Showing posts with label তন্ময় বিশ্বাস. Show all posts
Showing posts with label তন্ময় বিশ্বাস. Show all posts

গোলটেবিল:: ঝম ঝমঃ শাশ্বত কর :: আলোচনাঃ তন্ময় বিশ্বাস


বইঃ ঝম ঝম
লেখকঃ শাশ্বত কর
প্রকাশকঃ পত্র ভারতী; প্রচ্ছদঃ মৃণাল শীল
আলোচনাঃ তন্ময় বিশ্বাস

এ গল্পের শুরু সে অনেককাল আগে অনেক অনেক আগে যখন সব বড়োরাই ছোটো ছিল, আকাশ এসে মিশত নদীর জলে আর বকরা সুযোগ বুঝে কড়ি দিয়ে যেত গোলাপি নখে? এ গল্প সেই তখনকার
সেই চুপকথার সময় বালিশের ওপর বুক ঠেকিয়ে আজকেরই কেউ এক পা দোলাতে দোলাতে হয়তো পড়েছিল অদ্ভুত এক রূপকথা যে রূপকথায় একেকটা পরতে পরত ঢেকে থাকে পেঁয়াজ খোসার মতো সে গল্পের শুরু থেকেই থাকে চরিত্রদের আনাগোনা নতুন নতুন ক্যারেকটার আসছে তো আসছেই একটা চ্যাপ্টারের সাথে আরেকটার কোনও মিলই নেই মনে হবে লেখক বুঝি আলাদা আলাদা গল্প মিশিয়ে দিয়েছেন উপন্যাসের নাম করে তাই বলে ছেড়ে দিতে কিন্তু পারবেন না আরে বাবা, প্রশ্নের উত্তর তো খোঁজা চাই, নাকি? গল্প বলতে বলতেই কোথাও টুক করে বসিয়ে দিচ্ছেন রহস্য, কিংবা ছাড়ছেন দেদার হাসির ফোয়ারা তখন একটু পড়া থামিয়ে পেট চেপে দুমদাম হাত-পা ছোঁড়া ছাড়া তেমন একটা উপায় থাকে না যদি একটু দীক্ষিত টাইপ পাঠক হন, তবে পড়তে পড়তেই বুঝবেন কথা বলাটাও ঠিক কতটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায় তা নাও যদি বোঝেন, শেষের দিকে এটা তো বুঝবেনই ছড়িয়ে থাকা পুতির মতো আলাদা আলাদা গল্পগুলো, চরিত্রগুলো কেমন সুন্দর লাল-নীল সুতোতে গেঁথে যাচ্ছে!
সেই সময়ই হয়তো কোনও এক সদ্য কিশোর নিজের গ্রামখানাকে বুনে নিয়েছিল অদ্ভুতুড়ে এক রূপকথায় গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপ, সেলুন, ভীতু নাপিত কিংবা বিলের ওপারের সেই ঘরগুলো, যেখানে কোনও কারণ ছাড়াই যাওয়া বারণ এইসব একে একে সেঁধিয়ে যায় তার গল্পে তারপর তো বেড়ে ওঠে ডালপালা, টকাস করে ডানা মেলে পক্ষীরাজ কে জানে, হয়তো কোনও গোপন ডায়েরিতে লেখাও হয়েছিল সে গল্প
কিন্তু তা হলেই বা Antoine-র ছোট্ট রাজপুত্রটি তো সেই কবেই বলে গেছে, যে বড়োরা বড্ড বেশি সংখ্যার ওপর জোর দেয় এই ধর না তুমি গিয়ে বললে, “আমি একটা গল্প লিখেছি
অমনি তোমাকে জিজ্ঞেস করা হবে, “বয়স কত?
তোমার ভাঁড়ারে তো তখন সবে মাত্র সাত! কী আর করা তাই বললে? ব্যস হয়ে গেল
“খাল্লি ডেঁপোমি, যাও পড়তে বস গে
খাতা ঢুকল সিন্দুকে গোমড়া মুখে বছর গেল তাই বলে গল্প কি আর হারিয়ে যায়? যায় না তো? সময়ের সাথে সাথে চারাগাছ হয় মহীরুহ সাত বেড়ে গিয়ে হয় সাতাশ লায়েক সংখ্যা বটে একটা আবার নামে ডায়েরি তারপর কাটাকুটি, কি-বোর্ড, দৌড়াদৌড়ি - তবে না গিয়ে হল গল্পের মতো গল্প?
সেই গল্পতে আবার আছে তোমার মতো কি তোমার ছোটোবেলার মতো একজন আরে, বাবিন গো! চেন? ও কিন্তু ঠিক তোমার মতোই তোমার মতোই মন দিয়ে ডরেমন দেখে, কাগজ মুড়িয়ে ঘুড়ি জোড়ে, গুটিসুটি মেরে বড়োদের আদর খায়, আবার ঢিসুম ঢিসুম করে রোল প্লেও খেলে এই মহারাজা, তো এই ফ্যান্টম মানে সব মিলিয়ে আরেকটা তুমিই আর কি!
তবে সাবধান! শুরু থেকেই কিন্তু গল্প ছুটবে! এই বাবিন, তো এই গগন, তো পরক্ষণেই জটাজুট সমেত কোনও এক সাধুবাবা হুঁ হুঁ এ হল অদ্ভুতুড়ে সিরিজ এ গল্প সবার সবাই নায়ক তারা সবাই রাজা!
