গল্পের ম্যাজিক:: বার বার তিনবার - যশোধরা রায়চৌধুরী


বার বার তিনবার
যশোধরা রায়চৌধুরী

মরক্কো নামে একটা দেশ আছে, আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিম কোণ বরাবর। দেশটা খুব পয়া। একদিকে অতলান্ত সাগর, অন্যদিকে ভূমধ্যসাগর। মারাকেশ শহরেই তো পাবে সেই বিখ্যাত বাজার, তাঁবু-তেরপলে ঢাকা দোকানে একই সঙ্গে কেনাবেচা আর তামাক ফুঁকতে ফুঁকতে আড্ডা চলে যেখানে। কথকঠাকুরেরা যেখানে বুনে চলেছেন মরক্কোর সাতরঙ কার্পেটের মতোই, গল্পের রামধনু।
আর নামডাকের ব্যাপারে, সমুদ্রতীরের বন্দরশহরগুলোর তো কথাই নেই গরম, খরখরে, একই সঙ্গে রসালো। অনেকটা খেজুরের মতন। দুনিয়ার সবচেয়ে চালাকচতুর মানুষে ভরা। সেই দলেই ছিল এক ব্যবসায়ী। নাম তার মিসির আলি বেন শেখমরক্কোর সর্বত্র মিসিরের খুব নামডাক। কারণ, এই একটিই সওদাগর আছে সে দেশে, যে ছোটোবেলায় ছিল বেজায় গরিব আর একদম নিরক্ষর। কিন্তু নিজের কবজির জোরে এখন সে এক অক্ষর না শিখেও পন্ডিত, তার হাতে পড়লে ধুলোও সোনা হয়। অনেক খাটুনি খেটে একখানা আলকাতরা মাখানো ছোট্ট নৌকো হয়েছিল তার। অল্পবয়সে ছোট্ট পুঁজি নিয়ে ব্যাবসা শুরু, সাধ্যমতো মালপত্র কিনে বন্দরে বন্দরে ঘুরে ব্যাবসা করে, জিনিস বেচে সে পেয়ে গেল তার চেয়ে অনেক বেশি দাম। লোককে কথায় চিঁড়ে ভেজাতে ওস্তাদ সে তাই বিক্রিবাটা হতে লাগল, আর বাড়তেই লাগল ব্যাবসা।
সেই এক নৌকো থেকে আজ দুটো-তিনটে-চারটে-পাঁচটা অবধি বাঘা বাঘা জাহাজ হয়েছে মিসিরেরসে সব জাহাজ মরক্কোর সেরা কার্পেট, তামার পরাত, বারকোশ, হাঁড়িকড়াই আর অঢেল মশলার পরা নিয়ে দেশে দেশে পাড়ি দেয়যায় সাগরপাড়ের দেশগুলোয়, পর্তুগালে, গ্রিস বা সাইপ্রাসেফরাসিদেশে, ইতালিতে, তুর্কিদেশে। প্রচুর সোনাদানা রোজগার করে এনে আবার মিসির আলি আর পণ্য কেনে, আবার জাহাজে পাড়ি দেয়।
আসলে মিসিরের মতো ক্ষুরধার বুদ্ধির লোক খুব কমই আছে মরক্কোতে। এদের মতো লোককেই বলে বিচক্ষণযাকে বলে খদ্দেরকে এক হাটে কিনে আরেক হাটে বেচতে পারা। সেটাই পারে সে। ঘটে তার যতটা বুদ্ধি ধরে, তাতে একটা বোকা লোকের আধখানা কিনে ফেলাই যায়।
এ হেন মিসিরের ছিল একটাই ছেলে। শাফিক। শাফিক একটু একটু করে বড়ো হচ্ছিল। মিসির নিজে তো পাঠশালার দোর মাড়ায়নি; সেই দুঃখ ভুলতেই সে শাফিককে পাঠিয়ে দিয়েছিল বড়ো বড়ো ওস্তাদ আর পন্ডিতের কাছেদুনিয়ার সবরকমের বিষয় পড়তে যায় সে, আর রোজ আর আর বিদ্যায় দিগগজ হয়ে ফিরে আসে।
কিন্তু তার যখন কুড়ি বছর বয়স হল, তখন মিসিরের মনে নানা চিন্তা এসে জড়ো হলমিসির ভাবলেন, এই ছেলে কি পারবে আমার মতো বুদ্ধি করে ব্যাবসাদারি করতে? ছেলেকে বললেন, শাফিক, তোমাকে যে এবার বাণিজ্যে যেতে হবে বাছা পারবে তো, দুঃখী বাবার চেয়েও বড়ো ব্যবসায়ী হতে?
