Showing posts with label দীপিকা মজুমদার. Show all posts
Showing posts with label দীপিকা মজুমদার. Show all posts

গল্পের ম্যাজিক:: গ্রীন গ্যালাক্সি সোসাইটি - দীপিকা মজুমদার


গ্রীন গ্যালাক্সি সোসাইটি
দীপিকা মজুমদার

“এই অ্যাপার্টমেন্টে থাকতে গেলে কিছু কড়া নিয়ম মেনে চলতে হয় শুনেছি, সেগুলো কি সত্যি?” গ্রীন গ্যালাক্সি সোসাইটির ভেতরে প্রবেশ করার সময়েই প্রশ্নটা করলাম।
আমার প্রশ্নের কোনও উত্তর দিলেন না রিয়েল এস্টেট এজেন্ট মহিলা। সামান্য হেসে মাথা নাড়লেন।
অর্থাৎ যা শুনেছি সেটা সত্যি, মিথ্যে নয়। বেশ কয়েক জায়গায় খোঁজাখুঁজির পর এই অ্যাপার্টমেন্টটাই কম ভাড়ায় পাওয়া গেলএকদম শহরের মাঝে যে অ্যাপার্টমেন্টগুলো পেয়েছিলাম সেগুলোর আকাশ ছোঁয়া ভাড়া। মাসের শেষে ব্যাঙ্কে যা আসবে তার অর্ধেকটা যদি বাড়ি ভাড়া দিতেই চলে যায় তাহলে সারাটা মাস খাবো কী আর জমাবই বা কী? তাছাড়া চাকরির সবে শুরু আমার, এই সময়ে যদি দুটো পয়সা সঞ্চয়ই না রাখতে পারি তাহলে আর নিজের জন্মস্থান ছেড়ে বাইরের শহরে চাকরি করতে আসার কী মানে?
এমন নয় যে আমি শুরু থেকেই অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নেওয়ার চেষ্টা করেছি। বেশ কয়েকটা বাড়িও দেখেছিলাম। কিন্তু সারা জীবন বাবার সরকারি আবাসনে থাকার অভ্যাস, ছুটির দিনে অন্তত চারটে লোকের মুখ না দেখলে নিজেকে বড়ো অসামাজিক বলে মনে হয়। বাড়িতে একা থাকার নানারকম ঝুঁকি আছে। সব নিজের হাতে দেখাশোনা করতে হবে। এই মুহূর্তে একজন কাজের লোক যে রাখব, সেই আর্থিক ক্ষমতাও নেই। তাছাড়া আমার প্রচণ্ড ভূতের ভয়, একা একটা বাড়িতে থাকতে হবে ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
অতএব সব মিলিয়ে এই গ্রীন গ্যালাক্সি সোসাইটিই আমার পক্ষে সুবিধেজনক বলে মনে হল। জায়গাটা মূল শহরের একটু বাইরের দিকে, আমার অফিস থেকেও গাড়িতে যাতায়াত করতে মিনিট চল্লিশ সময় তো লাগবেই। সে হোক, শহরের ভিড়ে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকতে সবসময় ভালো লাগে না। একটু নিরিবিলি হলে সপ্তাহান্তে বেশ স্বচ্ছন্দে থাকা যায়। মোটের ওপর জায়গাটা আমার খারাপ লাগল না। কয়েকটা কড়া নিয়ম না হয় মেনেই চললাম। এমনিতে তো প্রতিদিন কতশত নিয়ম ভাঙছি আমরা।
গেটের কাছে গাড়িটা দাঁড়াতেই জলপাই সবুজ রঙের উঁচু বিল্ডিংগুলো নজরে পড়ে। গেটের আর্চের উপর গোটা গোটা ইংলিশ হরফে লেখা - GREEN GALAXY SOCIETY. আমি অবশ্য ‘সবুজ নীহারিকা’ নাম দিয়েছি।
“ওসব নিয়ম-টিয়ম নিয়ে বেশি ভাববেন না ম্যাডাম। জায়গাটা আপনার কেমন লাগছে বলুন?” আমাকে চুপচাপ হাঁটতে দেখে রিয়েল এস্টেট এজেন্ট মহিলা জিজ্ঞেস করলেন।
অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরের বাগান দিয়ে ভারী ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে হাঁটছিলাম। বললাম, “এখনও তো ঘরই দেখলাম না। আগে ঘর দেখি।” মুখে বললাম বটে। তবে পছন্দ হলে হাতে হাতে চেক দিয়ে আজই শিফট করে যাবতাই জিনিসপত্রও সব গুছিয়ে নিয়ে এসেছি। আসলে হোটেলে থাকাটা আর পোষাচ্ছে না। একটা স্থায়ী থাকার জায়গা না হলে কাজেও মন বসছে না।
“হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ম্যাডাম। ঘর দেখেই ডিসাইড করবেন। আপনার নিশ্চয়ই ভালো লাগবে।”
সবুজ নীহারিকা সোসাইটির ভেতরে এ বি সি ডি করে মোট ছ’টা বিল্ডিং, সব ক’টাই জলপাই সবুজ রঙের। জায়গায় জায়গায় আবার সাদার ছিটে। ঠিক যেন রাতের আকাশের গায়ে তারাদের সমাবেশ। শুধু আকাশের রং সবুজ। শুধু নামেই সবুজ নয়, গাছপালা মিলিয়ে সবুজের বাহারও কম নয়। মূল ড্রাইভওয়ের পাশে সার দেওয়া দেবদারু গাছতার পেছনেই সবুজ চাপ চাপ ঘাস। অ্যাপার্টমেন্ট তৈরির আগে এখানে যে কয়েকটা বড়ো বড়ো বৃক্ষ ছিল সেগুলোকেও সযত্নে এড়িয়ে বিল্ডিং বানানো হয়েছে। সব মিলিয়ে এই পরিবেশ বান্ধব ব্যাপারটা আমায় মুগ্ধ করেছে। সপ্তাহের ছ’টা দিন শহরের যানজটের ক্যাঁচক্যাঁচানি ছেড়ে একটা দিন এই সবুজের মাঝে কাটানো যাবে।
কিছুটা হেঁটে যেতেই একটা দোকান দেখা গেলআজকাল অ্যাপার্টমেন্টগুলোর ভেতরে সবরকম সুবিধে মজুদ রাখা হয়। আমি দোকানটার দিকে দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছিলাম। দোকানের বাইরে বড়ো বড়ো বোর্ডে লেখা আছে ‘গ্যালাক্সি থিম আইসক্রিম’
“কিছুদিন আগেই নিউ ইয়ার পার্টি হল এই সোসাইটিতে। বাচ্চাদের জন্য ছিল গ্যালাক্সি থিম আইসক্রিম - ব্লু বেরি অ্যান্ড বীটরুট সস্‌ উইথ স্প্রিঙ্কলড সেসামে সীড।”
“বাহ! দারুণ তো!” এই অ্যাপার্টমেন্টের সব কিছুই যেন আধুনিকতায় মোড়া। সবরকম আধুনিক বিলাসবহুল ব্যবস্থা। তবে ভাড়াটা তুলনায় একটু বেশিই কম এটাই যা আশ্চর্যের।
আমার মনের কথাটা রিয়েল এস্টেট এজেন্ট মহিলা ধরতে পারলেন কিনা কে জানেবললেন, “সবরকম সুবিধেই পাবেন এখানে ম্যাডাম। এমনকি এদের নিজস্ব ট্রাস্টও আছে। রাতবিরেতে অসুস্থ হয়ে পড়লেও অ্যাম্বুলেন্সের জন্য চিন্তা করতে হয় না। ট্রাস্টের তরফ থেকেই সুব্যবস্থা রয়েছে।”
এই অ্যাপার্টমেন্টের ব্যবস্থা একটু বেশি রকমই ভালো যেন।
কথায় কথায় ডি-ব্লকের বিল্ডিঙের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলাম। আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে মহিলা কোথাও যেন উধাও হয়ে গেলেন। মিনিট খানেক পর হাতে একটা চাবি নিয়ে ফিরে এসে বললেন, এই বিল্ডিঙের সাত তলায় একটা টু-বিএইচকে খালি আছে। আপনাকে দেখিয়ে দিই? পছন্দ হলে এটাই ফাইনাল করে নেবেন না হয়।”
আমি দেখলাম সাত তলার জানালা বন্ধ। সেখান থেকে সরাসরি বাইরের বাগানটা দেখা যায়। জানালা দিয়ে দু’চারটে লোকজনের মুখও দেখা যাবে, মন্দ নয়। মহিলাকে বললাম, “বেশ চলুন দেখে আসি

*                   *                   *

দুই কামরার ঘর। সঙ্গে খাট বিছানা আর রান্নাঘরের প্রয়োজনীয় টুকটাক জিনিসপত্র মজুদ আছে। আনাজপাতি, মশলা কিনলেই আপাতত চলে যাবেদুটো ঘরের মধ্যে একটা বেড রুম, অন্যটা স্টাডি হিসেবে ব্যবহার করব ভেবেছি। পিঠ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে চেক্‌ সই করতে গিয়েও মনে হল কয়েকটা ব্যাপারে আরও একটু ভালো করে জেনে নেওয়া উচিত। একটু ইতস্তত করে বললাম, “আচ্ছা ম্যাডাম। শুনেছিলাম এই অ্যাপার্টমেন্টের কেউ ওদের নিয়ম-টিয়ম ভঙ্গ করলে বেশ মোটা টাকা ফাইন দিতে হয়, সেটা ভাড়ার তুলনায় অনেকটাই বেশি। কথাটা কি সত্যি?”
আমার প্রশ্ন শুনে মহিলা বেশ বিরক্তই হলেনএই বিল্ডিঙে আসার আগে চাবির সঙ্গে একটা কালো মলাট দেওয়া মোটা ফাইল বগলদাবা করে এনেছিলেন। সেই ফাইল খুলে এক গোছা কাগজ আমার সামনের টেবিলে নামিয়ে দিয়ে বললেন, “এই নিয়মগুলো পড়ে এখানে একটা সই করে দেবেন।”
একগোছা কাগজ টেনে নিয়ে পাতা ওলটাতে শুরু করলাম। কি জানি কেমন সব উদ্ভট নিয়ম লেখা আছে এখানে।
নিয়ম এক - গ্যারেজ ছাড়া সোসাইটির ভেতরে কোনোরকম যানবাহন পার্ক করা যাবে না। যানবাহন বের করার পর এবং রাখার পর গ্যারেজ বন্ধ করা বাধ্যতামূলক। অন্যথায় ১০০০ টাকা জরিমানা।
“অ্যাঁ! সামান্য গাড়ি পার্ক করা নিয়ে এত টাকা জরিমানা?” প্রথম নিয়মেই বড়োসড়ো ধাক্কা
মহিলা আমতা আমতা করে বললেন, “বাইরে গাড়ি রাখার দরকারটাই বা কী? চুরি-টুরি হয়ে গেলে...”
আমি দু’নম্বর নিয়মের দিকে এগিয়ে গেলাম।
নিয়ম দুই - সোসাইটির ভেতরে ঘোরাঘুরি করার সময়, বাইরে থেকে প্রবেশ করার সময় অথবা বেরোনোর সময় ধূসর অথবা কালো রঙের পোশাক ছাড়া অন্য কোনও রং ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। অন্যথায় ৫০০ টাকা জরিমানা।
আমি নিজের টি-শার্ট-এর দিকে দেখলাম। উজ্জ্বল সমুদ্র সবুজ টি-শার্ট আর নীল জিন্স পরে আছি। অবাক হয়ে মহিলার দিকে তাকালাম। এবারও উনি আমতা আমতা করে জবাব দিলেন, “লোয়ার গার্মেন্ট নিয়ে তেমন সমস্যা নেই। সঙ্গে একটা কালো জ্যাকেট রাখবেন। এটা তেমন স্ট্রিক্ট রুলের মধ্যে পড়ে না। আপনাকে তিন বার সুযোগ দেওয়া হবে।”
উদ্ভট নিয়মই বটে! আমি কী রঙের জামাকাপড় ব্যবহার করব সেই ব্যক্তি স্বাধীনতাতেও হস্তক্ষেপ? আমি আর না থেমে পরের নিয়মগুলো পড়তে শুরু করলাম।
নিয়ম তিন - বাগানের ফুল গাছের দিকে যাওয়া অথবা হাত দেওয়া কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। বাড়িতে ছোটো বাচ্চা অথবা পোষা জীবজন্তুর ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। বিশেষ করে পিটুনিয়া ফুলের ঝোপের দিকে যাওয়ার আগে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে অনুরোধ করা হচ্ছে। অন্যথায় ১০০০ টাকা জরিমানা।
আশ্চর্য! সামান্য ফুল গাছে হাত দেওয়ার জন্যও এক হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে? তবে এটা নিয়ে বিশেষ ভাবনার কিছু নেই। অনেক পার্ক বা পাবলিক সেকটারের বাগানে এমন নির্দেশিকা থাকে। আমি পরের নিয়ম পড়ায় মন দিলাম।
নিয়ম চার - মাসের প্রথম তিন দিনের মধ্যে ভাড়া সোসাইটির নির্দিষ্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা করে দিতে হবে। এর জন্যে অ্যাপার্টমেন্টের কেয়ার টেকারকে বার বার বিরক্ত করা বা সময় চাওয়া নিয়ম বিরুদ্ধ। অন্যথায় মাসের চতুর্থ দিন থেকে প্রতি এক দিনের হিসেবে ১০০ টাকা করে জরিমানা ধার্য হবে।
একটু বেশিই যেন কঠোর নিয়মগুলো।
নিয়ম পাঁচ - প্রতিদিনের আবর্জনার মধ্যে পচনশীল আবর্জনা, যেমন সবজির খোসা, উচ্ছিষ্ট খাবার, মাছ মাংসের হাড় ইত্যাদি এবং প্লাস্টিকের প্যাকেট ইত্যাদি আবর্জনা আলাদা করে ফেলতে হবে। এর জন্য ধূসর ও কালো রঙের ডাস্টবিন আলাদা করা আছে। নির্দিষ্ট আবর্জনা নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলতে হবে। অন্যথায় ৩০০০ টাকা জরিমানা।
ভালো নিয়ম। এই নিয়মটাই এতক্ষণে যথাযথ নিয়ম বলে মনে হল আমার। তবে এই নিয়মের জন্য সরাসরি তিন হাজার টাকা জরিমানা, একটু বাড়াবাড়িই। অবশ্য নতুনত্ব কিছু নেই। উদ্ভট কয়েকটা নিয়মের জন্য যদি পাঁচশ বা হাজার টাকা জরিমানা রাখা যায় তাহলে পরিবেশ পরিছন্ন রাখার জন্য তিন হাজার টাকা ঠিকই আছে।
তবে আসল খটকাটা হয়তো লুকিয়ে ছিল ছয় নম্বর নিয়মে।
নিয়ম ছয় - রাত্রি বারোটা থেকে রাত্রি তিনটে অবধি সোসাইটির গেট বন্ধ থাকে। এই সময়ের মধ্যে সোসাইটির ভেতরে ঘুরে বেড়ানো, বাইরে যাওয়া অথবা বাইরে থেকে ভেতরে আসা নিষিদ্ধ। একান্ত প্রয়োজন অথবা আপৎকালীন প্রয়োজনে সোসাইটির কেয়ার-টেকারের সঙ্গে আগে যোগাযোগ করতে হবে। ঐ সময়টুকু ঘরের ভেতরে চিৎকার করা অথবা জোর শব্দে বাদ্যযন্ত্র বাজানো, টিভি চালানো নিষিদ্ধ। দরজা জানালা, এমনকি ঘরের ভেতরের উজ্জ্বল আলোও ঐ সময় বন্ধ রাখতে হবে অথবা পুরু পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। নিয়মভঙ্গ হলে ৩০০০ টাকা জরিমানা।
আমি আর স্থির থাকতে না পেরে মহিলাকে প্রশ্ন করেই বসলাম। “আচ্ছা এই অ্যাপার্টমেন্টে কী এলিয়েন থাকে? এত ফালতু নিয়ম তো মানুষে বানায় বলে হয় না।”
আমার প্রশ্নে রিয়েল এস্টেট এজেন্ট মহিলা যেন ঘাবড়ে গেলেন। বললেন, “এলিয়েন? এলিয়েন কেন থাকবে? মানুষই থাকে। একটু কড়া নিয়ম না হলে সুস্থ পরিবেশ গড়ে তোলা যায় না ম্যাডাম। আমাদের গ্রীন গ্যালাক্সি সোসাইটির ট্রাস্টের উদ্দেশ্যই হল সুস্থ ও স্বচ্ছ পরিবেশ গড়ে তোলা। মানুষের মন ও স্বাস্থ্যও তো এর বাইরে নয়, তাই না?”
হিসেব করে দেখলাম আমি এক মাসে যদি সব ক’টা নিয়ম ভাঙি তাহলে মোটামুটি সাড়ে আট হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। প্রতি মাসের শেষ দিনে রাত্রি বারোটার মধ্যে আমার স্যালারি এসে যায় এটাই যা আশার কথা, না হলে ঘর ভাড়া দিতেও প্রতিদিন একশো টাকার জরিমানার পারা চড়ে যেত।
এত কম ভাড়ায় এত সহজে হয়তো এর চেয়ে ভালো থাকার জায়গার ব্যবস্থা করতে পারব না। তাই দু-একটা উদ্ভট ও কড়া নিয়ম জেনেও কাগজের শেষে সই করে দিলাম।
রিয়েল এস্টেট এজেন্ট মহিলা ঘর ভাড়া বাবদ তিন মাসের অগ্রিম চেক ও সই করা কাগজগুলো নিয়ে প্রস্থান করলেন। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, কাগজগুলোর একটা প্রতিলিপি আর একজন ঘর পরিষ্কার করার লোক আমার কাছে পাঠিয়ে দেবেন।
আমি ব্যাগ থেকে একটা চাদর বের করে বিছানার গদির উপর পেতে ক্লান্ত শরীরটা ছেড়ে দিলাম। মাথাটা ঝিমঝিম করছিল আমার। এই ভাবেই শুরু হল সবুজ নীহারিকায় আমার প্রথম দিন।

*                   *                   *

প্রথম কয়েকদিন সবুজ নীহারিকায় বেশ ভালোভাবেই কাটল। আশেপাশের অ্যাপার্টমেন্টের দু-একজন প্রতিবেশীর সঙ্গে পরিচয়ও হয়েছেমোটেই তাঁদের এলিয়েন বলে মনে হয়নি, প্রত্যেকেরই হাশিখুশি ভদ্র ব্যবহার। তবে একটা সাধারণ বিষয় সকলের মধ্যেই খেয়াল করেছি, এই সোসাইটির নিয়ম সম্পর্কে কেউ যেন কথা বলতে আগ্রহী নয়। এরকম উদ্ভট নিয়ম কেন জিজ্ঞেস করলে কেউ কিছু বলতে পারে না। অথবা বলতে চায় না। এর পেছনে যে ঠিক ভয় কাজ করে তা নয়, এরা সকলেই যেন বিষয়টা দৈনন্দিন কাজের মতোই স্বাভাবিক মনে করে।
আমার অ্যাপার্টমেন্টে কেউ এলে সব সময় ধূসর বা কালো একটা জ্যাকেট চড়িয়ে আসতে দেখেছি। দেখাদেখি আমিও একদিন অফিস ফিরতি পথে দুটো কালো জ্যাকেট কিনে নিলামধূসর রঙটা মোটেই পছন্দ নয় আমার। ট্রাস্টের লোকজন এবং কেয়ার-টেকার ও ম্যানেজারের সই সহ নিয়মাবলির কাগজপত্র আমার হাতে এসে গিয়েছিল পরের দিনই। এখনও ব্যক্তিগত যানবাহন যেহেতু কেনা হয়নি তাই প্রথম নিয়ম অনুসরণ বা ভঙ্গ করা কোনোটাই আমার ক্ষেত্রে খাটে না। খুব সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট বানিয়ে খেয়ে আটটার মধ্যে বেরিয়ে পড়তে হয়, ন’টার মধ্যে অফিসে পৌঁছে যাওয়ার সময়। তাই রাত্রি দশটার মধ্যে প্রতিদিনের আবর্জনা নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে এগারোটার মধ্যে আলো বন্ধ করে শুয়ে পড়িডাস্টবিনটা ঠিক যেখানে রাখা আছে তার পেছনেই লাল নীল সাদা গোলাপি বেগুনি রঙের পিটুনিয়া ফুলের ঝোপ। এই ফুলের ঝোপ থেকেই আমার প্রথম সন্দেহ শুরু হয়।
বেশ কয়েকদিনের আবর্জনা জমে ছিল। প্লাস্টিক প্যাকেট ও নানারকম আবর্জনায় ভরে উঠেছিল দুটো ব্যাগ। ঘড়িতে সময় দেখলাম সাড়ে দশটা বাজে। ব্যাগ দুটো তুলে লিফটে চড়ে নিচে এলাম। বাইরেটা আজ যেন অদ্ভুত রকমের শান্ত। শীতের শেষ, বাগানে ফুল পাখির সমাহার দেখলেই বোঝা যায় বসন্ত এসে গেছে। অথচ সূর্য ডোবার পর কেমন যেন গা ছমছমে পরিবেশ। বাইরের দোকানটায় একটা টিমটিমে আলো জ্বলে, সেটাও এগারোটার পর বন্ধ হয়ে যায়।
হেঁটে ডাস্টবিনের কাছে এলাম। প্রায় একজন মানুষ সমান দুটো ডাস্টবিন, একটা কালো একটা ধূসর। ধূসর ডাস্টবিনে আনাজের খোসা আর কালো ডাস্টবিনে প্লাস্টিকের আবর্জনা ফেলে পেছন ফিরতেই কেমন একটা অনুভূতি হল। কী যেন একটা ঠিক নেই, একটা অন্যরকম ব্যাপার। ঘুরে দাঁড়ালাম ডাস্টবিনের দিকে। এখানে এমন কিছু একটা আছে যা বদলে গেছে, কিন্তু এই বদলটা আমার চোখে ধরা দিচ্ছে না। কিছু যেন একটা নেই, অথবা আছে কিন্তু উপস্থিতিটা অস্বস্তিকর।
জানি নিয়ম বিরুদ্ধ, কিন্তু পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম পিটুনিয়া ফুলের ঝোপের কাছেনিয়মাবলিতে লেখা আছে - ‘...বিশেষ করে পিটুনিয়া ফুলের ঝোপের দিকে যাওয়ার আগে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে অনুরোধ করা হচ্ছে।’ আশ্চর্য ব্যাপারটা এবার আমার চোখে ধরা পড়ল। এই ক’দিন দেখেছি রঙবেরঙের পিটুনিয়াগুলোকে। কোনোটা লাল, কোনোটা শকিং পিঙ্ক, আবার গাঢ় বেগুনি অথবা হলদে। কিন্তু এখন আমার সামনে যে পিটুনিয়াগুলো ফুটে আছে সেগুলো সব সাদা অথবা কালো। ফুলগুলো শুধু ফুটেই নেই, তিরতির করে কাঁপছে, অথচ এখন বাতাসের লেশমাত্র নেইযেন এগুলো ফুল নয়, মানুষ। নিজেদের মধ্যে কথা বলছে কি? আকার আয়তনেও যেন আগের চেয়ে দ্বিগুণ।
খুট্‌ করে কোথাও একটা শব্দ হল। আমি তাকিয়ে দেখলাম পিটুনিয়ার ঝোপের কাছে দাঁড়িয়ে আছি আমি। কেউ দেখে ফেলার আগে কালো জ্যাকেটটার পকেটে হাত ঢুকিয়ে লিফটের দিকে দৌড়ে চলে গেলাম।
সারা রাত ঘুম এল না, একটা চাপা অস্বস্তি নিয়ে রাতভর এপাশ ওপাশ করে কাটিয়ে দিলাম। ভোরের দিকে চোখ লেগে গিয়েছিল, উঠতে দেরি করে ফেলেছি। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় কালো জ্যাকেটটা গায়ে চড়াতে ভুলে গিয়েছিলাম। অফিস থেকে ফিরে দরজা খুলেই দেখি দরজার তলায় একটা সাদা খাম পড়ে। খামের ভেতরে লেখা আছে - গতকাল রাতে পিটুনিয়ার ঝোপের দিকে যাওয়ার জন্য সোসাইটির ট্রাস্টের তরফ থেকে আমার ১০০০ টাকা জরিমানা ধার্য হয়েছে। এর সঙ্গে আমাকে উজ্জ্বল রঙের জামাকাপড় পরে বাইরে না যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।
আশ্চর্য! আমি কোনো গাছে হাত দিইনি, শুধু ঘাসের ওপর দাঁড়িয়েছিলাম মাত্র, তাতেই হাজার টাকা জরিমানা? এবার বিষয়টা বিরক্তির চেয়েও বেশি রাগের উদ্রেক করল। কোনো ঘটনার পেছনে যুক্তি থাকবে না এ হতেই পারে না। সিদ্ধান্ত নিলাম এরকম উদ্ভট নিয়মের পেছনে যুক্তিগুলো খুঁজে বের করবই।
পরের দিন ঘরের আলো বন্ধ করে ডাস্টবিনে আবর্জনা ফেলে আর ঘরে ফিরলাম না, সিঁড়ির তলার অন্ধকারটায় লুকিয়ে রইলাম। আমার মন বলছিল পিটুনিয়া বাগানেই রহস্যটা লুকিয়ে আছে। সিঁড়ির ঠিক সামনের ড্রাইভওয়েটার পেছনেই পিটুনিয়ার ঝোপটা
মোবাইল ইচ্ছে করেই ঘরে রেখে এসেছিলাম, হাত ঘড়িতে সময় দেখলাম বারোটা দশ। আজও পিটুনিয়াগুলো সাদা কালো হয়ে আছে, গতকালের মতোই আয়তনে বড়ো এবং একইরকম তিরতির করে কাঁপছে।  ঠিক সেই সময়েই খুট্‌ করে একটা শব্দ হল কোথাও। আমি ফুলগুলোর দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে রইলাম। হঠাৎ বাগানের সোনালি আলোটা দপ্‌ দপ্‌ করতে করতে বন্ধ হয়ে গেলআরও ঘন কালো অন্ধকার যেন চেপে ধরেছে বাগানটাকে। কিন্তু আশ্চর্য, আমি পিটুনিয়াগুলোকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, ওদের গা থেকে যেন ঝাপসা নরম একটা আলো ঠিকরে পড়ছে। যে আলোয় চোখ ধাঁধাঁয় না, কিন্তু দেখা যায়।
বাগানে কোনও প্রাণের চিহ্ন নেই, সোসাইটি একদম নির্জন। না, নির্জন নয়! বাগানে কেউ একজন আছে। পিটুনিয়ার ঝোপের আড়াল থেকেই বেরিয়ে এল লম্বা কালো জোব্বা পরা একটা লোক। লোকটার চলন ঠিক মানুষের মতো নয়, লাফিয়ে লাফিয়ে অদ্ভুত ভাবে হাঁটে। ডাস্টবিনের কাছে এসে বাগানের চারপাশ মাথা ঘুরিয়ে দেখল একবার। তারপর কালো ডাস্টবিনের ঢাকনা খুলে বিন-ব্যাগটা দু’হাতে বার করল।
আমি প্রথমে ভেবেছিলাম সোসাইটির জমাদার আবর্জনা তুলতে এসেছে। কিন্তু আশপাশে কোনও গার্বেজ ট্রাক নেই। ঠিক তখনই আমাকে অবাক করে দিয়ে বিন-ব্যাগটা দু’হাতে তুলে ধরে হুডি পরা কালো মাথার ভেতরে ঢুকিয়ে নিলআমি কি ঠিক দেখলাম? পুরো প্লাস্টিকের বিন-ব্যাগটা লোকটা গিলে ফেলল এক নিমেষে! এটা দেখার পরই আমার মুখ থেকে একটা ভয় মিশ্রিত বিস্ময়কর শব্দ বেরিয়ে এল - “আঁক!”
শব্দটা লোকটা শুনতে পেয়েছে, চমকে দিয়েছে ওকে। আবার দু’পাশে দেখে নিয়ে লোকটা লাফাতে লাফাতে পিটুনিয়া ঝোপের পেছনে চলে গেলপ্রথমটায় ভয় পেয়েছিলাম, কিন্তু সোসাইটির বাইরের কোনও বদমাইশ লোক অথবা চোর ঢুকে এইসব করছে ভেবে দৌড়ে গেলাম পিটুনিয়া ঝোপের পেছনে। তখন বাগানের আলোটাও জ্বলে উঠেছে, আর অদ্ভুতভাবে পিটুনিয়াগুলোর কম্পনও বন্ধ হয়ে গেছে। আমি এদিক ওদিক দেখতে গিয়ে বুঝলাম ঠিক আমার পেছনেই কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। সোসাইটির গেট কি আজ খোলা থেকে গিয়েছিল? এ কি সাধারণ চোর নয়, কোনও খুনি? আতঙ্কে জ্ঞান হারালাম আমি।

