Showing posts with label অদিতি সরকার. Show all posts
Showing posts with label অদিতি সরকার. Show all posts

গল্পের ম্যাজিক:: চোর - অদিতি সরকার


চোর
অদিতি সরকার
 
সেই তখন থেকে গালে হাত দিয়ে চুপচাপ ব্যালকনিতে বসে ছিল টুকটুকি। ঘরের ভেতরে সক্কাল থেকে যা চলছে, চুপচাপ রকিকে নিয়ে সরে পড়েছে সে তাই। কিন্তু ব্যাপারটা যে কী করে কী হল এতক্ষণ ধরে ভেবে ভেবেও কোনও কূলকিনারা পাচ্ছিল না টুকটুকি। চুপি চুপি রকিকেও দু-চারবার জিজ্ঞেস করেছিল সে, কিন্তু যথারীতি ছুঁচলো কানের ডগাদুটো কয়েকবার ওপরনিচ করা আর ফোলা ফোলা সাদাকালো লেজটা টুকটুক নাড়ানো ছাড়া আর বিশেষ কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি সেখান থেকে।
ঠামি ওদিকে এখন সব ছেড়ে বাণীদিদিকে নিয়ে পড়েছেন।
আস্ত জিনিসটা তো হাওয়ায় উবে যেতে পারে না বাণী। টুকটুকি বলছে সে দেখেইনি, বউমা বলছে ভুল করে বাথরুমের জানালায় রেখে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু আমি বলতেই তার মনে পড়ে গিয়েছিল, অথচ তক্ষুনি ফিরে গিয়ে আর পায়নি। তুমি যদি না নিয়ে থাক তাহলে বাকি রইল আমার ছেলে আর আমিতাহলে কি আমাদের দুজনের মধ্যেই কেউ বউমার জিনিসটা নিয়েছি? তাই বলছ তুমি?”
বাণীদিদি ফোঁপাচ্ছিল। খুব খারাপ লাগছিল শুনতে টুকটুকির। কেন যে ঠামি এমন বিচ্ছিরি করে কথা বলছে বাণীদিদির সঙ্গে। অথচ নিজের সব উলটোপালটা কাজে এই বাণীদিদিকেই লাগে ঠামির। সে বাবাকে লুকিয়ে একশোবিশ জর্দা আনানোই হোক, আর অমাবস্যা পূর্ণিমায় হাঁটুতে ঘষে ঘষে ব্যথার মলম লাগিয়ে দেওয়াই হোক। আজ পর্যন্ত একবারও কিন্তু বাণীদিদিকে আপত্তি করতে শোনেনি টুকটুকি।
আমি বউদির হার নিইনি মাসিমা। এত বছর এ বাড়িতে কাজ করছি, একটা কুটো কোনোদিন এদিক থেকে ওদিক হতে দেখেছেন?”
এতদিন দেখিনি বলেই যে আজ দেখব না, এমনও তো কোনো কথা নেই বাপু। মানুষের মন বলে কথা, পালটে যেতে কতক্ষণ? রোজ দেখছ না টিভিতে?” ঠামির গলাটা কেমন যেন অচেনা লাগে শুনতে।
কেঁদো না বাণী, চোখ মোছো। হার তুমি নাওনি, আমি জানি। আমারই মনে হয় কিছু একটা ভুল হচ্ছে কোথাও। মাথা ঠাণ্ডা করে একটু ভাবতে দাও, ঠিক মনে পড়ে যাবে।এটা মার গলার আওয়াজ। নরম, ঠাণ্ডা
আর লাই দিও না বউমা। ওই করেই মাথায় চড়িয়েছ, এখন তার ফলটিও হাতে নাতে পাচ্ছ।ঠাকুমা ঝাঁঝিয়ে উঠলেন।
না মা, আমায় মেরে ফেললেও আমি বাণীকে চোর ভাবতে পারব না। আপনিও ওর সম্বন্ধে অমন কথা আর মুখে না আনলেই ভালো। মনে না আনলে তো সবচেয়ে ভালো। মা খুব শান্ত গলায় উত্তর দিল।
ঠামি বোধহয় মার কাছ থেকে এরকম উত্তর আশা করেননি। কখনও ঠামির মুখে মুখে জবাব দেয় না তো মা। সে যত কড়া কথাই হোক। চুপ করে থাকে নইলে সামনে থেকে সরে যায়। আজই হঠাৎ একটু অন্যরকম হল। ঠামি কীরকম হকচকিয়ে গিয়ে বিড়বিড় করতে করতে চুপ করে গেলেন
বউদি, চান করার সময় তোমার হাত লেগে নিচে পড়ে-টড়ে যায়নি তো? জানালা তো খোলাই ছিল। বাণীদিদির ফোঁপানি থেমেছে, তবে গলা এখনও ভার।
না বাণী, অত বেখেয়ালও ছিলাম না যে আস্ত একটা জিনিস পড়ে যাবে হাত লেগে আর আমি টেরও পাব না। খুলে রাখা পর্যন্ত মনে করতে পারছি, তার পরে যে কী করলাম সেটাই তো কিছুতেই মনে আনতে পারছি না। গলায় তো পরিনি, কিন্তু কী করলাম? ঘরে নিয়ে এসেছিলাম কি? এলে কোথায় রাখলাম? ড্রেসিং টেবিলের ওপরে নেই। মানলাম আমার ভুলো মন, ধরো যদি ভুলে আলমারিতে ঢুকিয়েও রেখে থাকি, তাও তো খুলে দেখেছি। নেইগেল কোথায়?”
বাবা, ওইটুকু সরু একচিলতে একটা হার, তাই নিয়ে সকাল থেকে কী হইচই, কী হইচই। নাকি মা চান করার সময় গলা থেকে খুলে বাথরুমের জানলার ধাপিতে রেখেছিল, তারপর পরতে ভুলে গেছে। মনে পড়তেই আবার বাথরুমে গিয়ে দেখে হার নেই। সেইটা সবাইকে বলার পর থেকেই যে মহাভারত শুরু হল, এখনও চলছে।
বলা আর কী, দেখল তো প্রথমে ঠামিই। মা তো খেয়ালও করেনি।
ও বউমা, গলা খালি কেন গো তোমার?”
মা ব্রেকফাস্ট দিচ্ছিল তখন সবাইকে। এই সময়টা খুব তাড়াহুড়োয় কাটে মা’র। বাবার ডিম টোস্ট চা, ঠামির ফল ছানা, টুকটুকির দুধ কর্নফ্লেক্স, সবাইকে আলাদা আলাদা বেড়ে বেড়ে দিতে হয় তো। বাণীদিদি হাত লাগায় যদিও মা’র সঙ্গে, তবু একটা ছুটোছুটি লেগেই থাকে মা’র রান্নাঘর আর টেবিলের মধ্যে। তাও তো আজ টুকটুকি আর মা দুজনেরই ছুটি, স্কুল যাওয়া নেই কারোই। নইলে তো রীতিমতো ঝড় বয় সকালে এই সময় বাড়িতে
ঠামির কথা শুনে চমকে প্রথমে নিজের গলায় হাত দিল মা। তারপরেই লজ্জা লজ্জা হেসে ফেলল।
ওহো, স্নানের সময় খুলে রেখেছিলাম বাথরুমে, আর পরা হয়নি।
খুলতে গেছিলেই বা কেন হঠাৎ?”
মাথা ঘষতে গিয়ে চুলে জড়িয়ে যাচ্ছিল যে, মা আরও হাসে, যাচ্ছি এক্ষুনি মা, পরে নিচ্ছি। আপনাদের জলখাবারটা দিয়েই যাচ্ছি
জলখাবার পালাচ্ছে না, তুমি আগে ওটা পরে এসো তো। বউ মানুষ গলা খালি রাখে না অমন। কিচ্ছু মানো না বাবা তুমি, ঠামি গজগজ করে।
মা মুচকি হেসে হাতের প্লেটটা নামিয়ে রাখে।
বাথরুম থেকে বেরোতে কিন্তু অনেক দেরি হয় মা’র। যখন এসে টেবিলের পাশে দাঁড়াল তখন সেই হাসিমুখ আর নেই। কেমন যেন ছায়া নেমে এসেছে পুরো মুখ জুড়ে।

