গল্পের ম্যাজিক:: অপরাধী - অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

 

অপরাধী
অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

অফিসের কাজে আমাকে মাঝে মধ্যেই ইংল্যান্ড থেকে ফ্রান্সে যেতে হয়। ইউরো রেলে যাই। আড়াই ঘণ্টার মধ্যেই সমুদ্র পেরিয়ে প্যারিস।
অন্যদিনের মতোই সেন্ট প্যানক্রাস স্টেশন থেকে প্যারিস যাচ্ছিলাম। সাধারণত ঘড়ি ধরে ঠিক সময়ে ট্রেন ছাড়েকিন্তু আজ সিগন্যালের কিছু গণ্ডগোলের কারণে ট্রেন ছাড়তে প্রায় এক ঘণ্টা দেরি হল। এমনিতেই দিনের শেষ ট্রেন। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে সহজ হিসেবটা সারলাম। প্যারিস পৌঁছোতে পৌঁছোতে রাত বারোটা বেজে যাবে। তারপরে উবের নিয়ে হোটেল পৌঁছোতে পৌঁছোতে আরও এক ঘণ্টা। প্যারিসের রাস্তাঘাট অত রাতে আজকাল খুব একটা নিরাপদও নয়। স্টেশন থেকে বেরোলেই যা পরিবেশ, ফোন, মানিব্যাগ দুটোর সম্বন্ধে বিশেষ সজাগ থাকতে হয়
এসব ভাবছি আর ট্রেন কখন ছাড়বে তার জন্য অধীরভাবে অপেক্ষা করছি, এর মধ্যে একটা মাঝবয়েসি লোক আমার উলটো দিকে বসল। দেখলাম টিকিটের সঙ্গে সিটের নাম্বার তিন-তিনবার মিলিয়ে তারপর বসল।
টাকমাথা মুখটা গোলমতো চোখের নিচটা একটু বসা। হয়তো সেভাবে লক্ষ করতাম না। কিন্তু লোকটার দৃষ্টির মধ্যে কী যেন একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার আছে! কোনও কারণে খুব টেনশনে আছে কী? তা না হলে বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে আশপাশ দেখার চেষ্টা করবে কেন? কারুর কি আসার কথা আছে সঙ্গে? যে রকম লটবহর নিয়ে ট্রেনে উঠেছে, সেটা এখানে খুব স্বাভাবিক নয়দুটো বড়ো সুটকেস। আর একটা মাঝারি সাইজের ব্যাগ।
এতক্ষণের পথ। ফাঁকা ট্রেন। একটুও কথা না বলে এতক্ষণ যাওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। আলাপ জমানোর চেষ্টা করলাম।
“আপনি কি ফ্রান্সে থাকেন?
“না।”
“তাহলে ইংল্যান্ডে?
“হ্যাঁ।”
“একা যাচ্ছেন?”
“হ্যাঁ।”
“আগে গেছেন প্যারিস?”
“হ্যাঁ।”
সাধারণত এতগুলো প্রশ্ন করার পর ওর আমার সম্বন্ধে খোঁজ নেওয়া স্বাভাবিক কিন্তু লোকটা দেখি সেরকম কোনও আগ্রহ না দেখিয়ে আবার এপাশ ওপাশ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল নাহ, এর সঙ্গে কথা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।
আমাকে যারা চেনে, তারা জানে আমি একটু কথা বলতে বেশি পছন্দ করি। একটু আড্ডা মারতে ভালোবাসি। কিন্তু এরকম সহযাত্রীর সঙ্গে কথা চালিয়ে যাওয়া আমার পক্ষেও অসম্ভব।
এর মধ্যেই ট্রেন চলতে শুরু করেছে। প্ল্যাটফর্ম পিছনে ফেলে বেরিয়ে এসেছে।
বাধ্য হয়ে আমি আমার ফোনটায় আবার চোখ নিবদ্ধ করলাম। আমাদের দু’জনের মধ্যে একটা বসার টেবিল। দু’দিকে দুটো করে চেয়ার। কিন্তু অনেক রাতের ট্রেন বলে আমাদের পাশে কেউ বসে নেই।
এখন শীত পড়ে গেছে। সূর্য বিকেল সাড়ে চারটেতে উধাও হয়েছে। কালো চাদরে গা ঢেকে ঘুমোচ্ছে বাইরের পরিচয়হীন ভূখণ্ড শুধু এটুকু বুঝতে পারছি এখনও টানেল আসেনি। ইংল্যান্ডেই আছি।
লোকটা খুব গভীরভাবে কী যেন ভাবছে। একবার দাঁড়িয়ে উঠে উপর থেকে ব্যাগটা নামাল টেবিলের উপরে রেখে খুলে কী যেন দেখল। চোখে পড়ল ব্যাগভর্তি বাচ্চাদের খেলার জিনিসকয়েকটা খেলার পাজল বার করে খানিকক্ষণ দেখে আবার যত্ন করে ঢুকিয়ে রাখল
ব্যাগটা আবার উপরে তুলে রেখে চুপ করে বসে রইল খানিক বাদে একটা বই হাতে নিয়ে বসে রইল কিন্তু বার বার যে ভাবে অন্যমনস্ক হয়ে বইয়ের থেকে চোখ সরিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে বসছিল, বুঝলাম অন্য কিছু ভাবছে দু’বার দেখলাম সিট ছেড়ে উঠে গেল, অন্য কামরা থেকে ঘুরে এল। তৃতীয়বার উঠে প্যান্ট্রি থেকে দুটো বিয়ার নিয়ে এল। এত অস্থিরতার কারণ কী বুঝতে পারছিলাম না
ট্রেন ইতিমধ্যে ইংলিশ চ্যানেলের সমুদ্রের তলার টানেলে ঢুকে পড়েছেবাইরের অন্ধকার তাই আরও গভীর হয়েছে।
আমি ইতিমধ্যে আজকের ‘ডেলি মিরর’ কাগজটা পড়তে শুরু করেছি। হঠাৎ একটা পাতায় এসে আটকে গেলাম। একটা বিশেষ খবরে একটা লোকের ছবি আর সেই লোকটার ছবি আমার সামনের লোকটার সঙ্গে একদম মিলে যায় লোকটার নাম তাহলে জন ইভান্স।
খবরটা টিভিতে শুনেছিলাম। যদিও বিশদভাবে জানা ছিল না। বেশ বিস্তারিতভাবে খবরটা বেরিয়েছে। পড়ে যা বুঝলাম জন স্কুলের টিচার ছিল। ঘটনাটা ২০১০ সালের। সুইনডন শহরের একটা ক্লাবে হয়েছিল। ক্লাব থেকে গাড়ি নিয়ে বেরোনোর সময় খেয়াল না করে একটা বছর আটেকের বাচ্চাকে চাপা দেয় জন। অন্তত সেরকমই অভিযোগ করেছিল বাচ্চার মা, বাচ্চাটার মৃত্যুর প্রায় এক বছর পরে। এরপর যা হয় আর কি! দীর্ঘ বিচার। কয়েকমাস আগে এত বছর বাদে বিচার শেষ হয়েছেজনকে সম্পূর্ণ নিরপরাধ বলে আদালতে জানানো হয়েছে।
এতটা হলে খবরটা হয়তো ‘ডেলি মিরর’-এ বেরোত না। এর পরেই বলা যায় আসল ঘটনা শুরু। আদালতের রায় বেরোনোর কয়েকদিন বাদে জন নিজেই সে রায়কে চ্যালেঞ্জ জানায়। জানায় যে তার এখন ধারণা যে তার গাড়ির ধাক্কাতেই বাচ্চাটার মৃত্যু হয়েছে।
কিন্তু বিচারক জনের আপিল খারিজ করে দিয়েছে। জনের সঙ্গে বাচ্চার মৃত্যুর কোনও রকম যোগাযোগ আছে এরকম কোনও প্রমাণ দীর্ঘ বিচারের সময়ে সামনে আসেনি। জনও অপরাধী হিসেবে নতুন কোনও সরাসরি প্রমাণ আনতে পারেনি।
এখানে প্রশ্ন উঠেছে, এভাবে যেখানে অভিযুক্তের নিজের ধারণা যে সেই অপরাধী, সেখানে আইন কীভাবে তাকে নিরপরাধ বলতে পারে
জনের উকিলের মতো অনেকের ধারণা এই সাংঘাতিক দুঃখজনক ঘটনায় এতদিন অভিযুক্ত থাকার জন্য শেষে জন আর মানসিক চাপ নিতে পারেনি। তার ধারণা হয়েছে যে সে সত্যিই এর সঙ্গে যুক্ত। সে তার অপরাধ কল্পনা করতে শুরু করেছে। এ অপরাধস্বীকার সেই আরোপিত ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে।
জনের ব্যক্তিগত জীবনের কোনও উল্লেখ নেই খবরটাতে।
তাহলে ব্যাগভর্তি ওই খেলনাগুলো কি ওর নিজের ছেলের জন্য! জিজ্ঞেস করে উঠলাম, “আপনার ছেলে কি আপনার সঙ্গেই যাচ্ছে?”
লোকটা চমকে উঠল।
“কোন? কোন ছেলের কথা বলছেন?” দু’পাশের দিকে আর পিছনের দিকে তাকাল লোকটা চমকে উঠে।
ফের বলে উঠল, “কেন, কাউকে দেখলেন?”
“না, না। আপনার সঙ্গে অনেক বাচ্চা ছেলের খেলনা – পাজল ইত্যাদি দেখলাম। তাই জিজ্ঞেস করলাম।”
লোকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
আবার খানিকক্ষণের জন্য চুপ।
লোকটা খানিক বাদে বিড়বিড় করে বলে উঠল, “ওরা কেউ আমার কথা শুনল না।”
“কী কথা?”
“ওই যে আমিই খুন করেছি। চাপা দিয়েছিলাম বাচ্চাটাকে। ওরা কেউ আমাকে বিশ্বাস করল না।”
বুঝতে পারলাম লোকটা কী বিষয় নিয়ে বলছে। কিন্তু আমি যে সে বিষয় কিছুটা জানি তা উল্লেখ না করে জিজ্ঞেস করে উঠলাম, “কী হয়েছিল?”
লোকটা চুপ করে রইল। ভাবলাম কিছু বলবে না।
কিন্তু মিনিট দুয়েক বাদে লোকটা বলে উঠল, “সেদিন আমার বেশ কয়েকটা দরকারি কাজ ছিল। অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। ক্লান্ত ছিলাম। কিন্তু বুঝিনি যে সামান্য ব্যস্ততার জন্য এত বড়ো একটা অপরাধ করে বসব। আমি ক্লাব থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে আসছিলাম। গাড়ির সাইড মিরর, রিয়ার ভিউ মিরর ভালো করে না দেখেই গাড়ি বার করতে গিয়ে মনে হল, কীসে যেন ধাক্কা লাগল। অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। আলোও কম ছিল ওই জায়গাটায়। তাই দেখতেও পাইনি।”
“কোনও শব্দ শুনেছিলেন?”
“না। শুধু মনে হয়েছিল একটা কিছুতে যেন ধাক্কা মারলাম। আসলে গাড়িতে হিটার চলছিল বলে হয়তো শুনতে পাইনি। বুঝতে পারিনি যে বাচ্চা ছেলেটা আমার গাড়ির চাকায় চাপা পড়েছে। ক্লাব থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। দু’দিন বাদে কাগজে প্রথম দেখলাম। ওই ক্লাবে গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে একটা বাচ্চা ছেলের ব্রেন ড্যামেজ হয়েছে। কিন্তু তখনও বুঝিনি যে ওটা আমার গাড়িতেই হয়েছে। আমিই এর জন্য দায়ী।”
লোকটা হাত দিয়ে মুখ আড়াল করে খানিকক্ষণ বসে রইল।
“কিন্তু পুলিস আপনাকে যখন প্রথম জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল, আপনি তো তখন স্বীকার করেননি। তাই না?”
“খুব ভুল করেছিলাম। আসলে প্রথমে মনে হয়েছিল কেন শুধু শুধু একটা সামান্য সন্দেহের বশে অপরাধ স্বীকার করব! এরকম অপরাধে কী ধরণের শাস্তি হতে পারে তা তো জানেনইআপনিই বলুন, আপনি নিজে কি করতেন?”
“জানি না। এরকম পরিস্থিতিতে তো কোনোদিন পড়তে হয়নি। আমার ভাগ্য ভালো।”
“সত্যিই তাই। কিন্তু আমার ভাগ্য অত ভালো ছিল না।”
“শুনেছি ছেলেটা গাড়ি চাপা পড়ার দেড় মাস পরে মারা গিয়েছিল।”
“প্লিজ, ওটা আমাকে আর মনে করাবেন না।”
লোকটা আবার জানালার দিকে তাকিয়ে খানিকক্ষণ কোনও কথা না বলে বসে রইল। দেখলাম লোকটার বাঁ হাতের আঙুলগুলো যেন উত্তেজনায় কাঁপছে।
আমি আবার নীরবতা কাটিয়ে প্রশ্ন করে উঠলাম, “আচ্ছা, ওই সময়ে তো শুধু আপনি একা ক্লাব থেকে বেরোননি! আরও অনেকে বেরিয়েছিল। আপনি কি করে শিওর হলেন যে আপনার গাড়িতেই ছেলেটা চাপা পড়েছে? এমনও তো হতে পারে যে আপনার কোনও ভূমিকা ছিল না।”
লোকটা চুপ করে রইল।
আশ্বস্ত করলাম, “এখন ফরেনসিক্স যেরকম এগিয়েছে, তাতে টায়ারের ছাপ, ঘটনার সময়, সি সি টিভি ক্যামেরার ছবি এসব দেখে তদন্তে ঠিক বোঝা যেত, তাই না? তার উপরে নির্ভর করেই জুরিরা নিশ্চিত হয়েছেন যে আপনি অপরাধী নন। আপনি ওদের সিদ্ধান্তই ঠিক মেনে নিন।”
“কতবার বলব, জানি যে আমি ছেলেটাকে মেরে ফেলেছি। আমার কাছে তার প্রমাণ আছে। আপনার এ সহজ কথাটা মাথায় ঢুকছে না!” লোকটা চিৎকার করে উঠল। দূরে কামরার অন্য প্রান্তে একজন বসেছিল, সেও দেখি আমাদের দিকে তাকাচ্ছে।
তারপরে লোকটা আবার আস্তে আস্তে বলে উঠল, “সরি। আমার আসলে মাথার ঠিক নেই। ঘটনার একমাস পরে ঝামেলার ভয়ে সব টায়ার চেঞ্জ করে নিয়েছিলাম। একটা সময় আমি মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ করতে।”
“শুধু আপনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন এমন তো নয়আপনি যে নিরপরাধ সেটা তো আইন আদালত মেনে নিয়েছে। তা কী প্রমাণের কথা যেন বলছিলেন!”
লোকটা প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে বলে উঠল, “জানেন। ছেলেটার ক্রিমেশন-এর সময়ে আমি ওখানে গিয়েছিলাম। দূর থেকে দেখেছিলাম। দেখেছিলাম ওর মা আর বাবা কীরকম অসহায়ভাবে কাঁদছিল। আমিও না কেঁদে পারিনি। সেদিন থেকেই নিজেকে অপরাধী বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু কেন জানি না তখনও স্বীকার করিনি। যখন স্বীকার করলাম, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
“আমি কিন্তু এখনও আমার প্রশ্নের উত্তর পেলাম না। আপনি কী করে শিওর হলেন যে আপনিই অপরাধী?”
লোকটা একটু দোনামনা করে বলে উঠল, “এটা চার মাস আগের কথা। তখন আদালতের রায় বেরিয়ে গেছে। প্রমাণিত যে আমি নিরপরাধ। আমি একাই সুইনডনে থাকি। আমার বাড়িটা দোতলা। সেদিন রাতে কয়েকজন বন্ধু এসেছিল আমার বাড়িআমাকে অভিনন্দন জানাতে। আমিও দারুণ আনন্দে ছিলাম। এত দিনের টেনশনের থেকে মুক্তি। আনন্দে বেশ ভালো মতোই ড্রিঙ্ক করে ফেলেছিলাম। রাত একটার সময় নিচের ড্রয়িং রুম থেকে উপরে শুতে যাচ্ছিলাম।
“সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠার সময় হঠাৎ মনে হল আমার পিছন পিছন কে যেন আসছে। স্পষ্ট আওয়াজ, বুঝলেন! একটা ছোটো ছেলের হালকা পা ফেলার শব্দ। ঠিক যেন আমার পিছু পিছু আসছে। মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম কেউ নেই। আওয়াজ থেমে গেছে। আবার যেই উঠতে শুরু করেছি, আবার সেই পিছনে হাঁটার শব্দ।”
“সে কী? হয়তো আপনার মনের ভুল।”
“মোটেও না। তারপর থেকে প্রতি সন্ধেবেলায় ছেলেটা আমার বাড়িতে এসেছে। প্রতিদিন সিঁড়িতে আমার পিছু নিয়েছে। মাঝে মধ্যে মনে হয়েছে আমাকে ধাক্কা দিয়ে হয়তো মেরে ফেলতে চায়। কোনোদিন রাতে আমার টেবিলে বসে বই পড়ছি, হঠাৎ মনে হয়েছে সামনে দিয়ে যেন একটা ছায়া চলে গিয়েছেরাতে খেতে বসেছি, হঠাৎ মনে হয়েছে কে যেন ঘাড়ের কাছে নিশ্বাস ফেলছেদরজা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেছে।”
“তারপরে? তারপরে আপনি বাচ্চাটার জন্য নিয়মিত খেলনা কিনতে শুরু করে দিলেন যাতে বাচ্চাটা আপনার কোনও ক্ষতি না করে। তাই তো?”
“ঠিক। কী করে বুঝলেন? আসলে আমার মনে হয়েছিল। ওকে যখন এড়াতে পারছি না, ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব করা দরকার।”
“পেরেছিলেন? কোনোদিন দেখেছেন ছেলেটাকে?”
“না, পারিনি। ছেলেটা বোধ হয় এখনও আমাকে ঘৃণা করে। জানেন। তাই কোনোদিন দেখতেও পাইনি কিন্তু আমি যেন সত্যি ওকে ভালোবাসতে শুরু করেছি। ওকে বুঝতে পেরেছি। ওদের বাড়ি থেকে ওর সব ব্যবহার করা জিনিসপত্র বিক্রি করে দিয়েছিল। আমি অনেক কষ্ট করে পুরোনো দোকান ঘুরে ঘুরে তার কিছু জোগাড়ও করেছি। এমনকি ওর পুরোনো জামাপ্যান্টও কিছু পেয়েছি। আমার ব্যাগেই, আমার সঙ্গেই আছে। কিন্তু আমাকে এখনও ছেলেটা ক্ষমা করেনি। শেষ চেষ্টাও করেছিলাম। এমনকি আমার নিজের অপরাধও স্বীকার করলাম। কিন্তু কেউ আমার কথা বিশ্বাস করল না। সবাই ভাবল আমি এই দীর্ঘ বিচারে মানসিক সুস্থতা হারিয়েছি।”
“তাই দেশ ছেড়ে অন্য দেশে!”
লোকটা কোনও কথা বলল না। মুখ ঢেকে বসে রইল।
আশ্বস্ত করলাম, “হয়তো পুরোটাই মনের ভুলও ঘটনাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করুন। পাস্ট ইজ পাস্ট।”
“সেটাই তো চেষ্টা করছি। কিন্তু ভুলছি কই? সবসময় ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে। অথচ সামনে আসছে না। এখনও আমাকে বিশ্বাস করছে না। ওকে আমি বলতে চাই, আমি জেনে এই অপরাধ করিনি। আমি বাচ্চাটার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে গাড়ির স্টিয়ারিং–এও হাত দিইনি। গাড়ি চালাতেই ভয় পাই।”
এসব কথার মধ্যে একটা অ্যানাউন্সমেন্ট হল। আর কয়েক মিনিটের মধ্যে আমরা প্যারিস পৌঁছব

লোকটার সঙ্গে আর কোনও কথা হয়নি। যেন ফের অন্য কোনও জগতে হারিয়ে গিয়েছিল।
খানিক বাদে ট্রেনটা যখন প্যারিসে পৌঁছল, দেখি লোকটা আমার আগে আগে জিনিসপত্র নিয়ে তড়িঘড়ি করে নামছে। ট্রেন থেকে নেমে জোর পায়ে হাঁটতে শুরু করে দিল। আমার বিশেষ তাড়া ছিল না। উবের ডেকেছি। আসতে মিনিট পনেরো লাগবে। বাইরে না বেরিয়ে স্টেশনের ভেতরেই অপেক্ষা করব। তাই ধীরেসুস্থে হাঁটছিলাম। লোকটার থেকে একটু পিছিয়ে পড়েছিলাম।
কিন্তু হঠাৎ সামনের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। প্ল্যাটফর্মে আলো কম। ট্রেনে যাত্রী খুব কম ছিল তাই দূর থেকে দেখা যাচ্ছে। আমার কিছুটা আগে লোকটা হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে। আর ওর ঠিক পিছনে একটা বছর আটেকের বাচ্চা। ওর পিছু পিছু যাচ্ছে। কোত্থেকে এল বাচ্চাটা? আগে তো একে দেখিনি ট্রেনে! অন্য কোনও কামরা থেকে নামল কি?
আমার মনের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলাম মুহূর্তের মধ্যে। বাচ্চাটা মাথা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়েছে। মুখে কোনও অভিব্যক্তি নেই। তার পরে আবার জনের পিছু নিয়েছে।
‘ডেলি মিরর’-এ ওই ছেলেটারও ছবি ছিল।
_____

5 comments:

  1. দারুণ লাগল।

    ReplyDelete
  2. দারুন গল্প।। ভাল লাগল।।

    ReplyDelete
  3. শেষ অনুচ্ছেদটাই গল্পটাকে মনের ভ্রম থেকে অন্য স্তরে পৌঁছে দিল।

    ReplyDelete
  4. ostad er mar diecho to dada,ga e kata diye uthlo..

    prosenjit

    ReplyDelete
  5. রাতে পড়ে ফেললাম, এবার ভয় করছে।
    খুব ভালো চমক

    ReplyDelete