*                   *                   *

“এখন কেমন আছেন আপনি?” মাথার ঝিমঝিম ভাবটা নিয়ে চোখ মেলে তাকাতেই দেখলাম লোকটাকে। মাথায় উশকোখুশকো কাঁচা-পাকা চুল, এক মুখ সাদা দাড়ি নিয়ে একজন বয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে আছেন আমার সামনে। হাতে একটা বড়ো কফি মগ।
সোফার উপর উঠে বসলাম। এটা আমার ঘর নয়, অচেনা কোনও জায়গা। আমি অবাক চোখে এদিক ওদিক তাকাতেই বয়স্ক লোকটি বললেন, “এটা আমার ঘর। তুমি বাইরে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলে। এখন এই হট চকোলেটটা খেয়ে নাও, ভালো লাগবে।”
আমি দ্বিধাগ্রস্ত হাতে মগটা নিতে গিয়ে বললাম, “আপনি কে?”
“আমি শশধর মল্লিক। এই গ্রীন গ্যালাক্সি সোসাইটির কেয়ার-টেকার।”
কেয়ার-টেকার শুনে আশ্বস্ত হলাম। হট চকোলেটের মগে চুমুক দিলাম, দারুণ স্বাদ, একটু ঝাঁঝালোও।
আমাকে চুপ থাকতে দেখে বৃদ্ধ বললেন, “পিটুনিয়া ঝোপের পেছনে এই সময় আপনি কী করছিলেন? আপনি কি জানেন এই মুহূর্তে আপনি সোসাইটির দুটো গুরুত্বপূর্ণ নিয়মভঙ্গ করেছেন?”
আমি সজোরে মাথা নাড়লাম, “হ্যাঁ জানি। কিন্তু ঐ লোকটা...”
আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বৃদ্ধ বললেন, “কোন লোকটা? যে ডাস্টবিনের আবর্জনা ঝোলা শুদ্ধু খেয়ে ফেলেছে?”
বললাম, “হ্যাঁ, আপনি দেখেছেন? দেখেছেন ঐ লোকটাকে?”
বৃদ্ধ আমাকে হাত তুলে শান্ত হতে ইশারা করলেন। বললেন, “এত কিছু তোমার দেখা উচিত হয়নি। এর জন্য তোমাকে এখান থেকে বের করেও দিতে পারি। একটার পর একটা নিয়ম ভেঙেছ তুমি? তবে এই মুহূর্তে তোমার মনে যে কৌতূহল তা অবশ্যই নিবারণ করব।
“বছর খানেক আগে যখন এই গ্রীন গ্যালাক্সি নির্মাণ শেষ হল, লোকজন সবে থাকতে শুরু করেছে, তখন হঠাৎ একটা চিঠি এল আমার কাছে। চিঠিটা কে পাঠিয়েছে, কোত্থেকে এসেছে কিছুই লেখা নেই। তিন কূলে আমার কেউ নেই, প্রাইমারি স্কুলে বিজ্ঞানের মাস্টারি করে অবসর নিয়েছি কয়েক বছর আগে। এই সোসাইটির ভেতরে একটা ঘর আর কেয়ার-টেকারের দায়িত্ব নিয়ে বাকিটা জীবন দিব্যি কেটে যাবে ভেবেছিলাম। আমাকে কে চিঠি পাঠাবে?
“খাম খুলে দেখলাম একটা সাদা কাগজের উপর বাংলায় টাইপ করে আমার নামে লেখা চিঠি। চিঠিতে প্রেরকের নাম পরিচয় কিছু নেই, তবে আমার সম্পর্কে বেশ খোঁজখবর রাখেন বলে মনে হল। মাস্টারি জীবনে ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞানের প্রদর্শনী করানোর সময় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার অভ্যাস শুরু হয়েছিল। তাই আমার উপর একটা গুরু দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই দায়িত্ব নির্বিঘ্নে অতি গোপনীয়তার সঙ্গে যদি পালন করতে পারি তাহলে তাঁদের এই গবেষণা সফল হবে।”
“তাঁদের! কাদের?” হট চকোলেটে চুমুক দিতে দিতে চোখ বড়ো বড়ো করে প্রশ্ন করলাম বৃদ্ধকে।
বৃদ্ধ মৃদু হেসে ঘরের জানালা দিয়ে বাইরের আকাশের দিকে ইশারা করে দেখালেন। জানালার বাইরে কালো আকাশ ছাড়া আর কিছু দেখতে পেলাম না। বৃদ্ধ আবার বলতে শুরু করলেন, “চিঠি আসার কয়েকদিন পর একটা বড়ো পার্সেল এল আমার কাছে। পার্সেলের ভেতরে অদ্ভুত সব যন্ত্রপাতি, এই যন্ত্রপাতি সম্পর্কে আগে কোনোদিন শুনিনি, দেখিওনি। সঙ্গে একটা একশো পাতার ম্যানুয়াল বুক। সেই বই পড়ে পড়ে যন্ত্রপাতিগুলোকে জোড়া দিলাম। জোড়া দিয়ে যেটা দাঁড়াল সেটা দেখতে এরকম।”
কথাটা বলেই বৃদ্ধ সোফার পেছনে রাখা লম্বা জিনিসটার ওপর থেকে সিল্কের ঢাকাটা সরিয়ে দিলেন। এতক্ষণ খেয়াল করিনি এটা। পেছন ফিরে দেখি সেই অন্ধকারে দেখা লাফিয়ে লাফিয়ে চলা কালো জোব্বা পরা লম্বা মানুষটা যে ডাস্টবিন থেকে খাবার চুরি করছিল। আমি ভয়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, “এটা কী?”
“এটা প্লাস্টিকখেকো যন্ত্র।”
“অ্যাঁ!”
“হ্যাঁ, এখনও ট্রায়ালে আছে। একে আরও উন্নত করার জন্য বিস্তর গবেষণা চলছে। আর একে চালনা করার দায়িত্ব আমার। এ যদি ঠিকঠাক কাজ করতে পারে তাহলে পৃথিবী থেকে যত প্লাস্টিক আবর্জনা আছে তা কয়েকদিনের মধ্যেই সরিয়ে ফেলা সম্ভব হবে।”
আমি লম্বা যন্ত্রটার কাছে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম। হুডির আড়ালে ধাতব যন্ত্রাংশের কাঠামো, ঠিক মানুষের মতোই। না, মানুষ নয়, সিনেমায় দেখা রোবটের মতোই। মাথার ওপর জ্বল জ্বল করছে কুচকুচে কালো দুটো চোখ, পিঠের সঙ্গে লেগে আছে একটা সোলার প্যানেল। ওটা দিয়ে নিশ্চয়ই সূর্যের আলোয় চার্জ নেয় যন্ত্রটা। বললাম, “আপনি এই যন্ত্রটার কথা সবাইকে জানাচ্ছেন না কেন? জানালে তো এরকম আরও যন্ত্র তৈরি করা সম্ভব।”
বৃদ্ধ বললেন, “যন্ত্রটা আমার বানানো নয়, আমি শুধু জুড়ে দিয়েছি। যারা ওটা পাঠিয়েছে, সময় হলে তারাই এসে নিয়ে যাবে। আর এই যন্ত্র সম্পর্কে পৃথিবীর মানুষ জানলে আর রক্ষা নেই। মানুষ নিজের স্বার্থে সুন্দর পৃথিবীর উপর অত্যাচার করেছে। এই যন্ত্র পেলে বিক্রি করে একদল মানুষ শুধু মুনাফা লুঠতেই ব্যস্ত হয়ে পড়বে। তাছাড়া, এটার মালিক আমার উপর নজর রাখছে প্রতিনিয়ত।”
“নজর রাখছে? কীভাবে?”
“বৃদ্ধ জানালার পর্দা সরিয়ে পিটুনিয়ার ঝোপের দিকে দেখালেন। বললেন, “ঐ ফুলগুলো দেখেছ? ওগুলো সত্যি কোনও ফুলগাছ নয়। এক একটা র‍্যাডার। ওগুলোর মাধ্যমে এই গ্রীন গ্যালাক্সির সমস্ত খবর প্রতিনিয়ত ওদের কাছে চলে যায়।”
পিটুনিয়াগুলোকে দেখে আমার আগেই সন্দেহ হয়েছিল। ওগুলো দিনের বেলায় রঙিন আর রাতে সাদা কালো হয়ে যায়, নিশ্চয়ই সূর্যের আলোর প্রভাবে। বললাম, “এই সোসাইটির যে উদ্ভট সব নিয়ম, এগুলো আপনার বানানো?”
বৃদ্ধ হেসে মাথা নাড়লেন। বললেন, “হ্যাঁ, সোসাইটির ভেতরে কোনও যানবাহন রাখা নিষিদ্ধ, কারণ পেট্রোলের গন্ধে আর লাল নীল উজ্জ্বল রঙের প্রতিফলনে র‍্যাডারগুলো কর্মক্ষমতা হারায়। ঠিক সেই কারণেই উজ্জ্বল রঙের পোশাকও এই সোসাইটিতে নিষিদ্ধ। যন্ত্রটা দিনের একটা বিশেষ সময়ে সূর্যের আলোয় শক্তি সঞ্চয় করে, তাই পিটুনিয়া বাগানের পেছনে আমার ঘরের এদিকে সকলের আসা বন্ধ করতেই জরিমানার ব্যবস্থা করেছি। জরিমানা না দিতে হলে কোনও নিয়মকে মানুষ নিয়ম বলে পাত্তা দেয় না। রাত বারোটা থেকে তিনটের মধ্যে সোসাইটির সব ক’টা ডাস্টবিনের প্লাস্টিক সংগ্রহ করে ওটা আবার আমার কাছে ফিরে আসেতাই ঐ সময়টা বাগানে কারও বেরোনোও নিষেধ।”
“এই নিয়মগুলো ট্রাস্টের লোকেরা মেনে নিল?”
“আমি বলেছি পেট্রোলের গন্ধ, উজ্জ্বল রঙ, জোর শব্দ এসবে আমার অসুবিধে হয়। বাগানে এদিক ওদিক পড়ে থাকা আবর্জনাও পরিবেশ বান্ধব সোসাইটিতে বেমানান। আর আমার অনুমতি ছাড়া আমার বাড়ির আশেপাশে কেউ ঘুরঘুর করবে এটা আমি বরদাস্ত করব না। তাছাড়া জরিমানার বেশ মোটা অঙ্কের টাকা ওদের খাতায় জমা পড়ে বলে জোরালো কোনও আপত্তি কেউ করেনি।”
“হুম, বুঝলাম।” মগের হট চকোলেট শেষ হয়েছিল অনেকক্ষণআমি মগটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে বললাম, “আমাকে এত কথা যে বললেন, আমি যদি এগুলো কাউকে বলে দিই?”
বৃদ্ধ এবার রহস্যময় হাসি হাসলেন। বললেন, “পার্সেলে আরও একটা জিনিস এসেছিল, সুস্বাদু হট চকোলেট।”
ঠিক তখনই পুরো ঘরটা আমার সামনে দুলতে শুরু করল। মনে হল আমার শরীর পালকের মতো হালকা হয়ে গেছে, আমি যেন আকাশের গায়ে উড়ে বেড়াচ্ছি। আকাশের রং উজ্জ্বল জলপাই সবুজ, দূরে একটা ঝাপসা নরম আলো, আর চারদিকে সেসামে সীডের মতো ছড়িয়ে আছে নক্ষত্র

*                   *                   *

পরের দিন সকালে যখন চোখ খুললাম ঘড়িতে তখন সকাল দশটা। মাথা আর শরীর বেশ ভারী হয়ে আছে। দিনটা রবিবার, তাই অফিস যাওয়ার তাড়া নেই। কিন্তু শরীর এত ভারী হয়ে আছে কেন বুঝতে পারলাম না। রাতে কখন ঘুমিয়েছি? শুধু মনে আছে ডাস্টবিনে আবর্জনা ফেলে ঘরের দিকে ফিরছিলাম। তারপর ঠিক কী হয়েছিল আমার মনে নেই। উঠতে গিয়ে সাইড টেবিলের ওপর রাখা সাদা খামটা দেখতে পেলাম। এতে কী আছে? খামটা খুলে দেখলাম। ভেতরে লেখা আছে -

মিস লাহিড়ী,
আপনি এই এক সপ্তাহের মধ্যে বেশ কয়েকটি নিয়মভঙ্গ করেছেন। কিন্তু প্রথমবার বলে প্রত্যেকটি জরিমানা মকুব করা হল। আপনার কাছে রাখা নিয়মাবলি আরও একবার ভালোভাবে পড়তে অনুরোধ করা হচ্ছে। আশা করি দ্বিতীয়বার আপনাকে এটা মনে করিয়ে দিতে হবে না।
গ্রীন গ্যালাক্সি সোসাইটি ট্রাস্ট

মনে পড়ল, সেদিন কালো জ্যাকেট পরে বেরোতে ভুলে গিয়েছিলাম, আর পিটুনিয়া বাগানের দিকে গিয়েছিলাম হয়তোগিয়েছিলাম কি? ধুর! কিছুই মনে নেই। মাথাটা ভার হয়ে আছে। এক মগ কড়া কফি নাহলে মাথার জটগুলো খুলবে না।
কফির মগ হাতে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালাম। নিচে সুন্দর রঙবেরঙের পিটুনিয়া ফুটে আছে। পেছনেই ঘাসের জমির ওপারে একটা ঘর। ঘরের সামনে একটা আরাম কেদারায় খবরের কাগজ হাতে একজন বৃদ্ধ বসে আছেনমাথা উশকোখুশকো কাঁচা-পাকা চুল, সাদা ধবধবে দাড়ি। কেন জানি না মনে হল এই লোকটার নাম শশধর, পদবী মনে পড়ছে না। কোথাও কি দেখেছি একে? হবে হয়তোসোসাইটির ভেতরেই দেখেছি, মনে পড়ছে না।
_____
ছবিঃ সুমিত রায়

গল্পের ম্যাজিক:: স্বর্ণ কলম - দীপিকা মজুমদার


স্বর্ণ কলম
দীপিকা মজুমদার

দিনের বেলায় তবুও ঠিক আছে, কিন্তু রাত হলেই ট্রেনে চড়ার মজাটা নেতিয়ে যায় কুট্টুসেরপর্দার আড়াল সরিয়ে বাইরের চলন্ত দৃশ্য দেখা, ছোটো ছোটো স্টেশন এলে ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাক ট্রেন জার্নির একটা আলাদা আমেজ এনে দেয়। প্লেনে যাতায়াত করলে সময় বাঁচে ঠিকই, কিন্তু ট্রেন জার্নির মতো মজাটা আসলে হয় না। কিন্তু ঐ দিনেই, রাতটা ট্রেনে বড্ড বোরিং।
পুজোর ছুটিতে এবার কোথাও যাওয়ার প্ল্যান ছিল না কুট্টুসদের বাবার অফিসে ছুটি নেই, মা-ও স্কুল থেকে এক বাণ্ডিল খাতা নিয়ে এসেছে। তবে ডিসেম্বরে মণিমাসির বিয়ের ব্যাপারটা না থাকলে একটা না একটা ছোটো ট্রিপ হতই এবছর ব্যতিক্রম। কিন্তু মহালয়ার আগে হঠাৎ করেই ছোটকাই এসে বলল, “কুট্টুস, রাজস্থান যাবি?” কুট্টুস কি আর না করতে পারে? সোনার কেল্লা, হাওয়ামহল, মরুভূমি দেখার ওর কতদিনের শখ।
হঠাৎ করেই প্ল্যান, প্লেনের বদলে ট্রেনের টিকিট। সমস্যা হল, টিকিটগুলো এক কামরায় হলেও এক জায়গায় পাওয়া গেল না এই যা। কিন্তু তাতে কি আর ঘোরার মজাটা কমে যায়! স্কুলে ছুটি পড়ার আগে দিনগুলো বেশ মজায় কাটছিল কুট্টুসের। কিন্তু শেষদিনই যত গোলমাল হয়ে গেলকেন যে ও সোহমকে চ্যালেঞ্জ করে বলতে গিয়েছিল, “আমার একটা সোনার কলম আছে।” ব্যস। বলে তো ফেলেছ। এবার সেটা না দেখাতে পারলে কুট্টুসের ইজ্জত থাকবে না। দেখিয়েও ছিল কুট্টুস। সোনার কলম ঠিক নয়, ঝরনা কলমের সোনার নিবদাদু দিয়েছিল বাবাকে, পরে ওটা কুট্টুসেরই হবে। কিন্তু এখন ওটা কুট্টুসের নাগালে থাকে না, মায়ের গয়নার বাক্সে রাখাস্কুল যাওয়ার তাড়ায় চাবির গোছাটা আলমারিতে ঝুলিয়েই মা স্নান করতে চলে গিয়েছিল। সেই সুযোগে লকার খুলে সোনার নিবটা বের করে নেয় কুট্টুস। একদিনের তো ব্যাপার! সোহমকে দেখিয়েই ফিরে এসে আবার সুযোগ বুঝে লকারে চালান করে দেবে।
গোলমালটা হল গেমস পিরিয়ডের পর। ক্লাস-রুমে ব্যাগ রেখে সবাই মাঠে গিয়েছিল। ক্লাস শেষে কুট্টুস ফিরে এসে দেখে সব ঠিক আছে, শুধু ওর কলমের সোনার নিবটাই নেই। সোহম ছাড়াও অনেকেই দেখেছিল কুট্টুসের সোনার কলম। কে যে এমন করল কুট্টুস ভেবে পায় না। মাকে বলতে পারেনি কুট্টুস, বাবাকেও না। দুটো দিন আর বাকি ছিল ট্রেনে চড়ার। পুরোনো নিবটাই কলমের সঙ্গে জুড়ে পকেটে রেখে দেয় কুট্টুস। বেড়াতে গিয়ে তো বাবা-মায়ের মনটা খুশি খুশি থাকবে, তখনই না হয় সত্যি কথাটা বলার সুযোগ নেবে সেবাইরে গিয়ে বেশি বকাবকিও করতে পারবে না কেউ, আবার ফিরে আসার পর রাগ এমনিতেই পড়ে যাবে। তাই কলমটাও সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছে।
ট্রেনে চড়ার পর থেকেই বেশ ভদ্র আচরণ করছে কুট্টুস। এটা সেটা খাওয়ার বায়না করেনি, জানালার ধারে বসতেও চায়নি। প্রিন্সদাদার পাশে ভালো ছেলের মতো বসে আছে কুট্টুস। তবে মনে মনে ফন্দি আঁটছে, কথাটা বাবা-মাকে কখন জানানো যায়। মা, বাবা, ছোটকাই আর কাকিমা এই কামরাতেই দুটো ক্যুপ আগে সিট পেয়েছে। কুট্টুস আর প্রিন্সদাদা পরের ক্যুপে লোয়ার আর মিডল বার্থে। আগের দিন রাতে যখন হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়ল, কুট্টুসের তখন খেয়াল ছিল না এখন তো পৌঁছাতেও বেশি সময় বাকি নেই। এদিকে রাত নামতেই প্রিন্সদাদাও একটা পুজোবার্ষিকী নিয়ে বসে পড়েছে, দাদাটা একটা পাক্কা বইপোকা। মা, বাবা, ছোটকাই, কাকিরা গল্পে মশগুল। কী যে বোরিং লাগছে কুট্টুসের! তার উপর আবার ঐ সত্যি কথাটা বলার ঝামেলা। সিটের ওপর পা তুলে বসে ছিল কুট্টুস।
ওদের উলটোদিকের বার্থে একজন বয়স্ক লোক বসে ছিলেনগতকাল ভোরের দিকে যখন সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন, তখনই ট্রেনে চড়েন লোকটা। কোন স্টেশন ছিল জানা নেই, তবে কুট্টুস দেখেছিল ট্রেনে চড়েই চাদর ঢাকা দিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন বৃদ্ধসকালে সেই একভাবে জানালার ধারে বসে আছেনমাঝে মাঝে কাঁধের ঝোলাটা হাতড়ে কীসব দেখছেন, আবার রেখে দিচ্ছেনসকাল থেকে বৃদ্ধকে একটাও কথা বলতে দেখেনি কুট্টুস। বেশ লম্বাচওড়া স্বাস্থ্যবান বৃদ্ধ, বয়স ষাট বা তার বেশিমাথার একটা চুলও আর কালো নেই। চামড়ার রঙ রোদে পুড়ে তামাটে, নাহলে বেশ বোঝা যায় বৃদ্ধর গায়ের রঙ ফর্সা কুট্টুস যখন নিব হারানোর ঘটনাটা ওর প্রিয় বন্ধু তীর্থকে ফোনে জানাচ্ছিল, তখন মাঝে মাঝেই বৃদ্ধর সঙ্গে কুট্টুসের চোখাচোখি হচ্ছিল, মনে হল ওর কথাটা উনি শুনেছেনতখনই দেখেছে কুট্টুস, বৃদ্ধর চোখের মণি নীলচে ধূসর, যা সাধারণত ভারতীয়দের মধ্যে বিরল।
যখন থেকে প্রিন্সদাদা পত্রিকাটা খুলে বসেছে তখন থেকে বৃদ্ধর নজর পত্রিকার উপরে ঘোরাফেরা করছে। কুট্টুস একবার পত্রিকার প্রচ্ছদটা দেখল, মা দুর্গার ছবির উপরে লেখক-লেখিকাদের নামআর বড়ো বড়ো হলুদ অক্ষরে লেখা আছে ‘স্যার আইজাক নিউটনের ভ্রান্ত বিজ্ঞান সাধনা।’ লোকটার নজর ঐ লেখাটার উপরেই ঘুরছে।
কুট্টুসের খেয়াল ছিল না, প্রিন্সদাদা কখন যেন পত্রিকাটা সিটের ওপর নামিয়ে উঠে গেছে, বৃদ্ধ সেই সুযোগে পত্রিকাটা হাতে তুলে নিয়েছেনকেমন লোক রে বাবা, কুট্টুসকে একবার জিজ্ঞেস করারও প্রয়োজন মনে করলেন না!
কুট্টুসকে ফ্যালফ্যাল করে ওঁর দিকে চেয়ে থাকতে দেখে ভুলটা বুঝতে পারেন বৃদ্ধ। পত্রিকাটা বন্ধ করে সিটের উপর রাখতে গিয়ে কুট্টুসের দিকে চেয়ে হেসে বলেন, “আজকাল কত ভ্রান্ত ধারণার উপর ভিত্তি করে পত্রিকায় লেখালেখি হয়। লোকে এসব পড়ে আর সত্যি ভাবে।” তারপর খানিক থেমে বলেন, “না বলে তুলে নিয়েছিলাম ওটা। সরি। আসলে স্যার আইজ্যাক নিউটনের নামটা দেখে পড়ার ইচ্ছা হচ্ছিল অনেকক্ষণ থেকে
“কী ভ্রান্ত ধারণা?” কুট্টুস বিস্ময়ে প্রশ্ন করে বৃদ্ধকে।
“এই যে অধিরসায়ন, মানে অ্যালকেমি। এটা নাকি ভ্রান্ত বিষয়। একজন বিজ্ঞানী জীবনের চল্লিশটা বছর যে বিষয় নিয়ে সাধনা করে গেলেন আজ আধুনিক বিজ্ঞানীদের মতে সেটা ভ্রান্ত!”
কুট্টুস কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। স্যার আইজ্যাক নিউটনের নাম সে জানে, আপেল গাছের তলায় বসে আপেল মাটিতে পড়ার ঘটনা দেখেই যিনি মাধ্যাকর্ষণ সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু এই অধিরসায়নটা কী বস্তু? ভাগ্যিস প্রিন্সদাদা টয়লেট থেকে ফিরে এসে হালটা ধরল, না হলে কুট্টুস তো মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিল না। বৃদ্ধের কথা শুনে প্রিন্স বলল, “ভ্রান্তই তো। স্পর্শের দ্বারা একটা ধাতুকে সোনায় পরিবর্তন করা সম্ভব? ওগুলো স্রেফ বুজরুকি ছাড়া কিছুই নয়
বৃদ্ধ স্মিত হেসে বললেন, “তোমার সত্যি মনে হয় যিনি মাধ্যাকর্ষণ সূত্রের মতো অসাধারণ কিছু সৃষ্টি করতে পারেন, তিনি জীবনের চল্লিশটা বছর একটা বুজরুকির পেছনে ছুটে জীবন শেষ করে দেবেন? আর্টিকেলটা আমি পড়লাম। ওখানে শুধু স্যার আইজ্যাক নিউটনের অধিরসায়ন সাধনা সম্পর্কে লেখা আছে। শুধু নিউটনের জীবন দিয়ে অধিরসায়নকে বোঝা সম্ভব নয়।”
“আপনি জানেন?” সিটের ওপর পা তুলে বসে প্রিন্স। ক্লাসে বরাবর প্রথম হওয়া ছাত্র সে মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক দুটো বড়ো পরীক্ষাতেই নব্বই শতাংশ নম্বর পেয়েছে সে। পাঠ্য বইয়ের বাইরেও যথেষ্ট জ্ঞান রাখে কুট্টুসের প্রিন্সদাদা। যেমন তেমন ব্যাপার নয়, একেবারে হবু কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারবাবুর পাল্লায় পড়েছেন তিনি। কুট্টুস ভাবল, প্রিন্সদাদা এত সহজে ছেড়ে দেবার পাত্র নয়।
“কিছু কিছু জানি,” পা নামিয়ে সোজা হয়ে বসলেন বৃদ্ধ। বললেন, “অ্যালকেমি শব্দটার উৎপত্তি আল-কিমিয়া নামক আরবি শব্দ থেকে। আর এই বিদ্যার উৎপত্তি প্রায় ১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিশরে। মিশর থেকেই এই বিদ্যা ক্রমশ ইতালি, ফ্রান্স, গ্রীস ইত্যাদি দেশে ছড়িয়ে পড়েমারিয়া নামের এক ইহুদি নারীই প্রথম অ্যালকেমিস্ট ছিলেন বলে মনে করা হয়। তিনি সোনা বানাতে পারতেন। অ্যালকেমির ইতিহাস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ঘাঁটলে ডেমোক্রিটাস, জাবির ইবনে হাইয়ান, অ্যালবারটাস ম্যাগনাস, সেন্ট থমাস অ্যাকিনাস প্রভৃতি অ্যালকেমিস্টদের নাম উঠে আসে। তবে অ্যালকেমিস্ট হিসেবে একজনের নাম না নিলে এই প্রসঙ্গ-চর্চা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাঁর নাম বলতে পারবে?”
প্রিন্স আর কুট্টুস মুখ চাওয়াচাওয়ি করে দু’জনে। ওদেরকে দেখে বৃদ্ধ যেন মজা পেলেন। বললেন, “নিকোলাস ফ্লামেল। কিছু মনে পড়েছে ইয়ং বয়?” বৃদ্ধর দৃষ্টি সোজা কুট্টুসের দিকে।
নিকোলাস ফ্লামেল! নামটা খুব চেনা লাগছে কুট্টুসের। কিন্তু মনে পড়ছে না।
প্রিন্স বলল, “হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য সসার্স স্টোন-এর নিকোলাস ফ্লামেল? যিনি ফিলোজফার্স স্টোন বানিয়েছিলেন?”
“একদম তাই। তিনি কিন্তু কোনও কাল্পনিক চরিত্র নন। তিনি সত্যিই ছিলেন এবং অকাট্য প্রমাণ না পাওয়া গেলেও ধারণা করা হয়, তিনি ফিলোজফার্স স্টোন বা পরশমণি বানাতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর সেটা একমাত্র সম্ভব হয়েছিল অধিরসায়ন চর্চার মাধ্যমেই।”
কুট্টুস দেখল প্রিন্সদাদাও সোজা হয়ে বসেছে, বিষয়টা মনোযোগ আকর্ষণ করার মতোই। ইশ, এতবার সিনেমাটা দেখেছে কুট্টুস, বইটাও পড়েছে, কিন্তু নিকোলাস ফ্লামেল নামটা কেন সে মনে করতে পারল না?
বৃদ্ধ বলে চলেছেন, “নিকোলাস ফ্লামেলের জন্ম আনুমানিক ১৩৩০ সালে, ফ্রান্সের পন্টয়েজে। প্রথম জীবনে নিকোলাস ফ্লামেল সাধারণ একজন বই বিক্রেতা ছিলেন। ব্যাবসার কাজে পুরোনো বই কিনে নিয়েও বিক্রি করতেন। একদিন এক ফেরিওয়ালা এসে কিছু দুষ্প্রাপ্য বই বিক্রি করে গেলেন তাঁর কাছে। সেই বইয়ের মধ্যে থেকেই একটি বই নিকোলাস ফ্লামেলের জীবন বদলে দিয়েছিল। চমৎকার বাঁধাই করা পার্চমেন্ট কাগজের অদ্ভুত বই যার কোনাগুলো ছিল সোনা দিয়ে বাঁধানো। ভেতরে ছিল অদ্ভুত সব চিত্র, তবে বইয়ের ভাষা ছিল প্রাচীন হিব্রু, যা নিকোলাসের দুর্বোধ্য। লেখকের নাম আগেই দেখেছেন, ইহুদি যুবরাজ আব্রাহাম ইলিয়েৎসার। কিছু সংকেত দেখে নিকোলাস বুঝলেন বইটি অ্যালকেমির প্রাচীন পাণ্ডুলিপি।
“এই বই পড়া নিকোলাসের কাছে যেমন অসম্ভব ছিল তেমনি ছিল অধিরসায়ন চর্চাও। সেই সময় অতিপ্রাকৃত বা জাদুবিদ্যা চর্চা ছিল অসামাজিক কাজ। থেমে রইল সেই বই পড়া কিন্তু নিকোলাস হার মানলেন না। প্রায় একুশ বছর পর মায়েস্ত্রো কানশেস নামের স্পেনের এক ইহুদি জাদুবিদ্যা কাব্বালায় পারদর্শীর সন্ধান পেলেন যিনি প্রাচীন ইহুদি ভাষা পড়তে পারতেনসেই ইহুদি জাদুকরকে তৎকালীন ইহুদি বিরোধী ফ্রান্সে নিয়ে আসার জন্যে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করলেন নিকোলাস ফ্লামেল। বৃদ্ধ মারা যাওয়ার আগে বইটার কিছুটা পাঠোদ্ধার করে দিয়ে গিয়েছিলেন। সেই পদ্ধতি অনুসরণ করেই নিকোলাস বাকি বই পাঠোদ্ধার করেন। হাতে কলমে গবেষণার কাজ করে চলেছিলেনআনুমানিক ১৩৭৯ সালে নিকোলাস ০.২৩ পারদকে রুপোয় রূপান্তরিত করেন এবং ১৩৮২ সালে সোনায়।”
“কীভাবে?” কুট্টুসের মুখ হাঁ হয়ে গিয়েছিল। এইভাবে সোনা তৈরি করা যায় নাকি?
“বই পড়ে,” কুট্টুসের দিকে চেয়ে উত্তর দিলেন বৃদ্ধ। তারপর হেসে বললেন, “আসলে ব্যাপারটা এত সহজ ছিল না। অ্যালকেমির দুটো মূল ভাগ। এক, ধাতুকে সোনায় রূপান্তর করার পদ্ধতি আবিষ্কার, যেটাকে ফিলোজোফার্স স্টোন বলি। দুই, ‘এলিক্সির অফ লাইফ’ বা অমৃত-সুধার সন্ধান। অর্থাৎ, ‘লাইফ পোশন’ বা ‘জীবনদায়ি আরক’ সন্ধান।”
“ইম্মর্টালিটি?” প্রিন্স প্রশ্ন করে।
বৃদ্ধ নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সম্মতি জানান। বললেন, “ধারণা করা হয় নিকোলাস একধরনের লালচে গুঁড়ো আবিষ্কার করেছিলেন যার দ্বারা তিনি যে কোনও ধাতুকে সোনায় রূপান্তরিত করতে পারতেন। তিনি শেষের দিকে বেশ ধনীও হয়েছিলেন কিন্তু।”
“সে সব গেল কোথায়? পেটেন্ট নিলেন না?” কুট্টুসের প্রশ্ন।
“তখন কি আর পেটেন্টের প্রচলন ছিল? আর অধিরসায়নের মতো অতিপ্রাকৃত ব্যাপারে চর্চা করাও ছিল অপরাধ। তাই গোপনেই করতে হয়েছিল পুরো ব্যাপারটা। রাজার কান বাঁচিয়ে গবেষণা করতেন নিকোলাস। তবে তিনি বেশ দানশীলও ছিলেন বলে শোনা যায়। দাতব্য চিকিৎসালয়, গরিবদের পুনর্বাসন দেওয়া, চার্চ ইত্যাদি নির্মাণ করেছিলেন ফ্লামেল। একজন সাধারণ বই বিক্রেতা কীভাবে এত খরচা করতে পারেন? এই বিষয়টা তৎকালীন রাজা ষষ্ঠ চার্লসের চোখ এড়ায়নি। কিন্তু চতুর নিকোলাস এ ব্যাপারে সাবধান ছিলেন। অ্যালকেমি নিয়ে প্রচুর বই লিখলেও তাঁর মৃত্যুর পর সেই লাল গুঁড়োর কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। অকাট্য প্রমাণ না থাকায় নিকোলাস ফ্লামেল কিংবদন্তী হয়েই রয়ে গেলেন। তবে অ্যালকেমি চর্চা সেখানেই থেমে থাকেনি, পরে অনেকেই এই বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। মূল ধারার বিজ্ঞানীরা এই বিদ্যাকে কোনওদিনই সুনজরে দেখেননি।”
“শুধু লাল গুঁড়ো আবিষ্কার করার দিকেই ঝুঁকলেন কেন? তিনি যদি অমৃত-সুধা বানাতে পারতেন তাহলে তো আরও বড়ো ব্যাপার হত। তখন তো সব বিজ্ঞানীদেরই ব্যাপারটা মানতে হত।” প্রিন্স জানতে চায়।
প্রিন্সের প্রশ্ন শুনে বৃদ্ধর মনে ঠিক কী পরিবর্তন হল বোঝা গেল না। তিনি ওদের কাছে এসে ঝুঁকে বললেন, “করেননি? আমার তো মনে হয় করেছিলেন।”
কুট্টুস বা প্রিন্স কেউই কোনও প্রশ্ন করতে পারল না। বৃদ্ধ বললেন, “শেষের দিকে বেশিরভাগ সময়ে কবরস্থানে কাটাতেন নিকোলাস ফ্লামেল। তাঁকে কীভাবে কোথায় কবর দেওয়া হবে সব নিজেই নির্বাচন করে গিয়েছিলেন। তাঁর প্রত্যেকটা স্থাপত্যে বিশেষ চিহ্ন খোদাই করা থাকত, যার সম্পূর্ণ অর্থ আজও কেউ উদ্ধার করতে পারেনি। তিনি মারা গেলেন ২২শে মার্চ, ১৪১৮ সালে। নিভৃতে, খুব স্বল্প লোকের মাঝে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হল। বহুবছর ধরে তাঁর লিখিত বই, দলিল, খোদিত চিহ্নগুলোর উপরে গবেষণা চালানো হল, এমনকি তাঁর বাড়িও তন্নতন্ন করে তল্লাশি চালানো হল। না উদ্ধার হল তেমন কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য, না পাওয়া গেল কোনও লাল গুঁড়ো। তাঁর মৃত্যুর প্রায় দু’শো বছর পর ডাকাতের দল তাঁর কবরে হানা দেয়। কিন্তু সেই কবর ছিল সম্পূর্ণ ফাঁকা। আসলে মনে করা হয় নিকোলাস ফ্লামেল কোনওদিন মারা যাননি, অথবা যদি মারা গিয়েও থাকেন তাহলে তাঁর কবর অন্য কোথাও আছে।”
প্রিন্স এবার হেসে বলে, “ও! আর তাই ধারণা করা হচ্ছে যে নিকোলাস ফ্লামেল এলিক্সির অফ লাইফ বানাতে সক্ষম হয়েছিলেন, তিনি আজও সেই অমৃত-সুধা পান করে বেঁচে আছেন?”
“হতেও তো পারে। বেঁচে থাকলেই বা কী? কেউ চিনবে কীভাবে?”
কুট্টুস দেখল ওর প্রিন্সদাদা বেশ বিরক্ত হয়েছে নিকোলাস ফ্লামেলের বেঁচে থাকার তত্ত্বটা মোটেই বিশ্বাস করেনি। কুট্টুসেরও মনে হয় না এতদিন একজন মানুষ বেঁচে থাকতে পারে। পারলে সে নিজের আবিষ্কার সবার সামনে আনবে না?
বৃদ্ধ চুপ করে ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। প্রিন্স কুট্টুসকে বলল, “আমি ওদিকে যাচ্ছি, খাওয়ার সময় হয়ে গেল” কথাটা বলেই প্রিন্স সিট ছেড়ে উঠে চলে গেল
কুট্টুসও চলেই যাচ্ছিল, সিটের উপর পত্রিকাটা দেখে বৃদ্ধকে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, সেই যুবরাজ আব্রাহামের বইটার কী হল? পাওয়া গিয়েছিল?”
বৃদ্ধ নিঃশব্দে মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, “নাহ্‌! পাওয়া যায়নি। শোনা গিয়েছিল, নিকোলাস তাঁর ভাগ্নে পেরিয়ারকে সেই বই দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু পেরিয়ারের কোনও খোঁজ ইতিহাস দিতে পারে না।”

রাত তখন ক’টা বাজে জানা নেই। কামরা অন্ধকার করে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে সবাই। নিকোলাস ফ্লামেল, লাল গুঁড়ো, জীবন-সুধা সব ভুলে কুট্টুস আবার নিজের সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছে। সোনার নিবটা হারিয়েছে সে, কেউ চুরি করে নিয়েছে। কথাটা কীভাবে মা-বাবাকে জানাবে সে? আপার বার্থে উঠে কলমটা হাতে ধরে শুয়ে ছিল কুট্টুস, ট্রেনের দুলুনিতে কখন চোখ লেগে গেছে। হঠাৎ ট্রেনের গতি ধীরে হয়ে আসায় ঘুমটা ভেঙে গেল কুট্টুসের। ওর ঠিক নিচের লোয়ার বার্থেই প্রিন্সদাদা ঘুমিয়ে। প্রিন্সদাদার সামনের লোয়ারে সেই বৃদ্ধর সিট। তবে বৃদ্ধ এখন সিটে নেই, মনে হয় টয়লেটে গিয়েছেন। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে হলদে আলো এসে সিটের উপরে পড়ছে, নিশ্চয়ই কোনও স্টেশনে ঢুকছে ট্রেন।
আপার বার্থ থেকে ধীরে ধীরে নেমে আসে কুট্টুসএকটু হালকা হওয়া দরকার ওর। ঘুম ঘুম চোখে এগিয়ে যায় টয়লেটের দিকে। দরজার কাছে গিয়েই দেখে সেই বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন, কাঁধে ঝোলা। কুট্টুসকে দেখে বললেন, “ঐ পত্রিকায় একটা খবর কিন্তু ভুল আছে। স্যার আইজ্যাক নিউটন কিন্তু শেষ বয়সে পাগল হয়ে যাননি। তাঁর সহকারী জন লক নামের একজন অ্যালকেমিস্ট তাঁকে বিবাহের জন্য চাপ দিতে শুরু করেন, সেই কারণে তিনি পাগলামির অভিনয় করেছিলেন মাত্র।”
ট্রেন গতি কমিয়ে একটা ছোটো স্টেশনে থেমেছে। কথাগুলো শেষ করেই বৃদ্ধ ট্রেন থেকে প্লাটফর্মে নেমে ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এগোতে থাকলেন। ছোটো অনামী স্টেশন, মিনিট দুয়েকও দাঁড়ায় না ট্রেন এখানে। কুট্টুস চলন্ত ট্রেন থেকে বৃদ্ধের চলে যাওয়া দেখছিল।
“কী দেখছিস? পড়ে যাবি তো! ভেতরে আয়।” হঠাৎ প্রিন্সদাদার গলার আওয়াজে সম্বিৎ ফেরে কুট্টুসের।
ইশ, সেই লাল গুঁড়ো যদি আজ থাকত ওর কাছে... বাবার শক্ত হাতের চড় কল্পনা করেই মুখ শুকিয়ে যায় কুট্টুসের।
টয়লেট থেকে ফিরে এসে নিজের বার্থে উঠে বসে কুট্টুসবালিশটা টেনে মাথার কাছে আনতে হাত লাগে ওর ঝরনা কলমে। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। কেন যে ও সোনার নিবটা স্কুলে নিয়ে গেল সেদিন! কলমের ঢাকনিটা সরিয়েই অবাক হয় কুট্টুসএ কী! নিবটা এমন চকচকে সোনালি হল কীভাবে? এই নিবটা তো সাদাটে রঙের ছিল।
মোবাইলের টর্চের আলো জ্বালে কুট্টুস। কলমের নিবটা সোনার, হুবহু আগেরটার মতো ঝলমল করছে সোনা রঙ। শিরদাঁড়া দিয়ে একটা স্রোত বয়ে যায় কুট্টুসের। বার্থ থেকে তড়িঘড়ি নামতে গিয়েই বালিশের তলায় রাখা চিরকুটটার উপর নজর পড়ে। ভাঁজ খুলে দেখে স্পষ্ট বাংলায় লেখা আছে, ‘লাল গুঁড়ো কিন্তু সত্যিই আছে।’
বিস্ময়ে কথা ফোটে না কুট্টুসের মুখে।
প্রিন্সও ফিরে এসেছে কুট্টুসের কাছে। খাপ খোলা কলম হাতে ভেবলে যাওয়া কুট্টুসকে দেখে এগিয়ে আসে প্রিন্সবলে, “এ কী! এটা সোনার নিবটা না? তুই এটা সঙ্গে নিয়ে এসেছিস? জেঠু-জেঠিমা জানে?”
কুট্টুসের চোখে মুখে আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে তখন। কলমটার ঢাকনা বন্ধ করে পকেটে চালান করে দেয় কুট্টুস। গায়ে চাদরটা ঢাকা দিতে গিয়ে বলে, “প্রিন্সদাদা, লাল গুঁড়ো কিন্তু সত্যি আছে রে।”

*                           *                          *

কুয়াশার আস্তরণ ভেদ করে ধীর পায়ে রিকশা স্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে গেলেন সতীনাথ বক্সি। শরৎকালের মাঝামাঝি এই সময়টায় রাতের দিকে হিম পড়ে বেশ ঠাণ্ডা থাকে রাজস্থানের পাথুরে অঞ্চল। দিনের আলো ফোটার আগেই এই গ্রামের ভৈরবদেও নামের এক পুরোনো গুনিনের বাড়িতে পৌঁছাতে হবে তাঁকে। এই গুনিনই বলতে পারবেন সেই মুসলিম ফকির বাবাকে কোথায় পাওয়া যাবেগুনিন জানিয়েছিলেন, বিকানেরের দিকে কোন গ্রামে থাকেন সেই ফকির বাবা। লোকে বলে ফকিরের বয়স পাঁচশো বছরেরও বেশি, দেখলে মনে হয় চল্লিশ-পঞ্চাশ মাত্র। ফকির বাবা আরব, ইরান, মিশর ঘুরে এসে এই থর মরুভূমিতে থিতু হয়েছেন। তবে দেখতে গেলে বয়েস তো সতীনাথেরও কম হল না। ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের সময়েই সতীনাথ স্কুলপড়ুয়া। বঙ্গভঙ্গ, দেশভাগ, গান্ধীজির হত্যা, ক্ষমতা বদল, একাত্তরের যুদ্ধ এসব তো নিজের চোখে দেখা। বাবা ব্রিটিশ, মা ভারতীয়। খাঁটি বাঙালি না হলেও অবিভক্ত বাংলায় জন্ম সতীনাথের। বংশপরম্পরায় পাওয়া একটা অর্ধসমাপ্ত বই সতীনাথের জীবনটা বদলে দিয়েছিল শৈশবেই। তাঁর বাবা বলেছিলেন, ফ্রান্সের রাজা ত্রয়োদশ লুই-এর দরবারে দুবো নামের একজন লোক এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেই লোক নাকি লালচে গুঁড়োর সংস্পর্শে সীসার বলকে সোনায় রূপান্তর করে দেখিয়েছিলেন। রাজা খোঁজ নিয়ে জেনেছিলেন দুবো একজন দাগী আসামী। তারপর বাকি জীবনটা তাঁর কারাগারেই কেটেছিল দুবোর সেই কারাবাসের সময় কোনো কারারক্ষীকে তিনি লাল গুঁড়ো বানানোর পদ্ধতি বলে দিয়ে যান সেই গুঁড়ো তিনি বানিয়েছিলেন পেরিয়ার নামক এক লোকের কাছ থেকে পাওয়া একটি বইয়ের কয়েকটা ছেঁড়া পৃষ্ঠা দেখে
সতীনাথের বাবার পূর্বপুরুষই ছিলেন ফ্রান্সের সেই কারারক্ষী। বিদ্যাটি অর্জন করার পর তিনি ফ্রান্স ছেড়ে চলে আসেন ইংল্যান্ডে। তিনি লাল গুঁড়ো বানাতে পারেননি ঠিকই, তবে দুবোর বলে দেওয়া পদ্ধতির পুঙ্খানুপুঙ্খ একটি বিবরণ লিখে যান। সেই বিবরণই হাতে পেয়ে কাজ শুরু করেছিলেন সতীনাথ। অধিরসায়ন নিয়ে আরও নানারকম বই পড়ে আরও উন্নত মানের লাল গুঁড়ো বানাতে পেরেছিলেন, যা শুধু সীসাকেই নয়, বরং যে কোনও ধাতু এমনকি সংকর ধাতুকেও স্পর্শের মাধ্যমে সোনায় রূপান্তর করতে পারে। এই পদার্থটির ভর সোনার চেয়ে বেশি। এরপর তিনি থেমে থাকেননি, খোঁজ চালিয়ে গিয়েছেন ‘এলিক্সির অফ লাইফ’ নামক জীবন-সুধার। কিছুটা সক্ষম তিনি হয়েছেন অবশ্য। নাহলে এই দেড়শো বছরের উপরের বয়স অবধি আজ কয়জন বেঁচে থাকে? তাঁর আবিষ্কৃত আরক শুধু মানুষের শরীরের রোগ নিরাময়ে সক্ষম, বয়স কমিয়ে তরতাজা যুবক বা যুবতী বানানো সেই আরক দ্বারা সম্ভব নয়।
সতীনাথ শুধু আধিরসায়ন চর্চাই করেননি। এই বিষয় নিয়ে কে কোথায় গবেষণা করছেন পাশাপাশি তার খোঁজও করে চলেছিলেন বহুদিন ধরে। আর খোঁজ করতে করতেই এই ভৈরবদেও গুনিনের কাছে ফকির বাবার খবর পান। সত্যি যদি এই ফকির বাবার বয়স পাঁচশো বছরের বেশি হয়ে থাকে তাহলে সতীনাথের অভিজ্ঞ চোখে ধরা পড়বেই।
একজন রিকশাওয়ালাকে ভৈরবদেও গুনিনের বাড়ির ঠিকানা বলে দিয়ে সিটের উপর সোজা হয়ে বসলেন সতীনাথ। ব্যাগের ভেতরে হাত চালান করে দেখলেন লাল গুঁড়োর কৌটোটা ঠিক আছে কি না। গুঁড়োর স্পর্শে সোনায় রূপান্তরিত জিনিসগুলো শুধু ভেলকি দেখাতেই নয়, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে উপঢৌকনের কাজেও লাগে। ঠিক যেমন একটু আগে ছোটো ছেলেটার কলমের নিবটা সোনায় রূপান্তরিত করে এসেছেন সতীনাথ।
_____
ছবিঃ লেখক

গল্পের ম্যাজিক:: আসিরগড়ের চিরঞ্জীবী - দীপিকা মজুমদার


আসিরগড়ের চিরঞ্জীবী
দীপিকা মজুমদার

।। ।।

ইন্দোর থেকে গাড়িতে যখন রওনা হলাম তখনও ঠিক আন্দাজ করতে পারিনি এতটা সময় লেগে যাবে বুরহানপুর পৌঁছোতে। গুগলে সার্চ করে দেখেছিলাম চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টার পথ। কিন্তু আমাদের সময় লাগল প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা। অবশ্য এর পেছনে একটা কারণ আছে, শুরু থেকেই অনিমেষ গাড়িটা একটু ধীরেই চালাচ্ছিল।
ইন্দোরের মূল শহর ছাড়িয়ে দু-একটা মফঃস্বল আর গ্রাম পেরিয়ে এলে বাকি রাস্তাটা প্রায় নির্জন। সময়টাও বর্ষাকাল, আশেপাশের জঙ্গল থেকে সবুজের বাহার রাস্তায় উপচে পড়ছেআবহাওয়া অনুযায়ী আগামি দু-তিনদিন বৃষ্টির সম্ভাবনা তেমন নেই, আকাশও মেঘমুক্ত। সপ্তাহান্তের দুটো দিন ছুটিটা একটু অন্যরকম ভাবে কাটাব বলে বদরউদ্দিন সাহেবের পরামর্শে আমরা দু’জন বুরহানপুর চলে এলাম। আমি আর অনিমেষ জন্মসূত্রে পশ্চিমবঙ্গের আর কর্মসূত্রে ইন্দোরে, যদিও আমাদের পরিচয় চাকরিক্ষেত্রে আসার পর। দু’জনে দুটো আলাদা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পাশ করে এক সঙ্গে এক ফার্মে। দু’জনেই বাঙালি বলেই পরিচয়টা প্রথমদিনেই, তারপর বন্ধুত্ব গাঢ় হলে দু’জনে একটা দু’কামরার বাড়ি ভাড়া নিয়ে মেস থেকে উঠে আসি। তারপর থেকেই সপ্তাহের শেষের ছুটির দুটোদিন কোথাও না কোথাও বেরিয়ে পড়ি। তবে এতটা দূরে এর আগে কোনোদিন আসা হয়নি। বদরউদ্দিন সাহেবের গল্পে অনুপ্রাণিত হয়েই দু’জনে এই ঝুঁকিটা নিয়ে নিই।
বদরউদ্দিন সাহেব হলেন আমাদের বাড়ির মালিক। একতলায় নিজের পরিবার নিয়ে থাকেন হাসি খুশি নির্বিবাদী মানুষটা। ভিন্ন ধর্মের লোক হয়েও আমাদের নিজের বাড়িতে ভাড়া দিয়েছিলেন। ভীষণ মনখোলা মানুষ, মাঝে মাঝে সন্ধেবেলায় আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দোতলায় উঠে আসেন। ওঁর জীবনের নানারকম বিচিত্র অভিজ্ঞতার ঝুলি উপুড় করে দেন।
ইন্দোরে আসার পর থেকে আশেপাশের দর্শনীয় স্থানগুলো আমি আর অনিমেষ মোটামুটি ঘুরে ফেলেছিলাম। আমরা এখন খুঁজছিলাম নতুন কোনও জায়গা। আমাদের ইচ্ছাটা জানার পর বদরউদ্দিন সাহেবই বললেন, “একটা জায়গা আছে, একটু দূরে, কিন্তু অসাধারণ একটা থ্রিল পাবে।”
আমার অনিমেষের মধ্যে এই একটা বিষয়ে খুব মিল আছে, যে কোনও বিষয়েই আমাদের থ্রিল চাই, তা সে কোনও সিনেমা দেখাই হোক অথবা বই পড়া। অনিমেষ বলে উঠল, “দূর হোক, জায়গায় থ্রিল থাকলে আমি অফিস কাটিয়েও যেতে পারি।”
তখনই বদরউদ্দিন সাহেব বুরহানপুরের আসিরগড় কেল্লার কথা বললেন। অনিমেষ আর আমি ইন্টারনেট ঘেঁটে এর ইতিহাস ছবি সম্পর্কে যা জানলাম তাতে আমাদের ভেতরে থ্রিলটা তখনই শুরু হয়ে যায়।
আয়োজন যা করার অনিমেষই করেছিল, বদরউদ্দিন সাহেবের গাড়িটাও একদিনের জন্য কী ভাবে যেন ব্যবস্থা করে নিলশুক্রবার অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে যাবতীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে একটু তাড়াতাড়িই ডিনার করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তবুও পরের দিন সকালে বেরোতে দেরি হয়ে গেলশেষমুহূর্তে আরও কিছু জিনিস ব্যাগে নেওয়ার বাকি ছিল অনিমেষের।
স্টিয়ারিং থেকে হাত সরিয়ে মোবাইলটা হাতে তুলে একবার দেখল অনিমেষ, “সাড়ে তিনটে বাজে। গুগল ম্যাপ অনুযায়ী আমরা বুরহানপুর এলাকায় ঢুকে পড়েছি কিন্তু রাস্তায় একটাও লোকের দেখা নেই কেন বল তো?”
আমি গাড়ির জানলা দিয়ে দেখলাম, সত্যিই তেমন একটা লোক দেখা যাচ্ছে না রাস্তায়। মাঝে মাঝে দু’একটা গাড়ি হুশ করে বেরিয়ে যাচ্ছে। আশেপাশের পরিবেশ বেশ মনোমুগ্ধকর, একপাশে সবুজ বনবীথি, অন্যপাশে সাতপুরা পর্বতমালার গিরিশ্রেণী মাথা তুলে দিনের শেষ সূর্যালোককে স্যালুট জানাচ্ছে। মনে মনে বললাম, অপূর্ব!
কিছুটা এগিয়ে যেতেই রাস্তার ধারে একটা ছোট্ট চায়ের গুমটি দেখা গেলঅনিমেষকে বললাম, “ওই দোকানিকে একবার জিজ্ঞেস করাই যায়। লোকটা সম্ভবত বুরহানপুরেরই হবে।”
অনিমেষ গাড়িটা ধীরে রাস্তার ধারে থামিয়ে জানালার কাচ নামিয়ে গলা উঁচিয়ে প্রশ্ন করল, “চাচা, বুরহানপুর জানা হ্যায়, কিতনা দূর হ্যায়?”
বৃদ্ধ দোকানি আমাদের দিকে একবার চোখ তুলে তাকিয়ে যেমন কাজ করছিলেন আবার তেমনই কাজে মন দিলেন“আশ্চর্য তো! রাস্তাই তো জিজ্ঞেস করেছি। ওর দোকানে ফ্রিতে চা খেতে চেয়েছি কি?” অনিমেষ অধৈর্য হয়ে পড়ে।
গাড়ি থেকে দু’জনেই নেমে যাই দোকানের সামনে। অনিমেষকে থামিয়ে আমি বলি, “চাচা, বুরহানপুরকা রাস্তা ইয়ে হি হ্যায় না?”
এবার বৃদ্ধ আমার দিকে সরাসরি তাকালেনমাথায় একটা ছাপা সুতির কাপড়ের পাগড়ি, গায়ে সাদা ফতুয়া আর খাটো ধুতি। হাত তুলে বললেন, “বুরহানপুরমে কিসকে ঘর জানা হ্যায়? রাস্তা তো ইয়ে হি হ্যায়।”
লোকটার বলার মধ্যে কেমন যেন সন্দেহের ভাব।
আমি বললাম, “জানা তো আসিরগড় হ্যায়...”
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই বৃদ্ধর মুখে একটা হাসির রেখা দেখা দিলবললেন, “পতা হ্যায় সাহাব, ইহা সব উস কিলামে জানে কে লিয়েই আতে হ্যায়।” তারপর খানিক থেমে বললেন, “সিধে রস্তে সে চলে যাইয়ে বুরহানপুর, আজ রাত হোটেল মে রুকিয়ে, সুবাহ কিলা দেখ লেনা সাহাব।”
এবার অনিমেষ ঝাঁঝ নিয়ে বলল, “কিউ? রাত কো কিলে মে ভূত তাণ্ডব করতা হ্যায় কেয়া?”
বৃদ্ধ বললেন, “ভূত? না সাহাব, আসিরগড় কিলা পবিত্তর জাগা হ্যায়, ওয়াহা ভূত-বুত নেই আতা। পর শাম হোনে কে বাদ কোই ইনসান ভি নেহি যাতা।”
অনিমেষের যে রাগ হচ্ছিল সেটা বেশ ভালোই বুঝতে পারছিলাম। এমনিতেই ভূত-প্রেতের অস্তিত্বে ওর বিশ্বাস নেই, পাক্কা যুক্তিবাদী। ওকে বললাম, “তুই গাড়িতে যা, আমি দেখছি।”
অনিমেষকে গাড়িতে যেতে বলে আমি দোকানিকে বললাম, “চাচা, রাত কো কিলে মে ঠেহেরনা হ্যায়। পানি কা বটল মিলে গা?”
আমার কথাটা শুনে বৃদ্ধ ডান হাতের তর্জনী তুলে বললেন, “পছতাওগে সাহাব।”
আমি চার বোতল জল কিনে টাকা মিটিয়ে গাড়িতে এসে বসলাম। গাড়ি এগিয়ে যাওয়ার সময় বাঁ দিকে রিয়ার ভিউ মিররে দেখলাম বৃদ্ধ দোকান ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এসে দু’হাত মাথার কাছে ঠেকিয়ে প্রার্থনা করার ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছেন। ব্যাপারটা আমার ঠিক ভালো লাগল না, অনিমেষকে বললাম, “কেল্লায় ফটোগ্রাফি করাটাই তো তোর উদ্দেশ্য। কাল ভোরের দিকে গেলেই হয়, আজ না হয় বুরহানপুরের অন্যান্য জায়গাগুলো ঘুরে দেখি।”
অনিমেষ দাঁত বার করে হেসে বলল, “এই জন্যে বাঙালির বদনাম, জানিস তো। এসেছি থ্রিল করতে। আর পাঁচটা পর্যটকের মতো এলে তো মধ্যপ্রদেশের অন্য জায়গাগুলোও দেখতে যেতে পারতাম।”
আমি জানি অনিমেষকে বারণ করা বিফলে যাবে, এই ক’দিন ওর সঙ্গে থেকে বুঝেছি যে কোনও ব্যাপারে জেদ জিনিসটা আমার চেয়ে ওর অনেক বেশি।
আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে অনিমেষ বলল, “চিন্তা করিস না। ভূত যদি থাকেও আজ তারও নিস্তার নেই। সব ব্যবস্থা আছে।” তারপর পেছনের সিটে রাখা বড়ো কালো ব্যাকপ্যাকটার দিকে ইশারা করলআমার মনে আছে আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ও বাজারে গিয়ে ব্যাগ ভর্তি করে কিছু জিনিস নিয়ে আসে। ব্যাগে কী আছে জিজ্ঞেস করাতে বলেছিল, “এখন খুলে দেখানোর সময় নেই।”
কী এমন জিনিস থাকতে পারে ওই ব্যাগে!

