গল্পের ম্যাজিক:: যুক্তি তক্কো অঙ্ক - তাপস মৌলিক

যুক্তি-তক্কো-অঙ্ক

তাপস মৌলিক


    একেই বলে পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা। শনিবার হোস্টেল থেকে বাড়ি ফিরছি। হাওড়া স্টেশনে কাটোয়া লোকালে উঠেই জানালার ধারের একটা একানে সিট পেয়ে গেলাম। তাও মনটা কেমন খুঁতখুঁত করছিল। কারণ সিটটা ট্রেন যেদিকে যাবে সেদিকে পেছন করে, তার মানে হাওয়া পাব না। এমন সময় আমার উল্টোদিকের বয়স্ক ভদ্রলোক বললেন, “ভাই, তুমি এদিকের সিটটায় বসবে? আমি তাহলে তোমার সিটটায় বসতে পাই।” এককথায় রাজি হয়ে গেলাম। হাওয়া খেতে খেতে যাওয়া যাবে। ওই সিটটাই তো বেশি পছন্দ আমার

    সিট পালটে ভদ্রলোককে ভাল করে দেখলাম। বয়েস সত্তরের কাছাকাছিফরসা, বেঁটেখাটো চেহারা। মাথায় কিছুটা টাক, কিছুটা সাদা চুল। মুখে অল্পস্বল্প গোঁফদাড়ি, সেও সাদা। গোলগোল চশমার পেছনে তীক্ষ্ণ চোখদুটোও গোলগোল। ভুরু প্রায় নেইকেমন জাপানি-জাপানি চেহারা। পরনে বিস্কুট রঙের খদ্দরের ফতুয়ার সাথে সাদা পাজামা। কোলের ওপর একটা বালিশের মত ফুলো কাপড়ের ব্যাগ আঁকড়ে মিটিমিটি হাসছেন। তাকিয়ে আছি দেখে বললেন, “দেখছ কী? আমার নাম জানো?”

    এই মরেছে! আমি ওনার নাম জানব কী করে? মাথা নেড়ে না বলতেই বললেন, “সে কী! আমায় চেন না? আমার নাম উৎফুল্ল পত্রনবিস। আমি একজন কবি, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, আইনজ্ঞ, তার্কিক, মনোবিদ, দাবাড়ু, প্রকৃতিপ্রেমী – আরও অনেক কিছু। আমাকে সবাই চেনে।”

    “উৎফুল্ল?”, মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, এরকম নাম কখনও শুনি নি কিনা!

    “কেন? উৎফুল্ল নামটা খটমট লাগছে? তাহলে প্রফুল্লও বলতে পারো। কিন্তু, জানালার ধারের এই সিটটা পেয়ে মনটা এমন খুশি হয়ে গেল যে প্রফুল্ল বললে ঠিকঠাক বোঝানো যায় না। উৎফুল্লই হবে। ডাকনাম হিসেবে অবশ্য আনন্দিত কিম্বা খুশি পত্রনবিস বলতে পার। তুমি সিটটা না ছাড়লে হত ব্যাজার পত্রনবিস।”
    “নাম এরকম ইচ্ছেমতন পালটানো যায় না কি?”

    “কেন যাবে না? আমি তো পাল্টাই। আসলে সবসময় একই নাম দিয়ে নিজেকে আমি ঠিক বোঝাতে পারি না। এই যেমন ট্রেনের দুলুনিতে যেই ঘুমিয়ে পড়ব, তখন যদি কেউ জিগ্যেস করে আপনার নাম কী, বলব ঘুমন্ত পত্রনবিস।”

    “ঘুমিয়ে পড়লে শুনবেন কী করে? নামটা বলবেনই বা কী করে?”

    “বাঃ বাঃ, তোমার তো বেশ বুদ্ধি আছে দেখছি? খপ করে ধরেছ। আসলে তোমাকে একটু টেস্ট করছিলাম। পাশ করে গেছতোমার মনটাও খুব ভাল। এককথায় আমাকে এই সিটটা ছেড়ে দিলে। কিন্তু, কেন দিলে বল তো?”

    “আমার তো ভালই হল। এদিকের সিটে হাওয়া অনেক বেশি পাব, সামনের দিকে মুখ করে বসেছি।”
    “হুম, যা ভেবেছি তাই। ঠিক ওই কারণেই সিটটা আমি ছেড়ে দিলাম। ব্যাপারটা কিন্তু ভীষণ জটিল আর গোলমেলে। হাওয়ার অঙ্কটা কিছুতেই মেলাতে পারবে না।”

    “হাওয়ার অঙ্ক মানে?”

    “হাওয়ার অঙ্কটা জানো না? এই যে এখন ট্রেনটা চলছে, তুমি দেখ, দু’পাশের সবকটা জানালা-দরজা দিয়ে হাওয়া ঢুকছে। কেবল ঢুকেই চলেছে। হাওয়াটা বেরোচ্ছে কোথা দিয়ে সেটা ভেবে দেখেছ? এটা আমি অনেক ভেবেও বার করতে পারি নি। প্রথমে ভাবতাম ট্রেনের শেষ কামরার পেছনের দেওয়ালে বোধহয় একটা জানালা আছে, অথবা দেওয়ালটাই নেই, সেখান দিয়ে সব হাওয়া বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একদিন পেছনে গিয়ে গার্ডের কামরায় ঢুকে দেখলাম, পেছনটা পুরো বন্ধ। সেখান দিয়েও হাওয়া বেরোনোর কোনও রাস্তা নেই। অথচ একটা রাস্তা তো থাকতেই হবে। নাহলে, শুধু যদি হাওয়া ঢুকেই যায়, ঢুকেই যায়, ট্রেনের পেটটা তো বেলুনের মত ফুলে উঠে বদাম করে ফেটে যাবে অঙ্কটা এখনও মেলাতে পারিনি বলেই ওদিকের সিটটায় বসি না। বাইরে থেকে হাওয়া ঢুকে চোখেমুখে লাগলেই আমি অস্বস্তিকর পত্রনবিস হয়ে যাই।”
    এরকম খিটকেলে অঙ্কের কথা আমি জীবনে শুনিনি। দাদুর মাথায় মনে হয় বেশ কয়েক গজ ছিট আছেট্রেনটা শ্রীরামপুর ছাড়তেই এক ঝালমুড়িওলা ‘ঝালমুড়ি, ঝালমুড়ি’ হাঁকতে হাঁকতে কামরার ভেতর ঢুকে এল। সেই কোন দুপুরে ক্যান্টিনে খেয়ে বেরিয়েছি। ভালই খিদে পেয়েছিল। কিনব বলে ভাবছিলাম, এমন সময় দাদুই বললেন, “আমার খিদেটা বলছে ঝালমুড়ি খাবে। তোমার খিদে কী বলছে? চলবে?”

    “না না, আপনি খাওয়াবেন কেন? আমি আমারটা কিনে নিচ্ছি।”

    “তা কেন? আমিই দুজনকে খাওয়াচ্ছি। তুমি আমায় পছন্দের সিটে বসতে দিয়েছচোপ, একদম অস্থির হবি না। খাবার দেখামাত্র চোঁ চোঁ করতে লেগেছে, একটু তর সয় না। দিচ্ছি তো কিনে, সবুর কর।”

    “মানে?”

    “ওহ, না না, সরি। তোমাকে নয়। ওটা আমার খিদেটাকে বললাম। ব্যাটা ছুঁচোর মত ডনবৈঠক দিচ্ছিল। অবশ্য, বেচারার খুব দোষ নেই, সেই সকালে খেতে দিয়েছি, তারপর আর দিইনি।”

    ঝালমুড়ির ঠোঙাটা হাতে নিয়ে একমুঠো গালে ফেলে ফ্যালফ্যাল করে দাদুর দিকে তাকিয়ে রইলাম। ব্যাপারটা ঠিক মাথায় ঢুকল না। ভদ্রলোক নিজের খিদের সঙ্গে কথা বলেন! পাগল নাকি? আমার অবস্থা দেখে উনি কিছু আন্দাজ করলেন।

    “বুঝতে পারলে না? দাঁড়াও, বুঝিয়ে বলছি। ব্যাপারটা অবশ্য একটু গোলমেলে। আইন জানা থাকলে বুঝতে একটু সুবিধে হয়। এই যে তুমি এখন ঝালমুড়ি খাচ্ছ, কখনও কি ভেবে দেখেছ যে এটা তুমি খাচ্ছ, না তোমার খিদেটা খাচ্ছে?”

    “এ আবার কী প্রশ্ন! আমিই খাচ্ছি। আমার খিদে আবার খাবে কী করে?”

    “দ্যাখো, আমাদের যখন খিদে পায়, আমরা সবাই সামর্থ্য থাকলে খাই, না থাকলেও খেতে চাই। যারা অনশন ধর্মঘট করে তাদের কথা অবশ্য আলাদা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে খাবারটা পেটে গেল, এটা আমি খেলাম, না আমার খিদে খেল?”

    “আমিই খেলাম। আমি আছি বলেই তো আমার খিদে আছে। আমি না থাকলে খিদেও হাপিস। খিদেটা তো আমার ওপর নির্ভরশীল। সে কি আমার থেকে আলাদা নাকি?”

    “আলবাত আলাদা, একশবার আলাদা। ধর তোমার খিদে পায় নি, পেট ভর্তি, তখনও তো তুমি আছ। তার মানে, তুমি আছ, অথচ তোমার খিদে নেই। অর্থাৎ, তুমি আর তোমার খিদে আলাদা। আবার ধরা যাক, তুমি কিছু খেলে। খাবারটা পেটে গেল। তাতে তোমার পেটটা ভরল। কিন্তু তুমি তো আর শুধু পেটসর্বস্ব নও। তোমার মনটা নাও ভরতে পারে। তার মানে, তোমার খিদেটা নির্মূল হলেও তুমি খুশি হলে না। তোমার খিদেটাই তাহলে খেল, তুমি মনেপ্রাণে খেলে না।”

    “কিন্তু উৎফুল্লদাদু, না কি খুশিদাদু বলব? ও না, এখন তো নিশ্চয়ই ক্ষুধার্ত পত্রনবিস হয়ে গেছেন!”

    “ভুল করলে। নামটা মনের অবস্থার সঙ্গে পালটায়, পেটের অবস্থার সঙ্গে নয়। বলছি না, খিদেটা আমার থেকে আলাদা। পদবিটা অবশ্য পালটায় না। তুমি আমায় নতুন পাতা বলতে পারো। পত্র নভিস - নতুন পাতা, বা নতুন পাতানো বন্ধু।”

    “নতুন পাতা? এই নামে আবার কাউকে ডাকা যায় নাকি? তারচেয়ে স্রেফ দাদুই ভাল। আপনার যুক্তি আমি মানতে পারলাম না। ‘আমার খিদে’ ব্যাপারটা একটা তাৎক্ষণিক ব্যাপার, ‘আমি’ ব্যাপারটা শাশ্বতখিদেটা তো স্বাধীন নয়।”

    “অবশ্যই স্বাধীন। ধরো, একদিন বিকেলবেলা তুমি পাড়ার মোড়ের চপের দোকান থেকে একটা ফিস ফ্রাই কিনলে। এবার, ফ্রাইটাতে কামড় দিতে যাবে, এমন সময় একটা কাক এসে সেটাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল। তুমি যে কে সেই রয়ে গেলে, কিন্তু তোমার খিদেটা চড়চড় করে বেড়ে গেল। খিদেটা স্বাধীন
    “কিন্তু দাদু,” আমারও যুক্তি মজবুত, “খায় সবাই বাঁচার জন্য। ‘আমার খিদে’টা যদি খেত তাহলে সে বাঁচত। কিন্তু পরিমাণমত খাবার পেটে গেলেই খিদে মরে যায়। তাই ‘আমার খিদে’ কখনওই খেতে পারে না। আমিই খাই।”

    “খিদে মরবে কেন? রাম রাম। খিদে মরে গেলে তো আর কোনও দিন খিদেই পাবে না, যদি না নতুন কোনও খিদের জন্ম হয়। খাবার পেটে গেলে খিদেটা ঘুমিয়ে পড়ে শুধু। আমাদের ভাতঘুমের মত। ঘুম ভাঙলেই ফের মাথাচাড়া দেবে। তাছাড়া ধরো, খাওয়াদাওয়ার পর খিদেটা আরাম করে ঘুমিয়ে পড়ল; আর তোমার এদিকে বদহজম, পেটখারাপ এসব যা তা হয়ে গেল। খিদে পেল আরাম, তোমার হল ব্যারাম। অর্থাৎ, তুমি আর তোমার খিদে সম্পূর্ণ আলাদা।”

    আমার মাথা তখন বনবন করে ঘুরছে। দাদু বলে চলেছেন, “আমার খিদেটারও নানারকম নাম আছে। যখন চাঙ্গা থাকে তখন ডাকি বুভুক্ষু, সর্বভুক, খাই খাই। ঝিমিয়ে থাকলে ডাকি টুকিটাকি, আড়মোড়া। আর ঘুমিয়ে থাকলে একাদশী বা অগ্নিমান্দ্য।”

    ট্রেন ব্যান্ডেল পার হয়ে গেছে। আমাদের ঝালমুড়িও অনেকক্ষণ শেষ হয়ে গেছে। এমন সময় ত্রিবেণী থেকে শালপাতা চাপা দেওয়া একঝুড়ি শিঙাড়া নিয়ে একজন হকার উঠলেন। গন্ধেই ফের খিদে পেয়ে গেল। দাদুকে বললাম, “দাদু, আপনার খিদে কি ঘুমিয়ে পড়েছে? ডেকে জিগ্যেস করুন শিঙাড়া চলবে কিনা। এবারে আমি খাওয়াব।”

    “শিঙাড়াটা চলতে পারে। শিঙাড়ার অঙ্কটা আমি সমাধান করে ফেলেছি।”
    “শিঙাড়ারও আবার অঙ্ক? কী রকম?”
    “সে কী! শিঙাড়ার অঙ্কটা শোন নি? ত্রিকোণমিতির অঙ্ক শিঙাড়া তো দেখ তিন দিক দিয়েই বন্ধ, তাহলে ভেতরে আলুর তরকারিটা ঢুকল কী করে বল তো?”
    শালপাতার চোঙায় চারটে করে শিঙাড়া নিয়ে খেতে খেতে বললাম, “ও, এটা! হ্যাঁ, এটা শুনেছি। এ তো খুব সোজা। শিঙাড়া তৈরি করার সময় আলাদা করে আলুর তরকারিটা বানিয়ে তারপর ভেতরে পুরে ...”
    “উঁহু, মোটেই না, মোটেই না। এই প্রসেসে অঙ্কটা করলে উত্তর মিলবে ঠিকই, কিন্তু এক নম্বরও পাবে না।”
    “তাহলে?”
    “আজ থেকে অনেক অনেক দিন আগে, বল্লাল সেনের সময়, একটা বিশাল ক্ষেতে আলু, গম আর সরষে একসাথে চাষ করা হয়েছিল। অদ্ভুত দেখতে বেঁটেমত একটা গাছ গজাল, আর তাতে ফলন হল শিঙাড়ার। যেখানে ব্যাপারটা প্রথম হয়েছিল সেই জায়গাটার নাম এখন সিঙ্গুর।”

    আমি গরম শিঙাড়া মুখে নিয়েও তীব্র প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু দাদু হঠাৎ ব্যস্তসমস্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “এই এই, আমার জিরাট চলে এসেছে। নামতে হবে। চললাম ভাই।”
    তাড়াতাড়ি শেষ শিঙাড়াটা শেষ করে, হাতের শালপাতার চোঙাটা জানালা গলিয়ে ফেলে দিয়ে, ব্যাগ সামলে আমার পাশ দিয়ে দরজার দিকে যেতে যেতে ‘হেউ’ করে একটা বিশাল ঢেকুর তুলে দাদু বললেন, “শুনলে?”
    “কী?”
    “শুনলে না? আমার খিদেটা তোমায় থ্যাঙ্ক ইউ জানাল।”
_______
ছবি - দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী  

8 comments:

  1. এই গল্প শুধু আপনার কলম/আঙুল-কিবোর্ড থেকেই বেরোতে পারে| অভিনন্দন তাপসদা, এবং দারুণ গল্পের জন্যে অনেকোনেক ধন্যবাদ|

    ReplyDelete
    Replies
    1. ধন্যবাদ ঋজু। :-)

      Delete
  2. এই গল্পটা যে আমি এতদিন পরে পড়লাম, এতেই প্রমাণ হচ্ছে যে আমি আর আমার বুদ্ধিশুদ্ধি দুটো সম্পূর্ণ আলাদা! কেয়াবাত!

    ReplyDelete
    Replies
    1. অদিতিদি, আপনার কমেন্টটা যে আমি এতদিন পর দেখলাম, তাতে প্রমাণ হচ্ছে যে আমার আর আপনার বুদ্ধিশুদ্ধি দুই বন্ধু। 'ধন্যবাদ'। আমি না, আমার বুদ্ধিশুদ্ধি বলল আপনাকে।

      Delete