গল্পের ম্যাজিক:: স্বপ্ন পূরণের গল্প - রম্যাণী গোস্বামী


স্বপ্ন পূরণের গল্প
রম্যাণী গোস্বামী

আড়মোড়া ভেঙে একটা ছোট্ট হাই তুলে চোখ পিটপিট করে সটান ঘড়িটার দিকে তাকিয়েই আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল টিনা’র। ঘড়িটা আদৌ চলছে তো? নাকি বন্ধ হয়ে পড়ে আছে কাল রাত এগারোটা পনেরো থেকে? বাড়িতে এত লোক। মা, বাপি, কুট্টিকাকা, ঠামি, জেজে, জেম্মা, কেউ ওকে ডাকল না একবারও? এত বেলা হয়ে গেল তাও? ওর ফেভারিট কার্টুন ‘প-পেট্রল’ মিস হয়ে গেল তাও? এমনকি ওর বেস্ট ফ্রেন্ড কুটাই? সেও ওকে ভুলে গেছে? অভিমানে ঠোঁট ফুলে গেল বেচারির।
পায়ে পায়ে হল রুমে এসে রাগের পাল্লা ভারি হল আরও। সবাই গদগদ মুখে বসে আছে ডাইনিং টেবিল ঘিরেকুট্টিকাকার হাতের প্লেটে ফুলকো লুচি আর লাল লাল আলুর দম। মা কুট্টিকাকার চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে বড় এক বোল হাতে। গাজরের হালুয়া খাওয়ানোর জন্য সাধাসাধি চলছে! জেজে একবার চশমার ফাঁক দিয়ে তাকালেন টিনা’র দিকে। মুখে কিছু না বললেও টিনা জানে ওই তাকানোর মানে একটাই। সেটা হল, এই দ্যাখো, আমাদের ধাড়ি মেয়ে এতক্ষণে ঘুম থেকে উঠলেন!
মা বললেন, ব্রাশ করেছিস? আয়, দুটো লুচি খেয়ে নিবি আয়।
টিনা মোটেই সেদিকে গেল না। ওর চোখ জ্বালা করছে। বরং ধাঁ করে ঘুরে ও সেঁধিয়ে গেল ব্যালকনিতে। নীল রঙের আকাশে রোদ ঝলকাচ্ছে খুশির। রোববারের সকাল। সবাই আনন্দে মাতোয়ারা। কিন্তু টিনার মুডটাই ভালো নেই একদম। কারণটা আর কিচ্ছু নয়। ছোট থেকে যাকে নিয়ে ধস্তাধস্তি, ও ব্যাটাই, ক্লাস এইটের ফাইনাল পরীক্ষায় সেই ভয়ঙ্কর অঙ্কের পেপারটাই ওকে ডুবিয়েছে আবারও। বাকিগুলো মনে হয় উতরে গেছে ভালো মতো। কিন্তু অঙ্কে মেরেকেটেও ষাটের বেশি উঠবে না। এতবার প্র্যাকটিস করা জিনিস কিন্তু পরীক্ষার হলে বসে ঘামতে ঘামতে কেমন করে যেন সমস্ত গুলিয়ে একশা!
আর সেই খবরটা শোনার পর থেকেই বাড়ির সকলে এমনভাবে তাকাচ্ছে ওর দিকে যেন কী একটা সাঙ্ঘাতিক অপরাধ করে ফেলেছে টিনা। বাপি দুদিন প্রায় কথাই বলেন নি। বাকিরা বলছে বটে টুকটাক, কিন্তু কেমন যেন করুণা করবার মতো ভাব ভঙ্গি তাঁদেরকুট্টিকাকা গত বছরই ফিজিক্সে এমএসসি তে গোল্ড মেডেল পেয়ে এখন পিএইচডি করতে ব্যস্ত। আর এস হস্টেলে থাকেন আর সপ্তাহে একদিন করে বাড়ি আসেন। সব শুনে টুনে ওর দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছেন যেন টিনা অন্য গ্রহের এলিয়েন। মিত্তিদিদি, মানে জেজে-জেম্মার একমাত্র ডলপুতুলের মতো দেখতে মেয়ে মৃত্তিকা এখন দিল্লিতে সেটলড। সে ইকনমিকস এর প্রফেসর। জেম্মা শুনে কাঁদোকাঁদো গলায় বলেছিলেন, ওরে, আজকাল যে সবেতেই অঙ্ক জানতে হয়। তোর দিদির ফ্ল্যাটে যে কত অঙ্কের বই! দেখলে তোর মাথা ঘুরে যাবে। এই অবধি শুনেই শুকনো মুখে টিনা উঠে চলে এসেছে জেম্মাদের ঘর থেকে। রোজকার মতো ফ্রিজ খুলে জেজের এনে রাখা ক্যাডবেরি বের করে মুখে ঢোকানোর কথাটাও ভুলে গেছে বিলকুল।
আচ্ছা? জেজে কি এবার থেকে বাজার ফেরত ওর জন্য চকোলেট কিনে এনে ফ্রিজে রাখবেন আর? উহু! মনে হয় না।
টিনার ইচ্ছে করছে কোথাও চলে যেতে। দূরে কোথাও। যেখানে কেউ ওকে চিনবে না। কেউ জানবে না যে এই মেয়েটা এবার ফাইনালে ম্যাথস এ সিক্সটি পাবে। আত্রেয়ী, বিতান, অনুস্কা সব্বাই একশো তে একশো! কিন্তু পালিয়ে যাবেটা কোথায়? মামাবাড়ি চলে গেলে হয় না? ধুর! ওখানেও তো একই কথা, একই আলোচনা। তাহলে? ইস! এখন যদি সিন্ডেরেলার মতো কোনও ফেয়ারি গড মাদার আসত ওর কাছে? ভাবতে ভাবতে আকুল হয়ে টিনা শুনতে পেল কলিং বেলের আওয়াজ। তারপরই মায়ের গলা। ওর নাম ধরেই ডাকছেন মা।
পায়ে পায়ে হলরুমের দরজার কাছটিতে এল টিনা, শুকনো মুখে জোর করে একটু হাসি ফুটিয়ে। পুরো হল একেবারে গমগম করছে একজন মানুষের গলার আওয়াজে। হবে না? মানুষটা যে আর কেউ নয়, পরাশর আঙ্কল। এমন মজাদার লোক জীবনে দেখেনি টিনা। সবসময় হা-হা হাসিতে ভরিয়ে রাখেন সকলকে! খুব ভালো ছাত্র ছিলেন কিন্তু কেরিয়ার তৈরিতে কোনও আগ্রহই নেই। একাই থাকেন। লেখালেখি, লিটল ম্যাগাজিন, কবিতা ক্লাব এইসব নিয়ে আছেন। ঘ্যামা ঘ্যামা চাকরি পেয়েছিলেন কিন্তু একমাত্র এই শহর, বন্ধুদের ছেড়ে গিয়ে মন টিকল না। সুতরাং ব্যাক টু প্যাভিলিয়ান। এখন একটা খবরের কাগজের অফিসে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করেন। টিনাকে বরাবরই স্নেহ করে এসেছেন পরাশর আঙ্কল। আজও এসেছেন ইয়াব্বড় চকোলেটের বক্স হাতে নিয়ে। ইস! কী লজ্জা!
কোথায়? আমাদের টিনা ম্যাডাম? আমার যে ভীষণ দরকার আছে ওর সঙ্গে। দারুণ ব্যস্তভাবে বলছেন পরাশর আঙ্কল আর এদিক ওদিক খুঁজছেন তাকে। এত লোকজনের হট্টগোলে দরজার কোণে লুকিয়ে থাকা টিনাকে দেখতেই পাননি আঙ্কল। বাপির দিকে তাকিয়ে বললেন এবার, শোন জরুরি কথা। ‘প্রতিশ্রুতি প্রকাশনা’ থেকে ছোটদের একটা গল্প সংকলন বেরোচ্ছে এবার শিলিগুড়ি বইমেলায়। সম্পাদনায় রয়েছেন সুবিখ্যাত লেখিকা মঞ্জুশ্রী ঘোষাল, মানে আমাদের মঞ্জুদি। বারোজন লেখকের বারোটি ছোটগল্প। ওর একটা কাজেই তোদের এখানে ছুটতে ছুটতে এলাম।
বাপি নড়েচড়ে বসেছেন, ‘প্রতিশ্রুতি প্রকাশনা’? বাব্বা! এ তো বড় হাউজ। তা ওই কাজে এখানে এসেছিস মানে? বুঝতে পারলাম না।
আর বলিস না! মঞ্জুদির একটাই ডিমান্ড। ছোটদের গল্পের বইতে ছোট্ট দুটো হাতের ছোঁয়া চান উনি। প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে ভিতরের পাতার ইলাসট্রেশন, সব হবে কোনও অ্যামেচার শিশুশিল্পীকে দিয়ে আঁকানো। নামজাদা আঁকিয়েরা তো অনেক রয়েছে। সবাই চেনে তাঁদের আঁকা। তার চাইতে বরং হোক না একটু নতুনত্ব। কী বলিস? কেমন আইডিয়া?
বেশ বেশ! এবার বাপি নয়, উৎসাহের গলায় বলে উঠলেন জেজে।
হুম! মায়ের এগিয়ে দেওয়া চায়ের কাপে একটা দীর্ঘ চুমুক দিয়ে বললেন পরাশর আঙ্কল, মঞ্জুদি আমার ওপর ভার দিয়েছেন আঁকিয়ে খোঁজার। আমি খুঁজেও পেয়েছি।
খুঁজে পেয়েছেন? কাকে? কুট্টিকাকা খাবার প্লেট হাতে নিয়ে বসে পড়লেন আঙ্কলের পাশে।
কাকে আবার? আমাদের টিনা’কেওর হাতের কিছু কিছু পেনসিল স্কেচ রাখা ছিল আমার ফাইলে। মঞ্জুদিকে দেখালাম। উনি তো দারুণ ইম্প্রেসড! তবে কাজটা মোটেই সহজ নয়। গল্পের ডিমান্ড অনুযায়ী ছবি আঁকতে হবে। একটা দুটো নয়, বারোখানা। আমিও হেল্প করব যতটা পারি। প্রচ্ছদের জন্যেও খাটতে হবে খুব। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে টিনা পারবে। তা ডাকো ওকে। কোথায় সে? পরীক্ষা তো সবে শেষ হল। মামাবাড়ি চলে যায়নি তো? এইরে! তাহলে তো খুব মুশকিল!
চিন্তা চিন্তা মুখটা নিমেষেই খুশির হাসিতে ভরে উঠল পরাশর আঙ্কলের। টিনাকে এতক্ষণে দেখতে পেয়েছেন উনি। হাত বাড়িয়ে ডাকলেন, আয় আয়, জলদি আয় তোর স্কেচবুক আর পেনসিল নিয়েতোকে গল্পগুলো শোনাই। অ্যাট লিস্ট একটা ছবি কিন্তু এঁকে দিতেই হবে আজ।  মঞ্জুদি দেখতে চেয়েছেন।
টিনা থমকে দাঁড়িয়ে আছে দরজার কোণা আঁকড়ে। শীত চলে যায়নি পুরোপুরি। কিন্তু বগলের তলা ঘামছে ওর। কপালের রগ বেয়ে টপটপ করে ঘাম পড়ছে। এখন ঘরের বাকি পাঁচজোড়া গোল্লা গোল্লা চোখ চেয়ে রয়েছে ওর দিকে। মা বললেন নার্ভাস গলায়, ও... ও কি পারবে পরাশরদা? মনের আনন্দে কীসব হিজিবিজি আঁকে রাতদিন উপুড় হয়ে। আর এসব তো প্রফেশনাল আর্টিস্টদের কাজ।
আরে ভাই মনের আনন্দ ছাড়া কি ভালো কিছুর সৃজন হয়? পাওয়া যায় কি সৃষ্টির সুখ অন্তরের তাগিদ ছাড়া? কি রে? পারবি তো? আমাকে ডোবাবি না তো রে? টিনার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন পরাশর কাকু।
আসছি, একটু দাঁড়াও। প্রায় ফিসফিস করে কথাগুলো বলেই টিনা ছুটল নিজের ঘরের দিকে। ওয়ারড্রবের তৃতীয় তাকটা ওর নিজস্ব জগত। সেখান থেকে টেনে বের করে আনল আর্ট পেপার, টেন-বি পেনসিল, ইরেজার এইসব টুকরো টাকরা। জিনিসপত্র বগলদাবা করে ফিরে আসতে গিয়ে হঠাৎ চোখ পড়ল জানালার দিকে। উফ্‌, আকাশে আজ কত যে নীলের শেড! এই নীল রঙেরই প্রচ্ছদ হলে কেমন হয়?
বইমেলা জমজমাট। স্টলের সামনে বন্ধুদের ভিড়। নীল-নীল-গাঢ় নীল মলাটের বই হাতে-হাতে ঘুরছে সবার। কুট্টিকাকা কাকে যেন ডেকে দেখাচ্ছেন বইয়ের ভিতরের একটা পাতার ছবি। এই দেখো, আমাদের টিনার আঁকা সব। ছোট্ট থেকে মেয়েটা আঁকতে বড়ই ভালোবাসে যে! মা-বাপি হাসি-হাসি মুখে দাঁড়ানো। জেজে হাত ধরে আছে টিনার। জেম্মা মোবাইলে কথা বলছেন মিত্তিদিদির সঙ্গে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমাদের টিনা রে! তোকে পোস্ট করে দিয়েছি বইটা। মলাটটা যে কী সুন্দর হয়েছে! দেখিস! পরাশর আঙ্কল মুচকি হাসছেন। বলছেন, আমি জানতাম তুই পারবি। ঠিক পারবি।
চোখটা আবারও জ্বালা করে উঠল। কিন্তু এর স্বাদ আলাদা। দু’হাতের চেটো দিয়ে চোখ মুছে ফেলল টিনা। সঙ্গে সঙ্গে পায়ের কাছে একটা নরম ছোঁয়া পেয়ে চমকে উঠল। কুটাইটা কোথা থেকে দৌড়ে এসে জামা ধরে টানছে ওর। আর লেজ নাড়ছে জোরে জোরে। যেন ও বলতে চাইছে, চলো চলো, আর দেরি কীসের?
পেনসিলটা আঙুলে আঁকড়ে ধরে ছুটল টিনা, এবার ও ঠিক পারবে নিজের স্বপ্নপূরণ করতে।
____________
ছবি –দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী


লেখক পরিচিতিঃ রম্যাণী গোস্বামী - শিলিগুড়ির বাসিন্দা। পেশায় পদার্থবিদ্যার অধ্যাপিকা। লেখালেখি শুরু বছর দুয়েক আগে থেকে। ভালোবাসেন বই পড়তে, বেড়াতে যেতে এবং ফটোগ্রাফি করতে।

গল্পের ম্যাজিক:: ঘুড়িগাছ - প্রকল্প ভট্টাচার্য


ঘুড়িগাছ
প্রকল্প ভট্টাচার্য

এই নিয়ে পরপর তিনদিন।
ইশকুল থেকে ফেরবার রাস্তায় তাদের বাড়ির পিছনের শুকনো বাদাম গাছটার তলায় আজও ঠিক একটা পেটকাটি ঘুড়ি পড়ে রয়েছে।
গতকাল অবশ্য অন্যরকম একটা নাম-না-জানা ঘুড়ি ছিল, তার আগের দিন ময়ুরপঙ্খী।
কিন্তু ঠিক এই একই জায়গায়! একই সময়ে!
ভুটকে অভ্যাসমতো আজও তুলে নিল ঘুড়িটা, কিন্তু অন্যমনস্ক হয়ে। প্রতিদিন ঠিক একই জায়গায় একটা করে আস্ত ঘুড়ি, তাও এত সকালে...
ভুটকে মর্ণিং স্কুলে পড়ে, কুয়াশামাখা ভোরে বাবা তাকে সাইকেলে পৌঁছে দিয়ে অফিস চলে যায়। একা হেঁটে ফেরে সে। বেশী দূর তো নয়, আর বাদামতলা দিয়ে এলে অনেক শর্টকাট হয়।
‘শর্টকাট’ কথাটা তাকে শিখিয়েছে বাপিনদা। বাপিনদা খুব ভালো, তাদের পাড়াতেই থাকে, অনেক কিছু জানে। হ্যাঁ, বাপিনদাকেই সে জিগ্যেস করবে ঘুড়ির রহস্যটা।
বাড়ি ঢুকতেই ভুটকে মায়ের সামনে পড়ল। “হাতে কী রে? আবার ঘুড়ি কিনলি?”
“কিনিনি মা, পেয়েছি।”
“পেয়েছিস? ইস্কুলে ঘুড়ি কে দিল তোকে?”
“ইস্কুলে নয় তো, রাস্তায়, গাছের তলায়।”
“গতকালও একটা আনলি না? রাস্তা থেকে কুড়িয়ে?”
ভুটকে কিছু না বলে হাত ধুয়ে গরম দালিয়া খেতে বসে গেল। মা বড্ড প্রশ্ন করে, অথচ সত্যি কথা বললে বিশ্বাস করে না।
“যত্তো নোংরা স্বভাব হয়েছে, রাস্তা থেকে না কোথা থেকে এনে ঘরে জঞ্জাল বাড়ানো। আজ আসুক তোর বাবা, হচ্ছে তোর!”
ভুটকের হাসি পেয়ে গেল। বাবাকে সে মোটেই ভয় পায় না, বাবা কিচ্ছু বলবে না। বরং তাকে লাটাই, সুতো কিনে ঘুড়ি ওড়াতে শিখিয়ে দেবে। কিন্তু ঘুড়িগুলো আসছে কোথা থেকে!
খেতে খেতেই সে ডাকল, “মা, তুমি ঘুড়ি ওড়াতে জানো?”
মা রাগ করতে গিয়েও হেসে ফেলল। “ধ্যাত, মেয়েরা কি ঘুড়ি ওড়ায় নাকি! আমি লাটাই ধরতাম।”
“বাবা জানে?”
“তা বোধহয় জানে।”
“আমাকে শেখাবে?”
“সে না হয় হবে, কিন্তু পড়াশোনাটা তো এইভাবে শিখতে চাস না! কোথায় ঘুড়ি, কোথায় সাইকেল, এই নিয়েই সারাদিন কাটালে চলবে? ওকি, খেয়েই কোথায় চললি?”
“একটু বাপিনদার বাড়ি যাচ্ছি মা

“বাঃ! আর হোমওয়ার্কগুলো?”
“এক্ষুণি আসছি, এসেই করে ফেলবো-ও-ও-ও,” বেরোতে বেরোতে চেঁচিয়ে বলল ভুটকে।
বাপিনদা মন দিয়ে দেখল ঘুড়িগুলো। কিছুটা মাঞ্জাসমেত, মানে কেটে এসে পড়েছে কোথাও থেকে।
“কোন গাছটার তলায় বললি?”
“ওই শুকনো বাদাম গাছটা গো!”
“সকালবেলা? নাকি কাল বিকেল থেকেই...”
“বিকেলে ছিল না, আমি সন্ধ্যে অবধি ওখানেই ছিলুম তো।”
“কিন্তু অত সকালে কে ঘুড়ি ওড়াবে... আর এগুলো বেশ দামী, শৌখিন ঘুড়ি!”
“তুমি জানো না?”
“নাঃ... তবে খোঁজ নিয়ে দেখছি, যদি জানতে পারি বলব তোকে।”
নিরাশ হয়ে ভুটকে ফিরে এল। বাপিনদাও জানে না! বাবা ফিরতে ফিরতে সেই রাত্তির। কাকে জিগ্যেস করবে ঘুড়ির রহস্য?
অন্যমনস্ক হয়েই সে হোমওয়ার্ক শেষ করল, দুপুরের খাওয়াও। তারপরেই হঠাৎ তার মনে পড়ল পাগলাদার কথা।
আবার মায়ের প্রশ্ন, “এই দুপুরে কোথায় বেরোচ্ছিস আবার?”
এবার সত্যিটা বলা যাবে না। জানতে পারলে মা কিছুতেই ছাড়বে না।
“এই একটু অংকগুলো শিখে আসি বাপিনদার কাছে।”
“হঠাৎ এত বাপিনদা আর বাপিনদা, আবার অংক শিখবি বলছিস, কী ব্যাপার বল তো?”
“বাপিনদা তখন ব্যস্ত ছিল, বলল দুপুরে আসতে। যদি বারণ করো তাহলে যাব না, বলে দেব মা অংক শিখতে আসতে দেয়নি!”
“ও ব্বাবা, ছেলের কথা শোন! আমি আবার কখন বারণ করলাম! আচ্ছা যা, বেশী রোদ্দুর লাগাসনি যেন!”
ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে ভুটকে দে দৌড়!
পাগলাদার আসল নাম বোধহয় কেউই জানে না। সবাই তাকে পাগলা বলেই ডাকে। মাথার কী অসুখের জন্যে পড়াশোনা করেনি, একা একা ঘোরে, আর সব্বাইকে দেখে মিষ্টি হাসে। ভুটকের খুব বন্ধু সে, যদিও তার মা মোটেই পছন্দ করে না পাগলাদাকে।
ঘুড়িগুলো দেখেই পাগলাদা বলল, “ঘুড়িগাছের তলায় পেলি বুঝি?”
ভুটকে তো হাঁ! “ঘুড়িগাছ!!”
“জানিস না? ওই শুকনো বাদাম গাছটা তো? ওটাই ঘুড়িগাছ! রাত্তিরে ঘুড়ি ওড়ায় গাছটা, দিনের বেলা চুপ করে থাকে!”
“রাত্তিরে! গাছটা ঘুড়ি ওড়ায়!”
পাগলাদা হাসল, সেই মিষ্টি হাসি। “হ্যাঁ রে, আমি তো দেখেছি! যদি কোনওদিন রাত্তিরে ঘুম থেকে উঠিস, তুইও দেখতে পাবি।”
রাত্তিরে কী করে ঘুড়ি ওড়ায় গাছ! ভুটকে চিন্তা করতে করতে বাড়ি ফিরে এল।
অনেক রাত্তিরে বাবা বাড়ি ফিরতেই ঝাঁপিয়ে পড়ল সে, “বাবা, রাত্তিরে কেউ ঘুড়ি ওড়ায়?”
ভুটকের অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে একটু থমকালেও, বাবা হেসে বলল, “একজন বিজ্ঞানী ছিলেন জানি, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, তিনি এক ঝড় বৃষ্টির রাতে ঘুড়ি উড়িয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে আকাশে যে বাজ পড়ে সেটা ইলেকট্রিক কারেন্ট!”
“না বাবা, কোনও মানুষ নয়, যদি...”
মা ঢুকল ঘরে, “কে রে রাত্তিরে ঘুড়ি ওড়ায়? মানুষ নয় তো কি, ভূত?”
“না মা, ও কিছু নয়।”
“আরে মাকেও বলই না!” বাবার কথায় ভুটকে আশ্বস্ত হল।
“আসলে ওই... শুকনো বাদাম গাছটা নাকি রাত্তিরবেলায়...”
কথা শেষ হওয়ার আগেই মা হি-হি করে হেসে উঠল। “কী বললি? গাছ ঘুড়ি ওড়ায়? কে শেখায় এইসব? তোর বাপিনদা, নাকি ইস্কুলের বন্ধুরা?”
বাবা কিন্তু হাসল না। বরং গম্ভীর গলায় বলল, “হ্যাঁ রে, ঠিকই বলেছিস। ওটার নাম ঘুড়িগাছ, আমিও শুনেছি ছোটবেলায়। রাত্তিরে ও নাকি ঘুড়ি ওড়ায়। কিন্তু নিজের চোখে দেখিনি কখনো।”
“কী যা তা শেখাচ্ছ ছেলেটাকে?” মা’র স্বরে বিরক্তি
“এমনিতেই রাস্তা থেকে ঘুড়ি এনে এনে ঘর নোংরা করছে রোজ, আবার তাকে আশকারা দিচ্ছ ভুলভাল গল্প শুনিয়ে?”
অবিচলিত স্বরে বাবা বলতে লাগল, “আজ রাত্তিরে তুই আর আমি দেখতে যাবো, কেমন? আর কাল তো রবিবার, তোকে লাটাই কিনে ঘুড়ি ওড়াতে শিখিয়ে দেব।”
ভুটকে আনন্দে লাফিয়ে উঠল, “সত্যি বাবা! সত্যি শিখিয়ে দেবে ঘুড়ি ওড়াতে!”
“দেব রে দেব। সত্যি। যা, এখন ঘুমিয়ে পড় তো!”
ভুটকে নিজের ঘরে শুয়েও বাবা মায়ের কথা শুনতে পেল। মা বলল, “কী গো তুমি! রাত্তিরে ওকে ঘুম থেকে তুলে সত্যি গাছ দেখাতে নিয়ে যাবে নাকি! তোমাকেও কি ভূতে পেল!”
বাবা বলল, “না গো না। রাত্তিরে কেউই উঠবো না। কিন্তু আজ ভুটু একটা সুন্দর স্বপ্ন দেখবে, এটা নিশ্চিত। বাবা হিসেবে ওকে তো তেমন কিছুই দিতে পারিনি, না হয় কয়েকটা স্বপ্নই দিলাম! কী বলো?”
মা একটুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আমাকেও শেখাবে গো ঘুড়ি ওড়াতে? আমি পারবো না?”
বাবা হাসল। এই হাসি হাসতে শুধু বাবাই পারে। “কেন পারবে না! একটা গাছ যদি পারে, তুমি পারবে না কেন!”
বাবার সব কথা বুঝতে পারে না ভুটকে। তা না পারুক। নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করল সে
রাত অনেক হলএতক্ষণে নিশ্চয়ই গাছটা জ্যান্ত হয়ে বার করে ফেলেছে তার নতুন মাঞ্জাওয়ালা লাটাইটা!
________
ছবি-দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী

লেখক পরিচিতি - একটা বহুজাতিক মার্কেট রিসার্চ কোম্পানির এডিটিং টিমের ম্যানেজার, চেন্নাইতে বসে বাংলা/ ইংরাজী/ হিন্দী/ তামিল ভাষায় অনুবাদ করেন ও করান, দিল্লীর 'দ্য লিটল ম্যাগাজিন' (অনুবাদ করানো) এবং পরে চাঁদমামা-র (বাংলা অনুবাদক) সাথে যুক্ত ছিলেন, লিখতে  ভালবাসেন মূলতঃ কবিতা।

গল্পের ম্যাজিক:: আকন্দপুরের সেই রাত - সুদেব ভট্টাচার্য


আকন্দপুরের সেই রাত
সুদেব ভট্টাচার্য

সন্ধেটা যেন ঝুপ করেই নেমে গেল। অবশ্য গ্রামের দিকে সন্ধেটা তাড়াতাড়িই নামে। ভ্যানে করে আসবার পথেই চোখে পড়েছিল সারা রাস্তার দুই ধারে আকন্দ আর ঘেঁটু ফুলের বাড়-বাড়ন্ত। তাই হয়ত প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এ গ্রামের নাম কেউ রেখেছিল আকন্দপুর। গ্রামটার সেরকম কোনও পরিচিতি যে নেই তা বলাই বাহুল্য – একেবারে ধ্যাধধেড়ে গোবিন্দপুর। সারাদিনে মোট তিনটে ট্রেন আসা যাওয়া করেআর তারপর একমাত্র ভরসা এই সাইকেল ভ্যান। এরকম একটা প্রত্যন্ত গ্রামের কথা কোথা থেকে যে জোটাল মল্লারদা কে জানে। অবশ্য এটাই প্রথমবার নয়। আগেও শুটিংয়ের লোকেশন দেখতে আমাদের বহুবার নানা জায়গায় যেতে হয়েছে। এটা আমাদের কাজের মধ্যেই পড়ে। আমরা মানে আমি আর সৌভিক। আমরা হলাম টলিউড-খ্যাত ডিরেক্টর মল্লার বসুর বাম এবং ডানহাত। তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রতিবারই ওনার হুকুম মাথায় করে শুটিংয়ের লোকেশন দেখতে নেমে পড়ি।

আমাদের এবারের স্থল হল একটি প্রাচীন জমিদারবাড়ি। সেখানেই যাচ্ছিলাম আমরা দুই জগাই মাধাই মিলে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আমাদের ভ্যান জমিদারবাড়িটার সামনে এসে থামল। পেল্লাই প্রাচীন এক অট্টালিকার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা দুজনেই কেমন বেকুব বনে গেলাম। এ হেন অর্বাচীন আকন্দপুরে এরকম একটি ইমারত যেন বেখাপ্পাই শুধু নয়, অহৈতুকীও বটে। সারা গ্রামে এরকম দোতলা বাড়ি হাতে গুনে চার পাঁচটার বেশি নেই। ভ্যানওলাকে পয়সা মিটিয়ে আমরা ভিতরে ঢুকলাম। আগে এককালে সিংহদুয়ারে প্রকাণ্ড গেট ছিল, এখন আর ওসবের বালাই নেই। উঠোন থেকেই আগাছা শুরু হয়েছে এবং প্রশ্রয় পেয়ে তা এখন ভিতরেও ঢুকতে শুরু করেছে। উঠোনে একটা পাথরের মেয়ে মুখভার করে কবে থেকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। একসময় তার মুখ থেকে ফোয়ারা বেরোত হয়ত। এখন কালের নিয়মে কিছুই নেই আর। এই বাড়ির একমাত্র জীবিত শরিক বিদেশে চলে গেছেন বহুকাল আগে। তাঁর থেকেই পারমিশন করিয়ে শুটিংয়ের আয়োজনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সামান্য কিছু আলো থাকতে থাকতেই আমরা বাড়ির পরিত্যক্ত ঘরগুলো দেখতে শুরু করলাম। সৌভিক নীচের ঘরগুলো দেখতে লাগল। আমি সটান সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় চলে এলাম। দোতলাতে বারান্দার পাশে সারি বেঁধে মোট পাঁচটা ঘর। আলো হাওয়ার অভাবে প্রতিটাই প্রায় স্যাঁতস্যাঁতেআবর্জনা, আগাছা, ধুলো আর মাকড়সার জাল ছাড়া ঘরগুলোর আর তেমন কোনও সম্বল অবশিষ্ট নেই। প্রতিটা ঘরই একই রকম ধাঁচে তৈরি আর একটুও বাসযোগ্য নয়। কিন্তু শেষের ঘরটার সামনে এসে আমাকে থামতেই হল। এই ঘরটি অন্যঘরগুলোর তুলনায় অনেক বড় এবং আশ্চর্য হয়ে দেখলাম এই ঘরে তেমন ময়লাও নেই। বেশ পরিষ্কার, যেন সদ্য ব্যবহার করা হয়েছে। আমি ভিতরে ঢুকলাম। আমার মাথার ওপর একটা ভাঙা ঝাড়বাতি স্থির হয়ে রয়েছে। ঘরের দেওয়ালে অনেকগুলো প্রবীণ রাজার তৈলচিত্র রয়েছে। একটা তৈলচিত্রে আমার চোখদুটো আটকে গেল এসেএটা একটা নারীর ছবি। নাচের কোনও বিশিষ্ট ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে। তার কপালে একটি সাপের মতো আকারের সিঁদুরের টিপ তার মুখটাকে আরও রহস্যময়ী করে তুলছে। তার কাজল-কালো চোখদুটি ভীষণরকম জীবন্ত, যেন এখুনি পট থেকে বেরিয়ে আসবে। আমি বেশ আশ্চর্য হলাম। এই ঘরটা কি তাহলে কেউ ব্যবহার করে? এরকম ঘরে আগে সাধারণত নাচগানের আসর বসত আর নরম গদিতে ঠেস দিয়ে গোলাপ শুঁকতে শুঁকতে জমিদাররা মজলিস করতেন। কিন্তু আমি তো জানতাম কেউই এই বাড়িতে আর থাকে না। অন্তত তেমনটাই বলা হয়েছিল আমাদের। আমি নীচে ছুটে গিয়ে সৌভিককে ব্যাপারটা জানাতে ও তেমন গুরুত্ব দিল না। ওর বক্তব্য, হয়তো কেউ ক’দিন আগে এসে থেকেছিল এই পরিত্যক্ত বাড়িটায়।

নীচের ঘরগুলোর তো আরও খারাপ অবস্থা। শ্যাওলা ধরে গেছে। কেন্নো আর আরশোলার ডিপো পুরো। আমরা ওপরের ঘরটাতেই রাত কাটাব ঠিক করলাম। আমাদের সঙ্গে বিস্কুট, মুড়ি, জল, টর্চ, মোম সবই আছে। একটা রাতের তো ব্যাপার মোটে। কোনওরকমে কেটে গেলে হয় ভালোয় ভালোয়। থাকার পক্ষে ওই শেষের ঘরটাই পারফেক্টওটাকেই বেছে নিলাম। বেশি পরিষ্কারও করতে হবে না। আমরা ঘরটাকে সামান্য ঝাড়পোঁছ করে শতরঞ্চি বিছিয়ে নিলাম। দুটো মোমও জ্বালালাম। বাথরুমের বালাই নেই।  রাতে প্রকৃতির ডাক পেলে নীচে নেমেই বাথরুম করতে হবে। মুড়ি বাতাসা চিবোতে চিবোতে আমি আর সৌভিক আমাদের এই বাড়িটা নিয়ে অবজারভেশনগুলো আলোচনা করতে লাগলাম।
কিন্তু এরকম পরিবেশে কতক্ষণ আর গল্প করা যায়। মোবাইলে টাওয়ারও নেই। সবে রাত ন’টা, অথচ বাইরে তাকালে মনে হচ্ছে যেন রাত একটা বেজে গেছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাইরে নিস্তব্ধতার সুর হয়ে একটানা ঝিঁঝিঁ ডেকেই চলেছে। কোথা থেকে পাগল করা হাসনুহানার গন্ধও নাকে আসছে। আমাদের দুজনের চোখ ঘুমে যেন বুজে আসতে লাগল।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। একটু পরেই সৌভিকের ডাকে আমি ধড়মড়িয়ে উঠলাম। বেচারা খুব হাঁপাচ্ছে।
“কি রে, কী হয়েছে?”
সৌভিক হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “ভাই, নীচে বাথরুম করতে গেছিলাম। ওখানে আমি জঙ্গলের মধ্যে স্পষ্ট দেখলাম কিছু রয়েছে। আমাদের বাড়ির আশেপাশে কেউ আছে রে! জায়গাটা সুবিধের নয়
আমি বললাম, ‘‘কেন, কী দেখেছিস তুই? কোনও লোক এত রাতে এখানে কী করবে?’’
সৌভিক বলল, “না না, কোনও লোক নয়। ভাই তুই বিশ্বাস করবি না, আমি অন্য জিনিস দেখেছি! দেখলাম, গাছগুলোর আড়ালে কতগুলো জ্বলন্ত নীল চোখ আমাকে চেয়ে দেখছে। আর পরক্ষণেই সেগুলো মিলিয়ে গেল।”
“কীসব পাগলের মত বকছিস? তুই কি ভূতের গল্প খাড়া করার চেষ্টা করছিস?”
সৌভিক গুম মেরে গেল। শেষমেশ ওর মুখচোখের অবস্থা দেখে আমি বললাম, “ঠিক আছে দাঁড়া, আমি দেখে আসছি একবার। শান্তি তো?”

আমি একটা টর্চ নিয়ে নীচে গেলাম। জঙ্গলটার দিকে টর্চ মেরে দেখলাম কতগুলো আকন্দ, বাবলা আর বাঁশঝোপ শুধু ভূতের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। ফিরেই আসছিলাম, হঠাৎ একটা ঝুনঝুন আওয়াজ আমার কানে এসে লাগল এবং সেটা এল বাড়ির পেছনদিক থেকে। আওয়াজটা অনেকটা ভারী নূপুরের মতো শোনাল। শব্দটা লক্ষ্য করে আমি আলো ফেললাম। না, এবারেও কিছু নেই। শুধু জংলা ঝোপ। কিন্তু লক্ষ্য করলাম কয়েকটা ঝোপের পাতা দুমড়ে মুচড়ে গেছে। এখনও অল্প অল্প ভাঙা আকন্দের ডালটা দোল খাচ্ছে। অথচ বিকেল থেকে একটুও হাওয়া দিচ্ছে না আজকে। খুবই মেঘলা আর গুমোট একটা পরিবেশ। চাঁদটাও ঢাকা পড়ে গেছে মেঘের আড়ালে। তবে কি কেউ ঝোপের মধ্যে দিয়ে এখুনি পালাল? তাই পাতাগুলো নড়ছে?
মনের মধ্যে একটা অজানা খটকা নিয়েই ওপরে উঠে এলাম। সৌভিক জেগেই রয়েছে। ওকে বললাম ব্যাপারটা। আমাদের দুজনেরই মনে হল জায়গাটা নিরাপদ নয়। তাই আজ রাতটা আমরা জেগেই কাটিয়ে দেবার প্ল্যান করলাম। এখন রাত প্রায় বারোটামোটামুটি ভোরের আলোটুকু ফোটার জন্য আমরা ঠায় জেগে রইলাম
মিনিট পনেরো বাদে, হঠাৎ ছাদের ওপর ধুপধাপ শব্দ শোনা গেল। আমাদের এবারে বুক বেশ জোরে জোরেই ঢিবঢিব করছে। নীল চোখের মতো আলো, নূপুরের শব্দ, নোংরা পরিত্যক্ত রাজবাড়ির পরিষ্কার নাচঘর – এ সবই আমাদের মনে মানুষের থেকেও অন্য কিছুর ভয়টাই বাড়িয়ে তুলল। তবে কি সেই তৈলচিত্রের নর্তকীর অতৃপ্ত আত্মা আমাদের ওপর সর্বক্ষণ নজর রেখে চলেছে? আমি একবার তাকালাম ছবিটার দিকে। যে চোখ আমাকে বিকেলে মুগ্ধ করেছিল, এখন সেটাই মোমের আলোয় আরও রহস্যজনক মনে হতে লাগল। আমরা জড়সড় হয়ে বসে রইলাম। বুঝতে পারছিলাম না, আমাদের ছাদে যাওয়াটা ঠিক হবে কি না।

একটু পরেই আরও জোরে শব্দ হতে লাগল। এবারে পায়ের সঙ্গে নূপুরের শব্দটিও খুব জোরালোভাবে কানে আসছে। তারপর সব সন্দেহের অবসান ঘটিয়ে আমাদের বুকে ছ্যাঁত করে ছ্যাঁকা দিল একটা নারীকন্ঠের অট্টহাসি। হ্যাঁ, আমরা দুজনেই স্পষ্ট শুনলাম সেই হাসি। সৌভিক দরদরিয়ে ঘামছে। ওর নাকি পূর্বে অতিমানুষিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই ও জোর গলাতেই বলল, “এই বাড়িতে আর রাত কাটানো ঠিক হবে না।”
আমিও যে খুব সাহসী তা নয়, তবু ওপরটা একবার না দেখে বাড়িটা ত্যাগ করতে মন সায় দিল না যেন। আমি সৌভিককে কোনওমতে মানিয়ে ওপরে উঠতে লাগলাম। এক একটা সিঁড়ি পা টিপে টিপে উঠছি আর বুকের ঢিবঢিবানি যেন আরও বেড়ে চলেছে। প্রতিটা সেকেণ্ডেই জোরালো হচ্ছে নূপুরের আওয়াজ। শেষ সিঁড়িতে পৌঁছে ছাদের দরজা থেকে টর্চের আলো ফেলতেই মনে হল কেউ যেন দৌড়ে চলে গেল ছাদের গা লাগোয়া কৃষ্ণচূড়ার দিকে। তারপর সেই গাছের পাতায় অন্ধকারের মধ্যে যেন মিলিয়ে গেল। ডালটা এখনও কাঁপছেএ কী দেখলাম? নিজের চোখকেই তো বিশ্বাস করতে পারছি না।  ছাদে ঢুকব কিনা ভাবছি, এমন সময় একটা নারী ছায়ামূর্তি ছাদের দরজা জুড়ে দাঁড়ালতার অনেকটা লম্বা খোলা চুলে তার মুখ ঢেকে গেছে প্রায় আর তার দু’পায়ে বাঁধা রয়েছে মল। আমাদের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। সৌভিকের মুখ থেকে বেড়িয়ে এল, “ভূ... ভূ...”
তারপর ও সিঁড়ির ওপরেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।


“আরে কী হল, কিছু করুন! আরে, ও দাদা
আমি চমকে উঠলাম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছি পুরো। ঘটনার আকস্মিকতায় মাথা কাজ করছে না। তবু মনে হল যেন সেই ছায়ামূর্তি নারীই যেন বলছে কথাগুলো আমাকে।
এবার আমার গায়ে ঠেলা মেরে সে বলল, “আরে দাদা, কী হল আপনার, অমন করে দেখছেন কী? আপনার বন্ধুটাকে ঘরে নিয়ে চলুন। ওনার মুখে চোখে জল দিতে হবে। আমি ভূত বা চোর নই
ভূত নয়? আমি এবার একটু স্থিত হয়েছি। তবু কী যে ঘটল কিছুই বুঝতে পারছি না। কিন্তু ওই নারীমূর্তির কথাগুলোই মেনে চলেছি যন্ত্রের মত। সৌভিককে ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে এসে ওর মুখে জল দিলাম কয়েক ঝাপটা। এমন সময় কোথা থেকে একটা বাচ্চা মেয়েও এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের ঘরের দরজার সামনে। মহিলাকে দেখে সে গিয়ে তার পিছনে লুকিয়ে পড়ল। সৌভিকের পালস-বিট ঘোড়ার গাড়ির মত দৌড়চ্ছে। একটু পরে আবার “ভু... ভু...” করতে করতেই তার জ্ঞান ফিরল। ঘরে এক মহিলা আর বাচ্চাকে দেখে ধড়মড়িয়ে উঠে বসল।

মহিলাটি হেসে বললেন, “কিছু মনে করবেন না, আমার এত খারাপ লাগছে! আপনারা শুধু শুধু বড্ড ভয় পেয়ে গেছেন।”
আমি একটা হাসি বহু কষ্টে ঠোঁটে এনে বললাম, “ব্যাপারটা কি একটু খুলে বলবেন?”
মহিলা বললেন, “আমি পাশের বাড়িতেই থাকিঠিক এই জমিদারবাড়ির লাগোয়া।”
“কিন্তু এখানে তো কোনও বাড়ি দেখলাম না আসার পর!”
“আসলে আমাদের বাড়িটা এই বাড়িটার ঠিক পেছনে। তাই দেখা যায় না সামনে থেকে। আর ওদিকে বড় বড় কয়েকটা কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া আছে, সেইজন্যেও ঢাকা পড়ে যায় বাড়িটা।”
“কিন্তু আপনি এত রাতে এখানে এলেন কী করে?”
মহিলা হেসে বললেন, “এই জমিদার বাড়ির এতটাই কাছে আমাদের ছাদের একটা অংশ যে আমরা প্রায়ই ছাদ টপকে এই ছাদে চলে আসি। ওই কৃষ্ণচূড়ার পেছনেই বাড়িদুটো প্রায় একে অন্যের সঙ্গে লাগোয়া। কাল সকালে ছাদে গেলেই দেখতে পাবেন। একটু আগেই তো আমার মেয়ে মিনি আপনার টর্চের আলো দেখে ওইভাবে ছাদ টপকে পালিয়েছিল।”
আমরা তো অবাক। একটু আগে তার জন্যেই পাতাগুলো নড়ছিল? আমাদের মুখের অবস্থা দেখে বাচ্চা মেয়েটাই খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।

মহিলা আবার বললেন, “আসলে আমার শ্বশুরবাড়িতে কেউ নাচ পছন্দ করেন না। কিন্তু এদিকে নাচ হল আমার জীবন। শহর থেকে এই অজপাড়াগাঁয়ে বিয়ে হয়ে আসার যন্ত্রণা পদে পদে বুঝতে পারছি। তবে আমারও জেদ চেপে বসল যে আমি নাচ ছাড়ব না এবং আমার মেয়েকেও তা শেখাব। তাই সারাদিনের কাজ, পড়াশুনা, খাবার-দাবারের পর আমি আমার মেয়েকে এই বাড়িতে নিয়ে আসি। এইখানে এই ঘরটা পরিষ্কার করে আমরা দুজনেই এভাবে নাচি, আমি ওকে তালিম দিইতারপর আবার ছাদ টপকে ফিরে যাই।”
তারপর তিনি ওই নর্তকীর তৈলচিত্রটা দেখিয়ে বললেন, “ওই যে ছবিটা দেখছেন, ওটি কিন্তু এই রাজবাড়ির সম্পত্তি নয়। আর উনি কোনও রাজনর্তকীও নন। উনি হলেন আমার নৃত্যগুরু। উনিই আমার রক্তে নাচের বীজ বুনে দিয়েছেন। এই বছর দশেক হল উনি মারা গেছেন। তাই কলকাতা থেকে ওনার চিত্র আঁকিয়ে এখানে টাঙিয়ে রেখেছি। এই নির্জন পরিত্যক্ত নাচঘরটাই এখন আমার মন্দির বলতে পারেন। আর উনি আমার দেবতা।”
আমাদের কাছে এখনও সব অবিশ্বাস্য ঠেকছে। এরকমও হয় নাকি? তবে সৌভিকের মুখটা দেখে আমার সেই অবস্থাতেও হাসি আটকানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছিল।
মহিলা বলতে লাগলেন, “একটু আগে আমার মেয়ে নীচের বাগানে আপনাকে লুকিয়ে দেখেছিল। বাইরের লোক দেখলে ও খুব লজ্জা পেয়ে যায়। তাই দেখতে পেয়ে ছুটে এসে আমাকে বলে যে আমাদের নাচের ঘরটাতে আপনারা এসে উঠেছেন। আমিও আপনাদের বিরক্ত করব না ভেবে আজকে ছাদেই ওকে নাচ শেখাচ্ছিলাম।”
এবারে বুঝলাম কেন নীচের বাগানের ডালগুলো নড়ছিল। মিনি নামক ওই ছোট্ট ডানপিটে মেয়েটার সাহসের কাছে আমার সমস্ত বীরত্ব যেন গ্যাসবেলুনের মতো ফুস হয়ে গেল।
এবারে সৌভিক বলে উঠল, “কিন্তু ওই যে নীল চোখের আলো? আমি তো নিজের চোখে স্পষ্ট দেখেছি।”
মহিলা এবারে খিলখিলিয়ে হেসেই উঠলেন। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, “ওহো! ওটা কিছু নয় ভাই, আলেয়া। ওদিকটায় একটা বাঁশঝাড় রয়েছে। কিছুদিন আগেই বর্ষা গেল তো, তাই পাতা পচে বাঁশবাগানে অনেক জৈব গ্যাস তৈরি হয়েছে। সেই আলেয়ার দপদপানিকে তুমি ভূতের চোখ বলে ভেবে বসলে নাকি?”
আমি বললাম, ‘‘ও ওইরকমই আমাদের জন্য আপনারও নাচের ক্ষতি হয়ে গেল। আসলে এরকম অভিজ্ঞতা আগে হয়নি তো।”
মহিলা বললেন, “না না, একদম ভাববেন না এই নিয়ে। আচ্ছা, আমি এখন উঠি। অনেক রাত হল। মিনির বাবা আবার চিন্তা করবে। কালকে একবার আসুন না সকালে আমাদের বাড়িতেএকটু চা খাওয়া যাবে সবাই মিলে। কী বলেন?”
আমি বললাম, “নিশ্চয়ই যাব। নমস্কার।”

মহিলা আমাদের বিদায় জানিয়ে আবার ছাদে চলে গেলেন। হয়ত যেভাবে এসেছিলেন সেই অভিনব উপায়েই ফিরে গেলেন ছোট্ট মিনিকে নিয়ে। আমি আর সৌভিক এবার নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমের ব্যবস্থা করতে লাগলাম। তবে ঘুম কি আর সহজে আসে? এই অজপাড়াগাঁয়ে এক মহিলার অসামান্য জেদ আর তার শিল্পের প্রতি ভালবাসা আমার মনটাকে এক অজানা তৃপ্তিতে ভরিয়ে তুলল। শুয়ে শুয়ে শুধু তাকিয়ে রইলাম তৈলচিত্রটার দিকে। কেন জানি না, আগের সেই ভয় চলে গিয়ে পুরনো মুগ্ধতা আবার আমাকে গ্রাস করলআবার ভালো লাগতে লাগল সেই কাজল-কালো চোখ। অদ্ভুত সুন্দর সেই ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই চোখ বুজে এল একসময়। মনে মনেই গুরু-শিষ্যের প্রতি আমার মনের সবটুকু শ্রদ্ধা উজাড় করে দিলাম
________________
ছবি - লেখক

গল্পের ম্যাজিক:: কাল সমুদ্রের যাত্রী - পুষ্পেন মণ্ডল


কাল সমুদ্রের যাত্রী
পুষ্পেন মণ্ডল

‘স্কাইপি’টা চালু করে পিউ বলল, “নাও, এবারে শুরু করো। আমরা রেডি।”
পাশ থেকে রন্টি উঁকি মেরে বলল, “আগের দিনেরটা কিন্তু ঠিক জমেনি।”
এই হয়েছে সমস্যা। আজকালকার বাচ্চাগুলোর আইকিউ এত বেশি যে সামান্য উনিশ বিশ হলেই না পসন্দ। আর আমিও পড়েছি জাঁতাকলে। বাড়ি থেকে যত দূরেই থাকি না কেন, হাইস্পিড ইন্টারনেটের যুগে কোনও নিস্তার নেই। ছুটির দিনে নিয়ম করে ভাইপো ভাইঝিদের গল্প শোনাও। তাও জমাটি প্লট না থাকলে এখন আর রিস্ক নিই না। বলে দিই কাজের ভীষণ চাপ, আজকে হবে না। কিন্তু এই একই অজুহাতও তো আর খুব বেশিদিন চলে না। হাতে একটা ডায়রি নিয়ে বললাম, “আজকে একটা অদ্ভুত জাহাজডুবির গল্প বলব।”
জাহাজডুবির কথা শুনে ওরা চোখ বড় বড় করে বলল, “টাইটানিকের মতো?”
“না, টাইটানিক ছিল যাত্রীবাহী জাহাজ। আর আমি যে ঘটনাটা বলব সেটা কার্গো অর্থাৎ মালবাহী জাহাজ।” বলে আমি শুরু করলাম, “মাস ছয়েক আগে চেন্নাইয়ের এক খবরের কাগজের ভিতরের পাতায় একটা ছোট্ট নিউজ বেরিয়েছিল আর. আর. চোলামন্ডালমনামে একটি ভারতীয় মালবাহী জাহাজ ভারত মহাসাগরে সামুদ্রিক সাইক্লোনের কবলে পড়ে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনা জীবিত উদ্ধার হয়েছিল মাত্র একজন তার নাম সিন্ধুনীল দাস। খবরটায় চোখ পড়তেই মনে পড়ল আমার ছোটবেলার সহপাঠী সিন্ধুনীল দাসও তো জাহাজের কাজ করত। যদিও বহুদিন তার সাথে কোনও যোগাযোগ নেই অন্যান্য বন্ধুদের মতফেসবুকবাহোয়াটস অ্যাপ-এ সে আসত না কলকাতায় তাদের পুরনো পাড়ায় অরিজিৎ থাকে তাকে ফোনে জিজ্ঞাসা করতে সে খোঁজখবর করে জানাল যে সেই ডুবে যাওয়া জাহাজের একমাত্র জীবিত ব্যক্তি নাকি আমাদেরই বন্ধু সিন্ধুনীল কিন্তু সে এখন কোনও এক মানসিক হসপিটালে ভর্তি কারণ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার ভয়ঙ্কর স্মৃতি তাকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে সে নাকি এখন কাউকেই চিনতে পারে না তার বাবা মা আগেই গত হয়েছেন বাড়ির অন্য লোকের সাথে কোনও যোগাযোগ নেই
যাই হোক, এই মর্মান্তিক ঘটনার বেশ কয়েকমাস পরে একদিন চেন্নাইয়ের রাস্তায় হঠাৎ সিন্ধুনীলের সাথে দেখা মুখে একরাশ কাঁচাপাকা দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতে চলেছে এত বছর পরে হঠাৎ করে দেখে আমার তাকে কোনওমতেই চেনা সম্ভব ছিল না, যদি না সে আমার সামনে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেত আর আমি তাকে তুলতে যেতাম ঘটনাটা একেবারেই কাকতালীয় কিন্তু কাছ থেকে তার মুখটা দেখেই আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল নাম ধরে ডাকতে সে আমার দিকে ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ তারপর হন্তদন্ত হয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেল আমিও কাজের তাড়ায় ছিলাম, তার পিছনে ধাওয়া করার ইচ্ছা থাকলেও সেটা হল না
কলকাতা ছেড়ে আমি তখন বেশ কিছুদিনের জন্য চেন্নাইয়েই আস্তানা গেড়েছি, আমার কাজের জন্য বন্ধুবান্ধব খুব বেশি জোটেনি ছুটির দিনগুলোতে কোনও কাজ না থাকায় ওদের কোম্পানিতে খোঁজখবর করে শেষে সিন্ধুনীলের চেন্নাইয়ের বাসার ঠিকানাটা জোগাড় করলাম তারপর একদিন হাজির হলাম সেখানে কিন্তু হতাশ হলাম দেখে বাইরে থেকে তালাবন্ধ বাড়িওয়ালা জানালেন, কখন সে ঘরে থাকে, আর কখন বাইরে, তার কোনও ঠিকঠিকানা নেই আমি কী ভেবে পকেট থেকে আমার একটানেম কার্ডবের করে তাঁকে দিয়ে বললাম, যদি এর মধ্যে তার সাথে দেখা হয় তাহলে বলবেন এই ঠিকানায় যোগাযোগ করতে আমি তার ছোটবেলার বন্ধু
এই ঘটনার প্রায় মাসখানেক পরে আমার ঠিকানায় এসে পৌঁছাল একটা চিঠি আমাকে সম্বোধন করে ইংরাজিতে লেখা পড়ে দেখলাম, সেই বাড়িওয়ালা লিখেছেন, আপনার বন্ধুর এতদিন ধরে কোনও খোঁজখবর না পাওয়ার কারণে ঘরটি খালি করে দেওয়া হল যা কিছু জিনিসপত্র ছিল, এক সপ্তাহ রেখে দেওয়া হবে এর মধ্যে সেগুলো না নিয়ে গেলে কর্পোরেশনের আবর্জনায় স্থান পাবে পরের ছুটির দিনেই গিয়ে হাজির হলাম সেখানে জামাকাপড় আর কাগজপত্রের মধ্যে একটা ডায়েরি পেয়েছিলাম সেই ডায়েরিটা আমি তোদের পড়ে শোনাব বিশ্বাস করা বা না করা তোদের ব্যাপার
দেখলাম এতটা শুনে ওরা দুজনেই নড়েচড়ে বসেছে। আমি ডায়েরিটা খুলে পড়তে শুরু করলাম
আগের ডায়েরিগুলো মহাসমুদ্রে তলিয়ে গেছে তাতে আমার রোজনামচা লেখা থাকত অনেক কাজের ফাঁকে তখন ডায়েরি লেখাটা একটা অভ্যাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল সাহিত্য বা লেখালিখির চর্চা আগে কোনও কালেই আমার ছিল না মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময়ে কলেজে আমার দু’একজন বন্ধু ছিল যারা কবিতা লিখত আমার কোনওদিন ওসব আসেনি বহু বছর পর ছন্দবিহীন জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে আমার এই ডায়েরি লেখা যারা সমতলে বাস করে তারা কখনওই কল্পনা করতে পারবে না যে যারা মাসের পর মাস জলে ভেসে বেড়ায় তাদের মানসিক অবস্থা কেমন হয় বছরে একবার হয়ত ছুটি মেলে অনেক সময়ে তাও নয় তবে সারা পৃথিবী ঘোরা যায় কত শহর দেখা যায়, অনেক মানুষের সাথে মেশা যায় জাহাজ যে ক’দিন বন্দরে নোঙর করে থাকে, তার মধ্যে কিছুটা সময় পেলেই আমরা শহর দেখে নিই তা সেই সাধারণ ডায়েরিগুলোর সলিল সমাধি হওয়ায় এত দুঃখের কিছু ছিল না, যদি না আমার জীবনে এরকম অদ্ভুত একটা ঘটনা না ঘটত। তাই শুরু থেকে আবার একবার গুছিয়ে লেখার চেষ্টা করছি। জানি না শেষ পর্যন্ত সব কিছু ঠিকঠাক বোঝাতে পারব কিনা!

**************

আমাদের জাহাজ তখন বালি দ্বীপের শহর ডেনপাসারেরবেনোয়াবন্দরে নোঙর করেছে এখানে মাল নামানো হচ্ছে। তারপর খালি জাহাজ এখান থেকে চেন্নাই যাবে প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার যাত্রাপথ সময় লাগবে আনুমানিক এক সপ্তাহ আমাদের এই মাঝারি মাপের কার্গো জাহাজকে বলে প্যানাম্যাক্স এর দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে ন’শো ফুট, বড় বড় কন্টেনারে ভর্তি কোম্পানির অর্ডার অনুযায়ী পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তের বন্দরে গিয়ে হাজির হতে হয় তারপর মাল নিয়ে আবার ভেসে পড়া হাজার হাজার মাইল দূরে অন্য কোনও বন্দরের উদ্দেশ্যে
আমাদের ক্যাপ্টেন মিঃ রমেশ রেড্ডি তামিলনাড়ুর লোক আমার সাথে সম্পর্ক খুবই ভালএমনিতে তিনি খুবই ভদ্র এবং বিনয়ী মানুষ কিন্তু আজকে তাঁর যে চেহারা দেখেছি তা ভোলার নয় সকালে ফাঁকা সময় পেতেই বললেন, “চলো দাস, একটু শহরটা দেখে আসি
আমিও উৎসাহ নিয়ে তাঁর সাথে বেরিয়ে পড়লাম
বেনোয়াবন্দর থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি নিয়ে আমরা শহর দেখতে বের হলাম বালি হচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার একটা ছোট দ্বীপ একে বলা হয়আইল্যান্ড অফ গড’, মানে ঈশ্বরের দ্বীপ এখানের প্রতিটা জিনিসই যেন অভিজ্ঞ শিল্পীর হাতে তৈরি সমুদ্র, পাহাড়, নদী, সবুজ গাছপালা, সব মিলেমিশে এক নৈসর্গিক দৃশ্য আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, পাথরের তৈরি প্রায় হাজার বছরের পুরনো কারুকার্যমণ্ডিত বহু হিন্দুমন্দির রয়েছে এখানে ছোটবেলায় ইতিহাস বইতে পড়েছিলাম, বাংলার আর দাক্ষিণাত্যের রাজারা দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার ফিলিপিন্স পর্যন্ত সমুদ্রপথে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে আসত
ক্যাপ্টেন বললেন, “মূলত চোল বংশের রাজা রাজেন্দ্র চোলের আমলে মায়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপপুঞ্জ, জাভা, সুমাত্রা, বালি, সব জায়গায় ভারতীয় উপনিবেশ ছিল তাঁর সেনাপতিরা বিশাল বড় নৌবহর নিয়ে এসে এইসব রাজাদের বশ্যতা স্বীকার করাতেন আমরা জানি ইংরেজরা আমাদের দেশ থেকে বহু ধনরত্ন লুঠ করে নিয়ে গেছে কিন্তু আজ থেকে হাজার বছর আগে ভারতীয় রাজারা এইসব উপনিবেশ থেকেও লুঠতরাজ কম করেনি অবশ্য শুধু নিয়ে যায়নি, দিয়েও গেছে অনেক কিছু ধর্ম, সংস্কৃতি, শিল্প, ভাস্কর্য এখানে যা কিছু দেখছ তার অনেকটাই আমাদের দেশের
প্রথমে আমরা গেলাম শহরের প্রাণকেন্দ্রে বালিবাসির শৌর্যের প্রতীকবজ্রসন্ধি মনুমেন্টদেখতে তারপর কুড়ি কিলোমিটার দূরে সমুদ্রের তীরে এক মন্দিরে, নামটানাহ লট টেম্পল মিঃ রেড্ডি বললেন, “এই জায়গাগুলো আমার আগে ঘোরা।”
দেখলাম অদ্ভুত সুন্দর এক মন্দির দূর থেকে মনে হবে জলের উপরে ভাসছে ক্যাপ্টেন জানালেন, ষোলশ শতাব্দীতেডাং ইয়াং নিরারথাএই মন্দির তৈরি করিয়েছিলেন মন্দিরের গায়ে ক্রমাগত সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ে রাশি রাশি সাদা ফেনা আর নোনা জল ছিটিয়ে দিচ্ছে চারিদিকে তবু এত শো বছর ধরে কী করে দাঁড়িয়ে আছে সেটাই আশ্চর্য সবুজ শেওলায় মোড়া কালো পাথরের এই অপূর্ব ভাস্কর্য থেকে চোখ সরানো মুশকিল আমি তন্ময় হয়ে দেখছি আর ক্যামেরায় যত পারি ছবি তুলে নিচ্ছি
“গুড আফতারনুন স্যারপেছন থেকে ডাক শুনে ঘুরে দেখি এক স্থানীয় বয়স্ক মহিলা হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছেন ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরাজিতে তিনি বললেন, “আমার কাছে কিছু পুরনো মুদ্রা, মূর্তি, পাথর এসব আছে আপনারা কি দেখবেন?”
আমার দেখার ইচ্ছা ছিল কিন্তু মিঃ রেড্ডি বললেন, “না, ধন্যবাদ, ওসব জিনিসে আমাদের কোনও আগ্রহ নেইতারপর আমাকে বললেন, “চলো, আমরা সমুদ্রের ধার থেকে একটু ঘুরে আসি
আগ্নেয় শিলায় তৈরি পাহাড় খাঁজে খাঁজে উঠে গেছে সমুদ্রতট থেকে সেই খাঁজেই গজিয়ে উঠেছে ম্যানগ্রোভ অরণ্য এখানে ছোট বানরের সংখ্যা চোখে পড়ার মত আর আছে প্রচুর সাদাবালি ময়না’, এদের চোখের পাশে আর লেজের শেষে কালো ছোপ
লক্ষ্য করলাম সেই মহিলা আমাদের পিছু পিছু আবার আসছেন স্যার, আপনাদের দেখে মনে হচ্ছে ভারতীয় আমার কাছে প্রাচীন ভারতীয় মুদ্রা আর ভগবানের মূর্তি রয়েছে আপনারা চাইলে একবার দেখে যেতে পারেন
“আপনাকে তো বললাম আমাদের এই ব্যাপারে কোনও আগ্রহ নেই কেন আমাদের পিছু নিয়েছেন? বেশি বিরক্ত করলে আমরা কিন্তু পুলিশে কমপ্লেন করবমিঃ রেড্ডি একটু কড়া করে ধমক দিতে মহিলা মাথা নিচু করে চলে গেলেন আমার মন বলছিল, ওনার কথা শুনে একবার জিনিসগুলো দেখে নিলেই হত কেনা না কেনা তো আমাদের কাছে মহিলাকে দেখে অভাবী বলেই মনে হয় তাছাড়া মিঃ রেড্ডির এই রেগে যাওয়াটা আমার কাছে একটু অন্যরকম ঠেকল
যাই হোক, আমরা সমুদ্রের পাড় ধরে অন্যদিকে চলে গেলাম এদিকটা বেশ নির্জন পশ্চিম আকাশ লাল টকটকে হয়ে উঠছে ক্রমশ লাল পলাশের মত সূর্য সমুদ্রের ঘন নীল জলে ডুব দিচ্ছে ধীরে ধীরে নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধু সমুদ্রের গর্জনের শব্দ। আমরা হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূরে চলে এসেছিলাম আলো কমে আসতে ফেরার পথ ধরেছি জুতোগুলো হাতে আর প্যান্ট গুটিয়ে হাঁটুর উপরে ছপাস ছপাস করে হাঁটছি জলের উপর দিয়ে
হঠাৎ সমুদ্রের তীরে একটা শেওলায় মোড়া পাথরখণ্ডে আমার চোখ আটকে গেল ভাল করে লক্ষ্য করলাম, মুষ্টিবদ্ধ হাতের মত এক ফুট লম্বা একটা পাথরের টুকরো আগ্রহ ভরে তুলে নিলাম সেটা বেশ ভারি মিঃ রেড্ডিও এগিয়ে এলেন আমার হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিলেন জিনিসটা। ভাল করে লক্ষ্য করে দেখলাম লম্বা লম্বা সবুজ সামুদ্রিক শেওলা ঘন হয়ে এঁটে রয়েছে গায়ে আঙ্গুলের চাপে শেওলাগুলো সরিয়ে মিঃ রেড্ডির চোখগুলো বড় বড় হয়ে গেল। দেখলাম সেটা একটা শিবের মূর্তি একটা পঞ্চমুখী সাপ তার ফণার মধ্যে শিবলিঙ্গটিকে ধরে আছে সম্ভবত কোনও মন্দির থেকে ভাঙা অংশ সমুদ্রে তলিয়ে গিয়েছিল সম্প্রতি হয়তো মাছ ধরার জালের সাথে উঠে এসেছে পাড়ে মিঃ রেড্ডির চোখমুখ উত্তেজিত হয়ে উঠেছে, বললেন, “দাস, তাড়াতাড়ি ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে নাও কেউ দেখে ফেললে আর নিয়ে যাওয়া যাবে না
একজন জেলে আমাদের লক্ষ্য করেছিল দূর থেকে তারপর দেখি গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসছে পিঠের ব্যাগে ঢোকানোর আগেই জেলেটা দৌড়ে এসেগিভ ইট টু মিবলেই ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার উপর আমি কোনওরকমে তাকে ঠেলে জলে ফেলে দিলাম আবার উঠে আক্রমণ করল এবার আমি ধরাশায়ী হলাম আর হাত থেকে মূর্তিটা ছিটকে পড়ল এমন অতর্কিতে ব্যাপারটা ঘটল, আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছি জেলেটা মাথা দিয়ে প্রচণ্ড জোরে গোঁত্তা মারল আমার থুতনিতে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে মুখ দিয়ে যন্ত্রণায় মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। নিজেকে সামলাতে আমার হয়তো কয়েক সেকেন্ড সময় লেগেছে। হঠাৎ আর্তচিৎকার করে মাথায় হাত দিয়ে সে জলে পড়ে গেল
আমি উঠে দেখলাম, রাগে মিঃ রেড্ডির চোখমুখ লাল হয়ে গেছে বললেন, “ব্লাডি নিগার!”
বুঝলাম সেই ভারি পাথরটা তুলে প্রচণ্ড জোরে মেরেছেন তার মাথায় ব্রহ্মতালু থেঁতলে গেছে রক্তে ভেসে যাচ্ছে দেখে আমার গা-হাত থরথর করে কাঁপতে শুরু করল
তারপর একটু ধাতস্থ হয়ে চারপাশে একবার চোখটা ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন, “চলো, কেউ এসে পড়ার আগে আমরা বেরিয়ে যাই
আমি কোনওরকমে ঢোঁক গিলে বললাম, “সে কি! ওকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে না হলে মারা যাবে তো!”
“আর ইউ ম্যাড! ও হয়তো এমনিতেই মারা যাবে হসপিটালে নিয়ে গেলে আমাদের পুলিশ এরেস্ট করবে আর স্থানীয় লোকেরা দেখতে পেলে আমাদের পিটিয়ে মেরে ফেলবে চলো এখান থেকে
আরও কিছুক্ষণ তর্ক বিতর্ক হল আমার সাথে ক্যাপ্টেনের চোখের সামনে লোকটা ছটফট করে মারা যাবে আমি মেনে নিতে পারছিলাম না আবার বিপদের গন্ধও পাচ্ছিলাম বিদেশে এসে খুনের কেসে একবার ফেঁসে গেলে কী হবে, সেটা ভেবে বুকটা কেঁপে উঠল। শেষে ক্যাপ্টেনের কথায় রাজি হয়ে অন্ধকারের মধ্যে তাকে ফেলে রেখে চলে এলাম
এই ঘটনার ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমাদের জাহাজবেনোয়াবন্দর ছেড়ে জলে ভেসে পড়ল একবার আন্তর্জাতিক জলসীমার মধ্যে প্রবেশ করলে আর ভয় নেই আমার আঘাতটা গুরুতর হয়নি শুধু একটা দাঁত নড়ে গেছে কিন্তু মনটা বিষাদে তেতো হয়ে রইল সারাক্ষণ।

সেদিন বাইরে রোদ ঝলমলে পরিষ্কার আকাশ আমাদের জাহাজ প্রায় তিরিশ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিতে এগিয়ে চলেছে দুদিন পরে আবার ডায়েরি লিখতে বসেছিলাম লেখার মতো মন আর বিষয় সবসময়ে থাকেও না বালি দ্বীপের সেই দুর্ঘটনাটা মনে পড়লে তখনও শিউরে উঠছি একটা কথা লেখা হয়নি যে জেলেটি মারা গিয়েছিল সে ঐ বয়স্ক মহিলারই ছেলে, যিনি আমাদের ভারতীয় কয়েন আর মূর্তি দেখার জন্য অনুরোধ করেছিলেন যখন আমরাটানাহ লট টেম্পল-এর ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে ট্যাক্সিতে উঠছি তখন একটা হৈ হৈ কানে আসতে দেখলাম এ্যাম্বুলেন্সে করে সেই ছেলেটাকে কোলে নিয়ে মহিলা কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলেন
সেই ঘটনার পর রাতে ঘুম আসছে না মিঃ রেড্ডির আচরণ আমার অদ্ভুত লেগেছিল প্রথমে তিনি বললেন তাঁর পুরনো জিনিসে কোনও আগ্রহ নেই তার কিছুক্ষণ পরেই সেই কুড়িয়ে পাওয়া পুরনো মূর্তিটা হস্তগত করার জন্য এক গরীব জেলেকে মেরে ফেললেন এবং তাতে তাঁর কোনও অনুশোচনাও নেই আশ্চর্য! ঐ মূর্তির মধ্যে কী এমন দেখেছিলেন তিনি? মূর্তিটাও তাঁর সাথে আমাদের জাহাজে করেই চলেছে

লক্ষ বছর আগে আমরা ভেলা তৈরি করেছিলাম তারপর সেই ভেলা কতরকমভাবে পরিবর্তিত হয়ে আজকের এই আধুনিক জাহাজে পরিণত হয়েছে একটা সময় ছিল যখন মানুষ পাল তোলা, হাল টানা বজরা বা নৌকা নিয়ে সমুদ্রে ভেসে পড়ত সূর্য আর নক্ষত্রের অবস্থান দেখে দিকনির্ণয় করত এখন স্যাটেলাইট জি.পি.আর.এস. ব্যবস্থায় জাহাজ অটোমেটিক তার গতিপথ ঠিক করে নেয় কয়েকটা কম্পিউটারের সামনে বসে আমরা গোটা জাহাজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি লোকবল আগের তুলনায় অনেক কম লাগে মানুষ এত উন্নত হয়েও কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃতির কাছে পরাস্ত হয়ে আছে বিজ্ঞান প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস দিতে পারে কিন্তু এখনও তাকে আটকাতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না সে বিদ্যা এখনও আমাদের আয়ত্তে আসেনি
কম্পিউটারে একটা সামুদ্রিক ঝড়ের পূর্বাভাস দেখতে পাচ্ছিলাম সেই মুহূর্তে আমাদের অবস্থান সুমাত্রা থেকে দেড় হাজার কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে অর্থাৎ প্রায় সুমাত্রা আর শ্রীলঙ্কার মাঝামাঝি ভারত মহাসাগরের মাঝখানে ঝড়টা দেড়শ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসছে ঠিক আমাদের পিছন থেকে দেড় হাজার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে কোনও বন্দর বা দ্বীপ নেই বলাই বাহুল্য সারা আকাশ জুড়ে ঘন বজ্রগর্ভ মেঘ বাতাস জোরে বইতে শুরু করেছে আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই হয়তো তাণ্ডব শুরু হয়ে যাবে
এর আগে প্রশান্ত মহাসাগর আর অ্যাটল্যান্টিক মহাসাগরে দুটো সাংঘাতিক ঝড়ের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে সে প্রচণ্ড প্রলয় যে নিজে না দেখবে তাকে বলে বোঝানো অসম্ভব মহাসমুদ্রের জল কোথাও আকাশচুম্বী উঁচু হয়ে যায়, আবার পরক্ষণেই পাতালপ্রবেশ ঘটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এইভাবে মৃত্যুর সাথে লড়াই করতে হয়, যতক্ষণ না সমুদ্র শান্ত হয় আমাদের করণীয় শুধু জাহাজের অভিমুখ ঢেউয়ের তরঙ্গের সাথে উল্লম্ব রাখা অর্থাৎ নব্বই ডিগ্রী কোণে যদি কখনও সেটা সমান্তরাল হয়ে যায় তবে জাহাজকে ওলটানোর হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না
বাইরে ঝড়ের বেগ ক্রমশ বাড়ছে কম্পিউটার থেকে যা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তাতে বুঝতে পারছি পিছনে যে ঝড়টা আসছে সেটা খুবই প্রলয়ঙ্কর মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে আছি আমরা মনে হচ্ছে যেন সেই অভাগী মায়ের কান্না বিশাল একটা তাণ্ডবের চেহারা নিয়ে গিলে খেতে আসছে আমাদের
প্রসঙ্গক্রমে আর একটা কথা মনে আসছে আমার গত কয়েক মাসের মধ্যেই দু-দু’খানা যাত্রী বোঝাই এয়ার বাস এই অঞ্চলেই নিখোঁজ হয়েছে একটার ব্ল্যাক বক্স মহাসমুদ্রের অতল থেকে উদ্ধার করা গেছে আর প্রথমটার কোনও হদিশ নেই সম্ভবত মাঝ আকাশে এরকমই ঝড়ের মুখোমুখি হয়েছিল তারা ছোটবেলায় পড়া বারমুডা ট্রায়ংগেলের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে যেখানে এরোপ্লেন আর জাহাজ একবার ঢুকে পড়লে আর বেরোতে পারত না
জাহাজ প্রচণ্ডভাবে দুলতে শুরু করেছে সেই দিনটা ছিল চব্বিশে মার্চ বিকাল পাঁচটার পরে প্রবল বিক্রমে সামুদ্রিক সাইক্লোন ‘হুপার’ ভারত মহাসাগরের মাঝখানে আমাদের জাহাজের উপর আছড়ে পড়ল কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা টের পেলাম যে আমরা যা ভেবেছিলাম এ সাইক্লোনের শক্তি তার থেকে অনেক বেশি আমাদের এত বড় জাহাজটাকে খোলামকুচির মতো নাস্তানাবুদ করে ফেলছে বিশাল জলরাশির মধ্যে যখন ঢুকে যাচ্ছি তখন মনে হচ্ছে আর উপরে উঠতে পারব না আবার সাঁ সাঁ করে ঢেউয়ের মাথায় উঠে পড়ছি যতদূর চোখ যায় সমুদ্র প্রচণ্ড বিক্রমে ফুঁসছে তার সাথে আকাশ কালো করে ঝমঝমে বৃষ্টি, কান ফাটানো বজ্রপাতের আওয়াজ আর ঝোড়ো হাওয়া একটা বিদ্যুতের রেখা এসে পড়ল জাহাজের এন্টেনায় কম্পিউটারসমেত সমস্ত স্যাটেলাইট সিস্টেম খারাপ করে দিল আমাদের সহকর্মীদের মধ্যে মৃত্যুভয় ঢুকে গেছে জাহাজের খোলে জল ঢুকছে হু হু করে সবক’টা পাম্প চালিয়েও সেই জল বাইরে ফেলা সম্ভব হচ্ছে না আর কতক্ষণ এভাবে লড়াই করা সম্ভব?
ক্যাপ্টেন নির্দেশ দিলেন লাইফ জ্যাকেট পরে নিতে অর্থাৎ, জাহাজ যে কোনও সময়ে ডুবে যেতে পারে এস..এস. পাঠানো হল কাছাকাছি সমস্ত জাহাজে
জাহাজ ডুবেছিল কিনা মনে নেই, কারণ তার কিছুক্ষণ পরেই যখন আমি লাইফ জ্যাকেট পরে ডেকের উপরে ভিজে ঝড়ো কাকের মতো অবস্থায় লড়াই করছি, আমার পিছনেই বোমা পড়ার মত বজ্রপাত হল তারপর আমি জ্ঞান হারালাম
জ্ঞান ফিরতে চোখ চেয়ে দেখি, একটা অন্ধকার ঘরের মধ্যে কাঠের তক্তার উপরে শুয়ে আছি ঘরটা দুলছে অর্থাৎ এটাও একটা জাহাজ কিন্তু আমাদের জাহাজ নয় কিছুক্ষণ পর খেয়াল হল, এটা কাঠের তৈরি জাহাজের নিচে খোলের মধ্যে আমি শুয়ে আছি হাতটা পিছমোড়া করে বাঁধা খটকা লাগল আমাকে যদি কোনও জাহাজ উদ্ধারও করে তবে হাত-পা বেঁধে রাখবে কেন? উঠে বসে দেখলাম চারপাশে অনেক লোকজন ব্যস্ততার সঙ্গে দৌড়োদৌড়ি করছে পায়ের নিচে জল ঢুকছে হু হু করে অন্ধকারের মধ্যে কিছুটা ছাড়া একটা করে মশাল জ্বলছে এখানে দ্বিতীয় খটকা, এখনকার দিনে মশাল কোন দেশের জাহাজে ব্যবহার হয়? বেশ হৈ-হল্লার আওয়াজ কানে আসছে ঘরের মধ্যে অনেকগুলো বড় বড় কাঠের তালাবন্ধ বাক্স কৌতূহল চাপতে না পেরে ঘষে ঘষে এগিয়ে গেলাম কিছুটা। দেখি দু’দিকে সার বেঁধে প্রায় একশ লোক বসে হাল টানছে আশ্চর্য! একবিংশ শতাব্দীতে হাল টানা জাহাজ?
আরও কিছুক্ষণ পরে বুঝলাম, অবাক হওয়ার সবে শুরু দুজন লোক এগিয়ে এল আমাকে দেখে। কিন্তু তাদের ভাষা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না তারাও আমার কোনও কথা বুঝছে না পোশাক-আশাক ভারতীয় গ্রাম্য মানুষের মত। হাঁটুর উপরে খাটো ধুতি পেঁচিয়ে পরা। গায়ের রং কালো। কোমরে গোঁজা বড় বড় ছোরা। আমার কথা বুঝতে না পেরে লোক দুটি কাঠের সিঁড়ি দিয়ে আমাকে টেনে হিঁচড়ে উপরে নিয়ে এল উপরে এসে যা দেখলাম তাতে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছি না বিশাল বড় বড় মাস্তুল লাগানো কাঠের যুদ্ধ জাহাজ তবে অস্ত্রশস্ত্র সব প্রাচীনকালের বিভিন্নরকম তলোয়ার, বর্শা, তির-ধনুক এ জাহাজটাও ঝড়ের মধ্যে পড়েছে একইরকম অসহায়ভাবে লড়াই করছে ঝড়ের সাথে জলোচ্ছ্বাস ভাসিয়ে দিচ্ছে সবকিছু জাহাজ বাঁচাতে সবাই ব্যস্ত
জাহাজের গায়ে বেশ কিছু শিবের মূর্তি খোদাই করা দেখলাম আরও বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলার চেষ্টা করতে একটা কথাই কানে ঢুকলচোলা সারা গায়ে সোনা, মণিমুক্তাখচিত গয়না আর দামী সিল্কের ধুতি পরা লম্বা একটা লোকের কাছে আমাকে টেনে নিয়ে গেল ওরা তার মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম হুবহু আমাদের ক্যাপ্টেন মিঃ রেড্ডি শুধু এনার কাঁচাপাকা চাপদাড়ি আছে। আমার পোশাক দেখে তাঁর হয়তো বিধর্মী মনে হয়েছে তিনিও চেষ্টা করে আমার ভাষা বুঝতে পারলেন না। এমনিতেই প্রচণ্ড সাইক্লোনের মধ্যে জাহাজ বাঁচানোই তখন সব থেকে বড় সমস্যা। তাই আমার মতো বাড়তি সমস্যাকে বহন করার কোনও প্রয়োজন নেই। এইসব ভেবে হয়তো আমাকে সমুদ্রে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন হঠাৎ কী মনে হল, তাঁর পায়ের কাছে সটান শুয়ে পড়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘ওম নমঃ শিবায়
অবাক ব্যাপার, এই মন্ত্রে কাজ হল ম্যাজিকের মত তাঁর নির্দেশে হাতের দড়িও কেটে দেওয়া হল তারপর একটা অন্য ঘরে নিয়ে গেল আমাকে একজন বয়স্ক লোক আমার শরীর পরীক্ষা করলেন সম্ভবত তিনি কবিরাজ আমাদের মধ্যে ইশারায় কিছু কথার আদানপ্রদান হল। তিনি আমাকে বড় পাথরের পাত্রে একটা কড়া পাঁচন খেতে দিলেন সেটা খেয়ে মাথাটা ভোম হয়ে রইল বেশ অনেকক্ষণ।
তারপর মাথাটা পরিষ্কার হতে তাঁর কথাগুলো অল্পস্বল্প বুঝতে পারলাম। শুনে মনে হল, এটা সম্রাট রাজেন্দ্র চোলের নৌবহরের প্রধান নৌকা পিছনে আরও অনেকগুলো নৌকা আসছে সেনাপতি মহেন্দ্রের নেতৃত্বে যবদ্বীপে যুদ্ধ জয় করে ফিরছে এরা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে শত্রুপক্ষের বহু লোক মারা গেছে ধনরত্ন বোঝাই এই নৌকার পেছনে অন্য নৌকাগুলোতে যুদ্ধবন্দী ক্রীতদাস নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কিন্তু ভয়ঙ্কর সামুদ্রিক ঝড়ে তার মধ্যে তিন চারটে নৌকা ডুবে গেছে জলোচ্ছ্বাসের মধ্যে দিয়ে আমি কোনওভাবে এই জাহাজের মধ্যে এসে পড়েছি
আমি তাঁর কথা শুনে এত অবাক হলাম যে প্রত্যুত্তরে একটা শব্দও মুখ দিয়ে বের হল না। বের হলেও যে খুব একটা লাভ হত এমনটা নয়। মনে হল আমি আদৌ বেঁচে আছি তো? এমনও তো হতে পারে যে সলিল সমাধির পরে অজানা কোনও কালচক্রে পড়ে হাজার বছর পিছিয়ে গেছি।
মনের মধ্যে এইসব নিয়ে যখন প্রচণ্ড তোলপাড় চলছে হঠাৎ আগের মতো বজ্রপাতের একটা সাংঘাতিক জোরে আওয়াজ, আর সঙ্গে সঙ্গে কাঠের এত বড় রণতরী মাঝখান থেকে মড়মড় করে ভেঙে দু’ভাগ হয়ে গেল আমার গায়ে যেহেতু আগে থেকেই লাইফ জ্যাকেট ছিল তাই আবার কোনওরকমে ভেসে উঠলাম চোখের সামনে হাজার বছরের পুরনো রণতরী মাস্তুল সমেত ডুবে গেল। আবার চারিদিকে ঘন অন্ধকার প্রলয়ঙ্কর বৃষ্টি আর ঝড় তখনও সমানে চলছে
কতক্ষণ ঐভাবে ভেসে ছিলাম জানি না তারপর হয়তো চৈতন্য লোপ পেয়েছে আবার যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখি একটা জাহাজ আমাকে উদ্ধার করেছে
“হাউ আর ইউ ম্যান?” ভাষা শুনে আর পোশাক দেখে বুঝলাম এটা একবিংশ শতকের জাহাজ

সিঙ্গাপুর থেকে সেই কার্গো জাহাজটি চেন্নাই আসছিল আমাদের এস..এস. পেয়েছে ঘণ্টা চারেক আগে তারপরে আর কোনও খোঁজ নেই আমাকে এতক্ষণ পরে জল থেকে উদ্ধার করার সময় ভেবেছিল মৃতদেহ কিন্তু অবাক ব্যাপার আমার হৃৎস্পন্দন তখনও চালু ছিল
এরপর চেন্নাইয়ে একটা হসপিটালে ভর্তি ছিলাম বেশ কিছুদিন। ডাক্তাররা বলছেন, স্মৃতিভ্রমের মতো একটা দুরারোগ্য ব্যাধি হয়েছে এর কারণ হিসাবে বজ্রপাতকেই ওনারা দায়ী করছেন মাঝে মাঝে নাকি আমি কাউকে চিনতে পারি না নেশার ঘোরের মতো ভুলভাল কথা বলি

আজকে ভোরবেলা উঠে একটা ট্যাক্সি নিয়েগঙ্গাইকোন্ডা চোলাপুরমগিয়েছিলাম চেন্নাই থেকে প্রায় আড়াইশো কিলোমিটার দক্ষিণ পূর্বে কোল্লিদাম নদীর তীরে হাজার বছরের পুরনো চোল সাম্রাজ্যের রাজধানী এখানে অনেক মন্দির, স্থাপত্য আর ভাস্কর্যের নিদর্শন এখনও স্ব-মহিমায় বিরাজ করছে আমাদের ক্যাপ্টেন মিঃ রেড্ডির বাড়িও এ অঞ্চলেই
এই ক’দিনে চেন্নাইয়ের ন্যাশনাল লাইব্রেরীতে গিয়ে চোল সাম্রাজ্যের উপরে বেশ কিছু বই পড়ে ফেলেছি আর যত তথ্য ইন্টারনেট থেকে পাওয়া সম্ভব সবকিছু ঘেঁটে যা বুঝলাম, সেটা বেশ রোমাঞ্চকর নয়শো শতকের শেষের দিকে চোল সম্রাট রাজারাজা’ তখন সিংহাসনে তাঁর ছেলে যুবরাজ রাজেন্দ্র চোল বিশাল নৌবহর পাঠিয়ে ছিলেন যবদ্বীপ দখল করার জন্য যবদ্বীপ বা জাভার তখন রাজা ছিলেন শ্রী কেশরী ভার্মাদেব তিনি ছিলেন শান্তিপ্রিয়, বৌদ্ধধর্মাবলম্বী কিন্তু চোলরাজের চোখে বিধর্মী নৃশংসভাবে হাজার হাজার লোক মেরে প্রচুর ধনরত্ন নিয়ে ফিরছিলেন সেনাপতি কিন্তু সামুদ্রিক ঝড়ে সেই নৌবহরের বেশিরভাগ রণতরী ডুবে যায়
প্রায় হাজার বছর পরে ভারত মহাসাগরের মাঝখানে কীভাবে আমি সেই রণতরীতে পৌঁছলাম? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর মনে হয় না কেউ দিতে পারবে
কিন্তু আর একটা জিনিস আবিষ্কার করে আশ্চর্য হলাম কোল্লিদাম নদীর তীরে সিরুকাট্টুর গ্রামে মিঃ রমেশ রেড্ডির পরিবারের সাথে দেখা করতে গিয়ে মিঃ রেড্ডিকে সরকার মৃত ঘোষণা করেছে তাই তার পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে যাওয়াটা আমার কর্তব্য গিয়ে দেখলাম এনারা বংশানুক্রমিক বিত্তবান আগে এনাদের বিশাল জমিদারী ছিল তাঁদের বংশের এক প্রাচীন শিবমন্দিরে গিয়ে আমি চোখের সামনে যেন কালের বিবর্তনটা পরিষ্কার দেখতে পেলাম
মন্দিরের মাঝখানে একটা বড় শিবলিঙ্গ আর চারটি কোণের মধ্যে তিনটি কোণে একই ধরনের মূর্তি চোখটা আটকে গেল চতুর্থ কোণে যে কোণটা ফাঁকা সেই জায়গাটা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করতে জানলাম, এটা বংশপরম্পরায় এরকমই আছে এর কোনও ইতিহাস তারা জানেন না অন্য তিনটি মূর্তিকে ভাল করে লক্ষ্য করলাম, পঞ্চমুখী নাগ তার ফণার মধ্যে শিবলিঙ্গ ধারণ করে আছে একদম হুবহু সেই একই মূর্তি যেটা আমরা বালি দ্বীপের সমুদ্রতীরে দেখেছিলাম শুধু সেটা ছিল গোড়া থেকে ভাঙা সামুদ্রিক শেওলায় মোড়া, আর এগুলো মন্দিরে পুজো হচ্ছে। তাহলে কি এই মন্দিরের ভাঙা অংশ আমরা পেয়েছিলাম বালির সমুদ্রতীরে? আর সেটা চিনতে পেরেই কি মিঃ রেড্ডি অত উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন? হয়তো তাই হবে।

*********

এই পর্যন্ত পড়ে আমি ডায়েরিটা মুড়ে রেখে দিলাম পাশে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে দেখলাম, পিউ আর রন্টি দুজনেই ঘোরের মধ্যে রয়েছে। কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে, রন্টি প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল, “তাহলে জাহাজের ক্যাপ্টেন মিঃ রেড্ডি কি চোল সাম্রাজ্যের সেনাপতি মহেন্দ্রর বংশধর?”
“একদম ঠিক ধরেছিস।”
“আচ্ছা, মন্দিরের ভাঙা অংশটা এখান থেকে বালি দ্বীপে গেল কীভাবে?”
“এটা তো আমি জানি না। হয়তো বহু বছর আগে যখন ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপপুঞ্জগুলোতে ‘চোল’ সাম্রাজ্যের উপনিবেশ ছিল, সেই সময়ে মিঃ রেড্ডির কোন পূর্বপুরুষ পুজো করার জন্য কুলদেবতার স্মারক হিসাবে মন্দিরের এই অংশটা নিয়ে যাচ্ছিল জাহাজে করে, আর সেই জাহাজ ডুবে যায়। আর এত বছর পর মাছ ধরার জালে আটকে উঠে এসেছিল বালি দ্বীপের পাড়ে।”
পিউ বলে উঠল, “কিন্তু এতদিন পরে মিঃ রেড্ডি সেটা পেয়েও বাড়ি নিয়ে আসতে পারলেন না।”

_____
ছবি - লেখক