গল্পের ম্যাজিক:: কৃতজ্ঞতা - অরিজিৎ পাত্র


কৃতজ্ঞতা
অরিজিৎ পাত্র

নাহ, এবার আর না উঠলেই নয়। ক্লাস টুয়েলভের ঘর থেকে হৈ হট্টগোলের শব্দটা লাইব্রেরি পেরিয়ে স্টাফ রুম অবধি আসছে অমূল্যবাবু না আসায় আজ থার্ড পিরিয়ডটা অফ যাচ্ছে ওদের। পুজোর ছুটির পর মাত্র ক’দিন হল স্কুল খুলেছে। সবার মধ্যেই তাই কেমন একটা গা ছাড়া ভাব। আমারও এই পিরিয়ডে কোনও ক্লাস নেই। ওদিকে গরম চা হাতে শ্যামলবাবু হাত-পা নেড়ে ছুটিতে তাঁর রাজস্থান ভ্রমণের গল্প শোনাচ্ছেন ভবেশদা-কেভবেশ দা আমাদের এই ভাঙাচোরা উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের একমাত্র ক্লার্ক এবং শ্যামলবাবুর সবরকম গাঁজাখুরি গল্পের সবচেয়ে বড়ো শ্রোতা। আমার অবশ্য ওসবে খুব একটা ইন্টারেস্ট নেই। ব্যাগে করে একটা নতুন পূজাবার্ষিকী এনেছি, এই সুযোগে ওটা খুলে নিয়ে বসেছি। জমজমাট একটা থ্রিলার মাঝপথে আটকে আছে গতকাল রাত থেকে।
কয়েকটা লাইন এগোতে না এগোতেই গোলমালটা কানে এল। স্টাফ রুমের এদিক ওদিক একবার তাকালাম। কারোরই তেমন কোনও হেলদোল নেই। টিচারদের মধ্যে আমি সবার জুনিয়র, অগত্যা আমাকেই বইটা বন্ধ করে উঠতে হল।
ক্লাসে স্যার না থাকলে ছাত্ররা এক-আধটু গোলমাল করেই। আবার খানিক বাদে সেটা থেমেও যায়। কিন্তু তা কখনও এতটা মাত্রা ছাড়ায় না। তাছাড়া ক্লাস টুয়েলভের রুমটা টিচার্স রুমের সবচেয়ে কাছাকাছি। বাধ্য হয়েই তারা একটু চুপচাপ থাকে। আজ তাদের এই অস্বাভাবিক ব্যবহারে একটু অবাক হলাম।
ক্লাসে ঢুকে দেখি, থার্ড বেঞ্চের কাছে সবাই মিলে জটলা করেছে। তাদের মধ্যে দাদা গোছের দু-একজন জোর গলায় কিছু একটা বলছে। আর মাথা নিচু করে বেঞ্চে বসে থাকা সুকুল হাঁসদা মিনমিনে গলায় তার প্রতিবাদ করার চেষ্টা করছে। আমাকে দেখে সবাই থতোমতো খেয়ে চুপচাপ হয়ে গেল। তারপর ক্লাসের ফার্স্ট বয় সুজয় একটু সাহস সঞ্চয় করে মুখ খুলল, “স্যার, সুকুল আমার নতুন পেনটা চুরি করেছে!”
জঙ্গলমহলের এই অঞ্চলের স্কুলগুলোতে বেশিরভাগ গরিব বাড়ির ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে। সত্যি কথা বলতে কী, তাদের মধ্যে অনেকে পড়াশোনা নয়, বরং মিড-ডে মিলের টানেই স্কুলে আসে। কিন্তু তারা কেউ চুরি করবে, কথাটা ঠিক হজম হল না আমার। আমার এই শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতায় ওদের মতো পরিশ্রমী আর সৎ মানুষ খুব কমই দেখেছি। তাছাড়া সুকুল ছেলেটা পড়াশোনাতেও মন্দ নয়।
আরেকটু খোঁজ নিয়ে বুঝলাম, দু’দিন আগে সুজয়ের বাবা ভালো রেজাল্ট করার জন্য সুজয়কে একটা সাদা রঙের পাইলট পেন কিনে দিয়েছেন। আজ কিছুক্ষণ আগে সুজয় পেনটা ব্যাগের ওপরে রেখে টয়লেটে গেছিল, কৌতূহল বশত সুকুল তখন ওটা হাতে নিয়ে একটু নেড়েচেড়ে, খাতায় নিজের নাম-টাম লিখে দেখছিল। তারপরেই কয়েকজন মিলে সুকুল-কে এসে ধরেছে।
একটু ধমক দিতেই সবাই চুপ করে গেল। আমি জোর গলায় বললাম, “অন্যের জিনিস হাতে নিলেই কেউ চোর হয়ে যায় না। সুকুল ওটা হাতে নিয়ে দেখছিল, ব্যাগে পুরে নেয়নি। তাই ওকে ‘চোর’ বলা ঠিক নয়। সবাই গিয়ে নিজের জায়গায় বসে বই খোলো।”
টিফিন আওয়ারে সুকুল-কে ডাকলাম টিচার্স রুমে। ক্লাস ফাইভ থেকে ওকে দেখছি। বাবা নেই, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে আর টুকটাক সবজি চাষ করে সংসার চালায়। এত কষ্টের মধ্যেও ছেলেটা পড়াশোনা ছেড়ে দেয়নি। মাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করে সায়েন্স নিয়ে পড়ছে।
জিজ্ঞেস করলাম, “পড়াশোনা কেমন হচ্ছে?”
“ভালো স্যার।”
“হ্যাঁ, ভালো করেই করতে হবে। আর কোনও অঙ্ক আটকে গেলে আমাকে জিজ্ঞেস করবি। লজ্জা করবি না।”
“হ্যাঁ।”
এরকম আরও দু-একটা কথাবার্তার পর জানতে চাইলাম, “আচ্ছা, সুজয়ের পেনটা কি তোর পছন্দ হয়েছিল?”
উত্তর না দিয়ে মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল সুকুল। বুঝলাম, এত দামি পেনটা মনে মনে পছন্দ হলেও মুখে সে কথা বলার সাহস হচ্ছে না ওরমাত্র সপ্তাহ খানেক আগে আমিও একটা ঐ ধরনের পাইলট পেন কিনেছিলাম বিগ বাজার থেকে। সাইড ব্যাগ থেকে ওটা বার করে সুকুলের হাতে দিলাম। প্রথমে কিছুতেই নিতে রাজি হচ্ছিল না। একটু বকুনি দিয়ে ওটা ওর হাতে দিয়ে বললাম, “ভালো করে পড়াশোনা করিস। মায়ের কষ্টের মর্যাদা রাখিস।”
অদ্ভুত একটা খুশিয়াল আভা ছড়িয়ে পড়ল সুকুল হাঁসদার মলিন মুখটায়।

*                    *                    *

তারপর বছর দশেক কেটে গেছে। রোজ কত নতুন ছাত্র-ছাত্রী, কত নতুন নতুন অভিজ্ঞতা। মাথার চুলে পাক ধরেছে আমারও। পুরোনো ছেলে-মেয়েদের অনেকেই এখন যোগাযোগ রেখেছে সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে খবর পেলে গর্বে বুকটা ভরে ওঠে।
তবে বছর সাতেক আগে সুকুল হাঁসদার মৃত্যুর খবরটা পেয়ে নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি। খুব ভালো নম্বর পেয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর মেদিনীপুর কলেজে কেমিস্ট্রি অনার্সে ভর্তি হয়েছিল ছেলেটা। সব ঠিকঠাকই চলছিল। পুজোর ছুটিতে বাড়িতে এসে রাতে সাপের কামড়ে সব শেষ...! শুনেছিলাম, কাছাকাছি ভালো হাসপাতাল না থাকায় ওকে ওঝার কাছে নিয়ে গেছিল গ্রামের লোকজন। ওর মায়ের মুখটা মনে পড়লে খুব কষ্ট হয় আজও।
এমনই অনেক ছোটো-বড়ো ভালো লাগা, মন্দ লাগা নিয়ে দিন কেটে যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গলমহলও পালটাচ্ছে একটু একটু করে। শিক্ষা-দীক্ষার হার বাড়ছে। সচেতনতা বাড়ছে। স্কুল যাওয়ার পথে শাল জঙ্গলের বুক চিরে ঝাঁ চকচকে পিচের রাস্তা মন ভালো করে দেয়। আমাদের স্কুলটা এখন আর পশ্চিম মেদিনীপুরের মধ্যে নেই। নতুন জেলা হয়েছে ঝাড়গ্রাম।
সেবার খবর পেলাম রাজ্যের বিরোধী রাজনৈতিক দল কোনও একটা কারণে ‘বাংলা বনধ’ ডেকেছে। আর রাজ্য সরকার ঘোষণা করেছেন, বনধের দিন সবাইকে স্কুলে আসতেই হবে। কোনও রকম ছুটি নেওয়া যাবে না। সকালে খোঁজ নিয়ে দেখলাম, বাস চলছে না। তাই অগত্যা বাইক নিয়েই পাড়ি দিলাম ষাট কিলোমিটার রাস্তা।
বিকেল সাড়ে তিনটের দিকে হেড স্যারকে বলে বেরিয়ে পড়লাম স্কুল থেকে। এতটা রাস্তা আবার বাইক চালিয়ে ফিরতে হবে। তাছাড়া আকাশটা কেমন একটু মেঘ মেঘ করছে। শীতকালের বিকেল। পাঁচটা বাজতে না বাজতেই চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে। তবে রাস্তাঘাট এই সময়টায় ফাঁকা থাকে। ঠিকঠাক স্পিডে চালালে দেড় ঘণ্টার মধ্যে বাড়ি পৌঁছে যাব।
ঠিকমতোই যাচ্ছিলাম প্রথমটা। মিনিট কুড়ি চালানোর পর হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হল। প্রথমটায় ঝিরঝিরে, তারপর মুষলধারে। একে শীতকাল, তায় কাছে রেনকোট নেই। রাস্তার দু’দিকে তাকিয়ে দেখলাম, কোথাও দাঁড়িয়ে মাথা বাঁচাবার উপায় নেই। ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে শাল গাছের নিচে দাঁড়ানোটা মোটেও উচিত কাজ হবে না। অগত্যা ভিজতে ভিজতেই আরও একটু এগোনোর পর রাস্তার পাশে অনেকগুলো ফাঁকা হাটচালা চোখে পড়ল। হাটচালা হল বাঁশের ওপর খড়ের ছাউনি দেওয়া আস্থায়ী ঘর। যার চারপাশে কোনও দেওয়াল দেওয়া থাকে না। প্রতি মঙ্গলবার এই জায়গাটায় গ্রামের হাট বসে। হাটুরেরা তাদের মালপত্র নিয়ে এই হাটচালাগুলোর নিচে পসরা সাজিয়ে বসেন। বিকেল থেকে সন্ধে পর্যন্ত বেচাকেনা চলে।
রাস্তার পাশে বাইকটা স্ট্যান্ড করে দৌড়ে গেলাম একটা হাটচালার নিচে। চারপাশ থেকে জলের ছাঁট এলেও মাথাটা অন্তত বাঁচবে। বৃষ্টিতে ভিজে ততক্ষণে বেশ শীত শীত করছে আমার। ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বার করে দেখলাম, নেটওয়ার্ক নেই। কয়েকবার নেটওয়ার্ক সার্চিং করেও কিছু লাভ হল না। অগত্যা এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি থামার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া কোনও উপায় নেই।
আকাশ ছোঁয়া শাল জঙ্গলের মাঝে একা আমি দাঁড়িয়ে আছি। বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। একটানা বৃষ্টির শব্দ আর জঙ্গলের গন্ধ মিশে অদ্ভুত এক নেশা ধরিয়ে দিচ্ছে।
কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম মনে নেই। অনেকক্ষণই হবে বোধহয়। বৃষ্টিটা থেমেছে খানিক আগে। চারপাশটা একটু একটু অন্ধকার হতে শুরু করেছে। হেলমেটটা পরে বাইকের দিকে এগোতে গিয়েই চমকে গেলাম। শাল জঙ্গলের বুক চিরে দ্রুত পায়ে যাদের এগিয়ে আসতে দেখলাম, তাদের দেখলে এই অঞ্চলের সবার রাতের ঘুম ছুটে যায়। বেশ বড়ো একটা বুনো হাতির দল এদিকেই আসছে! আমার বাইক থেকে তাদের দূরত্ব বড়োজোর চল্লিশ পঞ্চাশ হাত! প্রতি মুহূর্তে সেই দূরত্ব কমছে। ওদের পায়ের নিচে পড়লে আমার সাধের বাইক আর আস্ত থাকবে না। তার চেয়েও বড়ো কথা, তেমন কিছু হলে আজ রাতে আর আমি বাড়ি পৌঁছাতে পারব না। ছুটে গিয়ে বাইকে উঠে বসলাম। কিন্তু একটানা বৃষ্টিতে ভিজে ইঞ্জিন ঠাণ্ডা হয়ে গেছেকিছুতেই স্টার্ট নিল না।
হাতির দলটা ততক্ষণে আরও কাছাকাছি এসে গেছে। আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। প্রবল ঠাণ্ডার মধ্যেও ঘামতে শুরু করেছি দরদর করে। ছুটেও আর বাঁচতে পারব না ওদের থেকে। নিয়তির হাতে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম। হঠাৎ মানুষের গলার শব্দ পেয়ে চোখ খুলে ফেললাম। আবছা অন্ধকারে দেখলাম, একটা অদৃশ্য কেউ মুখে অদ্ভুত শব্দ করতে করতে হাতির দলটাকে তাড়িয়ে দিচ্ছে উলটোদিকে! সেই গলার শব্দটা আমার ভীষণ, ভীষণ চেনা!
আমার বাইকটা স্টার্ট নিয়েছে ততক্ষণে। মেঘ কেটে গিয়ে আকাশে তখন গোল থালার মতো চাঁদ উঠেছে। ঝকঝকে সাদা জ্যোৎস্না ধুইয়ে দিচ্ছে সারা জঙ্গলটাকে। কোনও দিকে একটুও ভয়ের চিহ্ন নেই। ফিরতে ফিরতে আমি ভাবছিলাম, এতখানি কৃতজ্ঞতা আমার প্রাপ্য কিনা...
_____
ছবিঃ পার্থ মুখার্জী

No comments:

Post a Comment