অনুবাদ গল্প:: একটু রোদের জন্যে - রে ব্রাডবেরি :: অনুবাদঃ দীপ ঘোষ


একটু রোদের জন্যে
(All summer in a day)
রে ব্রাডবেরি
ভাষান্তরঃ দীপ ঘোষ

“কিছু দেখা যাচ্ছে?”
“উঁহু!”
“এবার?”
“নাহ্‌, তবে খুব তাড়াতাড়িই শুরু হবে।”
“বিজ্ঞানীরা ঠিক বলেছেন তো? আজকেই হবে? ঠিক তো?”
“আরে, নিজেই দেখ না বাবা!”
বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো ঘরের একমাত্র জানালাটার চারপাশে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। মনে হচ্ছিল একগুচ্ছ ফুলকে যেন মিলিয়ে মিশিয়ে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। তারা সবাই মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সূর্যটাকে খুঁজছিল।
কিন্তু বৃষ্টি থামার কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছিল না। গত সাত বছর ধরে এই বৃষ্টি হয়েই চলেছে। সাত বছর, কত হাজার হাজার দিন, সকাল থেকে রাত শেষ হওয়া পর্যন্ত জলের বাদ্যি বাজিয়ে চলেছে এই বৃষ্টি। চকমকে স্ফটিকের ধারার মতো অবিশ্রান্ত বর্ষণ আর তার সাথে ঝড়ের গজরানি। সে আবার যে সে ঝড় নয়, এই ছোটো ছোটো দ্বীপগুলোর উপর সেই ঝড় ঝাঁপিয়ে পড়ে বিশাল সামুদ্রিক ঢেউয়ের আকার নিয়ে। হাজার হাজার বর্গ মাইলের জঙ্গল তছনছ হয়ে যায় হাজার বার এই ঝড় আর বৃষ্টির দৌরাত্ম্যেআবার হাজার বার মাথা তুলে ধরে গাছগুলো আরও হাজার বার গুঁড়িয়ে যাবে বলে। আবহমানকাল ধরে শুক্রগ্রহের জীবজগতের এটাই জীবনচক্র। কিন্তু এই স্কুল বাড়িটা তো শুক্রগ্রহের না। এই বাড়িতে থাকে সেইসব বাচ্চারা যাদের বাবা-মা রকেটে করে এই গ্রহে এসেছে নতুন সভ্যতা গড়ে তোলার জন্যে।
“দেখ দেখ, বৃষ্টি ধরে আসছে!”
“হ্যাঁ, তাই তো!”
মার্গো বাকি বাচ্চাদের থেকে আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এদের প্রত্যেকের বয়সই ঠিক নয় বছর। সাত বছর আগে যদিও বা এক ঘন্টার জন্যে সূর্য উঠেছিল, এরা কেউ সে কথা মনে করতে পারে না। যত দিন মনে পড়ে শুধু বৃষ্টিই দেখেছে ওরা সবাই। মার্গো কিন্তু এদের থেকে অন্যরকম। ও জানে বাচ্চারা যখন রাত্রিবেলায় ঘুমের মধ্যে কেঁপে ওঠে, স্বপ্নের মধ্যে তাদের মনে পড়ে সোনালি হলুদ রঙ পেন্সিলে আঁকা একটা চাকতির কথা, যা দিয়ে দুনিয়ার সবকিছু কিনে নেওয়া যেতে পারে। বাচ্চারা মনে করার চেষ্টা করে সেই উষ্ণতার কথা, যা ধীরে ধীরে তাদের সারা শরীর ছুঁয়ে যায় কোনও অপার্থিব ভালোবাসা নিয়ে আর তারপরেই ঘুম ভেঙে যায় অবিরাম বৃষ্টির বাদ্যিতে; স্বচ্ছ মুক্তোর ধারা ঝরতে থাকে বাড়ির ছাদে, কার্নিশে, রাস্তায়, বাগানে আর জঙ্গলে অবিশ্রাম।
গতকাল তারা সারাদিন ক্লাসে সুর্যের গল্প পড়েছে। দিদিমণিরা কেউ ছবিতে দেখিয়েছেন সূর্য একটা হলুদ পাতিলেবুর মতো; কেউ বা পড়িয়েছেন তার উত্তাপের কথা। বাচ্চারা সবাই কবিতা আর গল্প লিখেছে সূর্যকে নিয়ে। মার্গোও একটা ছড়া লিখেছিল। নিস্তব্ধ ক্লাসরুমে কচি গলায় সুর করে পড়ছিল ছড়াটা আর বাইরে তখন তাল মিলিয়ে অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছিল
‘সূর্য যেন ছোট্ট একটা ফুল,
এক ঘন্টাই আয়ু তার,
নেইকো এতে ভুল।’
“এটা ও লেখেইনি,” ছেলেদের মধ্যে থেকে একজন চেঁচিয়ে উঠল।
“আমি লিখেছি। সত্যি বলছি।” রিনরিনে গলায় বলল মার্গোদিদিমণি বকে উঠলেন উইলিয়াম নামের ছেলেটিকে।
যাই হোক, এটা ছিল গতকালের ঘটনা। আজ কিন্তু বৃষ্টি ধরে আসছে, আর তাই সব বাচ্চারা জড়ো হয়েছে জানালার ধারে।
“দিদিমণি কোথায়?”
“এখুনি আসবেন।”
“উফ্‌, দেরি করছেন কেন? যদি এখুনি সূর্য উঠে যায়?”
বাচ্চারা জানালার ধারে ছটফট করতে লাগল। মার্গো দূরে দাঁড়িয়ে ছিল চুপটি করে। ছোট্ট রোগাপাতলা মেয়েটিকে দেখে মনে হয় যেন এই বৃষ্টিতে তার চোখের নীল রং, চুলের স্বর্ণালি দীপ্তি আর গালের সজীবতা, সব ধুয়ে ঝাপসা হয়ে গেছে। ঠিক যেন পুরনো সাদাকালো অ্যালবাম থেকে বের করে নেওয়া, হারিয়ে যাওয়া একটি ছোট্ট মেয়ের ছবি। তার গলার স্বর শুনলে মনে হত তা ভেসে আসছে অনেক দূরের কোনও জগত থেকে।
“কী দেখছ হাঁ করে?” উইলিয়াম জিজ্ঞাসা করল।
মার্গো কোনও উত্তর না দিয়ে তাকিয়ে রইল বিরাট কাঁচের জানালাটার দিকে, যার অপর পারে দুনিয়া হারিয়ে গেছে বৃষ্টির শব্দে।
“এই! আমি তোমার সাথে কথা বলছি। জবাব দিচ্ছ না কেন?”
উইলিয়াম এগিয়ে এসে মার্গোকে ঠেলা মারল। মার্গো কিন্তু একটুও নড়ল না নিজের জায়গা থেকে। বাকি বাচ্চারা সবাই মার্গোর থেকে দূরে সরে গেল, যেন কেউ তাকে দেখতেই পাচ্ছিল না। আসলে সে কোনওদিনই অন্যদের সাথে মাটির নিচের শহরের ধাতব সুড়ঙ্গে লুকোচুরি খেলেনি। কেউ যদি তাকে ছুঁয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়, মার্গো বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে শুধু। ক্লাসে সবাই যখন কোরাসে আনন্দ আর খেলার গান গায়, তখন ওর ঠোঁট কেউ কোনওদিন নড়তে দেখেনি। শুধুমাত্র সূর্য আর গ্রীষ্মকালের গানের সময়েই যেন মার্গোর ঠোঁটে প্রাণ ফিরে আসত, আর তখন সে উদাস হয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকত। তবে মার্গোর সব থেকে বড়ো দোষ ছিল সে মাত্র পাঁচ বছর আগে পৃথিবী থেকে এখানে এসেছিল। চার বছর বয়সে ওহায়ো শহরের আকাশে সূর্যের ছবি তার মগজে গেঁথে গেছিল। বাকি বাচ্চারা খুব অল্প সময়ের জন্যে সাত বছর আগে সূর্য হয়তো দেখেছিল, কিন্তু তার কোনও স্মৃতিই তাদের মনে নেই।
কিন্তু মার্গো ভুলতে পারত না। “সূর্য একটা এক টাকার মুদ্রার মতো।” চোখ বুজে বলত সে।
“মোটেও না।” বাকি বাচ্চারা চেঁচিয়ে উঠত।
“উনুনের মধ্যের আগুনের মতো উষ্ণ।” সে বলত।
“মিথ্যে কথা! তোমার মনে থাকতেই পারে না!” আবার চেঁচিয়ে উঠল বাকিরা।
কিন্তু তার সব মনে ছিল। আর তাই সে সবার থেকে আলাদা দাঁড়িয়ে থাকত আর জানালার কাচে বৃষ্টির খেলা দেখত। একমাস আগে একদিন হঠাৎ সে স্কুলের চানঘরে যেতে অস্বীকার করল। দুই হাতে কান আর মাথা চেপে ধরে সে চিৎকার করে বলছিল, জল যেন তার মাথা স্পর্শ করতে না পারে। সেদিন থেকেই মার্গো বুঝেছিল সে অন্যদের থেকে আলাদা, আর অন্যরাও তাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেছিল। কানাঘুষোয় শোনা গেল মার্গোর বাবা-মা পরের বছর তাকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সেটাই নাকি তাকে ভালো করার একমাত্র উপায়। যদিও এর জন্যে তাদের বেশ কয়েক লাখ টাকা ক্ষতি স্বীকার করতে হবে। অন্য বাচ্চারা এই সমস্ত ছোটোবড়ো কারণের জন্যে মার্গোকে পছন্দ করত না। তাদের অপছন্দ ছিল তার ম্লান মুখ, সীমাহীন নৈঃশব্দ, রুগ্ন শরীর আর সবথেকে বেশি পৃথিবীতে ফেরার সম্ভাবনাকে।
এখান থেকে চলে যাও!” উইলিয়াম আবার ধাক্কা দিল মার্গোকে। “এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?”
মার্গো আস্তে আস্তে ঘুরে তাকাল তার দিকে। তার উজ্জ্বল চোখদুটো বলে দিচ্ছিল কেন সে এখানে দাঁড়িয়ে আছে।
“এখানে দাঁড়িয়ে কোনও লাভ নেই, তুমি আজ কিছুই দেখতে পাবে না।” নিষ্ঠুরভাবে চেঁচিয়ে উঠল উইলিয়াম।
মার্গোর ঠোঁটদুটো নড়ে উঠল। কিন্তু কোনও কথা শোনা গেল না।
“এখানে দেখার কিছু নেই।” আবার বলল ছেলেটা। তারপর বাকি বাচ্চাদের দিকে ফিরে বলল, “আজকে কিছুই হবে না, তাই না?”
সবাই মজাটা বুঝতে পেরে গেল। হাসতে হাসতে মাথা নেড়ে সুর করে বলতে লাগল, “কিচ্ছু হবে না, কিচ্ছু হবে না।”
মার্গো অসহায়ভাবে ফিসফিস করে বলতে লাগল, “কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলেছেন, আজকেই... ওঁরা ঠিক জানেন... আজকেই... সূর্য...।”
“সব মিথ্যে কথা।” আবার নিষ্ঠুরভাবে বলে উঠল উইলিয়াম। মার্গোর হাত ধরে তাকে ঠেলতে লাগল ক্লাসঘরের দিকে। “সবাই শোন, দিদিমণি আসার আগেই ওকে ক্লাসঘরের বড়ো আলমারিটায় আটকে রাখি।”
“না না!” ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে আর্তনাদ করে উঠল মার্গো
কিন্তু বাচ্চারা ততক্ষণে নিষ্ঠুরতার স্বাদ পেয়ে গেছে। সবাই মিলে মার্গোকে তুলে বয়ে নিয়ে যেতে লাগল ক্লাসঘরের দিকে। মার্গোর প্রতিবাদ, মিনতি আর কান্না কোনও কিছুই তাদের থামাতে পারল না। একটা লম্বা বারান্দা পেরিয়ে তারা ক্লাসঘরে ঢুকে পড়ল তাকে নিয়ে। সবথেকে বড়ো আলমারিটার মধ্যে তারা মার্গোকে আটকে ফেলে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দিল। মার্গোর ধাক্কায় আলমারির দরজা কেঁপে উঠতে লাগল, কিন্তু খুলল না। আলমারির ভেতর থেকে তার চাপা কান্নার শব্দ তখনও ভেসে আসছিল। বাচ্চারা যখন বুঝল মার্গো কিছুতেই আলমারি থেকে বেরোতে পারবে না, তখন তারা হাসতে হাসতে বারান্দার দিকে দৌড়ে গেল আবার।
“সবাই তৈরি তো?” দিদিমণি উদ্বিগ্ন মুখে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে জানালার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
সবাই একসাথে কলরব করে বলে উঠল, “হ্যাঁ।”
দিদিমণি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “সবাই এসেছে তো?”
বাচ্চারা আবার চিৎকার করে জানাল, সবাই উপস্থিত আছে।
বৃষ্টি আস্তে আস্তে আরও কমে এল। বাচ্চারা সবাই দরজার কাছে জড়ো হল। আর হঠাৎ বৃষ্টি একেবারেই থেমে গেল।
অনেক সময় সিনেমার মাঝে এরকম হয়। ধরুন পর্দায় ভীষণ ঝড়বৃষ্টি-তুফান অথবা অগ্ন্যুৎপাতের মতো কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ চলছে, আর তার মাঝে কোনও যান্ত্রিক গোলযোগে হঠাৎ শব্দটা কমে গেল, আর তারপর সব শব্দই বন্ধ হয়ে গেল। সমস্ত ঝড়ের শব্দ, মেঘের গুরুগম্ভীর ধ্বনি আর বাজের হুঙ্কার যেন এক ফুঁয়ে কেউ নিভিয়ে দিল। সবশেষে সিনেমার প্রজেক্টর থেকে পুরনো ফিল্মটা সরিয়ে কেউ যেন সুন্দর সবুজ এক ঘন অরণ্যের রৌদ্রোজ্জ্বল জগতের ফিল্ম লাগিয়ে দিল। সেই নীরবতা এতই অসহ্য যেন মনে হবে আপনি বধির হয়ে গেছেন অথবা আপনার কান কেউ তুলো দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে।
বাচ্চারা সবাই হাত দিয়ে কান ঢেকে রেখেছিল। এবার দরজাটা একটু ফাঁক হল আর সাথে সাথে বন্য অরণ্যের সোঁদামাটির গন্ধ ঘরের মধ্যে এসে ঢুকল।
আকাশে সূর্যকে দেখা গেল।
নীল আকাশের মাঝে গলন্ত ব্রোঞ্জের রঙের বিরাট সূর্যটা যেন ঝুলছিল আর বাইরের জঙ্গলটা ভেসে যাচ্ছিল সোনাগলা রোদে। বাচ্চারা যেন কোন মন্ত্রবলে হঠাৎ জেগে উঠল আর কলরব করে ছুটে বেরিয়ে গেল দরজা দিয়ে।
পেছন থেকে দিদিমণির গলা শোনা গেল, “মাত্র একঘন্টা সময় কিন্তু বাচ্চারা, মনে রেখ।”
কিন্তু ততক্ষণে সবাই বাইরে বেরিয়ে গেছে। বাচ্চারা গরম জামা খুলে ফেলে আকাশের দিকে দু’হাত তুলে সারা শরীর দিয়ে সূর্যের উত্তাপ অনুভব করতে লাগল।


“উফ্‌! কী সুন্দর! সূর্য তো ঘরের বিদ্যুৎ-চুল্লির থেকে অনেক ভালো!”
“অনেক অনেক ভালো
তারা শুক্রের বিখ্যাত জঙ্গলের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। এই জঙ্গল যেন সবসময় বেড়েই চলেছে। কিছুক্ষণ একদৃষ্টে কোনও অংশের দিকে তাকিয়ে থাকলে গাছগুলোর বৃদ্ধি যেন অনুভব করা যায়। মাথার উপর লতা ও গুল্মের ঘন জাল, বিচিত্র সব ফুল ফুটেছে এই ক্ষণিকের বসন্তে। গাছের পাতা কিন্তু ছাইরঙা, বছরের পর বছর সূর্যের অনুপস্থিতিতেবাচ্চাদের কাছে মনে হচ্ছিল জঙ্গলটা যেন পাথর, সাদাটে চীজ আর কালি দিয়ে আঁকা হয়েছে। তারা হাসতে হাসতে জঙ্গলের পুরু পাতাঝরা মাটিতে শুয়ে পড়ল। পাতার বিছানা শব্দ করে জানান দিল রোদ্দুরের স্বাদ তারাও পেয়েছে। তারা গাছের ফাঁকে দৌড়াতে লাগল, একে অপরকে ঠেলা দিয়ে ছোঁয়াছুঁয়ি আর লুকোচুরি খেলতে লাগল। তারা পা পিছলে পড়ে গিয়ে আবার উঠে দৌড়ল। তবে সবথেকে বেশি সময় তারা সূর্যের দিকে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল, যতক্ষণ না তাদের চোখ জলে ভরে ওঠে।
তারা দুই হাত আকাশে তুলে ছোঁয়ার চেষ্টা করল সূর্যকে। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল ঠাণ্ডা বাতাসে, কান পেতে শুনল জঙ্গলের অসীম নীরবতাকে। অন্ধকার বন্দীদশা থেকে মুক্ত স্বাধীন পশুদের মতো ছুটে বেড়ালো, গোল হয়ে চিৎকার করল তারা।
আর তারপরে –
তাদের মধ্যে থেকে একটি মেয়ে তীক্ষ্ণস্বরে আর্তনাদ করে উঠল।
সবাই থেমে গিয়ে তার দিকে ঘুরে তাকাল।
মেয়েটি ধীরে ধীরে তার হাত বাড়িয়ে ধরল সবার সামনে। কাঁপতে কাঁপতে বলল, “সময় হয়ে গেছে!”
মেয়েটির হাতের চেটোতে বিশাল একফোঁটা বৃষ্টির জল ধরা ছিল। মেয়েরা সবাই সেটা দেখে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। বাকিরা সবাই আকাশের দিকে তাকাল।
দেখতে দেখতে বড়ো বড়ো ঠাণ্ডা জলের ফোঁটা সবার চোখেমুখে ঝরে পড়তে লাগল। এক অপার্থিব কুয়াশায় যেন সূর্য ঢাকা পড়ে গেল দেখতে দেখতে। বাচ্চারা ঠাণ্ডা হাওয়ায় কেঁপে উঠল আর তারপরেই হাত ধরাধরি করে মাটির নিচের শহরের দরজার দিকে হাঁটতে লাগল। দূরে কোথাও প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল। ঝড়ের মুখে পাতার মতো তারা দৌড়ল দরজার দিকে। কেউ আর হাসছিল না। প্রথমে দশ মাইল দূরে, তারপর পাঁচ মাইল, এক মাইল - একের পর এক বাজ পড়ছিল। মূহুর্তের মধ্যে আকাশে রাত্রির অন্ধকার নেমে এল।
বৃষ্টির মধ্যেও দরজার সামনে যতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায় তারা অপেক্ষা করল। কিন্তু দেখতে দেখতে প্রচণ্ড বৃষ্টি আর ঝড়ের বেগে তারা বাধ্য হল দরজা বন্ধ করে ভেতরে চলে আসতে। বাইরে তখন অনন্ত বর্ষণ আর বজ্রপাত।
“আবার সাত বছর পরে?”
“হ্যাঁ, আরও সাত বছর।”
হঠাৎ তাদের মধ্যে কেউ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
“মার্গো!”
“কী হল?”
“ওকে আমরা আলমারি থেকে বের করতে ভুলে গেছি! ও এখনও ওখানেই আটকে আছে!”
সবার পা যেন পেরেক দিয়ে কেউ মেঝেতে আটকে দিয়েছিল। সবাই একে অপরের দিকে আড়চোখে তাকাতে লাগল। কিন্তু কারোর চোখের দিকে তাকানোর সাহস তাদের ছিল না। বাইরের প্রকৃতির মতোই তাদের মুখগুলো ম্লান হয়ে উঠেছিল। একটি মেয়ে বলে উঠল, “আমরা এখন কী করব?”
সবাই মাথা নিচু করে নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। শেষপর্যন্ত কেউ বলে উঠল, “সবাই মিলে চল।”
বৃষ্টির শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে তারা লাইন করে ক্লাসঘরে ঢুকল। ঝড় আর বাজের শব্দে ঘরটা যেন চমকে উঠছিল বারে বারে। বিদ্যুৎ-চমকের আলোয় তাদের ম্লান মুখগুলো আরও নীল দেখাচ্ছিল। আলমারির সামনে তারা সবাই গোল হয়ে দাঁড়াল।
বন্ধ দরজার অন্যদিকে কোনও শব্দ পাওয়া গেল না। তারা দরজার তালাটা খুলে সন্তর্পণে মার্গোকে বের করে আনল।
_____
অলঙ্করণঃ মঞ্জিমা মল্লিক

7 comments:

  1. দীপ ঘোষ বড় ঝরঝরে সুন্দর অনুবাদ করেছেন । আমি এই গল্পটা বলবো বাচ্চাদের । কিন্তু আমার খটকা লাগছে যে যদি অনেক বছর সূর্য না উঠে থাকে তাহলে শুক্রগ্রহের আবহাওয়া তে কি কারনে বরফ হয় নি? এটা বোঝা যাচ্ছে যে বৃষ্টি নিরন্তর হয়ে চলেছে আর মেঘে ঢাকা পড়েছে । বাচ্চারা যারা নিজেরা পড়বে তারা কিন্তু এই জায়গাটায় আটকে যাবেই । একটা লাইন কিন্তু ব্রাডবুরি যোগ করতেই পারতেন । দীপ ঘোষ যদি কিছু আলোকপাত করেন

    ReplyDelete
    Replies
    1. প্রদীপ বাবু, অনেক ধন্যবাদ গল্পটি পড়ার জন্যে। আপনার প্রশ্নটি খুবই সঙ্গত। এর আগেও এই প্রশ্ন দেবব্রত বাবু করেছিলেন, কল্পবিজ্ঞান গ্রুপেও এই নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সোজা কথায় বলতে গেলে ব্রাডবেরি সায়েন্স ফিকশানের থেকে সায়েন্স ফ্যান্টাসিই লিখেছেন বেশি। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সাধারন মানুষের মনের বিভিন্ন দিকের রহস্য উন্মোচন করা। আর তাঁর জন্যে তিনি সাহায্য নিয়েছিলেন কল্পবিজ্ঞানের। তাই তাঁর গল্পে মানুষ ও ঘটনা বেশি প্রাধান্য পায়, বিজ্ঞানের থেকে। বেশিরভাগ সময়েই বিজ্ঞান এসেছে রূপক অর্থে। এই গল্পের ক্ষেত্রেও মার্গো আর তাঁর বন্ধুদের আচরনই প্রধান, আর সেটি দেখানোর জন্যেই অবতারণা হয়েছে শুক্রের সাত বছরে এক ঘন্টার সূর্যের। আশা করি কিছুটা ব্যখ্যা করতে পারলাম।

      Delete
  2. খুব সাবলীল সুন্দর অনুবাদ।

    ReplyDelete
    Replies
    1. অনেক ধন্যবাদ দাদা, আপনার ভালো লেগেছে জেনে খুব খুশি হলাম।

      Delete
  3. Ebaba etai to ami onubad korechi..jeta ebar Bohumukhi be chapa hobe...

    ReplyDelete
    Replies
    1. বেশ হয়েছে! কল্পবিশ্বে লেখা না দিলে এমনই হবে :P

      Delete
  4. এত সুন্দর! যেন বা অনুবাদ নয় মৌলিক সৃষ্টি। ভাষাকে গভীর ভাবে ভালো না বাসলে আর নিজের লেখার ক্ষমতা না থাকলে অসম্ভব।

    ReplyDelete