শাফিক সরলমনে হেসে বলল, হ্যাঁ বাবা, বিশ্বাস কর, আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করব। তবে সওদাগর হিসেবে তোমার যে নামডাক, তার চেয়ে বেশি আমি কি আর পারব?
বাবা খুশি হয়ে বললেন, কিন্তু তোমাকে তো শিখতে হবে। তুমি চাঁদ-তারার হিসেব শিখেছ, তুমি দেশবিদেশ সম্বন্ধে শিখেছ, আমাদের পূর্বপুরুষেরা বইতে যা যা লিখেছে, সেগুলো সব তোমার মাথায় ভর্তি। কিন্তু ব্যাবসা চালানো তো আর কেতাব পড়া নয়, ওটা আলাদা করে শিখতে হয়। মরুভূমির দেশের লোকেদের জল বিক্রি করতে, কিম্বা রাঁধুনিকে নুন বিক্রি করতেও ব্যবসায়িক বুদ্ধি লাগে। তুমি কি তা পারবে? শুরুর থেকে তো শুরু করতে হবে, বাবা। আমি তোমাকে এক জাহাজ জিনি সাজিয়ে দিচ্ছি, তুমি সেই জাহাজ নিয়ে যাও, নানা দেশে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করে ফিরে এসে আমাকে দেখিও কেমন পেরেছ সওদা করতে।

এক জাহাজ ভালো ভালোরা নিয়ে তো রওনা হল ছেলে। শাফিকের মনে অনেক আশা, সে বড়ো ব্যবসায়ী হবে। কিন্তু এই প্রথম বিদেশযাত্রা তার, অনেক বিস্ময়। নানা দেশ দেখবে, নানারকম জিনি দেখতে পাবে, যা এতদিন শুধু বইতে পড়েছেপথে যা দেখে তাতেই সে বিস্মিত হয়। সেইসব আশ্চর্য পাখি, মাছ, গাছ, ফুল, ফল দেখতে দেখতে, আর সমুদ্রের নানা রূপ দেখে দেখে আশ মেটে না তার।
কিছুদিন ধরে সমুদ্রে এইসব দেখতে দেখতেই কেটে গেল। তারপর একদিন দেখল উলটোদিক থেকে আসছে এক জাহাজ। কৌতূহলী শাফিক নিজের মাল্লাদের বলে, ওই অচেনা নাওয়ের কাছে ওর জাহাজকে নিয়ে যেতে। কাছাকাছি আসতে না আসতেই সেই নাওয়ের ভেতর থেকে ভেসে আসে মানুষের কান্নার শব্দ, কষ্টের গোঙানির শব্দ। সেই শব্দ শুনেই অবাক হয় শাফিক একই সঙ্গে তার মন দুঃখে ভরে ওঠে। সে তার মাল্লাদের বলে, ইশারা করে অন্য জাহাজকে কাছে আসতে বলতে। অন্য জাহাজ কাছাকাছি এলে সেই জাহাজের কাপ্তানকে শাফিক জিগ্যেস করে, ও কাদের কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে?
কাপ্তান বলে, ও কিছু না এই জাহাজের যাত্রীদের গলার আওয়াজ।
কিন্তু ওরা কাঁদছে কেন?
হাতে পায়ে শেকল বাঁধা কিনা। বিক্কিরির জন্য যাচ্ছে তো।
সে কী! বিক্রির জন্য! মানুষকে বিক্রি?”
দাস হিসেবে বিক্রি হবে এরা। দেখবেন নাকি? কেনার ইচ্ছে আছে?
কৌতূহলী শাফিক অন্য জাহাজে যায় গিয়ে দেখে শেকলে বাঁধা অনেক লোক, অনেক মহিলা ছেলেমেয়েও আছে। তাদের দেখে তার মন কেঁদে উঠল। সে বলল, এদের বিক্রি করে দিন আমার কাছে।
চালাক দাসব্যবসায়ী চোখ নাচিয়ে বলল, টাকা আছে তো, এত দাস কিনে নেবার?
শাফিক সরল বিশ্বাসে বলল, টাকা, তা, এই এত এত পণ্যভরা জাহাজ যে আছে। এতে হয়ে যাবে না?
লোকটা দারুণ ধূর্ত খুব খুশি হল মুখে তা প্রকাশ না করে দুটো জাহাজ বদলাবদলি করে নিল। শাফিকও খুব খুশি। জাহাজসুদ্ধু সব পণ্য ওই দুষ্টু দাসব্যবসায়ীকে দিয়ে অন্তত এতগুলো লোকের মুক্তি তো ও কিনতে পেরেছে! প্রথমেই সবার শেকল খুলে দেবার জন্য বলে দিয়ে তারপর জনে জনে নামধাম জেনে নিয়ে কাপ্তেনকে বলল, চলো অমুক দেশ। সেখান থেকে আর এক দেশ। তারপর আর এক।
এক জাহাজ দাসকে তাদের নিজের নিজের দেশে নামিয়ে যতদিনে ফিরে এল শাফিক, ততদিনে জাহাজে শুধু দুজন দাস রয়ে গেছে। একজন একটি ফুটফুটে সুন্দর মেয়ে, বয়স বড়জোর আঠারোআর তার ধাইমা। মেয়েটিকে তার দেশ কোথায় জিগ্যেস করেও কোনও লাভ হয়নি। সে শুধু বলেছে, আমার বাড়ি-ঘর-দোর বাবা-মা কিছুই নেই। এক এই ধাইমা ছাড়া কেউ নেই আমার।
কী আর করা শাফিকেরও তো ইতিমধ্যে ওই বুদ্ধিমতী আর সুন্দরী মেয়েটির প্রতি মনে খুব মায়া পড়ে গেছিল তো সে বলল, তবে তুমি আমার দেশেই চল আর যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আমার গিন্নি হিসেবে তুমি একেবারে যারপরনাই  মানানসই।
মেয়েটি মুখে কিছু না বললেও সে যে রাজি তা তার মুখ দেখেই বোঝা গেল।

বহু দেশ ঘুরে যখন শাফিকের নাও ফিরে এল মরক্কোয়, বাবা মিসির তো ততদিনে ধরেই নিয়েছেন যে ঝড়বাদলে কিছু একটা অঘটন ঘটে গেছে শাফিক আর তার জাহাজ দুইই জলের তলায় তলিয়ে গেছে। দূরদিগন্তের দিকে তাকিয়ে রোজ মিসির বসে থাকেন বন্দরে, যদি চেনা পালটা দেখা যায়। সেদিন অন্য একটা জাহাজ এসে ভিড়ল তীরে আর তা থেকে ছেঁড়া কাপড়ে, রোগা শুকনো চেহারার শাফিক নামল যখ, তিনি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
কী হয়েছে শাফিক, বাছা আমার? আমাদের জাহাজটা কোথায় গেল? তোমার চেহারাই বা এরকম হয়েছে কেন?
বাবাকে দেখেই তো শাফিকের গলা শুকিয়ে কাঠ। কী করে মুখ দেখাবে সে? সব পণ্যই যে জলাঞ্জলি দিয়ে এসেছে দাসেদের উদ্ধার করতে গিয়ে। বিক্রি তো কিছুই করা হয়নি। সে বলল, বাবা, আপনাকে দেবার খবর আছে দুটো। একটা ভালো খবর, একটা খারাপ খবর। কোন খবরটা আগে বলি?
বাবার বুক কেঁপে উঠলবললেন, খারাপটাই আগে বল
সব বলে শাফিক। তার অন্য জাহাজির সঙ্গে দেখা, তারপর জাহাজবদল, আর শেষে দিনের পর দিন দেশে দেশে ঘুরে সবাইকে বাড়ি ফেরানো। জাহাজের সব খাবার এতজনের সঙ্গে ভাগ করে খেতে গিয়ে ফুরিয়ে যায়, আর যে কদিনে ফেরার কথা ছিল তার চেয়ে ঢের বেশিদিন ধরে ঘোরাঘুরির ফলে জামাকাপড় নোংরা হয়ে ছিঁড়ে যায়। সে জন্যই আজ এই অবস্থা।
খারাপ খবরটা সব শোনার পর রাগে গা কাঁপতে থাকে মিসিরের। বুদ্ধু কোথাকার! শুধু পড়ার বই পড়েছিস, ঘটে কিছুই ঢোকেনি দেখছি! তোর দ্বারা কিসসু হবে না। মরক্কোর সেরা কার্পেট আর তামার পাত্র নিয়ে গিয়ে তুই দিয়ে এলি একটা ধান্ধাবাজ দাস ব্যবসায়ীকে দয়া দেখালি কতগুলো মানুষকে, আর আমার ঘরে যে ফুটো কড়িও ফেরত এল না! কী রে তুই? তোর তো একটা কয়েদিকে লেবু বিক্রি করারও মুরোদ নেই দেখছি একটা তৃষ্ণার্ত মানুকে সরবত বিক্রিটাও তুই করে উঠতে পারবি না।
ধপাস করে সমুদ্রতীরের বালির ওপরেই বসে মাথা চাপড়াতে থাকেন মিসির। তারপর অনেক শাপশাপান্ত করে বলে ওঠেন, এবার ভালো খবরটা বল।
জাহাজ থেকে তখন নামেনি শাফিকের হবু বউ, সেই সুন্দর মেয়েটি, যাকে দাসেদের মধ্য থেকেই পেয়েছিল সে। মেয়েটি আর ধাই যখন বন্দরে নেমে আসে, তখন পুত্রবধূর চমৎকার চেহারা দেখে মন গলে যায় বৃদ্ধ মিসিরের। বাহ্‌, বাহ্‌ বলে খুশি হয়ে ডেকে নিয়ে যান ওদের নিজের বাড়িতে তারপর যথাসময়ে ধূমধাম করেই বিয়ে হয়ে যায় শাফিক ও মেয়েটির।

কিছুদিন যায় শাফিকের ওপর রাগও গলে জল হয়ে যায় মিসিরের। আবার একটা সুযোগ দেবেন ওকে, ভেবে ফেলেন তিনি। তারপর একদিন আবার জাহাজ সাজিয়ে, পরায় ভরে শাফিককে বলেন, এবার আর কোন ভুল করবি না। যদি মুরোদ থাকে তো খাজনা আদায়কারীকে ভ্রূকুটি বিক্কিরি করে নিজেকে প্রমাণ করে আয় এবার। আর খবরদার, অন্য কোন জাহাজের ধারে পাশে ঘেঁষিস না।
বাধ্য ছেলের মতো মাথা নেড়ে শাফিক জাহাজে চাপে এবার আর সে ভুল করবে না। বাবার মান রাখবে। ওকে বিদায় জানাতে গিয়ে মিসির মাথা নাড়েন, হে আল্লা, হে ভগবান, এই বুড়ো সওদাগরের দিকে মুখ তুলে চাও। ছেলেটাকে বুদ্ধিসুদ্ধি দিও।
এবার আর অন্য জাহাজের দিকে তাকায় না শাফিক। সোজা চলে যায় ভিনদেশের বন্দরে। সেখানে নোঙর ফেলেই খোঁজ করে স্থানীয় সওদাগরদেরকিন্তু কেউ কোত্থাও নেই। উল্টে দেখা যায়, একদল সৈন্য চাবুক মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছে কিছু গরিব লোককে লোকগুলোর বাচ্চারা কাঁদতে কাঁদতে সঙ্গে চলেছে।
কী ব্যাপার, জানতে চায় শাফিক শোনে, এই লোকগুলো খাজনা দিতে পারেনি বলে ওদের জেলে পোরা হবে। শুনেই মনখারাপ হয় শাফিকের সে এগিয়ে গিয়ে বলে, এদের মুক্তি দিতে চাই যদি খাজনার টাকাটা আমিই দিয়ে দিই, কেমন হয়?
সৈন্যরা খাজনা আদায়ের কর্তাকে ডেকে আনে তিনি তো ভাবেন, এই লোকটা মাথাটাই খারাপ। যত তাড়াতাড়ি পারে শাফিক তার সব পণ্য বেচে দেয় অল্প দামে তারপর সেই টাকাটা তুলে দেয় রাজস্বকর্তার হাতে। তারপর ফের পাড়ি দেয়।
এবারও সমুদ্রতীরে, বন্দরের এক কোণে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় বৃদ্ধ বাবা মিসির। তাঁর ভেতরে গভীর উদ্বেগছেলে পারবে তো এবারের পরীক্ষায় সফল হতে?
জাহাজ ফেরামাত্র শাফিক যখন এসে দাঁড়ায় ধীরপায়ে, পাটাতন থেকে নেমে, ম্লান মুখে, তিনি তাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, কেমন আছিস, বাবা? এবার সব মাল ঠিকঠাক বেচেছিস তো?
বেচারা শাফিক আবার বাবাকে বলতে বাধ্য হয় যে টাকাপয়সা আনেনি সে। বিক্রিবাটা যা হয়েছিল সবই গেছে বন্দিদের মুক্ত করতে।
বাবা হা হা করে হেসে ওঠেন, আমার সঙ্গে রসিকতা করছিস তুই, শাফিক? কই ক, দেখা দেখি, কত স্বর্ণমুদ্রা ভরে এনেছিস জাহাজে! আর বুড়ো বাপটার সঙ্গে মজা করিস না আমার দুর্বল হৃদযন্ত্র এইসব মজা আর বইতে পারবে না
ছেলে কাঁচুমাচু হয়ে বলে, মজা নয় বাবা, সত্যি।
এবার রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ে আবার বালিতে বসে পড়েন মিসির। আবার মাথা চাপড়ান আর শাপমন্যি করেন ছেলেকে। হায় হায় হায়, এ কোন হতবুদ্ধি ছেলের বাপ হলাম আমি! এ ছেলের তো দেখি মাথায় এক ছিটেফোঁটা বুদ্ধিও দিয়ে পাঠাননি আল্লা। কার অভিশাপে আমার ঘরে এমন গাধা জন্মায়! বলে কিনা, জিনিস বেচে সেই টাকা দিয়ে অন্য লোকের হয়ে খাজনা দিয়ে এল! ওরে, তুই তো দেখি পালক ছাড়ানো মুরগিকেও একটা পালক বিক্রি করে উঠতে পারবি না সারাজীবনে!
বাবার রাগের মুখে পড়ে শাফিক পালিয়ে বাঁচে এক বন্ধুর বাড়িতে। তার স্ত্রীও গিয়ে আশ্রয় নেয় সেখানে। দিনের পর দিন বন্ধু শাফিককে বোঝায়, আর মাঝে মাঝেই গিয়ে বৃদ্ধ মিসিরের বাড়িতে দেখা করে বলে, কাকাবাবু, এবারের মতো শাফিককে ক্ষমা করে দিন আর একটা সুযোগ ওকে দিয়ে দেখুন, আর কোন ভুল করবে না ও। আমার মাথার দিব্যি দিয়ে কথাটা বলছি কিন্তু।
বন্ধুর কথায় কাজ হয়। মিসির শেষবারের মতো জাহাজ সাজান। বলে দেন পই পই করে বন্ধুটিকে, বার বার তিনবার। এই তৃতীয়বার যদি ও গোলমাল পাকায় তাহলে কিন্তু আর নয়। ত্যজ্যপুত্র হবে তোমার বন্ধু শাফিক। ওর বউয়ের দিব্যি দিয়ে ওকে পাঠাও, যাতে এবার আর দয়াধর্ম দানদাতব্য কিছুই না করে অন্তত ঘরে কিছু টাকা আনে।
বন্ধুটি বুদ্ধি করে শাফিকের স্ত্রীর একটা চমৎকার ছবি আঁকায় এক শিল্পীকে দিয়ে। তারপর জাহাজের খোলে শাফিকের কামরায় সেই ছবিটা বাঁধিয়ে টাঙিয়ে দেয় আর বলে, বন্ধু, রোজ এই ছবিটা দেখবে আর ভাববে ব্যবসা ভালো না করতে পারলে তোমার গিন্নি কতটা রেগে যাবে। এমনও হতে পারে, হাত খালি করে এলে তোমার গিন্নি তোমাকে ছেড়েই চলে গেল হয়তো বা।