প্রথম চোট তো যথারীতি এসে পড়ল টুকটুকির ওপর। সে বেচারি যত বলে আমি হার-ফার কিছু দেখিইনি, তো ফেলবই বা কোথায় আর লুকোবই বা কেন, কে শোনে কার কথা। টুকটুকিও রেগেমেগে পড়ার টেবিলের ড্রয়ার, পুতুলের বাক্স, রকির বিছানা-টিছানা খাবারের গামলা সব উলটে ফেলে দেখিয়ে দিয়েছে। তাতে আবার এক প্রস্থ বাড়তি বকুনি জুটল, নাকি খুব মেজাজ হয়েছে টুকটুকির আজকাল। এইটুকু বয়সে এত ভালো নয়। বড়ো হলে ভুগতে হবে, এই ওই তাই। মা এসবের মধ্যে চুপ করেই ছিল অবশ্য। শুধু চোখ দিয়ে টুকটুকিকে একটু শাসন করে দিয়েছিল।
বাবা আর ঠামি মিলে মাকেও একটু বকে নিল তারপর। এত ভুলো মন, দামি জিনিসের প্রতি কোনও মায়া নেই, মন কোথায় থাকে হ্যান-ত্যান। সারাক্ষণ শুধু বইয়ে মুখ, অন্য কোনোদিকে খেয়াল নেই, বাড়ির বউয়ের অমন আলাভোলা হলে চলে না, সব দিকে নজর রাখতে হয়, আরো কত কী।
এইসব দেখেশুনে সেই যে রকির কলার ধরে টেনে ব্যালকনিতে পালিয়েছে টুকটুকি, ঝামেলা না থামলে আর তার ভেতরে যাওয়ার ইচ্ছে-টিচ্ছে নেই।
তাদের আটতলার ব্যালকনি থেকে চারপাশটা বেশ পরিষ্কার দেখা যায়।
মা রোজ ব্যালকনির কোনায় কোনায় টবের আড়ালে আড়ালে ছোটো ছোটো সরায় করে পাখিদের জন্য দানা আর জল দিয়ে রাখে, সেই খেতে সারাদিন কত যে চড়াই আর বুলবুলির আনাগোনা। রান্নাঘরের জানালায় তো রুটির টুকরো খেতে কাকও এসে ডাকাডাকি করে রোজ সকালে। রকি প্রথম প্রথম খুব বকাবকি করত লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে। আজকাল দু’পক্ষেরই অভ্যেস হয়ে গেছে, কেউ কাউকে কিছু বলে না। চড়াই দানা খায়, রকি থাবায় মুখ গুঁজে শুয়ে শুয়ে মিটমিট করে দেখে।
ছোটোবড়ো অনেক গাছও আছে তাদের ফ্ল্যাটের চারদিকে। কয়েকটা তো লম্বা হতে হতে ব্যালকনির রেলিং ছুঁয়েই ফেলেছে প্রায়। তাতেও আবার প্রতি বছর কতরকম পাখি বাসা বাঁধে। টুকটুকি মা পাখির ডিম পাড়া থেকে শুরু করে সেই ডিম ফুটে ছানা বেরিয়ে উড়ে যাওয়া পর্যন্ত পুরোটা ব্যালকনিতে বসে বসেই দিব্যি দেখতে পায়। এবারও দেখেছে কদমগাছের মোটা ডালের খাঁজে পাতিকাক বাসা বানাচ্ছে ক’দিন ধরে। কাঠিকুটি ঠোঁটে নিয়ে কাক আর কাকের বউ সারাদিন শুধু আসছে আর যাচ্ছে। জোর করে ঘরের ভেতরের চ্যাঁচামেচি থেকে কান সরিয়ে ওদিকেই চোখ ঘোরায় টুকটুকি।
কত কিছু যে এনে জুটিয়েছে কাক দুটো, বাব্বাহ্! ওই তো বাসার ছিরি। এদিক দিয়ে ঝুলছে, ওদিক দিয়ে খসে পড়ছে। তার মধ্যে কী নেই! খানিকটা নীল রঙের উলের টুকরো, প্লাস্টিক ছেঁড়া কয়েক ফালি, তুলোর দলা, একটা স্টিলের চামচও যেন মনে হচ্ছে চকচক করছে ওরই মধ্যে।
টুকটুকির দৃষ্টিটা হঠাৎ ধারালো হয়ে ওঠে।
ওটা কী? পাতলা সুতোর মতো, চকচকে হলুদ?
গ্রিলের আরও কাছে এগিয়ে যায় টুকটুকি। ভালো করে দেখার জন্য রেলিঙের ফাঁকে মুখ গুঁজে দেয়।
এবং তারপরেই চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে বাড়ির ভেতর ছোটে ধুপধাপ
মা। বাণীদিদি। একবার ব্যালকনিতে এসো শিগগির।
মা রান্নাঘরে কাজ করছিল। মুখটা এখনও ভার। কপালে চিন্তার ভাঁজ। বাণীদিদি সকালের বাসনপত্র ধুয়ে তুলছিল জায়গামতো। টুকটুকির ওরকম ডাকাডাকিতে দু’জনেই চমকে তাকায়।
কী হল কি? বাড়ি মাথায় তুললি যে একেবারে।
এই রে। ঠামিও বেরিয়ে এসেছে ঘর থেকে। মেয়েদের জোরে কথা বলা, ছুটোছুটি ঠামির একেবারে অপছন্দ। টুকটুকির আবার ওগুলোই স্বভাব।
একবার বাইরে এসো না,হাঁফাতে হাঁফাতে বলে টুকটুকি।
কী আছে বাইরে? দেখছ তো কাজ করছি, মা একটু গম্ভীরভাবে তাকায় টুকটুকির দিকে।
কাকের বাসা
কী কাকের বাসা? এখন তোমার সঙ্গে পাগলামি করার সময় নেই আমার টুকটুকি, পুরো রান্না বাকি এখনও, মা সত্যি সত্যি রেগে যাচ্ছে এবার।
পাগলামি না। হার। তোমার। দেখবে চলো।
আর কিছু বলতে হল না। সব কাজ ফেলে হুড়মুড়িয়ে তিনজনই ব্যালকনিতে দৌড়ল। মা, ঠামি, বাণীদিদি।
টুকটুকিও টুকটুক করে গেল পেছন পেছন।
কদম ডালের ফাঁকে বাসাটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। তেরছা হয়ে রোদের একটা ফালি এসে পড়েছে ঠিক তার মধ্যে, আর রোদ পড়ে ঝলমল করছে জড়িমড়ি হয়ে পড়ে থাকা পাতলা একটা চেন। সোনার।
কী চোর পাখি দেখেছ বউদি? তক্কে তক্কে ছিল গোযেই না তুমি ঘর ছেড়ে বেরিয়েছ অমনি এসে নিয়ে গেছে টুক করে, বাণীদিদি গালে হাত দিয়ে বলে।
মা অবাক হয়ে তাকিয়েই ছিল বাসাটার দিকে। বাণীদির কথায় মুখ ঘোরায়।
তাই তো দেখছি। চকচকে জিনিসে ওদের খুব লোভ শুনেছিলাম। চামচ-টামচ নিয়ে যায়। তবে এ যে একেবারে ঘরে ঢুকে এসে গয়না পর্যন্ত নিয়ে যাবে কে জানত। টুকু দেখেছিল তাই। এমনিতে তো চট করে পাখিকে কেউ চোর বলে সন্দেহও করবে না। কেন যেন একবার ঠামির দিকে তাকায় মা।
ঠামি এতক্ষণ হাঁ করে দাঁড়িয়ে ছিল। এখন তাড়াতাড়ি ব্যালকনি ছেড়ে ঘরে ঢুকে যায়। কারও চোখে চোখ না রেখে।
কিন্তু ওটা অত উঁচু গাছ থেকে পেড়ে আনবে কী করে, মা?”
গেটে একবার ফোন কর তো টুকাই। ইলেকট্রিকের লোককে ওদের সেই লম্বা মইটা নিয়ে আসতে বল। ডিম পাড়েনি ওরা এখনওবাসায় হাত দিলে বিশেষ কিছু বলবে না বোধহয়। চলো গো বাণী, ওদিকে আবার সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে এসেছি।
মুচকি হেসে ভেতরে ঢুকে যায় মা। মুখের মেঘটা আর নেই।
_____
ছবিঃ লাবণি চ্যাটার্জি

