Showing posts with label কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়. Show all posts
Showing posts with label কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়. Show all posts

প্রবন্ধ:: মেক্সিকারাই গড়ে তুলেছিল আজটেক সভ্যতা - কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়


মেক্সিকারাই গড়ে তুলেছিল আজটেক সভ্যতা
কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

দ্বাদশ শতকের শুরু থেকে মেক্সিকো উপত্যকায় এক নতুন জনগোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ ঘটে। এরা নাহুয়াটল ভাষায় কথা বলত। এরা এসেছিল উত্তরের মরু অঞ্চল থেকে। এই যাযাবর জনগোষ্ঠীটি স্বভাবে ছিল অত্যন্ত হিংস্র ও লড়াকু। এরা প্রথমে তেকসকোকো হ্রদের উপকন্ঠে আনাহুয়াক উপত্যকায় ছোটো ছোটো দলে ভাগ হয়ে বসতি স্থাপন করে। সেই সময় ওই অঞ্চলে টোলটেকরা রাজত্ব করত। শক্তি সামর্থ্যের দিক থেকে এরা টোলটেকদের তুলনায় ছিল অতি নগণ্যতাই এদের বসতি স্থাপনের সময় টোলটেকরা তেমন বাধা দেয়নি।
এই নতুন জনগোষ্ঠী সেই সময় আজটেক নামে পরিচিত ছিল নাতাহলে কী নামে তারা নিজেদের পরিচয় দিত? এদের উপকথা (অবিন কোডেক্স, Aubin Codex) থেকে জানা যায়, আজৎলান নামে কোনো এক স্থানে এরা বসবাস করত। তীব্র খাদ্যাভাব দেখা দিলে স্ব-ভূমি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে নতুন ঠিকানার উদ্দেশে যেখানে খাদ্যের অভাব নেই। এই গোষ্ঠীর দেবতা হুইৎজিলোপোচিটলি-র আদেশ ছিল নতুন জায়গায় গিয়ে তারা যেন নিজেদের আজটেকা বলে পরিচয় না দিয়ে মেক্সিকা বলে পরিচয় দেয়। কারণ আজটেকা তাদের রাজার নাম।
ইতিহাসবিদদের মতে মেক্সিকা গোষ্ঠী চাহুলতেপেক এলাকায় প্রবেশ করেছিল ১২৪৮ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ। সেই সময়ে মেক্সিকো উপত্যকায় বেশ কয়েকটি শহর ছিল। সামরিক শক্তিতে এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী শহর ছিল পশ্চিমের আজকাপোৎজালকো এবং দক্ষিণের কুলুয়াকান আজকাপোৎজালকোর তেপানেক শাসকেরা মেক্সিকাদের চাহুলতেপেক এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেয়। লড়াকু মেক্সিকাদের ভবিষ্যতে সৈন্যবাহিনীতে কাজে লাগানো যেতে পারে এই কথা ভেবে ১২৯৯ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণের কুলুয়াকান রাজা কোকোক্‌সতলি এদের তিজাপান নামক এক অনুর্বর এলাকায় বসতি স্থাপনের অনুমতি দেন। এরপর থেকে মেক্সিকারা কুলুয়াকান সংস্কৃতি গ্রহণ করতে শুরু করে। কারণ তারা বুঝেছিল টোলটেকরা তাদের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ও সভ্য। নিজেদের নাহুয়া দেবতাদের সঙ্গে টোলটেক দেব-দেবীদেরও তারা আপন ধর্মে গ্রহণ করে নেয়
মেক্সিকাদের মধ্যে একটা লোকগল্প প্রচলিত আছে। গল্পে বলা আছে একটি বিশাল ঈগল পাখি পিয়ার ক্যাকটাস গাছে বসে আছে, তার নখে গাঁথা একটা প্রকাণ্ড সাপ। এর অর্থ, মেক্সিকাদের দেবতা হুইৎসিলোপোকৎলি তাদের এই এলাকায় বসতি স্থাপনের উদ্দেশ্যে নিজেদের শহর গড়ে তোলার আদেশ দিচ্ছেন। কিন্তু টোলটেকদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় তারা হ্রদ অঞ্চলের পূর্বে, পশ্চিমে বা দক্ষিণে কোনো শহর গড়ে তুলতে পারল না। অবশেষে তারা তেকসকোকো হ্রদের উত্তরে এক জলা দ্বীপে ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দে তেনোকতিতলান শহরের গোড়াপত্তন করে। এরপরে প্রায় ৫৩ বছর ধরে তারা আশেপাশের দ্বীপগুলিতে এবং অগভীর অঞ্চলগুলি ভরাট করে বসতি বিস্তার করতে থাকে। ১৩৭৬ খ্রিস্টাব্দে মেক্সিকারা তাদের প্রথম হুয়েই ত্‌লাতোআনি অর্থাৎ প্রধান শাসক বা রাজা নির্বাচিত করেন। প্রথম এই রাজা বা নেতা-শাসকের নাম আকামাপিকৎলি।
আকামাপিকৎলি মেক্সিকাদের রাজা নির্বাচিত হলেও তিনি স্বাধীন রাজা ছিলেন না। টোলটেকদের শক্ত ঘাঁটি আজকাপোৎজালকোর রাজার অধীনে ছিল। প্রতি পূর্ণিমায় ধার্য কর পৌঁছে দিতে হত তেপানেক রাজাকে। ১৪২৬ খ্রিস্টাব্দে আজকাপোৎজালকোর রাজার মৃত্যু হলে ক্ষমতা দখল করেন তাঁর ছেলে মাক্‌স্‌ৎলা। রাজা হয়েই তিনি মেকসিকা-শাসককে হত্যা করেনসেই সময় মেক্সিকাদের নেতা ছিলেন চিমালপোপোকা। ভবিষ্যৎ নিষ্কন্টক করার জন্য মাক্‌স্‌ৎলা তাঁর নিজের ভাই নেজাহুয়ালকোয়োৎলকে রাজ্য থেকে বহিষ্কার করেন।
সেই সময় আজকাপোৎজালকো ছিল টোলটেকদের প্রধান শক্তি। একক প্রচেষ্টায় তাদের পরাজিত করে নিজেদের শাসন-অঞ্চল উদ্ধার করা যে সম্ভব নয় সেটা মেক্সিকারা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিল। তাই মাক্‌স্‌ৎলার বিরুদ্ধে যৌথ অভিযানের জন্য চিমালপোপোকার উত্তরাধিকারী ত্‌লাতোআনি ইৎজকোআতল্‌ গোপনে বিতাড়িত তেকসকোকো রাজা নেজাহুয়ালকোয়োৎল এবং ত্‌লাকোপান এর রাজার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আলাপ আলোচনার পর তিন শক্তির মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি ত্রিশক্তি নামে ইতিহাসখ্যাত হয়ে আছে। এই ত্রিকোণ জোট ধীরে ধীরে এক বিস্তীর্ণ এলাকা নিজেদের শাসনের আওতায় নিয়ে আসে। এই সময় মেক্সিকারা নিজেদের আজটেক নামে পরিচয় দিতে শুরু করে। প্রতিষ্ঠিত হয় আজটেক সাম্রাজ্য।
আজটেক সাম্রাজ্য একটি মাত্র জনগোষ্ঠী নিয়ে গড়ে ওঠেনি। এদের সাম্রাজ্যে বহু জনজাতির বাস ছিল। প্রত্যেকের জীবনযাপন পদ্ধতি, ভাষা, সংস্কৃতি, রুচিবোধ ভিন্ন ভিন্ন ছিল। ফলে এদের কোনো কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা ছিল না। বিকেন্দ্রীকৃত শাসন ব্যবস্থাই এদের সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করত। প্রতিটি জনপদ শাসনের দায়িত্ব থাকত স্থানীয় শাসকদের উপরে। তাঁদের শাসন-ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয়-শাসক অর্থাৎ আজটেক সম্রাট হস্তক্ষেপ করতেন না। জনপদ থেকে নির্দিষ্ট সময়ে ধার্য কর সম্রাটের কোষাগারে পৌঁছে গেলে সে জনপদটি সম্রাটের অনুগত বলে ধরে নেওয়া হত। দৈনন্দিন ব্যবহার্য্য বস্ত্র, খাদ্য ইত্যাদির পাশাপাশি পালকের পোষাক, রত্ন, প্রভৃতির মতো বিলাসসামগ্রীও কর হিসাবে গ্রহণ করা হত। কোনো জনপদের অধিবাসীরা বিদ্রোহ করলে বা সময়মতো কর প্রেরণ না করলে তবেই সম্রাট সৈন্য পাঠাতেন তাদের দমন করার জন্য। প্রতিটি জনপদের শাসকেরা তাদের বংশধারা বা উত্তরাধিকার সূত্রে নির্বাচিত হত। বস্তুসামগ্রী কেনা-বেচার জন্য আজটেকরা কাকাও দানা মুদ্রা হিসাবে ব্যবহার করত। এই কাকাও থেকেই কোকো বা চকলেট তৈরি করা হয়ে থাকে।
দ্বাদশ শতকে আজটেক সভ্যতার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল। বহুসংস্কৃতি মিশ্রিত এই সভ্যতার অন্তিম দিন ঘনিয়ে এল ষোড়শ শতকে। কোর্তেস-এর নেতৃত্বে স্প্যানিয় আক্রমণে ১৫২১ খ্রিস্টাব্দে শেষ হয়ে যায় মেসোআমেরিকায় গড়ে ওঠা ওলমেক, জাপোটেক, মায়া, টোলটেক ইত্যাদির মতো কয়েকটি প্রাচীন সভ্যতার শেষ সভ্যতাটি। স্প্যানিয়দের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল স্থানীয় কিছু জনজাতি নেতা। পতন হল আজটেক সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট মনতেজুমার। সেই সঙ্গে শেষ হল প্রাচীন সভ্যতার শেষ অধ্যায়টি
----------
ছবি - আন্তর্জাল

বিজ্ঞান:: বন্ধু পাখির গল্প - কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়


