প্রবন্ধ:: বাংলা রূপকথায় ছবির ব্যবহার - সমুদ্র বসু

বাংলা রূপকথায় ছবির ব্যবহার
সমুদ্র বসু

একটা খালি দেওয়াল যেমন বাড়িতে অনেক মানুষ থাকলেও শূন্যতা সৃষ্টি করে তেমনই রূপকথার বইয়ে যদি আঁকা না থাকে সেটাকে মৃত বলে মনে হয়। আমরা যখন বই কিনতে যাই তখন তো বুঝি না যে তাতে কী লেখা আছে কিন্তু পাতা জোড়া ছবি চুম্বকের মতন টানে, বাধ্য করে বইটা কিনতে। একজন ভালো অলঙ্করণ শিল্পী তিনিই যিনি খুব ভালো পাঠক সেই বইটার আর যিনি বেছে নিতে পেরেছেন সেরা কিছু মুহূর্তকে বা কিছু উল্লেখযোগ্য চরিত্রকে। এই কাজটাই দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার প্রথম সফলভাবে করেছিলেন অন্য শিল্পীদের মাধ্যমে তাঁর যুগান্তকারী বই ‘ঠাকুরমার ঝুলি’তে। ঠাকুরমার ঝুলি বইয়ের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ বইয়ের ছবিগুলো। শিশু বা কিশোর বয়সের পাঠকের আগ্রহ জন্মায় কিন্তু বইয়ের ছবি দেখেঠাকুরমার ঝুলিতে ব্যবহৃত বেশিরভাগ ছবিই হয়েছে কাঠখোদাইয়ের মাধ্যমে। ভট্টাচার্য অ্যাণ্ড সন্স প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হল বাংলা ভাষার প্রথম সফল রূপকথার গল্প সংকলন ‘ঠাকুরমার ঝুলি’। তার পাতায় পাতায় ছবি পাঠককে খুব সহজে চিনে নিতে শেখাল গল্পের নাম ও চরিত্রগুলোকে – কলাবতী রাজকন্যা, ঘুমন্তপুরি, কাঁকনমালা-কাঞ্চনমালা, নীলকমল আর লালকমল, ডালিমকুমার, পাতালকন্যা মণিমালা, সোনার কাঠি-রুপোর কাঠি, শেয়াল পন্ডিত, সুখু-দুখু, ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী, দেড় আঙুলে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর উচ্ছ্বাস গোপন রাখতে পারেননি তখন উনি লিখেছিলেন, “আমি হইলে তো এ কাজে সাহসই করিতাম না” ঠাকুরমার ঝুলিতে চারজন খোদাই শিল্পীর নাম পাওয়া যায় – প্রিয়গোপাল দাস, অরবিন্দ দাস, কুঞ্জবিহারী পাল ও হেমেন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়।

   

রূপকথার গল্পের ইতিহাসে ১৯১০ সাল খুব গুরুত্বপূর্ণ। ঠাকুরমার ঝুলিতে কিন্তু লেখক নিজে ছবি আঁকেননি কিন্তু ১৯১০-এ ইউ রে অ্যান্ড সন্স থেকে ‘টুনটুনির বই’ প্রকাশ করলেন শিশুসাহিত্যের প্রাণপুরুষ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, যিনি হাফটোন ছবির মাধ্যমে নিজেই নিজের গল্পের ছবি পৌঁছে দিলেন পাঠকের কাছে। এর ঘরানা কিন্তু ঠাকুরমার ঝুলির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রায় তেরো বছর নিজের ব্যক্তিগত জীবনের বাধাবিপত্তিকে অগ্রাহ্য করে মুদ্রণ বিষয়ক গবেষণা করেছিলেন উপেন্দ্রকিশোর। ছোটোদের হাতে সুন্দর, সুদৃশ্য বই তুলে দেওয়াই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। ১৮৯৫ সালে তিনি বিলেত থেকে যন্ত্রপাতি এনে নিজের বাড়িতে বসিয়ে শুরু করলেন এক অমানুষিক পরিশ্রমের গবেষণা। পুণ্যলতা চক্রবর্তী তাঁর ছেলেবেলার দিনগুলোতে যা বলেছেন তার থেকেই স্পষ্ট যে উপেন্দ্রকিশোরের আত্মত্যাগ শুধুমাত্র গল্পে ছবির ব্যবহারকে সফল করার জন্যে “মাঝারি রকমের বাড়ি, তার মধ্যে একটা ঘরে বাবা স্টুডিয়ো তৈরি করলেন, আর একটা ঘরে ছোটো একটা ছাপার প্রেস বসল, আর একটা ঘরে ও বারান্দায় নানারকম যন্ত্রপাতি রাখা হল। স্নানের ঘরকে করা হল ডার্করুম” টুনটুনির বই বাংলা শিশুসাহিত্যের সবথেকে বড়ো সম্পদ। এর আঁকাগুলো শিশুদের মনে এমনভাবে দাগ কাটে যে তারা বড়ো হয়ে গল্পগুলো ভুলে গেলেও আঁকাগুলো চোখের সামনে ভাসেএখানেই উপেন্দ্রকিশোর সবার থেকে আলাদা। তাঁর সম্পাদিত সন্দেশ পত্রিকার সমস্ত রূপকথা বা লোককথার গল্পেতেও এই ধরনের অসামান্য হাফটোন ছবি দেখা যায়।

   

এবারে আসা যাক ষাটের দশকের থেকে নব্বইয়ের দশকের কথায়। বিজ্ঞানের জয়যাত্রার সঙ্গে মুদ্রণেও অনেক পরিবর্তন হল। রূপকথার গল্পের প্রচ্ছদ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠল। তার মূল কারণ, ছবিগুলো হয়ে উঠল রঙিনসত্যজিৎ রায় আঁকতে শুরু করলেন। একের পর এক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পে প্রচ্ছদ ও আঁকা। সিগনেট বুক থেকে প্রকাশিত ‘ক্ষীরের পুতুল’ আজও অনবদ্য। এর সঙ্গে সঙ্গে সত্তর ও আশির দশককে মাতিয়ে তুললেন আরেকজন অলঙ্করণ শিল্পী যাঁর আঁকা রূপকথার রাজ্যে গাবলু-গুবলু  শিশুদের ছবি সব বয়সের পাঠককে সমানভাবে আকর্ষণ করল। শৈলেন ঘোষের ‘অরুণ, বরুণ, কিরণমালা’ বা ‘হুপ্পোকে নিয়ে গপ্পো’ বা ‘মিতুল নামে পুতুলটি’ পড়লে এবং তার সঙ্গে বিমল দাসের ছবিগুলো দেখলে বোঝা যাবে রূপকথা কতটা জীবন্ত।

   


বিজ্ঞান ও কল্পবিজ্ঞানের যুগে রূপকথা কিন্তু আজও তার অস্তিত্বকে সজীব করে রেখেছে আধুনিকতার ছোঁয়ায়। হয়তো রূপকথার বই খুললে আর ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী চোখে পড়বে না, কিন্তু মোবাইল হাতে ছোটো ছেলেকে দেখা যাবে রূপকথার অন্য এক স্বর্গরাজ্যে। বর্তমানে চোখে পড়ার মতন রূপকথার গল্পের ছবির যথার্থ ব্যবহার দেখা গেছে দেবব্রত ঘোষের আঁকা দীপান্বিতা রায়ের ‘তিলু পানা পোলাপান’ এবং কাহিনি ঘোষের আঁকা অনন্যা দাশের ‘রিমঝিম, অনামিকা আর সবুজের মাঠ’ উপন্যাসে। অতীতে উপেন্দ্রকিশোর বা সত্যজিৎ রায় যেমন নিজের গল্পের ছবি নিজে এঁকে সব থেকে ভালো ও সহজভাবে গল্পের বক্তব্যকে পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতেন সেটা অবশ্য আজকের দিনে হারিয়ে যাচ্ছে যেহেতু লেখক ও অলঙ্করণ শিল্পী আলাদা। তবে আজকের দিনেও সেই সত্তাটাকে আধুনিক রূপকথার মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখতে সক্রিয় হয়েছেন আরেকজন – বিবেক কুন্ডু তাঁর ‘বুমবুম’ সিরিজ রূপকথার বেশিরভাগ গল্পে নিজেই এঁকে চলেছেন মনকাড়া সব আঁকা।
রূপকথা আরও দীর্ঘজীবি হোক তার আঁকার মাধ্যমে এটাই সবসময় চাইব, আর আমরা সবাই মিলে তার আনন্দ উপভোগ করে জীবনের দুঃখ-বেদনাটুকু শুষে নিতে পারব বলে আশা রাখি।

_____

1 comment:

  1. বেশ মনোজ্ঞ লেখা

    ReplyDelete