গল্পের ম্যাজিক:: হুল - অদিতি সরকার


হুল
অদিতি সরকার

নাঃ, এই বনে আর মনে হয় থাকা যাবে না। মাংকু গাল বেয়ে গড়িয়ে আসা চোখের জলটা এক হাতে মুছে নিল। অন্তত এই ইশকুলে তো আর কিছুতেই পড়া যাবে না। কিন্তু মা-কে ইশকুল ছাড়ার কথা বলবে কী করে মাংকু?
ভুতুম স্যারের ইশকুলের এত নামডাক বলেই না মা তাকে নিয়ে সেই কালাগড়ের জঙ্গল ছেড়ে এত দূরে এসেছে। যদি একটু ভালো করে পড়াশোনাটা শিখতে পারে মাংকু, সেই আশাতেই তো? কী করে বলবে মা-কে মাংকু যে সে আর ইশকুল যাবে না? যদি ধরো সাহস করে বলেও, এমন একটা অদ্ভুত ঘোষণা শুনে মা কারণ জানতে চাইবেইআর তাহলেই তো সব বলতে হবে। সেই প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত যা যা হয়েছে মাংকুর সঙ্গে, যা যা এখনও হয়ে চলেছে, সব। মা যে ভীষণ দুঃখ পাবে।
সেগুন গাছের চওড়া ডালের খাঁজে বসে বসে মাংকু এই সব আকাশপাতাল ভাবছিল আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। আচমকা কানের কাছে বেজায় কর্কশ একটা গলা ক্যাঁ ক্যাঁ করে উঠল।
- এই যে। ওহে। বেলা দুপুরে ইশকুল ফাঁকি দিয়ে এখানে কী হচ্ছে, অ্যাঁ? চোখে আবার জলও দেখছি যেন? কী হয়েছে শুনি?
মাংকু চমকে আর একটু হলেই গাছ থেকে পড়ে যাচ্ছিল প্রায়। নেহাত ল্যাজ দিয়ে পাশের ডালটা আচ্ছা করে প্যাঁচানো ছিল তাই রক্ষে। পড়লে আর লজ্জার শেষ থাকত না। এসব কথা কী আর চাপা থাকে? কালকেই ইশকুলে ঢি-ঢি পড়ে যেত। বাঁদরের ছানা হয়ে মাংকু ঠিকঠাক গাছেও চড়তে পারে না। ব্রুনোর দলবল আরও একটা সুযোগ পেয়ে যেত মাংকুকে হেনস্থা করার।
ক্যাঁকক্যাঁকে আওয়াজটা কোথা থেকে এল তাই খুঁজছিল মাংকু। একটু একটু রাগ হচ্ছিল তার। ভয়ও করছিল একটু একটু। ব্রুনো কি তাহলে তার এই একেবারে নিজস্ব লুকোনো জায়গাটাও খুঁজে বার করে ফেলেছে?
- আহা ওদিকে কোথায় খুঁজছ? এইদিকে তাকাও, এইদিকে। আরে আচ্ছা ক্যাবলা ছেলে তো হে তুমি। এই যে ঠিক তোমার নাকের ডগায় বসে আছি দেখতেও পাচ্ছ না? গলাটা আবার ক্যাঁও ক্যাঁও করে ওঠে।
এতক্ষণে দেখতে পায় মাংকু। সত্যিই ঠিক নাকের ডগায় সেগুনপাতার সঙ্গে মিশে বসে আছে চড়া গলার মালিকমস্ত টিয়াটার পরনে ধোপদুরস্ত চকচকে সবুজ পালক, গলায় আবার লাল মালা একটা। গোল গোল চোখে কটকট করে মাংকুকেই দেখছে।
- এই যে। এতক্ষণে। আচ্ছা ছেলে বাবা। বলি জঙ্গলে অমন উদাস হয়ে বসে থাকলে চলে? কখন কোথা দিয়ে গুলবাঘা ঝপ করে এসে টপ করে ধরে নিয়ে ব্রেকফাস্ট বানিয়ে ফেলবে টেরও পাবে না যে হে। কিছুই কি শেখায়নি ইশকুলে? মাংকুর মুখের সামনে ডানা নাড়ায় টিয়া।
- আপনি কে? আমি তো চিনি না আপনাকে। মাংকু মিনমিন করে।
- সে কী হে? জঙ্গলগড়ে থাকো আর আমাকে চেনো না? তুমি তো দেখছি নিতান্তই একটি ইয়ে ছোকরা। শোনো শ্রীমান বুদ্ধুরাম, আমার নাম শ্রীপোপটলাল তোতারাম প্যারটিয়া। মনে রেখো নামটা। এই জঙ্গলগড়ে সব থেকে বড়ো বুদ্ধির ব্যাবসা আমার, বুঝেছ? ওপর নিচে দু’বার মাথা ঝাঁকায় পোপটলাল।
- আ-আজ্ঞে রাখব। নিশ্চয়ই মনে রাখব। আর ইয়ে, মানে আমার নাম মাংকু। বুদ্ধুরাম নয়। মাংকু তোতলায়।
- বাহ্। এই তো দিব্যি কথা ফুটেছে। তা মাংকুরাম বাহাদুর গভীর বনে একা একা বসে চোখের জল কেন ফেলছেন জানতে পারি? হুতুম মাস্টারের গোয়াল তো এখান থেকে ঢের দূরে।
- হুতুম না, ভুতুম। স্যারের নাম ভুতুম। নাম বাঁকিয়ে বলবে না। ভারি রাগ হয় মাংকুর।
- ওই হল। তা ভুতুম মাস্টারের ছাত্তরের মুখ গোমড়া কেন?
মাংকু গোঁজ হয়ে বসে থাকে। জবাব দেয় না।
- আহা বলেই ফেল না হে। বললাম না, আমার বুদ্ধির দোকান আছে। সমস্যাটা জানতে পারলে একটা কিছু উপায় হয়তো বের করেও দিতে পারি। একদম ফিরিতেই দেব, চিন্তা নেই। ছোটো বাঁদরদের কাছ থেকে আমি বুদ্ধির দাম নিই না। এই নাও, এই পেয়ারাটা ধরো দেখি। খেতে খেতে টুক করে বলে ফেল। মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ পেটে কিছু পড়ে-টড়েনি। পোপটলাল খুব নরম সুরে বলে। তার বাড়িয়ে ধরা ডান পায়ে একটা টসটসে পাকা পেয়ারা।
মাংকুর কান্না থেমে গিয়েছিল, কিন্তু হঠাৎ কী যে হল। পোপটলালের আদরের সুরে আবার একেবারে ভেতর থেকে ভাসিয়ে কান্না উঠে এল তার। এতদিনের এত হেনস্থা, এত কষ্ট সব হুড়হুড় করে বেরিয়ে আসতে থাকল বন্যার জলের মতো।
সবটা শান্ত হয়ে শুনল পোপট। কী ভাবে রোজ মাংকুর টিফিন কেড়ে নিয়ে খায় ব্রুনো আর তার চ্যালারা, কীভাবে রোজ ইশকুল ছুটির পর মাংকুকে মাটিতে ফেলে মারে, কীভাবে নিজেরা রোজ একটার পর একটা অন্যায় করে তার দায় নতুন ছেলে মাংকুর ওপর চাপিয়ে দেয়। এমন কী আজকের কাণ্ডটাও চুপচাপই শুনল। সবাই জানে ভুতুম স্যার দিনের বেলা চোখে ভালো দেখেন না। সেই সুযোগ নিয়ে আজ ব্রুনো আর টেডি স্বয়ং ভুতুম স্যারের খাবার চুরি করে খেয়েছে। আর ভালো মানুষের মতো মুখ করে দোষ চাপিয়ে দিয়েছে মাংকুর ঘাড়ে।
- আমাকে স্যার ক্লাসের বাইরে বার করে দিলেন, জানো? সবাই যেতে যেতে একবার করে দেখে গেল আমায়। আচ্ছা তুমিই বলো, ওইসব ইঁদুর-টিঁদুর কি আমি খাই, যে চুরি করব? ফল-টল হলেও নয় বুঝতাম। স্যার এত রেগে গেছিলেন, আমার কোনো কথা শুনলেনই না। আর ওই পাজিগুলো যে পেছনে দাঁড়িয়ে কত ভেংচি কাটছিল, মিটমিট করে হাসছিল সে তো দেখতেই পেলেন না স্যার। উলটে বললেন আবার এরকম হলে আমায় ইশকুল থেকেই তাড়িয়ে দেবেন। হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে মাংকু।
- আহা অত কেঁদো না তো। শান্ত হও। ভাবতে দাও আমায় একটু। খুচখুচ করে বাঁ পা দিয়ে মাথা চুলকোয় পোপটলাল প্যারটিয়াবাঁকানো ঠোঁট ঘষে সেগুনের ডালে।
- আচ্ছা এই ব্রুনোটা কে বলো তো? ওই জাম্বুবান কেভসে থাকে কি? একটা রাম পাজি ভাই আছে?
- হ্যাঁ হ্যাঁ। টেডি। তুমি চেন নাকি? মাংকু আশ্চর্য হয়ে তাকায় পোপটলালের দিকে।
- মনে হচ্ছে যেন চিনি চিনি। ব্রাউন বেয়ার অ্যাকাডেমিতে পড়ত আগে দুটোই, না?
- হ্যাঁ। ইংলিশ মিডিয়াম থেকে এসেছে বলে ভারি ডাঁট। আমি বাংলা মিডিয়াম বলে সব সময় আমায় হ্যাটা করে। ওদিকে তো একটা পড়াও পারে না। শুধু মারপিট করতে পারে। মাংকু নাক মোছে।
- হুঁ। বুঝলাম। পোপট পালক ফুলিয়ে গা ঝেড়ে নেয় দু’বার।
- কী বুঝলে?
- বুঝলাম যে গুণ্ডামি দিয়ে তুমি ওদের সঙ্গে পারবে না।
- সে তো আমি জানিই। আমার গায়ে কি ওদের মতো জোর আছে নাকি? না ওদের মতো কুচুটে মতলব খেলে আমার মাথায়? মাংকুর গলা আবার কান্না কান্না শোনায়। - এত শুনে টুনে এই বুদ্ধি বেরোল বুঝি তোমার মাথা থেকে?
- আরে না হে না। বুদ্ধির কথা তো এখনও বলিইনি তোমায়। সে বলব সময় হলে। তার আগে একবার চেয়ে দেখো তো ওই দিকটায়।
পোপটলালের বাড়ানো ডানার ডগা অনুসরণ করে তাকায় মাংকু। ফুলে ভরা কয়েকটা ঝোপ ছাড়া আর কী যে দেখার আছে কিছুই মগজে ঢোকে না যদিও তার।
- কী দেখব? গোটা কয় বোলতা উড়ছে ভোঁ ভোঁ করে, আর কী আছে ওখানে?
- হ্যাঁ, বোলতাই তো। কিন্তু ওই বোলতার চাকের পাশ দিয়ে কারা খুব সাবধানে চুপি চুপি গুঁড়ি মেরে যাচ্ছে বলো তো?
- আরে, দুটো মানুষ তো। হাতে কাটারি না কী যেন। কাঠ কাটতে যাচ্ছে বোধহয়।
- ঠিক। একদম ঠিক। ওরকম সাবধানে পা টিপে টিপে যাচ্ছে কেন ওরা বলতে পারবে, মাংকুরাম? পোপট জ্বলজ্বলে চোখে তাকায় মাংকুর দিকে।
- বোলতার ভয়ে, না? যদি বোলতা হুল ফুটিয়ে দেয়।
- ভেরি ভেরি গুড। এবার বলো তো, অত ছোটো বোলতাকে অত বড়ো মানুষদুটো অমন ভয় পায় কেন?
- তা তো জানি না। মাংকু মাথা চুলকোয়।
- কারণ বোলতার হুল একবার যে খেয়েছে সে জানে কী জ্বালা ওই হুলে। অত্তোটুকু হলে কী হবে। হুলের ভয়েই বোলতাকে তাই হাতিও ঘাঁটাতে সাহস পায় না, মানুষের কথা তো ছেড়েই দিলাম। ছোটো হলেই যে সব সময় পড়ে পড়ে বড়োর মার খেতে হবে তা কিন্তু মোটেই নয়। এবার তুমি নিজে ভেবেচিন্তে বলো দেখি এ কথা তোমায় কেন বলছি।
- হুল ফোটাতে বলছ ব্রুনোর দলবলকে? কিন্তু আমি হুল কোথায় পাব। আমি তো বোলতা নই। ফ্যালফ্যাল করে তাকায় মাংকু।
- ভাবো। খুব করে ভাবো। তুমি বুদ্ধিমান, ঠিক ভেবে বার করতে পারবে। আজ বাড়ি যাও, আর কষে ভাবো।
মাংকুকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ডানা ঝটপটিয়ে উড়ে গেল পোপটলাল তোতারাম প্যারটিয়া।

সারা রাত সত্যিই খুব করে ভাবল মাংকু। তারপর ভোর ভোর উঠে চান-টান করে ইশকুলের জন্য তৈরি হল।
- আজ আমায় একটু বেশি করে টিফিন দিও তো মা।
মাংকুর কথা শুনে অবাক হয়ে গেলেন হনুমতী। ছেলের হল কী আজ? অন্য দিন তো গোছানো টিফিনের পুঁটলি এখানে ওখানে লুকিয়ে রেখে চলে যায়। আজ নিজে থেকেই নিতে চাইছে, তাও আবার বেশি করে?
- বেশি টিফিন কেন নিবি রে? ইশকুলে কোনো অনুষ্ঠান আছে বুঝি? কৌতূহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞেসই করে ফেলেন হনুমতী।
- না না, ওসব কিছু না। বন্ধুদের দেব। এত ভালো ভালো কলা, পেয়ারা হয় আমাদের এদিকে, ওরাও একটু খাক না।
- হ্যাঁ, হ্যাঁ, সবাইকে দিয়েথুয়ে খাওয়া খুব ভালো অভ্যেস। এই নে, আরও কতগুলো দিয়ে দিলাম তাহলে এই বড়ো শালপাতার পুঁটুলিটায়। ভারি খুশি হয়ে মাংকুর টিফিন গোছাতে থাকেন হনুমতী। যাক, ছেলেটা এতদিনে নতুন ইশকুলে সবার সঙ্গে মিলে মিশে গেছে তাহলে। যা লাজুক ছেলে তাঁর।
ইশকুলের পথে যেতে যেতে আরও কয়েকটা জিনিস টিফিনে যোগ করে মাংকু। এ জঙ্গলের মোটামুটি সব গাছ তার চেনা। বেছে বেছে কয়েকটা থেকে লাগসই কিছু ফলপাকুড় টুকটুক করে ঢোকে তার পুঁটুলিতে। আজ তার কাছ থেকে কেড়েকুড়ে কলা খেয়ে ব্রুনোর অবস্থাটা কী হবে কল্পনা করেই তার হাসি পেয়ে যায়।
ক্লাসে আজ কোনোদিকে না তাকিয়ে সটান সোজা হয়ে বসে মাংকু। একদম ফার্স্ট বেঞ্চে। নিজেকে লুকোতে একটুও চেষ্টা করে না সে বরং টুকটুক করে ভুতুম স্যারের সব প্রশ্নের উত্তর দেয়। ব্রুনো আর দলবল বেজায় অবাক হয়ে চোখাচোখি করে নিজেদের মধ্যে। ভিতু ছেলেটার হঠাৎ এরকম পরিবর্তন। কাণ্ডটা কী?
টিফিন হতে না হতে টেডি এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে মাংকুর ওপর।
- কী রে, খুব যে গুড বয়গিরি দেখানো হচ্ছিল? স্যারকে তেল দিয়ে ক্লাসে ফার্স্ট হবি ভেবেছিস বুঝি? ভারি তো বাংলা মিডিয়ামের হ্যাংলা বাঁদর একটা, কী করে যে এই স্কুলে চান্স পেলি তাই ভাবি।
প্রত্যেকটা কথার সঙ্গে দুমদুমিয়ে কিল পড়তে থাকে মাংকুর পিঠে। অন্যদিন হলে মাংকু কেঁদেকেটে একশা করত। আজ অবশ্য একদম চুপ করে থাকে সে, মুখে মুচকি হাসি। তাই দেখে আরও হিংস্র হয়ে ওঠে টেডি।
ব্রুনো ততক্ষণে হ্যাঁচকা দিয়ে মাংকুর টিফিন পুঁটলি কেড়ে নিয়েছে।
- উঃ, আজ যে দেখছি মেলা খাবার। বলতে বলতে খপ করে আস্ত একটা কলা মুখে পুরে দেয় ব্রুনো। লাফিয়ে এসে আর একটা গেলে টেডি।
বেশিক্ষণ লাগে না মাংকুর হুলের কাজ শুরু হতে।
দুই ভাইয়ের চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসে প্রায়। নাকমুখ দিয়ে জলের স্রোত। পেটে থাবা চেপে যন্ত্রণায় মাটিতে গড়াগড়ি খেতে থাকে দু’জন। ওদের চ্যালারা মাংকুর টিফিনে ভাগ বসাতে আসছিল সবে, কাণ্ড থেকে সবাই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে।
- পরের জিনিস কেড়ে খেলে এরকম শাস্তিই পেতে হয়, বুঝেছ গোবরগণেশরা? আজ কলার মধ্যে ধানি লংকা পুরে এনেছি। কাল হয়তো বিছুটি পাতাও থাকতে পারে।
- তুই, তুই, তোর এত বড় সাহস? হেঁচকি তুলতে তুলতে বলে ব্রুনো। – জানিস আমরা তোকে কী করতে পারি?
- হ্যাঁ। সাহস। কী করবে? কী করতে পারো তোমরা? তোমরা আসলে নিজেরাই ভিতুর ডিম, তাই শুধু গায়ের জোর ফলিয়ে বেড়াও, আর নিজের করা দোষের দায় অন্যের ঘাড়ে চাপাও। একটা হুল তো খেলে আজ, দেখলে তো তার কেমন জ্বলুনি। এবার থেকে কিন্তু আমার হুল রোজ শানানোই থাকবে। সাবধান থেকো বাপুকখন কোথায় হুল ফুটে যায় কে জানে।
গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে মাংকু পকেট থেকে নিজের টিফিন বার করে। হতভম্ব ব্রুনোর দলবলের চোখের সামনেই
নিশ্চিন্তে খেতে খেতে মাথার ওপরে একটা ঝটপট শব্দে চোখ তুলে তাকায় মাংকু। বলা যায় না, কোনো পাজি হয়তো গাছে উঠে বসে আছে। ওখান থেকে লাফিয়ে পড়বে ঘাড়ে। সাবধানে গাছের পাতার ফাঁকফোকরে নজর চালায় মাংকু।
না, ব্রুনো টেডির চ্যালা-ট্যালা কেউ নয়। পোপটলাল এসে বসেছে বটের ডালে। তার দিকে তাকিয়ে ফিক করে একটু হাসে মাংকু। আর পড়ে পড়ে মার খাবে না সে। একা একা কাঁদবেও না।  হুল ফোটাতে শিখে গেছে মাংকুরাম
_____
ছবিঃ পার্থ মুখার্জী

গল্পের ম্যাজিক:: কুপার্স লজ - অদিতি সরকার


কুপার্স লজ
অদিতি সরকার

দূর, একটা পদের থাকার জায়গা পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় না,” বিক্রম স্ক্রিনের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত স্ক্রোল করে নামতে নামতে গজগজ করছিল। আজকের দিনেও আদ্ধেক হোটেলের কোনও ওয়েবসাইটই নেই। সেই পুরনো দিনের চিন্তা নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলে না, দূর দূর।
জিষ্ণু বিক্রমের কাঁধের ওপর দিয়ে ঝুঁকে দেখার চেষ্টা করছিল।
কেন, এই যে এটা? বেশ ভালো তো,” একটা রঙচঙে পাঁচতলা ইট-সিমেন্টের স্তূপের দিকে আঙুল দেখাল জিষ্ণু।
মাথা খারাপ!বিক্রম এককথায় উড়িয়ে দিল। এসব জায়গা আমাদের জন্য নয়।
তা বটে,” জিষ্ণু গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ে। ওখানে থাকতে গেলে শুধু থাকাটাই হবে। খাওয়ার পয়সা আর থাকবে না।
এইসব হোটেলের গপ্পো আমি খুব ভালো জানি,” স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই জবাব দেয় বিক্রম।বাইরে যে চা খাবি দশ টাকা কাপ, এখানে ঢুকলেই সেটা এক লাফে তিনশো টাকা। পোষাবে না রে, ভাই।
এটাও বেশ কিন্তু।জিষ্ণু আরেকটা ছবির দিকে আঙুল দেখায়। সত্যিই সুন্দর জায়গাটা। প্রচুর গাছপালা, সুইমিং পুলও দেখা যাচ্ছে।
বেশ তো বটেই, কিন্তু রেটিং দেখেছ চাঁদু? ফোর স্টার। আমাদের মতো ব্যাকপ্যাকিং বাইকার দেখলে সিকিউরিটি গেট থেকেই তাড়িয়ে দেবে। বাজেট হোটেল খোঁজো বন্ধু, বাজেট হোটেল।  আরে দাঁড়া দাঁড়া, এটা একবার দ্যাখ তো!” হালকা চালে কথা বলতে বলতে হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে ওঠে বিক্রম। তার সামনে স্ক্রিনজোড়া ছবিটায় বড়ো বড়ো গাছে প্রায় ঢাকা পড়ে যাওয়া একটা পুরনো দিনের সাহেবি বাংলো। কালচে হয়ে আসা লাল টালির ছাদ ঢেকে ঝাঁপানো বুগেনভিলিয়া। সামনে ছড়ানো একটু অগোছালো লন। পেছনে আবছা নদী দেখা যাচ্ছে। বিউটিফুল, না!”
একটু পুরনো মতন লাগছে না? কীরকম ফাঁকা ফাঁকা। খেয়াল করে দ্যাখ, দেওয়ালের রঙটঙ সব চটে গেছে। মালিক নজর দেয় না মনে হয়। সার্ভিস ভালো হবে না এখানে, আমি শিওর। জিষ্ণুর গলায় খুঁতখুঁতে ভাব লুকোনো থাকছিল না। আরও কয়েকটা খুঁজে-টুজে দেখতে পারিস তো। বেটার কিছু থাকে যদি?
বেটার খুঁজতে গেলে পকেট পারমিট করবে না। তাতে উইক-এন্ডের বাজার। সঙ্গে একদিন এক্সট্রা ছুটি। পিলপিল করে ট্যুরিস্ট আসবে, ভাইয়া। তাদের পকেট আমাদের তুলনায় হাজারগুণ গরম। ফটাফট কড়ি ফেলবে আর টপাটপ ভালো ভালো হোটেলের ভালো ভালো রুমে সেট হয়ে যাবে।
কিন্তু এই জুন মাসে করবেট পার্ক তো এখন বন্ধ। আবার সেই অক্টোবরে খুলবে। এখনও এত ট্যুরিস্ট হবে বলছিস?” জিষ্ণু অবাকই হচ্ছিল বিক্রমের কথা শুনে।
আরে, সব গেট বন্ধ না। ঝির্না গেট সারাবছর খোলা থাকে। কোর এরিয়ায় নিয়ে যায় না ঠিকই, কিন্তু ট্যুরিস্ট নিয়ে পঁচিশটা গাড়ি রোজ জঙ্গলে ঢোকে। আর তাছাড়া আমাদের মতো পাগল কি কম আছে নাকি দুনিয়ায়? অফ সিজন বলে ট্যুরিস্ট কম হবে এমনটি ভেব না, বাছা। বিক্রম হাসতে হাসতে বলে।দেখিই না এটা কেমন। রেটে পুষিয়ে গেলে মন্দ কী। একরাতের তো মামলা।বিক্রম কীবোর্ড ট্যাপ করতে করতে বলে। তারপর কীরকম চমকে গিয়ে আবার ট্যাপ করে। কী হল বল তো ব্যাপারটা? এইমাত্র দেখলাম তো। এইখানেই ছিল না ছবিটা?
বেশি পিছিয়ে গেছিস মনে হয়,জিষ্ণু স্ক্রিনের দিকে না তাকিয়েই জবাব দেয়।
উঁহু। এখানেই ছিল। পরিষ্কার মনে আছে। জাস্ট উড়ে গেল।
তাহলে বোধহয় পুরো ভর্তি হয়ে গেছে। আর বুকিং নেবে না। সাইট থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
যাহ্‌, সে আবার হয় নাকি? দু’মিনিটের মধ্যে? কী যে বলিস তার ঠিক নেই।
আচ্ছা বেশ,” জিষ্ণু কাঁধ ঝাঁকায়,আমি কী বলছি শোন। ওসব ওয়েবসাইট-ফাইট ছাড়। এদেশে ওসব চলে না। বরং আমার প্ল্যানটা অনেক বেটার। একদম ভোর ভোর দিল্লি থেকে বাইক নিয়ে স্টার্ট করবি, বুকিং-টুকিং ছাড়াই। সোজা ধিকুলিকতক্ষণ লাগবে, ঘণ্টা পাঁচেক? না হয় ধর ছ’ঘন্টাই হল, রাস্তায় ব্রেকফাস্ট-টেকফাস্ট করে তাও দেখবি বারোটা সাড়ে বারোটার মধ্যে পৌঁছেই যাব। ধিকুলি থেকে করবেট পার্কের গেটের মধ্যে যে জায়গাটা পছন্দ হবে, ঢুকে জিজ্ঞেস করব। ঠিক আছে? দরে পোষালে, ওখানেই নাইট হল্ট। ওকে? পরের দিন ওখান থেকে রানিখেত, ইচ্ছে হলে আলমোড়া ডিল?
বিক্রম হাই ফাইভ করার জন্য ডানহাতটা তোলে।ডিলনেহাতই কিছু না জুটলে আশেপাশের গ্রামের কাউকে ধরে-টরে রাত্তিরটা ওদের কারও কুঁড়েঘরেই থেকে যাব, কী বলিস?”

ভোর সাড়ে চারটের সময় চেনা দিল্লির আকাশকেও অন্যরকম লাগে। রাস্তাগুলোকেওপাতলা সরের মতো আলোমাখা আকাশের নিচে ন্যাশনাল হাইওয়ে নাইন ধরে বিক্রমের বাইক হু হু করে উড়ে যাচ্ছিল।
ওরা ধিকুলিতে ঢুকল বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ। কাশীপুরের কিছু আগে একটা অ্যাক্সিডেন্টের জন্য প্রায় চল্লিশ মিনিট দেরি না হলে আরও আগেই পৌঁছে যেত হয়তো। যে উৎসাহ নিয়ে বেরিয়েছিল সেটা অবশ্য এতক্ষণে কিছুটা কমে এসেছিল ওদের। রাস্তার ডানদিকে কোশি নদীর ধার ঘেঁষে পরপর অনেকগুলো রিসর্টই রয়েছে, কিন্তু কোনওটাই ওদের পকেটের মাপের নয়। তবুও বিক্রম প্রত্যেকটার রিসেপশনে ঢুকে ঢুকে জিজ্ঞাসা করছিল, যদি অফ সিজন বলে কিছু ছাড়-টাড় পাওয়া যায়। ছাড় ছিলও কয়েকটাতে। কিন্তু ছাড়ের পরে যে অঙ্কটা থাকছিল সেও ওদের সাধ্যের বাইরে।
কী রে, শেষপর্যন্ত গ্রামেই যেতে হবে নাকি?” জিষ্ণু হেলমেটের তলা দিয়ে আঙুল চালিয়ে মাথা চুলকোয়।
দাঁড়া নাকিছু না কিছু ঠিক জুটে যাবে। বিক্রমের মনোবল এখনও অটুট। এখানে কি শুধু বড়লোকরাই বেড়াতে আসে নাকি?”
কিন্তু এই গরিবের যে পেটে ছুঁচোর পল্টন প্যারেড করছে!
বিক্রম উত্তরে কী একটা বলতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। ওটা কী দ্যাখ তো?”
কোনটা?”
আরে, ওই যে একটা সাইনবোর্ড মতন। দেখতে পাচ্ছিস না?” বিক্রম রাস্তার ধার ঘেঁষে বাইক থামায়।
ততক্ষণে জিষ্ণুও দেখতে পেয়েছে বোর্ডটা। রাস্তার পাশেই একটা মোটা শালের খুঁটিতে আটকানো সাদা রঙ করা কাঠের চৌকো বোর্ড। তাতে কালো দিয়ে একটা তিরচিহ্ন আঁকা। তিরের মুখ বাঁদিকে। তার তলায় পুরনো স্টাইলের রোমান হরফে বড়ো বড়ো করে লেখা, কুপার্স লজ। গুড ফুড, কমফর্টেবল অ্যাকোমোডেশন
কী রে? দেখবি নাকি একবার ট্রাই মেরে? ভালো খাবার, আরামের আস্তানা?” বিক্রম বাইকে স্টার্ট দিতে দিতে জিষ্ণুর দিকে তাকায়।
চল। এতগুলো যখন দেখলাম, এটাও না হয় দেখেই নিই একবার জিষ্ণু লাফিয়ে বিক্রমের পেছনে চড়ে বসে আবার।
একটু এগিয়েই একটা সরু গলিমতো পাওয়া গেল বাঁদিকে, বড়ো রাস্তা ছেড়ে এঁকেবেঁকে নেমে গেছে। বাইক ঘুরিয়ে গলিতে নামার সঙ্গে সঙ্গে হাইওয়ে ধরে ছুটে চলা গাড়ির একটানা গর্জন, মাঝবেলার ঝাঁঝালো গরম যেন নিমেষে শূন্যে মিলিয়ে গেল। অদ্ভুত শান্ত নৈঃশব্দ্য ওদের ঘিরে ফেলেছিল। শুধু বিক্রমের বাইকের শব্দ ছাড়া আর কোনও আওয়াজই নেই কোথাও।
একটু এবড়োখেবড়ো পাথুরে রাস্তা, কিন্তু দু’ধারে বিশাল বিশাল গাছ ছায়া করে রেখেছে একেবারে। দেখলেই বোঝা যায় গাছগুলোর বয়স অনেক। ঠান্ডা সবজেটে সুড়ঙ্গটার ভেতর দিয়ে সাবধানে, সামান্য লাফাতে লাফাতে চলছিল বিক্রমের বাইক। প্রায় মিনিট তিনেক চলার পর একটা কাঠের গেটের সামনে এসে ঝপ করে রাস্তাটা ফুরিয়ে গেল। গেটের পাশেই পাঁচিলে গাঁথা পাথরের ফলকে বড়ো বড়ো করে লেখা, কুপার্স লজ।
গেটটা অবশ্য খোলাই ছিল। নুড়ি ফেলা রাস্তা ধরে ওরা ভেতরে ঢুকে এল। আলোছায়ার জাফরিকাটা লনের ওপারে ঢালু ছাদের বাংলো প্যাটার্নের হাত-পা ছড়ানো বাড়িখানা দুপুরের রোদে ঝলমল করছিল।
আরে! এটাই সেই রিসর্টটা না? ওই যে, ওয়েবসাইটে দেখেছিলাম? যেটা উড়ে গেল?” বিক্রমের বিস্ময় ছিটকে বেরোয়।
তা জানি না তবে জায়গাটা সত্যি দারুণ। এবার গরিবের কপাল কী বলে দেখা যাক। জিষ্ণু পেতলের গুল বসানো প্রাচীন চেহারার কাঠের দরজাটার দিকে যেতে যেতে হাসে। কথা বলতে তো ক্ষতি নেই।
আমলকি গাছের ঝিরঝিরে ছায়ায় বাইক দাঁড় করিয়ে ওরা দু’জন এগোয়। মধ্য-জুনের দুপুরের বাতাস যেন ভেজা কম্বলের মতো ভারী গলিটার মতোই এখানেও চারদিক অদ্ভুত চুপচাপ।
দরজাটা জিষ্ণুর আঙুলের আলতো ছোঁয়াতেই নিঃশব্দে মসৃণভাবে খুলে গেল। ভেতরে ঢুকে কিন্তু ওরা অবাক হয়ে গেল। বাইরে থেকে বাড়িটাকে দেখতে যেমন স্বাধীনতার আগের যুগের নমুনা মনে হচ্ছিল, ভেতরটা একেবারেই তার উলটো।
ওরা ভাবছিল সেই আদ্যিকালের মোটা মোটা ফার্নিচার, গদি বসে যাওয়া সোফা-টোফা দিয়ে সাজানো একটা অন্ধকার ঘর গোছের কিছু দেখবে। কাচ আর স্টিলের ধারালো আধুনিক আসবাব, সিলিং থেকে ঝরে পড়া লুকোনো স্পটলাইটের আলো, দেওয়ালজোড়া এলসিডি টিভি - এসব ওরা একেবারেই আশা করেনি।
নাহ্‌, জিষ্ণু হতাশ মাথা নাড়ে। এখানেও হল না।
কেন?”
দেখতেই তো পাচ্ছিস। এখানকার রেট আরও চড়া হবে।
কিন্তু গেল কোথায় সব? একেবারে শুনশান। কেউ থাকে-টাকে না নাকি?”
বলতে বলতেই বাড়ির ভেতরের দিকের কাচের দরজা ঠেলে একজন ঢুকে এল। লম্বা রোদে পোড়া পেটানো চেহারা। পরনে একটা হাতকাটা গেঞ্জি আর জঙ্গলছাপ ট্র্যাক প্যান্ট। বিক্রমদের থেকে বড়োই হবে কিছুটা।
গুড আফটারনুন, গুড আফটারনুন। সরি, আমি একদম টের পাইনি আপনারা এসেছেন। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে?”
না, এই তো। এটা, মানে হোটেল তো?” বিক্রম সোজা কাজের কথায় আসে।
ঠিক হোটেল বলা যায় না।
এইটুকু শুনেই জিষ্ণু পেছন ফিরছিল ভদ্রলোক হাঁ হাঁ করে উঠলেন। আরে, ও কী? কী হল? চললেন কোথায়?”
আপনি যে বললেন হোটেল নয়। সরি, দুপুরবেলা এসে বিরক্ত করলাম।
আরে, দাঁড়ান। কথাটা শেষ তো করতে দিন। ওহো, আমার পরিচয়টাই তো দেওয়া হয়নি। কর্নেল অরবিন্দ নেগি, রিটায়ার্ড। একটা চওড়া পাঞ্জা একে একে ওদের দু’জনের হাতদুটো ঝাঁকায়। কুপার্স লজ আমার বাড়ি। কিন্তু একা একা এত বড়ো বাংলো নিয়ে কী করব বলুন তাই কিছু ঘর ভাড়া দিই। একরাত থেকে একবছর, যেমন যে চায়। তবে হ্যাঁ, ভাড়াটে পছন্দসই হলে তবেই।
জিষ্ণু হাসে এবার। আমরা কি একরাতের জন্য আপনার পছন্দসই ভাড়াটে হতে পারি?”
কর্নেল নেগি তক্ষুনি উত্তর দেন না। তীক্ষ্ণ দুটো হালকা বাদামি চোখ খুব ভালো করে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত জিষ্ণু আর বিক্রমকে খুঁটিয়ে দেখে বেশ কিছুক্ষণ। বিক্রমের অস্বস্তি হচ্ছিল ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে। কিছু একটা উলটোপালটা বলে ফেলার আগেই নেগির ঠোঁট নড়ল।
পারেন।
কিন্তু, আপনার রেটটা?”
কর্নেল নেগি যে ভাড়াটা বললেন সেটা শুনে দু’জনেরই বুক খালি করে স্বস্তির শ্বাস পড়ল।
আসুন, ভেতরে আসুন। পেছনের ঘরটায় আমি থাকি। বাকি সব ঘরই আজ খালি। যেটা পছন্দ বেছে নিন। তবে আমি সাজেস্ট করব ওই কোণের ঘরটা। কোশি নদী একেবারে পাশ দিয়েই বয়ে যাচ্ছে প্রায়। আনপ্যারালেলড ভিউ।
ইয়ে, এখানে খাবারদাবারের ব্যবস্থা, মানে... জিষ্ণু ইতস্তত করে। আপনি একা থাকেন বলছিলেন।
একা থাকি। তার মানে কি একাই সব করি? কাজের লোকজন গ্রাম থেকে আসে, কাজ সেরে চলে যায়। ভয় নেই, খেতে পাবেন। উইদাউট এনি এক্সট্রা চার্জ। লাঞ্চ করবেন তো?” ওদের উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলতে থাকেন নেগি, তবে হ্যাঁ, এবেলা হয়তো একটু কষ্ট হবে। আপনারা আসবেন জানা ছিল না তো। সেভাবে রান্না কিছু হয়নি। রাজমা-চাওল চলে?”
দৌড়য়। জিষ্ণু একমুহূর্ত সময় নেয় না জবাব দিতে

শুধু রাজমা-চাওল নয়, তার সঙ্গে অতীব সুস্বাদু একটা তরকারিও ছিল নানারকম সবজি মেশানো। শেষপাতে সেমাইয়ের পায়েস। বেশিই খাওয়া হয়ে গেল।
এখন শুবি নাকি, হ্যাঁ রে?” জিষ্ণুর আকাশপাতাল হাই তোলা দেখে ঘাবড়ে যাচ্ছিল বিক্রম।
হুঁ, একটু গড়াই। যা খাওয়া হল। তুই গেলে যা, ছবি-টবি তোল গে, যা
তাই যাব। এখন শুলে আর দেখতে হবে না। নেগি-স্যারকে দেখতে পেলে একটু ধারে-কাছের ভালো স্পট নিয়ে আইডিয়া পাওয়া যেত।ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বার করতে করতে বলে বিক্রম।
কর্নেল নেগিকে অবশ্য আশেপাশে কোথাওই দেখা গেল না। বিক্রমও আর ডাকাডাকির চেষ্টা করেনি। হয়তো বিশ্রাম নিচ্ছেন ভদ্রলোক। একাই বাংলোর চারদিকে ঘুরে ঘুরে ছবি তুলে যাচ্ছিল সে। অদ্ভুত নীল আকাশ, অনেক ওপরে উড়তে থাকা নিঃসঙ্গ চিল, চারদিকের ঝিম ধরা নির্জনতা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছিল আস্তে আস্তে। এত ভালো একটা জায়গা পেয়ে যাবে থাকার জন্য এটা তার কল্পনাতেও ছিল না।

রাতে খাওয়ার টেবিলে নেগি এলেন আবার। উনিই দরজায় টোকা দিয়ে ডেকেছিলেন খেতে, সাড়ে আটটা নাগাদ। তখন লক্ষ করেনি, এখন বিক্রমের চোখে পড়ল ভদ্রলোকের কপালে, গালে গভীর কয়েকটা কাটা দাগ। সবথেকে বড়ো দাগটা বাঁ-কানের তলা দিয়ে নেমে গলা বেয়ে শার্টের কলারের আড়ালে ঢুকে গেছে। যুদ্ধক্ষত। চোখ সরিয়ে নিতে নিতে মনে মনে ভাবে বিক্রম। প্রচন্ড কৌতূহলকে চেপে নেয় সে। প্রথম পরিচয়েই কাউকে এসব জিজ্ঞাসা করা অভদ্রতা।
এবেলা মুরগি হয়েছে। দুর্ধর্ষ স্বাদ। জিষ্ণু কোনওদিকে না তাকিয়ে মন দিয়ে খেয়ে যাচ্ছিল। নেগির কথায় মুখ তুলে তাকাল।
আপনারা কি ন্যাশনাল পার্কে ঢুকবেন কাল? তাহলে কিন্তু পারমিট করাতে হবে রামনগর থেকে।
না। এই মুহূর্তে জঙ্গল দেখার খুব একটা ইচ্ছে নেই। আমরা আসলে জাস্ট একটা রোড ট্রিপে বেরিয়েছি। সেভাবে ঠিক বাঘ-টাঘ দেখতে নয়।বিক্রম জবাব দেয়।
ওকে দেন। কখন বেরোবেন তাহলে?”
যতটা সকাল সকাল পারা যায়।
গুড। আমিও আর্লি রাইজার। তবে কাল আমারও একটু বেরোনো আছে। এক কাজ করবেন। যদি আমি না থাকি, রুমের চাবিটা লাউঞ্জেই রেখে দেবেন বরং।
আর আপনার বিলটা? এখনই ক্লিয়ার করে দিই তাহলে?” বিক্রম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে।
আরে, না না। চাবির সঙ্গেই রেখে দেবেন। কেউ নেবে না।নেগি হাত নাড়েন। বিক্রমের আবার চোখে পড়ে, চওড়া কবজি ঘিরে শুকনো বাদামি কাটা দাগ। ওকে দেন, জেন্টলমেন, এনজয় ইয়োরসেলভস। গুড নাইট।
আপনি খেলেন না?” জিষ্ণু ভদ্রতা করে।
আমার খাওয়া হয়ে গেছে, থ্যাঙ্কসআসলে অনেকদিনের অভ্যেস, সন্ধে-সন্ধেয় খেয়ে নিই। একটু সুপ-টুপ হলেই হয়ে যায় আমার, বেশি লাগে না। ইউ পিপল ক্যারি অন। মাথাটা অল্প ঝুঁকিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন কর্নেল নেগি।

উঠতে উঠতে একটু বেলাই হয়ে গিয়েছিল। বেরোতে বেরোতে সেই সাতটা বাজল। কর্নেল নেগিকে কোথাওই দেখা গেল না। কাজের লোক-টোকও কেউ এসে পৌঁছয়নি।
কী আর করা উনি যেমন বললেন অমনিই করি তাহলে? টাকা আর চাবি এই টেবিলের ওপর রেখে দিয়ে যাই?”
আর তো কোনও উপায় দেখছি না। কে কখন আসবে তাও জানি না। অপেক্ষা করতে গেলে বেলা গড়িয়ে দুপুর হবে তো।
বিক্রম চকচকে পালিশ করা টেবিলে একরাতের ভাড়াটা রাখে। পাঁচশো টাকার চারটে নোট। কী ভেবে আরও একটা পাঁচশো টাকার নোটও রেখে দেয় এত ভালো সার্ভিসের জন্য কৃতজ্ঞতা। চকচকে পেতলের চাবিটা দিয়ে চাপা দিয়ে দেয় টাকাগুলো। ভালোই হয়েছে কর্নেল নেগি নেই। থাকলে হয়তো বাড়তি টাকাটা দিতে দিতেন না।
রইল তাহলে। চল, বেরিয়ে পড়ি।

রানিখেত পৌঁছতে মোটামুটি ঘণ্টা তিনেক লাগল ওদের। ছবির মতো সুন্দর ছোট্ট পাহাড়ি শহর। বিক্রম সাধ মিটিয়ে ছবি তুলছিল। সাধারণ ট্যুরিস্ট স্পটে যাওয়ার ঝোঁক ছিল না ওদের দু’জনের একজনেরও। এ-রাস্তা ও-রাস্তায় শুধু উদ্দেশ্যহীন ঘোরা, আর ছবি তোলা। এখান থেকে আবার কৌশানি যাওয়ার প্ল্যান।
জিষ্ণুকে সকাল থেকেই একটু আনমনা দেখছিল বিক্রম। দুপুরে সর্দারজির ধাবায় বসে খেতে খেতে প্রশ্নটা করেই ফেলল তাই। কী হয়েছে রে তোর? শরীর খারাপ লাগছে?”
জিষ্ণু একবার তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল। কৌশানি না গেলে তুই কি খুব রাগ করবি?”
মানে? সেই প্ল্যানই তো ছিল। মুখে গ্রাস তুলতে গিয়ে থেমে যায় বিক্রম।
না আসলে, ওই কুপার্স লজটা বড্ড ভালো ছিল কিন্তু, বল। স্পেশালি রান্নাটা।
কী বলতে চাইছিস ঠিক করে বল তো দেখি, পেটুকরাম।
জিষ্ণু লজ্জা পেয়ে হাসে।
আসলে, ভাবছিলাম, আজ রাতটাও ওখানেই কাটিয়ে কাল ওখান থেকেই দিল্লির জন্য রওনা দিলে হত না? আবার কৌশানি-টৌশানি কী দরকার? গায়ে অলরেডি ব্যথা হয়ে গেছে তো।
মন্দ বলিসনি কিন্তু। খুব রেস্টফুল, নেগি-স্যারের বাংলোটা। এত ভালো ঘুম কবে লাস্ট ঘুমিয়েছি মনেই নেই। ঠিক হ্যায়, কৌশানি রইল পরের বারের জন্য।

সাইনবোর্ডটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিল না ওরা।
এইরকম জায়গাতেই তো ছিল!জিষ্ণু একটু বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিল।
উলটোদিকে দেখছিস কেন, রাস্তার ওধারে? ওপর থেকে নামছি না?” হাওয়া বিক্রমের কথা উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
আরে, ওধারেই তো দেখছি। নেই, দ্যাখ।
বেশি নিচে চলে এসেছি বোধহয়। খেয়াল করিনি, পেছনে রয়ে গেছে হয়তো। দাঁড়া, ওই চায়ের দোকানটাতে জিজ্ঞেস করি।
কর্নেল নেগির নাম বলাতে প্রৌঢ় দোকানদার সহ উপস্থিত বাকি খদ্দেররাও চুক চুক শব্দ করে মাথা নাড়ল। জরুর চিনতাম সাব। বড়ো ভালো লোক ছিলেন।
ছিলেন? ছিলেন মানে?” বিক্রম অবাক হয়ে তাকায়।
নেগি-সাব আমাদের দেশেরই লোক ছিলেন তো। গাঢ়ওয়ালি রাজপুত। অকেলা আদমি, শাদি-টাদি করেননি। ফৌজ থেকে রিটায়ার করে ওই কুপার-সাহেবের পুরনো বাংলোটা কিনে অনেক খরচা করে সাজিয়েছিলেন। কে জানত, ওই বাংলোতেই একদিন অমনভাবে শেষ হতে হবে। মিলটারিতে অত জঙ্গ লড়ে যার কিছু হল না, তার হল কিনা নিজের গাঁওয়ে ফিরে। চা ঢালতে ঢালতে দুঃখিত মাথা ঝাঁকায় দোকানি।
কী বলছ ভাই, আমরা তো কিচ্ছু বুঝতে পারছি না!
হাঁ, সাব। আমরাও বুঝিনি। রুম ভাড়া দিতেন তো। অনেক দেখেশুনেই দিতেন। তাও তো চুক হয়ে যায় বাবুজি, হয় না, বলুন?”
ওদের হতবুদ্ধি চোখের সামনে দোকানের বাকি খদ্দেররা ঘন ঘন মাথা নাড়ে ওপর নিচেসচ বাত। চুক হয়ে যায়।
তিনটে ঘর ভাড়া দিয়েছিলেন নেগি-সাব। তিনটে ছেলে এসেছিল। মনে অন্য ধান্দা ছিল ওদের কর্নেল-সাব জানতেন না। এত বড়ো বাংলো, ওরা ভেবেছিল অনেক টাকাপয়সা আছে। লুটতে এসেছিল ওরা। রাতে নিজের ঘরে ঘুমিয়েছিলেন সাহেব দোর খোলাই ছিল, কিছু সন্দেহ তো করেননি। ওরা বিছানাতেই কুপিয়ে কুপিয়ে শেষ করে দিয়েছিল লোকটাকে।
কী, বলছ কী? আমরা তো... জিষ্ণুর হাতে চাপ দিয়ে থামিয়ে দেয় বিক্রম।
ধরা পড়েনি কেউ?”
তখন পড়েনি। অন্য একটা ডাকাইতির কেসে গিরফতার হয়েছিল পুরা গ্যাংতখন বলেছিল। ওই তো আগে ডানদিকে গলি। কেউ যায় না আর কুপার-সাহেবের বাংলোতে। খন্ডহর হয়ে পড়ে আছে।
কিন্তু, আমরা যে... আবার জিষ্ণুকে থামায় বিক্রম।
কবেকার কথা বলো তো ভাই এসব?”
এটা অংরেজির কী মাস, বাবু? জুন তো? পাঁচ সাল পহলে এইসি এক জুন মাহিনাতেই হয়েছিল এই কান্ড। জুনের চৌবিস কি পচ্চিস তারিখ। চাওয়ালা আঙুলে হিসেব করে বলে।
আজ ছাব্বিশে জুন। জিষ্ণু খুব আস্তে বলে।
বিক্রম আর কোনও কথা বলে না। নিঃশব্দে দু’কাপ চায়ের দাম চুকিয়ে বাইকে চড়ে বসে।
হ্যাঁ। এই গলিটাই। কিন্তু গতকালের সেই সবুজ সুড়ঙ্গ কোথায় গেল? হাইওয়েতে ছুটে চলা গাড়ির অবিশ্রাম শব্দ সমানে ধাক্কা মারছিল কানে। ভাঙাচোরা গর্তে ভরা রাস্তা খুব কষ্ট করে চালাতে হচ্ছিল বাইক। দু’ধারের গাছগুলোর বেশিরভাগই মরা যেগুলো বেঁচে আছে সেগুলোরও অবস্থা ভালো নয়। প্রবল ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে রাস্তার শেষে পৌঁছে ওরা দেখল একটা ভাঙা গেট, যার একদিকের পাল্লা কবজা থেকে ভেঙে ঝুলছে। পাথরের ফলকে লেখা নামের রঙ অনেকটা মুছে এলেও এখনও পড়া যাচ্ছে অবশ্য।
আমি তো কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। এসব কী? কী ব্যাপার এগুলো?” জিষ্ণুর গলা থরথর করে কাঁপছিল।
বিক্রম কোনও উত্তর দেয় না। শ্যাওলামাখা নুড়িবিছানো আগাছাঢাকা পথ মাড়িয়ে সে তখন যাচ্ছিল পালিশহীন কাঠের দরজাটার দিকে। তার চোয়াল শক্ত, কপালে ভাঁজ। অনেক কিছুই চোখে পড়ছিল তার। দরজার গায়ে বসানো পেতলের গুলগুলো, অযত্নে কালচে। ছাদের টালি খসে গেছে অনেক জায়গায়।  বুগেনভিলিয়ার শুকনো কঙ্কাল ঝুলছে ভাঙা টালির ওপর।
কোথায় যাচ্ছিস, বিক্রম? কী পাগলামি করছিস! ঢুকিস না ভেতরে। জিষ্ণু আবারও আতঙ্কিত চিৎকার করে ওঠে।
বিক্রম কিচ্ছু শুনছিল না। দরজাটা একটু ঠেলতে হল, কিন্তু খুলল। শব্দ হল ক্যাঁচক্যাঁচ, মেঝেতে ঘষটে গেল ঝুলে পড়া পাল্লা, তবুও খুলল।
জিষ্ণু পেছন পেছন এসেছিল বিক্রমের। বিস্ফারিত চোখে চারদিক দেখছিল সেঝুলে ভর্তি দেওয়াল, একটা ছেঁড়া সোফা আর একটা পা ভাঙা টেবিল ছাড়া আর কোনও আসবাব নেই কোত্থাও। একটা দমবন্ধ স্যাঁতসেঁতে গন্ধ ভেতরে।
টেবিলটার সামনে পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিক্রম।
বিক্রম?” জিষ্ণু খুব সাবধানে কাঁধে হাত রাখে।
আস্তে, খুব আস্তে পেছনে ফেরে বিক্রম। আমরা এসেছিলাম। এসেছিলাম আমরা।
মানে?”
হালকা কাঁপতে থাকা ডানহাতটা জিষ্ণুর চোখের সামনে তুলে ধরে বিক্রম।
বিক্রমের হাতে একটা কালচে ছোপ ধরা পেতলের চাবি, আর ধুলোয় মলিন হয়ে যাওয়া পাঁচটা পাঁচশো টাকার নোট।
_____
অলঙ্করণঃ সুমিত রায়