বন্ধু পাখির গল্প
কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

পাখি কি আমাদের বন্ধু হতে পারে? কেন হবে না? টিয়া বা কাকাতুয়াকে খাঁচায় বন্দি রেখে কথা শেখালে কী সুন্দর কথা বলে, গান গায়। না আমি এ ধরনের বন্ধুত্বের কথা বলছি না। যেসব পাখি নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় আমি তাদের কথা বলছি। তারা কি বন্ধুর মতো আমাদের কোনো উপকার করে?
পাখি সব সময়ই আমাদের কিছু না কিছু উপকার করে। তবে কিছু পাখি আছে যাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে উপকারে আসে। এই প্রসঙ্গে প্রথমেই বলতে হয় শকুনের কথা। এরা মৃত প্রাণীদেহের মাংস খেয়ে পরিবেশকে দূষণমুক্ত করে। যদিও শকুনের অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। এটা আমাদেরই কৃতকর্মের ফল।
চড়াই পাখি আমরা সকলেই দেখেছি। বাড়ির আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। দেওয়ালের ফাটলে, ঘুলঘুলিতে, কড়ি-বরগার ফাঁকে এরা বাসা বাঁধে। সেখানে ডিম পাড়ে, ছানাপোনা হয়। বড়ো হয়ে বাড়ির চারপাশে ফুড়ুৎ-ফুড়ুৎ করে উড়ে বেরায়। আমরা কি কখনও ভেবেছি এই ছোট্ট পাখিগুলিই ভূমিকম্পের আগাম খবর দিয়ে আমাদের প্রাণ বাঁচাতে পারে? ১৮৫৭ সালে ইতালির জিনোয়া শহরে যে ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হয়েছিল তার আগাম খবর দিয়েছিল এই পাখিরা। ভূমিকম্প শুরু হওয়ার আগে এরা শহর ছেড়ে পালিয়ে যেতে থাকে। তাই দেখে সেখানকার মানুষ সতর্ক হওয়াতে তারা প্রাণে বেঁচে যায়। ১৮৫৫ সালে জাপানের টোকিও শহরে এক বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়েছিল। এই ঘটনার সাতদিন আগে থেকে সেখানকার মুরগিদের মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ করা গিয়েছিল। ওই সময় ওরা ডিম দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল এবং নিজেদের ঘরে থাকতে চাইছিল না। ওদের আচরণ দেখে ভূমিকম্পের আগাম খবর পেয়ে গিয়েছিল সেখানকার মানুষেরা। ১৯৭৫ সালে চিনের হেই-চেং শহরে এবং ১৯৭৬ সালে ইতালির উত্তরাঞ্চলে যে বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়েছিল তার হাত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল পাখিদের অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ করে সতর্ক হওয়াতে।
আমাদের বাড়ির চারপাশে দেখা যায় এমন আর একটি পাখির কথা বলি। এরা হল শালিক। এক শালিক, দুই শালিক নিয়ে আমাদের মধ্যে যতই সংস্কার থাক, এরা কিন্তু আমাদের উপকারী বন্ধু। সম্প্রতি জানা গেছে শালিক পাখি আবহাওয়া পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিতে পারে। সাধারণত এরা ‘কিক্‌ কিকিউ কিক্‌ কিকিউ’ শব্দ করে নিজেদের মধ্যে ডাকাডাকি করে। কিন্তু দক্ষিণ-পশ্চিম বায়ু আসার ঠিক আগে এদের ডাক পালটে যায়। তখন এরা ‘পিকিউ পিকিউ’ শব্দে ডাকে। এই ডাকের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট তাল ও ছন্দ থাকে। কুড়ি থেকে তিরিশ সেকেন্ড এক নাগাড়ে ডাকার পর দশ থেকে পনেরো সেকেন্ড চুপ করে থাকে। তারপর আবার শুরু হয় ডাক। দেখা গেছে বজ্র-বিদ্যুৎ সহ ঝড়বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, নিম্নচাপ সৃষ্টির আট থেকে ছত্রিশ ঘন্টা আগে এরা এইভাবে ডাকতে থাকে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় কেটে গেলে এদের ডাকও পালটে যায়।
‘কমন সুইফ্‌ট’ নামে এক ধরনের পাখিও ঝড়ের আগাম খবর দিতে পারে। ঝড় আসার আগে এরা নিজেদের বাসা ছেড়ে আকাশে উড়তে থাকে। ঝড় না থামা পর্যন্ত এরা আকাশ থেকে নামে না।
হাঁসের ডাকেও রকমফের আছে। এদের শরীরে এক ধরনের সূক্ষ্ম অনুভূতি আছে যার সাহায্যে এরা বিপদের আঁচ আগে থেকেই করতে পারে। আর তখনই এরা একটি নির্দিষ্ট স্বরে ডাকতে থাকে। শোনা যায়, হাঁসের এই বিপদ-সূচক ডাক শুনে অতীতে রোমের মানুষ এক বড়ো ধরনের বিপদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছিল।
পাখিদের দেওয়া এইসব বিপদ সঙ্কেত আমরা অনেক সময়েই গ্রাহ্য করি না। ফলে বহুক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে পাখিরা নিজেদের বাঁচাতে পারলেও, বুদ্ধিমান জীব হয়েও আমরা নিজেদের রক্ষা করতে পারি না।
শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগেই নয়, আরও নানা ক্ষেত্রে পাখি প্রকৃত বন্ধুর মতো আমাদের সাহায্য করে। বিশেষ করে নতুন দেশ সন্ধানে পরিযায়ী পাখির ভূমিকা এক সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
প্রাচীনকালে সমগ্র পৃথিবীর মানচিত্র আমাদের জানা ছিল না। তাই নতুন দেশের সন্ধানে বহু দুঃসাহসিক অভিযাত্রী সমুদ্রের বুকে ভেসে পড়ত পালতোলা জাহাজ, কম্পাস, জনশ্রুতি আর আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র সম্বল করে। একটু ভুল হল বলতে। এইসব অভিযাত্রীদের আরও একটি সম্বল ছিল — পরিযায়ী পাখি। এই পাখিদের যাতায়াতের পথ ধরে জাহাজ চালিয়ে অভিযাত্রীরা অনেক নতুন দেশ আবিষ্কার করেছেন।
দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে জেগে আছে দুটি দ্বীপ — তাহিতি ও রাইয়াটিয়া। প্রতি বছর শীতকালে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি এখানে আসে। এরা আসে উত্তর দিক থেকে। এদের যাতায়াতের পথ লক্ষ করে এখানকার অধিবাসীরা একদিন ভাবতে শুরু করল যে উত্তরে নিশ্চয়ই কোনও দেশ আছে যেটা এদের প্রকৃত বাসস্থান। ব্যস, দেশ খোঁজার নেশায় একদল নির্ভীক মানুষ ভেসে পড়ল সমুদ্রের বুকে। চলল উত্তর বরাবর পাখিদের যাতায়াতের পথ ধরে। বহু কষ্ট সহ্য করে ওই পলিনেশিয়ান দলটি যে দেশটি আবিষ্কার করল তার নাম ‘হাওয়াই’।
তাহিতির আর এক দুঃসাহসিক নাবিক ‘কুপে’-কে দেশ আবিষ্কারের সম্মান এনে দিয়েছিল পরিযায়ী পাখির একটি দল। এদের দেখতে কোকিলের মতো। তবে লেজগুলো হয় খুব লম্বা। এই পাখির দলটি দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে তাহিতি-তে উড়ে আসত। এদের পথ অনুসরণ করে কুপে রওনা দিলেন দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে। সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে অবশেষে তাঁর জাহাজ গিয়ে ভিড়ল নিউজিল্যান্ডের উপকূলে।
কলম্বাস যখন নতুন দেশের খোঁজে সমুদ্রে জাহাজ ভাসিয়েছিলেন তখন তাঁর জাহাজের গতিপথ ছিল এক ঝাঁক পরিযায়ী পাখিকে অনুসরণ করে। সমুদ্রে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে অবশেষে একদিন তিনি পৌঁছেছিলেন আমেরিকায়। সময়টা ছিল ১৪৯২ সাল।
ভারতবর্ষের খোঁজে পর্তুগীজদের একটি দল দমুদ্রে যাত্রা করেছিল। আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় তারা এক ঝাঁক পরিযায়ী পাখিকে পশ্চিম দিকে উড়ে যেতে দেখে সেদিকে জাহাজের মুখ ঘোরায়। কিছুদিন পর তারা যে দেশে পৌঁছোয় সেটা অবশ্য ভারতবর্ষ ছিল না, ছিল ব্রাজিল।
৮৫৪ সালের কথা। জলদস্যু গার্ডার-সুইডেন লক্ষ করলেন যে এক ঝাঁক পাখি প্রতি বছরই গ্রীষ্মকালে নরওয়ের পশ্চিম উপকূল ছেড়ে উড়ে চলে যায় উত্তর সাগরের দিকে। কোথায় যায় ওরা? ঐ দিকে কি কোনো দেশ আছে? ওদের গন্তব্যস্থল দেখার উদ্দেশ্যে গার্ডার চললেন ওদের অনুসরণ করে। অবশেষে একদিন অবাক হয়ে দেখলেন ওদের দেশ ‘আইসল্যান্ড’।
শোনা যায়, আলেকজান্ডার একবার লিবিয়ার মরুভূমিতে পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন। এক ঝাঁক পাখির জন্য সে যাত্রা তাঁর প্রাণ রক্ষা হয়েছিল। পাখিদের অনুসরণ করেই তিনি সেবার মরুভূমি থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন।
“রানার ছুটেছে তাই ঝুম ঝুম ঘন্টা বাজছে রাতে….” সুকান্তর লেখা এই কবিতাটি আমরা প্রায় সকলেই পড়েছি। দেশ থেকে দেশান্তরে প্রিয়জনের কথা, নানা ধরনের সংবাদ পৌঁছে দিতে একসময় এরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। এক সময় এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করার জন্য মানুষ পাখির সাহায্য নিত। আর এ ব্যাপারে পায়রাই ছিল মানুষের প্রথম পছন্দের পাখি। ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায় যে রাজা সলোমনের কয়েকটি পায়রা ছিল। রাজপ্রাসাদ ছেড়ে দূরে কোথাও গেলে তিনি এই পায়রাগুলিকে সঙ্গে নিতেন। রাজপ্রাসাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য এরাই তখন পত্র-বাহকের কাজ করত। জুলিয়াস সিজার রাজ্য শাসনকালে গুপ্ত সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য পায়রার সাহায্য নিতেন। শোনা যায়, ইরাকে এক সময় পায়রার সাহায্যে ডাক ব্যবস্থার প্রচলন করা হয়েছিল। ১৮৭১ সালে ফ্রান্স ও প্রুশিয়ার যুদ্ধের সময় পায়রা-নিয়ন্ত্রিত ডাক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল।
প্রাচীনকালে গ্রিক নাবিকেরা সমুদ্রে পাড়ি দেওয়ার সময় সঙ্গে পায়রা নিয়ে যেত। দেশে ফেরার আগে সেই পায়রা তারা উড়িয়ে দিত। পায়রাগুলি দেশে ফিরে এসে নাবিকদের আগমন-বার্তা আগাম পৌঁছে দিত তাদের আত্মীয়-স্বজনদের কাছে।
শোনা যায়, হিটলারের পরাজয়ের অন্যতম কারণ নাকি একটি পায়রা। পায়রাটি এমন একটি গোপন খবর মিত্র পক্ষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল যাতে হিটলারের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। এই পায়রাটিকে পরে ‘ভি’ মেডাল দিয়ে সম্মান জানানো হয়েছিল।
এক সময় আমেরিকার উপকূল রক্ষীবাহিনী উদ্ধার কার্যের জন্য পায়রার সাহায্য নিত। এদের হেলিকপ্টারের নীচে একটি খাঁচা ঝোলানো থাকত। এই খাঁচায় তিনটি খোপ থাকত। এই খোপগুলি এমনভাবে তৈরি করা হত যাতে এখানে রাখা পায়রাগুলি একে অপরের সঙ্গে ১২০ ডিগ্রি কোণ করে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকতে পারে। প্রত্যেক খোপে একটি করে বোতাম রাখা হত। এগুলির সঙ্গে চালকের কেবিনে রাখা নির্দিষ্ট তিনটি আলোর সঙ্গে সংযোগ থাকত। খোপের পায়রাগুলি প্রশিক্ষণ-প্রাপ্ত হত। সমুদ্রে লাল, হলুদ বা গোলাপী রঙের কোনো ভাসমান বস্তু দেখলে এরা বোতামে ঠোক্কর মারত। সঙ্গে সঙ্গে চালকের কেবিনে নির্দিষ্ট করা আলো জ্বলে উঠত। চালক সেই আলো দেখে বুঝতে পারত কোন পায়রাটি বোতামে ঠোক্কর মেরেছে। সেই অনুযায়ী হেলিকপ্টারের মুখ ঘুরিয়ে উদ্ধারকারীর দল রওনা দিত গন্তব্যস্থলের দিকে।

_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

বিজ্ঞান:: চলমান নববর্ষ - কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়


চলমান নববর্ষ
কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাস অতি প্রাচীন। বৈদিক যুগে পাটিগণিত, বীজগণিত ও জ্যামিতি চর্চার সাথে সাথে শুরু হয়েছিল ‘নক্ষত্র-বিদ্যা’ আর্য ঋষিদের কাছে কৃষিকার্যের তুলনায় যাগ-যজ্ঞাদি নানা ধর্মানুষ্ঠানের গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। বিভিন্ন ঋতুতে নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতে গিয়ে তাঁরা অনুভব করেছিলেন কাল নির্ণয়ের প্রয়োজনীয়তা। ফলস্বরূপ, প্রণীত হয় পঞ্জিকা। হিন্দু জ্যোতির্বিজ্ঞানের মূলগ্রন্থ ‘সূর্য-সিদ্ধান্ত’ ভারতবর্ষে যে পঞ্জিকা তথা ক্যালেন্ডারের প্রচলন হয়েছিল তা এই সূর্য-সিদ্ধান্তের নিয়ম মেনেই। এই ধারা এখনও বিদ্যমান।
দৈনন্দিন জীবনে বর্তমানে আমরা যে ক্যালেন্ডার ব্যবহার করি সেটা আমাদের কাছে ইংরেজি ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত হলেও আসলে সেটা হল গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার। সরকারি কাজকর্মের জন্য গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার অপরহার্য হলেও পূজা-পার্বন, বিয়ে, অন্নপ্রাশন ইত্যাদি নানারকম সামাজিক উৎসবের জন্য ‘সূর্য-সিদ্ধান্ত’-র নিয়ম মেনে রচিত ক্যালেন্ডারই আমরা এখনও ব্যবহার করি।
সারা বিশ্বে সাধারণত দু’রকম ক্যালেন্ডারের প্রচলন দেখা যায় — চান্দ্র ও সৌর। তবে বর্তমানে সৌর ক্যালেন্ডারই অধিক প্রচলিত। ভারতবর্ষে বেশির ভাগ অঞ্চলের ক্যালেন্ডার চান্দ্র-সৌর হলেও বাংলা ক্যালেন্ডার কিন্তু সৌর। ব্যাপক প্রচলিত গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডারও সৌর হওয়ায় এই দুটো ক্যালেন্ডারের মধ্যে কোনও তফাত থাকা উচিত নয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আমাদের বাংলা ক্যালেন্ডারে বছর শুরু হয় গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডারের ১৪ বা ১৫ এপ্রিল। স্বাভাবিক কারণেই মনে হতে পারে, কেন এমন হয়?
বৈদিক ঋষিরা রাশিচক্র (Zodiacal belt)-এর সঙ্গে পরিচিত ছিলেনসূর্যের আপাত গতিপথকে বৈদিক সাহিত্যে ক্রান্তি বৃত্ত বা রবিমার্গ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। ঋগবেদে এই ক্রান্তিবৃত্তকে তুলনা করা হয়েছে বা্রোটি পাকিযুক্ত চাকার সঙ্গে। অনুমান করা হয় চাকার এই বারোটি পাকি হচ্ছে রাশিচক্রের বারোটি প্রতীক।
সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর এক পাক দেওয়া মানে ৩৬০ পথ অতিক্রম করা। এই পথকে ১২টি ভাগে ভাগ করলে এক একটি ভাগ হয় ৩০ অর্থাৎ রবিপথকে সমান বারো ভাগে ভাগ করলে সূর্যের সরণ হয় ৩০ করে। এই প্রতিটি ভাগকে নির্দিষ্ট করার জন্য জ্যোতির্বিদরা সাহায্য নিলেন ‘নক্ষত্রমণ্ডলের’ তারাদের সমন্বয়ে গঠিত বারোটি নক্ষত্রমণ্ডলকে জ্যোতির্বিদরা নির্দিষ্ট করলেন রবিপথের উপর ৩০ অন্তর অন্তর। এদের প্রত্যেকটিকে বলা হয় রাশি। মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ, কন্যা, তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ এবং মীন — এই বারোটি রাশির সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে রাশিচক্র। আর একটা রাশি থেকে আরেকটা রাশিতে সূর্যের আপাত সরে যাবার সময় কালকেই বলা হয় ‘সৌরমাস’
যে কক্ষপথে পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে সেই কক্ষপথের উপর চারটি নির্দিষ্ট বিন্দু আছে। এদের মধ্যে দু’টির একটি হল উত্তরায়ণ শুরুর দিন, আর অপরটি হল দক্ষিণায়ণ শুরুর দিন। বাকি দু’টির একটি উত্তরায়ণের পথের উপর এবং আরেকটি দক্ষিণায়ণের পথের উপর। উত্তরায়ণের এবং দক্ষিণায়ণের পথের উপরের এই বিশেষ দিন দু’টিতে পৃথিবীর সর্বত্র দিন ও রাত্রির দৈর্ঘ্য সমান। উত্তরায়ণের পথের দিবা-রাত্র সমান এই দিনটিকে আমরা বলি ‘বাসন্তী বিষুব’ আর দক্ষিণায়ণ পথের দিনটিকে বলি ‘শারদ বিষুব’ ক্যালেন্ডারের বছর শুরু করার জন্য এই চারটি দিনের যে কোনও একটিকে বেছে নেওয়াই যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেছিলেন প্রাচীন ভারতের জ্যোতির্বিদগণ। আর সেইমত তাঁরা বছর শুরু করার জন্য বেছে নিয়েছিলেন ‘বাসন্তী বিষুব’কে। গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডারে বাসন্তী বিষুব হচ্ছে ২১ মার্চ। তাহলে আমাদের বাংলা ক্যালেন্ডারে ১ বৈশাখ হওয়ার কথা ২১ মার্চ। কিন্তু হচ্ছে না তো? হচ্ছে ১৪ বা ১৫ এপ্রিল। কেন এই পার্থক্য?
ষষ্ঠ শতাব্দীর হিন্দু জ্যোতির্বিদরা এক বছর সমান ৩৬৫·২৫৮৭৫৬ দিন ধরছিলেন। বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে বর্তমানে আমরা জানি সৌর বছরের দৈর্ঘ্য হল ৩৬৫·২৪২১৯৯ দিন। তাহলে দু’টি হিসেবের মধ্যে এক বছরে পার্থক্য হচ্ছে ০·০১৬৫৫৭ দিনের মতো। অর্থাৎ, হিন্দু জ্যোতির্বিদিরা বছরের হিসেব প্রকৃত হিসেবের তুলনায় ০·০১৬৫৫৭ দিন বা প্রায় ২৩ মিনিট ৫০·৫০ সেকেন্ডের মতো বেশি ধরেছিলেন। জুলীয় ক্যালেন্ডারেও এক সময় অনুরূপ ভুল ছিল। পরবর্তীকালে গ্রেগরীয় সংস্কারের মাধ্যমে সেই ভুল শুধরে নেওয়া হয়। ষষ্ঠ শতাব্দীতে অর্থাৎ, প্রায় ১৪০০ বছর আগে ভারতীয় জ্যোতির্বিদগণ সূর্য-সিদ্ধান্ত বইটিতে বছরের হিসেব করতে যে ভুলটুকু করেছিলেন পরবর্তীকালে সেটা কিন্তু আর শোধরানো হল না। এই সামান্য ভুলটুকু থেকেই গেল। ১৪০০ বছর ধরে সেটা জমে জমে আজ প্রায় ২৩ দিনের গরমিলে এসে ঠেকেছে। তাই গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বাসন্তী বিষুব ২১ মার্চ হলেও বাংলা নববর্ষ আসে ২৩ দিন পরে অর্থাৎ, ১৪ বা ১৫ এপ্রিল।
উত্তরায়ণ যে দিন শুরু হয় সে দিনটিকে বলা হয় কর্কট ক্রান্তি। গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডারের হিসেবে উত্তরায়ণ শুরু হয় ২২ ডিসেম্বর। অথচ বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মকর সংক্রান্তি উৎসব পালিত হয় ১৫ জানুয়ারি নাগাদ — সেই ২৩ দিনের তফাত। কর্কট ক্রান্তির বেলাতেও দেখা যায় সেই একই হিসেব। যে ভুলটুকুর জন্য এত গরমিল সেটুকু শুধরে না নিয়ে এইভাবে চলতে থাকলে ১৪০০ বছর পরে বাংলা নববর্ষ পালিত হবে আরও ২৩ দিন পরে অর্থাৎ, ৭ বা ৮ মে। প্রাচীনকাল থেকে যা চলে আসছে তাকে আঁকড়ে ধরে না থেকে এই ভুলটুকু এখনি শুধরে নেওয়া প্রয়োজন।
ভুল শোধরানোর চেষ্টা যে হয়নি তা নয়। ১৯৫২ সালে ভারত সরকার বিজ্ঞানী ড. মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বে ভারতীয় রাষ্ট্রীয় পঞ্জিকা সংস্কার কমিটি গঠন করেন১৯৫৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা পঞ্জিকায় কয়েকটি পরিবর্তন সুপারিশ করেন। এই সুপারিশে বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস ৩১ দিনে এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস ৩০ দিনে করার কথা বলা আছে। গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী যে বছর লিপ-ইয়ার সেই বছরে চৈত্র মাস ধরতে হবে ৩১ দিনে। এরপরে আশির দশকে ড. সাহা কর্তৃক প্রবর্তিত পঞ্জিকায় অধিকতর উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে কিছু পরিবর্তন আনা হয়। লিপ-ইয়ারে বা অধিবর্ষে চৈত্র মাসের পরিবর্তে ফাল্গুন মাসকে ৩১ দিন ধরার কথা বলা হয়। শুধু তাই নয়, দিন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিয়মানুসারে রাত ১২টা সুপারিশ করা হয়। বিজ্ঞানভিত্তিক এই বাংলা পঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডার বাংলাদেশ সরকার গ্রহণ করলেও আমাদের দেশে সনাতনপন্থী পঞ্জিকাকারদের প্রবল বাধায় তা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে বাংলাদেশে চৈত্রসংক্রান্তি এবং বাংলা নববর্ষ নির্দিষ্ট দিনে (যথাক্রমে ১৩ এপ্রিল এবং ১৪ এপ্রিল) পালিত হলেও ভারতবর্ষে এই উৎসব কোনও কোনও বছরে ভিন্ন দিনে (যথাক্রমে ১৪ এপ্রিল এবং ১৫ এপ্রিল) পালিত হতে দেখা যায়। এমনকী দুর্গা পূজার তিথির ক্ষেত্রেও কখনও কখনও ভিন্ন পঞ্জিকায় ভিন্ন মত লক্ষ্য করা যায়।
আমরা জানি বারো মাসে এক বছর হয়কিন্তু অনেকেরই জানা নেই কেন বছরকে ১২ মাসে ভাগ করা হল? আর এই বারো মাসের নামগুলোই বা এল কী ভাবে? পৃথিবী সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে যে সময় নেয় তাকে আমরা বছর বলি। আর পৃথিবীর চারপাশে একবার ঘুরে আসতে চাঁদের যে সময় লাগে তাকে বলা হয় মাস। দুটি সময়ের তুলনা করলে দেখা যাবে চাঁদ বছরে পৃথিবীকে ১২ বার পাক খায়। এই ১২ বার প্রদক্ষিণের পথে ২৭টি নক্ষত্র মণ্ডলের সঙ্গে চাঁদের সাক্ষাৎ হয়। পূর্ণিমার দিনে চাঁদ যে নক্ষত্র মণ্ডলে থাকে সেই নক্ষত্র মণ্ডলের নামানুসারেই (বাংলা নাম) সেই মাসের নাম রাখা হয়েছে। যেমন, বিশাখা থেকে বৈশাখ, জেষ্ঠা থেকে জৈষ্ঠ, আষাঢ়া থেকে আষাঢ়, শ্রবণা থেকে শ্রাবণ, ভাদ্রপদ থেকে ভাদ্র, অশ্বিনীকুমার থেকে আশ্বিন, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, মৃগশিরা অগ্রহায়নী থেকে অগ্রহায়ণ, পুষ্যা থেকে পৌষ, মাঘী থেকে মাঘ, ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন এবং চিত্রা থেকে চৈত্র।

ভারতবর্ষে প্রাচীনতম মহাকাশ চিন্তায় তারকা এবং নক্ষত্র শব্দ দুটির মধ্যে তেমন কোনও পার্থক্য দৃষ্ট হয় না। পরে নক্ষত্র অর্থে চান্দ্রপথের উপরে অবস্থিত কয়েকটি তারকামণ্ডল বোঝাত।
প্রাচীন ভারতবর্ষে কাল (সময়) গণনার দুটি ভিন্ন পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। প্রথমটি চান্দ্রতিথি সংক্রান্ত, দ্বিতীয়টি রাশি সংক্রান্ত। তিথি সংক্রান্ত পদ্ধতিটি রাশির বহু পূর্বে আবিষ্কৃত।
- প্রাচীন ভারতে জ্যোতির্বিজ্ঞান; অরূপরতন ভট্টাচার্য, কলকাতা, পৃঃ ৬৯ 

তথ্য সূত্রঃ
১) Hindu Astronomy; W. Brennand, London, 1896
২) History of calendars - Wikipedia
৩) Bengali calendars - Wikipedia
৪) প্রাচীন ভারতে বিজ্ঞান চর্চা; রমেশচন্দ্র মজুমদার, কলিকাতা, ১৩৬৩
৫) প্রাচীন ভারতে জ্যোতির্বিজ্ঞান; অরূপরতন ভট্টাচার্য, কলকাতা, ১৯৭৫

       
_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

বিজ্ঞান:: মহাকাশে কান্না - কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়


মহাকাশে কান্না
কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রায় এক বছরের চেষ্টায় পিন্টু আর চিন্টু দু’জনে মিলে মহাকাশযানটা বানিয়ে ফেলল। কেউ যাতে দেখে না ফেলে তাই সেটাকে পিন্টু ওদের বাড়ির পিছনের বাগানে একটা ঝোপের আড়ালে রেখে দিয়েছে। এখন শুধু ওড়ার অপেক্ষায়। এত অত্যাধুনিক মহাকাশযান এর আগে তৈরি হয়নি। বিল্ট-ইন রকেট থাকায় একে মহাকাশে তোলার জন্য আলাদা করে কোনও রকেটের দরকার হয় না। ঠিক হয়েছে আগামীকালই এতে চড়ে ওরা মহাকাশে একটা চক্কর মেরে আসবে।
দুই বন্ধু পাশাপাশি বাড়িতে থাকে। একই সাথে বড়ো হয়েছে। অ্যারোনটিক্স-ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময়েই পিন্টুর মাথায় এই নতুন ধরনের মহাকাশযান বানানোর মতলব ঘুরপাক খেতে শুরু করেছিল। চিন্টুর সাহায্য নিয়ে এতদিনে সেই স্বপ্ন সফল হয়েছে।

পিন্টু, চিন্টুকে নিয়ে পূর্ব নির্ধারিত সময়েই মহাকাশযান আকাশে উড়ল। দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে। মহাকাশযানের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই পিন্টু-চিন্টু দু’জনেই অবাক। মহাকাশজুড়ে শুধু গ্যালাক্সি আর গ্যালাক্সি। সীমাহীন মহাকাশে গ্যালাক্সিগুলি অর্থাৎ, তারাজগতগুলি যেন দলবেঁধে ভেসে বেড়াচ্ছে। প্রতিটি গ্যালাক্সিতে রয়েছে গ্রহ-নক্ষত্রের মেলা। চিন্টু হঠাৎ পিন্টুর পিঠে আলতো টোকা মেরে মহাকাশের একদিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, “ওইদিকে দেখ, একটা হালকা আলো দেখা যাচ্ছে না?”
পিন্টু সেইদিকে তাকিয়ে বলল, “তাই তো! একটা হালকা নীল আলো দেখা যাচ্ছে। দাঁড়া, দূরবীনটা দিয়ে ভালো করে দেখি।”
দূরবীনে চোখ রেখে একটু পরে পিন্টু বলল, “ওটা প্যান্ডোরাস তারাজগতগুচ্ছ (Pandora’s Cluster)। ওখান থেকেই আলোটা আসছে।”
“বিজ্ঞানীরা যাকে ‘আবেলি ২৭৪৪’ বলে?”
“ঠিক বলেছিস, চিন্টু।”
“ওখান থেকে ওরকম আলো বের হচ্ছে কেন? অন্য তারাজগতগুচ্ছগুলি থেকে তো বের হচ্ছে না?”
“তারাজগতগুলি যখন জোট বেঁধে তারাজগতগুচ্ছ তৈরি করে তখন অনেক সময় দুটি তারাজগতের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। এই বিধ্বংসী সংঘর্ষে বহু তারা নিজের নিজের তারাজগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরা তখন সেই তারাজগতগুচ্ছে ভবঘুরের মতো একা একা ঘুরে বেড়াতে থাকে। টফির দুটি প্রান্ত ধরে টানলে যেমন মাঝখানটা সরু হতে হতে একসময় ছিঁড়ে যায় তেমন সংঘর্ষের ফলে ও মহাকর্ষ বলের টানে কখনও কখনও কোনও কোনও তারাজগতেরও তেমনি দশা হয়। ছিন্নভিন্ন হয়ে নিষ্প্রভ এই তারাজগতগুলি তারাজগতগুচ্ছের মধ্যে মৃতবৎ অবস্থায় ঘুরে বেড়ায়। প্যান্ডোরাস তারাগুচ্ছের মধ্যে ছয় বিলিয়ন বছর ধরে ছিন্নভিন্ন হওয়া এরকম ছ’টি মৃতবৎ তারাজগত আছে। ছিন্নভিন্ন তারাজগতগুলির যে তারাগুলি ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে সেগুলির জ্বালানি শেষ হয়ে গেছে। পুরো তারাজগতগুচ্ছটিতে এইধরনের তারা আছে দুশো বিলিয়নের মতো। এই তারাগুলি নিষ্প্রভ হলেও এগুলি থেকে এখনও একধরনের হাল্কা নীলাভ আলো বেরিয়ে আসছে। সেটাই আমরা দেখতে পাচ্ছি।”
মহাকাশের এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যে মহাকাশযান একটা কৃষ্ণ-গহ্বরের সামনে এসে পড়েছে ওদের খেয়ালই ছিল না। যখন খেয়াল হল তখন সেটা ঘটনা দিগন্তর কাছাকাছি এসে পড়েছে। আর কিছুটা গেলেই সেটা ঢুকে পড়বে ঘটনা দিগন্তে। তারপর সেটা ভাসতে ভাসতে এগিয়ে যেতে থাকবে কৃষ্ণ-গহ্বরের দিকে। সেখান থেকে কোনওমতেই আর বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে ঢুকে যাবে কৃষ্ণ-গহ্বরে। তারপর? না, তারপরের কথা চিন্টু আর ভাবতে পারছে না। স্টিফেন হকিং-এর কথা মনে পড়তেই ও শিউরে উঠল। বাস্তব কালের পরিপ্রেক্ষিতে দু’জনের কারোরই আর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। আর সেই মৃত্যু হবে ভয়ংকরভাবে। কী ঘটবে তখন? মাথা এবং পায়ের দিকে মহাকর্ষীয় বলের পার্থক্যের দরুণ তাদের দেহ ক্রমশ লম্বা হতে থাকবে। শেষে সরু সুতোর মতো হয়ে ছিঁড়ে যাবে। যদিও মহাবিশ্বে বাস্তব কাল বলে কিছু নেই। তাই কাল্পনিক কালের প্রেক্ষিতে বিচার করলে এমনটা নাও ঘটতে পারে। পিন্টু-চিন্টুর প্যাকাটির মতো সরু হয়ে যাওয়া শরীরে হয়তো প্রাণটা ধুকপুক করতে থাকবে। কৃষ্ণগহ্বর থেকে কণিকা এবং বিকিরণ বেরিয়ে এলে সেটার ভর কমতে থাকবে এবং সেটা ছোটো হতে হতে একসময় হয়তো মিলিয়ে যাবে। যদি এমনটা ঘটে তাহলে ইতিমধ্যে ওই কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যে পড়ে থাকা অন্যান্য বস্তুর সঙ্গে পিন্টু-চিন্টু নিজস্ব একটি শিশু-মহাবিশ্বে চলে যাবে যার স্থান, কাল সবই কাল্পনিক। জানা নেই সেখানে তারা কেমন থাকবে।
পিন্টু প্রাণপণ চেষ্টা করছে মহাকাশযানটাকে ঘটনা দিগন্ত থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে। কিন্তু পারছে না। একটার পর একটা বোতাম টিপেই চলেছে। শেষ পরিণতির কথা ভেবে চিন্টু ভয়ে কাঠ হয়ে বসেছিল। এবারে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল। আর কী আশ্চর্য, মহাকাশযান ঘটনা দিগন্তর ঠিক সীমানার কাছে এসে দাঁড়িয়ে গেল। পিন্টু হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। নিজের মনে বলল, ‘যাক, মহাকাশযানটাকে আটকানো গেছে। এবারে এখান থেকে বেরিয়ে যাবার পথ খুঁজতে হবে।’
হঠাৎ চিন্টুর দিকে চোখ ফেরাতেই অবাক হয়ে পিন্টু বলল, “কী হল তোর? ওরকম ভেংচি কাটছিস কেন?”
“কোথায় ভেংচি কাটছি?”
“তাহলে ওরকম মুখ করে বসে আছিস কেন?”
পিন্টু ওর মুখের সামনে একটা আয়না ধরে বলল, “দ্যাখ, তোর মুখের অবস্থা।”
চিন্টু এবার হেসে ফেলল। বলল, “ধ্যাৎ, আমি মোটেই ভেংচি কাটছিলাম না। ভয়ে আমার কান্না পেয়ে গিয়েছিল।”
“এই তোর কান্নার ছিরি? চোখ থেকে তো এক ফোঁটাও জল পড়ল না!”
পিন্টুর কথা শুনে চিন্টু গালে হাত দিয়ে অবাক হয়ে গেল। হু-হু করে যেভাবে কাঁদছিল তাতে তো চোখের জল গাল বেয়ে টপ টপ করে পড়ার কথা। কিন্তু গাল তো শুকনো! জল গেল কোথায়?
চিন্টুর অবস্থা দেখে পিন্টু হো হো করে হেসে বলল, “তুই কি কুমিরের কান্না কাঁদছিলি?”
এবারও এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। পিন্টু হো হো করে হেসে উঠতেই মহাকাশযান ছিটকে ঘটনা দিগন্ত থেকে দূরে সরে এল। তারপর পৃথিবীর উদ্দেশ্যে চলতে শুরু করল।
এতক্ষণে চিন্টুর মুখে হাসি ফুটেছে। পিন্টুর দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ রে, কান্নার সময় আমার চোখ থেকে জল পড়ল না কেন রে?”
চিন্টুর দিকে তাকিয়ে পিন্টু বলল, “তোর ভয় এখনও কাটেনি দেখছি। বিজ্ঞানটাই ভুলে গেছিস। এখানে কি কোনও মাধ্যাকর্ষণ আছে যে চোখ থেকে জল পড়বে?”
“তাই তো!” বলে চিন্টু জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মহাকাশের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে গুন গুন করে গান ধরল।
_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

বিজ্ঞান:: বৈকালিক ভ্রমণে হাতি - কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়


বৈকালিক ভ্রমণে হাতি
কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

নিয়ম করে সকালে বা বিকালে ভ্রমণের অভ্যাস কি পশুপাখিদের মধ্যে আছে? অনেক ভেবেচিন্তে উত্তর দিলেও উত্তরটা সম্ভবত না-ই হবে। খাবারের খোঁজে এরা কখনও কখনও এক জঙ্গল থেকে আরেক জঙ্গলে যায় ঠিকই, তবে সেটাকে ভ্রমণ বলা যায় না। পরিযায়ী পাখিদের ক্ষেত্রেও এই একই কথা খাটে। তবে ভ্রমণের এই বিরল দৃশ্য দেখা যাবে কেনিয়ার সংরক্ষিত সাভানা অঞ্চলে অর্থাৎ, মাউন্ট এলগন ন্যাশনাল পার্কে গেলে। সেখানকার তৃণভোজী পশুদের মধ্যে বিশেষ করে হাতিদের মধ্যে এই অভ্যাস আছে সারাদিন ঘুরে ঘুরে পেট পুরে খেয়ে বিকেল হতে না হতেই আফ্রিকার এই হাতিগুলি দলবেঁধে বেড়াতে বের হয়। যায় ‘এলগন’ পাহাড়ের (Mt. Elgon) দিকে। অন্ধকার হওয়ার আগেই আবার তারা ফিরে আসে। ভাবখানা যেন, ‘পেট পুরে খাওয়া দাওয়ার পর একটু পায়চারি না করলে কি চলে? হজম হবে না যে!’ এই সাভানা হাতিদের স্বভাবের সঙ্গে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার জঙ্গলে যে হাতিদের দেখতে পাওয়া যায় তাদের স্বভাবের কোনও মিল নেই।
কেনিয়া ও উগান্ডা পাশাপাশি দুটি দেশের সীমারেখা বরাবর দাঁড়িয়ে আছে ৪,৩২১ মিটার (১৪,১৭৭ ফুট) উঁচু এলগন পাহাড়। এর ১০০ কিলোমিটার উত্তরে আছে ভিক্টোরিয়া হ্রদ। আফ্রিকার পাহাড়গুলির মধ্যে উচ্চতার বিচারে এটি অষ্টম স্থানে আছে। এই পাহাড়ের গায়ে একটা গুহা আছে। গুহাটা অদ্ভুত। প্রতিদিন একটু একটু করে বড়ো হচ্ছে। হাতির দল নিয়ম করে এই গুহার মধ্যে যায়, আবার বেরিয়ে আসে। কী আছে ওই গুহায়?
এলগন পাহাড় প্রকৃতপক্ষে একটা মৃত আগ্নেয়গিরি। বহু বছর আগে যখন জীবন্ত ছিল তখন অগ্ন্যুতপাতের ফলে কোনও এক সময় এই গুহাটা তৈরি হয়েছিল। সে সময় গুহার আকার অনেক ছোটো ছিল। প্রতিদিন একটু একটু করে বেড়ে বেড়ে বর্তমানে এটা ২০০ মিটারের (৭০০ ফুট) মতো গভীর। এখনও বেড়ে চলেছে। কোথায় গিয়ে শেষ হবে তা জানা নেই। এই গুহা দীর্ঘদিন মানুষের চোখের আড়ালেই ছিল। ১৯৮০ সালে ফ্রান্সের এক পর্যটক প্রথম এই গুহার খোঁজ পান। তবে সেখান থেকে ফিরে আসার পর মারবুগ ভাইরাসে  (Marburg virus) আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। এরপরে ১৯৮৭ সালে ওই গুহা দেখে ফেরার পর ১৫ বছরের এক ড্যানিশ যুবক ওই একই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এই গুহায় অনেক ফলাহারি বাদুরের বাস যাদের থেকে ইবোলা রোগ ছড়ায়


বেঁচে থাকার জন্য সকল প্রাণীর দেহে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ নুন থাকা দরকার। শরীরে এই নুন আসে মূলত খাবারের সঙ্গেতা না হলে বাইরে থেকে তা জোগাড় করতে হয়। মাংসাশী প্রাণীরা তাদের প্রয়োজনীয় নুন শিকারের রক্ত ও মাংসের সঙ্গে পেয়ে যায়। অসুবিধায় পড়ে তৃণভোজী প্রাণীরা। প্রয়োজনীয় নুন ওই ধরনের খাবারে থাকে না। তাই তাদের আলাদা করে নুন খাবার দরকার হয়।
এলগন পাহাড়ের গায়ে যে লাভার আস্তরণ আছে তাতে প্রচুর সোডিয়াম যৌগ রয়েছে। গুহার পাশে আছে একটা ঝর্না। সেই জলে ভিজে ভিজে সেখানকার পাথর তুলনামূলকভাবে নরম। বিশেষজ্ঞদের অনুমান দীর্ঘদিন ধরেই পশুপাখির দল এখানে জলের খোঁজে আসত। হাতির দলও আসত। কোনও একদিন জল পান করার সময় কোনও একটি হাতির শুঁড় জলের ভিতর দিয়ে পাথরের গায়ে ঠেকে যায়। আরে! নোনতা নোনতা লাগছে না? টুক করে পাথরের একটা ছোটো টুকরো ভেঙে নিয়ে মুখে পুরে দিল। কড়মড় করে চিবোতেই বুঝে গেল এই পাথরে নুন আছে। দ্রুত খবর চলে গেল দলের অন্যান্য হাতিদের কাছে। তারাও দেওয়াল থেকে পটাপট পাথর ভেঙে মুখে পুরতে লাগল। বাহ্‌, নুনের খোঁজে এখানে সেখানে যাবার তো আর দরকার নেই কাছাকাছি এই গুহায় চলে এলেই তো হল অন্যান্য হাতির দলের কাছে এই খবর পৌঁছতে দেরি হল না। এরপর থেকেই সারাদিনের খাওয়াদাওয়া সেরে হাতির দল নিয়ম করে এই গুহায় আসে। অন্ধকার গুহায় পাশের দেওয়ালে শুঁড় ঠেকিয়ে ঠেকিয়ে ভিতরে চলে যায়। তারপর লবণাক্ত দেওয়াল থেকে পাথরের ছোটো ছোটো টুকরো ভেঙে মুখে পুরে চিবোতে চিবোতে বেরিয়ে আসে। যেন ভুরিভোজের পর একটু মুখশুদ্ধি খাওয়া, এই আর কী। দেওয়াল ভাঙার সময় দু’চারটে ছোটো টুকরো নিচে পড়ে যেতেই পারে। সেগুলি খোঁজার আগ্রহ বা ধৈর্য হাতিদের নেই। তাই গুহার ভিতরে সেগুলি পড়ে থাকে। অন্যান্য তৃণভোজী প্রাণীরা এখানে জল পান করতে এসে তার দু’চারটি মুখে তুলে নেয়। তবে তারা হাতিদের মতো নিয়ম করে কোনও নির্দিষ্ট সময়ে আসে না। অন্ধকার গুহায় হাতিরা যে দুর্ঘটনায় পড়ে না এমনটা নয়। গুহার ভিতরে ছোটো বড়ো অনেক ফাটল আছে। মায়েদের সঙ্গে আসা হাতির বাচ্চারা অনেক সময় অন্ধকারে অসাবধানতাবশত ওই ফাটলে পড়ে গিয়ে মারা যায়।
বছরের পর বছর এই রুটিন চলে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এইভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ‘মাউন্ট এলগন কেভ’ বা ‘কিটুম কেভ’ আর গুহা থাকবে না একটা সুড়ঙ্গ হয়ে যাবে। তখন এটাই হবে পৃথিবীর একমাত্র হাতির দ্বারা তৈরি সুড়ঙ্গপথ। যদিও এখনই এটা হাতির তৈরি গুহা নামে বিশ্বখ্যাত।

_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

বিজ্ঞান:: জলের নিচে ডক্টরস্‌ চেম্বার - কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

জলের নিচে ডক্টরস্‌ চেম্বার
কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

ডাক্তার মাছ Wrasse


আমি আজ তোমাদের এমন এক গল্প বলব যা শুনে তোমাদের রূপকথার গল্প বলেই মনে হবে। তবে এই গল্প কোনও রাক্ষস-খোক্ষস, দত্যি-দানো বা আকাশপথে উড়ে আসা পরিদের নিয়ে নয়। যাদের কথা বলব তাদের সঙ্গে ইচ্ছে করলে তোমরা দেখা করতে পারবে। ভাবছ কীভাবে যাবে সেখানে? আমার গল্পটা পড়লেই বুঝতে পারবে।
অসুখ করেছে? কী করবে? নিশ্চয়ই ডাক্তার দেখাবে? ডাক্তারবাবু ওষুধ লিখে দেবেন। আর তা খেয়ে ভালো হয়ে যাবে। এ পর্যন্ত ঠিক আছেকিন্তু ডাক্তারবাবু যদি জলের নিচে থাকেন? আর তার চেম্বারটিও যদি জলের তলায় হয়? তাহলে ডাক্তার দেখাবে কীভাবে? ডুবুরির পোষাক পরে যাবে সেখানে? ভাবছ, এ আবার কেমন ডাক্তার? চেম্বার খোলার আর জায়গা পেল না? শেষে কিনা জলের নিচে? তাহলে আসল কথাটা বলি। এই ডাক্তারখানা আমাদের জন্য নয়। এখানে চিকিৎসা হয় মাছেদের। উঁহুঁ, অ্যাকোয়ারিয়ামের মাছ নয়, রীতিমতো সমুদ্রের মাছ।
অসুখ শুধু মানুষের হবে এমন তো কোনও কথা নেই? পশু, পাখি, গাছ, লতাপাতা সবারই অসুখ হতে পারে। তাহলে মাছই বা বাদ যাবে কেন? ওদেরও অসুখ হয়। পুকুরে, খালে, বিলে যে সব মাছ চাষ করা হয় বা অ্যাকোয়ারিয়ামে যে সব মাছ সাজিয়ে রাখা হয় তাদের অসুখ করলে মাছের বিশেষজ্ঞরা দেখভাল করেন। কিন্তু সমুদ্রে যে সব মাছ আছে তাদের অসুখ করলে কে দেখবে? সমুদ্রের তলায় গিয়ে চিকিৎসা করা তো আর মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়? তাছাড়া সমুদ্রের নিচে কোনও মাছের অসুখ করলে ডাঙায় বসে তো আর জানা যায় না? এছাড়াও আরও একটা ব্যাপার আছে। খরচখরচা কে দেবে? জলের নিচে যে জগৎ রয়েছে তাদের নিয়ম আর আমাদের সমাজের নিয়ম তো আর এক নয়? সেখানে টাকা পয়সার কোনও ব্যাপার নেই। সবকিছু ফ্রি। তাহলে কে সেই ডাক্তার যাঁর মাছেদের প্রতি এত ভালোবাসা? নিখরচায় চিকিৎসা করার জন্য জলের নিচে গিয়ে চেম্বার খুলে বসেছেন?
আমাদের সমাজে ডাক্তার হতে গেলে চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করতে হয়। মাছেদের জগতে তার কোনও প্রয়োজন নেই। সেখানে যে কেউ ডাক্তার হতে পারে না। প্রকৃতির নিয়মে বিশেষ কয়েকটি জাতের মাছ আছে যারা পেশায় ডাক্তার। এদের কাছে চিকিৎসা করাতে যেসব রোগী মাছেরা আসে তাদের কিন্তু কোনো গাঁটের পয়সা খরচ করতে হয় না। নিখরচায় চিকিৎসা করলেও ডাক্তার মাছেরা তাদের কর্তব্যে অবহেলা করে না। বরং সব সময় চেষ্টা করে রোগীদের সাহায্য করতে। ডাক্তার না হয়েও কারও অসুখ হতে দেখলে উপদেশে উপদেশে তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলা আমাদের স্বভাব। পারলে দু’চারটে ওষুধও প্রেসক্রাইব করে দিইমাছেদের মধ্যে এধরনের স্বভাব দেখা যায় না। ডাক্তার মাছ ছাড়া কেউই ডাক্তারি করার চেষ্টা করে না। এ ব্যাপারে এরা ভীষণ শৃঙ্খলাপরায়ণ। এই একটি ক্ষেত্রে মাছেরা মানুষকে টেক্কা দিয়েছে।
আমাদের মধ্যে যেমন সব দেশেই ডাক্তার আছে মাছেদের রাজত্বেও তেমন প্রায় সব অঞ্চলেই ডাক্তার মাছের দেখা পাওয়া যায়। প্রায় পঁয়তাল্লিশ রকমের মাছ এই পেশায় যুক্ত। অঞ্চল ভেদে এদের গায়ের রঙ ভিন্ন ভিন্ন হয়। এ ব্যাপারে উষ্ণমণ্ডলের ডাক্তারবাবুরা নাতিশীতোষ্ণমণ্ডলের ডাক্তারবাবুদের থেকে অনেক বেশি চটকদার। নাতিশীতোষ্ণমণ্ডলের ডাক্তার মাছেদের গায়ের রঙ সাধারণত সাদামাটা হয়। সেখানে উষ্ণমণ্ডলের ডাক্তার মাছেদের গায়ে থাকে উজ্জ্বল রঙের লম্বা লম্বা দাগ। গায়ের এই বিশেষ ধরনের রঙ ডাক্তার মাছেদের চিনতে সাহায্য করে। আমরা যেমন গাড়ির সামনে ‘রেডক্রস’ চিহ্ন দেখলেই বুঝতে পারি এটি ডাক্তারবাবুর গাড়ি তেমনি এই বিশেষ গায়ের রঙ বা পোষাক দেখেই মাছেরা চিনতে পারে তাদের ডাক্তারবাবুদের। এই পোষাকই আবার শিকারি মাছেদের হাত থেকে ডাক্তার মাছেদের প্রাণে রক্ষা করে। আসলে ওরাও বোঝে যে ডাক্তারবাবুদের খেয়ে ফেললে ওদের রোগ সারাবে কে? তাই ডাক্তার মাছেদের শিকার ভেবে ওরা ‘কপাৎ-কোঁৎ’ করে না।
মাছেদের মধ্যে কিছু দুষ্ট মাছ যে নেই এমন নয়। যেমন ব্লেনি মাছ (Blenny fish)এদের গায়ের রঙ আর সুপরিচিত ডাক্তার মাছ র‌্যাসে (Wrasse)-র গায়ের রঙ প্রায় কাছাকাছি। এরা এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে ভুয়ো ডাক্তার সাজে। রোগীরা ভুল করে এদের কাছে এলেই এরা মহানন্দে ভোজ শুরু করে দেয়। বিনা খাটুনিতে শিকার ধরার এমন সুযোগ কি ছাড়া যায়? সত্যিকারের ডাক্তার মাছেরা কিন্তু এমনটি কখনই করে না। বরং মাঝেমাঝে তারাই শহিদ বনে যায়। সে কথায় পরে আসছি। আগে দেখে নেওয়া যাক ডাক্তার মাছেরা কীভাবে চিকিৎসা করে থাকে।
ডাক্তার মাছেরা যেসব অঞ্চলে বসবাস করে সেই সব অঞ্চলই হয়ে ওঠে এক একটা ডাক্তারখানা। সমুদ্রের নিচে কোথায় কোন ডাক্তার মাছ আছে সে খবর রোগী মাছেদের কাছে পৌঁছতে সময় লাগে না। চিকিৎসার উদ্দেশ্যে কিছুদিনের জন্য তারা এসে আস্তানা গাড়ে এই সব ডাক্তারখানার চৌহদ্দিতে। স্যুটেড-বুটেড ডাক্তারবাবু চেম্বারে বসে আছেন। পাশে রাখা আছে স্টেথস্কোপ। রোগীরা চেম্বারের বাইরে অপেক্ষা করছেন। ডাক এলে দুরু দুরু বুকে দরজা ঠেলে চেম্বারে ঢুকছেন — আমাদের সমাজে ডাক্তারবাবুদের ছবিটা অনেকটা এরকম। মাছেদের দেশে কিন্তু ব্যাপারটা অন্যরকম। ডাক্তার মাছেদের সুনির্দিষ্ট এলাকা তথা চেম্বার থাকলেও এরা চেম্বারে এক জায়গায় বসে থাকে না। পুরো এলাকা জুড়েই ঘুরপাক খেতে থাকে। সেই সঙ্গে রোগীরা কেমন আছে, কার কী অসুবিধা হচ্ছে তারও খোঁজখবর নেয়। নতুন কোনও রোগীকে আসতে দেখলেই ছুটে যায় তার কাছে। প্রথমে প্রীতি সম্ভাষণ। তারপর শুরু হয় খোঁজখবর নেওয়া — কী ধরনের অসুখ হয়েছে, অসুখ কতটা জটিল আকার ধারণ করেছে ইত্যাদি। আগেই বলেছি, আমাদের সমাজে ডাক্তার দেখাতে হলে রোগীকে বেশ ভালো মতোই ট্যাঁকের কড়ি গুণতে হয়। তার সঙ্গে আছে ওষুধ, পথ্যের খরচ। রোগী মাছেরা কিন্তু এব্যাপারে নিশ্চিন্ত। ডাক্তার দেখানোর জন্য কোনও খরচ করতে হয় নাআসলে ডাক্তার মাছেরা সবাই সেবাপরায়ণ। তাই মাছেদের ডাক্তারখানাগুলিকে সেবাকেন্দ্র বলাই ভালো। অনেকেই হয়তো ভাবছ ছুরি, কাঁচি, ওষুধ, পথ্য ছাড়া ডাক্তার মাছেরা চিকিৎসা করে কীভাবে? শুনলে অবাক হবে। শুধুমাত্র দু’টি ঠোঁটের সাহায্যে এরা চিকিৎসা চালিয়ে যায়। সব ধরনের রোগের চিকিৎসা এরা করতে পারে না ঠিকই, তবে আঘাত লেগে সৃষ্টি হওয়া ক্ষত, ব্যাকটিরিয়া বা ছত্রাক আক্রান্ত ক্ষত, মুখের ভিতরে বা বাইরে পরজীবীর আক্রমণ ইত্যাদি রোগগুলির চিকিৎসা এরা ভালোভাবেই করে থাকে। এই ধরনের রোগই মাছেদের বেশি হয় বলে ডাক্তার মাছেদের সেবা কেন্দ্রে রোগীর ভিড় লেগেই থাকে। রোগীর মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত পরীক্ষা করে ডাক্তারবাবুর হয়তো মনে হয়েছে রোগীর পাখনার নিচে ক্ষত হয়েছে। অমনি সে পাখনার কাছে মুখ নিয়ে ঠুক্‌ ঠুক্‌ করে দুটো ঠোক্কর মারল। যেন বলতে চাইছে, ওহে পাখনাটা একটু তোলো , কী হয়েছে দেখি। রোগীও বুঝে গেল, তাকে পাখনা তুলে ধরতে বলা হচ্ছে। পাখনা তুলে ধরতেই ডাক্তারবাবু পাখনার নিচে গিয়ে খুঁটে খুঁটে সবকিছু পরিষ্কার করে দেয়। হয়তো কানকোটা একটু খুলে রাখতে হবে, সেখানে ছত্রাক আক্রমণ হয়েছে। আবার সেই আলতো ঠোক্কর। রোগী কানকো আলগা করতেই ডাক্তারবাবুর শুরু হয়ে গেল সাফাই-এর কাজ। দেহের বাইরেটা চেকআপ করতে বা চিকিৎসা করতে ডাক্তারবাবুদের কোনও অসুবিধা হয় না। সমস্যা হয় যদি রোগীর মুখের ভিতরে কোনো ক্ষত থাকে। সেটা তো আর বাইরে থেকে চিকিৎসা করা যায় না? মুখের ভিতরে শরীরটাকে ঢুকিয়ে দিয়ে তবেই চিকিৎসা করতে হয়। আর তখন যদি কোনও রোগী কপাৎ-কোঁৎ করে ফেলে? তাহলে তো ডাক্তারবাবুর ভবলীলা সাঙ্গ। তবে কি ডাক্তারবাবুরা কোনো রোগীর মুখের ভিতরে ক্ষত হলে চিকিৎসা করবে না? সেবার কাজে যারা নিজেদের উৎসর্গ করেছে তাদের কি ভয় পেলে চলে? তাই অকুতোভয়ে ডাক্তার মাছেরা সুড়ুৎ করে রোগীর হাঁ-করা মুখে ঢুকে পড়ে। আগেই বলেছি, রোগীরা জানে ডাক্তারবাবুকে গলাধঃকরণ করলে পরে তাদের চিকিৎসা করবে কে? তাই ডাক্তারবাবু কাজ সেরে মুখের ভিতর থেকে বেরিয়ে না আসা পর্যন্ত রোগীরা মুখ হাঁ করেই রাখে। উষ্ণমণ্ডলের ডাক্তার মাছেরা তো বারকুইডার মতো হিংস্র মাছের মুখের ভিতরে নির্ভয়ে ঢুকে পড়ে। চিকিৎসার কাজ সেরে আবার সুস্থ শরীরে বেরিয়েও আসে। নাতিশীতোষ্ণমণ্ডলের ডাক্তার মাছেদের ভাগ্য কিন্তু এত ভালো নয়। কারণ এখানে কিছু দুষ্ট মাছ আছে। এরা রোগী সেজে ডাক্তারবাবুর চেম্বারে চলে আসে। ডাক্তারবাবু সরল মনে এদের মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত চেকআপ করে কোনও রোগ খুঁজে না পেয়ে যেই না মুখের ভিতর ঢুকেছে অমনি দুষ্ট মাছটি গপ্‌ করে ডাক্তারবাবুকে গিলে পেটে চালান করে দেয়। এরা তো আর চিকিৎসা করাতে আসেনি! এসেছে শিকার ধরতে। মজার কথা হল যে ডাক্তার মাছেরা যখন এদের দেহের বাইরেটা চেকআপ করে তখন এরা ঘাপটি মেরে থাকে — যেন ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানে না। ডাক্তার মাছ তো শহিদ হল। এবার অন্য ডাক্তার মাছেরা কী করবে? কর্মবিরতি (Strike) পালন করবে, না ধর্নায় বসবে? না, কোনওটাই এরা করবে না। সেবা করাই এদের ধর্ম। আর সেই কাজ করতে গিয়ে যদি শহিদ হতে হয়, হতে হবে?— এমনই এদের ভাবখানা।
আমাদের সমাজে ডাক্তারবাবুরা যেখানে সেখানে চেম্বার খোলেন নাপসার জমবে এমন জায়গা বেছে নিয়ে চেম্বার খোলেন ডাক্তার মাছেরাও কিন্তু জলের নিচে যেখানে সেখানে চেম্বার খোলে না। এদেরও পছন্দ-অপছন্দের জায়গা আছেএদের পছন্দের জায়গাগুলি হল, জলের নিচে যেখানে সাদা বালি আছে, পাথরের স্তূপ আছে, প্রবাল আছে এমন সব জায়গা। ফলে ডাক্তার মাছেদের চেম্বার চিনতে রোগী মাছেদের কোনও অসুবিধা হয় না।
ডাক্তার মাছেদের কথা তো শুনলে। এটাও জানলে যে প্রায় সর্বক্ষণ এরা চিকিৎসা করতেই ব্যস্ত থাকে। কখনও ভেবেছ কি, এরা খায় কখন, কী-ই বা খায়? না খেয়ে তো বেঁচে থাকা যায় না? আসলে এরা খাওয়া দাওয়া আর সেবা দুটোই একসঙ্গে করে। রোগীর দেহের পরজীবী, ক্ষতস্থানের মৃতকোষ এদের খাদ্য। এই খাদ্য সংগ্রহের জন্যই পরোপকারে এরা এত উৎসাহী। তাহলে বুঝতে পারছ, সেবার নামাবলী গায়ে চাপিয়ে যে সেবাকার্য এরা করে তা একেবারে নিঃস্বার্থ নয়।
এবারে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ, ঐ রূপকথার দেশে কীভাবে যেতে হবে? হ্যাঁ, হয় ডুবুরির পোশাকে নয়তো ডুবোজাহাজে। সেখানে গেলে ডাক্তারবাবুকে দিয়ে শরীরটা একবার দেখিয়েও নিতে পার। খরচপত্তর কিছু লাগবে না।
***********
ছবিঃ আন্তর্জাল

ইতিহাস:: রহস্যময় ইস্টার দ্বীপ - কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

রহস্যময় ইস্টার দ্বীপ
কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

দক্ষিণ আমেরিকার চিলি উপকূল থেকে প্রায় আড়াই হাজার মাইল পশ্চিমে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেকগুলি ছোটো ছোটো দ্বীপ। পলিনেশিয়ার পূর্বদিকে অবস্থিত দ্বীপগুলোর সুদূরতম দ্বীপটির নাম ‘ইস্টার দ্বীপ’প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে জেগে থাকা এই দ্বীপটির আয়তন ১৬০ বর্গ কিলোমিটার। বর্তমানে লোকবসতি খুবই কম, মাত্র ১৬০০ জনের মতো। দ্বীপটিতে আছে তিনটি আগ্নেয়গিরি – রানো রারাকু, ম্যঙ্গাটেরেভাকা ও কাটিকি। আগ্নেয়গিরির লাভা থেকে দ্বীপটির উৎপত্তি। তাই দ্বীপটিতে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য আগ্নেয়শিলা। এখানকার সবথেকে বড়ো বিস্ময় হল আগ্নেয়শিলায় তৈরি দৈত্যাকৃতির সব মূর্তি। সমুদ্রতট থেকে পাহাড়ের কোলে প্রায় সর্বত্রই অতন্দ্র প্রহরীর মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সার দিয়ে। এগুলো কাদের মূর্তি? তৈরিই বা করেছিল কারা? পৃথিবীর মানুষ, না গ্রহান্তরের জীব? এরকম হাজারো প্রশ্ন বারবার উঁকি মেরেছে মানুষের মনে। রহস্যে ঘেরা এই দ্বীপটির হাতছানিতে অভিযাত্রী দল তাই বারবার ছুটে গেছে সেখানে।
স্থানীয় আদিবাসিদের ভাষায় দ্বীপটির নাম ‘তে পিতো ওতে হনুয়া’ অর্থাৎ বিশ্বের নাভিমূল। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে অবশ্য এর পরিচিতি ‘ইস্টার আইল্যান্ড’ নামে। এই নামকরণটিও হয়েছিল প্রায় তিনশ বছর আগের একটি অভিযান থেকে। ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে অ্যাডমিরাল জ্যাকব রোগেভিনের নেতৃত্বে একদল ইউরোপীয় অভিযাত্রী নিয়ে একটি জাহাজ এই দ্বীপটিতে যেদিন পৌঁছয় সেদিনটি ছিল ইস্টার ডে। তাই দ্বীপটির নাম রাখা হয়েছিল ‘ইস্টার আইল্যান্ড’। ইউরোপীয় অভিযাত্রী হিসেবে এরাই প্রথম এই দ্বীপে পা রেখেছিলেন।
জনবিরল এই দ্বীপটির প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা এই দৈত্যাকার পাষাণমূর্তিগুলো আজও বিস্ময় জাগায়। বহু শতাব্দী ধরে এর নির্মাণকৌশল রহস্যাবৃত ছিল। ফলে এগুলিকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছিল নানারকম কাল্পনিক গল্প। রহস্যের উদ্ঘাটন করতে অনেক অভিযাত্রীই পাড়ি দিয়েছিলেন এই দ্বীপে। এদের মধ্যে স্পেনীয় নাবিক ফিলিপ গঞ্জালেস্‌ এবং ফরাসী অ্যাডমিরাল জা ফ্রাসোয়া লা পেরোজ-এর নাম উল্লেখযোগ্য। ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে গঞ্জালেস্‌ আর ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে পেরোজ এই দ্বীপে পাড়ি দেন। কিন্তু কেউই এই দানবীয় মূর্তির রহস্য উন্মোচন করতে পারেননি।
ইস্টার আইল্যান্ড বহুদিন ধরে রহস্যাবৃত রয়ে গেল। সমুদ্রতটে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকৃতির মূর্তিগুলো যুগ যুগ ধরে যেন অতন্দ্র প্রহরীর মতো সমগ্র দ্বীপটিকে আগলে রেখেছে যাতে এখানকার সত্য রূপটি বহির্জগতের মানুষের কাছে কোনোদিনই প্রকাশিত না হয়। রহস্য যত ঘনীভূত হতে থাকে বিশ্বের মানুষের কাছে দ্বীপটির আকর্ষণ ততই বাড়তে থাকে। এই আকর্ষণেই নরওয়ের প্রখ্যাত প্রত্নতাত্বিক থর হেয়ারডাল ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে ইস্টার দ্বীপে এসে উপস্থিত হন। বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে তিনি দেখলেন প্রায় হাজারখানেক মূর্তি দ্বীপটির বিভিন্ন জায়গায় পড়ে আছে। এগুলির উচ্চতা এক মিটার থেকে একুশ মিটার পর্যন্ত। এদের মধ্যে কিছু কিছু ভেঙে গেছে, কিছু কিছু অর্ধসমাপ্তদ্বীপের ভেতরের মূর্তিগুলো ইতস্তত দেখা গেলেও সমুদ্রতটের মূর্তিগুলো কালের প্রহরীর মতো মাথা উঁচু করে সারবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দ্বীপের প্রাচীন আদিবাসীরা মৃতদেহ সৎকার করতে বড়ো বড়ো পাথরের ব্লক কেটে তৈরি বেদীর উপর মৃতদেহ ফেলে রাখত যতদিন সেটা কঙ্কালে পরিণত না হত। এরপর এটিকে মাটি চাপা দিয়ে কবর দিত। পাথরের এই ব্লকগুলো লম্বায় প্রায় দশ মিটারের মতো হত। এরকম বেশ কিছু কবরের নিদর্শন ঐ দ্বীপে পাওয়া গেছে। এই স্মৃতিস্তূপগুলোর স্থানীয় প্রাচীন নাম ‘আহু’। অনেকে মনে করেন মৃতের স্মৃতিরক্ষার উদ্দেশ্যেই দ্বীপের প্রাচীন আদিবাসীরা এই দানবীয় মূর্তিগুলো তৈরি করেছিল।


বর্তমানে দ্বীপটিতে সবুজের অভাব থাকলেও মনে করা হয় একসময় এখানে ঘন জঙ্গল ছিল। বার বার অগ্নুৎপাতের ফলে তা আজ প্রায় নিশ্চিহ্ন। দ্বীপের চতুর্দিকে ছড়িয়ে আছে আগ্নেয়শিলা। মূর্তিগুলো তৈরি করতে এই পাথরই ব্যবহৃত হয়েছে। কোনও মূর্তির মাথায় লম্বা লম্বা চুড়ো দেখতে পাওয়া যায়। সবচেয়ে লম্বাটি প্রায় ২.৮ মিটার উঁচু। ওজন ১১.৫ টনের মতো এগুলো লাভাপ্রস্তর দিয়ে তৈরি হওয়ায় দেখতে কিছুটা রক্তিম।
মূর্তিগুলো তৈরির জন্য ব্যবহৃত কিছু যন্ত্রপাতির হদিস পাওয়া গেছে ‘রানো রারাকু’র খাদের মধ্যে। এছাড়াও ৩৯৪টি অসম্পূর্ণ মূর্তিও পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো মূর্তিটির উচ্চতা প্রায় ২১ মিটার এবং ওজন ২০০ টনের কাছাকাছি। মূর্তিগুলোকে তৈরি করা হত শোয়ানো অবস্থায়। তাই খাদের মধ্যে অর্ধসমাপ্ত মূর্তিগুলোর প্রায় সবক’টিই শোয়ানো অবস্থায় রয়েছে। এই অসম্পূর্ণ মূর্তিগুলো দেখে প্রত্নতত্ত্ববিদরা মনে করেন, এই অঞ্চল ছিল মূর্তি তৈরির কারখানা। প্রায় সমাপ্ত মূর্তিগুলোকে রানো রারাকুর খাদ থেকে নিচে নামানো হত দড়ি দিয়ে বেঁধে পাথুরে ঢাল বেয়ে ধীরে ধীরে। হিবিস্‌কাস (Hibiscus) জাতীয় একরকম উদ্ভিদের আঁশ দিয়ে তৈরি হত এই দড়ি। খাদের মাথায় পাহাড়ের গায়ে প্রায় এক মিটার গভীর কয়েক জোড়া ছিদ্রের খোঁজ পাওয়া গেছে। এই ছিদ্রগুলো নিচের দিক থেকে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। অনুমান করা হয়, মূর্তিগুলো নামানোর সময় দড়ি বাঁধার জন্য এই ছিদ্রগুলো ব্যবহার করা হত। এছাড়াও পাথর কেটে বানানো কিছু খুঁটির সঙ্গেও দড়ি বাঁধা হত।
পাহাড়ের পাদদেশে মাটি খুঁড়ে কতগুলো গর্ত করা হত। মূর্তিগুলোকে সেখানে নামিয়ে খাড়া করে দাঁড় করিয়ে অবশিষ্ট কাজ সম্পূর্ণ করা হত। পাহাড়ের তলদেশে এরকম ১০৩টি স্ট্যাচু মাটির ভেতর আবক্ষ প্রোথিত অবস্থায় পাওয়া গেছে। কোনও এক অজানা কারণে এগুলো সম্পূর্ণ করে সমুদ্রতটে আর স্থানান্তরিত করা হয়নি।
এই বিশাল বিশাল মূর্তিগুলোকে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে সমুদ্রতট অবধি স্থানান্তরিত করা খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। অধ্যাপক উইলিয়াম মুলয়-এর মতে মূর্তিগুলোকে স্থানান্তরের জন্য বিশেষভাবে তৈরি কাঠের দোলায় বা স্লেজ জাতীয় একধরনের গাড়ি ব্যবহার করা হত। পরবর্তীকালে ডঃ ভ্যান টিলবার্গ দোলায় চাপিয়ে মূর্তি স্থানান্তরের ঘটনাকে সমর্থন করেননি। তাঁর মতে অধিকাংশ মূর্তির গড়ন এই ধরনের পরিবহন-ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।


বর্তমানে দ্বীপটিতে গাছপালা বিরল হলেও প্রাচীনকালে (অষ্টম-নবম খ্রিস্টাব্দে) যে এখানে পামগাছের এক ঘন জঙ্গল ছিল এরকম অনুমান না করার কোনও কারণ নেই। রানো রারাকুর হ্রদের তলদেশ থেকে বহু শতাব্দী ধরে জমে থাকা পরাগরেণুর ফসিল আবিষ্কার করে ব্রিটেনের হাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী জন ফ্লেনলে এই সত্য আবিষ্কার করেন। তাই পরিবহণের জন্য স্লেজ জাতীয় গাড়ি বানাতে কাঠের কোনও অভাব ছিল না আজ থেকে প্রায় একহাজার বছর আগে। ইস্টার দ্বীপের এই মূর্তিগুলো ১০০০ থেকে ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তৈরি। বড়ো বড়ো মূর্তিগুলো অপেক্ষাকৃত ছোটো মূর্তিগুলোর তুলনায় বয়সে নবীন। আহুর কাছে সবচেয়ে বড়ো যে মূর্তিটি ছিল তার উচ্চতা ৯.৮ মিটার ও ওজন ৮২ টন ছিল। ‘পারো’ নামে বিখ্যাত এই মূর্তিটি এখন অবশ্য ভগ্নাবস্থায় রয়েছে।
এশিয়ার কোনও এক জনগোষ্ঠী পলিনেশিয় দ্বীপপুঞ্জে সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়েছিল, এরকম একটা ধারণা বহুদিন ধরেই প্রচলিত ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক থর হেয়ারডাল কিন্তু ভিন্ন মত পোষণ করতেন। তিনি পলিনেশিয়ার বহু নিদর্শনের সঙ্গে পেরুর প্রাচীন ইনকা সভ্যতার আশ্চর্য মিল খুঁজে পান। মিশর ও পেরু উভয় জায়গাতেই সূর্যকে দেবতা জ্ঞানে পুজো করা হত। সূর্যদেবতার নাম ছিল ‘রা’। পলিনেশিয়রাও সূর্যদেবতা ‘রা’-এর উপাসনা করত। শোনা যায়, প্রাচীন আমলে ইস্টার দ্বীপে বেতের তৈরি একধরনের নৌকার ব্যবহার ছিল। পেরু ও মিশরেও এই ধরনের নৌকার ছবি দেখতে পাওয়া যায়কৃষিকার্যের জন্য ঋতু নির্ণয়ের প্রয়োজন হয়। পেরু এবং পলিনেশিয় উভয় অঞ্চলের লোকেরাই সপ্তর্ষিমণ্ডলের বিভিন্ন অবস্থান দেখে ঋতুর হিসেব রাখত। পেরুর ইনকাদের মধ্যে একটা কাহিনী প্রচলিত আছে যে ইনকাদের রাজা সূর্যদেবতা বিরাকোচার প্রাচীন নাম ছিল ‘কন্‌টিকি’ ও ‘ইল্লাটিকি’। কোকুইম্বো উপত্যকায় ‘কারি’ নামে এক রাজা ছিলেন। টিটিকাকা হ্রদের তীরে কারি এবং কন্‌টিকির মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে কন্‌টিকি হেরে যান। পালিয়ে এসে তিনি প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে আশ্রয় নেন। কিন্তু কারি তাঁর পিছু ধাওয়া করেন। আর কোনও উপায় নেই দেখে কন্‌টিকি নিজের এবং অনুগামীদের প্রাণ বাঁচাতে বিরাট বিরাট ভেলা বানিয়ে অকূল সমূদ্রে ভেসে পড়েন। টিটিকাকা হ্রদের তীরে যে ধ্বংসাবশেষ রয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করে থর-এর ধারণা হয় যে ইনকাদের এই কাহিনী কোনও কাল্পনিক গল্প নয়। পেরুতে অনুসন্ধান চালিয়ে তিনি এক প্রাচীন শহরের নানা নিদর্শন আবিষ্কার করেন। এইসব প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান থেকে তিনি স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছন যে ইনকারা সমুদ্রপথে ব্যবসা-বাণিজ্য করততাই সমুদ্র তাদের কাছে অচেনা ছিল না। অনুসন্ধানপ্রাপ্ত এইসব তথ্যের উপর ভিত্তি করে থর নিশ্চিত হন যে পেরুর ইনকারা কোনও এক সময় পলিনেশিয় দ্বীপপুঞ্জে এসে বসবাস শুরু করে। হয়তো বা কন্‌টিকির সেই ভেলা সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে পলিনেশিয় দ্বীপপুঞ্জে এসেই ঠেকেছিল পেরুতে অনুসন্ধান চালানোর সময় থরকে সবরকম ভাবে সাহায্য করেছিলেন প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক ওল্টার আলভা।
‘প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইনকাদের একটি দল পেরু থেকে ভেলায় চেপে পলিনেশিয়ায় এসে উপস্থিত হয়েছিল’ — থরের এই তত্ত্বকে অধিকাংশ ঐতিহাসিকই মানতে রাজি ছিলেন না। নিজের তত্ত্বের স্বপক্ষে প্রমাণ দাখিল করার জন্য থর নিজেই ভেলায় চেপে পেরু থেকে পলিনেশিয় দ্বীপপুঞ্জে পাড়ি দেওয়া মনস্থ করলেন। পেরুতে একসময় বালসা কাঠের অভাব ছিল না। এই কাঠের আরও একটা গুণ হচ্ছে, দীর্ঘদিন জলে থাকলেও পচে নষ্ট হয়ে যায় না। তাই থরের ধারণা হয়েছিল যে ইনকাদের কাহিনীতে কন্‌টিকি যে ভেলায় চেপে সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিলেন তা সম্ভবত বালসা কাঠে তৈরি ছিল। তাই কোনোরকম আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য না নিয়ে শুধুমাত্র প্রাচীন পদ্ধতিতে তিনি বালসা কাঠ দিয়ে ৪৫ ফুট X ১৮ ফুট মাপের একটি ভেলা তৈরি করলেন। ইনকাদের প্রাচীন কাহিনি স্মরণ করে ভেলাটির নাম রাখলেন ‘কন্‌টিকি’। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৮ এপ্রিল পর্যাপ্ত পানীয় জল, রসদ এবং ইচ্ছুক কয়েকজন দুঃসাহসী অভিযাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বিদায় জানালেন পেরুবাসীকে। গন্তব্যস্থল ইস্টার দ্বীপ। বেশ কিছুদিন অতিক্রান্ত হবার পর বিশ্ববাসীরা ধরেই নিয়েছিলেন যে ওই দুঃসাহসী অভিযাত্রীদের সলিল সমাধি ঘটেছে। সমালোচকদের সমালোচনা যখন আরও তীব্র হয়ে উঠল তখন হঠাৎই খবর এল যে অভিযাত্রীদের নিয়ে ভেলাটি নির্বিঘ্নে পলিনেশিয় দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছে গেছে। সমুদ্রবুকে এই সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে অভিযাত্রীদের সময় লেগেছিল ১৩১ দিন। জয় হল থর হেয়ারডালের

প্রাচীনকালে পলিনেশিয় দ্বীপপুঞ্জে দু’ধরনের আদিবাসীর বসবাস ছিল। একদল সম্ভবত সেমেটিক জাতির। এদের গায়ের রঙ ফরসা, চুল লালচে আর চোখ কটা। এদের ধারণা, পূর্বদিকের কোনও এক গরম আবহাওয়ার দেশ ছিল এদের আদিনিবাস। কোনও একসময় এদের পূর্বপুরুষেরা পলিনেশিয় দ্বীপপুঞ্জে এসে বসতি স্থাপন করে। একসময় এরা নিজেদের উরুকেহু বলে পরিচয় দিত। এদের প্রাচীন রাজাদের নাম টাঙ্গারোয়া, টিকি, কানে ইত্যাদি। হেয়ারডালের মতে পেরু থেকে পশ্চিমে বিতাড়িত কন্‌টিকিই তাঁর দলবল নিয়ে পলিনেশিয়ায় এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। এরাই এই লাল চুলের উপজাতিদের আদিপুরুষ। সম্ভবত হাওয়াই থেকে অন্য একটি দল এখানে এসেছিল। এদের গায়ের রঙ বাদামী, চুল কালো, নাক মোটা ও ভারি ছিল। দীর্ঘদিন ধরে একই অঞ্চলে বসবাস করার ফলে ক্রমশ এই দুই দলের মধ্যে রক্তের মিশ্রণ ঘটে। আর এরই ফলে উৎপত্তি হয় পলিনেশিয় জাতির। এরা পাথরের কাজে অত্যন্ত দক্ষ ছিল। ইস্টার দ্বীপের পথঘাট, পাথরের মন্দির এবং বিশাল বিশাল মূর্তিগুলো এদেরই তৈরি। মূর্তিগুলোর লম্বাটে কানের গড়ন দেখে থর নিশ্চিত হন যে এগুলো পেরু থেকে আসা আদিবাসীদের উন্নত কারিগরি বিদ্যারই ফসল। পেরুর ইনকা উপজাতিরা কানে মোটা মোটা গয়না পরত। ফলে তাদের কানদু’টো গয়নার ভারে ঝুলে পড়ত এবং দেখতে লম্বাটে হত। ইস্টার দ্বীপের মূর্তিগুলো যেন তারই প্রতিচ্ছবি।
ইস্টার দ্বীপের এই দানবীয় মূর্তিগুলোর রহস্য উন্মোচনে থর হেয়ারডাল-এর অবদান অপরিসীম। তাঁর গবেষণায় আজ একথা প্রমাণিত যে এগুলো কোনও গ্রহান্তরের জীবের সৃষ্টি নয় বরং পৃথিবীরই এক প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন।

_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

ভৌত সংবাদ:: অশরীরীর কান্না - কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়


অশরীরীর কান্না
কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

গভীর রাতে ওরা আসে। কখনও ঘুঙুরের টুং টাং আওয়াজ, কখনও কান্না আবার কখনও অট্টহাসি দিয়ে জানান দেয় ওরা এসেছে। আলো-আঁধারি রাতে ওদের ঠিকমতো দেখা যায় না। তবে বোঝা যায় ওরা এসেছে। চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওদের গল্প অনেক শুনেছি, পড়েছিও। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভূতুড়ে বাড়িগুলোতে ওরা থাকে। আমাদের দেশেও এরকম অনেক বাড়ি আছে। কলকাতা শহরেও একসময় অনেক ভূতুড়ে বাড়ি ছিল। তখন তাঁরা সেখানে মহানন্দেই থাকত। তবে বর্তমানে তাঁদের এই শহরে দেখা পাওয়া মুশকিল।
দু’তিন দশক আগেও কলকাতা শহরে দু’চারটে হানাবাড়ি বা পোড়োবাড়ির দেখা পাওয়া যেত। জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে সেসব বাড়ি ভাঙা পড়েছে। সেখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বহুতল বাড়ি। ঝাঁ চকচকে বাড়ি ভূতেরা তেমন পছন্দ করে না। তাই বলা যায়, কলকাতার ভূতেরা আজ গৃহহারা। যতই সূক্ষ্ম শরীর হোক না কেন, থাকার জন্য ন্যূনতম একটু জায়গা দরকার হয়ই। কলকাতা শহরে এখন মানুষেরই থাকার জায়গার অভাব, ভূতেদের ঠাঁই হবে কোথা থেকে! তা সত্ত্বেও এখনও যে দু’চারটে পুরনো বাড়ি এই শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেখানে গেলে ওদের সঙ্গে দেখা হলেও হয়ে যেতে পারে। যাবে নাকি ওদের সঙ্গে দেখা করতে?

এরকমই একটা বাড়ি আছে গার্স্টিন প্লেসে। এই বাড়িতে প্রথম দিকে আকাশবাণীর অফিস ছিল। শোনা যায়, পুরনো দিনের বহু শিল্পী নাকি রাজপোশাকে এক সুদর্শন ব্যক্তিকে এই বাড়িতে ঘুরে বেড়াতে দেখেছেন। প্রথম দিকে তাদের মনে হয়েছিল কোনও নাট্যগোষ্ঠীর শিল্পী শো শেষ করে ছুটে এসেছেন কোনও নাটকের অনুষ্ঠানের রেকর্ড করতে। তাড়াহুড়োয় হয়তো পোশাক পাল্টানোর সময় পাননি! কিন্তু দিনের পর দিন ওই একই ব্যক্তিকে ঘুরে বেড়াতে দেখে তাদের মনে সন্দেহ জাগেকোনও নাট্যশিল্পীই তো! না মহারাজ নন্দকুমারের অশরীরী?


নন্দকুমারে ইতিহাস সকলেরই জানা। তাই এখানে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন নেই। যাদের জানা নেই তাদের জন্য সংক্ষেপে বলা যেতে পারে। বর্ধমানের দেওয়ান ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। কাউন্সিল মেম্বার ফিলিপ ফ্রান্সিস হেস্টিংসকে পছন্দ করতেন না। তিনি হেস্টিংসের নানা দুর্নীতির খবর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পৌঁছে দিতেন। অন্যান্য কাউন্সিল মেম্বারদের মধ্যে বার্ক ও মেকলে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁরাও হেস্টিংসের কাজকর্ম সমর্থন করতে পারছিলেন না। এনাদেরই সুপারিশে এবং কিছুটা চাপে কোম্পানি ১৭৬৪ সালে ওয়ারেন হেস্টিংসকে দেওয়ানের পদ থেকে সরিয়ে মহারাজ নন্দকুমারকে ওই পদে বহাল করেন। নন্দকুমার ছিলেন অত্যন্ত সৎ ব্যক্তি। কোনওরকম দুর্নীতি তিনি প্রশ্রয় দিতেন না। ফ্রান্সিস-এর মদতে ইনি হেস্টিংসের বিরুদ্ধে নানা অপকীর্তির অভিযোগ দায়ের করেন। হেস্টিংসও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিলেন না। ফ্রান্সিস তাঁর পয়লা নম্বর শত্রু ছিলেন। এবার মহারাজ নন্দকুমারও সেই তালিকায় যুক্ত হলেন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এলিজা ইম্পে ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁর পরামর্শে এবং মদতে হেস্টিংস নন্দকুমারকে ফাঁসানোর পরিকল্পনা করতে লাগলেন। সেইমতো হেস্টিংস নন্দকুমারে বিরুদ্ধে জালিয়াতির মিথ্যে অভিযোগ আনলেন। বিচারক ইম্পে। অতএব বিচারের নামে যে প্রহসন হবে সকলেই বুঝতে পারলেন। হলও তাই। নন্দকুমারের হিতৈষীদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল। ইম্পে ফাঁসির হুকুম দিলেন। ১৭৭৫ সালে মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসি হয়। পরবর্তীকালে বার্ক ও মেকলেসহ কাউন্সিল মেম্বারদের একাংশ ইম্পে এবং হেস্টিংসের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। ফলস্বরূপ ইংল্যান্ডে হেস্টিংসের বিচার হয়েছিল। সেই ইতিহাসও আমাদের জানা।


মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসি হয়েছিল কোথায়? এ নিয়ে মতভেদ আছে। কারও কারও মতে গার্স্টিন প্লেসের সেই বাড়িতে যেখানে আকাশবাণী কলকাতার পুরনো অফিস ছিল। আবার কারও কারও মতে বি.বা.দী. বাগের কাছে কাউন্সিল হাউস স্ট্রিট-এর বাঁ হাতে যে ছোটো রাস্তাটা বেরিয়েছে সেই ফ্যান্সি লেন-এ। একে অবশ্য রাস্তা না বলে গলি বলাই ভালো।

কলকাতা শহরের পত্তন করেছিল জব চার্ণক (যদিও এ নিয়ে মতভেদ আছে)। তিনশ বছর ধরে এই শহরের  সীমানা যেমন বেড়েছে তেমন বেড়েছে পথের সংখ্যা। ক্রমবর্ধমান শহরের বড়ো বড়ো রাস্তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমানে বেড়েছে গলির সংখ্যা। উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ কলকাতার সর্বত্রই গলি তথা লেনের ছড়াছড়ি। বিভিন্ন রাস্তার যেমন নাম আছে এইসব গলিরও তেমন নাম আছে। পুরনো গলিগুলির মধ্যে ফ্যান্সি লেন অন্যতম। অফিস পাড়া অর্থাৎ বি.বা.দী বাগে যাদের যাতায়াত আছে তারা সকলেই এই গলিটির নামের সঙ্গে পরিচিত। বর্তমানে গলিটিকে দেখে বোঝাই যাবে না যে একসময় এর পাশ দিয়ে বয়ে যেত একটি পশ্চিমগামী খাল যা গিয়ে মিশেছিল গঙ্গার সাথে। ‘ফ্যান্সি লেন’ নাম শুনলেই মনে হয় কলকাতা শহরে যত গলি আছে তাদের মধ্যে সবথেকে সুন্দর গলি এটি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা নয়। স্বজনহারা মানুষের অশ্রুজলে সিক্ত এই গলি বহন করে চলেছে বিভীষিকাময় স্মৃতি।
জব চার্ণকের আমলে কোনও অপরাধীর শাস্তি ছিল অত্যন্ত কঠোররাস্তার ধারে কোনও বৃক্ষসংলগ্ন ফাঁসিমঞ্চে ফাঁসি দেওয়া হত এইসব অপরাধীদের। তারপর ঝুলিয়ে দেওয়া হত তাদের দেহ সেইসব গাছের ডালে। ফ্যান্সি লেনেও ছিল এইরকম একটি ফাঁসিমঞ্চ যেখানে বহু ভারতীয়কে ঝুলতে হয়েছিল ফাঁসির দড়ি গলায় পরে। আর্চ্চডিকন হাইডের মতে ফাঁসি শব্দ থেকেই ফ্যান্সি লেনের ‘ফ্যান্সি’ কথাটির উৎপত্তি।
আজ আর সে দিন নেই। নেই সেই ফাঁসীমঞ্চ। গলির দু’পাশে উঠেছে বড়ো বড়ো বাড়ি। পাল্টে গেছে সমাজ ব্যবস্থা। তবুও আজও অতীত ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে ফ্যান্সি লেন তার নামের মধ্য দিয়ে। শোনা যায়, গার্স্টিন প্লেসের ওই বাড়িতে মহারাজা নন্দকুমারের অশরীরী যেমন বারবার ফিরে আসে তেমন শীতের রাতে চারিদিক নির্জন হয়ে এলে ফ্যান্সি লেনে কারা যেন জেগে ওঠে। শোনা যায় তাদের কান্না। সান্ত্বনা দিতে মহারাজা নন্দকুমারও নাকি সেখানে চলে আসেন। গম্ভীর গলায় বলেন, ‘দেখ তোমাদের মতো আমাকেও ওরা অন্যায়ভাবে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়েছিল।’ এরপরেই চারদিক নিঃশব্দ, নিঝুম হয়ে যায়।
তেঁনাদের সঙ্গে দেখা করতে যাবে নাকি কোনও এক নির্জন শীতের রাতে ফ্যান্সি লেনে অথবা গার্স্টিন প্লেসের সেই পুরনো বাড়িতে?
________
ছবি – আন্তর্জাল

লেখক পরিচিতি - কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় একজন জনপ্রিয় লেখক এবং শিক্ষাবিদ। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। তাঁর লেখা বইগুলি পাঠক মহলে ইতিমধ্যে যথেষ্ট সাড়া ফেলেছে। শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় দ্য এশিয়াটিক সোসাইটি, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ এবং রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচারের আজীবন সদস্য। বর্তমানে তিনি বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের সহ সভাপতি। জ্ঞান ও বিজ্ঞান পত্রিকার সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য। এছাড়াও তিনি আরও অনেক পত্রপত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রে বিজ্ঞানের অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত অংশ গ্রহণ করে থাকেন। দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গল শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়কে ২০০৫ সালে গোপাল ভট্টাচার্য স্মৃতিপুরষ্কার প্রদান করেন। লেখকের সম্পর্কে আরও জানতে হলে এই ব্লগে যেতে হবে Blogsite: kbbwriter.wordpress.com
_____