আবার অদ্ভুতুড়ে সিরিজ নয়ও আলাদাও আছে এই যেমন ধর কোথাও হুড়মুড়িয়ে কিন্তু স্নিগ্ধভাবে ঢুকে পড়েছে প্রকৃতি তার যেমনি ঠাটবাট, তেমনি মোহময়ী আঁকাজোখা আর প্রকৃতির সাথে কি কবিরা না এসে পারেন? তাও আবার হয়! তাই তো লিখতে লিখতে তারই অজান্তে এসে পড়ে, “লাল, যেন সদ্য পোড়া ইটের হৃদয় সবুজ এমন, যেন সতেরো দিনের স্নিগ্ধ আপেল
আর এই হুট করে ধরা পড়ে গিয়েই যেন কবি, থুড়ি আমাদের বন্ধু লেখক নিজেই যেন নিজেকে ধমকে ওঠেন, “অর্বাচীন, দৃষ্টিহীন!
এগুলো কি লেখকের বুকের ভেতর থেকেই বুড়বুড়ি কাটে? কে জানে! আমরা থোড়াই লেখক! ওসব বোঝাবুঝি চশমাওয়ালা জ্যাঠাদের কাজ আমরা বরং গল্প পড়ি তবে খবরদার, ওই জ্যাঠামি করে আবার লজিক খুঁজতে যেও না যেন অদ্ভুতুড়ে ঘরানায় লজিস্টিক চর্চা মারাত্মক অপরাধ
তবে কখনও কখনও তাল যে কাটে না তা নয় ওই যে একটু আগে বললাম না, সদ্য পোড়া ইটের হৃদয়? এরকমই নরম-সরম মানুষগুলোর ভাবনা মাঝে মাঝে একটু বেশি বেশি করেই ভেসে পড়েছে গল্পে আর কে না জানে কোনও কিছুই বেশি বেশি ভালো নয় সব রান্নারই তো এটা ওটার পরিমাপ থাকে তাই না? এই নুনটা, চিনিটা, ঝালটা, তেমনিই আর কী!
এমনই এক মায়াময় তেল, নুন, মশলার গল্প শুনিয়েছেন শাশ্বত কর গল্পদাদুর ঢঙে বলে যাওয়া চিরপুরাতন, আবার চিরনতুন সেই শিষ্টের পালন দুষ্টের দমনের গল্প সেই দেবতা অসুরেরই এক অন্যরকমের লোকগাথা
লেখকের নিজের কথায়, ‘এ গল্পে মজা আছে, অদ্ভুত আছে, আর সরল মনের নিরালা গ্রাম আছে, গ্রামের সহজ সরল মানুষেরা আছেন, শ্রদ্ধা আছে আর ভালোবাসা আছে অনেকটা
ও, ভালো কথা, টাইম মেশিন আছে কিন্তু আবার ফোর্থ ডাইমেনশনও আছে আরও কত কীই না আছে দুষ্টু লোক আছে, তাদের অদ্ভুত সব যন্ত্র আছে, বিজ্ঞান আছে সুযোগ বুঝে
তার গল্পই বাবু হয়ে বসে কেমন অনায়াস প্রত্যয়ে বলে গেছেন লেখক চোরা টান টানে সেই গল্প অদ্ভুতুড়ে থ্রিলারে যা হয় আর কী! কোথাও আস্ত মানুষই অদৃশ্য করে ফেলছেন চোখের সামনে, তো কোথাও পারমিশন নিয়েই যেন রহস্যটুকু গুছিয়ে রাখছেন পরের চমকের জন্য আবার কোথাও ঘাড় ঘুরিয়ে হালকা চালে এটা ওটা বলে নিতেও ছাড়েননি যাকে আমরা গম্ভীর ভাষায় বলি দর্শন ডেঁপো ছেলেপিলেরা বলে জ্ঞান দেওয়া!
“ইচ্ছের মতো ইচ্ছে করলেই হয়
সত্যি এখন গালে হাত দিয়ে ভাবি, এমন গল্প বলতে তো ইচ্ছেটা থাকা চাই! ইচ্ছের মতো চাই সবাই তো পারে না অমন অলৌকিকপনা ইচ্ছে করতে কতজন পারে হুড়হুড়িয়ে বেড়ে যেতে যেতে বয়সের সংখ্যা বাড়াতে বাড়াতে মনটাকে সেই ছোট্টটি রেখে দিতে? আমি তো ভাই পারিনি
কোথাও মন খুঁজে ফেরে মাস্টার অংশুমানের সাথে একটু আধটু মিল বা কোথাও সেই নবীন গঞ্জের দৈত্যর, রোগা হলে কী হবে ইয়া মোটা, ফরসা তবে কালোটাও বেশ কুচকুচেই, লম্বা কিন্তু বেঁটের দিকেই গড়ন ধরনের প্রায় হুবহু ভাষা
আবার শীর্ষেন্দুর সেই অদ্ভুতুড়ের অদ্ভুত ভাষার টরেটক্কা কোথাও কোথাও অবশ্য গল্প বলা কবেই বা অমন গ্রাফশিট মেনে হয়েছে? তার চলন তো চিরকালই হাটে, মাঠে, আকাশে, নদী ছুঁয়ে ছুটে চলা বরং আপনি বইখানা নামিয়ে দিন বাড়ির ছোটোটির সামনে দেখবেন ডরেমন, কিতরেসুর থেকে অনেক অনেক বেশি রসদ পেয়ে যাবে সে আর পেয়ে গিয়েই চুকুস করে ঠোঁট ছোঁয়াবে আপনার গালে তবে ওই যে বললাম, দিতে হবে না দিয়েই পড়ে না, পড়ে না করে ঘ্যান ঘ্যান করবেন না প্লিজ
তবে আঁকা আর লেখার বিস্তর ফারাক যে! এই জনতা-জনার্দনরা খুদে হলে কী হবে, এরা কিন্তু বেজায় সিরিয়াস যাক গে, যা বই দেখছি, তাতে দ্বিতীয় সংস্করণ বেরলো বলে
_____

গোলটেবিল:: ভয়নিচের অজানা ভাষাঃ অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী :: আলোচনাঃ তন্ময় বিশ্বাস


বইঃ ভয়নিচের অজানা ভাষা ও আরো বারো
লেখকঃ অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
প্রকাশকঃ দেব সাহিত্য কুটির
আলোচনাঃ তন্ময় বিশ্বাস

উইকএন্ডের ছুটিটা বেশ তারিয়ে তারিয়ে নীলে সবুজে মেশানো বইখানা চিবোনো গেল তারপরও আধখানা সময় বেঁচে যাওয়ায় ভাবলুম, এবার একটু জাবর কাটা যেতেই পারে।

১) ভয়নিচের অজানা ভাষাঃ না, বইয়ের নামটাই আবার রিপিট করছি না। এটা বইয়ের প্রথম গল্প, আর আমার মতে এটাই এই বইয়ের সেরা লেখা। গল্পটা এর আগে অনেক অনেক রিভিউ পেয়েছে। তাই নতুন করে কিছু বলব না। এটুকু বলতে পারি, শুধু এই একটা লেখা পড়ার জন্যও বইটা অনায়াসে কিনে ফেলা যায়।

২) আলোছায়াঃ আগেও পড়েছি এবং আবারও পড়লামমুগ্ধতার কি আর সত্যি সত্যিই কোনও শেষ থাকে! যারা ভয়ের গল্প ছাড়াও ভূতের গল্প পড়তে ভালোবাসেন তাদের জন্য রইল এক অসাধারণ গল্প। কে জানে বলা তো যায় না ভয় পেলেও পেতে পারেন।
ওহ্‌, ভালো কথা, এটা এবং এর আগের গল্পে পেইন্টিংয়ের ওপর লেখকের যা কনসেপ্ট দেখলাম তাতে বলতে বাধ্য হচ্ছি, উনি শিল্পী হলে অনেকেরই ভাত মারা যেত। কে বলতে পারে ভবিষ্যতে হয়তো যাবেও সাধু সাবধান!

৩) বাটারফ্লাই এফেক্টঃ মন ভরে যাওয়ার মতো গল্প। এই নিয়ে কিছু বলা মানে গল্পটা মারাত্মকভাবে স্পয়েলড করে ফেলা। শুধু বলি, একা হতে হতে এমন দিনও হয়তো আসবে। হয়তো আসছে।

৪) অ্যাকিনেটপসিয়াঃ নামের ওপর ভিত্তি করেই গল্প। তবে আমার মনে হয়েছে গল্পটাকে আরেকটু খেলালে হয়তো ভালো হত। হালকা দুর্বল লাগল

৫) পরজীবীঃ মিস্টার পাইয়ের দারুণ একটা গল্প। চেনা প্লট হলেও বেশ উপভোগ্য। আশা করি বাকিদেরও ভালো লাগবে।

৬) চড়াইঃ বেশ মিষ্টি গল্প।

৭) মারগাম ক্যাসেলে খানিকক্ষণঃ ভ্রমণকাহিনির মতো করে লেখা। সেভাবে পড়াই ভালো। মন্দ না। তবে এর জায়গায় অন্য কোনও গল্প দিলে ভালো হত।

৮) পাথরের রাস্তায়ঃ আরও একবার অভিজ্ঞানদাকে স্যালুট। গল্পটা নিয়ে নতুন করে আমি আর কিছু বলব না। মানবিকতার কাছে সত্যি সত্যিই সব হেরে যায়স-ব। এমনকি আমরা নিজেরাও।

৯) আগে কোথায় দেখেছিঃ আবারও মানবিকতা। বেশ লাগল পড়তে। দিনের শেষে বালির ওপর কিছু কিছু দাগ তো থাকেই। তাই না?

১০) উলূপীঃ কিছু বলব না। চোখ বন্ধ করে পড়ে ফেলুন।

১১) বিশ্বাসঃ আবারও ফিরে আসা মানবিকতা। মাঝে মাঝে ঠকে যাওয়াও তো ভালো!

১২) একটু অন্যরকমঃ সত্যিই অন্যরকম গল্প। আমার মনে হয় সমস্ত বাচ্চাদের এই গল্পটা পড়ানো উচিত। কোনও কাজকেই যেন তারা ছোটো করে না দেখে।

১৩) ছেলেটা এখনও বন্ধু খোঁজেঃ এই ভয় পাওয়ার ব্যাপারটায় আমার মতে আমি সম্ভবত মেনটালি চ্যালেঞ্জড কিন্তু সেটা বাদ দিলেও ইতিহাস, রহস্যে মেশানো দুর্দান্ত একটা গল্প। শেষপাতে চেটেপুটে খাওয়ার গ্যারান্টি রইল।

সব মিলিয়ে একটা ফিল গুড ব্যাপার আছে বইটায়। দেবাশিস দেবের ইলাস্ট্রেশনের তুলনা আগেও ছিল না, আজও নেই। কিন্তু মাত্র দুটো গল্পে ইলাস্ট্রেশন পেয়ে মনটা ঠিক ভরল না। সেকেণ্ড ইস্যুতে আরও কিছু ছবি যোগ করলে বেশ হয়। আরেকটা যেটা যোগ করলে ভালো হয় সেটা হচ্ছে, প্রথম প্রকাশের স্থান ও কাল।
পুনশ্চঃ কল্পবিজ্ঞান, রহস্যের বাইরেও অভিজ্ঞান রায়চৌধুরীকে জানতে হলে এই বইটা অবশ্যই পড়ুন।
_____

গল্পের ম্যাজিক:: মিথ্যে তুমি দশ পিপীলিকা - তন্ময় বিশ্বাস


মিথ্যে তুমি দশ পিপীলিকা
তন্ময় বিশ্বাস

একটা ছোটখাটো ওয়াচ টাওয়ার। সূর্যদেব তার স্নেহ দিয়ে জড়িয়ে রেখেছেন তাকে। সোনালী আলো গিয়ে উঁকি মারছে টাওয়ারের ওপর। সেখানে গোমড়া মুখ করে বসে আছে বিল্টু। কালার বক্সের লাল রং শেষ। একদম শেষ! সামনে খোলা খাতা। বিল্টুর ক্যানভাসমনের ক্যানভাস। বিশাল মাঠ। পিল পিল করছে লোক। সবুজ রং করা জামা, প্যান্ট, টুপি। হাতে বন্দুক। যুদ্ধ। মিলিটারি। সবার সামনে যে আছে তার হাতে বন্দুক নেই। নেই মিলিটারি পোষাক। তার বদলে অপটু হাতে আঁকা পাজামা পাঞ্জাবি, যেন শান্তির দূত। হাতে একটা তেরঙা ফ্ল্যাগ। এটা বিল্টুর বাবা! ছবিটার অনেক জায়গা সাদা পড়ে আছে। ওখানে বিল্টু লাল রং করতলাল রক্ত।
এই ওয়াচ টাওয়ারটা কবেকার তা বিল্টু জানে না। বাবা বলে, একবার নাকি পৃথিবী জুড়ে ভীষণ যুদ্ধ হয়েছিল। এটা নাকি তখনকার। বিল্টুর বাবাও যুদ্ধ করে। লেফটেন্যান্ট। ওয়াচ টাওয়ারের ওপরটা বাবারও খুব প্রিয়। এখানে বসে বসে বিল্টুকে পড়াত। বলত, “লেফটেন্যান্ট বানান লেখ তো।”
বিল্টু মাথা চুলকে, কাটা নখগুলো আবার খেয়ে কোনওরকমে লিখত Leftnant বা Latent বাবা কোনওদিন বকে না। শুধু হাসে। হাসার সময় বাবাকে ভারি সুন্দর দেখায়। হাসলে সবাইকে ভালো লাগে না। বাবাকে লাগে। হাসার সময় যখন বাবার গোঁফদুটো ফিঙের লেজের মতো নাচে, তখন বিল্টুর বেশ মজা লাগে। বাবা বলে, “আচ্ছা, এবার লেখ মিথ্যে তুমি দশ পিপীলিকা। লিখে তার নিচে ওই শব্দের ইংরেজিগুলো লেখ lie-u-ten-ant তাহলে কী দাঁড়াল? Lieutenant ব্যস, হয়ে গেল
বিল্টু অবাক, “ওমা, কী সোজা!”
বাবা আবার হাসে। মন ভরানো সেই হাসি।

ওয়াচ টাওয়ারের লম্বা ছায়া পড়ছে ওদের বাড়িটার ওপর। সেখান থেকে মা ডাকে, “বিল্টু এবার নীচে আয়পড়তে বস।”
বিল্টু নেমে আসে। ছদ্ম অভিমান দেখিয়ে বলে, “আমি কি পড়তে বসি না?
মা হেসে বিল্টুর নাকটা টিপে দিয়ে বলে, “না, আমার বিল্টুবাবু তো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে
মায়ের দাঁতগুলো দিয়ে ঝরে পড়ে একরাশ মুক্তোস্নেহ, মমতামাখা একটা মুখ। চিকচিকে দুটো চোখ। চুলে হালকা রুপোলি রেখা। পৃথিবীর যা কিছু শুভ, সব যেন এসে জমা হয়ে আছে ওই মুখে। বিল্টুদের আশেপাশে কোনও বাড়ি নেই। ওদের প্রতিবেশী বলতে সবুজে মোড়া গাছ, কিচিরমিচির করা পাখি। আর ওই ওয়াচ টাওয়ার। বিল্টুর বাবা খুব নিরিবিলি পছন্দ করে। বলে, “যুদ্ধের সময় তো কান পাতা দায় হয়ে যায়। নাক দিয়ে যেন বিষ টানি। অন্তত বাড়িতে যখন আসব তখন তো একটু প্রাণ খুলে বাঁচি!”
পড়তে পড়তে বিল্টুর চোখ চলে যায় জানালার দিকে। কাঁচে হিম জমেছে। বিল্টু আঙুল দিয়ে কাঁচের ওপর ধারা কাটে। বাইরে পরিষ্কার আকাশ। মিটি মিটি তারা। আর ফুটফুটে একটা চাঁদ। যেন মেরি-বিস্কুট। সবেমাত্র রুপোয় ডুবিয়ে তুলে আনা হয়েছে। এখনও তা থেকে রুপো ঝরছে। একসময় চাঁদটাও গলে গলে পড়বে ঠিক মেরি-বিস্কুটের মতো! বিল্টুর বাবা বিল্টুকে নিয়ে সন্ধেবেলায় উঠে পড়ত ওয়াচ টাওয়ারে।
“ওই দ্যাখ কালপুরুষ। দেখেছিস কেমন তির-ধনুক উঁচিয়ে যুদ্ধ করছে!”
বিল্টু বলতো, “বাবা, আমিও যুদ্ধ করবতোমার মতো।”
তখন বাবা বলত, “দূর বোকা। যুদ্ধ বড়ো বাজে জিনিসতুই যুদ্ধ করবি না ওই দ্যাখ সপ্তর্ষিমণ্ডল। দেখেছিস ওরা কেমন জিজ্ঞাসাচিহ্ন বাগিয়ে বসে আছে! ওদের অনেক কৌতূহল। সবসময় প্রশ্ন করছে। এটা কী? ওটা কেন? ওরকম হতে হবে বুঝলি? জানার কোনও শেষ নেই।”
বিল্টু বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ে।
বিল্টু উঠে পড়লমা পাশের ঘরে। ঘরে কোনও আলো নেই। জানালা দিয়ে জ্যোৎস্না এসে খেলা করছে মায়ের কোলে। জানালার পাশে ফুলদানি। তাতে বাগানে ফোটা দুটো রজনীগন্ধার স্টিক। জানালা দিয়ে তিরতির করে হাওয়া এসে সারা ঘর ভরিয়ে তুলছে রজনীগন্ধার মিষ্টি গন্ধে। মা জ্যোৎস্না কোলে নিয়ে একমনে পিয়ানোর রিড টানছে। করুণ একটা সুর। বিল্টুর মনটা হঠাৎ করে খুব খারাপ হয়ে গেল। বাবাকে কতদিন দেখে না। সেই শেষবার যখন গেল, হাতে পাশবালিশের মতো মস্ত একখানা ব্যাগইচ্ছে করলে বিল্টু তাতে ঢুকে পড়তে পারে। চুল ঘেঁটে দিয়ে বাবা বলেছিল, “তাহলে বিল্টুবাবু, ভালোভাবে থাকবে কিন্তু। একদম দুষ্টুমি করবে না।”
তারপর বিল্টুর মুখের কাছে মুখটা নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলেছিল, “তুমি এখন থেকে এখানকার কী বলো তো?
বিল্টু বাবার মুখে ছোট্ট একটা থাবা দিয়ে বলেছিল, “মিথ্যে তুমি দশ পিপীলিকা।”
বাবা হো হো করে হেসেছিল। মা একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল দুই অসমবয়সী শিশুর কীর্তি।
বাবা চলে গেল। বিল্টু ওয়াচ টাওয়ারে উঠে শেষপর্যন্ত দেখেছিল। যতক্ষণ না বাবা মিলিয়ে যাচ্ছে সূর্যের দেশে। সূর্য যেখানে ঘুমোতে যায় বিল্টু ছুটে গিয়ে মাথা গুঁজল মায়ের কোলে। জ্যোৎস্না কোল থেকে লাফিয়ে উঠে পড়ল বিল্টুর মাথায়যেন বিল্টু তার ছোটভাই
“এই, দেখি দেখি। কী হয়েছে আমার বিল্টুবাবুর?
“বাবা কবে আসবে?
“ও, বাবার জন্য মন খারাপ! বাবা তো ভারী দুষ্টু। আচ্ছা এবার বাবাকে আসতে দাও। দুজনে মিলে বলবকেমন?
মা হাত বুলিয়ে দেয় বিল্টুর পিঠে। তারও মনখারাপ। অনেকদিন হয়ে গেল বিল্টুর বাবার কোনও চিঠিপত্র আসেনি মানুষটা কেমন আছে কে জানে! হয়তো এই একই আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে বসে আছে বারুদমাখা মানুষটা! ভাবছে বিল্টুর কথা।

আজ সকাল থেকেই সূর্যের অভিমান। একনাগাড়ে জ্বলতে জ্বলতে মাঝে মাঝেই সূর্যের অভিমান হয়। মুখ কালো করে বসে থাকে। চোখ বেয়ে পড়ে অশ্রুনদী। আজ বোধহয় একটু বেশিই অভিমান। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি ভিজে ভিজে একটা লোক এলসবুজ রেনকোট থেকে টপ টপ করে জল পড়ছে। মুখটা কেমন জানি। ইয়া মোটা মোটা ঝুলপি। বিল্টুর কেন জানি তাকে দেখেই ভয় করতে লাগললোকটা কিন্তু মিষ্টি হেসে একটা ক্যাডবেরি গুঁজে দিল বিল্টুর হাতে। দাঁত বার করে বলল, “গুড মর্নিং, ইয়াং ম্যান!”
বিল্টু ছুট্টে ঘরে চলে গেল লোকটা রেনকোট ছেড়ে বিল্টুর মায়ের মুখোমুখি সোফায় বসলতারপর মায়ের উৎকণ্ঠা মেশানো মুখটার দিকে তাকিয়ে একটা গলাখাঁকারি দিয়ে বলতে লাগল, “ম্যাডাম, আমি মিলিটারি অফিস থেকে আসছি। ওয়ার-ফিল্ড থেকে কিছু খবর আছে মানে ইয়ে, এই নিউজ আছে যে.... মিঃ সেন বীরগতিপ্রাপ্ত হয়েছেন।”
কোনওরকমে কথাগুলো শেষ করে লোকটা তাকাল বিল্টুর মায়ের দিকে। সেখানে যেন সত্যিই বাজ পড়েছে। শুধু কোনওরকমে চোখ চুঁইয়ে একফোঁটা মুক্তো খসে পড়ল কোলের ওপর। লোকটিও ভীষণ অসহায় বোধ করল। এই সময়ে কী করতে হয়, তা সে সত্যিই জানে না। চাকরির দায়ে তাকে আজ মৃত্যু বয়ে আনতে হয়েছে। সে খুলে দিয়েছে এক মস্ত প্যান্ডোরাস বক্স। তা থেকে গলগল করে বেরিয়ে আসছে কালো ধোঁয়া। কালো দুঃখ। সে আবার বলে, “মিসেস সেন, প্লিজ ভেঙে পড়বেন না। ইউ শুড ফিল প্রাউড অফ ইয়োর হাজব্যান্ড! উনি দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। উনি দেশের গর্ব!”
তার কথাগুলো যেন কোথায় হারিয়ে যায়। তলিয়ে যায় গভীরে।
বিল্টু জানালার কাছে বসে। মন খারাপ। টেবিলের ওপর আঁকাটা রেখেছিল। জানালা দিয়ে জল এসে ভিজিয়ে দিয়েছে। লাল রঙটা আর করা হল না। জানালার কাঁচে জমে আছে প্রকৃতির কান্না। বিল্টু তার ওপর ধারা কেটে লেখে ‘মিথ্যে তুমি দশ পিপীলিকা’! কিন্তু প্রকৃতি আজ বন্য। বন্য অভিমানে আছড়ে পড়ে জানালার ওপর। মুছে যায় ‘’মিথ্যে তুমি দশ পিপীলিকা!’
_____
ছবিঃ দ্বৈতা গোস্বামী

গল্পের ম্যাজিক:: পিশাচ - সহেলী চট্টোপাধ্যায়


পিশাচ
সহেলী চট্টোপাধ্যায়

বাড়িটা দেখে মনে হয় অনেক পুরনো আমলের বাড়ি। একদম হানাবাড়ির মতো দেখতে। বাড়ির কার্নিশ থেকে উঁকি মারছে দুএকটা বটের চারা। ওপরের রেলিং তো কবেই ধসে গেছে। ছাদের ওপর অযত্নে জন্মেছে কিছু নয়নতারা। আমি কিছুদিন হল দিদির বাড়ি এসেছি বেড়াতে। মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে সবেবন্ধুরা অনেকেই অনেকরকম কোর্স করতে ভর্তি হয়ে গেছে। আমি চাই কিছুদিন একটু স্বস্তির সাথে বাঁচি। আমার জেঠতুতো দিদির বাড়ি মনোহরপুরে। শহর থেকে অনেকদূরে। জামাইবাবু লোকাল থানার ইন্সপেক্টর। থানার লাগোয়া কোয়ার্টার। জামাইবাবু এই ছোটো শালাকে বেশ ভালোইবাসেন। মনোহরপুরের সবই ভাল, তবে বড্ড নির্জন।
দিদি বলল, ভাগ্যিস তুই এলি। একা একা হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। কথা বলার লোকই পাই না।
তবে দিদি জায়গাটা বেশ সুন্দর। আমাদের কলকাতার মতো অষ্টপ্রহর কানের কাছে চেল্লামেল্লি নেই। আর বিশুদ্ধ অক্সিজেন ভর্তি বাতাসে।
লেখকদের খুব ভালো লাগবে এইরকম ভূতের জায়গা।
দিদি আমাকে লেখক বলে উপহাস করে মাঝে মাঝে, আবার পছন্দও করে। আমি মাঝে মাঝে গল্প লেখার চেষ্টা করি। স্কুল ম্যাগাজিনে আমার একটা ভূতের গল্প বেরিয়েছিল একবার। দিদি পড়ে ভয় পেয়েছিল। অনেকেই খুব প্রশংসা করেছিল গল্পের।
হ্যাঁ দিদি। দুএকটা গল্প লিখব বলে খাতা আর পেন নিয়ে এসেছি। তবে এসেই নজর কেড়েছে উল্টোদিকের ওই ভাঙাচোরা দোতলা বাড়িটা। কেউ থাকে না ওখানে?
আরে বাড়িটা নিয়ে অনেক গল্পকথা আছে। যাদের বাড়ি তারা একজন ভদ্রলোককে ভাড়া দিয়ে বাইরে চলে গেছেন। ভদ্রলোক ভ্যাগাবণ্ড গোছের লোক কিন্তু কারোর সাথেই আলাপ নেই। একদমই মিশুকে নয়। কখন বাড়িতে থাকে আর কখন যে বাইরে বেরোয় কিছুই বোঝা যায় না।
এরপর দিদি রাতের রান্না করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল আর আমি গল্পের বইয়ে মন দিলাম। সাগর দত্তর হরর কাহিনীতে মুখ ডুবিয়ে বসে রইলাম দুঘণ্টা। জীবনে আমার একটাই স্বপ্ন, সাগর দত্তর মতো হরর আর সাসপেন্স লিখব জানিনা কখনও সফল হব কি না! কিন্তু স্বপ্ন দেখতে তো দোষ নেই।
পরের দিন বিকেল বেলা হাঁটতে বেরলাম। পায়ে পায়ে এগিয়ে চললাম ওই হানাবাড়ির দিকে। মনে মনে এই বাড়ির নাম আমি হানাবাড়িই রেখেছি। বাড়ির সদর দরজায় দেখি বিশাল একটা তালা ঝুলছে। আমি অন্য পথ ধরলাম। সামনে একটা বড় দীঘি মতো আছে, সেদিকে পা বাড়ালাম। হঠাৎ মনে হল আমার পেছনে কেউ হেঁটে আসছে। পায়ের শব্দ হচ্ছে। পেছন ফিরে দেখি বাসন্তীমাসি আসছে। দিদির বাড়ি বাসন মাজে, ঘর মোছে। বলল, বিট্টু শোনো।
আমি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কিছু বলছ?
হ্যাঁ। একটা কথা চুপি চুপি বলছি। বলে গলাটা একদম খাটো করে বলল, ওই ভাঙাবাড়ির সামনে দিয়ে কখনও যাবে না। একটা পিশাচ এসে জুটেছে ওই বাড়িতেওই বাড়িতে কোনও মানুষ ঢুকলে সে আর বেরোতে পারে না।”
এরকম কথা কখনও শুনিনি। তাই বেশ হকচকিয়ে গেলাম। বাসন্তীমাসি আমাকে খুবই ছোটোছেলে ভাবে দেখছি। বেড়াতে আর ভালো লাগল না। বাড়ি চলে এলাম। তবে বেশ একটা রহস্যের গন্ধ পেলাম মাসির কথায়। একটা গল্প লিখে ফেললে মন্দ হয় না। দিদি আর জামাইবাবুকে রাতে খাবার টেবিলে সবকথা বললাম। দুজনেই হেসে গড়িয়ে পড়লেন। জামাইবাবু বললেন, আসলে ওই ভদ্রলোক কারোর সাথে মেশেন না, তাই এরকম গালগল্প চালু হয়েছে ওনাকে নিয়ে। মানুষ এসব গালগল্প শুনতে আর বিশ্বাস করতে ভালবাসে।
দিদিও সায় দিল। বলল, ছেলেরা কখনও ঐ বাড়িতে যায় না। চাঁদা চাইতে যায় না, আম পাড়তে যায় নাএমনকি বল বা ঘুড়ি এসে পড়লেও চাইতে যায় না। বাবামায়েরা এমন ভয় দেখিয়েছে। সব বাসন্তীর মুখেই শুনেছি। একবার নাকি একটা ছেলে সাহস করে ভেতরে ঢুকেছিল তাকে আর পাওয়া যায়নি। ওই লোকটির চোখ নাকি জ্বলে সবসময়।
তুমি আর গল্প বাড়িয়ো না। আমাকে আর একটু ভাত দাও। জামাইবাবু আলোচনা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

আর একসপ্তাহ পরই এখান থেকে চলে যাবযাকে নিয়ে এত গল্প শুনছি তাকে চাক্ষুষ দেখার খুব ইচ্ছে আছে। রোজই চেষ্টা করি দেখার কিন্তু সফল হই না। রোজ সকাল বিকেলে হাঁটতে বেরোই। একদিন ভদ্রলোকের সাথে দেখা হয়ে গেল। এক বিকেলে আমি ওই বাড়ির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম হঠাৎ বাড়ির সদর দরজা খুলে গেল। একজন রোগামত ভদ্রলোক দরজা খুলে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। এত তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা ঘটে গেল যে দৌড়ে পালাবার সুযোগ পেলাম না। ভদ্রলোকের পরনে একটা লুঙ্গি আর সাদা ফতুয়া। মাথার চুলগুলো পাতলা হয়ে এসেছে। বয়স পঞ্চাশের নিচেই হবে। চোখের মণি দুটি খুব উজ্বল। যেন জ্বলছে। সরাসরি আমাকেই জিজ্ঞাসা করলেন, ক’দিন ধরেই দেখছি আমার বাড়ির সামনে ঘুরঘুর করছ। লোকে আমার বাড়ির ত্রিসীমানায় আসতে ভয় পায়। তুমি তো খুব সাহসী দেখছি। তা এখানে এসেছ কোথায়?
আমার গলা শুকিয়ে গেছিল কোনরকমে গলায় জোর এনে বললাম, আমি ইন্সপেক্টরবাবুর বাড়ি এসেছি। উনি আমার জামাইবাবু হন। মাধ্যমিক হয়ে গেছে তাই দিদির বাড়ি বেড়াতে এসেছিলাম। এই বাড়িটা খুব পুরনো আর আমার পুরনো বাড়ি দেখতে খুব ভালো লাগে তাই সকাল-সন্ধে চেয়ে থাকতাম।
বেশ বেশ। পুরনো বাড়ি আমারও খুব ভালো লাগে। তাই তো এমন একটা বাড়ি ভাড়া নিয়েছি। আমার লেখার খুব সুবিধা হয় এতে।
আপনি বুঝি লেখক?
সব গল্পই কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হয় নাকি? ভেতরে এসো, একটু চা খেয়ে যাও।
যদিও ভয় ভয় করছিল তবু ভাবলাম, একবার ভেতরটা দেখে আসি। মানুষটার সাথে আলাপ করে আসি আমাকেও তো লেখক হতে হবে। তাই সবরকম অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে হয়। মানুষের সাথে মিশতে হবে।

ভদ্রলোকের পেছন পেছন প্রবেশ করলাম সেই হানাবাড়িতে।  ঘরের ভেতর বেশ ঠাণ্ডা। পুরনো দিনের বাড়িঘর এমনিতেই বেশ ঠাণ্ডা হয়। এই গরমেও ভদ্রলোক সমস্ত জানলা বন্ধ করে রেখেছেন। ইলেকট্রিক বাতি জ্বলছে না, কিন্তু কোথা থেকে একটা মৃদু নরম আলো আসছে আর তাতেই সব কিছু দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার। পুরানো আমলের খাট আর একটা টেবিল চেয়ার ছাড়া আসবাবপত্র বিশেষ কিছুই নেই। তবে অনেকগুলো বুকসেলফ আছে। আর সমস্তই বইয়ে ঠাসা। আমি জানলার দিকে চেয়ে আছি দেখে বললেন, “শিক ভাঙা বেশিরভাগ জানলার। তাই বন্ধ রেখেছি। এই একতলাতেই আমি থাকি। একটু বসো, চা আনি।  ভদ্রলোক একটা দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লেন।
বুকসেলফে বইগুলোর দিকে এবার আমার নজর পড়ল। বেশিরভাগ বইই দেখছি ভূতপ্রেত আর পরলোক নিয়ে। বিদেশী লেখকের পাশাপাশি দেশি লেখকদেরও অনেক বই আছে। সাগর দত্তর বেশ কিছু বই আছে। সাগর দত্তর সব বইই আমার পড়া।
কী দেখছ? বইপত্র আমার একটা নেশা বলতে পার। কখন জানি ঘরে প্রবেশ করেছেন ভদ্রলোক, হাতে একটা ট্রে। দুকাপ চা আর বিস্কুট। এত তাড়াতাড়ি কী করে করলেন ভদ্রলোক?
বললাম, আপনি ভূতের বই বেশি ভালবাসেন দেখছি। সাগর দত্তর লেখা কেমন লাগে?
ভদ্রলোক হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠলেন। এই কথায় এত হাসার কী আছে বুঝলাম না।
বললেন, এই অধমের নামই সাগর দত্ত।
আমার কাপ থেকে চা চলকে পড়ল ডিশের মধ্যে। বললাম, তার মানে এত গল্প আপনারই লেখা?
চোখের সামনে যেন নিজের গুরুদেবকে দেখছি।
কিন্তু আপনি কেন কোথাও নিজের সাক্ষাৎকার দেন না? কেন নিজের ছবি দেন না কোথাও? ফেসবুকেও আপনি নেই! ফ্যানদের থেকে সসময় দূরে দূরে থাকেন কেন? আজকের দিনে কেউ কি এভাবে থাকতে পারে?
আমার কোনও প্রচার মাধ্যমের দরকার নেই। সম্পাদকরা মুখিয়ে থাকেন আমার একটা লেখা পাওয়ার জন্য।
সে তো হবেই। কত ভালো লেখেন আপনি! কিন্তু আমাদের অর্থাৎ আপনার অনুরাগীদেরও তো জানতে ইচ্ছা করে আপনার সম্পর্কে।
জানবে জানবেসময় হলেই সব জানতে পারবে সবাই। সাগরবাবুর মুখে একটা রহস্যময় হাসি খেলে গেল।
আমার চা জুড়িয়ে জল হয়ে গেছিল। একচুমুকে শেষ করলাম। বললাম, আপনার একটা অটোগ্রাফ পেতে বড়ো ইচ্ছা করছে।
সাগরবাবু আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার চোখদুটো জ্বলজ্বল করে উঠল। বললেন, আমি মানুষের সঙ্গে মিশতে পছন্দ করি না অনেক কারণে। আমার চেহারাটা তেমন ভাল নয় বলে ছোটো ছেলেপুলেরা ভয় পায় অনেকে পিশাচ বলে মনে করে। এই বাড়ি নিয়েই কত গল্প রটিয়েছে!
সাগরবাবুর গলা দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে। সত্যি সাগরবাবুকে দেখতে তেমন ভাল নয়। তাই বলে পিশাচ বলে ভাবাটা লোকের বাড়াবাড়ি। বললাম, হ্যান অ্যান্ডারসনকেও দেখতে ভালো ছিল না। অনেকে ঠাট্টা করেছে তাঁকে নিয়ে কিন্তু তাঁর মতো লেখক ক’জন হতে পেরেছে?
সাগর দত্ত কিছু বললেন না। সন্ধে নেমে গেছে। আশেপাশের কিছু বাড়ি থেকে শাঁখের আওয়াজ ভেসে আসছে বললাম, এবার উঠতে হবে আর একদিন আসব সময় করে। কাল বিকেলে আসব? আপনার সময় হবে?
সাগরবাবু স্থির হয়ে চেয়ে আছেন আমার দিকে। হঠাৎ একটা কালো ছায়া যেন ঘরে প্রবেশ করল। বেশ বড়ো আকারের একটা বাদুড়। বাইরে দমকা হাওয়া উঠল। জানলা তো সব বন্ধ তাহলে ঢুকল কোথা দিয়ে? নিশ্চয় ঘুলঘুলি দিয়ে ঢুকেছে। আজ বোধহয় কালবৈশাখী উঠবেকারেন্ট চলে গেল টুক করে। মাথার ওপর পাখা ঘুরছিল শব্দ করে, সেটা বন্ধ হয়ে যেতেই মনে হল সভ্য জগত থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি। এতক্ষণ ঘরের মধ্যে যে আলোটা আসছিল সেটাও আর আসছে না। পুরো ঘরটা এক নিকষ অন্ধকারে ডুবে গেছে। হঠাৎ তীক্ষ্ণ একটা চিৎকার কানে এল। বুঝতে পারলাম না কিসের চিৎকার। গলার কাছে কী যেন কুটকুট করছে। বললাম, সাগর বাবু কীসের চিৎকার শোনা যাচ্ছে?
ওটা একটা কুকুরের কান্না,” ফ্যাসফ্যাসে গলায় উত্তর দিলেন।
কুকুরের কান্না মোটেও এরকম নয়। মিথ্যে বললেন কেন উনি? আমি কি এতই বাচ্চা যে কুকুরের কান্না বুঝতে পারব না? যদি বলতেন শকুনের বাচ্চার কান্না তাহলেও বা বিশ্বাস করা যেত।

ঘরের মধ্যে ভীষণ অন্ধকার। একটা ঠাণ্ডা ঝাপটা লাগল আমার গালে। ভীষণ শীতল সেই ঝাপটা। বাদুড়টা এখনও উড়ছে ঘরের মধ্যে। সাগরবাবু আলো জ্বালাচ্ছেন না কেন? ভারি অদ্ভুত লোক তো! কেমন একটা ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছি আস্তে আস্তে। ঘরের মধ্যে অস্পষ্ট একটা ধোঁয়া এল কোথা থেকে? চোখে জল এসে গেছে। আমার কি দৃষ্টিবিভ্রম হচ্ছে? বলতে যাচ্ছিলাম ঘরের মধ্যে এই সাদা ধোঁয়া কিসের? কিন্তু বলতে পারলাম না। গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ বেরুলো না। সেই সাদা অস্পষ্ট ধোঁয়ার দিকে একভাবে তাকিয়ে আছি। মনে হচ্ছে সাদা ধোঁয়াটা যেন অস্পষ্ট একটা ছায়ামূর্তির রুপ নিচ্ছে। এবার সে আমাকে গিলে খাবে। আমার চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে। আর কিছুই অনুভব করতে পারছি না। সাদা ধোঁয়াটা আমার গলার কাছে চলে এসেছে। আমার ভীষণ শীত করছে। গলার কাছটা খুব জ্বালা করে উঠল।
সম্বিৎ ফিরল সাগরবাবুর ঝাঁকানোর চোটে। কী হল তন্ময়, তুমি ঘুমিয়ে পড়ছ কেন? বাড়ি দিয়ে আসি?
তাকিয়ে দেখি কারেন্ট এসে গেছে। পাখা ঘুরছে মাথার ওপর আর একটা ইলেকট্রিক বাল্ব জ্বলছে। বেশি আলো হচ্ছে না তাতে, তবে একটু একটু দেখা যাচ্ছে। এতক্ষণ আমি এসব কী দেখছিলাম! সব তো ঠিকই আছে। কোথাও কোনও গোলমাল নেই।
না না, আমি একাই যেতে পারব,” হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ার জন্য বেশ লজ্জিত বোধ করি।
না না, পারবে না। খুব ঝড়বৃষ্টি হয়েছে তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি। তাছাড়া আটটা বেজে গেছে। তোমার দিদি নিশ্চয় খুব চিন্তা করছেন। আমি সঙ্গে না থাকলে তুমি বকা খাবে।
সাগরবাবু হাতে একটা বড়ো টর্চ আর ছাতা নিয়ে আমাকে এগোতে চললেন।
দিদির বাড়ি তো কাছেই। তবু এটুকু আসতেই অনেক কাদা মাড়াতে হল। গাছের ডাল ভেঙে ভেঙে পড়েছে। খুব সাবধানে চলতে হচ্ছে। কখন এত ঝড় হল বুঝতে পারিনি তো!
দিদি সদর দরজায় দাঁড়িয়েছিল উদ্বিগ্ন মুখে। এখনও টুপটাপ করে বৃষ্টি পড়ছে। দিদি আমাকে দেখেই এগিয়ে এল তবে কিছু বলল না কারণ, আমার পেছনে সাগরবাবু ছিলেন। সাগরবাবুই বললেন, কিছু মনে করবেন না। ঝড়বৃষ্টি দেখে ছেলেটিকে ঘরে বসিয়ে রেখেছিলাম।
ভালই করেছেন। যা দস্যি ছেলে! একটু চা খেয়ে যান?
আজ আসি বোন। আর একদিন হবে না হয়!
দিদি আর জোরাজুরি করল না। সাগরবাবু বেরিয়ে গেলেন।
রাতে খেতে বসে জামাইবাবু আর দিদিকে সাগর দত্তর কথা বললামজামাইবাবু বললেন, লোকটার সম্বন্ধে কত বাজে কথাই শুনেছি এতদিন ধরে।
দিদিও সায় দিল, “অথচ কত ভদ্রমানুষ উনি।
জামাইবাবু বললেন, “হবে না কেন? এত বড় একজন লেখক মানুষ। সাগর বাবুর কিছু লেখা আমিও পড়েছি। একদিন গিয়ে আলাপ করে আসব
দিদি বলল, “একদিন নেমন্তন্ন করে এস বিট্টু থাকতে থাকতে

আমি বলার চেষ্টা করলাম, হ্যাঁ খুব ভালো হবে, কিন্তু পারলাম না। গলার কাছটা কেমন যেন ব্যথা ব্যথা করছে। খেয়ে উঠে দাঁত ব্রাশ করতে বেসিনের সামনে গেলাম। আয়নায় দেখলাম নিজের গলার কাছে ছোট্ট দুটো ফুটো একটু একটু রক্তের রেখা দেখা যাচ্ছে এখনও। সেগুলো এখন শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে।
______
ছবি - তন্ময় বিশ্বাস