর মতো বিশাল একখণ্ড মেঘ ভেদ করতে চলেছে ওরা। অর্ক চোখ বন্ধ করে আরও জোরে পিঠ আঁকড়ে ধরল তিতলিরএই মেঘের সাথে ধাক্কা লাগলে চুরমার হয়ে যাবে মাথা এক নিমেষেই। তিতলি উড়েই চলেছে। তিতলির কোনও ভয় ডর নেই। হঠাৎ নাকে মুখে একটা হিমেল পরশ পেতেই চোখ খুলল অর্ক। আরে! কী আশ্চর্য! এ যে ঘন কুয়াশার মধ্যে দিয়ে উড়ে চলেছে সে। মেঘ কী তবে শক্ত কোনও জিনিস নয়, যেমনটা মাটি থেকে মনে হয়!


মেঘের দেশটা পেরোতেই একটা ঝলমলে নতুন দেশ আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে উঠল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ল অর্ক। এ কোন দেশ! এত সুন্দর ফোয়ারা, এত সুন্দর গাছগাছালি, একরাশ দুধের ধারার মতো ঝর্ণা, কচি কচি চারাগাছে কী বাহারি ফুল! তিতলি যতই নিচে নামছে ততই আরও বেশি স্পষ্ট আর সুন্দর মনে হতে লাগল দেশটাকে। এ যে এক স্বপ্নের দেশ! রূপকথার দেশ!
“এই তোমার দেশ নাকি তিতলি? কী নাম এর?” খুশিতে ডগমগ হয়ে জিগ্যেস করল অর্ক।
“হ্যাঁ গো! রাঙামাটি। এখানে সব রাঙা, সব রঙিন। তোমাদের ওখানকার মতো কোনও দূষণই নেই এখানে। তবে সুখ আছে, দুঃখ আছে। আছে হাসি, আছে কান্না।”
ততক্ষণে আকাশ থেকে নেমে একটা নাম না জানা গাছের ছায়ায় বসেছে দুজনে। একটু জিরিয়ে নিয়ে তিতলি বলল, “চলো, তোমায় ঘুরেফিরে দেখাই আমাদের রাঙামাটির দেশটা। চলো চলো।”
“আচ্ছা তিতলি, ওই যে ডানদিকে গাছের ডালে শুয়ে আছে, ও এমন কেন?”
“আর বলো না, রোজ রোজ বেলায় বেলায় ডিম খেয়ে ওর চেহারা এখন ডিমের মতো হয়ে গেছেওকে কেউ আর এখন খেলায় নেয় না। খেলতে নেমে শুধুই হাঁপায়। তাই মনের দুঃখে একা একা শুয়ে থাকে,” তিতলি গোমড়া মুখে জবাব দিল।
“আর ও? ওই যে কাঠের তক্তায় শুয়ে আছে?”
তিতলি ঘাড় ফিরিয়ে বলল, “ও? আর বলো না। হাবিজাবি, চপ কাটলেট, চিপস চকোলেট হরদম খেয়ে সাংঘাতিক অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ডাক্তার কবিরাজ কেউই সুস্থ করে তুলতে পারছে না।”
অর্কর খুব খারাপ লাগছিল কথাগুলো শুনতে। ওরা হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে চলল যেদিকে দু’চোখ যায়। যতই দেখছে ততই মুগ্ধ হয়ে পড়ছে অর্ক রাঙামাটির সৌন্দর্যে। ডানাগুলোয় কী সুন্দর হরেক রঙের বাহার নিয়ে এক একটা প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। তাছাড়া সাদা কালো লাল নীল কমলা হলুদ ছোটছোট ফুরফুরে প্রজাপতি তো আছেই। গা ঘেঁষে ঘেঁষে ওড়াউড়ি করছে এ গাছ থেকে ও গাছে। দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়।
খানিকটা এগোতেই ও দেখল এক ঝাঁক প্রজাপতি আনন্দে লাফাতে লাফাতে আসছে মাঝখানে কাকে রেখে যেন। অর্ক বিস্ময়ভরা চোখে তাকাতেই তিতলি বলে উঠল, “মাঝখানে যে দেখছ, ওর নাম লালি। খুব ভালো ছেলে আমাদের। পড়াশুনো বলো, খেলাধুলো বলো, আচার আচরণ বলো সবেতেই খুব ভালো। ও কক্ষনও বাবা মায়ের, গুরুজনদের অবাধ্য হয় না। মিথ্যে কথা বলে না। তাই সবাই ওকে খুব ভালবাসে, রোজই কেউ না কেউ কিছু না কিছু উপহার দেয়। আর সবাই মিলে আনন্দ করে।”
চোখদুটো জ্বলজ্বল করে উঠল অর্কর। ঘুরতে ঘুরতে একসময় তিতলির বাড়িতে এসে উপস্থিত হল দুইবন্ধু মিলে। ঠিক অর্কর আঁকার বইয়ের ছবিগুলোর মতো সুন্দর তিতলির বাড়িটা। ঘরে ঢুকতেই সবাই দৌড়ে এল। তিতলির মা খুব আদর করল অর্ককে। হঠাৎ ওর হাঁটুর দিকে চোখ পড়তেই জিগ্যেস করল, “ওমা, ওখানে কী হল আবার বাছা? কীভাবে ব্যথা পেলে?”
অর্ক মনে মনে লজ্জা পেয়ে গেল। বলল, “পা পিছলে পড়ে গিয়ে...”
কিন্তু স্কুলে বিশালের দামি পেনসিলটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে বিশালের ধাক্কায় স্কুলের বারান্দার রেলিংয়ে ঘষটে গিয়ে যে জায়গাটা নীল হয়ে গেছে সে কথা বেমালুম চেপে গেল ও। কথাটা বলেই মুখটা ঘুরিয়ে নিল ও। পাশ ফিরে তাকাতেই থ বনে গেল একেবারেএকটা প্রজাপতি ঠায় বসে আছে একটা চেয়ারে। সুন্দর রঙগুলো বিবর্ণ হতে হতে ডানাগুলো ছিঁড়ে যেতে শুরু করেছে। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সামনের বন্ধ টিভিটার দিকে। পায়ের কাছে রিমোটটা টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। অর্কর চোখের চাউনি অনুসরণ করে তিতলি বলে উঠল, “আমার ভাই। ভীষণ জেদি আর দুষ্টু ছিল। যখন তখন টিভি খুলে বসে পড়ত বলে বাবা একদিন বকাঝকা করতেই রিমোটটা ছুঁড়ে ফেলে ভেঙে ফেলল। সেই থেকে এই চেয়ারেই আটকে আছে। কিছু খেতে পারে না, কোত্থাও যেতে পারে নাটিভিটাও নষ্ট হয়ে গেছে,” বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল তিতলি।
তিতলি এবার তাড়া দিল। অর্ককে এবার রেখে আসতে হবে। কথায় কথায় অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। কিন্তু অর্কর কিছুতেই মন চাইছে না ফিরে যেতে। তিতলিরা শুধু একবার মুখ ফুটে বললেই থেকে যাবে ও। কিন্তু তিতলি এক কথার প্রজাপতি। কথা মতো অর্কর মা স্নান সেরে বেরনোর আগেই পৌঁছে দেবে অর্ককে। একটু গাল ফুলিয়ে থেকেও কী একটা কিছু মনে পড়তেই ফিক করে হেসে উঠল অর্ক। তিতলি মুচকি হেসে বলল, “ভাবছ, অনেকক্ষণ তো কেটে গেছে। ঘণ্টা তিনেক তো হবেই। মা কি আর বাথরুমে আছে এখনও? কোন কালে বেরিয়ে হয়তো এদিক ওদিক খুঁজছে তোমাকে।  কিন্তু বন্ধু, না। মা এখনও বাথরুমেই আছে। তোমাদের দশ মিনিট মানে আমাদের দশ ঘণ্টার সমান। আমাদের জীবনকাল তোমাদের চেয়ে অনেক কম কিনা।”
অর্ক আশ্চর্য হয়ে তিতলিকে বলল, “তাই নাকি! তবে তো আরও কিছুক্ষণ... উম... উম...উম...”
কথাটা শেষ করার আগেই কে যেন হঠাৎ এক চামচ মধু না কী একটা ঠেসে দিল জোর করে অর্কর মুখে। আস্তে আস্তে চোখের পাতা ভারী হতে হতে গাঢ় ঘুমে ডুবে গেল ও। ঘুমের ঘোরটা অচিরেই এত ঘন হয়ে এল যে পিঠে কে যেন জোরে জোরে ধাক্কা দিচ্ছে বুঝতে পেরেও সাড়া দিতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ওর। সারা শরীরের শক্তি এক করেও কুলোচ্ছে না যেন।
শেষে ঝাঁঝালো আওয়াজটা আরও জোরালো হতেই ধড়মড় করে উঠে বসল অর্ক। সামনে আঁকার খাতাটা খোলা। ফ্যানের বাতাসে পাতার একটা কোণা উঠি উঠি করেও উঠতে পারছে না রং পেনসিলগুলো আর রবারের চাপে। চোখ কচলে দেখল মা সমানে বকেই চলেছে, “হে ভগবান! কী অদ্ভুত ছেলে রে তুই অর্ক, অ্যাঁ? এই ঠাণ্ডা টাইলে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিলি! আর হাঁটুটা নীল হয়ে আছে কেন? আজকে আবার স্কুলে... উফ, বাবা গো, এই বিচ্ছু ছেলে আমায় মেরে ফেলবে গো।”
মা মাত্র স্নান সেরে এসেছে। বেলিফুলের মতো মিষ্টি একটা গন্ধ বেরোচ্ছে গা থেকে। এই গন্ধটা খুব ভালবাসে অর্কসব মায়েরই একটা আলাদা গন্ধ থাকে। এই বেলিফুলের গন্ধটাই অর্কর মা মা গন্ধ। ঝপ করে মা’র কোমর জড়িয়ে ধরে পিঠে মাথা ফেলে অর্ক বলল, “আমি আর স্কুলে দুষ্টুমি করব না মা, রোজ দুবেলা ডিম খেতেও বায়না ধরব না। আর গলি দিয়ে ওই ড্রেনের নোংরা জল দিয়ে বানানো আইসক্রিমওয়ালা গেলে দৌড়ে যাব না। বেড়ালের ল্যাজের চুল দিয়ে তৈরি শোনপাপড়ির দিকে তো তাকাবোই না। হোম ওয়ার্ক মন দিয়ে করে ফেলব, জ্বালাবো না মা, সত্যি বলছি। শুধু মাঝে মাঝে তিতলি এলে বেড়াতে যাব একটু। তখন কিন্তু তুমি আমি না ফেরা পর্যন্ত বাথরুম থেকে বেরোবে না একদম। কেমন?”
হাত বাড়িয়ে পেছন থেকে টেনে এনে ছেলের মুখের দিকে খানিক হাঁ করে তাকিয়ে থেকে মা জিগ্যেস করল, “কে তিতলি? নতুন বন্ধু বুঝি?”
তারপর হঠাৎ খাতাটার দিকে চোখ যেতেই বলল, “আরে দেখি দেখি, খাসা এঁকেছিস তো প্রজাপতিটা সোনা।”
বলেই চুকুম করে চুমু খেল অর্কর মা ওর গালে। অর্ক হালকা গা মুচড়ে বলল, “আহ, ছাড়ো না! ইস, চোখদুটো আঁকতে ভুলে গেছি, দাঁড়াও।”


____________
ছবি- পিয়ালী বন্দোপাধ্যায়

লেখক পরিচিতি ত্রিপুরার মন্দিরনগরী উদয়পুরে জন্ম। বেড়ে ওঠা এবং স্থিতি গোমতী জেলার কাকড়াবনে। পেশায় একজন ফার্মাসিউটিক্যাল ডিস্ট্রিবিউটর। নেশাবই পড়াসিনেমা দেখা আর কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় অনেকদিন ধরেই লেখালেখি করছেন।

দেশবিদেশের গল্প:: আগুন কীভাবে এলো (আমেরিকা) - মল্লিকা ধর

আগুন কীভাবে এলো (আমেরিকা)
মল্লিকা ধর

(এই গল্পটির আখ্যানভাগ নেটিভ আমেরিকান কারোক উপজাতির উপকথা থেকে সংগৃহীত বাংলায় এ কাহিনির পুনর্কথনের সময় নামগুলোকে বাঙালির নাম করা হয়েছে গল্পের ভালো লাগা বাড়িয়ে তোলার জন্য।)  

সে অনেক অনেক দিন আগের কথা তখন আগুন শুধু আগুনমানুষদের কাছে ছিল তারা কাউকে তা দিত না, খুব সাবধানে পাহারা দিয়ে রাখত। মাঠে জঙ্গলে কত পশু-পাখি, গ্রামে কত মানুষ তারা কেউ আগুন পায় না।
বসন্তে, গ্রীষ্মে, সুখের দিনে কোনও কষ্ট হয় না, কিন্তু শীতের দিনে ভারী কষ্ট
বুড়ো আর কচিরা অনেকে শীতে কষ্ট পেয়ে মারা যায়
এমন তো চলতে পারে না - ঋক্ষবান ভাবে বনকুসুমীর কোলে কচি ছেলে, সামনের শীতে সে যদি না বাঁচে? বনকুসুমী সেই ভয়ে কুঁকড়ে যায়। বনমালী বলে, ‘কিছু একটা করতে হবে
মণ্ডুক মাথা দুলিয়ে বলে, ‘করতে হবেই কিছু। কিন্তু কী করা যায়?’
বলাকা বলে, ‘জম্বুক কে ডাকি সে সবচেয়ে চালাক একটা না একটা বুদ্ধি বার করবেই
জম্বুক এসে বলে, ‘নো প্রবলেম জাস্ট রিল্যাক্স আমরা আগুন নিয়ে আসব ঐ স্বার্থপর আগুন মানুষেরা চিরকাল আগুন নিজেদের কাছে রেখে দেবে তা হয় না কি? তা হবে না কায়োটে থাকতে তা হতে পারে না
সবাই ভুরু তুলে বলল, ‘আগুন নিয়ে আসবে? কেমন করে?’
মিচকি মিচকি হেসে জম্বুক বলে, ‘আমার একটা প্ল্যান আছে এস আমি তোমাদের বলি কী করতে হবে?’
জম্বুকের প্ল্যান মত সবাই তৈরি হল তারপর একদিন পাহাড়ের পাশ দিয়ে ঘোরানো প্যাঁচানো রাস্তা দিয়ে তারা পাঁচজনে মিলে চলল আগুনে মানুষদের পাথুরে বাড়ির দিকে।
সকলের গায়ে রঙিন উল্কি, নানা রঙ্গে ছোপানো পোশাক।
জম্বুকের মাথায় মস্ত এক পালকের মুকুট
নদী পার হয়ে শুকনো শনঝোপ তারপর ছোটো একটা জঙ্গল, তারপরে এক বিরাট মাঠ সেই মাঠের পরপারে আগুন মানুষদের বিরাট পাথুরে বাড়ি। বেড়া দিয়ে ঘেরা উঠোন। কড়া পাহারা
জম্বুক, ঋক্ষবান, মন্ডুক, বলাকা আর বনমালী গিয়ে পৌঁছাল সেখানে আগুন মানুষদের বাড়ির দুয়ারে গিয়ে বলল যে তারা যাযাবর, অনেক দূর থেকে হেঁটে হেঁটে আসতে আসতে তারা খুব ক্লান্ত আর ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর। যদি আশ্রয় পায় কিছুক্ষণের জন্য আর সামান্য খাদ্য-পানীয় তাহলে খুবই কৃতজ্ঞ থাকবে তারা।
আগুন মানুষেরা প্রথমে বিশ্বাস করতে চায় না। বলে, ‘তোমরা যে আমাদের জিনিস চুরি করে পালাবে না তার গ্যারান্টি কী?
জম্বুক একেবারে বিগলিত হয়ে বলে, ‘কী যে বলেন! আমরা সামান্য ধূলা মাখা যাযাবর, আমরা আপনাদের জিনিস নিয়ে গিয়ে কি করব?’
‘আমরা তো আর আপনাদের ঘরে যাবো না, উঠানে বসতে দিলেই আমাদের পক্ষে ঢের। আহ! খুব ক্লান্ত আমরা। আপনাদের মত দয়ালু মানুষরা থাকতে আমরা ক্ষুধা–তৃষ্ণায় মারা যাবো, এই কি একটা ন্যায্য কথা হল, বলুন?’
জম্বুক এমন হাঁপানোর ভঙ্গী করে যেন এক্ষুণি লুটিয়ে পড়ে মরে যাবে
আগুন-মানুষেরা ভালো করে তাদের ঝুলি ঝোলা ঝেড়ে ঝুড়ে দেখে তাদের ভেতরে নিয়ে গেল। উঠানে তাদের বসতে দিল মাদুর বিছিয়ে, খেতে দিল, জল দিল। পথশ্রমে ক্লান্ত তারা পাঁচজন খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ল।
ভালো করে একঘুম দিয়ে তারা যখন উঠল তখন বেলা আর নেই, সন্ধ্যা হয়ে এসেছে
চোখমুখ ডলতে ডলতে মস্ত হাই তুলে জম্বুক বলল, ‘আরে এত দেরী হয়ে গেল! এই অন্ধকারে যাব কী করে আমরা?’
আগুন-মানুষেরা উঠানের মাঝখানে আগুনের কুণ্ডে তখন আগুন জ্বালিয়েছে, এদিকে রান্না-বান্না হচ্ছে, সুরাপানও তারা শুরু করে দিয়েছে। রঙ্গিন চোখে তাদের নেতা এসে হাসতে হাসতে বলে, ‘আরে যাযাবররা যে! ঘুম কেমন হল? তোমরা রাতে আর যাবে কোথা? আমাদের নাচা-গানা হবে একটু পরেই। খাওয়া-দাওয়াও। তোমরাও যোগ দাও সে সবাই কে সুরাপাত্র এগিয়ে এগিয়ে দেয়। যাযাবরেরা হাস্য বিগলিত মুখে ধন্যবাদ দিয়ে পাত্র গ্রহণ করে। আর মুখের কাছে তুলে চুমুক দেবার অভিনয় করে।
জম্বুক আগে পানের সময়ই সবাইকে ভালো করে সতর্ক করে দিয়েছিল যেন ভুলেও তারা আগুন মানুষদের দেওয়া মাদক পান না করে।
খাওয়াদাওয়া হয়ে গেলে নাচ শুরু হল আগুন ঘিরে জম্বুক তো একেবারে পরম উৎসাহে নাচতে নাচতে তারস্বরে গানও গাইছে। আগুন-মানুষরা তারিফও করে খুব। একসময় সে খুলে রাখা পালকের মুকুটটা পরে নেয়, তাতে নাচ আরও জমে
এদিকে নাচতে নাচতে আগুন-মানুষদের খেয়াল হয়নি রাত অনেক হয়েছে আগুনও কেমন নিবু নিবু হয়ে এসেছে।
জম্বুক বলে, ‘আরও উসকে দাও আলো, অন্ধকারে কি নাচ জমে?
আগুন-মানুষদের নেতা যেই নতুন কাঠ-কুটো আগুনে ছুঁড়ে দিয়ে আগুন খুঁচিয়ে দিয়েছে লম্বা দণ্ড দিয়ে, মস মস শিখা লাফিয়ে উঠেছে। খুব কাছেই ছিল জম্বুক, মাথা নুইয়ে সে পালকমুকুটে ধরে নিল আগুন।
তারপর ছুট ছুট ছুট, তারা পাঁচজনে দৌড়ল আগুন-মানুষেরা তো, ‘আরে রে রে নিয়ে গেল আমাদের আগুন চুরি করে, নিয়ে গেল যাযাবরেরা, ধর ব্যাটাদের ধর’ বলে তাড়া করেছে।
জম্বুকের হাতে আগুন জ্বলা মুকুট, আগুন-মানুষেরা তাকে প্রায় ধরে ধরে। সে ছুঁড়ে দিল মুকুট বনমালীর দিকে। বনমালী লুফে নিয়ে দৌড়। আগুন-মানুষরা এবারে বনমালীর দিকে দৌড়ল, ‘ধর ধর সে আগুন ছুঁড়ে দেয় বলাকার দিকে। তাড়া করে আসা লোকগুলো এবার বলাকার দিকে দৌড়য়। এই ভাবে আগুন হাত থেকে হাতে ফিরতে থাকে। আগুন-মানুষরা তাদের ধরতে পারে না।
এদিকে দৌড়তে দৌড়তে তারা এসে গেছে মাঠ পার হয়ে সেই শুকনো গাছের কাছে। হাত ফেরত হতে হতে আগুন আবার এসে গেছে জম্বুকের হাতে। জম্বুক আছড়ে ফেলে গাছে, দাউ দাউ ধরে যায়। আর চিন্তা নেই, এবারে আর কেড়ে নিতে পারবে না আগুন। ব্যর্থ আগুন-মানুষরা গালাগাল দিতে দিতে ফিরে যায়।
জম্বুক, বনমালী, ঋক্ষবান, বলাকা আর মনুক পাঁচটি শুকনো ডালের ডগায় আগুন ধরিয়ে নেয় ফিরে যায় তাদের গ্রামে।
তারপর থেকে আর তাদের শীতে কষ্ট হয়নি। আর জম্বুক হয়ে যায় তাদের চিরকালের বীর নায়ক।
-----------------------
ছবি - পিয়ালী বন্দোপাধ্যায়

লেখক পরিচিতি - মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। লেখালেখির সূত্রপাত স্কুল জীবন থেকেই। ছোটোবড়ো প্রত্যেকের জন্যই লেখেন। প্রথম সারির সমস্ত পত্রিকায় নিয়মিত লেখা প্রকাশিত হয়। অশেষ আকাশএবং অনন্ত আগামী লেখিকার প্রকাশিত দুটি বই। বাংলা ব্লগেও নিয়মিত লেখালেখি করেন।

দেশবিদেশের গল্প:: কী ভাবে এল গাছপালা আর জল (দক্ষিন আফ্রিকা) - মল্লিকা ধর

কী ভাবে এল গাছপালা আর জল (দক্ষিন আফ্রিকা)

মল্লিকা ধর

এটি আফ্রিকার দক্ষিনাংশের সান (san) জাতির উপকথা। গল্পটি অপূর্ব। এই গল্পে আছে একেবারে প্রথমে সৃষ্টিকর্তা ক্যাগেন সব পশু পাখি তৈরি করে পৃথিবীতে ছেড়ে দিলেন, কিন্তু না বানালেন কোনও পুকুর, না কোনও নদী, না কোনও ঝর্না বা কোনও প্রস্রবণ। কোনও ঘাস জমি নেই, কোনও ফলের গাছ নেই, চারদিকে শুধু ধূ ধূ বালির মরু, তীব্র সূর্য আগুন ঢেলে তাতিয়ে তোলে তা সারাদিন। পশুপাখিরা সবাই পশুপাখি মেরেই মাংস ভক্ষণ করে আর তৃষ্ণা মেটায় রক্তে। কী ভয়ঙ্কর রক্ত লাল সেই সব দিন। কারোর জীবনের ই কোনো নিরাপত্তা নেই।

এক ছিল বিরাট হাতি, সে এই সব দেখে ব্যথিত। সে বলল, “এই রকম চলতে পারে না, পারে না, পারে না”। পশুপাখিরা কাছে এগিয়ে আসে, কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করে, “তাহলে”?



মহান হৃদয় হাতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “আমি মরে গেলে আমার দেহের পশম থেকে গজাবে ঘাস। আমার শিরা উপশিরা থেকে হবে তরমুজের লতা তাতে রসটসটসে তরমুজ ফলবে। আমার হাড় গুলি থেকে হবে ফলের গাছ। রসালো ফল হবে তাতে। আর কাউকে মাংস খেতে হবে না। রক্ত পান করতে হবে না। প্রচুর খাবার আর পানীয় পাবে সব পশুপাখি”।

আগ্রহে উদগ্রীব হয়ে সব পশুপাখি হাতির দিকে চেয়ে থাকে, একজন বলে, “কবে, সে কবে? আহা কবে?”

হাতি বলে, “কী জানি? আমরা হাতিরা তো অনেকদিন বাঁচি। দেখা যাক কী হয়!”
সবাই আশায় আশায় চলে যায়, ভাবতে ভাবতে যায় একদিন মরু সবুজ হবে, কত ঘাস, কত ফল, মাটিতে কত রসালো তরমুজ! এত তৃষ্ণা আর থাকবে না, ক্ষুধা থাকবে না, রক্তলোলুপ এই সব ভয়ঙ্কর দিনের অবসান হবে। কিন্তু সে কবে?
এক ছিল মস্ত সাপ। সে হাতিকে এসে বলল, “হাতি সত্যি তুমি তোমার নিজের জীবন দিয়ে আমাদের জীবন সুন্দর করতে চাও? আমাদের রক্ষা করতে চাও”?
হাতি বলে, “হ্যাঁ সত্যি। এই বীভৎস যন্ত্রণা আর চোখে দেখতে পারি না। এর অবসান চাই”।

সাপ বলল, “আর এক বার ভেবে দ্যাখো । সকলের জীবন সুন্দর হবে কিন্তু তার জন্য চরম মুল্য দিতে হবে তোমাকে”।

হাতি বলে, “আমি ভেবে দেখেছি অনেকবার, আমি তৈরী”।

সাপ বলে, “তবে তাই হোক”। বিদ্যুতের মতন চমকে ওঠে সাপের ফণা। গভীর দংশন করে সে হাতিকে। সব টুকু বিষ ঢেলে দেয়। হাতি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, যন্ত্রণায় নীল হয়ে যেতে থাকে তার বিরাট দেহ। কিছুক্ষণ পরেই মৃত্যু হয় হাতির।

হাতির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে আগুনের মত। দলে দলে পশুপাখিরা এসে হামলে পড়ে হাতির মৃতদেহের ওপর। পেট ভরে মাংস খায়, তৃষ্ণা মিটিয়ে রক্ত পান করে তারা, খায় আর পান করে। খেতে খেতে দিন ফুরায় প্রায়, আর কিছুই পড়ে থাকে না, চামড়া, হাড় আর শিরা উপশিরা ছাড়া। এক সময় সূর্য নামে পাটে , পরিতৃপ্ত উদরে পশুপাখিরা ঘুমাতে যায়। বহুদিন পরে পেট ভরে খেতে পেয়েছে তারা, মিটাতে পেরেছে তৃষ্ণা।
পরদিন সকালে একে একে জেগে উঠতে থাকে পশুপাখিরা। আবার তপতপে গরমের দিন, আবার ক্ষুধা আবার তৃষ্ণা। আবার সেই যন্ত্রণা। সকলে উন্মত্তের  মতন “হা খাবার হা পানীয়” শুরু করে দিল। সাপ বলে, “আরে তোমরা এত অধীর হয়ো না। মনে আছে হাতির প্রতিশ্রুতির কথা?” পশুপাখিদের স্মৃতিশক্তি বেশী না, অনেকেরই কিছু মনে নেই, শুধু কয়েকজন তোতলাতে তোতলাতে বলে, “ হ্যাঁ কী যেন ......হাতি বলেছিল সে মরে গেলে তার হাড় থেকে ফল গাছ হবে...... তাই বলেছিল না? কিন্তু হাতি তো মরেনিসাপ তুমি তাকে মেরেছ। সাপ ফোঁস করে ওঠে, “এখন আমার নামে দোষ, না? সুবিধাটুকু পাওয়া হয়ে গেলে এরা সব ভুলে যায় । আয় কে খেতে চাস আমার রক্ত? সাহস থাকে তো এগিয়ে আয়”।

সাপের ক্রুদ্ধ চেহারা দেখে সবাই পিছু হটে, সাপের বিষ দাঁতের কথা কে না জানে! সাপ কে কেউ ঘাঁটাতে চায় না।


অনাহারে আর বিনা পানীয়তেই কেটে যায় একটি দিন, ক্রমে সূর্যাস্ত হয়। রাতের বেলা একে একে পরিচিত তারারা ফোটে আকাশে। তার সাথে দেখা যায় নতুন এক তারা, সেই তারা এগিয়ে আসতে থাকে। ভয়ে শিউরে ওঠে সব প্রাণী , বলে, “ওই যে হাতির আত্মা। আমাদের ধ্বংস করতে আসছে।”

চুপ করে দাঁড়িয়ে চেয়ে আছে পশুপাখিরা, নতুন তারাটি এগিয়ে আসতে আসতে ক্রমে স্থির হয় হাতির দেহাবশেষের উপর। সহসা হাতির হাড়গুলি খাড়া হয়ে ওঠে, শিকড় গজিয়ে ছড়িয়ে যায় মাটির গভীরে, উপরে ডালপালা গজায়, পাতাপত্তর হয়। ফলের গাছ হয়ে যায় ওরা। হাতির শিরা উপশিরা থেকে তরমুজের লতা হয়, রসালো তরমুজ ধরে তাতে। আর হাতির গায়ের পশম থেকে হয় মস্ত মস্ত লোম, হাতি ঘাসের জঙ্গল বলে যা এখন পরিচিত।

পরদিন সকালে পশুপাখিদের আনন্দ দেখে কে! দলে দলে হরিন, খরগোশ, গরু, ভেড়া, জেব্রা, ঘোড়া আর বাকি সবাই বেরিয়ে পড়ে খেতে। মাঠ ভরা সবুজ ঘাস, আহা! শুধু কিছু  কিছু প্রাণী চিতা, হায়না, সিংহ, নেকড়ে, পেঁচা এই রকম কিছু প্রাণী বলল, তারা মাংস ছাড়া বাঁচতে পারবে না। তারা চলে গেল রাত্রির অন্ধকারে রাতে শিকার ধরে খাবে। শকুন বলল, যে তারও মাংস লাগবে কিন্তু সে নিজে মারবে না, এমনি এমনি কেউ মরে গেলে তবে খাবে। খাবারদাবারের ব্যবস্থা তো হয়ে গেল, কিন্তু পানীয়? কী ভীষণ তৃষ্ণা ! আবার সাপ কে তারা বলে, “পানীয় চাই, পানীয় চাই। তেষ্টায় মরে গেলাম”।

সাপ বলে, “ফলে রস আছে, তরমুজেও। ঘাসেও। সে সবে তেষ্টা মেটে না তোমাদের?”
কিন্তু কেউ শোনে না, আহা, তৃষ্ণা! আবার তাকাতে থাকে এদিক ওদিক, নধর কোনো প্রাণীর মিঠা রক্তে তারা তৃষ্ণা মেটাবে ।


সাপ বাধা দেয়, বলে, “ না না না, আর নয়। মহান হাতি নিজের জীবন দিল তোমাদের জন্য, তবু তোমাদের সন্তুষ্টি নেই। দাঁড়াও , দেখি কি করা যায়।” সাপ মাটিতে গর্ত করে নেমে গেল পাতালে, সেখান থেকে ফণা আর লেজের ঝাপটা দিয়ে ঠেলে ঠেলে পাতালের জল নিয়ে এল উপরে, দেখা দিল ঝর্না আর প্রস্রবণ। নীচু নীচু জায়গা জলে ভরে গিয়ে হল পুকুর, দিঘী, হ্রদ, নদী বয়ে গেল উপত্যকার মাঝ দিয়ে।

খাদ্য ও পানীয়র সমস্যা মিটে গেল। এখন পৃথিবী ঘাসে, পাতায়, লতায়, গাছে সবুজ, স্নিগ্ধ, জলের অভাব এখন আর নেই। সকলে সুখী।

সাপ রইল না, আগুনে ঝাঁপ দিয়ে সে ফিরে গেল স্বর্গেসে কাউকে বলেনি যে হাতিকে সে মর্মান্তিক ভালোবাসতো, তাকে ছাড়া সে থাকবে কেমন করে?

রয়ে গেছে হাতিঘাসের জঙ্গল, রয়ে গেছে সেই জলকুণ্ড যেখানে প্রথম পাতালের জল নিয়ে এসেছিল সাপ। আর রয়ে গেছে এই গল্প। 

ছবি- পিয়ালী বন্দোপাধ্যায়

লেখক পরিচিতিঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। লেখালেখির সূত্রপাত স্কুল জীবন থেকেই। ছোটোবড়ো প্রত্যেকের জন্যই লেখেন। প্রথম সারির সমস্ত পত্রিকায় নিয়মিত লেখা প্রকাশিত হয়। ‘অশেষ আকাশ’ এবং ‘অনন্ত আগামী’ লেখিকার প্রকাশিত দুটি বই। বাংলা ব্লগেও নিয়মিত লেখালেখি করেন।