।। ।।

“আসা আহির নামের এক জমিদার পঞ্চদশ শতকে বুরহানপুরে এই কেল্লা স্থাপন করেন। তাঁর নামানুসারে এই কেল্লার নাম হয় আসিরগড় কেল্লা। এরপর খান্দেশের নবাব নাসির খান আসা আহিরকে পরাজিত করে কেল্লার দখল নিলেন আসিরগড় কেল্লায় প্রবেশ করা নাসির খানের পক্ষে সহজ ছিল না। শোনা যায়, নাসির খান আসা আহিরকে পত্র পাঠান যে, তিনি খবর পেয়েছেন সম্রাট আকবর খান্দেশ জয় করার জন্য রওনা হয়েছেন। তাই খান্দেশের নারীদের আসিরগড় কেল্লায় সুরক্ষিত রাখার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। খান্দেশের নারীদের জন্যে আসিরগড় কেল্লার দরজা খুলে দিলেন আসা আহির। কিন্তু সেদিন নারীদের পোশাকের আড়ালে আসলে নাসির খান তাঁর সৈন্যদের পাঠিয়েছিলেন।
“এরপর নাসির খানের উত্তরপুরুষ মিরন বাহাদুর ১৫৯৬ থেকে ১৬০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে নিজেকে মুঘলদের থেকে স্বাধীন ঘোষণা করেন এবং সম্রাট আকবর ও তাঁর তৃতীয় পুত্র দানিয়েলকে কেল্লায় প্রবেশ করতে বাধা দেন।
“প্রায় ১৫৯৯ সাল নাগাদ সম্রাট আকবর তাঁর সৈন্য নিয়ে বুরহানপুর দখল করেন এবং ধীরে ধীরে আধিপত্য বিস্তার করেতে সক্ষম হন এবং ১৬০১ সালের ১৭ই জানুয়ারি আসিরগড় কেল্লা অধিকার করেন।
কয়েকশো শতাব্দী পর দ্বিতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের সময় ১৮ই অক্টোবর ১৮০৩ ব্রিটিশ সেনা আসিরগড় কেল্লার পাট্টা নেয়। এই যুদ্ধে দু’জন ইংরেজ সেনা নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছিলেন, মৃত ইংরেজ সেনাদের সমাধি কেল্লার ছাদে অবস্থিত।
“কেল্লার গঠনশৈলী মূলত মুঘল শিল্পকলা দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও এতে ইসলাম, পার্সি, তুর্কি ও ভারতীয় শিল্পরীতির মিশ্রণ দেখা যায়। কেল্লাটি প্রধানত তিনটি স্তরে গঠিত। একদম নীচে ভূগর্ভের স্তরের নাম হল কমলগড়, দ্বিতীয় মালাইগড় এবং তৃতীয় ও সর্বোচ্চ হল আসিরগড়। কেল্লার ভেতরে একটি পুকুর দেখা যায় যার তিনদিক পাথর দ্বারা বাঁধানো ও একদিকে বিস্তৃত ঢালু জমি যেখান দিয়ে বৃষ্টির জল অনায়াসে পুকুরে এসে গড়িয়ে যায় শোনা যায় এই পুকুর কোনোদিন শুকিয়ে যায় না।”
ভিডিও ক্যামেরাটা চালু করে অনর্গল বকে গেল অনিমেষ। ওর পেছনে বিশালাকার সুউচ্চ আসিরগড় কেল্লার মাথা দেখা যাচ্ছে। অদ্ভুত ব্যাপার হল কেল্লার মাথার উপরে ঘাস ও বড়ো বড়ো বৃক্ষ ডালপালা বিস্তার করে আছে।
গাড়ি থেকে আমাদের দু’দুটো ভারি ব্যাকপ্যাক আর জলের বোতল নিয়ে কেল্লায় ওঠার পাথুরে পথ দিয়ে এগিয়ে চলেছিলাম। পুরো রাস্তাটা শুট করবে বলে অনিমেষ ভিডিও ক্যাম চালু রেখেছে। কিছুটা সোজা পথ হাঁটার পরেই এবড়োখেবড়ো পাথুরে পথ ক্রমশ চড়াই। কিছুটা এগিয়ে যেতেই কেল্লার ভাঙা দরজা দেখা গেলঅনিমেষ হাত দিয়ে দরজাটা সরিয়ে দিতেই ঘুঘুটে অন্ধকারে প্রবেশ করলাম আমরা। চলার সময় পায়ের নীচে খেয়াল রাখতে হচ্ছিল বেশি, একে তো ছোটো বড়ো পাথর ছড়িয়ে আছে রাস্তায়, তার ওপর বর্ষাকাল। ভূত না হয়, সাপের কামড়েই নির্জন জায়গায় বেঘোরে প্রাণ দিতে হবে।
কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পরই দেখলাম একটা খাড়া সিঁড়ি সোজা উঠে গেছে ছাদের দিকে। পড়ন্ত সূর্যের কমলা আলো কেল্লার ঘুলঘুলি দিয়ে সিঁড়ির উপরে এসে বৃত্তাকার আলপনা তৈরি করেছিল। মনে হল আমি যেন সেই সম্রাট আকবর অথবা নাসির খানের সময় পঞ্চদশ শতকে পৌঁছে গিয়েছি।
খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই খোলা ছাদে উঠে এলাম আমরা। অনিমেষ ভিডিও ক্যামটা বন্ধ করে একটা ছোটো গর্তের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, “এটা কী বল তো?”
আমি কাছে গিয়ে দেখলাম চৌকো একটা বাঁধানো ছিদ্র কেল্লার ছাদে, ঠিক যেন রাস্তার উপরে খোলা ম্যানহোল। আমাকে কিছু বলতে দেওয়ার আগেই অনিমেষ বলল, “কেল্লার ভূগর্ভস্থ কক্ষগুলোতে আলো পৌঁছানোর ব্যবস্থা।”
পুরো ছাদটাই ঘাসে ঢাকা, এদিক ওদিক বড়ো বড়ো গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। আমার মনে হল কোনও কেল্লা নয়, যেন টেবিল টপ মাউন্টেনের উপরে উঠে এসেছি। পাল্লা দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস যেন আরও শিহরণ তুলছিলসত্যি অসাধারণ একটা পরিবেশ। মনে মনে বদরউদ্দিন সাহেবকে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারলাম না।
হঠা অনিমেষকে ইতস্তত এদিক ওদিক হাঁটাহাঁটি করতে দেখলাম, কিছু যেন খুঁজছে। আমি বললাম, “কী হল? কী খুঁজছিস?”
আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে অনিমেষ যেন নিজেকেই বলল, “এই তো। এটাই হবে।”
ব্যাপারটা দেখার জন্য কাছে এগিয়ে যেতেই দেখি ও আবার ভিডিও ক্যাম অন করেছে। বলল, “কেল্লার ছাদে অবস্থিত এই শিবমন্দিরের নাম হল গুপ্তেশ্বর মন্দির। আসা আহির এই মন্দির স্থাপন করেন। এরপর কেল্লায় মুসলিম অধিপত্য স্থাপন হলে একটা মসজিদ বানানো হয়, ইংরেজরা আসার পর এখানে চার্চও বানিয়েছিল। কিন্তু সে সব সম্ভবত নীচের দিকে আছে, নীচের ঘরগুলোর ভগ্নস্তূপে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ।”
সূর্যাস্ত হয়ে আসছিল। আমরা কেল্লার ছাদেই থাকব মনস্থির করলাম। অনিমেষ ওর বিশাল ব্যাগ থেকে একটা ক্যানভাসের তাঁবু বার করে টাঙ্গাতে লাগলযদিও এই খোলা হাওয়াই আমার বেশ ভালো লাগছিল, তবুও বৃষ্টি হলে এই তাঁবুই ভরসা।

।। ।।

কেল্লার ছাদের উপরে গুপ্তেশ্বর মহাদেব মন্দিরের সামনের চাতালেই আমাদের তাঁবু খাটানো হয়েছিল। কেল্লার মাথা থেকে আশেপাশের জঙ্গল ও পাহাড়ের গায়ের সূর্যাস্ত দেখা এক অনন্য সাধারণ অভিজ্ঞতা। ধীরে ধীরে অন্ধকার যত গাঢ় হতে লাগল ততোই যেন আশেপাশের পরিবেশ নিস্তব্ধ হতে শুরু করেছে, তবুও প্রকৃতির এই নিস্তব্ধতার মধ্যেও যেন অদ্ভুত একটা শব্দ আছে।
রাত ঘন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের তীব্রতা একটু কমেছে, আমরাও তাঁবুর ভেতরে জিনিসপত্র রেখে বাইরে দুটো মোমবাতির আলো নিয়ে বসে আছি। আমাদের মোবাইল দুটো এতক্ষণ ছবি তোলার কাজে সাহায্য করেছে, কিন্তু খেয়ালই হয়নি কখন যেন নেটওয়ার্ক চলে গিয়েছে। সাধারণত এসব ঘন জঙ্গল এলাকায় নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। আমি অনিমেষকে অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছিলাম। সূর্যাস্তের পর থেকে কেমন যেন চুপ করে আছে, হাতের মোবাইল নিয়ে নাড়াচাড়া করে চলেছে। বললাম, “কী রে, কী ভাবছিস?”
“উম! কিছু না, ছবিগুলো দেখছিলাম,” সংক্ষেপে জবাব দিল অনিমেষ।
বললাম, “কফি বানাব? খাবি একটু?”
আমার প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে অনিমেষ বলল, “আচ্ছা মহাভারতের গল্পগুলো সম্পর্কে তোর কী ধারণা?”
এখন মহাভারতের প্রসঙ্গ কী কারণে আমার ঠিক বোধগম্য হল না। বললাম, “মহাভারত? তুই এখন মহাভারত নিয়ে ভাবছিস?”
অনিমেষ দূরে একটা পাহাড়ের দিকে তাকিয়েছিল। সেদিকে তাকিয়েই বলল, “এই যে সাতপুরা রেঞ্জ দেখছিস, এর আশেপাশের জঙ্গল এলাকা মহাভারতে উল্লিখিত খাণ্ডব বনের একাংশ।”
বললাম, “হ্যাঁ, সে এককালে নিশ্চয়ই ছিল হয়তো।”
অনিমেষ বলল, “মহাভারতে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষের গল্পটা জানিস তো?”
মহাভারত সম্পর্কে কোনও বিস্তারিত ধারণা না থাকলেও গল্পগুলো মোটামুটি আমার জানা ছিল। মহাভারত কোনও একটা গল্প নয়, অনেক ঘটনাবলীর সমষ্টি। অনিমেষকে বললাম, “ঠিক কী বলতে চাইছিস সেটা বল তো?”
“গুরু দ্রোণাচার্য কৌরব এবং পান্ডবদের অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা দিয়েছিলেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় হস্তিনাপুর রাজ্যের প্রতি নিষ্ঠাবান হবার কারণে দ্রোণাচার্য কৌরবদের পক্ষে এবং পান্ডবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।
“পান্ডব সেনারা দ্রোণাচার্য ও অশ্বত্থামা অর্থাৎ পিতা এবং পুত্রের দ্বারা বারংবার বিধ্বস্ত অবস্থায় পৌঁছে অত্যন্ত নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন এবং তাই দেখে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দ্রোণাচার্যকে বধ করবার জন্য একটি কৌশল গ্রহণ করেন।
“ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির কখনোই মিথ্যা কথা বলতেন না এবং তাঁর সত্যনিষ্ঠা সম্পর্কে সকলেই অবহিত ছিলেন। অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে তাঁকে ব্যবহার করে, কৌশলগতভাবে দ্রোণাচার্যকে শ্রীকৃষ্ণের সহায়তায় পাণ্ডবরা বধ করেন। দ্রোণাচার্য ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে অশ্বত্থামার মৃত্যুর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে যুধিষ্ঠির জবাব দেন ‘অশ্বত্থামা হত ইতি গজ’ অর্থাৎ ‘অশ্বত্থামা মারা গেছেন কিন্তু তা নর নাকি হস্তী তা জানা নেই’ এই খবর শুনে দ্রোণাচার্য অস্ত্রত্যাগ করে কিংকর্তব্যবিমুঢ় অবস্থায় যুদ্ধভূমিতে বসে পড়েন এবং সেই অবসরে পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের পুত্র ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁকে হত্যা করেন।
“পিতার এই মৃত্যু সংবাদ অশ্বত্থামাকে অত্যন্ত বিচলিত করে। পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবার জন্য অশ্বত্থামা সকল পাণ্ডব পুত্রদের হত্যা করেন এবং উত্তরার গর্ভে প্রতিপালিত হওয়া অভিমন্যুর পুত্র পরীক্ষিকে হত্যার জন্য ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করেনভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং পরীক্ষিৎকে রক্ষা করেন। শাস্তিস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ অশ্বত্থামার শিরস্থিত মণি তুলে ফেলে তাকে তেজহীন করে দেন এবং তাঁকে অমরত্বের অভিশাপ দেন।”
এই অবধি বলে অনিমেষ থামল।
আমি বললাম, “হ্যাঁ, এই গল্পটা আমার জানা। কেন কী হয়েছে?”
এবার অনিমেষ আমার দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বলল, “আসিরগড় আসার আগে বদরউদ্দিন সাহেব আমাকে আসিরগড় সম্পর্কে আরও একটা তথ্য দিয়েছিলেন যেটা তোকে আমি জানাইনি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা অভিশপ্ত হয়ে অশ্বত্থামা পাঁচ হাজার বছর ধরে মৃত্যু রহিত অবস্থায় অমর হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এরকম মনে করা হয় যে, এই বুরহানপুরের আসিরগড় কেল্লার গুপ্তেশ্বর শিব মন্দিরে রোজ ভোরবেলায় সবার অলক্ষে দিনের সর্বপ্রথম পুজো করতে আসেন অশ্বত্থামা। স্থানীয় লোকজনের মতানুসারে কখনও কখনও নিজের মাথায় শ্রীকৃষ্ণকৃত ঘায়ের যন্ত্রণার উপশম করার জন্য এবং রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য তিনি স্থানীয় লোকেদের থেকে হলুদ আর তেল চেয়ে থাকেন। গ্রামের বৃদ্ধ ব্যক্তিরা এই কথা মানেন যে যারা অশ্বত্থামাকে একবার দেখে তারা মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে যায়
এবার অনিমেষের কথায় আমি না হেসে পারি না।
“ও, এই জন্য তুই সেই থেকে চুপ করে বসে আছিস। তোর মনে হয় এত বছর পর অশ্বত্থামা বেঁচে আছে আর এখানে আসবে মন্দিরে পুজো দিতে, আর তুই অশ্বত্থামার ছবি তুলবি। তাই তো? আরে তোর মতো যুক্তিবাদী ছেলে যে এইসব ভড়ং বিশ্বাস করবে আমি জানতাম না সত্যি।”
অনিমেষ আমতা আমতা করে বলল, “না, প্রথমে বিশ্বাস আমিও করিনি, আর সেই কারণেই আসিরগড় আসার জেদটা ছিল। কিন্তু...” সামান্য থেমে অনিমেষ আবার বলল, “বিকেলে যখন মন্দিরের ভেতরে গেলাম তখন স্পষ্ট দেখেছিলাম শিবলিঙ্গের চারপাশে টাটকা ফুল ছড়ানো। তুই ভাব, এই নির্জন জায়গায় টাটকা ফুল দিয়ে কে পুজো করে যাবে?”
আমি বললাম, “বুরহানপুর এখান থেকে মাত্র মিনিট কুড়ির রাস্তা। আর তাছাড়া ভুলে যাস না, সকালের দিকে কিন্তু অনেক পর্যটক আসে। জায়গাটা নির্জন হলেও একেবারেই যে কেউ আসে না তা নয়। দেখছিস না, আশেপাশের দেওয়ালগুলোয় কেমন নিজেদের নাম খোদাই করে গেছে, এদিক ওদিক প্লাস্টিকের বোতল ফেলে রেখে গেছে। ওদের মধ্যেই কেউ ফুল দিয়ে গেছে।”
“তুই মন্দিরের ভেতরে ফুলগুলো একবার দেখে আয়। ওইরকম ফুলের গাছ এই জঙ্গলে তো দূর আমি জন্মেও কোথাও দেখিনি,” অনিমেষ জোর গলায় বলল।
ওর কথা রাখার জন্য একটা মোমবাতি হাতে নিয়ে ঢুকলাম মন্দিরের গর্ভগৃহে। অপ্রশস্ত মন্দিরের ঠিক মাঝখানেই কালো পাথরের শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত, শিবলিঙ্গ ঘিরে ছড়িয়ে আছে নানারকম রঙের ফুল ও বেলপাতা। এরকম ফুল সত্যি আমিও কোনোদিন দেখিনি, কিন্তু অবাক হলাম না। জঙ্গলের সব গাছগাছালি যে চিনব তা তো নয়। সেরকমই কোনও নাম না জানা ফুল দিয়ে কেউ হয়তো সকালে পুজো দিয়ে গেছে।
মন্দির থেকে বাইরে এসে বললাম, “তাহলে ওই রাস্তার ধারের দোকানি এই কারণেই রাতে থাকতে বারণ করছিল আমাদের। কী বলিস?”
“হুম তাই হবে।” অনিমেষকে অন্যমনস্ক মনে হল।
অনিমেষকে বেশ সাহসী বলেই জানতাম। এরকম একটা উড়ো কথায় যে ও বিশ্বাস করবে আমি ভাবিনি। ওর কাঁধে হাত রেখে বললাম, “পাঁচ হাজার বছর ধরে কোনও মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না।”
এবার ও একটু চঞ্চল হয়ে উঠে বলল, “একজ্যাক্টলি। আমিও তাই বলেছিলাম বদরউদ্দিন সাহেবকে। আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে নিশ্চয়ই ভয় দেখানোর জন্য মানুষেই এই কাজ করে, তবে ওঁর ধারণা এই কেল্লায় কোন আত্মার বসবাস। তাই...”
“তাই? তাই কী?”
অনিমেষ ওর ব্যাকপ্যাক থেকে একটা বাক্স বার করে এনে দেখাল। বলল, “বদরউদ্দিন সাহেব দিয়েছেন। এই যন্ত্রটার সাহায্যে লাল আর সবুজ আলোর মাধ্যমে কোনও আত্মার উপস্থিতি চিহ্নিত করা যাবে। সবুজ জ্বললে ঠিক আছে, কিন্তু লাল জ্বললে ধরে নিতে হবে আশেপাশেই কোনও আত্মা উপস্থিত আছে।”
“আর তুই এসব বিশ্বাস করে নিয়ে এলি? আমি জাস্ট ভাবতে পারছি না।”
“নিতে চাইনি। বদরউদ্দিন সাহেব দিলেন। তবে ওই ফুলগুলো দেখে...” অনিমেষকে কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগে।
দু’হাত দিয়ে ওর কাঁধ ঝাঁকিয়ে দিয়ে বললাম, “শোন জঙ্গলের মাঝে এত বড়ো একটা কেল্লার অস্তিত্বকে লোকচক্ষুর আড়াল থেকে বাঁচাতে হয়তো গ্রামবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে এই গল্প ফেঁদেছে। মানুষ মাত্রই মরণশীল। আর মহাভারতের ঘটনাগুলো আমার সবসময় আংশিক সত্য বলে মনে হয়। যা কিছু অলৌকিক বর্ণনা আছে তার কোনও সঠিক ব্যখ্যাই হয় না বুঝলি।” কথাগুলো অনিমেষকে বললাম বটে। কিন্তু ওর এই অর্ধেক বিশ্বাস ও সংশয়কে দূর করতে পারলাম না বলে এই অদ্ভুত সুন্দর পরিবেশেও মনটা তেতো হয়ে রইল।
রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে অনিমেষ বলল, “তুই চাইলে ঘুমোতে পারিস, আমি কিছুক্ষণ জাগব
আমি অনিমেষের প্রস্তাব শুনে কিছু বললাম না। এমনিতেও আগামীকাল ইন্দোর অবধি আমাকেই ড্রাইভ করতে হবে। দেখলাম তাঁবুর বাইরে ক্যানভাসের চেয়ারটায় পা তুলে বসে আছে অনিমেষ, ওর পাশে রাখা বদরউদ্দিন সাহেবের দেওয়া ভূত চিহ্নিত করার যন্ত্রটায় সবুজ আলো জ্বলছে। মনে মনে বললাম, “ওটা কোনোদিনই লাল হবে না।”
তাঁবুর ভেতরেও যে খুব তাড়াতাড়ি আমার ঘুম এল তা নয়। অচেনা জায়গা আর মশার কামড় খেয়ে এ পাশ ও পাশ করতে করতে একসময় ক্লান্তিতে চোখ লেগে গিয়েছিল। হঠাৎ তাঁবুর বাইরে ভারি কিছু একটা পড়ার শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেবাইরে গিয়ে দেখি অনিমেষ যে চেয়ারটায় বসে ছিল সেটা উলটে পড়ে আছে, পাশে ভূত ধরার যন্ত্রটায় সবুজ আলো জ্বলে আছে তখনও, অনিমেষ কোথাও নেই।
আমি মোবাইলে সময় দেখি, প্রায় সাড়ে চারটে বাজে, আকাশ সামান্য ফরসা হয়েছে। মোবাইলেই টর্চটা জ্বালিয়ে একবার হাঁক দিলাম “অনিমেষ।” কোনোদিকে কোনও সাড়া নেই। আমি কেল্লার ছাদের উলটো দিকের ঘাসজমিটার দিকে পা বাড়ালাম, ওদিকে হয়তো গিয়েছে প্রাতঃকৃত্য সারতে। ছোটোখাটো ঝোপঝাড়ের আড়ালে গিয়ে খুঁজলাম, অনিমেষ কোথাও নেই।
তাঁবুর কাছে ফিরে আসতেই কী মনে হল একবার মন্দিরের ভেতরটা দেখা উচিত। মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করতে গিয়েই চমকে গেলাম। শিবলিঙ্গের পাশে একটা প্রদীপ জ্বলছে, আমার অস্তিত্ব টের পেয়ে একটা বিশালদেহী কালো ছায়া যেন দেওয়ালের দিকে মিশে গেলমেঝেতে অনিমেষ লুটিয়ে পড়ে আছে আর ওর আশেপাশে ছড়িয়ে আছে নাম না জানা ফুল ও বেলপাতা। অনিমেষকে কোনোরকমে তুলে নিয়ে তাঁবুর কাছে এনে ওর চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিলেও ওর যেন ঘোর কাটছিল না। আকাশে ভোরের আলো দেখা দিয়েছে ততক্ষণে, কিন্তু অনিমেষ সেই সামান্য আলোটুকুও সহ্য করতে না পেরে চোখ বুজে ফেলছিল বারবার
কাঁধে ভর দিয়ে অতিকষ্টে তিনতলার সিঁড়ি দিয়ে ওকে নীচে নামিয়ে এনে গাড়িতে বসালাম। গাড়ির চাবি ঘোরাতে যাব, এমন সময় দেখি জঙ্গলের সরু পথ দিয়ে দুজন হেঁটে কেল্লার দিকে আসছে। লোকগুলো কিছুটা এগিয়ে আসতেই আমি একজনকে চিনতে পারলাম, গতকাল রাস্তার ধারে দোকানে দেখা বৃদ্ধ।
ওঁরা এগিয়ে আসতেই আগের দিনের বৃদ্ধ বললেন, “মুঝে পতা থা আজ কিলে মে কুছ না কুছ হোনেওয়ালা হ্যায়। মানা কিয়া থা না আপকো।”
আমি কথা না বাড়িয়ে বৃদ্ধ ও তাঁর সঙ্গীর সহায়তায় অনিমেষকে বুরহানপুরের হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন কোনও ভারি কিছুতে আঘাত লেগে অনিমেষের বাঁ হাত সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেছে। বিকেলের দিকে অনিমেষ কিছুটা ধাতস্থ হলে বলল, “ভোরের দিকে কিছু একটার শব্দ পেয়ে মন্দিরের দিকে গিয়ে দেখি একজন হলুদ কৌপীন পরা সুদর্শন দীর্ঘদেহী সুপুরুষ প্রদীপ জ্বালিয়ে ফুল দিয়ে শিবলিঙ্গের উপাসনা করছেন। আমি দরজার আড়াল থেকে দেখছিলাম, সেই সময় এক দমকা হাওয়া এসে আমার চেয়ার উলটে দেয়। সেই শব্দে আমিও ধরা পড়ে যাই, চোখাচোখি হয় ওঁর সঙ্গে। লোকটির কপালের মধ্যভাগে বিশাল একটা ক্ষত থেকে রক্ত আর পুঁজ ঝরছিল। আমাকে দেখে কাছে এসে দুর্বোধ্য ভাষায় কিছু চাইলেন, আমি ভয়ে পিছিয়ে আসতে গিয়ে টাল সামলাতে না পেরে বাঁ দিকে কাত হয়ে পড়ে যাই। তারপর আর কিছু মনে নেই।”
অনিমেষ যখন কথাগুলো বলছিল তখন সেই বৃদ্ধও উপস্থিত ছিলেন। সব শুনে বললেন, “তেল হলদি মাঙ্গতে হ্যায়।” তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, “বাপ দাদাকে জামানে সে শুনতে আয়ে হ্যায় কে উস মন্দিরকে অন্দর সে এক খুফিয়া রাস্তা হ্যায় যো খাণ্ডভ বনকে সাথ জুড়া হুয়া হ্যায়। হর রাত বারা সে লে কর সুবাহ পাঁচ বজে কে বীচ মে অশ্বত্থামা ইস মন্দিরমে আকে শিভজি যা পূজন করতে হ্যায় মুক্তি কে লিয়ে
অনিমেষ এরপর বহুদিন অবধি চোখে পরিষ্কার দেখতে পেত না। দৃষ্টি ধীরে ধীরে কিছুটা ফিরে এলেও ওর বাঁ হাতটা সম্পূর্ণ প্যারালাইজড হয়ে গিয়েছিল। যেহেতু গুপ্তেশ্বর মন্দিরের গর্ভগৃহ আমি নিজের চোখে দেখেছি তাই বলতে পারি তিনতলার ওপরে অবস্থিত ওই মন্দিরের সঙ্গে লাগোয়া এমন কোনও দরজাই ছিল না যেখান দিয়ে একজন মানুষ বেরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেদিন অনিমেষ বা ওই স্থানীয় বৃদ্ধের মুখে যা শুনেছিলাম সেটা একেবারে অবিশ্বাস করারও কোন অবকাশই আমার ছিল না, কারণ মন্দিরের গায়ে প্রদীপের আলোয় একটা ছায়াকে মিশে যেতে আমিও দেখেছিলাম।
_____
ছবিঃ লেখক