হুম এবার আর ভুল করব না,” বলে শাফিক বিদায় নেয়।
বাবা মিসির সমুদ্রতীরে দাঁড়িয়ে ভাবে, ছেলেটা একজন ছুতোরকে একটা পেরেকও বিক্রি করে উঠতে পারলে তবে বুঝি! আল্লা, আল্লা, তুমি মেহেরবান, আমাকে খুদা এবার দয়া করে একটু দেখসারাজীবনের সব জমানো টাকা দিয়ে ওকে পাঠালাম।

এইবার আর দেরি না করে প্রথমেই এক দারু সমৃদ্ধ শহরে যায় শাফিক। চমৎকার বড়লোকেদের শহর সেটা। সেখানে রেশমের কাপড়ে সাজগোজ করা তাগড়াই চেহারার সওদাগরেরা এসে তার জাহাজে ওঠে, মালপত্র দেখে, দরদাম করে। বেশ চড়াদামে বিক্রি হতে থাকে শাফিকের মাল।
একদিন এক সওদাগর শাফিকের কামরায় তার স্ত্রীর ছবিটা দেখে ফেলেঅবাক হয়। হয়ে বলে, আচ্ছা, এই ছবিটা কার?
আমার স্ত্রীর
তাই কি? তিনি কি ঠিক এইরকমই দেখতে যেমন ছবিতে?
আজ্ঞে হ্যাঁ, হুবহু এইরকম
তাহলে তো ভাবনার কথা। আচ্ছা দাঁড়ান।
তড়িঘড়ি নেমে যায় নাও থেকে সেই সওদাগর। ফিরে আসে একটু পরেই, দেশের মন্ত্রীকে নিয়ে। মন্ত্রী ছবিটি দেখেন। দেখে ঘামতে শুরু করে দেন। মশাই, এ আপনার স্ত্রীর ছবি? সত্যি সত্যি ইনি আপনার স্ত্রী?
আজ্ঞে হ্যাঁ, কিন্তু আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
দাঁড়ান।
নেমে যান মন্ত্রী। ফিরে আসেন দেশের রাজাকে নিয়ে। সঙ্গে একগাদা লোকলস্কর।
শাফিক ঘাবড়ে যায়। রাজামশাই তার কামরায় ছবিটি দেখেন, আর দেখামাত্রই মুচ্ছো যান।
অনেক পরে জ্ঞানটান ফিরলে রাজামশাই বলেন, হে তরুণ বিদেশি সওদাগর! তুমি আমাকে বাঁচালে।
আজ্ঞে, আমি তো কিছুই, মানে, বুঝতে, মানে, পারছি না...
এই ছবি আমার মেয়ের। তিনবছর আগে আমি তুচ্ছ কারণে আমার মেয়েকে নির্বাসন দিয়েছিলাম। বয়সের কারণে সে একটু চঞ্চল প্রকৃতির ছিল। একদিন না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল ছদ্মবেশে। আমি সেইদিন তাকে তাড়িয়ে দিই। কী যে ভুল আমার...। সেই থেকে তাকে খুঁজে চলেছি। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পাইনি। আজ এই ছবিতে তাকে দেখতে পেলাম।
বলে কাঁদতে থাকেন প্রৌঢ় রাজামশাই। ভেউ ভেউ কান্না। লোকলস্কর তাঁকে থামাতে চেষ্টা করে, পারে না।
শাফিকের বড্ড মায়া হয়। সে বলে, এবার বুঝেছি। আমি তাকে পাই এক দাসব্যবসায়ীর জাহাজে। আপনি নির্বাসন দিয়েছিলেন বলেই সে বলেছিল, আমার কোন ঘরবাড়ি দেশ নেই। আমি যেখানে খুশি যেতে পারি। সেজন্যেই আমি তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাই, বিয়ে করি। সে অতি চমৎকার মেয়ে এমন মেয়ে দুনিয়ায় নেই।
তা তো নেইই। তুমি তাকে নিয়ে, তোমার বাবা-মা, আত্মীয়-বন্ধু সবাইকে নিয়ে এক কাজ কর, আমার এই দেশে চলে এসআমি তোমাদের সঙ্গে নিয়েই শেষ জীবনটা কাটাতে চাইআহা, কী আনন্দের দিন আজ! ওরে, তোরা ভেঁপু বাজা, কাড়ানাকাড়া বাজা।

অনেক টাকা-গয়না, মণিরত্ন আর ভালো ভালো মিষ্টি উপঢৌকন নিয়ে ফিরে চলে শাফিক। এমনিতেও তো বিক্রিবাটাও মন্দ হয়নি। হু হু বেগে জাহাজ চলে, আর শাফিক ভাবে, আর একটু তাড়াতাড়ি গেলে হত।
ফিরেই সুখবরটা শোনায় বাবা-মাকে। মিসির তো আনন্দে আত্মহারা হয়ে যান ছেলের এই সাফল্য দেখে। আর শাফিকের স্ত্রীও বাবা তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন জেনে খুব খুশি। সবাই মিলে তারা আবার রওনা দেয় মেয়েটির বাপের বাড়ির দেশের দিকে।
সেখানে পৌঁছে যখন রাজার লোকলস্কর এসে তাদের নিয়ে যাবে, ঠিক তখনই রাজার এক মন্ত্রীর কুনজরে পড়ে শাফিকবেজায় হিংসুটে মন্ত্রী ভেবেছিল, এই রাজার তো ছেলেটেলে নেই তাই রাজকন্যাকে বিয়ে করে সেই রাজা হয়ে বসবে। সেটা তো হলই না, উলটে কো এক বিদেশি উটকো লোক নাকি রাজকন্যাকে বিয়ে-টিয়ে করে বসে আছে। মন্ত্রীটা আপ্যায়নের ছল করে নৌকোর একেবারে ধারে নিয়ে যায় শাফিককে তারপর ঠেলে ফেলে দেয় জলে। শাফিক তলিয়ে যায় জলের তলায়।
এদিকে শাফিককে খুঁজে না পেয়ে চারদিকে কান্নাকাটি, শোরগোল। আনন্দ মাটি হয়ে গেল বাবার সঙ্গে মেয়ের এতদিন পর দেখা হয়েও। মুহ্যমান সকলেই রাজামশাইয়ের সভায়।
শাফিক কিন্তু মরেনি। এক জেলে তার ডিঙিতে তুলে নেয় অজ্ঞান শাফিককে, তাকে খাইয়ে-দাইয়ে বাঁচায়। জ্ঞান ফিরে শাফিক দেখে সে এক অপরিচিত মানুষের ঘরে। গরিব জেলে তাকে আদরযত্ন করে সারিয়ে তোলে।
শাফিকের পরিচয় চাইলে সবকথা বলে শাফিক বলে, আজ আমার সঙ্গে কিছুই নেই জেলেভাই, যা দিয়ে তোমার এই উপকারের মূল্য দেব। কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা নেই আমার। বল, কী করতে পারি তোমার জন্য?
কিচ্ছু করতে হবে না, ভাই। তুমি বেঁচে উঠেছ, এই তো অনেক।
না না জেলেভাই, আমি তোমাকে বলছি, আগামী দিনগুলোয় যদি জীবনে কিছু করে উঠতে পারি, কোন ধনরত্ন জমাতে পারি তার অর্ধেক পাবে তুমি।
ভুলবে না তো?
ভুলব না।

শাফিক একাই ফিরে যায় রাজদরবারে। শাফিককে দেখে সবাই আনন্দে আবার উথলে ওঠে। রাজার এবার সত্যিই মুখে হাসি ফোটে নিজের মেয়ে আর জামাইকে দুদিকে বসিয়ে ঘোষণা করেন, তাঁর মৃত্যুর পর শাফিক হবে দেশের রাজা।
পাশে বসা সেই দুষ্টু মন্ত্রীর গলা শুকিয়ে যায়।
মিসির একপাশে নিয়ে ছেলেকে জিগ্যেস করে, তোর কী হয়েছিল, শাফিক?
ছেলে বলে, তাকে জলে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল হিংসুটে মন্ত্রিমশাইমিসির লম্ফঝম্প করে ওঠেন। “তাহলে রাজামশাইকে বলে ওকে শূলে চড়াচ্ছিস না কেন রে? ও তো তোর সঙ্গে আবার অসভ্যতা করবে!”
শাফিক বলে, আমি ওকে ক্ষমা করে দিলাম, বাবা। আমাকে আল্লা এতকিছু দিয়েছেন। তারপরেও প্রতিহিংসা কেন?
হায় হায়, এ কী ছেলে রে! বলে কিনা ক্ষমা করে দেবে! ওরে, তোর এখন ঘটে বুদ্ধি হল না তুই আজও বদলাসনি। আমি বলে দিচ্ছি, একটা দর্জিকে তুই একটা সূচও বিক্রি করে উঠতে পারবি না কোনওদিন।
হা হা হা, বাবা, ভুলে যেও না, প্রথমবার আমি দাসের জাহাজ কিনেই আমার গিন্নিকে পেয়েছিলাম আর সেজন্যেই আজ আমি রাজার জামাই।
বাবা চুপ করে যান।

তারপর শাফিক আর তার স্ত্রী, বৃদ্ধ মিসির ও বাকি সবাইকে নিয়ে রাজামশাইয়ের কাছেই চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় খেয়ে দিব্যি থাকে বহু বহু দিন। সুখে শান্তিতে মেয়ে জামাইকে নিয়ে আটবছর কাটাবার পর একদিন চোখ বুজলেন রাজামশাই।
রাজামশাইয়ের মৃত্যুর পর তো শাফিকই রাজা হল। রাজা হবার দিন বিশাল হুলুস্থুল দেশজুড়ে। নতুন রাজার অভিষেক দেখতে কাতারে কাতারে লোক এসেছে। হঠা ভিড়ের মধ্য থেকে কে যেন বলে উঠল,রাজামশাই, আপনার শপথটা মনে আছে তো? অর্ধেক রাজত্ব কিন্তু আমার হল।
কে বলল? কে বলল? সব পাইক-লস্কর তেড়ে গেল অচেনা গরিব এক বুড়ো জেলের দিকে। ছেঁড়া কাপড় পরা লোকটাকে ধরে নিয়ে এল শাফিকের কাছে। তাকিয়ে দেখল শাফিক আটবছর আগের সেই মানুষটাকে মনে পড়ে গেল, যে তাকে বাঁচিয়েছিল জলে ডুবে মরার আগের মুহূর্তে।
এস জেলেভাই, ঠিক সময়ে এসেছ। হ্যাঁ, অর্ধেক রাজত্ব তোমার।
বুকে টেনে নিল শাফিক জেলেকে। দেখেশুনে তো রাজ্যসুদ্ধ লোক থসবাই অবাক হয়ে গেল। আর সবচেয়ে বেশি হতবাক তো একজন হলেন বল তো কে?
অবশ্যই শাফিকের বাবা, থুরথুরে বুড়ো মিসিরসাহেব। মাথা-কপাল চাপড়ে মাটিতে বসে পড়লেন তিনি। হায় হায়, এ কোন অপদার্থের জন্ম দিয়েছিলাম আমি! মুখের কথায় আধখানা রাজত্ব দিয়ে দিচ্ছে। ওরে, তুই তো মড়াকে একটা কাফনও বিক্কিরি করে উঠতে পারবি না রে!

এর পরের ঘটনা খুবই সামান্যসম্রাট শাফিক পরবর্তী চল্লিশ বছর রাজত্ব করলেন মরক্কোতে। উদার, মহ ও অত্যন্ত বিচক্ষণ রাজা হিসেবে মরক্কোর দিকে দিকে সম্রাট শাফিকের বিশাল খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। রাজ্যজুড়ে কোন গরিব-দুঃখী রইল না। ইতিহাসের পাতায় রয়ে গেল শাফিকের তিন-তিনবার সমুদ্রযাত্রার গল্প, উপকথার রূপে। মারাকেশের রাস্তায় গল্প বলার ঠেকে চাঁদোয়ার নিচে বসে আজ বলাবলি করে সবাই সেই রাজার কথা, যে নাকি কোন রাঁধুনিকে এক চিমটি নুনও বিক্রি করতে পারত না।
_____
( মরক্কোর উপকথা থেকে উদ্বুদ্ধ )
অলঙ্করণঃ অরিজিৎ ঘোষ

5 comments: