আমার ছেলেবেলা - চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়


আমার ছেলেবেলা
চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়

আমার জন্ম-সময়টা এমন একটা বছরে যখন একদিকে যৌথ পরিবারগুলো শেষ পুরুষের কলকাকলিতে একই ছাদের তলায় অবস্থান করছে। ঘরের মধ্যে দেওয়াল। বাড়ির নাটমন্দির ভাগ করে রান্নার জায়গা। তবুও বাড়ির মেজবউ লাউ-চিংড়ি রান্না করে একবাটি বড়ো ভাসুরের জন্য পাঠিয়ে দেয়। বড়োজন লাউ-চিংড়ি খেতে খুবই ভালোবাসে যে! তেমনি ছোটোকর্তার মেয়ে অনায়াসে মেজজ্যাঠার সঙ্গে শীতের বালাপোশ ভাগ করে শুয়ে পড়ে। তখনও কলকাতার সূর্যাস্তে ছড়ানো রয়েছে বাবু কালচারের ফিকে হয়ে যাওয়া স্বর্ণালী আভার শেষ পরতটুকু। তখনও কলকাতার গৃহস্থ-বাড়িতে ছিল কয়লা জ্বালানো উনুনে রান্না। সেটা ১৯৬০ সাল। বাড়িতে বাড়িতে ছিল সাদা নব দেওয়া রেডিও, গ্রামোফোন, ৭৮ স্পীডের রেকর্ড, ইকমিক কুকার, হ্যাজাকের আলো, হোল্ড-অল, আচার শুকানো কাঁচের বয়াম, দোয়াত কলম। তখন কলকাতায় ছিল ভিস্তিওয়ালা, ডবল ডেকার বাস, সিনেমার হাফ টাইমের বই। ছিল বেতার জগত, এইচ এম ভি-র শারদ অর্ঘ্য, পুজোর গান, থিয়েটার পাড়া, কমলালয় স্টোরস, উত্তর পূরবী-উজ্জ্বলা আর ছিল সকাল ন’টার ভোঁ।
আমাদের বাড়ির সামনে একজন চিনাম্যান জাগলিংয়ের খেলা দেখাতেন। আমার জ্ঞান হওয়া থেকে যৌবন পর্যন্ত তাকে ওই একই খেলা দেখাতে দেখেছি। কাঁধে একটা বড়ো কাঠের বাক্স স্ট্র্যাপ দিয়ে আটকানো। হাতে একটা গোলাকৃতি ছোট্ট টুল। তখন আমাদের ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ দান হিসেবে মনে হত সেই লোকটিকে যে হাতে মোটা বাঁশের লাঠি নিয়ে এসে দাঁড়াত আর লাঠিতে জড়ানো থাকত চ্যাপটানো লজেন্স। সে সেখান থেকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে বানিয়ে দিত হাতে ঘড়ি, গড়গড়া, পদ্মফুল। তখন এক পয়সা, দু’পয়সা, তিন পয়সা মাপের পেপারমেন্ট লজেন্সের বিক্রি ছিল এখনকার ক্যাডবেরি স্লিকের থেকে বেশি। দোলযাত্রায় মুড়কি, ফুটকড়াই আর চিনির তৈরি মঠ ছিল অবশ্য আহার্য। তিলের কাঠি, কদমা, পাঁচ পয়সার ‘বরফ আইসক্রিম’ (ফিরিওয়ালারা ওই নামেই ডাকত)। তখনও কলকাতায় ছিল আড্ডা দেওয়ার রক। বিয়েবাড়িতে হত কলাপাতায় খাওয়া, মাটির খুরিতে কেওড়া জল। ছিল আন্তরিকতার মোড়কে কলকাতা।

আমাদের এন্টালির বাড়িতে সত্যজিৎবাবু, আমি হাফপ্যান্ট পরে

বাঙালি জীবন দ্বিতীয় রেনেসাঁয় ভেসে যাচ্ছে। কি সঙ্গীত, কি সাহিত্য, কি শিল্প, কি চলচ্চিত্রে, কি বাণিজ্য-রাজনীতিতে বাঙালি তখন স্বর্ণালী নস্টালজিয়ায় সওয়ার। আর আমার জ্ঞান হওয়া থেকে বাল্য-কৈশোরে বেড়ে ওঠাও এই পরিবেশে। ছোটোবেলা থেকেই একটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে শ্বাস নিতে নিতে বড়ো হয়ে গেছি কখন।
আমার বাবা বিমলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ, আড্ডাবাজ, গ্রন্থপ্রেমী এক মানুষ। যিনি পরবর্তী জীবনে অভিনেতা হয়ে উঠেছিলেন সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেনের বিভিন্ন চলচ্চিত্রে। আমাদের ছোটোবেলায়, কিশোরবেলায় একটা পাড়া-সংস্কৃতির ছাপ ছিল সর্বত্র। পান পরাগ কালচার তখন ব্রাত্য। তখন ছোটোদের জন্য মণিমেলা, ব্রতচারী সংঘ ছিল। ছিল শহরের মধ্যেই বড়ো বড়ো পুকুর। খেলবার মাঠ। ছিল পাড়ায় পাড়ায় বিশেষ বিশেষ দিনে প্রভাতফেরী। বিচিত্রানুষ্ঠান। আমি ছোটোবেলা থেকেই মণিমেলার সদস্য। এছাড়া বিশেষ বিশেষ পাড়ায় অনুষ্ঠিত হত সারারাতব্যাপী বাংলা গানের জলসা। সাধারণ চৌকি পেতে, ত্রিপল বিছিয়ে স্টেজ করা হত। মাথার ওপর সাধারণ কাপড়ের ঢাকা। অবশ্য একটা গ্রিনরুম হত বড়ো সাইজের। শিল্পীরা সেখানে বসে আড্ডা দিতেন। বাংলার প্রায় সমস্ত নামী গাইয়েরা উপস্থিত থাকতেন। এইরকম একটা কলকাতায় আমার বড়ো হয়ে ওঠা। যখন গাছে চড়া, পিট্টু খেলা, ডাংগুলি এগুলো না খেললে দমবন্ধ হয়ে যেত। বাবা ব্যস্ত থাকতেন তাঁর সাংস্কৃতিক আঙিনায়। বাড়ির নিয়ম ছিল বড়োরা গল্প করলে, কথা বললে সে ঘরে প্রবেশ নিষেধ। যতক্ষণ না তাঁরা ডাকছেন। রবিবার মানেই সকাল থেকেই বাবার কাছে লোকের আনাগোনা। তার ভেতর এক রবিবার বাবা নিয়ে গেলেন আমায় আমাদেরই পড়শি কাজী নজরুল ইসলামের বাড়িতে। আমার বয়স তখন আট কি নয়। একজন দাদু কবিতা লেখে এটাই ছিল আমার কাছে তাঁর পরিচয়। সেই আমার দেখা প্রথম মহাপুরুষ। যেতাম কাজী সব্যসাচীর কাছে কবিতা শিখতে। কোনও কোনওদিন হয়তো তিনি ব্যস্ত, আমায় বলতেন, ‘যা, বাবার ঘরে গিয়ে বস। এই কবিতাটা মুখস্থ কর। আমি দেখে দিচ্ছি।’ গিয়ে বসতাম কাজী নজরুলের ঘরে। আমার হাতে কবিতার বই ‘সঞ্চিতা’কবিতা ‘ঝিঙেফুল’। উনি হয়তো একটা তক্তপোষে বসে নিবিষ্ট মনে কাগজ ছিঁড়ে চলেছেন। আর আমি বসে থাকতাম একটা গোল করে পাকানো শতরঞ্চির ওপর। অদ্ভুতভাবে উনি মাঝে মাঝে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতেন আমার দিকে চেয়ে। তখন জানতাম না কোন মনীষীর সামনে বসে আছি। খুব খারাপ লাগত যখন দেখতাম কাজের লোকেরা ওনাকে চান করানোর জন্য নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু হয়তো ওনার লুঙ্গি খুলে গেল। আর অমনি কাজের লোকটি দু’চার ঘা বসিয়ে দিল কাজী নজরুলের গায়ে। বড়ো হয়ে মা’র কাছে শুনেছি এই কারণেই নাকি মাস কয়েক পর আর আমি ওখানে যাইনি। মাকে নাকি বলতাম, ‘ওরা দাদুকে মারে। আমি যাব না।’ যাই হোক, তাঁর কৃপাদৃষ্টি তো আমি পেয়েছি। আজ বুঝি সে আমার জীবনের কত বড়ো সম্পদ।

বাবা আর মা বাবা আলাউদ্দিনের সঙ্গে ভবানীপুরের বাড়িতে

আমাদের বাড়িতে তখন পুরোদমে চলছে নবীন বাউলের জন্মদিবস পালনের কর্মসূচি। পূর্ণদাস বাউল তখন রোজই আসতেন আমাদের বাড়ি। হঠাৎ অনেকের ভিড়ে একদিন লম্বা এক ফর্সা ভদ্রলোককে আসতে দেখলাম। একটা অদ্ভুত জ্যোতি বার হচ্ছে মনে হল ভদ্রলোকের চতুর্দিক থেকে। বাবা প্রণাম করতে বললেন। ভদ্রলোক আমার গাল টিপে আদর করে দিলেন। পাশে বসিয়ে কোন স্কুলে পড়ি, কী পড়ি সব জিজ্ঞাসা করলেন। বাবার কাছে শুনলাম উনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বংশধর, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ঠাকুরবংশের আরেক বোহেমিয়ান মানুষকে অনেকবার দেখেছি আমাদের বাড়িতে বা ওনার বাড়ি ধর্মতলায়। সুভো ঠাকুর। আড্ডা জমে উঠলে কারুরই সময়ের খেয়াল থাকত না। তখন বাবা সন্ধেবেলা বাড়ি থাকা মানেই আড্ডা। তবুও পড়াশুনোর ফাঁকে ফাঁকে উঁকি মেরে দেখতাম কে আসছে বাবার কাছে। যাঁরা আসছেন তাঁদের নাম জানতাম শুধু। তাঁরা কে বোঝবার মতো বয়স হয়নি তখনও। পরে অনুভব করেছি, বিস্মিত হয়েছি। হাতে একটা কালো ছোট্ট সুটকেস টাইপের বাক্স ঝুলিয়ে, সাদা ফতুয়া-পাঞ্জাবি আর ঢোলা পায়জামা পরে এক বেঁটেখাটো ভদ্রলোক মাঝে মাঝে আসতেন আমাদের বাড়ি। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময়ে হাঁক পাড়তেন, ‘কী রে বিমল, আছিস? বৌমা, তাড়াতাড়ি চায়ের জল বসাও।’ উনি এলেই দেখতাম মা ওনাকে প্রণাম করতেন। চা খাওয়া হল। আড্ডার ফাঁকেই দরাজ গলায় গান ধরতেন। কী অসাধারণ কণ্ঠস্বর! তখন কি জানতাম, পাহাড়ি সান্যালের গলায় গান শুনছি? নিধুবাবুর টপ্পা অথবা অতুলপ্রসাদের গান।
তখন ক্লাস এইট-নাইনে পড়ি। আমাদের পাড়ার কনভেন্ট পার্কে ক্রিকেট খেলতে যেতাম বন্ধুদের সঙ্গে। ওখানে আলাপ হল একদিন বয়সে বেশ কিছুটা বড়ো রাজাদার সঙ্গে। রাজাদা পাশেই কনভেন্ট ম্যানসনে থাকতেন। সাবেকি ভাড়াবাড়ির চারতলায়। রাজাদার বাড়ি প্রায়ই যেতাম। একদিন দেখি একজন মানুষ আপনমনে চোখ বুজে এসরাজ বাজাচ্ছেন। বেশ কিছুক্ষণ শুনলাম। রাজাদা এসে আলাপ করিয়ে দিলেন ওঁর জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে, বাবার নাম বলে। এসরাজ নামিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘তুমি বিমলের ছেলে! বিমল কেমন আছে? বোলো, একদিন আমি ডেকেছি।’ পরে বাবাকে গিয়ে ওনার কথা বললাম। ওমা, দেখি বিকেলবেলায় রাজাদাকে সঙ্গে নিয়ে উনি নিজেই হাজির আমাদের বাড়ি। রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রবাদপ্রতিম মানুষ, শৈলজারঞ্জন মজুমদার। কী অমায়িক মানুষ!

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে বাবা, জয় বাবা ফেলুনাথের সেটে

জগন্ময় মিত্র ছিলেন ঘরের লোক। অসাধারণ কুঁচোনো ধুতি পরে জগন্ময়কাকা এসে বসতেন খাটে। আড্ডা চলত, গান চলত। আমার যুবকবেলা অবধি জগন্ময়কাকার সান্নিধ্য পেয়েছি। প্রেমেন্দ্র মিত্র মানুষটি খুবই শান্তশিষ্ট স্বভাবের। তখন ঘনাদা পড়া হয়ে গেছে আমার। উনি আসতেন, বাবার লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে যেতেন। আমার দাদা-দিদির প্রতি খুব রাগ হত। তারা আমার থেকে আঠারো এবং কুড়ি বছরের বড়ো। তারা বাবার খ্যাতির তুঙ্গটা দেখেছেন। আমি বাবা-মা’র বেশি বয়সের সন্তান। তাই সবার আদরটাই পেয়েছি বেশি করে। আমার মা উত্তরপাড়ার বিখ্যাত জমিদার পেয়ারীমোহন মুখোপাধ্যায়ের জ্যেষ্ঠা প্রপৌত্রী। পথ চলতে গিয়ে বাবা থেমে থাকেননি কোনও নির্দিষ্টতায়। দিগন্তরেখার হাতছানিতে বারবার ছুটে গিয়েছেন আকাশ ছুঁতে বিভিন্ন মাধ্যমে। হয়তো এটাই তাঁর ব্যর্থতা। অথবা এটাই এনে দিয়েছিল তাঁর জীবনকে বহুমুখীতার জনপ্রিয়তার স্বাদ। প্রথম জীবনে ঘুরে বেড়িয়েছেন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বীর সাভারকার, অগ্রজ নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ( যিনি এন. সি. চ্যাটার্জী নামেই খ্যাত এবং লোকসভার প্রাক্তন স্পীকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের পিতা)। সেখানে মন টেঁকেনি। সরিয়ে নিয়ে নিজেকে বেঁধেছিলেন সুরের জালে। আমাদের এন্টালির বাড়িতে বসত মাসিক জলসার আসর। কে আসেননি সেই জলসায়। দিলীপকুমার রায়, ডাঃ কালিদাস নাগ, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, ধীরাজ ভট্টাচার্য, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ধীরেন বসু, সুচিত্রা সেন, সুনন্দা পট্টনায়েক, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, অখিলবন্ধু ঘোষ, ঋত্বিক ঘটক প্রমুখেরা। এভাবেই একদিন কৈশোরের সঙ্গমে এসে দাঁড়ালাম।
বাবা তখন অভিনেতা। সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লা, জয় বাবা ফেলুনাথ, জন অরণ্য, হীরক রাজার দেশে, ঘরে বাইরে আর ঋত্বিক ঘটকের খারিজ-এর জনপ্রিয় অভিনেতা। আমার জীবনেও তখন কিঞ্জল পত্রিকার হাতছানি। মাধ্যমিক পাশ করবার পরই বার করেছিলাম কিঞ্জল পত্রিকা। আজ চল্লিশ বছর ধরে যা প্রকাশ করে চলেছি। আমার জীবনে দেখা শেষ মনীষী সত্যজিৎ রায়। আর কিঞ্জল পত্রিকা আমাকে দিয়েছে আরও আরও প্রচুর মানুষের স্নেহ, মমতা। তাঁদের স্নেহবর্ষণে সিক্ত আমি – রাধারানী দেবী, অন্নদাশঙ্কর রায়, চিত্রিতা দেবী, রথীন মৈত্র, পরিতোষ সেন, রাধাপ্রসাদ গুপ্ত, আরও আরও অনেকে। সে অন্য পর্ব। অন্য মনন।

আমাদের ১১৬ নং এন্টালির বাড়ি
_____

1 comment: