গল্পের ম্যাজিক:: আমার গাড়ি সাজা - সুজন দাশগুপ্ত


আমার গাড়ি সাজা
সুজন দাশগুপ্ত

[প্রথমেই বলি নীচের গল্পটা আমি শুনেছি শঙ্করদার কাছ থেকেগল্পের আমিঅবশ্যই নিজে নই, শঙ্করদাযে-ভাবে কাহিনিটা শুনেছি, সে-ভাবেই লেখার চেষ্টা করেছি, নাম-ধাম শুধু পালটেছি নাম থেকে পরিচিত কাউকে খুঁজতে গেলে ঠকতে হবে]

ঘটনাটা ষাট দশকের। বড়ো বড়ো ইউনিভার্সিটি বাদ দিলে অন্যান্য স্কুলে (মার্কিন মুলুকে ইউনিভার্সিটিকে স্কুলও বলা হয়) ভারতীয় ছাত্রদের সংখ্যা তখন আঙুলে গোনা যেত। অক্সফোর্ডের মায়ামি ইউনিভার্সিটিতে পড়ত মোট ন’জন ভারতীয়, তাদের মধ্যে আবার তিনজন বাঙালি। আমি, শিবনাথ, আর কমল সরকার। শিবনাথ আমার ছেলেবেলার বন্ধু। কমল সরকার আমাদের থেকে অনেকটা সিনিয়র। একটু বেশি বয়সেই এদেশে পড়তে এসেছিলেন। ইউনিভার্সিটিতেও আছেন বছর চারেক। কোর্স ওয়ার্ক শেষ, থিসিসটাই শুধু হয়নি, মনে হয় তাতে একটু হিমসিম খাচ্ছেন। অন্যরা সবাই সবে ঢুকেছি, মার্কিন আদব কায়দা তখনও রপ্ত করে উঠতে পারিনি। খুব স্বাভাবিক ভাবেই কমল সরকার হয়ে উঠেছেন আমাদের ‘ফ্রেন্ড ফিলসফার এন্ড গাইড’। অবশ্য ‘ফ্রেন্ড’ বলতে আমরা যা বুঝি, তা ঠিক নয়। ওঁর একটা গ্র্যাভিটি ছিল, দূরত্ব বজায় রাখতেন। সেই জন্যেই মনে হয় সবাইকে আপনি বলতেন, ফলে আমরাও ওঁকে আপনিই বলতাম।

কমল সরকারের একটা গাড়ি ছিল। গাড়িটা বেশ মেজাজি। বেশির ভাগ সময়েই ঝিম মেরে থাকত, তখন কারও বাবার সাধ্যি নেই তাকে চাঙিয়ে তোলে। আবার চলতে চলতে মাথা গরম হয়ে গেলে তাকে থামানো সহজ ছিল না, ইগনিশন সুইচ বন্ধ করে দিলেও ঘট ঘট ঘটাং করে চলার চেষ্টা করত। গাড়িতে যারা থাকত, তাদের পক্ষে তখন একটা বেশ ভয়াবহ পরিস্থিতি।
সমস্যাটা ঠিক কী, আমরা বুঝতাম না। দেশে আমাদের কারোরই গাড়ি ছিল না। ‘স্টার্টার আর টিউনিং প্রবলেম, প্লাস উইক ব্যাটারি’ পেট্রল পাম্পের এক ছোকরা মেকানিক রায় দিয়েছিল। কিন্তু পঁচাত্তর ডলারের গাড়ির পেছনে একটা পয়সা খরচ করতে কমল সরকার রাজি ছিলেন না। রায় শুনে বলেছিলেন, ‘পয়সার শ্রাদ্ধ। স্টার্টিং প্রবলেম আবার প্রবলেম নাকি, গাড়ি একটু ঠেললেই তো স্টার্ট নেওয়া যায়।’
সেটাই তিনি করতেন। ওঁর গাড়িতে জনা দুই ভারতীয় ছাত্র সব সময়ই মজুত থাকত। তবে পুরো জিনিসটাই ‘গিভ এন্ড টেক’-র ব্যাপার। উনি ছাত্রদের দোকান টোকানে নিয়ে যেতেন। প্রতিদানে ছাত্ররা গাড়ি চালু করার জন্য মাস্‌ল পাওয়ার দিত। গাড়ি ঠেলতে আমার ভালো লাগে না বলে আমি পারতপক্ষে কমল সরকারের গাড়িতে উঠতাম না। হেঁটে বা বাস ধরে বাজার সারতাম।

একদিন আমি আর শিবনাথ স্টুডেন্ট ইউনিয়ন বিল্ডিং-এ আড্ডা দিচ্ছি, কমল সরকার এসে হাজির।
“আপনাদের দু’জনকে আমার দরকার,” বেশ গাম্ভীর্য নিয়ে ঘোষণা করলেন।
“দু’জনকেই দরকার?” শিবনাথ বিস্মিত হয়ে প্রশ্নটা করল।
“হ্যাঁ, ক্যাম্পাস পুলিশ জয়দেবকে বলেছে ড্রাইভিং ট্রেনিং নিয়ে ওহায়োর ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে। নইলে ওর গাড়িতে স্টিকার দেওয়া হবে না।”
এখানে ব্যাপারটা একটু বিশদ করে বলতে হবে। জয়দেব ধালিয়াল আমাদের সঙ্গেই পড়ে। কমল সরকার তাকে দিয়ে একটা গাড়ি কিনিয়েছেন। কেন কিনিয়েছেন, এতে কমল সরকারের কী স্বার্থ – সেটা ঠিক জানি না। শুধু জানি জয়দেবের একটা ইন্টারন্যাশেনাল ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে, আর পকেটে এক্সট্রা টাকাও কিছু আছে, আমাদের মতো হতভাগ্য নয়। সমস্যা হল ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে গাড়ি রাখতে হলে স্টিকার লাগে। কিন্তু ইতিমধ্যেই গাড়ি কিনে ট্রায়াল রান দিতে গিয়ে জয়দেব রাস্তার পাশে রাখা এক ডজন ফুলের টব ভেঙ্গেছে। ক্যাম্পাস পুলিশ সেটা মোটেই ভালোভাবে নেয়নি।
“ড্রাইভার’স ট্রেনিং নেওয়া তো ভালো কথা, রাস্তায় চালাবে যখন,” আমি বললাম।
“কী উলটোপালটা বকছেন? কত টাকা লাগে জানেন এখানে ড্রাইভিং শিখতে?”
“না,” সত্যিই জানি না। আমি আর শিবনাথ দু’জনেই মাথা নাড়লাম, “কোনও ধারণাই নেই।”
আর কোনও কথা খরচা করলেন না কমল সরকার। “উঠুন, গাড়িতে উঠুন। জয়দেবকে গাড়ি চালানো শেখাব, আপনারা সঙ্গে থাকবেন।”
এবার শিবনাথ মিউ মিউ করল। “বুঝতে পারছি না ব্যাপারটা, আমরা কী জানি গাড়ি চালানোর?”
“আঃ, আপনাদের শেখাতে কে বলছে? গাড়ি থেমে গেলে একটু ঠেলবেন – এইটুকুই।”
আমরা তখনও ইতস্তত করছি দেখে কড়া ধমক লাগালেন। “কী রকম ছেলে মশাই আপনারা! ক্লাসের এক বন্ধুর বিপদে এগিয়ে আসতে চান না! এমন কী চাইছে আপনাদের কাছ থেকে – ঘন্টা দুয়েক সময় দেবেন... এইটুকুই তো? আর জয়দেব তো গাড়ি চালায়। তেমন কিছু সময়ও লাগবে না হাতটা পাকা হতে
এর ওপর আর কিছু বলা যায় না।

গাড়িতে জয়দেব ড্রাইভার সিটে বাঁ দিকে বসে আছে। এদেশে তো লেফট-হ্যান্ড ড্রাইভ। পাশে ডানদিকে সদা-সতর্ক ড্রাইভিং গুরু কমল সরকার। পিছনের সিটে আমি আর শিবনাথ। বুঝলাম এর মধ্যেই এখানকার ট্র্যাফিক নিয়ম-কানুন অর্থাৎ থিওরেটিকাল ক্লাস নেওয়া হয়ে গেছে। আজকে হচ্ছে জয়দেবকে হাতে-কলমে শিক্ষা।
“প্রথম কাজ কী বলুন তো?”
“সিট বেল্ট লাগানো,” অনুগত ছাত্রের উত্তর।
“ভেরি গুড।”
“কিন্তু বেল্টের বাকলটা লাগাব কোথায়? এখানে একটা আটকাবার জায়গা থাকার কথা ছিল না?”
“ওটা মিসিং, লাগানোর ব্যাপারটা এখন বাদ দিন। এর পর কী চেক করবেন?”
“কিন্তু বেল্ট লাগাইনি দেখতে পেলে পুলিশ তো টিকিট দেবে?”
“ধুত্তোর আপনার পুলিশ! আমি হাত দিয়ে বেল্টটা ধরে রাখব, পুলিশ বুঝতেও পারবে না। নিন, স্টার্ট দিন।”

ইগনিশন চাবি ঘোরাতে গাড়িটা চাপা স্বরে গাওঁ-আঁও-আঁও কয়েকবার করল, কিন্তু স্টার্ট নেবার কোনও লক্ষণ নেই।
“ব্যস ব্যস, বন্ধ করুন নিন, এবার আরেকবার চাবি ঘোরান।”
সেই একই রাজাল্ট।
“শিবনাথ, শঙ্কর - গাড়ি থেকে নেমে এবার অ্যাকশনে নামুন।”
“অ্যাকশন?
“আরে, ঠেলতে হবে না? গাড়ি না চললে গাড়ি চালানো প্র্যাকটিস হবে কি করে?” আমাদের নির্বুদ্ধিতা কমল সরকারকে বিস্মিত করল।
অগত্যা। আমরা নেমে ঠেলতে শুরু করলাম। গাড়ি ফার্স্ট গিয়ারে থাকলেও ক্লাচটা টেপা ছিল, সুতরাং নাড়াতে খুব একটা বেগ পেতে হল না। কমল সরকার জয়দেবকে ইনসট্রাকশন দিয়ে যাচ্ছেন শুনছিলাম। এই অবস্থায় গাড়ি কী করে স্টার্ট দিতে হয় সেই সম্পর্কে। একটু বাদেই ক্লাচটা বোধ হয় ছেড়ে দিল জয়দেব, একটা ঝাঁকুনি খেয়ে গাড়ি স্টার্ট নিয়ে সাঁ করে এগোলো। প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম আমরা দু’জন, কোনও মতে সামলালাম।
“ব্যস,” কমল সরকারের উচ্ছ্বাস শুনতে পেলাম, “এবার ব্রেকে পা দিন” গাড়ি থামতেই আমাদের উদ্দেশে, “দাঁড়িয়ে কেন? উঠে আসুন গাড়িতে।”
“আর কি ওঠার দরকার আছে? গাড়ি তো দিব্বি চলছে?” আমি বললাম।
“আঃ বড্ড ফ্যাঁকড়া তোলেন আপনি, উঠুন?”

সায়েন্স বিল্ডিং-এর পাশ দিয়ে ছোটো রাস্তাটা পার হয়ে ক্যাম্পাসের বড়ো রাস্তায় পড়লাম – গোঁ-গোঁ করতে করতে। আসলে গিয়ার চেঞ্জের ব্যাপারটাকে মোটেই গুরুত্ব দেয় না জয়দেবকমল সরকারের পেড়াপেড়িতে ফার্স্ট থেকে সেকেন্ড হয়ে থার্ড গিয়ারে পৌঁছল বটে, কিন্তু ক্লাচটা এমন ঝট করে ছাড়ল, যে দু-দুবারই প্রচন্ড ঝাঁকুনি। আমাদের তাতে পিলে চমকালেও, কমল সরকারকে মনে হল না তেমন বিচলিত হয়েছেন
শান্ত ভাবে বললেন, “ক্লাচটা আপনাকে আস্তে আস্তে ছাড়তে হবে, ওটাতে তাড়াহুড়ো করলে চলবে না। এবার থার্ড থেকে ফোর্থে যান... ক্লাচ টিপুন, গিয়ার বদলান... এবার আ...স্তে, খুব আ...স্তে ক্লাচটা ছাড়ুন... ফার্স্ট ক্লাস।”

সত্যিই ফার্স্ট ক্লাস। প্রায় ঝাঁকুনি ছাড়াই ফোর্থে গেল। এখন চওড়া রাস্তা। কিন্তু খেয়াল করলাম, জয়দেব রোবটের মতো স্টিয়ারিংটাকে বাঁদিক ডানদিক ঘোরাচ্ছে। ফলে গাড়ি ইতিউতি ধেয়ে এগোচ্ছে।
“এটাই আপনার প্রধান সমস্যা,” কমল সরকার তাঁর মতামত দিলেন, “অযথা স্টিয়ারিং ঘোরাবেন না। গাড়ি যতক্ষণ না নিজের থেকে বেঁকেছে, ততক্ষণ আপনার স্টিয়ারিং থাকবে অনড়-অচল, নো মুভমেন্ট। যদি দেখেন বেঁকেছে, তখন আস্তে করে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে সোজা করে... আবার স্টেডি হয়ে থাকবেন। বুঝলেন?”
“সমঝে,” মাথা ঝাঁকাল জয়দেব।
“দ্যাটস গুড, বাঃ, এই তো বেশ হচ্ছে, চমৎকার।”

শিক্ষার ফল দেখে মুগ্ধ হচ্ছিলাম। সত্যিই এখন সর্পিল গতিতে নয়, বেশ সোজা এগোচ্ছে গাড়িটা। জয়দেবের স্টেডি নজর স্টিয়ারিং হুইলে, কোনও রকম নড়াচড়া যাতে সেখানে না হয়। দেখতে দেখতে এসে গেছি ব্ল্যাকওয়েল স্ট্রিটের মোড়ে। সেখানে জ্বল জ্বল করছে লালবাতি। এদিকে কমল সরকার বলে চলেছেন, “ইজি, বি স্টেডি, একসেলেন্ট…।”
চেঁচিয়ে উঠলাম, “রেড-লাইট।”
আমার চ্যাঁচানিতে জয়দেব এবং কমল সরকার দুজনেই সচকিত, কিন্তু গাড়ি থামল না… সোঁ করে রেড লাইট জাম্প করে বেরিয়ে গেল। ভাগ্যিস পাশের রাস্তা দিয়ে কোনও গাড়ি আসেনি!
“রেড লাইট জাম্প করলেন কিন্তু,” বুকটা তখনও ধুকপুক করছে।
“থামুন তো মশাই, আমি তো দেখছিই চারিদিক,” আমার মাতব্বরিতে বিরক্ত হলেন কমল সরকার
“তা বলে রেড লাইট?”
“সো হোয়াট? আগে তো স্টিয়ারিং কনট্রোল ঠিক হোক, তারপর ওসব ফর্মালিটির কথা আসবে।”
শিবনাথ তখনও ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সিটের পেছনটা খামচে ধরে বসেছিল। সামলে উঠে বলল, “ব্রেকটা চাপা উচিত ছিল, ওটাও তো গাড়ির একটা অঙ্গ।”
“একজ্যাকটলি,” আমি উৎসাহিত হয়ে বললাম, “সময়মতো ব্যবহারের জন্যেই তো ওটা রয়েছে।”
“আপনি ড্রাইভার না আমি?” ভুরু কুঁচকে তেরছা চোখে প্রশ্ন করলেন কমল সরকার।
“হুয়া ক্যা?” জয়দেব পিছন ফিরে আমাদের দিকে তাকাতেই স্টিয়ারিং ঘুরে গোঁত্তা খেয়ে গাড়ি ডানদিকে ছুটল। কমল সরকার চট করে স্টিয়ারিং সোজা করে দিয়ে বললেন, “হুঁশিয়ার, সামনে দেখনা।” তারপর আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, “দেখছেন তো কী ডেঞ্জারাস লোক আপনারা। ফালতু একটা লোকের কনসেনট্রেশন নষ্ট করছেন!”
“সরি,” কমল সরকারের দাবড়ানিতে দুজনেই চুপ করে গেলাম।

খানিক বাদে শিবনাথ বলল, “আচ্ছা হাইওয়েতে চলে গেলে হয় না।”  ঠাট্টা করছে কিনা বুঝতে পারলাম না। “মানে রেড-লাইটের ঝামেলা নেই ওখানে। আচ্ছা সে স্টিয়ারিং প্র্যাকটিস হত।”
“নট এ ব্যাড সাজেশন।” কথাটা মনে ধরল কমল সরকারের। তারপর নিজেই সেটা নাকচ করলেন। “আসলে অনেক অবস্ট্যাক্‌ল-এর মধ্য দিয়ে না গেলে প্রপার ট্রেনিং হবে না। তাছাড়া পরীক্ষাটা তো হবে এইসব রাস্তাতেই।”
“তাহলে বরং ইউনিভার্সিটির পার্কিং লট-এ যাওয়া যাক। সেখানে তো অবস্ট্যাক্‌লের অভাব নেই।” এই প্রস্তাবটা আমি দিলাম
কমল সরকার চোখ দুটো ছোটো করে ঘাড় বেঁকিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন আরও কিছু শোনার অপেক্ষা করছেন।
“লালবাতিও নেই সেখানে,” ভয়ে ভয়ে বললাম, “মানে স্টিয়ারিং প্র্যাকটিসের সুবিধার জন্য বলছি।”
“কেন, এই রাস্তায় আপনার আপত্তি কীসের?” অনেকটা ছর্‌রার মতো বেরোল কথাটা।
“না না আপত্তির আর কী!” আরও গোলমেলে প্রশ্ন থেকে মুক্তি পেতে বললাম।
“তাহলে চুপচাপ বসে থাকুন বকবক না করে।”

কথাটা শেষ হতে না হতেই একটা বিশাল ট্রাক উলটোদিক থেকে গাড়িটার একচুল ফাঁক দিয়ে হুস্‌স্‌ করে বেরিয়ে গেল।
“মাই গড!” শিবনাথ একেবারে আঁতকে উঠল।
“ঘাবড়াও মৎ,” জয়দেব অভয় দিল।
“পার্কিং লট,” আমি চিঁ চিঁ করে বললাম।
“পার্কিং লট,” শিবনাথও তোতা পাখির মতো রিপিট করল।
“ধ্যাত্তেরিকা! ঠিক হ্যায়, পার্কিং লট,” কমল সরকার হাল ছেড়ে দিলেন, “গোঁ ধরেছেন যখন আপনারা।”

পার্কিং লট-এ দু-চক্কর দেবার পর কমল সরকার বলেন, “স্টপ।”
জয়দেব এমন ব্রেক কষল যে আমি আর শিবনাথ হুমড়ি খেয়ে পড়লাম সামনের সিটের ওপর।
“আঃ। অ্যাপ্লাই ইওর ব্রেক স্লোলি, আস্তে আস্তে।”
জয়দেব সাবধানি হয়ে গেল। এর পরের বার ব্রেকে খুব আস্তে চাপ দিতে থাকার ফলে ঝাঁকুনি একেবারেই লাগল না, কিন্তু থামতে থামতে প্রায় পার্কিং লট-এর অপর প্রান্তে পৌঁছে গেলাম।
“আরে না, অত আস্তে না, আরেকটু তাড়াতাড়ি, একটু আস্তে, একটু জোরে ...” এরকম প্রায় বার দশেক চলল। অবশেষে থামাটা কমল সরকারের মনের মতো হল। ততক্ষণে ব্রেকের ধাক্কায় আমার মাথা ঝিমঝিম করছে। শিবনাথের অবস্থাও মনে হল তথৈবচ।
“নিন এবার নেমে পড়ুন গাড়ি থেকে, আপনাদের জায়গা মতো দাঁড় করিয়ে দিই।”
“জায়গা মতো মানে?”
“আঃ! প্যারালাল পার্কিং প্র্যাকটিস করতে হবে না?”
“বুঝলাম, কিন্তু আমরা কী করব?”
“আপনারা গাড়ি সাজবেন।”
“আমাদের গাড়ি সাজার দরকার কী, অজস্র গাড়ি তো পার্কিং লট-এ ছড়িয়ে আছে?” শিবনাথ বলল।
আমি যোগ করলাম, “আরেকটু স্টিয়ারিং প্র্যাকটিস করে আরেকদিন করলে হত না? প্যারালাল পার্কিং-ই তো সবচেয়ে ডিফিকাল্ট শুনেছি।”
“আপনাকে নিয়ে তো মহা বিপদ। গাড়ি চালানোর কী বোঝেন আপনি? নিন, দাঁড়িয়ে পড়ুন। শিবনাথ, আপনি এখানে দাঁড়ান। আপনি হচ্ছেন সামনের গাড়ির লেফট-ব্যাক এন্ড।”
“আমি বেঁটে, আমি বরং পিছনে দাঁড়াই, দেখার সুবিধা হবে তাহলে।” শিক্ষার্থীর সুবিধার কথা কতই না যেন চিন্তা করছে শিবনাথ!
ঘোরতর আপত্তি তুললাম আমি, “আমিও তেমন কিছু লম্বা নই, আমায় দেখতে পেলে তোকেও দেখতে পাবে ও।”  মোট কথা সামনে দাঁড়িয়ে প্রথম চোটেই ধাক্কা খেতে আমি রাজি নই।
“তোকে একটু বেশি দেখতে পাবে,” শিবনাথ জোর করল।
“কতটুকুই বা বেশি দেখবে?”
“অন্তত ইঞ্চি দুয়েক।”
এত সহজে আমি হারতে রাজি নই। অ্যাঙ্গল অফ ভিশনের প্রশ্ন তুলে প্রতিবাদ করতে যাচ্ছি, কমল সরকার থামিয়ে দিলেন।
“থামুন তো মশাই আপনারা! তখন থেকে বাচ্চা ছেলেদের মতো কিচমিচ করছেন। এতই যদি ভয়, তাহলে এলেন কেন এ দেশে?”
আসার বহুবিধ কারণ ছিল – আমার আর শিবনাথ, দুজনেরই। কিন্তু কমল সরকারের মেজাজ দেখে বলার সাহস হল না।
“আপনি দাঁড়াবেন এখানে,” গাড়ির লেংথ হিসেব করে কয়েক পা পেছনে গিয়ে আমাকে দাঁড় করালেন। “আপনি হলেন পিছনের গাড়ির লেফট ফ্রন্ট এন্ড। দাঁড়িয়ে থাকুন। দুজনের কেউই নিজের জায়গা থেকে একদম নড়বেন না।” আমাদের সতর্ক করে জয়দেবকে বললেন, “এই যে দু’জনকে ভালো করে দেখে নিন। ফুটপাথ থেকে এঁদের প্রায় ছ’ফুট দূরে দাঁড় করিয়েছি। ফুটপাথ আর এঁদের দুজনের মধ্যে যে রেকট্যাঙ্গল সেখানে আপনার গাড়িকে দাঁড় করাতে হবে। আন্ডারস্ট্যান্ড?
জয়দেব ঘাড় কাত করল।
“আপনি সোজা শঙ্করের গা ঘেঁষে...”
“খুব কাছে ঘেঁষার দরকার নেই,” আমি চট করে জানিয়ে দিলাম।
কটমট করে আমার দিকে একবার তাকিয়ে কমল সরকার বলে চললেন, “আপনি শঙ্করের গা ঘেঁষে এগিয়ে শিবনাথের গা ঘেঁষে দাঁড়াবেনএমন ভাবে দাঁড়াবে্ন যাতে আপনার গাড়ির পিছনের ডানদিকের চাকা শিবনাথের ঠিক পাশেই থাকে। ও-কে?
“ইয়াপ।”
“এবার ব্যাক গিয়ার দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি ডানদিকে কাটাবেনসামনের ডানদিকের চাকা শিবনাথের পাশে এলেই স্টিয়ারিং পুরোপুরি বাঁদিকে ঘুরিয়ে দেবেনব্যস, ইউ উইল বি অল সেট। বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা?”
কমল সরকারের ইনসট্রাকশনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জয়দেব শূন্যে হাত ঘোরাচ্ছিল। সেটা দেখে কমল সরকার সন্তুষ্ট হলেন। বোধহয় বুঝেছে।
“আপনারা আপনাদের পজিশন থেকে নড়বেন না কিন্তু।”
“নড়ব না,” শিবনাথ বলল।
আমার দিকে তাকালেন কমল সরকার। আমিও আপত্তি জানালাম না।

জয়দেবকে নিয়ে গাড়িতে উঠলেন কমল সরকার। পার্কিং লট-এ আরেকবার চক্কর দিয়ে জয়দেব আমাদের দিকে গোঁ গোঁ করে এগোতে শুরু করল। কোথায় আমাদের পাশ দিয়ে আসা, দেখি সোজা আমাদের দিকে এগোচ্ছে। আমি প্রথমে গুটি গুটি, তারপর দ্রুত গতিতে ফুটপাথের দিকে সরতে শুরু করলাম। আমি যত সরি, জয়দেবও আমাকে তাক করে এগোতে থাকে। শেষমেশ ফুটপাথের একেবারে পাশে এসে ক্যাঁচ করে ব্রেক কষল।
আমি ততক্ষণে ফুটপাথে উঠে পড়েছি।
গাড়ি থেকে নেমে কমল সরকার ফেটে পড়লেন।
“বলি এটা হচ্ছে কি, পার্কিং-এর রেকট্যাঙ্গলকে তো একবারে ত্রিভুজ বানিয়ে ফেললেন!! কোথায় দাঁড়ানোর কথা ছিল আপনার?”
“ওইখানে,” আঙুল দিয়ে দেখালাম। “আসলে গাড়িটা আমার দিকে যে ভাবে ধেয়ে আসছিল…”
“আপনার দিকে না এসে কি উলটোদিকে যাবে? আপনিই তো পার্ক করা গাড়ি!”
“তা জানি, মনে হচ্ছিল ধাক্কা লেগে যেতে পারে, নতুন শিখছে তো।”
“লাগলেই হল? গাড়িতে আমি রয়েছি কী করতে? আমার ওপর বিশ্বাস নেই, তাই তো?”
“না না, আছে।”
“তাহলে?”
জয় গুরু! আমি কথা দিলাম, এরপর আর নট নড়ন-চড়ন – যা হবার তাই হবে।।
“দ্যাটস গুড, সাহস রাখুন বুকে, নইলে ভেতো বাঙালির দুর্নাম ঘুচবে কী করে!” সেন্টিমেন্টে সুড়সুড়ি দিলেন কমল সরকার।

আমি সোজা নিজের জায়গায় গিয়ে চোখ বুজে ফেললাম। আর দেখাদেখির মধ্যে নেই, দেখলেই কুচিন্তা মাথায় আসে। আমার সব ভাবনা চিন্তা মায় প্রাণটি কমল সরকারের হাতে ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। হুউস করে হাওয়া লাগিয়ে আমার পাশ দিয়ে গাড়ি চলে গিয়ে ক্যাঁচ করে থামল। তারপরেই ব্যাক গিয়ার দেবার একটা আওয়াজ পেলাম। গোঁওওও … তার মানে গাড়ি ব্যাক করছে। ব্রেক চাপার একটা আওয়াজ, কিন্তু তার আগেই হাঁটুতে একটা প্রচণ্ড ধাক্কা। বিশ্বটা এক নিমেষে তালগোল পাকিয়ে গেল। হঠাৎ ভেসে উঠল নীল আকাশ, চিত হয়ে পার্কিং লট-এ আমি ভূপতিত। আর কী অসহ্য যন্ত্রণা!

হাসপাতালে কমল সরকার এসেছিলেন। ভাগ্যক্রমে হাঁটুর ওপর দিয়েই ধাক্কাটা গেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটা চলা করতে পারব। কমল সরকার খবরটা জেনে খুশি হলেন যাক, বাড়াবাড়ি কিছু হয়নি।
“আপনি যে এত লেদরুশ মশাই, সেটা জানলে কখনোই দাঁড়াতে বলতুম না। চোখ-কান তো একটু খোলা রাখবেন – একটা নভিস ড্রাইভার ব্যাক গিয়ার দিচ্ছে!”
_____

5 comments: